ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর
মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার
সংকলনে
মুহাম্মাদ ইরফানুল হক
এ. কে. এম. রাশিদুজ্জামান
ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
শিরোনাম : ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর
মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার
সংকলনে : মুহাম্মাদ ইরফানুল হক
এ.কে.এম. রাশিদুজ্জামান
প্রকাশক : ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
279/5 , মাসকান্দা , ময়মনসিংহ।
গ্রন্থস্বত্ব : প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত।
প্রকাশকাল : 25 মহরম , 1434 হি. ,
26 অগ্রহায়ণ , 1419 বাং. ,
10 ডিসেম্বর , 2012 খ্রি. ।
কম্পোজ ও প্রচ্ছদ : আলতাফ হোসাইন
ISBN : 978-984-33-6037-3
Captive Family of Prophet (s.) ―After the Martyrdom of Imam Hossain (a.), Compiled by Md. Irfanul Huq & A.K.M. Rashiduzzaman, Published by Wiseman Publications, Mashkanda, Mymensingh, Bangladesh.
© Wiseman Publications, 2012.
ALL RIGHTS RESERVED FOR THE PUBLISHER.
Published in December 2012 (First Edition), Printed in Bangladesh, Pages-56.
ForContact : wiseman1472313@yahoo.com, (8802) 01922683019
Topics : Historical incidences of Karbala – Martyrdom of Imam Hussain Ibne Ali (a.) – Heartrending Tragedy of Islam – Teachings of Sacrifice in Islam – Steadfastness of Ahlul Bayt (a.) – Captive Family of Prophet (s.).
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“ নিশ্চয়ই হোসেইন হেদায়াতের বাতি ও নাজাতের নৌকা। ”
[মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-433 ; সাফিনাতুল বিহার , খণ্ড-1 ;
মদিনাতুল মায়াজিয , খণ্ড-4 , পৃষ্ঠা-52 ; খাসায়িসুল হোসেইনিয়া , পৃষ্ঠা-45 ;
নাসিখুত্ তাওয়ারিখ , পৃষ্ঠা-57]
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর
মহানবী (সা.)-এর বন্দী পরিবার
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাত
মহান আল্লাহর সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রিয় নাতি ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমার (আ.) প্রিয় সন্তান যাকে কারবালায় হিজরী 61 সনের 10ই মুহাররম নির্মমভাবে পিপাসার্ত , ক্ষুধার্ত ও অসহায় অবস্থায় শহীদ করা হয়। সাইয়েদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আ.) সম্পর্কে মহানবীর (সা.) সবচেয়ে সুপরিচিত হাদীস যা সেখানকার উপস্থিত হত্যাকারীরা পর্যন্ত জানতো যে ,“ হাসান ও হোসেইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার।” [জামে আত-তিরমিযী , হাদীস-3720]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ আর হোসেইনের (আ.) বিষয়ে — সে আমার থেকে , সে আমার সন্তান , আমার বংশ , মানবজাতির মধ্যে তার ভাইয়ের পরে শ্রেষ্ঠ। সে মুসলমানদের ইমাম , মুমিনদের অভিভাবক , জগতসমূহের রবের প্রতিনিধি , তাদের সাহায্যকারী যারা সাহায্য চায় , তাদের আশ্রয় যারা আশ্রয় খোঁজে , [সে] আল্লাহর প্রমাণ তাঁর পুরো সৃষ্টির ওপরে , সে বেহেশতের যুবকদের সর্দার , উম্মতের নাজাতের দরজা। তার আদেশই হলো আমার আদেশ। তার আনুগত্য করা হলো আমারই আনুগত্য করা। যে-ই তাকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তার অবাধ্য হয় সে আমার সাথে যুক্ত হতে পারে না। ’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-428]
ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার , বিনয়ী , জ্ঞানী , সাহসী এবং স্বাধীনতাকামী একজন নেতা। তিনি তার নানা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের সংশোধনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে উদ্দ্যোগ নেন। কিন্তু সে সময়ের খলিফা [শাসক] ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া তা অপছন্দ করে এবং তার সব ধরনের অন্যায় ও অপকর্মকে সম্মতি দিয়ে তার প্রতি আনুগত্য করার আদেশ দেয়। আর তা করা না হলে তাকে হত্যা করা হবে বলে জানিয়ে দেয়। ইমাম হোসেইন (আ.) তার সব অপকর্মের প্রতিবাদ করেন এবং আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন।
কিন্তু তিনি জানতে পারেন ইয়াযীদ হজ্বের সময় তাকে হত্যার জন্য মক্কায় তার দূত পাঠিয়েছে। পবিত্র কাবা ঘরের কোন স্থানে তার রক্ত ঝরুক এটি তিনি পছন্দ করেন নি। তাই হজ্ব না করেই 8ই জিলহজ্ব ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা থেকে মরুভূমির দিকে বেরিয়ে পড়েন। [বর্তমান ইরাকের] কুফা এলাকা থেকে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.)-কে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি কুফায় যান এবং সেখানে গিয়ে তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন। এতে ইসলাম ধ্বংস ও বিকৃতি থেকে রক্ষা পাবে। এসব চিঠির কারণে ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করে কুফার দিকে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু পথে ইয়াযীদের নিয়োগ করা গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের আদেশে হুর বিন ইয়াযীদ ইমামকে বাধা প্রদান করে এবং কারবালা প্রান্তরে নিয়ে যায়। এখানে শত্রুরা প্রায় ত্রিশ হাজার সসস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করে এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-কে জোরপূর্বক বাইয়াত [আনুগত্য] করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। তারা জানায় যে , যদি তা না করা হয় তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে।
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথে ছিলো কেবল অল্প ক ’ জন বন্ধু ও সাহায্যকারী এবং তার পরিবারের নারী ও শিশুরা। যুদ্ধ করতে পারেন এমন পুরুষের সংখ্যা ছিলো 70 জনেরও কম। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য ইসলামকে রক্ষার জন্য [আত্মরক্ষার] যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
শত্রুরা ইমাম হোসেইন (আ.)-কে কাবু করার জন্য পাশেই বয়ে যাওয়া ফোরাত নদীর তীর ঘেরাও করে রাখে যাতে ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীরা পানি থেকে বঞ্চিত হন। একটানা কয়েক দিন ইমামের পরিবারের নারী , শিশুরা ও সাথীরা পানি থেকে বঞ্চিত হয়। শিশুরা পানির পিপাসায় কাতর হয়ে যায়। এমন অবস্থায় শত্রুরা 9ই মহররম ইমামকে যুদ্ধ শুরুর জন্য অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে এবং ইমামের তাবুর দিকে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। ইমাম হোসেইন (আ.) শত্রুদের কাছে তার দূত পাঠালেন এ বলে যে , তিনি একটি রাত ইবাদতের জন্য সময় চান। শত্রুরা এক রাতের জন্য তাকে সময় দেয়।
ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সব সাথীরা জীবনের শেষ রাতটি আল্লাহর যিকির , দোয়া , নামায ও কুরআন তেলাওয়াতে কাটালেন। সকাল হলে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বড় ছেলে হযরত আলী আকবর (আ.) আযান দিলেন এবং সবাই নামায আদায় করলেন। এরপর শত্রুরা বৃষ্টির মতো তীর ছুঁড়ে যুদ্ধ শুরু করে ইমামের একদল ক্লান্ত , ক্ষুধার্ত , পিপাসার্ত ও পরহেজগার সাথীদের বিরুদ্ধে। যাদের সংখ্যা নগন্য। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথে থাকা শিশু সহ মোট সংখ্যা প্রায় 100 লোকের বিরুদ্ধে 30 ,000 সসস্ত্র সেনাদলের যুদ্ধ। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম অসম যুদ্ধ আর দেখা যায় না।
জোর করে চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধে ইমাম হোসেইন (আ.)-সহ মোট 72 জন শহীদ হন। শত্রুরা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সন্তান মাত্র 6 মাসের শিশু আলী আসগরকেও তীর নিক্ষেপ করে হত্যা করে। জঘন্য ও নিকৃষ্টতম ঐ শত্রুরা তাদেরকে হত্যার পর তাদের লাশের মাথাগুলো কেটে বর্শার মাথায় বিদ্ধ করে এবং দশ জন ঘোড়সওয়ার দেহগুলোকে ঘোড়ার পায়ের আঘাতে আঘাতে পিষ্ট করে।
তারা তাবুগুলো লুট করে ও তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুট করার সময় শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের চাবুক মারে। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মেয়ে পাঁচ বছরের শিশু সাকিনার কানের দুল কান থেকে ছিঁড়ে নেয় এবং তা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। শিশুরা ভয়ে ও ব্যাথায় কাঁদতে থাকলে তাদের গালে চড় মারে। নারীদের মাথার চাদরও [বোরখা] কেড়ে নেয়। নবী পরিবারের নির্যাতিত অসহায় এসব সম্মানিত ব্যক্তিরা মরুভূমিতে আশ্রয়হীনভাবে খোলা আকাশের নীচে চলে আসেন।
চিত্র: [....] ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মদীনা থেকে যাত্রা করে
মক্কা হয়ে কারবালায় যাওয়ার রুট।
[― ] মহানবীর (সা.) পরিবারের বন্দী অবস্থায় কারবালা থেকে
কুফা হয়ে দামেস্কে গমনের রুট।
এরপর নবী পরিবারের বেঁচে থাকা সব সদস্যদের বন্দী করা হয় এবং তাদের সাথে নিকৃষ্ট ও অপমানজনক আচরণ করা হয়। সব বন্দীদের প্রথমে কুফায় উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের প্রাসাদে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে সিরিয়ার দামেস্কে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার রাজপ্রাসাদে নেওয়া হয়। কারবালা থেকে কুফা ছিল প্রায় 76 কিলোমিটার এবং কুফা থেকে দামেস্ক ছিল প্রায় 1200 কিলোমিটার। কুফা থেকে দামেস্কে [শামে] যাওয়ার এ দীর্ঘ পথে কাফেলাটি বিভিন্ন যায়গায় মোট উনিশটি স্থানে বিশ্রামের জন্য থামে। থামার যায়গাগুলো ছিল‘ প্রথম বিশ্রামের স্থান’ , তাফরিত্ , মাশহাদ আল-নুকতা , ওয়াদি আল-নুখলা , মুসাল , নাসিবুন , আ ’ ইনুল ওয়ারদা , রাক্কা , জুসাক্ব , দাওয়ায়াত , হাল্ব , ক্বিন্নাসরিন , মায়াররা আল-নুমান , শিযর , কাফরি তালিব , সিবুর , হামাত , হিমাস ও বালবাক।
মহানবীর (সা.) বন্দী পরিবারের নারী , শিশু ও একমাত্র জীবিত পুরুষ [অসুস্থ] ইমাম আলী ইবনে হোসেইন (আ.)-কে প্রায় 20 দিন ধরে কয়েদিদের মতো দড়িতে হাত বাঁধা অবস্থায় জিন ছাড়া ও ছাউনি-বিহীন উটে ও খচ্চরে চড়ে ― আবার কখনোবা পায়ে হেঁটে ― মরুভূমির উত্তপ্ত দিনগুলোতে এ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
আমরা এ সংকলনটিতে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর কারবালায় বেঁচে থাকা নবী পরিবারের সম্মানিত সদস্যদের সাথে এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর লাশ ও কেটে নেওয়া মাথার সাথে কি অমানবিক , অপমানজনক ও প্রতিশোধমূলক আচরণ করা হয়েছে এবং পথিমধ্যে নবী পরিবারে নির্যাতিত ও শোকার্ত সদস্যগণ যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো থেকে উপস্থাপন করবো। এ বর্ণনাগুলো প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা শেইখ আব্বাস কুম্মি রচিত‘ শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস ’ [নাফাসুল মাহমুম] থেকে নেওয়া হয়েছে।
শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী
বর্ণনাকারী বলে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর তারা তার পোশাক লুট করে নিয়ে যায়। তার গায়ের জামা নিয়ে যায় ইসহাক বিন হেইওয়াহ হাযরামি , সে তা পরার পর তার কুষ্ঠ রোগ দেখা দিয়েছিল এবং তার চুল পড়ে গিয়েছিল।
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহে তেত্রিশটি বর্শার আঘাত ও চৌত্রিশটি তরবারির আঘাত ছিলো। তার পাজামা নিয়ে যায় বাহর বিন কা ’ আব তামিমি এবং বর্ণিত আছে যে সে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিল এবং তার পাগুলো অবশ হয়ে গিয়েছিল। তার পাগড়ি কেড়ে নেয় আখনাস বিন মুরসিদ হাযরামি যে তা মাথায় পরেছিল এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার স্যান্ডেলগুলো কেড়ে নেয় আসাদ বিন খালিদ এবং তার আংটি নেয় বাজদুল বিন সালীম কালবি যে তার আঙ্গুল কেটে তা নিয়ে গিয়েছিল [আল্লাহর অভিশাপ তার ওপরে] । যখন মুখতার তাকে [বাজদুলকে] গ্রেফতার করলো সে তার হাত ও পা কেটে ফেলেছিল , সে তার রক্ত প্রবাহিত হতে দিয়েছিল যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। ইমামের গোসলের পর পরার জন্য পশমের তৈরী লম্বা জামা ছিলো যা লুট করে নিয়ে যায় ক্বায়েস বিন আল আশআস। তার বর্ম নিয়ে যায় উমর বিন সা ’ আদ এবং যখন তাকে হত্যা করা হয় মুখতার তা উপহার দেয় তার হত্যাকারী আবি উমরোহকে। তার তরবারি নিয়ে যায় জামী ’ বিন খালক আওদী ; আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে , এক তামিমি ব্যক্তি আসাদ বিন হানযালাহ অথবা ফালাফিস মুনশালি তা নিয়ে যায়। তার বিদ্যুৎগতি তরবারিটি যুলফিক্বার ছিলো না , ছিলো অন্য একটি যা ছিলো নবুয়ত ও ইমামতের একটি আমানত এবং তার বিশেষ আংটিও যা তার পরিবারের নিরাপদ হেফাযতে ছিলো।
শেইখ সাদুক্ব থেকে মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন যে , ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল ইমাম হোসেইন (আ.)-এর আংটি সম্পর্কে যে , তার পোষাক লুটের সময় কে তা নিয়েছে। ইমাম (আ.) উত্তর দিলেন ,“ যে রকম বলা হয় তেমন নয়। ইমাম হোসেইন (আ.) ওসিয়ত করে যান তার সন্তান ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর কাছে এবং হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন তার আংটি এবং ইমামতের জিনিসপত্র যা এসেছিল আল্লাহর রাসূল (সা.) থেকে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.)-এর কাছে। ইমাম আলী (আ.) তা ইমাম হাসান (আ.)-এর কাছে হস্তান্তর করেন এবং ইমাম হাসান (আ.) তা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কাছে দিয়ে যান , যা পরবর্তীতে আমার পিতা [ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.)]-এর কাছে আসে এবং তা আমার কাছে পৌঁছেছে। এটি আমার কাছে আছে এবং আমি জুম ’ আর দিন পরি এবং তা পরে নামাজ পড়ি।” মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বলেন যে , আমি শুক্রবার দিন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম এবং তার সাথে নামাজ পড়লাম। যখন তিনি নামাজ শেষ করলেন তিনি তার হাত আমার দিকে লম্বা করলেন এবং আমি তার আঙ্গুলে আংটিটি দেখলাম যাতে খোদাই করে লেখা আছে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই , আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাতে প্রস্তুত। তখন ইমাম বললেন ,“ এটি হলো আমার প্রপিতামহ আবু আব্দুল্লাহ হোসেইন (আ.)-এর আংটি।”
শেইখ সাদুক্বের‘ আমালি ’ ও‘ রাওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ -এ বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঘোড়া তার কেশর ও কপালকে তার রক্তে রঞ্জিত করে নিলো এবং দৌঁড়াতে শুরু করলো ও চিৎকার করতে থাকলো। যখন নবীর নাতনীরা তার চিৎকার শুনতে পেলেন তারা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ঘোড়াটিকে দেখলেন তার আরোহী ছাড়া , এভাবে তারা জানতে পারলেন ইমাম হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে গেছেন।
ইবনে শাহর আশোব তার‘ মানাক্বিব ’ -এ এবং মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঘোড়া সেনাবাহিনীর ঘেরাও থেকে পালিয়ে এলো এবং তার কপালের চুল রক্তে ভেজালো। সে দ্রুত নারীদের তাঁবুর দিকে ছুটে গেলো এবং চিৎকার করতে লাগলো। এরপর সে তাঁবুর পিছনে গেলো এবং তার মাথাকে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো যতক্ষণ না মৃত্যুবরণ করলো। যখন সম্মানিতা নারীরা দেখলেন ঘোড়াটিতে আরোহী নেই তারা বিলাপ শুরু করলেন এবং সাইয়েদা উম্মে কুলসুম (আ.) তার মাথাতে হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন , হে মুহাম্মাদ , হে নানা , হে নবী , হে আবুল ক্বাসিম , হে আলী , হে জাফর , হে হামযা , হে হাসান , এ হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে পড়ে গেছে এবং তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার পাগড়ী ও পোশাক লুট করে নিয়ে গেছে। এ কথা বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জিনিসপত্র লুট এবং তার আহলুল বাইতের কান্না ও বিলাপ
সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেন যে , একজন নারী গৃহকর্মী ইমাম হোসেইন (আ.)-এর তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো এবং এক ব্যক্তি তাকে বললো , হে আল্লাহর দাসী , তোমার সর্দারকে হত্যা করা হয়েছে। সে বলে যে , আমি আমার গৃহকর্তার কাছে দৌড়ে গেলাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম , এ দেখে সব নারীরা উঠে দাঁড়ালেন এবং বিলাপ শুরু করলেন। বলা হয়েছে যে , তখন সেনাবাহিনী একত্রে এগিয়ে আসে রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশধর ও যাহরা (আ.)-এর চোখের আলো হোসেইন (আ.)-এর তাঁবু লুট করার জন্য এবং নারীদের কাঁধ থেকে চাদর ছিনিয়ে নেয়ার জন্য। রাসূলুল্লাহর (সা.) পরিবারের কন্যারা এবং তার আহলুল বাইত একত্রে বিলাপ শুরু করলেন এবং কাঁদলেন তাদের সাথী ও বন্ধুদের হারিয়ে।
বলা হয়েছে , আল্লাহর শপথ আমি আলী (আ.)-এর কন্যা যায়নাব (আ.)-কে ভুলতে পারি না যিনি হোসেইনের (আ.) জন্য কাঁদছিলেন এবং শোকাহত কণ্ঠে বলেছিলেন ,“ হে মুহাম্মাদ , আকাশের ফেরেশতাদের সালাম আপনার উপর , এ হলো হোসেইন , যে পড়ে গেছে [নিহত হয়েছে] , যার শরীর রক্তে ভিজে গেছে এবং তার শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে এবং আপনার কন্যারা বন্দী হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা.)-এর কাছে এবং আলী মুরতাযা (আ.) ও ফাতিমা যাহরা (আ.) এবং শহীদদের নেতা হামযার কাছে , হে মুহাম্মাদ (সা.) , এ হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে গড়িয়ে পড়েছে এবং বাতাস তার জন্য শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে এবং সে নিহত হয়েছে অবৈধ সন্তানদের হাতে , আহ শোক , হায় মুসিবত , আজ আমার নানা রাসূল (সা.) পৃথিবী থেকে চলে গেছেন , হে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাথীরা , আসুন ও দেখুন মুস্তাফা (সা.)-এর বংশকে কিভাবে কয়েদীদের মতো বন্দী করা হয়েছে।”
অন্য আরেকটি বর্ণনায় নিচের কথাগুলো এসেছে ,“ হে মুহাম্মাদ (সা.) , আপনার কন্যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আপনার বংশকে হত্যা করা হয়েছে। বাতাস তাদের উপর ধুলো ফেলছে। এ হলো হোসেইন , তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তার পোশাক ও চাদর লুট করা হয়েছে। আমার বাবা কোরবান হোক তার জন্য যার দলকে সোমবার দিন হামলা করা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার তাঁবুর দড়ি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার সাথে সাক্ষাৎ এখন আর সম্ভব নয় এবং তার আঘাতগুলো সুস্থ হবার নয়। আমার পিতার জীবন তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য আমার জীবন কোরবান। আমার পিতা কোরবান হোক তার জন্য যিনি দুঃখের ভিতর ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার নানা মুহাম্মাদ আল মুস্তাফা (সা.) , আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার নানা আকাশগুলোর রবের রাসূল। আমার পিতা কোরবান হোক খাদিজাতুল কুবরা (আ.)-এর জন্য। আমার পিতা কোরবান হোক আলী আল-মুরতাযা (আ.)-এর জন্য। আমার পিতা কোরবান হোক ফাতিমা যাহরা (আ.)-এর উপর যিনি নারীদের সর্দার। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য সূর্য ফিরে এসেছিল যেন তিনি নামাজ পড়তে পারেন।”
বর্ণনাকারী বলেন , আল্লাহর শপথ , এ কথাগুলো শুনে প্রত্যেকেই কেঁদেছিল ― হোক সে বন্ধু অথবা শত্রু । এরপর সাকিনা (আ.) তার পিতার দেহ জড়িয়ে ধরেন এবং বেদুইনরা চারিদিকে জমা হলো এবং তাকে তার কাছ থেকে টেনে সরিয়ে নিলো।
কাফ ’ আমির‘ মিসবাহ ’ -তে আছে যে , সাকিনা (আ.) বলেছেন যে , যখন হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে যান , আমি তাকে জড়িয়ে ধরে ছিলাম এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম এবং আমি তাকে বলতে শুনলাম ,“ হে আমার শিয়ারা [অনুসারীরা] আমাকে স্মরণ করো যখন পানি পান কর এবং আমার জন্য কাঁদো যখন ভ্রমণকারী অথবা শহীদের কথা শোন।” তা শুনে আমি ভয়ে উঠে পড়ি এবং কান্নার কারণে আমার চোখ ব্যথা করছিল ; এরপর আমি আমার মুখে আঘাত করতে থাকি।
ইবনে আবদ রাব্বাহ তার‘ ইক্বদুল ফারীদ ’ -এ বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন মুসলিমাহ থেকে , তিনি সাবীত থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন আনাস বিন মালিক থেকে যে: যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দাফন করলাম , সাইয়েদা ফাতিমা যাহরা (আ.) আমার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে আনাস , কীভাবে তোমার অন্তর সায় দিলো রাসূলুল্লাহ (সা.) চেহারায় মাটি ঢালতে ?” এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ হে প্রিয় বাবা , আপনি রাজী হয়েছেন যখন আপনার রব আপনার সাক্ষাৎ চেয়েছেন , হে আমার প্রিয় বাবা যার নিকটবর্তী হলেন তার রব (শেষ পর্যন্ত) ।” ফাতিমা (আ.)-এর অবস্থা ছিলো এরকম তার পিতার দাফনের পর , তাহলে কী নেমে এসেছিল সাকিনা (আ.)-র উপর যখন তিনি তার পিতার রক্তাক্ত লাশ জড়িয়ে ধরেছিলেন , যা ছিলো মাথাবিহীন এবং তার পাগড়ী ও পোশাক লুট হয়ে যাওয়া , হাড়গুলো ভাঙ্গা ও বাঁকা পিঠসম্পন্ন ? এরপর তিনি তার অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন:“ কিভাবে তোমাদের অন্তর সায় দিলো যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানকে হত্যা করলে ? কিভাবে তোমরা তার বুকের হাড়গুলো ভেঙ্গে পিষে ফেললে যা ছিলো‘ পবিত্র জ্ঞান ’ -এর ভাণ্ডার ?
