সৃষ্টির পরশমনি

লেখক: মুহাম্মদ মাহদী হায়েরীপুর,মাহদী ইউসুফিয়ান ও মুহাম্মদ আমীন বালাদাসতিয়ান
ইমাম মাহদী (আ.)

সৃষ্টির পরশমনি

                     

মূল:

মুহাম্মদ মাহদী হায়েরীপুর ,মাহদী ইউসুফিয়ান ও মুহাম্মদ আমীন বালাদাসতিয়ান

অনুবাদ:

মোহাম্মাদ আলী মোর্ত্তজা

প্রকাশনায় :বিশ্ব ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র কোম ,ইরান।



সৃষ্টির পরশমনি

মূল : মুহাম্মদ মাহদী হায়েরীপুর ,মাহদী ইউসুফিয়ান ও মুহাম্মদ আমীন বালাদাসতিয়ান

ভাষান্তর : মোহাম্মাদ আলী মোর্ত্তজা

সম্পাদনা : মীর আশরাফ উল আলম

কম্পোজ : সৈয়দা শাহারবানু (ঋতু )

প্রকাশনায় : বিশ্ব ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র কোম ,ইরান।

SERISTIR POROSHMONI

By: Muhammad Mahdi Haeripur, Mahdi Yousufian & Muhammad Amin Baladestian.

Translated by: Muhammad Ali Murtaza

Eadit by: Mir Ashraf-ul-Alam

Published by: Qum, Iran.


প্রথম অধ্যায় : ইমামত

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর নবীন মুসলিম সমাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়টি ছিল খেলাফত তথা রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নিয়ে। একটি দল কিছু বিশিষ্ট সাহাবাদের পরামর্শে আবুবকরের খেলাফতকে মেনে নিয়েছিল। অপর দলটির দৃঢ় বিশ্বাস রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী তার মনোনয়নের মাধ্যমেই (অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশে) নির্ধারিত হবে আর তিনি হলেন হযরত আলী (আ.)। পরবর্তীতে প্রথম দলটি সাধারণ (আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত) এবং দ্বিতীয় দলটি বিশেষ (তাশাইয়্যো বা শিয়া ইছনা আশারী) নামে পরিচিতি লাভ করে।

বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হল এই যে ,শিয়া সুন্নির পার্থক্যটা শুধুমাত্র ব্যক্তি রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারীকে নিয়ে নয় বরং প্রত্যেকের দৃষ্টিতে ইমামের অর্থ ,বিষয়বস্তু এবং পদমর্যাদাও ভিন্ন। আর এ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই দুই মাঝহাবকে একে অপর থেকে পৃথক করেছে।

বিষয়টির স্পষ্টতার জন্য ইমাম ও ইমামতের অর্থকে বিশ্লেষণ করব যার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গিসমূহের ভিন্নতা সুস্পষ্ট হবে।

ইমামতের আভিধানিক অর্থ হল পথপ্রদর্শন বা নেতৃত্ব এবং ইমাম তাকে বলা হয় যিনি কোন সম্প্রদায়কে একটি নির্দিষ্ট পথে পরিচালনা করার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তবে ইসলামী পরিভাষায় ইমামতকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আহলে সুন্নতের দৃষ্টিতে ইমামত হচ্ছে পার্থিব হুকুমত (ঐশী পদমর্যাদা নয়) যার মাধ্যমে ইসলামী সমাজ পরিচালিত হবে। যেহেতু প্রতিটি জাতিরই নেতার প্রয়োজন রয়েছে ইসলামী সমাজও রাসূল (সা.)-এর পর নিজেদের জন্য অবশ্যই একজন নেতা নির্বাচন করবে। তবে তাদের দৃষ্টিতে যেহেতু ইসলামে নেতা নির্বাচনের কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেই কাজেই বিভিন্ন পন্থায় রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা যেতে পারে। যেমন: অধিকাংশের ভোটের মাধ্যমে অথবা সমাজের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের মতামতের ভিত্তিতে বা কখনো পূর্ববর্তী খলিফার ওসিয়াতের মাধ্যমে এমনকি কখনো আবার সামরিক অদ্ভুত্থানের মাধ্যমে।

কিন্তু শিয়া মাযহাব ইমামতকে নবুয়্যতের ধারার ধারাবাহিকতা এবং ইমামকে আল্লাহর হুজ্জাত ও মানুষের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম মনে করেন। তাদের বিশ্বাস হল এই যে , ইমাম শুধুমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হবেন এবং ওহীর বার্তা বাহক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পরিচয় লাভ করবেন। ইমামতের সুউচ্চ মর্যাদার কারণেই শিয়া মাযহাব ইমামকে মুসলমানদের পরিচালক এবং ঐশী হুকুম-আহকাম বর্ণনাকারী ,কোরআনের বিশ্লেষণকারী এবং সৌভাগ্য অর্জিত পথের দিক নির্দেশক মনে করেন। অন্য কথায় শিয়া মাযহাবের সাংস্কৃতিতে ইমাম হলেন মানুষের দ্বীন ও দুনিয়া সংক্রান্ত সকল সমস্যার সমাধানকারী। অর্থাৎ সুন্নি মাযহাবের সম্পূর্ণ বিপরীত কেননা তারা বিশ্বাস করে যে ,খলিফার দায়িত্ব হল সে শুধুমাত্র শাসন করবে এবং মানুষের পার্থিব সমস্যার সমাধান করবে।


ইমামের প্রয়োজনীয়তা

দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ স্পষ্ট হওয়ার পর এই প্রশ্নটির জবাব দেওয়া সমিচীন মনে করছি যে কোরআন এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নত থাকা সত্ত্বেও (যেমনটি শিয়া মাযহাব বিশ্বাস করে) ইমাম বা নেতার কি প্রয়োজন ?

ইমামের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তার জন্য অসংখ্য দলিল প্রমাণ রয়েছে তবে আমরা এখানে একটি অতি সাধারণ দলিল বর্ণনা করেই ক্ষান্ত হব। নবীর প্রয়োজনীয়তার জন্য যে সকল দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে তা ইমামের প্রয়োজনীয়তার দলিলও বটে। এক দিকে যেহেতু ইসলাম সর্ব শেষ দ্বীন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর সর্ব শেষ নবী সেহেতু ইসলামকে অবশ্যই কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যার সমাধান দিতে হবে ,অপর দিকে আল কোরআনে (ইসলামের) মৌলিক বিষয় ,আহকাম সম্পর্কিত নির্দেশাবলী এবং ঐশী তথ্যাবলী বর্ণিত হয়েছে এবং তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব রাসূল (সা.)-এর উপর অর্পিত হয়েছে। 1 এটা স্পষ্ট যে রাসূল (সা.) মুসলমানদের নেতা হিসাবে সমাজের প্রয়োজনীয়তা এবং ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর আয়াতকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। অতএব তার এমন যোগ্য উত্তরাধিকারীর প্রয়োজন যিনি তার মত আল্লাহর অসীম জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন ,তাহলেই তিনি রাসূল (সা.) যে সকল বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে যান নি তার ব্যাখ্যা দিতে পারবেন এবং ইসলামী সমাজের সকল যুগের সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবেন। এমন ইমামই রাসূল (সা.)-এর রেখে যাওয়া দ্বীন ইসলামের রক্ষী এবং কোরআনের প্রকৃত মোফাসসের। আর তারাই পারেন ইসলামকে সকল প্রকার শত্রুর হাত থকে রক্ষা করে কিয়ামত পর্যন্ত পাক ও পবিত্র রাখতে।

তাছাড়া ইমাম একজন পূর্ণমহামানব হিসাবে মানুষের জন্য একটি পরিপূর্ণ আদর্শ এবং মানুষ এমন একটি আদর্শের প্রতি বিশেষভাবে নির্ভরশীল। এভাবে তার সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনায় উপযুক্ত মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে। এই ঐশী পথপ্রদর্শকের ছত্র ছায়ায় থেকে চারিত্রিক অবক্ষয় এবং বাহ্যিক শয়তান থেকে নিরাপদ থাকতে পারবে।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ,মানুষের জন্য ইমামের প্রয়োজনীয়তা অতি জরুরী। তাই নিম্নে ইমামের কিছু বৈশিষ্ট বর্ণিত হল:

*নেতৃত্ব এবং সমাজ পরিচালনা (সরকার গঠন)।

*রাসূল (সা.)-এর দ্বীন ও শরীয়তের রক্ষণাবেক্ষণ এবং কোরআনের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান।

*মানুষের আত্মশুদ্ধি এবং হেদায়াত।


ইমামের বৈশিষ্ট্যসমূহ

রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী যিনি দ্বীনের অব্যাহত ধারার কর্ণধর ,মানুষের সমস্যার সমাধানকারী ,এক ব্যাতিক্রমধর্মী ব্যাক্তিত্ব এবং মহান ইমাম ও নেতা হিসাবে নিঃসন্দেহে তিনি বহুমূখী গুণাবলীর অধিকারী। এখানে ইমামের উল্লেখযোগ্য কিছু গুণাবলী আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল।

তাকওয়া ,পরহেজগারি এবং এমন নিঃস্কলুষ যে তার দ্বারা সামান্যতম কোন গোনাহ সংঘটিত হয় নি।

তার জ্ঞানের উৎস হচ্ছে রাসূল (সা.) এবং তা ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত।

অতএব তিনি সকলের পার্থিব ,আধ্যাত্মিক ,দ্বীন এবং দুনিয়ার সকল ধরনের (প্রশ্নের) সমাধানকারী।

তিনি ফযিলত এবং শ্রেষ্টতম চারিত্রিক গুনাবলিতে সু-সজ্জিত।

তিনি মানবজাতিকে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।

উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ,এমন ধরনের ব্যক্তি নির্বাচন করা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতার ঊর্ধে। একমাত্র আল্লাহই তার অসীম জ্ঞানের মাধ্যমে রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী নির্বাচন করে থাকেন। সুতরাং ইমামের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হল যে ,তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত ও নির্ধারিত হবেন।

যেহেতু উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ অধিক গুরুত্ববহ তাই প্রতিটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল:

1 )ইমামের জ্ঞান : ইমাম যেহেতু মানুষের নেতার আসনে সমাসীন সেহেতু অবশ্যই তাকে দ্বীন সম্পর্কে সার্বিকভাবে জানতে হবে ,দ্বীনের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকতে হবে। তাকে কোরআনের তফসীর এবং রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের উপর পূর্ণ দখল থাকতে হবে। দ্বীনি শিক্ষার বর্ণনা ও জনগণের বিভিন্ন বিষয়ে সকল প্রকার প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং তাদেরকে উত্তমভাবে পথপ্রদর্শন করতে হবে। এটা স্পষ্ট যে কেবল মাত্র এধরনের ব্যক্তিই সর্বসাধারণের বিশ্বস্ত এবং আশ্রয় স্থান হতে পারেন আর এ ধরনের পাণ্ডিত্ব একমাত্র ঐশী জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। ঠিক একারণেই শিয়া মাযহাবের অনুসারীগণ বিশ্বাস করেন যে ,ইমাম (আ.) তথা রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত প্রতিনিধিগণের জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত। হযরত আলী (আ.) প্রকৃত ইমামের চিহ্ন সম্পর্কে বলেছেন:

ইমাম হালাল হারাম ,বিভিন্ন ধরনের আহকাম ,আদেশ ,নিষেধ এবং জনগণের সকল প্রয়োজন সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবহিত। 2

2 ) ইমামের ইসমাত ( পবিত্রতা ) :ইমামের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং ইমামতের মৌলিক শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা আর তা সত্যের জ্ঞান ও বলিষ্ঠ ইচ্ছা (দৃঢ় মনবল) থেকে সৃষ্টি হয়। ইমাম এ দুই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার কারণে সকল প্রকার গোনাহ এবং ত্রুটি থেকে বিরত থাকেন। ইমাম ইসলামী শিক্ষার পরিচয় এবং বর্ণনা ও পালন করার ক্ষেত্রে ,এবং ইসলামী সমাজের উন্নতি ও ক্ষতি নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ত্রুটি মুক্ত ও নিস্পাপ। ইমামের পবিত্রতার জন্য (কোরআন এবং হাদীসের আলোকে) বুদ্ধিবৃত্তিক এবং উদ্ধৃতিগত দলিল রয়েছে। উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক দলিলসমূহ নিম্নরূপ:

ক) দ্বীন এবং দ্বীনি কর্মকাণ্ড (ইসলামী সাংস্কৃতি) রক্ষার্থে ইমামের নিস্পাপ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। কেননা দ্বীনকে বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করা এবং জনগণকে হেদায়াত করার দায়িত্বভার ইমামের উপর ন্যাস্ত। এমনকি ইমামের কথা ,আচরণ এবং অন্যদের কার্যকলাপকে অনুমোদন করা বা না করাও সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। সুতরাং ইমামকে দ্বীন সম্পর্কে জানতে হবে এবং আমলের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণরূপে ত্রুটি মুক্ত এবং নিস্পাপ হতে হবে আর তাহলেই তিনি তার অনুসারীদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করতে পারবেন।

খ) সমাজে ইমামের প্রয়োজনীয়তার অপর একটি যুক্তি হল যে ,জনগণ দ্বীন সম্পর্কে জানতে এবং তা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে ত্রুটি মুক্ত নয়। এখন যদি মানুষের নেতাও এমনটি হন তাহলে মানুষ কিভাবে তার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করবে ?অন্য কথায় ইমাম যদি মাসুম না হন তাহলে মানুষ তার অনুসরণ এবং নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়বে। 3

কোরআনের আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয় যে ,ইমামকে অবশ্যই মাসুম তথা নিস্পাপ হতে হবে। সূরা বাকারার 124 নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,আল্লাহ তা আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে নবুয়্যত দান করার পরও অনেক পরীক্ষা নিয়ে তবেই তাকে ইমামতের পদমর্যাদা দান করেন। তখন হযরত ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করলেন যে ,হে আল্লাহ এই মর্যাদাকে আমার বংশধরের জন্যেও নির্ধারণ করুন। আল্লাহ তা আলা বললেন: আমার এ প্রতিশ্রুতি (ইমামতের পদমর্যাদা) জালিমদের প্রতি প্রযোজ্য হবে না।

পবিত্র কোরআনে শিরককে সর্বাপেক্ষা বড় জুলুম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘন (গোনাহে লিপ্ত হওয়া) করাও নিজের প্রতি অত্যাচারের অন্তর্ভূক্ত। প্রতিটি মানুষই তাদের জীবনে কোন না কোন গোনাহে লিপ্ত হয়েছে ,সুতরাং সেও জালিমদের অন্তর্ভূক্ত এবং কখনোই সে ইমামতের পদমর্যাদা লাভের উপযুক্ত নয়।

অন্যকথায় নিঃসন্দেহে হযরত ইব্রাহীম (আ.) তার ওই ধরনের বংশধরের জন্য দোয়া করেন নি যারা সারা জীবন গোনাহে লিপ্ত ছিল এবং যারা প্রথমে ঈমানদার ছিল পরে গোনাহগার হয়েছিল। সুতরাং দুই শ্রেণীর লোকরা অবশিষ্ট থাকে যথা:

1. যারা প্রথমে গোনাহগার ছিল কিন্তু পরবর্তীতে তওবা করে সৎকর্মশীল হয়েছে।

2. যারা কখনোই গোনাহে লিপ্ত হয় নি।

আল্লাহ রাব্বুল আ লামিন কোরআনপাকে প্রথম শ্রেণীর লোকদেরকে বাদ দিয়েছেন এবং ইমামতের পদমর্যাদাকে শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেণীর মহামানবদের জন্য নির্ধারণ করেছেন।

ইমামের সামাজিক দ্বায়িত্ব ও কর্মতৎপরতা :

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ মানুষের চিন্তা-চেতনা এবং আচরণে বহুমুখী প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাই সঠিক প্রশিক্ষণ এবং সমাজকে আল্লাহর সান্ন্যিধ্যের পথে পরিচালনা করার জন্য উপযুক্ত সামাজিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা একান্ত প্রয়োজন। আর তা কেবল ঐশী (ইসলামী) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব। সুতরাং ইমাম তথা জনগণের নেতাকে অবশ্যই সমাজ পরিচালনা করার ক্ষমতা থাকতে হবে এবং কোরআনের শিক্ষা ও রাসূল (সা.)-এর সুন্নতের আলোকে এবং উপযুক্ত ও কার্যকরি উপকরণের সাহায্যে ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।

মহান চারিত্রিক গুণাবলিতে গুনান্বিত হওয়া :

ইমাম যেহেতু সমাজের নেতা সে জন্য তাকে অবশ্যই সকল প্রকার ত্রুটিমুক্ত এবং চারিত্রিক কলঙ্ক মুক্ত হতে হবে। পক্ষান্তরে তাকে সকল প্রকার চারিত্রিক গুণাবলীর সর্বোচ্চস্থানে অবস্থান করতে হবে। কেননা তিনি পরিপূর্ণ মানুষ (আদর্শ মহাপুরুষ) হিসাবে অনুসারীদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকেন।

ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন , ইমামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ;তিনি সর্বাধীক জ্ঞানী ,পরহেজগার ,মহানুভব ,সাহসী ,দানশীল এবং ইবাদতকারী। 4

তাছাড়া তিনি রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী এবং তার দায়িত্ব হল মানুষের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করা। সুতরাং তার নিজেকে অবশ্যই সবার আগে সু-চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

যে (আল্লাহর নির্দেশে) মানুষের ইমাম হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছে তার প্রথম দায়িত্ব হল সবার পূর্বে নিজেকে গঠন করা এবং অবশ্যই কথার পূর্বে কর্মের মাধ্যমে মানুষকে প্রশিক্ষণ দান করা। 5

ইমাম আল্লাহ কর্তৃক নির্বাচিত হন :

শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে ইমাম তথা রাসূল (সা.)-এর উত্তরাধিকারী কেবলমাত্র আল্লাহর নির্দেশ ও তার অনুমোদনেই নির্ধারিত হয়ে থাকে এবং অতঃপর রাসূল (সা.) তাকে পরিচয় করান। সুতরাং এক্ষেত্রে (ইমাম নির্বাচনে) কোন দল বা গোত্রের বিন্দুমাত্র ভুমিকা নেই।

ইমাম যে আল্লাহ কতৃক নির্বাচিত হবেন তার অনেক যুক্তি রয়েছে যেমন:

1. কোরআনের ভাষায় একমাত্র আল্লাহই সকল কিছুর উপর ক্ষমতা রাখেন এবং সকলকে অবশ্যই তার আনুগত্য করতে হবে। এটা স্পষ্ট যে ,আল্লাহ যাকে ইচ্ছা এই ক্ষমতা (যোগ্যতা এবং প্রয়োজনানুসারে) দান করতে পারেন। সুতরাং যেমনভাবে রাসূলগণ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে থাকেন ,ইমামও আল্লাহর নির্দেশে জনগণের উপর নেতৃত্ব পেয়ে থাকেন।

2. ইতিপূর্বে আমরা ইমামের জন্য ইসমাত (পবিত্রতা) এবং ইলম (জ্ঞান) বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিয়েছি। এটা স্পষ্ট যে ,এই সকল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিকে পাওয়া এবং চেনা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব। কেননা তিনি সকল কিছুর উপর সম্যক জ্ঞাত। কোরআনপাকে আল্লাহ তা আলা হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে বলেন:

আমি তোমাকে মানবজাতির জন্য ইমাম (নেতা) নির্বাচন করলাম। 6

একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর বাণী

এ আলোচনার শেষে ইমামের মর্যাদা এবং বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হযরত ইমাম রেযা (আ.)-এর বাণীর অংশ বিশেষ বর্ণনা করা উপযুক্ত মনে করছি যা নিম্নে তুলে ধরা হল :

যারা ইমামত সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করে এবং মনে করে যে ইমামত হচ্ছে নির্বাচনের বিষয় ,তারা অজ্ঞ। জনগণের পক্ষে সম্ভবই নয় যে তারা ইমামের মর্যাদাকে উপলব্ধি করবে। অতএব কিরূপে সম্ভব যে তাদের ভোটে ইমাম নির্বাচিত হবেন ?

নিঃসন্দেহে ইমামতের মর্যাদা ,আসন এবং গভীরতা মানুষের বুদ্ধি ও নির্বাচন ক্ষমতার অনেক উর্দ্ধে।

নিঃসন্দেহে ইমামত ,এমন একটি পদমর্যাদা যাকে আল্লাহ তা আলা নবুয়্যাত ও খুলক্বাত অর্থাৎ খলিলুল্লাহর পর তৃতীয় মর্যাদা হিসাবে হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে দান করেছেন। ইমামত হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর খলিফা এবং আলী (আ.)-এর পদমর্যাদা ও হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-এর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ। সত্যি বলতে ইমামত হচ্ছে দ্বীনের কাণ্ডারি ,ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান ,দুনিয়ার মঙ্গল এবং মু মিনদের সম্মানের স্থান। অনুরূপভাবে ইমাম থাকার কারণেই ইসলামী রূপরেখা রক্ষিত এবং তাকে মেনে নেয়াতেই নামায ,রোযা ,হজ্জ ,যাকাত ,জিহাদ কবুল হয়ে থাকে।

ইমাম আল্লাহ বর্ণিত হারাম ও হালালকে ব্যাখ্যা করেন। আল্লাহর আদেশ নিষেধকে মেনে চলেন এবং আল্লাহর দ্বীনকে সমর্থন করেন । তিনি পরিপূর্ণ জ্ঞানের মাধ্যমে এবং সুন্দর যুক্তির মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত করেন।

ইমাম উদিত সূর্যের ন্যায় যার জ্যোতি সারা বিশ্বকে আলোকিত করে কিন্তু সে নিজে সবার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ইমাম উজ্জল চন্দ্র ,জলন্ত প্রদ্বীপ ,দ্বীপ্তিময় জ্যোতি ,বিষম অন্ধকারে পথপ্রদর্শনকারী নক্ষত্র। মোটকথা তিনি সকল প্রতিকুলতা থেকে মুক্তিদানকারী স্বর্গিয় দূত।

ইমাম উত্তম সাথী ,দয়ালু পিতা ,সহোদর ভ্রাতা এবং ছোট্ট শিশুর জন্য মমতাময়ী মাতা। তিনি মহা বিপদের দিনে অসহায়দের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র। ইমাম এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি সকল প্রকার গোনাহ এবং ত্রুটি হতে মুক্ত। তিনি বিশেষ জ্ঞান ,আত্মশুদ্ধি এবং ধৈর্যের প্রতীক। ইমাম যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং কেউই তার নিকটবর্তী হওয়ার যোগ্যতা রাখে না এবং কোন পণ্ডিতই তার সমকক্ষ হতে পারে না। কেউ তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে না এবং কেউ তার অনুরূপ নয়।

সুতরাং কার পক্ষে ইমামকে চেনা সম্ভব অথবা কে পারে ইমাম নির্বাচন করতে ?আফসোস ,হায় আফসোস! এখানেই মানুষ বুদ্ধি হারিয়ে হতবাক হয়ে যায়। এখানেই চোখের জ্যোতি হারিয়ে যায় ,বড় ছোট্ট হয়ে যায় ,বিচক্ষণরা হকচকিয়ে যায় ,বক্তারা নির্বাক হয়ে যায় ,কেননা তারা কেউই ইমামের একটি ফযিলত এবং বৈশিষ্ট্যকে বর্ণনা করতে অক্ষম এবং তারা সকলেই তাদের দূর্বলতাকে একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন। 7


দ্বিতীয় অধ্যায় :ইমাম মাহদী পরিচিতি


প্রথম ভাগ :এক দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী (আ .)

শিয়া মাযহাবের শেষ ইমাম এবং রাসূল (সা.)-এর বারতম উত্তরাধিকারী 225 হিজরীর 15ই শাবান শুক্রবার প্রভাতে (868 খ্রীষ্টাব্দে) ইরাকের সামেররা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।

শিয়া মাযহাবের একাদশ ইমাম হযরত হাসান আসকারী (আ.) তার মহান পিতা। মাতা হযরত নারজিস খাতুন। নারজিস খাতুনের পিতা হলেন রোমের যুবরাজ ,আর মাতা আশ্ শামউন সাফার বংশধর হযরত ঈসা (আ.)- এর ওয়াসি এবং নবীগণের বন্ধু হিসাবে পরিচিত। নারজিস খাতুন স্বপ্নের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর নির্দেশ অনুযায়ী যুদ্ধের ময়দানে যান এবং সেখানে অন্যান্য মুসলমানদের সাথে বন্দি হন। ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) একজনকে প্রেরণ করেন এবং সে নারজিস খাতুনকে কিনে সামেররায় ইমামের বাড়িতে নিয়ে আসে। 8

এসম্পর্কে আরও কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে 9 তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হযরত নারজিস কিছুদিন যাবৎ ইমাম হাদী (আ.)-এর বোন হযরত হাকিমা খাতুনের বাড়িতে ছিলেন এবং তিনি তাকে অনেক কিছু শিক্ষা-দীক্ষা দিয়েছিলেন। হযরত হাকিমা খাতুন নারজিস খাতুনকে অধিক সম্মান করতেন। নারজিস খাতুন হলেন সেই রমনী যার প্রশংসা করে পূর্বেই রাসূল (সা.) ,10 আলী (আ.) 11 ও ইমাম জাফর সাদিক (আ.) 12 হতে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তাকে সর্বোত্তম দাসী এবং তাদের নেত্রী হিসাবেও উল্লেখ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর মাতা আরও কয়েকটি নামে যেমন: সুসান ,রেহানা ,মালিকা এবং সাইকাল (সাকিল) নামে পরিচিত।

নাম ,কুনিয়া ও উপাধি

ইমাম মাহদী (আ.)-এর নাম ও কুনিয়া 13 রাসূল (সা.)-এর নাম ও কুনিয়ার অনুরূপ। কিছু সংখ্যক হাদীসে তার আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত তাকে নাম ধরে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে।

ইমাম যামানার প্রসিদ্ধ উপাধিসমূহ হচ্ছে: মাহ্দী ,কায়েম ,মুনতাযার ,বাকিয়াতুল্লাহ ,হুজ্জাত ,খালাফে সালেহ ,মানসুর ,সাহেবুল আমর ,সাহেবুয্ যামান এবং ওলী আসর আর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ হল মাহ্দী। প্রতিটি উপাধিই মহান ইমাম সম্পর্কে এক বিশেষ বাণীর বার্তাবাহক।

ঐ মহান ইমামকে মাহ্দী বলা হয়েছে। কারণ তিনি নিজে হেদায়াত প্রাপ্ত এবং অন্যদেরকে সঠিক পথে হেদায়াত করবেন। তাকে কায়েম বলা হয়েছে। কেননা তিনি সত্যের জন্য সংগ্রাম করবেন। তাকে মুনতাযার বলা হয়েছে। কেননা সকলেই তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। তাকে বাকিয়াতুল্লাহ বলা হয়েছে। কেননা তিনি হচ্ছেন আল্লাহর হুজ্জাত এবং গচ্ছিত শেষ সম্পদ।

হুজ্জাত অর্থাৎ সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর স্পষ্ট দলিল এবং খালাফে সালেহ -এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহর ওয়ালিগণের উত্তরাধিকারী। তিনি মানসুর কেননা আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন। তিনি সাহেবুল আমর কেননা ঐশী ন্যায়পরায়ণ সরকার গঠনের দায়িত্ব তার উপর ন্যান্ত হয়েছে। তিনি সাহেবুয্ যামান এবং ওয়ালি আসর কেননা তিনি হচ্ছেন তার সময়ের একছত্র অধিপতি।

জন্মের ঘটনা

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) হতে বহুসংখ্যক হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে তার বংশ হতে মাহ্দী নামক একজন ব্যক্তি অভ্যূত্থান করবেন এবং তিনি অত্যাচারের ভিতকে সমূলে উৎপাটন করবেন। অত্যাচারী আব্বাসীয় শাসকরা এঘটনা জানতে পেরে ইমাম মাহদী (আ.)-কে তার জন্মলগ্নেই হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সুতরাং ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর সময় থেকে মাসুম ইমামগণের জীবন-যাপন কড়া সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলে আসে এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সময়ে এ পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌছায়। এমনকি ইমাম (আ.)-এর গৃহের অতি সামান্য আসা যাওয়ার বিষয়ও শাসকবর্গের নখদর্পনে থাকত। অতএব এমতাবস্থায় শেষ ইমাম তথা ঐশী নবজাতকের জন্ম গোপনে বা লোকচক্ষুর আড়ালে হওয়াটাই বাঞ্চনীয়। ঠিক একারণেই ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর অতি নিকট আত্মীয়রাও ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্মের ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না। এমনকি জন্মের কয়েক ঘন্টা পূর্বেও হযরত নারজিস খাতুনের গর্ভবতী অবস্থা পরিদৃষ্ট ছিল না।

হযরত ইমাম মুহাম্মদ তকী আল জাওয়াদ (আ.)-এর কন্যা হাকিমাহ বলেন যে ,ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাকে বললেন:

ফুপি আম্মা আজকে 15ই শাবান ,আমাদের সাথে ইফতার করুন। কেননা ,আজ রাতে (রাতের শেষ ভাগে) আল্লাহ তার বরকতময় হুজ্জাতকে দুনিয়াতে প্রেরণ করবেন।

আমি বললাম: এই বরকতময় নবজাতকের জননী কে ?

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: নারজিস ।

আমি বললাম: কিন্তু আমি তো তার কোন আলামত দেখছি না!

ইমাম (আ.) বললেন: কল্যাণ এর মধ্যেই নিহিত ,আমি যা বলেছি তা ঘটবেই ইনশা আল্লাহ ।

আমি নারজিস খাতুনের ঘরে প্রবেশ করে সালাম করে বসলাম ,সে আমার পায়ের থেকে জুতা খুলে বলল: শুভ রাত্র হে আমার ,নেত্রী। আমি বললাম: তুমি আমার এবং আমাদের পরিবারের মহারাণী।

নারজিস খাতুন বললেন: না! আমি কোথায় আর এ মর্যাদা কোথায়।

আমি বললাম: হে আমার কন্যা! আল্লাহপাক তোমাকে আজ রাত্রে এমন একটি সন্তান দান করবেন যে দুনিয়া ও আখেরাতের নেতা।

একথা শোনার পর সে বিনয় ও লাজুকতার সাথে বসে পড়ল। আমি নামায-কালাম পড়ে ইফতার করে শুয়ে পড়লাম।

মধ্যরাত্রে উঠে তাহাজ্জুতের নামায পড়লাম। নারজিস ঘুমাচ্ছিল কিন্তু বাচ্চা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না। নামায শেষে পুনরায় শুয়ে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর ঘুম ভেঙ্গে গেল দেখলাম নারজিস নামায পড়ছে কিন্তু বাচ্চা হওয়ার কোন আলামত দেখতে পেলাম না। তখন আমার সন্দেহ হল ইমাম হয়ত ঠিক বুঝতে পারে নি।

এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী তার শোয়ার ঘর থেকে উচ্চস্বরে বললেন ,(আ.)

لا تجعلی یا عمه فإنّ الامر قد قرب

ফুপি আম্মা ব্যস্ত হবেন না বাচ্চা হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে।

একথা শোনার পর আমি সুরা সাজদা এবং সুরা ইয়াছিন পড়তে লাগলাম। এর মধ্যে হটাৎ নারজিস লাফিয়ে উঠলে আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম তোমার ব্যথা অনুভব হচ্ছে ?বলল , হ্যাঁ ফুপি।

আমি বললাম: চিন্তার কোন কারণ নেই ধৈর্য ধর ,তোমাকে যে সুসংবাদ দিয়েছিলাম এটা তারই পূর্বাভাস।

অতঃপর আমি ও নারজিস সামান্য ঘুমালাম ,জেগে দেখি সেই চোখের মণি জন্মগ্রহণ করেছে এবং সেজদা করছে। তাকে কোলে নিয়ে দেখলাম সম্পুর্ণ পাক ও পবিত্র কোন ময়লা তার গায়ে নেই। এমন সময় ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন , ফুপি আম্মা আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন।

আমি নবজাতককে তার কাছে নিয়ে গেলাম তিনি শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিলেন এবং নিজের জিহ্বাকে তার মুখে দিলেন এবং চোখে ও কানে হাত বুলালেন এবং বললেন:

تکلم یا ابی

আমার সাথে কথা বল হে আমার পুত্র।

পবিত্র শিশুটি বলল:

اشهد ان لا اله الا الله وحده لا شریک له و اشهد انّ محمد رسول الله

অতঃপর ইমাম আলী (আ.) সহ সকল ইমাম (আ.) গণের উপর দরুদ পাঠ করলেন।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: ফুপি! তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যান সে মাকে সালাম করবে ,তারপর আমার কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন।

তাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে গেলাম ,সে মাকে সালাম করল নারজিস সালামের উত্তর দিল এবং আবার তাকে তার পিতার কাছে নিয়ে গেলাম।

হাকিমা খাতুন বলেন , পরের দিন আমি ইমাম হাসান আসকারী (আ.)- এর কাছে গিয়ে সালাম করলাম এবং ঘরে ঢুকে নবজাতককে দেখতে পেলাম না। ইমামের কাছে জানতে চাইলাম , ইমাম মাহ্দী কোথায় ,তাকে দেখছিনা কেন ,তার কি হয়েছে ?ইমাম বললেন: ফুপি ,তাকে তার কাছে শপে দিয়েছি যার কাছে হযরত মুসার মাতা মুসা (আ.)-কে শপে দিয়েছিলেন।

হাকিমা খাতুন বলেন , সপ্তম দিনে আবার ইমামের বাসায় গেলাম এবং ইমাম আমাকে বললেন: ফুপি ,আমার সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসুন! আমি তাকে ইমামের কাছে নিয়ে আসলাম। ইমাম বললেন: হে আমার সন্তান! কথা বল! শিশুটি মুখ খুললেন এবং কালিমা শাহাদত পাঠ করলেন। অতঃপর মহানবী ও তার পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠ করলেন। অতঃপর এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

) وَنُرِ‌يدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْ‌ضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِ‌ثِينَ وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْ‌ضِ وَنُرِ‌يَ فِرْ‌عَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُم مَّا كَانُوا يَحْذَرُ‌ونَ (

আমি ইচ্ছা করলাম পৃথিবীতে যাদেরকে হীনবল করা হয়েছিল ,তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে ,তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে ,তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে। এবং তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করতে ,আর ফিরাউন হামান ও তাদের বাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে যা তাদের নিকট তারা আশঙ্কা করত। 14 (সূরা আল কাসাস আয়াত নং 5 ,6 )

আকৃতি এবং বৈশিষ্ট্য

রাসূল (সা.) ও তার পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর বাণীতে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরছি:

তার চেহারা যুবক এবং গৌরবর্ণেও ,কপাল প্রশস্ত ও উজ্বল ,ভ্রু চাঁদের মত ,চোখের রং কালো ও টানা টানা ,টানা নাক ও সুন্দর ,দাঁতগুলো চকচকে। ইমামের ডান চোয়ালে একটি কালো তিল আছে এবং কাধের মাঝে নবীগণের মত চিহ্ন আছে। তার গঠন সুঠাম ও আকর্ষণীয়।

পবিত্র ইমামদের পক্ষ থেকে তার সম্পর্কে যে সকল বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে তার কিছু এখানে তুলে ধরা হল:

ইমাম মাহদী (আ.) তাহাজ্জুদের নামাজ পড়েন ,সংযমি এবং সাধারণ ,ধৈর্যশীল এবং দয়ালু ,সৎকর্মশীল ও ন্যায়পরায়ণ । তিনি সকল জ্ঞান- বিজ্ঞানের ধনভান্ডার। তার সম্পূর্ণ অস্তিত্ব জুড়ে পবিত্রতা এবং বরকতের ঝর্ণাধারা। তিনি জিহাদী ও সংগ্রামী ,বিশ্বজনীন নেতা ,মহান বিপ্লবী এবং তিনি প্রতিশ্রুত শেষ সংষ্কারক ও মুক্তিদাতা। সেই জ্যোর্তিময় অস্তিত্ব রাসূলের বংশধর ,হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরার সন্তান এবং সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর নবম বংশধর। তিনি মক্কা শরিফে আবির্ভূত হবেন এবং তার হাতে থাকবে রাসূল (সা.)-এর ঝাণ্ডা। তিনি সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা করবেন ও আল্লাহর শরিয়তকে সারাবীশ্বে প্রচলিত করবেন। এ পৃথিবী অন্যায় অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়ার পর তিনি তা ন্যায়-নীতিতে পরিপূর্ণ করবেন। 15


ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনি তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত:

1 গুপ্ত অবস্থা : জন্মের পর থেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) এর শাহাদত পর্যন্ত তিনি গুপ্ত অবস্থায় জীবন-যাপন করেন।

2 অদৃশ্যকাল : ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের পর থেকে শুরু হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশে আবির্ভাব হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা চলতে থাকবে।

3 আসরে যহুর (আবির্ভাবের সময়): অদৃশ্যকাল শেষ হওয়ার পর মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীকে সুখ-শান্তি ও সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ করবেন। কেউই তার আবির্ভাবের সময়কে জানেন না । ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বলেছেন , যারা তার আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করবে তারা মিথ্যাবাদী। 16


দ্বিতীয় ভাগ : ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্ম থেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদাত পর্যন্ত

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনের এ সময়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল নিম্নে তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হল:

1- শিয়া মাযহাবের মাঝে ইমাম মাহদী (আ.)-এর পরিচয়

ইমামের জন্ম গোপনে হওয়ার কারণে এধারণার অবকাশ ছিল যে শিয়ারা শেষ ইমামকে চিনতে ভুল করবে এবং পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর দায়িত্ব ছিল যে নিজের সন্তানকে বিশিষ্ট শিয়া ও নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গের মাঝে পরিচয় করাবেন। তারা আবার এ সংবাদ আহলে বাইতের অপর অনুসারীদের কাছে পৌঁছে দিবেন আর এভাবেই ইমামের পরিচয় ঘটবে এবং ইমাম (আ.) সকল বিপদ থেকে মুক্ত থাকবেন।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর বিশেষ অনুসারী এবং বিশিষ্ট শিয়া জনাব আহমাদ বিন ইসহাক বলেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়ে মনে মনে তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী সম্পর্কে জানার ইচ্ছা পোষণ করলাম ,কিন্তু কিছু জানতে চাওয়ার পূর্বেই তিনি বললেন: হে আহমাদ! আল্লাহপাক হযরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পর থেকে কখনোই পৃথিবীকে হুজ্জাত বিহীন রাখেন নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত কখনোই খালি রাখবেন না। আর আল্লাহর হুজ্জাতের মাধ্যমেই পৃথিবীর মানুষের উপর থেকে বালা-মুছিবত দূর হয়। তার অস্তিত্বের বরকতেই বৃষ্টি বর্ষণ হয় এবং ফসল ফলে।

আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান! আপনার পরবর্তী ইমাম এবং উত্তরাধিকারী কে ?ইমাম সাথে সাথে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন এবং তিন বছরের একটি অতি সুন্দর ও চাঁদের ন্যায় পবিত্র শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে বললেন: হে আহমাদ বিন ইসহাক! যদি আল্লাহ ও তার হুজ্জাতের নিকট প্রিয়ভাজন না হতে তাহলে আমার এ পূত্র তোমাকে দেখাতাম না। তার নাম ও কুনিয়া রাসূল (সা.)-এর নাম ও কুনিয়ার অনুরূপ। পৃথিবী যেভাবে অন্যায়-অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়েছিল সে তেমনিভাবে পৃথিবীকে ন্যায়-নীতিতে পরিপূর্ণ করবে।

আমি বললাম: এমন কোন চিহ্ন কি আছে যা দেখে আমি নিশ্চিত হতে পারি ?এমন সময় পবিত্র শিশুটি বললেন:

انا بقیة الله فی ارضه و المنتقم من اعدائه

আমিই হলাম পৃথিবীতে আল্লাহর শেষ গচ্ছিত সম্পদ এবং আমি আল্লাহর দুশমনদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করব। হে আহমাদ বিন ইসহাক নিজ চোখে দেখার পর আর কোন চিহ্নের অপেক্ষায় থেক না।

আহমাদ বিন ইসহাক বলেন: এ কথা শোনার পর অতি আনন্দের সাথে ইমাম (আ.)-এর বাড়ী থেকে চলে আসলাম। 17

অনুরূপভাবে মুহাম্মদ বিন উসমান ও আরও কয়েক জন বিশিষ্ট শিয়া ব্যক্তিত্ব বর্ণনা করেছেন:

আমরা শিয়া মাযহাবের চল্লিশজন ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে একত্রিত হই। তিনি আমাদেরকে তার পবিত্র সন্তানকে দেখিয়ে বললেন , আমার পর এই তোমাদের ইমাম ও আমার উত্তরাধিকারী। তার নির্দেশ মেনে চলবে এবং দ্বীন থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড় না তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। আজকের পর থেকে তাকে আর দেখতে পাবে না। 18

একটি সুন্নত হচ্ছে শিশুদের জন্য আকিকা করা এবং ওলিমা দেয়া। দুম্বা অথবা গরু জবাই করে মানুষকে খাওয়ানো। এর মাধ্যমে শিশুর বালা- মুছিবত দূর হয় এবং আয়ূ দীর্ঘ হয়। ইমাম হাসান আসকারী (আ.) কয়েকবার তার পবিত্র সন্তানের জন্য আকিকা করেছিলেন। এভাবে তিনি রাসূল (সা.)-এর সুন্নতকে পালন করেন এবং শিয়া মাযহাবকে দ্বাদশ ইমাম সম্পর্কে জ্ঞাত করেন।

2 .মো জেযা এবং কেরামত

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনীর অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তার জন্মের পর থেকে অদৃশ্যের পূর্ব পর্যন্ত। এসময়ে তার মাধ্যমে অনেক মো জেযা ও কেরামত সম্পাদিত হয়েছে। তবে ইমাম (আ.)-এর জীবনের এ দিকটির প্রতি বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয় নি।

আমরা এখানে একটি উদাহরণ বর্ণনার মাধ্যমে তা তুলে ধরতে চেষ্টা করব: আহমাদ ইবনে ইব্রাহীম নিশাপুরী বলেন:

যখন আমর বিন আ উফ (অত্যাচারি শাসক যে শিয়া মাযহাব অনুসারীদের হত্যা করতে খুব পছন্দ করত) আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল। আমার সমস্ত অস্তিত্ব আতঙ্কে শিউরে উঠল। অতঃপর সবার সাথে বিদায় নিয়ে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর বাড়িতে বিদায় নিতে গেলাম এবং ভেবে রেখেছিলাম যে তার পর পালাব। ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে গিযে তার পাশে একটি বাচ্চা ছেলে বসা দেখলাম যার চেহারা পূর্ণিমার চাঁদের মত জ্বল জ্বল করছিল। তার ঐ নুরানী চেহারা দেখে আমি এত বেশী হতবাক হলাম যে ,আমার সব কিছু প্রায় এলোমেলো হয়ে গেল।

এমন সময় তিনি আমাকে বললেন: হে ইব্রাহীম ,পালাবার কোন প্রয়োজন নেই । খুব শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে তার অনিষ্ট হতে পরিত্রাণ দিবেন।

আমি আরও বেশী হতবাক হয়ে ইমাম আসকারী (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম , আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গ হোক এই ছেলে কে যিনি আমার মনের খবর বলছেন ? ইমাম (আ.) বললেন: সে আমার সন্তান এবং আমার উত্তরাধিকারী।

ইব্রাহীম বলেন , আল্লাহর করুনার প্রতি আশা ও দ্বাদশ ইমাম (আ.)-এর কথার প্রতি বিশ্বাস আমার ছিল। কিছু দিন পর আমার চাচা সংবাদ দিলেন যে আমর বিন আ উফকে হত্যা করা হয়েছে।

3- বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দান

ইমামত নামক আকাশের শেষ উজ্বল নক্ষত্র শিশু বয়সেই শিয়া মাযহাব অনুসারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতেন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করতেন। উদাহরণস্বরূপ সংক্ষেপে একটি রেওয়ায়েত বর্ণনা করছি:

শিয়া মাযহাবের বিশিষ্ট আলেম সা দ ইবনে আব্দুল্লাহ কুম্মী ,ইমামের উকিল আহমাদ ইবনে ইসহাক কুম্মীকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর জানতে ইমাম আসকারী (আ.)-এর কাছে গিয়েছিলেন। তিনি ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে প্রশ্নের উত্তর জানতে গেলে তিনি তার সন্তানের দিকে ইশারা করে বললেন: আমার চোখের জ্যোতির কাছে প্রশ্ন কর। তখন ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন: যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। বললাম , کهیعص এর উদ্দেশ্য কি ?তিনি বললেন: এই অক্ষরগুলো গায়েবি সংবাদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা আলা তার বান্দা (নবী) যাকারিয়াকে সে সম্পর্কে অবহিত করেছেন অতঃপর মুহাম্মদ (সা.)-কেও সে সংবাদ দিয়েছেন। ঘটনা হল যে হযরত যাকারিয়া (আ.) আল্লাহর কাছে পাক পঞ্জাতনের নাম জানতে চাইলেন। আল্লাহ তা আলা হযরত জীব্রাইল (আ.)- কে সে নামগুলো শিক্ষা দিলেন। হযরত যাকারিয়া যখন মুহাম্মদ (সা.) ,আলী (আ.) ,ফাতিমা (আ.) ও হাসান (আ.)-এর নাম উচ্চারণ করলেন তার সকল কষ্ট ও সমস্যার অবসান হয়ে গেল। কিন্তু যখন ইমাম হুসাইন (আ.)- এর নাম উচ্চারণ করলেন তখন কষ্টে তার গলা আটকে আসতে লাগল। তিনি আল্লাহর কাছে বললেন: হে আল্লাহ আমি যখন প্রথম চার জনের নাম উচ্চারণ করি তখন আমার সকল কষ্ট দূর হয়ে যায় এবং মন আনন্দে ভরে যায়। কিন্তু যখন হুসাইন (আ.)-এর নাম উচ্চারণ করি তখন আমার দু চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। আল্লাহ তাকে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ঘটনা সম্পর্কে অবগত করলেন এবং বললেন: کهیعص হচ্ছে এই ঘটনার সংকেত। کاف হচ্ছে কারবালার সংকেত। هاء হচ্ছে হালাকাত বা ধ্বংসের সংকেত। یاء হচ্ছে পাপিষ্ট ইয়াযিদের নামের সংকেত। عین হচ্ছে আতাশ তথা পিপাসার সংকেত। صاد হচ্ছে ইমাম হুসাইন (আ.) এর সবর ও ধৈর্যের সংকেত।

বললাম: কেন মানুষ নিজেরাই তাদের ইমামকে নির্বাচন করতে পারবে না ?

