শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস
(প্রথম খণ্ড)
(কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস)
লেখক:
আল্লামা আব্বাস বিন মুহাম্মাদ রেযা আল কুম্মি
ইংরেজী অনুবাদ:
এজায আলী ভুজওয়ারা (আল হোসাইনি)
অনুবাদ:
মুহাম্মদ ইরফানুল হক
সম্পাদনা:
এ. কে. এম. রাশিদুজ্জামান
ফাতিমা মুনাওয়ারা
ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
এই বইটি আল হাসানাইন (আ.) ওয়েব সাইট কর্তৃক আপলোড করা হয়েছে ।
http://alhassanain.org/bengali
শিরোনাম : শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস (নাফাসুল মাহমুম)
লেখক : আল্লামা আব্বাস বিন মুহাম্মাদ রেযা আল কুম্মি
ইংরেজী অনুবাদ : এজায আলী ভুজওয়ারা (আল হোসাইনি)
অনুবাদ : মুহাম্মদ ইরফানুল হক
সম্পাদনা : এ. কে. এম. রাশিদুজ্জামান , ফাতিমা মুনাওয়ারা
সহযোগিতায় : কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর , ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান , ঢাকা , বাংলাদেশ
প্রকাশক : ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
আমাদের অভিভাবক মজলুম ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্ম ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্মের দিন , মাস ও বছর নিয়ে শিয়া ও সুন্নি পণ্ডিত ব্যক্তিদের , হাদীসবেত্তাদের ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন তিনি জন্মেছিলেন শা’ বান মাসের তিন ও পাঁচ তারিখে অথবা হিজরি ৪র্থ বর্ষের ৫ই জমাদিউল উলাতে , আবার কেউ বলেন তা ছিলো হিজরি ৩য় বর্ষের রবিউল আউয়াল মাসের শেষের দিকে।
একইভাবে শেইখ তূসী তার‘ তাহযীব’ -এ , শেইখ শাহীদ আল আউয়াল তার‘ দুরূস’ -এ এবং শেইখ বাহাই তার‘ তাওযীহাল মাক্বাসিদ’ -এ সবাই একমত এবং তারা সিক্বাতুল ইসলাম (ইসলামের বিশ্বস্ত কর্তৃপক্ষ) শেইখ কুলাইনি (আল্লাহ তার কবরকে সম্মানিত করুন) থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন ,“ ইমাম হাসান (আ.) (এর জন্ম) ও ইমাম হোসেইন (আ.) এর (গর্ভে আসা) মধ্যে দূরত্ব এক তুহর (পবিত্র সময়) এবং তাদের জন্মদিনের মধ্যে দূরত্ব ছয় মাস দশ দিন।”
এখানে যা বোঝানে হয়েছে তা হলো ন্যূনতম পবিত্র কাল যা হলো দশ দিন। ইমাম হাসান (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন রমযানের পনেরো তারিখে। বদরের যুদ্ধের বছরে অর্থাৎ হিজরি দ্বিতীয় বছরে।
পাশাপাশি এটিও বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম হাসান (আ.) (এর জন্ম) এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর (গর্ভে আসা) দূরত্ব এক তুহর ছিলো না এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার মায়ের গর্ভে ছিলেন ছয় মাস।
ইবনে শাহর আশোব তার‘ মানাক্বিব’ -এ উল্লেখ করেছেন‘ কিতাব আল আনওয়ার’ থেকে যে , আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাসূলুল্লাহ (সা.) কে ইমাম হোসেইন (আ.) এর গর্ভে আসা ও তার জন্ম সম্পর্কে অভিনন্দন পাঠালেন এবং একই সাথে তার শাহাদাত সম্পর্কে শোক বার্তা পাঠালেন। যখন হযরত ফাতিমা যাহরা (আ.) কে তা জানানো হলো তিনি শোকাভিভূত হয়ে পড়লেন। তখন নিচের এ আয়াতটি নাযিল হয়:
) حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا(
“ কষ্ট নিয়ে তার মা তাকে বহন করেছে এবং কষ্টের ভেতরে সে তাকে প্রসব করেছে এবং তাকে গর্ভে বহন ও দুধ খাওয়ানো ছিলো ত্রিশ মাস।” [সূরা আল আহক্বাফ: ১৫]
সাধারণত একজন নারীর গর্ভকাল হলো নয় মাস এবং কোন শিশু ছয় মাসে জন্মগ্রহণ করে বেঁচে থাকে না , শুধুমাত্র নবী ঈসা (আ.) এবং ইমাম হোসেইন (আ.)১ ছাড়া।
শেইখ সাদুক্ব তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা উল্লেখ করে সাফিয়াহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিব থেকে বর্ণনা করেন যে , তিনি বলেছেন: যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্ম হলো আমি তখন তার মায়ের সেবা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে ফুপু , আমার ছেলেকে আমার কাছে আনো।” আমি বললাম আমি তাকে এখনও পবিত্র করি নি। তিনি বললেন ,“ তাকে তুমি পবিত্র করবে ? বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে পরিষ্কার ও পবিত্র করেছেন।”
অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে , তখন তিনি শিশুকে রাসূল (সা.) এর কাছে দিলেন যিনি তার জিভকে তার মুখের ভিতর দিলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তা চাটতে লাগলেন। সাফিয়াহ বলেন যে , আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে দুধ ও মধু ছাড়া অন্য কিছু দেননি। তিনি বলেন যে , এরপর শিশু পেশাব করলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তার দুচোখের মাঝখানে একটি চুমু দিলেন এবং কাঁদলেন , এরপর আমার কাছে তাকে তুলে দিয়ে বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , আল্লাহ যেন তাকে অভিশাপ দেন যে তোমাকে হত্যা করবে।” তিনি তা তিনবার বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হোক , কে তাকে হত্যা করবে ?” তিনি বললেন ,“ বনি উমাইয়ার মধ্য থেকে যে অত্যাচারী দলটি আবির্ভূত হবে।”
বর্ণিত আছে , রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামাহ দিলেন। ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) বর্ণনা করেছেন যে , রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কানে আযান দিয়েছিলেন যেদিন তার জন্ম হয়েছিলো। এছাড়া বর্ণিত আছে যে , সপ্তম দিনে তার আকিকা দেয়া হয়েছিলো এবং সাদা রঙের মন কাড়া দুটো ভেড়া কোরবানী করা হয়েছিলো , এর একটি উরু এবং সাথে একটি স্বর্ণমুদ্রা ধাত্রীকে দেয়া হয়েছিলো। বাচ্চার চুল চেঁছে ফেলা হয়েছিলো এবং এর সমান ওজনের রুপা দান করা হয়েছিলো। এরপর বাচ্চার মাথায় সুগন্ধি মেখে দেয়া হয়েছিলো।
ইসলামের বিশ্বস্ত কর্তৃপক্ষ শেইখ কুলাইনি বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার মা হযরত ফাতিমা (আ.) অথবা অন্য কোন মহিলা থেকে দুধ পান করেননি। তাকে সবসময় রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে আনা হতো এবং তিনি তাকে তার হাতের বুড়ো আঙ্গুলটি চুষতে দিতেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তার বুড়ো আঙ্গুল চুষতেন এবং এরপর দুই অথবা তিন দিন তৃপ্ত থাকতেন। এভাবেই ইমাম হোসেইন (আ.) এর রক্ত ও মাংস তৈরী হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (সা.) এর রক্ত ও মাংস থেকে।
শেইখ সাদুক্ব (আল্লাহ তার কবরকে আরও পবিত্র করুন) ইমাম সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) জন্ম নিলেন তখন আল্লাহ জিবরাঈলকে আদেশ করলেন সাথে এক হাজার ফেরেশতা নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করতে এবং রাসূল (সা.) কে আল্লাহর পক্ষ থেকে ও তার নিজের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাতে। জিবরাঈল অবতরণ করলেন এবং একটি দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যেখানে ফিতরুস নামে এক ফেরেশতা , যে আরশ বহনকারী ছিলো , বহিস্কৃত অবস্থায় পড়েছিলো। আল্লাহ একবার ফিতরুসকে একটি কাজ দিয়েছিলেন যা সে করতে দেরী করেছিলো অলসতার কারণে ; তাই আল্লাহ তার পাখা দুটো কেটে নিয়েছিলেন এবং ঐ দ্বীপে বহিষ্কার করেছিলেন। ফিতরুস সেখানে আল্লাহর ইবাদত করেছিলো সাতশত বছর ইমাম হোসেইন (আ.) জন্মের সময় পর্যন্ত। যখন ফিতরুস জিবরাঈলকে দেখলো সে তাকে জিজ্ঞেস করলো তিনি কোথায় যাচ্ছেন। জিবরাঈল উত্তরে বললেন ,“ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুহাম্মাদ (সা.) এর উপর নেয়ামত (ইমাম হোসেইন) দান করেছেন। আর এজন্য আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন তার কাছে যেতে এবং তাকে অভিনন্দন জানাতে তার পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে।” ফিতরুস বললো ,“ তাহলে হে জিবরাঈল , আমাকেও আপনার সাথে নিয়ে চলুন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে , হতে পারে তিনি আমার জন্য দোআ করবেন।” জিবরাঈল তাকে তুলে নিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে তাকে আনলেন। যখন তিনি সেখানে পৌঁছালেন তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ও নিজের পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানালেন , এরপর ফিতরুসের বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ফিতরুসকে আদেশ করলেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর দেহ স্পর্শ করতে এবং ওপরে উঠতে। ফিতরুস তা-ই করলো এবং ওপরের দিকে উঠে গেলো এবং বললো ,“ হে রাসূলুল্লাহ , আপনার এ সন্তানটি আপনার উম্মতের হাতে দয়ামায়া ছাড়া নিহত হবে। অতএব আমার উপর দায়িত্ব হয়ে যায় এ উপকারের বদলে আমি প্রতিউপকার করি। তাই এমন কোন ব্যক্তি নেই যে তার কবর যিয়ারত করবে আর আমি তাকে এগিয়ে এসে গ্রহণ করবো না এবং কোন মুসলমান নেই যে তাকে সালাম জানাবে অথবা তার জন্য দোআ করবে আর আমি তা তার কাছে পৌঁছে দিবো না এবং তার সংবাদ নিয়ে যাবো না।” এ কথা বলে ফিতরুস উড়ে চলে গেলো। অন্য একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে , ফিতরুস উড়ে চলে যাওয়ার সময় বললো ,“ কে আছে আমার মত ? আমি হোসেইন (আ.) এর কারণে মুক্ত হয়েছি , যে আলী (আ.) ও ফাতিমা (আ.) এর সন্তান এবং যার নানা হচ্ছে আহমাদ (সা.) ।”
শেইখ তূসী তার‘ মিসবাহ’ তে বর্ণনা করেছেন যে , ক্বাসিম বিন আবুল আলা’ আ হামাদানি (ইমাম আলী আন-নাক্বী (আ.) এর প্রতিনিধি) ইমাম আল মাহদী (আল্লাহ তার আত্মপ্রকাশ তরান্বিত করুন)-এর কাছ থেকে একটি লিখিত ঘোষণা পান যা ছিলো এরকম: আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন বিন আলী (আ.) জন্ম নিয়েছিলেন বৃহস্পতিবার , শা’ বান মাসের তৃতীয় দিনে , অতএব সে দিন রোযা রাখো এবং এ দোআটি তেলাওয়াত করো ,“ হে আল্লাহ , আমি তার নামে আপনার কাছে চাচ্ছি যিনি এ দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন (শেষ পর্যন্ত)।” এছাড়া নিচের কথাগুলো উল্লেখ ছিলো ,“ ফিতরুস তার দোলনার নিচে আশ্রয় নিয়েছিলো এবং তার পরে আমরা আশ্রয় খুঁজি তার কবরের নিচে।”
‘ মালহুফ’ -এ সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , আকাশগুলোতে কোন ফেরেশতা বাকী ছিলো না যে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্মদিনে অভিনন্দন জানাতে ও তার শাহাদাত সম্পর্কে শোক বার্তা জানাতে আসে নি এবং তারা জানিয়েছিলো ইমামের জন্য কী পুরস্কার প্রস্তুত রাখা হয়েছিলো। তারা তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কবর দেখালেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) দোআ করলেন ,“ হে আল্লাহ , তাকে পরিত্যাগ করো যে হোসেইনকে পরিত্যাগ করে এবং তাকে হত্যা করো যে হোসেইনকে হত্যা করে এবং তাকে কোন প্রাচুর্য দান করো না যে তার মৃত্যু থেকে সুবিধা নেয়ার ইচ্ছা করে।” ২
প্রথম অধ্যায়
ইমাম হোসেইন (আ.) এর কিছু গুণাবলী ,
তার দুঃখ-কষ্ট স্মরণ করে কাঁদার পুরস্কার ,
তার হত্যাকারীদের ওপর অভিশাপ দেয়া এবং
তার শাহাদাতের বিষয়ে ভবিষ্যদ্ববাণী সম্পর্কে
পরিচ্ছেদ - ১
ইমাম হোসেইন (আ.) এর কিছু গুণাবলী সম্পর্কে
আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন (আ.) এর গুণাবলীগুলো স্পষ্ট এবং তার সম্মানের ও মর্যাদার উঁচু মিনার আলোকিত ও অনস্বীকার্য। সব বিষয়ে তিনি উচ্চ স্থান ও সম্মানের আসনের অধিকারী। শিয়া এবং অন্যান্যদের মধ্যে কেউ নেই যে প্রশংসা করে নি তার মহত্ত্ব , সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্বকে। তাদের মধ্যে বুদ্ধিমানরা সত্যকে চিনতে পেরেছে এবং মূর্খরা তা পরিচ্ছন্ন করে নিচ্ছে। কেনইবা তা হবে না , কারণ তার সম্মানিত সত্তা উচ্চতম নৈতিক গুণাবলীতে ঘেরাও হয়ে আছে এবং এ মহান চেহারা তার সমস্ত সত্তা জুড়ে আছে এবং সবদিক থেকে সৌন্দর্য তার ভিতরে প্রবেশ করেছে যা কোন মুসলমান অস্বীকার করতে পারে না।
তার নানা মুহাম্মাদ আল মুস্তাফা (যাকে বাছাই করা হয়েছে) (সা.) , নানী হযরত খাদিজা (আ.) , মা হযরত ফাতিমা যাহরা (আ.) , ভাই ইমাম হাসান আল মুজতাবা (সম্মানিত) (আ.) , তার চাচা জাফর তাইয়ার এবং বংশধরেরা হলো পবিত্র ইমামরা যারা হাশেমী পরিবার থেকে বাছাইকৃত। কবিতায় এসেছে ,“ আপনার জ্যোতি সবার কাছে স্পষ্ট , শুধু সেই অন্ধ ছাড়া যে চাঁদ দেখতে পায় না।”
যিয়ারতে নাহিয়াতে আমাদের অভিভাবক ইমাম আল মাহদী (আল্লাহ তার আত্মপ্রকাশকে তরান্বিত করুন) তার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন নিচের ভাষায়:
“ এবং আপনি আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য পূর্ণ করেছেন চূড়ান্ত প্রস্তুত মনোভাবের সাথে। দানশীলতায় সুপরিচিত আপনি , মধ্যরাতের নামায সম্পন্ন করেছেন অন্ধকারে
আপনার পথ ছিলো দৃঢ় , (আপনি ছিলেন) মানুষের মধ্যে অত্যন্ত দয়াবান , অগ্রবর্তীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , বংশধারায় উচ্চ সম্মানের অধিকারী , পূর্বপুরুষদের বিষয়ে মর্যাদাপূর্ণ এবং আপনার ছিলো প্রশংসিত আসন এবং (আরও) বেশি কিছু শ্রেষ্ঠত্ব
আপনি ছিলেন প্রশংসিত চরিত্রের , যথেষ্ট উদার
আপনি ছিলেন সহনশীল , মার্জিত , ক্রন্দনকারী , দয়াবান , জ্ঞানী , প্রচণ্ড পরিশ্রমী , একজন শহীদ ইমাম , ক্রন্দনকারী , (বিশ্বাসীদের) ভালোবাসার মানুষ , (কাফেরদের জন্য) ভয়ানক
আপনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের (সা.) সন্তান এবং যিনি পবিত্র কোরআন পৌঁছে দিয়েছেন এবং এ উম্মতের বাহু
এবং যিনি (আল্লাহর) আনুগত্যের পথে সংগ্রাম করে গেছেন
শপথ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী
আপনি ঘৃণা করতেন সীমালঙ্ঘনকারীদের পথ
যারা সমস্যায় আছে তাদের প্রতি দানকারী
যিনি রুকু ও সিজদাকে দীর্ঘায়িত করেছেন
আপনি এই পৃথিবী থেকে বিরত থেকেছিলেন
আপনি একে সবসময় তার দৃষ্টিতে দেখেছেন যে একে শীঘ্রই ছেড়ে যাবে।”
এরপর তিনি আরও বলেন:
“ আমি নিজের প্রতি আশ্চর্য হই যে আমি তার প্রশংসা করতে যাচ্ছি যার প্রশংসায় পাতা শেষ হয়ে গেছে ; সমুদ্রের পানি আপনার শ্রেষ্ঠত্বের বই পূর্ণ করার জন্য যথেষ্ট নয় , যাতে আমি আমার আঙ্গুল ডোবাবো পাতাগুলো ওল্টানোর জন্য (তা পড়ার জন্য)।”
তার বীরত্ব
বর্ণনাকারীরা ও নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকে যেতে চাইলেন উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ তখন সৈন্যদলের পর সৈন্যদল পাঠাতে থাকলো তার দিকে এবং পুলিশ বাহিনীকেও জড়ো করলো হত্যা করার জন্য। সে ত্রিশ হাজার সৈন্যের (পদাতিক ও অশ্বারোহী) একটি বাহিনী প্রস্তুত করলো , বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে একের পর এক তাকে অনুসরণ করার জন্য এবং সামরিক সজ্জায় সজ্জিত হয়ে তাকে সবদিক থেকে ঘেরাও করার জন্য। তারা তাকে এ সতর্ক বাণী পাঠালো:“ হয় যিয়াদের পুত্রের আদেশ মানো এবং ইয়াযীদের কাছে বাইয়াতের শপথ করো অথবা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও , যা কলিজা বের করে আনবে এবং মহাধমনী কেটে ফেলবে , আত্মাগুলোকে ওপরে পাঠিয়ে দিবে এবং দেহগুলোকে মাথা নিচু অবস্থায় মাটিতে ছুঁড়ে ফেলা হবে।”
কিন্তু ইমাম তার সম্মানিত নানা ও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বেইজ্জতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করলেন। তিনি আত্মসম্মান এবং জনগণের সম্মানের বিষয়ে এক উদাহরণ সৃষ্টি করলেন এবং তরবারির নিচে (মর্যাদার) মৃত্যু বেছে নিলেন। এরপর তিনি নিজে , তার ভাই এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন ইসলামের (প্রতিরক্ষায়) এবং মৃত্যুকে বেছে নিলেন ইয়াযীদের অত্যাচারের কাছে আত্মসমর্পণের চাইতে। বদমাশ এবং ঘৃণ্য একদল সৈন্য তাদেরকে বাধা দিচ্ছিলো এবং চরিত্রহীন কাফেররা তার দিকে তীর ছুঁড়তে শুরু করলো। কিন্তু ইমাম হোসেইন (আ.) পাহাড়ের মত দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং কোন কিছুই তার দৃঢ়তাকে দুর্বল করতে পারলো না। শাহাদাতের যমীনের উপর তার পা দুটো পাহাড়ের চাইতে দৃঢ় ছিলো এবং যুদ্ধ অথবা মৃত্যুর ভয়ে তার হৃদয় বিচলিত হয় নি। একইভাবে তার সাহায্যকারীরা উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের বাহিনীগুলোর মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং তাদের অনেককে হত্যা ও আহত করেছিলেন। তারা নিজেরা মৃত্যুবরণ করে নি যতক্ষণ না তারা তাদের অনেককে হত্যা করেছেন এবং তাদেরকে হাশেমী বংশের তেজের মাধ্যমে মৃত্যুর স্বাদ দিয়েছেন। হাশেমীদের মাঝে কেউ শহীদ হয় নি যতক্ষণ না তারা তাদের প্রতিপক্ষকে মাটিতে ফেলেছেন এবং হত্যা করেছেন এবং তাদের তরবারির হাতল পর্যন্ত তাদের দেহের ভিতর ঢুকিয়ে দিয়েছেন। ইমাম হোসেইন (আ.) নিজে শত্রুদেরকে আক্রমণ করেছেন ভয়ানক সিংহের মত এবং তার মহা ক্ষমতাবান তরবারি দিয়ে তাদেরকে মাটির উপর ছুঁড়ে ফেলেছেন। বর্ণনাকারী এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছে যে বলেছে , আল্লাহর শপথ , আমি তার মত কাউকে দেখি নি যে সন্তানদের , আত্মীয়দের এবং প্রিয় বন্ধুদের হারানোর পরও তার হৃদয় ছিলো শক্তিশালী ও প্রশান্ত এবং পা দুটো মাটির ওপরে সুদৃঢ়। আল্লাহর শপথ , আমি তার মত কাউকে দেখি নি , তার আগে ও পরে।”
বর্ণিত আছে যে একটি খামারের মালিকানার বিষয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) ও ওয়ালীদ বিন উক্ববার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলো। যদিও ওয়ালীদ ছিলো মদীনার গভর্নর (কিন্তু সে ছিলো ভুলের মধ্যে) , ইমাম ক্রোধান্বিত হলেন এবং তার মাথার পাগড়ী খুলে ঘাড়ে ঝুলালেন।
‘ ইহতিজাজ’ নামের বইতে মুহাম্মাদ বিন সায়েব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , একদিন মারওয়ান বিন হাকাম ইমাম হোসেইন (আ.) কে বললো ,“ যদি তোমার সম্মান ও মর্যাদা হযরত ফাতিমার মাধ্যমে না হয়ে থাকে তাহলে কিভাবে তুমি আমাদের চাইতে বেশী সম্মানিত ?” ইমাম হোসেইন (আ.) ক্রোধান্বিত হলেন এবং তার লোহার মত শক্ত থাবা দিয়ে তার ঘাড় ধরলেন এরপর তিনি তার পাগড়ী খুলে ফেললেন এবং তা মারওয়ানের ঘাড়ে বেঁধে দিলেন এবং সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলো। এরপর তিনি তাকে ফেলে চলে গেলেন।
লেখক বলেন যে , ইমাম হোসেইনের বীরত্ব একটি সুপরিচিত শব্দ হয়ে দাঁড়ালো এবং অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে তার সহনশীলতা অন্যদেরকে ক্লান্তও হতাশ করে ফেলেছিলো।
তার যুদ্ধ ছিলো রাসূল (সা.) এর বদরের যুদ্ধের মত এবং অসংখ্য শত্রুর সামনে অল্প সংখ্যক সমর্থক থাকা সত্ত্বেও তার সহনশীলতা ছিলো সিফফীন ও জামালের যুদ্ধে তার পিতা ইমাম আলী (আ.) এর মত।
ইমাম মাহদী (আ.) যিয়ারতে নাহিয়াতে বলেছেন:
“ এবং (তারা) আপনার উপর প্রথম আক্রমণ করেছিলো , তাই আপনিও রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বর্শা ও তরবারি নিয়ে।
এবং আপনি সীমালঙ্ঘনকারীদের সৈন্য বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত করেছিলেন
এবং আপনি যুদ্ধের ধুলার ভিতরে ঘেরাও হয়ে পড়েছিলেন এবং যুলফিক্বার নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন এমন তীব্রতায় যেন আপনি ছিলেন আলী- যাকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিলো
তাই যখন শত্রুরা দেখলো আপনি ছিলেন স্থির ও শান্তকোন ভয় ও দুশ্চিন্তা ছাড়া , তারা পরিকল্পনা করলো এবং আপনার জন্য ফাঁদ তৈরী করলো এবং তারা আপনার সাথে যুদ্ধ শুরু করলো চালাকি ও অসৎ পন্থায় এবং অভিশপ্ত (উমর বিন সা’ আদ) তার সৈন্যবাহিনীকে আদেশ করলো (আপনার দিকে) পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করে দিতে। এবং তাদের সবাই তাদের অত্যাচার শুরু করলো আপনাকে হত্যা করার জন্য এবং আপনার বিরুদ্ধে সারিবদ্ধ হওয়ার জন্য দ্রুত এগিয়ে এলো তারা আপনার দিকে আঘাত করলো তীর ছুঁড়ে এবং তাদের ব্যর্থ হাতগুলো আপনার দিকে প্রসারিত করলো তারা আপনার অধিকার বিবেচনা করলো না , না তারা আপনার বন্ধুদের তরবারি দিয়ে হত্যা করাকে গুনাহ মনে করলো , (এবং) তারা আপনার জিনিসপত্র লুট করে নিলো আপনি (যুদ্ধের) দুঃখ-কষ্ট দৃঢ়তার সাথে সহ্য করলেন এবং তাদের কাছ থেকে আসা বিপদ মুসিবত সহ্য করলেন এমনভাবে যে আকাশের ফেরেশতারা আপনার ধৈর্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলো এরপর শত্রুরা আপনাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো এবং আপনাকে আহত করলো এবং তারা দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে আপনাকে আপনার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো , আপনার জন্য আর কোন সাহায্যকারী রইলো না , আপনি ধৈর্য ও বিরতিহীন প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাদেরকে আপনার পরিবারের নারী ও শিশুদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছিলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা তারা আপনাকে আপনার ঘোড়ার পিঠ থেকে জোর করে নামিয়ে দিলো এবং আপনি মাটিতে পড়ে গেলেন আহত অবস্থায় ঘোড়াগুলো আপনাকে তাদের পায়ের নিচে পিষছিলো , বর্বর বাহিনী তাদের তরবারি নিয়ে আপনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো মৃত্যুর ঘাম আপনার কপালে দেখা দিলো এবং আপনার হাত এবং পা ভাঁজ হলো এবং সোজা হলো ডান দিকে ও বা দিকে (অসুবিধা বোধ করার কারণে) আপনি আপনার পরিবার ও ব্যক্তিগত জিনিসগুলোর বিষয়ে আশঙ্কা করছিলেন যখন এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজের ব্যথার কারণে হয়তো আপনি আপনার সন্তান সন্ততি ও পরিবার এর জন্য নাও ভাবতে পারতেন।”
তার জ্ঞান
মনে রাখা দরকার যে , আহলুল বাইত (আ.) এর জ্ঞান আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান এবং তারা অন্যের কাছ থেকে জ্ঞান লাভের মুখাপেক্ষী ছিলেন না। তাদের বর্তমান জ্ঞান অতীতের মতই ছিলো (কোন পরিবর্তন ছাড়া)। যুক্তি-তর্ক , গভীর ভাবনা অথবা অনুমানের কোন প্রয়োজন তাদের হতো না এবং তাদের বুদ্ধিমত্তা মানুষের আয়ত্তের বাইরে। যারা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব গোপন করার চেষ্টা করে তারা হচ্ছে তাদের মত যারা সূর্যের চেহারাকে চাদর দিয়ে ঢাকতে চায়। জেনে রাখা উচিত যে , তারা গোপন বিষয়গুলোকে পরীক্ষা করে দেখেছেন প্রকাশ্য অবস্থায় থেকেই। তারা জ্ঞানের বাস্তবতা বুঝতে পেরেছেন ইবাদতের নির্জনতায় থেকে এবং তারা তাদের সাথী ও বন্ধুদের ধারণার চাইতে অনেক বেশী উন্নত ছিলেন। তারা সাধারণ লাভ অন্বেষণকারী ও তাদের যারা পরীক্ষা করতে চাইতো তাদের সামনে থামতেন না এবং উত্তেজিতও হতেন না অথবা অলসতা দেখাতেন না। তারা তাদের অবস্থায় ও আলোচনায় ছিলেন প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং তাদের যুগে তুলনাবিহীন। বিশেষত্বে ও সম্মানে , শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারা একে অপরের সাথে ছিলেন সম্পূর্ণ একমত। যখন তারা কথা বলার জন্য মুখ খুলতেন অন্যরা চুপ থাকতো। যখন তারা কথা বলতেন অন্যরা (আশ্চর্য হয়ে) তাদের কথা শুনতো। এভাবে কোন প্রচেষ্টাকারী তাদের কাছে (উচ্চস্থানে) পৌঁছাতে পারতো না। (তাদের অতিক্রম করার) লক্ষ্যও পূর্ণ হতো না এবং তাদের নীতি সফলতা লাভ করে নি। তারা এমন গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন যা ছিলো তাদের প্রতি সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে দান এবং সত্যবাদী (রব) ঘোষণা করেছেন যে , তিনি তাদের বিষয়ে সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ঐ পর্যন্ত যে তিনি তাদেরকে প্রমাণ ও যুক্তি-তর্কের ঊর্ধ্বে স্বাধীন করে দিয়েছেন। এ কারণে তারা বলেছেন ,“ আমরা হলাম মানবজাতির অভিভাবক আব্দুল মোত্তালিবের সন্তান।”
তার উদারতা ও দানশীলতা
বর্ণিত হয়েছে যে , একদিন ফাতিমা যাহরা (আ.) তার দুই ছেলে ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.) কে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে নিয়ে গেলেন যিনি খুব অসুস্থ ছিলেন (এবং পরে তিনি এ কারণেই ইন্তেকাল করেন)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে অনুরোধ করলেন তার দুই ছেলেকে (তার গুণাবলী থেকে) কিছু উত্তরাধিকার হিসেবে দিতে। এতে রাসূল (সা.) বললেন ,“ হাসানের জন্য , সে আমার খোদাভীতি ও শ্রেষ্ঠত্ব উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করবে এবং হোসেইন , সে আমার উদারতা ও বীরত্ব উত্তরাধিকার হিসাবে লাভ করবে।”
এটি সুপরিচিত যে , ইমাম হোসেইন (আ.) অতিথিদের আপ্যায়ন ও সেবা করতে ভালোবাসতেন এবং অন্যের আশা পূরণ করতেন এবং আত্মীয়দের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের ও দরিদ্রদের উপহার দিতেন , অভাবীদের দান করতেন , বস্ত্রহীনকে পোষাক দিতেন , ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন , ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করতেন , ইয়াতিমদের স্নেহের সাথে হাত বুলিয়ে দিতেন এবং সাহায্যপ্রার্থীদের সাহায্য করতেন , যখনই তিনি কোন সম্পদ লাভ করতেন তিনি তা অন্যদের মাঝে বন্টন করে দিতেন।
বর্ণিত হয়েছে যে , একবার মুয়াবিয়া মক্কায় গিয়েছিলো এবং সে ইমাম (আ.) কে বেশ কিছু সম্পদ এবং পোষাক উপহার দিলো , কিন্তু তিনি সেগুলো গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। এরকমই ছিলো দানশীল ও উদার ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য এবং প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারীদের চরিত্র। তার ব্যক্তিত্ব তার দয়ালু স্বভাবের স্বাক্ষী বহন করতো এবং তার বক্তব্য তার অতি উন্নত চরিত্র প্রকাশ করতো এবং তার কর্মকাণ্ডতার উন্নত গুণাবলীকে প্রকাশ করতো।
মনে রাখা উচিত যে , দানশীলতার সাথে প্রশস্তহৃদয় ও অতি ক্ষমাশীলতা একমাত্র আহলুল বাইত (আ.) এর মাঝে একত্র হয়েছে , যা অন্যদের মাঝে শুধু ভাসা ভাসা। আর তাই বনি হাশিমের কারো বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ উঠে নি , কিন্তু তাদের দানশীলতাকে মেঘের (বৃষ্টি) সাথে এবং তাদের সাহসিকতাকে সিংহের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) সিরিয়াতে তার একটি খোতবাতে বলেছিলেন:“ আমাদেরকে দেয়া হয়েছে প্রজ্ঞা , সহনশীলতা , দানশীলতা , অতি উন্নত বক্তব্য , সাহসিকতা এবং বিশ্বাসীদের অন্তরে (আমাদের জন্য) ভালোবাসা।”
নিশ্চয়ই তারা উদ্বুদ্ধকারী সমুদ্র এবং বৃষ্টিভরা মেঘমালা। ভালো কাজ সম্পাদন তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। তারা ঐশী আইন কানুনকে পুরোপুরি নিজেদের চরিত্র বানিয়েছেন এবং অধ্যাবসায়ের মাধ্যম করেছেন এবং সম্মানের সর্বোচ্চ স্থানের স্বীকৃতি বানিয়েছেন , কারণ তারা ছিলেন উন্নত পিতার উন্নত সন্তান। তারা ছিলেন জাতির অভিভাবক , জনগণের মাঝ থেকে বাছাইকৃত , আরবদের সর্দার , আদমের সন্তানদের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত , পৃথিবীর মাঝে সার্বভৌম ব্যক্তিত্বগণ , আখেরাতের পথপ্রদর্শক , আল্লাহর দাসদের মাঝে তাঁর প্রমাণ (হুজ্জাত) এবং শহরগুলোতে তাঁর আমানতদার , তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট এবং তাদের মাঝে তা দৃশ্যমান।
অন্যরা তাদের কাছ থেকে (দানশীলতার) শিক্ষা গ্রহণ করেছে এবং তাদের পদ্ধতিগুলো থেকে হেদায়াত লাভ করেছে। কিভাবে তিনি তার সম্পদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করবেন না , যিনি তার পা ফেলেছেন (যুদ্ধক্ষেত্রে তার জীবন কোরবান করার জন্য) , এবং কিভাবে তিনি এ পৃথিবীর বিষয়গুলোকে নীচ বলে ভাববেন না যিনি সাহস (রিয্ক্ব) জড়ো করেছেন পরকালের জন্য। তার বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে প্রস্তুত তার জীবনকে কোরবান করতে যুদ্ধক্ষেত্রে , যে , তিনি তার সম্পদের সাথে কখনো সম্পর্কচ্ছেদ করবেন কিনা। তাহলে সে কিভাবে , যে এ পৃথিবীর আনন্দকে পরিত্যাগ করেছে , এ ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর জিনিসগুলোকে মূল্য দিবে ?