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , উমর বিন সা ’ আদ তার সাঙ্গপাঙ্গদের মাঝে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলো , কে চায় স্বেচ্ছায় হোসেইনের পিঠ ও বুকের ওপর ঘোড়া চালাতে ? দশ জন লোক তা করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে ছিলো , ইসহাক বিন হাইওয়াহ হাযরামি , যে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জামা লুটে নিয়েছিলো , অন্যরা ছিলো আখনাস বিন মুরসিদ , হাকীম বিন তুফাইল সুমবোসি , উমর বিন সাবীহ সাইদাউই , রাজা ’ বিন মানকায আবাদি , সালীম বিন খাইসামাহ জুফী , ওয়াহেয বিন না ’ য়েম , সালেহ বিন ওয়াহাব জু ’ ফী , হানি বিন সাবীত হাযরামি এবং উসাইদ বিন মালিক [আল্লাহর অভিশাপ তাদের সবার উপর] । তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহ ঘোড়ার খুরে পিষ্ট করে যতক্ষণ না তার বুক ও পিঠ পিষে যায়। বর্ণনাকারী বলে যে এ দশ জন উবায়দুল্লাহর কাছে আসে এবং উসাইদ বিন মালিক তাদের মধ্যে থেকে বলে যে , আমরা শক্তিশালী ঘোড়ার খুর দিয়ে পিঠের ওপরে বুক পিষেছি। [উবায়দুল্লাহ] ইবনে যিয়াদ বললো , তোমরা কারা ? তারা বললো , আমরা হোসেইনের পিঠ ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষ্ট করেছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তার বুকের হাড়গুলো গুঁড়ো হয়ে গেছে। সে [উবায়দুল্লাহ] তাদেরকে কিছু উপহার দিলো।
আবু আমর যাহিদ বলে যে , আমরা ঐ দশ জন সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছি এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে , তাদের সবাই ছিলো জারজ। [পরে] মুখতার সাক্বাফি তাদের সবাইকে গ্রেফতার করেছিল এবং তাদের হাত ও পা লোহার বেড়িতে বেঁধেছিলো। এরপর সে আদেশ দিয়েছিল ঘোড়া দিয়ে তাদের পিঠ পিষ্ট করতে , যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা মারা যায়।
শহীদদের পবিত্র মাথাগুলোকে কুফায় উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে প্রেরণ
[‘ মানাক্বিব ’ ,‘ ইরশাদ ’ ও‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] এরপর উমর বিন সা ’ আদ ইমাম হোসেইন (আ.) -এর মাথাটি আশুরার দিনই উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে পাঠালো। তারপর সে ইমামের সাথীদের ও আত্মীয়দের মাথাগুলো জমা করলো যাদের সংখ্যা ছিলো বাহাত্তর। এরপর সে সেগুলো শিমর বিন যিলজাওশন , ক্বায়েস বিন আল-আশ ’ আস , আমর বিন হাজ্জাজ এবং উযরাহ বিন ক্বায়েসকে দিয়ে পাঠালো , যারা তা উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে পৌঁছালো।
তাবারি বলেন যে , খাওলি ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাটি [কুফার] রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলো এবং দেখলো যে তার তোরণ বন্ধ আছে। সে মাথাটি তার নিজের বাসায় নিয়ে গেলো এবং তা কাপড় ধোয়ার ড্রামের নিচে রাখলো। তার স্ত্রী ছিলো দুজন। এদের একজন ছিলো বনি আসাদ গোত্রের এবং অন্যজন ছিলো বনি হাযরাম গোত্রের যার নাম ছিলো নাওয়ার , সে ছিলো মালিক বিন আক্বরাবের কন্যা। সেদিন ছিলো নাওয়ারের দিন [স্বামীর সাথে থাকার] ।
হিশাম [বিন মুহাম্মাদ কালবি] বলে যে , আমার পিতা নাওয়ার থেকে শুনেছে যে , খাওলি ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাটি এনে উঠানে কাপড় ধোয়ার একটি ড্রামের নিচে ঢেকে রেখেছিল। এরপর সে ঘরে প্রবেশ করলো এবং বিছানার ওপর বিশ্রাম নেওয়ার জন্য শুয়ে পড়লো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ,“ তুমি কী খবর এনেছো ?” সে জবাব দিলো ,“ আমি তোমার জন্য প্রচুর সম্পদ নিয়ে এসেছি। এটি হলো হোসেইনের মাথা যা তোমার বাড়ির উঠানে পড়ে আছে।” আমি বললাম ,“ তোমার ওপর দুর্ভোগ হোক , মানুষ সোনা ও রুপা আনে , আর তুমি এনেছো রাসূলুল্লাহর (সা.) নাতির মাথা ? আল্লাহর শপথ , আমি কখনোই বিছানার ওপর তোমার পাশে মাথা রাখবো না।” এরপর আমি বিছানা থেকে দূরে সরে গেলাম এবং বাড়ির উঠানে এলাম। এরপর সে [খাওলি] তার অন্য স্ত্রীকে ডেকে পাঠালো , যে ছিলো বনি আসাদ গোত্রের এবং সে তার বিছানায় উঠলো , আর আমি বসে রইলাম মাথাটির দিকে তাকিয়ে। আল্লাহর শপথ , আমি দেখলাম একটি আলোর স্তম্ভ একটি পাতের মত উঠান থেকে আকাশের দিকে উঠে গেছে ― আর কিছু সাদা রঙের পাখি তা তাওয়াফ করছে। এরপর যখন সকাল হলো সে তা [উবায়দুল্লাহ] ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে গেলো।
সাইয়েদ ইবনে তাউস তার‘ ইক্ববাল ’ গ্রন্থে বলেন , জেনে রাখো যে , আশুরার সন্ধ্যায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর পরিবার , কন্যারা ও শিশু সন্তানরা শত্রুদের হাতে বন্দী হন। তারা শোক , দুঃখ ও কান্নার মাঝে ঘেরাও হয়ে পড়লেন। তারা সারা দিন যে অবস্থায় পার করেছেন সে ব্যাথা ও অসম্মান বর্ণনা করা আমার কলমের শক্তির বাইরে। তারা রাত কাটালেন পরিত্যক্ত অবস্থায় এবং কোন সাহায্যকারী ও তাদের পুরুষদের অনুপস্থিতির মাঝে। অন্যদিকে শত্রুরা তাদেরকে চরম ঘৃণা করছিল এবং তাদেরকে ঘৃণ্য মনে করে ফেলে রেখেছিল। এর মাধ্যমে তারা মুরতাদ [ধর্মত্যাগী] উমর বিন সা ’ আদ-এর নৈকট্য চেয়েছিল , যে মুহাম্মাদ (সা.)-এর সন্তানদের এতিম করেছিল এবং যে তাদের হৃদয়কে আহত করেছিল ― আর [নৈকট্য] চেয়েছিল উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের যে ছিলো নাস্তিক এবং ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়ার [নৈকট্য] , যে ছিলো বিদ্রোহী ― ধর্মদ্রোহী কথায় ও ঔদ্ধত্যের চুড়ায়।
এরপর তিনি বলেন যে , আমি‘ মাসাবীহ ’ -এ একটি হাদীস দেখেছি যা ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , আমার পিতা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আলী [আল বাক্বির] (আ.) আমাকে বলেছেন যে: আমি আমার পিতা আলী ইবনে হোসেইন [যায়নুল আবেদীন] (আ.)-কে বহনের জন্য ইয়াযীদ যে বাহন পাঠিয়েছিলো সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন , আমি একটি দুর্বল ও উলঙ্গ উটের পিঠে [হাওদার আসন ছাড়া] চড়েছিলাম , আর ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাটি একটি বাঁশের মাথায় উঠিয়ে রাখা হয়েছিল। আর আমার পিছনে নারীদের বসানো হয়েছিল জিন ছাড়া খচ্চরের ওপর। একই সময়ে রক্ষীরা আমাদের মাথার পিছনে এবং চারিদিক থেকে ঘেরাও করেছিল বর্শা লম্বা করে। যদি আমাদের কারো চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি পড়েছে , তাহলে তাদের মাথায় আঘাত করা হয়েছে বর্শা দিয়ে , যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা দামেশকে প্রবেশ করলাম , একজন ঘোষক ঘোষণা দিচ্ছিলো , হে সিরিয়াবাসীরা , এরা হলো অভিশপ্ত পরিবারের বন্দীরা। [আউযুবিল্লাহ]
[তাবারির গ্রন্থে আছে] আযদি বলেন যে , আবু যুহাইর আবাসি বর্ণনা করেছে কুররাহ বিন ক্বায়েস তামিমি থেকে যে , সে বলেছে , আমি পাহারায় ছিলাম যখন [ইমাম] পরিবারের নারী ও শিশুদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো ইমাম হোসেইনের শাহাদাতের স্থানটির পাশ দিয়ে। তারা উচ্চকণ্ঠে কাঁদতে লাগলেন এবং নিজেদের চেহারাতে আঘাত করতে লাগলেন। আমি সবই ভুলতে পারি কিন্তু ঐ সময়টিকে ভুলতে পারি না যখন ফাতিমা (আ.)-এর কন্যা যায়নাব তার ভাই হোসেইনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি চিৎকার করে বললেন ,“ হে মুহাম্মাদ , হে মুহাম্মাদ , আকাশের ফেরেশতাদের সালাম আপনার ওপরে , এ হলো হোসেইন যে রক্তে ভিজে গেছে এবং কর্তিত অবস্থায় মরুভূমিতে গড়িয়ে পড়েছে , হে মুহাম্মাদ , আপনার কন্যাদের বন্দী করা হয়েছে এবং আপনার বংশ শহীদ হয়ে পড়ে আছে ; আর বাতাস তাদের লাশের উপর বালি ছিটিয়ে দিচ্ছে।” সে [কুররাহ] বলে যে ,“ আল্লাহর শপথ , তার কথাগুলো প্রত্যেক বন্ধু ও শত্রুকে কাঁদিয়েছে।”
যায়েদাহ থেকে একটি সুপরিচিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন যে , আমাদের ওপর যা আপতিত হয়েছিল কারবালার সমতলে , তা যখন ঘটলো ― আমার পিতা ও তার সন্তানদের মাঝে তার সাথীরা , ভাইয়েরা এবং অন্যান্যরা শহীদ হয়ে গেলেন। আর তার নারী-স্বজনদের এবং পরিবারকে উটগুলোয় উঠানো হলো যেগুলোতে বসার জন্য কোন আসন ছিলো না এবং কুফার দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। আমার দৃষ্টি পড়লো শহীদদের ওপর যারা মাটিতে পড়েছিলেন এবং তাদেরকে কেউ দাফন করে নি ― আমার হৃদয় চাপে সংকুচিত হয়ে গেলো। তা আমার ওপরে এত মারাত্মক ছিলো যে আমি শোকে প্রায় মৃত্যুর কাছে চলে গিয়েছিলাম। আমার ফুফু যায়নাব (আ.) , যিনি ছিলেন আলী (আ.)-এর কন্যা , আমার অবস্থা অনুভব করতে পারলেন এবং বললেন , হে আমার নানা , বাবা ও ভাইয়ের প্রতিচ্ছবি , কেন তুমি তোমার জীবনকে বিপদাপন্ন করছো ? আমি জবাব দিলাম , কেন আমি অস্থির হবো না , কেন আমি আমার জীবনকে বিপদাপন্ন করবো না , যখন আমি দেখছি আমার মাওলা , আমার ভাইয়েরা , চাচারা , চাচাতো ভাইয়েরা এবং আমার পরিবার রক্ত আর ধুলায় মেখে মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে , আবরণহীন ও বস্ত্রহীন অবস্থায় , মরুভুমিতে ? তাদের কাফনও পরানো হয় নি , দাফনও করা হয় নি। কেউ তাদের পাশে নেই , না কোন মানুষ তাদের চারপাশে ঘুরছে ― যেন তারা তুর্কী অথবা দায়লামি বংশ। তিনি বললেন , তুমি যা দেখছো তার কারণে স্থিরতা হারিও না , আল্লাহর শপথ , তোমার বাবা ও তোমার দাদা , রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে উপদেশ লাভ করেছেন যেন এ মারাত্মক দুর্যোগের তাপ সহ্য করেন। আর আল্লাহ এ উম্মতের একদলের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছেন যাদেরকে এ পৃথিবীর ফেরাউনের মতো ব্যক্তিরা চেনে না , কিন্তু তারা আকাশের বাসিন্দাদের মাঝে সুপরিচিত যে , তারা এ দেহগুলোর টুকরোগুলোকে জড়ো করবে এবং দাফন করবে। আর তারা তোমার বাবার কবরের মাথার দিকে একটি নিদর্শন [গম্বুজ ও মিনার] প্রতিষ্ঠা করবে কারবালার ভূমিতে , যা চিরদিন থাকবে এবং কখনোই মুছে ফেলা হবে না। আর যদি কুফরের নেতারা এবং পথভ্রষ্টদের সমর্থকরা তা মুছে ফেলতে চায় , তাহলে এর নিদর্শন না কমে বরং প্রচুর সংখ্যায় বাড়তেই থাকবে এবং এ বিষয়টি দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
শেইখ তুসি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , বনি আসাদ গোত্রের লোকেরা একটি নতুন চাটাই এনে তা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহের নিচে বিছিয়ে দিয়েছিল। দীযাজ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে সে বলেছে ,“ আমি আমার দাসদের বিশেষ একদলকে নিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কবর খুঁড়ে উম্মুক্ত করলাম। আমি দেখলাম একটি নতুন চাটাইয়ের ওপর ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দেহ শোয়ানো আছে , আর তা থেকে মেশকের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। আমি ঐ চাটাইটি আগের জায়গাতেই রেখে দিলাম যার ওপরে ইমামের দেহ শোয়ানো ছিলো। এরপর আমি আদেশ দিলাম মাটি দিয়ে ভরে দিতে এবং তার ওপর পানি ছিটিয়ে দিতে।
আবিল জারুদ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , প্রথমে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কবর মাথার দিক থেকে উম্মোচন করা হলো , এরপর পায়ের দিকে। মেশকের সুগন্ধ তা থেকে ছড়িয়ে পড়ছিলো এবং কারো এতে সন্দেহ ছিলো না।
যায়েদাহ থেকে একটি সুপরিচিত হাদীস বর্ণিত হয়েছে যে , জিবরাঈল রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বললেন , আপনার এ নাতি , তিনি তা বললেন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর দিকে ইশারা করে , শহীদ হবে আপনার পরিবার , বংশ এবং আপনার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত ধার্মিক একদল মানুষের সাথে ফোরাত নদীর তীরে ― জায়গাটির নাম কারবালা। তিনি আরো বললেন , যখন তারা লুটিয়ে পড়বে তাদের আরামের জায়গায় , আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের আত্মাগুলোকে নিজের হাতে হরণ করবেন , আর সপ্তম আকাশের ফেরেশতারা আসবে লালমনি ও পান্না-এর ট্রে নিয়ে যা পূর্ণ থাকবে চির জীবন লাভের পানি দিয়ে এবং থাকবে জান্নাতের চাদর ও সুগন্ধি , এরপর তারা দলে দলে তার লাশের জানাযার নামাজ পড়বে। এরপর আল্লাহ আপনার উম্মতের মধ্যে একটি দলকে ক্রিয়াশীল করবেন , যাদেরকে মুশরিকদের রাজ্য চিনতে পারবে না , না তারা তার সাথে রক্ত , বক্তব্য , ধারণা ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকবে। তারা তাদেরকে দাফন করবে এবং একটি নিদর্শনকে দাঁড় করাবে শহীদদের সর্দারের জন্য ঐ মরুভূমির বুকে , যা সৎকর্মশীলদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে এবং বিশ্বাসীদের জন্য সম্মৃদ্ধির মাধ্যম হবে এবং প্রতিদিন প্রত্যেক আকাশ থেকে একশ লক্ষ ফেরেশতা একে তাওয়াফ করবে এবং তার প্রতি সালাম পেশ করবে। তারা আল্লাহর তাসবিহ করবে এবং তাঁকে অনুরোধ জানাবে তাদেরকে নাজাত দেওয়ার জন্য যারা তার কবর যিয়ারতে গেছে। এরপর তারা যিয়ারাতকারীদের নাম লিখে নিবে।”
কুফাতে সাইয়েদা যায়নাব বিনতে আলী (আ.)-এর খোতবা
উমর ইবনে সা ’ আদ কারবালা থেকে মহানবী (সা.)-এর পরিবারের অবশিষ্ট সদস্যদের বন্দী করে কুফার নিকটবর্তী স্থানে আসলে সেখানকার লোকেরা দৃশ্য দেখার জন্য জমায়েত হলো। কুফার লোকেরা বন্দীদের পরিচয় জেনে কাঁদতে শুরু করে। এ সময় সাইয়েদা যায়নাব বিনতে আলী (আ.) একটি ভাষণ দেন।
আবু মানসূর তাবারসি তার‘ ইহতিজাজ ’ -এ বর্ণনা করেছেন যে , কুফাবাসীদের মধ্যে ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.)-এর কন্যা যায়নাব (আ.)-এর খোতবা ছিলো তাদের প্রতি তিরস্কার ও দমনমূলক। হিযাম বিন সাতীর আসাদি বর্ণনা করেছে যে , যখন ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-কে অসুস্থ অবস্থায় কারবালা থেকে কুফা আনা হলো , কুফার নারীরা নিজেদের জামার কলার ছেঁড়া শুরু করলো এবং উচ্চ স্বরে কাঁদতে লাগলো এবং পুরুষরাও তাদের আহাজারির সাথে যোগ দিলো। ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) , যিনি অসুস্থ ছিলেন , তাদেরকে ক্ষীণ কণ্ঠে ডেকে বললেন ,“ হে যারা কাঁদছো , তোমরা ছাড়া আর কারা আমাদের হত্যা করেছে ?” সাইয়েদা যায়নাব (আ.) বিনতে আলী (আ.) লোকদেরকে ইশারা করলেন চুপ থাকার জন্য। হিযাম আসাদি আরো বলে যে , আল্লাহর শপথ আমি কখনো কোন নম্র নারীকে তার চাইতে বাগ্মী দেখি নি যিনি বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.)-এর কণ্ঠে বলছিলেন , তিনি লোকদেরকে ইশারা করলেন কথা শোনার জন্য। তাদের নিশ্বাস বুকের ভেতরে বন্ধ হয়ে গেলো এবং তাদের সম্মিলিত কন্ঠের সুর মিলিয়ে গেলো। এরপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সালাম পেশ করলেন এবং বললেন ,