ইমাম বললেন: তুমি মুসলেহ (মুক্তিদাতা) ইমামের কথা বলছ নাকি মোফসেদ (পথভ্রষ্ট) ইমামের কথা বলছ ?বললাম: মুসলেহ ইমামের কথা বলছি যিনি সমাজকে সংষ্কার করবেন। ইমাম বললেন: যেহেতু কেউই কারো মনের খবর রাখে না যে ,সে গঠনমূলক চিন্তা করে নাকি ধ্বংসাত্মক ,সুতরাং মানুষের পক্ষ থেকে নির্বাচিত ব্যক্তি মোফসেদও তো হতে পারে ?বললাম: হ্যাঁ ,হতে পারে। বললেন: কারণ ,এটাই। 19

ইমাম এই হাদীসে আরও অনেক শর্ত বা কারণ বর্ণনা করেছেন তবে সংক্ষিপ্ততার জন্য তা বর্ণনা করা থেকে বিরত হলাম।

4- উপহার গ্রহণ করা

শিয়া মাযহাবের আরও একটি রিতি হচ্ছে যে ,তারা ইমামের জন্য বিভিন্ন উপঢৌকন এবং খুমস প্রেরণ করে থাকে। ইমাম (আ.) সেগুলোকে গ্রহণ করে সমাজের নিম্নবিত্তদের প্রয়োজন মেটাতেন।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর উকিল ইবনে ইসহাক বলেন: শিয়া মাযহাবের উপঢৌকন ইমাম আসকারী (আ.)-এর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে গেলাম। সেখানে তার চাঁদের ন্যায় পুত্র তার পাশে বসে ছিলেন। ইমাম আসকারী (আ.) তার সন্তানকে বললেন: হে আমার পুত্র তোমার বন্ধু ও অনুসারীদের আনিত উপঢৌকনগুলো খোল। শিশু পুত্র বললেন: হে আমার মাওলা এই পবিত্র হাত দিয়ে হালাল ও হারাম মিশ্রিত নাপাক বস্তু ছোয়া কি ঠিক হবে ?

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: হে ইসহাক! থলের মধ্যে যা আছে তা বের কর। আমার পুত্র তার মধ্য থেকে হারাম এবং হালালগুলোকে পৃথক করবে। আমি একটি থলে বের করলাম। শিশু পুত্র বললেন: এই থলেটা কোম শহরের অমুক লোকের এবং তার মধ্যে 62 আশরাফী আছে। তার মধ্যে 45 আশরাফী তার পিতার দেয়া জমি বিক্রয়ের ,14 আশরাফী তার নয়টি জামা বিক্রয়ের এবং বাকি তিনটি আশরাফী তার দোকান ভাড়ার।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: হে আমার পুত্র! ঠিক বলেছ। এখন এই ব্যক্তিকে বলে দাও যে ,এর মধ্যে কোনটি হারাম ?শিশু ইমাম মনযোগ সহকারে হারাম জিনিসগুলোকে পৃথক করলেন এবং তার কারণও উল্লেখ করলেন।

অতঃপর আর একটি থলে বের করলাম। ওই থলেটি যে ব্যক্তির তিনি তার নাম ও ঠিকানা বলার পর বললেন: তার মধ্যে 50 আশরাফী আছে যা আমাদের ছোঁয়া ঠিক নয়। তারপর ওই অর্থ অপবিত্র হওয়ার কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিলেন।

অতঃপর ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বললেন: হে আমার পুত্র তুমি সঠিক বলেছ। তারপর আহমাদ বিন ইসহাককে বললেন: সবগুলোকে তাদের প্রত্যেককে ফিরিয়ে দাও কেননা আমাদের তার কোন প্রয়োজন নেই। 20

5- পিতার জানাযার নামায পড়ানো

ইমাম মাহদী (আ.)-এর গুপ্ত অবস্থার সময়ে এবং স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্য শুরু হওয়ার পূর্বে সর্বশেষ যে কার্য সম্পাদন করেছিলেন তা হল পিতার জানাযার নামায। একাদশ ইমামের খাদেম আবুল আদইয়ান এ সম্পর্কে বলেন:

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) জীবনের শেষ সময়ের দিকে আমাকে কিছু চিঠি দিয়ে বললেন: এগুলোকে মাদায়েনে নিয়ে যাও। পনের দিন পর ফিরে এসে আমার বাড়িতে রোনা-জারি শুনতে পাবে এবং আমার মৃতদেহ গোসলের স্থানে দেখবে। আমি বললাম: হে আমার মাওলা এমনটি হলে আপনার উত্তরাধিকারী তথা পরবর্তী ইমাম কে হবেন ?ইমাম বললেন: যে তোমার কাছে আমার চিঠির উত্তর সম্পর্কে জানতে চাইবে তিনিই পরবর্তী ইমাম হবেন। বললাম: আরও কিছু বৈশিষ্ট্য বলুন। ইমাম বললেন: যে আমার জানাযার নামাজ পড়াবেন তিনিই পরবর্তী ইমাম হবেন। বললাম: অরও কিছু বৈশিষ্ট্য বলুন। ইমাম বললেন: যে এই থলেতে যা আছে সে সম্পর্কে খবর দিবে সেই পরবর্তী ইমাম হবেন। কিন্তু ইমাম (আ.)-এর গাম্ভির্য দেখে প্রশ্ন করতে সাহস পেলাম না।

চিঠিসমূহকে মাদায়েনে নিয়ে গেলাম উত্তর নিয়ে ইমামের কথামত পনের দিনের মাথায় সামেররাতে ফিরে ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর মৃতদেহকে গোসলের স্থানে দেখতে পেলাম। তখন ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর ভাই জা ফরকে দেখলাম যে ইমাম (আ.)-এর বাড়িতে দাড়িয়ে আছে এবং কেউ কেউ তাকে শোক বার্তা জানাচ্ছে এবং ইমাম হিসাবে তাকে মোবারকবাদ জানাচ্ছে। আমি মনে মনে বললাম: এই লোক যদি ইমাম হয় তাহলে ইমামত ধ্বংস হয়ে যাবে। কেননা তাকে আমি চিনতাম সে মদ্য পান করত এবং গানবাজনা করত। যেহেতু ইমাম (আ.)-এর বলে যাওয়া আলামতের খোজে ছিলাম তাই আমিও তার কাছে গেলাম এবং অন্যদের মত তাকে শোকবার্তা জানালাম ও মোবারকবাদ জানালাম। কিন্তু সে আমাকে চিঠির জবাব সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞাসা করল না। তখন আকিদ [ইমাম হাসান আসকারী (আ.)]-এর আর এক খাদেম জা ফরকে বলল: হে আমার নেতা আপনার ভ্রাতাকে কাফন করা হয়েছে এসে জানাযার নামায পড়ান। আমিও জা ফর এবং শিয়া মাযহাবের অন্যান্যদের সাথে ভিতরে গিয়ে দেখলাম যে ,ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-কে কাফন পরিয়ে তাবুতে রাখা হয়েছে। জা ফর নামায পড়ানোর জন্য সামনে গিয়ে তকবির দিতে গেল তখন গৌরবর্ণের একটি শিশু বেরিয়ে এসে জা ফরের জামা টেনে ধরে বললেন: হে চাচা সরে দাড়ান আমার পিতার জানাযার নামায পড়ানোর দায়িত্ব আমার উপর ন্যাস্ত হয়েছে। জা ফরের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল এবং সে পিছনে সরে আসল। ছোট্ট শিশু সামনে গিয়ে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)- এর জানাযার নামায পড়ালেন। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: চিঠির উত্তরগুলো আমাকে দাও। আমি চিঠিগুলো তাকে দিলাম। আমি মনে মনে বললাম এ দু টি নিদর্শনই তো এই ছোট্ট বালকের ইমাম হওয়ার নিদর্শন। থলের ঘটনাটি বাকি রইল। জা ফরের কাছে গিয়ে দেখি সে আর্তনাদ করছে। একজন শিয়া মাযহাবের অনুসারী তাকে প্রশ্ন করল এই বালকটি কে ?

জা ফর বলল: আল্লাহর শপথ আমি এ ছেলেটিকে কখনোই দেখিনি এবং তাকে চিনিও না।

আবুল আদইয়ান আরও বলল: আমরা বসে ছিলাম এমতাবস্থায় কোম থেকে কিছু লোক এসে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সম্পর্কে জানতে চাইল। তারা ইমাম (আ.) শহীদ হওয়ার খবর জানতে পেরে বলল: কাকে শোকবার্তা জানাব ?জনগণ জা ফরের দিকে ইশারা করল। তারা জা ফরকে সালাম দিয়ে তাকে শোকবার্তা ও মোবারকবাদ জানাল। অতঃপর তারা জা ফরকে বলল: আমাদের কাছে কিছু চিঠি ও উপঢৌকন আছে। বলুন চিঠিগুলো কার ?এবং কি পরিমাণ উপঢৌকন আছে ?

জা ফর রেগে গিয়ে দাড়িয়ে বলল: আমার কাছে গায়েবী সংবাদ জানতে চাও ?তখন ভিতর থেকে একজন খাদেম বেরিযে এসে বলল: ওমুক ,ওমুকের চিঠি তোমাদের কাছে আছে এবং তাদের নাম ঠিকানা বলল। থলের মধ্যে এক হাজার দিনার আছে এবং দশটির চিহ্ন মুছে গেছে। তারা চিঠি এবং দিনারগুলোকে তার কাছে দিয়ে বলল: যিনি তোমাকে এগুলো নিতে পাঠিয়েছেন তিনিই হলেন প্রকৃত ইমাম। 21


তৃতীয় ভাগ : পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে ইমাম মাহদী (আ.)

ক)- কোরআন

পবিত্র কোরআন হচ্ছে ঐশী শিক্ষার দূর্লভ ঝর্ণাধারা ,প্রতিষ্ঠিত হিকমত এবং মানুষের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ভাণ্ডার। কোরআন সত্য ও ন্যায়ে পরিপূর্ণ কিতাব যাতে পৃথিবীর অতীত ,বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে সংবাদ দান করা হয়েছে এবং কোন কিছুই তা থেকে বাদ পড়ে নি। তবে এটা স্পষ্ট যে ,পৃথিবীর ব্যাপক ঘটনাবলী কোরআনের ঐশী আয়াতের মধ্যে নিহিত রয়েছে এবং কেবলমাত্র যারা তার গভীরে পৌঁছতে পারবে তারাই এসত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে। তারাই হচ্ছেন কোরআনের প্রকৃত কর্ণধার ও মোফাসসের অর্থাৎ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পবিত্র আহলে বাইত (আ.) গণ।

আল্লাহর শেষ প্রতিনিধি পৃথিবীর এক মহান সত্য যার প্রতি কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে এবং ওই সকল আয়াতের ব্যাখ্যায়ও বহু রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে নিম্নে তার কিছু তুলে ধরা হল: যেমন সূরা আম্বিয়ার 105 নং আয়াতে বলা হচ্ছে:

) وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ‌ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ‌ أَنَّ الْأَرْ‌ضَ يَرِ‌ثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ (

নিঃসন্দেহে আমরা স্মারকবাণীর (তাওরাতের) পর যাবুরেও লিপিবদ্ধ করে দিয়েছিলাম যে ,পৃথিবীর উত্তরাধিকারী আমার সৎ বান্দারা হবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদী (আ.) ও তার সাহায্যকারীরা হচ্ছেন সেই যোগ্য বান্দা যারা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবেন। 22

সূরা কাসাসের 5 নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:

) وَنُرِ‌يدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْ‌ضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِ‌ثِينَ (

এবং আমরা ইচ্ছা করলাম যাদেরকে পৃথিবীর বুকে (বঞ্চিত) হীনবল করা হয়েছিল তাদেরকে নেতৃত্ব দান করতে এবং উত্তরাধিকারী করতে।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

বঞ্চিত বা হীনবল বলতে রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতকে বোঝানো হয়েছে। অনেক প্রচেষ্টা ও কষ্টের পর আল্লাহ এই বংশের মাহদী (আ.)-কে প্রেরণ করবেন এবং তাকে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন এবং শত্রুদেরকে কঠিন ভাবে লাঞ্চিত করবেন। 23

সূরা হুদের 86 নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:

) بَقِيَّتُ اللَّـهِ خَيْرٌ‌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (

আল্লাহর গচ্ছিত সম্পদই তোমাদের জন্য যথেষ্ট যদি তোমরা মু মিন হয়ে থাক।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদী ( আ .) আবির্ভূত হওয়ার পর কা বা গৃহে হেলান দিয়ে প্রথমে উক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করবেন। অতঃপর বলবেন :

انا بقیة الله فی الارضه و خلیفته و حجته علیکم

আমিই পৃথিবীর বুকে আল্লাহর গচ্ছিত সম্পদ ,তোমাদের প্রতি তার উত্তরাধিকারী এবং হুজ্জাত। অতঃপর যারা তাকে সালাম করবে তারা বলবে:

السلام علیک یا بقیة الله فی ارضه

আপনার প্রতি সালাম ,হে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর গচ্ছিত সম্পদ। 24

সূরা হাদীদের 17 নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:

) عْلَمُوا أَنَّ اللَّـهَ يُحْيِي الْأَرْ‌ضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ (

জেনে রাখ আল্লাহই ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। আমি নির্দশনগুলি তোমাদের জন্য বিশদভাবে ব্যক্ত করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আল্লাহ তা আলা ইমাম মাহদী (আ.)-এর নিষ্ঠার মাধ্যমে পৃথিবীকে পূনর্জীবিত করবেন। কেননা অত্যাচারিতের অত্যাচারের মাধ্যমে পৃথিবী মৃত্যুবরণ করেছিল। 25

খ)- রেওয়ায়েত

ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিষয়টি এমনই একটি বিষয় ,যে সম্পর্কে বহু সংখ্যক রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে। ইমামের জীবনের বিভিন্ন পর্যায় যেমন: জন্ম ,শৈশবকাল ,স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকাল ,আবির্ভাবের নিদর্শন ,আবির্ভাবের পর এবং বিশ্বব্যাপী অনুশাসন সম্পর্কে ইমামগণ হতে পৃথক পৃথক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যেমনিভাবে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ,অদৃশ্যকালীন পরিস্থিতি ,প্রতিক্ষাকারীদের পুরষ্কার সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই হাদীসসমূহ শিয়া-সুন্নি উভয় মাযহাবের গ্রন্থেই বর্ণিত হয়েছে এবং ইমাম মাহ্দী সম্পর্কিত বহু হাদীসই মুতাওয়াতির।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মাসূমগণ তার সম্পর্কে অতি সুন্দর সুন্দর কথা বলেছেন । যার সমষ্টি থেকে ইমাম মাহদী (আ.)-এর ন্যায়নিষ্ঠ বিপ্লবের গুরুত্ব প্রকাশ পায়। এখানে আমরা ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কিত চৌদ্দ মাসুম (আ.) হতে বর্ণিত হাদীসসমূহকে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছি:

রাসূল (সা.) বলেছেন:

তার সৌভাগ্য ,যে মাহ্দীকে দেখবে। তারও সৌভাগ্য ,যে মাহদীকে ভালবাসবে এবং সেও সৌভাগ্যবান ,যে তার ইমামতকে গ্রহণ করবে। 26

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

আবির্ভাবের প্রতিক্ষায় থেকো এবং কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে বিমুখ হয়ো না। এটা অতি সত্য যে ,আবির্ভাবের প্রতিক্ষায় থাকা আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ইবাদত। 27

হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা (আ.)-এর কিতাবে বর্ণিত হয়েছে:

অতঃপর বিশ্ববাসীর প্রতি রহমতের জন্য আউলিয়াগণের পর্যায়ক্রমকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর সন্তানের মাধ্যমে পরিপূর্ণতা লাভ করবে। যার মধ্যে হযরত মুসার পূর্ণতা ,হযরত ঈসার সৌন্দর্য এবং হযরত আইয়ুবের ধৈর্য থাকবে। 28

ইমাম হাসান মুজতাবা (আ.) বলেছেন:

আল্লাহপাক শেষ যামানায় একজন মহাপুরুষকে প্রেরণ করবেন এবং তাকে ফেরেশ্তাদের মাধ্যমে সাহায্য করবেন এবং তার সাথীদেরকেও রক্ষা করবেন। তাকে পৃথিবীর সবকিছুর উপর প্রাধান্য দেয়া হবে। তিনি দুনিয়াকে এমনভাবে ন্যায়নীতি ও সাম্যে পরিপূর্ণ করবেন যেমনিভাবে পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল। সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান যে ,তাকে দেখবে এবং তার নির্দেশ পালন করবে। 29

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন:

আল্লাহ হযরত মাহ্দীর মাধ্যমে ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। তার মাধ্যমেই সত্য দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর প্রাধান্য দান করবেন যদিও মুশরিকরা তা পছন্দ করে না। তিনি অদৃশ্যে থাকবেন অনেকেই দ্বীনচ্যুত হবে আবার অনেকেই দ্বীনের প্রতি প্রতিষ্ঠিত থাকবে। যে ব্যক্তি অদৃশ্যকালীন অবস্থায় বিভিন্ন অত্যাচার ও মিথ্যাচারে ধৈর্য ধারণ করবে সে রাসূল (সা.)-এর সাথে থেকে মুশরিকেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে। 30

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েমের অদৃশ্যকালীন সময়ে যারা আমাদের প্রতি বিশ্বাসে অনড় থাকবে আল্লাহ তা আলা তাকে বদর এবং ওহুদের যুদ্ধে শাহাদত প্রাপ্তদের মত সহস্র শহীদের পুরস্কার দান করবেন। 31

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

মানুষের জন্য এমন সময় আসবে যখন তাদের ইমাম অদৃশ্যে থাকবে এবং সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান যে ,ঐ সময়ে আমাদের বেলায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। 32

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েমের জন্য দৃ টি অদৃশ্য রয়েছে একটি স্বল্পমেয়াদী অপরটি দীর্ঘমেয়াদী। 33

ইমাম কাযিম (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদী (আ.) দৃষ্টির অন্তরালে থাকবেন কিন্তু মু মিনরা তাকে কখনোই ভুলবেন না। 34

ইমাম মুসা রেযা (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদী (আ.) যখন আবির্ভূত হবেন পৃথিবী তার জ্যোতিতে আলোকিত হয়ে যাবে এবং তিনি ন্যায়বিচারের মানদণ্ড স্থাপন করবেন। সুতরাং তখন কেউই কারো প্রতি অত্যাচার করবে না। 35

ইমাম তাকি আল জাওয়াদ (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম তিনি যার অদৃশকালীন অবস্থায় তার প্রতিক্ষায় থাকতে হবে এবং আবির্ভাবের পর তার নির্দেশ পালন করতে হবে। 36

ইমাম হাদী আন্ নাকি (আ.) বলেছেন:

আমার পর ইমাম হচ্ছে আমার পুত্র হাসান এবং তার পর তার পুত্র মাহ্দী ইমাম হবে এবং তিনি দুনিয়াকে এমভাবে ন্যায়নীতি ও সাম্যে পরিপূর্ণ করবেন যেমনিভাবে পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল। 37

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) বলেছেন:

আল্লাহর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে ,তিনি আমার মৃত্যুর পূর্বেই আমাকে আমার উত্তরাধিকারী দান করেছেন। সে সকল দিক থেকেই রাসূল (সা.)-এর অনুরূপ। 38


চতুর্থ ভাগ : অন্যান্যদের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী (আ.)

যদি অন্যরা প্রশংসা করতে বাধ্য হয় ,

তবে সেটাই হচ্ছে বড় গৌরবের।

ইমাম মাহদী (আ.) ও তার বিশ্বজনীন বিপ্লবের বিষয়টি কেবল মাত্র শিয়া মাযহাবের গ্রন্থেই বর্ণিত হয় নি বরং তা মুসলমানদের সকল মাঝহাবেই বর্ণিত হয়েছে এবং এ সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনাও হয়েছে। তারাও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অস্তিত্ব ও আবির্ভাব এবং তিনি যে রাসূল (সা.)-এর বংশ হতে এবং হযরত ফাতিমাতুয্ যাহরা (আ.)-এর সন্তান 39 এ সম্পর্কে একমত। আহলে সুন্নত যে মাহ্দীবাদের প্রতি বিশ্বাসী তা জানার জন্য তাদের বিশিষ্ট আলেমদের গ্রন্থসমূহের শরণাপন্ন হতে হবে। আহলে সুন্নতের মোফাসসেরগণও তাদের তাফসীর গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করেছেন যে ,কোরআন পাকের কিছু আয়াত শেষ যামানায় ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রতি ঈঙ্গিত করে। যেমন: ফাখরে রাযী 40 ,কুরতুবি 41 ... ।

অনুরূপভাবে তাদের অধিকাংশ মুহাদ্দিসগণও ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কিত হাদীসসূহকে তাদের স্ব-স্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে তাদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহও রয়েছে। যেমন: সিহাহ সিত্তা 42 , মুসনাদে আহমাদ বিন হাম্বাল ...।

আহলে সুন্নতের পূর্বের ও বর্তমানের অনেক পণ্ডিতরাই ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন: আবু নাঈম ইস্পাহানী ,মাজমাউল আরবাইন গ্রন্থ লিখেছেন এবং সূয়ূতী ,আল ওরফুল ওয়ারদী ফী আখবারিল মাহ্দী (আ.) গ্রন্থ রচনা করেছেন।

এখানে উল্লেখ্য যে ,আহলে সুন্নতের কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ইমাম মাহ্দীর প্রতি বিশ্বাসের স্বপক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেছেন এবং যারা বিষয়টিকে অস্বীকার করে তাদের বিপক্ষে গ্রন্থ লিখেছেন। তাদের মধ্যে মুহাম্মদ সিদ্দিক মাগরেবী এবং ইবনে খালদুন উল্লেখযোগ্য। 43 এটা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতি আহলে সুন্নতের বিশ্বাসের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র। আহলে সুন্নতের গ্রন্থে উল্লেখিত শত শত হাদীসের মধ্যে সংক্ষিপ্ততার প্রতি দৃষ্টি রেখেই দু টি হাদীস তুলে ধরা হল: রাসূল (সা.) বলেছেন:

যদি মাহপ্রলয়ের একদিনও অবশিষ্ট থাকে আল্লাহ তা আলা সেদিনকে এত দীর্ঘায়িত করবেন যে ,আমার বংশ হতে এক ব্যক্তিকে আবির্ভাব ঘটাবেন তিনি দুনিয়াকে এমভাবে ন্যায়নীতি ও সাম্যে পরিপূর্ণ করবেন যেমনিভাবে পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল। যার নাম আমার নামের অনুরূপ। 44

তিনি আরও বলেছেন:

আমার বংশ হতে এমন এক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন যিনি সবদিক থেকেই আমার অনুরূপ। তিনি দুনিয়াকে এমভাবে ন্যায়নীতি ও সাম্যে পরিপূর্ণ করবেন যেমনিভাবে পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল। 45

শেষ যামানায় ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের বিষয়টি সকলেই বিশ্বাস করেন। মাহ্দীবাদ হল গোটা মানবের চাওয়া পাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যা বিভিন্ন ধর্ম ও মাযহাবের অনুসারী হয়েও তারা এ অভিন্ন বিষয়ের মুখপানে ধাবিত। মাহ্দীবাদ হল মানব প্রকৃতির এক ঐশী আহবানের স্বচ্ছ স্ফুরণ যার পথ ধরে বিভিন্ন আক্বীদা বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও মানুষ প্রতিশ্রুত দিনকে অবলোকন করে থাকেন। পবিত্র তৌরাত ,যাবুর ,ইঞ্জিল এমনকি হিন্দুদের গ্রন্থে এবং অগ্নিপুজকদের গ্রন্থেও ইমাম মাহ্দী সম্পর্কে ঈঙ্গিত করা হয়েছে। তবে প্রত্যেকেই তাকে ভিন্ন নামে চিনে থাকে। অগ্নিপুজকরা তাকে সুশিনাস অর্থাৎ বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতা ,খ্রীষ্টানরা তাকে মাসিহ মাওউদ এবং ইহুদিরা তাকে সারওয়ারে মিকাইলি নামে আখ্যায়িত করেছেন। অগ্নিপুজকদের জামাসাব নামে গ্রন্থে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

আরবদের নবীই শেষ নবী যিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করবেন এবং তিনি মানুষের সাথে তাদের মতই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবেন। তার দ্বীনই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তার কিতাব (কোরআন) সকল কিতাবকে বাতিল করবে। তার কন্যার সন্তানরা যারা পৃথিবীর সূর্য এবং যুগের নেতা (ইমাম) নামে ভুষিত। আল্লাহর নির্দেশে ঐ নবীর শেষ উত্তরাধিকারীর শাসনব্যবস্তা কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। 46


তৃতীয় অধ্যায় :অদৃশ্য ইমামের প্রতিক্ষায়


প্রথম ভাগ :অদৃশ্য

বিশ্ব মানবতার মুক্তিদাতা ,হযরত আদম থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকারী এবং আল্লাহর শেষ গচ্ছিত সম্পদ হযরত হুজ্জাত ইবনেল হাসান আসকারী (আ.)-এর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানার পর এখন তার জীবনের অপর গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অর্থাৎ অদৃশ্য সম্পর্কে কথা বলব।

অদৃশ্যের তাৎপর্য

প্রথম লক্ষণীয় বিষয়টি হল অদৃশ্য অর্থাৎ দৃষ্টির অন্তরালে থাকা ,অনুপস্থিত থাকা নয়। সুতরাং এ অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করব যে ইমাম মাহদী (আ.) লোকচক্ষুর অন্তরালে আছেন এবং তারা তাকে দেখতে পায়না কিন্তু তিনি তাদের মাঝে উপস্থিত রয়েছেন এবং তাদের সাথে জীবন-যাপন করছেন। এ সত্যটি মাসুম ইমামগণের হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

আমার প্রভুর শপথ মানুষের মাঝে আল্লাহর হুজ্জাত রয়েছে এবং তিনি মানুষের মাঝেই বিচরণ করেন। মানুষের বাড়ীতেও আসা যাওয়া করেন। তিনি পৃথিবীর সর্বত্রই বিরাজমান। মানুষের কথোপকথোন শোনেন এবং তাদেরকে সালাম দেন। তিনি দেখেন কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাকে দেখতে পাবে না। 47 তবে আরেক ধরনের অদৃশের কথাও বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.)-এর দ্বিতীয় প্রতিনিধি বলেন:

ইমাম মাহদী (আ.) প্রতি বছর হজ্জের মৌসুমে সেখানে উপস্থিত হন। তিনি সবাইকে দেখেন এবং চেনেন । আর মানুষও তাকে দেখতে পায় কিন্তু তাকে চিনতে পারে না। 48

সুতরাং হযরত মাহদী (আ.) সম্পর্কে দুই ধরনের অদৃশ্য ঘটতে পারে: তিনি কখনো লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকেন আবার কখনো পরিদৃষ্ট হয়ে থাকেন কিন্তু কেউ তাকে চিনতে পারে না। ইমাম সর্বদাই মানুষের মাঝে বিরাজমান।

অদৃশ্যের ইতিকথা

অদৃশ্য তথা দৃষ্টির অন্তরালে জীবন-যাপন এমন বিষয় নয় যা কেবলমাত্র আল্লাহর শেষ প্রতিনিধির বেলায় ঘটেছে। বরং হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা জানা যায় যে ,আল্লাহর বিশেষ কয়েকজন নবীও তাদের জীবনের কিয়দাংশকে অদৃশ্যে তথা দৃষ্টির অন্তরালে অতিবাহিত করেছেন। এ ঘটনা আল্লাহর নির্দেশেই ঘটেছিল তাদের ব্যক্তিগত চাহিদা বা পারিবারিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নয়।

সুতরাং অদৃশ্য হচ্ছে আল্লাহর একটি পন্থা 49 যা বিভিন্ন নবী যেমন: হযরত ইদ্রিস ,নূহ ,সালেহ ,ইব্রাহীম ,ইউসুফ ,মুসা ,শোয়েব ,ইলিয়াস ,সুলাইমান ,দানিয়াল (আ.)-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে। আল্লাহর নির্দেশে তাদের প্রত্যেকেই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অদৃশ্যে থেকেছেন এবং হযরত ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রে তা এখনো অব্যহত রয়েছে। 50     একারণেই ইমাম মাহদী (আ.)-এর অদৃশ্যকে নবীগণের একটি সুন্নত বা রীতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে । ইমাম মাহদী (আ.)-এর অদৃশ্যের একটি দলিল হচ্ছে তার জীবনে নবীদের সুন্নত বাস্তবায়িত হবে। ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েমের জন্য অদৃশ্য রয়েছে যা দীর্ঘায়িত হবে । রাবী প্রশ্ন করল: হে রাসূলাল্লাহর সন্তান এ অদৃশ্যের কারণ কি ?

ইমাম বললেন: আল্লাহ চান যে নবীদের সুন্নত তার জীবনে বাস্তবায়িত হোক। 51

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্যের বিষয়টি তার জন্মের পূর্বেই আলোচনার বিষয়বস্তু হিসাবে স্থান পেয়েছিল। ইসলামের নেতাগণ অর্থাৎ রাসূল (সা.) থেকে শুরু করে হযরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.) পর্যন্ত সকলেই ইমাম মাহ্দীর অদৃশ্যের ঘটনা ,তার বৈশিষ্ট্য এবং তা ঘটার সময় সস্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন। এমনকি সে সময়ে মুসলমানদের কর্তব্যও বর্ণনা করেছেন। 52

রাসূল (সা.) বলেছেন:

মাহ্দী আমার সন্তানদের মধ্য থেকে সে অদৃশ্যে থাকবে যখন মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে তখন সে আবির্ভূত হবে উজ্জল তারার ন্যায়। সে পৃথিবীকে এমভাবে ন্যায়নীতি ও সাম্যে পরিপূর্ণ করবে যেমনিভাবে পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল। 53

অদৃশ্যের দর্শন

সত্যি ,কেন ইমাম তথা আল্লাহর হুজ্জাত দৃষ্টির অন্তরালে আছেন এবং কি কারণে জনগণ তার আবির্ভাবের বরকত থেকে বঞ্চিত রয়েছে ?

এ বিষয়ে অনেক বক্তব্য রয়েছে এবং বহুসংখ্যক হাদীসও বর্ণিত হয়েছে। তবে উপরিউক্ত প্রশ্নসমূহের উত্তর দেওয়ার পূর্বে একটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করাকে প্রয়োজন মনে করছি।

আমরা বিশ্বাস করি যে আল্লাহ তা আলার কোন কাজই তাই সে ছোট হোক আর বড়ই হোক নিরর্থক নয়। তিনি প্রতিটি কর্মই হিকমতের সাথে করে থাকেন এখন আমরা তা বুঝি আর নাই বুঝি। তাছাড়াও পৃথিবীর অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনাও আল্লাহর নির্দেশে সংঘটিত হয়ে থাকে আর তার মধ্যে অন্যতম হল ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্যের ঘটনাটি। সুতরাং তার অদৃশ্যের ঘটনাটিও আল্লাহর হিকমতের মাধ্যমেই ঘটেছে যদিও আমরা তার দর্শন না জেনে থাকি।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

নিঃসন্দেহে আমাদের সাহেবুল আমর দৃষ্টির অন্তরালে থাকবে এবং অসত্যপন্থিরা বিভ্রান্তিতে পড়বে।

রাবী এর কারণ সম্পর্কে ইমাম (আ.) -এর কাছে জানতে চাইলে ,ইমাম (আ.) বলেন:

যে কারণে অন্তর্ধান ঘটবে তা বলা নিষিদ্ধ...। অদৃশ্য আল্লাহর রহস্যের মধ্যে একটি। যেহেতু আমরা জানি যে ,মহান আল্লাহ হাকিম সুতরাং আমরা তা মেনে নিয়েছি। আল্লাহর প্রতিটি কর্মই হিকমতপূর্ণ তাই আমরা তার কারণ জানি বা নাই জানি। 54

তবে এমনটিও হতে পারে একজন মানুষ আল্লাহর সকল কার্যাবলীকে হিকমতপূর্ণ মেনে নেওয়ার পরও আত্মিক তৃপ্তি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সৃষ্টির কিছু কিছু রহস্য জানার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে। সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্যের হিকমত সম্পর্কে বিশ্লেষণ করব এবং সে সম্পর্কিত কিছু রেওয়ায়াতের প্রতি আলোকপাত করব:

ক)- মানুষের শিক্ষার জন্য

যখন উম্মত নবী ও ইমামের মর্যাদা বোঝেনা এবং তাদের প্রতি কর্তব্য পালন করে না বরং তাদের নির্দেশ লঙ্ঘন করে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাদের নেতাকে তাদের থেকে পৃথক করে দেন যেন তারা তাদের ভুল বুঝতে পারে এবং ইমামের অদৃশ্যকালীন সময়ে তার বাহ্যিক উপস্থিতির বরকত ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পারে। অতএব ইমামের অদৃশ্য উম্মতের জন্য কল্যাণকর যদিও তারা তা উপলব্ধি করতে অক্ষম।

ইমাম বাকের (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

আল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের ওঠা-বসাকে অপছন্দ করেন তখন আমাদেরকে তাদের মাঝ থেকে উঠিয়ে নেন। 55

ব্যক্তি স্বাধীনতা এবং কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ না হওয়ার কারণে যারা কোন পরিবর্তন ও বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টায় থাকে তারা সংগ্রামের প্রথমে বিরোধীদের কারো কারো সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয় ,যার মাধ্যমে তারা উদ্দেশ্যের পানে অগ্রসর হন। কিন্তু প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্দী (আ.) এমনই একজন সংস্কারক যিনি বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করতে এবং বিশ্বজনীন ন্যায় পরায়ণ শাসন ব্যাবস্থার প্রচলন ঘটাতে কোন অত্যাচারী শক্তির সাথে আপোস করবেন না। কেননা হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি হচ্ছেন সকল প্রকার অত্যাচার ও অত্যাচারীর প্রকাশ্য নির্মূলকারী। আর একারণেই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তিনি অদৃশ্যে থাকবেন যেন তাকে কোন অত্যাচারীর সাথে চুক্তিবদ্ধ না হতে হয়। ইমাম রেযা (আ.) অদৃশ্যের কারণ সম্পর্কে বলেছেন:

এ জন্য যে ,যখন তিনি সংগ্রাম করবেন তখন যেন কারো সাথে তার চুক্তিবদ্ধতা না থাকে। 56

খ)- মানুষের পরীক্ষার জন্য

মানুষকে পরীক্ষা করা আল্লাহর সুন্নতসমূহের একটি। তিনি তার বান্দাদেরকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে থাকেন যার মাধ্যমে সত্যের পথে তাদের দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়। যদিও পরীক্ষার ফলাফল স্পর্কে আল্লাহ জ্ঞাত কিন্তু এই পরীক্ষার মাধ্যমে বান্দাগণ শিক্ষা পাবে এবং নিজেদের সম্পর্কে বিশেষভাবে জানতে শিখবে।

ইমাম কাযেম (আ.) বলেছেন:

যখন আমার বংশের পঞ্চম পুরুষ অদৃশ্যে থাকবে তখন তোমরা দ্বীনের প্রতি যত্নবান থেকো। তেমাদের মধ্য থেকে কেউ যেন বিচ্যুত না হয়। আমাদের মাহ্দী (আ.) অদৃশ্যে থাকবে এবং এ সময় অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়বে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাদেরকে পরীক্ষা করবেন। 57

গ)- ইমামের জীবন রক্ষার জন্য

উম্মতের কাছ থেকে নবীগণের অদৃশ্য হয়ে থাকার অপর একটি কারণ হল নিজের জীবন রক্ষা করা। তারা পরবর্তীতে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার তাগিদে বিপদের সময়ে অদৃশ্য হতেন যেমন রাসূল (সা.) মক্কা থেকে বেরিয়ে গুহায় লুকিয়ে ছিলেন। তবে এ সবই আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছায় ঘটে থাকে। ইমাম মাহদী (আ.)-এর অদৃশ্য হওয়ার কারণ সম্পর্কেও বিভিন্ন রেওয়ায়েতে ঠিক একই দলিল বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.) তার সংগ্রামের পূর্বে কিছুদিন যাবত অদৃশ্যে থাকবে। কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ইমাম বলেন: জীবন রক্ষার জন্য। 58

যদিও ঐশী মহামানবরা শহীদ হওয়ার প্রার্থনা করে থাকেন। তবে সেই শাহাদত অর্থবহ যখন তা কর্তব্যপালন করতে গিয়ে এবং সমাজ ও আল্লাহর দ্বীন রক্ষার জন্য হয়ে থাকে। কিন্তু যদি হত্যার মাধ্যমে মানুষের উদ্দেশ্য অর্জিত না হয় ও তা বৃথা যায় তখন জীবন বাচাঁনো ফরজ এবং তা বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকেও পছন্দনীয়। দ্বাদশ ইমাম যিনি আল্লাহর শেষ গচ্ছিত সম্পদ তিনি যদি এভাবে মারা যান তাহলে মানুষের সকল আশা বৃথা যাবে এবং সকল নবীদের শ্রম ব্যর্থ হবে। আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ,ন্যায়নিষ্ঠ্য শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিভিন্ন হাদীসে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্যের আরও অনেক কারণ বর্ণিত হয়েছে ,তবে সংক্ষিপ্ততার জন্য তা বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকা হল। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল যা পূর্বেও বলা হয়েছে , অদৃশ্য আল্লাহর রহস্যের মধ্যে একটি এবং এই অদৃশ্যের প্রকৃত কারণ ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের পর উদঘাটিত হবে। (এতটুকু বলা যেতে পারে) যা আলোচনা করা হয়েছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্যে তার প্রভাব রয়েছে।


দ্বিতীয় ভাগ :অদৃশ্যের প্রকারভেদ

পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অদৃশ্য হওয়ার বিষয়টি একান্ত জরুরী। কিন্তু যেহেতু আমাদের মহান ইমামগণের প্রত্যেকটি পদক্ষেপই জনগণের ঈমান ও বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য। তাই ভয় ছিল যে ,আল্লাহর শেষ হুজ্জাত (আ.)-এর অন্তর্ধান মুসলমানদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাড়াবে তাই অদৃশ্যের সময়টি ক্রমান্বয়ে এবং যথাযথভাবে শুরু হয়ে চলতে থাকে।

দ্বাদশ ইমামের জন্মের বহু দিন পূর্বে থেকেই তার অদৃশ্য এবং এর অপরিহার্যতা সম্পর্কে ইমামগণ এবং তাদের সাথীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। অনুরূপভাবে ইমাম হাদী (আ.) ও ইামাম আসকারী (আ.) তাদের অনুসারীদেরকে বিশেষভাবে বিষয়টিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে ধীরে ধীরে আহলে বাইতের অনুসারীরা বুঝে নিয়েছিলেন যে ,দুনিয়া এবং আখেরাতের বিভিন্ন সমস্যাতে সর্বদা উপস্থিত ইমামের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই বরং তাদের নায়েবদের (প্রতিনিধিদের) মাধ্যমেও এসবের সমাধান করা সম্ভব। ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদত এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্য শুরু হওয়ার পরও উম্মতের সাথে ইমামের সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয় নি। বরং জনগণ ইমামের বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের মহান ইমামের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এসময়েই জনগণ এবং দ্বীনি আলেমদের মধ্যে ব্যপক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মানুষ বুঝে নিয়েছিল যে ,ইমাম অদৃশ্যে থাকলেও তাদের দ্বীনি কর্তব্য পালনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় নি। এটাই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জন্য উপযুক্ত সময় ছিল যে ,তিনি দীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যে যাবেন। আর এভাবে ইমাম এবং জনগণের মধ্যে সাধারণ সম্পর্ক স্থগিত হয়ে যায়।

এখন স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকালের কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অলোচনা তুলে ধরা হল:


স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকাল (অন্তর্ধান)

260 হিজরীতে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদতের পর দ্বাদশ ইমাম (আ.)-এর ইমামত শুরু হয় এবং তখন থেকেই তার স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্য শুরু হয় যা গাইবাতে সোগরা নামে পরিচিত আর এ অদৃশ্যকাল 329 হিজরী পর্যন্ত (প্রায় 70 বছর) চলে।

স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকালের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এসময়ে জনগণ ইমামের বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাথে যোগাযোগ রাখতেন ,তাদের মাধ্যমে ইমামের নির্দেশ পেতেন এবং নিজেদের কৃত প্রশ্নের জবাব পেতেন। 59 কখনো আবার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ইমাম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করতেন।

ওই বিশেষ চারজন প্রতিনিধির সকলেই হচ্ছেন শিয়া মাযহাবের বিশিষ্ট আলেম এবং ইমাম মাহদী (আ.)-এর মনোনীত ছিলেন। উক্ত চারজন হলেন যথাক্রমে:

(1) উসমান ইবনে সাঈদ আমরী (রহ.)। তিনি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অন্তর্ধানের প্রথম থেকে প্রতিনিধিত্ব গ্রহণ করেন এবং 267 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এরও প্রতিনিধি ছিলেন।

(2) মুহাম্মদ বিন উসমান ইবনে সাঈদ আমরী (রহ.)। তিনি প্রথম প্রতিনিধির সন্তান এবং পিতার মৃত্যুর পর তিনি ইমামের প্রতিনিধি নিযুক্ত হন এবং 305 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

(3) আবুল কাসেম হুসাইন ইবনে রুহ নৌবাখতী (রহ.)। তিনি দীর্ঘ 21 বছর প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করার পর 326 হিজরীতে ইহধাম ত্যাগ করেন।

(4) আবুল হাসান আলী ইবনে মুহাম্মদ সামুরী (রহ.)। তিনি 329 হিজরীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং তার মৃত্যুর মাধ্যমেই স্বল্পমেয়াদী অন্তর্ধানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

বিশেষ প্রতিনিধিদের সকলেই ইমাম হাসান আসকারী (আ.) এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মানুষের কাছে পরিচয়লাভ করেছিলেন। শেখ তুসী (রহ.) তার আল গাইবাহ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে ,একদা চল্লিশজন শিয়া উসমান ইবনে সাঈদকে (প্রথম নায়েব) নিয়ে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হন। ইমাম তার সন্তানকে তাদেরকে দেখিয়ে বলেন:

আমার পর এই সন্তানই তোমাদের ইমাম। তাকে অনুসরণ করো ,জেনে রাখ আজকের পর থেকে প্রাপ্ত বয়ষ্ক না হওয়া পর্যন্ত তোমরা তাকে আর দেখতে পাবে না। সুতরাং তার অদৃশ্যকালে উসমান যা বলে তাই মেনে নিও এবং তার অনুসরণ করো। কেননা ,সে তোমাদের ইমামের প্রতিনিধি এবং সকল দায়িত্ব তার উপর ন্যাস্ত। 60

অপর একটি হাদীস থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দ্বিতীয় প্রতিনিধিকেও ইমাম হাসান আসকারী (আ.) নির্বাচন করেছিরেন। শেখ তুসী (রহ.) বর্ণনা করেছেন:

উসমান বিন সাঈদ শিয়া মাযহাবের ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে যে সকল মাল জিনিস নিয়ে এসেছিলেন ইমাম তা গ্রহণ করলেন। যারা এঘটনাটির সাক্ষী ছিল তারা বললেন , আমরা জানি যে ,উসমান আপনার অনুসারীদের মধ্যে অন্যতম তবে আপনার এ কাজের মাধ্যমে আমাদের কাছে তা আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে গেল। ইমাম (আ.) বললেন , হ্যাঁ তোমরা জেনে রাখ যে ,উসমান আমার প্রতিনিধি এবং তার পুত্র মুহাম্মাদ আমার পুত্র মাহ্দীর প্রতিনিধি হবে। 61

এগুলি ইমাম মাহদী (আ.)-এর অদৃশ্যের পূর্বের ঘটনা এবং স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকালে প্রত্যেক প্রতিনিধি তার মৃত্যুর পূর্বে ইমাম মাহদী (আ.)-এর নির্দেশে পরবর্তী প্রতিনিধিকে নির্বাচন করে যেতেন।

এই মহান ব্যক্তিত্বরা বিশেষ গুনে গুনান্বিত হওয়ার কারণেই ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশেষ প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।

আমানতদারীতা ,পবিত্রতা ,কথা এবং কাজে ন্যায়পরায়ণতা ,আহলে বাইত (আ.)-এর গোপন তথ্য গোপন রাখা ইত্যাদি তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। তারা ইমামগণের বিশ্বস্ত এবং প্রিয় ছিলেন। তাদের অনেকে আবার 11 বছয় বয়স থেকে ইমামদের সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছিলেন এবং ঈমানের পাশাপশি জ্ঞানের দিক থেকেও সবার শীর্ষে ছিলেন। সকলেই তাদেরকে ভালমানুষ হিসাবে জানত। তারা এত বেশী সহনশীল ও মহৎপ্রাণ ছিলেন যে ,অতি কঠিন মূহুর্তেও তারা পুরোপুরি ইমামের অনুগত ছিলেন। এই উত্তম বৈশিষ্ট্যের পাশাপশি তারা শিয়া মাযহাবের নেতৃত্বের যোগ্যতাও রাখতেন। অনেক প্রতিকুলতা থাকা সত্বের তারা সামান্য উপকরণের মাধ্যমে শিয়া সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পেরেছিলেন এবং স্বপ্লমেয়াদী অন্তর্ধানকে সফলভাবে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর স্পল্পমেয়াদী অন্তর্ধানকে অধ্যায়ন করলে বোঝা যায় যে ,তার প্রতিনিধিগণ কত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং ইমাম ও উম্মতের মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। এই যোগাযোগ এবং কারো কারো সাথে ইমামের সাক্ষাৎ ইমামের জন্ম ও অস্তিত্ব প্রমাণে অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আর এ ঘটনাটি ঠিক তখন ঘটেছিল যখন শত্রুরা শিয়া মাযহাবের ইমামের জন্মের ব্যাপারে সন্দেহের মধ্যে ফেলতে চেয়েছিল। তাছাড়াও এ সময়টি দীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেও যথেষ্ট সহায়ক ভুমিকা রেখেছিল। কেননা ,দীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যে নায়েবদের মাধ্যমেও ইমামের সাথে যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন মানুষ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে ,তাদের মহান ইমাম অস্তিত্বমান তবে তিনি দৃষ্টির অন্তরালে।


দ্বীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকাল (অন্তর্ধান)

চতুর্থ প্রতিনিধির জীবনের শেষ দিকে ইমাম মাহ্দী তাকে উদ্দেশ্য করে এভাবে লিখেছিলেন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

হে আলী ইবনে মুহাম্মদ সামুরী আল্লাহ তোমার মৃত্যুর শোকে তোমার দ্বীনি ভাইদেরকে সবর ও কেরামত দান করুন। কেননা 6 দিন পর তুমি মৃত্যুবরণ করবে এবং চিরস্থায়ী ঠিকানায় চলে যাবে। কাজেই তোমার সকল কাজের ঠিকমত দেখাশুনা কর এবং তোমার পর আর কাউকে প্রতিনিধির ওসিয়ত করো না। কেননা ,এখন থেকে আমার দ্বীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধান শুরু হতে যাচ্ছে এবং আল্লাহর নির্দেশ না হওয়া পর্যন্ত আমাকে দেখতে পাবে না এবং এ অন্তর্ধান দীর্ঘকাল ধরে অর্থাৎ মানুষের অন্তর কঠিন ও কুৎসিত এবং পৃথিবী অন্যায় ও অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকবে। 62

সুতরাং 329 হিজরীতে দ্বাদশ ইমাম (আ.)-এর শেষ প্রতিনিধির মৃত্যুর মাধ্যমে দ্বীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকাল যা গাইবাতে কোবরা নামে পরিচিত শুরু হয়। আল্লাহর নির্দেশ না হওয়া পর্যন্ত এ দ্বীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকাল চলতে থাকবে এবং যে দিন আল্লাহর নির্দেশে অদৃশ্যের মেঘ সরে যাবে সেই দিন পৃথিবী বেলায়াত নামক সূর্যের প্রত্যক্ষ নূরে আলোকিত হবে।

যেমনটি পূর্বেই জেনেছেন যে ,স্বল্পমেয়াদী অন্তর্ধানের সময়ে শিয়ারা ইমামের বিশেষ প্রতিনিধির মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান করত। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধানের সময়ে একমাত্র নায়েবে আ ম (সাধারণ) অর্থাৎ দ্বীনি আলেম ও মারাজায়ে তাকলীদদের শরণাপন্ন হবে এবং এটা একটি সরল পথ ,যে সম্পর্কে ইমাম মাহ্দী (আ.) নিজেই একজন বিশ্বস্ত শিয়া আলেমের কাছে চিঠি লিখেছেন। এই চিঠির কিছু অংশ যা ইমামের দ্বিতীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ,সেখানে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

و اما الحوادث الواقعة فارجعوا فیها الی رواة حدیثنا فانهم حجتی علیکم و انا حجة الله علیهم

পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে আমাদের হাদীস বর্ণনাকারীদের শরণাপন্ন হবে। কেননা তারা আমার হুজ্জাত আর আমি তাদের জন্য আল্লাহর হুজ্জাত। 63

দীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধানে দ্বীনি প্রশ্নসমূহের উত্তরের এ নতুন পদ্ধতি বিশেষকরে ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্তব্য সস্পর্কে জানার এ পদ্ধতি এটাই স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় যে ,শিয়া মাযহাবের সাংস্কৃতিতে ইমামত ও নেতৃত্বের এ প্রক্রিয়া একটি জীবন্ত ও সক্রিয় পদ্ধতি। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে মানুষের হেদায়েত ও নেতৃত্বকে গঠনমূলক পদ্ধতিতে পালন করে থাকে। কখনোই তাদের অনুসারীদেরকে নেতাবিহীন রাখে নি ,বরং তাদের জীবনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল ব্যাপারকে যোগ্যতম আলেমদের হাতে সপে দিয়েছেন। যারা দ্বীন বিশেষজ্ঞ ,আমানতদার এবং পরহেজগার। যারা পারেন ইসলামের তরীকে সকল প্রতিকুলতা থেকে রক্ষা করতে এবং শীয়া মাযহাবকে তাদের বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখতে।

ইমাম হাদী আন্ নাকী (আ.) অদৃশ্যকালীন সময়ে দ্বীনি আলেমদের ভুমিকা সম্পর্কে বলেছেন:

ইমাম মাহদী (আ.)-এর অন্তর্ধানের পর যদি আলেমগণ জনগণকে তার দিকে আহবান না করতেন ,হেদায়াত না করতেন ,যদি বলিষ্ঠ দলিল ও হুজ্জাতের মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীনকে রক্ষা না করতেন ,তারা যদি শয়তান এবং শয়তানী বৈশিষ্টের অধিকারী ও আহলে বাইতের শত্রুদের হাত থেকে শিয়া মাযহাবকে রক্ষা না করতেন তাহলে সকলেই দ্বীনচ্যুত হয়ে পড়ত। কিন্তু তারা আছেন এবং শিয়া মাযহাবের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে রেখেছেন। যেভাবে একজন জাহাজ চালক জাহাজের আরোহীদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ওই সকল আলেমগণ আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম। 64

এখানে যে বিশেষ বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে তা হল ,একজন নেতার কি কি বৈশিষ্ট্য থাকা অত্যাবশ্যক। কেননা মানুষের দ্বীন ও দুনিয়ার এ গুরু দায়িত্ব এমন মাহামানবের ওপর অর্পণ করতে হবে যিনি সঠিক বিষয়টি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সিদ্ধ হস্ত হবেন। একারণেই মাসুম ইমামগণ (আ.) দ্বীনি আলেম এবং তারও উর্ধে ওয়ালীয়ে ফকীহর জন্য অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। এসম্পর্কে ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বর্ণনা করেছেন:

ফকীহ্ ও আলেমগণের মধ্যে যারা নিজেদেরকে ছোট অথবা বড় গোনাহ্ থেকে দুরে রেখেছে এবং দ্বীনের আইন-কানুন টিকিয়ে রাখতে দৃঢ় ভূমিকা পালন করে সাথে সাথে নিজের ইচ্ছা ও চাওয়া-পাওয়ার প্রতি বিরোধিতা করে ও যামানার ইমামের নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকে ,মানুষের উচিৎ তাদেরকে অনুসরণ করা। শিয়া মাযহাবের ফকীহ্গণের মধ্যে কিছু সংখ্যক হচ্ছে এরূপ ,সকলেই নয়। 65


তৃতীয় ভাগ :অদৃশ্য ইমামের সুফল

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোক-সমাজ ইমামের আবির্ভাব হতে বঞ্চিত এবং মুসলিম উম্মাহও তাদের ঐশী নেতা ও পবিত্র ইমামের সহচার্য্য থেকে বঞ্চিত। তাহলে তার অদৃশ্যে অবস্থান ,দৃষ্টির অন্তরালে জীবন-যাপন এবং মানুষেল ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকা পৃথিবী তথা বিশ্ববাসীর জন্য কি কাজে আসবে ?এটা কি হতে পারত না ,যে তিনি আবির্ভাবের নিকটবর্তী সময়ে জন্মগ্রহণ করতেন এবং নিজের অদৃশ্যের জন্য তার অনুসারীদের এই দূর্ভোগ পোহাতে হত না ?