কবি বলেছেন ,“ তিনি নিজের বিষয়ে উদার , যেখানে অতি উদার ব্যক্তিরাও কৃপণ , অথচ নিজ সত্তার উদারতা (আত্মত্যাগ) উদারতার সর্বোচ্চ শিখর।”
তাই বলা হয় যে , উদারতা ও সাহসিকতা এক বুক থেকে দুধ পান করেছে এবং একের সাথে অন্যটি যুক্ত। তাই প্রত্যেক উদার ব্যক্তি সাহসী এবং প্রত্যেক সাহসী ব্যক্তি উদার - এটি সাধারণ প্রকৃতি।
এ বিষয়ে আবু তামাম বলেছে ,“ যখন তুমি আবু ইয়াযীদকে কোন সমাবেশে অথবা যুদ্ধক্ষেত্রে দেখো অথবা দেখো ভাঙচুর করছে তখন তুমি একমত হবে যে উদারতা সাহসিকতার নিকটবর্তী হচ্ছে এবং অতি দানশীলতা বীরত্বের নিকটবর্তী হচ্ছে।”
আবুত তাইয়্যেব বলেছে ,“ তারা বলে অতি দানশীলতা যথেষ্ট নয় , যতক্ষণ পর্যন্তনা সে পথিকের জন্য বাড়ি বানিয়েছে , আমি বলি উদার ব্যক্তির সাহস তাকে কৃপণতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে। হে উদারতা , তুমি একটি ঘূর্ণায়মান স্রোতের মত পরিণত হতে পারো , তার তরবারি তাকে ডুবে যাওয়া থেকে নিরাপত্তা দিয়েছে।”
একবার মুয়াবিয়া বনি হাশিমের প্রশংসা করলো তাদের অতি দানশীলতার জন্য , যুবাইরের সন্তানদেরকে সাহসিকতার জন্য , বনি মাখযুমকে তাদের দাম্ভিকতার জন্য এবং বনি উমাইয়াকে সহনশীলতার জন্য। যখন ইমাম হাসান (আ.) তার এ কথা শুনলেন তখন তিনি বললেন ,“ আল্লাহ তাকে হত্যা করুন! সে চায় যে বনি হাশিম (তার প্রশংসা শুনে) তাদের সম্পদ বিলিয়ে দিক এবং তার ওপরে নির্ভরশীল হয়ে যাক এবং যুবাইরের সন্তানরা (তার প্রশংসায় প্রভাবিত হয়ে) যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হোক এবং বনি মাখযুম যেন নিজেদের নিয়ে অহংকার করে যেন অন্য লোকেরা তাদের অপছন্দ করে এবং যেন বনি উমাইয়া (উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে) ঝুঁকে পড়ে যেন জনগণ তাদেরকে পছন্দ করতে শুরুকরে।”
মুয়াবিয়া সত্য বলেছে , যদিও সত্যবাদিতা তার কাছ থেকে অনেক দূরে , কিন্তু প্রায়ই এমন হয় যে একজন মিথ্যাবাদী (অনিচ্ছাকৃতভাবে) সত্য বলে ফেলে। যখন বনি হাশিমের বিষয়ে , মুয়াবিয়া বলেছে তাদের মাঝে দানশীলতা আছে এবং সাহসিকতা ও মধ্যপন্থা তাদের মাঝে আছে , আর জনগণ তাদেরকে শুধু বাইরের দিকে অনুসরণ করতো। সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে ভালো যেসব গুণাবলী বন্টিত ছিলো সেগুলো তাদের মাঝে এক জায়গায় জমা হয়েছিলো। এটিই ছিলো সত্য এবং বাকী সব মিথ্যা।৩
তার বাগ্মিতা , বিরত থাকা , বিনয় ও ইবাদত
যদি আমরা তার বাগ্মিতা , উন্নত ইবাদত , বিনয় এবং গুণাবলী সম্পর্কে বর্ণনা করতে শুরু করি তাহলে আমরা এ বইয়ের সীমানা অতিক্রম করে ফেলতে পারি। বরং আমরা তার প্রতি রাসূল (সা.) এর ভালোবাসা ও স্নেহ সম্পর্কিত হাদীসগুলো বর্ণনা করবো।
শেইখ মুহাম্মাদ ইবনে শাহর আশোব তার‘ মানাক্বিব’ -এ ইবনে উমর থেকে বর্ণনা করেছেন যে , একদিন রাসূল (সা.) মিম্বরে বসে খোতবা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ (শিশু) ইমাম হোসেইন (আ.) এলেন এবং তার পা তার জামার সাথে পেঁচিয়ে গেলো এবং তিনি পড়ে গেলেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন। পবিত্র রাসূল (সা.) মিম্বর থেকে নেমে তাকে তুলে নিলেন এবং বললেন ,“ আল্লাহ শয়তানকে হত্যা করুন! নিশ্চয়ই সে হৃদয়কাড়া শিশু। তাঁর শপথ , যার হাতে আমার জীবন , আমি জানি না কিভাবে আমি মিম্বর থেকে নেমে এসেছি।”
আবু সাদাত তার‘ মানাক্বিব’ -এ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরিবার (আহলুল বাইত)-এর প্রশংসাকালে ইয়াযীদ বিন যিয়াদ থেকে বর্ণনা করেছেন , যে একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত আয়েশার বাড়ি থেকে বেরিয়ে হযরত ফাতিমা যাহরা (আ.) বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) কে কাঁদতে শুনলেন। তিনি বললেন ,“ হে ফাতিমা , তুমি কি জানো না হোসেইনের কান্না আমাকে অনেক কষ্ট দেয় ?”
ইবনে মাজাহ-এর‘ সুনান’ এবং যামাখশারির‘ ফায়েক্ব’ থেকে‘ মানাক্বিব’ -এ উল্লেখ করা হয়েছে যে , একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং দেখলেন ইমাম হোসেইন (আ.) অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তার হাত দুটো লম্বা করলেন এবং তাকে ধরতে চেষ্টা করলেন , কিন্তু ইমাম হোসেইন (আ.) এদিক ওদিক দৌড়াতে লাগলেন যেন তাকে ধরা না যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) আনন্দ পেলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে ফেললেন। এরপর তিনি তার একটি হাত তার থুতনির নিচে এবং অন্য হাতটি তার মাথায় রাখলেন , এরপর তাকে উঁচু করলেন এবং তাকে চুমু দিয়ে বললেন ,“ হোসেইন আমার থেকে এবং আমি হোসেইন থেকে , আল্লাহ তার সাথে বন্ধুত্ব করেন যে হোসেইনকে ভালোবাসে। নিশ্চয়ই হোসেইন গোত্রগুলোর (বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্রের) একটি।” ৪
‘ মানাক্বিব’ -এ আব্দুর রহমান বিন আবি লাইলা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি বলেছেন: একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সামনে বসা ছিলাম যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এলেন এবং রাসূলের পিঠের উপর লাফ দিয়ে উঠতে লাগলেন এবং খেলতে লাগলেন। রাসূল (সা.) বললেন ,“ তাকে ছেড়ে দাও।”
একই বইতে লাইস বিন সা’ আদ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে ,“ একদিন রাসূল (সা.) জুম’ আর নামাযের ইমামতি করছিলেন। তখন ইমাম হোসেইন (আ.) , যিনি তখন শিশু ছিলেন , তার পাশে বসা ছিলেন। যখন রাসূল (সা.) সিজদায় গেলেন হোসেইন তার পিঠে উঠে বসলেন এবং পায়ে আঘাত করে বললেন ,‘ হিল হিল’ (যে শব্দ করে ঘোড়া ও উটকে জোরে ছুটতে বলা হয়)। রাসূল (সা.) তাকে হাত দিয়ে ধরে নামালেন এবং তাকে পাশে বসিয়ে দিলেন এবং এরপরে উঠে দাঁড়ালেন। এরপর আবার যখন রাসূল (সা.) সিজদা করতে গেলেন তখন আবার তা ঘটলো , যতক্ষণ পর্যন্তনা তিনি নামায শেষ করলেন।”
হাকিমের‘ আমালি’ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , আবু রাফে বলেছেন যে ,“ একদিন আমি‘ মিদহাহ’ ৫ নামে একটি খেলা খেলছিলাম ইমাম হোসেইন (আ.) সাথে , তখন তিনি ছোট শিশু ছিলেন। যখন আমি জিতলাম , তখন আমি তাকে বললাম আমাকে তার পিঠে চড়তে দিতে (যা খেলার নিয়ম ছিলো) , তিনি বললেন যে , আমি কি তার পিঠে চড়তে চাই যে রাসূলের (সা.) পিঠে চড়েছে ? তাই আমি তা মেনে নিলাম। এরপর যখন তিনি জিতলেন আমি বললাম আমিও তাকে আমার পিঠে উঠতে দিবো না যেরকম তিনি করেছেন। কিন্তু তখন তিনি বললেন যে , আমি কি পছন্দ করি না তাকে কোলে নিতে যাকে রাসূল (সা.) কোলে নিয়েছেন ? আমি এখানেও তা মেনে নিলাম।”
একই বইতে ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে হাফস বিন গিয়াসের মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে যে ,“ একদিন রাসূল (সা.) নামায পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার পাশে দাঁড়ানো ছিলেন । রাসূল (সা.) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বললেন কিন্তু ইমাম তা উচ্চারণ করতে পারলেন না। রাসলূ (সা.) তা আবার বললেন কিন্তু ইমাম তা পারলেন না। রাসূল (সা.) তার তাকবীর সাত বার বললেন এবং সপ্তম বার ইমাম হোসেইন (আ.) তা সঠিকভাবে উচ্চারণ করলেন।” ইমাম সাদিক্ব (আ.) বলেন যে , এ জন্য নামায শুরুর আগে সাত বার তাকবীর বলা সুন্নাত।
একই বইতে নাক্কাশের তাফসীর থেকে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা এসেছে যে , তিনি বলেছেন , একদিন আমি রাসূল (সা.) এর সামনে বসা ছিলাম। এ সময় তার ছেলে ইবরাহীম তার বাম উরুর ওপরে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার ডান উরুর ওপরে বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের একজনের পর আরেকজনকে চুমু দিলেন। হঠাৎ জিবরাঈল অবতরণ করলেন ওহী নিয়ে। যখন ওহী প্রকাশ শেষ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন ,“ আমার রবের কাছ থেকে জিবরাঈল এসেছিলো এবং আমাকে জানালো যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে তিনি এ দুই শিশুকে একত্রে থাকতে দিবেন না এবং একজনকে অপরজনের মুক্তিপণ (বিনিময়) করবেন।”
রাসূল (সা.) ইবরাহীমের দিকে তাকালেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন ,“ তার মা একজন দাসী , যদি সে মারা যায় আমি ছাড়া কেউ বেদনা অনুভব করবে না কিন্তু হোসেইন হলো ফাতিমা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর সন্তান এবং আমার রক্ত-মাংস , যদি সে মারা যায় শুধু আলী এবং ফাতিমা নয় আমিও ভীষণ ব্যথা অনুভব করবো। তাই আলী ও ফাতিমার শোকের চাইতে আমি আমার শোককে বেছে নিচ্ছি। তাই হে জিবরাঈল , ইবরাহীমকে মৃত্যুবরণ করতে দাও , কারণ আমি হোসেইনের জন্য তাকে মুক্তিপণ করছি।”
ইবনে আব্বাস বলেছেন যে , তিন দিন পর ইবরাহীম মৃত্যুবরণ করলো। এরপর থেকে যখনই রাসূল (সা.) হোসেইনকে দেখতেন , তিনি তাকে চুমু দিতেন এবং তাকে নিজের দিকে টেনে নিতেন এবং তার ঠোঁটগুলোতে নিজের জিভ বুলাতেন। এরপর তিনি বলতেন ,“ আমার জীবন তার জন্য কোরবান হোক যার মুক্তিপণ হিসাবে আমার ছেলে ইবরাহীমকে দিয়েছি। আমার পিতা- মাতা তোমার জন্য কোরবান হোক , হে আবা আবদিল্লাহ ।”
পরিচ্ছেদ - ২
ইমাম হোসেইন (আ.) এর দুঃখ কষ্টের উপর শোক অনুভব করার ফযীলতের চল্লিশটি হাদীস (রেওয়ায়েত) এবং তার হত্যাকারীদের উপর অভিশাপ দেয়ার জন্য পুরস্কার এবং তার শাহাদাত লাভের উপর ভবিষ্যদ্বাণী।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১
এ বইয়ের লেখক আব্বাস কুম্মি বলেন যে , আমার শিক্ষক হাজ্ব মির্যা হোসেইন নূরী (আল্লাহ তার কবরকে আলোকিত করুন) তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনার পূর্ণ সাধারণ অনুমতিসহ আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন। মির্যা হোসেইন নূরী অনুমতি পেয়েছেন (বর্ণনা করার জন্য) আল্লাহর নিদর্শন (আয়াতুল্লাহ) হাজ্ব শেইখ মুর্তাযা আনসারী (আল্লাহ তাকে তাঁর রহমতের ভিতর ঢেকে দিন) থেকে , যিনি তা পেয়েছেন সম্মানিত অভিভাবক হাজ্ব মোল্লাহ আহমাদ নারাক্বী থেকে , তিনি আমাদের সম্মানিত অভিভাবক সাইয়েদ মাহদী বাহারুল উলুম থেকে , তিনি সর্দারদের সর্দার , আমাদের অভিভাবক আক্বা মুহাম্মাদ বাক্বির বেহবাহানি থেকে যিনি ওয়াহীদ নামে সুপরিচিত , তিনি তার পিতা মোল্লাহ মুহাম্মাদ বাক্বির মাজলিসি ইসফাহানি , তিনি তার পিতা মোল্লাহ মুহাম্মাদ তাক্বী মাজলিসি থেকে , তিনি আমাদের সম্মানিত শেইখ মুহাম্মাদ আমেলি থেকে যিনি বাহাউদ্দীন (শেইখ বাহাই) নামে সুপরিচিত , তিনি তার পিতা শেইখ হোসেইন বিন আব্দুস সামাদ আমেলি হারিসি থেকে , তিনি শেইখ যাইনুদ্দীন (শহীদ আস সানি , দ্বিতীয় শহীদ) থেকে , তিনি শেইখ আলী বিন আব্দুল আলী মীসি থেকে , তিনি শেইখ মুহাম্মাদ বিন দাউদ জাযযিনি থেকে , তিনি আলী বিন মুহাম্মাদ থেকে , তিনি তার পিতা মুহাম্মাদ বিন মাকি (শহীদ আল আউয়াল , প্রথম শহীদ) থেকে , তিনি মুহাম্মাদ বিন আল্লামা হিল্লি থেকে , তিনি তার পিতা আল্লামা হিল্লি থেকে , তিনি জাফর বিন সা’ ঈদ হিল্লি থেকে , তিনি ফাখর বিন মা’ ঈদ মুসাউই থেকে , তিনি ইমাদুদ্দীন তাবারসি থেকে , তিনি আবু আলী (মুফীদ আস সানি , দ্বিতীয় মুফীদ) থেকে , তিনি তার পিতা শেইখ তূসী থেকে , তিনি শেইখ মুফীদ থেকে , তিনি সম্মানিত শেইখ সাদুক্ব থেকে , তিনি মাজেলুইয়া কুম্মি থেকে , তিনি আলী বিন ইবরাহীম কুম্মি থেকে , তিনি তার পিতা ইবরাহীম বিন হাশিম কুম্মি থেকে , তিনি রাইয়ান বিন শাবীব (মোতাসিমের মামা) থেকে , যিনি বলেছেন যে , আমি ইমাম আলী আল রিদা (আ.) এর সাথে মহররমের প্রথম দিন দেখা করতে গেলাম। ইমাম রিদা (আ.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে শাবীবের সন্তান , তুমি কি আজ রোযা অবস্থায় আছো ?” আমি উত্তরে না বললাম। ইমাম বললেন , এ দিন নবী যাকারিয়া (আ.) তার রবের কাছে এভাবে দোআ করেছিলেন:
) رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ(
“ হে আমার রব , আপনার কাছ থেকে আমাকে একটি ভালো সন্তান দিন। নিশ্চয়ই আপনি দোআ শ্রবণকারী।” [সূরা আলে ইমরান: ৩৮]
তখন আল্লাহ তার দোআ কবুল করলেন এবং তাঁর ফেরেশতাদের আদেশ দিলেন তাকে সুসংবাদ দিতে তার সন্তান নবী ইয়াহইয়া (আ.) সম্পর্কে। ফেরেশতারা এলো , তিনি মেহরাবে নামাযরত ছিলেন , তারা তাকে ডাক দিলো। তাই যে ব্যক্তি এই দিনে রোযা রাখে এবং আল্লাহর কাছে তার আশা ভিক্ষা চায় , তার দোআ কবুল হবে যেরকম হয়েছিলো যাকারিয়ার।
এরপর ইমাম (আ.) বললেন ,“ হে শাবীবের সন্তান , মহররম এমন একটি মাস অজ্ঞতার যুগে (ইসলাম পূর্ব) আরবরাও এর পবিত্রতাকে সম্মান করতো এবং অত্যাচার ও রক্তপাত এ মাসে নিষেধ করতো , কিন্তু এ লোকগুলো (উমাইয়া বংশের লোকেরা) এ মাসের পবিত্রতাকে সম্মান করলো না এবং তাদের রাসূলের পবিত্রতাকেও নয়। এ মাসে তারা রাসূলের সন্তানকে হত্যা করলো এবং নারী সদস্যদের কারাগারে নিক্ষেপ করলো তাদের জিনিসপত্র লুট করে নেয়ার পর , নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের এ অপরাধকে কখনো কোন কালে ক্ষমা করবেন না।
হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি কারো ওপরে শোক পালন করতে ও কাঁদতে চাও তাহলে তা কর হোসেইন বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর উপর , কারণ তার মাথাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো একটি ভেড়ার বেলায় যেমন করা হয় ; তার পরিবারের আঠারোজন ব্যক্তিকেও , যারা ছিলো পৃথিবীর বুকে অতুলনীয়। তাদেরকেও তার সাথে হত্যা করা হয়। আকাশগুলো ও পৃথিবীর মাটি হোসেইনের মৃত্যুতে কেঁদেছে। চার হাজার ফেরেশতা আকাশগুলো থেকে নেমে এসেছিলো তাকে সাহায্য করার জন্য , কিন্তু তারা যখন সেখানে পৌঁছালো তারা দেখতে পেলো যে ইতোমধ্যেই তাকে শহীদ করা হয়েছে। এ কারণে তারা সবাই তার পবিত্র কবরের কাছে এখনো রয়ে গেছে ধুলোমাখা অগোছালো চুল নিয়ে , ক্বায়েম (ইমাম মাহদী)-এর উত্থান দিবস পর্যন্ত। তখন তারা সবাই তাকে সাহায্য করবে এবং তাদের শ্লোগান হবে: হোসেইনের রক্তের প্রতিশোধ।
হে শাবীবের সন্তান , আমার পিতা (ইমাম মূসা আল কাযিম) বর্ণনা করেছেন তার পিতা (ইমাম জাফর আস সাদিক্ব) থেকে তিনি তার দাদা (ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন) থেকে যে , যখন আমার দাদা ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হয় , আকাশ রক্ত ও লাল বারি বর্ষণ করেছিলো।
হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি হোসেইন (আ.) এর দুঃখ কষ্টের ওপরে কাদো এবং তা এমনভাবে যে তোমার চোখ থেকে অশ্রু বয় এবং তোমার গাল দুটোর ওপরে পড়ে , আল্লাহ তোমার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন , হোক সেগুলো বড় অথবা ছোট এবং সংখ্যায় কম অথবা অনেক।
হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার মোলাকাত চাও , ঐ অবস্থায় যে তোমার সব গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে গেছো , তাহলে তুমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর কবর যিয়ারতে যাও।
হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি চাও বেহেশতের প্রাসাদগুলোতে রাসূল (সা.) ও তার বংশধরদের সাথে বাস করতে তাহলে ইমাম হোসেইন (আ.) এর হত্যাকারীদের উপর অভিশাপ দাও।
হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি চাও তাদের মত পুরস্কার পেতে যারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে থেকে শহীদ হয়েছে তাহলে যখনই তাকে স্মরণ করবে বলো: হায় যদি আমি তাদের সাথে থাকতাম তাহলে আমি বিরাট বিজয় অর্জন করতাম। হে শাবীবের সন্তান , যদি তুমি চাও বেহেশে ত আমাদের উচ্চমযর্দায় বাস করতে , তাহলে আমাদের দুঃখ ও দুর্দশা নিয়ে দুঃখ করো এবং আমাদের আনন্দে আনন্দ করো এবং আমাদের প্রতি ভালোবাসার সাথে যুক্ত থাকো। কারণ যদি কোন ব্যক্তি এ পৃথিবীতে একটি পাথরের সাথেও যুক্ত থাকে , আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেটির সাথেই তাকে দাঁড় করাবেন।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২
ধারাবাহিক ও পরম্পরাযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্মানিত শেইখ মুহাম্মাদ বিন নো’ মান আল মুফীদ (আল্লাহ তার আত্মাকে আরও পবিত্র করুন) বর্ণনা করেছেন সম্মানিত শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন মুহাম্মাদ ক্বওলাওয়েইহ কুম্মি (আল্লাহ তার কবরকে সুগন্ধিযুক্ত করুন) , তিনি ইবনে ওয়ালীদ থেকে , তিনি সাফফার থেকে , তিনি ইবনে আবুল খাত্তাব থেকে , তিনি মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল থেকে , তিনি সালেহ বিন আক্ববাহ থেকে , তিনি আবু হারুন মাকফূফ থেকে , তিনি বলেছেন যে , একবার আমি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর কাছে গেলাম। ইমাম আমাকে কবিতা আবৃত্তি করতে বললেন , আমি আবৃত্তি শুরু করলাম । তখন ইমাম (আ.) বললেন ,“ এভাবে নয় , যেভাবে তুমি তার (ইমাম হোসেইনের) জন্য আবৃত্তি করো নিজেদের মধ্যে এবং তার কবরের মাথার দিকে (দাঁড়িয়ে)।”
তখন আমি আবৃত্তি করলাম ,“ হোসেইনের কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার পবিত্র হাড়গুলোকে বলো ....।” ইমাম (আ.) কাঁদতে শুরু করলেন এবং তাই আমি চুপ করে গেলাম। ইমাম সাদিক্ব আমাকে আবৃত্তি চালিয়ে যেতে বললেন এবং আরও কিছু আবৃত্তি করতে বললেন , তখন আমি আবৃত্তি করলাম ,‘ হে ফারওয়া , উঠো এবং কাঁদো ও শোক প্রকাশ করো তোমার অভিভাবক হোসেইনের জন্য , একটি সুযোগ দাও ইমাম হোসেইনের লাশের পাশে কান্নাকাটি করার জন্য।” আবু হারুন বলেন যে , ইমাম সাদিক খুব বেশী কাদতে লাগলেন এবং তার ঘরের নারী সদস্যরাও কাঁদতে লাগলেন। যখন তারা চুপ হয়ে গেলেন , ইমাম বললেন ,
“ হে আবু হারুন , যদি কোন ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং তার মাধ্যমে দশ জন লোককে কাঁদায় তাহলে বেহেশত তার জন্য নির্দিষ্ট করা হবে ঐ মুহূর্তেই।”
এরপর ইমাম লোকের সংখ্যা কমাতে লাগলেন এবং যখন একজন পর্যন্ত পৌঁছালেন , বললেন ,“ যদি কোন ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিষয়ে কবিতা আবৃত্তি করে এবং একজন লোককে এর মাধ্যমে কাঁদায় , তাহলে তার জন্য বেহেশত নির্দিষ্ট হয়ে যায় সেই মুহূর্তেই।”
ইমাম আরও বললেন ,“ কোন ব্যক্তি যদি ইমাম হোসেইন (আ.) কে স্মরণ করে এবং তার জন্য কাঁদে , সে বেহেশত পাবে (পুরস্কার হিসাবে)।”
লেখক (আব্বাস কুম্মি) বলেন যে , যে কবিতা আবু হারুন আবৃত্তি করেছিলেন তা রচনা করেছিলেন সাইয়েদ আলী হিমইয়ারি এবং তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন শেইখ ইবনে নিমা।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩
পরম্পরাসম্পন্ন ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শেইখ সাদুক্ব বর্ণনা করেছেন তার ধারাবাহিক ও পরম্পরাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ইবনে আব্বাস থেকে যে , ইমাম আলী (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জিজ্ঞেস করলেন , আক্বীল কি আপনার প্রিয় ? রাসূলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন ,“ হ্যাঁ আল্লাহর শপথ , সে আমার প্রিয় দু’ কারণে। তার প্রথম কারণ হলো আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে পছন্দ করি , দ্বিতীয় কারণ হলো আবু তালিব তাকে ভালোবাসতেন এবং তার সন্তান (মুসলিম) মৃত্যুবরণ করবে তোমার সন্তান (ইমাম হোসেইন)-এর সাথী হয়ে এবং নিশ্চয়ই বিশ্বাসীদের চোখগুলো কাঁদবে (তার শাহাদাতের কারণে) এবং আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতারা তার ওপরে দরুদ পাঠাবে।”
রাসূল (সা.) কাঁদতে লাগলেন এবং তার অশ্রু তার বুকের উপর পড়লো , তিনি বললেন ,“ আমি এ বিষয়ে আল্লাহর কাছেই অভিযোগ করি এর (বেদনা ও কষ্টের) জন্য যা আমার মৃত্যুর পরে আমার বংশধরকে বইতে হবে।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৪
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে সম্মানিত শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ মুসমে কারদীন থেকে বর্ণনা করেন , যিনি বলেছেন , একদিন ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) আমাকে বললেন ,“ হে মুসমে , ইরাকের অধিবাসী হওয়ায় তুমি কি ইমাম হোসেইন (আ.) কবর যিয়ারতে যাও ?”
আমি বললাম ,“ না , কারণ বসরার লোকেরা আমাকে ভালো করে চিনে এবং তারা খলিফার অনুসারী এবং গোত্রগুলোর নাসিবীদের (নবীর আহলুল বাইত বা পরিবারের সাথে যারা শত্রুতা রাখে) মধ্যে থেকে অনেক শত্রু আছে এবং আমাদের চারদিকেও আছে। আমি ভয় করি যে তারা হয়তো আমার বিরুদ্ধে সুলাইমানের (বিন আব্দুল মালিক , আব্বাসীয় খলিফা) সন্তানদের কাছে অভিযোগ করবে , এরপর সে আমাদের উপর অত্যাচার করবে এবং হয়রানি করবে।” তখন ইমাম বললেন ,“ তাহলে ইমাম হোসেইনের উপর যে যুলম করা হয়েছে তা স্মরণ করো।”
আমি সম্মতিসূচক উত্তর দিলাম। ইমাম আবার জিজ্ঞেস করলেন ,“ তুমি কি এ কারণে বিপর্যস্ত হও ?”
আমি বললাম ,“ অবশ্যই , আল্লাহর শপথ এবং এ শোক আমার মধ্যে এমন প্রভাব ফেলে যে আমার পরিবার তা আমার চেহারায় দেখতে পায় এবং আমি খাবারও ছেড়ে দেই এবং এ দুঃখ আমার দুগালে স্পষ্ট হয়ে যায়।” ইমাম সাদিক্ব (আ.) বললেন ,“ আল্লাহ তোমার অশ্রুর ওপরে রহমত করুন , নিশ্চয়ই তুমি তাদের একজন যারা আমাদের শোকে বিপর্যস্তয় হয , যারা আমাদের সমৃদ্ধিতে উল্লসিত হয় এবং আমাদের দুঃখে কাঁদে এবং যারা আমাদের সাথে যুক্ত আছে আমাদের ভয়ের ও শান্তির দিনগুলোতে। সত্য হলো এই যে যখন তুমি মৃত্যুবরণ করবে তখন তুমি আমাদের রহমতপ্রাপ্ত পূর্বপুরুষদের তোমার কাছেই দেখতে পাবে এবং তারা মৃত্যুর ফেরেশতাকে উপদেশ দিবে তোমার বিষয়ে এবং তোমাকে সুসংবাদ দেয়া হবে যা তোমার চোখ দুটোকে আলোকিত করে তুলবে , তখন সে তোমার প্রতি তার চেয়ে বেশী দয়া ও মায়া করবে যতটুকু একজন মা তার সন্তানের প্রতি করে।”
একথা বলে ইমাম কাঁদতে শুরু করলেন এবং আমি নিজেও আমার অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। এরপর তিনি বললেন ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর , যিনি তাঁর রহমতের মাধ্যমে আমাদেরকে তার সব সৃষ্টপ্রাণীর ওপরে স্থান দিয়েছেন এবং আমাদের আহলুল বাইতকে অনুগ্রহ করেছেন তার বরকত দিয়ে। হে মুসমে , নিশ্চয়ই আকাশগুলো এবং পৃথিবী কাঁদছে সেদিন থেকে যেদিন বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) কে শহীদ করা হয়েছে। যে ফেরেশতারা আমাদের জন্য কাঁদে তাদের সংখ্যা অনেক এবং তাদের অশ্রু আমাদের শাহাদাতের সময় থেকে শুকিয়ে যায়নি এবং কেউ নেই যে আমাদের জন্য কাঁদে না। এমন কেউ নেই যে আমাদের জন্য এবং আমাদের দুঃখ-কষ্টের জন্য কাঁদে এবং তার চোখ থেকে অশ্রু তার গালের উপর পড়ে আর তার আগেই আল্লাহ তাঁর দরুদ তার উপর পাঠান না এবং যদি একটি অশ্রু ফোঁটাকে , যা তাদের চোখ থেকে ঝরেছে , ছুঁড়ে দেয়া হয় জাহান্নামের গর্তের ভিতরে তাহলে এর উত্তাপ ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যেন কোন আগুনই সেখানে কখনও ছিলো না। যে ব্যক্তির হৃদয় আমাদের জন্য ব্যথা অনুভব করে , সে তার মৃত্যুর সময়ে আমাদের দেখতে পেয়ে আনন্দ করবে এবং (তার আনন্দ) পুরোপুরি বজায় থাকবে সে সময় পর্যন্ত যখন সে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করবে হাউযে কাউসারে। কাউসার নিজেই পরিতৃপ্ত থাকবে আমাদের বন্ধুদের দেখে এবং তার মুখে এমন সব সুস্বাদু খাবার দেয়া হবে যে সে সেখান থেকে চলে যেতে চাইবে না।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৫
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মি তার ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন বাকর থেকে , যিনি একটি দীর্ঘ হাদীসের বিষয়বস্তুর মধ্যে বর্ণনা করেন যে , আমি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর সাথে হজ্ব পালন করলাম এবং এরপর বললাম ,“ হে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সন্তান , যদি ইমাম হোসেইন বিন আলী (আ.) এর কবর খোলা হয় সেখানে কী পাওয়া যাবে ?” ইমাম বললেন ,“ হে বাকরের সন্তান , তুমি কত বড়ই না এক প্রশ্ন করেছো। নিশ্চয়ই ইমাম হোসেইন বিন আলী (আ.) তার পিতা , মাতা ও ভাইয়ের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে আছেন এবং তিনি খাদ্য গ্রহণ করেন (নেয়ামতগুলো থেকে) তাদের সবার সাথে এবং তিনি আরশের ডান পাশে আছেন এবং তাদের সাথে যুক্ত আছেন এবং তিনি বলেন , হে আল্লাহ , আপনি তা পূরণ করুন যে প্রতিশ্রুতি আপনি আমাকে দিয়েছেন। এরপর তিনি তার কবরে আসা যিয়ারতকারীদের নাম এবং তাদের পিতার নামের দিকে তাকান এবং তিনি জানেন তারা তাদের মালপত্রের ভিতরে যা এনেছে , তারা তাদের সন্তানদের যেভাবে চিনে তার চাইতে বেশী এবং তিনি তাদের দিকে তাকান যারা তার দুঃখ-কষ্ট স্মরণ করে কাঁদে এবং তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করেন তাদের সন্তুষ্টি ও আত্মনির্ভরশীলতার জন্য। এরপর তিনি বলেন , হে , যে আমার জন্য কাঁদছো , যদি তোমাকে জানানো হতো কী পুরস্কার ও নেয়ামত তোমার জন্য আল্লাহ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন (তোমার শোক পালনের কারণে) , তাহলে তুমি শোকার্ত হওয়ার চাইতে আনন্দিত হতে। এরপর তিনি তাদের সব গুনাহ ও ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৬
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সম্মানিত শেইখ ও হাদীসবেত্তাদের সর্দার মুহাম্মাদ বিন আলী বাবাওয়েইহ কুম্মি থেকে এবং তিনি তার বর্ণনাকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন ইমাম আলী আল রিদা (আ.) থেকে যে ,“ যে আমাদের দুঃখসমূহ স্মরণ করে এবং আমাদের উপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তার জন্য কাঁদে , সে কিয়ামতের দিন আমাদের মর্যাদায় আমাদের সাথে থাকবে এবং যে আমাদের দুঃখসমূহ স্মরণ করে এবং এ জন্য কাঁদে এবং অন্যদের কাঁদায় , তাহলে তার চোখগুলো সেদিন কাঁদবে না যেদিন সব চোখগুলো কাঁদবে এবং যে এ ধরনের সমাবেশে বসে যেখানে আমাদের বিষয়গুলো আলোচিত হয় তাহলে সেদিন তার হৃদয় মরে যাবে না যেদিন সব হৃদয় ধ্বংস হয়ে যাবে।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৭
আমার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা শেইখুত তাইফা আবু জাফর তূসী পর্যন্ত পৌঁছেছে , তিনি বর্ণনা করেছেন শেইখ মুফীদ থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন ইবনে ক্বাওলাওয়েইহ থেকে , তিনি তার পিতা থেকে , তিনি সা’ আদ থেকে , তিনি বারক্বি থেকে , তিনি সুলাইমান বিন মুসলিম কিনদি থেকে , তিনি ইবনে গাযাওয়ান থেকে , তিনি ঈসা বিন আবি মানসূর থেকে , তিনি আবান বিন তাগলিব থেকে , তিনি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে যে , তিনি বলেছেন ,“ আমাদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তার কারণে যে শোকার্ত , তার দীর্ঘশ্বাস হলো তাসবীহ এবং আমাদের বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা হলো ইবাদত এবং আমাদের রহস্যগুলো গোপন রাখা আল্লাহর পথে জিহাদের পুরস্কার বহন করে।”
এরপর তিনি বললেন ,“ নিশ্চয়ই এ হাদীসটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিত।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৮
ফক্বীহ শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ বর্ণনা করেন ইবনে খারেজা থেকে যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) বলেছেন ,“ আমি হলাম দুঃখের শহীদ এবং আমাকে বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে এবং যে আমার কবর যিয়ারত করতে আসবে দুঃখ ভারাক্রন্ত হয়ে - এটি আল্লাহর উপর (দায়িত্ব) যে তাকে তার পরিবারে কাছে ফেরত পাঠাবেন , সন্তুষ্ট অবস্থায়।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৯
শেইখ আত তাইফা তূসি থেকে বর্ণিত , আবু আমর উসমান দাক্কাক থেকে ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , তিনি জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন মালিক থেকে , তিনি আহমাদ বিন ইয়াহইয়া আযদি থেকে , তিনি মাখূল বিন ইবরাহীম থেকে , তিনি রাবি বিন মনযির থেকে , তিনি তার পিতা থেকে , তিনি ইমাম হোসেইন বিন আলী (আ.) থেকে যে , তিনি বলেছেন ,“ আল্লাহর এমন কোন বান্দাহ নেই যে অশ্রু ফেলে এবং তার চোখগুলো ভিজে যায় আর আল্লাহ তাকে একটি (দীর্ঘ) সময়ের জন্য বেহেশতে রাখবেন না।”
আহমাদ বিন ইয়াহইয়া আযদি বলেন যে , একদিন আমি ইমাম হোসেইন (আ.) কে স্বপ্নে দেখলাম এবং তার কাছে জিজ্ঞেস করলাম এ হাদীসটির সত্যতা সম্পর্কে এবং ইমাম উত্তর দিলেন যে , তা সত্য।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১০
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ বর্ণনা করেছেন এবং তিনি তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন আবু আম্মারাহ থেকে , যিনি কারবালার শোকগাঁথা গাইতেন যে , একদিন ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর সামনে ইমাম হোসেইন (আ.) এর নাম নেয়া হলো এবং তিনি রাত পর্যন্ত মুচকি হাসিও হাসলেন না এবং তিনি সব সময় বলতেন ,“ হোসেইন হলো বিশ্বাসীদের কান্নার মাধ্যম।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১১
আমার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা যুক্ত হয়েছে সম্মানিত শেইখ আলী বিন ইবরাহীম কুম্মি এর সাথে , তিনি বর্ণনা করেছেন তার পিতা থেকে , তিনি ইবনে মাহবুব থেকে , তিনি আলা’ থেকে , তিনি মুহাম্মাদ থেকে , তিনি ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) থেকে , যিনি বলেছেন , ইমাম আলী বিন হোসেইন যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন ,“ যদি কোন বিশ্বাসী ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের বিষয়ে কাঁদে এবং তার চোখ থেকে অশ্রু বয় এবং তার গাল দুটোর ওপরে পড়ে , তাহলে আল্লাহ তাকে বেহেশতের প্রাসাদগুলোতে বাস করতে দিবেন , যেখানে সে দীর্ঘ একটি সময়ের জন্য বাস করবে। আর যদি আমাদের উপর যে নিপীড়ন ও নির্যাতন আমাদের শত্রুরা করেছে সে জন্যে একজন বিশ্বাসীর চোখ থেকে অশ্রু বয় (দুঃখে) এবং তার গালের উপর পড়ে , তাহলে আল্লাহ তাকে বেহেশতে একটি আসন উপহার দিবেন এবং যে বিশ্বাসী আমাদের কারণে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে এবং তার অশ্রু তার গালে ঝরে , তাহলে আল্লাহ তার দুঃখকে তার চেহারা থেকে দূর করে দিবেন এবং কিয়ামতের দিন তিনি তাকে তাঁর ক্রোধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন এবং তাকে (জাহান্নামের) আগুন থেকে রক্ষা করবেন।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১২
ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , শেইখ সাদুক্ব মুহাম্মাদ বিন আলী বিন বাবাওয়েইহ কুম্মি বর্ণনা করেছেন তার পিতা থেকে (ইবনে বাবওয়েইহ আউয়াল) , তিনি কুম্মিদের অভিভাবক আব্দুল্লাহ বিন জাফর হুমাইরি থেকে , তিনি আহমাদ বিন ইসহাক্ব বিন সা’ আদ থেকে , তিনি বাকর বিন মুহাম্মাদ আযদি থেকে যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) একবার ফুযাইলকে বললেন যে ,“ তোমরা যখন পরস্পরের সাথে বসো তোমরা কি আমাদের হাদীসগুলো আলোচনা করো ?”