“ আম্মা বা’ দ , হে কুফাবাসীরা , হে অহংকারী ব্যক্তিরা , হে প্রতারক ব্যক্তিরা , হে পেছনে পলায়নকারীরা , শুনে রাখো , তোমাদের কান্না যেন কখনো না থামে এবং তোমাদের বিলাপ যেন কখনো শেষ না হয়। নিশ্চয়ই তোমাদের উদাহরণ হচ্ছে সেই নারীর মতো যে নিজেই তার সুতার প্যাঁচ খুলে ফেলে তা প্যাঁচানোর পর। তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছো প্রতারণার মাধ্যমে এবং তোমাদের মাঝে লোক দেখানো আত্ম-গরিমা , সীমা অতিক্রম এবং অসততা ছাড়া কিছু বাকী নেই। তোমরা দাসীদের প্রতি প্রেমবাক্য এবং শত্রুদের প্রতি মিষ্টি কথাকে তোমাদের ঐতিহ্য হিসাবে নিয়েছো। তোমাদের উদাহরণ হলো বিস্তীর্ণ বনের মতো অথবা কবরস্থানের মূল্যবান গহনার মতো। জেনে রাখো , কী খারাপই না তোমরা নিজেদের জন্য এনেছো যা আল্লাহর ক্রোধ ডেকে এনেছে তোমাদের ওপরে এবং তোমরা আখেরাতে ক্রদ্ধ আগুনের ভেতরে জায়গা অর্জন করেছো। তোমরা আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদছো ? হ্যাঁ , নিশ্চয়ই , আল্লাহর শপথ , তোমাদের কাঁদা উচিত , তোমরা এর যোগ্য। প্রচুর কাঁদো , কম হাসো , এভাবেই তোমরা অপমানে আক্রান্ত হয়েছো এবং ঘৃণার ভেতরে বন্দী হয়েছো যা তোমরা কখনোই ধুয়ে ফেলতে পারবে না। কীভাবে তোমরা‘ শেষ নবী ’ (সা.)-এর সন্তান এবং তোমাদের মাঝে‘ রিসালাতের খনি ’ -র রক্ত নিজেদের হাত থেকে ধুয়ে ফেলবে ― যিনি ছিলেন বেহেশতের যুবকদের সর্দার , যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতি এবং তোমাদের দলের আশ্রয়। তিনি ছিলেন তোমাদের বিশ্রামের এবং তোমাদের কল্যাণের বাসস্থান। তিনি ক্ষত নিরাময় করতেন এবং তোমাদেরকে রক্ষা করতেন , যেসব খারাপ তোমাদের দিকে আসতো। তোমরা তার কাছে যেতে যখন তোমরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করতে। তিনি ছিলেন তোমাদের শ্রেষ্ঠ পরামর্শদাতা , তোমরা তার ওপর নির্ভর করতে এবং তিনি ছিলেন তোমাদের পথ চলার বাতি। জেনে রাখো , কী খারাপই না তোমরা নিজেদের জন্য এনেছো এবং ক্বিয়ামতের দিনের জন্য কী বোঝাই না তোমরা তোমাদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছো। আত্মার ধ্বংস! আত্মার ধ্বংস! ধ্বংস! তোমাদের সন্ধান ব্যর্থ হোক এবং তোমাদের হাত অবশ হয়ে যাক , কারণ তোমরা তোমাদের রিযক্ব-এর বিষয়টি প্রবহমান বাতাসের কাছে হস্তান্তর করেছো। তোমরা আল্লাহর ক্রোধের ভেতরে জায়গা করে নিয়েছো এবং ঘৃণা ও দুর্ভাগ্যের মোহর তোমাদের কপালে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দুর্ভোগ হোক তোমাদের! তোমরা কি জানো তোমরা মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রিয় সন্তানের মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করেছো ? এবং কী অঙ্গীকার তোমরা তার সাথে ভঙ্গ করেছো ? এবং তার প্রিয় পরিবারকে তোমরা রাস্তায় বের করে এনেছো ? এবং তাদের মর্যাদার কোন্ আবরণ [বোরখা] তোমরা তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছো ? এবং কোন্ রক্ত তোমরা তার কাছ থেকে ঝরিয়েছো ? কী কুটিল জিনিসই না তোমরা জন্ম দিয়েছো যে , আকাশগুলো যেন ভেঙ্গে পড়বে এবং জমিন ছিন্ন- বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে , আর পাহাড়গুলো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়বে পৃথিবী ও আকাশের মাঝের জায়গা পূর্ণ করে।
তোমাদের বিষয়গুলোর বধূ হলো চুলবিহীন , অপরিচিত , নোংরা , অন্ধ , কুৎসিত ও গম্ভীর। তোমরা আশ্চর্য হচ্ছো কেন আকাশ থেকে রক্ত বৃষ্টি হয়েছে ? আখেরাতের শাস্তি আরো অপমানকর এবং তখন কোন সাহায্যকারী থাকবে না। তোমাদের এ অবসর যেন তোমাদেরকে হালকা মনের না করে দেয় , কারণ সর্বশক্তিমান ও পবিত্র আল্লাহ সম্পর্কে কেউ পূর্ব-ধারণা করতে পারে না এবং প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়ে তিনি ভুলে যান না ; না , কখনোই না , তোমাদের রব তোমাদের জন্য ওঁত পেতে আছেন।”
এরপর তিনি নিচের শোকগাঁথাটি আবৃত্তি করলেন ,“ কী উত্তর দিবে যখন নবী জিজ্ঞেস করবেন , তোমরা ছিলে শেষ উম্মত ; কেমন আচরণ করেছো তোমরা আমার বংশ ও আমার সন্তানদের সাথে ― যারা ছিলো সম্মানিত ; যাদের কিছুকে বন্দী করেছিলে এবং তাদের কিছুকে তাদের রক্তে ভিজিয়েছো ? এটি তো সেই প্রতিদান নয় যে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলাম যার মাধ্যমে তোমরা আমার‘ ক্বুরবা ’ [রক্তজ]-এর প্রতি আচরণ করেছো ; আমি আশঙ্কা করি , যে গযব‘ ইরাম ’ -এর লোকজনের ওপর পড়েছিল ঐ রকম একটি গযব তোমাদের ওপর অবতরণ করবে।” এ কথা বলে তিনি তার মুখ তাদের দিক থেকে ঘুরিয়ে নিলেন।
হিযাম বলে যে , আমি দেখলাম সব পুরুষ এদিক সেদিক চলে গেলো এবং তারা গভীর অনুতপ্ত ছিলো। আমার পাশে দাঁড়ানো একজন বৃদ্ধ মানুষ ভীষণ কাঁদলো এবং তার দাড়ি তার চোখের পানিতে ভিজে গেলো। সে তার হাত দুটো আকাশের দিকে তুলে ধরলো এবং বললো , আমার বাবা-মা কোরবান হোক তাদের জন্য যাদের বৃদ্ধ , যুবক ও নারীরা সব বৃদ্ধ , যুবক ও নারীদের ওপরে বাছাইকৃত। তাদের পরিবার সম্মানিত এবং তাদের মর্যাদা সুউচ্চ। এরপর সে বললো ,“ তাদের পুর্বপুরুষরা এবং তাদের বংশধরগণ শ্রেষ্ঠ। যখন আগামীকাল তাদের বংশধরদের গণনা করা হবে , তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ও অভিশপ্তদের মাঝে তাদের [বংশধর] থাকবে না।”
ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) বলেছেন ,“ হে প্রিয় ফুফু , দয়া করে চুপ থাকুন , যা ঘটে গেছে তা ভবিষ্যতের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। আলহামদুলিল্লাহ , আপনি কোন প্রশিক্ষণ ছাড়াই বিচক্ষণ ব্যক্তি এবং জ্ঞানী , যাকে আর বুঝানোর প্রয়োজন নেই। নিশ্চয়ই কান্না ও আহাজারি তাদেরকে ফেরত আনতে পারবে না যারা চলে গেছে।”
কুফার জনগণের ভেতর ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর যুক্তি পেশ
এরপর হিযাম বিন সাতীর বলে যে , ইমাম আলী বিন যায়নুল আবেদীন (আ.) জনতার সামনে এগিয়ে এলেন এবং তাদেরকে ইশারা করলেন চুপ থাকার জন্য। এরপর তিনি বসলেন , আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবিহ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সালাম পেশ করলেন। তারপর বললেন ,
“ হে জনতা , তোমাদের মধ্যে যারা আমাকে চিনো , তারাতো আমাকে চিনোই , আর যারা আমাকে চিনো না ― আমি আলী , হোসেইনের সন্তান , যার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ফোরাতের তীরে কোন অপরাধ বা দোষ ছাড়াই। আমি তার সন্তান যার পবিত্রতা লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং যার রহমতপূর্ণ জীবনকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে. তার সম্পদ লুট করা হয়েছে এবং তার নারীদের বন্দী করা হয়েছে। আমি তার সন্তান যাকে হত্যা করেছে একদল সংঘবদ্ধ মানুষ , আর এ [শাহাদাতের] সম্মান আমাদের জন্য যথেষ্ট।
হে জনতা , আমি তোমাদেরকে আল্লাহর নামে বলছি , তোমরা কি জানো না যে তোমরা আমার পিতাকে একটি চিঠি লিখেছিলে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ? তোমরা তাকে ধোঁকা দিয়েছো অঙ্গীকারের মাধ্যমে এবং তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রতি দিয়ে এবং তার কাছে আনুগত্যের শপথ করে। এর পরিবর্তে তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছো এবং তাকে পরিত্যাগ করেছো। তোমরা যেন তার মাধ্যমে ধ্বংস হও যার জন্ম তোমরা দিয়েছো এবং তোমাদের আদর্শ যেন কদর্য হয়ে যায়। তোমরা কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দাঁড়াবে যখন তিনি বলবেন: তোমরা আমার সন্তানকে হত্যা করেছো এবং আমার পবিত্রতার মর্যাদা লঙ্ঘন করেছো , তোমরা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নও।”
পুরুষদের মাঝে কান্নার রোল উঠলো এবং তারা পরস্পরকে বলতে লাগলো , তোমরা ধ্বংস হয়ে গেছো এবং তোমরা [তা] জানো না। এরপর ইমাম (আ.) আরও বললেন ,“ তার ওপর আল্লাহর রহমত হোক যে আমার উপদেশ গ্রহণ করে এবং আমার পরামর্শকে হেফাযত করে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) এবং তার বংশের পথে যে , আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে রক্ত সম্পর্ক রেখে আরো উত্তম হেদায়েতের অধিকারী।”
তারা তাকে বললো ,“ হে রাসূলুল্লাহর সন্তান , আমরা সবাই কথা শুনি , অনুগত এবং আপনার পবিত্রতার প্রশংসাকারী। আমরা আপনাকে পরিত্যাগ করবো না এবং আপনার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিবো না। তাই আদেশ করুন আমাদের , আপনার রব আপনার ওপর রহমত করুন , আমরা আপনার সাথে আছি যুদ্ধ ও শান্তির সময়ে। এরপর আমরা তার ওপর প্রতিশোধ নিবো যে আপনাদের ওপরে জুলুম করেছে অথবা আমাদের ওপর। একথা শুনে ইমাম (আ.) বললেন ,
“ হায় আশ্চর্য , হায় আশ্চর্য , হে প্রতারণাপূর্ণ ধোঁকাবাজের দল , একটি বিরাট বাধা আছে তোমাদের এবং তোমাদের ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষার মাঝে। তোমরা কি আমার সাথে একই আচরণ করতে চাও যেভাবে তোমরা আমার পূর্বপুরুষদের সাথে আচরণ করেছো ? না , কখনোই না। হাজ্বীদের আনন্দিত উটদের রবের শপথ , আমার পিতার ও আমার পরিবারের শাহাদাতের গভীর ক্ষতসমূহ এখনো আরোগ্য লাভ করে নি , যে আঘাতগুলো রাসূলুল্লাহ (সা.) , আমার পিতা ও তার সন্তানদের বুকে করা হয়েছে তা এখনো স্মৃতি থেকে মুছে যায় নি। আমার ঘাড়ের হাড়গুলো ভেঙ্গে গেছে দুঃখে এবং এর তিক্ততা আমার কণ্ঠ ও শ্বাসনালীর মাঝখানে উপস্থিত আছে , আমার হৃদয়ের হাড়গুলো আমার শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছে। আমি চাই যে তোমরা যেন আমাদের উপকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হও , আর না আমাদের অনিষ্টকারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।
এরপর তিনি বললেন , এটি কোন আশ্চর্যের বিষয় নয় যে হোসেইনকে (আ.) হত্যা করা হয়েছে , তার পিতার মতোই , যিনি ছিলেন তার চাইতে উত্তম এবং তার চাইতে শ্রেষ্ঠ। হে কুফাবাসীরা , উল্লাসিত হয়ো না আমাদের দুর্দশায় , যা একটি বিরাট দুর্যোগ। যিনি শহীদ হয়ে পড়ে আছেন ফোরাতের তীরে , আমার জীবন তার জন্য কোরবান হোক ― আর তার হত্যার শাস্তি হবে জাহান্নামের আগুন।
কুফায় সাইয়েদা ফাতিমা বিনতে হোসেইন (আ.)-এর খোতবা
যাইদ বিন মূসা বিন জাফর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছে , যে তার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে ফাতিমা সুগরা [বিনতে হোসেইন] (আ.)-এর খোতবা বর্ণনা করেছে , যা তিনি কারবালা থেকে ফেরার পর দিয়েছিলেন:
আল্লাহর প্রশংসা করছি সব বালুকণার সংখ্যায় এবং পৃথিবী পর্যন্ত আকাশগুলোর ওজনের সমান। আমরা তার প্রশংসা করি এবং তাকে বিশ্বাস করি এবং শুধু তারই ওপর নির্ভর করি এবং আমরা বলি যে আল্লাহ ছাড়া আর কোন খোদা নেই , তিনি অদ্বিতীয় ও তাঁর কোন অংশীদার নেই এবং মুহাম্মাদ (সা.) তাঁর দাস ও রাসূল। কোন দোষ ছাড়াই তার সন্তানদের মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ফোরাত নদীর তীরে। হে আল্লাহ , আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই যদি আমি আপনার বিষয়ে কোন মিথ্যা বলি অথবা আমি যদি কোন ভুল ধারণা পোষণ করি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর খিলাফতের বিষয়ে , যার অধিকার অন্যায়ভাবে দখল করা হয়েছিল এবং তাকেও কোন অপরাধ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে আল্লাহর ঘরগুলোর একটিতে , যেভাবে তার সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে গতকাল। সেখানে ছিলো একদল লোক যারা নিজেদের মুসলমান দাবী করেছিল , তাদের মাথা যেন তাদের ঘাড়ের ওপর না থাকে , তিনি পিপাসার্ত ছিলেন যতক্ষণ না তার সত্তাকে আপনার কাছে তুলে নেয়া হয়েছিল। তার ছিলো প্রশংসনীয় চরিত্র , ধার্মিক বংশধর এবং সুবিখ্যাত গুণাবলী ও প্রশংসনীয় ধর্ম এবং তিনি আপনার পথে কোন তিরস্কার ও ধমককে ভয় করতেন না। হে আল্লাহ , আপনি তাকে আপনার ইসলামের দিকে পথ দেখিয়েছেন শৈশব থেকেই এবং আপনি তার বালেগ বয়সের গুণাবলীকে প্রশংসা করেছেন। তিনি সার্বক্ষণিকভাবে আপনার রাসূলের প্রতি আন্তরিক ছিলেন এবং আপনার দরুদ তার ওপর বর্ষিত হয়েছে ঐ সময় পর্যন্ত যখন আপনি তাকে আপনার নিজের কাছে ডেকে নিলেন। তিনি বিরত ছিলেন এ পৃথিবীর বিষয়ে এবং তিনি সম্পদলোভী ছিলেন না। আর তিনি ছিলেন আখেরাতের বিষয়ে আশাবাদী। এরপর তিনি আপনার পথে সংগ্রাম করেছেন এবং আপনি তাকে ভালোবেসেছেন ও তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং তাকে সিরাতাল মুসতাক্বিমের পথ দেখিয়েছেন।
আম্মা বা ’ দ , হে কুফাবাসীরা , হে ধোঁকাবাজ , প্রতারক এবং অহংকারী ব্যক্তিরা , আমরা এক পরিবার যাদেরকে আল্লাহ পরীক্ষা করেছেন তোমাদের বিষয়ে এবং তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেছেন আমাদের বিষয়ে। তিনি এ পরীক্ষাগুলোকে আমাদের জন্য ঐশী প্রশান্তি লাভের কারণ করেছেন এবং এ বিষয়ে আমাদের জানিয়েছেন। আমরা তাঁর জ্ঞানের হেফাযতকারী অভিভাবক এবং তাঁর বুদ্ধির ভাণ্ডার। আমরা তাঁর প্রজ্ঞাকে স্বীকৃতি দেই এবং তার পৃথিবীতে তাঁর দাসদের ওপর আমরা তাঁর প্রমাণ। তিনি আমাদের অত্যন্ত ভালোবাসেন তার দয়ার মাধ্যমে এবং আমাদেরকে তাঁর সৃষ্টিকূলের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন তার নবীর মাধ্যমে। তোমরা আমাদেরকে মিথ্যা বলেছো এবং কুফুরী করেছো আমাদের [ওপর অত্যাচারের] মাধ্যমে। তোমরা মনে করেছো আমাদের হত্যা করা বৈধ এবং আমাদের জিনিসপত্র লুট করেছো যেন আমরা তুরস্ক ও কাবুলের কাফের। এই গতকাল ছিলো যখন তোমরা আমাদের দাদাকে হত্যা করেছো এবং তোমাদের তরবারিগুলো আমাদের , আহলুল বায়েত [নবী পরিবার]-এর রক্ত ছিটিয়েছে। তোমরা তোমাদের চোখকে শীতল করেছো প্রাচীন শত্রুতার কারণে এবং উল্লাস করেছো আল্লাহর বিরুদ্ধে উদ্ধত হয়ে এবং যে ধোঁকার জন্ম দিয়েছো তার কারণে। আমাদের রক্ত ঝরানোতে ও আমাদের জিনিসপত্র লুট করে উল্লাসিত হয়ো না , কারণ এ মহাদুর্যোগের এবং বিরাট জবাইয়ের মাধ্যমে আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা কোরআনের এ আয়াতের সাথে একমত
) س َابِقُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا كَعَرْضِ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أُعِدَّتْ لِلَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ (21) مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ نَبْرَأَهَا إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ(
“ প্রতিযোগিতা করো দ্রুত এগোবার জন্য তোমাদের রবের ক্ষমা এবং এক জান্নাতের দিকে ― যার বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর বিস্তৃতির মতো , [এটি] প্রস্তুত করা হয়েছে তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলে ; এটি আল্লাহর অনুগ্রহ , তিনি তা দান করেন যাকে তাঁর ইচ্ছা এবং আল্লাহ বিরাট অনুগ্রহের প্রভু। কোন দুর্যোগ ঘটে না পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের ভেতরে , যা আগে থেকেই একটি কিতাবে নেই ― আমরা ঘটতে দেই , তা আল্লাহর জন্য সহজ।” [সূরা হাদীদ: 21-22]
তোমরা যেন বহিস্কৃত হও! অপেক্ষা করো সে অভিশাপের জন্য যা শীঘ্রই তোমাদের ওপর অবতরণ করবে। আকাশগুলোর প্রতিশোধ তোমাদের ওপর অবতরণ করবে একের পর এক এবং ক্ষয়ে যেতে থাকবে ,
) أ َوْ يَلْبِسَكُمْ شِيَعًا وَيُذِيقَ بَعْضَكُمْ بَأْسَ(
“ অথবা তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে পরিণত করবেন এবং তোমাদের মধ্যে কিছুকে অন্যের যুদ্ধের স্বাদ গ্রহণ করাবেন।” [সূরা আন ’ আম: 65]
এরপর আমাদের ওপর তোমরা যে জুলুম করেছো , [সে জন্য] তোমরা কিয়ামতের দিনে থাকবে চিরস্থায়ী ভয়ানক আযাবের ভেতর। জেনে রাখো , জালেমদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ! তোমাদের দুর্ভোগ হোক! তোমরা কি জানো এবং তোমরা কি বুঝো ? তোমরা কেমন হাত দিয়ে আমাদের দিকে বর্শা তাক করেছিলে ? কেমন সত্তা নিয়ে তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করতে এসেছিলে ? কেমন পা নিয়ে আমাদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে এসেছিলে ? তোমাদের অন্তরগুলো শক্ত হয়ে গেছে। তোমাদের কলিজা লোহায় পরিণত হয়েছে এবং তোমাদের হৃদয় অন্ধ হয়ে গেছে। আর তোমাদের কান ও চোখের ওপর মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে। শয়তান তোমাদের উস্কানি দিয়েছে এবং তোমাদের আদেশ দিয়েছে এবং তোমাদের চোখগুলোকে অন্ধ করে দিয়েছে , আর তোমরা কখনোই হেদায়াত খুঁজে পাবে না। তোমরা যেন ধ্বংস হয়ে যাও হে কুফাবাসীরা , রাসূল (সা.)-এর কত রক্তের দায় তোমাদের ওপর ? এবং কী পরিমাণ [প্রতিশোধ] তোমাদের ঘাড়ের ওপর ? এরপর তোমরা তার ভাই আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে প্রতারণা করেছো এবং তার সন্তানদের সাথেও ― যারা নবীর বংশ এবং তারা ছিলো পবিত্র ও ধার্মিকদের অন্তর্ভুক্ত। তোমাদের মাঝে একজন দম্ভ করে বলেছিল: আমরাই তারা যারা আলী এবং তার সন্তানদেরকে হত্যা করেছি ভারতীয় তরবারি ও বর্শা দিয়ে এবং আমরা তাদের নারীদের বন্দী করেছি তুরস্কের বন্দীদের মতো এবং আমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এবং তা একটি যুদ্ধই ছিলো। তার মুখের মধ্যে কাদা যে তা বলেছে। তোমরা গর্ব করেছো তাদের হত্যা করে যাদের আল্লাহ প্রশংসা করেছেন এবং পবিত্র করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে অপবিত্রতা দূরে সরিয়ে রেখেছেন ? নিশ্বাস বন্ধ করো , এরপর বসো যেভাবে একটি কুকুর তার লেজের আগায় বসে , যেভাবে তোমাদের পিতা বসতো। প্রত্যেক ব্যক্তি তাই লাভ করবে যা সে আগে পাঠিয়েছে। দুর্ভোগ হোক তোমাদের , তোমরা আমাদের হিংসা করতে আল্লাহ যে অনুগ্রহ আমাদের ওপর করেছেন তার কারণে। আমাদের এতে কী দোষ যদি আমাদের নদী প্রচুর পানিতে পূর্ণ থাকে , আর তোমাদের নদী শুকিয়ে যায় , যা একটি কেঁচোকে লুকাতে পারে না ?