এ ধরনের প্রশ্ন ইমাম তথা আল্লাহর হুজ্জাতের মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণেই জন্ম নেয়।

আসলে সৃষ্টিজগতে ইমামের অবস্থান কোথায় ?তার সকল সুফল কি কেবল মাত্র তার প্রকাশ্যে থাকার মধ্যে নিহীত ?তিনি কি শুধুমাত্র মানুষেরই নেতা নাকি তার অস্তিত্ব সৃষ্টির সকল কিছুর জন্য ফলপ্রসূ ?

ইমাম সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু (কান্ডারী)

শিয়া মাযহাবের দৃষ্টিতে এবং ইসলামী শিক্ষার ভিত্তিতে ইমাম হচ্ছেন সৃষ্টির সকল আস্তিত্বের মাঝে আল্লাহর রহমত পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। তিনি হচ্ছেন সৃষ্টিজগতের কেন্দ্রবিন্দু ও মানদণ্ড এবং তিনি না থাকলে পৃথিবী ,মানুষ ,জ্বীন ,ফেরেশতা ,পশু ও জড়বস্তু কিছুরই অস্থিত্ব থাকবে না।

ইমাম জা ফর সাদেক (আ.)-এর কাছে প্রশ্ন করা হল ,ইমাম ব্যতীত পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকে থাকতে পারে কি ?

তিনি বললেন: ইমাম না থাকলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। 66

তিনি যে মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতার দিকে দিকনির্দেশ করার মাধ্যম এবং সকল কল্যাণ ও দয়া তার মাধ্যমেই সবার কাছে পৌঁছে তা একটি অতি স্পষ্ট ও অনিবার্য বিষয়। কেননা ,সৃষ্টির প্রথম থেকেই আল্লাহ তা আলা মানুষকে তার রাসূল এবং পরবর্তীতে তাদের উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে হেদায়াত করে আসছেন। তবে মাসুম ইমামগণের থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে বোঝা যায় যে ,পৃথিবীর বুকে পবিত্র ইমামগণের আসার উদ্দেশ্য হচ্চে বৃহৎ থেকে অতি ক্ষুদ্রতম জিনিসের কাছে আল্লাহর রহমত ও বরকত পৌঁছে দেওয়া। আরো স্পষ্টভাবে বলা যায় যে ,প্রত্যেকেই যে রহমত ও বরকত পেয়ে থাকে তা পবিত্র ইমামদের মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। তাদের অস্তিত্বও ইমামদের মাধ্যমেই এবং তাদের জীবনের সকল নিয়ামত ও কল্যাণও ইমামদের মাধ্যমে অর্জিত হয়।

যিয়ারতে জামে কাবীরা যা ইমাম পরিচিতির একটি বিশেষ পাঠ সেখানে বর্ণিত হয়েছে:

بکم فتح الله و بکم یختم و بکم یترل الغیث و بکم یمسک السماء ان تقع علی الارض الا باذنه

হে মহান ইমামগণ আল্লাহপাক আপনাদের মাধ্যমেই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনাদের মাধ্যমেই তার সমাপ্তি ঘটাবেন। আপনাদের পবিত্র অস্তিত্বের মাধ্যমেই বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং আপনাদের মাধ্যমেই আকাশ দন্ডায়মান রয়েছে। 67

সুতরাং ইমামের অস্তিত্বের প্রভাব তথা সুফলতা কেবলমাত্র তার আবির্ভাব ও প্রকাশ্যে থাকার মধ্যেই বিদ্যমান নয় বরং শুধুমাত্র তার অস্তিত্বই সকল অস্তিত্বের উৎস স্বরূপ। আল্লাহই এটা চেয়েছেন যে ,ইমামগণ সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ট অস্তিত্ব হিসাবে সকল অস্তিত্বের কাছে আল্লাহর রহমত ও বরকত পৌঁছে দিবেন আর এক্ষেত্রে তার প্রকাশ্য ও অদৃশ্য অবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। হ্যাঁ প্রত্যেকেই ইমামের অস্তিত্ব থেকে লাভবান হয়ে থাকে এবং ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর অন্তর্ধান তাতে ক োন বাধার সৃষ্টি করে না। আরো মজার ব্যপার হচ্ছে যে ,ইমাম মাহদী ( আ .)- এর কাছে অদৃশ্যকালীন সময়ে আমরা কিভাবে লাভবান হতে পারি সে সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন :

و اما وجه الانتفاع بی فی غیبتی فکا الانتفاع بالشمس اذا غیبتها عن الابصار السحاب

আমার অদৃশ্যের পর আমার থেকে তোমাদের উপকারিতা হচ্ছে সূর্যের ন্যায় যখন তা মেঘের আড়ালে থাকে। 68

ইমামকে সূর্যের সাথে তুলনা করা এবং অদৃশ্যকে মেঘের আড়ালে থাকা সূর্যের সাথে তুলনা করার মধ্যে অনেক গভীরতা রয়েছে যা নিম্নে তুলে ধরা হল:

সৌরজগতে সূর্যের ভূমিকা সবচেয়ে বেশী। তাকে কেন্দ্র করে অন্য সব গ্রহ অনবরত ঘুরছে। অনুরূপভাবে ইমাম মাহদী (আ.)ও সকল সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।

ببقائه بقیت الدنیا و بیمنه رزق الوری و بوجوده ثبتت الررض و السماء

তার কারণেই পৃথিবী অস্তিত্বমান এবং তার বরকতেই পৃথিবীর সকলেই রিযিক প্রাপ্ত হয় এবং তার বরকতেই পৃথিবী ও আকাশ প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। 69

সূর্য কখনোই কিরণ দেওয়া থেকে বিরত থাকে না এবং যে যতটুকু তার সাথে সম্পর্ক রাখবে সে ততটুকুই সূর্যের আলো থেকে উপকৃত হতে পারবে। অনুরূপভাবে ইমাম মাহদী (আ.)-এর মাধ্যমেই সকলেই আধ্যাত্মিক ও পার্থিব নিয়ামত গ্রহণ করে থাকে। তবে প্রত্যেকেই তাদের সম্পর্ক অনুযায়ী উপকৃত হবে।

এই সূর্য যদি মেঘের আড়ালেও না থাকে তাহলে অতি ঠান্ডা এবং বিদঘুটে অন্ধকারে পৃথিবী বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে উঠবে। অনুরূপভাবে ইমাম যদি দৃষ্টির অন্তরালেও না থাকতেন তাহলে নানাবিধ সমস্যায় মানুয়ের জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়ত।

শেখ মুফিদ (রহ.)-এর কাছে লেখা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর একটি চিঠিতে শিয়া মাযহাবকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন:

انا غیر مهملین لمراعاتکم و لا ناسین لذکرکم ذلک لترل بکم اللاواء و اصطلمکم الاعداء

আমরা কখনোই তোমাদেরকে তোমাদের উপর ছেড়ে দেই নি এবং কখনোই তোমাদেরকে ভুলে যাই নি। যদি তা না হত তাহলে তোমরা অনেক বালা- মুছিবতের সম্মুখিন হতে এবং শত্রুরা তোমাদেরকে ধ্বংস করে ফেলত । 70

সুতরাং ইমামের অস্তিত্বের কিরণ পৃথিবীর উপর পড়ে এবং সকলকে উপকৃত করে। এর মধ্যে মানুষ বিশেষ করে মুসলমানরা এবং আরো বিশেষ করে শিয়ারা বেশী উপকৃত হয়ে থাকে এখানে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হল:

ক) - আশার আলো

জীবনের শ্রেষ্ঠ মূলধনের একটি হচ্ছে আশা বা উদ্দেশ্য। আশাই হচ্ছে বেচেঁ থাকা ,স্বাচ্ছন্দ ও উন্নতির সোপান। আশা নিয়েই মানুষ অগ্রসর হয় এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পৃথিবীতে ইমামের অস্তিত্বও আমাদেরকে উজ্বল ও আনন্দঘন ভবিষ্যতের আশা যোগায়। শিয়া মাযহাব চৌদ্দ শত বছরের ইতিহাসে অনবরত বিভিন্ন ধরনের কঠিন বিপদের সম্মুখিন হয়েছে। উজ্বল ভবিষ্যৎ ঈমানদার ও দ্বীনদারদের জন্য এ আশা ও বিশ্বাসই তাদেরকে জীবনের গতিধারা চালিয়ে যেতে এবং কঠিন বিপদের নিকট পরাস্ত না হতে শক্তি যুগিয়েছে। যে ভবিষ্যৎ কাল্পনিক বা রূপকথা নয়। সে ভবিষ্যৎ নিকটবর্তী এবং আরও নিকটবর্তী হতে পারে। কেননা ,যিনি এই বিপ্লবের নেতা তিনি জীবিত এবং সদা প্রস্তুত। প্রস্তুত হতে হবে কেবল অমাদেরকে।

খ) - মাযহাবের প্রতিষ্ঠার জন্যে

প্রতিটি সমাজেরই তার কাঠামো রক্ষা করতে এবং নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে একজন জ্ঞানী নেতার প্রয়োজন। এভাবে সমাজ তার দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের মাধ্যমে সঠিক পথে পরিচালিত হবে। নেতার অস্তিত্ব সামাজের মানুষের জন্য এক বিরাট সহায়ক যার মাধ্যমে তারা সুসংঘটিতভাবে তাদের পূর্বার্জিত সাফল্যকে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করার সাহস পায়। জীবিত ও যোগ্য নেতা ,সমষ্টির মাঝে না থাকলেও সংবিধান ও সামগ্রিক কর্মপদ্ধতি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সামান্যতম অবহেলা করেন না। তাছাড়া বিভিন্ন উপায়ে তিনি ভ্রান্ত পথ সম্পর্কে সতর্ক করে দেন।

যামানার ইমাম (আ.) অদৃশ্যে থাকলেও তার অস্তিত্ব শিয়া মাযহাবকে রক্ষা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি শত্রুদের সকল ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত বিধায় বিভিন্নভাবে শিয়া মাযহাবের চিন্তার সীমানাকে রক্ষা করে থাকেন। প্রতারক শত্রুরা যখন বিভন্নভাবে ধর্মের মূলভিত্তি এবং মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে চেষ্টা করে (তখন ইমাম) আলেম ও নির্বাচিত ব্যক্তিদেরকে হেদয়াত ও নির্দেশের মাধ্যমে শত্রুদের প্রবেশ পথ রুদ্ধ করে দেন।

বাহরাইনের শিয়াদের উপর ইমামের দয়া সম্পর্কে আল্লামা মাজলিসী (রহ.) বলেছেন:

প্রাচীনকালে বাহরাইনে একজন নাসেবী (যারা হযরত আলী (আ.)-এর উপর লানত পাঠ করত) হুকুমত করত। তার এক উজির ছিল ,যে হযরত আলী (আ.)-এর সাথে শত্রুতার মাত্রা ছাড়িয়ে ফেলেছিল। একদিন সে বাদশার কাছে একটি কাচাঁ ডালিম নিয়ে গেল যার গায়ে লেখা ছিল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুলাহ ,আবুবকর ,ওমর ,ওছমান এবং আলী - খুলাফায়ে রাসূলুল্লাহ। বাদশা এটা দেখে আশ্চার্যান্বিত হয়ে গেল এবং উজিরকে বলল: এটা শিয়া মাযহাবকে বাতিল প্রমাণ করার জন্য একটি স্পষ্ট ও বলিষ্ট দলিল। তুমি বাহরাইনের শিয়াদের সম্পর্কে কি ধারণা করছ ?উজির উত্তর দিল: আমার মনে হয় তাদের সকলকে ডেকে এটা দেখানো উচিৎ। যদি তারা মেনে নেয় তাহলে তারা তাদের মাযহাবকে পরিত্যাগ করবে । আর যাদি না মানে তাহলে আমরা তাদেরকে তিনিটি পথের যে কোন একটি বেছে নিতে বলব। তারা এটার একটা যুক্তি সংগত উত্তর দিবে ,নইলে জিযিয়া কর দিবে ,অথবা তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করা হবে এবং সন্তান ও নারীদেরকে গনিমত হিসাবে বন্দি করে আনা হবে।

বাদশা তার সিদ্ধান্তকে মেনে নিল এবং শিয়া মাযহাবের পণ্ডিতদেরকে ডেকে পাঠাল। অতঃপর ডালিমটা তাদেরকে দেখিয়ে বলল: যদি এটার কোন যুক্তি সংগত দলিল না দেখাতে পারেন তাহলে আপনাদেরকে হত্যা করে আপনাদের সন্তান ও নারীদেরকে গনিমত হিসাবে বন্দি করে আনা হবে। অথবা জিযিয়া কর দিতে হবে। শিয়া মাযহাবের পণ্ডিতরা তিন দিন সময় চাইলেন। তারা একত্রে বসে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে ,বাহরাইনে যত বড় আলেম ও পরহেজগার শিয়া আছে তাদের মধ্য থেকে দশ জনকে বাছাই করে তার ভিতর থেকে তিন জনকে বেছে নিয়ে এক জনকে বললেন: আপনি আজ রাত্রে মরুভুমিতে গিয়ে ইমাম যামানার কাছে সাহায্য চাইবেন এবং তার কাছ থেকে মুক্তির পথ জেনে নিবেন। কেননা তিনি হচ্ছেন আমাদের ইমাম এবং অভিভাবক।

ওই ব্যক্তি গেলেন এবং সাহায্য চাইলেন কিন্তু ইমামের সাক্ষাৎ পেলেন না । দ্বিতীয় রাতে আরেক জন গেল সেও ইমামের সাক্ষাৎ পেল না। তৃতীয় এবং শেষ রাতে তৃতীয় ব্যক্তি যার নাম ছিল মুহাম্মদ বিন ঈসা তিনি গেলেন। তিনি অনেক কেঁদে-কেটে ইমামের কাছে সাহায্য চাইলেন। শেষ রাত্রের দিকে সে শূনতে পেল কেউ তাকে বলছেন: হে মুহাম্মদ বিন ঈসা এভাবে মরুভুমিতে এসে কাঁদছ কেন ?মুহাম্মদ বিন ঈসা বলল: আমাকে আমার অবস্থায় থাকতে দিন। তিনি বললেন: হে মুহাম্মদ বিন ঈসা আমিই তোমাদের সাহেবায্ যামান। তোমার মনের কথা বল! মুহাম্মদ বিন ঈসা বলল: আপনি যদি ইমাম যামানা হয়ে থাকেন তাহলে তো আপনি সবই জানেন ,কাজেই আমার কিছুই বলার দরকার নেই । ইমাম বললেন: তুমি ঠিকই বলেছো এবং ওই সমস্যার সমাধান নিতে এখানে এসেছ। সে বলল: হ্যাঁ আপনি আমাদের ইমাম আপনি আমাদেরকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করুন। ইমাম বললেন: হে মুহাম্মদ বিন ঈসা! ওই উজিরের বাড়িতে ডালিম গাছ আছে। যখন গাছে নতুন ডালিম ধরা শুরু করে সে মাটি দিয়ে একটি ডালিমের মত ছাচ তৈরী করে অর্ধেক করে তার মধ্যে ওই লেখা গুলো লেখে। অতঃপর ডালিম ছোট থাকা অবস্থায় সেটাকে ছাচের মধ্যে ঢুকিয়ে বেধে রাখে। যেহেতু ডালিমটা ঐ ছাচের মধ্যে বড় হয় ঐ লেখা গুলো ডালিমের উপর ছাপ পড়ে যায়। কালকে বাদশার কাছে গিয়ে বলবে আমি জবাবটা উজিরের বাড়িতে গিয়ে দিব। উজিরের বাড়িতে গিয়ে তার আগেই অমুক কক্ষে যেয়ে একটি সাদা ব্যগ দেখতে পাবে যার মধ্যে একটি মাটির ছাচ আছে। সেটাকে বাদশাকে দেখাবে। আর একটি দলিল হচ্ছে যে ,বাদশাকে বলবে: আমাদের আর একটি মো জেযা হচ্ছে ডালিমটা ভেঙ্গে দেখুন তার মধ্যে ছাই ব্যতীত আর কিছুই পাবে না!

মুহাম্মদ বিন ঈসা তা শূনে খুব খুশি হল এবং শিয়াদের কাছে ফিরে আসল। পরের দিন তারা বাদশার কাছে গেল এবং ইমাম যামান যা বলেছিলেন তা সত্য প্রমাণিত হল।

বাদশা এই মো জেযা দেখে শিয়া হয়ে গেল এবং উজিরকে মৃত্যুদণ্ড দিল । 71

গ) - আত্মশুদ্ধি

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে:

) وَقُلِ اعْمَلُوا فَسَيَرَى اللَّهُ عَمَلَكُمْ وَرَسُولُهُ (

এবং ( হে রাসূল ) বলুন , তোমরা কর্ম করতে থাক ( কিন্তু জেনে রেখ ) আল্লাহ তো তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করেন এবং তার রাসূল ও মু মিনগণও করেন। 72

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে কোরআনের এ আয়াতে মু মিন বলতে পবিত্র ইমামগণকেই বুঝানো হয়েছে। 73 সুতরাং মানুষের আমলনামা ইমাম যামানার কাছে পৌঁছে এবং তিনি পর্দার আড়াল থেকে আমাদের কর্মকাণ্ড দেখতে পান । এই সত্যের প্রশিক্ষণগত বড় প্রভাব রয়েছে এবং শিয়া মাযহাবকে নিজেদের কর্মসমূহকে পরিশুদ্ধ করতে আশা যোগায় এবং আল্লাহর হুজ্জাত ভালদেরকে ইমামের মোকাবেলায় গোনাহ থেকে রক্ষা করে। তবে মানুষ যত বেশী ওই পবিত্র ইমামের দিকে লক্ষ্য রাখবে তার অন্তরও তত বেশী পবিত্র হবে এবং এই পবিত্রতা তার কথা ও কর্মেও প্রকাশ পাবে।

ঘ) - জ্ঞান ও চিন্তার আশ্রয়স্থল

পবিত্র ইমামগণ (আ.) সমাজের (মানুষের) প্রকৃত শিক্ষক ও প্রশিক্ষণদাতা এবং জনগণ সর্বদা তাদের দূর্লভ শিক্ষা থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। অদৃশ্যকালীন সময়ে যদিও সরাসরি ইমামকে কাছে পাওয়া যায় না এবং সবধরনের সুবিধা তার কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনা কিন্তু ওই ঐশী জ্ঞান ভাণ্ডার বিভিন্নভাবে শিয়াদের চিন্তাগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার সমাধান করে থাকেন । স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকালীন সময়ে জনগণ এবং আলেমদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ইমাম চিঠির মাধ্যমে (যা তৌকিয়াত নামে বিশেষ পরিচিত) দিতেন। 74

ইমাম যামানা (আ.) ইসহাক ইবনে ইয়াকুবের চিঠির প্রশ্নের উত্তরে লিখেছিলেন:

আল্লাহ তোমাকে হেদায়াত করুন এবং সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। কিন্তু তুমি আমার চাচার বংশের এবং নিজেদের বংশের কিছু লোকের কথা লিখেছ যারা আমাদের ইমামতকে অস্বীকার করে। জেনে রাখ যে ,আল্লাহর সাথে কারো আত্মিয়তার সম্পর্ক নেই এবং যারা আমাদেরকে অস্বীকার করে তারা আমাদের কিছুই নয়। তাদের শেষ পরিণতি হযরত নুহের ছেলের ন্যায়... । আর তোমার খুমস সম্পর্কে যা জানতে চেয়েছ যতক্ষণ না তা পবিত্র (হালাল) করছ গ্রহণ করব না ।

কিন্তু যে সকল জিনিস আমাদের জন্য পাঠিয়েছ যদি পাক ও হালাল হয় তাহলে তা গ্রহণ করব। যে আমাদের জিনিসকে হালাল মনে করে খাবে সে আগুন খেয়েছে এবং আমার থেকে উপকৃত হওয়া মেঘের আড়ালে সূর্যের মত। আমি পৃথিবীবাসীর মুক্তির উপায় যেভাবে তারকা রাজি আসমানবাসীদের মুক্তির মাধ্যম। যে সকল জিনিসে তোমাদের কোন লাভ নেই তা সম্পর্কে জানতে চেও না এবং তোমাদের কাছে যা চাওয়া হয় নি তার জন্য অযথা কষ্ট করো না। আমার আবির্ভাব তরান্বিত হওয়ার জন্য বেশী বেশী দোয়া করবে। কেননা ,তার মধ্যে তোমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। হে ইসহাক বিন ইয়াকুব তোমার প্রতি এবং যারা হেদায়াতের অনুসারী তাদের প্রতি সালাম। 75

গাইবাতে সোগরার পরও শিয়া মাযহাবের আলেমরা নিজেদের নানাবিধ সমস্যাকে ইমামের কাছে বলেছেন এবং তার সমাধানও পেয়েছেন। মোকাদ্দাস আরদেবেলীর এক ছাত্র মীর আল্লাম বলেন:

মধ্য রাত্রে নাজাফে আশরাফে ইমাম আলী (আ.)-এর মাযারে ছিলাম হঠাৎ দেখলাম এক জন লোক রওজা শরীফের দিকে যাচ্ছে ,তার কাছে গিয়ে দেখি তিনি হচ্ছেন শেইখ এবং আমার ওস্তাদ মোল্লা আহমাদ মোকাদ্দাস আরদেবেলী। নিজেকে লুকিয়ে রাখলাম।

তারা রওজার নিকটবর্তী হলেন কিন্তু দরজা বন্ধ ছিল। হঠাৎ দেখলাম দরজা খুলে গেল এবং তারা ঢুকে পড়লেন! কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসলেন এবং কুফার দিকে রওনা হলেন।

আমিও তার পিছন পিছন রওনা হলাম যেন আমাকে দেখতে না পান। কুফার মসজিদে প্রবেশ করলেন এবং মেহরাবের কাছে গেলেন যেখানে আমিরুল মু মিনিন আলী (আ.)-কে তলোয়ারের আঘাত হেনেছিল কিছুক্ষণ সেখানে থাকলেন। অতঃপর মসজিদ থেকে বেরিয়ে আবার নাজাফের দিকে রওনা হলেন। আমিও তার পিছু পিছু ছিলাম তিনি মসজিদে হান্নানাতে পৌঁছালেন। হঠাৎ আমার কাশি হল তিনি শব্দ শুনে তাকিয়ে আমাকে চিনতে পারলেন। বললেন: তুমি মীর আল্লাম ?বললাম: হ্যাঁ! বললেন: এখানে কি করছ ?বললাম: আপনি যখন থেকে ইমাম আলী (আ.)-এর রওজায় প্রবেশ করেছেন তারপর থেকে আপনার সাথেই আছি। এই কবরের শপথ দিয়ে বলছি আজকে যা দেখলাম তার রহস্য কি তা আমাকে বলুন!

বললেন: শর্ত হচ্ছে যে ,আমি জীবিত থাকা পর্যন্ত তা কাউকে বলতে পারবে না! তাকে কথা দিলাম তখন বললেন: যখন আমি কোন সমস্যায় পড়ি তখন তার সমাধানের জন্য আমিরুল মু মিনিনের কাছে আসি। আজও একটি সমস্যায় পড়েছিলাম এবং তার সমাধানের জন্য এসেছিলাম।

আসার পর দরজা বন্ধ দেখলাম এবং তুমিতো দেখলেই যে ,তা খুলে গেল। ভিতরে গিয়ে ক্রন্দন করলাম যে ,হে আল্লাহ আমার সমস্যার সমাধান করে দিন হঠাৎ পবিত্র রওজা থেকে আওয়াজ আসল এবং বললেন: কুফার মসজিদে গিয়ে কায়েমের কাছে প্রশ্ন কর। কেননা ,সে হচ্ছে তোমার যামানার ইমাম। অতঃপর কুফার মসজিদে গিয়ে ইমাম মাহ্দীর কাছে প্রশ্ন করলাম এবং তার উত্তর নিয়ে এখন বাড়ি যাচ্ছি। 76

ঙ) - আত্মিক ও অভ্যান্তরীণ হেদায়াত

ইমাম তথা আল্লাহর হুজ্জাতের দায়িত্ব হল জনগণের নেতৃত্ব দান ও হেদায়াত করা এবং যারা হেদায়াতের নূর গ্রহণ করতে প্রস্তুত তাদের পথপ্রদর্শন করা। এই ঐশী দায়িত্ব পালন করার জন্য কখনো তিনি সরাসরি জনগণের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং নিজ গঠণমূলক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে তাদেরকে সৌভাগ্য ও কল্যাণের পথ নির্দেশ করেন। কখনো আবার ইমামতের শক্তি এবং অদৃশ্য ঐশী ক্ষমতার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করেন। বিশেষ অনুগ্রহের মাধ্যমে তাদের অন্তরসমূহকে ভালর দিকে আকৃষ্ট করেন এবং উন্নতি ও পরিপূর্ণতার পথকে সুগম করেন। এক্ষেত্রে ইমামের বাহ্যিক উপস্থিতি ও সরাসরি যোগাযোগের কোন প্রয়োজন নেই বরং এ পদ্ধতিতে হেদায়াত কেবলমাত্র অভ্যান্তরীণ ও আত্মিকভাবে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ইমামের করণীয় সম্পর্কে হযরত আলী (আ.) বলেন:

হে আল্লাহ শুধুমাত্র আপনার সৃষ্টিকে আপনার দিকে হেদায়াত করার জন্যই আপনি আপনার হুজ্জাতকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন ... কখনো তার অস্তিত্ব বাহ্যিকভাবে মানুষের দৃষ্টির অন্তরালে থাকলেও নিঃসন্দেহে তার শিক্ষা ও আদর্শ মু মিনদের মাঝে বিদ্যমান থাকে এবং তারা তার ভিত্তিতেই আমল করে থাকে 77

অদৃশ্য ইমাম এভাবেই বিশ্বজনীন বিপ্লবের জন্য সৈন্য তৈরী করে থাকেন। যাদের সেই যোগ্যতা আছে তারাই ইমামের বিশেষ শিক্ষায় প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকে এবং ইমামের সাথে থেকে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এটা অদৃশ্য ইমামের একটি দায়িত্ব এবং তা তার অস্তিত্বের বরকতেই সংঘটিত হয়ে থাকে।

চ) - বালা মুছিবত হতে মুক্তি

নিঃসন্দেহে নিরাপত্তা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে প্রধান মূলধন। বিভিন্ন ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও দুর্ঘটনার কারণে জীবের অস্তিত্ব বিলিন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃত্তিমভাবে এ সকল দুর্ঘটনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজতর। আমাদের ইমামগণের (আ.) হাদীসে ইমাম তথা আল্লাহর হুজ্জাতের অস্তিত্বকে সৃষ্টিজগতের জন্য নিরাপত্তার মাধ্যম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইমাম মাহ্দী (আ.) নিজেই বলেছেন:

و انی لامان لاهل الارض

আমি পৃথিবীর অধিবাসিদের জন্য ( বালা মুছিবত হতে ) নিরাপত্তার কারণ 78

ইমামের কারণেই মানুষ তাদের বিভিন্ন গোনাহের ফলে আল্লাহর কঠিন আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে থাকে এবং পৃথিবীও ধ্বংস হওয়া থকে রক্ষা পায়। এ সম্পর্কে কোরআন পাকে বর্ণিত হয়েছে:

) وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ (

(হে রাসূল) আল্লাহ এমন নহেন যে আপনি তাদের (মুসলমানদের) মধ্যে থাকবেন অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন এবং আল্লাহ এমনও নহেন যে ,তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দিবেন। 79

ইমাম মাহ্দী (আ.) যেহেতু আল্লাহর রহমত ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ সুতরাং তিনি তার বিশেষ মহানুভবতার মাধ্যমে কঠিন আযাব ও বিপদকে বিশেষকরে প্রতিটি শিয়াদের থেকে দূর করবেন। যদিও অনেক ক্ষেত্রে শিয়ারা তার দয়া ও রহমতের প্রতি সচেতন না হয়ে থাকে। ইমাম মাহদী (আ.) নিজেকে এভাবে পরিচয় দিচ্ছেন:

انا خاتم الاوصیاء و بی یدفع الله عز و جل البلاء من اهلی و شیعتی

আমি রাসূল ( সা .)- এর শেষ প্রতিনিধি এবং আল্লাহ তা আলা আমার মাধ্যমে আমাদের শিয়াদের সকল বলা - মুছিবত দূর করবেন 80

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রারম্ভে এবং 8 বছর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সময়ে বারংবার এ দেশ ও জাতির প্রতি ইমামের দয়া ও মহানুভবতা পরিলক্ষিত হয়েছে। আর এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্র ,মুসলিম জাতি ও মাহ্দীবাদ দুশমনদের কালো থাবা থেকে মুক্তি পেয়েছে। ফার্সী 1357 সালের তীর মাসের 21 তারিখে ইমাম খোমিনী (রহ.)-এর নির্দেশে রাজতন্ত্রের পতন ,1359 সালে তাবাস মরুমূমিতে আমেরিকার সামরিক হেলিকপ্টারের পতন ,8 বছরের যুদ্ধে দুশমনদের অপারগতা ইত্যাদি তার উজ্জল দৃষ্টান্ত।

ছ) - রহমতের বারিধারা

প্রতিশ্রুত ইমাম মাহ্দী (আ.) ,মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র এবং শিয়াদের আত্মার আত্মিয় সর্বদা মানুষের আবস্থার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। ওই দয়ালু সূর্যের অদৃশ্যতা জনগণকে তার সুখকর প্রতিবিম্ব থেকে উপকৃত হতে কখনোই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। ওই দ্বীপ্তিময় চন্দ্র সর্বদা শিয়াদের বন্ধু ও সুখ দুঃখের ভাগিদার এবং সাহায্য প্রার্থীদের সাহায্যকারী। কখনো অসুস্থদের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে রোগের উপষম ঘটিয়েছেন। কখনো আবার পথ হারা পথিককে পথ দেখিয়েছেন। অসহায়ের সহায়তা করেছেন। কখনো আবার প্রতিক্ষাকারীদের মনে আশার সঞ্চার করেছেন। তিনি যেহেতু আল্লাহর রহমতের বারিধারা তাই মরুভূমির ন্যায় শুষ্ক হৃদয়ে বর্ষিত হন। তিনি শিয়াদের জন্য দোয়া করে তাদের জন্য সবুজ শ্যামল গনিমত উপহার দেন । তিনি আল্লাহর দরবারে প্রার্থনার হাত তুলে আমাদের জন্য মোনাজাত করেন এভাবে :

 یا نور النور یا مدبر الامور یا باعث من فی القبور صل علی محمد و آل محمد و اجعل لی ولشیعتی من الضیق فرجا و من الهم مخرجا و اوسع لنا المنهج و اطلق لنا من عندک ما یفرج و افعل بنا ما انت اهله یا کریم

হে জ্যোতি দানকারী , হে সকল কর্মের নিতি নির্ধারণকারী , হে মৃতদের জীবন দানকারী , রাসূল ( সা .) তার আহলে বাইতের প্রতি দরুদ পাঠ করুন এবং আমার ও আমার শিয়াদের সমস্যার সমাধান করুন। সকল দুঃখ কষ্ট হতে পরিত্রাণ দান করুন। হেদায়াতের পথকে আমাদের জন্য প্রশস্ত করুন। যে পথে আমাদের মুক্তি , আমাদেরকে সেই পথ প্রদর্শন করুন। হে করুনাময় আমাদের প্রতি আপনার করুনা বর্ষণ করুন 81

যা বর্ণিত হয়েছে তা হচ্ছে ইমাম অদৃশ্যে থাকলেও তার সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব এবং যারা সে যোগ্যতা রাখেন তারা তার সাহচার্য পাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।


চতুর্থ ভাগ :কাঙ্ক্ষিতের সাক্ষাৎ

অদৃশ্যকালীন সময়ে শিয়াদের সবচেয়ে বড় কষ্ট হল যে ,তারা তাদের মাওলার থেকে দুরে এবং তার নজির বিহীন নূরানী চেহারাকে দেখতে পায় না। অদৃশ্যের পর থেকে আবির্ভাবের জন্য প্রতিক্ষাকারীরা সর্বদা তাকে দেখার আশায় জ্বলছে এবং তার দুরত্বের কারণে আর্তনাদ করছে। তবে স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকালীন সময়ে শিয়ারা ইমামের নায়েবদের (প্রতিনিধিদের) মাধ্যমে ইমামের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারত এবং কেউ কেউ আবার সরাসরি ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করতেন। এ সম্পর্কে অনেক হাদীসও রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধানের (যাকে পরিপূর্ণ অদৃশ্য বলা যেতে পারে) পর সরাসরি যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি বিশেষ নায়েবদের মাধ্যমেও ইমামের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।

তারপরও অধিকাংশ আলেমগণ বিশ্বাস করেন যে ,এ সময়েও তার সাথে সাক্ষাৎ করা সম্ভব এবং তা বহুবার ঘটেছে। আল্লামা বাহরুল উলুম ,মোকাদ্দাস আরদেবেলী ,সাইয়্যেদ ইবনে তাউস এবং আরো অনেক বড় আলেমগণ তার সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। 82

ইমাম মাহ্দীর সাথে সাক্ষাতের আলোচনায় নিম্নলিখিত বিষয়ের উপর লক্ষ্য করুন:

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে: কখনো অসহায় ও অতি জরুরী অবস্থায় ইমামের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে থাকে ,কখনো আবার সাভাবিক অবস্থাতেই এ সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে কখনো মানুষ কোন সমস্যা বা বিপদে পড়ে অসহায় অনুভব করলে ইমাম মাহ্দী (আ.) তাদেরকে সাহায্য করেন। অনেকেই বিভিন্ন স্থানে যেমন হজ্বে যাওয়ার পথে পথ ভুলে গেলে ইমাম মাহদী (আ.) অথবা তার কোন প্রতিনিধি তাদেরকে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। অধিকাংশ মোলাকাতই এ ধরণের। কিন্তু কখনো আবার স্বাভাবিক অবস্থাতেই মোলাকাতকারী তার আধ্যাত্মিক মর্যাদার মাধ্যমে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করে থাকেন।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমামের সাথে মোলাকাতের দাবি সবার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে: দীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকালে বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যারা ইমামের সাথে সাক্ষাতের দাবি করে থাকে তারা কেবল নিজেদের চারপাশে লোক জড়ো করা এবং রুজি ও খ্যতি অর্জন করার জন্যেই একাজ করে থাকে। এভাবে তারা অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে এবং তাদের আক্বীদা ও আমল নষ্ট করেছে। তারা বিভিন্ন দোয়া এবং বিশেষ কিছু আমলের মাধ্যমে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব বলে থাকে কিন্তু তার কোন ভিত্তি নেই। তারা দাবি করে এসব করলে অতি সহজেই ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করা সম্ভব। যেখানে আল্লাহর নির্দেশে ইমাম দীর্ঘ মেয়াদী অদৃশ্যে রয়েছেন এবং অতি বিশেষ এবং খুবই মুষ্টিমেয় মহান আলেমরা ব্যতীত কেউই তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারবে না।

তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে: তখনই মোলাকাত সম্ভব যখন ইমাম মাহ্দী (আ.) নিজেই তা প্রয়োজন মনে করবেন। সুতরাং যখন কোন সাক্ষাৎ পিপাসু অতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করতে না পারে তখন তাকে নিরাশ হলে চলবে না এবং যেন মনে না করে যে ,ইমাম তাকে ভালবাসে না বা তার প্রতি ইমামের কোন দৃষ্টি নেই। অনুরূপভাবে যিনি তার সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে সে যেন মনে না করে যে ,ইমাম তাকে সবার চেয়ে বেশী ভালবাসে এবং সে তাকওয়া ও ফজিলতের শীর্ষে অবস্থান করছে।

মোদ্দা কথা হচ্ছে যদিও ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করা ও কথা বলা অতি সৌভাগ্যের ব্যাপার কিন্তু আমাদের ইমামগণ বিশেষ করে ইমাম মাহ্দী (আ.) শিয়াদেরকে বলেন নি যে তোমরা আমাকে দেখার জন্য চিল্লায় বস অথবা জঙ্গলে বসবাস কর। বরং তারা বলেছেন যে ,তার আবির্ভাবের জন্য দোয়া কর এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তার সন্তুষ্টির জন্য চেষ্টা কর। তার মহান উদ্দেশ্যের পথে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। এভাবেই তার আবির্ভাবের পথ সুগম হবে এবং সারা বিশ্ব তার থেকে সরাসরি উপকৃত হবে।

ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই বলেছেন:

اکثر الدعاء بتعجیل الفرج فان ذالک فرجکم

আমার আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য বেশী বেশী দোয়া কর কেননা তার মধ্যেই তোমাদের সৌভাগ্য নিহীত রয়েছে 83

এখানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে মরহুম হাজী আলী বাগদাদীর মোলাকাতের সুন্দর ঘটনাটি বর্ণনা করা উপযুক্ত মনে করছি।

ওই যোগ্য ও পরহেজগার ব্যক্তি সর্বদা বাগদাদ থেকে কাযেমাইনে যেতেন এবং দু মহান ইমাম হযরত ইমাম জাওয়াদ (আ.) এবং হযরত ইমাম কাযেম (আ.)-এর যিয়ারত করতেন। তিনি বলেন: আমার উপর কিছু খুমস ও যাকাত ওয়াজিব ছিল। এ কারণেই নাজাফে আশরাফ গেলাম এবং তা থেকে 20 তুমান মহান আলেম ও ফকীহ শেইখ আনসারীকে দিলাম এবং 20 তুমান আয়াতুল্লাহ শেইখ মুহাম্মদ হাসান কাযেমী (রহ.)-কে দিলাম। 20 তুমান আয়াতুল্লাহ শেইখ মুহাম্মদ হাসান শুরুকী (রহ.)-কে দিলাম এবং সিদ্ধান্ত নিলাম বাকি দেনাকে ফেরার পথে হযরত আয়াতুল্লাহ আলে ইয়সীনকে দিব। পঞ্চম দিনে বাগদাদে ফিরে এসে প্রথমে দু মাহন ইমামকে যিয়ারত করার জন্য কাযেমাইনে গেলাম। অতঃপর আয়াতুল্লাহ আলে ইয়াসীনের বাড়ী গেলাম এবং আমার শরিয়তী দেনার বাকি অংশ তাকে দিলাম। তার কাছে অনুমতি চাইলাম যে ,বাকিটা ক্রমে ক্রমে তাকে অথবা অন্যদেরকে দিব। তিনি আমাকে তার কাছে থাকতে বললেন কিন্তু জরুরী কাজ থাকাতে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাগদাদের দিকে রওনা হলাম। তিন ভাগের এক ভাগ পথ জাওয়ার পর একজন মহান সাইয়্যেদের সাথে সাক্ষাৎ হল। তার মাথায় সবুজ পাগড়ী এবং চোয়ালে একটি সুন্দর কালো তিল ছিল। তিনি যিয়ারতের উদ্দেশ্যে কাযেমাইনে যাচ্ছিলেন। তিনি আমার নিকটে এসে আমাকে সালাম এবং হাতে হাত দিলেন ,আমাকে টেনে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানিয়ে বললেন ,কোথায় যাচ্ছ ?