ফুযাইল বললেন ,“ জ্বী , অবশ্যই আমরা তা করি , আমি যেন আপনার জন্য কোরবান হই।” ইমাম বললেন ,“ যে আমাদের হাদীসগুলো স্মরণ করে অথবা যার উপস্থিতিতে আমাদেরকে নিয়ে আলোচনা হয় এবং একটি মাছির পাখার সমান অশ্রুফোঁটাও তার চোখ থেকে বয় , আল্লাহ তার সব গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন , যদি তা নদীর ফেনার সংখ্যার সমানও হয়।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৩
আমার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে সম্মানিত শেইখ , হাদীসবেত্তাদের উস্তাদ মুহাম্মাদ বিন আলী বিন বাবাওয়েইহ কুম্মি (শেইখ সাদুক্ব) থেকে , তিনি আবি আম্মারাহ (শোকগাথাঁর আবৃত্তিকারক ও গায়ক) থেকে যে , তিনি বলেছেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) আমাকে বলেছেন ,“ হে আবু আম্মারাহ , যে ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং পঞ্চাশ জনকে কাঁদায় তার পুরস্কার হলো বেহেশত এবং যে ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং ত্রিশ জনকে কাঁদায় তার পুরস্কার হলো বেহেশত এবং যে ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং বিশ জনকে কাঁদায় তার পুরস্কার হলো বেহেশত এবং যে ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং দশ জনকে কাঁদায় তার পুরস্কার হলো বেহেশত এবং যখন কোন ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং একজনকে কাঁদায় তার পুরস্কার হলো বেহেশত। যখন কোন ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং নিজে কাঁদে , তার পুরস্কার হলো বেহেশত এবং যে-ই ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য কবিতা আবৃত্তি করে এবং শোকাভিভূত হয় তার পুরস্কার হলো বেহেশত।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৪
ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মি পর্যন্ত পৌঁছেছে , তিনি বর্ণনা করেছেন হারুন বিন মূসা তালউকবারি থেকে , তিনি উমার বিন আব্দুল আযীয কাশশি থেকে , তিনি উমার বিন সাবাহ থেকে , তিনি ইবনে ঈসা থেকে , তিনি ইয়াহইয়া বিন ইমরান থেকে , তিনি মুহাম্মাদ বিন সিনান থেকে , তিনি যাইদ বিন শিহাম থেকে , তিনি বলেন যে , আমি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর সামনে কুফা থেকে আসা একদল ব্যক্তির সাথে বসা ছিলাম , যখন জাফর বিন আফফান প্রবেশ করলেন। ইমাম তাকে স্বাগত জানালেন এবং তাকে নিজের কাছে বসার জন্য ইশারা করলেন এবং বললেন ,“ হে জাফর।”
তিনি বললেন ,“ আমি উপস্থিত (আপনার খেদমতে) , আমি যেন আপনার জন্য কোরবান হই।” ইমাম বললেন ,“ আমি শুনেছি যে তুমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য শোকগাথা গাও এবং তা তুমি খুব ভালোই কর।”
তিনি বললেন ,“ জ্বী , আমি যেন আপনার জন্য কোরবান হই।”
তিনি আবৃত্তি করলেন এবং ইমাম কাঁদতে শুরু করলেন এবং যারা সেখানে উপস্থিত ছিলো তারাও সবাই কাঁদতে শুরু করলো , ঐ পর্যন্ত যখন ইমামের দাড়ি চোখের পানিতে ভিজে গেলো। তখন তিনি বললেন ,“ হে জাফর , আল্লাহর শপথ , আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতারা এখানে অবতরণ করেছে এবং তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য তোমার কবিতা শুনেছে এবং আমাদের মত কেঁদেছে বরং আরও বেশী কেঁদেছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ তোমার জন্য এই মুহূর্তে বেহেশত প্রস্তুত রেখেছেন এবং তোমার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিয়েছেন। হে জাফর , তুমি কি আরও কিছু শুনতে চাও” ?
জাফর হ্যাঁ সূচক উত্তর দিলেন এবং ইমাম বললেন ,“ এমন কেউ নেই যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য শোকগাঁথা আবৃত্তি করে এবং অন্যদের কাদানোর পাশাপাশি নিজে কাদে যার জন্য আল্লাহ বেহেশত বাধ্যতামূলক করেন না এবং তাকে ক্ষমা করেন না।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৫
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , শেইখ সাদুক্ব বর্ণনা করেন ইবনে মাসরুর থেকে , তিনি ইবনে আমির থেকে , তিনি তার চাচা থেকে , তিনি ইবরাহীম বিন আবি মাহমূদ থেকে , যিনি বলেন যে , ইমাম আলী আল রিদা (আ.) বলেছেন ,“ মহররম একটি মাস যে সময়ে ইসলামপূর্ব মূর্তিপূজক আরবরা রক্তপাত করাকে অন্যায় মনে করতো , কিন্তু আমাদের রক্ত ঝরানো হয়েছে এ মাসে। আমাদের পবিত্রতা লঙ্ঘন করা হয়েছে এবং শিশু ও নারী সদস্যদের বন্দী করা হয়েছিলো। আমাদের তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো এবং সেখানে যা পাওয়া গেছে তাই লুট করা হয়েছিলো এবং তারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্ককেও সম্মান করে নি। যেদিন ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হয়েছে সেদিন আমাদের চোখকে আহত করা হয়েছিলো এবং তখন থেকে অবিরাম আমাদের অশ্রু বইছে। দুঃখ ও পরীক্ষা (কারব ও বালা)-এর ময়দানে আমাদের প্রিয়জনদের অসম্মান করা হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত দুঃখ ও দুর্দশার জন্য পথ করে দিয়েছে। তাই শোকার্ত মানুষের উচিত এর (ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের) উপর শোক পালন করা , কারণ এ বিষয়ে কান্না কবিরা গুনাহগুলোকে ক্ষমা করে দেয়।”
এরপর তিনি বললেন ,“ যখন মহররম মাস আসতো , আমার পিতাকে (ইমাম মূসা আল কাযিমকে) কেউ হাসতে দেখতো না দশ তারিখ পর্যন্তএবং তার উপর শোক নেমে আসতো এবং দশম দিন হতো দুঃখ ও শোক এবং বিলাপের দিন এবং তিনি বলতেন: আজ হলো সেই দিন যেদিন ইমাম হোসেইনকে (আ.) অনেকে মিলে হত্যা করেছিলো।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৬
আমার পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা শেইখ সাদুক্ব পর্যন্তপৌঁছেছে , তিনি বর্ণনা করেছেন তালক্বানি থেকে , তিনি আহমাদ হামাদানি থেকে , তিনি আলী বিন হাসান বিন ফাযযাল থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন তার পিতা থেকে যে ইমাম আলী আল রিদা (আ.) বলেছেন ,“ যে ব্যক্তি দশ মহররমের দিনে তারথিপ বীর বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেয়া এড়িয়ে যায় আল্লাহ এ পৃথিবীর ও আখেরাতের বিষয়ে তার আশা আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করবেন। যে এ দিনটিকে শোক পালন , দুঃখ এবং কাঁদার জন্য গ্রহণ করবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিয়ামতের দিনটিকে তার জন্য আনন্দ উল্লাসের দিন বানিয়ে দিবেন এবং আমাদের কারণে বেহেশতে তার চোখ দুটোকে প্রশান্তিময় করে দেয়া হবে , আর যে দশ মুহাররমকে সমৃদ্ধির দিন হিসাবে গণ্য করবে এবং তার ঘরের জন্য (কল্যাণ মনে করে) কিছু কিনবে , তাহলে আল্লাহ তাকে সে বিষয়ে কোন সমৃদ্ধি দান করবেন না এবং কিয়ামতের দিন তাকে উঠানো হবে ইয়াযীদ , উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ ও উমার ইবনে সা’ আদ (তাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ হোক)-এর সাথে এবং জাহান্নামের সবচেয়ে গভীর গর্তে ফেলা হবে।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৭
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , শেইখ সাদুক্ব বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছ থেকে যে , তিনি বলেছেন , নবী মূসা বিন ইমরান (আ.) আল্লাহর কাছে দোআ করেছিলেন এবং বলেছিলেন ,“ হে আমার রব , আমার ভাই মৃত্যুবরণ করেছে , তাই তাকে ক্ষমা করে দিন” । তার কাছে ওহী আসলো ,“ হে মূসা , তুমি যদি চাও , আমি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব মানুষকে ক্ষমা করে দিবো শুধু হোসেইনের হত্যাকারীদের ছাড়া , কারণ অবশ্যই আমি তাদের উপর প্রতিশোধ নিবো।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৮
আমার পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা যুক্ত হয়েছে সম্মানিত শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মির সাথে , যিনি বর্ণনা করেছেন তার ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষসমূহের মাধ্যমে যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন ,“ নবী ইয়াহইয়া (আ.) এবং ইমাম হোসেইন (আ.) দুজনেরই হত্যাকারীরা ছিলো জারজ। আকাশগুলো কখনো কাঁদে নি শুধুমাত্র এ দুজনের শাহাদাতের কারণে ছাড়া।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ১৯
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , সম্মানিত শেইখ জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ বর্ণনার্ করেছেন তার ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষসমূহের মাধ্যমে দাউদ রাকী থেকে , যিনি বলেন যে , একদিন আমি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর সামনে উপস্থিত ছিলাম যখন তিনি পানি চাইলেন পান করার জন্য । যখন তিনি পান করলেন , তিনি শোকাভিভূত হয়ে পড়লেন এবং তার চোখদুটো অশ্রুপূর্ণ হয়ে গেলো। তিনি বললেন ,“ হে দাউদ , আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক ইমাম হোসেইন (আ.) এর হত্যাকারীদের উপর। কোন বান্দাহ (আল্লাহর) নেই যে পানি পান করে এবং হোসেইনকে স্মরণ করে এবং তার শত্রুদের উপর অভিশাপ দেয় আর আল্লাহ তার খাতায় এক লক্ষ নেক কাজ লিপিবদ্ধ করেন না এবং তার এক লক্ষ গুনাহ ক্ষমা করেন না এবং এক লক্ষ বার তার মর্যাদার আসনকে ওপরে উঠান না। তা যেন এমন যে সে এক লক্ষ দাসকে মুক্তি দিয়েছে এবং কিয়ামতের দিন সে পিপাসামুক্ত পূর্ণ তৃপ্ত হিসাবে উঠে দাঁড়াবে।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২০
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , সম্মানিত শেইখ আবিরল কাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ বর্ণনা করেন সম্মানিত শেইখ , ইসলামের বিশ্বস্ত (কর্তৃপক্ষ) মুহাম্মাদ বিন ইয়াক্বুব কুলেইনি থেকে , তিনি বর্ণনা করেন তার ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষসমূহের মাধ্যমে দাউদ বিন ফারক্বাদ থেকে , তিনি বলেন যে , আমি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর বাড়িতে বসেছিলাম , তখন আমরা একটি কবুতরকে (যার নাম ছিলো যাগাবি) গুম গুম আওয়াজ করতে শুনলাম , ইমাম আমার দিকে ফিরলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে দাউদ , তুমি কি জানো এ পাখিটি কী বলছে ?” আমি না-সূচক উত্তর দিলাম। তিনি বললেন ,“ এটি ইমাম হোসেইনের (আ.) হত্যাকারীদের অভিশাপ দেয় , তাই এ ধরনের কবুতরকে তোমাদের বাড়িগুলোতে পালন করো।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২১
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে , সুবিখ্যাত পণ্ডিত আয়াতুল্লাহ (আল্লাহর নিদর্শন) আল্লামা হিল্লি বর্ণনা করেছেন তদন্তকারীদের মধ্যে সার্বভৌম খাজা নাসিরুদ্দীন মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ তূসি থেকে , তিনি বিজ্ঞ শেইখ এবং হাদীস বিশারদ বুরহান মুহাম্মাদ বিন আলী হামাদানি ক্বাযভিনি (যিনি রেইশহরে বাস করতেন) থেকে , তিনি সম্মানিত শেইখ মুনতাজাবুদ্দিন আলী বিন উবায়দুল্লাহ বিন হাসান কুম্মি থেকে , তিনি তার পিতা থেকে , তিনি তার পিতার পিতা থেকে , তিনি সম্মানিত শেইখ আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ বিন আলী বিন উসমান কারাজাকি থেকে , তিনি মুহাম্মাদ বিন আব্বাস থেকে , তিনি তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে হাসান বিন মাহবুব থেকে , তিনি তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে সানদুল থেকে , তিনি দারিম বিন ফিরক্বাদ থেকে , তিনি বলেছেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন ,“ তোমাদের ফজরের ওয়াজিব (বাধ্যতামূলক) এবং নফল (অতিরিক্ত) নামাযে সূরা আল ফজর তেলাওয়াত করো , কারণ তা বিশেষভাবে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে সম্পর্কিত। তোমরা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কথা এ আয়াতে শোন নি: হে পূর্ণ প্রশান্ত আত্মা , তোমার রবের কাছে ফিরে আসো , পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে (তাঁর প্রতি) , (তাঁকে) পূর্ণ সন্তুষ্ট করে।”
এখানে ইমাম হোসেইন (আ.) কে সম্বোধন করা হয়েছে এ বলে যে , হে পূর্ণ প্রশান্ত আত্মা , পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে (আল্লাহর প্রতি) এবং তিনি তার প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্ট হওয়ার পর।
নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে থেকে যারা তার সাথী তারাই হলেন যারা কিয়ামতের দিনে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবেন এবং আল্লাহও তাদের প্রতি সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট থাকবেন। নিশ্চয়ই এ সূরাটি বিশেষ করে ইমাম হোসেইন (আ.) ও নবী পরিবারের যে সদস্যরা তার সাহাবী ছিলেন তাদের সাথে সম্পর্কিত। যে ব্যক্তি এ সূরাটি প্রতিদিন তেলাওয়াত করে সে বেহেশতে ইমাম হোসেইনের সাথে এবং তার উচ্চ মাকামে থাকবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ একমাত্র ক্ষমতাধর ও সর্বপ্রজ্ঞাবান।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২২
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে সম্মানিত ও সফলতা লাভকারী শেইখ আবু জাফর তূসী তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে মুহাম্মাদ বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেন যে , আমি ইমাম বাক্বির (আ.) এবং ইমাম জাফর আস সাদিক্বকে (আ.) বলতে শুনেছি যে ,“ নিশ্চয়ই শাহাদাতের পুরস্কার ও ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহ ইমামতকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর বংশধরের মধ্যে রেখেছেন , তার কবরের মাটিতে আরোগ্য রয়েছে , তার কবরের মাথার দিকে আশা পূরণ হয় এবং যিয়ারতকারী তার কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার সময় থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত (তার কাছ থেকে) কোন হিসাব নেয়া হবে না।”
ইমাম সাদিক্ব (আ.) কে মুহাম্মাদ বিন মুসলিম জিজ্ঞেস করেছিলেন ,“ এ পুরস্কারগুলো (মানুষের জন্য) ইমামের কারণে , কিন্তু তার জন্য পুরস্কার কী ?”
ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে মিলিত করেছেন এবং রাসূলুল্লাহর সাথেই আছেন , তার মর্যাদায় ও তার মাক্বামে।”
এরপর তিনি কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন ,
) وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُم(
“ এবং যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে যারা বিশ্বাসে তাদের অনুসরণ করে , আমরা তাদেরকে তাদের সন্তানদের সাথে মিলিত করবো।” [সূরা তুর: ২১]
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৩
পরম্পরাসহ ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষসমূহের মাধ্যমে , সম্মানিত শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন সাঈদ (মুহাক্কিক হিল্লি) বর্ণনা করেছেন সম্মানিত সাইয়েদ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন যুহরা হোসেইনি হালাবি (তার কবর সুগন্ধিযুক্ত হোক) থেকে , তিনি বিজ্ঞ হাদীসবেত্তা , জাতির ও ধর্মের সঠিক পথপ্রদর্শক মুহাম্মাদ বিন আলী বিন শাহর আশোব সারাউই থেকে , তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন সম্মানিত শেইখ আহমাদ বিন আবু তালিব তাবারসির কিতাব‘ ইহতিজাজ’ -এর একটি দীর্ঘ হাদীস থেকে যা সা’ আদ বিন আব্দুল্লাহ আশ’ আরির সাথে ইমাম আল মাহদী (আল্লাহ তার আগমন ত্বরান্বিত করুন)-এর সাক্ষাৎ সম্পর্কে , যেখানে সা’ আদ ইমাম আল মাহদী (আ.) কে সূরা আল মারইয়ামের , কাফ , হা , ইয়া , আইন , সোয়াদ-এর অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ইমাম বলেছিলেন , এই শব্দগুলো হল গোপন সাংকেতিক চিহ্ন যে সম্পর্কে আল্লাহা তার বান্দাহ নবী যাকারিয়া (আ.) কে জানিয়েছিলেন এবং এ সম্পর্কে নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর কাছে ওহী এসেছিলো। ঘটনাটি ছিলো এরকম: নবী যাকারিয়া (আ.) তার রবকে অনুরোধ করেছিলেন পবিত্র পাঁচ জনের নাম শিক্ষা দিতে , এতে জিরবাঈল অবতরণ করলেন এবং তাকে পাঁচ জনের নাম শিক্ষা দিলেন। যখন নবী যাকারিয়া (আ.) চার জনের নাম মুহাম্মাদ (সা.) , আলী (আ.) , ফাতিমা (আ.) , এবং হাসান (আ.) এর নাম বলতেন তখন তার অন্তর আলোকিত হয়ে উঠতো এবং তার দুঃখ দূর হয়ে যেতো কিন্তু যখন তিনি হোসেইন (আ.) এর নাম নিতেন তখন তিনি দুঃখ পূর্ণ হয়ে যেতেন এবং অস্থির হয়ে উঠতেন। একদিন তিনি সর্বশক্তিমান আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে আমার রব , যখন আমি এ চার জন পবিত্র ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করি আমার দুঃখ দূর হয়ে যায় , কিন্তু যখন হোসেইনের নাম নেই , আমি শোকাভিভূত হয়ে যাই , কাঁদি ও বিলাপ করি।” তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার কাছে ওহী পাঠালেন‘ কাফ , হা , ইয়া , আইন ও সোয়াদ’ সম্পর্কে। (কাফ)-এ কারবালা , এবং (হা)-তে হালাকাত (ধ্বংস) নবী বংশের ধ্বংস , (আইন)-এ আতাশ বা পিপাসা এবং (সোয়াদ)-এ সবর যা হলো হোসেইনের ধৈর্য ও সহনশীলতা। যখন নবী যাকারিয়া তা শুনলেন তিনি এতো শোকার্ত হলেন যে তিন দিন পর্যন্ত তার ইবাদতখানা থেকে বের হতে অস্বীকার করলেন এবং কোন ব্যক্তিকে অনুমতি দিলেন না তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং নিদারুণ শোকাভিভূত হয়ে রইলেন এবং অনেক কাঁদলেন এবং তিনি এ শোকগাঁথাটি আবৃত্তি করলেন ,“ হে আমার রব , তুমি কি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে তার সন্তানের দুঃখ-কষ্ট দেখতে দিবে ? হে আমার রব , তুমি কি আলী ও ফাতিমাকে শোকের পোষাক পরাবে এবং তারা কি এ মহাবিপর্যয় প্রত্যক্ষ করবে ?” তিনি (নবী যাকারিয়া) সব সময় বলতেন ,“ হে আমার রব , আমাকে এমন একটি সন্তান দান করো যে আমার বৃদ্ধ বয়সে আমার চোখের আলো হবে এবং যখন তুমি আমাকে একটি সন্তান দিবে তখন তার প্রতি আমার প্রচণ্ড ভালোবাসা সৃষ্টি করো এবং এরপর আমাকে তাকে হারানোর শোক অনুভব করতে দিও যেমন অনুভব করবেন তোমার হাবীব মুহাম্মাদ (সা.) , যিনি তার সন্তানের মৃত্যুতে শোকাভিভূত হবেন।” এরপর আল্লাহ নবী যাকারিয়া (আ.) কে একটি সন্তান ইয়াহইয়া (আ.) কে দান করলেন , যার শাহাদাতে নবী যাকারিয়া শোক পালন করলেন। নবী ইয়াহইয়া (আ.) এর (মায়ের) গর্ভকালীন মেয়াদ ছিলো ছয় মাস , ঠিক যেমনটি ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর বেলায়।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৪
ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষসমূহের মাধ্যমে যা পৌঁছেছে ইসলামের স্তম্ভ শেইখ সাদুক্ব পর্যন্ত , যিনি তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে আবিল জারুদ থেকে বর্ণনা করেছেন , তিনি বলেছেন , ইমাম মুহাম্মাদ বাক্বির (আ.) বলেছেন যে , একদিন পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) তার স্ত্রী , মুমিনদের মাতা , উম্মে সালামা (আ.) এর ঘরে ছিলেন এবং তিনি তাকে বললেন তিনি যেন তার সাথে কাউকে সাক্ষাৎ করতে অনুমতি না দেন। ইমাম হোসেইন (আ.) , যিনি সে সময়ে শিশু ছিলেন , সেখানে প্রবেশ করলেন এবং ছুটে নবীর কাছে গেলেন। উম্মে সালামা (আ.) তাকে অনুসরণ করলেন এবং দেখলেন ইমাম হোসেইন নবীর বুকের ওপর বসে আছেন আর নবী কাঁদছেন। তার হাতে কিছু একটা ছিল যেটার উপর দিককে তিনি নিচের দিকে রেখেছিলেন। এরপর তিনি বললেন ,“ হে উম্মে সালামা , জিবরাঈল আমার কাছে এলো এবং আমাকে সংবাদ দিলো যে আমার হোসেইনকে শহীদ করা হবে এবং এ মাটি হলো তার শাহাদাতের স্থান। এটি তোমার কাছে সংরক্ষণ করে রাখো , আর যেদিন এ মাটি রক্তে পরিণত হয়ে যাবে , জানবে যে হোসেইনকে শহীদ করা হয়েছে।”
উম্মে সালামা বললেন ,“ হে আল্লাহর নবী , আল্লাহর কাছে দোআ করেন যেন হোসেইন এ মুসিবত থেকে রক্ষা পায়।”
নবী জাবাব দিলেন ,“ হ্যাঁ , আমি এর জন্য আল্লাহর কাছে দোআ করেছিলাম , কিন্তু আমার কাছে আল্লাহ ওহী পাঠিয়েছেন এবং প্রকাশ করেছেন যে তার শাহাদাতের মাধ্যমে তাকে একটি মর্যাদায় ভূষিত করা হবে যার কাছাকাছি যাওয়া অন্য কারো জন্য সম্ভব হবে না। আর তার থাকবে এমন শিয়া (অনুসারী) যারা (কিয়ামতের দিনে) শাফায়াত করতে পারবে এবং তাদের শাফায়াত (সুপারিশ) গ্রহণ করা হবে এবং মাহদী হবে তার বংশ থেকে। তাই কতই না ভালো তাদের জন্য যারা হোসেইনের সাথে বন্ধুত্ব করবে এবং তার অনুসারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে কারণ অবশ্যই কিয়ামতের দিন তারা সফলকাম হবে।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৫
শেইখ সাদুক্ব , যার কাছে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর ধারা পৌঁছেছে , তিনি ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনাকারীদের ধারার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি (কোরআনের এ আয়াত সম্পর্কে) বলেছেন ,
) وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولًا نَبِيًّا(
“ এবং কিতাবে ইসমাঈলের স্মরণ কর , নিশ্চয়ই সে (তার) প্রতিশ্রুতিতে সত্যবাদী ছিলো এবং সে ছিলো একজন রাসূল , একজন নবী। ” [সূরা মারইয়াম: ৫৪]
আল্লাহ কিতাবে যে ইসমাঈলের উল্লেখ করেছেন তিনি নবী ইবরাহীম (আ.) এর ছেলে নবী ইসমাঈল (আ.) নন , তিনি আল্লাহর নবীদের মধ্যে অন্য আরেকজন নবী। তিনি তার জাতি থেকে আল্লাহর বাছাইকৃত ছিলেন , তারা তাকে এমন নির্যাতন করেছিলো যে তার মাথা ও মুখের চামড়া তুলে ফেলেছিলো। একজন ফেরেশতা তার ওপর নাযিল হয়েছিলো এবং বলেছিলো ,“ মহিমান্বিত আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আপনার মন যা চায় তা আপনি চাইতে পারেন। ” জবাবে নবী বলেছিলেন ,“ হোসাইনের ওপর যা ঘটানো হবে তার জন্য আমি ব্যথিত। ”
হাদীস ( রেওয়ায়েত )নং :২৬
শেইখুত তাইফা (তূসী) , যার কাছে আমার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি পবিত্র নবী (সা.) এর স্ত্রী যায়নাব বিনতে জাহাশ থেকে বর্ণনাকারীদের ধারায় বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেছেন , একদিন নবী (সা.) আমার ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন , তখন ইমাম হোসেইন (আ.) সেখানে প্রবেশ করলেন। আমি তাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলাম যেন তিনি নবীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে না ফেলেন। এরপর আমি কাজে মগ্ন হয়ে গেলাম এবং যেখানে নবী ঘুমাচ্ছিলেন হোসেইন সে ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি তাকে অনুসরণ করলাম এবং দেখলাম যে তিনি পবিত্র নবীর ওপরে শুয়ে আছেন এবং তার বুকের উপর প্রস্রাব করেছেন। আমি তাকে তুলতে চেষ্টা করলাম , কিন্তু নবী বললেন ,“ হে যায়নাব , সে শেষ না করা পর্যন্ত তাকে ছেড়ে দাও। ”
যখন তিনি শেষ করলেন , নবী উঠে গেলেন এবং নিজেকে পবিত্র করলেন এবং নামায পড়া শুরু করলেন। যখনই তিনি সিজদায় গেলেন , হোসেইন তার পিঠে বসলেন। হোসেইন যতক্ষণ পর্যন্তনা তার পিঠ থেকে নামলেন , নবী সিজদাতেই থাকলেন। এরপর যখন তিনি উঠলেন , হোসেইন আবার ফেরত এলেন এবং নবী তাকে তুলে নিলেন। যখন তিনি তার নামায শেষ করলেন , তিনি তার হাত সামনের দিকে প্রসারিত করলেন এবং বললেন ,“ কাছে আসো , কাছে আসো , হে জিবরাঈল।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে রাসূলুল্লাহ , আজ আমি আপনাকে এমন কিছু করতে দেখলাম যা আপনি আগে কখনও করেন নি।” জবাবে নবী বললেন ,“ হ্যাঁ জিবরাঈল আমাকে সমবেদনা জানাতে এসেছিলো এবং আমাকে বললো যে আমার উম্মত আমার হোসেইনকে হত্যা করবে এবং সে তার সাথে আমার জন্য লাল বালি এনেছিলো।”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৭
সম্মানিত শেইখ আবুল কাসিম জাফর বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মি , যার কাছে নির্ভযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.) থেকে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করেছেন যে , একদিন পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। আমি তার জন্য কিছু খাবার কিনেছিলাম যা উম্মে আয়মান আমাদের জন্য উপহার হিসেবে এনেছিলো অর্থাৎ এক বাটি খেজর , এক কাপ দুধ এবং এক বাটি মাখন , যেন তিনি তা থেকে খেতে পারেন। যখন তিনি খাওয়া শেষ করলেন , আমি ধোয়াবার জন্য তার হাতে পানি ঢালতে উঠলাম। যখন তিনি ধোয়া শেষ করলেন , তার ভেজা হাতগুলো তার রহমতপূর্ণ চেহারায় আর দাড়িতে ঘষলেন। এরপর তিনি ঘরের এক কোণায় নামাযের জায়গায় গেলেন এবং সেজদায় গেলেন এবং অনেক সময় ধরে কাঁদলেন। এরপর তিনি তার মাথা উঠালেন এবং আমাদের কারোরই সাহস হলো না তার কাছে যাওয়ার ও কারণ জানতে চাওয়ার। হোসেইন উঠলেন এবং কাছে গেলেন এবং আল্লাহর নবীর উরুর ওপরে বসলেন এবং তার মাথা তার বুকেবর উপর রাখলেন এবং তার চোয়ালকে তার মাথার সাথে রাখলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় নানা , কেন আপনি কাঁদেন ?” নবী জবাব দিলেন ,“ আমি তোমাদের সবার দিকে তাকালাম এবং আমি এতোটাই খুশী আর সন্তুষ্ট ছিলাম যে এর আগে এতো আনন্দিত আর কখনই হই নি। এরপর জিবরাঈল নাযিল হলো এবং আমাকে জানালো যে তোমাদের সবাইকে শহীদ করা হবে এবং তোমাদের কবরগুলো হবে একটি থেকে অন্যটি অনেক দূরে। সুতরাং আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম যা আপতিত হবে (তোমাদের ওপরে) এবং তোমাদের ভালো চাইলাম। ”
হোসেইন বললেন ,“ তাহলে হে নানা , এতো দূরে কারা আমাদের কবরগুলো দেখাশোনা করবে এবং যিয়ারত করবে ?”
এর জবাবে নবী বললেন ,“ আমার উম্মতের মধ্য থেকে তারাই তোমাদের কবর যিয়ারতে আসবে যারা আমার সন্তুষ্টি ও বন্ধুত্ব লাভের আশা করে। আর তাই (কিয়ামতের) হিসাবের স্থানে আমি তাদের সাহায্য করতে যাবো এবং তাদের হাত ধরবো এবং সে দিনের দুর্ভোগ ও ভয় থেকে তাদেরকে পরিত্রাণ দেবো। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৮
সম্মানিত শেইখ মুফীদ , আমার নির্ভরযোগ্য বর্ণনারীদের ধারাবাহিকতায় , তার ইরশাদ (গ্রন্থে) আওযাঈ থেকে , তিনি আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ থেকে , তিনি উম্মুল ফাযল বিনতে হুরেইস থেকে বর্ণনা করেছেন , তিনি বলেছেন , একদিন আমি পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর কাছে গেলাম এবং বললাম ,“ হে আল্লাহর নবী , আজ রাতে আমি একটি খুব খারাপ স্বপ্ন দেখেছি। ” নবী সেটি কী জানতে চাইলেন। আমি বললাম যে , এটি আমার জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার। আমাকে তিনি আবার সেটি তাকে বলার জন্য বললেন। আমি বললাম ,“ আমি দেখলাম যে , আপনার শরীরের একটি অংশ কেটে গিয়ে আমার কোলে পড়লো। ” নবী জবাব দিলেন ,“ তা ঠিক আছে , কারণ নিশ্চয়ই আমার ফাতিমা (আ.) একটা ছেলে সন্তান জন্ম দিবে এবং তখন তুমি হবে তার ধাত্রী। ”
অতএব ইমাম হোসেইন (আ.) জন্ম নিলেন এবং আমার কোলে শুলেন যেমনটি নবী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। একদিন আমি তাকে নবীর কাছে নিলাম। হঠাৎ আমি তার চোখের দিকে তাকালাম এবং দেখলাম তা অশ্রুতে ভরে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ আমার বাবা-মা আপনার জন্য কোরবান হোক , হে আল্লাহর নবী , আপনার কি হয়েছে ?” তিনি জবাব দিলেন ,“ জিবরাঈল আমার কাছে আসলো আর জানালো যে আমার উম্মতের মধ্য থেকে লোকেরা আমার এ সন্তানকে হত্যা করবে , আর সে (তার শাহাদাতের জায়গার মাটি থেকে) লাল রঙের বালি এনেছে। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ২৯
আমার নির্ভরযোগ্য (হাদীস) বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় , শেইখ মুফীদ তার ইরশাদ (গ্রন্থে) (মুমিনদের মা) উম্মে সালামা (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেন , এক রাতে পবিত্র নবী (সা.) আমাদের মাঝ থেকে দূরে ছিলেন এবং বেশ অনেক সময় ধরে ফিরে আসেন নি। যখন তিনি ফিরে এলেন তার চুল ছিলো এলোমেলো এবং তিনি ধুলায় ধুসরিত ছিলেন আর তার এক হাতের তালু মুঠ করা ছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে আল্লাহর নবী , কি হয়েছে যে আমি আপনাকে বিচলিত এবং ধুলায় ভরা দেখতে পাচ্ছি ?” নবী জবাব দিলেন ,” আমাকে ইরাকের এক জায়গায় নেয়া হয়েছিলো যাকে কারবালা বলা হয় এবং আমাকে দেখানো হয়েছে সেই জায়গা যেখানে আমার সন্তান হোসেইন ও আমার পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে এবং বাচ্চাদেরকে হত্যা করা হবে। আমি তাদের রক্ত (লাল বালি) জড়ো করেছি এবং তা এখানে আমার হাতে। ” এরপর তিনি তার হাতের তালু মেলে ধরলেন এবং বললেন ,“ এটি নাও এবং তোমার কাছে এটি সংরক্ষণ করো। ” আমি তা তার কাছ থেকে নিলাম আর দেখলাম যে এটি লাল রঙের বালি। আমি তা একটি বোতলে রেখে দিলাম এবং এর মুখ সীলগালা করে রাখলাম , আর তা আমার সাথে সংরক্ষণ করলাম। যখন হোসেইন মক্কা ছেড়ে ইরাকের দিকে রওনা দিলো , আমি প্রতিটি দিন আর রাত বোতলটি বের করতাম , এর ঘ্রাণ নিতাম এবং এর দিকে তাকাতাম আর কাঁদতাম সেই যন্ত্রণার জন্য যা তার উপর পড়বে। এরপর ১০ই মহররম , সেই দিন যেদিন হোসেইনকে শহীদ করা হয়েছিলো , আমি এটি বের করলাম সকালের শুরুর দিকে আর এটি এক রকমই ছিলো। এরপর যখন আমি এটি দিনের শেষের দিকে বের করলাম , আমি দেখতে পেলাম যে তা (কারবালার বালি) পুরোপুরি রক্তে পরিণত হয়ে গেছে। আমি শোকে মুহ্যমান হয়ে গেলাম এবং হাহাকার করা শুরু করলাম কিন্তু এটি আমি গোপন রাখলাম পাছে মদীনার শত্রুরা জেনে যায় আর এতে দ্রুত ফুর্তি শুরু করে দেয়। সেই দিন থেকে আমি এ দুঃখকে আমার অন্তরে গোপন করলাম সেই সময় ও সেই দিন পর্যন্ত যখন তার শাহাদাতের খবর মদীনায় পৌঁছে গেলো আর এভাবেই এটির সত্যতা প্রমাণিত হলো।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩০
শেইখ মুফীদ , যার কাছে আমার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি তার ইরশাদ (গ্রন্থে) বর্ণনা করেছেন যে একদিন পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) বসেছিলেন এবং ইমাম আলী (আ.) , হযরত ফাতিমা (আ.) , ইমাম হাসান (আ.) এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার চারপাশে বসে ছিলেন। নবী তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন ,“ তোমাদের অবস্থা কী হবে যখন তোমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের কবরগুলো ছড়িয়ে পড়ে থাকবে ?”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ আমরা কি সাধারণভাবে মারা যাবো নাকি আমাদেরকে শহীদ করা হবে ?”
নবী জবাব দিলেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , অত্যাচার আর নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে তোমাকে হত্যা করা হবে , আর তোমার ভাইও (হাসান) নিপীড়ন ও নিষ্ঠুরতার মাঝে নিহত হবে , আর তোমার সন্তান-সন্ততিকে পৃথিবীতে বিক্ষিপ্ত করে দেয়া হবে। ”
হোসেইন জিজ্ঞাসা করলেন ,“ কে আমাদেরকে হত্যা করবে , হে আল্লাহর নবী ?”
তিনি জবাব দিলেন ,“ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টরা। ”
এরপর হোসেইন জানতে চাইলেন ,“ তাহলে আমাদের মৃত্যুর পর কেউ কি আমাদের (কবর) যিয়ারতে আসবে ?”