) ذ َلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ(
“ এ হলো আল্লাহর অনুগ্রহ , তিনি তা দান করেন যাকে তাঁর ইচ্ছা এবং আল্লাহ বিরাট অনুগ্রহের প্রভু।” [সূরা হাদীদ: 21]
) و َمَنْ لَمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِنْ نُورٍ(
“ যাকে আল্লাহ নূর দেন না , তার জন্য নূর থেকে কিছু নেই। [সূরা নূর: 40]
বলা হয়েছে যে এ কথা শুনে কান্নার কণ্ঠগুলো উচ্চকিত হলো এবং জনতা বললো , যথেষ্ট হয়েছে হে পবিত্রদের কন্যা , আপনি আমাদের হৃদয় পুড়িয়ে ফেলেছেন , আমাদের ঘাড় নিচু করে দিয়েছেন এবং আমাদের বিবেকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। এরপর তিনি চুপ করে গেলেন। তার ও তার পিতা ও তার নানার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।
কুফাতে সাইয়েদা উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (আ.)-এর খোতবা
সাইয়েদ ইবনে তাউস তার‘ মালহুফ ’ -এ খোতবাগুলো উদ্ধৃত করেছেন এবং এরপর বলেছেন যে , সেদিন ইমাম আলী (আ.)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম (আ.) পর্দার পেছন থেকে কেঁদে উঠলেন এবং বললেন , হে কুফাবাসীরা , তোমরা যেন খারাপের সম্মুখীন হও , কেন তোমরা ইমাম হোসেইন (আ.)-কে সাহায্য করা থেকে বিরত রইলে ? কেন তাকে হত্যা করলে ? কেন তোমরা তার জিনিসপত্র লুট করলে এবং এগুলোর মালিক বনে গেলে ? কেন তার নারী-স্বজনদের বন্দী করেছো এবং তাকে নিশ্চুপ করে দিয়েছো ? তোমরা যেন ধ্বংস হয়ে যাও এবং শিকড় শুদ্ধ উৎপাটিত হয়ে যাও। দুর্ভোগ হোক তোমাদের , তোমরা কি জানো তোমরা কিসের জন্ম দিয়েছো ? তোমরা কি জানো কী গুনাহের বোঝা তোমরা তোমাদের পিঠের ওপর তুলে নিয়েছো ? এবং কী রক্ত তোমরা ঝরিয়েছো ? এবং কোন নারীদের তোমরা বন্দী করেছো ? এবং কোন শিশুদের লুট করতে চাও ? এবং কোন জিনিসপত্র তোমরা লুটতরাজ করেছো ? তোমরা রাসূল (সা.)-এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে হত্যা করেছো। আর তোমাদের হৃদয় থেকে দয়া বিদায় নিয়েছে।
) أ َلَا إِنَّ حِزْبَ الشَّيْطَانِ هُمُ الْخَاسِرُونَ(
“ জেনে রাখো , একমাত্র হিযবুল্লাহ-ই [আল্লাহর দল] সফলতা লাভ করবে [সূরা মুজাদালাহ: 22]
জেনে রাখো , অবশ্যই শয়তানের দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” [সূরা মুজাদালাহ: 19]
এরপর তিনি বললেন ,
“ তোমরা আমার ভাইকে হত্যা করেছো , অভিশাপ তোমাদের ওপর। তোমরা অবশ্যই এর পুরস্কার হিসাবে পাবে আগুন ― যাতে চিরকাল পুড়বে। তোমরা তার রক্ত ঝরিয়েছো যার রক্ত ঝরানোকে হারাম ঘোষণা করেছেন আল্লাহ কোরআন ও মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে ; তোমরা যেন আগুনের সংবাদ পাও যেখানে তোমরা আগামীকাল প্রবেশ করবে এবং চিরস্থায়ীভাবে সেখানে যাবে। আমি আমার ভাইয়ের জন্য সারা জীবন কাঁদবো , যিনি জন্ম নিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসাবে। আমার গালে অশ্রু বইছে বন্যার মতো এবং বৃষ্টির মতো ― যা কখনো শুকোবে না।”
বলা হয়েছে , জনতা কাঁদতে লাগলো এবং উচ্চকণ্ঠে আহাজারি করতে লাগলো। নারীরা তাদের নিজেদের চুল ছিঁড়লো এবং মাথায় বালি মাখলো। তারা তাদের চেহারায় খামচি দিলো এবং তাতে আঘাত করতে শুরু করলো এবং বললো , হায় , হায়। পুরুষরা কাঁদতে শুরু করলো এবং নিজেদের দাড়ি ধরে টানলো। কোনদিন পুরুষ ও নারীদের এমন বিলাপ দেখা যায় নি।
কুফায় উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের প্রাসাদে নবী পরিবারের বন্দীরা
‘ শারহে হামাযিয়া ’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে , সে [উবায়দুল্লাহ] আদেশ দিলো যেন [ইমাম হোসেইন আ.-এর] মাথাটি তার ডান পাশে রাখা একটি বর্মের ওপর রাখা হয়। আর তার কাছেই দুই সারিতে লোকজন দাঁড়িয়ে ছিলো।
আযদি বলেন যে , সুলাইমান বিন রাশীদ বর্ণনা করেছে হামীদ বিন মুসলিম থেকে যে , আমি দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা তার কাছেই রাখা আছে। আর সে তার দাঁতগুলোতে তার হাতের বেত দিয়ে এক ঘন্টা ধরে আঘাত করছে। যখন যাইদ বিন আরক্বাম দেখলেন যে সে তার হাতকে নিবৃত্ত করছে না , তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ তোমার বেত সরিয়ে নাও এ দাঁতগুলো থেকে , কারণ আল্লাহর শপথ , যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দুটো ঠোঁটকেই দেখেছি সেগুলোর ওপর চুমু দিতে।” এ কথা বলার পর বৃদ্ধের দুঃখ বিস্ফোরিত হলো এবং তিনি কাঁদতে লাগলেন। ইবনে যিয়াদ বললো , তোমার রব তোমাকে কাঁদাক। আল্লাহর শপথ , যদি তুমি বৃদ্ধ না হতে অথবা নির্বোধে পরিণত না হতে এবং তোমার বুদ্ধি চলে না যেতো , আমি তোমার মাথা উড়িয়ে দিতাম। এরপর সে উঠে দাঁড়ালো ও চলে গেলো। আমি যখন রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলাম , দেখলাম লোকজন পরস্পরকে বলছে , আল্লাহর শপথ , যাইদ বিন আরক্বাম এমন কথা উচ্চারণ করেছে যে যদি যিয়াদের সন্তান তা শুনতো , সে তাকে হত্যা করে ফেলতো। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম সে কী বলেছে। তারা বললো , সে বলেছে: একজন দাস একজন দাস লাভ করেছে এবং সে মনে করছে সব মানুষ তার দাসের সন্তান [আরবী প্রবাদ] । হে আরবরা , আজ থেকে তোমরা দাসে পরিণত হয়েছো। তোমরা ফাতেমা (আ.)-এর সন্তানকে হত্যা করেছো এবং মারজানাহর সন্তানকে তোমাদের অধিনায়ক বানিয়েছো। সে তোমাদের মাঝে ধার্মিকদের হত্যা করে। আর জেনে রাখো , সে তোমাদেরকে তার দাস বানিয়েছে। তোমরা নিজেদেরকে অপমানের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছো এবং মৃত্যু হোক তাদের যারা নিজেদের অপমানের ভেতর প্রবেশ করিয়েছে।
শেইখ সাদূক্ব তার‘ আমালি ’ গ্রন্থে এবং ফাত্তাল নিশাপুরি তার‘ রাওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন উবায়দুল্লাহর এক খাদেমের কাছ থেকে যে , সে বলেছে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাটি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে আনা হলো সে এটিকে একটি সোনালী ট্রে-তে রাখতে আদেশ দিলো। এরপর সে তার বেত দিয়ে এর সামনের দাঁতগুলোতে আঘাত করতে লাগলো এবং বললো , হে আবা আবদিল্লাহ , তুমি খুব তাড়াতাড়িই বৃদ্ধ হয়ে গেছো। উপস্থিতদের মধ্যে একজন বললো , আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি সেখানে চুমু দিতে যেখানে তুমি তোমার বেত দিয়ে আঘাত করছো। সে বললো , এ দিনটি হলো বদরের দিনের বদলা। এরপর সে আদেশ দিলো আলী বিন হোসেইন (আ.)-কে শেকলে বাঁধতে এবং তার পরিবারের নারী ও অন্যান্য বন্দীদের সাথে কারাগারে পাঠাতে। আমি তাদের সাথে ছিলাম এবং দেখলাম সবগুলো রাস্তা পুরুষ ও নারীতে পূর্ণ ছিলো এবং তারা নিজেদের চেহারায় আঘাত করছিল এবং কাঁদছিলো। তারা তাদেরকে কারাগারে ঢুকালো এবং দরজায় তালা মেরে দিলো। এরপরে সে আলী বিন হোসেইন (আ.) এবং নারীদের সাথে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা আনতে বললো , তাদের সাথে সাইয়েদা যায়নাব (আ.)ও ছিলেন। ইবনে যিয়াদ বললো ,“ সব প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি তোমাদেরকে অপমান করেছেন এবং হত্যা করেছেন।” এরপর উবায়দুল্লাহ তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ করলো এবং সব জায়গায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মৃত্যুর সংবাদ পাঠালো ও ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাসহ বন্দীদেরকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠালো।
শেইখ তুসী বর্ণনা করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ মদীনায় পৌঁছলো , আক্বীল বিন আবি তালিবের কন্যা আসমা একদল নারীর সাথে বেরিয়ে এলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কবরের দিকে গেলেন ও চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন। এরপর তিনি মুহাজির ও আনসারদের দিকে তাকিয়ে বললেন , আপনারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কী উত্তর দেবেন যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আপনাদের জিজ্ঞেস করবেন কিয়ামত ও হিসাব দেওয়ার দিনে ― যেদিন সত্য টিকে থাকবে ― যে তোমরা আমার বংশধরকে পরিত্যাগ করেছিলে ও অনুপস্থিত ছিলে এবং তাদেরকে জুলুমকারিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলে ; এখন কেউ নেই যে তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে শাফায়াত করবে ; যখন কারবালার মরুভূমিতে মৃত্যু তার দিকে এসেছিল , তার কোন সাহায্যকারী ছিলো না , না ছিলো কোন সাথী যারা বলবে , আমরা তার প্রতিরক্ষা করবো-অন্যের হাতে নিহত হওয়া থেকে। ’ বর্ণনাকারী বলেছে যে , আমরা এর আগে নারী-পুরুষদের এভাবে কাদঁতে দেখি নি।
নবী পরিবারের বন্দীদের কুফা থেকে দামেস্কে প্রেরণ
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা পাঠিয়ে দেওয়ার পর উবায়দুল্লাহ শিশুদের এবং নারীদের প্রস্তুত করলো এবং ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) এর গলায় একটি লোহার বেষ্টনি পরালো এবং তাদেরকে মাথার পিছনে রওয়ানা করিয়ে দিলো মাখফার বিন সা ’ লাবাহ আ ’ য়েযী এবং শিমর বিন যিলজাওশানকে দিয়ে এবং তারা একসময়ে মাথাগুলো বহনকারী কাফেলার সাথে যুক্ত হলো। ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) পথে তাদের সাথে কোন কথা বললেন না সিরিয়া পৌঁছা পর্যন্ত।
‘ তারীখুল খামীস ’ গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে , তারা [মাথা বহনকারীরা] এগিয়ে যেতে থাকলো একটি গির্জাতে পৌঁছানো পর্যন্ত এবং সেখানে তারা দুপুর পর্যন্ত বিশ্রাম নেয়ার জন্য প্রবেশ করলো। সেখানে তারা দেখলো দেয়ালে লেখা আছে ,“ যে উম্মত হোসেইনকে হত্যা করেছে , এরপরও তারা আশা করে যে কিয়ামতের দিন তার নানা তাদের জন্য সুপারিশ করবে ? তারা একজন পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলো , কে এ বাক্যগুলো লিখেছে ? সে বললো , এগুলো নবুয়ত ঘোষণার একশত পঞ্চাশ বছর আগে এখানে লেখা হয়েছিল।”
সিবতে ইবনে জাওযী তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল মালিক বিন হিশাম নাহউই মিসরি থেকে , একটি হাদীসের মধ্যে আছে যে , তারা [মাথা বহনকারীরা] যখনই তাদের জিনিসপত্র নামাতো প্রতিবারই ট্রাংক থেকে পবিত্র মাথাটিও বের করে বর্শার ওপরে ওঠাতো। তারা সারা রাত পাহারা দিত ― সকাল পর্যন্ত এবং যাত্রা শুরুর আগে তা আবার ট্রাংকে ঢুকিয়ে রাখতো এবং সামনে অগ্রসর হতো। তাদের কোন এক যাত্রা বিরতির সময় এক পাদ্রীর গির্জার কাছে এলো। বরাবরের মতো তারা মাথাটি বর্শার ওপরে ওঠালো এবং একে পাহারা দিলো , আর বর্শাটিকে গির্জার দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখলো। মধ্যরাতে পাদ্রী দেখলো একটি আলোর রশ্মি মাথা থেকে বেরিয়ে আসছে এবং আকাশে পৌঁছে গেছে। সে গির্জার ওপর থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে বললো , তোমরা কারা ? তারা উত্তর দিলো , আমরা ইবনে যিয়াদের সাথী। সে বললো , এটি কার মাথা ? তারা বললো , এটি হোসেইনের , আলী বিন আবি তালিব ও আল্লাহর নবীর কন্যা ফাতেমার সন্তান। সে বললো , তোমরা বলতে চাও তোমাদের নবী ? তারা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। একথা শুনে সে বললো , তোমরা মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট। যদি মসীহর [ঈসা-আ.] কোন পুত্র-সন্তান থাকতো আমরা তাকে আমাদের চোখের ওপর রাখতাম [আমরা তাকে অনেক সম্মান দিতাম] । আরো বললো , তোমরা কি কিছু চাও , আমাকে কি একটা উপকার করতে পারো ? তারা জিজ্ঞেস করলো তা কী ? সে বললো , আমার দশ হাজার আশরাফী আছে , তোমরা তা নিতে পারো যদি মাথাটি আমাকে দাও। সকাল পর্যন্ত তা আমার কাছে রাখতে দিবে এবং যখন তোমরা আবার যাত্রা করবে তখন তা আমার কাছ থেকে ফেরত নিয়ে নিও। তারা বললো , এতে আমাদের কোন ক্ষতি নেই। একথা বলে তারা মাথাটি তার কাছে হস্তান্তর করলো এবং সে [পাদ্রী] বিনিময়ে তাদেরকে আশরাফীগুলো দিলো। পাদ্রী মাথাটি পানি দিয়ে ধুয়ে নিলো। এতে সুগন্ধি মাখালো এবং তা তার উরুর ওপর রেখে সকাল পর্যন্ত অনেক কাঁদলো। যখন সকাল হলো সে বললো ,“ হে মাথা , আমার নিজের ওপরে ছাড়া আমার আর কোন ক্ষমতা নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং আপনার নানা আল্লাহর রাসূল। আপনি সাক্ষী থাকুন যে আমি আপনার বন্ধু ও গোলাম। এরপর সে গির্জা ও এর ভেতরে যা ছিলো সব পরিত্যাগ করলো এবং আহলুল বাইত (আ.)-এর গোলামদের সারিতে প্রবেশ করলো।”
ইবনে হিশাম তার‘ সীরাহ ’ -তে বলেছেন যে , তারা মাথাটি নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হলো এবং যখন দামেস্কের কাছে পৌঁছলো , তারা পরস্পরকে বলতে শুরু করলো যে , আসো আমরা আশরাফীগুলো আমাদের মাঝে ভাগ করে নেই। হয়তো ইয়াযীদ সেগুলো দেখলে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাবে। থলেটি আনা হলো এবং খোলা হলো। তারা দেখলো তা মাটিতে পরিণত হয়েছে এবং এর এক পাশে লেখা ,
) و َلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ إِنَّمَا يُؤَخِّرُهُمْ لِيَوْمٍ تَشْخَصُ فِيهِ الْأَبْصَارُ(
“ এবং ভেবো না জালেমরা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ গাফেল। তিনি তাদের শুধু ঐ দিন পর্যন্ত রেহাই দেন যেদিন চোখগুলো পলকহীন তাকিয়ে থাকবে (আতঙ্কে) ।” [সূরা ইবরাহীম: 42]
এবং অন্য পাশে লেখা:
) و َسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ(
“ এবং শীঘ্রই জালেমরা জানতে পারবে কী খারাপ ফেরার দিকেই না তারা ফিরে আসবে।” [সূরা আশ শুআরা: 227]
এ দেখে তারা সেগুলোকে বুরদা নদীতে নিক্ষেপ করলো।
সাইয়্যেদ ইবনে তাউস বলেন যে ইবনে লাহী ’ আহ এবং অন্যরা এ সংবাদটি দিয়েছে , যা থেকে আমরা একটি অংশ উল্লেখ করছি যতটুকু আমাদের প্রয়োজন: আমি কা ’ বা তাওয়াফ করছিলাম। তখন এক ব্যক্তিকে বলতে শুনলাম , হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু আমি জানি তুমি তা কখনো করবে না। আমি বললাম , হে আল্লাহর বান্দাহ , আল্লাহকে ভয় করো এবং এ কথা উচ্চারণ করো না। এমনও যদি হয় যে তোমার গুনাহ বৃষ্টির ফোটাগুলোর অথবা গাছগুলোর পাতার সংখ্যার সমান। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও , নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমা করে দেবেন। কারণ আল্লাহতো পরম ক্ষমাশীল ও পরম করুণাময়। সে বললো , আসো , যেন তোমাকে আমি আমার সম্পর্কে বলতে পারি। সে বললো , আমরা ছিলাম পঞ্চাশ জন যারা হোসেইনের মাথা নিয়ে সিরিয়া যাচ্ছিলাম। প্রতি রাতে আমরা হোসেইনের মাথাকে একটি ট্রাঙ্কে ঢুকিয়ে রাখতাম এবং একে ঘিরে থেকে মদপান করতাম। এক রাতে আমার বন্ধুরা মদপান করলো এবং মাতাল হলো এবং বেহুশ হলো , কিন্তু আমি মদ পান করি নি। যখন রাত্রির এক অংশ পার হয়ে গেলো , আমি একটি বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পেলাম এবং বিদ্যুৎ চমকাতে দেখলাম। হঠাৎ আকাশের দরজাগুলো খুলে গেলো এবং নবী আদম (আ.) , নূহ (আ.) , ইবরাহীম (আ.) , ইসমাইল (আ.) , ইসহাক্ব (আ.) এবং আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) , সাথে জিবরাঈল এবং অন্যান্য ফেরেশতারা , নেমে এলেন। জিবরাঈল ট্রাঙ্কের কাছে এলেন এবং পবিত্র মাথাটি তা থেকে তুলে জড়িয়ে ধরলেন এবং চুমু দিতে লাগলেন। এরপর প্রত্যেক নবী তাকে অনুসরণ করে একই কাজ করলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তা শেষ নবী (সা.)-এর কাছে পৌঁছালো। রাসূলুল্লাহ কাঁদতে শুরু করলেন এবং অন্য নবীরা তাকে সমবেদনা জানাতে লাগলেন। তখন জিবরাঈল বললেন ,“ হে মুহাম্মাদ (সা.) আমি আপনার উম্মত সম্পর্কে আপনার অনুগত। আপনি যদি আমাকে আদেশ করেন আমি তাদের ওপর জমিন উল্টিয়ে দিবো যেভাবে আমি দিয়েছি নবী লূতের (আ.) জাতিকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন , হে জিবরাঈল , নিশ্চয়ই আল্লাহর সামনে তাদের বিরুদ্ধে হিসাব চাইবো। এরপর ফেরেশতারা আমাদের হত্যা করতে অগ্রসর হলো। আমি বললাম , আশ্রয় দিন , আশ্রয় দিন , হে আল্লাহর রাসূল। আর তিনি (সা.) বললেন , দূর হও , আল্লাহ যেন কখনো তোমাদের ক্ষমা না করেন।”
দামেস্কে নবী পরিবারের বন্দীরা
আবু রায়হান [আল বিরুনী] তার‘ আসারুল বাক্বিয়াহ ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে , সফর মাসের প্রথম দিন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা দামেস্কে আনা হলো। ইয়াযীদ এটি তার সামনে রাখলো এবং এর দাঁতগুলোতে হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা দিয়ে বলছিল , আহ , কতইনা ভালো হতো আমার গোত্রের মধ্য থেকে যারা বদরে নিহত হয়েছিল এবং যারা [ওহুদের যুদ্ধে] খাযরাজ গোত্রকে দুমাথা ওয়ালা বর্শার আঘাতে আহত হয়ে চিৎকার করতে দেখেছিল , যদি তারা আজ এখানে উপস্থিত থাকতো। তারা আমাকে উচ্চকণ্ঠে অভিনন্দন জানাতো এবং বলতো ,‘ হে ইয়াযীদ , তোমার হাত যেন অলস না হয়ে যায় , কারণ আমরা তার [রাসূলুল্লাহ-সা.] গোত্রের সর্দারকে হত্যা করেছি। আমি তা করেছি বদরের প্রতিশোধ হিসাবে , তা এখন পরিপূর্ণ হয়েছে। বনি হাশিম সার্বভৌমত্ব নিয়ে একটি খেলা খেলেছে। কোন রিসালাহ [আল্লাহর কাছ থেকে সংবাদ] আসে নি , না এসেছে কোন ওহী। আমি খন্দক পরিবারের একজন থাকতাম না যদি আহমাদ-এর বংশধরের ওপর প্রতিশোধ না নিতাম তাদের কৃতকর্মের জন্য। ’
আবি মাখনাফ এর‘ মানাক্বিব ’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা ইয়াযীদের কাছে আনা হলো , এ থেকে একটি সুবাস ছড়িয়ে পড়লো এবং অন্য সব সুবাসকে শুষে ফেললো।
‘ বিহার ’ এবং‘ মানাক্বিব ’ -এও বর্ণিত হয়েছে ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যাইদ থেকে , যে বর্ণনা করেছে তার পূর্বপুরুষ থেকে যে , সাহল বিন সা ’ আদ বলেছে , আমি আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলাম , যখন সিরিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রবেশ করলাম তখন আমি একটি শহরে প্রবেশ করলাম যেখানে বেশ কিছু পানির স্রোতধারা বইছিল এবং সবুজ গাছ-গাছালি ছিলো। আমি দেখলাম শহরটিকে সাজানো হয়েছে এবং চারিদিকে আনন্দ-উল্লাস চলছে। নারীরা তাম্বুরীন ও ঢাক বাজাচ্ছিলো এবং আনন্দ-ফুর্তিতে ব্যস্ত ছিলো। আমি নিজেকে বললাম সিরিয়াবাসীদের উৎসব সম্পর্কে আমি ভালোভাবেই অবগত , অথচ এ দিনটি কোন উৎসবের দিন নয়। আমি একদল লোককে দেখলাম পরস্পর কথা বলছে। আমি তাদের কাছে গেলাম এবং বললাম , আপনারা সিরিয়াতে উৎসব করছেন অথচ এ সম্পর্কে আমি জানি না। তারা বললো , যেন তুমি মরুভূমি থেকে এসেছো ? আমি বললাম , আমি সাহল বিন সা ’ আদ , মুহাম্মাদ (সা.)-এর একজন সাহাবী। তারা বললো , হে সাহল , খুবই আশ্চর্য যে আকাশগুলোর রক্ত বৃষ্টি ঝরছে না , না পৃথিবী এর অধিবাসীদের গিলে ফেলছে। আমি তাদেরকে বললাম তারা কেন একথা বলছে , তারা বললো , কী আশ্চর্য! হোসেইনের মাথা ইরাক থেকে উপহার হিসেবে আনা হয়েছে , আর এ লোকেরা উল্লাস করছে ? আমি জিজ্ঞেস করলাম , তাদের কোন তোরণ দিয়ে প্রবেশ করানো হয়েছে ? তারা একটি তোরণের দিকে ইশারা করলো যার নাম ছিলো‘ বাব আস সা ’ আত ’ ।
হঠাৎ দেখলাম একটির পর একটি সামরিক পতাকা প্রবেশ করছে এবং একজন ঘোড়সওয়ার একটি লম্বা ফলাবিহীন বর্শা বহন করছে যার আগায় একটি মানুষের মাথা বসানো আছে। যার গালগুলোর সাথে , আর যে কোন ব্যক্তির চাইতে সবচেয়ে বেশী মিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে। মাথার পেছনে আসছিলো নারীরা , গদীবিহীন উটের ওপরে। আমি তাদের কাছে গেলাম এবং তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম , কার কন্যা তুমি ? সে বললো , আমি সাকিনাহ , হোসেইনের কন্যা। আমি বললাম , তুমি কি কিছু চাও ? আমি সাহল বিন সা ’ আদ তোমার প্রপিতামহ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একজন সাহাবী। সে উত্তর দিলো , মাথা বহনকারীদের বলুন যেন তারা আমাদের মাঝ থেকে সরে যায় , যেন জনতা সেদিকে তাকিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরিবার তাদের দৃষ্টি থেকে মুক্তি পায়। আমি মাথা বহনকারীর কাছে গেলাম এবং বললাম , তুমি কি আমার আশা পূরণ করার পরিবর্তে চারশ আশরাফী নিতে চাও ? সে জিজ্ঞেস করলো তা কী ? আমি বললাম , এ মাথাটি এই নারীদের মাঝ থেকে দূরে সরিয়ে নাও। সে রাজী হলো এবং আশরাফীগুলো নিলো। তখন তারা মাথাটিকে একটি ট্রাঙ্কে ভরলো এবং ইয়াযীদের কাছে নিয়ে গেলো এবং আমিও তাদের সাথে সাথে গেলাম। ইয়াযীদ সিংহাসনে বসা ছিলো একটি মুকুট পরে যা ছিলো মুক্তা ও লালমনি পাথরে সজ্জিত। আর একদল গণ্যমান্য কুরাইশ ব্যক্তি তার কাছে বসা ছিলো। মাথা বহনকারী সেখানে প্রবেশ করলো এবং বললো , আমার ঘোড়ার ব্যাগ ভরে দিন সোনা ও রূপা দিয়ে। কারণ , আমি হত্যা করেছি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের সর্দারকে।
পিতা-মাতার দিক বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে আমি হত্যা করেছি ― যার বংশধারা শ্রেষ্ঠ যখন বংশধারা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। একথা শুনে ইয়াযীদ বললো , তুমি যদি জানতেই যে সে ছিলো মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , তাহলে কেন তাকে হত্যা করেছো ? সে জবাব দিলো , আপনার কাছ থেকে একটি পুরস্কারের লোভে। ইয়াযীদ আদেশ দিলো তার মাথা বিচ্ছিন্ন করতে এবং তা করা হলো। এরপর সে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা নিজের সামনে রাখলো এবং বললো , এসব কেমন দেখছো , হে হোসেইন ?