আমি বললাম: যিয়ারত করে এখন বাগদাদে ফিরে যাচ্ছি। তিনি বললেন: আজ বৃহস্পতিবারের দিবগত রাত কাযেমাইনে ফিরে যাও এবং এ রাতটা সেখানেই কাটাও। বললাম: সম্ভব হবে না! তিনি বললেন: পারবে ,যাও ফিরে যাও তাহলে সাক্ষি দিব যে তুমি আলী (আ.)-এর প্রতি এবং আমাদের প্রতি ভালবাসা পোষণকারী এবং শেইখও সাক্ষি দিবে। আল্লাহ তা আলা বলছেন:

و استشهد شهیدین  দু জনকে সাক্ষি রাখ। 84

আলী বাগদাদী আরো বললেন: আমি ইতিপূর্বে আয়াতুল্লাহ আলে ইয়াসিনকে বলেছিলাম যে ,আমার জন্য যেন তিনি একটি সনদ লিখেন এবং তাতে যেন সাক্ষ্য দেন যে ,আমি আহলেবাইতের প্রতি ভালবাসা পোষণকারী শিয়া এবং আমি সে সনদটাকে আমার কাফনের মধ্যে রাখব। আমি সাইয়্যেদকে প্রশ্ন করলাম: আপনি কোথা থেকে আমাকে চেনেন এবং কিভাবে এ সাক্ষ্য দিবেন ?তিনি বললেন: যদি কেউ কারো আধিকার সম্পূর্ণরূপে দিয়ে দেয় তাহলে তাকে চেনা কি কঠিন ?বললাম: কোন অধিকার ?তিনি বললেন: যে অধিকার তুমি আমার উকিলকে দিয়েছ। বললাম: আপনার উকিল কে ?তিনি বললেন: শেইখ মুহাম্মদ হাসান। আমি বললাম: তিনি কি আপনাপর উকিল ?বললেন: হ্যাঁ।

তার কথা শুনে আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম। মনে হচ্ছিল তিনি আমার পূর্ব পরিচিত কেউ অথচ আমি তাকে ভুলে গেছি। তিনি প্রথম দেখাতেই আমাকে আমার নাম ধরে ডেকেছিলেন। মনে করেছিলাম যে ,তিনি হয়ত রাসূল (সা.)-এর সন্তান হিসাবে ওই খুমসের কিছু অংশ আমার কাছে চাচ্ছেন। সুতরাং বললাম: আপনাদের অধিকারের কিছু পরিমাণ আমার কাছে আছে ,তবে তা খরচ করার অনুমতি নিয়ে নিয়েছি। তিনি মুচকি হেসে বললেন: হ্যা ,আমাদের কিছু হককে নাজাফে আমাদের উকিলের কাছে দিয়েছ। বললাম: আল্লাহ আমার এ কাজ গ্রহণ করবেন ?তিনি বললেন: হ্যাঁ। আমার মনে প্রশ্নের উদ্রেক হল যে ,তিনি কিভাবে আমাদের সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেমকে তার উকিল হিসাব করছেন। কিন্তু আবার তা ভুলে গেলাম।

আমি বললাম: হে আমার মাওলা এটাকি ঠিক যে ,যদি কেউ বৃহস্পতিবারের দিবগত রাতে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে যিয়ারত করে তাহলে সে আল্লাহর আযাব থেকে মুক্তি পাবে ?তিনি বললেন: হ্যাঁ! এবং তখনই তার চোখ অশ্রুতে ভরে গেল ও তিনি কেঁদে ফেললেন। কিছুক্ষণ পর দেখলাম যে ,কোন প্রকার পথ না হেটেই কাযেমাইনে পৌঁছে গেছি। প্রবেশ দারে দাড়ালাম। তিনি বললেন: যিয়ারত পড়। আমি বললাম: হে আমার মাওলা আমি ভাল পড়তে পারি না। তিনি বললেন: তুমি কি চাও যে ,আমি পড়ব আর তুমি আমার সাথে যিয়ারত করবে ?বললাম: হ্যাঁ।

তিনি শুরু করলেন এবং রাসূল (সা.) ও ইমামদের প্রতি সালাম করলেন এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.) পর্যন্ত পড়ার পর বললেন: তুমি তোমার যামানার ইমামকে চেন ?বললাম: কেন চিনব না ?বললেন: তাহলে তার প্রতি সালাম কর। বললাম ,

السلام علیک یا حجة الله یا صاحب الزمان یا ابن الحسن

তিনি একটু মুচকি হেসে বললেন:

وعلیک السلام و رحمة الله و برکاته

অতঃপর মাযারে প্রবেশ করে যারিহতে চুমু খেলাম। তিনি বললেন: যিয়ারত পড়। বললাম: হে আমার মাওলা আমি ভাল পড়তে পারি না। তিনি বললেন: তুমি কি চাও যে ,আমি পড়ব আর তুমি আমার সাথে যিয়ারত করবে ?বললাম: হ্যাঁ। তিনি যিয়ারতে আমিন আল্লাহ পড়ে বললেন: আমার পিতামহ ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত করতে চাও ?বললাম: হ্যাঁ আজকে বৃহস্পতিবারের দিবগত রাত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত করার রাত। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর যিয়ারত পাঠ করলেন। মাগরিবের নামাজের সময় হলে তিনি বললেন , চল জামাতের সাথে নামাজ পড়ি। নামাজ পড়ার পর দেখলাম তিনি নেই এবং অনেক খোঁজা খুঁজি করেও তাকে আর পেলাম না।

তখন বুঝলাম যে ,তিনি আমাকে নাম ধরে ডেকেছিলেন ,অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে কাযেমাইনে ফিরে গেলাম। তিনি বড় বড় আলেম ও ফকীহদেরকে নিজের উকিল বললেন। শেষে আবার হঠাৎ করে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন । অতঃএব ,তিনিই ইমাম মাহদী (আ.) ছিলেন এবং হায় আফসোস যে ,আমি তাকে অনেক দেরীতে চিনতে পেরেছিলাম। 85


পঞ্চম ভাগ :দীর্ঘায়ূ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জীবনী সংক্রান্ত অপর একটি আলোচনা হচ্ছে তার দীর্ঘায়ূ নিয়ে। কারো কারো নিকট এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে কিভাবে সম্ভব যে ,একজন মানুষ এত দীর্ঘ আয়ূর অধিকারী হতে পারে ?86

এই প্রশ্নের উৎপত্তি এবং তা উপস্থাপনের কারণ হল যে ,বর্তমান বিশ্বে মানুষের গড় আয়ূ 70 থেকে 100 বছর। 87 অনেকে এ ধরণের গড় আয়ূ দেখার পর কোন মতেই বিশ্বাস করতে পারেন না যে. একজন মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বেঁচে থাকতে পারেন । কেননা ,বুদ্ধিবৃত্তি ও বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দীর্ঘায়ূ খুবই সাধারণ ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ পরীক্ষা করার পর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে ,মানুষের পক্ষে দীর্ঘকাল ধরে জীবিত থাকা অসম্ভব নয়। এমনকি মানুষ বৃদ্ধ ও ক্ষীনকায়ও হবে না।

এ ব্যাপারে বার্নার্ড শ বলেছেন:

জীববিদ্যার সকল বৈজ্ঞানীকদের মতে মানুষের আয়ূ এমন একটি জিনিস যার কোন সীমা নির্নয় করা সম্ভব নয়। এমনকি দীর্ঘকাল জীবন- যাপনেরও কোন সীমানা নেই। 88

এ ব্যাপারে প্রফেসর আতিনগার বলেছেন:

আমার দৃষ্টিতে প্রযুক্তি উন্নয়নে আমরা যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি তাতে একবিংশ শতাব্দীর মানুষ সহস্র বছর বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে। 89

বৈজ্ঞানীকদের বৃদ্ধ না হওয়া এবং দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার জন্য যে প্রচেষ্টা তা প্রমাণ করে যে বিষয়টি সম্ভবপর এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে অনেকেই উপযুক্ত আবহাওয়া ,উপযুক্ত খাদ্য ,নিয়মিত শরীর চর্চা ও সুচিন্তা এবং আরও বিভিন্ন কারণে 150 বছর কখনো আবার আরও বেশী দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন। মজার ব্যপার হল পৃথিবীর ইতিহাসে পূর্বেও মানুষ দীর্ঘকাল বেচে থেকেছে এবং ঐশী গ্রন্থ এবং ইতিহাস গ্রন্থেও অনেক মানুষের নাম ,ঠিকানা ও জীবন বিত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে ,যাদের আয়ূ বর্তমান কালের মানুষের চেয়ে আনেক বেশী ছিল।

এসম্পর্কে বহু গ্রন্থ এবং গবেষণাও রয়েছে নিম্নে তার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হল:

1. পবিত্র কোরআনে এমন আয়াত রয়েছে যাতে শুধুমাত্র দীর্ঘায়ূ নয় বরং অনন্ত জীবনের সংবাদ দেওয়া হচ্ছে। আয়াতটি হযরত ইউনুস সম্পর্কে ,তাতে বলা হয়েছে:

যদি সে (ইউনুস) মাছের উদরে তসবীহ না পড়ত (আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা না করত) তা হলে তাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাছের উদরে থাকতে হত। 90

সুতরাং আয়াতে অতি দীর্ঘ আয়ূ (হযরত ইউনুসের সময় থেকে কিয়ামত পর্যন্ত) প্রাণীবিদরা যাকে অনন্ত আয়ূ বলে থাকেন কোরআনের দৃষ্টিতে মাছ ও মানুষের জন্য তা সম্ভবপর বিবেচিত হয়েছে। 91

2. পবিত্র কোরআন পাকে হযরত নূহ (আ.) সম্পর্কে বলা হচ্ছে: আমি তো নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেছিলাম । সে তাদের মাঝে অবস্থান করেছিল পঞ্চাশ হাজার বছর। অতঃপর প্লাবন তাদেরকে গ্রাস করে ;কারণ তারা ছিল সীমালঙ্ঘনকারী। 92

পবিত্র কোরআনের আয়াতে হযরত নূহের নবুয়্যতের বয়সকে 950 বছর বোঝানো হয়েছে (তার গড় আয়ু সম্পর্কে বলা হয়নি)। হাদীসের আলোকে তিনি 2450 বছর বেঁচে ছিলেন। 93

বিশেষ ব্যাপার হল ইমাম সাজ্জাদ (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহদী (আ.)-এর মধ্যে হযরত নূহের একটি বৈশিষ্ট্য (সুন্নত) আছে আর তা হল দীর্ঘায়ূ। 94

3. হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে: তাদের এই উক্তির জন্য যে , আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করেছি (আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হল) । অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি ,ক্রুশবিদ্ধও করেনি ;কিন্তু তাদের এরূপ বিভ্রম হয়েছিল। যারা তার সম্বন্ধে মতভেদ করেছিল ,তারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল। এসম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে ,তারা তাকে হত্যা করে নি। বরং আল্লাহ তাকে তার নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী ,প্রজ্ঞাময়। 95

পবিত্র কোরআন ও হাদীসের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক মুসলমানই বিশ্বাস করেন যে ,হযরত ঈসা (আ.) জীবিত রয়েছেন এবং হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের পরমূহুর্তে তিনি আবির্ভূত হবেন এবং তাকে সহযোগিতা করবেন।


ষষ্ঠ :ভাগ সবুজ প্রতীক্ষা

যখন কালো মেঘ সূর্যকে আড়াল করে দেয় ,মরু প্রান্তর সূর্যকে চুমা খাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় এবং বৃক্ষরাজি ও ফুল সূর্যের ভালবাসার পরশ না পেয়ে নুয়ে পড়ে তখন উপায় কি ?যখন সৃষ্টির নির্যাশ ,ভালর সমষ্টি ,সৌন্দর্যের দর্পন অদৃশ্যে থাকে এবং বিশ্ববাসী তার উপস্থিতি থেকে বঞ্চিত তখন কি করা যেতে পারে ?

ফুলবাগানের ফূলগুলো তাদের সুজন মালির প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে কখন তাকে কাছে পাবে এবং তার ভালবাসাপূর্ণ হাতের পানিতে প্রাণ জুড়াবে। আগ্রহী হৃদয় অধিরভাবে তার দৃষ্টির পানে তাকিয়ে আছে যেন তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী অনুগ্রহকে উপলব্ধি করতে পারে আর এখানেই প্রতীক্ষা পূর্ণতা পায়। হ্যাঁ সকলেই এ প্রতীক্ষায় আছে যে তিনি সজীবতা এবং প্রশান্তি বয়ে আনবেন।

সত্যিই প্রতীক্ষা কতইনা সুখকর যদি কিনা তার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা যায় এবং তার সুমিষ্টতাকে অন্তরে অনুভব করা যায়।

প্রতীক্ষার স্বরূপ এবং মর্যাদা

প্রতীক্ষার অনেক অর্থ করা হয়েছে তবে এ শব্দটির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দিলে তার প্রকৃত অর্থ হস্তগত হবে। প্রতীক্ষা অর্থাৎ কারো অপেক্ষায় থাকা তবে এই অপেক্ষা স্থান ও পাত্র ভেদে মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে এবং তা ফলপ্রসূ হয়। প্রতীক্ষা কেবলমাত্র এক অভ্যান্তরীণ ও আত্মীক বিষয় নয় বরং তা ভিতর থেকে বাহিরে বিস্তৃত হয় এবং গতি ও পদক্ষেপ সৃষ্টি করে। এ কারণেই প্রতীক্ষা সর্বশ্রেষ্ট ইবাদৎ হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। প্রতীক্ষা প্রতীক্ষাকারীকে গঠন করে এবং তার কর্ম ও প্রচেষ্টার জন্য এক বিশেষ দিক সৃষ্টি করে। এটা এমন একটি পথ যা তাকে প্রতীক্ষার বাস্তবায়ন করতে সহায়তা করে।

সুতরাং হাতের উপর হাত রেখে বসে থাকার সাথে প্রতীক্ষার কোন সামঞ্জস্যতা নেই। দরজার পানে তাকিয়ে থেকে আফসোস করার মধ্যে প্রতীক্ষা শেষ হয় না। রবং প্রকৃত প্রতীক্ষার মধ্যে প্রচেষ্টা ,পদক্ষেপ এবং চঞ্চলতা লুকিয়ে আছে।


ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষার বৈশিষ্ট্য

আমরা বলেছি প্রতীক্ষা মানুষের একটি সহজাত স্বভাব এবং তা প্রত্যেকের মধ্যেই বিদ্যমান। তবে মানুষের জীবন চলার পথে বা সমাজে যে সাধারণ প্রতীক্ষা তা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতার প্রতীক্ষার তুলনায় অতি সামান্য তথা নগন্য। কেননা ,তার প্রতীক্ষার বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষা সৃষ্টির প্রথম থেকেই শুরু হয়েছে। অর্থাৎ আদিকাল থেকে নবীগণ (আ.) তার আবির্ভাবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। শেষের দিকেও আমাদের ইমামগণ (আ.) তার শাসন ব্যবস্থার অপেক্ষা করতেন।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমি যদি তার সময়ে হতাম (তার সাক্ষাৎ পেতাম) তাহলে সারা জীবন তার খেদমত করতাম। 96

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষা মানে বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতার প্রতীক্ষা। বিশ্বজনীন ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যবস্থার প্রতীক্ষা এবং সকল প্রকার ভাল প্রতিষ্ঠা হওয়ার প্রতীক্ষা। এ প্রতীক্ষায় মানবজাতি অপেক্ষায় আছে যে ,তারা তাদের ঐশী সহজাত স্বভাবের মাধ্যমে যার আশা করছে এবং কখনোই পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয় নি তাকে দেখবে। মাহ্দী হচ্ছেন তিনি যিনি মানুষের জন্য ন্যায়পরায়ণতা ,আধ্যাত্মিকতা ,ভ্রাতৃত্ব ও সাম্য ,ভুমির উর্বরতা ও সোনালী ফসল ,নিরাপত্তা ও সন্ধি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের বন্যা বয়ে আনবেন। অত্যাচারের মূল উৎপাটন ,মানুষকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদান ,সকল প্রকার অত্যাচার ও স্বৈরাচার নিষিদ্ধকরণ এবং সকল প্রকার বিশৃঙ্খলা থেকে সমাজকে মুক্তিদান করা তার শাসনব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষা এমন একটি প্রতীক্ষা যা কেবলমাত্র ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হবে এবং তা ওই সময়ে সম্ভব যখন প্রত্যেকেই শেষ যামানায় বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতার প্রতীক্ষায় থাকবে। তিনি এসে তার অনুসারীদের সাহায্যে সবধরণের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কেবলমাত্র মো জেযার মাধ্যমে বিশ্বকে সুসজ্জিত করা সম্ভবপর নয়।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষা ,প্রতীক্ষাকারীদের মধ্যে তাকে সাহায্য করা ও সঙ্গ দেওয়ার স্পৃহা তথা অনুপ্রেরণা যোগায়। মানুষকে ব্যক্তিত্ব ও জীবন দান করে এবং তাদেরকে শুন্যতা ও হতাশা থেকে মুক্তিদান করে।

যা বর্ণিত হয়েছে তা প্রতীক্ষার বিশাল বৈশিষ্ট্যের (যা সকলমানুষের অন্তরে গেঁথে আছে) একটি অংশ মাত্র এবং কোন প্রতীক্ষাই তার প্রতীক্ষার সমকক্ষ নয়। সুতরাং ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষার বিভিন্ন দিক ও বহুমুখী ফলাফল সম্পর্কে জানা এবং প্রতীক্ষাকারীদের দায়িত্ব ও তার নজিরবিহীন পুরস্কার সম্পর্কে কথা বলা যথাযত হবে।

প্রতীক্ষার বিভিন্ন দিক

মানুষ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে থাকে:

এক দিকে সে চিন্তাগত ও কার্যগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ,অন্য দিকে সে ব্যক্তিগত ও সামাজিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ,অপর দিকে আবার সে শারীরিক ও আত্মিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। নিঃসন্দেহে উল্লিখিত প্রতিটি দিকেরই নির্দিষ্ট সীমারেখার প্রয়োজন রয়েছে যার মধ্যে মানুষের জীবনের সঠিক পথ উম্মোচন হবে এবং ভ্রান্ত পথসমূহ বন্ধ হয়ে যাবে। সেই সঠিক পথটিই হচ্ছে প্রতীক্ষার পথ।

বিশ্বমানবতার মুক্তিদাতার প্রতীক্ষা ,প্রতীক্ষাকারীর জীবনের প্রতিটি দিকেই প্রভাব বিস্তার করে। চিন্তাগত দিক যা মানুষের কার্যগত দিকের ভিত্তি তা মানুষের জীবনের মৌলিক বিশ্বাসের সীমারেখাকে রক্ষা করে।

অন্যকথায় সঠিক প্রতীক্ষার দাবি হচ্ছে প্রতীক্ষাকারী তার আক্বীদা-বিশ্বাস ও চিন্তার ভিত্তিকে মজবুত করবে যাতে করে সে ভ্রান্ত মাযহাবসমূহের ফাদে না পড়ে অথবা ইমাম মাহদী (আ.)-এর অন্তর্ধান দীর্ঘ হওয়ার ফলে হতাশার অন্ধকুপে নিমজ্জিত না হয়।

ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.) বলেছেন:

মানুষের প্রতি এমন দিন আসবে যে দিন তাদের ইমাম অদৃশ্যে থাকবেন। অতঃপর তাদের জন্য সুসংবাদ ,যারা সে সময়ে আমাদের ইমামতের উপর বিশ্বাসে অটল থাকবে। 97

অর্থাৎ অদৃশ্যকালীন সময়ে শত্রুরা বিভিন্ন সন্দেহমূলক প্রশ্ন উত্থাপন করার মাধ্যমে শিয়া মাযহাবের সঠিক আক্বীদাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবে আর ঠিক তখনই প্রতীক্ষার ঘাটিতে অবস্থান নেওয়ার ফলে বিশ্বাসের সীমানা রক্ষিত হবে।

কার্যগত ক্ষেত্রে প্রতীক্ষা মানুষের সবধরণের কর্মকাণ্ডে সঠিক পথ নির্দেশ করে। প্রতীক্ষাকারীকে কর্মক্ষেত্রে সচেষ্ট হতে হবে যার মাধ্যমে ন্যায়নিষ্ঠ শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। সুতরাং প্রতীক্ষাকারী এ পর্যায়ে আত্মগঠন ও সমাজ সংশোধনে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে থাকে। অনুরূপভাবে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও আত্মগঠনের জন্য চারিত্রিক গুনাবলির দিকে গুরুত্ব দেয় এবং নূরানী দলে কার্যকরী ভূমিকা পালন করার জন্য শারীরিক শক্তি উপার্জন করে।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

যারা ইমাম মাহদী (আ.)-এর সাহায্যকারী হতে চায় তাদেরকে প্রতীক্ষা করতে হবে এবং প্রতীক্ষার অবস্থায় পরহেজগার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। 98

মোদ্দা কথা প্রতীক্ষা এমন একটি পবিত্র ঘটনা যা প্রতিক্ষিত ব্যক্তি ও সমাজের শিরা উপশিরায় ধাবমান। মানুষের জীবনের সকল অধ্যায়ে খোদায়ী রং দান করে এবং কোন রং খোদায়ী রঙের চেয়ে উত্তম ও স্থায়ী হতে পারে ?পবিত্র কোরআন পাকে বর্ণিত হয়েছে:

) صِبْغَةَ اللَّـهِ  وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّـهِ صِبْغَة (

আল্লাহর রং (গ্রহণ কর) ,রঙে আল্লাহ অপেক্ষা কে অধিকতর সুন্দর ?এবং আমরা তারই ইবাদতকারী। 99

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে ,বিশ্বমানবতার মুক্তিদানকারীর প্রতীক্ষাকারীদেরকে অবশ্যই আল্লাহর রং ধারণ করতে হবে। যার মাধ্যমে প্রতীক্ষার বরকত ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে শোভা বর্ধন করবে। এভাবে দেখলে এ দায়িত্ব আর আমাদের কাধে বোঝার সৃষ্টি করবে না বরং তা মধুর ঘটনা হিসাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি দিককে অর্থবোধক ও সৌন্দর্য মণ্ডিত করে তুলবে। সত্যিই যদি দয়াময় রাষ্ট্রের অধিপতি এবং দয়ালু কাফেলার প্রধান আমির তোমাকে ঈমানের তাবুর যোগ্য সৈন্য হিসাবে সত্যের ঘাটির জন্য ডেকে থাকেন আর তা প্রতীক্ষায়রূপ নেয় তখন তুমি কি করবে ?তোমার উপর কি দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে যে ,এটা কর ওটা কর নাকি তুমি নিজেই প্রতীক্ষার পথকে চিনেছ এবং যে (সঠিক) পথকে নির্বাচন করেছ সে দিকেই যাত্রা করবে ?

প্রতীক্ষাকারীদের দ্বায়িত্ব

রেওয়ায়াতে এবং ইমামগণ (আ.)-এর বাণীতে আবির্ভাবের প্রতীক্ষাকারীদের বহু দায়িত্ব-কর্তব্য বর্ণিত হয়েছে এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য তুলে ধরছি।

ক) - ইমামকে চেনা

প্রতীক্ষিত ইমাম (আ.)-কে না চিনে প্রতীক্ষার পথকে অতিক্রম করা অসম্ভব। প্রতিশ্রুত ইমামকে চেনার মাধ্যমেই প্রতীক্ষার পথে টিকে থাকা সম্ভব। সুতরাং ইমাম (আ.)-এর নাম ও বংশ পরিচয় জানার পাশাপাশি তার মর্যাদা ,মহিমা ,অবস্থান ও পদমর্যাদা সম্পর্কেও বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন রয়েছে।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর খাদেম আবু নাসর ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর অন্তর্ধানের পূর্বে ইমামের কাছে আসলে ইমাম (আ.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি আমাকে চেন ?সে বলল: হ্যাঁ ,আপনি আমার নেতার সন্তান এবং আমার নেতা। ইমাম বললেন: এমন পরিচয় সম্পর্কে আমি তোমাকে প্রশ্ন করি নি। আবু নাসর বলল: তাহলে আপনি কেমন পরিচয় সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন ,দয়া করে নিজেই বলুন।

ইমাম (আ.) বললেন:

আমি রাসূল (সা.)-এর সর্বশেষ প্রতিনিধি এবং আল্লাহ আমার মাধ্যমেই আমার বংশ ও আমাদের অনুসারীদের বালা-মুছিবত দূর করে থাকেন 100

যদি প্রতীক্ষাকারী ইমামের সঠিক পরিচিতি অর্জন করতে পারে তাহলে সে এখন থেকেই নিজেকে ইমাম (আ.)-এর পক্ষে অনুভব করবে অর্থাৎ মনে করবে যে ,সে ইমাম (আ.)-এর তাবুতে তার পাশেই অবস্থান করছে। সুতরাং কখনোই সে ইমাম (আ.)-এর দলকে শক্তিশালী করার জন্য সামান্যতম সময়কেও হেলায় কাটাবে না।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

من مات و هو عارف لامامه لم یضره تقدم هذا الامر او تأخر و من مات و هو عارف لامامه کان کمن هو مع الفائم فی فسطاطه

যে ইমাম (আ.)-কে সঠিকভাবে চিনে মৃত্যুবরণ করবে ইমামের আবির্ভাব দেরীতেই হোক আর নিকটেই হোক তার জন্য কোন ক্ষতির কারণ নয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইমাম (আ.)-কে সঠিকভাবে চিনে মৃত্যুবরণ করবে সে সেই ব্যক্তির ন্যায় যে ,ইমাম (আ.)-এর তাবুতে তার পাশেই অবস্থান করছে।

এই পরিচিতি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ইমামগণ (আ.) বলেছেন ,তা অর্জন করার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দীর্ঘ অন্তর্ধানে বিপথগামিরা সন্দেহে পড়বে। ইমামের ছাত্র যুরারাহ বলল: ঐ পরিস্থিতির শিকার হলে কি করতে হবে ?ইমাম (আ.) বললেন: এই দোয়া টি পাঠ করবে।

اَللّهُمَّ عَرِّفْني نَفْسَکَ فَاِنَّکَ اِنْ لَمْ تُعَرِّفْني نَفْسَکَ لَمْ اَعْرِفْ رَسُولَکَ اَللّهُمَّ عَرِّفْني رَسُولَکَ فَاِنَّکَ اِنْ لَمْ تُعَرِّفْني رَسُولَکَ لَمْ اَعْرِفْ حُجَّتَکَ اَللّهُمَّ عَرِّفْني حُجَّتَکَ فَاِنَّکَ اِنْ لَمْ تُعَرِّفْني حُجَّتَکَ ضَلَلْتُ عَنْ ديني

উপরিউক্ত আলোচনায় সৃষ্টিজগতে ইমাম (আ.)-এর অবস্থানের পরিচয় সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। তিনি আল্লাহর হুজ্জাত ,রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত প্রতিনিধি এবং সর্বসাধারণের নেতা তথা ইমাম। তার আনুগত্য সবার জন্য ওয়াজিব ,কেননা তার আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যেরই অনুরূপ।

ইমাম (আ.) পরিচিতির অপর দিকটি হল তার সিরাত ও বৈশিষ্ট্যকে চেনা। এই পরিচিতি প্রতীক্ষাকারীর কার্যগত জীবনের প্রতিটি দিকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ইমাম তথা আল্লাহর হুজ্জাতের জীবনের প্রতিটি দিকের সাথে মানুষের পরিচয় যত বেশী ঘনিষ্ট ও গভীর হবে তার প্রভাবও মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকে অধিক হবে।

খ)- আদর্শ গ্রহণ

ইমাম (আ.)-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয়লাভের পর অনুসরণ ও আদর্শ গ্রহণের পালা আসে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

সেই ব্যক্তি সৌভাগ্যবান , যে আমার বংশের কায়েমকে দেখবে এবং তার আবির্ভাবের পূর্বেই তার ও তার পূর্ববর্তী ইমামগণের প্রতি বিশ্বাস রাখবে এবং তাদের শত্রুদের প্রতি ঘৃনা প্রদর্শন করবে। তারা আমার নিকট সবচেয়ে ভাল বন্ধু ও উত্তম সাথী 101

সত্যিই যে তাকওয়া ,ইবাদত ,সাধারণ জীবন-যাপন ,দানশীলতা ,ধৈর্য এবং সকল চারিত্রিক গুনাবলিতে ইমাম (আ.)-এর অনুসরণ করে চলে সেই ঐশী নেতার নিকট সে কতইনা মর্যাদাবান হবে এবং যখন তার সাক্ষাৎ পাবে তখন সে কতই না মহিমান্বিত থাকবে ?

তাই নয় কি যে প্রতীক্ষাকারী পৃথিবীর সুন্দরতম অস্থিত্বের অপেক্ষায় রয়েছে সে নিজেকেও সুন্দরভাবে সুসজ্জিত করবে ও সকল প্রকার পঙ্কিলতাকে দূরিভুত করবে এবং সর্বদা নিজের চিন্তা ও আমলের প্রতি সতর্ক থাকবে। অন্যথায় অপকর্ম ধীরে ধীরে তার ও তার কাঙ্ক্ষিতের মধ্যে ব্যবধানকে বৃদ্ধি করবে এবং এ সতর্কবাণী প্রতিশ্রুত ইমাম থেকেই বর্ণিত হয়েছে:

فما یحبسنا عنهم الا ما یتصل بنا مما نکرهه و لا نوثره منهم

কোন কিছুই আমাদের অনুসারীদের নিকট থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয় না , কেবল মাত্র তাদের কর্মফল ব্যতীত। যে সকল কাজ আমাদেরকে সন্তুষ্ট করে না এবং আমরা যা তাদের কাছে আশা করি না 102

প্রতীক্ষাকারীদের একমাত্র উদ্দেশ্য হল বিশ্বজনীন ন্যায়নিষ্ঠ সরকার গঠনে তার ভুমিকা রাখতে চায় এবং আল্লাহর শেষ হুজ্জাতের সাথী ও সাহায্যকারী হওয়ার মত গৌরব অর্জন করতে চায়। কিন্তু আত্মশুদ্ধি ও সুচরিত্রবান হওয়া ব্যতীত কি এ মহান উদ্দেশ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব ?ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

যে ব্যক্তি ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর অনুসারী হতে চায় তাকে অবশ্যই প্রতীক্ষা করতে হবে এবং প্রতীক্ষিত অবস্থায় পরহেজগার এবং সৎকর্মশীল হতে হবে 103

এটা স্পষ্ট যে ,এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ইমাম মাহ্দী (আ.) ব্যতীত অন্য কোন আদর্শই খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। কেননা ,তিনি হচ্ছেন সকল সৌন্দর্যের আয়না স্বরূপ।

গ) - ইমামের স্মরণ

যে জিনিসটি প্রতীক্ষাকারীকে ইমাম মাহদী (আ.)-এর পরিচিতি এবং অনুসরণের জন্য সহায়ক এবং প্রতীক্ষার পথে দৃঢ় রাখে তা হচ্ছে নিয়মিতভাবে ওই মহান ইমাম (আ.)-এর সাথে সম্পর্ক রাখা।

সত্যিই যখন দয়ালু ইমাম সর্বত্র ও সর্বক্ষণ আমাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টি রাখেন এবং ক্ষণিকের জন্যেও আমাদেরকে ভুলে যান না ,তাহলে কি দুনিয়ার মোহে তাকে ভুলে যাওয়া আমাদের উচিৎ হবে ?নাকি বন্ধুত্বের নিয়ম হল যে ,সর্বদা তাকে নিজের এবং অন্যদের চেয়ে বেশী গুরুত্ব দেয়া। নামাযের পাটিতে প্রথমে তার জন্য দোয়া করতে হবে এবং তার সুস্থতা ও আবির্ভাবের জন্য দোয়া করতে হবে। তিনি নিজেই বলেছেন: আমার আবির্ভাব তরান্বিত হওয়ার জন্য সর্বদা দোয়া করবে। 104 এবং সর্বদা এই দোয়াটা পাঠ করবে।

اللَّهُمَّ کُنْ لِوَلِیِّکَ الحُجَهِ بنِ الحَسَن صَلَواتُکَ علَیهِ و عَلی آبائِهِ فِی هَذِهِ السَّاعَهِ وَ فِی کُلِّ سَاعَهٍ وَلِیّاً وَ حَافِظاً وَ قَائِداً وَ نَاصِراً وَدَلِیلًا وَ عَیْناًحَتَّى تُسْکِنَهُ أَرْضَکَ طَوْعاً وَ تُمَتعَهُ فِیهَا طَوِیل

হে আল্লাহ আপনার ওয়ালী হুজ্জাত ইবনুল হাসান যার নিজের ও পরিবারের প্রতি আপনার সালাম বর্ষিত হয় এই সময়ে এবং সবসময় তার অভিভাবক , সাহায্যকারী , নেতা , বন্ধু , পথপ্রদর্শক এবং নিয়ন্ত্রক হন। এমনকি তাকে আপনার স্বইচ্ছায় দীর্ঘ দিনের জন্য দুনিয়াতে প্রেরণ করুন। 105

প্রকৃত প্রতীক্ষাকারী সদকা দেওয়ার সময় প্রথমে পবিত্র ইমামের সুস্থতা কামনা এবং যে কোন বাহানায় তার উপর তাওয়াসসুল করে। এ ছাড়াও তার পবিত্র ও অতিসুন্দর চেহারা দেখার জন্য সর্বদা ক্রন্দন করে।

عزیز علی ان اری الخلق و لا تری

আমার জন্য অধিক কষ্টদায়ক যে , সকলকে দেখতে পাই অথচ আপনাকে দেখতে পাই না ! 106

যেখানেই ইমামের নামে অনুষ্ঠান হয় তার প্রতি ভালবাসাকে আরও দৃঢ় করার জন্য প্রতীক্ষাকারীরা সেখানেই উপস্থিত হয়ে থাকে। যেমন: মসজিদে সাহলা ,মসজিদে জামকারান এবং পবিত্র সারদাবে গমনা গমন করে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রতীক্ষাকারীদের জীবনের উত্তম দিকগুলো হচ্ছে তারা প্রত্যহ ইমামের সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এবং সেই প্রতিজ্ঞার প্রতি নিজেদের দৃঢ়তাকে প্রমাণ করে। দোয়ায়ে আহ্দে বর্ণিত হয়েছে:

اَللّـهُمَّ اِنّي اُجَدِّدُ لَهُ في صَبيحَةِ يَوْمي هذا وَ ما عِشْتُ مِنْ اَيّامي عَهْداً وَ عَقْداً وَ بَيْعَةً لَهُ في عُنُقي ، لا اَحُولُ عَنْها وَ لا اَزُولُ اَبَداً اَللّـهُمَّ اجْعَلْني مِنْ اَنْصارِهِ وَ اَعْوانِهِ وَ الذّابّينَ عَنْهُ وَ الْمُسارِعينَ اِلَيْهِ في قَضاءِ حَوائِجِهِ ، وَ الْمُمْتَثِلينَ لاِوامِرِهِ وَ الْمحامينَ عَنْهُ ، وَ السّابِقينَ اِلى اِرادَتِهِ وَ الْمُسْتَشْهَدينَ بَيْنَ يَدَيْهِ .

হে আল্লাহ আমি এই প্রভাতে এবং আমার সারা জীবনে ইমামমের প্রতি যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে তা পূণরায় স্বীকার করছি। আমি কখনোই যেন এই প্রতিজ্ঞা থেকে দূরে সরে না যাই এবং তার প্রতি অটল থাকতে পারি। হে আল্লাহ আমাকে তার সাহায্যকারী ,সহযোগী ,সাথী এবং তার চাহিদা মেটানোর জন্য দ্রুত তার দিকে ধাবমানকারীদের অন্তুর্ভূক্ত করুন। আমি যেন তার নির্দেশ পালন করি। আমি যেন তাকে সাহায্য করি এবং তার আদেশ পালনকারীদের শীর্ষে থাকি। আমাকে তার দলে শহীদ হওয়ার তৌফিক দান করুন।

যদি কেউ সর্বদা এই প্রতিজ্ঞা পড়তে থাকে এবং আন্তরিকভাবে তার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে তাহলে কখনোই অলসতা করবে না। নিজ ইমামের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এবং তার আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য বিন্দুমাত্র অবহেলা করবে না। এ ধরণের ব্যক্তিরাই কেবলমাত্র মহান ইমামের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন এই দোয়া পাঠ করবে সে আমাদের কায়েমের সাহায্যকারী হবে। যদি তার আবির্ভাবের পূর্বেই মারা যায় আল্লাহ তাকে ইমাম মাহ্দীকে সাহায্য করার জন্য পূণরায় জীবিত করবেন।

ঘ) - ঐক্য ও সহানুভূতি

প্রতীক্ষাকারীদের প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি প্রতিক্ষিত সমাজেও ইমামের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দিষ্ট কার্যক্রম থাকতে হবে। অন্যকথায় প্রতিক্ষিত সমাজকে তাদের প্রতিটি কর্মকেই ইমামের সন্তুষ্টির জন্য পালন করতে হবে। সুতরাং প্রতিক্ষিত সমাজের দায়িত্ব হল ইমামের সাথে যে প্রতিজ্ঞায় তারা আবদ্ধ হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা। যার মাধ্যমে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। ইমাম মাহ্দী (আ.) এরূপ সমাজের উদ্দেশ্যে বলেছেন:

আমাদের অনুসারীরা যদি (আল্লাহ তাদেরকে তার আদেশ পালনে সাহায্য করুন) তাদের গৃহীত প্রতিজ্ঞার প্রতি অটল থাকে তাহলে তারা অচিরেই আমাকে দেখতে পাবে। আমাদের প্রতি পরিপূর্ণ ও সঠিক ভালবাসা পোষণ করলে আমার আবির্ভাব ত্বরান্বিত হবে। 107

উক্ত প্রতিজ্ঞা যা পবিত্র কোরআনে ও নবীগণের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিম্নে বর্ণিত হল:

1- ইমামদের অনুসরণের চেষ্টা এবং তাদের বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব ও শত্রুদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা।

ইমাম বাকের (আ.) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন:

সে ব্যক্তিই সৌভাগ্যবান , যে আমাদের কায়েমকে দেখবে এবং তার আবির্ভাবের পূর্বেই তার অনুসরণ করবে। তার শত্রুদের সাথে শত্রুতা এবং বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব পোষণ করবে। তারা আমার বন্ধু এবং কিয়ামতের দিনে তারা আমার সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটতম ব্যক্তি 108

2- প্রতীক্ষাকারীরা দ্বীনের ভ্রান্তি ও বিদয়া ত সম্পর্কে অচেতন নন এবং সমাজের পঙ্কিলতা ও বিশৃঙ্খলা সম্পর্কেও অসতর্ক নন। তারা সমাজে সৎকর্ম ও চারিত্রিক মর্যাদাকে পদদলিত হতে দেখলে তার বিরুদ্ধাচারণ করেন।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

শেষ যামানায় এমন এক দল আসবে যাদের পুরস্কার ইসলামের প্রথম যুগের উম্মতের সমপরিমাণ হবে। তারা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং ফিতনা ফ্যাসাদকারীদের সাথে যুদ্ধ করবে 109

3- প্রতীক্ষিত সমাজ অন্যদের সাথে সাক্ষাতের সময় সহযোগিতাকে মূলমন্ত্র মনে করবে। এ সমাজের অধিবাসিরা কোন প্রকার কৃপনতা ও স্বার্থপরতা ব্যতীত সর্বদা সমাজের দিন-দুঃখিদের খোঁজ খবর রাখবে এবং তাদের সমস্যার সমাধান করবে। একদল শিয়া ইমাম বাকের (আ.)-কে নসিহত করার অনুরোধ করলে ইমাম বললেন:

তোমাদের মধ্যে যে শক্তিশালী সে দূর্বলকে সাহায্য করবে , যে স্বনির্ভর সে অভাবিদের প্রতি সহানুভূতি দেখাবে ও সাহায্য করবে এবং প্রত্যেকেই প্রত্যেকের ভাল চাইবে 110

এটা জানা দরকার যে ,এই সহযোগীতা ও সহমর্মিতার সীমা কেবলমাত্র আমরা যেখানে বসবাস করি তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতীক্ষাকারীদের কল্যাণ ও মহানুভবতা অনেক দূরের অধিবাসিদের নিকটেও পৌঁছে থাকে। কেননা প্রতীক্ষিত সমাজে জনতার মধ্যে কোন প্রকার ব্যবধান ও বৈষম্যের ঠাঁই নেই।

4- যারা প্রতীক্ষিত সমাজের সদস্য তারা সমাজে মাহ্দীবাদের রং ও সুগন্ধ বিলাবে এবং ইমামের নাম ও স্মরণকে সর্বত্র উচু রাখবে। ইমামের কথা ও বৈশিষ্ট্যকে সকল কিছুর মূল হিসাবে সবার সামনে উপস্থান করবে। এ পথে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করলে অবশ্যই ইমাম তাদের প্রতি দয়া করবেন। 111

আব্দুল হামিদ ওয়াসেতী ইমাম বাকের (আ.)-কে বলল:

আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় জীবনকে উৎসর্গ করেছি এবং অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি!

ইমাম তার প্রশ্নের জবাবে বললেন:

হে আব্দুল হামিদ তুমি কি মনে কর ,যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে আল্লাহ তার সমস্যার সমাধান করবেন না ?আল্লাহর শপথ করে বলছি আল্লাহ এমন ব্যক্তির জন্য মুক্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহ তার উপর রহমত করুক ,যে আমাদের বেলায়াতকে জীবিত রাখবে! 112

শেষ কথা হল প্রতীক্ষিত সমাজ ,সমাজ জীবনের সকল স্তরে অন্য সব সমাজের আদর্শ হওয়ার চেষ্টা করবে এবং বিশ্বমানবের প্রতিশ্রুত মুক্তিদাতার আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট তৈরী করবে।

ঙ) - প্রতীক্ষার প্রভাব

অনেকে মনে করে যে ,ইমাম মাহ্দীর প্রতীক্ষা মানুষকে স্থবির করে দেয়। প্রতীক্ষাকারীরা ইমাম মাহ্দী আবির্ভুত হয়ে অন্যায়-অত্যাচারের মূল উৎপাটন না করা পর্যন্ত জুলুমের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করবে না বরং তারা হাতের উপর হাত দিয়ে বসে থকবে এবং বসে বসে অত্যাচার দেখবে!!

প্রকৃতপক্ষে এটা কোন সঠিক চিন্তা ভাবনা নয় বরং সম্পূর্ণ একটা ভুল ধারণা। কেননা ,আমরা ইমাম মাহ্দীর প্রতীক্ষার স্বরূপ ও তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এবং প্রতীক্ষার বিভিন্ন দিক ও তার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যা বলেছি তা থেকে বোঝা যায় ইমাম মাহ্দীর প্রতীক্ষা মানুষকে নিথর তো করেই না বরং মানুষের চঞ্চলতা ও উদ্দিপনার সৃষ্টি করে থাকে।

প্রতীক্ষা ,প্রতীক্ষাকারীর মধ্যে পবিত্র ও কল্যাণময় চাঞ্চল্য ও উদ্দেশ্য মণ্ডিত উদ্দিপনা সৃষ্টি করে এবং প্রতীক্ষাকারী যত বেশী প্রতীক্ষার হকিকতের নিকটবর্তী হবে প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে ততবেশী ধাবিত হবে। প্রতীক্ষার ছত্রছায়ায় মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতার গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে ইসলামী সমাজের একটা অংশ মনে করে। সুতরাং সমাজকে তার সাধ্য অনুযায়ী সংশোধনের চেষ্টা করে। সমাজ যখন এমন ধরনের যোগ্য ব্যক্তিত্ব দ্বারা গঠিত হয় তখন তা ফযিলত বিস্তারের চেষ্টা করে। তখন সকলেই ভালকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য অগ্রসর হয়। এমন পরিবেশেই সমাজে বসবাসরত মানুষের মধ্যে ধর্ম ও মাহ্দীবাদের প্রতি বিশ্বাস বেড়ে যায়। প্রতীক্ষার কারণেই প্রতীক্ষাকারীরা ফ্যাসাদের মধ্যে নিমজ্জিত না হয়ে তাদের দ্বীনি বিশ্বাসকে রক্ষা করে। তারা সকল সমস্যার মোকাবেলায় ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আশায় সকল বালা-মুছিবতকে বক্ষে ধারণ করে। তারা কখনোই নিরাশ হয় না।

প্রকৃতপক্ষে এমন কোন মাকতব দেখেছেন কি যেখানে তার অনুসারীদের জন্য এত সুন্দর ও সুব্যবস্থা করা হয়েছে ?এমন পথ যা ঐশী উদ্দেশ্যে অতিবাহিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত মহান পুরস্কার অর্জন করে নিয়ে আসে।

চ) - প্রতীক্ষাকারীদের পুরষ্কার

তারা সৌভাগ্যবান ,যারা কল্যাণের প্রতীক্ষায় রয়েছে। তাদের পুরস্কার কতইনা বড় যারা ইমাম মাহ্দীর প্রতীক্ষায় দিনাতিপাত করে এবং তাদের মর্যাদাও অধিক যারা কিনা কায়েমে আলে মুহাম্মদের প্রকৃত প্রতীক্ষাকারী।

এ অধ্যায়ের শেষে প্রতীক্ষাকারীদেও মর্যাদা ও ফযিলত সম্পর্কে ইমামদের কিছু বাণী বর্ণিত হল। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আমাদের কায়েমের অনুসারীদের জন্য সৌভাগ্য যে ,তারা তার অদৃশ্যের সময়ে তার আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় থাকবে এবং তার আবির্ভাবের পর তার অনুগত থাকবে। তারা আল্লাহর বন্ধু তাদের কোন ভয় ও দৃঃখ থাকবে না। 113

এর চেয়ে বড় গৌরব আর কি হতে পারে যে ,আল্লাহর বন্ধুত্বের প্রতীক কারো গলায় থাকবে। কেনইবা তারা দুঃখ ও কষ্ট পাবে ,কেননা তাদের জীবন ও মৃত্যু তো তখন অনেক বড় মর্যাদার অধিকারী।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেছেন:

যে ব্যক্তি আমাদের কায়েমের অদৃশ্যের সময়ে আমাদের বেলায়াতের প্রতি প্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহ তাকে বদর ও হুদের যুদ্ধের সহস্র শহীদের সমপরিমাণ সওয়াব দান করবেন। 114

হ্যাঁ যারা অদৃশ্যকালীন সময়ে তাদের যামানার ইমামের বেলায়াতের উপর দৃঢ় থাকবে তারা ঐ সকল মুজাহিদদের সমান যারা রাসূল (সা.)-এর পক্ষে আল্লাহর দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং সেখানে নিজের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে।

যে সকল প্রতীক্ষাকারীরা জীবন বাজি রেখে রাসূল (সা.)-এর সন্তানের সাহায্যের প্রতীক্ষায় রয়েছে তারা এখনই যুদ্ধের ঘাটিতে সত্যপন্থি নেতার পাশে রয়েছেন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন: তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ইমাম মাহ্দীর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে ,সে ঐ ব্যক্তির সমপরিমাণ সওয়াব পাবে যে ইমামের তাবুতে ইমামের পাশে ছিল। অতঃপর একটু থেমে আবার বললেন: না বরং তার মত ,যে ইমামের পক্ষে যুদ্ধ করেছে! অতঃপর বললেন: না ,আল্লাহর শপথ বরং তার মত ,যে রাসূল (সা.)-এর পাশে শাহাদত বরণ করেছেন। 115

এরা সেই দল ,যাদেরকে বহু যুগ পূর্বে রাসূল (সা.) তার ভাই ও বন্ধু হিসাবে তুলনা করেছেন এবং বলেছেন , আমি তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালবাসি।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:  

একদা রাসূল (সা.) সাহাবাদের সামনে বললেন: হে আল্লাহ আমার ভাইদেরকে আমাকে দেখান! এই কথা তিনি দুইবার বললেন। সাহাবারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আমরা কি আপনার ভাই নই ?রাসূল (সা.) বললেন: না ,তোমরা আমার সাহাবা। আমার ভাই তারা যারা শেষ যামানায় আমাকে না দেখেই আমার প্রতি ঈমান আনবে! আল্লাহ তাদেরকে তাদের পিতার নামসহ আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। দ্বীনের প্রতি তাদের ঈমানের দৃঢ়তা হচ্ছে রাতের অন্ধকারে কাঁটাওয়ালা উদ্ভিদ তোলা এবং হাতে জলন্ত আগুন ধরার চেয়েও মজবুত। তারা হচ্ছে হেদায়াতের মশাল। আল্লাহ তাদেরকে সকল প্রকার ফিতনা থেকে মুক্তি দিবেন। 116

রাসূল (সা.) আরও বলেছেন:

তারা সৌভাগ্যবান যারা আমার আহলে বাইতের কায়েমকে দেখবে এবং তার সংগ্রামের পূর্বেই তার অনুসরণ করবে। তার শত্রুদের সাথে শত্রুতা এবং বন্ধৃদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করবে এবং তার পূর্বের সকল ইমামদেরকেও ভালবাসবে। তারা আমার বন্ধু এবং আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় উম্মত। 117

যারা রাসূল (সা.)-এর নিকট এত বেশী মর্যাদার অধিকারী হয়েছে তারা আল্লাহর আহবান শুনতে পাবে! সে আহবান ভালবাসা ও আন্তরিকতায় পূর্ণ থাকবে এবং তা প্রমাণ করবে যে ,তারা আল্লাহর অধিক নৈকট্যলাভ করেছে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

এমন দিন আসবে যখন উম্মতের ইমাম অদৃশ্যে থাকবেন। অতএব তারা সৌভাগ্যবান যারা সে সময়ে আমাদের বেলায়াতের প্রতি দৃঢ় থাকবে। তাদের নুন্যতম পূরস্কার হচ্ছে যে ,আল্লাহ তাদেরকে আহবান করে বলবেন: হে আমার বান্দারা ,তোমরা আমার রহস্যের (অদৃশ্য ইমামের) প্রতি ঈমান এনেছ এবং তাকে স্বীকার করেছ। অতএব তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কারের সুসংবাদ দিচ্ছি যে ,তোমারা আমার প্রকৃত বান্দা। তোমাদের সৎকর্মকে গ্রহণ করব এবং তোমাদের গোনাহসমূহকে ক্ষমা করব। তোমাদের বরকতে বান্দাদের উপর পানি বর্ষণ করব এবং তাদের থেকে বালা-মুছিবত দূর করব। যদি তোমরা তাদের মধ্যে না থাকতে তাহলে গোনাগারদের উপর আমার আযাব প্রেরণ করতাম। 118

কিন্তু কি জিনিস প্রতীক্ষাকারীদেরকে শান্ত করতে পারে এবং তাদের প্রতীক্ষার সমাপ্তি ঘটাতে পারে ?কোন জিনিস তাদের চোখ উজ্জল করতে পারে এবং তাদের আনচান মনকে শান্ত করতে পার ?যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষার পথে চেয়ে আছে এবং এ পথেই সকল কষ্ট সহ্য করে পথ চলেছে। তারা আবির্ভাবের সবুজ উদ্দ্যানে না পৌঁছে এবং তাদের কাঙ্ক্ষিতের পাশে বসতে না পেরে সন্তুষ্ট হতে পারে কি ?এর চেয়ে সুন্দর মূহুর্ত আর কি হতে পারে ?