নবী জবাব দিলেন ,“ হ্যাঁ , আমার প্রিয় সন্তান , আমার সম্প্রদায় থেকে একদল লোক আমার সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের কবর যিয়ারতে আসবে। এরপর কিয়ামতের দিনে হিসাবের সময় আমি তাদের কাছে যাবো এবং তাদের হাত ধরার মাধ্যমে তাদেরকে এর আতঙ্ক ও দুঃখ থেকে রক্ষা করবো। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩১
নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় আল্লামা মাজলিসি তার‘ বিহারুল আনওয়ার ’ (গ্রন্থে) উল্লেখ করেছেন যে ,‘ দারুস সামীন ’ (গ্রন্থের) লেখক কোরআনে নিম্নলিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন ,
) فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ(
“ এরপর আদম তার রবের কাছ থেকে বাণী গ্রহণ করলো , আর আল্লাহ তার দিকে (ক্ষমাশীল হয়ে) ফিরলেন। ” [সূরা বাকারা: ৩৭]
(তিনি লিখেছেন) যে , নবী আদম (আ.) আরশের ভিতে নবী মুহাম্মাদ (সা.) ও ইমামদের (আ.) নাম লেখা দেখতে পেলেন আর জিবরাঈল তাকে নির্দেশনা দিলেন বলার জন্য:“ হে মহাপ্রশংসিত (হামিদ) , মুহাম্মাদের (সা.) সত্যতার মাধ্যমে ; হে সর্বোচ্চ (আলা) , আলীর সত্যতার মাধ্যমে ; হে সৃষ্টিকর্তা (ফাতির) , ফাতিমার সত্যতার মাধ্যমে ; হে (মুহসীন) , হাসান এবং হোসাইনের সত্যতার মাধ্যমে এবং ভালো তো আপনার কাছ থেকেই। ” যখন আদম হোসাইনের নাম উচ্চারণ করলেন , তার চোখ অশ্রুতে ভরে গেলো এবং তার অন্তরে ছিলো ব্যথা। আদম জিবরাঈলকে বললেন ,“ হে ভাই জিবরাঈল , যখন আমি পঞ্চম জনের নাম নিলাম , আমার চোখ অশ্রুতে ভরে গেলো আর আমার হৃদয় টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। ”
জিবরাঈল জবাব দিলেন ,“ তোমার এ সন্তান (হোসেইন)-কে এমন দুর্ভোগ ঘিরে ধরবে যে অন্য সব দুর্দশাকে এর সাথে তুলনা করলে অনেক ছোট ও কম মনে হবে। ” নবী আদম জিবরাঈলকে জিজ্ঞাসা করলেন কী সেই দুর্ভোগ , উত্তরে জিবরাঈল বললেন ,“ তাকে হত্যা করা হবে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় , অসহায় অবস্থায় এবং একজন নিঃসঙ্গ মুসাফির অবস্থায়। তার কোন বন্ধু , কোন সাহায্যকারী থাকবে না। তুমি যদি তাকে দেখতে চিৎকার করছে: হে তৃষ্ণা! হে নিঃসঙ্গতা! এবং তার তৃষ্ণা যেন তার ও আসমানগুলোর মাঝে ধোঁয়া হয়ে ছড়াবে। মৃত্যুর বৃষ্টি আর তরবারি ছাড়া কেউ তার ডাকে সাড়া দেবে না এবং তাকে ভেড়ার মত ঘাড়ের পেছন দিক থেকে জবাই করা হবে। শত্রুরা তার তাঁবুগুলো থেকে তার জিনিসপত্র ডাকাতি করবে এবং তার পবিত্র মাথা তার পরিবারের (বন্দী) নারীদের মাঝখানে এবং তার (ঘরের বন্দী হওয়া) মহিলাদের মাঝখানে তার সাথীদের মাথাগুলো বর্শার আগায় (বিদ্ধ) করে শহরগুলোতে প্রদর্শন করা হবে। এটি তোমার রবের জ্ঞানের মাঝে প্রকাশ পেয়েছে। ” তখন নবী আদম আর জিবরাঈল দুজনেই কাঁদতে লাগলেন যেভাবে তা একজন মা তার সন্তান হারানোতে কাদতে থাকে।
অন্যান্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় এসেছে যে , ঈদের দিনে ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.) তাদের নানা , আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর বাসায় প্রবেশ করলেন এবং বললেন ,“ হে নানা , আজকে ঈদের দিন এবং আরবদের ছোট বাচ্চারা নতুন ও রঙীন জামা পরেছে যখন আমাদের কোন নতুন জামা নেই , তাই আমরা আপনার কাছে এসেছি। ”
নবী তাদের অবস্থার কথা ভেবে দেখলেন এবং কাদলেন , কারণ তাদের জন্য উপযক্ত কোন জামা তার কাছে নেই আর তার কোন ইচ্ছাই ছিলো না তাদেরকে হতাশ ও ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ফেরত পাঠাতে। তিনি তার হাত ওপরে উঠালেন আর দোআ করলেন ,“ হে আল্লাহ , তাদের ও তাদের মায়ের হৃদয়কে সন্তুষ্ট করে দিন। ”
হঠাৎ জিবরাঈল বেহেশতের জামাগুলো থেকে দুটো সাদা জামা নিয়ে অবতরণ করলেন। নবী অনেক আনন্দিত হলেন এবং বললেন ,“ হে বেহেশতের যুবকদের নেতারা , এ পোষাকগুলো নাও যা তোমাদের মাপ অনুযায়ী (আল্লাহর পক্ষ থেকে) দর্জির মাধ্যমে সেলাই করা আছে। ”
দুজন ইমামই দেখলেন জামা দুটো সাদা রঙের আর তাই বললেন ,“ হে নানা , এগুলোতো সাদা রঙের , যখন আরব শিশুরা রঙীন পোষাক পড়েছে , আমরা কিভাবে পড়বো ?”
নবী তার মাথা নিচু করলেন এবং তা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করলেন , তখন জিবরাঈল বললেন ,“ হে মুহাম্মাদ (সা.) , আনন্দ করুন আর চোখ জুড়ান। ঐশী রঙ দিয়ে যিনি রঙীন করেন সেই শক্তিমান তাদের ইচ্ছা পূরণ করবেন এবং তাদেরকে সে সব রঙ দিয়ে খুশী করে দেবেন যা তারা চায়। তাই হে নবী , একটা জগ আর একটা পাত্র আনতে আদেশ করুন। ” একটি পাত্র আনা হলো আর জিবরাঈল বললেন ,“ হে আল্লাহর নবী , আমি জামাগুলোর উপর পানি ঢালবো আর আপনি নিংড়াবেন যতক্ষন পর্যন্তনা ইচ্ছামত রঙ হয়। ”
নবী ইমাম হাসান (আ.) এর জামাটা ভিজালেন আর বললেন ,“ তুমি কোন রঙ চাও ?”
ইমাম হাসান (আ.) জবাবে বললেন যে তিনি সবুজ রঙ বেশী পছন্দ করেন আর তাই নবী তার নিজের হাত দিয়ে জামাটা ঘষলেন যেটার রঙ আল্লাহ ইচ্ছায় ও আদেশে পান্নার মত উজ্জ্বল সবুজ রঙে পরিণত হলো। এরপর তিনি তা ইমাম হাসান (আ.) কে দিলেন যা তিনি পরে নিলেন। এরপর জিবরাঈল অন্য জামাটা নিলেন এবং পাত্রে পানি ঢালা শুরু করলেন। নবী এবার ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ফিরলেন , তার বয়স তখন ছিলো পাঁচ বছর , এবং জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে আমার চোখের আলো , তুমি কোন রঙ চাও ?” উত্তরে ইমাম হোসেইন বললেন যে তিনি লাল রঙ বেশী পছন্দ করেন। নবী আবার জামাটি তার নিজের মহিমান্বিত হাত দিয়ে ঘষলেন আর তা রুবী পাথরের মত উজ্জ্বল লাল রঙে পরিণত হলো। এরপর তিনি এটি ইমাম হোসেইন (আ.) এর হাতে তুলে দিলেন এবং তিনিও সেটা পড়ে নিলেন। পবিত্র নবী আর দুই ইমামই অনেক খুশী হলেন আর তারা তাদের মায়ের কাছে ফিরে গেলেন। যখন জিবরাঈল এটি দেখলেন তিনি কান্না শুরু করে দিলেন। নবী বললেন ,“ হে ভাই জিবরাঈল , এটি তো শোকের দিন নয় যখন আমার ছেলেরা আনন্দ করছে , আর তারা খুশী। আল্লাহর শপথ , দয়া করে তোমার দুঃখের কারণ আমাকে জানতে দাও। ”
জিবরাঈল জবাব দিলেন ,“ আমি শোক করছি কারণ আপনার ছেলেরা প্রত্যেকে একটি করে রঙ বেছে নিয়েছে। আপনার ছেলে হাসানের ক্ষেত্রে তাকে বিষ দেয়া হবে আর এর প্রভাবের ফলে তার শরীর সবুজ হয়ে যাবে। আর আপনার ছেলে হোসেইনের ক্ষেত্রে , তলোয়ারের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হবে। আর তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে যখন তার শরীর লাল রক্তে ঢেকে যাব ।” এটি শুনে নবী কাঁদতে শুরু করলেন আর তার দুঃখ বেড়ে গেলো।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩২
বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা , যা শেইখ সাদুক্ব পর্যন্ত পৌঁছেছে , তার মাধ্যমে তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেছেন , আমি আমিরুল মুমিমনীন ইমাম আলী (আ.) এর সাথে ছিলাম যখন আমরা সিফফীন এর দিকে যাচ্ছিলাম। ফোরাত নদীর তীরে যখন আমরা নাইনাওয়াহ অতিক্রম করছিলাম , ইমাম আলী উচ্চ স্বরে বললেন ,“ হে ইবনে আব্বাস , তুমি কি এ জায়গা চিনতে পেরেছো ?” আমি না-বোধক জবাব দিলাম। ইমাম বলতে লাগলেন ,“ আমি যা জানি তা যদি তুমি জানতে তাহলে তুমি না কেঁদে এ জায়গা থেকে নড়তে না। ”
এরপর ইমাম আলী (আ.) এতো কাঁদলেন যে তার দাড়ি ভিজে গিয়েছিলো এবং চোখের পানি তার বুকের উপর পড়ছিলো , আর আমিও কাঁদতে শুরু করলাম । তিনি উচ্চকণ্ঠে বলতে শুরু করলেন ,“ হায়! আমার কাছে আবু সুফিয়ান আর হারব কি চায় যে তারা একদল শয়তান হয়ে অবিশ্বাসের বন্ধু হয়েছে ? হে আবা আব্দিলাহ (ইমাম হোসেইন) , ধৈর্য আর সহনশীলতায় অবিচল থেকো। তোমার বাবা সব দেখতে পাচ্ছেন যা তোমার উপর আপতিত হবে। ”
এরপর তিনি পানি চাইলেন এবং অযু করলেন , আর যতক্ষণ চাইলেন নামায পড়লেন এবং এরপর আগে যা বলেছিলেন তা আবার বললেন। শেষ করে তিনি কিছু সময় ঘুমালেন , আর এরপর ঘুম থেকে উঠলেন এবং আমাকে ডাকলেন। আমি বললাম ,“ এই যে আমি আপনার খেদমতে আছি , হে মুমিনদের সর্দার।”
ইমাম আলী (আ.) বললেন ,“ আমি কি তোমাকে বলবো না আমি এখন স্বপ্নে কী দেখলাম ?” আমি বললাম ,“ নিশ্চয়ই আপনি ঘুমিয়েছিলেন , আর আপনার স্বপ্ন ন্যায়সঙ্গত ও সত্য হবে , হে মুমিনদের নেতা। ” ইমাম আলী (আ.) বললেন ,“ আমি স্বপ্নে দেখলাম যে কিছু লোক সাদা পতাকা নিয়ে এবং উজ্জ্বল , চকচকে তলোয়ারে সজ্জিত হয়ে আসমান থেকে অবতরণ করলো এবং মাটিতে একটি দাগ টেনে দিলো। আমি দেখলাম যে খেজুর গাছের শাখা মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছে আর তাদের থেকে লাফিয়ে রক্ত ঝরছে এবং আমি দেখলাম আমার প্রিয় সন্তান এবং আমার চোখের আলো হোসেইন রক্তে ঢাকা পড়ে আছে আর সাহায্যের জন্য চিৎকার করে ডাকছে কিন্তু কেউই তাকে সাড়া দিলো না। আসমান থেকে আসা লোকগুলো তাকে ডেকে বলছে: হে নবীর বংশ , ধৈর্য আর সহনশীলতায় অবিচল থাকো , কারণ তুমি সবচেয়ে অভিশপ্ত লোকের হাতে নিহত হবে। হে আবা আব্দিলাহ (ইমাম হোসেইন) , বেহেশত তোমার জন্য অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে। এরপর তারা আমাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন: হে আবুল হাসান , তোমার প্রতি সুসংবাদ , কারণ কিয়ামতের দিনে আল্লাহ তার জন্য তোমার চোখকে জুড়িয়ে দেবেন। আর এরপর তুমি দেখলে যে আমি জেগে গেলাম। তাঁর শপথ , যার হাতে আলীর জীবন! সততায় সবোৎকৃষ্ট আবুল ক্বাসিম (পবিত্র নবী) আমাকে বলেছিলেন যে আমি এ বিস্তীর্ণ এলাকায় আসবো যখন আমি বিদ্রোহী আর অনিষ্টকর লোকদের সাথে যুদ্ধ করতে যাবো। আর এ বিস্তীর্ণ এলাকাই কারবালা নামে পরিচিত যেখানে হোসেইনের সাথে আমার আর ফাতিমার বংশের সতেরো জনকে দাফন করা হবে। আর এ জায়গাটি আসমানেও সুপরিচিত। এ কারব (কষ্ট) ও বালা (মুসিবত)-এর জায়গাটি সেভাবে উল্লেখ করা হবে যেভাবে দুই হারাম (কা‘ বা এবং নবীর মসজিদ) এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের উল্লেখ করা হবে। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৩
শেইখ সাদুক্ব , যার কাছে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি তার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় হারসামাহ বিন আবি মুসলিম থেকে বর্ণনা করেছেন , তিনি বলেছেন যে , আমরা ইমাম আলী (আ.) এর সাথে সিফফীনের যুদ্ধ করেছিলাম। ফিরে আসার সময় আমরা কারবালায় থামলাম এবং সেখানে সকালের নামায পড়লাম। এরপর তিনি একমুঠো মাটি নিলেন এবং গন্ধ শুঁকলেন আর বললেন ,“ তোমার প্রশংসা , হে (কারলাবার) মাটি! তুমি এক দল লোকের সাহচর্য পাবে যারা কোন হিসাব ছাড়াই বেহেশতে প্রবেশ করবে। ”
যখন আমি আমার স্ত্রীর কাছে ফেরত এলাম , তিনি আলী (আ.) এর শিয়া (অনুসারী) ছিলেন , আমি তাকে বললাম , আমি কি তোমার মাওলা (অভিভাবক) আলীর বাণী তোমাকে শোনাবো না ? আলী এক জায়গায় থামলেন যার নাম হলো কারবালা এবং সকালের নামায পড়লেন আর এক মুঠো মাটি তুলে নিলেন এবং বললেন ,“ তোমার প্রশংসা , হে (কারবালার) মাটি , তুমি একদল লোকের সাহচর্য পাবে যারা কোন হিসাব ছাড়াই বেহেশতে প্রবেশ করবে। ” আমার স্ত্রী জবাব দিলেন যে মুমিনদের সর্দার যা বলেছেন তা সত্য ও সঠিক। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কারবালায় এলেন , আমি ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বাহিনীতে উপস্থিত ছিলাম। যখন আমি সেই জায়গাটি আর গাছগুলো দেখলাম , আমি ইমাম আলী (আ.) এর কথাটা মনে করলাম। আমি আমার উটের উপর বসলাম এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে গেলাম। আমি তাকে সালাম দিলাম আর তাকে বর্ণনা করলাম এ জায়গা সম্পর্কে তার বাবা ইমাম আলী (আ.) এর কাছ থেকে আমি যা শুনেছিলাম। ইমাম হোসেইন (আ.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ তুমি কি আমাদের সাথে না আমাদের প্রতিপক্ষের সাথে ?” আমি জবাব দিলাম ,“ আমি আপনার সাথেও না , আপনার প্রতিপক্ষের সাথেও না , আমি ছোট ছোট বাচ্চা রেখে এসেছি , আমি আশঙ্কা করছি যে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ তাদের ক্ষতি করবে। ”
ইমাম বললেন ,“ তাহলে এমন জায়গায় চলে যাও যেখান থেকে তুমি আমাদের শাহাদাতের জায়গাও দেখতে পাবে না আর (সাহায্যের জন্য) আমাদের ডাকও শুনতে পাবে না। কারণ তার শপথ যার হাতে হোসেইনের জীবন , আজকে এমন কেউ নেই যে আমাদের (সাহায্যের জন্য) ডাককে শুনতে পাচ্ছে আর আমাদেরকে সাহায্য করছে না , আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে ছুঁড়ে ফেলবেন না। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৪
শেইখ মুফীদ , যার কাছে বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি আবুল হাকাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন , আমি আমার শিক্ষক এবং অন্যান্য জ্ঞানীদের কাছ থেকে শুনেছি যে একবার ইমাম আলী (আ.) একটি বক্তৃতা দিলেন যেখানে তিনি বলেছেন ,“ তোমরা যা চাও আমাকে জিজ্ঞেস করে নাও আমাকে হারাবার আগেই। তোমরা কি আমার কাছে জানতে চাইবে না একদল লোকের কথা যারা অন্য একশ মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে বা একশ মানুষকে বন্দী করেছে , কিন্তু আমি তাদের কথা তোমাদের জানিয়ে দেবো যারা প্ররোচিতকারী এবং যারা এটি কেয়ামত পর্যন্ত পরিচালনা করবে। ”
একজন লোক দাঁড়িয়ে বললো ,“ আমাকে বলুন যে আমার মাথায় আর দাড়িতে কতগুলো চুল আছে। ”
ইমাম আলী (আ.) জবাব দিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমার মাওলা আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে বর্ণনা করেছেন যা তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করলে। একজন ফেরেশতা তোমার মাথার চুলের আগায় বসে আছে যে তোমাকে অভিশাপ দেয় , আর তোমার দাড়ির প্রত্যেকটি চুলে একটি করে শয়তান বসে আছে যারা তোমাকে উৎসাহিত করে (এবং আহ্বান করে খারাপ ও চরিত্রহীনতার দিকে) এবং তোমার ঘরের একটি সন্তান হবে পবিত্র নবীর সন্তানের হত্যাকারী এবং এ চিহ্নই হলো এর সত্য প্রমাণ যা আমি তোমাকে জানালাম। আর তা না হলে তুমি যা জানতে চেয়েছো আমি তোমাকে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিতাম কিন্তু তার (অর্থাৎ চুল গণনার) প্রমাণ দেয়াটা কঠিন। কিন্তু তোমার উপর অভিশাপের ব্যাপারে এবং তোমার অভিশপ্ত ছেলের ব্যাপারে প্রমাণ এটাই যা তোমাকে জানালাম। ”
সে সময়ে তার ছেলে ছোট ছিলো এবং তার পায়ের উপর হামাগুড়ি দিতো। আর যখন ইমাম হোসেইনের অবস্থা সে রকম হলো তখন সে তাকে হত্যা করার বিষয়ে নেতৃত্বে ছিলো এবং ইমাম আলী (আ.) যা বলেছেন তা ঘটেছিলো।
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৫
সম্মানিত শেইখ আবুল কাসিম জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন ক্বাওলাওয়েইহ (আল্লাহ তার কবরকে সুগন্ধযুক্ত করুন) , যার কাছে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর কাছে আসতেন , তিনি তাকে তার কাছে টেনে নিতেন আর মুমিনদের নেতা ইমাম আলী (আ.) কে বলতেন তাকে যত্নে রাখতে। এরপর নবী নিচু হতেন এবং তাকে চুমু দিয়ে কাঁদতে শুরু করতেন। (একবার) ইমাম হোসেইন তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন তিনি কাঁদছেন। নবী জবাব দিয়েছিলেন ,“ আমার প্রিয় সন্তান , আমি তোমার শরীরের সেই অংশে চুমু দিচ্ছি যা তলোয়ারের সাহায্যে বিচ্ছিন্ন করা হবে এবং তাই আমি কাঁদছি। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে প্রিয় নানা , আমাকে কি হত্যা করা হবে ?” তিনি জবাব দিলেন ,“ হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ , তোমাকে ও তোমার বাবাকে এবং তোমার ভাইকে হত্যা করা হবে। ” ইমাম জিজ্ঞাসা করলেন ,“ হে নানা , আমাদের শাহাদাতের স্থানগুলো কি একটা থেকে অন্যটা দূরে হবে ?”
নবী হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলেন , যার উত্তরে ইমাম হোসেইন জিজ্ঞাসা করলেন ,“ আপনার লোকদের মধ্যে কারা আমাদের কবর যিয়ারতে আসবে ?”
তিনি জবাবে বললেন ,“ সিদ্দীকীন (সত্যবাদীরা) ছাড়া আমার উম্মতের মধ্য থেকে কেউ তোমার কবর , তোমার বাবার কবর , আর তোমার ভাইয়ের কবর যিয়ারত করতে আসবে না। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৬
সম্মানিত বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ বিন আলী বিন শাহর আশব সারাউই , (আল্লাহ তার কবরকে আলোকিত করুন) যার কাছে বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে , একদিন হিন্দ (আবু সুফিয়ানের স্ত্রী) আয়েশাকে ডাকলেন নবীকে একটি স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞাসা করার জন্য। নবী তাকে স্বপ্নে সে কী দেখেছে তা বর্ণনা করার জন্য বললেন। সে বললো ,“ আমি দেখলাম আমার মাথার উপর একটা সূর্য উদয় হচ্ছে আর আমার ভেতর থেকে একটা চাঁদ বের হচ্ছে। একটি অন্ধকার নক্ষত্র চাঁদ থেকে বের হলো এবং সূর্যকে আক্রমণ করলো। একটি ছোট (উজ্জ্বল) নক্ষত্র যা সূর্য থেকে বের হয়েছিলো তাকে অন্ধকার নক্ষত্রটি গিলে ফেললো পুরো দিগন্তকে অন্ধকারে ঢেকে দিয়ে। এরপর আমি দেখলাম যে অনেকগুলো নক্ষত্র আকাশে আবির্ভূত হলো এবং পৃথিবী অন্ধকার নক্ষত্রে ভরে গেলো যেগুলো দিগন্তকে পুরোপুরি ঢেকে দিলো। ”
যখন নবী এটি শুনলেন , তার চোখ দিয়ে পানি পড়া শুরু করলো এবং তিনি দুবার হিন্দকে চলে যেতে বললেন এ বলে ,“ হে আল্লাহর শত্রু , তুমি আমাকে আবার দুঃখ দিচ্ছো এবং আমাকে আমার প্রিয় মানুষদের মৃত্যুর কথা জানাচ্ছো। ”
যখন সে চলে গেলো তখন তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , তার ও তার বংশের উপর অভিশাপ দিন। ”
যখন তাকে তার স্বপ্নের তাবীর জিজ্ঞাসা করা হলো , তিনি বললেন ,“ সূর্য ,তার মাথার উপর উদিত হয়েছিলো , সে হলো আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) , আর চাঁদ (যা হিন্দ-এর ভেতর থেকে প্রকাশিত হয়েছিলো) সে হলো রাষ্ট্রদ্রোহী , সীমালঙ্ঘনকারী আর আল্লাহকে অগ্রাহ্যকারী মুয়াবিয়া। আর সেই অন্ধকার যার কথা সে বললো , অন্ধকার নক্ষত্র যা চাঁদ থেকে বের হলো এবং ছোট সূর্যকে (উজ্জ্বল নক্ষত্র) আক্রমণ করার কথা বললো এবং পুরো বিশ্ব অন্ধকারে পরিণত হলো - এর ব্যাখ্যা হলো যে আমার সন্তান হোসেইন মুয়াবিয়ার ছেলের মাধ্যমে নিহত হবে যার ফলে (শোকে) সূর্য কালো হয়ে যাবে আর পুরো দিগন্ত অন্ধকার হয়ে যাবে। আর অন্ধকার নক্ষত্রগুলো , যারা পুরো পৃথিবী ছেয়ে ফেলবে তারা হলো বনি উমাইয়া। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৭
শেইখ এবং মুজতাহিদ , বিজয়ী ও সফল ব্যক্তি শহীদ (প্রথম শহীদ) মুহাম্মাদ বিন মাকি , যার কাছে নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের ধারা পৌঁছেছে , তিনি শেইখ ও মুজতাহিদ , পুণ্যবান আলেম , দ্বীনের গৌরব আবু মুহাম্মাদ হাসান বিন আহমাদ (নিযামুদ্দীন) বিন মুহাম্মাদ (নাজিবুদ্দীন) বিন নিমা হিল্লি থেকে বর্ণনা করেছেন , যিনি তার সম্মানিত পিতা শেইখ আহমাদ থেকে বর্ণনা করেছেন , যিনি তার ভাই , জাতির ও দ্বীনের নক্ষত্র জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন নিমা হিল্লি থেকে বর্ণনা করেছেন , তিনি তার বই‘ মুসীরুল আহযান আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন , যিনি বলেন যে , যখন পবিত্র নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর অসুস্থতা তীব্র হলো , (যার কারণে পরে তিনি ইন্তেকাল করেন) তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) কে ডাকলেন এবং তাকে বুকে চেপে ধরলেন যখন তার চেহারায় মৃত্যুর ঘাম স্পষ্ট হয়ে উঠলো। এরপর তিনি বললেন ,“ আমার কাছে ইয়াযীদ কী চায় ? হে আল্লাহ তাকে প্রাচুর্য দেবেন না এবং হে আল্লাহ আপনার অভিশাপ পাঠান ইয়াযীদের উপর। ”
এরপর তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন এবং সে অবস্থায় ’ অনেকক্ষণ থাকলেন। এরপর যখন তার জ্ঞান ফিরলো , তিনি হোসেইনকে চুমু দিলেন , তার দুচোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছিলো আর তিনি বলেছিলেন ,“ জেনে রাখো , আমি আর তোমার হত্যাকারী সর্ব শক্তিমানের সামনে দাঁড়াবো (যিনি আমাদের মাঝে ফায়সালা করে দেবেন) । ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৮
ওপরে বর্ণিত বই থেকে বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করা হয়েছে সাইদ বিন যুবাইর থেকে , যিনি ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন , যিনি বলেন যে , একদিন আমি পবিত্র নবী (সা.) এর কাছে বসেছিলাম যখন ইমাম হাসান (আ.) এলেন। যখন নবীর দৃষ্টি তার দিকে গেলো , তিনি কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন ,“ আমার কাছে আসো , আমার কাছে আসো। ” এবং তার ডান উরুতে তাকে বসালেন। কিছুক্ষণ পর ইমাম হোসেইন (আ.) এলেন এবং নবী তাকে দেখার পর কাঁদতে শুরু করলেন। এরপর তিনি ইমাম হোসেইনকে তার বাম উরুতে বসালেন। এরপর কিছু সময় পর হযরত ফাতিমা (আ.) এলেন এবং নবী আবারও কাঁদতে শুরু করলেন এবং আগের মত করলেন এবং তাকে তার দিক মুখ করে বসতে বললেন। এরপর যখন ইমাম আলী (আ.) এলেন তখন তিনি কাঁদতে শুরু করলেন এবং তার কথাগুলো আবার বললেন তাকে ডান দিকে বসতে ইশারা করলেন। যখন সেখানে বসা সাহাবীরা তা দেখলো তারা বললো ,“ হে আল্লাহর নবী , তাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে দেখে আপনি কাঁদেন নি , তাদের মধ্যে কি এমন কেউ নেই যার সাক্ষাত আপনাকে আনন্দিত করতে পারে ?”
নবী জবাব দিলেন ,“ আমি তাঁর নামে শপথ করি যিনি আমাকে নবুয়তের সম্মান দিয়েছেন এবং আমাকে পুরো সৃষ্টিজগতের ওপরে মর্যাদা দিয়েছেন। এ বিশ্বজগতে আর কেউ নেই যারা এদের চাইতে আমার কাছে বেশী প্রিয়। আর আমার কান্না হলো আমার মৃত্যুর পর তাদের উপর যে দুঃখ-কষ্ট আপতিত হবে তারই ফল। আর আমি স্মরণ করি ঐ জুলুমের বিষয়ে যা হোসেইনের উপর আপতিত হবে। তা এমন যে আমি যেন তাকে দেখতে পাচ্ছি আমার কবরে এবং পবিত্র কাবায় সে আশ্রয় নিচ্ছে , কিন্তু কেউ তাকে সেখানে থামতে দিবে না। এরপর সে ঐ জায়গায় যাবে যা তার শাহাদাতের এবং দুঃখ ও মুসিবতের জায়গা। তখন একদল মানুষ তাকে সাহায্য করবে যারা কিয়ামতের দিনে আমার জাতির মধ্যে সকল শহীদদের নেতা হবে। এটি এমন যে আমি যেন সেই তীরগুলো দেখতে পাচ্ছি যা তার দিকে ছোঁড়া হয়েছে এবং সে তার ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। এরপর তারা তাকে অত্যাচার করে একটি ভেড়ার মত জবাই করবে। ”
এরপর তিনি কান্না আর হাহাকার করা শুরু করলেন এবং তার কাছে যারা ছিলো সবাই কাঁদলেন এবং তাদের আওয়াজ বাড়ছিলো। এরপর তিনি উঠলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমার মৃত্যুর পর আমার বংশকে যেসব দুঃখ-কষ্ট সইতে হবে আমি তার জন্য আপনার কাছে নালিশ করছি। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৩৯
সম্মানিত শেইখ জাফর বিন মুহাম্মাদ ক্বাওলাওয়েই কুম্মির কাছে বর্ণনাকারীদের যে ধারা পৌঁছেছে তার মাধ্যমে‘ মুসীরুল আহযান ’ (গ্রন্থে) উল্লেখ আছে যে , আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে , একদিন ইমাম হোসেইন (আ.) তার ভাই ইমাম হাসান (আ.) এর কাছে গেলেন। যখন তিনি ইমাম হাসান (আ.) এর দিকে তাকালেন , তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। ইমাম হাসান জিজ্ঞাসা করলেন ,“ হে আবা আব্দিল্লাহ , কেন তুমি কাঁদছো ?”
ইমাম হোসেইন জবাবে বললেন যে , তার ওপরে যা ঘটবে তার কারণে তিনি কাঁদছেন। ইমাম হাসান বললেন ,“ আমার উপর যা ঘটবে তা হলো প্রাণনাশক বিষ কিন্তু আমার দিনগুলো কোনটিই তোমারগুলোর মতো হবে না। তিরিশ হাজার লোক , যারা আমাদের নানার (নবীর) অনুসরণ করে বলে দাবী করে , একত্রিত হবে তোমাকে আক্রমণ করতে এবং তোমার রক্ত ঝরাতে এবং পবিত্রতা নষ্ট করতে এবং তোমার নারীদের ও শিশুদের বন্দী করতে এবং তোমার তাঁবুগুলো লটু করতে। সে সময়ে (আল্লাহর) গযব বনি উমাইয়ার উপর নাযিল হবে এবং আকাশ রক্তের বৃষ্টি ঝরাবে এবং সব কিছুই তোমার জন্য বিলাপ করবে , এতোই বেশী যে বনের হিংস্র পশুরা এবং নদীর মাছও তোমার দুঃখ-কষ্টের জন্য কাঁদবে। ”
হাদীস (রেওয়ায়েত) নং: ৪০
ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যে ধারা সম্মানিত শেইখ জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মির কাছে পৌঁছেছে তার মাধ্যমে এবং তিনি তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের থেকে হাম্মাদ বিন উসমান থেকে বর্ণনা করেছেন , যিনি ধারাবাহিকতায় ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , যখন নবী মুহাম্মাদ (সা.) কে আসমানে নেয়া হয়েছিলো (মেরাজের রাতে) , আল্লাহ তাকে বলেছিলেন যে , আমি তোমাকে তিনভাবে পরীক্ষা করবো , তোমার ধৈর্য কেমন তা জানার জন্য। নবী (সা.) জবাব দিলেন ,“ আমি আপনার হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করি। কিন্তু আপনার পরীক্ষা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই। দয়া করে আমাকে বলুন সেই তিন উপায় কি কি ?”