‘ কামিলে বাহাই ’ -এ উল্লেখ করা হয়েছে যে , নবী পরিবারকে সিরিয়ার প্রবেশদ্বারে অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল তিন দিন। আর এ সময় শহরকে এমনভাবে সাজানো হচ্ছিলো যে তা আগে আর কখনো দেখা যায় নি। পাঁচ লক্ষ সিরিয় পুরুষ ও মহিলা নতুন পোশাক পরেছিল , সাথে ছিলো তাম্বুরীন , করতাল এবং ঢাক ; তারা নিজেদের প্রস্তুত করলো এবং তাদের দিকে এগিয়ে গেলো। সেদিন ছিলো বৃহষ্পতিবার , শহরের ভেতরে ছিলো পুনরুত্থান দিবসের মত [ভীড়] এবং সেখানে জনগণ আনন্দ-উল্লাস করছিল। যখন দিবস অগ্রসর হলো , মাথাগুলোকে শহরে প্রবেশ করানো হলো। অনেক মানুষের ভীড়ের কারণে , অনেক কষ্টে দিনের শেষে তারা ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়ার প্রাসাদের দরজায় পৌঁছাতে পারলো। মূল্যবান পাথরে সজ্জিত একটি সিংহাসন ইয়াযীদের জন্য রাখা হয়েছিল এবং তার বাড়ি সাজানো হয়েছিল এবং সোনালী ও রূপালী চেয়ারগুলো তার সিংহাসনকে ঘিরে রাখা হয়েছিল। ইয়াযীদের সেবকরা মাথা বহনকারীদের প্রবেশ করতে বললো , আর তারা তা পালন করলো। তারা বললো , অধিনায়কের ইযযতের শপথ , আমরা আবু তুরাব [আলী]-এর সন্তানকে হত্যা করেছি এবং তাদের বংশধারা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছি। এরপর তারা পুরো ঘটনা বর্ণনা করলো এবং তার সামনে মাথাগুলো রাখলো। আহলে বাইত (আ.)-কে দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্দী করে রাখা হয়েছিল , ছেষট্টিদিন যাবৎ এবং এ সময়ে কেউ তাদের সালাম জানাতে পারে নি। সেদিন এক বৃদ্ধ ব্যক্তি ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর কাছে গেলো এবং বললো , সব প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি তোমাদের হত্যা করেছেন ও ধ্বংস করেছেন এবং বিদ্রোহের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন।
শইখ মুফীদ বলেন যে , যখন তারা ইয়াযীদের প্রাসাদের দরজায় পৌঁছলো তখন মাখফার বিন সা ’ লাবাহ উচ্চকণ্ঠে বললো , আমি মাখফার বিন সা ’ লাবাহ , আমি এ নোংরা সীমালঙ্ঘনকারীদের [আউযুবিল্লাহ] এনেছি ইয়াযীদের কাছে।
একথা শুনে ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) বললেন , মাখফারের মায়ের সন্তান হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং সবচেয়ে নীচ।
অত্যাচারী সিরিয়ার নাগরিকরা বললো , আমরা কখনো এত সুন্দর বন্দী দেখি নি। তোমরা কারা ? ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কন্যা সাইয়েদা সাকিনাহ (আ.) উত্তর দিলেন ,“ আমরা মুহাম্মাদ (সা.)-এর বন্দী পরিবার।” তাদেরকে এবং ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-কে আটকে রাখা হলো মসজিদের সিঁড়িঘরে। তিনি তখন অল্প-বয়সী যুবক ছিলেন। সিরিয়াবাসীদের মধ্যে এক বৃদ্ধ এগিয়ে এলো এবং বললো ,“ সব প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি তোমাদেরকে হত্যা করেছেন ও ধ্বংস করেছেন এবং বিদ্রোহের আগুনকে নিভিয়ে দিয়েছেন।” এরপর সে যা ইচ্ছা বলতে থাকলো এবং যখন সে চুপ হলো , ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) তাকে বললেন ,“ তুমি কি আল্লাহর কুরআন পড়েছো ?” সে হ্যাঁ বললো। তিনি বললেন , তুমি কি এ আয়াত পড়েছো:
) ق ُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَىٰ(
বলো [হে আমার রাসূল]: আমি তোমাদের কাছে কিছু দাবী করি না [নবুয়তের পরিশ্রমের জন্য] শুধু আমার রক্তের আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া। [সূরা শুরা: 23]
সে বললো , হ্যাঁ , আমি পড়েছি। ইমাম (আ.) বললেন , আমরাই সেই পরিবার থেকে। এছাড়া এ আয়াত তুমি কি পড়ো নি:
) و َآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ(
এবং দিয়ে দাও তোমার রক্তের আত্মীয়দের অধিকার। [সূরা বনি ইসরাইল: 26]
সে বললো সে তা পড়েছে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বললেন , আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত। এরপর তিনি বললেন , তুমি কি এ আয়াত পড়ো নি:
) إ ِنَّمَا يُرِيدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا(
আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের কাছ থেকে অপবিত্রতা দূরে রাখতে হে আহলে বাইত এবং তোমাদের পবিত্র করতে চান পুত: পবিত্রের মতো। [সূরা আহযাব: 33]
সে বললো , কেন নয় ? ইমাম বললেন , আমরাই তারা যাদের কথা এখানে বলা হয়েছে। একথা শুনে সিরিয় ব্যক্তি তার দুহাত আকাশের দিকে তুলে বললো ,
হে আল্লাহ , আমি আপনার সামনে নিজেকে মুহম্মাদ (সা.)-এর সন্তানদের শত্রু ও হত্যাকারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছি। আমি সব সময় কোরআন পড়েছি কিন্তু আজকে পর্যন্ত এর ওপরে আমি গভীরভাবে ভাবি নি।
আমাদের উস্তাদ শেইখ সাদূক বর্ণনা করেছেন ফযল বিন শাযান থেকে যিনি বলেছেন যে , আমি ইমাম আলী আল রিদা (আ.)-কে বলতে শুনেছি যে ,“ যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা সিরিয়াতে নেওয়া হলো , ইয়াযীদ আদেশ দিলো তা মাটিতে রাখার জন্য এবং একটি দস্তরখান এর সামনে বিছানো হলো। সে এরপর তার সাথীদেরসহ এর দিকে ফিরে খাবার খাচ্ছিলো এবং মদ পান করেছিল। যখন তারা শেষ করলো , সে ট্রে-টিকে তার সিংহাসনের নিচে রাখতে আদেশ দিলো। এরপর সে সিংহাসনের ওপরেই পাশা খেলার বোর্ড বিছালো এবং খেলা শুরু করলো। সে টিটকারী করতে লাগলো ইমাম হোসেইন (আ.) , তার পিতা (আ.) এবং তার নানার (সা.) নাম উল্লেখ করে এবং সে জিতলো। সে এর জন্য মদ পান করলো। তিনবার সে মদ পান করলো এবং এরপর কিছুটা ট্রের কাছে ছুঁড়ে মারলো। অতএব যে আমাদের শিয়া [অনুসারী] , যখন তার দৃষ্টি পড়বে মদ ও পাশার দিকে , সে ইমাম হোসেইন (আ.)-কে স্মরণ করবে , আর ইয়াযীদ ও তার বংশকে অভিশাপ দিবে , আল্লাহ তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিবেন যদি তা তারাগুলোর সংখ্যার সমানও হয়।”
অভিশপ্ত ইয়াযীদের সামনে সাইয়েদা যায়নাব (আ.)-এর খোতবা
বর্ণনাকারী বলেছে যে , ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.)-এর কন্যা সাইয়েদা যায়নাব (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন , সব প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালকের জন্য এবং শান্তি বর্ষিত হোক তাঁর রাসূল এবং তার বংশধরদের সবার ওপর। কত সত্যই না আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন:
) ث ُمَّ كَانَ عَاقِبَةَ الَّذِينَ أَسَاءُوا السُّوأَىٰ أَن كَذَّبُوا بِآيَاتِ اللَّـهِ وَكَانُوا بِهَا يَسْتَهْزِئُونَ(
“ এরপর অত্যন্ত খারাপ পরিণতি হলো তাদের যারা খুব খারাপ কাজ করেছে , কারণ তারা আল্লাহর নিদর্শনগুলোকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছে এবং তাদের প্রতি তারা টিটকারী করতো।” [সূরা রূম: 10]
হে ইয়াযীদ , এখন যেহেতু তুমি পৃথিবীর পথ ও আকাশের দিগন্তকে আমাদের ওপর বন্ধ করে দিয়েছো এবং আমাদেরকে কয়েদীদের মতো তাড়িয়ে এনেছো। তুমি কি মনে করো যে তুমি আমাদেরকে আল্লাহর কাছে বেইযযতি করেছো এবং তোমাকে প্রিয় করেছো ? আর তুমি এর কারণে আল্লাহর কাছে সম্মান ও উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছো ? আর তাই তুমি আমাদেরকে নীচু মনে করে তাকাচ্ছো এবং অহংকারী , আনন্দিত ও উচ্ছসিত হচ্ছো যে পৃথিবী তোমার দিকে ফিরে এসেছে ? তুমি মনে করেছো যে তোমার কাজ গোছানো , আর সার্বভৌমত্ব ও রাজ্য তোমার জন্য প্রীতিকর ? মনে হচ্ছে তুমি ধীরে ধীরে সর্বশক্তিমান ও পবিত্র আল্লাহর কথাগুলো ভুলে গেছো , যারা অবিশ্বাসী তারা যেন মনে না করে যে তাদেরকে আমরা যে সময় দিচ্ছি তা তাদের জন্য কল্যাণকর ; আমরা তাদের শুধু সময় দেই এজন্যে যে তারা যেন গুনাহতে বৃদ্ধি পায় , আর তাদের জন্য আছে অপমানকর শাস্তি। এটিই কি ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি যে তুমি তোমার পরিবারের নারীদের এবং নারী গৃহকর্মীদের পর্দার আড়ালে বসাবে আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যাদের বন্দী করবে , তাদেরকে প্রদর্শনী বানাবে ? তুমি তাদের বোরখা ছিনিয়ে নিবে আর তাদেরকে বেআব্রু করে রাখবে , আর তাদের শত্রুরা তাদেরকে অন্যদের সামনে প্রদর্শন করে বেড়াবে এক শহর থেকে আরেক শহরে এবং প্রত্যেক নদী ও শহরের অধিবাসীরা তাদেরকে এক নজর দেখবে ? এবং তাদের দিকে তাকাবে প্রত্যেক ঘনিষ্ঠ ও অঘনিষ্ঠ মানুষ , নীচ ও সম্মানিত লোকেরাও , যখন তাদের সাথে থাকবে না পুরুষ অথবা নির্ভরযোগ্য কোন ব্যক্তি ? কী তাক্বওয়া আমরা তাদের কাছ থেকে আশা করতে পারি যারা পরহেযগারদের [মুত্তাকীদের] কলিজা খেয়েছে এবং যাদের গায়ে মাংস গজিয়েছে শহীদদের রক্ত [পান] থেকে ? কীভাবে সে আমাদের প্রতি তার ঈর্ষা কমাবে , যে আমাদের আহলুল বাইতের দিকে তাকায় দাম্ভিকতা , শত্রুতা এবং ঘৃণার দৃষ্টিতে ? এবং সে বীরত্বের সাথে ঘোষণা করে যে , তারা আমাকে উচ্চকণ্ঠে অভিনন্দন জানাতো এবং বলতো:“ হে ইয়াযীদ , তোমার হাত দুটো যেন অলস না হয়ে যায় , এরপর তুমি আবু আব্দুল্লাহ (আ.) , যিনি জান্নাতের সর্দার , তার দাঁতের দিকে মনোযোগ দিয়েছো এবং এতে আঘাত করেছো তোমার হাতের কঞ্চি দিয়ে ? তাই এরকম কেনইবা তুমি বলবে না ? তুমি আঘাতকে এর গভীরতম তলায় পৌঁছে দিয়েছো এবং আদি উৎসকে উপড়ে ফেলেছো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তান ও আব্দুল মোত্তালিবের বংশ থেকে পৃথিবীর নক্ষত্রদের একজনের রক্ত ঝরানোর মাধ্যমে। এরপর তুমি উচ্চকণ্ঠে তোমার পূর্বপুরুষদের সম্বোধন করেছো এবং তোমার অনুমানে তাদেরকে ডেকে আনছো ? খুব শীঘ্রই তুমিও তাদের শেষ পরিণতির সম্মুখীন হবে। আর তখন তুমি বলবে , হায় যদি তুমি অবশ হতে এবং বোবা হতে তাহলে তো একথাগুলো বলতে হতো না এবং এমন চরিত্র তোমার হতো না।
হে আল্লাহ , আমাদের অধিকারকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিন এবং আমাদের ওপর যারা অত্যাচার করেছে তাদের ওপর প্রতিশোধ নিন এবং আপনার গযব পাঠান তাদের ওপরে যারা আমাদের রক্ত ঝরিয়েছে এবং আমাদের সাহায্যকারীদের হত্যা করেছে। আল্লাহর শপথ , তুমি তোমার নিজের চামড়া ছিঁড়েছো এবং তোমার নিজের মাংস টেনে ছিঁড়েছো এবং তুমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানের রক্ত ঝরানোর এবং তার পরিবার ও অনুসারীদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিরাট বোঝা নিয়ে তার সামনে যাবে ― এমন জায়গায় যেখানে আল্লাহ জড়ো করবেন তাদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়াদের এবং সংখ্যা বৃদ্ধি করবেন তাদের মধ্যে যারা ছড়িয়ে পড়েছিল , আর তাদের কাছে তাদের অধিকার উপহার দিবেন ,
) و َلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّـهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ(
“ এবং ভেবো না যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তারা মৃত , বরং তারা জীবিত , তাদের রবের সাথে আছে ― রিযক্ব লাভ করছে।” [আল ইমরান: 169
আল্লাহ তোমার ওপরে বিচারক হিসাবে যথেষ্ট এবং রাসূল হবেন তোমার শত্রু এবং তিনি জীবরাঈলের সমর্থন পাবেন। খুব শীঘ্রই তোমার বাবা , যে তোমাকে রাজ্য প্রস্তুত করে দিয়ে গেছে এবং তোমাকে মুসলমানদের ঘাড়ে বসিয়ে গেছে , বুঝতে পারবে অত্যাচারীদের জন্য কত খারাপ এক জায়গা অপেক্ষা করছে।
কী খারাপ স্থানই না তুমি অর্জন করেছো এবং কী দুর্বল সামরিক বাহিনীইনা তোমার। যা হোক , অপ্রীতিকর পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করেছে তোমার সাথে কথা বলতে , যখন আমি মনে করি তোমার স্থান অত্যন্ত নিচে এবং তোমার তিরস্কার খুবই বড় এবং এও চাই যে তোমাকে অনেক তাচ্ছিল্য করি। কিন্তু চোখগুলো ফুলে উঠেছে এবং হৃদয়গুলো ছিটকে বেরিয়ে যেতে চায়। সাবধান , এটি আশ্চর্য যে আল্লাহর কাছে মর্যাদাবান ব্যক্তিদের দলটিকে হত্যা করবে মুক্তদের সেনাবাহিনী ― যারা শয়তান। এ হাতগুলোই আমাদের রক্ত মুঠোয় চেপে ধরেছে এবং এ চোয়ালগুলোই আমাদের মাংস গোগ্রাসে খেয়েছে। আর এগুলো হলো পবিত্র ও জ্যোতির্ময় লাশসমূহ যেগুলোকে এখন পাহারা দিচ্ছে নেকড়েরা এবং হায়েনাগুলো বার বার বালি ছিটিয়ে দিচ্ছে তাদের দেহের ওপর। আর এখন তুমি মনে করছো আমরা তোমার গনিমত ,
) ذ َٰلِكَ بِمَا قَدَّمَتْ يَدَاكَ وَأَنَّ اللَّـهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ(
“ এটি হচ্ছে সে কারণে যা তোমাদের হাত সামনে পাঠিয়েছিল [যা তোমরা তোমাদের জীবনে করেছিলে] এবং আল্লাহ তার দাসদের প্রতি কখনো জুলুম করেন না।” [সূরা হাজ্ব: 10]
আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি এবং শুধু তাঁর ওপরেই নির্ভর করি। এরপর তুমি তোমার যে কোন ফাঁদ পাততে পারো এবং তোমার ইচ্ছানুযায়ী যে কোন পদক্ষেপ নিতে পারো এবং চেষ্টা করে যাও যত চাও। আল্লাহর শপথ , তুমি কখনোই আমাদের কথা মুছে ফেলতে পারবে না এবং ওহীকে আমাদের মাঝ থেকে উৎখাত করতে পারবে না , না তুমি এ ঘটনার লজ্জাকে মুছে ফেলতে পারবে। তোমার অভিমত ভ্রান্তিপূর্ণ এবং তোমার দিনগুলো কম। আর তোমার দল ছত্রভঙ্গ থাকবে যেদিন আহ্বানকারী আহ্বান করবে: জেনে রাখো ,
) أ َلَا لَعْنَةُ اللَّـهِ عَلَى الظَّالِمِينَ(
নিশ্চয়ই আল্লাহর অভিশাপ জালিমদের ওপরে। [সূরা হুদ: 18]
সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি জগতসমূহের সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক , যিনি আমাদের শুরুতে শান্তি বর্ষণ করেছেন এবং যিনি শাহাদাতকে বরকতসহ আমাদের পরিণতি হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। আমি আল্লাহর কাছে চাই যেন তিনি তাঁর পুরস্কারকে তাদের জন্য পূর্ণ করেন এবং তা আরো বৃদ্ধি করে দেন এবং তাদের উত্তরাধিকার হিসেবে আমাদের ওপর সদয় হয়ে ফেরেন , কারণ তিনি ক্ষমাশীল ও একজন বন্ধু।
) ح َسْبُنَا اللَّـهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ(
“ আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি হলেন শ্রেষ্ঠ নিরাপত্তাদানকারী।”
[সূরা আল ইমরান: 173]
সাইয়েদা যায়নাব (আ.)-এর এ দীর্ঘ ও গুরুভার বক্তব্যের উত্তরে ইয়াযীদ বললো , শোকার্ত নারীর বিলাপ প্রশংসনীয় , কিন্তু মৃত্যু বিলাপরত নারীর জন্য আরো সহজ।
শেইখ মুফীদ বর্ণনা করেছেন সাইয়েদা ফাতেমা বিনতে হোসেইন (আ.) থেকে যে , যখন আমরা ইয়াযীদের সামনে বসেছিলাম , সে আমাদের অবস্থা দেখে করুণা প্রকাশ করলো। সিরিয়াবাসীদের মধ্যে লাল চেহারার একজন উঠে দাঁড়িয়ে বললো ,“ হে বিশ্বাসীদের আমির [আউযুবিল্লাহ] আমাকে এ মেয়েটি উপহার দিন , এবং‘ এ ’ বলার মাধ্যমে সে আমাকে বুঝাচ্ছিলো। আমি ভয়ে কাঁপতে লাগলাম এবং অনুমান করলাম যে এ কাজ তাদের জন্য সহজ। আমি আমার ফুফু যায়নাব (আ.)-এর কোলে সেঁটে রইলাম , যিনি অবশ্য জানতেন তা কখনো ঘটবে না। আমার ফুফু সিরিয় ব্যক্তিকে বললেন , আল্লাহর শপথ , তুমি মিথ্যা বলছো , আর তুমি তোমার নীচ প্রকৃতির প্রকাশ ঘটিয়েছো। তোমার এবং তার কোন ক্ষমতা নেই তা করার। ইয়াযীদ ক্রুদ্ধ হয়ে বললো ,“ তুমি মিথ্যা কথা বলছো , আল্লাহর শপথ , আমার এ কাজ করার অধিকার আছে।” সাইয়েদা যায়নাব (আ.) উত্তর দিলেন ,“ না , আল্লাহর শপথ , আল্লাহ তোমাকে এ ক্ষমতা দেন নি , যদি না তুমি আমাদের উম্মত পরিত্যাগ করো এবং অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করো।” এ কথা শুনে ইয়াযীদের রাগ দ্বিগুণ হলো এবং চিৎকার করে বললো ,“ তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলো ? অবশ্যই তোমার বাবা ও তোমার ভাই-ই ধর্ম ত্যাগ করেছিল [আউযুবিল্লাহ] ।” সাইয়েদা যায়নাব (আ.) বললেন ,“ তুমি যদি মুসলমান হয়ে থাকো , এবং তোমার দাদা ও বাবা , তাহলে আল্লাহর ধর্মের সঠিক পথ পেয়েছো , যা আমার বাবা ও আমার ভাইয়ের ধর্ম।” একথা শুনে ইয়াযীদ বললো ,“ হে আল্লাহর শত্রু [আউযুবিল্লাহ] , তুমি মিথ্যা বলছো।” সাইয়েদা যায়নাব বললেন ,“ সার্বভৌমত্ব এখন তোমার , আর তুমি জুলুমের মাধ্যমে গালি দিচ্ছো এবং তুমি যেকোন ব্যক্তিকে তিরস্কার করছো তোমার শাসন ক্ষমতার শক্তি দিয়ে।” ইয়াযীদ এ কথা শুনে লজ্জা পেলো এবং চুপ করে রইলো। তখন সিরিয় ব্যক্তিটি আবার অনুরোধ করলো তাকে মেয়েটি উপহার দেয়ার জন্য। ইয়াযীদ চিৎকার করে বললো ,“ বের হ , তোকে যেন আল্লাহ হত্যা করে।”
ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর খোতবা