ইমাম কাযিম (আ.) বলেছেন:

আমাদের অনুসারীদের সৌভাগ্য যারা আমাদের কায়েমের অদৃশ্যের সময়ে আমাদের সাথে বন্ধুত্বে অটল থাকবে এবং আমাদের শত্রুদের সাথে শত্রুতায় অটল থাকবে। তারা আমাদের এবং আমরাও তাদের। তারা আমাদের নেতৃত্বতে সন্তুষ্ট (এবং আমাদের ইমামতকে গ্রহণ করেছে) এবং আমরাও সন্তুষ্ট যে তারা আমাদের অনুসরী (শিয়া)। তারা সৌভাগ্যবাণ! আল্লাহর শপথ করে বলছি কিয়ামতের দিন তারা আমাদের সাথেই থাকবে। 119


চতুর্থ অধ্যায় : আবির্ভাবের সময়কাল


প্রথম ভাগ :আবির্ভাবের সময়ে বিশ্ব

পূর্বের অধ্যায়সমূহে আমরা দ্বাদশ ইমামের অদৃশ্য এবং তার দর্শন সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আল্লাহর শেষ হুজ্জাত এজন্যে অদৃশ্যে রয়েছেন যে ,প্রেক্ষাপট প্রস্তুত হওয়ার পর তিনি আবির্ভূত হবেন এবং বিশ্বকে সরাসরি হেদায়াত করবেন। অদৃশ্যকালীন সময়ে মানুষ সাঠিকভাবে আমল করত তাহলে আবির্ভাবের ক্ষেত্র অতি সত্তর প্রস্তুত হতে পারত। কিন্তু শয়তানের ও নফসের তাড়নায় ,কোরআনের শিক্ষা থেকে দূরে থাকা এবং পবিত্র ইমামদের বেলায়াত গ্রহণ না করার কারণে মানুষ পথভ্রষ্ঠ হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত অন্যায়ের ঘাঁটি তৈরী করেছে ও অন্যায়-অত্যাচারকে বৃদ্ধি করেছে। এ পথকে নির্বাচন করে তারা অতি ভয়ানক পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছে। অত্যাচারে পূর্ণ পৃথিবী ,ফ্যাসাদ ও ধ্বংস ,আত্মিক ও চারিত্রিক নিরাপত্তার অভাব ,পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা বিহীন জীবন ,অন্যায়ে ভরা সমাজ এবং কর্মচারীদেরকে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি হচ্ছে অদৃশ্যকালীন সময়ের মানুষের কর্মকাণ্ড। যে সত্যকে বহু শতাব্দি পূর্বে পবিত্র ইমামগণ বলে গিয়েছেন।

ইমাম জা ’ ফর সাদিক (আ.) তার এক সাথীকে বলেছেন:

যখন দেখবে অন্যায়-অত্যাচার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ,কোরআনকে ভুলে গিয়েছে এবং ইচ্ছামত তার তাফসীর হচ্ছে ,অসত্য পন্থিরা সত্যপন্থিদের উপর প্রাধান্য পেয়েছে ,ঈমানদাররা মুখ বন্ধ করে রেখেছেন ,আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন হয়েছে ,চাটুকারীতা বেড়ে গিয়েছে ,সত্যের রাস্তা খালি এবং অন্যায়ের রাস্থা ভরপুর ,হালালকে হারাম করা আর হারামকে মার্জিত মনে করা হয়েছে । অধিক ধন-সম্পদ আল্লাহর আক্রশের (ফ্যাসাদ ও নষ্টামির) পথে ব্যয় হচ্ছে ,সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে সুধ খাওয়ার প্রচলন ঘটেছে ,অবৈধ বিনোদন এত বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে যে কেউ তার বিরোধিতা করতে পারছে না। কোরআনের হকিকত শুনতে কষ্ট পাচ্ছে অথচ বাতিলকে অতি সহজেই অনুসরণ করছে। অন্য কারো উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরে হজ্জ করতে যাচ্ছে ,মানুষের হৃদয় কঠিণ হয়ে যাচ্ছে। যদি কেউ ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করতে যায় তাকে বলা হয় এটা তোমার দায়িত্ব নয় ,প্রতি বছর নতুন নতুন ফ্যাসাদ ও বিদয়াতের প্রচলন ঘটছে। (যখনই দেখবে মানুষের পরিস্থিতি এমন হয়েছে) সতর্ক থাকবে এবং আল্লাহর কাছে তা থেকে মুক্তি চাইবে। (আবির্ভাব নিকটে)। 120

তবে অদৃশ্যকালীন সময়ের এ অবস্থা অধিক হলেও প্রকৃত ঈমানদার আছে যারা তাদের ঈমানের প্রতি অটল থাকবে এবং ঈমানের গণ্ডিকে রক্ষা করবে। তারা সমাজের ফ্যাসাদে নিমজ্জিত হবে না এবং নিজের ভাগ্যকে অন্যদের দুর্ভাগ্যের সাথে জোড়া লাগাবে না। তারা আল্লাহর উত্তম বান্দা এবং পবিত্র ও নূরানী ইমামদের শিয়া (অনুসারী) যাদেরকে বিভিন্ন হাদীসেও অনেক প্রশংসা করা হয়েছে। তারা নিজেরাও পবিত্রভাবে জীবন- যাপন করেছে এবং অন্যদেরকেও পবিত্রভাবে জীবন-যাপন করার জন্য আহবান করেছে । তারা জানে যে ,সৎকর্মের প্রসার ঘটলে এবং ঈমানের সুগন্ধে পরিবেশকে সুগন্ধী করলে ইমাম আবির্ভূত হবেন এবং তার সংগ্রাম ও হুকুমতের পথ সুগম হবে। কেননা ,তখনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা সম্ভব যখন ইমামের সাহায্যকারী থাকবে। এ চিন্তাধারা ঐ বাতিল চিন্তার মোকাবেলায় আনা হয়েছে যারা বলে থাকে যে ,ইমামের আবির্ভাবের জন্য অন্যায়ের প্রসার ঘটাতে হবে। এটা কি মেনে নেয়া সম্ভব যে ,ঈমানদাররা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না এজন্যে যে ,অন্যায়ের প্রসার ঘটলে ইমাম মাহদী (আ.) আবির্ভূত হবেন ?সত্য ও ন্যায়ের প্রসার ঘটার মাধ্যমে সৎকর্মশীলদের ইমামের আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়া সম্ভবপর নয় কি ?

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা মুসলমাদের উপর ফরজ এবং কখনো ও কোথাও তা থেকে দূরে থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য কিরূপে অন্যায় ও অত্যাচারের প্রসার ঘটানো সম্ভব হতে পারে ?

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:

শেষ যামানায় এমন এক দল আসবে যাদের পুরস্কার ইসলামের প্রথম যুগের উম্মতের সমপরিমাণ হবে। কেননা ,তারা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং ফিতনা-ফ্যাসাদকারীদের সাথে সংগ্রাম করবে। 121

তাছাড়াও অসংখ্য রেওয়ায়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে পৃথিবী অন্যায়- অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে তার অর্থ এই নয় যে ,প্রতিটি মানুষই জালেম হয়ে যাবে। বরং আল্লাহ পথের পথিকরা ঠিকই সে পথে অবিচল থাকবে এবং ফযিলতের সুগন্ধ বিভিন্ন স্থান থেকে নাকে আসবে।

সুতরাং আবির্ভাবের পূর্বের পৃথিবী তিক্ত হলেও তা আবির্ভাবের সুন্দর পৃথিবীতে গিয়ে শেষ হবে। ফ্যাসাদ ও অত্যাচার থাকলেও পাশাপাশি নিজে পবিত্র থাকা এবং অন্যদেরকে সৎকর্মের দিকে আহবান করা মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য এবং তা ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করতে সরাসরি ভূমিকা পালন করে থাকে।

এ অধ্যায়টি ইমাম মাহ্দী তিনি বলেছেন: (আ.) -এর একটি বাণীর মাধ্যমে শেষ করছি ,কোন কিছুই আমাদের অনুসারীদের থেকে আমাদেরকে দূরে রাখে না কেবল মাত্র তাদের গোনাহ ও অসৎকর্ম ব্যতীত। 122


দ্বিতীয় ভাগ :আবির্ভাবের ক্ষেত্র এবং তার আলামতসমূহ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের বিভিন্ন শর্ত ও আলামত রয়েছে যাকে আবির্ভাবের আলামত ও ক্ষেত্রও বলা হয়ে থাকে। এই দু টির মধ্যে পার্থক্য হল ,ক্ষেত্র আবির্ভাবের ক্ষেত্রে সত্যিকার ভূমিকা রাখে অর্থাৎ ক্ষেত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব সম্ভব নয়। কিন্তু আবির্ভাবের ক্ষেত্রে আলামতের কোন ভূমিকা নেই বরং তার মাধ্যমে কেবলমাত্র আবির্ভাব ও তার নিকটবর্তী হওয়াকে বোঝা সম্ভব।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে ,শর্ত ও ক্ষেত্রের গুরুত্ব আলামতের চেয়ে বেশী। সুতরাং আমাদের উচিৎ আলামতের চেয়ে ক্ষেত্রের দিকে বেশী গুরুত্ব দেয়া এবং নিজেদের সাধ্যমত তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। একারণেই আমরা প্রথমে আবির্ভাবের ক্ষেত্র ও শর্ত সম্পর্কে আলোচনা করব এবং পরিশেষে সংক্ষেপে কিছু আলামতকে তুলে ধরব।

1)- আবির্ভাবের ক্ষেত্র

পৃথিবীতে প্রতিটি জিনিসই ক্ষেত্র ও শর্ত প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে অস্তিত্বমান হয়ে থাকে এবং ক্ষেত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোন জিনিসই অস্তিত্বমান হতে পারে না। প্রতিটি ভুমিতেই ফসল ফলে না এবং সবধরণের আবহাওয়াতে সকল প্রকার বৃক্ষ জন্মায় না। একজন কৃষক তখনই ভাল ফসলের চিন্তা করতে পারে যখন সে ভাল ফসল ফলানোর সকল ব্যবস্থা করে থাকে।

সুতরাং সকল বিপ্লব ও সামাজিক ঘটনাও তার ক্ষেত্র ও শর্তের উপর নির্ভরশীল। ইরানের ইসলামী বিপ্লবও যেমন তার ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়ার মাধ্যমে সফল হয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ্বজনীন সংগ্রাম ও বিপ্লবও যা বিশ্বের সর্ব বৃহৎ সংগ্রাম এ নিয়মের বাইরে নয় এবং ক্ষেত্র ও প্রেক্ষাপট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তা বাস্তবায়ীত হবে না।

একথা বলার কারণ হচ্ছে আমরা যেন মনে না করি যে ,ইমাম মাহ্দী (আ .) -এর বিপ্লব পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে এবং ইমামের এ সংগ্রাম মো জেযার মাধ্যমে সংঘটিত হবে। বরং কোরআনের বাণী ও ইমামদের আদর্শ অনুযায়ী এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ,পৃথিবীর সকল কর্মকাণ্ড তার স্বাভাবিক গতিতেই সংঘটিত হবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আল্লাহপাক চান না যে ,পৃথিবীর কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে সংঘটিত হোক। 123

একজন ইমাম বাকের (আ.)-কে বলল:

আমরা শুনেছি যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) -এর আবির্ভাব ঘটলে সব কিছু তার ইচ্ছা অনুযায়ী চলবে।

ইমাম বললেন:

না ,এমনটি নয়। আল্লাহর শপথ করে বলছি যদি এমনটিই হত যে ,কারো জন্য সব কিছু নিজে নিজেই হয়ে যাবে তাহলে রাসূল (সা.)-এর বেলায়ও তাই ঘটত। 124

তবে উপরিউক্ত কথার অর্থ এই নয় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান আন্দলনে আল্লাহর কোন মদদ থাকবে না রবং উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐশী সহযোগিতার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি প্রস্তুত থাকতে হবে।

এ ভুমিকা থেকে বুঝতে পারলাম যে ,প্রথমে আবির্ভাবের পরিবেশ ও পরিস্থিতিকে জানতে হবে অতঃপর তা বাস্তবায়ণ করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের চারটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রয়েছে যার প্রত্যেকটিকে পৃথকভাবে আলোচনা করব:

( ক) কর্মসূচী: এটা স্পষ্ট যে ,প্রতিটি সংগ্রামের জন্য দু টি কর্মসূচীর প্রয়োজন রয়েছে।

1। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সাথে সংগ্রামের জন্য কর্মসূচী গ্রহণ ও সৈন্য বিন্যাস করা।

2। সমাজের সকল প্রয়োজন মেটাতে এবং একটি রাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে এবং সমাজকে একটি আদর্শ ও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানোর সুব্যবস্থা করতে তেমন একটি পরিপূর্ণ ও উপযুক্ত নীতিমালা প্রয়োজন।

পবিত্র কোরআনের শিক্ষা এবং পবিত্র মাসুম (আ.)-গণের পন্থাই হচ্ছে সেই চিরন্তন ইসলাম এবং তা সর্বোত্তম নীতিমালা ও কর্মসূচী হিসাবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে রয়েছে। তিনি এই নীতিমালা অনুসারে আমল করবেন। 125 যে আসমানী কিতাবের সকল আয়াত আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনি মানুষের জীবনের সকল প্রকার পার্থিব ও আধ্যাত্মিক চাহিদা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। সুতরাং তার বিশ্বজনীন বিপ্লব এক নজির বিহীন সম্মতির অধিকারী এবং অন্য কোন বিপ্লব ও সংগ্রামের সাথে এর তুলনা চলে না। এ দাবীটা হয়তবা এমন হতে পারে যে ,বর্তমান বিশ্ব পার্থিব সকল প্রকার নীতিমালাকে পরীক্ষা করে তার দূর্বলতাকে মেনে নিয়েছে এবং ধীরে ধীরে ঐশী নীতিমালাকে মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।

আমেরিকার রাজনীতিবীদদের উপদেষ্টা আলভীন তাফলার এই সমস্যার সমাধান এবং বিশ্বসমাজকে সংষ্কারের জন্য তৃত্বীয় তরঙ্গ নামে একটি থিউরী দিয়েছেন। তারপরও তিনি এ বিষয়ে অনেক কিছুই স্বীকার করেছেন।

পশ্চিমা বিশ্ব যে সকল সমস্যায় জর্জরিত তা গুনে শেষ করা যাবে না। উন্নত বিশ্বের অবনতি ও ফিতনা-ফ্যাসাদ দেখে আশ্চর্যবোধ হয় এবং তাদের চারিত্রিক অবক্ষয় রুচিশীল মানুষের নাশিকাকে পীড়া দেয়। ফলস্বরূপ অশান্তির তরঙ্গ পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করে ফেলেছে। এই সমস্যার সমাধানের জন্য হাজারও পরিকল্পনা ও কর্মসূচী উত্থাপিত হয়ে থাকে এবং সকলেই বলে থাকেন যে ,তা মৌলিক এমনকি বৈপ্লবিক। কিন্তু বার বারই এ পরিকল্পনাসমূহ ভেস্তে যায় এবং সমস্যার উপর সমস্যা সৃষ্টি হয় এবং এটা মানুষের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি করে এবং কোন সুফলদান করে না। এই অনুভূতি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য খুবই ক্ষতিকর এবং তা বাগধারার সেই সাদা অশ্বারোহীর প্রয়োজনীয়তাকে দ্বিগুন বাড়িয়ে দেয়। 126

( খ) নেতৃত্ব: প্রতিটি সংগ্রামের জন্যই একজন নেতার প্রয়োজন এবং সংগ্রাম যত বেশী বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হবে তেমন যোগ্য নেতার প্রয়োজনও বেশী অনুভূত হবে।

বিশ্বব্যাপী জুলুম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং পৃথিবীতে ন্যায়বিচার ও সাম্য গড়ে তুলতে একজন বিচক্ষণ ,যোগ্য এবং দয়ালু নেতার অতি প্রয়োজন । কেননা ,তিনিই সঠিক ভাবে এ সংগ্রামকে পরিচালনা করতে পারেন। ইমাম মাহ্দী (আ.) যেহেতু সকল নবী ও আওলীয়াদের নির্যাস তাই তিনি এই মহান সংগ্রামের নেতা এবং তিনি জীবিত। তিনিই একমাত্র নেতা যিনি আলামে গাইবের সাথে সম্পর্ক রাখার কারণে বিশ্বেও সকল কিছু সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবহিত এবং তার সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

জেনে রাখ মাহ্দী সকল জ্ঞানের উত্তরাধিকারী এবং সকল বিষয়ের উপর জ্ঞান রাখে। 127

তিনিই একমাত্র নেতা যিনি সকল বাধ্যবাধকতার বাইরে এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত। সুতরাং বিশ্ব সংগ্রামের নেতা ও সর্বোত্তম নেতা।

( গ) সাহায্যকারীগণ: আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট এবং শর্তের মধ্যে যোগ্য সাহায্যকারীর প্রয়োজন রয়েছে। ঐশী নেতার জন্য তেমন যোগ্য সাহায্যকারীর প্রয়োজন তো অতি স্বাভাবিক ব্যপার। এমনটি নয় যে ,যে ব্যক্তিই দাবী করবে সে ব্যক্তিই সাহয্যকারীর মধ্যে পরিগণিত হবে।

মামুন রাকী বর্ণনা করেন ,

একদা ইমাম জা ফর সাদিক ( আ .)- এর সাথে ছিলাম ,সাহল বিন হাসান খোরাসানী এসে সালাম করে বলল , হে রাসূল ( সা .)- এর সন্তান ! আপনি প্রকৃত ইমাম কারণ আপনি রহমত ও অনুগ্রহ পরায়ণ বংশের সন্তান ,কেন আপনি আপনার এক লক্ষ সৈন্য যারা শত্রুদের সাথে লড়তে প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও আপনার ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করছেন না ?

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বললেন:

হে খোরাসানী বস ,এখনই তোমার সামনে সত্য প্রকাশিত হয়ে যাবে। ইমাম (আ.)তার দাসীকে চুলা জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই চুলা আগুনে পরিপূর্ণ হয়ে গেল।

ইমাম জা ফর সাদিক ( আ .) সাহলকে বললেন :

হে খোরাসানী যাও ঐ আগুনের মধ্যে গিয়ে বস!

খোরাসানী বলল:

হে রাসূল (সা .) -এর সন্তান! আমাকে ক্ষমা করুন আমাকে আগুনে পোড়াবেন না।

ইমাম (আ.) বললেন:

অস্থির হয়ো না ,তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি ।

এমন সময় হারুন মাক্কি জুতা খুলে হাতে নিয়ে খালি পায়ে ইমামের (আ.) কাছে উপস্থিত হল এবং সালাম দিল। ইমাম (আ.) তার সালামের জবাব দিয়ে বললেন:

জুতা রেখে ,যাও ঐ আগুনের মধ্যে গিয়ে বস! হারুন জুতা রেখে তৎক্ষণাত আগুনের মধ্যে গিয়ে বসল।

ইমাম (আ.) খোরাসানীর সাথে খোরাসানের বাজার এবং বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করতে লাগলেন যে মনে হচ্ছিল তিনি অনেকদিন যাবৎ সেখানে বসবাস করতেন। অতঃপর সাহলকে বললেন যাও দেখে আস হারুন আগুনের মধ্যে কি করছে । আমি যেয়ে দেখলাম হারুন আগুনের মধ্যে হাঁটু পেতে বসে আছে। আমাকে দেখে আগুনের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসে সালাম করল। ইমাম (আ.) সাহলকে বললেন: খোরাসানে এ ধরনের ক জন লোক পাওয়া যাবে।

সাহল বলল: আলাহর শপথ! এ ধরনের একজন লোকও ওখানে পাওয়া যাবে না।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বললেন:

আলাহর শপথ! এ ধরনের একজন লোকও ওখানে পাওয়া যাবে না। যদি এ ধরনের পাঁচজন লোকও পেতাম তাহলে সংগ্রাম করতাম। আমরাই ভাল জানি যে ,কখন আমাদেরকে সংগ্রাম করতে হবে। 128

সুতরাং আমাদেরকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহয্যকারীদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানতে হবে তাহলে আমরা আমাদেরকে চিনতে পারব এবং সমস্যা সমাধানের জন্য সচেষ্ট্য হব।

1 - পরিচিতি এবং অনুসরণ : ইমাম মাহদী ( আ .)- এর অনুসারীরা তাদের আল্লাহ এ বং ইমামকে খুব ভালভাবে চেনে এবং পরিপূর্ণ পরিচিতির সাথে সত্যের ময়দানে উপস্থিত হয়।

ইমাম আলী ( আ .) তাদের সম্পর্কে বলেছেন :

তারা আল্লাকে সঠিকভাবে চিনেছে । 129

ইমাম পরিচিতিও তাদের অস্তিত্বকে পরিবেষ্টিত করেছে তবে এ পরিচিতি নাম ,ঠিকানা এবং বংশ পরিচিতির অনেক ঊর্ধ্বে। তারা ইমামের বেলায়াতকে চিনেছে এবং তারা জানে যে ,এ পৃথিবীতে ইমামের মর্যাদা কত বেশী। এ পরিচিতির কারণেই তারা ইমামকে অধিক ভালবাসে এবং তার নির্দেশ পালনের জন্য সর্বদা প্রস্তুত। কেননা তারা জানে যে ,ইমামের নির্দেশ আল্লাহরই নির্দেশ এবং তার অনুসরণ আল্লাহরই অনুসরণ।

রাসূল (সা.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

তারা তাদের ইমামের নিদের্শ পালন ও অনুসরণের জন্য সর্বদা চেষ্টা করবে। 130

2- ইবাদৎ এবং সালাবাত: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অনুসারীরা ইবাদতের ক্ষেত্রেও তাদের ইমামের কাছ থেকে আদর্শ নিয়েছেন। তারা দিবারাত্র আল্লাহর যিকির করে অতিবাহিত করে। ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

তারা ইবাদতের মাধ্যমে রাত অতিবাহিত করে এবং রোজার মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করে। 131

তিনি আরও বলেছেন:

তারা উটের পিঠেও আল্লাহর ইবাদত করেন। 132

এই আল্লাহর যিকরই তাদেরকে লৌহ মানবে রূপান্তরিত করেছে এবং একারনেই কোন কিছুই তাদের দৃঢ়তাকে ছিনিয়ে নিতে পারে না। ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

তারা এমন মানুষ যে তাদের মনবল যেন লোহার মত কঠিন। 133

3- শাহাদত পিয়াশি এবং আত্মত্যাগী: ইমাম মাহ্দীর অনুসরারীরা তাদের ইমাম সম্পর্কে গভীর পরিচিতি রাখার কারণে তাদের অন্তরসমূহ ইমামের মহব্বতে পরিপূর্ণ। সুতরাং যুদ্ধের ময়দানে তারা তাদের ইমামকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখবে এবং মৃত্যুকে নিজেদের জীবন দিয়ে ক্রয় করে নিবে।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদীর অনুসারীরা যুদ্ধের ময়দানে তার চারপাশে বিচরণ করবে এবং জীবন দিয়ে স্বীয় ইমামের হিফাজত করবে। 134

তিনি আরও বলেছেন:তারা ইচ্ছ পোষণ করেন যেন আল্লাহর রাস্থায় শাহাদাত বরণ করতে পারেন 135

4 - সাহসীকতা এবং বীরত্ব : ইমাম মাহদী ( আ .)- এর সাহায্যকারীরা তাদের মাওলার ন্যায় সাহসী এবং শক্তিশালী বীরপুরুষ। ইমাম আলী ( আ .) তাদের সম্পর্কে বলেছেন :

তারা প্রত্যেকেই এমন সিংহ যারা খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং তারা যদি ইচ্ছা করে তাহলে পাহাড়কেও স্থানান্তরিত করতে পারে। 136

5 - ধৈর্য ও সবর : বিশ্বব্যাপী অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়তে এবং ন্যায় - নীতিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তুলতে অনেক কষ্ট করতে হবে আর ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর সাহায্যকারীরা সকল সমস্যাকে জী বন দিয়ে ক্রয় করবে। কিন্তু তারা এখলাস ও নমনীয়তার কারণে নিজেদের কাজকে অতি সামান্য মনে করে।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন: তারা এমন এক দল যরা আল্লাহর রাস্থায় ধৈর্য ধারণ করে আল্লাহর উপর অধিকার দাবি করে না। তারা আল্লাহর রাস্তায় জীবন দান করে বড়াই করে না এবং সেটাকে অনেক বড় কিছু মনে করে না (সম্পূর্ণ এখলাসের সাথে তারা এ কাজ করে থাকে।) 137

6 - ঐক্য এবং সহমর্মিতা : ইমাম আলী ( আ .) ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর সাহায্যকারীদের মধ্যে ঐক্য ও সহমর্মিতা সম্পর্কে বলেছেন : তারা প্রত্যেকেই ঐক্যবদ্ধ এবং আন্তরিক। 138

এই আন্তরিকতা এবং ঐক্যের কারণ হচ্ছে তাদের মধ্যে কোন স্বার্থপরতা ,অহংকার এবং ব্যক্তিগত চাহিদা নেই। তারা সঠিক আক্বীদা নিয়ে এক পতাকার নিচে একই উদ্দেশ্যে সংগ্রাম করে এবং এটাই শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের বিজয়ের কারণ।

7 - যোহ্দ বা সাধারণ জীবন - যাপন : ইমাম আলী ( আ .) ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর সাহায্যকারীদের সম্পর্ কে বলেছেন : তিনি তার সাহায্যকারীদের কাছে বায়াত গ্রহণ করবেন যে ,তারা যেন সোনা - জহরত এবং চাল ও গম গচ্ছিত না করে। 139

তাদের অনেক বড় উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তারা মহান উদ্দেশ্যের জন্য প্রস্তুত হয়েছে ,দুনিয়া এবং পার্থিবতা যেন তাদেরকে মহান উদ্দেশ্য থেকে বিরত না রাখে। সুতরাং দুনিয়ার চাকচিক্য দেখে যাদের চোখ বড় হয়ে যায় এবং মন অস্তির হয়ে যায় ইমাম মহদী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের মধ্যে তাদের কোন স্থান নেই। এখানে ইমাম মহাদী (আ.)-এর সাহায্যকারীদের সামান্য কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হল আর এ ধরনের উত্তম বৈশিষ্টের অধিকারী হওয়ার কারণে বিভিন্ন হাদীসে তাদেরকে প্রশংসা করা হয়েছে।

তাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:

اولئکم هم خیار الامة

তারা আমার সর্বোত্তম উম্মত। 140

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

আমার পিতা-মাতা সেই স্বল্প সংখ্যকদের জন্য উৎসর্গিত হোক যারা (আল্লাহর অতি উত্তম বান্দা হওয়া সত্ত্বেও) পৃথিবীতে অপরিচিত রয়েছে। 141

তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাহায্যকারীরা তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে থাকবে। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে ইমাম মাহ্দী (আ.) তার 313 জন বিশেষ সাহায্যকারী নিয়ে সংগ্রাম করবেন যারা এ সংগ্রামের প্রধান ভূমিকা রাখবেন ,তারা ব্যতীত আরও দশ হাজার বিশেষ সৈন্য থাকবে এবং আরও শত-সহস্র মু মিনগণ ইমামের সাহায্যে এগিয়ে আসবেন।

( ঘ )- সর্বসাধারণের প্রস্তুতি : পবিত্র ইমামদের ইতিহাসে দেখা যায় যে ,তাদের উম্মতরা তাদের কাছ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না। তারা পবিত্র ইমামের উপস্থিতিকে মূল্যায়ণ করত না এবং তাদের হেদায়েত গ্রহণ করত না। আল্লাহ তা আলা তার শেষ হুজ্জাতকে অদৃশ্যে রেখেছেন এবং যখন প্রত্যেকেই তাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হবে আল্লাহর নির্দেশে তিনি আবির্ভূত হবেন এবং প্রত্যেককেই তিনি ঐশী মা রেফাতে পরিতৃপ্ত করবেন।

সুতরাং সেই মহান সংস্কারকের আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুতি থাকার একান্ত প্রয়োজন রয়েছে। কেননা ,প্রস্তুত থাকার মাধ্যমেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংস্কার আন্দলোন তার চুড়ান্ত সফলতায় উপণীত হবে।

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে বণী ইসরাঈলের এক দল অত্যাচারী শাসক জালুতের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তাদের নবীর (শামওয়ীল) কাছে এসে বলল: আমাদের জন্য একজন নেতা নির্ধারণ করুন যার নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর পথে জালুতের সাথে যুদ্ধ করব।

أَلَمْ تَرَ‌ إِلَى الْمَلَإِ مِن بَنِي إِسْرَ‌ائِيلَ مِن بَعْدِ مُوسَىٰ إِذْ قَالُوا لِنَبِيٍّ لَّهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُّقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّـهِ  قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِن كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلَّا تُقَاتِلُوا  قَالُوا وَمَا لَنَا أَلَّا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّـهِ وَقَدْ أُخْرِ‌جْنَا مِن دِيَارِ‌نَا وَأَبْنَائِنَا  فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ  وَاللَّـهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ

তুমি কি মুসার পরবর্তী বণী ইসরাঈল প্রধানদেরকে দেখনি ? তারা যখন তাদের নবীকে বলেছিল , আমাদের জন্য এক জন নেতা নিযুক্ত কর যাতে আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। তিনি বললেন , এটা তো হবে না যে , তোমাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হলে তখন আর তোমরা যুদ্ধ করবে না ? তারা বলল , আমরা যখন স্ব স্ব আবাসভূমি ও স্বীয় সন্তান - সন্ততি হতে বহিস্কৃত হয়েছি , তখন আল্লাহর পথে কেন যুদ্ধ করব না ? অতঃপর যখন তাদের প্রতি যুদ্ধের বিধান দেওয়া হল তখন তাদের সল্প সংখ্যক ব্যতীত সকলেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল এবং আল্লাহ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত। 142

যুদ্ধের জন্য নেতা চাওয়া প্রমাণ করে যে ,তরা প্রস্তুত ছিল যদিও তাদের অধিকাংশই মাঝ পথে কেটে পড়েছিল এবং অতি স্বল্প সংখ্যক অবশিষ্ট ছিল।

সুতরাং আবির্ভাব তখনই হবে যখন প্রত্যেকেই আন্তরিকভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার ,চারিত্রিক ও মানসিক নিরাপত্তা এবং আত্মিক উন্নতি ও সাফল্য চাইবে । যখন মানুষ অন্যায় ও বৈষম্য থেকে অতিষ্ট হয়ে পড়বে এবং দেখবে যে ,প্রকাশ্যে ধনিদের মাধ্যমে দূর্বলদের অধিকার পয়মল হচ্ছে। পার্থিব সম্পদ একটি বিশেষ শ্রেণীর কাছে গচ্ছিত হচ্ছে ,যখন অনেকেই শুধুমাত্র একবেলা খাওয়ার জন্য মানবেতর জীবন-যাপন করছে ঠিক তখনই এক দল নিজেদের জন্য প্রাসাদ তৈরী করতে ব্যস্ত এবং বিশাল আয়োজন - অনুষ্ঠান ও রংবেরংয়ের খাদ্য সামগ্রি নিয়ে উৎসবে মাতামাতি করছে। এমন পরিস্থিতিতে সকলেই ন্যায়বিচারের জন্য আকুল হয়ে উঠবে।

যখন চারিত্রিক অবনতি বিভিন্নভাবে সমাজে প্রচলিত হবে এবং মানুষ চরিত্র বহির্ভূত কাজে একেঅপরের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতির্ণ হবে এমনকি তারা তাদের কুকর্ম নিয়ে গর্ববোধ করবে অথবা ইসলামী নীতিমালা থেকে এতবেশী দূরে সরে যাবে যে ,অনেক ধরনের গর্হিত কাজকে (পতিতা বৃত্তি ,সমকামিতা ,অশালিনতা...) আনইসংগত করে নিবে। ফলশ্রুতিতে পারিবারিক শৃঙ্খলা পঙ্গু হয়ে পড়বে ,ইয়াতিম ও অনাথ সন্তানে পৃথিবী ভরে যাবে। তখনই যে নেতার হুকুমত বিশ্বে চারিত্রিক নিরাপত্তা দান করবে তার চাহিদা বেশী অনুভব হবে। যখন মানুষ পার্থিব সকল আরাম- আয়েশকে উপভোগ করতে অথচ শান্তি অনুভব করবে না তখন তারাও আধ্যাত্মিক বিশ্বের খোঁজ নিবে এবং ইমামের অপেক্ষায় থাকবে।

তখনই মানুষ ইমামের জন্য আকুল হয়ে অপেক্ষা করবে যখন তারা মানুষের সকল ধরনের শাসনব্যবস্থাকে দেখবে এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে যে ,একমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধি ইমাম মাহদী (আ.) আমাদেরকে শান্তি দিতে পারেন। একমাত্র যে নীতিমালা পবিত্র ও সুনিপুন জীবন মানুষের জন্যে বয়ে আনতে পারে তা হল ঐশী নীতিমালা। সুতরাং সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে ইমামের উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করতে হবে এবং সাথে সাথে ইমামের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট তৈরী করার জন্য চেষ্টা করতে হবে এবং সকল প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে হবে। তখনই কেবল ইমামের আবির্ভাব জটবে।

রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন: এমন সময় আসবে যখন অন্যায়- অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য মোমিনদের আর কোন আশ্রয় থাকবে না। তখন আল্লাহ তা আলা আমার বংশ থেকে একজনকে (ইমাম মাহ্দীকে) প্রেরণ করবেন। 143


2)- আবির্ভাবের নিদর্শন

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন বিপ্লবের বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। এ নিদর্শনসমূহ জানা থাকলে আমাদের অনেক উপকার হবে। এই নির্দশনসমূহ যেহেতু ইমমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সংবাদ দেয় এবং তার এক একটি পরিদৃষ্ট হওয়ার সাথে সাথে প্রতীক্ষাকারীদের মনে আশার আলো জাগায় এবং দুশমনদের মনে ত্রাস সঞ্চার করে। কেননা ,এর মাধ্যমে তাদের অত্যাচারের পালা শেষ হবে এবং মু মিনদের জন্য পবিত্র ইমামের সাথে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার সুযোগ হবে। তাছাড়াও আমাদের যদি জানা থাকে যে ,ভবিষ্যতে কি ঘটবে তাহলে আমরা সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব এবং বুঝতে পারবে যে ,তখন আমাদের কি করতে হবে। এটা আমাদেরকে ভণ্ড মাহ্দী দাবীকারীদেরকে চিনতে সাহায্য করবে। সুতরাং যদি কেউ মিথ্যা মাহ্দী দাবী করে এবং তার সংগ্রামে এসকল নিদর্শন না থাকে তাহলে অতি সহজেই বুঝে নেওয়া সম্ভব হবে যে ,সে মিথ্যা দাবী করছে।

পবিত্র ইমামদের বাণীতে আবির্ভাবের অনেক নিদর্শন বর্ণিত হয়েছে তার কিছু কিছু স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক এবং কিছু কিছু অস্বাভাবিক ও অলৌকিক। এ নিদর্শনসমূহের মধ্য থেকে প্রথমে আমরা নির্ভরযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ রেওয়ায়েতসমূহ বর্ণনা করব এবং শেষে সংক্ষেপে আরও কিছূ নিদর্শন বর্ণনা করব।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহদী (আ.)-এর সংগ্রামের পাঁচটি নিদর্শন রয়েছে , যা হচ্ছে: সুফিয়ানির আবির্ভাব , ইয়ামানির আবির্ভাব , আসমানী গায়েবী আওয়াজ , নাফসে যাকিয়ার হত্যা এবং খুসুফে বাইদা। 144

এখন উপরিউক্ত পাঁচটি নিদর্শনের ব্যাখ্যা দেওয়া হল যদিও এর সবকটিই হয়ত বস্তুনিষ্ঠ নয়।

(ক)- সুফিয়ানির আবির্ভাব:

সুফিয়ানির আবির্ভাব একটি নিদর্শন যা বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে। সুফিয়ানি ,আবু সুফিয়ানের বংশধর যে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু দিন পূর্বে সিরিয়াতে সংগ্রাম করবে। সে এমন এক অত্যাচারি যে হত্যা করতে কোন পরওয়া করে না এবং তার শত্রুদের সাথে অতি ভয়ানক আচরণ করবে।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তার সম্পর্কে বলেছেন:

যদি সুফিয়ানিকে দেখ তাহলে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম লোককে দেখলে। 145

সে রজব মাসে তার সংগ্রাম শুরু করবে। সে সমগ্র সিরিয়াকে তার আয়ত্বে আনার পর ইরাকে হামলা করবে এবং বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাবে।

হাদীসের বর্ণনা মতে তার সংগ্রাম থেকে হত্যা হওয়া পর্যন্ত পনের মাস সময় লাগবে। 146

(খ)- খুসুফে বাইদা :

খুসুফ অর্থাৎ তলিয়ে যাওয়া এবং বাইদা হচ্ছে মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থান। খুসুফে বাইদার ঘটনাটি হচ্ছে যে ,সুফিয়ানি ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যুদ্ধের জন্য মক্কার উদ্দেশ্যে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করবে। তার সৈন্যরা যখন বাইদায় পৌঁছাবে অলৌকিকভাবে তারা মাটির নিচে তলিয়ে যাবে।

ইমাম বাকের (আ.) এসম্পর্কে বলেছেন:

সুফিয়ানির সেনা প্রধান জানতে পারবে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) মক্কার দিকে রওনা হয়েছেন। অতঃপর সৈন্য বাহিনীকে তার দিকে প্রেরণ করবে কিন্তু তাকে দেখতে পাবে না। যখন তার সেনাবাহিনী বাইদায় পৌঁছবে গায়েবী আওয়াজ আসবে হে বাইদা তাদেরকে ধ্বংস কর অতঃপর সেই স্থান তাদেরকে তলিয়ে নিবে । 147

(গ)- ইয়ামানির আবির্ভাব:

ইয়ামান থেকে এক নেতার সংগ্রাম একটি নিদর্শন যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু পূর্বে ঘটবে। তিনি একজন মু মিন ও মোখলেস বান্দা। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বেন। তবে সে সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত কিছু জানা নেই।

ইমাম বাকের (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে যতগুলো সংগ্রাম হবে তার মধ্যে ইয়ামানির সংগ্রামের পতাকা হেদায়েতপূর্ণ। তার পতাকাই হচ্ছে হেদায়েতের পতাকা। কেননা ,সে তোমাদেরকে তোমাদের ইমামের দিকে আহবান করে। 148

(ঘ)- আসমানি আওয়াজ:

আর্বিভাবের পূর্বে অপর যে নিদর্শনটি দেখা যাবে তা হল আসমানী আওয়াজ । এই আসমানী আওয়াজ হাদীসের ভাষ্যমতে হযরত জীব্রাইলের আওয়াজ এবং তা রমযান মাসে শুনতে পাওয়া যাবে। 149 ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রাম যেহেতু বিশ্বজনীন এবং প্রত্যেকেই তার অপেক্ষায় রয়েছে সুতরাং এ আওয়াজের মাধ্যমেই প্রত্যেকে খবর পাবে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) আবির্ভূত হয়েছেন।

ইমাম বাকের (আ.) এসম্পর্কে বলেছেন:

আসমানী গায়েবী আওয়াজ না আসা পর্যন্ত আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন না , যে আওয়াজ পূর্ব ও পশ্চিমের সকলেই শুনতে পাবে। 150

এই আওয়াজ মু মিনদের জন্য যেমন আনন্দদায়ক অসৎকর্মশীলদের জন্য তেমন কঠিন। কেননা ,তাদেরকে অন্যায় ত্যাগ করে সৎকর্মশীল হতে হবে।

এই আওয়াজ সম্পর্কে ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন: আহবানকারী ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তার পিতার নাম ধরে আহবান করবেন। 151

(ঙ)- নাফসে যাকিয়ার হত্যা :

নাফসে যাকিয়ার অর্থ হচ্ছে যে ব্যক্তি পূর্ণতায় পৌঁছেছে অথবা পবিত্র ও নিষ্পাপ ব্যক্তি যে কোন হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয় নি বা অন্যায় করে নি। ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের কিছু পূর্বে একজন নিষ্পাপ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি তার বিরোধীদের হাতে নিহত হবেন।

হাদীসের ভাষ্যমতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের 15 দিন পূর্বে এ ঘটনাটি ঘটবে। ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব এবং নাফসে যাকিয়ার নিহত হওয়ার মধ্যে মাত্র 15টি রাতের ব্যবধান। 152

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের আরও অনেক নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে হচ্ছে: দজ্জালের আগমন (একটি ভণ্ড ও নিকৃষ্ট চরিত্র যে অনেক মানুষকে গোমরাহ করবে) রমযান মাসে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ। ফিতনাসমূহ প্রকাশ পাবে এবং খোরাসান থেকে এক ব্যক্তি সংগ্রাম করবে।


তৃতীয় ভাগ :আবির্ভাব

আবির্ভাবের কথা আসলেই মানুষের মনে মনরম অনুভূতি জাগে। মনে হয় সবুজ উদ্দ্যানে ঝর্ণার পাশে বসে আছে এবং বুলবুলির কণ্ঠে মধুর গান শুনছে। হ্যাঁ সুন্দরের বহিঃপ্রকাশ প্রতীক্ষাকারীদের মনে-প্রাণে সজিবতা দান করে এবং আশাবাদীদের নয়নে আনন্দের চমক সৃষ্টি করে।  

এইঅধ্যায়ে ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব এবং তার উপস্থিতিতে যা ঘটবে সে সম্পর্কে আলোচনা করব অতঃপর তার নজিরবিহীন চেহারাকে যিয়ারত করব।


1) - আবির্ভাবের সময়

যে প্রশ্নটি সবার মনে জাগে তা হল ইমাম মাহ্দী (আ.) কখন আবির্ভূত হবেন ,আবির্ভাবের কোন নিদৃষ্ট সময় আছে কি ?