বলা হলো ,প্রথমটি হচ্ছে ক্ষুধা এবং নিজের আর নিজের পরিবারের উপর অভাবীকে অগ্রাধিকার দেয়া। নবী জবাব দিলেন ,“ আমি গ্রহণ করলাম , হে রব , এবং আমি সন্তুষ্ট ‘ এবং আপনার আদেশের সামনে আমি মাথা নত করি আর অনুগ্রহ ও ধৈর্য তো শুধু আপনার কাছ থেকে। ”
দ্বিতীয়টি হলো , যে মিথ্যা অপবাদ মানুষ তোমাকে দেবে , ভয় ও কঠিন বিপদ এবং আমার পথে তোমার জীবনকে কোরবান করা এবং তোমার জীবন ও সম্পদ দিয়ে কুফরের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করা , আর তাদের হাতে আর মুনাফিক্বদের পক্ষ থেকে যে কঠোরতা ও কাঠিন্য তোমার উপর আপতিত হবে তার জন্য ধৈর্য ধরা এবং যুদ্ধের ময়দানের জখম , সমস্যা আর কষ্ট। নবী জবাব দিলেন ,“ আমি গ্রহণ করলাম , হে রব , এবং আমি সন্তুষ্ট এবং আপনার আদেশের সামনে আমি মাথা নত করি ; আর অনুগ্রহ ও ধৈর্য তো শুধু আপনার কাছ থেকে। ”
তৃতীয়টি হলো , তোমার মৃত্যুর পর যে দুঃখ-কষ্ট ও শাহাদাত তোমার পরিবারকে সইতে হবে। এরপর তোমার চাচাতো ভাই (ইমাম আলী)-কে অপবাদ রটনা , গালাগালি আর দমনের মুখোমুখি হতে হবে এবং কঠোরতা আর নিপীড়নের শিকার হবে এবং হতাশ হবে এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হবে। নবী জবাব দিলেন ,“ আমি গ্রহণ করলাম , হে রব , এবং আমি সন্তুষ্ট এবং আপনার আদেশের সামনে আমি মাথা নত করি ; আর অনুগ্রহ ও ধৈর্য তো শুধু আপনার কাছ থেকে। ”
আর তোমার মেয়ের (সাইয়েদা ফাতিমার) ক্ষেত্রে , তাকেও কষ্ট সহ্য করতে হবে (ঐসব মুসিবত যা তার সাথে সম্পর্কিত) । এরপর তোমার এ মেয়ে তোমার চাচাতো ভাই থেকে দুটি সন্তান লাভ করবে যাদের মধ্যে একজন (ইমাম হাসান) এক কাপুরুষের মাধ্যমে নিহত হবে এবং তার সম্পদ লুট করা হবে এবং বর্শা দিয়ে তাকে জখম করা হবে , আর এই নির্মম কাজগুগো তোমার উম্মতের লোকেরা করবে। নবী জবাব দিলেন ,“ আমি গ্রহণ করলাম , হে রব। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য আর নিশ্চয়ই আমরা তার দিকেই ফিরে যাবো। আর আমি সন্তুষ্ট এবং আপনার আদেশের সামনে মাথা নত করি এবং অনুগ্রহ ও ধৈর্য তো শুধু আপনার কাছ থেকেই। ”
তার দ্বিতীয় সন্তানের (ইমাম হোসেইনের) ক্ষেত্রে , লোকেরা তাকে যুদ্ধের জন্য ডাকবে এবং তাকে এমনভাবে হত্যা করবে যে তার সন্তানদের এবং (তার পরিবার ও বন্ধুদের থেকে) যে-ই তাকে সঙ্গ দেবে তাকেও হত্যা করা হবে। এরপর তার পরিবারকে লুট করা হবে এবং সে আমার কাছে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করবে , কিন্তু নিশ্চয়ই শাহাদাত তার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তাদের জন্যও যারা তার সঙ্গে থাকবে। আর তার শাহাদাত পূর্ব ও পশ্চিমের সব মানুষের জন্য একটি প্রমাণ। আর আসমানগুলো ও পৃথিবী তার জন্য কাঁদবে এবং ফেরেশতারা , যারা তাকে সাহায্য করতে পারবে না , তারাও বিলাপ করবে। এরপর আমি তার বংশ থেকে এক ব্যক্তির (ইমাম মাহদীর) প্রকাশ ঘটাবো , যার মাধ্যমে আমি তোমাকে সাহায্য করবো এবং তার রুহ আছে আমার কাছে , আরশের নিচে।
দ্বিতীয় অধ্যায়
ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া বাইয়াত দাবী করার পূর্ব থেকে
ইমাম হোসেইন (আ.) এর ওপরে কী আপতিত হয়েছিলো
ইমাম হাসান (আ.) এর শাহাদাতের পর ইরাকের শিয়াদের মাঝে একটি আন্দোলন শুরু হয়। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে ক্ষমতাচ্যুত করা ও (ইমামকে সমর্থন করা) এবং তাদের প্রস্তুতি ও তার হাতে বাইয়াত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে একটি চিঠি লেখে। তাদের চিঠির উত্তরে ইমাম হোসেইন (আ.) লেখেন যে তিনি এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন কারণ , তাদের সাথে মুয়াবিয়ার একটি চুক্তি হয়েছে যা তারা ভঙ্গ করবেন না যতক্ষণ না এর নির্ধারিত কাল অতিক্রম হয় (মুয়াবিয়ার মৃত্যু পর্যন্ত) এবং যখন মুয়াবিয়ার মৃত্যু হবে তখন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কী করতে হবে।
মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ৬০ হিজরিতে রজব মাসের মাঝামাঝি মৃত্যুবরণ করে। ইয়াযীদ একটি চিঠি লেখে ওয়ালিদ বিন উতবা বিন আবু সুফিয়ানের কাছে , যাকে মুয়াবিয়া মদীনার গভর্নর নিয়োগ দিয়েছিলো , যেন সে হোসেইন ইবনে আলী (আ.) থেকে তৎক্ষণাৎ বাইয়াত দাবী করে।
পরিচ্ছেদ - ১
মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের মৃত্যু সম্পর্কে
মাসউদী এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেন যে তার অসুস্থতার (যার কারণে সে মৃত্যুবরণ করে) প্রাথমিক দিনগুলোতে মুয়াবিয়া গোসলখানায় গেলো। যখন সে তার দুর্বল ও শুকনো দেহের দিকে তাকালো সে কাঁদতে শুরু করলো , কারণ সে বুঝতে পারলো তার সময় শেষের নিকটবর্তী এবং সে নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলো ,
“ আমি দেখতে পাচ্ছি সময় আমাকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য দ্রুত চলে এসেছে এবং আমার কিছু অংশ নিয়ে গেছে ও কিছু রেখে গেছে , দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের বিচ্যুতি তাকে বসিয়ে দিয়েছে , দীর্ঘ একটি সময় ধরে সে দাঁড়িয়ে থাকার পর। ”
আর যখন তার মৃত্যু ও পৃথিবীর সাথে বিচ্ছেদের ক্ষণ নিকটবর্তী হলো এবং তার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলো ও তার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা কম মনে হলো , সে অনুতপ্ত হয়ে কিছু পঙ্ক্তি আবৃত্তি করলো ,“ হায় যদি আমি এক মুহূর্তের জন্যও স্বাধীন না হতাম। আমি অন্ধও না হতাম পৃথিবীর আনন্দে ডুবে যেয়ে , (হায়) যদি আমি দরিদ্রের মত হতাম , যে শুধু প্রয়োজন মিটিয়ে সস্তুষ্ট থাকে যতক্ষণ পর্যন্তনা সে কবরের লোকদের সাথে মিলিত হয়। ”
ইবনে আসীর জাযারি বলেন , মুয়াবিয়া তার অসুস্থতার সময়ে বলেছিলো ,“ আমি হচ্ছি গৃহপালিত পশুর মত যার জবাই নিকটবর্তী হয়েছে। আমার রাজত্ব ও শাসন তোমাদের ওপরে ছিলো দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। যার কারণে আমি তোমাদের উপর বিরক্ত এবং তোমরা আমার উপর বিরক্ত। আমি আকাঙ্ক্ষা করি তোমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য এবং তোমরাও তাই চাও , কিন্তু আমি তার চেয়ে উত্তম যে আমার পরে তোমাদের শাসন করবে , যেরকম আমার আগে যারা ছিলো তারা আমার চাইতে ভালো ছিলো। বলা হয় , যে চায় সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে , সর্বশক্তিমান আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চান। হে আল্লাহ , আমি আপনার সাথে সাক্ষাৎ চাই এবং আমি আপনাকে অনুরোধ করি আমার সাক্ষাৎ পছন্দ করতে এবং এটিকে আমার সমৃদ্ধি ও একটি উসিলা বানাতে। ” কিছু সময় পর মৃত্যুর নিদর্শনগুলো তার উপর সুস্পষ্ট হয়ে গেলো এবং সে যখন বুঝতে পারলো তার মৃত্যু নিশ্চিত সে তার পুত্র ইয়াযীদকে ডাকলো এবং বললো:
মুয়াবিয়ার অসিয়ত তার পুত্র ইয়াযীদের প্রতি
“ হে আমার প্রিয় সন্তান , আমি ব্যথার বোঝাকে বেঁধে রেখেছি এবং তোমার কাছ থেকে বিদ্রোহকে সরিয়ে দিয়েছি এবং বিষয়গুলোকে সোজা করেছি। আমি শত্রুদেরকে শান্ত করেছি , আরবদের লাগাম তোমার হাতে এনে দিয়েছি এবং তোমার জন্য তা জমা করেছি যা কেউ এর আগে করে নি। তাই হিজাযের জনগণের কথা বিবেচনা করো যারা তোমার ভিত্তি এবং তোমার শিকড়। হিজাযের লোকদের মধ্যে যারা তোমার কাছে আসে তাদের সম্মান দিও এবং তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে থাকো যারা তাদের মধ্যে নেই। এছাড়া ইরাকের লোকদের কথা বিবেচনায় এনো এবং যদি তারা চায় যে তুমি প্রতিদিন একজন গভর্নরকে পদচ্যুত করো , তাহলে তা করতে অস্বীকার করো না , কারণ তোমার বিরুদ্ধে দশ হাজার খোলা তরবারির মুখোমুখি হওয়ার চাইতে একজন গভর্নর বদলানো সহজ। সিরিয়ার লোকদের সুযোগ-সুবিধা দিবে , কারণ তারা তোমার নিকটজন এবং তোমার চৌবাচ্চা এবং যদি কোন শত্রুকে ভয় পাও তাহলে তাদের সাহায্য চাও এবং যখন তুমি তোমার লক্ষ্য অর্জন করবে (শত্রুকে পরাজিত করবে) , তাদেরকে (সিরিয়ার) শহরগুলোতে ফিরিয়ে আনো , কারণ তারা যদি অন্য জায়গায় থাকে তাদের আচরণ বদলে যাবে। খিলাফতের প্রশ্নে তোমার বিরোধিতা ও তোমার সাথে যুদ্ধ করার বিষয়ে চার জন ছাড়া আর কাউকে আমি ভয় করি না। তারা হলো হোসেইন বিন আলী , আব্দুল্লাহ বিন উমর , আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর এবং আব্দুর রহমান বিন আবু বকর।
আব্দুল্লাহ বিন উমরের বিষয়ে , (অতিরিক্ত) ইবাদত তাকে ভেঙ্গে ফেলেছে , যদি তাকে সাহায্য করার কেউ না থাকে সে তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করবে। হোসেইন ইবনে আলীর বিষয়ে , সে হালকা মনের মানুষ এবং ইরাকের লোকেরা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে যতক্ষণ না তারা তাকে বাধ্য করে বিদ্রোহ করতে। যদি সে বিদ্রোহ করে এবং তুমি তার ওপরে বিজয়ী হও , তাকে ক্ষমা করো ; কারণ সে আত্মীয়তার মাধ্যমে আমাদের সাথে যুক্ত এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে আত্মীয়তা ও নৈকট্যের জন্য সে বেশী অধিকার রাখে। আর আবু বকরের সন্তানের বিষয়ে , সে তা অনুসরণ করে যা তার সাথীরা পছন্দ করে , তার উচ্চাশা হচ্ছে নারী ও খেলাধুলা। আর যে সিংহের মত ওঁৎপেতে থাকে এবং যে খেকশিয়াল তোমার সাথে একটি খেলা খেলছে ও একটি সুযোগের অপেক্ষায় আছে , সে হচ্ছে যুবায়েরের সন্তান ; যদি সে বিদ্রোহ করে , তোমাকে আঘাত করবে এবং তুমি যদি তার উপর বিজয়ী হও , তার প্রত্যেক হাড়ের জোড়া আলাদা করে ফেলো। আমাদের নিজেদের লোকদের রক্তকে নিরাপদ রাখতে চেষ্টা করো।
” বলা হয় যে , তার পিতার অসুস্থতার দিনগুলোতে এবং তার পিতা মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সময় ইয়াযীদ সিরিয়াতে ছিলো না। তাইয়ামবিয়া যাহহাক্ বিনা কায়েস এবং মুসলিম বিন উকবা মুররীকে ডেকে পাঠালো এবং তাদেরকে নির্দেশনা দিলো তার অসিয়তকে ইয়াযীদের হাতে দিতে , যা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
ইবনে আসীর আরও বলেন , মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান তার অসুস্থতার সময় প্রলাপের মধ্যে ছিলো এবং মাঝে মধ্যে বলতো ,“ আমাদের ও গুটার (সিরিয়ার দক্ষিণে উর্বর মরুদ্যানের মধ্যে দূরত্ব কত ?” এগুলো শুনে তার কন্যা উচ্চস্বরে বিলাপ করা শুরু করলো ,“ হায় দুঃখ। ” মুয়াবিয়া জ্ঞান ফিরে পেলো এবং বললো ,“ যদি তোমরা বেসামাল হয়ে থাকো (তোমাদের সে অধিকার আছে) , কারণ তোমরা বেসামাল একজনকে দেখেছো। ”
যখন মুয়াবিয়ার মৃত্যু হলো , যাহ্হাক বিন ক্বায়েস তার বাড়ির বাইরে এলো এবং মিম্বরে উঠলো , তখন মুয়াবিয়ার কাফনের কাপড় তার হাতে ছিলো। সে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলো এবং বললো ,“ নিশ্চয়ই মুয়াবিয়া ছিলেন একজন সহায়তাকারী , সাহসী এবং একজন সৌভাগ্যবান আরব যার হাত দিয়ে আল্লাহ ষড়যন্ত্র ও দুষ্কর্ম দূর করেছেন এবং আল্লাহ তাঁর দাসদের ওপরে তাকে সার্বভৌমত্ব দিয়েছিলেন , শহর ও মফস্বলগুলো তার নিয়ন্ত্রণে ছিলো। কিন্তু এখন সে মারা গেছে এবং এই তার কাফনের কাপড় এবং আমরা তাকে এই কাপড় দিয়ে ঢেকে দিবো এবং তাকে তার কবরে প্রবেশ করাবো এবং আমরা তাকে বারযাখে (পৃথিবী ও আখেরাতের মধ্যবর্তী সময়ে) ছেড়ে দিবো , বিচার দিন পর্যন্ত। তাই যারা তার উপর জানাযার নামায পড়তে চায় তারা যেন এ জন্য যোহরের সময় সমবেত হয়। ” যাহ্হাক নিজেই তার মৃতদেহের জন্য জানাযার নামায পড়লো।
বলা হয় যে , যখন মুয়াবিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো তখন তার সন্তান ইয়াযীদ হাওয়ারীনে (সিরিয়ার হালাবের একটি শহর) ছিলো। তার কাছে একটি চিঠি পাঠানো হলো যেন সে দ্রুত তার পিতার সাথে দেখা করে। যখন চিঠিটি ইয়াযীদের কাছে পৌঁছালো সে নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলো ,
“ দূত একটি বন্ধ চিঠি নিয়ে এলো যার কারণে হৃদয় অস্থির হলো , আমরা বললাম আক্ষেপ তোমার জন্য কী আছে তোমার ঐ দলিলে , সে উত্তরে বললো যে খলিফা নিশ্চল , ব্যথায় আছে। ”
যখন ইয়াযীদ সিরিয়াতে পৌঁছালো ততক্ষণে মুয়াবিয়াকে কবর দেয়া হয়ে গেছে। তাই সে জানাযা পড়লো তার কবরের উপর।
পরিচ্ছেদ - ২
মদীনার গভর্নর ও ইমাম হোসেইন (আ.)
[‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] যখন ইয়াযীদ জনগণের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ নিলো সে ওয়ালিদ ইবনে উতবার কাছে মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ দিয়ে একটি চিঠি লিখলো। একটি সংক্ষিপ্ত চিঠিতে সে লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , আনুগত্যের শপথ চাও হোসেইন , আব্দুল্লাহ বিন উমর এবং আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের কাছ থেকে। আর তাদেরকে অবসর দিও না যতক্ষণ না তারা তা করে। ” যখন ওয়ালিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যু সম্পর্কে পড়লো সে শঙ্কিত হয়ে পড়লো এবং সংবাদটি তাকে চিন্তায় ফেলে দিল , তাই সে অনিচ্ছাসহ মারওয়ান বিন হাকামকে ডেকে পাঠালো। মারওয়ান ওয়ালিদের আগে মদীনার গভর্নর ছিলো। তাই যখন ওয়ালিদ গভর্নর হলো সে তাকে ঘৃণা করতে শুরু করলো এবং তাকে গালাগালি করতো এবং নিজেকে দীর্ঘ দিনের জন্য বিচ্ছিন্ন রেখেছিলো যতক্ষণ পর্যন্তনা মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ ও জনগণের কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ নেয়ার দাবী তার কাছে পৌঁছালো। যখন মারওয়ান এলো , ওয়ালিদ চিঠির বিষয়বস্তু তাকে পড়ে শোনালো। মারওয়ান তা শুনে বললো“ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছে ফেরত যাবো ” এবং সে মুয়াবিয়ার উপর রহমত হওয়ার জন্য দোআ করলো। যখন ওয়ালিদ বিষয়টি সম্পর্কে তার পরামর্শ চাইলো মারওয়ান বললো ,“ আমার মতে , মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করার আগে এই লোকগুলোকে এ মুহূর্তেই ডেকে পাঠাও (এবং ইয়াযীদের কাছে আনুগত্যের শপথ করার জন্য তাদেরকে বলো) । যদি তারা অস্বীকার করে , তাদের মাথা কেটে ফেলো তারা মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ জানার আগেই। যদি তারা এ বিষয়ে সামান্যও জানতে পারে তাহলে তারা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় চলে যাবে এবং বিদ্রোহ শুরু করবে এবং নিজেদেরকে খিলাফতের জন্য যোগ্য দাবী করবে। ”
ওয়ালিদ তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ইমাম হোসেইন (আ.) ও আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরকে ডেকে আনতে আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন উসমানকে ডেকে পাঠালো যে তখন বালক ছিলো। এটি এমন একটি সময় ছিলো যখন ওয়ালিদ সাধারণত কারো সাথে সাক্ষাৎ করতো না। আব্দুল্লাহ বিন আমর তাদেরকে মসজিদে বসে থাকতে দেখলো এবং তাদের কাছে ওয়ালিদের সংবাদ পৌঁছে দিলো। তারা তাকে ফিরে যেতে বললো এবং শীঘ্রই তারা তাকে অনুসরণ করবে বলে জানালো। আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ফিরে বললো ,“ তোমার অভিমত অনুযায়ী আমাদেরকে সাক্ষাতের জন্য এ অসময়ে ওয়ালিদ কেন ডাকবে ?” ইমাম বললেন ,“ আমি অনুমান করছি তাদের বিদ্রোহীদের নেতা মারা গেছে এবং আমাদেরকে ডেকেছে ইয়াযীদের কাছে আনুগত্যের শপথ করতে , অন্যান্য লোকের কাছে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার আগেই। ” আব্দুল্লাহও এতে মত দিলো এবং জিজ্ঞেস করলো কী করা যায়। ইমাম বললেন যে তিনি ওয়ালিদের সাথে সাক্ষাতের জন্য যাবেন কিছু যুবক সাথে নিয়ে [ইরশাদ] ।
এরপর তিনি তার আত্মীয়দের মাঝ থেকে একটি দলকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন ,“ তোমাদের অস্ত্র তুলে ধরো , কারণ ওয়ালিদ আমাকে এ সময়ে ডেকে পাঠিয়েছে এবং আমাকে তা করার জন্য বাধ্য করতে পারে যা আমি ঘৃণা করি। আমি তাকে বিশ্বাস করি না। তাই আমার সাথে থাকো। যখন আমি তার সাথে দেখা করতে ভিতরে যাবো তোমরা দরজায় বসে থাকবে এবং যখন তোমরা আমার উচ্চস্বর শুনবে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করবে এবং আমাকে সাহায্য করবে। ”
যখন ইমাম ওয়ালিদের কাছে গেলেন , তিনি দেখলেন মারওয়ান তার সাথে বসে আছে। ওয়ালিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ ইমাম হোসেইন (আ.) কে দিলো এবং বললো ,“ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছে ফিরে যাবো। ” এরপর ওয়ালিদ ইয়াযীদের চিঠিটি এবং তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেয়ার আদেশ পড়ে শোনালো।
ইমাম বললেন ,“ আমি বুঝতে পারছি যে আমি যদি গোপনে ও ব্যক্তিগতভাবে আনুগত্যের শপথ করি তোমরা তাতে রাজী হবে না যতক্ষণ না আমি তা প্রকাশ্যে করি যেন জনগণ তা জানতে পারে। ”
ওয়ালিদ হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। ইমাম হোসেইন বললেন ,“ সে ক্ষেত্রে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করো। ”
ওয়ালিদ বললো ,“ যেভাবে তুমি চাও , তুমি আল্লাহর আশ্রয়ে যেতে পারো যতক্ষণ না জনতাকে সাথে নিয়ে আমার কাছে আসো। ” মারওয়ান বললো ,“ যদি হোসেইন তোমাদের মাঝখান থেকে চলে যায় আনুগত্যের শপথ না করেই , তোমাদের আর কখনোই শক্তি হবে না আনুগত্য চাইতে যতক্ষণ পর্যন্তনা তোমাদের ও তার মাঝে অনেক রক্ত ঝরে। তাই তাকে বন্দী করো যতক্ষণ না সে আনুগত্যের শপথ করে অথবা তার মাথা কেটে নাও। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ হে যারক্বার সন্তান , তুমি কি আমাকে হত্যা করতে সাহস করবে ? নিশ্চয়ই তুমি মিথ্যা বলেছো এবং গুনাহ করেছো। ”
এ কথা বলে ইমাম হোসেইন (আ.) বাইরে চলে এলেন এবং তার বাড়িতে ফেরত এলেন তার লোকজনসহ। তখন মারওয়ান ওয়ালিদের দিকে ফিরে বললো ,“ তুমি আমাকে অমান্য করলে ? আল্লাহর ক্বসম , তুমি কখনোই তাকে আর ধরতে পারবে না। ” ওয়ালিদ বললো ,“ আক্ষেপ তোমার সত্তার জন্য যা তোমার নিজেরই শত্রু। হে মারওয়ান , তুমি আমাকে এমন বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছো যা আমার ধর্মকে ধ্বংস করবে। আল্লাহর ক্বসম , আমি ঐ সম্পদ ও রাজ্য চাই না যার ওপরে সূর্য উদয় হয় ও অস্ত যায় যদি তাতে হোসেইনের হত্যা জড়িত থাকে। সুবহানাল্লাহ , আমি হোসেইনকে হত্যা করবো শুধু এ জন্য যে সে আনুগত্যের শপথ করতে অস্বীকার করেছে ? আল্লাহর ক্বসম , আমি নিশ্চিত যে-ই হোসেইন হত্যার সাথে জড়িত হবে , কিয়ামতের দিন তার (কাজের) পাল্লা হালকা হবে আল্লাহর কাছে। ” মারওয়ান বললো ,“ এটিই যদি তুমি চিন্তা কর তাহলে তুমি যা করেছো তা সঠিক। ” এরপর সে তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলো।
ইবনে শাহর আশোব‘ মানাক্বিব ’ -এ লিখেছেন যে ইমাম হোসেইন (আ.) ওয়ালিদের সাথে দেখা করতে গেলেন এবং চিঠির বিষয়বস্তু পড়লেন। তিনি বললেন যে , তিনি আনুগত্যের শপথ করবেন না। মারওয়ান , যে সেখানে উপস্থিত ছিলো , সে বললো ,“ আমিরুল মুমিনীনের (অর্থাৎ ইয়াযীদের) প্রতি আনুগত্যের শপথ করো। ” ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,
“ আক্ষেপ তোমার জন্য! নিশ্চয়ই তুমি বিশ্বাসীদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছো। কে তাকে বিশ্বাসীদের আমির বানালো ?”
এ কথা শুনে মারওয়ান উঠে দাঁড়ালো এবং তার তরবারি কোষমুক্ত করে বললো ,“ জল্লাদকে ডাকো এবং তার মাথা কাটতে বলো সে এখান থেকে যাওয়ার আগেই এবং তার রক্তের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে থাকবে। ” যখন কণ্ঠস্বর উঁচু হলো ইমামের পরিবারের উনিশ জন যুবক বড় ছোরা হাতে ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তাদের সাথে বেরিয়ে গেলেন।
যখন এ সংবাদ ইয়াযীদের কাছে পৌঁছালো সে ওয়ালিদকে পদচ্যুত করলো এবং মারওয়ানকে মদীনার গভর্নর নিয়োগ দিলো। এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) ও আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন এবং আব্দুর রহমান বিন আবু বকর ও আব্দুল্লাহ বিন উমরকে কেউ স্পর্শ করলো না।
আর আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের , যখন সে ওয়ালিদের সংবাদ পেলো , সে উত্তরে বললো সে শীঘ্রই আসবে। এরপর সে বাসায় গেলো এবং নিজেকে লুকিয়ে রাখলো। ওয়ালিদ তাকে অনুসরণ করলো এবং দেখলো যে সে তার বন্ধুদের জড়ো করেছে এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে। ওয়ালিদ তাকে চাপ প্রয়োগ করলো কিন্তু আব্দুল্লাহ বললো যে সে কিছু সময় চায় ভাবার জন্য। তখন ওয়ালিদ তার দাসদেরকে আব্দুল্লাহর কাছে পাঠালো , তারা গেলো এবং তাকে ধমক দিয়ে বললো ,“ তোমাকে আমাদের কাছে আসতে হবে নয়তো সে তোমাকে হত্যা করবে। ” আব্দুল্লাহ বললো ,“ আমি তোমাদের জবরদস্তির কারণে চিন্তিত। আমাকে একটু সময় দাও যেন আমি আমার একজন লোককে গভর্নরের কাছে পাঠাতে পারি জিজ্ঞেস করতে যে তিনি আমার কাছে কী চান। ” এরপর সে তার ভাই জাফর বিন যুবাইরকে পাঠালো। জাফর ওয়ালিদের কাছে গেলো এবং বললো ,“ আপনার উপর আল্লাহর রহমত হোক , আব্দুল্লাহকে ছেড়ে দিন , কারণ আপনি তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেন। আগামীকাল ইনশাআল্লাহ সে আপনার কাছে আসবে , তাই আপনার দূতদের আদেশ করুন ফেরত আসতে। ”
ওয়ালিদ কোন একজনকে পাঠালো তার দূতদের ফেরত ডাকতে , তারা ফেরত এলো। একই রাতে আব্দুল্লাহ তার ভাই জাফরকে সাথে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন ফারার রাস্তা দিয়ে এবং তাদের সাথে আর কেউ যায় নি।
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] যখন তার পালানোর খবর সকালে ওয়ালিদকে জানানো হলো সে আশি জন ঘোড়সওয়ারসহ বনি উমাইয়ার এক দাসকে পাঠালো যারা তার পিছু ধাওয়া করলো , কিন্তু তাকে খুঁজে পেলো না। আর তাই ফেরত আসলো এবং সেদিন তারা ব্যস্ত ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিষয় নিয়ে এবং রাত পর্যন্ত তার সাথে যোগাযোগ রাখলো।
সকালে ইমাম হোসেইন (আ.) তার বাসা থেকে বেরিয়ে এলেন জনতার কাছ থেকে সংবাদ শোনার জন্য , তখন তিনি মারওয়ানের দেখা পেলেন। মারওয়ান বললো ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আমি আপনার ভালো চাই , তাই আমি যা বলি তা গ্রহণ করুন যতক্ষণ না আপনি সৎকর্মশীলদের রাস্তায় পৌঁছান। ” ইমাম তাকে বলতে বললেন সে যা বলতে চায়। মারওয়ান বললো ,“ আমি বলছি আপনি ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ করুন , কারণ তা আপনার জন্য এ পৃথিবীর জীবনে ও আখেরাতে ভালো হবে। ” ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,
“ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর ও নিশ্চয়ই আমরা তার কাছেই ফেরত যাবো। ইসলামের বিদায় হয়ে যাবে যদি উম্মাত ইয়াযীদের নেতৃত্বের ফাঁদে পড়ে। কারণ আমি আমার নানাকে বলতে শুনেছি খিলাফত আবু সুফিয়ানের সন্তানের উপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ”
এভাবে তারা পরস্পরের সাথে কথা শুরু করে এবং তাদের তর্ক বির্তক বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত মারওয়ান অপমানিত হয়ে স্থান ত্যাগ করে।
একই দিন ওয়ালিদ কিছু লোককে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পাঠায় যেন তিনি গিয়ে আনুগত্যের শপথ করেন। ইমাম বললেন ,“ সকাল আসুক এবং আমরা দেখবো এবং তোমরাও দেখবে। ”
যখন তারা এ কথা শুনলো তারা তার উপর চাপ প্রয়োগ না করে ফিরে গেলো। সে রাতেই তিনি মদীনা ত্যাগ করলেন এবং তা ছিলো আটাশ রজবের রাত। তিনি তার পুত্র সন্তানদের , ভাইদের , ভাতিজা , ভাগ্নে এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রওনা দিলেন শুধু মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া ছাড়া। মুহাম্মাদ জানতো না তিনি কোথায় যাবেন এবং তাই বললেন ,“ হে ভাই , আপনি আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং আমার ভালোবাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং তাই আপনি উপদেশ উপহার পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য। ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া থেকে এবং সুপরিচিত শহরগুলো থেকে দূরে থাকুন যতটুকু পারেন। আপনার দূতদের ছড়িয়ে দিন এবং লোকদেরকে আপনার দিকে আহ্বান করুন। যদি জনগণ আপনার আদেশ মানে এবং আপনার প্রতি আনুগত্যের শপথ করে তাহলে আল্লাহর প্রশংসা করুন এবং যদি তারা আপনাকে ছেড়ে যায় এবং অন্যের চারদিকে জড়ো হয় এতে আপনার বুদ্ধি ও ধর্ম কমে যাবে না এবং আপনার সাহস ও দয়ার কমতি হবে না। আমি আশংকা করছি আপনি হয়তো কোন সুপরিচিত শহরে যাবেন যেখানে একদল আপনাকে সমর্থন করবে এবং অন্যরা বিদ্রোহ করবে এবং এভাবে আপনি হয়তো তাদের বর্শার শিকার হবেন। তখন জনগণের মধ্যে যে নিজের পিতা-মাতার প্রতি সবচেয়ে ভালো ব্যক্তি হয়তো তার রক্ত ঝরবে এবং তার পরিবার অপমানিত হবে। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে প্রিয় ভাই , আমি কোথায় যাবো ?”