দামেস্কে বন্দী থাকা অবস্থায় ইমাম আলী ইবনে হোসেইন (আ.) ইয়াযিদকে বলেছিলেন সে যেন জুমার দিনে খুতবার দেওয়ার অনুমতি দেয়।‘ বিহার আল আনওয়ার ’ গ্রন্থে উদ্ধৃত আছে এবং‘ মানাক্বিব ’ -এর লেখক এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন যে , ইয়াযীদ একটি মিম্বর তৈরী করতে বললো এবং এরপর একজন বক্তাকে ডেকে পাঠালো। সে তাকে আদেশ করলো ইমাম হোসেইন (আ.) ও ইমাম আলী (আ.)-কে তিরস্কার করার জন্য এবং তাদের কাজকর্ম সম্পর্কে জনতার সামনে বলার জন্য। বক্তা মিম্বরে উঠলো এবং আল্লাহর হামদ ও তাসবিহ করলো এবং ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.)-কে প্রচুর গালিগালাজ করলো। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মুয়াবিয়া ও ইয়াযীদের প্রশংসা করলো এবং তারা অনেক ভালো কাজ করেছে বলে উল্লেখ করলো। তখন ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) তাকে উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ হে তুমি , যে ওয়াজ করছো , দুর্ভোগ হোক তোমার , তুমি সৃষ্টিকর্তার ক্রোধ ডেকেছো সৃষ্টিকে খুশী করতে গিয়ে , আর তোমার স্থান হলো জাহান্নামে। এরপর তিনি ইয়াযীদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন , তুমি কি আমাকে অনুমতি দিচ্ছো কিছু বলার জন্য যা আল্লাহর জন্য সন্তুষ্টির এবং যারা উপস্থিত আছে তাদের জন্য হবে পুরস্কার ?” ইয়াযীদ তা প্রত্যাখ্যান করলো , কিন্তু জনতা বললো ,“ তাকে অনুমতি দিন মিম্বরে ওঠার জন্য , হয়তোবা আমরা তার কাছ থেকে [মূল্যবান] কিছু শুনতে পাবো।” ইয়াযীদ বললো ,“ যদি আমি তাকে অনুমতি দিই মিম্বরে ওঠার জন্য সে তা থেকে নামবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আমাকে ও আবু সুফিয়ানের বংশকে অপমানিত করবে।” তারা বললো , কিভাবে এ অসুস্থ যুবক তা করবে ? ইয়াযীদ বললো ,“ সে এমন এক পরিবার থেকে এসেছে যারা শিশুকালেই দুধের সাথে প্রজ্ঞা পান করেছে।” তারা তাকে চাপ দিতে থাকলো যতক্ষণ না সে তাতে রাজী হলো। ইমাম (আ.) মিম্বরে উঠলেন , তিনি আল্লাহর হামদ ও তাসবিহ করলেন এবং একটি খোতবা দিলেন যা চোখগুলোকে কাঁদালো এবং হৃদয়গুলোকে কাঁপিয়ে দিলো। এরপর তিনি বললেন ,
“ হে জনতা , আমাদেরকে ছয়টি গুণাবলী ও সাতটি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে [আল্লাহর পক্ষ থেকে] ― জ্ঞান , সহনশীলতা , উদারতা , বাগ্মিতা , সাহস ও বিশ্বাসীদের অন্তরে আমাদের জন্য ভালোবাসা ― যা আমাদের মাঝে উপস্থিত। আর আমাদের মর্যাদাগুলো হলো যে , যে রাসূল দায়িত্বে আছেন তিনি আমাদের মাঝ থেকে ; সত্যবাদী [ইমাম আলী] আমাদের মাঝ থেকে ; যিনি ওড়েন [জাফর আত তাইয়ার] তিনি আমাদের মাঝ থেকে , আল্লাহর সিংহ এবং তাঁর রাসূলেরও ― আমাদের মাঝ থেকে ; আর উম্মতের দুই সিবত আমাদের মাঝ থেকে। যারা আমাকে জানে তারাতো আমাকে জানেই ; যারা আমাকে চেনে না , আমি তাদের জন্য আমার বংশধারা ও পুর্বপুরুষদের পরিচয় প্রকাশ করছি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা আমাকে চিনতে পারে। হে জনতা , আমি মক্কা ও মিনার সন্তান , আমি যমযম ও সাফা-এর সন্তান। আমি তার সন্তান যিনি কালো পাথরকে [হাজর আল আসওয়াদ] তুলেছিলেন তার কম্বলের প্রান্ত ধরে। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যিনি সুন্দর করে পাজামা ও আলখাল্লা পড়তেন। আমি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যিনি কাবা তাওয়াফ করেছেন , সাঈ করেছেন। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যিনি হজ্ব করেছেন এবং তালবিয়া উচ্চারণ করেছেন। আমি তার সন্তান যাকে রাতের বেলা মাসজিদুল আকসাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল [মেরাজের সময়] , আমি তার সন্তান যাকে সিদরাতুল মুনতাহাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল , আমি তার সন্তান যে-
) ث ُمَّ دَنَا فَتَدَلَّىٰ(
“ এরপর নিকটবর্তী হলো এবং আরো নিকটবর্তী।” [সূরা নাজম: 8]
আমি তার সন্তান যে ছিলো-
) ك َانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَىٰ(
“ দুই ধনুক পরিমাণ [পরস্পর মুখোমুখি] অথবা তার চাইতেও কাছে।” [সূরা নাজম: 9]
আমি তার সন্তান যাকে সর্বশক্তিমান ওহী দান করেছিলেন , যা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। আমি হোসেইন (আ.)-এর সন্তান ― যাকে কারবালায় হত্যা করা হয়েছে ; আমি আলীর সন্তান ― যিনি মুর্তাযা [অনুমোদনপ্রাপ্ত] ; আমি মুহাম্মাদের সন্তান ― যাকে বাছাই করা হয়েছিল ; আমি ফাতেমাতুয যাহরা (আ.)-এর সন্তান , আমি সিদরাতুল মুনতাহার সন্তান , আমি শাজারাতুল মুবারাকাহ [বরকতময় গাছ]-এর সন্তান , আমি তার সন্তান যার শোকে রাতের অন্ধকারে জিনরা বিলাপ করেছিল , আমি তার সন্তান যার জন্য পাখিরা শোক পালন করেছিল।”
‘ কামিলে বাহাঈ ’ গ্রন্থে উদ্ধৃত হয়েছে যে , ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) ইয়াযীদকে বলেছিলেন যে সে যেন তাকে জুম ’ আর দিন খোতবা দিতে দেয়। এতে সে রাজী হয়েছিল। জুম’ আর দিন ইয়াযীদ এক অভিশপ্তকে আদেশ করলো মিম্বরে উঠতে এবং ইমাম আলী (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.)-কে যত পারে তত গালি দিতে এবং খলিফা উমর ও খলিফা আবু বকরের প্রশংসা করতে। অভিশপ্ত ব্যক্তিটি মিম্বরে উঠলো এবং তার যা ইচ্ছা বললো। তখন ইমাম (আ.) বললেন ,“ আমাকে অনুমতি দাও খোতবা দেওয়ার জন্য।” ইয়াযীদ তার প্রতিশ্রতি রক্ষা করতে অস্বীকার করলো এবং তাকে অনুমতি দিলো না। জনতা চাপ প্রয়োগ করলো , কিন্তু সে অনুমতি দিলো না , যতক্ষণ পর্যন্ত না তার নাবালক সন্তান মুয়াবিয়া বললো , হে বাবা , তার খোতবা কোন দিকে নিয়ে যেতে পারে ? তাকে খোতবা দেওয়ার জন্য অনুমতি দিন। ইয়াযীদ বললো ,“ তুমি তাদের কাজ সম্পর্কে জানো না , তারা প্রজ্ঞা ও বাগ্মীতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। আর আমি আশঙ্কা করি তার খোতবা হয়তো বিদ্রোহের সৃষ্টি করতে পারে এবং আমাদের মাথার ওপরে ঘুরতে পারে।” এরপর সে তাকে অনুমতি দিলো। ইমাম (আ.) মিম্বরে উঠলেন এবং বললেন ,“ প্রশংসা আল্লাহর যার কোন শুরু নেই এবং যিনি চিরস্থায়ী যার কোন শেষ নেই , তিনি সবার প্রথমে যাঁর কোন শুরু নেই এবং তিনি সবার শেষে যার শেষের কোন শেষ নেই , সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে শুধু তাঁর সত্তা ছাড়া , তিনি দিন ও রাতের পরিমাপ নির্ধারণ করেন , পরিণতি প্রস্তুত করেন এবং বরকতময় হলেন আল্লাহ , তিনিই একমাত্র বাদশাহ , সর্বজ্ঞানী।”
এরপর বললেন ,“ আল্লাহ আমাদেরকে দান করেছেন জ্ঞান , সহনশীলতা , উদারতা , বাগ্মীতা , সাহস এবং বিশ্বাসীদের অন্তরে ভালোবাসা। আর আমাদের মর্যাদা হলো , যে রাসূল দায়িত্বে আছেন তিনি আমাদের মাঝ থেকে , এ ছাড়াও শহীদদের সর্দার [হামযা] এবং জাফর , যিনি বেহেশতে ওড়েন এবং এ উম্মতের দুই সিব্ত [ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেইন-আ.] আমাদের মাঝ থেকে এবং মাহদী (আ.)-ও যিনি‘ দাজ্জাল ’ -কে হত্যা করবেন। হে জনতা , যারা আমাকে চিনে তারাতো চিনেই , আর যারা আমাকে চিনো না , তাদের জন্য আমার বংশবৃক্ষ ও পূর্বপুরুষের পরিচয় দিচ্ছি যতক্ষণ না তারা আমাকে চিনতে পারে। হে জনতা , আমি মক্কা ও মিনার সন্তান , আমি যমযম ও সাফা-এর সন্তান , আমি তার সন্তান যিনি তার কম্বলের পাশ ধরে হাজর আল-আসওয়াদ [কালো পাথর] তুলেছিলেন। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান যার কারণে পাজামা ও আলখাল্লা সৌন্দর্য পেয়েছিল। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সন্তান যারা [কা ’ বা] তাওয়াফ করেছিল এবং সাঈ করেছিল। আমি সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের সন্তান যারা হজ্ব সম্পাদন করেছিল এবং তালবিয়াহ উচ্চারণ করেছিল। আমি তার সন্তান যাকে রাতে মসজিদুল আক্বসাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল [মেরাজে]। আমি তার সন্তান যাকে সিদরাতুল মুনতাহাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আমি তার সন্তান যে নিকটবর্তী হলো এবং স্থির হয়ে রইলো [সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির মাঝে মেরাজের রাতে] , আমি তার সন্তান , যে ছিলো নিকটে ― দুই ধনুক পরিমাণ দূরত্বে অথবা তারও কাছে [সামনা সামনি]। আমি তার সন্তান যাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ ওহী পাঠিয়েছিলেন , যা তিনি প্রকাশ করেছিলেন। আমি সন্তান হোসেইন (আ.)-এর ― যাকে কারবালায় হত্যা করা হয়েছে , আমি সন্তান আলীর ― যাকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে [মুরতাযা] , আমি সন্তান মুহাম্মাদ (সা.)-এর ― যিনি ছিলেন নির্বাচিত , আমি সন্তান ফাতেমা যাহরা [জোতির্ময়] (আ.)-এর , আমি সন্তান সিদরাতুল্ মুন্তাহার , আমি সন্তান শাজারাতুল মুবারাকাহর [পবিত্র বৃক্ষের] , আমি সন্তান তার যাকে রক্তে ও বালিতে মাখা হয়েছে , আমি সন্তান তার যার জন্যে জিনরা বিলাপ করেছে রাতের অন্ধকারে , আমি সন্তান তার যার জন্যে পাখিরা শোক পালন করেছে।” যখন খোতবা এ পর্যায়ে পৌঁছলো জনতা কাঁদতে ও বিলাপ করতে শুরু করলো এবং ইয়াযীদ আশঙ্কা করলো এতে বিদ্রোহ শুরু হয়ে যেতে পারে। সে মুয়া যযিনকে ডেকে বললো , নামাযের ঘোষণা দাও। মুয়া যযিন উঠলো এবং বললো , আল্লাহু আকবার , আল্লাহু আকবার। ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ শ্রেষ্ঠতর এবং সর্বোচ্চ , সবচেয়ে সম্মানিত এবং সবচেয়ে দয়ালু তার চাইতে যা আমি ভয় করি এবং যা আমি এড়িয়ে যাই। এরপর সে বললো , আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। ইমাম বললেন , নিশ্চয়ই আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি অন্যদের সাথে যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং তিনি ছাড়া কোন মালিক নেই , আর আমি প্রত্যেক অস্বীকারকারীকে প্রত্যাখ্যান করি। যখন সে বললো , আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল , ইমাম নিজের মাথা থেকে পাগড়ী নামিয়ে নিলেন এবং মুয়া যযিনের দিকে ফিরে বললেন , আমি এ মুহাম্মাদের (সা.) নামে অনুরোধ করছি , এক মুহূর্ত নীরব থাকার জন্য।” এরপর তিনি ইয়াযীদের দিকে ফিরে বললেন ,“ হে ইয়াযীদ , এ সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ রাসূল কি আমার প্রপিতামহ , নাকি তোমার ? যদি তুমি বলো যে তোমার প্রপিতামহ , তাহলে গোটা পৃথিবী জানে তুমি মিথ্যা বলছো। আর যদি তুমি বল যে তিনি আমার প্রপিতামহ , তাহলে কেন তুমি আমার পিতাকে জুলুমের মাধ্যমে হত্যা করেছো এবং তার মালপত্র লুট করেছো এবং তার নারী-স্বজনদের বন্দী করেছো ? এ কথা বলে ইমাম (আ.) নিজের জামার কলার ছিঁড়ে ফেললেন ও কাঁদলেন। এরপর বললেন , আল্লাহর শপথ , এ পৃথিবীর ওপরে আমি ছাড়া কেউ নেই যার প্রপিতামহ হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.) , কেন এ লোকগুলো আমার পিতাকে জুলুমের মাধ্যমে হত্যা করেছে এবং আমাদেরকে রোমানদের মতো বন্দী করেছে ? এরপর বললেন , হে ইয়াযীদ , তুমি এটি করে আবার বলছো যে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল এবং তুমি ক্বিবলার দিকে মুখ ফিরাও , অভিশাপ তোমার ওপর ঐদিন যেদিন আমার প্রপিতামহ এবং পিতা তোমার ওপর ক্রোধান্বিত হবেন।” এ কথা শুনে ইয়াযীদ মুয়া যযিনকে নামাযের ইক্বামাহ দিতে বললো। লোকজনের ভেতর গুঞ্জন উঠলো এবং তাদের ভেতর একটি তোলপাড় শুরু হলো। এরপর একটি দল তার সাথে নামাজ পড়লো এবং অন্যরা পড়লো না এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে চলে গেলো।
বন্দী অবস্থায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কন্যা সাইয়েদা সাকিনাহ (আ.)-এর স্বপ্ন
সাইয়েদা সাকিনাহ (আ.) বর্ণনা করেছেন যে , সিরিয়াতে এক বৃহস্পতিবার স্বপ্ন দেখলাম , এরপর তিনি একটি দীর্ঘ স্বপ্ন বর্ণনা করলেন।
শেইখ ইবনে নিমা বর্ণনা করেছেন যে , সাইয়েদা সাকিনাহ (আ.) দামেস্কে স্বপ্নে দেখেছেন যে , পাঁচটি আলোকিত ঘোড়া সামনে এগিয়ে এলো এবং প্রত্যেকটির ওপর একজন সম্মানিত ব্যক্তি বসে আছেন এবং ফেরেশতারা তাদেরকে সব দিক থেকে ঘেরাও করে আছে এবং বেহেশতের একজন নারী কর্মীও তাদের সাথে আছে। যারা ঘোড়ায় বসে আছেন তারা আরো এগিয়ে গেলেন , আর নারী কর্মীটি আমার দিকে এলেন এবং বললেন ,“ নিশ্চয়ই তোমার প্রপিতামহ তোমাকে সালাম পাঠিয়েছেন।” আমি উত্তর দিলাম ,“ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরও সালাম , আপনি কে ?” তিনি বললেন , বেহেশতের নারী কর্মীদের একজন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ তারা কারা যারা সম্মানিত ঘোড়াগুলোর পিঠে বসে এখানে এসেছেন ?” তিনি জবাব দিলেন ,“ তারা হলেন আদম সিফওয়াতুল্লাহ [বাছাইকৃত] (আ.) , দ্বিতীয় জন হলেন ইবরাহীম খলিলুল্লাহ [আল্লাহর বন্ধু] (আ.) , তৃতীয় জন হলেন মূসা কালিমুল্লাহ [যিনি আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন] (আ.) এবং চতুর্থ জন ঈসা রুহুল্লাহ [যার রুহ আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত] ।” আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ ইনি কে যিনি নিজের দাড়ি ধরে আছেন এবং পড়ে যাচ্ছেন [শোকে] এবং আবার উঠছেন ?” তিনি বললেন ,“ তিনি তোমার দাদা , রাসূলুল্লাহ (সা.) ।” আমি বললাম ,“ তারা কোথায় যাচ্ছেন ?” তিনি উত্তর দিলেন ,“ তারা তোমার পিতা হোসেইনের (আ.) দিকে যাচ্ছেন।” আমি তার দিকে দৌড়ে গেলাম , এটি জানানোর জন্য যে অত্যাচারীরা আমাদের সাথে কী ব্যবহার করেছে তার মৃত্যুর পর। ঐ মুহূর্তে পাঁচটি উটের হাওদা এলো এবং এদের প্রত্যেকটিতে একজন নারী বসেছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ এ নারীরা কারা যারা এই মাত্র এলেন ?” তারা বললো ,“ প্রথম জন হাওয়া ― যিনি মানবজাতির মা , দ্বিতীয় জন আসিয়াহ ― যিনি মাযাহিম-এর কন্যা [ফেরাউনের স্ত্রী] , তৃতীয় জন মারইয়াম ― যিনি ইমরানের কন্যা [ঈসা (আ.)-এর মা] , চতুর্থ জন খাদিজা (আ.) ― যিনি খুয়াইলিদের কন্যা [রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী ও মা ফাতেমা (আ.)-এর মা] এবং পঞ্চম জন যার হাত তার মাথায় রাখা এবং যিনি পড়ে যাচ্ছেন এবং আবার উঠছেন তিনি আপনার দাদী ফাতেমা (আ.)― যিনি রাসূলুল্লাহ (আ.) -এর কন্যা , আপনার পিতার মা।” আমি বললাম ,“ আল্লাহর শপথ , আমার উচিত তার কাছে বর্ণনা করা তারা আমাদের সাথে কী ব্যবহার করেছে। এ কথা বলে আমি তার সামনে বসলাম এবং বললাম , হে প্রিয় মা , তারা আমাদের অধিকার দেয় নি ; হে প্রিয় মা , তারা আমাদের দলকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ; হে প্রিয় মা , তারা আমাদের মর্যাদা লঙ্ঘন করেছে ; হে প্রিয় মা , আল্লাহর শপথ , তারা আমার পিতা হোসেইন (আ.)-কে হত্যা করেছে। তিনি (আ.) জবাব দিলেন , হে সাকিনাহ , চুপ করো , তুমি আমার কলিজা পুড়ে ফেলেছো এবং আমার হৃদপিণ্ডের সংযোগ কেটে ফেলেছো। এ হলো তোমার বাবা হোসেইন (আ.)-এর জামা যা আমি সংরক্ষণ করছি যতক্ষণ না আমি এটি নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করি।” এরপর আমি ঘুম থেকে উঠে গেলাম এবং তা গোপন রাখতে চাইলাম , কিন্তু তা আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কাছে বলে ফেললাম। আর তা জনগণের মাঝে প্রচার হয়ে গেলো।
ইয়াযীদের স্ত্রীর স্বপ্ন এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য তার কান্না
বিহার আল আনওয়ার ’ গ্রন্থে ইয়াযীদের স্ত্রী হিনদ থেকে বর্ণিত আছে যে , আমি বিছানায় শুয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম যে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে গেলো এবং ফেরেশতারা একজনের পর একজন অবতরণ করলো ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথার কাছে এবং তাকে অভিবাদন জানালো। সে মুহূর্তে একটি মেঘ হাজির হলো যার ওপরে কিছু মানুষ বসে ছিলেন এবং এদের মাঝে একজনের চেহারা ছিলো আলোকিত। তিনি ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং তার দাঁতগুলোতে চুমু দিয়ে বললেন ,“ হে আমার সন্তান , তারা তোমাকে হত্যা করেছে , আর তুমি কি মনে করো তারা তা করেছে তোমাকে না চিনেই ? এছাড়া তারা পানির কাছে যাওয়ার পথকে তোমার জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। হে প্রিয় সন্তান , আমি তোমার নানা , রাসূলুল্লাহ (সা.) , এ হলো তোমার পিতা আলী আল মুরতাযা (আ.) । এ হলো তোমার ভাই হাসান (আ.) , এরা হলো তোমার দু চাচা জাফর (আ.) ও আক্বীল (আ.) , আর ওরা হলো হামযা ও আব্বাস [নবীর চাচা] । একথা বলে তিনি তার পরিবারের প্রত্যেকের নাম বললেন।”