উত্তর হচ্ছে ইমামদের কথা থেকে বোঝা যায় যে ,আবির্ভাবের সময় আমাদের কাছে গোপন রয়েছে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমরা পূর্বেও আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করি নি এবং ভবিষ্যতেও নির্ধারণ করব না। 153

সুতরাং যারা আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করে তারা প্রতারক ও মিথ্যাবাদী এবং হাদীসের ভাষ্য থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারি।

ইমাম বাকের (আ.)-এর একজন সাহাবা আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন:

যারা সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যাবাদী , যারা সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যাবাদী , যারা সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যাবাদী। 154

এ ধরনের রেওয়ায়েত থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে ,সর্বদা এমন ধরনের মানুষ ছিল যারা তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করত এবং এ ধরনের মানুষ ভবিষ্যতেও থাকবে। এ কারণেই পবিত্র ইমামগণ তাদের অনুসারীদেরকে এ ধরনের ব্যাপারে নিরব না থেকে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে বলেছেন।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে তার এক সাহাবাকে বলেছেন:

যারা আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করে তাকে প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধা কর না কেননা , আমরা কারো জন্য সময় নির্ধারণ করি নি। 155


2) - ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময় গোপন থাকার রহস্য

যেমনটি পূর্বেই বলা হয়েছে আল্লাহর ইচ্ছাতেই আবির্ভাবের সময় আমাদের জন্য গোপন রয়েছে এবং নিঃসন্দেহে হেকমতের কারণেই তা আমাদের জন্য গোপন রয়েছে। কয়েকটি হেকমতকে আমরা এখানে বর্ণনা করছি।

ক)- আশার বিরাজমানতা:   আবির্ভাবের সময় গোপন থাকার কারণে সর্বকালের প্রতীক্ষাকারীদের অন্তরে আশার আলো বিদ্যমান থাকবে। এ আশা চিরস্থায়ী আর এর মাধ্যমেই অদৃশ্যকালীন সময়ের সকল কষ্ট ও চাপের মোকাবেলায় ধৈর্য ধারণ করা সম্ভব। পূর্বের শতাব্দিসমূহে যে সকল শিয়ারা বসবাস করতেন তাদেরকে যদি বলা হত যে ,আপনাদের সময়ে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভব ঘটবে না বরং সুদুর ভবিষ্যতে তা ঘটবে তখন সকল ফিতনা ও সমস্যার মোকাবেলা করা তাদের জন্য খুব কঠিন হয়ে দাড়াত এবং অদৃশ্যের ঐ সময়টি তাদের জন্য অজ্ঞতার যুগ হিসাবে পরিগণিত হত।

খ)- ক্ষেত্র প্রস্তুত:নিঃসন্দেহে গঠনমূলক প্রতীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কেবলমাত্র আবির্ভাবের সময় গোপন থকার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে পারে । কেননা ,আবির্ভাবের সময় জানা থাকলে তারা বুঝবে যে ,আমরা আবির্ভাবের সময়ে থাকব না তাদের মধ্যে আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার মত কোন স্পৃহা থাকবে না।

কিন্তু আবির্ভাবের সময় গোপন ও থাকার কারণে সর্বকালের মানুষ আবির্ভাবের আশায় তা ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। তারা চাইবে যে ,আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার মাধ্যমে তারা তাদের সমাজকে একটি আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণ সমাজে রূপান্তরীত করতে পারবে।

তাছাড়াও আবির্ভাবের সময় নির্ধারিত থাকলে যদি কারণ বসত তা পিছিয়ে যায় তাহলে অনেকেই ইমাম মাহ্দীর প্রতি বিশ্বাস হারাবে ফলে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বে।

ইমাম বাকের (আ.)-এর কাছে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:

যারা সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যাবাদী (এ কথাকে তিনি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেন) হযরত মুসা (আ.) যখন আল্লাহর নির্দেশে ত্রিশ দিনের জন্য তার গোত্রের কাছে থেকে দূরে ছিলেন এবং আল্লাহ সেই ত্রিশ দিনের সাথে আরও দশ দিন বৃদ্ধি করে দিলেন হযরত মুসার গোত্রের লোকেরা বলল: মুসা তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছে ফলে তারা যা না করার তাই করল (অর্থাৎ দ্বীন চ্যুত হয়ে গরুর বাছুরকে পুজা করল।) 156


3) - সংগ্রামের ঘটনা

সকলেই জানতে চান যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন সংগ্রামে কি কি ঘটবে । ইমামের সংগ্রাম কোথা থেকে এবং কিভাবে শুরু হবে। বিরোধীদের সাথে তিনি কেমন আচরণ করবেন। তিনি কিভাবে সারা বিশ্বের উপর কর্তৃত্ব পাবেন এবং সমগ্র বিশ্ব তার আয়ত্বে আসবে। এ ধরনের আরও অনেক প্রশ্ন রয়েছে যা প্রতীক্ষাকারীদের মনকে মশগুল করে রেখেছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ঘটার পর কি ঘটবে সে সম্পর্কে কথা বলা খুবই কঠিন কাজ। কেননা ,ভবিষ্যতে কি ঘটবে সে সম্পর্কে বলা সহজ নয় এবং সঠিক করে কিছু বলাও সম্ভব নয়।

সুতরাং এখানে যা বর্ণনা করব তা হচ্ছে বিভিন্ন হাদীসে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পর কি ঘটবে সে সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তারই বর্ণনা মাত্র।


4) - কিভাবে সংগ্রাম হবে

যখন পৃথিবী অন্যায়-অত্যাচারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে এবং অত্যাচারিরা পৃথিবীকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করবে তখন বিশ্বের মজলুম জনতা আকাশে সাহায্যের হাত তুলে দোয়া করবে ;তখন হঠাৎ করে আসমান থেকে গায়েবী আওয়াজ এসে রাতের অন্ধকার দূর করে আল্লাহর মাসে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের সুসংবাদ দান করবে। 157 অন্তরে কাঁপন উঠবে ,চোখ থিরিয়ে যাবে! ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষাকারীরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর খোঁজ নিবে এবং তাকে দেখার জন্য ও তার পক্ষে শত্রুর সাথে সংগ্রাম করার জন্য অধির হয়ে থাকবে।

তখন সুফিয়ানি যার ক্ষমতা সিরয়িা ,জর্ডান ও ফিলিস্থিনের ব্যাপক এলাকা জুড়ে থাকবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রেরণ করবে। সুফিয়ানির সৈন্যরা মক্কার পথে বাইদা নামক স্থানে মাটিতে তলিয়ে যাবে। 158

নাফসে যাকিয়ার শাহাদতের কিছু দিন পর ইমাম মাহ্দী (আ.) মক্কা শরীফে আবির্ভাব করবেন এবং তার গায়ে রাসূল (সা.)-এর পবিত্র জুব্বা ও হাতে রাসূল (সা.)-এর পতাকা থাকবে। তিনি কা বার গায়ে হেলান দিয়ে আবির্ভাবের গান গাইবেন ও আল্লাহর প্রশংসা করবেন এবং রাসূল (সা.) ও তার পবিত্র বংশধরের উপর দরুদ পাঠ করে বলবেন: হে লোক সকল আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাচ্ছি এবং পৃথিবীর যারা আমাদের ডাকে সাড়া দিবে তাদের কাছেও সাহায্য চাচ্ছি। তখন তিনি নিজের ও বংশের পরিচয় দিবে বলবেন:

فا لله الله فینا لا تخذلونا و ناصرونا ینصر کم الله تعالی

আমাদের অধিকারের ব্যপারে আল্লাহকে দৃষ্টিতে রেখ। আমাদেরকে ( ন্যাবিচারের ময়দানে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ) একা রেখে না আমাদেরকে সাহায্য কর তাহলে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন।

ইমামের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আসমান ও জমিন থেকে পাল্লা দিয়ে এসে ইমামের সাথে বাইয়াত করে তার দলে যোগদান করবে এমনকি তাদের সাথে সাথে ওহীর বাহক হযরত জীব্রাইল (আ.) ও ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর হাতে বাইয়াত করবেন। তখন 313 জন সিদ্ধপুরুষ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে এসে ইমামকে সাহায্য করার জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ হবেন। এভাবে চলতে থাকবে এবং দশ হাজার সৈন্য রাসূলের সন্তান ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর হাতে বাইয়াত করবে। 159

ইমাম মাহ্দী (আ.) তার সৈন্যদেরকে নিয়ে খুব শিঘ্রই মক্কা ও তার আসে পাশে শক্তিধর হয়ে উঠবেন এবং রাসূল (সা.)-এর জন্মভূমি মক্কাকে পাপিষ্টদের কবল থেকে মুক্ত করবে। অতঃপর মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং সেখানে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন ও অসৎকর্মশীলদেরকে উতখাৎ করবেন। তারপর ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন এবং কুফা নগরিকে ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসাবে নির্ধারণ করনে। তিনি সেখান থেকেই সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন এবং ইসলাম ও কোরআনের আইন অনুসারে চলার জন্য বিশ্ববাসীকে দাওয়াত করবেন।

ইমাম মাহ্দী (আ.) পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলোকে একের পর এক জয় করবেন। কেননা ,তিনি বিশ্বস্ত ও ঈমানদার সাহায্যকারীদের পাশাপাশি আল্লাহর ফেরেশ্তাগণের দ্বারাও সাহায্য প্রাপ্ত হবেন। তিনি রাসূল (সা.)-এর মত ভয়ের সৈন্যদেরকে কাজে লাগাবেন এবং আল্লাহপাক শত্রুদের মনে ইমাম মাহ্দী ও তার সৈন্যদের ব্যাপারে এমন ভয় ঢুকিয়ে দিবেন যে ,কোন শক্তিই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সাথে যুদ্ধ করার সাহস পাবে না।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

আমরা আমাদের কায়েমকে তার শত্রুদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিয়ে সাহায্য করব। 160

বলাবাহুল্য যে ,পৃথিবীর একটি স্থান যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সৈন্যদের মাধ্যমে বিজয় হবে তা হচ্ছে বাইতুল মুকাদ্দাস। 161 তারপর আর একটি পবিত্র ঘটনা ঘটবে এবং সে ঘটনা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিল্পবকে শক্তিশালী করবে তা হচ্ছে হযরত ঈসা (আ.)-এর আগমন। কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী হযরত ঈসা (আ.) জীবিত আছেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় আসমানে আছেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পর তিনিও আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীতে আসবেন এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ইমামতিতে নামাজ পড়বেন। আর এভাবে হযরত ঈসা (আ.)-এর উপর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রাধান্য সবার জন্য স্পষ্ট হয়ে যাবে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

সেই আল্লাহর শপথ যিনি আমাকে মানুষের হেদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছেন। যদি মহাপ্রলয়ের এক দিনও অবশিষ্ট থাকে আল্লাহপাক সে দিনকে এত বেশী দীর্ঘায়ীত করবেন যে , আমার সন্তান মাহ্দী সংগ্রাম করবে। অতঃপর ঈসা ইবনে মারইয়াম আসবেন এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পিছনে নামাজ আদায় করবেন। 162

হযরত ঈসা (আ.)-এর এ কাজ দেখে খ্রীষ্টানরা ইসলামধর্ম গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর শেষ গচ্ছিত সম্পদ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতি ঈমান আনবে। আল্লাহ তা আলা হয়ত হযরত ঈসা (আ.)-কে এ কারণেই হেফাজত করে রেখেছিলেন যে তিনি সত্য পিয়াসীদের জন্য হেদায়াতের প্রদ্বীপ হিসাবে কাজ করবেন।

যদিও ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মাধ্যমে মো জেযার বহিঃপ্রকাশ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রামের একটি কর্মসূচী যা মানুষের হেদায়াতের জন্য পথ খুলে দিবে।

এ কারণেই ইমাম মাহ্দী (আ.) অবিকৃত তওরাতের ফলককে (ইহুদীদের পবিত্র কিতাব) আবিস্কার করবে 163 এবং ইহুদীরা তাতে ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর আলামত দেখে ইমামের প্রতি ঈমান আনবে। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরাও এমন পরিবর্তন দেখে এবং সত্যের বাণী শুনে ও মো জেযা দেখে দলে দলে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর দলে যোগদান করবে । এভাবেই আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়ীত হবে এবং সমগ্র বিশ্ব ইসলামের পতাকাতলে একত্রিত হবে।

) هُوَ الَّذِي أَرْ‌سَلَ رَ‌سُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَ‌هُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِ‌هَ الْمُشْرِ‌كُونَ (

তিনিই পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীনসহ তার রাসূল প্রেরণ করেছেন অপর সমস্থ দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করার জন্য যদিও মুশরিকরা তা অপ্রিতিকর মনে করে । 164

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে ,একমাত্র জালিম এবং অত্যাচারীরা সত্যের কাছে মাথা নত করবে না এবং তারা মু মিনদের মোকাবেলায় কিছু করতেও পারবে না। অবশেষে তারা ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর ন্যায়বিচারের তলোয়ারে দিখণ্ডিত হবে এবং পৃথিবী চিরতরে তাদের অন্যায় থেকে মুক্তি পাবে।


পঞ্চম অধ্যায় : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত

মেঘ ও কালো পর্দা সরে যাওয়ার পর বিশ্বের সূর্য তার চেহারা উম্মোচন করবেন এবং গোটা বিশ্বকে তার জ্যোতিতে আলোকিত করবেন।

হ্যাঁ ,অন্যায় ও ফ্যাসাদের সাথে সংগ্রাম করার পর ন্যায়বিচারের হুকুমতের পালা আসবে। তখন ন্যায়বিচার হুকুমতের আসনে উপবিষ্ট হবেন এবং প্রতিটি জিনিসকে তার উপযুক্ত স্থানে স্থান দান করবেন ও প্রত্যেকের অধিকারকে ন্যায়ের ভিত্তিতে বন্টন করবেন। মোটকথা পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা সত্য ও ন্যায়পরায়ণ হুকুমত দেখতে পাবে এবং সেখানে কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করা হবে না। সে হুকুমতে থাকবে ঐশী সৌন্দর্য এবং তার ছায়াতলে মানুষ তার সকল অধিকার খুঁজে পাবে। এ অধ্যায়ে আমরা চারটি প্রসঙ্গে আলোচনা করব:

1- ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্যসমূহ।

2- বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কার্যক্রমসমূহ।

3- ঐশী ন্যায়পরায়ণ হুকুমতের সাফল্য ও অবদানসমূহ।

4- ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বৈশিষ্ট্যসমূহ।


প্রথম ভাগ :ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্যসমূহ

সমগ্র সৃষ্টির উদ্দেশ্য যেহেতু পূর্ণতায় পৌছানো এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভ আর এ মাহান উদ্দেশ্যে পৌছানোর জন্য প্রয়োজন তার সরঞ্জাম প্রস্তুত করা। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্যলাভ এবং তাতে উপণীত হতে সকল প্রতিকুলতাকে অপসারণ করা।

মানুষ যেহেতু শরীর ও আত্মা দিয়ে তৈরী কাজেই তার প্রয়োজনও ,পার্থিব ও আধ্যাত্মিক দুই ভাগে বিভক্ত। সুতরাং পূর্ণতায় পৌছানোর জন্য দু দিকেই সমানভাবে অগ্রসর হতে হবে। ন্যায়পরায়ণতা যেহেতু ঐশী হুকুমতের মূলমন্ত্র কাজেই তা মানুষের দু দিকেই উন্নত করার জামানত দিতে পারে ।

সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতি ,ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও তার প্রসার।

ক) - আধ্যাত্মিক উন্নতি

উপরিউক্ত উদ্দেশ্যসমূহের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই তাগুতি হুকুমতসমূহের দিকে দৃষ্টিপাত করতে হবে।

মানুষের জীবনে ঐশী হুকুমত ব্যতীত ,আধ্যাত্মিকতা এবং আধ্যাত্মিক মর্যাদা কোন অবস্থানে ছিল ?এমনটাই নয় কি যে ,মানবতা লোপ পেয়েছিল ,সর্বদা মানুষ আসৎ পথে চলত ,নফসের তাড়নায় এবং শয়তানের প্ররচনায় জীবনের সকল মর্যাদাকে ভুলে গিয়ে মানুষ তাদের সকল ইতিবাচক গুনকে নিজের হাতে কামনা-বাসনার গোরস্থানে দাফন করে রেখেছিল ?পবিত্রতা ,শালিনতা ,সত্যবাদিতা ,সৎকর্ম ,সাহয্য- সহযোগিতা ,ত্যাগ-তিতিক্ষা ,দানশীলতা ও বদান্যতার স্থানে ছিল নফসের তাড়না ,কামনা-বাসনা ,মিথ্যাচার ,স্বার্থপরতা ও সুযোগসন্ধান ,খিয়ানত ,পাপাচার এবং উচ্চাভিলাস। মোটকথা তাগুতি হুকুমতকালীন সময়ে মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিকতা তার শেষ প্ররহর গুনছিল এবং এমনকি কিছু কিছু স্থানে ও কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তার (আধ্যাত্মিকতার) কোন অস্থিত্বই ছিল না।

ইমাম মাহদী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতে মানুষের জীবনের এ অধ্যায়কে জীবিত এবং তাতে প্রাণ সঞ্চার করার জন্য চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকৃত জীবনের মিষ্টি স্বাদ মানুষকে আস্বাদন করাবেন এবং সকলকে স্মরণ করিয়ে দিবেন যে ,প্রথম থেকেই তাদেরকে এমন পবিত্রতাকে অনুভব করার কথা ছিল।

) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّـهِ وَلِلرَّ‌سُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ (

হে মু মিনগণ! রাসূল যখন তোমাদেরকে এমন কিছুর দিকে আহবান করে যা তোমাদেরকে প্রাণবন্ত করে ,তখন আল্লাহ ও রাসূলের আহবানে সাড়া দিবে। 165

মানুষের আত্মিক দিকটা যেহেতু তাদেরকে অন্যান্য পশুদের থেকে পৃথক করে সুতরাং তা মানুষের বৃহদাংশ তথা প্রধান অংশকে গঠন করে। কেননা ,মানুষ আত্মার অধিকারী হওয়ার কারণেই মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছে এবং এদিকটাই তাকে আল্লাহর নৈকট্যলাভে সাহায্য করে থাকে।

এ কারণেই আল্লাহর ওয়ালীর হুকুমতে মানুষের অস্তিত্বের এ দিকটিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং আত্মিক মর্যাদা ও মানবীয় গুনাবলী জীবনের প্রতিটি দিকে প্রাধান্য পাবে। আন্তরিকতা ,আত্মত্যাগ ,সত্যবাদিতা এবং সকল উত্তম গুনাবলী সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।

তবে এ উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর জন্য একটি গঠনমূলক কর্মসূচীর প্রয়োজন রয়েছে যা পরবর্তীতে বর্ণিত হবে।

খ) - ন্যায়পরায়ণতার প্রসার

যুগ যুগ ধরে মানুষের উপর যে বড় ধরনের অপরাধটি সংঘটিত হচ্ছে তা হল জুলুম ও অত্যাচার। মানুষ সর্বদা তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং মানুষের পার্থিব ও আত্মিক অধিকার কখনোই ন্যায়ের ভিত্তিতে বণ্টিত হয় নি। সর্বদা ভরাপেটদের পাশাপাশি খালিপেটদেরকে (ক্ষুধার্তদেরকে) দেখা গেছে এবং বড় বড় প্রাসাদ ও অট্টালিকার পাশাপাশি শত-সহস্র মানুষকে পথে-ঘাটে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে। শক্তিশালী ও বিত্তশালীরা দূর্বলদেরকে দাস হিসাবে ব্যবহার করেছে। কৃষ্ণাঙ্গরা শেতাঙ্গদের কাছে অত্যাচারিত হয়েছে । মোটকথা সর্বদা ও সর্বত্র দূর্বলদের অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে এবং জালেমরা তাদের অসাধু চাহিদাকে চরিতার্থ করেছে। মানুষ সর্বদা ন্যায়পরায়ণতা ও সাম্যের জন্য প্রহর গুনেছে এবং ন্যায়বিচার সম্পন্ন হুকুমতের জন্য অধির আগ্রহে প্রতীক্ষা করেছে।

এই প্রতীক্ষার শেষ হচ্ছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ শাসনব্যাবস্থা। তিনি মহান ন্যায়পরায়ণ নেতা হিসাবে সারা বিশ্বে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। বিভিন্ন রেওয়ায়েতও সে সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে।

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন: যদি মহাপ্রলয়ের মাত্র একটি দিনও অবশিষ্ট থাকে আল্লাহ তা আলা সে দিনকে এত বেশী দীর্ঘায়ীত করবেন যে ,আমার বংশ থেকে একজন আবির্ভূত হবে এবং পৃথিবী যেমন অন্যায়- অত্যাচারে ভরে গিয়েছিল তেমনিভাবে ন্যায়নীতিতে ভরে তুলবেন। রাসূল (সা.)-এর কাছে আমি এমনটি শুনেছি। 166

এ ধরনের আরও বহু রেওয়ায়েত রয়েছে যেখানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ছায়াতলে বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অত্যাচারকে নির্মূল করার সংবাদ দেওয়া হয়েছে।

এটা জানা প্রয়োজন যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতার বৈশিষ্ট্যটি এত বেশী স্পষ্ট যে ,কিছু কিছু দোয়াতেও তাকে ওই উপাধিতে ভুষিত করা হয়েছে:

اللهم و صلی علی ولی امرک القائم المومل و العدل المنتظر

হে আল্লাহ আপনার ওয়ালী আমরের উপর শান্তি বর্ষিত করুন যিনি আদর্শ সংগ্রাম করবেন এবং সবার প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার। 167

হ্যাঁ তিনি ন্যায়বিচারকে তার বিপ্লবের মূলমন্ত্র করেছেন। কেননা ,ন্যায়বিচার হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের প্রাণ এবং ন্যায়পরায়ণতা ব্যতীত পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা প্রাণহীন মানুষ যাদেরকে কেবল জীবিত মনে করা হয়ে থাকে। ইমাম কাযিম (আ.) নিম্নলিখিত আয়াতের তাফসীর সম্পর্কে বলেছেন:

( اعْلَمُوا أَنَّ اللَّـهَ يُحْيِي الْأَرْ‌ضَ بَعْدَ مَوْتِهَا قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ )

এ আয়াতের অর্থ এই নয় যে ,আল্লাহ জমিনকে পানি দিয়ে জীবিত করেন বরং তিনি এমন ধরনের মহাপুরুষদেরকে 168 প্রেরণ করেন যারা ন্যায়পরায়ণতাকে জীবিত করেন। অতঃপর (সমাজে) ন্যায়বিচার জীবিত হওয়ার মাধ্যমে জমিন জীবিত হয়।

জমিন জীবিত হওয়া বলতে বোঝানো হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর ন্যায়বিচার হচ্ছে সর্বজনীন ন্যায়বিচার যা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।


দ্বিতীয় ভাগ :বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কার্যক্রমসমূহ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রামী উদ্দেশ্যের সাথে পরিচিত হওয়ার পর এই উদ্দেশ্যে উপণীত হওয়ার জন্য তার কার্যক্রমসমূহ নিয়ে আলোচনার পালা আসে। আর এর মাধ্যমেই আবির্ভাবের মুহুর্তের কর্মসূচীর পরিচিতি পেলেই আবির্ভাবের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত কি করা প্রয়োজন তার আর্দশ গ্রহণ করা সম্ভব। এভাবে যারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষায় রয়েছে তারা তার প্রশাসনিক কর্মসূচীর সাথে পরিচিত হতে পারবে এবং নিজেদেরকে ও সমাজকে সে পথে অগ্রসরীত হতে প্রস্তুত করবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত সম্পর্কে যে সকল রেওয়ায়েত বর্ণিত হয়েছে তা থেকে বোঝা যায় যে ,তার হুকুমতের প্রধান তিনটি কর্মসূচী রয়েছে এবং তা হচ্ছে: সাংস্কৃতিক কর্মসূচী ,সামাজিক কর্মসূচী এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচী।

অন্য কথায় বলতে গেলে মনুষ্য সমাজ যেহেতু কোরআন ও আহলে বাইতের আদর্শ থেকে পিছিয়ে পড়েছে সুতরাং একটি বড় ধরনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রয়োজন রয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ কোরআন ও ইতরাতের কোলে ফিরে আসবে।

অনুরূপভাবে একটি পরিপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচী এ জন্য প্রয়োজন যে ,সমাজে এমন একটি সঠিক সমাজ ব্যবস্থার দরকার যার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষ তার নিজেস্ব অধিকার প্রাপ্ত হবে। কেননা ,এত দিন ধরে যে অন্যায় ও অবিচার চলে আসছে অর্থাৎ ঐশী অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে এবং জালেমী পদ্ধতি সমাজকে নিষ্ঠুর পর্যায়ে নিয়ে গেছে একটি ন্যায় ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থাই তা থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে।

একটি আদর্শ সভ্য সমাজ গড়ে তোলার জন্য একটি সুষ্ট অর্থনৈতিক কর্মসূচীরও প্রয়োজন রয়েছে। যার মাধ্যমে পার্থিব সকল সুযোগ-সুবিধা সমভাবে সাবর মধ্যে বণ্টিত হবে। অন্য কথায় এমন একটি গঠনমূলক অর্থ ব্যবস্থার প্রয়োজন যার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত পার্থিব সকল সুযোগ-সুবিধা সমভাবে সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বণ্টিত হবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমাজিক কর্মসূচীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনার পর পবিত্র ইমাম (আ.)-গণের রেওয়ায়েত অনুসারে তার ব্যাখ্যা দান করা হল:

(ক)- সাংস্কৃতিক কর্মসূচী :

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন শাসন ব্যাবস্থায় সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড মানুষের জ্ঞান ও আমল বৃদ্ধির পথে অনুষ্ঠিত হবে এবং মুর্খতার সাথে সার্বিকভাবে মোকাবেলা করা হবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.) -এর ন্যায়নিষ্ঠ শাসনব্যাবস্থার প্রধান প্রধান সাংস্কৃতিক কর্মসূচী হচ্ছে:

1- কোরআন ও সুন্নত জীবন্তকরণ: যুগ যুগ ধরে যখন কোরআন বঞ্চিত ও একাকি হয়ে পড়েছে এবং জীবন পাতার এক কোণে ফেলে রেখেছিল এবং সকলেই তাকে ভুলে গিয়েছিল ;আল্লাহর শেষ হুজ্জাতের হুকুমতের সময়ে কোরআনের শিক্ষা মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রবেশ করবে। সুন্নত যা হচ্ছে মাসুমদের বাণী ,কার্যকলাপ এবং তাকরির ,তা সর্বত্র উত্তম আদর্শ হিসাবে মানুষের জীবনে স্থান পাবে এবং সবার আচরণও কোরাআন ও হাদীসের আলোকে পরিমাপ করা হবে।

ইমাম আলী (আ.) ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কোরআনী হুকুমতকে স্পষ্ট ভাষায় এভাবে বর্ণনা করেছেন: যখন মানুষের নফস হুকুমত করবে তখন (ইমাম মাহ্দী আবির্ভূত হবেন) এবং হেদায়াত ও সাফল্যকে নফসের স্থলাভিষিক্ত করবেন। যেখানে ব্যক্তির মতকে কোরআনের উপর প্রাধান্য দেওয়া হত তা পরিবর্তন হয়ে কোরআনকে সমাজের উপর হাকেম করা হবে। 169

তিনি অন্যত্র আরো বলেছেন: আমি আমার শিয়াদেরকে দেখতে পাচ্ছি যে ,কুফার মসজিদে তাবু বানিয়ে কোরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিল সেভাবে জনগণকে শিক্ষা দিচ্ছে। 170

কোরআন শেখা এবং শিক্ষা দেওয়া কোরআনের সাংস্কৃতির প্রসার ও সমাজের সর্বস্তরে কোরআনের কর্তৃত্বের পরিচায়ক।

2 - মারেফাত ও আখলাকের প্রসার : পবিত্র কোরআন ও আহলে বাইতের শিক্ষাতে মানুষের চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কেননা ,মানুষের উদ্দেশ্যের পথে অগ্রগতি ও উন্নতির মূলমন্ত্র হচ্ছে তার উত্তম চরিত্র। রাসূল (সা.) নিজেও তার নবুয়্যতের উদ্দেশ্যকে চারিত্রিক গুনাবলীকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানো বুঝিয়েছেন। 171 পবিত্র কোরআনও রাসূল (সা.)-কে সবার জন্য উত্তম আদর্শ হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। 172 কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় যে ,মানুষ কোরআন ও আহলে বাইত থেকে দূরে সরে গিয়ে নষ্টামির নোংরা জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। আর এই চারিত্রিক অবক্ষয়ই ব্যক্তি ও সমাজের পতনের মূল।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর শাসনব্যাবস্থায় যা কিনা ঐশী ও আদর্শ হুকুমত সেখানে চারিত্রিক গুনাবলীর প্রসার সবকিছুর উপর প্রাধান্য পাবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন তখন তার পবিত্র হাতকে মানুষের মাথায় বুলাবেন এবং তাদের বিবেককে একত্রিত করবেন ও তাদের চরিত্রকে পরিপূর্ণ করবেন। 173

এই সুন্দর উপমা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের মাধ্যমে যা কিনা চারিত্রিক ও আধ্যাত্মিক হুকুমত সেখানে মানুষের বিবেক ও চরিত্রের পূর্ণতার ব্যাবস্থা থাকবে। কেননা ,যেহেতু মানুষের খারাপ চরিত্র তার খারাপ ও ভণ্ড মানষিকতার ফল ,অনুরূপভাবে মানুষের সুন্দর ও আদর্শ চরিত্রও তার সুস্থ মস্তিষ্কের ফল।

অন্যদিকে কোরআনের হেদায়েতপূর্ণ ঐশী পরিবেশ মানুষকে সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে। সুতরাং মানুষকে ভিতর ও বাহির থেকে শুধু সৌন্দর্যের দিকে পরিচালিত করে আর এভাবেই গোটা বিশ্ব ,মানবিক ও ঐশী গুনাবলীতে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।

3- জ্ঞানের প্রসার: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের অপর সাংস্কৃতিক কর্মসূচী হচ্ছে জ্ঞানের বিপ্লব। ইমাম মাহ্দী (আ.) তার যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। 174 তার সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।

রাসূল (সা.) ইমাম মাহ্দী (আ.) -এর আগমনের সুসংবাদ দেওয়ার সাথে সাথে এটাও বলেছেন:

ইমাম হুসাইন ( আ .)- এর ঔরসের নবম সন্তান হচ্ছেন ইমাম মাহ্দী। সমগ্র বিশ্ব অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার পর আল্লাহ তা আলা তার মাধ্যমে পূনরায় সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করবেন। অন্যায় - অত্যাচারে পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তা ন্যায়নীতিতে পূর্ণ করবেন। অনুরূপভাবে সমগ্র বিশ্ব অজ্ঞতায় পূর্ণ হওয়ার পর তিনি তাকে জ্ঞানের আলোতে আলোকিত করবেন। 175

এই জ্ঞানের বিপ্লব সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য ,সেখানে নারী- পুরুষের কোন ভেদাভেদ থাকবে না। বরং নারীরাও দ্বীনি শিক্ষার চরম শিখরে পৌঁছবে।

ইমাম বাকির (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর হুকুমতের সময়ে তোমাদেরকে জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হবে এবং এমনকি নারীরা ঘরে বসে কিতাব ও সুন্নত অনুসারে বিচার করবে। 176

এটা থেকে প্রমাণ হয় যে ,সে সময়ে তারা কোরআনের আয়াত ও আহলে বাইতের রেওয়ায়েত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করবে। কেননা ,বিচার করা একটি অতি কঠিন কাজ।

4-বিদয়া তের সাথে সংগ্রাম: বিদয়া ত হচ্ছে সুন্নতের বিপরীত যার অর্থ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু প্রবেশ করানো। অনুরূপভাবে ব্যক্তিগত চিন্তা- চেতনাকে দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করানো।

ইমাম আলী (আ.) বিদয়া তকারীদের সম্পর্কে বলেছেন: বিদয়া তকারী তারা যারা আল্লাহ ও তার কিতাবের নির্দেশ অমান্য করে এবং তার রাসূল (সা.)-এর বিরোধিতা করে। তারা নিজেদের নফসের তাড়নায় চলে যদিও তাদের সংখ্যা অধিক হোক না কেন। 177

সুতরাং বিদয়া ত হচ্ছে আল্লাহ ,কোরআন ও রাসূলের বিরোধিতা করা এবং নফসের তাড়নায় ব্যক্তি কেন্দ্রিকভাবে চলা। তবে কোরআন ও হাদীসের ভিত্তিতে নতুন কিছু বের করার সাথে বিদয়া তের অনেক পার্থক্য রয়েছে। বিদয়া ত আল্লাহর বিধান ও রাসূলের সুন্নতকে ধ্বংস করে এবং কোন কিছুই বিদয়া তের ন্যায় ইসলামকে ক্ষতি করে না।

হযরত আলী (আ.) বলেছেন:

ما هدم الدین مثل البدع

কোন কিছুই বিদয়াতের ন্যায় দ্বীনকে ধ্বংস করে না। 178

এ কারণেই দ্বীনদারদেরকে বিদয়া তকারীদের সাথে লড়তে হবে এবং তাদের ধোকার পর্দা উম্মোচন করতে হবে। তাদের অসৎ পথকে মানুষকে দেখিয়ে দিতে হবে এবং এভাবেই জনগণকে গোমরাহি থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।

রাসূল (সা.) বলেছেন: যখন উম্মতের মধ্যে বিদয়া ত প্রকাশ পাবে তখন আলেমদের কর্তব্য হচ্ছে তাদের জ্ঞানের প্রকাশ ঘটানো। যদি কেউ এমনটি না করে তাহলে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হবে। 179

পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে ,রাসূল (সা.)-এর পর তার সুম্পষ্ট পথ থাকার পরও কতধরনের বিদয়া ত যে দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! এভাবে তারা দ্বীনের সঠিক চেহারাকে পাল্টে দিয়েছে ,ইসলামের উজ্জল চেহারাকে নফসের কালো কাপড়ে ঢেকে ফেলেছে। যদিও পবিত্র ইমামরা ও পরবর্তীতে আলেমরা অনেক চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার পরও বিদয়া ত থেকে গেছে এবং তা অদৃশ্যকালীন সময়ে আরও বেশী বেড়ে গেছে।

বর্তমানে বিশ্ব অপেক্ষায় আছে যে ,বিশ্বমানবের মুক্তিদাতা তথা প্রতিশ্রুত মাহ্দী আসবেন ও তার হুকুমতের ছায়তলে সুন্নতসমূহ জীবিত হবে এবং বিদয়া তসমূহ বিতাড়িত হবে। নিঃসন্দেহে ইমাম মাহদী (আ.) বিদয়া ত ও সকল গোমরাহির সাথে সংগ্রাম করবেন এবং হেদায়াতের পথকে সবার জন্য প্রস্তুত করবেন।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

তিনি সকল বিদয়া তকে উৎখাত করবেন এবং সকল সুন্নতকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। 180

(খ )- অর্থনৈতিক কর্মসূচী :

একটি সুস্থ সমাজের পরিচয় হচ্ছে তার সুস্থ অর্থব্যবস্থা। যদি দেশের সকল সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তা একটি বিশেষ গোষ্ঠির হাতে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং সরকার দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের উপর দৃষ্টি রাখে ও সবার জন্য সম্পদের এ উৎস থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ করে দেয় তাহলে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে যেখানে আধ্যাত্মিক উন্নতির সুযোগও বেশী হবে। পবিত্র কোরআন ও মাসুমগণের হাদীসেও অর্থনৈতিক দিক ও মানুষের জীবনের উন্নতির প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে । সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কোরআনী হুকুমতে বিশ্বের অর্থ ব্যবস্থা ও মানুষের জন্য গঠনমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রথমত: উৎপাদন খাত পরিপূর্ণতা পাবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার হবে। দ্বিতীয়ত: অর্জিত অর্থ ও সম্পদ সবার মধ্যে শ্রেণী নির্বিশেষে সমভাবে বণ্টিত হবে।

এখানে আমরা রেওয়ায়াতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আ.) -এর হুকুমতের অর্থনীতিকে জানার চেষ্টা করব:

1 - প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার : অর্থনৈতিক একটি সমস্যা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার না করা। না মাটির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না পানিকে মাটির উর্বরতার জন্য সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বরকতে আকাশ উদারভাবে বৃষ্টি দিবে এবং মাটিও উদারভাবে ফসল দান করবে।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন আকাশ উদারভাবে বৃষ্টি দিবে এবং মাটিও উদারভাবে ফসল দান করবে । 181

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকল সম্পদ ইমামের হাতে থাকবে এবং তিনি তা দিয়ে একটি সুষ্ট অর্থব্যবস্থা গড়ে তুলবেন।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ভূমি পেচিয়ে উঠবে এবং তার মধ্যে লুকাইত সকল সম্পদ প্রকাশিত হবে। 182

2 - সম্পদের সঠিক বণ্টন : পুজবাদি অর্থ ব্যবস্থার মূল সমস্যা হচ্ছে একটি বিশেষ গোষ্ঠির হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া। সর্বদাই এমনটি ছিল যে ,সমাজের এক দল প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জনসাধারণের সম্পদকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করত। ইমাম মাহ্দী (আ.) তাদের সাথে সংগ্রাম করবেন এবং জনসাধারণের সম্পদকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন। এভাবে তিনি হযরত আলী (আ.)-এর ন্যায়বিচারকে সবার কাছে প্রমাণ করবেন।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের কায়েম যখন কিয়াম করবেন সম্পদের সঠিক বণ্টন করবেন এবং সবার সাথে ন্যায়ভিত্তিক আচরণ করবেন। 183

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে সাম্য ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকলেই তাদের ঐশী ও মানবিক অধিকার প্রাপ্ত হবে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

আমি তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দান করছি। আমার ইম্মতে তার আগমন ঘটবে ,সে সম্পদের সঠিক বণ্টন করবে। একজন সাহাবি জিজ্ঞাসা করল: তার অর্থ কি ?রাসূল (সা.) বললেন: অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে। 184

এই সাম্যের ফলাফল হচ্ছে সমাজ থেকে দারিদ্রতা দুরিভূত হবে এবং শ্রেণী বৈষম্য দূর হয়ে যাবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.) সবার সাথে সমান আচরণ করবেন যার ফলে সমাজে আর কোন যাকাত প্রাপ্ত লোকের সন্ধান পাওয়া যাবে না। 185

3 - উন্নয়ন প্রকল্প : সাধারণ হুকুমতসমূহে সমাজের একটি অংশ উন্নত হয়ে থাকে। এ উন্নতি কেবলমাত্র সরকার ও তার আসে-পাশের লোকজনদের জন্য হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে যাদের সম্পদ এবং ক্ষমতার জোর আছে কেবলমাত্র তারাই এ উন্নতির ভাগিদার হয়ে থাকে এবং অন্য সকল শ্রেণীর লোকরা তা থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে উৎপাদন ও বণ্টন সমতার সাথে হবে এবং গোটা বিশ্ব উন্নতির মুখ দেখবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

পৃথিবীর কোথাও অনুন্নত কিছুই থাকবে না , সারা বিশ্ব উন্নতিতে ভরে যাবে। 186

(গ )- সামাজিক কর্মসূচী :

সমাজের উচ্ছৃঙ্খল ও দুস্কৃতিকারীদের সাথে আচরণের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে সুশিল সমাজ গঠনের জন্য কোরআন ও আহলে বাইতের নির্দেশ মোতাবেক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। আর তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের জীবনপ্রণালী আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রস্তুত হবে । যে বিশ্ব ঐশী হুকুমতের আয়ত্বে থাকবে সেখানে সৎকর্মের বিকাশ ঘটবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবহার করা হবে। সেখানে সবার অধিকারকে সমানভাবে প্রদান করা হবে এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা প্রকৃতার্থে বাস্তবায়িত হবে। এখন এ বিষয়টিকে আমরা রেওয়ায়াতের আলোকে পর্যবেক্ষণ করব:

1- ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধের প্রসার: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ বিশেষভাবে প্রসার লাভ করবে। এ ওয়াজিব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে:

) كُنتُمْ خَيْرَ‌ أُمَّةٍ أُخْرِ‌جَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُ‌ونَ بِالْمَعْرُ‌وفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ‌ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّـهِ (

তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত ;মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা সৎকার্যের নির্দেশ দান কর ,অসৎকার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহকে বিশ্বাস কর। 187

এর মাধ্যমে আল্লাহর সকল ওয়াজিব প্রতিষ্ঠিত হবে 188 এবং ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ না করার কারণে পৃথিবীতে এত বেশী অন্যায় ও অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সর্বোত্তম ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে যে ,বাষ্ট্র প্রধানরা এ কাজ করবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

মাহ্দী ও তার সাহায্যকারীরা ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করবেন। 189

2 - ফ্যাসাদ ও চারিত্রিক অবনতীর সাথে সংগ্রাম : ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর সময়ে অন্যায় কাজের নিষেধ কেবলমাত্র মুখেই করা হবে না বরং কার্যত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যার ফলে সমাজে আর কোন ফ্যাসাদ ও চারিত্রিক অবনতী দেখতে পাওয়া যাবে না এবং এবং সমাজ সকল প্রকার পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র হয়ে যাবে। দোয়া নুদবাতে এ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে:

این قاطع حبائل الکذب و الافتراء این طامس آثار الزیغ و الاهواء

তিনি কোথায় যিনি মিথ্যা ও অপবাদকে নির্মূল করবেন ?তিনি কোথায় যিনি সকল অধপতন এবং অবৈধ কামনা-বাসনাকে ধ্বংস করবেন। 190

3 - আল্লাহর বিধানের প্রয়োগ : সমাজের উচ্ছৃঙ্খল ও দুস্কৃতিকারীদের সাথে আচরণের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে সুশিল সমাজ গঠনের জন্য কোরআন ও আহলে বাইতের নিদের্শ মোতাবেক কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। অনুরূপভাবে মানুষের সকল চাহিদা মেটানো ও সমাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যত সকল অন্যায়ের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এর পরও যদি কেউ অন্যায়ে লিপ্ত হয় ,অন্যের অধিকার নষ্ট করে এবং আল্লাহর বিধি লঙ্ঘন করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন: সে আল্লাহর বিধান প্রয়োগ করবে। 191

4- বিচার বিভাগীয় ন্যায়পরায়ণতা : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের প্রধান কর্মসূচী হচ্ছে সমাজের সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি পৃথিবীকে অন্যায়-অত্যাচারে পূর্ণ হওয়ার পর ন্যায়নীতিতে পূর্ণ করবেন। ন্যায়পরায়ণতার একটি বিশেষ ক্ষেত্র হচ্ছে বিচার বিভাগ। কেননা ,এ বিভাগে অনেককেই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেওয়া ,রক্তপাত ঘটানো এবং নির্দোষিদের সম্মান নষ্ট করা হয়েছে! দুনিয়ার বিচারে দূর্বলদেরকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং সর্বদা শক্তিশালী ও জালেমদের পক্ষে রায় গোষণা করা হয়েছে। এভাবে তারা অনেক মানুষের জান ও মালের ক্ষতি সাধন করেছে। অনেক বিচারকরাও তাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অন্যায় বিচার করেছে। অনেক নির্দোষিদেরকে ফাসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়েছে এবং অনেক দোষিদেরকে বেকুসুর খালাস করা হয়েছে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়নিষ্ঠ হুকুমতে সকল অন্যায়-অত্যাচারের অবসান ঘটবে। তিনি যেহেতু আল্লাহর ন্যায়বিচারের বাস্তব চিত্র তাই ন্যায়পরায়ণ বিচারালয় গড়ে তুলবেন এবং সেখানে ন্যায়নিষ্ঠ ,সৎকর্মশীল ও খোদাভীরু বিচারকদেরকে নিয়োগ করবেন। পৃথিবীর কোথাও কারো প্রতি সমান্যতম জুলুম হবে না।

ইমাম রেযা (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

তিনি যখন কিয়াম করবেন পৃথিবী আল্লাহর নুরে আলোকিত হয়ে যাবে। তিনি ন্যায়ের মানদণ্ডকে এমনভাবে স্থাপন করবেন যে কেউ কারো প্রতি সামান্যতম জুলুম করতে পারবে না 192

এ রেওয়ায়েত থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়বিচার এত বেশী ব্যাপক যে অত্যাচারীদের অত্যাচারের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে অন্যায়ের পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ হয়ে যাবে।


তৃতীয় ভাগ :ঐশী ন্যায়পরায়ণ হুকুমতের সাফল্য ও অবদানসমূহ

কোন ব্যক্তি বা দল ক্ষমতায় পৌঁছানোর আগে তার সরকারে কর্মসূচীকে বর্ণনা করে। কিন্তু সাধারণত ক্ষমতায় আসার পর তার কর্মসূচীর কিছুই বাস্তবায়ন করে না এবং মনকি পূর্বের দেওয়া সকল ওয়াদা বেমালুম ভুলে যায়।

কর্মসূচী বাস্তবায়ণ না করতে পারার কারণ হচ্ছে হয়ত কর্মসূচী গঠনমূলক ছিল না অথবা এ কর্মসূচী পরিপূর্ণ ছিল না এবং অধিকংশ ক্ষেত্রে যোগ্যতার অভাবে এমনটি হয়ে থাকে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকল উদ্দেশ্য ও কর্মসূচী গঠনমূলক ও বাস্তবমুখী যার মূলে রয়েছে মানুষের বিকেব ,সকলেই যার প্রতীক্ষায় ছিল। ইমামের সকল কর্মসূচী কোরআন ও সুন্নত মোতাবেক এবং তা সম্পূর্ণটাই বাস্তবায়ন হওয়ার উপযোগি। সুতরাং এ মহান বিপ্লবের সাফল্য অতি ব্যাপক। এক কথায় ইমাম মাহদী (আ.)-এর হুকুমতের সাফল্য মানুষের সকল পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট।

রেওয়ায়াতের আলোকে আমরা এখন তার আলোচনা করব:

1 - ব্যাপক ন্যায়বিচার : বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান বিপ্লবের প্রধান সাফল্য হচ্ছে সর্বজনীন ন্যায়পরায়ণতা। হুকুমতের উদ্দেশ্য নামক অধ্যায়েও আমরা এ সম্পর্কে আলোচনা করেছি। এ অধ্যায়ে আমরা তার সাথে এ বিষয়টিকেও যোগ করতে চায় যে ,কায়েমে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর হুকুমতে সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার একটি মূলমন্ত্র হিসাবে বিরাজ করবে এবং ছোট ,বড় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনকি মানুষের আচরণও ন্যায়ের ভিত্তিতে হবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

আল্লাহর শপথ! ন্যায়বিচারকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিব যেমনভাবে ঠাণ্ডা ও গরম মানুষের ঘরে প্রবেশ করে। 193

ঘর সমাজের একটি ছোট্ট জায়গা আর সেটাই যখন ন্যায়পরায়ণ হয়ে উঠবে এবং পরিবারের সকলেই সবার সাথে ন্যায়সঙ্গত আচরণ করবে তা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমত ক্ষমতা বা আইনের বলে চলবে না বরং কোরআনের নির্দেশ অনুসারে ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। 194 জনগণকে সেভাবেই গড়ে তোলা হবে এবং সকলেই তাদের ঐশী দায়িত্ব পালন করবে। সকলের অধিকারকেই সম্মান দেওয়া হবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায়বিচার একটি মূল সাংস্কৃতি হিসাবে স্থান পাবে এবং মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিবে এবং কোরআনের শিক্ষা থেকে দুরে থাকবে তারাই কেবল এর বিরুদ্ধাচারণ করবে। তবে ন্যায়পরায়ণ হুকুমত তাদের বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ নিবে এবং তাদেরকে কোন সুযোগ দেওয়া হবে না ,বিশেষ করে তাদেরকে হুকুমতে প্রভাব ফেলতে বাঁধা দেওয়া হবে।