মুহাম্মাদ বললেন ,“ মক্কায় যান এবং সেখানে থাকুন। যদি আপনি স্বস্তিপান সেখানেই থেকে যান , কারণ সেটিই আপনি খুঁজছেন এবং যদি আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে না পারেন তবে ইয়েমেনের দিকে চলে যান। যদি আপনি সেখানে নিরাপত্তা পান তবে থেকে যান অথবা মরুভূমিতে অথবা পাহাড়ে আশ্রয় নিন। এরপর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যান যতক্ষণ না আপনি জনগণের অবস্থা বোঝেন। সে সময় আপনার সিদ্ধান্ত হবে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। ” ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে ভাই , তুমি যথাযথ উপদেশ দিয়েছো এবং আশা করি তোমার উপদেশ দৃঢ় ও বিজয়ী হবে। ”
এরপর তিনি মসজিদে গেলেন এবং ইয়াযীদ বিন মুফাররির কবিতাটি আবৃত্তি করলেন ,“ আমি সকালের ঘাস খেতে থাকা গবাদি পশুকে ছত্রভঙ্গ করে দিবো না , না আমাকে ডাকা হবে ইয়াযীদ বলে। সেই দিন কখনো আসবে না যেদিন আমি আত্মসমর্পণ করবো এবং মৃত্যু আমাকে দেখবে পিছিয়ে যেতে। ”
পরিচ্ছেদ - ৩
‘ বিহারুল আনওয়ার’ -এ আল্লামা মাজলিসির আলোচনা
আল্লামা মাজলিসি‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ বর্ণনা করেছেন যে মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব মুসাউই বলেছেন যে , যখন ওয়ালিদ ইমাম হোসেইন (আ.) কে হত্যা করার জন্য চিঠি পেলো তা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের অনুভূত হলো এবং সে বললো ,
“ আল্লাহর শপথ , আল্লাহ যেন তাঁর নবীর সন্তানকে হত্যা হওয়া আমাকে না দেখান , যদি ইয়াযীদ আমাকে এর বদলে সারা পৃথিবীও দেয় এবং এর ভিতরে যা আছে তাও , তবুও নয়। ”
বলা হয় , এক রাতে ইমাম হোসেইন (আ.) তার বাড়ি থেকে বের হলেন এবং তার নানার কবরের মাথার দিকে গেলেন এবং বললেন ,
“ সালাম আপনার উপর হে আল্লাহর রাসূল। আমি হোসেইন , ফাতিমা (আ.) এর সন্তান। আমি আপনার প্রিয় এবং আপনার প্রিয়র পুত্র সন্তান। আমি আপনার সন্তান যাকে আপনি আপনার উম্মতের ভিতরে আপনার উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে গেছেন। তাই হে রাসূলুল্লাহ , সাক্ষী থাকুন যে এ লোকেরা আমাকে ত্যাগ করেছে এবং আমাকে অবহেলা করেছে এবং আমাকে নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করেছে। আপনার কাছে আসার আগ পর্যন্ত আপনার কাছে এটিই আমার অভিযোগ। ”
এরপর তিনি উঠলেন এবং নামায পড়তে শুরু করলেন , অনবরত রুকু ও সিজদা করে। ওয়ালিদ তার বাসায় গেলো খোঁজ নেয়ার জন্য যে ইমাম মদিনা ত্যাগ করেছেন কি না। যখন সে দেখলো ইমাম সেখানে নেই তখন সে বললো ,“ আল্লাহকে ধন্যবাদ যে সে চলে গেছে এবং আমাকে রক্ষা করা হয়েছে আদালতে হাজির হওয়া থেকে এবং তার রক্ত ঝরানোতে জড়িত হওয়া থেকে। ” এরপর ইমাম তার বাসায় ফেরত গেলেন এবং দ্বিতীয় রাতে আবার রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কবরে গেলেন এবং কয়েক রাকাত নামায পড়লেন। নামায শেষ করার পর তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , এটি হচ্ছে তোমার রাসূলের কবর এবং আমি তোমার রাসূলের নাতি। তুমি জানো আমার উপর কী আপতিত হয়েছে। নিশ্চয়ই আমি নৈতিক গুণ ও সৎকর্মশীলতাকে ভালোবাসি এবং খারাপকে ঘৃণা করি। হে গৌরব ও সম্মানের প্রভু , আমি এই কবর এবং যিনি এখানে শায়িত আছেন তার অধিকারের মাধ্যমে অনুরোধ করি যেন আপনি আমার জন্য তা বের করে আনেন যা আপনার ও আপনার রাসূল দ্বারা অনুমোদিত। ”
ইমাম কাঁদলেন সকাল পর্যন্ত। এরপর তিনি তার মাথাকে কবরের উপর রেখে অল্প সময়ের জন্য ঘুমালেন। তিনি স্বপ্নে দেখলেন রাসূল (সা.) তার বাম , ডান ও সামনের দিকে ফেরেশতাসহ তার দিকে আসছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) কাছে এলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর মাথাকে তার বুকে চেপে ধরলেন। এরপর তার দুই চোখের মাঝখানে চুমু দিলেন এবং বললেন ,
“ হে আমার প্রিয় হোসেইন , আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তুমি রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছো দুঃখ ও পরীক্ষা (কারব ও বালা)-এর স্থানে এবং আমার উম্মতের একটি দল তোমার মাথা কেটে ফেলেছে এবং তুমি পিপাসার্ত অথচ তারা তোমার পিপাসা মেটাচ্ছে না। এ সত্ত্বেও তারা আমার শাফায়াত (সুপারিশ) আশা করে (কিয়ামতের দিন) । আল্লাহ যেন তাদেরকে আমার শাফায়াত থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। হে প্রিয় হোসেইন , তোমার বাবা , মা এবং ভাই আমার কাছে এসেছে এবং তারা তোমার সাথে দেখা করতে চায় এবং তুমি বেহেশতে এমন এক উঁচু সম্মান অর্জন করেছো যে তুমি যদি শহীদ না হও তুমি সেখানে পৌঁছাবে না। ”
ইমাম তার নানার দিকে তাকালেন এবং বললেন ,
“ হে নানা , আমি এ পৃথিবীতে আর ফেরত যেতে চাই না। দয়া করে আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যান এবং আপনার কবরে প্রবেশ করান। ”
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন ,“ তোমার উচিত ফেরত যাওয়া (পৃথিবীর দিকে) এবং শাহাদাত লাভ করা এবং এভাবে যে মহান পুরস্কার আল্লাহ তোমার জন্য বাছাই করে রেখেছেন তা অর্জন করা। কারণ কিয়ামতের দিন তুমি , তোমার পিতা , তোমার চাচা এবং তোমার পিতার চাচা একটি বিশেষ সম্মানিত দল হিসেবে উত্থিত হবে বেহেশতে প্রবেশ করা পর্যন্ত। ”
ইমাম হোসেইন (আ.)মঘে থকে উঠলে দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়ে এবং স্বপ্নটি বর্ণনা করলেন তার পরিবার ও আব্দুল মোত্তালিবের বংশধরদের কাছে। ঐ দিন পৃথিবীতে কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরিবারের চাইতে বেশী দুশ্চিন্তাযুক্ত ও দুঃখী ছিলো না।
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকলেন। মধ্যরাতে তিনি তার মা হযরত ফাতিমা (আ.) এর ও তার ভাই ইমাম হাসান (আ.) এর কবরে গেলেন এবং বিদায় নিলেন। ফজরের সময় যখন তিনি বাসায় ফিরলেন তার ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া তার কাছে এলেন ও বললেন ,“ হে প্রিয় ভাই , আপনি আর সবার চাইতে আমার কাছে প্রিয় ও ভালোবাসার এবং আমি আপনি ছাড়া কাউকে উপদেশ দিবো না , কারণ আপনি এর যোগ্য , কেননা আপনি আমার থেকে এবং আপনি আমার জীবন , আমার রুহ এবং আমার চোখ এবং আমার পরিবারের গুরুজন। আপনার আনুগত্য আমার উপর বাধ্যতামূলক , কারণ আল্লাহ আপনাকে আমার ওপরে মর্যাদা দিয়েছেন এবং আপনাকে জান্নাতের যুবকদের সর্দার হিসেবে বাছাই করেছেন। ” এরপর তিনি রাসূল (সা.) এর পুরো হাদীসটি বর্ণনা করেন ,
“ হাসান ও হোসেইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার।”
এরপর তিনি বললেন ,“ আমি চাই আপনি মক্কা যান , যদি আপনি শান্তি খুঁজে পান , সেখানেই থাকুন কিন্তু যদি ঘটনা ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায় তাহলে ইয়েমেনে চলে যান। কারণ সেখানকার জনগণ আপনার নানা ও বাবার সাহয্যকারী ও অনুসরণকারী এবং তারা মানুষের মাঝে খুবই দয়ালু ও করুণাময় , আর তাদের শহর ও মফস্বলগুলো বড়। তখন যদি পারেন সেখানে থেকে যান। যদি তা না হয় তাহলে আশ্রয় নিন মরুভূমিতে অথবা পাহাড়ের গুহায় এবং এক শহর থেকে আরেক শহরে যান যতক্ষণ না আপনি জনসাধারণের অবস্থা বুঝেন। আর আল্লাহ যেন আমাদের মাঝে এবং জালেম দলের মাঝে বিচার করে দেন। ” ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,
“ হে ভাই , যদিও এ পৃথিবীতে আমাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য এমন কোন জায়গা নেই , আমি কখনোই কোন দিন ইয়াযীদের কাছে আনুগত্যের শপথ করবো না। ”
এটি শুনে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া তার বক্তব্য শেষ করলেন এবং কাঁদতে শুরু করলেন এবং ইমামও কাঁদলেন। এরপর তিনি বললেন ,“ হে ভাই , আল্লাহ যেন উদারভাবে তোমাকে পুরস্কার দান করেন , কারণ তুমি উপদেশ দিয়েছো এবং সঠিক মতই প্রকাশ করেছো। আর তোমার বিষয়ে , হে প্রিয় ভাই , তুমি মদীনায় থেকে যেতে পারো এবং সতর্ক থেকো এবং আমাকে শত্রুদের বিষয়ে সংবাদ জানাতে থাকো। ”
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) একটি কাগজ ও কলম চাইলেন এবং তার ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার জন্য পরামর্শ লিখলেন ,
“ আল্লাহর নামে যিনি সর্বদয়ালু , সর্ব করুণাময়। এটিতে তা-ই আছে যা হোসেইন বিন আলী অসিয়ত করেছেন তার ভাই মুহাম্মাদের জন্য যে ইবনে হানাফিয়া নামে সুপরিচিত। নিশ্চয়ই হোসেইন সাক্ষ্য দেয় যে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং সে সাক্ষ্য দেয় যে মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর দাস ও রাসূল যাকে তিনি যথাযথভাবে বাছাই করেছেন এবং জানাত ও জাহান্নাম সত্য এবং কোন সন্দেহ নেই কিয়ামতের দিন আসবে এবং কবরে যারা আছে আল্লাহ তাদের সবাইকে উত্থিত করবেন।
আমি উঠে দাঁড়িয়েছি অন্যায় ছড়িয়ে দেয়া বা লোক দেখানোর জন্য নয় ; না অনৈতিকতা ও নিপীড়ন ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। বরং আমি বের হয়েছি আমার নানার উম্মতের সংস্কারের জন্য এবং আমি চাই সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে , এভাবে আমি অনুসরণ করবো আমার নানা ও বাবা আলী ইবনে আবি তালিব (আলাইহিম সালাম)-কে। যে ব্যক্তি সত্যকে গ্রহণ করবে আমার মাধ্যমে সে আল্লাহর কাছ থেকে সত্য পাবে। আর যে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে , তাহলে আমি ধৈর্য ধরবো যতক্ষণ না আল্লাহ আমার মাঝে ও অত্যাচারী সম্প্রদায়টির মাঝে বিচার করে দেন এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ সবচেয়ে ভালো বিচারক। এটি আমার পক্ষ থেকে তোমার কাছে সাক্ষ্য , হে ভাই , এবং আমার পুরস্কার শুধু আল্লাহর কাছে যাঁর ওপরেই শুধু আমি নির্ভর করি এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন। ”
এরপর তিনি চিঠিটি ভাঁজ করলেন এবং এর ওপরে তার নিজের সীলমোহর দিলেন ও তার ভাই মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়াকে দিলেন এবং তাকে বিদায় জানালেন এবং রাতের অন্ধকারের ভেতর স্থান ত্যাগ করলেন।
মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব বলেন যে , মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াকুব‘ ওয়াসায়েল ’ -এ বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া থেকে এবং তিনি মুহাম্মাদ বিন হোসেইন থেকে এবং তিনি আইয়ুব বিন নূহ থেকে , তিনি সাফওয়ান থেকে এবং তিনি মারওয়ান বিন ইসমাইল থেকে , তিনি হামযা বিন হুমরান থেকে বর্ণনা করেছেন যে , আমরা ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর কাছে ইমাম হোসেইন (আ.) এর আন্দোলন এবং মদীনাতে মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়ার থেকে যাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম , ইমাম উত্তরে বললেন ,
হে হামযা , আমি তোমাকে এমন এক সংবাদ দিবো যার পরে আর কোনদিন তুমি এ ধরনের প্রশ্ন কোন জমায়েতে করবে না। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মদীনা ছেড়ে যেতে চাইলেন তিনি কাগজ চাইলেন এবং সেখানে লিখলেন ,“ আল্লাহর নামে যিনি সর্বদয়ালু ও সর্বকরুণাময়। এটি হোসেইন বিন আলী বিন আবি তালিব থেকে বনি হাশেমের প্রতি। আম্মা বা’ আদ , যে আমার সাথে আসবে সে শহীদ হয়ে যাবে , আর যে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে সে সফলতা ও শান্তি লাভ করবে না। ওয়াসসালাম।”
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে ফেরেশতাদের কথাবার্তা
শেইখ মুফীদ তার বর্ণনার ক্রম সূত্র উল্লেখ করে বলেছেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মদীনা ত্যাগ করলেন , বিশেষ চিহ্নসহ একদল ফেরেশতা পথে সাক্ষাৎ করলো। তারা তাদের হাতে তরবারি বহন করছিলো এবং বেহেশতের ঘোড়ায় চড়েছিলো। তারা ইমামের কাছে এসে তাকে অভিবাদন জানালো এবং বললো ,“ হে সৃষ্টির ওপরে আল্লাহর প্রমাণ , আপনার নানা , বাবা ও ভাইয়ের পরে , মহান আল্লাহ , যিনি আমাদের মাধ্যমে তার অনেক যুদ্ধে আপনার নানাকে সাহায্য করেছিলেন , তিনি এখন আমাদের পাঠিয়েছেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য। ”
ইমাম বললেন ,“ প্রতিশ্রুত সেই ভূমি হচ্ছে কারবালা , তাই তোমরা সেখানে আমার কাছে আসতে পারো। ”
তারা বললো ,“ হে আল্লাহর প্রমাণ , আপনার যা ইচ্ছা আদেশ করতে পারেন এবং আমরা তা সম্পাদন করবো ও আপনাকে মেনে চলবো। আপনি যদি শত্রুকে ভয় পান আমরা তাদের বিরুদ্ধে আপনাকে রক্ষা করবো। ”
ইমাম বললেন ,“ আমার বিরুদ্ধে তারা কোন পথ পাবে না এবং তারা আমাকে কোন ক্ষতিও করতে পারবে না যতক্ষণ না আমি আমার (নির্ধারিত) মাযারে পৌঁছি। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রতিরক্ষায় জিনদের সেনাবাহিনী
বেশ কিছু সংখ্যক মুসলমান জিনের দল ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলো এবং বললো ,“ হে আমাদের অভিভাবক , আমরা আপনার অনুসারী ও সাহায্যকারী ; আর আমরা আপনার আদেশ পালন করবো , তা যা-ই হোক। আপনি যদি চান আমরা এখানে থামবো এবং আপনার সব শত্রুকে হত্যা করবো। ”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ তোমাদের ভালো পুরস্কার দিন , তোমরা কি কোরআন পড়ো নি যা আমার নানার কাছে নাযিল হয়েছিলো ; যেখানে বলা হয়েছে ,
) أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ(
‘ তোমরা যেখানেই থাকো , মৃত্যু তোমাদের ধরে ফেলবে , এমনও যদি হয় তোমরা উঁচু (ও শক্তিশালী) ইমারতে থাকো না কেন। ’ [সূরা নিসা: ৭৮]
এবং বলা হয়েছে ,
‘ যাদের জন্য কতল হওয়া নির্ধারিত হয়েছে তারা অবশ্যই সে জায়গায় চলে যেতো যেখানে তারা (এখন নিহত হয়ে) পড়ে আছে। ’
তাই আমি যদি এখানে থেকে যাই , কিভাবে এ হতভাগ্য জাতিকে পরীক্ষা করা হবে ? এবং কে কারবালায় আমার কবরে শুয়ে থাকবে ? যখন আল্লাহ পৃথিবী সম্প্রসারণ করলেন (সে দিন) তিনি আমার জন্য সেই ভূমি পছন্দ করলেন এবং একে আমার অনুসারীদের (শিয়াদের) আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন যেন তারা সেখানে শান্তি খুঁজে পায় এ পৃথিবীতে এবং আখেরাতে। আমার কাছে এসো শনিবার দিন , কারণ আমি সপ্তাহের শেষে দশ তারিখে শহীদ হবো। আমার পরিবারের , বন্ধুদের , ভাইদের এবং আত্মীয়দের কেউ আর বেঁচে থাকবে না আমার মৃত্যুর পর। এরপর আমার মাথা ইয়াযীদের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে। ”
জিন বললো ,“ হে আল্লাহর বন্ধু এবং আল্লাহর বন্ধুর সন্তান , যদি আপনার আদেশ পালন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক না হতো এবং হত্যা করা অবৈধ না হতো আমরা অবশ্যই আপনার সমস্ত শত্রুকে হত্যা করে ফেলতাম তারা আপনার কাছে পৌঁছানোর আগেই। ”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ আমরা তোমাদের চাইতে তাদেরকে হত্যা করার জন্য বেশী যোগ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য হচ্ছে কাউকে হত্যা করা উচিত (উপযুক্ত) প্রমাণ ও যুক্তিসহ এবং হেদায়েত করা উচিত প্রমাণ ও যুক্তিসহ। ”
অন্য কথায় ইমাম চান নি যে তারা ধ্বংস হোক তাদের কাছে প্রমাণ উপস্থিত করার আগে। (এখানেই তা শেষ হয়েছে যা মুহাম্মাদ বিন আবি তালিবের বইতে উল্লেখছিলো।)
যাত্রার সময় (নবীর স্ত্রী) উম্মু সালামা (আ.) এর সাথে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কথোপকথন
আল্লামা মাজলিসি বলেন যে , আমি কিছু বইতে পড়েছি যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মদীনা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন উম্মু সালামা (আ.) তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , আমাকে শোকাহত করো না ইরাকের দিকে যেয়ে। কারণ আমি তোমার নানাকে বলতে শুনেছি যে আমার হোসেইনকে হত্যা করা হবে ইরাকে কারবালা নামের এক জায়গায়। ” ইমাম বললেন ,
“ হে প্রিয় নানীজান , আমিও তা জানি এবং আমাকে জোর করে হত্যা করা হবে , আর এ থেকে পালানোর কোন সুযোগ নেই। আল্লাহর শপথ , আমি সে দিনটিকে জানি যেদিন আমাকে হত্যা করা হবে এবং আমার হত্যাকারীদের চিনি। এছাড়া সে মাযারকেও চিনি যেখানে আমাকে সমাহিত করা হবে , এবং আমি আমার পরিবার , আত্মীয়স্বজন এবং অনুসারীদের মধ্যে সবাইকে চিনি যারা আমার সাথে মৃত্যুবরণ করবে এবং আমি আপনাকে সেই জায়গাটি দেখাতে চাই যেখানে আমাকে কবর দেয়া হবে। ”
এরপর তিনি কারবালার দিকে ইঙ্গিত করলেন এবং সেখানকার মাটি ওপরে উঠলো এবং তিনি তাকে সে জায়গাগুলো দেখালেন যেখানে তার কবর হবে , কোথায় তিনি শহীদ হয়ে পড়ে থাকবেন , তাঁবু খাটানোর জায়গা এবং কোথায় তিনি থামবেন। যখন উম্মু সালামা এসব দেখলেন তিনি খুব কাঁদতে থাকলেন এবং আল্লাহর কাছে সব অভিযোগ করলেন। তখন ইমাম বললেন ,“ হে নানীজান , আল্লাহ চান আমাকে কতল হওয়া অবস্থায় দেখতে এবং আমার মাথা নৃশংসতায় ও অন্যায়ভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়া দেখতে। এছাড়া (আল্লাহ) চান যে আমার পরিবার এবং নারী স্বজনরা উচ্ছেদ হোক এবং আমার শিশু সন্তানরা নির্যাতিত হোক , মাথায় পর্দা ছাড়া , গ্রেফতারকৃত এবং শিকলে বন্দী অবস্থায় এবং তারা অনুরোধ করবে এবং সাহায্যের জন্য চিৎকার করবে কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। ”
অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে যে উম্মু সালামা ইমাম হোসেইন (আ.) কে বলেছিলেন ,“ আমার কাছে কিছু বালি আছে যা তোমার নানা আমাকে দিয়েছিলেন এবং যা একটি বোতলে আছে। ” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ আমাকে হত্যা করা হবে যদি আমি ইরাকে নাও যাই। ” তখন তিনি এক মুঠ মাটি (কারবালার ভূমি থেকে যা উঁচু হয়ে উঠেছিলো) তুললেন এবং উম্মু সালামাকে তা দিয়ে বললেন , “ এটি বোতলের বালির সাথে মিশিয়ে নিন যা আমার নানাজান আপনাকে দিয়েছিলেন , যখন তা রক্তে পরিণত হবে জানবেন যে আমাকে শহীদ করা হয়েছে। ” (এখানে‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এর বর্ণনাটি শেষ হয়েছে।)
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারীর সাথে ইমাম (আ.) এর কথোপকথন
সাইয়েদ বাহরানি‘ মাদিনাতুল মা’ জিয ’ -এ‘ সাক্বিবুল‘ মানাক্বিব ’ থেকে ও অন্যরা‘ মানাক্বিবুস সুয়াদা ’ থেকে বর্ণনা করেন যে জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারি বলেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের দিকে যেতে চাইলেন আমি তার কাছে এলাম এবং বললাম ,“ আপনি রাসূলুল্লাহর সন্তান এবং তার প্রিয় দুই নাতির একজন। আমি আর কোন মতামত দিচ্ছি না শুধু এছাড়া যে আপনিও (ইয়াযীদের সাথে) একটি শান্তিচুক্তি করেন যেভাবে আপনার ভাই মুয়াবিয়ার সাথে করেছিলো এবং নিশ্চয়ই তিনি (ইমাম হাসান) ছিলেন বিশ্বস্তও সঠিক পথপ্রাপ্ত। ” ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,
“ হে জাবির , আমার ভাই যা করেছিলেন তা ছিলো আল্লাহর ও রাসূলের আদেশ এবং আমি যা করবো তা-ও হবে আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশ। আপনি কি চান আমি এ মহূর্তে রাসূলুল্লাহ , ইমাম আলী এবং আমার ভাইকে আমন্ত্রণ জানাই আমার কাজ সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ?”
এরপর ইমাম আকাশের দিকে তাকালেন , হঠাৎ আমি দেখলাম আকাশের দরজাগুলো খুলে গেলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) , ইমাম আলী (আ.) , ইমাম হাসান (আ.) , হযরত ফাতিমা (আ.) , হযরত জাফর তাইয়ার (আ.) এবং (আমার চাচা) যাইদ আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে এলেন। এ দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন ,
“ হে জাবির , আমি কি হোসেইনের আগে হাসানের সময়ে তোমাকে জানাই নি যে তুমি বিশ্বাসী হবে না যদি না তুমি ইমামদের কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং তাদের কাজে প্রতিবাদ না করো ? তুমি কি সেই জায়গা দেখতে চাও যেখানে মুয়াবিয়া বাস করবে এবং আমার সন্তান হোসেইনের জায়গা এবং তার হত্যাকারী ইয়াযীদের বাসস্থান ?”
আমি বললাম ,“ জ্বী।” তখন নবী তার পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলেন এবং তা দু’ ভাগ হয়ে গেলো এবং এর নিচে আরেকটি ভূমি উপস্থিত হলো। তখন আমি দেখলাম একটি নদী প্রবাহিত হচ্ছে , সেটিও দুভাগ হয়ে গেলো , এর নিচে ছিলো আরেকটি ভূমি। এভাবে মাটি ও নদীর সাতটি স্তর (একটির নিচে আরেকটি) ফাঁক হয়ে গেলো যতক্ষণ পর্যন্তনা জাহান্নাম দৃষ্টিগোচর হলো। আমি দেখলাম ওয়ালিদ বিন মুগিরা , আবু জাহল , মুয়াবিয়া ও ইয়াযীদ একসাথে শিকলে বাঁধা অন্যান্য বিদ্রোহী শয়তানদের সাথে এবং তাদের শাস্তি ছিলো জাহান্নামের অন্যান্য লোকদের চাইতে কঠিন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে মাথা তুলতে আদেশ করলেন। আমি দেখলাম আকাশের দরজাগুলো খুলে গেছে এবং বেহেশত দেখা যাচ্ছে। তখন যে বরকতময় লোকেরা অবতরণ করেছিলেন তারা সবাই ফেরত চলে গেলেন। যখন তারা বাতাসে ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) ইমাম হোসেইনকে (আ.) ডাক দিয়ে বললেন ,“ আসো এবং আমার সাথে মেলামেশা করো , হে আমার প্রিয় হোসেইন। ”
আমি দেখলাম যে হোসেইনও তাদের সাথে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় যোগ দিয়েছেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) হোসেইনের হাত ধরে আমাকে বললেন ,
“ হে জাবির , আমার এই সন্তান এখানে আমার সাথে আছে , তার কাছে আত্মসমর্পণ করো এবং সন্দেহে পড়ো না , যেন বিশ্বাসী হতে পারো। ”
জাবির বলেন যে ,“ আমার দুটো চোখই অন্ধ হয়ে যাক যদি আমি যা দেখেছি এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে যা বর্ণনা করেছি তা যদি মিথ্যা হয়ে থাকে। ”
পরিচ্ছেদ - ৪
ইমাম হোসেইন (আ.) এর (মদীনা থেকে) মক্কায় যাত্রার নিয়ত ও তার প্রতি (ইরাকের) কুফা শহরের জনগণের চিঠি সম্পর্কে
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কার দিকে যাওয়ার নিয়ত করলেন আব্দুল্লাহ বিন মুতি তখন তার সাথে দেখা করতে এলেন ও বললেন ,“ আমি আপনার জন্য কোরবান হই , আপনি কোথায় যাচ্ছেন ?” ইমাম বললেন ,“ বর্তমানে আমি মক্কা যাওয়ার নিয়ত করেছি , এরপর আমি মহান আল্লাহর কাছে দিক নির্দেশনা চাইবো। ”
আব্দুল্লাহ বললেন ,“ আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন , আপনি মক্কায় যেতে পারেন কিন্তু যদি কুফায় যান তাহলে তা একটি অভিশপ্ত শহর। আপনার বাবাকে সেখানে গুপ্তঘাতক হত্যা করেছে এবং আপনার ভাইকে সাহায্যবিহীন পরিত্যাগ করা হয়েছিলো এবং বর্শার এক আঘাতে আহত হয়েছিলেন যা তাকে প্রায় মরণাপন্ন করেছিলো। আপনি কা‘ বার সাথে যুক্ত থাকুন যেহেতু আপনি আরবদের অভিভাবক এবং হিজাযের (পশ্চিম আরবের) লোকেরা আপনার সমকক্ষ কাউকে ভাবে না। সেখানকার লোকেরা আপনার সাহায্যে দ্রুত আসবে , আমি আপনার জন্য কোরবান হই , কারণ আপনাকে যদি হত্যা করা হয় আমাদেরকে দাস বানানো হবে এবং আমরা দখল হয়ে যাবো।”
শেইখ মুফীদ বলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন প্রধান রাস্তা দিয়ে , কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করে ,
) فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ(
“ সে বেরিয়ে পড়লো , ভীত অবস্থায়। ” [সূরা ক্বাসাস: ২১]
কেউ একজন তাকে বললো ,“ ভালো হয় যদি আমরা কোন বাঁকা পথ ধরি আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের মত এবং প্রধান রাস্তা এড়িয়ে চলি , যাতে আমাদের খোঁজে যারা আছে তারা আপনার কাছে না পৌঁছাতে পারে। ”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , না , আমি এ রাস্তা ছাড়বো না যতক্ষণ পর্যন্তনা আল্লাহ আমাকে আদেশ করেন। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কায় প্রবেশ করলেন শুক্রবার , শা’ বান মাসের তৃতীয় দিনে , এ আয়াত তেলাওয়াত করে ,
) وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَنْ يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ(
“ যখন সে (মূসা আ.) তার চেহারা মাদায়েনের দিকে ঘুরিয়ে বললো: হয়তো আমার রব আমাকে সঠিক পথ দেখাবেন। ” [সূরা ক্বাসাস: ২২]
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কায় স্থির হলেন সেখানকার জনগণ এবং যারা হজ্ব করতে এসেছিলো এবং অন্যান্য শহরের লোকেরা তার সাথে দেখা করতে আসলো। আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরও মক্কায় ছিলো এবং কা‘ বা ঘরের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলো এবং নামায পড়তে লাগলো ও তাওয়াফ করতে থাকলো। সে-ও অন্যান্য লোকের সাথে এলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে সালাম জানাতে , প্রত্যেক দুদিনে একবার অথবা এর চেয়ে বেশী। ইমামের মক্কায় উপস্থিতি তাকে অস্বস্থিতে ফেলে দিলো , কারণ সে জানতো যতক্ষণ ইমাম মক্কায় থাকবেন সেখানকার জনগণ তার (আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের) কাছে আনুগত্যের শপথ করবে না (কারণ সে-ও খেলাফত চাইছিলো) । কারণ তারা ইমামকে ভালোবাসতো এবং তাদের ওপরে শাসনকর্তা হওয়ার জন্য তাকে বেশী যোগ্য মনে করতো।
আর কুফার জনগণের বিষয়ে , যখন তারা মুয়াবিয়ার মৃত্যু সংবাদ পেলো তারা ইয়াযীদ সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করতে শুরু করলো । এছাড়া তারা জানতে পেরেছিলো যে ইমাম হোসেইন (আ.) ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ করতে অস্বীকার করেছেন এবং মক্কায় চলে গিয়েছেন। আর আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরও মক্কায় পালিয়ে গেছে তার সাথে এবং তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
ইমামের শিয়ারা (অনুসারীরা) সুলাইমান বিন সুরাদ খুযাঈর বাড়িতে জড়ো হলো মুয়াবিয়ার মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করতে এবং আল্লাহর প্রশংসা এবং তাসবীহ করতে। সুলাইমান উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ মুয়াবিয়ার মৃত্যু হয়েছে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন ও মক্কায় চলে গিয়েছেন। তোমরা তার ও তার বাবার শিয়া (অনুসারী) । তাই যদি তোমরা তাকে সাহায্য করতে চাও ও তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাও তাকে চিঠি লিখো এবং তাকে এ বিষয়ে জানাও। কিন্তু যদি তোমরা ভয় পাও যে তোমরা ঢিলেমী করবে এবং পিছু হটবে তাহলে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করো না (তাকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে) । ” প্রত্যেকেই ঐক্যবদ্ধভাবে শপথ করলো যে তারা তাকে সাহায্য করবে এবং তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে তার আদেশে এবং তাদের জীবনকে এগিয়ে দিবে কোরবান করতে । যখন সুলাইমান তা শুনলেন , তিনি তাদেরকে আহ্বান জানালেন ইমামকে চিঠি লেখার জন্য এবং তারা লিখলো।
ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রতি কুফাবাসীদের চিঠি
“ আল্লাহর নামে যিনি সর্বদয়ালু , সর্বকরুণাময়। হোসেইন বিন আলীর (আ.) প্রতি , সুলাইমান বিন সুরাদ , মুসাইয়াব বিন নাজাবাহ , রুফা’ আ বিন শাদ্দাদ , হাবীব বিন মুযাহের এবং কুফা শহরের অধিবাসীদের মধ্যে থেকে অনুসারী , বিশ্বাসী ও মুসলমানদের পক্ষ থেকে। আপনার উপর শান্তিবর্ষিত হোক , আমরা আপনার আগে আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করছি যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আম্মা বা’ আদ , প্রশংসা আল্লাহর যিনি আপনার একগুঁয়ে শত্রুকে ধ্বংস করেছেন। যে (মুয়াবিয়া) ইসলামী জাতির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এবং তাদের বিষয়গুলোকে ছিনিয়ে নিজের হাতে নিয়েছিলো এবং তাদের গণিমত কেড়ে নিয়েছিলো এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলো তাদের সম্মতি ছাড়াই। সে ধার্মিকদের হত্যা করেছে এবং খারাপদের বাঁচিয়ে রেখেছিলো এবং সে আল্লাহর সম্পদকে অত্যাচারী ও ধনীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছিলো। এ জন্য তাকে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে যেভাবে সামূদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিলো এবং আমাদের এখন কোন ইমাম নেই (আপনি ছাড়া) । আমরা আপনাকে অনুরোধ করি আমাদের কাছে আসার জন্য যেন আল্লাহ আমাদেরকে সত্যের উপর একতাবদ্ধ করেন। নোমান বিন বাশীর এখন প্রাসাদে একা উপস্থিত , কিন্তু আমরা তার সাথে শুক্রবার দিন (জুম’ আর নামাযে) একত্র হই না। না আমরা ঈদের দিনও তার কাছে যাই। যদি আমরা জানতে পারি আপনি রওনা করেছেন আমাদের কাছে আসার জন্য আমরা তাকে এখান থেকে বের করে দিবো এবং তার পিছু ধাওয়া করে সিরিয়া পর্যন্ত নিয়ে যাবো , ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর শান্তিও রহমত আপনার ওপরে বর্ষিত হোক।
তারা এ চিঠি দিলো উবায়দুল্লাহ বিন মুসমে হামাদানি এবং আব্দুল্লাহ বিন ওয়াল তাইমিকে এবং তাদেরকে দ্রুত যেতে বললো। তারা দ্রুত গেলো যতক্ষণ না তারা দশই রমযান মক্কাতে পৌঁছালো। এরপর কুফার লোকেরা দুদিন অপেক্ষা করলো এবং ক্বায়েস বিন মুসাহ্হার সাইদাউই এবং আব্দুর রাহমান বিন আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ আরহাবি এবং আম্মারাহ বিন আব্দুল্লাহ সালুলিকে আবার পাঠালো একশত পঞ্চাশটি চিঠি দিয়ে যা এক , দুই , তিন অথবা চারজন লিখেছিলো।
এরপর আবার দুদিন পর তারা হানি বিন হানি সাবেঈ এবং সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ হানাফিকে দিয়ে একটি চিঠি পাঠালো যার বিষয়বস্তু ছিলো এ রকম:
“ আল্লাহর নামে যিনি সর্ব দয়ালু , সর্ব করুণাময়। হোসেইন বিন আলী (আ.) এর প্রতি তার অনুসারীদের , বিশ্বাসীদের এবং মুসলমানদের পক্ষ থেকে। আম্মা বা’ আদ , লোকজন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে এবং আর কোন মত পোষণ করবেন না , তাই দ্রুত আসুন , দ্রুত আসুন। আপনার উপর শান্তিবর্ষিত হোক। ”
আরেকটি চিঠি লিখেছিলো শাবাস বিন রাব’ ঈ , হাজ্জার বিন আবজার আজালি , ইয়াযীদ বিন হুরেইস বিন রুয়েইম শাইবানি , উরওয়া বিন ক্বায়েস আহমাসি , আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদি এবং মুহাম্মাদ বিন আমর তামিমি , যার বিষয় ছিলো এরকম:
“ আম্মা বা’ আদ , বাগানগুলো সবুজ রং ধারণ করেছে এবং ফলগুলো পেকেছে। যদি আপনি চান , এখানে আসতে পারেন , সেনাদল আপনাকে রক্ষায় প্রস্তুত। ”
যখন এ পত্রবাহকরা সবাই একত্র হলো , ইমাম চিঠিগুলো পড়লেন এবং তাদের কাছে জনগণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং রুকন ও মাক্বামের মাঝখানে নামায পড়লেন এবং আল্লাহর কাছে কল্যাণ ভিক্ষা চাইলেন। এরপর তিনি মুসলিম বিন আকীল ¡বিন আবি তালিবকে ডাকলেন এবং তা কে পরিস্থিতি’ সম্পর্কে জানালেন এবং জবাবে কুফার লোকদের কাছে একটি চিঠি লিখলেন।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) নিচের উত্তরটি পাঠান হানি বিন হানি সাবেঈ ও সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ হানাফির মাধ্যমে , যারা ছিলো (কুফা থেকে আসা) শেষ পত্রবাহক।