হিনদ বলেছে যে , আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম ভয় নিয়ে এবং দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথার চারপাশে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। এরপর আমি উঠে পড়লাম ইয়াযীদকে খুঁজতে এবং তাকে একটি অন্ধকার ঘরে দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে থাকতে দেখলাম এবং বলতে শুনলাম , আমার হোসেইনের সাথে কী দরকার ছিলো ? এবং মনে হলো পৃথিবীর সব দুঃখ তাকে ঘিরে ধরেছে। আমি তাকে স্বপ্নটি বর্ণনা করলাম , আর সে তার মাথা নিচু করলো। যখন সকাল হলো , সে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর পরিবারকে ডেকে পাঠালো এবং বললো , তোমরা কি আমার সাথে থেকে যেতে চাও , নাকি মদীনায় ফেরত যেতে চাও এবং অনেক পুরস্কার নিতে চাও ? তারা বললেন , প্রথমে আমরা চাই ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ওপর শোক পালন করতে ও কাঁদতে। সে উত্তর দিলো , তোমরা চাইলে তা করতে পারো। তখন কিছু বাড়িঘর তাদের জন্য খালি করা হলো এবং বনি হাশিম ও কুরাইশ-এর নারীরা কালো পোশাক পরলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য সাতদিন শোক পালন করলেন।
শেইখ ইবনে নিমা বলেন যে , যতদিন নবী পরিবারের নারীরা দামেস্কে রইলেন ততদিন তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য শোক পালন করলেন দুঃখ ও বিলাপের মাধ্যমে। বন্দীদের দুঃখ ছিলো অপরিসীম এবং তাদের পুরুষদের এত শীঘ্র মৃত্যুতে তাদের শোকও ছিলো অনেক। তাদেরকে এমন একটি বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল যেখানে তাপ ও ঠাণ্ডায় নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব ছিলো না , যতক্ষণ না তাদের পর্দার আড়ালে বেড়ে ওঠা নরম দেহের চামড়া ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসছিল। সহ্য করার ক্ষমতা তাদের কাছ থেকে চলে গিয়েছিল এবং তীব্র বেদনা তাদেরকে পরাস্ত করেছিল এবং দুঃখ ছিলো তাদের সাথী।
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শিশু কন্যার স্বপ্ন
ইয়াজিদের জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর এক শিশু কন্যা একটি স্বপ্ন দেখে।‘ কামিলে বাহাই ’ গ্রন্থে‘ কিতাব আল হাউইয়াহ ’ থেকে উদ্ধৃত হয়েছে যে , নবী পরিবার শিশুদের কাছে তাদের পিতাদের শাহাদাতের সংবাদ গোপন রেখেছিলেন। তারা তাদেরকে বলেছিলেন তাদের পিতারা সফরে গিয়েছেন , ঐ সময় পর্যন্ত যখন ইয়াযীদ তাদেরকে তার বাড়িতে ডেকে পাঠালো। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর চার বছরের এক শিশু কন্যা একদিন ঘুম থেকে উঠে বললেন , আমার বাবা কোথায় ছিলেন ? আমি এখন তাকে স্বপ্নে দেখলাম যে তিনি অস্থির এবং বিপর্যস্ত। এ কথা শুনে নারীরা এবং শিশুরাও কাঁদতে শুরু করলেন এবং তাদের শোকের কণ্ঠ উঁচু হলো। ইয়াযীদ তার ঘুম থেকে উঠলো এবং জিজ্ঞেস করলো , কী হয়েছে ? তারা বিষয়টি জানলো এবং তাকে জানালো , আর এ অভিশপ্ত আদেশ দিলো তার বাবার [ইমাম হোসেইন আ.-এর] মাথাটি ঐ কন্যার কাছে পাঠিয়ে দিতে। মাথাটি আনা হলো এবং তার কোলে রাখা হলো। শিশু কন্যাটি জিজ্ঞেস করলো , এটি কী ? তারা উত্তর দিলো এটি তোমার বাবার মাথা। এ কথা শুনে বাচ্চাটি অস্থির হয়ে উঠলো এবং চিৎকার করতে শুরু করলো , সে অসুস্থ হয়ে পড়লো এবং দামেস্কে মৃত্যুবরণ করলো।
দামেস্কের প্রধান দরজা ও বড় মসজিদে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঝুলন্ত মাথা
‘কামিলে বাহাই ’গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে ,ইয়াযীদ আদেশ দিয়েছিল যেন ইমাম হোসেইনের (আ .)মাথা এবং তার পরিবারের অন্যান্যদের এবং তার সাথীদের মাথাগুলো শহরের প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
একই গ্রন্থে এও বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথাটি দামেস্কের সবচেয়ে বড় মসজিদের মিনারে চল্লিশ দিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল , আর অন্যান্য মাথাগুলো অন্যান্য মসজিদ ও শহরগুলোর দরজায় ঝোলানো হয়েছিল এবং ইয়াযীদের বাড়ির দরজায় ঝোলানো হয়েছিল একদিনের জন্য।
শেইখ রাওয়ানদি বর্ণনা করেছেন মিনহাল বিন আমর থেকে যে , আল্লাহর শপথ , আমি এক ব্যক্তিকে দেখেছি এর দিকে ফিরে সূরা কাহফ তেলাওয়াত করতে। যখন সে এ আয়াতে পৌঁছলো:
) أ َمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا(
“ অথবা তুমি কি মনে করো গুহার বাসিন্দারা এবং লেখা কাগজ আমাদের একটি বিস্ময়কর নির্দশন ?” [সূরা কাহাফ: 9]
মাথাটি সুস্পষ্ট ও সুন্দর কণ্ঠে বললো , আমার শাহাদাত এবং উদাহরণ গুহার বাসিন্দাদের চাইতেও বিস্ময়কর।
ইয়াজিদের দরবারে ইহুদী রাব্বি-এর বক্তব্য
আল্লামা মাজলিসি তার‘ বিহার আল-আনওয়ার ’ গ্রন্থে সিরিয়ার মিম্বর থেকে ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা উল্লেখ করার পর বলেন যে , সে সময় এক ইহুদী রাব্বি ইয়াযীদের সামনে বসে ছিলো। সে বললো , হে ইয়াযীদ , এ যুবকটি কে ? ইয়াযীদ বললো , সে হোসেইনের সন্তান আলী। রাব্বি জিজ্ঞেস করলো , কোন হোসেইন ? ইয়াযীদ বললো , আলী ইবনে আবি তালিবের সন্তান। রাব্বি জিজ্ঞেস করলো , কে তার মা ? ইয়াযীদ বললো , ফাতেমা ― মুহাম্মাদের কন্যা। এ কথা শুনে ঐ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বললো , সুবহানাল্লাহ , সে তোমার রাসূলের নাতি , আর তুমি তাকে এত শীঘ্র হত্যা করলে ? কত খারাপ আচরণই না করেছো তার সন্তানের সাথে তার মৃত্যুর পর। আল্লাহর শপথ , যদি মূসা বিন ইমরানের ঔরস থেকে কোন নাতি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকতো , আমরা বিশ্বাস করি আমরা আমাদের রবের সমান তার ইবাদাত করতাম। তোমাদের নবী তোমাদের মাঝ থেকে গতকাল চলে গেছেন , আর আজ তোমরা তার সন্তানের ওপর আঘাত করেছো এবং তাকে হত্যা করেছো। কত খারাপ জাতিই না তোমরা। এ কথা শুনে ইয়াযীদ আদেশ দিলো তার কণ্ঠনালীকে তিনবার চেপে ধরতে। রাব্বি উঠে দাঁড়িয়ে বললো , তুমি যদি চাও আমাকে হত্যা করতে তাহলে করো , যদি চাও মুক্ত করে দাও এবং যদি চাও আমাকে আঘাত করো। আমি তওরাতে পড়েছি , যে নবীর সন্তানকে হত্যা করে সে যতদিন জীবিত থাকবে ততদিন অভিশপ্ত থাকবে এবং যখন মরবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।”
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইবনে লাহীআহ বর্ণনা করেছে আবুল আসওয়াদ মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান থেকে যে সে বলেছে যে , রা’ স আল জালুত আমার কাছে এলো এবং বললো , দাউদ (আ.) ও আমার মাঝে সত্তর জন পিতামহের দূরত্ব আছে , আর এ কারণে ইহুদীরা আমাকে সম্মান করে , অথচ তোমরা তোমাদের নবীর সন্তানকে হত্যা করলে যখন তাদের মাঝে যুক্তকারী পিতা [বা মাতা] শুধুমাত্র একজন ?
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর হত্যাকারীকে ইয়াজিদের পুরস্কার প্রদান
সিবতে ইবনে জাওযির‘ তাযকিরাহ ’ গ্রন্থে আছে যে , ইয়াযীদ [উবায়দুল্লাহ]‘ ইবনে যিয়াদকে’ ডেকে পাঠালো এবং তাকে বেশ কিছু পুরস্কার এবং অসংখ্য উপহার দিলো। এরপর সে তাকে নিজের কাছে বসালো এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করলো এবং তাকে নিজের স্ত্রীদের সাথে চলাফেরা করতে দিলো। সে তাকে নিজের সৌভাগ্য সাথী বানিয়েছিলো এবং এক রাতে সে মাতাল হলো এবং গায়ককে আদেশ দিলো একটি গান গাওয়ার জন্য এবং নিজ থেকেই হঠাৎ বললো , আমাকে এক গ্লাস মদ দাও যা আমার মনোবল বৃদ্ধি করবে এবং একই জিনিস দাও ইবনে যিয়াদকে , যে আমার গোপন কথার অংশীদার ও বিশ্বস্ত এবং সে আমার জন্য যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আনে এবং আমার জন্য যুদ্ধ করে , সে বিদ্রোহী হোসেইনের [আউযুবিল্লাহ] হত্যাকারী এবং আমার শত্রুদেরও এবং ঈর্ষাপরায়ণদেরও।
দামেস্কে নবী পরিবারের বন্দীদের মুক্তি প্রদান
এক পর্যায়ে ইয়াজিদ জনরোষের কথা বিবেচনায় এনে নবী পরিবারের অসহায় ও শোকার্ত বন্দীদের শেষ পর্যন্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। একদিন ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং দামেস্কের বাজারে হেঁটে বেড়াতে লাগলেন। মিনহাল বিন আমর তার দিকে এগিয়ে এলো এবং জিজ্ঞেস করলো , রাতটি আপনি কিভাবে কাটিয়েছেন হে রাসূলুল্লাহর (সা.) সন্তান ? ইমাম জবাব দিলেন , আমাদের রাত ছিলো বনি ইসরাইলের মতো। যারা ফেরাউনের জনগণের মধ্যে ছিলো , যাদের পুত্র-সন্তানদের মাথা কেটে ফেলা হয়েছিল এবং নারীদের বন্দী করা হয়েছিল। হে মিনহাল , অন্যদের মধ্যে আরবদের বিশেষ মর্যাদা ছিলো এ কারণে যে মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন একজন আরব এবং আমরা , মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবার , নিহত হয়েছি এবং এ রাতে ছত্রভঙ্গ হয়েছি , আমাদেরকে ঘৃণা করা হয়েছে , হত্যা করা হয়েছে এবং বিতাড়িত হয়েছি। তাই এ রাতের ওপর হে মিনহাল , ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নবী পরিবারের নির্যাতিত ও শোকার্ত সদস্যদের সিরিয়া থেকে কারবালা হয়ে মদীনায় গমন
‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে , বর্ণনাকারী বলেছে যে , যখন ইমাম হোসেইন ( আ .) - এর পরিবার সিরিয়া ত্যাগ করলেন এবং ইরাকে পৌঁছলেন , তারা তাদের পথপ্রদর্শককে বললেন , আমাদেরকে কারবালার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাও। এরপর যখন তারা শাহাদাতের স্থানটিতে পৌঁছলেন , তারা দেখলেন জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারি ( আ .) ও সাথে বনি হাশিমের একটি দল এবং রাসূলুল্লাহ ( সা .)- এর আত্মীয়রা ইমাম হোসেইন ( আ .)- এর কবর যিয়ারাতে এসেছেন। তারা পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ করলেন প্রচণ্ড দুঃখ নিয়ে এবং বিলাপ করে এবং নিজেদের চেহারায় আঘাত করতে করতে। এরপর এক হৃদয় বিদারক শোকানুষ্ঠান শুরু হলো এবং আশেপাশের শহরগুলো থেকে নারীরাও তাদের সাথে যোগ দিলেন এবং তারা সবাই সেখানে কয়েক দিনের জন্য শোক পালন করলেন। শেইখ ইবনে নিমাও তার শাহাদাতের বইতে একই রকম বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , বর্ণনাকারী বলেছে যে , এরপর তারা কারবালা থেকে মদীনার দিকে রওয়ানা হলেন। বাশীর বিন জাযলাম বলে যে , যখন আমরা মদীনার কাছে পৌঁছলাম ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) সেখানে নেমে পড়লেন এবং তাঁবু গাড়লেন এবং নারীদেরও বললেন নেমে আসতে। এরপর বললেন , হে বাশীর , আল্লাহ যেন তোমার পিতার ওপর রহম করেন , তিনি ছিলেন একজন কবি। তাহলে তুমিও কি শোকগাঁথা আবৃত্তি করো ? আমি বললাম , জ্বী , হে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তান , আমিও একজন কবি। ইমাম (আ.) বললেন , তাহলে মদীনায় যাও এবং আবু আব্দুল্লাহ (আ.)-এর শাহাদাতের খবর ঘোষণা করো। আমি ঘোড়ায় চড়লাম এবং দ্রুত ঘোড়া ছোটালাম যতক্ষণ না মদীনায় পৌঁছলাম। যখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদে পৌঁছলাম , আমি কাঁদতে শুরু করলাম এবং উচ্চকণ্ঠে বললাম , হে ইয়াসরিবের জনগণ , এখানে তোমাদের থাকার কোন জায়গা নেই , হোসেইনকে হত্যা করা হয়েছে , তার কারণে আমার অশ্রু বইছে , তার দেহ পড়ে আছে কারবালায় ধুলো ও রক্তে মাখামাখি হয়ে এবং তার মাথা বর্শার আগায় রেখে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় রাস্তায় রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়েছে।
এরপর বললাম , এ হলো আলী বিন হোসেইন (আ.) , যিনি তোমাদের শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছেছেন। তার সাথে আছে তার ফুফুরা এবং বোনেরা। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন যেন আমি তার অবতরণের স্থানটির ঘোষণা দেই , এ কথা শুনে বোরখায় ঢাকা সব নারীরা দৌড়ে বেরিয়ে এলো কাঁদতে কাঁদতে। আর আমি জীবনে কখনো এরকম কান্না দেখি নি , না আমি এমন কিছু জানি যা ছিলো মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে কষ্টকর। আমি একটি বালিকাকে কাঁদতে শুনলাম একথা বলে , তুমি আমার অভিভাবকের শাহাদাতের সংবাদ এনেছো এবং আমাকে শোকাহত করেছো এবং আমার অবস্থা খারাপ করে দিয়েছো , আর এ সংবাদ আমার হৃদয়কে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে , তাই হে আমার চোখ দুটো , প্রচুর অশ্রু ঝরাও অনবরত তার ওপরে যার দুঃখের কারণে আল্লাহর আসমান ভেঙ্গে পড়েছে , তার শাহাদাত উচ্চ মর্যাদাকে , ধর্ম ও উষ্ণ আবেগকে ফুটো করে দিয়েছে , তাই রাসূলুল্লাহ (সা.) ও আলীর সন্তানের জন্য কাঁদো , যদিও তার কবর অনেক অনেক দূরে।
এরপর বালিকাটি আমার দিকে ফিরে বললো , হে মৃত্যুর সংবাদবাহক , আবু আবদুল্লাহর জন্য তুমি আমাদের দুঃখকে নতুন করে আরম্ভ করেছো এবং তুমি আমাদের ভেতরের ক্ষতকে ঘষে দিয়েছো যা তখনও শুকায় নি। তোমার রব তোমার ওপর রহমত করুন , তুমি কে ? আমি বললাম , আমি বাশীর বিন জাযলাম এবং আমার অভিভাবক ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) আমাকে পাঠিয়েছেন , আর তিনি নিজে এবং সাথে আবু আব্দুল্লাহ আল হোসেইন (আ.)-এর পরিবার অমুক জায়গায় তাঁবু ফেলেছেন। তখন লোকজন আমাকে ছেড়ে ঐ জায়গার দিকে দৌড়াতে শুরু করলো। এরপর আমি আমার ঘোড়ায় চড়লাম এবং ফেরত এলাম এবং দেখলাম জনগণ সব বড় রাস্তা ও গলি দখল করে ফেলেছে। আমি আমার ঘোড়া থেকে নামলাম এবং মানুষের ঘাড়ের ওপর দিয়ে পা ফেলে ফেলে তাঁবু পর্যন্ত পৌঁছলাম। ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) ভেতরে ছিলেন এবং তিনি বাইওে বেরিয়ে এলেন একটি রুমাল দিয়ে অশ্রু মুছতে মুছতে। একজন খাদেম তার পেছন পেছন এলো একটি চেয়ার নিয়ে এবং তা মাটিকে রাখলো এবং ইমাম (আ.) এতে বসলেন। তার অশ্রু অনবরত ঝরছিলো এবং পুরুষদের কান্নার কণ্ঠ উঁচু হলো এবং নারীরা বিলাপ করতে লাগলো। এরপর জনগণ চতুর্দিক থেকে তাকে সমবেদনা জানাতে লাগলো এবং ঐ জায়গায় এক ভয়ানক শোরগোল শুরু হলো।
মদীনার উপকণ্ঠে ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা
ইমাম (আ.) উপস্থিত জনতাকে ইশারা করলেন চুপ করার জন্য এবং কান্নার আওয়াজ বন্ধ হলো। তিনি (আ.) বললেন , আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন , বিচার দিনের বাদশাহ , সব সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা। সেই রবের শপথ যিনি অনুভবের আয়ত্তে আসার বাইরে এবং তিনি এত কাছে যে তিনি [তার বান্দাহদের] গোপন কথাগুলো শোনেন। আমি তার প্রশংসা করি এ মারাত্মক ঘটনা এবং যুগের বিপর্যয়গুলোর বিষয়ে এবং দুঃখের কঠিন মাত্রা এবং গভীর দুঃখজনক ঘটনাগুলোর তিক্ত স্বাদের সময়ে এবং বিরাট দুঃখ ও মহাশোকে , হৃদয় বিদারক এবং বিপর্যস্তকারী দুঃখ-কষ্টের ভেতরে।
হে জনতা , নিশ্চয়ই আল্লাহ , যিনি প্রশংসার যোগ্য , আমাদেরকে পরীক্ষা করেছেন বিরাট দুঃখসমূহের মাধ্যমে যখন ইসলামের ভেতরে এক গভীর ফাটল প্রকাশিত হয়েছে। আবু আব্দুল্লাহ আল হোসেইন (আ.) এবং তার পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে , আর তার নারী-স্বজনদের এবং অপরিণত বয়সের সন্তানদের বন্দী অবস্থায় তাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। তার মাথাকে বর্শার আগায় রেখে শহরগুলোর রাস্তাগুলিতে প্রদর্শন করা হয়েছে , আর এ মহাবিপর্যয়ের কোন তুলনা নেই।
হে জনতা , তোমাদের মধ্যে কারা তার মৃত্যুর পর আনন্দিত হবে এবং তোমাদের মধ্যে কাদের হৃদয় তার জন্য ছারখার হবে না ? তোমাদের মধ্যে কার চোখ এর জন্য অশ্রু ফেলবে না এবং তোমাদের মধ্যে কে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে নিজের চেহারায় চাপড় না দিয়ে ? সাতটি উচ্চ আকাশ তার শাহাদাতে কেঁদেছে এবং নদীগুলো তাদের ঢেউসহ , আকাশগুলো তাদের স্তম্ভগুলোসহ , পৃথিবী তার চারধারসহ , এবং গাছগুলো তাদের শাখাগুলোসহ , সমুদ্র ও এর গভীরের মাছেরা , [আল্লাহর] নিকটবর্তী ফেরেশতারা এবং আকাশের বাসিন্দারাও তার জন্য কান্নায় তাদের কণ্ঠ মিলিয়েছে।
হে জনতা , কোন হৃদয় কি আছে যা তার শাহাদাতের কারণে ছিঁড়ে যাবে না ? এবং কোন বিবেক কি আছে যা এর কারণে পুড়ে যাবে না ? এবং কোন কান কি আছে যা বধির হয়ে যাবে না যখন তারা দেখে ইসলামের ভেতর এ ফাটল দেখা দিয়েছে ?