হ্যাঁ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে ন্যায়পরায়ণতা এভাবেই প্রভাব বিস্তার করবে আর এভাবেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লবের মহান উদ্দেশ্য বাস্তবাইত হবে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং অন্যায়-অত্যাচার চিরতরে বিদায় নিবে।

2- চিন্তা , চরিত্র ও ঈমানের বিকাশ : পূর্বেই বলা হয়েছে যে ,সমাজের মানুষের সঠিক প্রশিক্ষণ ,কোরআন ও আহলে বাইতের সাংস্কৃতির প্রসারের মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে চিন্তা ,চরিত্র ও ঈমানের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন নিজের হাতকে মানুষের মাথায় বুলিয়ে দিবেন এবং তার বরকতে তাদের জ্ঞান , বুদ্ধি , বিবেক ও চিন্তাশক্তি পুরিপূর্ণতায় পৌঁছবে। 195

ভাল ও সৌন্দর্যসমূহ বিবেক পরিপূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়। কেননা ,বিবেক হচ্ছে মানুষের অভ্যান্তরীণ নবী। তা যদি মানুষের শরীর ও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে মানুষের কর্মও সঠিক পথে পরিচালিত হবে ,আল্লাহর বান্দায় পরিণত হবে এবং সৌভাগ্যবাণ হবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.)-এর কাছে প্রশ্ন করা হল যে ,বিবেক কি ?তিনি বললেন: বিবেক হচ্ছে তা যার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত হয় এবং তার (নির্দেশনার) মাধ্যমে বেহেশত অর্জিত হয়। 196

বর্তমান সমাজে আমরা দেখতে পাই যে ,কামনা-বাসনা বিবেকের উপরে স্থান পেয়েছে এবং নফসের তাড়না ব্যক্তি ,দল ও গোত্রের উপর এককভাবে নেতৃত্ব দান করছে । যার ফলে মানুষের অধিকার পয়মল হচ্ছে ও ঐশী মর্যাদাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সমাজ আল্লাহর হুজ্জাতের নেতৃত্বে যিনি হচ্ছেন পরিপূর্ণ বিবেক। আর পরিপূর্ণ বিবেক কেবলমাত্র সৎকর্মের দিকেই আহবান করবে।

3 - ঐক্য ও সহমর্মিতা : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সকলেই ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিক হবে এবং হুকুমত প্রতিষ্ঠার সময় কারো প্রতি কারো শত্রুতা ও হিংসা থাকবে না।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবেন ,সবার মন থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ দূরিভুত হবে।

তখন হিংসা-বিদ্বেষের আর কোন অজুহাত থাকবে না। কেননা ,তখন সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠত হবে এবং কারো অধিকার পয়মল হবে না ,সকলেই বিবেকের সাথে চলবে ,কামনা-বাসনার সাথে নয়। সুতরাং হিংসা-বিদ্বেষের আর কোনো পথই অবশিষ্ট থাকবে না। এভাবে প্রত্যেকেই আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে জীবন-যাপন করবে এবং কোরআনী ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। 197

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) এ সম্পর্কে বলেছেন: সে সময় আল্লাহ সবার মধ্যে ঐক্য ও আন্তরিকতা দান করবেন। 198

কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে ,আল্লাহ যদি চান তাহলে সবই সম্ভব। আল্লাহর ইচ্ছাতেই বর্তমান সমাজের এই অনৈক্য ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে ইঠবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম কিয়াম করলে প্রকৃত বন্ধুত্ব ও সঠিক আন্তরিকতা প্রতিষ্ঠিত হবে। তখন প্রয়োজনে একজন অন্য জনের পকেট থেকে প্রয়োজনীয় টাকা নিতে পারবে এবং সে তাতে কোন বাধা দিবে না। 199

4 - শারীরিক ও আন্তরিক সুস্থতা : বর্তমান যুগের মানুষের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধির বহিঃপ্রকাশ। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন: পরিবেশ দূষণ ,রাসায়নিক বোমা ,এটোম বোমা ও জীবাণু বোমা। অনুরূপভাবে মানুষের অবৈধ মেলা-মেশা ,জঙ্গল ধ্বংস করা ,পানি দুষণ ইত্যাদির কারণে বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন: ক্যানসার ,এইডস ,মহামারি ,হার্ট এ্যটাক ,পঙ্গুত্ব ইত্যাদি হচ্ছে যার চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব। শারীরিক অসুস্থতা ছাড়াও বহু ধরনের আন্তরিক অসুস্থতা রয়েছে যা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে এবং এটাও মানুষের বিভিন্ন অন্যায়ের কারণে ঘটছে।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণ হুকুমতে মানুষের সকল প্রকার শারীরিক ও আন্তরিক ব্যাধি দূর হয়ে যাবে এবং মানুষের শরীর ও মন অত্যান্ত বলিষ্ঠ হয়ে উঠবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

যখন ইমাম মাহ্দী (আ.) কিয়াম করবেন আল্লাহ তা আলা মু মিনদের সকল অসুস্থতা দূর করে দিবেন এবং সুস্থতা ও (শান্তি ) দান করবেন। 200

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতি ঘটবে এবং আর কোন দূরারোগ্য ব্যাধির অস্তিত্ব থাকবে না । চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ঘটবে এবং ইমামের বরকেতে অনেকে সুস্থ হয়ে উঠবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

যে আমাদের কায়েমকে দেখবে যদি অসুস্থ থাকে সুস্থ হয়ে যাবে আর যদি দূর্বল থাকে তাহলে শক্তিশালী হয়ে যাবে। 201

5 - অধিক কল্যাণ ও বরকত : কায়েমে আলে মুহাম্মদ (আ.)-এর হুকুমতের আরও একটি সাফল্য হচ্ছে অধিক কল্যাণ ও বরকত। তার হুকুমতের বসন্তে সর্বত্র সবুজ-শ্যামল ও সাচ্ছন্দময় হয়ে উঠবে। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং মাটি থেকে ফসল উৎপন্ন হবে ও ঐশী বরকতে ভরপুর হয়ে যাবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আল্লাহ তা আলা তার কারণে আকাশে ও মাটিতে বরকতের বন্যা বইয়ে দিবেন। আকাশ থেকে রহমতের বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং মাটি থেকে ফসল উৎপন্ন হবে 202

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে আর কোন অনুর্বর ভুমি থাকবে না প্রতিটি স্থানই সবুজ-শ্যামল হবে এবং ফসল দান করবে।

এই নজির বিহীন পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবে সকল প্রকার পঙ্কিলতা দূর হয়ে যাবে এবং পবিত্রতার বৃক্ষ জন্ম নিবে ও ঈমানের ফুল ফুটবে। সব শ্রেণীর মানুষেরা ঐশী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে এবং পারস্পারিক সকল সম্পর্ককে ঐশী মর্যাদা অনুসারে আঞ্জাম দিবে । আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে ,এমন পবিত্র পরিবেশকে কল্যাণ ও বরকতে পরিপূর্ণ করবেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হযেছে:

) وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَ‌ىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَ‌كَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْ‌ضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ (

যদি সেই সকল জনপদের অধিবাসীবৃন্দ ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর কল্যাণ উন্মুক্ত করতাম ,কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদেরকে শাস্তি দিয়েছি। 203

6 - দারিদ্রতা নির্মূল হবে : পৃথিবীর সকল সম্পদ যখন ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর কাছে প্রকাশ পাবে এবং তার যামানার মানুষের উপর আকাশ ও মাটির সকল বরকত বর্ষিত হবে ও মুসলমানদের বাইতুল মাল সমভাবে বণ্টিত হবে তখন দারিদ্রতার আর কোন স্থান থাকবে না। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে সকলেই অভাব ও দারিদ্রতার কালো থাবা থেকে মুক্তি পাবে। 204

তার সময়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের সাথে গড়ে উঠবে। ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা ও অর্থলিপ্সার স্থানে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ব স্থান নিবে। তখন সকলেই প্রত্যেককে একই পরিবারের সদস্য মনে করবে। সুতরাং প্রত্যেকেই অন্যকে নিজের মনে করবে এবং তখন সর্বত্র একতা ও অভিন্নতার সুবাস ছড়িয়ে পড়বে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.) বছরে দুই বার জনগণকে দান করবেন এবং মাসে দুই বার তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তা পূরণ করবেন। এ ক্ষেত্রেও তিনি সমানভাবে সবার মধ্যে বণ্টন করবেন। এভাবে মানুষ স্বনির্ভর হয়ে উঠবে এবং যাকাতের আর প্রয়োজন হবে না। 205

বিভিন্ন রেওয়ায়েত থেকে বোঝা যায় যে ,মানুষের স্বনির্ভরতার কারণ হচ্ছে তারা স্বল্পে তুষ্ট। অন্য কথায় মানুষের পার্থিব ধন-সম্পদ বেশী হওয়ার পূর্বে যার মাধ্যমে স্বনির্ভর হবে আত্মিক প্রশান্তি তথা আত্মিক স্বনির্ভরতার প্রয়োজন। আল্লাহ তা আলা তাদেরকে যা দিয়েছেন তারা তাতেই সন্তুষ্ট। কাজেই অন্যের সম্পদের দিকে তাদের কোন লোভ বা লালসা থাকবে না।

রাসূল (সা.) এ সম্পর্কে বলেছেন:

আল্লাহ তা আলা স্বনির্ভরতাকে মানুষের অন্তরে দান করে থাকেন 206

যদিও ইতিপূর্বে অর্থাৎ ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে মানুষ ,লালসা ও সম্পদের আধিক্যের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল এবং গরিবদের প্রতি দান-খয়রাতের কোন ইচ্ছাই তাদের মধ্যে ছিল না। মোটকথা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে মানুষ বাহ্যিক ও আন্তরিক উভয় দিক থেকেই স্বনির্ভর থাকবে। এক দিকে অধিক সম্পদ সমভাবে বণ্টিত হবে অন্য দিকে অল্পে তুষ্টি মানুষকে স্বনির্ভর করবে।

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:

আল্লাহ তা আলা উম্মতে মুহাম্মদিকে স্বনির্ভর করবেন এবং সকলেই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়পরায়ণতার অন্তর্ভূক্ত হবে। ইমাম মাহ্দী একজনকে বলবেন যে ঘোষণা কর:

কার সম্পদের প্রয়োজন আছে ?তখন সবার মধ্য থেকে মাত্র একজন বলবে আমার! তখন ইমাম (আ.) তাকে বলবেন: ক্যাশিয়ারের কাছে যেয়ে বল , ইমাম মাহ্দী (আ.) আমাকে পাঠিয়েছেন এবং আমাকে টাকা দিতে বলেছেন। তখন ক্যাশিয়ার তাবে বলবে: তোমার জামা (আরবী লম্বা জামা) নিয়ে এস ,অতঃপর তার জামা অর্ধেক টাকায় ভরে দেওয়া হবে। সে ওই টাকা গুলোকে পিঠে করে নিয়ে যেতে যেতে ভাববে: উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে আমি কেন এত লোভী। অতঃপর সে তা ফিরিয়ে দিতে চাইবে কিন্তু তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করা হবে না এবং তাকে বলা হবে: আমরা যা দান করি তা আর ফেরত নেই না। 207

7 - ইসলামী হুকুমত এবং কাফেরদের উৎখাত : কোরআন পাকে তিনটি স্থানে ওয়াদা করা হয়েছে যে ,আল্লাহ তা আলা পবিত্র ইসলামকে বিশ্বজনীন করবেন :

) هُوَ الَّذِي أَرْ‌سَلَ رَ‌سُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَ‌هُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِ‌هَ الْمُشْرِ‌كُونَ (

মুশরিকরা অপ্রীতিকর মনে করলেও অপর সমস্ত দীনের উপর জয়যুক্ত করার জন্য তিনিই পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ তার রাসূল প্রেরণ করেছেন। 208

) إِنَّ اللَّـهَ لَا يُخْلِفُ الْمِيعَادَ (

নিশ্চয়ই আল্লাহ ওয়াদা খেলাফ করে না। 209

কিন্তু রাসূল (সা.) ও আল্লাহর ওয়ালীগণের অনেক চেষ্টার পর এখনও তা বাস্তবায়িত হয় নি 210 প্রতিটি মুসলমান সে দিনের প্রতীক্ষায় রয়েছে। এ সত্যটি মাসুম ইমামদের বাণীতেও বর্ণিত হয়েছে।

সুতরাং ইমাম মাহ্দীর হুকুমতে  اشهد ان لا اله الا الله ধ্বনি যা ইসলামের পতাকা এবং আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ গোটা বিশ্বকে পরিপূর্ণ করবে এবং শিরক ও কুফরের কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না।

ইমাম বাকের (আ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর আবির্ভাবের পর এই আয়াতের বাস্তবায়ন ঘটবে।

) قَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ كُلُّهُ لِلَّـهِ فَإِنِ انتَهَوْا فَإِنَّ اللَّـهَ بِمَا يَعْمَلُونَ بَصِيرٌ‌ (

এবং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাক যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং আল্লাহর দ্বীন সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যদি তারা বিরত হয় তবে তারা যা করে আল্লাহ তো তার সম্যক দ্রষ্টা 211

তবে ইসলামের এ বিশ্বজনীনতা ইসলামের সত্যতার জন্যই এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে তা আরও বেশী স্পষ্ট হবে ও সকলকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করবে। কিন্তু যারা শত্রুতা করবে ও নফসের তাড়নায় অবাধ্য হবে তারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর তলোয়ারের মুখোমুখী হবে।

এ অধ্যায়ের শেষ কথা হচ্ছে যে ,এই আক্বীদাগত ঐক্যবদ্ধতা যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ছত্রছায়ায় অর্জিত হবে তা ঐক্যবদ্ধ পৃথিবী গড়ে তোলার একটি উত্তম প্রেক্ষাপট। এই ঐক্যবদ্ধ পৃথিবী ও ঐক্যবদ্ধ আক্বীদা একটি তৌহিদী হুকুমতকে মেনে নিতে প্রস্তুত। অতপর তার ছত্রছায়ায় নিজেদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সর্ম্পকে একই আক্বীদার ভিত্তিতে সুসজ্জিত করবে। এ বর্ণনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে ,আক্বীদাগত ঐক্যবদ্ধতা এবং সকল মানুষের একই দ্বীন ও একই পতাকার তলে একত্রিত হওয়াটা অতিব জুরুরি বিষয় যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতে অর্জিত হবে।

8 - সর্বসাধারণের নিরাপত্তা : ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর হুকুমতে মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে সব ধরনের সৎকর্ম ছড়িয়ে পড়বে তখন নি রাপত্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া অর্জিত হবে।

সকল মানুষ যখন একই আক্বীদার অনুসরণ করে ,সামাজিক আচরণেও ইসলামী আখলাক মেনে চলে এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন জীবনের কোথাও আর ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। যে সমাজে প্রত্যেকেই তার অধিকার প্রাপ্ত হয় এবং সামান্যতম অপরাধেরও উপযুক্ত শাস্তি হয় সেখানে অতি সহজেই সামাজিক নিরাপত্তা অর্জিত হওয়া সম্ভব।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

আমাদের সময়ে অতি কঠিন সময় অতিবাহিত হবে কিন্তু যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবে তখন সকল হিংসা - বিদ্বেষ দূরীভ ূত হবে এমনকি সব ধরনের পশু - পাখিরাও একত্রে জীবন - যাপন করবে। সে সময়ে পরিবেশ এত বেশী নিরাপদ হবে যে , এক জন নারী তার সকল স্বর্ণ - অলঙ্কার ও টাকা - পয়সাসহ একাকি ইরাক থেকে সিরিয়া পর্যন্ত নির্ভয়ে পরিভ্রমন করবে। 212

আমরা যেহেতু অন্যায় ,হিংসা ,অত্যাচার ও সকল প্রকার অসৎকর্মের যুগে বসবাস করছি তাই এমন সোনালী যুগের ধারণাও আমাদের জন্য অতি কঠিন ব্যাপার। এর কারণের দিকে যদি দৃষ্টিপাত করি তাহলে বুঝব যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের ওই সবের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। সুতরাং আল্লাহর ওয়াদা বাস্তবায়িত হবে এবং সমাজ নিরাপত্তায় পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তা আলা পবিত্র কোরআনে বলছেন:

) وَعَدَ اللَّـهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْ‌ضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْ‌تَضَىٰ لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُم مِّن بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِ‌كُونَ بِي شَيْئًا وَمَن كَفَرَ‌ بَعْدَ ذَٰلِكَ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে , তিনি অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন , যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন . .. 213

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) এই আয়াতের অর্থ সম্পর্কে বলেছেন: এই আয়াত ইমাম মাহ্দী (আ.) ও তার সাহায্যকারীদের উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে। 214

9 - জ্ঞানের বিকাশ : ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর হুকুমতে জ্ঞান - বিজ্ঞানের ব্যাপক বিকাশ ঘটবে এবং তাত্বিক জ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

জ্ঞান-বিজ্ঞানের 27টি অক্ষর রয়েছে নবীগণ যা এনেছেন তা হচ্ছে মাত্র 2টি অক্ষর এবং জনগণও এই দুই অক্ষরের বেশী কিছু জানে না। যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবে বাকি 25টি অক্ষর বের করবেন এবং মানুষের মধ্যে তা প্রচার করবেন। অতঃপর ওই দু অক্ষরকেও তার সাথে যোগ করে মানুষের মাঝে প্রচার করবেন। 215

এটা স্পষ্ট যে ,মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটবে এবং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে ,ঐ সময়ের প্রযুক্তির সাথে বর্তমান প্রযুক্তির বিশাল ব্যবধান থাকবে। 216

বর্তমান প্রযুক্তির সাথে পূর্বের প্রযুক্তির যেমন বিশাল ব্যবধান রয়েছে। এখানে কয়েকটি হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করা হল:

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ে মু মিন ব্যক্তি প্রাচ্য থেকে তার ভাইকে যে প্রাশ্চাত্যে রয়েছে দেখতে পাবে। 217

তিনি আরও বলেছেন:

যখন আমাদের কায়েম কিয়াম করবে আল্লাহ তা আলা আমাদের অনুসারীদের শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শীক্তকে এত বেশী বৃদ্ধি করে দিবেন যে , ইমাম মাহ্দী (আ.) 28 কিলোমিটার দূর থেকে তার অনুসারীদের সাথে কথোপকথন করবেন এবং তারাও তার কথা শুনতে পাবে ও তাকে দেখতে পাবে। অথচ ইমাম সেখানেই দাড়িয়ে থাকবেন। 218

একজন নেতা হিসাবে দেশের জনগণ সম্পর্কে ইমামের ধারণা ও জ্ঞান সম্পর্কে বর্ণিত হযেছে:

মানুষ ঘরের মধ্যেও কথা বলতে ভয় করবে যে ,যদি দেওয়ালেরও কান থাকে ?219

আধুনিক যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি দেখে তা উপলব্ধি করা খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়। কিন্তু আমরা জানি না যে ,ইমামের সময়ে এই সকল প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে ব্যবহার করা হবে নাকি তিনি নতুন কোন প্রযুক্তির ব্যবস্থা করবেন।


চতুর্থ ভাগ :ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বৈশিষ্টসমূহ

পূর্ববর্তী অধ্যায়সমূহে আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের উদ্দেশ্য ,সাফল্য বা অবদান সম্পর্কে কথা বলেছি। এখর আমরা ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর হুকুমতের কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন: হুকুমতের পরিধি ,ও তার রাজধানী ,হুকুমতের সময় সীমা ও তার কার্যপদ্ধতি ও তার পরিচয় এবং মহান নেতার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করব।

1) - হুকুমতের পরিধি ও তার রাজধানী

এতে কোন সন্দেহ নেই যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত হচ্ছে বিশ্বজনীন। কেননা তিনি হচ্ছেন সমগ্র মানব জাতির মুক্তিদাতা ও তাদের সকল আশার বাস্তবায়নকারী। সুতরাং তার হুকুমতের সকল সৌন্দর্য ,সৎকার্য ও সুফল সারা বিশ্বকে আচ্ছন্ন করবে। এ সত্য বিভিন্ন রেওয়াত থেকে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যায় ,নিম্নে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া হল:

)- অধিক সংখ্যক রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে: পৃথিবী অন্যায়- অত্যাচারে পরিপূর্ণ হওয়ার পর ইমাম মাহ্দী (আ.) পূনরায় পৃথিবীকে ন্যায়- নীতিতে পূর্ণ করবেন। 220 الارض বা মাটি শব্দের অর্থ সমগ্র পৃথিবী এবং সেটাকে পৃথিবীর কিছু অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কোন দলিল আমাদের কাছে নেই।

)- যে সকল রেওয়ায়াতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে সে সকল স্থানের গুরুত্ব ও ব্যাপকতা থেকে বোঝা যায় যে ,তিনি সমগ্র বিশ্বের উপর হুকুমত করবেন। রেওয়ায়াতে যে সকল শহর ও দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা কেবল উদাহরণ মাত্র এবং রেওয়ায়াতে সে সময়ের মানুষের উপলব্ধির দিকেও দৃষ্টি রাখা হয়েছে।

বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) চীন ,রোম ,দেইলাম ,তুরস্ক ,সিন্ধু ,ভারত ,কাসতানতানিয়া এবং কাবুল বিজয় করবেন। 221

বলাবাহুল্য যে ,ইমামদের যুগ এই সকল এলাকার পরিধি অনেক বেশী ছিল যেমন: রোম বলতে সমগ্র ইউরোপ এমনকি আমেরিকার কিছু অংশকেও বোঝানে হয়েছে। চীন বলতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন: জাপান ,করিয়া ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে ভারত বলতে ভারত উপমহাদেশকে বোঝানো হয়েছে। কাসতাননিয়া বা ইসতামবুল সে সময়ে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারি ছিল এবং তা বিজয় করা অতি গৌরবের বিষয় ছিল। কেননা ,তা ইউরোপে প্রবেশ করার একটি প্রধান কোরিডোর ছিল।

মোটকথা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহের বিজয়ই হচ্ছে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের পরিচায়ক।

)- প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর রেওয়ায়েত ছাড়াও আরও অনেক রেওয়ায়েত রয়েছে যা থেকে বোঝা যায় যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত বিশ্বজনীন।

রাসূল (সা.) বলেছেন যে ,আল্লাহ তা আলা বলেছেন:

আমি তাদের ( বার ইমামের ) মাধ্যমে ইসলামকে সকল দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করব এবং তাদের মাধ্যমে আমার নির্দেশকে বাস্তবয়ন করব। আার সর্বশেষ জনের ( ইমাম মাহ্দীর ) মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে শ ত্রুর হাত থেকে মুক্ত করব এবং তাকে প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের অধিপতি করব। 222

ইমাম বাকের ( আ .) বলেছেন :

কায়েম হচ্ছে রাসূল (সা.)-এর বংশ থেকে এবং তিনি প্রাচ্য ও প্রাশ্চাত্যের অধিপতি হবেন ,আল্লাহ তাকে অপর সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করবেন ,মুশরিকরা অপ্রীতিকর মনে করলেও। 223

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হচ্ছে ঐতিহাসিক কুফা শহর। সে সময়ে কুফার পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে এবং নাজাফও কুফার মধ্যে পড়বে আর সে কারণেই কিছু কিছু হাদীসে নাজাফকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের রাজধানী হচ্ছে কুফা শহর এবং বিচার কার্যের স্থান হচ্ছে কুফার মসজিদ। 224

বলাবাহুল্য যে ,কুফা শহর বহু দিন আগে থেকেই রাসূল (সা.)-এর বংশের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলী (আ.) সেখানে হুকুতম করতেন ,কুফার মসজিদ ইসলামের চারটি নামকরা মসজিদের একটি সেখানে হযরত আলী (আ.) নামাজ পড়াতেন ,খোৎবা দিতেন ,বিচার করতেন এবং শেষ পর্যন্ত তিনি ঐ মসজিদের মেহরাবে শাহাদত বরণ করেন।

2) - হুকুমতের সময় সীমা

দীর্ঘ দিন ধরে মানুষ জালেম ও অত্যাচারী শাসকদের হুকুমতের মধ্যে থাকার পর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমে পৃথিবী ভালর দিকে ধাবিত হবে। তখন সৎকর্মশীলদের মাধ্যমে পৃথিবী পরিচালিত হবে এবং এটা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি যা অবশ্যই বাস্তবাইত হবে।

সৎকর্মশীলদের হুকুমত যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর নেতৃত্বে শুরু হবে এবং দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং আর কখনোই জালেমদের হুকুমত আসবে না ।

হাদীসে কুদসীতে আরও বর্ণিত হয়েছে:

ইমাম মাহ্দী হুকুমতে অধিষ্টিত হওয়ার পর তা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং এ হুকুমত আল্লাহর ওয়ালী ও তাদের বন্ধুদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। 225

সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.) যে ,ন্যায়পারায়ণ হুকুমত গড়ে তুলবেন তা কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে। তারপর আর কোন সরকার আসবে না এবং প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে ,যেখানে সকলেই ঐশী হুকুমতের ছত্রছায়ায় জীবন-যাপন করবে।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন:

আমাদের সরকার শেষ সরকার , অন্য সকলেই আমাদের পূর্বে রাজত্ব করবে। কাজেই আমাদের শাসনব্যাবস্থা দেখে আর কেউ বলতে পারবে না যে , আমরা থাকলেও ঠিক এভাবেই শাসন করাতাম 226

সুতরাং আবির্ভাবের পর থেকে ঐশী হুকুমত কিয়ামত পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং ইমাম মাহ্দী (আ.) তার জীবনের শেষ পর্যন্ত হুকুমত করবেন।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময় সীমা এতটা হতে হবে যে ,তিনি সে সময়ের মধ্যে পারবেন পৃথিবীকে ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ করতে। কিন্তু এ উদ্দেশ্য কয় বছরের মধ্যে সাধিত হবে তা ধারণা করে বলা সম্ভব নয়। এ জন্য পবিত্র ইমামদের হাদীসের স্মরণাপন্ন হতে হবে। তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যোগ্যতা ,আল্লাহর সাহায্য ,যোগ্য সাথী ,পৃথিবীর মানুষের প্রস্তুতি সব মিলিয়ে খুব কম সময়ের মধ্যেই তিনি তার মহান উদ্দেশ্যে উপনীত হবেন। যুগ যুগ ধরে মানুষ যা অর্জন করতে পারে নি ইমাম মাহ্দী (আ.) 10 বছরের কম সময়ে তা অর্জন করবেন।

যে সকল রেওয়ায়াতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা বর্ণিত হয়েছে তা বিভিন্ন ধরনের। কিছু হাদীসে 5 বছর ,কিছুতে 7 বছর ,কিছুতে 8/9 বছর ,কিছুতে 10বছর উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েকটি রেওয়ায়াতে 19 বছর কয়েক মাস এমনকি কোন কোন হাদীসে 40 থেকে 309 বছর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। 227

তবে রেওয়ায়াতে এ ভিন্নতার কারণ আমাদের কাছে স্পষ্ট নয় এবং এত রেওয়ায়াতের মধ্য থেকে সঠিক সময় নির্ধারণ করা অতি কঠিন ব্যাপার। তবে বড় বড় আলেমগণ 7 বছরকে নির্বাচন করেছেন। 228

অনেকে আবার বলেছেন ইমাম মাহ্দী (আ.) 7 বছর হুকুমত করবেন কিন্তু তার হুকুমতের প্রতি এক বছর বর্তমান বছরের 10 বছরের সমান।

রাবী ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেন: ইমাম মাহ্দী (আ.) 7 বছর হুকুমত করবেন তবে তা বর্তমান বছরের 70 বছরের সমান। 229

মরহুম মাজলিসী (রহ.) বলেছেন: ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের সময়সীমা সম্পর্কে যে সকল হাদীস বর্ণিত হয়েছে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন মনে করছি: কিছুতে হুকুমতের পরের সময়কে বোঝানো হয়েছে। কিছুতে হুকুমত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময়কে বোঝানো হয়েছে। কিছুতে বর্তমান বছর ও মাসের কথা বলা হয়েছে এবং কিছুতে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময়ের বছর ও সময়কে বুঝানো হযেছে ,হকিকত আল্লাহই জানেন। 230

3)- ইমামের হুকুমতের আদর্শ

প্রতিটি শাসকই তার হুকুমত পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ আদর্শ মেনে চলে যা তার হুকুমতের নিদর্শন। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এরও রাষ্ট্র পরিচালনার একটি বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। যদিও এর পূর্বে ইমামের রাষ্ট্র পরিচালন পদ্ধতির উপর কিছু ইঙ্গিত করা হয়েছে কিন্তু বিষয়টির গুরুত্বের জন্য স্বতন্ত্রভাবে এ বিষয়ের প্রতি এখানে আলোচনা করা হল। আর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত সম্পর্কে আরও ভাল করে জানার জন্য রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামগণের বাণীর দিকে দৃষ্টি দিব।

প্রথমে যে বিষয়টির উপর গুরুত্ব দিতে হবে তা হল রেওয়ায়াতের আলোকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আদর্শের যে চিত্র বর্ণিত হয়েছে তা রাসূল (সা.)-এর আদর্শ ও পদ্ধতিরই অনুরূপ। রাসূল (সা.) যেভাবে অজ্ঞদের সাথে সংগ্রাম করেছিলেন এবং চিরন্তন ইসলাম যা দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যের সোপান তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)ও তার আবির্ভাবের মাধ্যমে আধুনিক অজ্ঞতার সাথে যা কিনা রাসূল (সা.)-এর সময়ের অজ্ঞতার চেয়েও বেশী ভয়ঙ্কর তার সাথে সংগ্রাম করবেন এবং ইসলামী ও ঐশী মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করবেন।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

ইমাম মাহ্দী ( আ .) রাসূল ( সা .)- এর মতই পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। রাসূল ( সা .) যেভাবে অজ্ঞদের সকল কুসংস্কারকে ধ্বংস করেছিলেন , ইমাম মাহ্দী ( আ .) আধুনিক সকল অজ্ঞতা ও কুসংস্কারকে দূর করে ইসলামের সঠিক স্বরূপকে প্রতিষ্ঠা করবেন। 231

4) - ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর যুদ্ধ পদ্ধতি

ইমাম মাহ্দী (আ.) তার বিশ্বজনীন বিপ্লবের মাধ্যমে কুফর ও শিরককে পৃথিবী থেকে উৎখাৎ করবেন এবং সকলকে পবিত্র ইসলামের দিকে আহবান করবেন।

এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন:

তার আদর্শ ও পদ্ধতি আমার আদর্শের আনুরূপ। সে জনগণকে আমার দ্বীন ও শরিয়তে প্রতিষ্ঠিত করবে 232

তবে তিনি এমন সময় আবির্ভূত হবেন যখন সত্য এমনভাবে প্রকাশ পাবে যে ,সর্ব দিকে থেকে তা সাবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে ।

তার পরও বিভিন্ন রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) অবিকৃত তৌরাত ও ইঞ্জিলের মাধ্যমে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের সাথে আলোচনা করবেন এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে যাবে। 233 এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী যে জিনিসটি সবাইকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করবে তা হচ্ছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) অদৃশ্য থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হচ্ছেন এবং তার মধ্যে নবীদের নিদর্শন রযেছে তা স্পষ্ট বুঝা যাবে। যেমন: হযরত সুলাইমান (আ.)-এর আংটি ,হযরত মুসার লাঠি এবং রাসূল (সা.)-এর বর্ম ,তলোয়ার ও পতাকা তার কাছে থাকবে। 234 তিনি রাসূল (সা.)-এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং বিশ্বজনীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সংগ্রাম করবেন। এটা স্পষ্ট যে ,এই সুন্দর পরিবেশে যেখানে সত্য সম্পুর্ণরূপে সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। কেবলমাত্র তারাই বাতিলের পক্ষে থাকবে যারা সম্পূর্ণরূপে তাদের মানবতা ও ঐশী গুনাবলীকে নষ্ট করে ফেলছে। এরা তারা ,যারা সারাজীবন অন্যায়-অত্যাচার ,ফ্যাসাদ ও কামনা-বাসনার মধ্যে নিমজ্জিত ছিল এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পবিত্র হুকুমত থেকে তাদেরকে উৎখাৎ করা হবে। তখন ইমাম মাহ্দী (আ.) তার তলোয়ার বের করবেন এবং অত্যাচারিদের মাথা দিখণ্ডিত করবেন। এটা রাসূল (সা.) ও আলী (আ.)- এর পদ্ধতিও বটে। 235

5) - ইমাম মাহদী(আ .)-এর বিচার পদ্ধতি

যেহেতু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইমাম মাহ্দী (আ.)-কে গচ্ছিত করে রাখা হযেছে ,তিনি তার দায়িত্ব পালন করার জন্য একটি সুন্দর বিচার বিভাগ গঠন করবেন। সুতরাং তিনি এ ক্ষেত্রে হযরত আলী (আ.)-এর নীতি অনুসরণ করবেন এবং তার সর্বশক্তি দিয়ে মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকারকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিবেন।

তিনি এমন ন্যায়ের ভিত্তিতে আচরণ করবেন যে ,যারা জীবিত তারা বলবে যে ,যারা মৃত্যুবরণ করেছে তারা যদি ফিরে আসত তাহলে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ন্যায়বিচার থেকে লাভবান হতে পারত। 236

বলাবাহুল্য যে ,কিছু কিছু রেওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) বিচারের আসনে হযরত সুলাইমান (আ.) ও হযরত দাউদ (আ.)- এর মত আচরণ করবেন এবং তাদের মত ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করবেন ,সাক্ষ্য-প্রামাণের মাধ্যমে নয়।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন হযরত সুলাইমান ( আ .) ও হযরত দাউদ ( আ .)- এর মত বিচার করবে অর্থাৎ সাক্ষ্য - প্রামাণের প্রয়োজন হবে না ( ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করবেন ) 237

এ ধরনের বিচারের রহস্য হয়ত এটা হতে পারে যে ,ঐশী জ্ঞানের মাধ্যমে বিচার করলে সঠিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কেননা ,মানুষের সাক্ষ্যর ভিত্তিতে বিচার করলে বাহ্যিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিা হতে পারে প্রকৃত ন্যায়বিচার নয়। কারণ মানুষের দ্বারা ভুল হতেই পারে। তবে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিচার পদ্ধতিকে উপলব্ধি করা অতি কঠিন ব্যাপার তবে তার সময়ের সাথে এ পদ্ধতির মিল রয়েছে।

6) - ইমাম মাহদী (আ .)-এর পরিচালনা পদ্ধতি

একটি হুকুমতের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে তার কর্মীরা। একটি প্রশাসনের কর্মচারিরা যদি যোগ্য হয় তাহলে দেশের সকল কর্ম সঠিকভাবে পরিচালিত হবে একং উদ্দেশ্যে উপণীত হওয়া সহজতর হবে।

ইমাম মাহ্দী (আ.) বিশ্বের নেতা হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের জন্য যোগ্য পরিচালক বা গভর্ণর নিয়োগ করবেন। যাদের মধ্যে একজন ইসলামী নেতার সকল বৈশিষ্ট্য যেমন: জ্ঞান ,প্রতিজ্ঞা ,নিয়ত ,আমল এবং বলিষ্ঠ সিন্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। তাছাড়াও ইমাম মাহ্দী (আ.) সমগ্র বিশ্বের নেতা হিসাবে সবর্দা তাদের কাজের উপর দৃষ্টি রাখবেন এবং তাদের কাছে হিসাব নিবেন। এই প্রধান বৈশিষ্ট্য যা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের পূর্বে সকলেই ভুলে গিয়েছিল হাদীসে তা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পরিচয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

ইামাম মাহ্দীর চিহ্ন হচ্ছে কর্মচারিদের কাজে কড়া নজর রাখবেন। অধিক দান-খয়রাত করবেন এবং মিসকিনদের প্রতি অতি দয়ালূ হবেন। 238

7) - ইমাম মাহদী(আ.)-এর অর্থনৈতিক পদ্ধতি

অর্থ বিভাগে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর পদ্ধতি হচ্ছে সাম্য অর্থাৎ সবার মাঝে সমানভাবে অর্থ বণ্টন করা। যে নীতি রাসূল (সা.) নিজেও অবলম্বন করতেন। রাসূল (সা.)-এর পর এ নীতির পরিবর্তন ঘটে এবং অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দেয়। তবে ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হাসান (আ.)-এর সময়ে আবারও মানুষের সমান অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তারপর উমাইয়্যা শাসকরা মুসলমানদের সম্পদকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে এবং তাদের অবৈধ হুকুতমকে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী করে। তারা মুসলমানদের সম্পত্তিসমূহকে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মাঝে বণ্টন করে দেয়। এ পদ্ধতি ওছমানের সময় থেকে শুরু হয় এবং উমাইয়্যাদের সময়ে তা একটি নীতিতে পরিণত হয়।

ইমাম মাহ্দী (আ.) একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসাবে বাইতুলমালকে সবার মাঝে সমানভাবে বণ্টন করবেন এবং মুসলমানদের সম্পদকে (আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে) দান করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করবেন। রাসূল (সা.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবে তখন অত্যাচারি শাসকরা যে সকল সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করেছিল বা আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে বণ্টন করেছিল তা ফিরিয়ে নেওয়া হবে এবং তাদের নিকট আর কোন সম্পত্তি থাকবে না। 239

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সকল মানুষের সমস্যার সমাধান করা এবং তাদের জন্য একটি সচ্ছল জীবন গঠন করা। ইমাম মাহ্দী (আ.) প্রচুর সম্পদ মানুষকে দান করবেন এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিরা সাহায্য চাইলে তাদেরকে সাহায্য করবেন। রাসূল (সা.) বলেছেন:

সে অধিক সম্পদ দান - খয়রাত করবে । 240

এ পদ্ধতিতে ব্যক্তি ও সমাজকে সংশোধন করা সম্ভব যেটা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মহান উদ্দেশ্য। তিনি জনগণকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করার মাধ্যমে মানুষের ইবাদত-বন্দেগির পথকে সুগম করবেন।

8) - ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যক্তিগত আদর্শ

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর ব্যক্তিগত আচরণ এবং জনগণের সাথে ব্যবহারে তিনি একজন ইসলামী শাসকের উত্তম আদর্শ। তার দৃষ্টিতে হুকুমত হচ্ছে মানুষকে খেদমত করার একটি মাধ্যম এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর একটি স্থান। সেখানে পুজিবাদি ও অত্যাচারিদের কোন স্থান নেই।

তিনি রাসূল (সা.) ও আলী (আ.)-এর ন্যায় জীবন-যাপন করবেন। সকল ধন-সম্পদ তার আয়ত্বে থাকা সত্ত্বেও তিনি অতি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবেন।

ইমাম আলী (আ.) তার সম্পর্কে বলেছেন:

সে (মাহ্দী বিশ্বের নেতা হওয়া সত্ত্বেও) প্রতিজ্ঞা করবে যে ,প্রজাদের মত চলাফেরা করবে ,পোশাক পরিধান করবে ও তাদের মতই বাহনে চড়বে এবং অতি অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকবে। 241

ইমাম আলী (আ.)ও পার্থিব জগতে খাদ্য ,পোশাক ও অন্যান্য সকল দিক দিয়ে রাসূল (সা.)-এর অনুরূপ ছিলেন। ইমাম মাহ্দী (আ.)ও তার অনুসরণ করবেন।

ইমাম জা ফর সাদিক (আ.) বলেছেন:

আমাদের কায়েম যখন কিয়াম করবেন হযরত আলী ( আ .)- এর পোশাক পরিধান করবেন এবং তার পদ্ধতিতেই দেশ পরিচালনা করবেন। 242

তিনি নিজে কষ্টে জীবন-যাপন করবেন কিন্তু উম্মতের সাথে একজন দয়ালু পিতার ন্যায় আচরণ করবেন। তাদের কল্যাণ ও সৌভাগ্য কামনা করবেন ,ইমাম রেযা (আ.) বলেছেন:

ইমাম ,সহধর্মি ,সহপাটি ,দয়ালু পিতা ,আপন ভাই ,সন্তানদের প্রতি মমতাময়ী মাতা এবং কঠিন মুহুর্তে মানুষের আশ্রয়স্থল। 243

হ্যাঁ তিনি সবার সাথে এত ঘনিষ্ট ও এত বেশী নিকটবর্তী যে ,সকলেই তাকে নিজেদের আশ্রয়স্থল মনে করবে।

রাসূল (সা.) ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে বলেছেন:

তার উম্মত তার কাছে আশ্রয় নিবে যেভাবে মৌমাছিরা রানী মাছির কাছে আশ্রয় নেয়। 244

তিনি জন নেতার উত্তম দৃষ্টান্ত ,তিনি তাদের মধ্যে তাদের মতই জীবন- যাপন করবেন। এ কারণেই তিনি তাদের সমস্যাকে সহজেই উপলব্ধি করবেন এবং তার প্রতিকারও তিনি জানেন। তিনি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। এমতাবস্থায় কেনইবা উম্মত তার পাশে নিরাপত্তা ও শান্তি অনুভব করবে না এবং কোন কারণে তাকে ছেড়ে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে ?