“ আল্লাহর নামে যিনি সর্ব দয়ালু , সর্ব করুণাময় , হোসেইন বিন আলী থেকে মুসলমান ও বিশ্বাসীদের মাঝে মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের কাছে। আম্মা বা’ আদ , হানি এবং সাঈদ তোমাদের চিঠিগুলো আমার কাছে নিয়ে এসেছে , তারা তোমাদের শেষ পত্রবাহক। আমি তাদের মাধ্যমে তোমাদের মতামত বুঝেছি এবং তোমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে‘ আমাদের উপর কোন ইমাম নেই। আপনি আমাদের দিকে আসুন , সম্ভবত আল্লাহ আপনার মাধ্যমে আমাদেরকে সত্য ও সৎকর্মশীলতায় একত্রিত করবেন। ’ আমি আমার চাচাত ভাই , আমার ভাই এবং পরিবারের একজন বিশ্বস্তলোক মুসলিম বিন আক্বীলকে তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি। আমি তাকে দিক নির্দেশনা দিয়েছি তোমাদের বিষয়ে খোঁজ নেয়ার জন্য এবং এ বিষয়ে আমাকে লেখার জন্য এবং যদি সে লিখে যে তোমাদের প্রবীণরা , বিজ্ঞরা এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরা একই অভিমত পোষণ করে যেভাবে তোমাদের পত্রবাহকরা আমাকে জানিয়েছে এবং যেভাবে তোমাদের চিঠিতে লেখা আছে , তখন আমি তোমাদের কাছে দ্রুত আসবো ইনশাআল্লাহ। আমি আমার জীবনের ক্বসম দিয়ে বলছি যে , কোন ব্যক্তি ইমাম ও পথপ্রদর্শক নয় সে ব্যক্তি ছাড়া যে আল্লাহর কিতাব দিয়ে ফায়সালা করে , ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে এবং সত্য ধর্ম প্রচার করে এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। সালাম। ”
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিব (আ.) কে ডাকলেন এবং তাকে ক্বায়েস বিন মুসাহ্হার সাইদাউই , আম্মারা বিন আব্দুল্লাহ আরজী এবং আব্দুর রাহমান এবং আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ আরহাবির সাথে কুফায় পাঠালেন। তিনি তাদেরকে আদেশ করলেন আল্লাহকে ভয় করার জন্য এবং তাদের উদ্দেশ্য গোপন রাখার জন্য , এছাড়া তাদেরকে দয়াপূর্ণ উপদেশ দিলেন এবং বললেন যদি তারা জনগণকে দৃঢ় ও শক্তিশালী হিসেবে দেখতে পায় তাহলে যেন তারা তাকে দ্রুত জানায়।
পরিচ্ছেদ - ৫
মাসউদীর বর্ণনা অনুযায়ী মুসলিম বিন আক্বীলের মধ্য রমযানে মক্কা ত্যাগ
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে] মাসউদীর বর্ণনা অনুযায়ী , মুসলিম বিন আক্বীল মদীনা পৌঁছালেন এবং মসজিদে নববীতে নামায পড়লেন এবং পরিবারকে বিদায় জানালেন। তিনি বনি ক্বায়েস থেকে দুজন লোককে পথ প্রদর্শক হিসেবে সাথে নিলেন এবং রওনা দিলেন। তারা একটি ভুল রাস্তা ধরলেন এবং পথ হারিয়ে ফেললেন। তারা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন এবং আর হাঁটতে পারছিলেন না। যে দুব্যক্তি মুসলিমের সাথে এসেছিলো তারা পানির অভাবে মারা গেলো কিন্তু মৃত্যুর আগে তারা মুসলিমকে পথের নিশানা বলে দিলো। মুসলিম আরও এগিয়ে গেলেন এবং মাযীক্ব নামে সুপরিচিত বিশ্রাম স্থলে থামলেন এবং ক্বায়েস বিন মুশীর সাইদাউইকে একটি চিঠি দিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পাঠালেন , যা ছিলো এরকম:
“ আম্মা বা’ আদ , আমি মদীনা ছেড়ে এসেছিলাম দুজন পথ প্রদর্শকের সাথে , কিন্তু আমরা পথ হারিয়ে ফেলি এবং ভীষণ তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ি এবং ঐ দুজন সহযোগী এ কারণে মৃত্যুবরণ করে। আমরা আরও এগিয়ে গেলাম পানি পাওয়া পর্যন্ত এবং এভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারলাম এবং এ জায়গাটি বাতনে জান্নাতে মাযীক্ব হিসেবে পরিচিত। আমি এ ঘটনাকে একটি অকল্যাণের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছি , যদি আপনি মনে করেন তা যথাযথ হবে তাহলে আমাকে অবসর দিন এবং অন্য কাউকে পাঠান এ কাজে , সালাম। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে লিখলেন ,
“ আম্মা বা’ আদ , আমি আশঙ্কা করছি যে , যে দায়িত্ব দিয়ে তোমাকে পাঠিয়েছি তা থেকে তোমার মুক্তি চাওয়ার কারণ হচ্ছে ভয়। অতএব যে কারণে তোমাকে পাঠিয়েছি সেদিকে তুমি এগিয়ে যাও। সালাম। ”
যখন মুসলিম চিঠিটি পড়লেন , তিনি বললেন যে তিনি নিজের জন্য কোন কিছুকে ভয় করছেন না এবং আরও এগিয়ে গেলেন। তিনি একটি পানির জায়গায় পৌঁছালেন যা ছিলো বনি তাঈ’ গোত্রের। তিনি সেখানে ঘোড়া থেকে নামলেন এবং এগিয়ে গেলেন। হঠাৎ মুসলিম দেখলেন একজন শিকারী একটি বড় হরিণের দিকে তীর ছুঁড়লো এবং তাকে হত্যা করলো। মুসলিম বললেন ,“ আল্লাহ চাইলে আমরাও আমাদের শত্রুদের এভাবে হত্যা করবো ” । এরপর আরও এগিয়ে গেলেন।
‘ মুরুজুয যাহাব ’ -এ এভাবে লেখা আছে যে , মুসলিম কুফাতে প্রবেশ করলেন শাওয়াল মাসের পাঁচ তারিখে। তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মুখতার বিন আবি উবাইদার বাসায় ছিলেন এবং শিয়ারা তার সাথে সাক্ষাৎ করতে এলো। যখন একদল জমা হলো তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর চিঠিটি তাদেরকে পড়ে শোনালেন , তারা তা শুনে কাঁদতে শুরু করলো । তখন আবিস বিন আবি শাবীব শাকিরি উঠে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর হামদ ও তাসবীহ করে বললেন ,
“ আম্মা বা’ আদ , আমি জনগণের পক্ষ থেকে বলছি না , না আমি খবর রাখি কী তাদের অন্তরে আছে এবং এভাবে আমি আপনাকে ধোঁকা দিতে চাই না। আল্লাহর শপথ , আমি শুধু তাই বলছি যা আমার অন্তরে রয়েছে। আল্লাহর শপথ , আমি আপনার ডাকে সাড়া দিবো যখনই আপনি ডাক দিবেন এবং আপনাদের পাশে থেকে আপনাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আপনার উপস্থিতিতে আমি তাদেরকে তরবারি দিয়ে আঘাত করবো যতক্ষণ না আমি আল্লাহর সাক্ষাতে মিলিত হই ; আর আমি (এর বদলে) আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছু চাই না। ”
এরপর হাবীব বিন মুযাহির ফাক্বা ’ সি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ আল্লাহর রহমত হোক তোমার ওপরে , তুমি সংক্ষেপে তাই প্রকাশ করেছো যা তোমার মনে ছিলো। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি , যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , আমি এ লোকটির (আবিসের) বিশ্বাসের মতই বিশ্বাস রাখি ” এবং তিনি আবিস যা বলেছিলেন তাই বললেন।
হাজ্জাজ বিন আলী বলেন যে আমি মুহাম্মাদ বিন বিশরকে জিজ্ঞেস করলাম ,“ আপনি কি তাকে (মুসলিমকে) কোন উত্তর দেন নি ?” তিনি বললেন ,“ আমি চেয়েছি আল্লাহ আমার বন্ধুদের সফলতা ও সম্মান দান করুন , কিন্তু আমি নিহত হতে চাই নি এবং না আমি মিথ্যা বলতে চেয়েছি। ”
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] আঠারো হাজার লোক মুসলিমের কাছে আনুগত্যের শপথ করলো। তাই তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) কে তাদের শপথের কথা জানালেন এবং তাকেফকা আসতে আমন্ত্রণ জানালেন। মুসলিম এ চিঠিটি লিখেছিলেন তার শাহাদাত বরণের সাতাশ দিন আগে। শিয়ারা (অনুসারীরা) ঘন ঘন মুসলিমের সাথে সাক্ষাৎ করতে লাগলো এবং মুসলিমের অবস্থান’ জানাজানি হয়ে গেলো।
নোমান বিন বাশীর কুফার জনগণকে সতর্ক করে দিলো
এ খবর নোমান বিন বাশীরের কাছে পৌঁছে গেলো , যাকে মুয়াবিয়া কুফার গভর্নর করেছিলো , এবং ইয়াযীদও তাকে তার পদে রেখে দিয়েছিলো। সে মিম্বরে উঠলো এবং আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহর পর বললো ,
“ আম্মা বা’ আদ , হে আল্লাহর বান্দাহরা , আল্লাহকে ভয় করো এবং ফাসাদ ও বিভেদ ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তাড়াহুড়ো করো না। কারণ তার পরিণতি হবে মানুষের হত্যা , রক্ত ঝরানো ও সম্পদ দখল হওয়া। আমি তার সাথে যুদ্ধ করি না যে আমার মুখোমুখি হয় না , না আমি তার দিকে অগ্রসর হই যে আমার দিকে অগ্রসর হয় না। আমি তোমাদের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য করি না , না আমি কাউকে হিসাব দিতে বলি শুধুমাত্র সন্দেহ ও অভিযোগের কারণে। কিন্তু যদি তোমরা আমার দিক থেকে চেহারা ঘুরিয়ে নাও এবং আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করো অথবা তোমাদের ইমামের বিরোধিতা করার চেষ্টা করো তাহলে আল্লাহর শপথ , যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , সেক্ষেত্রে আমি আমার তরবারি দিয়ে আঘাত করতে থাকবো যতক্ষণ এর হাতল আমার হাতে থাকবে। এমনও যদি হয় তোমাদের মাঝে আমার কোন সমর্থক আর না থাকে। তারপরও আমি আশা করি যে , তোমাদের মধ্যে যারা সত্য জানে তাদের সংখ্যা বেশী , তাদের চাইতে , যাদেরকে মিথ্যা (শেষ পর্যন্ত) ধ্বংস করে দিবে। ”
আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন রাবি’ আ হাযরামি , যে বনি উমাইয়ার একজন মিত্র ছিলো , সে উঠে দাঁড়ালো এবং বললো ,“ এ ফাসাদ যা আপনি এখন দেখছেন তা শক্তি প্রয়োগ ছাড়া থামবে না এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে আপনার এ মনোভাব দুর্বলদের মনোভাব। ” নোমান বললো ,“ আমি যদি দুর্বল থাকি এবং আল্লাহকে মেনে চলি তাহলে তা আমি পছন্দ করি তার চাইতে বেশী যখন আমি শক্তিশালী থাকবো অথচ আল্লাহর অবাধ্য হব। ” এ কথা বলে সে মিম্বর থেকে নেমে চলে গেলো। আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বেরিয়ে আসলো এবং এরপর একটি চিঠি লিখলো ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়াকে এ বলে যে ,“ মুসলিম বিন আক্বীল কুফাতে এসেছে এবং শিয়ারা হোসেইন বিন আলীর প্রতি আনুগত্যের শপথ করেছে। যদি আপনি চান কুফা আপনার রাজত্বের অধীনে থাকুক তাহলে একজন শক্তিশালী লোককে পাঠান যে আপনার আদেশ বাস্তবায়িত করবে এবং আপনার আদেশ অনুযায়ী কাজ করবে। কারণ নোমান বিন বাশীর একজন দুর্বল লোক অথবা ইচ্ছা করে দেখাচ্ছে সে দুর্বল। ”
আম্মারাহ বিন উক্ববাহ এবং উমর বিন সা’ আদ বিন আবি ওয়াক্কাস একই ধরনের চিঠি লিখলো ইয়াযীদের কাছে। যখন এ চিঠিগুলো ইয়াযীদের কাছে গেলো সে সারজুনকে ডাকলো , যে মুয়াবিয়ার কৃতদাস ছিলো এবং বললো ,“ হোসেইন মুসলিম বিন আক্বীলকে কুফাতে পাঠিয়েছে এবং জনগণ তার কাছে আনুগত্যের শপথ নিতে শুরু করেছে। আর নোমান হচ্ছে দুর্বল লোক এবং তার সম্পর্কে অন্যান্য খারাপ অভিযোগ আছে। তোমার অভিমত অনুযায়ী তার বদলে কাকে আমি কুফার গভর্নর করবো ?” সে সময়ে ইয়াযীদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। সারজুন বললো ,“ যদি মুয়াবিয়া আজ জীবিত হয়ে যেতেন আপনি কি তার পরামর্শ শুনতেন ?” ইয়াযীদ হ্যাঁ-বোধক উত্তর দিলো। সারজুন মুয়াবিয়ার একটি চিঠি বের করলো যাতে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে কুফার গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো , এরপর বললো ,“ এটি হচ্ছে মুয়াবিয়ার উপদেশ। কারণ যখন তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখে তিনি চেয়েছিলেন কুফা ও বসরা উভয়ের গভর্নর পদটি উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে দিতে। ” ইয়াযীদ একমত হলো এবং উবায়দুল্লাহর কাছে খবর পাঠালো। এরপর সে কুতাইবাহর পিতা মুসলিম বিন আমর বাহিলীকে ডাকলো এবং উবায়দুল্লাহর নামে একটি চিঠি হস্তান্তর করলো , যার বিষয়বস্তু ছিলো এরকম:“ আম্মা বা’ আদ , কুফাতে আমার অনুসারীরা লিখেছে যে আক্বীলের সন্তান সৈন্যদল জোগাড় করছে মুসলমানদের ভিতরে বিদ্রোহ ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। তাই যখন তুমি আমার চিঠি পড়বে কুফাতে দ্রুত চলে যাবে এবং আক্বীলের সন্তানকে খুঁজবে , যেন তুমি একটি পুঁতি খুজছো , যতক্ষণ না তাকে খুঁজে পাও। এরপর তাকে বাধো (শিকলে) , হয় তাকে হত্যা করো অথবা শহর থেকে বহিষ্কার করো। সালাম। ” ইয়াযীদ তাকে কুফার শাসনকর্তার পদটিও দিল। মুসলিম বিন আমর রওনা হলো এবং বসরায় উবায়দুল্লাহর কাছে পৌঁছালো। আদেশ ও ক্ষমতার অনুমোদন পাওয়ার সাথে সাথে উবায়দুল্লাহ পর দিন যাত্রা শুরুর আদেশ দিলো।
নোমান বিন বাশীরের ব্যক্তিত্বের ওপরে একটি বর্ণনা
নোমান বিন বাশীর সম্পর্কে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যথাযথ হবে। তার নাম ছিলো নোমান বিন বাশীর বিন সা’ আদ বিন নসর বিন সা’ লাবাহ খাযরাজি আনসারি। তার মা ছিলো উমরাহ বিনতে রুয়াহাহ , যে ছিলো আব্দুল্লাহ বিন রুয়াহাহ আনসারির বোন , যিনি শহীদ হয়েছিলেন জাফর বিন আবু তালিব (আ.) এর সাথে মুতাহর যুদ্ধে। বলা হয় যে নোমান ছিলো আনসার (মদীনার সাহায্যকারী)-দের মাঝে প্রথম জন্মগ্রহণকারী সন্তান , মদীনায় নবী (সা.) প্রবেশ করার পর , ঠিক যেভাবে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর ছিলো মুহাজিরদের মধ্যে জন্মগ্রহণকারী প্রথম সন্তান , মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা.) প্রবেশের পর। তার বাবা বাশীর বিন সা’ আদ ছিলো প্রথম ব্যক্তি যে সাক্বিফাতে আবু বকরের কাছে প্রথম আনুগত্যের শপথ করে এবং এভাবে আনসাররা তা অনুসরণ করে।‘ আইনুত তামার ’ -এর যুদ্ধে বাশীর এবং খালেদ বিন ওয়ালিদ নিহত হয়। নোমান ছিলো কবিদের পরিবারের একজন এবং খলিফা উসমানের অনুসারী। সে কুফাবাসীদের ঘৃণা করতো যেহেতু তারা ইমাম আলী (আ.) কে ভালোবাসতো। সে ছিলো একমাত্র আনসার যে সিফফীনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার সাথে ছিলো। সে মুয়াবিয়ার দৃষ্টিতে ছিলো সম্মানিত ও মর্যাদাবান। তাই ইয়াযীদ তাকে পছন্দ করতো।
নোমান জীবিত ছিলো মারওয়ান বিন হাকামের খিলাফত পর্যন্ত এবং হামাসের গভর্নর ছিলো। যখন জনগণ মারওয়ানের প্রতি আনুগত্যের শপথ করা শুরু করলো সে লোকজনকে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের দিকে আহ্বান করলো এবং মারওয়ানের বিরোধিতা করলো এবং এ ঘটনা ঘটলো যখন যাহহাক ইবনে ক্বাইসকে মারজে রুহিতে হত্যা করা হয়েছিলো কিন্তু হামাসের লোকেরা তার ডাকে কান দেয় নি , তাই সে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো এবং তারা তাকে পিছু ধাওয়া করলো এবং তাকে খুঁজে পেয়ে হত্যা করলো। ৬৫ হিজরিতে এ ঘটনা ঘটেছিলো।
ইয়াযীদ তাকে দুর্বল ও কুৎসা রটনাকারী বলার কারণ হলো , ইবনে কুতাইবাহ দীনাওয়ারি তার বই‘ আল ইমামাহ ও সিয়াসাহতে বলেছেন যে নোমান বিন বাশীর বলেছিলো যে ,“ নবীর নাতি আমার কাছে বাহদুলের নাতির চাইতে প্রিয়। ” বাহদুলের নাতি আর কেউ ছিলো না ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া ছাড়া , যার মা মায়সুন ছিলো বাহদুল কালবিয়াহর কন্যা। ইবনে কুতাইবাহ হলেন আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন কুতাইবাহ বিন মুসলিম বিন আমর বাহিলী এবং এ মুসলিম বিন আমর হলেন সেই একই ব্যক্তি যাকে ইয়াযীদ উবায়দুল্লাহর কাছে পাঠিয়েছিলো কুফার গভর্নর নিয়োগ করে।
পরিচ্ছেদ - ৬
বসরার সম্মানিত লোকদের প্রতি ইমামের চিঠি
সাইয়েদ ইবনে তাউস তার‘ মালহুফ ’ -এ উল্লেখ করেছেন যে: ইমাম হোসেইন (আ.) বসরার সৎকর্মশীল সম্মানিত লোকদের কাছে সাহায্যের জন্য একটি চিঠি পাঠালেন , তার পরামর্শক সুলাইমানের মাধ্যমে যার ডাক নাম ছিলো আবু রাযীন এবং তার প্রতি আনুগত্যের জন্য তাদেরকে আহ্বান জানালেন। সেখানে যাদের নাম ছিলো তাদের মধ্যে ছিলো ইয়াযীদ বিন মাসউদ নাহশালি এবং মুনযির বিন জারুদ আবাদি। ইয়াযীদ বিন মাসউদ তখন বনি তামীম , বনি হানযালাহ এবং বনি সা’ আদ গোত্রের লোকদের একত্র করলো। যখন তারা এলো সে বললো ,“ হে বনি তামীম গোত্রের লোকেরা , তোমাদের দৃষ্টিতে আমার কী অবস্থান ও ত্রুটি ?” তারা বললো ,“ তা পরিষ্কার , আল্লাহর শপথ , আপনি আমাদের পিঠের শক্তি এবং মর্যাদায় প্রথম এবং সম্মানিতদের মাঝে স্থানপ্রাপ্ত এবং আপনি এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ” তখন সে বললো ,“ আমি তোমাদের সবাইকে এখানে ডেকেছি যেন একটি বিষয়ে তোমাদের মতামত জিজ্ঞেস করতে পারি এবং এ জন্য তোমাদের সাহায্য চাইতে পারি। ” তারা বললো ,“ আল্লাহর শপথ আমরা আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং আমরা আপনাকে আন্তরিকভাবে পরামর্শ দিতে আলস্য করবো না। আপনি বলতে পারেন , যেন আমরা জানতে পারি তা কী। ” ইয়াযীদ বনি মাসউদ বললো , “ মুয়াবিয়া মৃত্যুবরণ করেছে এবং আমরা শোকপালন করছি না , না আমরা তার মৃত্যুতে দুঃখিত। কারণ অবিচার ও অত্যাচারের দরজাতে ফাটল ধরেছে এবং নিপীড়নের খুঁটিতে কঠিন আঘাত করা হয়েছে। সে বিদ ’ আত তৈরী করেছে তার ছেলের (ইয়াযীদের) প্রতি আনুগত্যের শপথের (দাবী করার) মাধ্যমে এবং সে এতে অনড় ছিলো অথচ তা সঠিক পথ থেকে কত দূওে , যা সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। সে চেষ্টা করেছিলো কিন্তু দুর্বল হয়ে গিয়েছিলো এবং সে পরামর্শ ও মতামত চেয়েছিলো তার বন্ধুদের কাছে কিন্তু তারা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এরপর তার ছেলে , যে মদ পান করে এবং শয়তান প্রকৃতির , সে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং নিজেকে মুসলমানদের খলিফা হিসাবে দাবী করেছে। সে তাদের উপর শাসন করছে তাদের সম্মতি ছাড়াই। যদিও সে এক অজ্ঞ ও মূর্খ ব্যক্তি , এমনকি সে তার পায়ের ছাপও চিনে না। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি যে ইয়াযীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চাইতে উত্তম। আর ইনি হলেন হোসেইন বিন আলী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নাতি। তার আছে সত্যিকার মর্যাদা , একজন সৎ উপদেশ দানকারী , এক বিরাট জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি এবং তিনি খিলাফতের জন্য বেশী যোগ্য ও অধিকারপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কারণ তিনি মুহাজিরদের মধ্যে প্রথম দিকের , একজন প্রধান এবং ধর্মে সবার চাইতে এগিয়ে , তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তিনি ছোটদের প্রতি স্নেহশীল এবং প্রবীণদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন এবং অন্যদের প্রতি দয়ালু। তিনি একজন প্রকৃত নেতা এবং বেহেশত তার মাধ্যমে অর্জিত হয় এবং তিনি ধর্ম প্রচার করেন সৎ উপদেশ ও সতর্কবাণীর মাধ্যমে। তাই সত্যের আলোর সামনে চোখ বন্ধ করে ফেলো না এবং মিথ্যার গর্তে পড়ো না। সাখর বিন ক্বায়েস তোমাদেরকে জামালের (যুদ্ধের) দিনে বিভ্রান্ত করেছিলো এবং অপমানিত করেছিলো , তাই অপমানের দাগকে ধুয়ে ফেলো নবীর নাতিকে সাহায্য করার মাধ্যমে। আল্লাহর শপথ , কেউ তাকে সাহায্য করা থেকে নিজেদের হাতকে গুটিয়ে রাখবে না শুধু তারা ছাড়া যাদের বংশধররা হবে অপমানিত , বঞ্চিত ও পরিত্যক্ত। আমি এখন যুদ্ধের শিরস্ত্রাণ পড়েছি এবং বর্ম বেঁধেছি। যে নিহত হবে না সে শেষ পর্যন্ত মারা যাবে এবং যে এ থেকে পালিয়ে যাবে সে তা থেকে নিস্কৃতি পাবে না। তাই আমাকে ভালোভাবে সাড়া দাও। আল্লাহর রহমত তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক।
এ কথা শুনে বনি হানযালাহ বললো ,“ হে আবা খালিদ (ইয়াযীদ বিন মাসউদের ডাক নাম) , আমরা আপনার তীর বহনকারী এবং গোত্রগুলোর মাঝে শ্রেষ্ঠ। আপনি যদি আমাদেরকে ছুঁড়ে মারেন (শত্রুর দিকে) আমরা লক্ষ্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বো এবং আপনি যদি আমাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যান আপনি বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হবেন। আপনি যদি সমুদ্রের গভীরে প্রবেশ করেন আমরাও আপনার সাথে যাবো এবং আপনি যেদিকে ঘুরবেন আমরাও সেদিকে ঘুরবো। আমরা আপনাকে আমাদের তরবারি দিয়ে রক্ষা করবো এবং আমাদের দেহগুলো হবে আপনার ঢাল। আমরা আপনার খেদমতে আছি যখনই আপনি আমাদের প্রয়োজন মনে করবেন। ”
এরপর বনি সা’ আদ বিন ইয়াযীদ বললো ,“ হে আবা খালিদ , আমাদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ হচ্ছে আপনার বিরোধিতা করা ও আপনার আদেশ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়া। নিশ্চয়ই সাখর বিন ক্বায়েস আমাদেরকে যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছিলো (জামালের যুদ্ধে) এবং আমরা আমাদের এ কাজে সন্তুষ্ট ছিলাম এবং আমাদের মর্যাদা রক্ষা হয়েছিলো। আপনি আমাদের কিছু সময় দিন যেন আমরা নিজেদের মাঝে পরামর্শ করে নিতে পারি এবং এ বিষয়ে আমাদের মতামত আপনাকে জানাতে পারি। ”
এসময় বনি আমির বিন তামীম বললো ,“ হে আবা খালিদ , আমরা আপনার পিতার সন্তান ও আপনার মিত্র। আপনি যদি অসন্তুষ্ট হন আমরা সন্তুষ্ট থাকবো না এবং যদি আপনি চলে যান আমরা আপনার পিছনে পিছনে আসবো। তাই আমাদের আদেশ করুন যেন আমরা সাড়া দিতে পারি এবং আমাদের ডাক দিন যেন আমরা আপনাকে মানি। নিশ্চয়ই আদেশ আপনার কাছেই।”
তখন তিনি বনি সা’ আদকে বললেন ,“ হে বনি সা’ আদ , আল্লাহর শপথ , যদি তোমরা সন্দেহে থাকো এবং বনি উমাইয়ার পক্ষ অবলম্বন কর (এবং হোসেইনকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হও) , আল্লাহ কখনোই তোমাদের ঘাড় থেকে তরবারি তুলে নিবেন না অথচ তোমাদের তরবারি তোমাদের হাতেই থাকবে। ”
এরপর সে (ইয়াযীদ বিন মাসউদ) ইমাম হোসেইন (আ.) কে একটি উত্তর পাঠালো ,“ আম্মা বা ’ আদ , আমরা আপনার চিঠি পেয়েছি এবং আপনি যে আহ্বান করেছেন তার উপর গভীরভাবে ভেবে দেখেছি , যেন আমরা আপনার আনুগত্যে আমাদের অংশ নিতে পারি এবং যেন আমরা আপনাকে সাহায্য করার মর্যাদা অর্জন করতে পারি। আল্লাহ কখনো পৃথিবীকে তার প্রতিনিধিবিহীন রাখেন না , তিনি উদারভাবে দানশীল এবং নাজাতের পথ প্রদর্শক। নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর সৃষ্টির ওপরে তাঁর প্রমাণ এবং পৃথিবীতে তাঁর আমানত। আপনি মুহাম্মাদ (সা.) এর জলপাই গাছের একটি শাখা , তিনি ছিলেন উৎস আর আপনি হচ্ছেন শাখা , আমাদের কাছে আনন্দের সাথে দ্রুত আসুন , কারণ আমি বনি তামীমের ঘাড়গুলো আপনার আদেশের নিচে এনেছি এবং তারা আপনার আনুগত্যে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাবে পিপাসার্ত সিংহের মত যে পানি পান করতে দ্রুত এগিয়ে যায়। এছাড়া বনি সা’ আদকে আপনার আনুগত্যে এনেছি এবং তাদের অন্তর থেকে ময়লা ধুয়ে ফেলেছি পানি দিয়ে যা মেঘ থেকে পড়েছে। ”
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) চিঠির বিষয়বস্তু পড়লেন তিনি বললেন ,“ তোমরা আর কী চাও , আল্লাহ তোমাদের ভয়ের দিনে (কিয়ামতে) নিরাপত্তা দিন এবং প্রচণ্ড পিপাসার দিনে তোমাদের পিপাসা মেটান এবং কাছে টেনে নিন। ”
যখন ইয়াযীদ বিন মাসউদ ইমামের দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন সে তার শাহাদাতের সংবাদ পেলো এবং সে নিজে শাহাদাত পেলো না বলে আফসোস করতে লাগলো।
আর মুনযিরা বিন জারুদ সম্পর্কে , যখন সে ইমাম হোসেইন (আ.) এর চিঠি পেলো সে তা ইমামের দূতসহ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে এলো , কারণ সে ভয়ে ছিলো যে এটি হতে পারে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কোন ষড়যন্ত্র , আর তার কন্যা বাহরিয়া ছিলো উবায়দুল্লাহর স্ত্রী। উবায়দুল্লাহ ইমামের দূতকে জল্লাদের কাছে পাঠালো এবং মিম্বরে উঠে একটি খোতবা পাঠ করলো , সেখানে সে বসরার জনগণকে সতর্ক করলো বিরোধিতা ও বিদ্রোহের বিরুদ্ধে। সেই রাত সে বসরায় কাটালো এবং পরদিন সকালে সে তার ভাই উসমান বিন যিয়াদকে তার প্রতিনিধি বানালো এবং দ্রুত কুফার দিকে যাত্রা করলো।
তাবারি বলেন যে , হিশাম বলেছেন যে আবু মাখনাফ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন এবং সে সাকীব বিন যুহাযর থেকে , তিনি আবু উসমান নাহদী থেকে বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) একই ধরণের একটি চিঠি লিখেছিলেন বসরার পাঁচটি বিভাগের সম্মানিত লোক ও সর্দারদের কাছে তার পরামর্শক সুলাইমানের মাধ্যমে। একই বিষয়বস্তু সম্বলিত আরও চিঠি লেখা হয়েছিলো মালিক বিন মুসমে ’ বাকরি , আহনাফ বিন ক্বায়েস , মুনযির বিন জারুদ , মাসউদ বিন আমর , ক্বায়েস বিন হাইসাম এবং উমার বিন আব্দুল্লাহ বিন মুয়াম্মারের কাছে:
“ আম্মা বা ’ আদ , নিশ্চয়ই আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা.) কে তাঁর সব সৃষ্টির ওপরে বাছাই করেছেন এবং তাকে নবুয়ত দান করেছেন এবং তাকে রিসালাতের জন্য বাছাই করেছেন। এরপর আল্লাহ তাকে তাঁর রহমতের দিকে (মৃত্যু) নিয়ে গিয়েছেন সব মানুষকে সত্যের দিকে পথ দেখাবার পর এবং সংবাদ প্রচার করার পর , যার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছিলো। আর আমরা তার পরিবার (আহলুল বাইত) , বন্ধু , উত্তরাধিকারী এবং তার খলিফা এবং আমরা অন্যদের চাইতে তার উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য বেশী যোগ্য। আর উম্মত এ বিষয়ে আমাদেরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করেছে এবং আমরা অসহায়ভাবে নিজেদেরকে সরিয়ে নিয়েছি বিভেদ এড়ানোর জন্য। আমরা শান্তি ভালোবাসি যদিও আমরা আমাদেরকে তাদের চাইতে এ বিষয়ে (খেলাফতে) বেশী যোগ্য এবং বেশী অধিকার রাখি বলে মনে করি। আমি তোমাদের দিকে আমার দূতকে পাঠিয়েছি এবং আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের দিকে , নবীর সুন্নাহর দিকে আহ্বান করছি। কারণ আমি দেখছি যে হাদীস (সুন্নাহ্) ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিদ ’ আত মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তাই যদি তোমরা আমার কথায় মনোযোগ দাও এবং আমার আদেশ মানো তাহলে আমি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখাবো এবং তোমাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। ”
সম্মানিত লোকদের মধ্যে যে-ই এ চিঠি পেলো সে তা গোপন করলো মুনযির বিন জারুদ ছাড়া , সে ভয় পেয়েছিলো যে এটি হয়তো উবায়দুল্লাহর ষড়যন্ত্র। তাই সে সেই দূতকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলো সেই দিন যেদিন রাতের বেলা উবায়দুল্লাহ কুফা রওনা দিয়েছিলো। সে উবায়দুল্লাহকে চিঠিটি দিলো যেন সে তা পড়তে পারে। চিঠি পড়া শেষ করে উবায়দুল্লাহ দূতকে হত্যার আদেশ দিলো এবং নিজে বসরার মিম্বরে উঠলো এবং আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহর পর বললো ,“ আম্মা বা ’ আদ , আল্লাহর শপথ , ক্ষুধার্ত উটও আমার মত নয় , না আমি খালি মশকের আওয়াজ শুনে পালাই , আমি নিজে আমার প্রতিপক্ষের উপর গযব এবং মারাত্মক এক বিষ তাদের জন্য যারা আমার বিরোধিতা করে। যে আমার দিকে এক দলা কাদা ছুঁড়ে মারে , সে একটি পাথর পুরস্কার পাবে। হে বসরার জনগণ , বিশ্বাসীদের আমির (ইয়াযীদ) আমাকে কুফার অভিভাবকত্ব দান করেছেন এবং আগামীকাল আমি সেখানে যাবো। আমি আমার ভাই উসমান বিন যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ানকে তোমাদের উপর আমার খলিফা (প্রতিনিধি) নিয়োগ দিলাম। সাবধান , বিরোধিতা ও ফাসাদ থেকে দূরে থাকো। কারণ আল্লাহর শপথ , যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , যদি আমি তোমাদের মাঝে কাউকে বিরোধিতা করতে শুনি , তাহলে আমি অবশ্যই তাকে হত্যা করবো , তার গোত্র প্রধান ও অভিভাবকসহ। আমি উপস্থিত যারা আছে তাদের দায়িত্ব দিচ্ছি যারা অনুপস্থিত আছে তাদের জন্য , যতক্ষণ না পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আমার বিরোধিতা করে ও আমাকে অপছন্দ করে এমন লোক যেন তোমাদের মাঝে না থাকে। আমি যিয়াদের সন্তান এবং আমার বাবার সাথে আমার বেশী মিল রয়েছে , তাদের চাইতে বেশী , যারা এ পৃথিবীতে এ পর্যন্ত পা রেখেছে এবং আমি আমার মামা ও চাচাদের মত নই। ” এরপর সে বসরা ত্যাগ করলো এবং কুফার দিকে গেলো তার ভাই উসমানকে তার জায়গায় রেখে।
আযদি বর্ণনা করেন যে , আবুল মাখারিক্ব রাসবী বলেন যে , বসরার কিছু শিয়া আব্দুল ক্বায়েস গোত্রের এক মহিলার বাড়িতে জড়ো হলো। মহিলার নাম ছিলো মারিয়া , সা ’ আদ অথবা মানক্বাযের কন্যা , যে ছিলো একজন শিয়া। তার বাড়ি ছিলো তাদের জড়ো হওয়ার জায়গা এবং তারা সেখানে পরস্পর দেখা সাক্ষাৎ করতো। যখন উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে জানানো হলো যে ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের দিকে আসছেন তখন সে তার নিয়োগকৃত তত্ত্বাবধায়ককে চিঠি লিখলো যেন সে পাহারাদার নিয়োগ দেয় এবং রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেয়। ইয়াযীদ বিন নাবীত , যে ছিলো আব্দুল ক্বায়েস গোত্রের একজন , সিদ্ধান্ত নিলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে রক্ষায় যাবে। তার দশ জন ছেলে ছিলো যাদেরকে সে জিজ্ঞেস করলো তার সঙ্গে কে যাবে। তার সন্তানদের মধ্যে দুজন আব্দুল্লাহ এবং উবায়দুল্লাহ রাজী হলো তার সাথে যাওয়ার জন্য। যখন শিয়ারা মারিয়ার বাসায় জড়ো হলো , সে তার সাথীদের উপস্থিতিতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলো। তার বন্ধুরা বললো যে তারা তার বিষয়ে উবায়দুল্লাহর লোকদেরকে ভয় পায়। এর উত্তরে সে বললো ,“ যখন আমার উটের ক্ষুরগুলো মরুভূমিতে পড়বে আমি তাদের ধাওয়াকে ভয় করি না। ” এরপর সে যাত্রা করলো এবং সফলতার রাস্তাগুলো তৈরী করলো এবং মক্কায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পৌঁছে গেলো। সে আবতাহতে অবস্থিত ইমাম হোসেইন (আ.)-এর তাঁবুতে পৌঁছে গেলো। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) তার আসার সংবাদ পেলেন তখন তাকে স্বাগত জানানোর জন্য তিনি উঠে দাঁড়ালেন। যখন সে ইমামের তাঁবুর কাছে চলে এলো , তাকে বলা হলো ইমাম ইতোমধ্যেই চলে গেছেন তার জায়গায় তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য। সে ফিরে চললো এবং দেখলো ইমাম দরজাতে বসে আছেন , তার জন্য অপেক্ষা করছেন এবং তিনি (আ.) বললেন ,
) قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا(
“ আল্লাহর অনুগ্রহে এবং তাঁর রহমতে , এতে তাদের আনন্দ উল্লাস করা উচিত। ” [সূরা ইউনুস : ৫৮]
তখন সে তাকে সালাম জানালো ও বসে পড়লো। এরপর ইমামের কাছে তার উদ্দেশ্য বর্ণনা করলো আর তিনি তার কল্যাণের জন্য দোআ করলেন। সে ইমামের সাথে রয়ে গেলো কারবালা পর্যন্ত এবং সেখানে সে যুদ্ধ করেছিলো এবং তার দুসন্তানসহ সেখানে শহীদ হয়েছিলো।
পরিচ্ছেদ - ৭
কুফার উদ্দেশ্যে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বসরা ত্যাগ