হে জনতা , আমাদেরকে তাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে এবং রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়েছে শহরগুলোর দূরবর্তী ও নিকটবর্তী জায়গাগুলোতে যেন আমরা ছিলাম তুর্কী অথবা কাবুলি লোকদের সন্তান , কোন অপরাধ করা ছাড়াই অথবা কোন খারাপ কাজ করা ছাড়াই , আর না আমরা তারা যারা ইসলামে ফাটল সৃষ্টি করেছি। কখনোই আমরা তা আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শুনি নি , এটি নুতন জিনিস ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহর শপথ , যদি রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের বিষয়ে সদুপদেশ না দিয়ে তাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দিতেন তাহলেও তারা আমাদের এর চেয়ে বেশী ক্ষতি করতো না , যা তারা ইতোমধ্যেই করেছে।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন , কী কঠিন বেদনাদায়ক , মারাত্মক , দুঃখপূর্ণ , হৃদয়বিদারক এবং তিক্ত দুর্যোগ ছিলো যা আমরা দেখেছি এবং সহ্য করেছি। আমরা আল্লাহর কাছে এর বিচারের ভার দিলাম , তিনি মহা ক্ষমতাবান , প্রতিশোধ গ্রহণকারী।
শাহাদাতের কিছু কিছু বইতে বর্ণিত হয়েছে যে , যখন সাইয়েদা উম্মে কুলসুম (আ.) মদীনায় পৌঁছলেন , তিনি কাঁদলেন এবং বললেন , হে আমাদের নানার শহর [মদীনা] , আমাদেরকে গ্রহণ করো না , আমরা ফিরেছি দুঃখ ও হতাশা সাথে নিয়ে ; সাবধান , যাও এবং রাসূলের কাছে বলো যে আমাদেরকে কঠিন কষ্ট দেওয়া হয়েছে আমাদের পিতার [প্রতি শত্রুতার] কারণে ; আমরা যখন তোমার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলাম , আমাদের সাথে সবাই ছিলো , কিন্তু এখন আমরা ফিরছি আমাদের পুরুষদের ও পুত্র-সন্তানদের ছাড়া ; আমরা যখন এখান থেকে গিয়েছিলাম তখন আমরা সবাই একত্রে ছিলাম ; এখন আমরা ফিরছি ক্ষতি নিয়ে ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র লুট হয়ে যাওয়া অবস্থায় ; আমরা আল্লাহর নিরাপত্তায় ছিলাম এবং এখন আমরা ফিরছি আমাদের স্বজনদের বিচ্ছেদ নিয়ে এবং ভয় নিয়ে ; আমাদের মাওলা হোসেইন ছিলেন আমাদের নিরাপত্তা দানকারী ও সাহায্যকারী , আর আমরা ফিরেছি তাকে ধুলো মাখা অবস্থায় ফেলে রেখে ; আমাদেরকে লুট করা হয়েছে এবং ধ্বংস করা হয়েছে এবং কোন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দানকারী ও সাহায্যকারী ছিলো না , আমরা আমাদের ভাইয়ের জন্য কাঁদছি ; হে নানা , শত্রুরা হোসেইনকে হত্যা করেছে এবং তারা আল্লাহর কাছে আমাদেরকে বিবেচনা করে নি। হে প্রিয় নানা , আমাদের শত্রুরা তাদের আশাগুলো পূরণ করেছে এবং তারা আমাদের মর্যাদা লঙ্ঘন করে স্বস্তি পেয়েছে , তারা আহলে বাইত (আ.)-দের বোরখাবিহীন করেছিল এবং বল প্রয়োগে তাদেরকে গদীবিহীন উটের ওপর বসিয়েছিল।
বর্ণনাকারী বলে যে , সাইয়েদা যায়নাব (আ.) মসজিদের এক জোড়া দরজা আঁকড়ে ধরলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন , হে নানা , আমি আপনার কাছে আমার ভাই হোসেইনের মৃত্যুর খবর জানাচ্ছি। এ কথা বলাতে তার অশ্রু অবিরত ঝরতে লাগলো এবং তিনি বিলাপ ও কান্না থামাতে পারলেন না এবং যতবার তার দৃষ্টি পড়তো ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর ওপর তার শোক নতুন করে শুরু হতো এবং হৃদয়ের বেদনা বৃদ্ধি পেতো।
আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর আহাজারি
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেছেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) চল্লিশ বছর কেঁদেছিলেন তার পিতার জন্য। তিনি সব সময় দিনে রোযা রাখতেন এবং পুরো রাত জেগে থাকতেন। আর যখন ইফতার করার সময় হতো তার খাদেম তার সামনে খাবার রাখতো ইফতারের জন্য এবং বলতো , হে আমার মালিক , আপনি ইফতার করুন। ইমাম (আ.) বলতেন , রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত অবস্থায়। এরপর তিনি তা বার বার বলতেই থাকতেন এবং অনেক কাঁদতেন তার অশ্রুতে খাবার ভিজে যাওয়া পর্যন্ত এবং পানিও , এবং তা চলতেই থাকলো তার জীবনের শেষ পর্যন্ত। তার একজন দাস বলেছে যে , একদিন আমার মালিক ঘরের বাইরে গেলেন , আমিও তাকে অনুসরণ করলাম। আমি দেখলাম তিনি তার কপাল একটি অমসৃণ পাথরের ওপর রাখলেন এবং আমি তার কান্না ও আহাজারি শুনতে পেলাম এবং তার তেলাওয়াতের কণ্ঠও শুনতে পেলাম এক হাজার বার , আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে , আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই পূর্ণ আত্মনিয়োগ ও বিনয়ের মাধ্যমে , আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই বিশ্বাসে ও সত্যে।
এরপর তিনি সিজদা থেকে তার মাথা তুললেন এবং তার দাড়ি ও চেহারা তার চোখের পানিতে ভিজে গিয়েছিল। এ দেখে আমি বললাম , হে আমার মালিক , আপনার দুঃখ শেষ হয় নি এবং আপনার আহাজারি থামে নি ? তিনি উত্তর দিলেন , তোমার জন্য আক্ষেপ , ইয়াক্বুব (আ.) একজন নবী ছিলেন এবং তার বারো জন সন্তান ছিলো। আল্লাহ তার এক সন্তানকে [ইউসূফ-আ.] তার চোখের আড়ালে রেখেছিলেন এবং তার মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল অত্যধিক দুঃখে এবং তার পিঠ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল দুঃশ্চিন্তায় এবং তার চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল অতিরিক্ত কান্নাকাটিতে ; আর এ সবকিছু হয়েছে যদিও তার সন্তান জীবিত ছিলো এ পৃথিবীতে। আর আমি আমার পিতা , ভাই এবং পরিবারের আঠারো জন সদস্যকে মাটিতে পড়ে যেতে এবং শহীদ হতে দেখেছি ― তাই কিভাবে আমার দুঃখ এবং অশ্রু থামতে পারে ?
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য শোক প্রকাশ
শেইখ আবু জাফর তূসি তার ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে খালিদ বিন সাঈদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে , সে বলেছে যে , আমি ইমাম জাফর আস- সাদিক্ব (আ.)-কে জিজ্ঞেস করলাম , কোন ব্যক্তি কি তার পিতা , ভাই অথবা আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর কারণে নিজের জামার কলার ছিঁড়তে পারে ? ইমাম (আ.) বললেন , এতে কোন সমস্যা নেই। নবী মূসা (আ.) নিজের জামার কলার ছিঁড়েছিলেন তার ভাই হারুন (আ.)-এর মৃত্যুতে। একজন পিতা তার সন্তানের মৃত্যুতে এবং একজন স্বামী তার স্ত্রীর মৃত্যুতে জামার কলার নাও ছিঁড়তে পারেন , কিন্তু একজন স্ত্রী তার স্বামীর মৃত্যুতে পারেন। এরপর আরও বললেন , ফাতেমা (আ.)-এর পরিবার হোসেইন (আ.)-এর জন্য জামার কলার ছিঁড়েছিলেন এবং চেহারায় হাত দিয়ে চাপড় মেরেছিলেন এবং তিনি এতই মূল্যবান ছিলেন যে তার মৃত্যুতে কলার ছেঁড়া এবং চেহারায় হাত দিয়ে চাপড় মারা উচিত ছিলো।
বারক্বী বর্ণনা করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-কে হত্যা করা হলো , বনি হাশিমের নারীরা কালো কাপড় ও শোকের পোশাক পরেছিলেন এবং উত্তাপ বা ঠাণ্ডার বিষয়ে কোন অভিযোগ করেন নি এবং ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.) তাদের শোকের অনুষ্ঠানের খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন।
আবু রায়হান [আল বিরুনী] তার‘ আসারুল বাক্বিয়াহ ’ গ্রন্থে বলেছেন যে , দশ মুহাররাম আরবদের কাছে পবিত্র বিবেচিত ছিলো যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐ দিনে ইমাম হোসেইন (আ.)-কে হত্যা করা হলো। এরপর তারা তার ও তার সাথীদের সাথে এমন ব্যবহার করলো যে , কোন জাতিই তাদের নিকৃষ্ট লোকদের সাথে এ আচরণ করে নি যা তারা তাদের সাথে করলো ক্ষুধা ও পিপাসায় , তরবারি , [তাঁবুতে] আগুন , বর্শার আগায় মাথাগুলো তোলা এবং তাদের দেহগুলোর ওপর ঘোড়া ছোটানোর বিষয়ে ; তাই তারা [শিয়ারা] এ দিনটিকে অকল্যাণের দিন বিবেচনা করতো , কিন্তু বনি উমাইয়া সেদিন আনন্দ উৎসব করতো এবং নুতন পোশাক পরতো এবং ভোজসভা ও আনন্দ উৎসবের আয়োজন করতো। তারা মিষ্টি প্রস্তুত করতো এবং সুগন্ধি বিতরণ করতো। যতদিন বনি উমাইয়ার রাজত্ব ছিলো এ সংস্কৃতি আম্মাহর [ ইয়াজিদি মুসলমানদের] মধ্যে চলতে থাকলো। তাদের রাজত্বের সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও‘ আম্মাহ ’ -এর মধ্যে এ সংস্কৃতি চলতে থাকলো। আর শিয়ারা , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের শোকে শোকগাঁথা আবৃত্তি করে এবং আহাজারি করে। আর এ সংস্কৃতি‘ শান্তির শহর ’ বাগদাদে এবং অন্যান্য শহরেও বজায় আছে এবং এ দিনে তারা কারবালার প্রশান্তিপূর্ণ কবরগুলোতে যিয়ারাতে যায়। অন্যদিকে আম্মাহ [ ইয়াজিদি মুসলমান] এ দিনে নুতন ঘটি বাটি এবং আসবাপত্র কেনা কল্যাণকর মনে করে।
শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মি যুহরি থেকে বর্ণনা করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-কে হত্যা করা হয়েছিল , তখন বাইতুল মুকাদ্দাসে এমন কোন নুড়িপাথর ছিলো না যার নিচে তাজা রক্ত পাওয়া যায় নি।
হুরেইম আ’ ওয়ার বর্ণনা করেছে যে , ইমাম আলী (আ.) বলেছেন , আমার পিতা-মাতা হোসেইন (আ.)-এর জন্য কোরবান হোক , যাকে হত্যা করা হবে কুফার পেছনে। আল্লাহর শপথ , আমি যেন দেখতে পাচ্ছি পশুদের বিভিন্ন জাতি তার কবরে গলা লম্বা করে দিচ্ছে এবং কাঁদছে ও তার জন্য আহাজারি করছে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত। তাই যখন তা ঘটবে তখন প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত অত্যাচার ও অকৃতজ্ঞতা থেকে দূরে থাকা।
যুরারাহ বর্ণনা করেছে ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে যে তিনি বলেছেন , হে যুরারাহ , নিশ্চয়ই আকাশগুলো চল্লিশ সকাল রক্ত অশ্রু ফেলেছে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য। পৃথিবী চল্লিশ সকাল অন্ধকারে পরিণত হয়েছিল এবং সূর্যগ্রহণ হয়েছিল ও চল্লিশ সকাল পর্যন্ত লাল হয়ে গিয়েছিল , আর পর্বতগুলো ভেঙ্গে পড়েছিল এবং গুড়ো হয়ে গিয়েছিল এবং সমুদ্র বিস্ফোরিত হয়েছিল। ফেরেশতারা চল্লিশ সকাল ধরে কেঁদেছিল ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য এবং যতদিন মাথাটি আমাদের কাছে পৌঁছায় নি , আমাদের নারী-স্বজনরা তাদের চুলে কলপ বা তেল দেয় নি , না তারা কাজল ব্যবহার করেছে অথবা চুলে চিরুনী চালিয়েছে। তার পরে আমরা সব সময় শোকাবিভূত ছিলাম। আর আমার পিতামহ [ইমাম যায়নুল আবেদীন-আ.] কাঁদতেন যখনই তিনি তার কথা মনে করতেন , যতক্ষণ পর্যন্ত না তার অশ্রুতে তার দাড়ি ভিজে যেতো। যে-ই তাকে দেখতো দুঃখবোধ করতো এবং কাঁদতো। তার কবরের মাথার কাছে ফেরেশতারাও কাঁদে এবং তারাও যারা সে পরিবেশে উপস্থিত থাকে এবং আকাশগুলোও তাদের কান্নার কারণে কাঁদে।
বলা হয়েছে যে , কোন অশ্রু অথবা চোখ নেই যা আল্লাহর কাছে এত প্রিয় এ চোখগুলোর চাইতে যেগুলো তার জন্য অশ্রু ফেলে। এরপর যে ব্যক্তি তার জন্য কাঁদে , ফাতেমা (আ.) এ বিষয়ে সংবাদ লাভ করেন , আর এটি তার প্রশান্তি লাভের কারণ হয়। আর এ খবর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছেও পৌঁছায় এবং তা যেন এমন যে সে আমাদের অধিকার পূর্ণ করেছে। কোন মানুষ নেই যে কিয়ামতের দিন কাঁদতে কাঁদতে উঠবে না , শুধু তারা ছাড়া যারা আমার প্রপিতামহের জন্য কাঁদে , আর তারা জাগ্রত হবে আলোকিত আত্মা ও আলোকিত চোখ এবং আনন্দিত চেহারা নিয়ে। লোকজন ভীতির ভেতওে থাকবে , আর এরা থাকবে শান্তিতে। অন্যরা হিসাব দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে , কিন্তু তারা থাকবে হোসেইন (আ.)-এর সাথে , তার সঙ্গীদের সাথে , আরশের নিচে এর ছায়াতে। আর তারা হিসাব দেয়ার অনিষ্টের ভয়ে থাকবে না। তাদেরকে বলা হবে , বেহেশতের দিকে যাও। তারা কোন কথায় কান দিবে না এবং তাদের হৃদয় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাহচর্য থেকে এবং তার সাথে কথা বলা থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। হুরীরা তাদের কাছে আমন্ত্রণ পাঠাবে যে , তারা এবং তাদের সাথে‘ অপরিবর্তনীয় বয়সের ’ গোলামরা তাদেরকে একনজর দেখার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে আছে , কিন্তু তারা মাথা তুলেও তাকাবে না এবং তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাহচর্যের আনন্দ ও রহমতে ডুবে থাকবে। এসময় তার কিছু শত্রুকে তাদের এলামেলো চুল ধরে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে , এবং কিছু চিৎকার করে বলবে যে তাদের কোন সুপারিশকারী ও কোন বন্ধু নেই তাদের প্রয়োজনে। তাদের বন্ধুরা বেহেশতে তাদের [উচ্চ] মর্যাদা দেখতে পাবে , কিন্তু তারা তাদের কাছে যেতে পারবে না এবং তাদেরকে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারবে না। বেহেশতের ফেরেশতারা তাদের জন্য সুসংবাদ বয়ে আনবে তাদের সঙ্গীদের [হুর] কাছ থেকে এবং তাদের ধনসম্পদের রক্ষকদের কাছ থেকে যে তাদের জন্য কী আনন্দজনক বিষয়সমূহ অপেক্ষা করছে। তারা উত্তর দিবে যে , ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের কাছে আসবো। ফেরেশতারা হুরীদের কাছে সংবাদ পৌঁছে দিবে , যাদের আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে তাদের মর্যাদা সম্পর্কে জেনে যা তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর নৈকট্য পাওয়ার কারণে লাভ করেছে। তখন তারা বলবে , আলহামদুলিল্লাহ , আল্লাহ আমাদেরকে বিরাট বিপর্যয় থেকে এবং কিয়ামতের ভয়ানক মরুভূমি থেকে রক্ষা করেছেন এবং রক্ষা করেছেন আমাদেরকে তা থেকে যার ভয় আমরা করতাম। এরপর তাদের বাহন আনা হবে এবং তারা এগুলোর ওপর বসবে এবং আল্লাহর , যিনি প্রশংসাযোগ্য , প্রশংসা করতে থাকবে এবং দরুদ পড়বে মুহাম্মাদ ও তার বংশধরের ওপরে এবং তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাবে।
বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি রাহবাহতে ছিলেন এবং এ আয়াতটি আবৃত্তি করলেন:‘ তাই তাদের জন্য আকাশগুলো ও পৃথিবী কাঁদলো না , না তাদের সময় দেওয়া হলো। ’ সাথে সাথে ইমাম হোসেইন (আ.) তার কাছে এলেন মসজিদের একটি দরজা দিয়ে। তাকে দেখে ইমাম আলী (আ.) বললেন , এ সেই ব্যক্তি , যাকে হত্যা করা হবে এবং আকাশগুলো ও পৃথিবী তার জন্য কাঁদবে।
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন যে , আকাশগুলো ও পৃথিবী ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য কেঁদেছিল ও লালবর্ণ ধারণ করেছিল। তারা কারো জন্যে কাঁদে নি একমাত্র নবী ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আ.) এবং হোসেইন (আ.) ছাড়া। অন্য এক স্থানে তার কাছ থেকেই উদ্ধৃত করা হয়েছে যে , ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আ.)-এর হত্যাকারী ছিলো এক জারজ সন্তান , এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর হত্যাকারীও। আকাশগুলো ও পৃথিবী কারো জন্যে কাঁদে নি এ দুজনের জন্য ছাড়া। বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলো , আকাশগুলোর কান্না বলতে কী বোঝায় ? ইমাম বললেন , সূর্য উদয় হলো লাল রঙ নিয়ে এবং অস্ত গেলো একইভাবে।
উসমান বিন আবি শাইবাহ বর্ণনা করেছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর আকাশ এমন হয়ে গেলো যে সাত দিন ধরে দেয়ালগুলো গাঢ় লাল রঙের লিনেন কাপড়ের মতো দেখালো এবং মনে হচ্ছিলো নক্ষত্রগুলো পরস্পরের সাধে ধাক্কা খাচ্ছে।
ইবনে জাওযী বর্ণনা করেছেন ইবনে সিরীন থেকে যে , বিশ্বজগত অন্ধকার হয়ে গেলো তিন দিনের জন্য এবং আকাশে লাল রঙ দেখা গেলো।
আবু সাঈদ বলেছে যে , পৃথিবীতে এমন কোন পাথর ওল্টানো হয় নি যার নিচে তাজা রক্ত দেখা যায় নি। আকাশগুলো থেকে রক্তবৃষ্টি ঝরেছে এবং এর দাগ দীর্ঘ দিন পোশাকে ছিলো।
এটিও বর্ণিত হয়েছে যে , খোরাসান , সিরিয়া ও কুফার দেয়ালগুলো ও বাড়িগুলোর ওপরে রক্ত বৃষ্টি হয়েছিল। আর যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা ইবনে যিয়াদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তার দেয়াল থেকে রক্ত বেয়ে পড়ছিল।
সিবতে ইবনে জাওযির‘ তাযকিরাহ ’ গ্রন্থে হিলাল বিন যাকওয়ান থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-কে হত্যা করা হলো , আমরা দেয়ালগুলোকে দেখলাম যেন রক্তে মেখে দেওয়া হয়েছে প্রায় দু অথবা তিন মাস ধরে ― ফজরের নামাযের সময় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আমরা এক সফরে বের হয়েছিলাম এবং হঠাৎ করে বৃষ্টি হলো , যার দাগ রক্তের মতো আমাদের পোশাকে লেগে রইলো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“ নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু ’ মিনের হৃদয়ে হোসেইনের শাহাদাতের ব্যাপারে এমন ভালোবাসা আছে যে , তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হয় না।” [মুস্তাদরাক আল-ওয়াসাইল , খণ্ড-10 , পৃষ্ঠা-318]
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন:“ সমস্ত চোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে , নিশ্চয়ই কেবল সেই চোখ ছাড়া যা হোসেইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে ; ঐ চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত প্রদান করা হবে।” [বিহারুল আনওয়ার , খণ্ড-44 , পৃষ্ঠা-193]
গ্রন্থপঞ্জি:
1. শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস [নাফাসুল মাহমুম] , মুহাদ্দিস শেইখ আব্বাস কুম্মী , ঢাকা , 2010।
2. মীযান আল-হিকমাহ , আল্লামা মুহাম্মদ মুহাম্মাদি রেইশাহরি , দার আল-হাদীস ইনস্টিটিউট , কোম , ইরান , 2009।
3. জামে আত-তিরমিযী , আবু ঈসা আত-তিরমিযী , ঢাকা , 1998।
4. The Story of Karbala, Ali Nazari Munfarid, Ahl al-Bayt Islamic Cultural Services (AICS), Qum, Iran, 1997
5 . The Event ofTaff : The Earliest Historical Account of the Tragedy of Karbala, Abu Makhnaf Lut Bin Yahya Al-Azdi Al-Ghamidi, Ahl al-Bayt (a.)World Assembly (ABWA), Qum, Iran, 2012.
সূচিপত্র
ইমাম হোসেইন ( আ .)- এর শাহাদাত 4
শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী 9
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জিনিসপত্র লুট 12
শহীদদের পবিত্র মাথাগুলোকে কুফায় উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে প্রেরণ 16
কুফাতে সাইয়েদা যায়নাব বিনতে আলী (আ.)-এর খোতবা 21
কুফার জনগণের ভেতর ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর যুক্তি পেশ 25
কুফায় সাইয়েদা ফাতিমা বিনতে হোসেইন (আ.)-এর খোতবা 27
কুফাতে সাইয়েদা উম্মে কুলসুম বিনতে আলী (আ.)-এর খোতবা 31
কুফায় উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের প্রাসাদে নবী পরিবারের বন্দীরা 33
নবী পরিবারের বন্দীদের কুফা থেকে দামেস্কে প্রেরণ 36
দামেস্কে নবী পরিবারের বন্দীরা 40
অভিশপ্ত ইয়াযীদের সামনে সাইয়েদা যায়নাব (আ.)-এর খোতবা 46
ইমাম আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর খোতবা 51
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কন্যা সাইয়েদা সাকিনাহ (আ.)-এর স্বপ্ন 57
ইয়াযীদের স্ত্রীর স্বপ্ন এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য তার কান্না 59
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শিশু কন্যার স্বপ্ন 61
দামেস্কের প্রধান দরজা ও বড় মসজিদে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর ঝুলন্ত মাথা 62
ইয়াজিদের দরবারে ইহুদী রাব্বি-এর বক্তব্য 63
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর হত্যাকারীকে ইয়াজিদের পুরস্কার প্রদান 65
দামেস্কে নবী পরিবারের বন্দীদের মুক্তি প্রদান 66
নবী পরিবারের নির্যাতিত ও শোকার্ত সদস্যদের সিরিয়া থেকে কারবালা হয়ে মদীনায় গমন 67
মদীনার উপকণ্ঠে ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.)-এর খোতবা 70
আলী বিন হোসেইন (আ.)-এর আহাজারি 73
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য শোক প্রকাশ 75
গ্রন্থপঞ্জি: 81