9) - জনপ্রিয়তা

হুকুমতসমূহের একটি বড় চিন্তা হচ্ছে কিভাবে জনগণের কাছে প্রিয় হবে। কিন্তু তাদের নানাবিধ ত্রুটির জন্য কখনোই তারা মানুষের কাছে প্রিয়ভাজন হতে পারে নি। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জনপ্রিয়তা। তার হুকুমত শুধুমাত্র পৃথিবীর অধিবাসিদের জন্যই জনপ্রিয় হবে না বরং তা আসমানের অধিবাসি ফেরেশতাগণের কাছেও প্রিয় হবে।

রাসূল (সা.) বলেছেন:

তোমাদেরকে মাহ্দীর সুসংবাদ দান করছি যার প্রতি আসমান ও যমিনের সকলেই রাজি ও সন্তুষ্ট থাকবে। আর কেনইবা তারা সন্তুষ্ট থাকবে না যখন জানতে পারবে যে ,দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও সৌভাগ্য কেবলমাত্র তার ঐশী হুকুমতের ছায়াতলেই অর্জন করা সম্ভব। 245

এ অধ্যায়ের শেষে আমরা ইমাম আলী (আ.) -এর অমিয় বাণী দিয়ে ইতি টানব:  

আল্লাহ তা আলা তাকে ও তার সাহায্যকারীদেরকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সাহায্য করবেন এবং নিজের নিদর্শনের মাধ্যমেও তাকে সাহায্য করবেন। তাকে পৃথিবীর উপর বিজয় দান করবেন এবং সকলেই তার দিকে আকৃষ্ট হবে। তিনি পৃথিবীকে ন্যায়নীতিতে আলোকিত করবেন। সকলেই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং কাফেরদের কোন অস্তিত্ব থাকবে না ,অত্যাচারি থাকবে না ,এমনকি পশু-পাখিরাও একত্রে বসবাস করবে। পৃথিবীর সকল সম্পদ বেরিয়ে আসবে ,আসমানও তার বরকত বর্ষন করবে এবং যমিনের সকল গুপ্তধন প্রকাশ পাবে। সুতরাং তাদের প্রতি সুসংবাদ যারা তার সময়কে দেখবে এবং তার কথা শুনতে পাবে। 246


ষষ্ট অধ্যায় :মাহ্দীবাদের অসুবিধাসমূহ

প্রতিটি আন্দোলনেরই কিছু প্রতিকুলতা থাকে যা ওই সাংস্কৃতির উন্নতি ও প্রগতিতে প্রতিন্ধকতা সৃষ্টি করে। ইসলামী আন্দোলনেরও অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে যা তার উন্নতি ও প্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এখানে আমরা ইসলামী আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতাসমূহ ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করব।

এ অধ্যায়ে আমরা মাহ্দীবাদের বিভিন্ন সমস্যা ও তার প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করব।

মাহ্দীবাদের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে যদি আমরা অসাবধান থাকি তাহলে তা ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে মানুষের আক্বীদা বিশেষ করে যুবকদের আক্বীদাকে দূর্বল করবে। কখনো আবার এ কারণে ব্যক্তি বা গোত্র বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে। সুতরাং এই সমস্যাসমূহকে জানার মাধ্যমে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর প্রতীক্ষাকরীরা আক্বীদা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিতে পড়া থেকে মুক্তি পেতে পারে। এখানে আমরা মাহ্দীবাদের প্রধান প্রধান সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব:  

1 - ভুল ধারণা : মাহ্দীবাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে ইসলামের এ সাংস্কৃতি সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা ও ভুল ধারণা। রেওয়ায়াতের ভুল ও অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা মানুষেকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে পারে নিম্নে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া হল।

ক)- প্রতীক্ষার ভাবার্থ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও ব্যাখ্যার কারণে অনেকে মনে করে থাকে যে ,পৃথিবীকে অন্যায় মুক্ত করে ন্যায়-নীতিতে পূর্ণ করা যেহেতু ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর মাধ্যমে সংঘটিত হবে তাই আমাদের কোন দায়িত্বই নেই। বরং অনেকে মনে করে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য সমাজে অন্যায়-অত্যাচার বৃদ্ধি করতে হবে। এ চিন্তা কোরআন ও হদীসের নির্দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেননা ,কোরআনে ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হযেছে।

ইমাম খোমেনী (রহ.) এ সম্পর্কে বলেছেন: আমাদের শক্তি থাকলে সারা বিশ্ব থেকে অন্যায়-অত্যাচার দূর করা আমাদের ইসলামী দায়িত্ব ,কিন্তু আমাদের সে শক্তি নেই। ইমাম মাহ্দী (আ.) পৃথিবীকে ন্যায়নীতিতে পূর্ণ করবেন ,সে জন্য আমাদেরকে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে আমাদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে। 247

তিনি আরও বলেছেন: আমরা কি কোরআনের নির্দেশ অমান্য করে অন্যায় কাজের নিষেধ করা থেকে বিরত থাকব ?ন্যায় কাজের আদেশ করা থেকে বিরত থাকব ?এবং ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের জন্য অন্যায়- অত্যাচারের প্রসার ঘটাব ?248

উল্লেখ্য যে ,আমরা প্রতীক্ষার আলোচনায় সঠিক প্রতীক্ষা সম্পর্কে আলোচনা করেছি।

খ)- অনেকে কিছু হাদীসের বাহ্যিক দিক দেখে এভাবে বর্ণনা করেছেন যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লবের পূর্ব সব ধরনের সংগ্রামই নিরর্থক। সুতরাং ইরানের ইসলামী বিপ্লবকেও অনেকে ভাল দৃষ্টিতে দেখে না।

তাদের জবাবে বলব যে ,ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ব্যতীত আল্লাহর বিধানের প্রয়োগ ,ফ্যাসাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং শত্রুর সাথে জিহাদ করা সম্ভব নয়। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা হচ্ছে একটি অতি পছন্দনীয় পদক্ষেপ। যে সকল রেওয়ায়াতে সংগ্রাম করতে নিষেধ করা হয়েছে তা হচ্ছে বাতিল সংগ্রাম এবং যা পার্থিব সুবিধা ভোগের জন্য অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কোন প্রকার প্রেক্ষাপট ও সময় সুযোগ ছাড়াই ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সংগ্রামের নামে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কাজেই সমাজ সংশোধনের জন্য যে বিপ্লব করা হয়ে থাকে তাতে কোন সমস্যা নেই। 249

)- মাহ্দীবাদ সম্পর্কে অপর একটি ভুল ধারণা হচ্ছে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিপ্লবকে হিংস্র বিপ্লব হিসাবে উপস্থাপন করা।

অনেকে মনে করে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) তলোয়ার দিয়ে রক্তের বন্যা বহিয়ে দিবেন। কিন্তু ইমাম মাহ্দী (আ.) হচ্ছেন অতি দয়ালু এবং তিনি প্রথমে রাসূল (সা.)-এর মত মানুষকে নরম ভাষায় ও স্পষ্ট দলিলের মাধ্যমে ইসলাম ও কোরআনের দিকে দাওয়াত করবেন। অধিকাংশ মানুষ তার আহবানে সাড়া দিবে এবং তার দলের অন্তর্ভূক্ত হবে। সুতরাং ইমাম শুধুমাত্র যারা জেনে শুনে সত্য গ্রহণ করতে চাইবে না এবং অস্ত্রের ভাষা ছাড়া কোন ভাষাই বোঝে না কেবল মাত্র তাদেরকেই হত্যা করবেন।

2 - আবির্ভাবের জন্য তাড়াহুড়া : মাহ্দীবাদের আপর একটি সমস্যা হচ্ছে যে ,আবির্ভাবের জন্য তাড়াহুড়া। এখানে তাড়াহুড়া বলতে কোন কিছুকে তার সময় না হতেই প্রার্থনা করা। তাড়াহুড়াকারীরা তাদের নফসের দূর্বলতার কারণে সব কাজেই অস্থিরতা প্রদর্শন করে এবং পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝেই কিছু ঘটার অপেক্ষায় থাকে।

মাহ্দীবাদের সাংস্কৃতিতে প্রতীক্ষাকারীরা সর্বদা ইমামের অপেক্ষায় রয়েছে ,তার আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার জন্য দোয়া করে ,কিন্তু কখনোই তড়িঘড়ি করে না তাই এ প্রতীক্ষা যতই দীর্ঘ হোক না কেন। সবর্দা ধৈর্য ধারণ করে এবং আবির্ভাবের জন্য আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহর ইচ্ছার কাছে মাথা নত করে ও আবির্ভাবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য চেষ্ট চালাতে থাকে।

আব্দুর রহমান বিন কাছির বলেন: আমি ইমাম জা ফর সাদিক (আ.)-এর কাছে বসেছিলাম তখন মাহরাম প্রবেশ করে বলল: আমরা যার প্রতীক্ষায় আছি তা কবে বাস্তবায়িত হবে ?ইমাম বললেন: হে মাহরাম যারা সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যা বলেছে এবং যারা তড়িঘড়ি করে তারা ধ্বংস হবে ,যারা ধৈর্য ধারণ করবে তারা মুক্তি পাবে। 250

তড়িঘড়ি করতে এ জন্য নিষেধ করা হয়েছে যে ,এ কারণে প্রতীক্ষাকারীরা নিরাশ হতে পারে এবং ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে তা নালিশে রূপান্তরিত হতে পারে। দেরিতে আবির্ভাব তাদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে আর এ অসুখ অন্যদের মধ্যেও প্রবেশ করতে পারে যার কারণে অনেকে ইমামকে অস্বীকার করে বসতে পারে।

বলাবাহুল্য যে ,তাড়াহুড়া করার কারণ হচ্ছে অনেকে জানে না যে ,আবির্ভাব হচ্ছে আল্লাহর সুন্নত এবং ক্ষেত্র প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তা বাস্তাবায়িত হবে না ,কাজেই তারা তাড়াহুড়া করে।

3- আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করা : মাহ্দীবাদের অপর একটি সমস্যা হচ্ছে অনেকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করে। যদিও আবির্ভাবের সময় গোপন রয়েছে এবং ইমামগণের হাদীসে আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করাকে বিশেষভাবে নিষেধ করা হয়েছে ও সময় নির্ধারণকারীদেরকে মিথ্যাবাদী হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

ইমাম বাকের (আ.)-এর কাছে আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: যারা আবির্ভাবের সময় নির্ধারণ করে তারা মিথ্যাবাদী। এ কথা তিনি তিনবার বলেছিলেন। 251

তারপরও অনেকেই আবির্ভাবের সময়কে নির্ধারণ করে যার প্রাথমিক কুফল হচ্ছে যারা এ কথা বিশ্বাস করে এবং তার বিপরীত ফল দেখে তখন তারা নিরাশ হয়ে পড়ে।

সুতরাং প্রকৃত প্রতীক্ষাকরীদেরকে মিথ্যাবাদী ও মুর্খদের থেকে দূরে থাকতে হবে এবং আবির্ভাবের জন্য শুধুমাত্র আল্লাহর উপর ভরশা করবে।

4 - আবির্ভাবের আলামতকে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপর প্রয়োগ করা : বিভিন্ন রেওয়ায়াতে ইমাম মাহ্দী ( আ .)- এর আবির্ভাবের বিভিন্ন আলামত বর্ণনা করা হয়েছে কিন্তু তার সঠিক বৈশিষ্ট্য আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। যদিও কখনো কখনো কেউ এই সকল আলামত দেখে ইমামের আবির্ভাব ত্বরান্বিত হওয়ার খবর দিয়ে থাকে।

এ ঘটনাও মাহ্দীবাদের একটি সমস্যা যার কারণে মানুষ আবির্ভাব সম্পর্কে নিরাশ হয়ে পড়ে। উদাহরণ স্বরূপ সুফিয়ানির চরিত্রকে অন্য কারো মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয় অথবা দজ্জাল সম্পর্কে দলিল বিহীন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ইমামের আবির্ভাব অতি নিকটে এই বলে সবাইকে সুসংবাদ দেওয়া হয় কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও যখন ইমামের আবির্ভাব হয় না তখন অনেকেই বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায় এবং তাদের আক্বীদা নড়বড়ে হয়ে যায়।

5 - অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের আলোচনা : মাহ্দীবাদের সাংস্কৃতিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যার আলোচনা অতি প্রয়োজন। কেননা ,অদৃশ্যের সময়ে শিয়াদের আক্বীদাকে দৃঢ় করার জন্য সেগুলোর প্রধান ভুমিকা রয়েছে।

কখনো এমন কিছু বিষয় নিয়ে সেমিনার ও আলোচনাসভা করা হয় যার কোন গুরুত্বই নেই বরং কখনো তার কারণে প্রতীক্ষাকারীদের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

উদাহরণ স্বরূপ ইমাম যামানার সাথে সাক্ষাৎ নামক সেমিনার সমূহে এ বিষয়টির উপর এত বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ,অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে এবং ফলে অনেকে নিরাশ হয়ে পড়েএমনকি অনেকে ইমাম মাহ্দী (আ.)-কে অস্বীকার করে বসে। বিভিন্ন রেওয়ায়াতে ইমাম মাহ্দী (আ.) যাতে সন্তুষ্ট সে পথে চলতে বলা হয়েছে ,কথা ও কাজে ইমামের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। সুতরাং ইমামের অদৃশ্যকালে প্রতীক্ষাকারীদের কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করতে হবে যার মাধ্যমে যদি কখনো ইমামের সাথে সাক্ষাতের সৌভাগ্য হয় তখন যেন তিনি আমাদের উপর সন্তুষ্ট থাকেন।

ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিবাহ ,তার সন্তান এবং তিনি কোথায় জীবন- যাপন করেন এগুলির সবই অপ্রয়োজনীয় আলোচনার মধ্যে পড়ে। এগুলোর পরিবর্তে প্রতীক্ষাকারীদের জীবনে যা গঠনমূলক ভূমিকা রাখে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এ কারণেই আবির্ভাবের নিদর্শনের আলোচনার চেয়ে আবির্ভাবের শর্ত ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা বেশী জরুরী। কেননা ,আবির্ভাবের শর্তসমূহ জানতে পারলে ইমাম মাহ্দী (আ.)- এর প্রতীক্ষাকারীরা সেই পথে অগ্রসর হতে আগ্রহী হবে।

মাহ্দীবাদের আলোচনায় সব দিকে দৃষ্টি রাখা অতি প্রয়োজন। অর্থাৎ ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে আলোচনা করার সময় সব বিষয়ে পড়াশুনা করার প্রয়োজন। কখনো কেউ কেউ কয়েকটি হাদীস পড়ে অন্য হাদীসসমূহের দিকে দৃষ্টি রেখেই মাহ্দীবাদ সম্পর্কে একটি ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ কেউ কেউ কয়েকটি হাদীস পড়ে খবর দিল যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সময় দীর্ঘ দিন ধরে যুদ্ধ হবে এবং অধিক রক্তারক্তি হবে। এভাবে তারা ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর একটি কঠোর মুর্তি অঙ্কন করেছে। অপর রেওয়ায়েত সমূহে যে ,ইমামের দয়া মহানুভবতা এবং তার চারিত্রিক গুনাবলিকে রাসূল (সা.)-এর চারিত্রিক গুনাবলির সাথে তুলনা করা হয়েছে সেদিকে কোন দৃষ্টিপাত করে না। এই দু ধরনের হাদীসের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দিলে বোঝা যাবে যে ,ইমাম মাহ্দী (আ.) সবার সাথে অতি দয়ালু আচরণ করবেন। তবে অত্যাচারী ও জালেমদের সাথে তিনি কঠোর আচরণ করবেন।

সুতরাং ইমাম মাহ্দী (আ.) সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে অনেক জ্ঞান থাকার প্রয়োজন রয়েছে। যাদের মধ্যে সে যোগ্যতা নেই তাদেরকে এই সম্পর্কে আলোচনা করার কোন দরকারও নেই। কেননা ,তারা এ বিষয়ে প্রবেশ করলে মাহ্দীবাদের অনেক ক্ষতি সাধন করবে।

10) - মিথ্যা মাহ্দী দাবীকারী

মাহ্দীবাদের অপর একটি সমস্যা হচ্ছে যে ,অনেকেই নিজেকে মাহ্দী বলে দাবী করবে। ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর সুদীর্ঘ অদৃশ্যকালে অনেকেই মিথ্যা দাবী করেছে যে ,তার সাথে আমাদের বিশেষ সম্পর্ক আছে অথবা তার পক্ষ থেকে নায়েব বা বিশেষ প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে।

ইমাম মাহ্দী (আ.) তার শেষ চিঠিতে চতুর্থ বিশেষ প্রতিনিধির কাছে লিখেছিলেন:

তুমি ছয় দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করবে , সকল কাজ ঠিক মত পালন কর এবং তোমার পর আর কাউকে প্রতিনিধি নির্ধারণ কর না। কেননা , দীর্ঘমেয়াদী অন্তর্ধানের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে অনেকেই দাবী করবে যে , আমাকে দেখেছে। যেনে রাখ সুফিয়ানীর আবির্ভাব ও আসমানী আওয়াজের পূর্বে যেই দাবী করবে যে , আমাকে দেখেছে সে মিথ্যাবাদী। 252

এ বর্ণনার পর প্রতিটি সচেতন শিয়ার দায়িত্ব হচ্ছে যারা দাবী করবে যে ,ইমাম মাহ্দীর সাথে আমাদের সম্পর্ক আছে ও আমরা তার বিশেষ প্রতিনিধি তাদেরকে অস্বীকার করা এবং এভাবে সুবিধাবাদিদের পথকে বন্ধ করা।

আনেকে আবার আরও এগিয়ে গিয়ে বিশেষ প্রতিনিধি দাবী করার পর নিজেকে স্বয়ং মাহ্দী দাবী করে বসেছে। এই ভণ্ড দাবীর মাধ্যমে তারা ভ্রান্ত র্ফেকার সৃষ্টি করেছে এবং অনেককেই বিভ্রান্তি মধ্যে ফেলে দিয়েছে। 253 এদের সম্পর্কে গবেষণা করলে দেখা যায় যে ,স্বৈরাচারিরা তাদের পৃষ্ঠপোষক এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তারা বেঁচে আছে।

অজ্ঞতার কারণেই মানুষ ভ্রান্ত ও বাতিল র্ফেকাতে যোগ দেয় এবং মিথ্যাভাবে ইমামের বিশেষ প্রতিনিধি দাবীকারী ও ভণ্ড মাহ্দী দাবীকারীকে বিশ্বাস করে । ইমাম সম্পর্কে সঠিক ও পর্যাপ্ত জ্ঞান না রেখে ইমামকে দেখার প্রবল ইচ্ছা ও সুবিধাবাদীদের সম্পর্কে অসাবধানতার কারণে অনেকে ভণ্ডদের কবলে পড়ে।

সুতরাং প্রতীক্ষিত অনুসারীদের মাহ্দীবাদ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখতে হবে ও নিজেদেরকে ভণ্ডদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে এবং বড় আধ্যাত্মিক শিয়া আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে সঠিক পথে চলতে হবে।


তথ্যসূত্র :

1 .আমরা আপনার নিকট কোরআন প্রেরন করেছি যে জনগণের জন্য যা নাজিল হয়েছে আপনি তার ব্যাখ্যা করবেন ।

2 .মিযানুল হিকমা খণ্ড -- 1 ,হাদীস - 861 ।

3 .তাছাড়া ইমাম যদি মাসুম না হন তাহলে আর একজন ইমামের শরণাপন্ন হতে হবে যে মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারবে। যদি সেও মাসুম না হয় তাহলে আর একজন ইমামের প্রয়োজন দেখা দিবে এভাবে একর পর এক চলতে থকবে এবং দর্শনের দৃষ্টিতে তা বাতিল বলে গন্য হয়েছে।

4 .মায়ানী আল আখবার খণ্ড - 4 ,পৃষ্টা 102।

5 .মিযানুল হিকমাহ বাব 147 ,হাদীস 850 ।  

6 .সূরা বাকারা আয়াত নং 124

7 .কাফী খণ্ড - 1 ,বাব 15 ,হাঃ 1 ,পৃষ্ঠা 255 ।

8 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 41 ,হাদীস 1 ,পৃষ্ঠা 132।

9 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 5 ,হাদীস 29 ,পৃ.-22 ,এবং হাদীস 14 পৃ.-11।

10 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 5 ,হাদীস 29 ,পৃ.-22 ,এবং হাদীস 14 পৃ.-11।

11 .গাইবাতে শেখ তুসী হাদীস 478 ,পৃ.-47।

12 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 33 ,হাদীস 31 ,পৃষ্ঠা 21।

13 .যে নাম আব অথবা উম দিয়ে শুরু হয়ে থাকে যেমনঃ আবা আবদিল্লাহ ও উম্মুল বানিন।

14 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড-2 ,বাবে 42 ,হাদীস নং-1 ,পৃ.-143।

15 .মুনতাখাবুল আছার দ্বিতীয় অধ্যায় পৃ.-239-283।

16 .ইহতিজাজা ,খণ্ড-2 ,পৃ.-542।

17 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 38 ,হাদীস 1 ,পৃ.-80।

18 . তিনি ইমাম মাহদীর দ্বিতীয় নায়েব।

19 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 43 ,হাদীস 21 ,পৃ.-190।

20 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড-2 ,বাব-43 ,হাদীস নং-21 ,পৃ.-190।

21 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড-2 ,বাব-41 ,হাদীস নং-25 ,পৃ.-223।

22 .তাফসীরে কুম্মী খণ্ড- 2 ,পৃ.-52।

23 .গাইবাতে শেখ তুসী হাদীস 143 ,পৃ.-184।

24 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাদীস 16 ,পৃষ্ঠা 603।

25 .গাইবাতে নোমানী পৃ.-32।

26 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-309।

27 .ঐ পৃ.-123।

28 .কামালুদ্দীন খণ্ড-1 ,বাব 28 ,হাদীস 1 ,পৃ.-569।

29 .ইহতিজাজা খণ্ড-2 ,পৃ.-70।

30 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 30 ,হাদীস 3 ,পৃষ্ঠা 585।

31 . ঐ খণ্ড- 1 ,বাব 31 ,হাদীস পৃষ্ঠা 592।

32 .ঐ খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাদীস 15 ,পৃষ্ঠা 602।

33 .গাইবাতে নোমানী বাব 10 ,হাদীস 5 ,পৃষ্ঠা 176।

34 .গাইবাতে নোমানী বাব 34 ,হাদীস 56 ,পৃষ্ঠা 57।

35 .গাইবাতে নোমানী বাব 35 ,হাদীস 5 ,পৃষ্ঠা 60।

36 .গাইবাতে নোমানী বাব 36 ,হাদীস 1 ,পৃষ্ঠা 70।

37 . গাইবাতে নোমানী বাব 37 ,হাদীস 10 ,পৃষ্ঠা 79।

38 .গাইবাতে নোমানী বাব 37 ,হাদীস 5 ,পৃষ্ঠা 176।

39 . মুসতাদরাক আলাস সাহীহাইন খণ্ড- 7 ,পৃ.-118।

40 . আত্ তাফসীর আল কাবীর খণ্ড- 16 ,পৃ.-40।

41 .তাফসীরুল কুরতুবি খণ্ড-8 ,পৃ.-121।

42 .সহীহ মুসলিম ,সহীহ বুখারী ,সুনানে আবু দাউদ ,সুনানে ইবনে মাজা ,সুনানে সাসায়ী এবং জামে তিরমিযী। এই ছয়টি হাদীস গ্রন্থ সুন্নিদের নিকট অতি গুরুত্বপূর্ণ।

43 .ইবনে খালদুন হচ্ছেন আহলে সুন্নতের একজন বিশিষ্ট্য সামাজবিজ্ঞানি এবং মুহাদ্দিস। তিনি ইমাম মাহদী সম্পর্কিত কিছু হাদীস জয়িফ মনে করেন এবং কিছু কিছুকে সত্য বলে স্বীকার করেন। তবে মুহাম্মাদ সিদ্দিক মাগরেবী তার এবরাযুল ওহামুল মাকনুন মিন কালামে ইবনে খালদুন গ্রন্থে এসব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। অনুরূপভাবে আব্দুল মোহসেন বিন হামাদ আল আব্বাদ তার আর রাদ্দু আলা মান কাযাবা বিল আহাদীসুস সাহীহাতুল ওয়ারিদা ফীল মাহদী প্রবন্ধে এসকল প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

44 .সুনানে আবু দাউদ খণ্ড- 2 ,হাঃ 4282 ,পৃ.-106।

45 .মো জামে কাবীর খণ্ড- 10 ,হাঃ 10229 ,পৃ.-83।

46 .আদিয়ান ওয়া মাহদাভীয়াত পৃ.-21।

47 . গাইবাতে নোমানী বাব 10 ,হাদীস 3 ,পৃষ্ঠা 146।

48 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,বাব 33 ,পৃ.-152।

49 . কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে যেমনঃ গাফের 58 ,ফাতহ 23 ,এবং ইসরা 77 নং আয়াতে অদৃশ্যকে আল্লাহর সুন্নত তথা পন্থা হিসাবে বর্ণিত হয়েছে যার সমষ্টি থেকে বোঝা যায় যে আল্লাহর সুন্নত বলতে স্থায়ী ও প্রতিষ্ঠিত ঐশী নিয়মাবলীকে বোঝানো হয়েছে যাতে কখনোই কোন পরিবর্তন আসবেনা। এই নিয়ম পূর্ববর্তীদের জন্যেও কার্যকরী ছিল এবং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যেও কার্যকরী । ( তাফসিরে নমুনা খণ্ড- 17 ,পৃ.-435)

50 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 1-7 ,পৃষ্ঠা 254-300।

51 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,হাঃ 3 ,পৃ.-90 ।

52 . মুনতাখাবুল আছার পৃ.-312-340।

53 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 25 ,হাঃ 4 ,পৃষ্ঠা 536।

54 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 44 ,হাঃ 11 ,পৃষ্ঠা 204।

55 . ইলালুশ শারিয়াহ পৃ.-244 ,বাব 179 ।

56 . কামালুদ্দীন খণ্ড-2 ,বাব 44 ,হাঃ 4 পৃ.-232।

57 . গাইবাতে শেখ তুসী অধ্যায়-5 ,হাঃ-284 ,পৃঃ-237।

58 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 44 ,হাঃ 7 ,পৃষ্ঠা 233।

59 . চিঠির বিষয়বস্তু (যা তৌকিয়াত নামে প্রশিদ্ধ) শিয়াদের গ্রন্থে রয়েছে যেমনঃ বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 ,বাব 31 ,পৃ.-150-197)।

60 .গাইবাতে শেখ তুসী ,অধ্যায় 6 ,হাদীস 319 ,পৃ.-357।

61 . গাইবাতে শেখ তুসী ,অধ্যায় 6 ,হাদীস 317 ,পৃ.-355।

62 .গাইবাতে শেখ তুসী ,অধ্যায় 6 ,হাদীস 143 ,পৃ .- 184 ।

63 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড - 2 ,বাব 45 ,হাদীস 3 ,পৃ.-236।

64 .ইহতিজাজ খণ্ড-1 ,হাঃ 11 ,পৃ.-15।

65 . ইহ্তিজাজ ,খণ্ড-2 ,পৃ.-511 ।

66 .কাফী খণ্ড- 1 ,পৃ.-201।

67 .মাফাতীহ আল জিনান।

68 .ইহ্তিজাজ ,খণ্ড-2 ,নং 344 ,পৃ.-542।

69 . মাফাতিহ আল জিনান ,দোয়া আদলিয়াহ।

70 . ইহতিজাজা খণ্ড- 2 ,নং 359 ,পৃ.-598।

71 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-178।

72 . সূরা তাওবা আয়াত 105।

73 .উসুলে কাফী বাবে আরযুল আমাল পৃ.-171।

74 .  কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 45 ,পৃষ্ঠা 235-286।

75 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,হাঃ 4 ,পৃষ্ঠা 237।

76 .ইছবাতুল হুদাত ,খণ্ড- 3 ,হাঃ 112 ,পৃ.-463।

77 . ইছবাতুল হুদাত ,খণ্ড- 3 ,হাঃ 112 ,পৃ.-463।

78 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 45 ,হাদীস 4 ,পৃষ্ঠা 239।

79 .সূরা আনফাল আয়াত নং 33।

80 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 43 ,হাঃ 12 ,পৃ.-171।

81 .মুনতাখাবুল আছার পৃ.-658।

82 .জান্নাতুল মাওয়া এবং নাজমুস সাকিব ,মোহাদ্দেস নূরী।

83 .কামালুদ দীন খণ্ড- 2 ,বাব 45 ,হাঃ 4 পৃ 239।

84 .সূরা বাকারা আয়াত নং 282।

85 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 ,পৃ.-315 এবং নাজমুছ ছাকিব দাসতানে 31 ।

86 .বর্তমানে আমরা 1426 হিজরীতে বসবাস করছি আর ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর জন্ম হয়েছে 255 হিজরীতে। সুতরাং এখন তার বয়স 1171 বছর।

87 .যদিও বর্তমানেও কিছু কিছু মানুষ দেখতে পাওয়া যায় যারা 100 বছরেরও বেশী বেঁচে থাকেন।

88 .ইমাম জামানা (আ.)-এর দীর্ঘায়ূর রহস্য ,আলী আকবার মাহদী পুর পৃ.-13।

89 .মাজাল্লেহ দানেশমানদ। ষষ্ট বছর ষষ্ট সংখ্যা পৃ.-147।

90 .সূরা সাফ্ফাত আয়াত 144।

91 . সৌভাগ্যের ব্যাপার হল মাদাগাসকারের সৈকতে 400 মিলিয়ন বছরের মাছ পাওয়া যাওয়াতে মাছের জন্য এত দীর্ঘ আয়ূ সম্ভপর করেছে । কাইহান সংখ্যা 6413 ,তাং 22- 8-1343 ফার্সী শতাব্দী।

92 .সূরা আনকাবুত আয়াত 14।

93 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 46 ,হাদীস 3 ,পৃষ্ঠা 309 ।

94 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 21 ,হাদীস 4 ,পৃষ্ঠা 591।

95 .সূরা নিসা আয়াত 157 ,158।

96 .গাইবাতে নোমানী বাব11 ,হাদীস 16 ,পৃ.-207।

97 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,হাদীস 15 ,পৃষ্ঠা 602।

98 . গাইবাতে নোমানী বাব11 ,হাদীস 16 ,পৃ.-200।

99 .সূরা বাকারা আয়াত 138।

100 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 43 ,হাদীস 12 ,পৃ.-171।

101 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 25 ,হাদীস 3 ,পৃষ্ঠা 535।

102 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 ,পৃ.-177।

103 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 পৃ.-177।

104 .  কামালুদ্দীন ,খণ্ড-2 ,বাব 45 ,হাঃ 4 পৃ.-237।

105 . মাফাতিহ আল জিনান।

106 .মাফাতিহ আল জিনান ,দোয়া আহাদ

107 .ইহ্তিজাজ ,খণ্ড-2 ,হাদীস নং 360 ,পৃ.-600।

108 .কামালূদ্দিন ,খণ্ড- 1 ,বাব 25 ,হাঃ 2 ,পৃ.-535।

109 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 25 ,হাঃ 2 ,পৃ.-535।

110 .দালায়েলুন নবুয়্যাত খণ্ড- 6 ,পৃ.-513।

111 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,বাব 22 ,হাঃ 5 ,পৃ.-123।

112 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,বাব 22 ,হাঃ 16 ,পৃ.-126।

113 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 33 ,হাঃ 54 ,পৃ.-39।

114 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 31 ,হাঃ 6 ,পৃ.-592।

115 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-126।

116 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-123।

117 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 25 ,হাঃ 2 ,পৃ.-535।

118 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাঃ 15 ,পৃ.-602।

119 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 34 ,হাঃ 5 ,পৃ.-43।

120 .কাফী খণ্ড- 7 ,পৃ.-28।

121 . মো জামে আহাদীসিল ইমাম আল মাহদী খণ্ড- 1 ,পৃ.-49।

122 .ইহ্তিজাজ ,খণ্ড-2 ,নং 360 ,পৃ.-602।

123 .মিযানুল হিকমাহ খণ্ড- 5 ,হাঃ 8166 ।

124 . গাইবাতে নোমানী বাব 15 ,হাঃ 2।

125 . ইমাম বাকের (আ.) ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে বলেছেন: তিনি আল্লাহর কিতাব কোরআন অনুসারে আমল করবেন এবং সকল প্রকার অন্যায়ের বিরুদ্ধাচারণ করবেন । বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 51 ,পৃ.-141।

126 .ফাসল নামে ইনতিযার দ্বিতীয় বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা পৃ.-98।

127 . নাজমুছ ছাকীব পৃ.-193 ।

128 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 47 পৃ.-123 এবং সাফিনাতুল বাহার খণ্ড- 8 ,পৃ.-681।

129 . মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 8 ,বাব 1 ,হাঃ 2 ,পৃ.-611।

130 .ইয়াওমুল খালাস পৃ.-223।

131 .ইয়াওমুল খালাস পৃ.-224।

132 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,পৃ.-308।

133 . ঐ

134 .ঐ

135 .ঐ

136 .ইয়াওমুল খালাস ,পৃ.-224।

137 .মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 6 ,বাব 11 ,হাঃ 4 ,পৃ.-581।

138 . ইয়াওমুল খালাস পৃ.-223

139 .মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 6 ,বাব 11 ,হাঃ 4 ,পৃ.-581।

140 .ইয়াওমুল ,খালাস পৃ.-224।

141 . মো জামে আহাদীসে ইমাম আল মাহদী ,খণ্ড- 3 ,পৃ.-101।

142 .সূরা বাকারা আয়াত নং 246।

143 .আকদুদ দুরার পৃ.-73।

144 .গাইবাতে নোমানি বাব 14 ,হাঃ 9 ,পৃ.-261।

145 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 57 ,হাঃ 10 ,পৃ.-557।

146 .গাইবাতে নোমানি ,বাব 18 ,হাঃ 1 ,পৃ.-310।

147 . ঐ বাব 14 ,হাঃ 67 ,পৃ.-289।

148 .ঐ হাঃ 13 ,পৃ.-264।

149 .গাইবাতে নোমানি ,পৃ.-262।

150 . গাইবাতে নোমানি ,হাঃ 14 ,পৃ.-265।

151 .গাইবাতে নোমানি ,বাব 10 ,হাঃ 29 ,পৃ.-265।

152 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 57 ,হাঃ 2 ,পৃ.-554।

153 .গাইবাতে তুসী ,অধ্যায় 7 ,হাঃ 412 ,পৃ.-426।

154 . গাইবাতে তুসী ,অধ্যায় 7 ,হাঃ 411 ,পৃ.-425।

155 .গাইবাতে তুসী ,অধ্যায় 7 ,হাঃ 414 ,পৃ.-426।

156 .গাইবাতে নোমানি ,বাব 16 ,হাঃ 13 ,পৃ.-305।

157 .গাইবাতে নোমানি বাব 14 ,হাঃ 17।

158 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 ,পৃ.-10।

159 .গাইবাতে নোমানি বাব 14 ,হাঃ 67।

160 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাঃ 16 ,পৃ.-603।

161 .রুযেগরে রাহয়ী খণ্ড- 1 ,পৃ.-554।

162 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 51 ,পৃ.-71।

163 .রুযেগরে রাহয়ী খণ্ড- 1 ,পৃ.-33।

164 .সূরা তাওবা আয়াত নং 33।

165 .সূরা আনফাল আয়াত নং 24।

166 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড-1 ,বাব 30 ,হাঃ 4 এবং 584।

167 .মাফাতীহ্ আল জিনান দোয়ায়ে ইফতিতাহ্।

168 . এখানে মহাপুরুষ বলতে ইমাম মাহদী (আ.) ও তার সাথীদেরকে বোঝানো হয়েছে। তাফসীরে বোরহান খণ্ড- 7 ,পৃ.-446।

169 .নাহজুল বালাগা খোতবা 138।

170 . গাইবাতে নোমানি বাব 21 ,হাঃ 3 ,পৃ.-333 ।

171 . রাসূল (সা.) বলেছেন: انما بعثت لاتمم مکارم الاخلاق নিঃসন্দেহে আমি চারিত্রিক গুনাবলীকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর জন্য প্রেরিত হয়েছি। মিযানুল হিকমা খণ্ড- 4 ,পৃ.- 1530। 172 .لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَ‌سُولِ اللَّـهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ সূরা আহযাব আয়াত নং 21।

173 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-336।

174 . ইমাম আলী (আ) বলেছেন: তার জ্ঞান তোমাদের সবার চেয়ে বেশী। গাইবাতে নোমানি ,বাব 13 ,হাঃ 1।

175 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 36 ,পৃ.-253। কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 24 ,হাঃ 5 ,পৃ.- 487।

176 .গাইবাতে নোমানি 239। বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-352 ।

177 .মিযানুল হিকমা হাঃ 1632।  

178 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 78 ,পৃ.-91।

179 .মিযানুল হিকমা হাঃ 1649।

180 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 58 ,হাঃ 11 ,পৃ.-11।

181 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 10 ,পৃ.-104 ,খিসাল 626।

182 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাঃ 16 ,পৃ.-603।

183 . গাইবাতে নোমানি ,বাব 13 ,হাঃ 26 ,পৃ.-242।

184 . বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 51 ,পৃ.-81।

185 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 51 ,পৃ.-390।

186 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 32 ,হাঃ 16 ,পৃ.-603।

187 . সূরা আলে ইমরান আয়াত নং 110।

188 .এই ওয়াজিব সম্পর্কে ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ এমন একটি ওয়াজিব যার মাধ্যমে আল্লাহর সকল ওয়াজিব প্রতিষ্ঠিত হবে। মিযানুল হিকমা খণ্ড- 8 ,পৃ.-3704।

189 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 51 ,পৃ.-47।

190 . মাফাতিহ আল জিনান ,দোয়া নুদবা।

191 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,বাব 27 ,হাঃ 4।

192 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-321।

193 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-362।

194 . পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ  إِنَّ اللَّـهَ يَأْمُرُ‌ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ও সদাচরণের নির্দেশ দেন। সূরা নাহল আয়াত নং 90 ।

195 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,হাঃ 71 ,পৃ.-336।

196 . কাফী খণ্ড- 1 ,হাঃ 3 ,পৃ.-58।

197 . انما المؤمنون اخوة সূরা হুজুরাত আয়াত নং 10।

198 . কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 2 ,বাব 55 ,হাঃ 7 ,পৃ.-548।

199 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,হাঃ 164 ,পৃ.-372।

200 .বিহারুল আনওয়ার ,হাঃ 138 ,পৃ.-364।

201 . বিহারুল আনওয়ার ,হাঃ 68 ,পৃ.-335।

202 .গাইবাতে তুসী ,হাঃ 149 ,পৃ.-188।

203 .সূরা আ রাফ আয়াত নং 96।

204 . মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 7 ,বাব 3 ও 4 ,পৃ.-589-593।

205 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,হাঃ 212 ,পৃ.-390।

206 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 51 ,পৃ.-84।

207 . বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 51 ,পৃ.-92।

208 .সূরা তাওবা আয়াত নং 33 ,সূরা ফাতহ আয়ত নং 28 ,সূরা সাফ আয়াত নং 9।

209 . সূরা আলে ইমরান আয়াত নং 9।

210 .এটা একটি বাস্তব বিষয় এ সম্পর্কে মোফাসসেরগণ যেমন: ফখরে রাজি তার তাফসীরে কাবীরের খণ্ড- 16 ,পৃ.-40 ,কুরতুবী তার তাফসীরে কুরতুবীতে খণ্ড- 8 ,পৃ.- 121 এবং তাবরাসী তার তাফসীরে মাজমাউল বায়ানে খণ্ড- 5 ,পৃ.-35 এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। 211 .সূরা আনফাল আয়াত নং 39।

212 .খিসাল খণ্ড- 2 ,পৃ.-418।

213 .সূরা নুর আয়াত নং 55।

214 . গাইবাতে নোমানি হাঃ35 ,পৃ.-240।

215 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড-52 ,পৃ.-326।

216 . তবে হাদীসে হয়তবা মোজেযা সম্পর্কে বলা হয়ে থাকতে পারে।

217 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,পৃ.-391।

218 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,পৃ.-336।

219 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,পৃ.-390 ।

220 .কামালুদ্দীন ,আয়াত বাব 25 ,হাঃ4 এবং বাব 24 হাঃ 1 ও 7।

221 .গাইবাতে তুসী এবং ইহতিজাজে তাবরাসী।

222 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 23 ,হাঃ 4 ,পৃ.-477।

223 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 1 ,বাব 23 ,হাঃ 16 ,পৃ.-603।

224 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 53 ,পৃ.-11।

225 .কামালুদ্দীন ,খণ্ড- 1 ,বাব 23 ,হাঃ 4 ,পৃ.-477।

226 . গাইবাতে তুসী ,অধ্যায়-8 ,হাঃ 493 ,পৃ.-472।

227 .চেশম আন্দাযী বে হুকুমাতে মাহ্দী (আ.) ,নাজমুদ্দিন তাবাসী ,পৃ.-173-175।

228 .আল মাহদী ,সাইয়্যেদ সাদরুদ্দিন সাদর পৃ.-239 ,তারিখে মা বায়দে জহুর ,সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ সাদর।

229 .গাইবাতে তুসী ,অধ্যায় 8 ,হাঃ 497 ,পৃ.-474।

230 .বিহারুল আনওয়ার ,খণ্ড- 52 ,পৃ.-280।

231 .গাইবাতে নোমানি বাব 13 ,হাঃ 13 ,পৃ.-236।

232 . কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 39 ,হাঃ 6 ,পৃ.-122।

233 .আল ফিতান পৃ.-249-251।

234 . ইছবাতুল হুদা ,খণ্ড- 3 ,পৃ .439-494।

235 .ইছবাতুল হুদা ,খণ্ড- 3 ,পৃ .450।

236 .আল ফিতান পৃ.-99।

237 . ইছবাতুল হুদা খণ্ড- 3 ,পৃ.-447।

238 .মোজামে আহাদীসে আল ইমাম আল মাহদী ,খণ্ড- 1 ,হাঃ 152 ,পৃ.-246।

239 .বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-309।

240 . বিহারুল আনওয়ার খণ্ড- 52 ,পৃ.-309।

241 .মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 6 ,বাব 11 ,হাঃ 4 ,পৃ.-581।

242 . ওছয়েলুশ শিয়া খণ্ড- 3 ,পৃ.-348।

243 .উছুলে কাফী খণ্ড- 1 ,হাঃ 1 ,পৃ.-225।

244 .মুনতাখাবুল আছার অধ্যায় 7 ,বাব 7 ,হাঃ 2 ,পৃ.-597।

245 . বিহার খণ্ড- 51 ,পৃ.-81।

246 .ইছবাতুল হুদা ,খণ্ড- 3 ,পৃ.-524।

247 .সহীফায়ে নুর ,খণ্ড- 20 ,পৃ.-196।

248 . সহীফায়ে নুর ,খণ্ড- 20 ,পৃ.-196।

249 .দদ গুসতারে জাহান ,ইব্রাহীম আমিনী পৃ.-254-300।

250 .কাফী খণ্ড- 2 ,পৃ.-191।

251 .গাইবাতে তুসী হাঃ 411 ,পৃ 426।

252 .কামালুদ্দীন খণ্ড- 2 ,বাব 45 ,হাঃ 45 ,পৃ.-294।

253 .একটি ভ্রান্ত ফেরকা হচ্ছে বাবিয়াত যাদের নেতা হচ্ছে আলী মুহাম্মাদ বাব সে প্রথমে ইমামের বিশেষ প্রতিণিধি দাবী করে এবং পরবর্তীতে দাবী করে যে ,আমি নিজেই সেই প্রতিশ্রুত মাহদী। অবশেষ সে নবুয়্যতের দাবীও করে। এই ফেরকার মাধ্যমেই ভ্রান্ত বাহায়ী ফেরকার জন্ম।


গ্রন্থপুঞ্জি

1-পবিত্র কোরআন

2-মাফাতীহ আল জিনান ,শেখ আব্বাস কুম্মী।

3-নাহজুল বালাগা ,সাইয়্যেদ রাযী।

4-ইছবাতুল হুদা ,মুহাম্মদ বিন হাসান আল হুররে আমেলী।

5-ইহতিজাজ ,আহমাদ বিন আলী ইবনে আবি তালেব তাবরাসী ,উসভে ,তেহরান 1416 হিঃ।

6- আদিয়ান ওয়া মাহদাভিয়াত ,মুহাম্মদ বেহেশতী ,কুরুশে কাবির ,তেহরান ,1342।

7-বিহারুল আনওয়ার ,মুহাম্মদ বাকের মাজলিসী ,দারুল কিতাবুল ইসলামিয়া।

8-তাফসীরে কুরতুবি ,আল কুরতুবি।

9-তাফসীরে কুম্মী ,আলী ইবনে ইব্রাহীম কুম্মি।

10-তাফসীরে কাবির ,ফাখরে রাযী।

11-খিসাল ,আবি জাফার মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন বাবেভেই কুম্মি ,জামে মোদাররেসিন হাওযায়ে ইলমিয়া কুম ,1362।

12-চেশম আনদাযি বে হুকুমাতে মাহদী ,নাজমুদ্দিন তাবাসী ,দাফতারে তাবলিগাতে ইসলামী1380।

13-দালায়েলুন নবুয়্যাত।

14-রযে তুলে ওমরে ইমাম যামান ,আলী আকবার মাহদীপুর ,তাউসে বেহেশত ,কুম ,1378। 15-রুযেগরে রাহয়ী ,কামেল সুলাইমান ,অনুবাদ আলী আকবার মাহদীপুর ,অফক তেহরান ,1386।

16-যেনদে রুযেগরন ,হুসাইন ফেরেইদুনি ,অফক ,তেহরান ,1381।

17-সাফিনাতুল বাহার ,শেখ আব্বাস কুম্মি ,উসভে তেহরান ,1422 হিঃ।

18-সুনানে আবু দাউদ ,আবি দাউদ সুলাইমান বিন আল আশয়াছ সজেসতানী উযদী ,দার ইবনে খারম ,বৈরুত 1418।

19-সহিফায়ে নুর ,ইমাম রুহুল - অহ মুসাভী আল খোমেনী। 20-আকদুদ দারার ,ইউসুফ বিন ইয়াহিয়া বিন আলী বিন আব্দুল আযিজ শাফেয়ী ,উসভে ,তেহরান ,1416।

21-ইলালুশ শারায়ে ,আবি জাফার মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন বাবেভেই কুম্মি ,,মোমেনিন ,কুম ,1380।

22-গাইবাতে তুসী ,আবি জাফার মুহাম্মদ বিন হাসান তুসী ,মায়ারেফে ইসলামী ,কুম ,1417। 23-গাইবাতে নোমানি ,ইবনে আবী যাইনাব মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম বিন জাফার আল কাতেব আল নোমানি ,1376।

24-আল ফিতান ,হাফেজ আবু আব্দুল্লাহ নাইম বিন হিমার মারুযী ,তৌহীদ ,কায়রো ,1412।

25-কাফী ,আবু জাফার মুহাম্মদ বিন ইয়াকুব বিন ইসহাক কুলাইনী রাযী ,বৈরুত 1401।

26-কামালুদ্দিন ,আবু জাফার মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন বাবেভেই কুম্মী ,দারুল হাদীস কুম ,1380।

27-আল মুসতাদরাক ,হাকেম নিশাবুরী।

28-মায়ানি আল আখবার ,আবু জাফার মুহাম্মদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন বাবেভেই কুম্মী।

29-মোজামে আহাদীসে আল ইমাম আল মাহদী ,আল হাইয়াতুল ইলমিয়াহ ,মায়ারেফে ইসলামী 1411।

30-মোজামুল কাবির ,আত তাবরানী।

31-মুনতাখাবুল আছার ,লুতফুল্লাহ সাফী গুলপায়গানী ,আস সাইয়্যেদাতুল মাসুমা ,কুম ,1419।

32-নাজমুছ ছাকিব ,মীর্যা হুসাইন তাবরাসী নুরী ,মাসজেদে মুকদ্দাসে জামকারান ,কোম ,1380।

33-মিযানুল হিকমা ,মাহাম্মাদ মাহদী রেই শাহরী ,দারুল হাদীস ,কুম ,1377।

34-ওসায়েলুশ শিয়া ,আল ইমাম আল শেখ মুহাম্মদ বিন আল হাসান আল হুরওে আল আমেলী ,দারে আহইয়া আত্ তুরাছ আল আরাবী ,বৈরুত।

35-ইয়াওমুল খালাস ,কামিল সুলাইমান ,আছছাকাফিয়া ,তেহরান ,1991 খ্রীষ্টাব্দ। আনসারুল হুসাইন


সূচীপত্র

প্রথম অধ্যায় :ইমামত 4

ইমামের প্রয়োজনীয়তা 6

ইমামের বৈশিষ্ট্যসমূহ 8

দ্বিতীয় অধ্যায় : ইমাম মাহদী পরিচিতি .14

প্রথম ভাগ :এক দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী (আ.) 15

ইমাম মাহদী (আ.)-এর জীবনি তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত: 21

দ্বিতীয় ভাগ : ইমাম মাহদী (আ.)-এর জন্ম থেকে ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর শাহাদাত পর্যন্ত 22

তৃতীয় ভাগ : পবিত্র কোরআন ও হাদীসের আলোকে ইমাম মাহদী (আ.) 30

চতুর্থ ভাগ : অন্যান্যদের দৃষ্টিতে ইমাম মাহদী (আ.) 35

তৃতীয় অধ্যায় : অদৃশ্য ইমামের প্রতিক্ষায় 37

প্রথম ভাগ :অদৃশ্য.38

দ্বিতীয় ভাগ :অদৃশ্যের প্রকারভেদ 44

স্বল্পমেয়াদী অদৃশ্যকাল (অন্তর্ধান) 45

দ্বীর্ঘমেয়াদী অদৃশ্যকাল (অন্তর্ধান) 48

তৃতীয় ভাগ : অদৃশ্য ইমামের সুফল 51

চতুর্থ ভাগ :কাঙ্ক্ষিতের সাক্ষাৎ 63

পঞ্চম ভাগ :দীর্ঘায়ূ 68

ষষ্ঠ : ভাগ সবুজ প্রতীক্ষা .71

ইমাম মাহদী (আ.)-এর প্রতীক্ষার বৈশিষ্ট্য 73

চতুর্থ অধ্যায় : আবির্ভাবের সময়কাল 88

প্রথম ভাগ :আবির্ভাবের সময়ে বিশ্ব 89

দ্বিতীয় ভাগ :আবির্ভাবের ক্ষেত্র এবং তার আলামতসমূহ 92

আবির্ভাবের নিদর্শন 102

তৃতীয় ভাগ :আবির্ভাব 106

আবির্ভাবের সময় 107

ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাবের সময় গোপন থাকার রহস্য .108

সংগ্রামের ঘটনা 110

কিভাবে সংগ্রাম হবে .111

পঞ্চম অধ্যায় : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমত 115

প্রথম ভাগ :ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর বিশ্বজনীন হুকুমতের উদ্দেশ্যসমূহ 116

দ্বিতীয় ভাগ :বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের কার্যক্রমসমূহ 120

তৃতীয় ভাগ :ঐশী ন্যায়পরায়ণ হুকুমতের সাফল্য ও অবদানসমূহ 130

চতুর্থ ভাগ : ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর হুকুমতের বৈশিষ্টসমূহ 140

ষষ্ট অধ্যায় : মাহ্দীবাদের অসুবিধাসমূহ 151

তথ্যসূত্র : 158

গ্রন্থপুঞ্জি .169

সমাপ্ত

সৃষ্টির পরশমনি

সৃষ্টির পরশমনি

লেখক: মুহাম্মদ মাহদী হায়েরীপুর,মাহদী ইউসুফিয়ান ও মুহাম্মদ আমীন বালাদাসতিয়ান
: মোহাম্মাদ আলী মোর্ত্তজা
প্রকাশক: বিশ্ব ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র কোম,ইরান।
বিভাগ: ইমাম মাহদী (আ.)
পৃষ্ঠাসমূহ: 40