যখন উবায়দুল্লাহ ইয়াযীদের চিঠি পেলো সে বসরায় লোকদের মাঝ থেকে পাঁচশ জনকে বাছাই করলো , যাদের মধ্যে ছিলো আব্দুল্লাহ বিন হুরেইস বিন নওফাল , শারীক বিন আ’ ওয়ার , তাদের দুজনই ছিলো শিয়া এবং মুসলিম বিন আমর বাহিলি এবং তার একদল অনুসারী ও পরিবারকে সাথে নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] যখন সে কুফায় পৌঁছলো , উবায়দুল্লাহ একটি কালো পাগড়ি পড়েছিলো এবং নিজের চেহারা ঢেকে নিয়েছিলো। সেখানকার জনতা সংবাদ পেয়েছিলো যে ইমাম হোসেইন (আ.) কুফায় আসবেন , আর তাই তারা তার আগমনের অপেক্ষায় ছিলো। তারা ভুল করে তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) ভাবলো এবং যে দলের ভিতর দিয়েই সে পথ অতিক্রম করলো তারা তাকে সালাম জানিয়ে বললো ,“ স্বাগতম হে রাসূলের সন্তান!” যখন উবায়দুল্লাহ দেখলো তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর আগমনে উল্লাস প্রকাশ করছে তখন সে চিন্তিত হয়ে পড়লো। যখন লোকজনের সংখ্যা বাড়তে লাগলো মুসলিম বিন আমর চিৎকার দিয়ে বললো“ সরে যাও , এ ব্যক্তি সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ। ” এরপর সে প্রাসাদে পৌঁছালো রাতের বেলা। একদল লোক তখনও তাকে ঘেরাও করেছিলো যারা তখনও ভাবছিলো যে সে ইমাম হোসেইন (আ.) । নোমান বিন বাশীর (তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) মনে করে) তার ও তার সাথীদের মখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। তখন তার এক জন লোক তাকে চিৎকার করে দরজা খুলে দিতে বললো। নোমান তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) মনে করে বললো ,“ আমি আল্লাহর নামে আপনাকে অনুরোধ করছি এখান থেকে চলে যাবার জন্য। কারণ আল্লাহর শপথ , আমি আপনার হাতে আমানত হস্তান্তর করবো না এবং না আমি চাই আপনার সাথে যুদ্ধ করতে।” উবায়দুল্লাহ চুপ করে রইলো এবং আরও কাছে এলো। নোমান তার সাথে ঝুলানো বারান্দা থেকে কথা বলছিলো। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ দরজা খোল , তুমি এখনও দরজা খোল নি এবং তোমার রাত্রিগুলো দীর্ঘ হয়ে গেছে (যে সময় তুমি শাসন করার পরিবর্তে ঘুমিয়েছো) । ” উবায়দুল্লাহর এ কথাগুলো তার পিছনে থাকা এক ব্যক্তি শুনলো , যে পিছন ফিরলো ঐ লোকদের দিকে যারা তাকে ইমাম হোসেইন বলে ভুল করছিলো এবং বললো ,“ হে জনতা , তাঁর শপথ , যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , এ লোক ইবনে মারজানা (উবায়দুল্লাহ) । ”
মাসউদী বলেন যে , যখন জনতা তাকে চিনতে পারলো তখন তারা তার দিকে পাথর ছুঁড়তে আরম্ভ করলো , কিন্তু সে সরে গেলো। [‘ ইরশাদ ’ ] এ সময় নোমান তার জন্য দরজা খুলে দিলো এবং সে প্রবেশ করলো এবং জনতার উপর দরজা বন্ধ করে দিলে তারা যে যার দিকে চলে গেলো।
সকালে সে জামায়াতে নামাযের জন্য ঘোষণা দিলো এবং লোকজন জড়ো হলো। উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলো এবং বললো ,“ আম্মা বা’ আদ , আমিরুল মুমিনীন (ইয়াযীদ) তোমাদের শহরের ও সীমান্তের দায়িত্ব আামাকে দিয়েছেন এবং তোমাদের গণিমত এখন আমার নিয়ন্ত্রণে এবং তিনি আমাকে আদেশ করেছেন নির্যাতিতদের সাহায্য করতে এবং বঞ্চিতদের দান করতে এবং তিনি আমাকে আরও আদেশ করেছেন যেন আমি অনুগতদের প্রতি সদয় হই এবং তোমাদের মাঝে যারা সন্দেহজনক ও বিদ্রোহী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এরপর আমি তোমাদের বিষয়ে তার আদেশ পালন করবো এবং তার আদেশ বাস্তবে প্রয়োগ করবো। আমি অনুগতদের প্রতি একজন দয়ালু পিতার মত হবো এবং আমার বর্শা ও তরবারি তাদের মাথার উপর পড়বে যারা আমাকে অমান্য করবে এবং আমার শাসনের বিরোধিতা করবে। প্রত্যেক মানুষের উচিত তার নিজেকে ভয় করা , সত্য তোমাদেরকে সতর্ক করুক , হুমকি নয়।”
আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে সে বলেছিলো ,“ আমার কথা ঐ হাশেমীর (মুসলিম বিন আক্বীলের) কাছে নিয়ে যাও যে , তার উচিত আমার ক্রোধ থেকে তার নিজেকে রক্ষা করা। ”
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] এরপর সে মিম্বর থেকে নামলো এবং তার সর্দারদের সাথে কড়া আচরণ করলো এবং আদেশ দিলো যে ,“ নিশ্চয়তা দানকারী লোকদের এবং ইয়াযীদের অনুসারীদের নাম লিখে রাখো এবং তাদেরও নাম যারা বিদ্রোহী ও সন্দেহজনক , যারা বিদ্রোহ করতে পারে এবং গণ্ডগোলের সৃষ্টি করতে পারে। এসব লোককে আমার কাছে আনবে যেন আমি তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এরপর যেসব সর্দাররা তাদের নাম লিখবে না তারা নিশ্চয়তা দিবে যে তাদের মধ্যে কেউ আমাদের বিরোধিতা করবে না ও বিদ্রোহ করবে না। যে তা করবে না তাকে ক্ষমা করা হবে না এবং তার রক্ত ও সম্পদ আমাদের জন্য বৈধ হবে। যদি ইয়াযীদের বিরুদ্ধে কোন বিদ্রোহীকে কোন সর্দারের অধীনে কোন জায়গায় পাওয়া যায় এবং সে তার বিষয়ে আমাদের কাছে কোন সংবাদ না দেয় , তাকে তার বাড়ির দরজায় ফাঁসি দেয়া হবে এবং তার ভাতা বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তাকে সিংহের খাবার বানানো হবে। ”
‘ ফুসুলুল মুহিম্মা ’ তে বলা হয়েছে যে , কুফার একদল লোককে সে বন্দী করে এবং তৎক্ষণাৎ হত্যা করে [তাবারি ও মুহাম্মাদ বিন আবি তালিবের গ্রন্থে এবং‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] ।
যখন মুসলিম বিন আক্বীলকে উবায়দুল্লাহর আগমন সম্পর্কে জানানো হলো এবং তিনি তার কথাগুলো শুনলেন , তিনি মুখতারের বাড়ি ত্যাগ করলেন এবং হানি বিন উরওয়াহ মুরাদির দরজায় গেলেন এবং তাকে ডাক দিলেন। যখন হানি বেরিয়ে এলেন তাকে বিরক্ত মনে হলো। মুসলিম বললেন ,“ আমি তোমার দরজায় এসেছি আশ্রয় নিতে ও একজন মেহমান হিসেবে। ” হানি বললেন ,“ তুমি আমাকে সমস্যায় ফেলে দিলে এবং যদি তুমি আমার বাড়িতে প্রবেশ না করতে এবং আমার সাথে আলোচনা করতে , আমি তোমাকে চলে যেতে বলতে খুশী হতাম। কিন্তু আমার বাড়িতে তুমি প্রবেশ করায় তুমি আমাকে দায়িত্বে বেঁধে ফেলেছো , তাই ভিতরে আসো। ” এভাবে হানি তাকে থাকার জায়গা দিলেন এবং শিয়ারা তার সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করতে লাগলো এবং তাকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছ থেকে রক্ষা করতে লাগলো। [‘ মানাক্বিব ’ ] জনগণ মুসলিমের হাতে আনুগত্যের শপথ করতে লাগলো যতক্ষণ পর্যন্তনা তাদের সংখ্যা পঁচিশ হাজারে পৌঁছল। তখন তারা বিদ্রোহ করার জন্য সিদ্ধান্ত নিলো কিন্তু হানি পরামর্শ দিলেন যে তাদের উচিত আরও অপেক্ষা করা।
উবায়দুল্লাহ তার পরামর্শক মা’ ক্বালকে ডাকলো এবং তাকে তিন হাজার দিরহাম দিলো [কামিল ] এবং তাকে বললো মুসলিম বিন আকীল ও তার সাথীদের অবস্থান খুঁজে বের করতে এবং তাদের সাথে মেলামেশা করতে এবং এরপর সে তাদের সাথে এ সম্পদ ভাগ করে নিবে এবং এভাবে তাদের দেখাবে যে সে তাদেরই একজন এবং এভাবে তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানবে ও তাকে সংবাদ দিবে। মা’ ক্বাল মসজিদে প্রবেশ করলো এবং শুনলো মুসলিম বিন আওসাজা আসাদি ইমাম হোসেইন (আ.) এর নামে আনুগত্যের শপথ করছে। মুসলিম সে সময় নামাযে ব্যস্ত ছিলেন। যখন তিনি নামায শেষ করলেন মা’ ক্বাল তার কাছে এলো এবং বললো ,“ হে আল্লাহর বান্দাহ , আমি সিরিয়ার অধিবাসী। যিল কিলার একজন দাস , যাকে আল্লাহ নবীর আহলুল বাইতের (নবী পরিবারের) ভালোবাসা দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন। এখানে তিন হাজার দিরহাম আছে এবং আমি এগুলো ঐ ব্যক্তিকে দিতে চাই যার বিষয়ে আমি শুনেছি তিনি কুফায় এসেছেন এবং তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর নামে আনুগত্যের শপথ নিচ্ছেন। আমি কিছু লোকের মুখে শুনেছি যে আপনি আহলুল বাইত (আ.) এর সাথে পরিচিত। তাই আমি আপনার কাছে এসেছি। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি এ সম্পদ গ্রহণ করতে এবং আপনার সর্দারের কাছে আমাকে নিয়ে যেতে যেন আমি তার কাছে আনুগত্যের শপথ করতে পারি এবং আপনি যদি চান আমি শপথ করবো আপনার হাতে , তার সাথে সাক্ষাৎ করার আগে। ” মুসলিম বললেন ,“ আমি তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে আনন্দিত এবং তোমার গন্তব্যে পৌঁছানোর ইচ্ছা দেখে খুশী এবং আল্লাহ যেন তোমার মাধ্যমে আহলুল বাইত (আ.) কে সাহায্য করেন। কিন্তু আমি চাই না যে জনগণ এ বিষয়ে জানুক তা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এবং আমি অত্যাচারী ও তার ক্ষমতাকে ভয় পাই। ” তখন মুসলিম তার আনুগত্যের শপথকে গ্রহণ করলেন এর প্রতি বিশ্বস্ত ও তা গোপন রাখার দৃঢ় শপথের মাধ্যমে। মা’ ক্বাল তার কাছে কিছু দিন ধরে আসতে লাগলো এবং একদিন মুসলিম তাকে মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) এর কাছে নিয়ে গেলেন।
পরিচ্ছেদ - ৮
কুফাতে উবায়দুল্লাহ
আমরা আগের অধ্যায়গুলোতে দেখেছি যে যখন উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ বসরা থেকে কুফা যেতে চাইলো তখন শারীক বিন আওয়ার তার সাথে ছিলো। শিয়া মতবাদের প্রতি শারীকের শক্তিশালী আকর্ষণ ছিলো। সে সিফফীনের যুদ্ধে আম্মার বিন ইয়াসিরের সাথে ছিলো [‘ কামিল ’ , তাবারি] (হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের পক্ষে ও মুয়াবিয়ার বিপক্ষে) এবং মুয়াবিয়ার সাথে তার বিতর্ক সুপরিচিত ছিলো। যখন শারীক (উবায়দুল্লাহর সাথে) বসরা ছেড়ে এলো পথে সে পরিশ্রান্তও অসুবিধার ভান করলো। সে চেয়েছিলো উবায়দুল্লাহ তার সাথেই থেকে যাবে এবং এভাবে ইমাম হোসেইন (আ.) তার আগেই কুফায় পৌঁছে যাবেন , কিন্তু উবায়দুল্লাহ তার দিকে কোন মনোযোগ দিল না এবং এগিয়ে গেলো।
যখন শারীক কুফায় পৌঁছলো সে হানি বিন উরওয়াহর বাসায় থাকলো এবং তাকে অনবরত উৎসাহিত করতে লাগলো মুসলিম বিন আক্বীলকে এবং তার নেতৃত্বকে সমর্থন দেয়ার জন্য। শারীক অসুস্থ হয়ে পড়লো এবং যেহেতু উবায়দুল্লাহ [কামিল , মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব] এবং অন্যান্য সম্মানিত ব্যক্তিরা তাকে সম্মান করতো তাই সে তাকে একটি সংবাদ পাঠালো যে সে রাত্রে তাকে দেখতে আসবে। শারীক মুসলিমকে বললো ,“ আজ রাতে এ বদমাশ লোকটা আমাকে দেখতে আসবে এবং যখন সে বসবে তখন তুমি পিছন দিয়ে এসে তাকে হত্যা করবে। এরপর তুমি প্রাসাদে যাবে এবং নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে এবং কেউ তোমাকে বাধা দিবে না। আর যদি আমি এ অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভ করি তাহলে আমি বসয়ায় যাবো এবং সেখানকার বিষয়গুলো তোমার জন্য সহজ করে দিবো। ”
[আবুল ফারাজের গ্রন্থে বলা হয়েছে] রাতে উবায়দুল্লাহ শারীককে দেখতে এলো। এর আগে শারীক মুসলিমকে বলেছিলো ,“ যখন ঐ লোক এখানে প্রবেশ করবে তাকে তোমার হাত থেকে পালিয়ে যেতে দিও না। ” হানি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ আমি এতে মত দেই না যে উবায়দুল্লাহকে আমার বাড়িতে হত্যা করা হোক ” এবং এ চিন্তাকে অপছন্দ করলো। উবায়দুল্লাহ এলো এবং বসলো এবং শারীকের কাছে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চাইলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো তার কী অসুখ হয়েছে। যখন তাদের কথোপকথন দীর্ঘ হলো শারীক দেখলো যে কেউ বের হয়ে এলো না এবং আশঙ্কিত হলো যে উদ্দেশ্য সফল হবে না , তখন সে নিচের পঙ্ক্তিগুলো আবৃত্তি করলো।“ কেন সালমাকে উপহার দেয়ার কথা আগ বাড়িয়ে চিন্তা করছো , তাকে (সালমাকে) এবং যে তাকে দান করে , তার গলায় মৃত্যুর পেয়ালাকে ঢেলে দাও। ”
সে এটি দুবার এবং তিন বার বললো। উবায়দুল্লাহ তা শুনে বুঝতে পারলো না এবং বললো , সে প্রলাপ বকছে অসুস্থতার ঘোরে। হানি বললো ,“ হ্যাঁ , তা সত্যি , আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করে দিন , সে এ অবস্থায় আছে গতকাল থেকে। ” উবায়দুল্লাহ উঠলো এবং চলে গেলো।
[তাবারির গ্রন্থে বলা হয়েছে] এছাড়া বলা হয় যে , উবায়দুল্লাহ তার পরামর্শক মেহরানকে সাথে নিয়ে এসেছিলো। যখন শারীক মুসলিমকে বলেছিলো যে সে যখন পানি চাইবে মুসলিম তখন আসবে এবং উবায়দুল্লাহকে আঘাত করবে। উবায়দুল্লাহ এলো এবং শারীকের কাছে তার বিছানায় বসলো এবং তার পরামর্শক মেহরান তার পিছনে তার মাথার কাছে দাড়ালো। শারীক পানি চাইলো এবং যখন কাজের মহিলা পানি আনছিলো তার দৃষ্টি পড়লো মুসলিমের ওপরে যে ওঁত পেতে ছিলো এবং সে সরে গেলো। সে আবার পানি চাইলো কিন্তু কোন সাড়া পেলো না এবং আবার সে তৃতীয় বারের মত পানি চাইলো এবং বললো ,“ আক্ষেপ তোমাদের জন্য! তোমরা আমাকে পানি দিচ্ছো না। আমাকে পানি দাও যদি এতে আমার মৃত্যুও হয়। ” মেহরান বুঝতে পারলো এবং সে উবায়দুল্লাহকে ইশারা করলো , এতে সে উঠে দাঁড়ালো চলে যাবার জন্য। শারীক বললো যে সে উবায়দুল্লাহর কাছে অসিয়ত করে যেতে চায় , সে উত্তর দিলো সে অন্য আরেক সময়ে আসবে এবং এরপর চলে গেলো। মেহরান তাকে দ্রুত নিয়ে চলে গেলো এবং বললো ,“ আল্লাহর শপথ , তারা আপনাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। ”
উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তারা এটি কিভাবে করতে পারে যখন আমি শারীককে সম্মান করি এবং তার প্রতি দয়া দেখাই এবং তাও আবার হানির বাড়িতে , যাকে আমার বাবা উপকার করেছে ?” মেহরান বললো ,“ আমি যা বলছি তা সত্য। ”
[‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] যখন উবায়দুল্লাহ চলে গেলো , মুসলিম লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে এলেন এবং শারীক তাকে জিজ্ঞেস করলো উবায়দুল্লাহকে হত্যা করতে কী তাকে বাধা দিলো। মুসলিম বললেন , তা করতে আমাকে দুটো জিনিস বাধা দিলো। প্রথমত হানি চায় না যে উবায়দুল্লাহকে তার বাড়িতে হত্যা করা হোক এবং একটি হাদীসের জন্য যা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,“ ইসলাম কাউকে বেখবর অবস্থায় হত্যা করতে নিষেধ করে এবং একজন বিশ্বাসী তা থেকে বিরত থাকে। ”
শারীক বললো ,“ তুমি যদি তাকে হত্যা করতে তাহলে তুমি প্রকৃতপক্ষে হত্যা করতে একজন সীমালঙ্ঘনকারী বদমাশ এবং একজন চতুর অবিশ্বাসীকে। ”
ইবনে নিমা বলেন , যখন উবায়দুল্লাহ চলে গেলো এবং মুসলিম শারীকের কাছে এলেন তরবারি হাতে নিয়ে , শারীক তাকে জিজ্ঞেস করলো কী তাকে কাজটি করতে বাধা দিলো। মুসলিম বললেন ,“ আমি যখন প্রায় বেয়িয়ে আসছি তখন হানির স্ত্রী আমাকে অনুরোধ করলো উবায়দুল্লাহকে তাদের বাড়িতে হত্যা না করতে এবং কাঁদতে শুরু করলো । তখন আমি আমার তরবারি ফেলে দিলাম এবং বসে পড়লাম। ” হানি বললেন ,“ ঐ মহিলার জন্য আক্ষেপ , সে নিজেকে এবং আমাকে হত্যা করেছে এবং আমি যা থেকে পালিয়েছি তা শেষ পর্যন্ত ঘটেছে। ”
[‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] শারীক আরও তিন দিন বেঁচে ছিলো এবং এরপর মারা গেলো। উবায়দুল্লাহ তার জানাযার নামাযে ইমামতি করলো এবং পরে তাকে জানানো হলো যে শারীক তাকে হত্যা করতে চেয়েছিলো। সে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি এখন থেকে আর কোন ইরাকীর জানাযায় ইমামতি করবো না এবং যদি (আমার পিতা) যিয়াদ তার পাশেই সমাহিত না হতো আমি অবশ্যই শারীকের লাশ কবর থেকে আবার উঠাতাম। ”
শারীকের মৃত্যুর পর উবায়দুল্লাহর পরামর্শক মা’ ক্বাল , যাকে তাদের ওপরে গোয়েন্দাগিরির জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিলো , তার সম্পদ দিয়ে মুসলিম বিন আওসাজার কাছে এলো। মুসলিম তাকে মুসলিম বিন আক্বীলের কাছে নিয়ে গেলো যিনি তার কাছ থেকে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করলেন। এরপর সে আবু সামামাহ সায়েদিকে ডাকলো , যে সব অর্থনৈতিক লেনদেন দেখাশোনা করতো , যেন সে তার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে। আবু সামামাহ অস্ত্র কেনার দায়িত্বে ছিলো। সে ছিলো আরবদের মাঝে সাহসী হিসেবে সুপরিচিত এবং শিয়াদের মাঝে বিশিষ্টতার অধিকারী। [‘ কামিল ’ ] মা’ ক্বাল তাদের কাছে আসতে শুরু করলো । তাদের কথাবার্তা শুনলো এবং তাদের গোপন কথা জেনে উবায়দুল্লাহর কাছে জানাতে থাকলো। আর হানি নিজেকে অসুস্থ জানিয়ে উবায়দুল্লাহর কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেন।
উবায়দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আশআস এবং আসমা বিন খারেজা এবং আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদিকেও ডাকলো , যার কন্যা রুয়াইয়াহ হানির স্ত্রী ছিলো এবং তার সন্তান ইয়াহইয়ার মা ছিলো। উবায়দুল্লাহ হানির বিষয়ে এবং তাদের কাছ থেকে তার দূরে সরে থাকার খোঁজ খবর নিলো [‘ কামিল ’ ] এবং তাকে বলা হলো যে সে সুস্থ নয়। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আমি শুনেছি সে ভালো আছে এবং দরজায় বসে। যাও তার সাথে দেখা করো এবং তাকে বলো যা তার জন্য বাধ্যতামূলক তা এড়িয়ে না চলতে। ” তারা হানির কাছে এলো এবং বললো ,“ উবায়দুল্লাহ তোমার খোঁজ খবর নিয়েছে এবং বলেছে যে যদি তুমি অসুস্থ হও তিনি তোমাকে দেখতে আসবেন এবং লোকজন তাকে বলেছে যে তুমি প্রায়ই তোমার দরজায় বস। তিনি দৃঢ়ভাবে জানতে চান যে কেন তুমি নিজেকে তার কাছ থেকে সরিয়ে রেখেছো অথচ সেনাপতি এ দূরত্ব বজায় রাখা ও অকৃতজ্ঞতাকে সহ্য করবেন না। তাই আমরা তোমাকে অনুরোধ করছি যে তুমি আমাদের সাথে চলো। ” তখন হানি তার পোষাক চাইলেন এবং তা পরলেন এবং খচ্চরের ওপরে চড়ে বসলেন ; আর যখন তিনি প্রাসাদে পৌঁছালেন তার হৃদয়ে একটি ভয় প্রবেশ করলো যে হয়তো আরও কোন সমস্যা হতে পারে।
হিসান বিন আল আসমা বিন খারেজাকে হানি বললেন ,“ হে ভাতিজা , আমি এ লোকটিকে ভয় পাচ্ছি , তুমি কী মনে কর ?” সে বললো ,“ আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ আমি দেখছি না , তাই অন্তর থেকে ভয় দূর করুন।” আসমা (অথবা হিসান বিন আল আসমা) ফাঁদ সম্পর্কে জানতো না কিন্তু মুহাম্মাদ বিন আল আশআস এ সম্পর্কে ভালোভাবেই জানতো। এরপর তারা হানিকে নিয়ে উবায়দুল্লাহর দরবারে প্রবেশ করলো। যখন উবায়দুল্লাহ হানিকে দেখলো [‘ ইরশাদ’ ] সে বললো ,“ বিশ্বাসঘাতক তার নিজের পায়ে হেঁটেই প্রবেশ করেছে। ”
যখন হানিকে উবায়দুল্লাহর কাছে আনা হলো , শুরেইহ তার পাশেই বসা ছিলো এবং উবায়দুল্লাহ দুই লাইন কবিতা আবৃত্তি করলো ,“ আমি চাই সে বেঁচে থাকুক কিন্তু সে চায় আমাকে হত্যা করতে। ” [‘ কামিল ’ ] উবায়দুল্লাহ আগে হানির প্রতি দয়ালু ছিলো এবং তাই সে তাকে বললো কী ঘটেছে। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য হানি , এ কোন ধরনের দুষ্কর্ম তোমার বাড়িতে ঘটছে আমিরুল মুমিনীনের (ইয়াযীদ) বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে ? তুমি মুসলিমকে এনেছো এবং তাকে তোমার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছো এবং জনশক্তি ও অস্ত্র জড়ো করছো তার জন্য ; আর তুমি কি মনে কর যে আমি এগুলোর কোন খবর রাখি না ?” হানি বললেন ,“ আমি কিছু করি নি। ” উবায়দুল্লাহ বললো যে সে তা করেছে। এরপর যখন তাদের তর্ক বাড়লো , সে তার পরামর্শক (মাকাল)-কে ডাকলো , যাকে সে গোয়েন্দা হিসাবে পাঠিয়েছিলো। সে এলো এবং হানির মুখোমুখি দাঁড়ালো। উবায়দুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো সে তাকে চিনে কিনা , এতে সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো এবং হানি বুঝতে পারলেন সে উবায়দুল্লাহর গোয়েন্দা এবং সে তাদের সব খবর পৌঁছে দিয়েছে। যখন তিনি তার মনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেন তিনি বললেন ,“ আমার কথা শোন এবং বিশ্বাস করো যে , আল্লাহর শপথ , আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলছি না। আমি মুসলিমকে দাওয়াত করি নি এবং তার উদ্দেশ্য সম্পর্কেও আমি জানতাম না , সে আমার বাসায় এলো এবং আমার অনুমতি চাইলো সেখানে থাকার জন্য এবং আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করতে লজ্জা অনুভব করলাম। এভাবে এর দায়িত্ব আমার উপর পড়ে যে আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি এবং এরপরে তুমি জান কী ঘটেছে এবং তুমি যদি চাও তাহলে আমি তোমার হাতে আনুগত্যের শপথ করবো এবং তোমার কাছে পণ জমা রাখবো এবং আমি শপথ করছি যে ফিরে গিয়ে আমি তাকে আমার বাড়ি থেকে বের করে দিবো এবং তোমার কাছে ফেরত আসবো। ”
উবায়দুল্লাহ বললো ,“ না আল্লাহর শপথ , তুমি যাবে না যতক্ষণ না তাকে (মুসলিম) আমার কাছে উপস্থিত কর। ”
হানি বললেন ,“ আমি আমার মেহমানকে তোমার কাছে আনবো না যেন তুমি তাকে হত্যা করতে পারো। ”
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে’ আছে] উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আল্লাহর শপথ , তাকে আমার কাছে তোমাকে আনতেই হবে। ” হানি বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তা কখনোই করবো না।” ইবনে নিমা বর্ণনা করেছেন যে হানি বলেছিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , যদি সে আমার পায়ের তলায়ও থাকে আমি সেগুলো তুলবো না এবং তোমার হাতে তাকে তুলে দিবো না। ”
যখন তাদের তর্ক বিতর্ক বৃদ্ধি পেলো , মুসলিম বিন আমর বাহিলি (কুফায় সে ছাড়া বসরা বা সিরিয়ার কোন লোক ছিলো না) দেখলো যে হানি অনড় হয়ে গেছে , তখন সে উবায়দুল্লাহকে বললো তাকে একটু সময় দিতে যেন সে তার সাথে কথা বলতে পারে। সে হানিকে এক কোণায় নিয়ে গেলো যেখানে উবায়দুল্লাহ তাদের দেখতে পায় এবং বললো ,“ হে হানি , আমি তোমাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি নিজেকে হত্যা না করার জন্য এবং তোমার গোত্রকে কষ্টের ভিতর না ফেলার জন্য। এ লোকটি (মুসলিম বিন আক্বীল) তাদের চাচাতো ভাই এবং তারা তাকে হত্যা করবে না , না তাকে কোন কষ্ট দিবে। তাই তাকে উবায়দুল্লাহর কাছে তুলে দাও এবং এতে তোমার কোন লজ্জা বা শাস্তি হবে না। কারণ তুমি শুধু তাকে সেনাপতির কাছে তুলে দিচ্ছো। ” হানি বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , এতে আমার জন্য রয়েছে লজ্জা ও অপমান। আমি আমার মেহমানকে তার হাতে তুলে দিবো না যখন আমার শক্তি আছে এবং আমার বাহুগুলো শক্তিশালী এবং আমার সাথে রয়েছে অগণিত সমর্থক এবং যদি আমি একাও হতাম এবং আমার কোন সাহায্যকারী নাও থাকতো আমি তাকে তার হাতে তুলে দিতাম না , বরং আমি মরবো তাকে সমর্থন দিতে গিয়ে। ” উবায়দুল্লাহ এ কথাগুলো শুনলো এবং আদেশ করলো তাকে তার কাছে নিয়ে আসতে। যখন হানিকে তারা আনলো সে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , হয় তুমি তাকে আমার কাছে আনবে অথবা আমি তোমার মাথা কেটে ফেলবো। ” হানি উত্তর দিলেন ,“ তুমি যদি তা করো , আল্লাহর শপথ , বহু তরবারি খাপ থেকে খোলা হবে তোমার বাড়ির চারদিকে ।” হানি ভেবেছিলেন যে তার গোত্রের লোকেরা তাকে সাহায্য করবে। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তুমি কি আমাকে তোমার গোত্রের তরবারিকে ভয় পেতে বলছো ?” এরপর সে হানিকে আরও কাছে আনতে বললো। যখন তাকে আনা হলো , উবায়দুল্লাহ তার বেত দিয়ে তার নাকে , কপালে ও গালে আঘাত করতে থাকলো যতক্ষণ না তার নাক ভেঙ্গে গেলো এবং রক্ত গল গল করে বেরিয়ে আসলেন এবং তার জামা কাপড় ভিজিয়ে দিলো। তার কপালের এবং গালের গোশত তার দাড়িতে পড়লো এবং বেতটি ভেঙ্গে গেলো।
তাবারি বলেন যে , আসমা বিন খারেজাকে এবং মুহাম্মাদ বিন আশআসকে উবায়দুল্লাহ বললো হানিকে ডেকে আনতে। তারা বলেছিলো যে সে আসবে না যতক্ষণ না উবায়দুল্লাহ তাকে নিরাপত্তা দেয়। উবায়দুল্লাহ বলেছিলো ,“ তার কোন নিরাপত্তার প্রয়োজন নাই , কিন্তু সে অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়েছে। তাকে আমার কাছে আনো এবং যদি তার জন্য আমি নিরাপত্তা দান না করলে সে তা করতে অস্বীকার করে , তাহলে তা করো। ” তারা হানির কাছে গেলো এবং তাকে জানালো , এতে সে উত্তর দিলো ,“ যদি সে আমাকে ধরতে পারে , সে অবশ্যই আমাকে হত্যা করবে। ” কিন্তু তারা তাকে অনুরোধ করলো এবং তাকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে এলো। সে সময় উবায়দুল্লাহ মসজিদে ছিলো , শুক্রবারের খোতবা দিচ্ছিলো , যখন হানি এলো তার দুপাশের চুল দুকাঁধের দিকে ঝুলছিলো। যখন উবায়দুল্লাহ নামাযের ইমামতি শেষ করলো , সে হানিকে ইঙ্গিত করলো এবং সে তাকে অনুসরণ করলো প্রাসাদ পর্যন্ত , তারা সেখানে প্রবেশ করলো এবং হানি তাকে অভিবাদন জানালেন। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ হে হানি , তুমি কি মনে করতে পারো যখন আমার বাবা (যিয়াদ) এ শহরে (কুফা) এসেছিলেন , তিনি এখানকার একজন শিয়াকেও বাদ দেন নি সবাইকে হত্যা না করা পর্যন্ত , শুধু তোমার বাবা ও হুজর ছাড়া এবং তুমি জানো হুজরের শেষ পর্যন্তকী হয়েছিলো। তিনি (যিয়াদ) তোমাদের প্রতি সব সময় কৃতজ্ঞ ছিলেন এবং তিনি কুফায় সেনাপতিকে লিখেছিলেন যে সে যেন তোমাদের প্রতি সদয় থাকে। ” হানি উত্তর দিলেন যে তিনি তা মনে করতে পারেন। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ এ অনুগ্রহগুলোর প্রতিদানে তুমি তোমার বাড়িতে এক ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছো আমাকে হত্যা করার জন্য ?” হানি বললেন যে তিনি তা করেন নি। তখন উবায়দুল্লাহ সেই তামিমি গোত্রের পরামর্শককে সামনে আনতে বললো এবং হানি বুঝতে পারলেন যে ঐ ব্যক্তি উবায়দুল্লাহর গোয়েন্দা ছিলো এবং তার কাছে সংবাদ পৌঁছে দিয়েছে। হানি বললেন ,“ হে সেনাপতি , যে সংবাদ আপনার কাছে পৌঁছেছে তা অবশ্যই সত্য কিন্তু আমি আপনার সদয় ব্যবহার অস্বীকার করবো না। আপনার পরিবার নিরাপত্তায় থাকবে , আর আপনি যেখানে ইচ্ছা নিরাপত্তাসহ চলে যেতে পারেন। ”
মাসউদী বলেন যে , হানি উবায়দুল্লাহকে বললো ,“ আপনার বাবা নিশ্চয়ই আমাদের প্রতি সদয় ছিলেন এবং কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন। আমি সম্পদশালী এবং আমি চাই আপনাকে (সে কারণে) প্রতিদান দিতে। তাই আপনি কি চান আমি আপনার জন্য কল্যাণকর প্রস্তাব দেই ?” উবায়দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো তা কী। হানি বললো ,“ আপনি এবং আপনার পরিবার আপনাদের সব সামগ্রী এবং সম্পদ নিয়ে সিরিয়ায় চলে যান। কারণ একজন ব্যক্তি যে আপনার ও ইয়াযীদের চাইতে এ সম্মানের জন্য বেশী যোগ্য ও অধিকার রাখে তিনি এসেছেন। ”
তাবারি এবং ইবনে আসীর জাযারি বর্ণনা করেছেন যে , উবায়দুল্লাহ এ কথাগুলো শুনে মাথা নিচু করলো। তার পরামর্শক মেহরান , যে তার পিছনে দাঁড়িয়েছিলো , একটি কাঁটাযুক্ত লাঠি নিয়ে বললো ,“ কী লজ্জা ও অসম্মান যে একজন বেদুইন দাস আপনার রাজ্যে আপনাকেই নিরাপত্তা দিতে চাইছে!” উবায়দুল্লাহ চিৎকার করলো যে হানিকে বন্দী করা হোক। মেহরান তার হাতের লাঠি ফেলে দিলো এবং হানির চুল ধরে তার চেহারাকে উবায়দুল্লাহর দিকে ফিরালো। উবায়দুল্লাহ লাঠিটি মাটি থেকে তুললো এবং হানির মুখে তা দিয়ে আঘাত করতে শুরু করলো । লাঠির কাঁটাগুলো অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে আঘাত করার কারণে উড়ে যেতে লাগলো এবং পাশের দেয়ালে বিদ্ধ হলো। সে হানিকে এমন কঠিনভাবে আঘাত করলো যে তার নাক ও কপালের হাড় ভেঙ্গে গেলো।
ইবনে আসীর জাযারি বলেন যে , হানি তার হাত কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক সৈনিকের তরবারির দিকে বাড়িয়ে দিলে সে পিছনে সরে গেলো। যখন উবায়দুল্লাহ তা দেখলো , সে বললো ,“ তুমি বিদ্রোহ করেছো এবং এভাবে আমাদের জন্য তোমার রক্ত ঝরানো বৈধ করেছো। ”
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] উবায়দুল্লাহ তাকে গ্রেফতার করতে আদেশ দিল। হানিকে নিয়ে যাওয়া হলো প্রাসাদের একটি ঘরে। তাকে বন্দী করে রাখা হলো। দরজায় তালা দেয়া হলো এবং উবায়দুল্লাহ তার উপর পাহারাদার নিয়োগ করলো।
[‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] যখন আসমা বিন খারেজা তা দেখলো , সে উবায়দুল্লাহর দিকে ফিরে দাঁড়ালো এবং বললো ,“ হে ধোঁকাবাজ , হানিকে মুক্ত করে দাও , তুমি আমাদের কাছে শপথ করেছো তাকে রক্ষা করবে এবং যখন আমরা তাকে আনলাম তুমি তার চেহারাকে আহত করেছো। তার রক্ত ঝরিয়েছো এবং এখন তুমি তাকে হত্যা করতে চাও। ” উবায়দুল্লাহ তাকে মারধর করার আদেশ দিলো। তা করা হলো এবং তাকে চুপ করানো হলো। তারা তাকে বিধ্বস্ত অবস্থায় ছেড়ে দিলো এবং সে বসে পড়লো। তখন মুহাম্মাদ বিন আল আশআস (যাকে আসমার সাথে হানিকে আনতে পাঠানো হয়েছিলো) বললো ,“ আমরা সেনাপতির আদেশের সাথে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম , তা আমাদের জন্য লাভজনক হোক বা না হোক। ”
আমর বিন হাজ্জাজ (হানির শ্বশুর) সংবাদ পেলেন হানিকে হত্যা করা হয়েছে আর তাই সে মাযহাজ গোত্রকে সাথে নিয়ে এলো এবং প্রাসাদকে সবদিক থেকে ঘেরাও করে চিৎকার করে বললো ,“ আমি আমর বিন হাজ্জাজ এবং আমার সাথে আছে মাযহাজের সাহসী ও সম্মানিত লোকেরা। আমরা অবাধ্য হই নি , না দলত্যাগ করেছি। ” সে সময় শুরেইহ কাযী উবায়দুল্লাহর পাশে বসেছিলো এবং উবায়দুল্লাহ তাকে বললো হানির কাছে যেতে এবং খোঁজ নিতে এবং তাদের (আমর ও সাথীদের) বলতে যে , সে জীবিত আছে। যখন শুরেইহ গেলো হানি জিজ্ঞেস করলো ,“ হে মুসলমানরা , আমার সাহায্যে আসো , আমার গোত্রকে কি হত্যা করা হয়েছে ? কোথায় ধার্মিকরা এবং কোথায় আমার সাথীরা ? এ শত্রুএবং এক শত্রুর সন্তান কি আমাকে ভীত করবে ?” যখন সে লোকদের কণ্ঠ শুনতে পেলো সে বললো ,“ আমি মনে করি এ কণ্ঠ আমার মাযহাজ গোত্রের (লোকজনের) কণ্ঠ এবং সম্মানিত মুসলমানদের কণ্ঠ এবং যদি তাদের দশ জনও এখানে প্রবেশ করে তাহলে অবশ্যই তারা আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করবে। ” শুরেইহ , যার সাথে উবায়দুল্লাহর প্রহরীরা ছিলো , চলে গেলো এবং পরে বলেছিলো ,“ যদি উবায়দুল্লাহর প্রহরীরা আমার সাথে না থাকতো তাহলে অবশ্যই হানির খবর তাদের কাছে পৌঁছে দিতাম। ” শুরেইহ বাইরে বেরিয়ে এলো এবং বললো ,“ আমি তোমাদের বন্ধুকে নিজ চোখে দেখেছি , সে জীবিত আছে এবং তাকে হত্যা করা হয় নি। ” আমর ও তার সাথীরা বললো ,“ আলহামদুলিল্লাহ যে তাকে হত্যা করা হয় নি। ”
তাবারি বর্ণনা করেন যে , যখন শুরেইহ হানির কাছে এলো , সে বললো ,“ হে শুরেহই , দেখেছো তারা আমাকে কী করেছে। ” শুরেইহ বললো ,“ আমি দেখছি যে তুমি জীবিত আছো।” হানি বললো ,“ এ দুরাবস্থার ভিতরে কি আমাকে জীবিত দেখাচ্ছে ? যাও আমার লোকজনকে বলো যে যদি তারা ফিরে যায় সে (উবায়দুল্লাহ) আমাকে অবশ্যই হত্যা করবে। ” শুরেইহ উবায়দুল্লাহর কাছে ফেরত গেলো এবং বললো ,“ আমি দেখলাম হানি জীবিত আছে কিন্তু নির্যাতনের চিহ্ন তার দেহে স্পষ্ট। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আমি মনে করি এটি যথাযথ যে একজন রাজা তার প্রজাকে নির্যাতন করবে ও শাস্তি দিবে। এ লোকগুলোর কাছে যাও এবং তাদের জানাও। ” শুরেইহ বাইরে এলো এবং উবায়দুল্লাহ মেহরানকে ইশারা করলো তার সাথে যেতে। শুরেইহ উচ্চ কণ্ঠে বললো ,“ কেন এ মিথ্যা হৈচৈ ও চিৎকার ? হানি জীবিত কিন্তু সেনাপতি তাকে শাস্তি দিয়েছেন যা তার জীবনের জন্য কোন ঝুকি নয়। তাই চলে যাও এবং নিজেদের জীবন এবং তোমাদের সাথীদের জীবনকে বিপদের মধ্যে ফেলো না। ” এ কথা শুনে তারা ফিরে গেলো।
শেইখ মুফীদ এবং অন্যরা বলেন যে , আব্দুল্লাহ বিন খাযিন বলেছেন , আমাকে মুসলিম বিন আক্বীল গোয়েন্দা হিসাবে প্রাসাদে নিয়োগ দিয়েছিলেন যেন তাকে জানাই হানির সাথে কী আচরণ করা হচ্ছে। যখন আমি দেখলাম যে তারা হানিকে মারধর করেছে এবং বন্দী করেছে আমি আমার ঘোড়ায় চড়লাম ও দ্রুত গেলাম মুসলিমকে এ বিষয়ে জানাতে এবং আমি বনি মুরাদের কিছু নারীকে দেখলাম তাদের নিজেদের মধ্যে চিৎকার করে বলতে ,“ হায় দুঃখ তার জন্য , হায় শোক তার জন্য। ” আমি মুসলিমের কাছে এলাম এবং যা ঘটেছে তাকে জানালাম। মুসলিম আমাকে যেতে বললেন এবং উচ্চ কণ্ঠে তার সমর্থকদের বলতে বললেন এবং তিনি আশে পাশের বাড়িগুলোতে চার হাজার মানুষ জড়ো করেছিলেন। আমি গেলাম এবং তাদের কাছে উচ্চ কণ্ঠে বললাম ,“ হে জাতির প্রতিরক্ষা বাহিনী , [কামিল] এটি ছিলো তখন তাদের শ্লোগান । তখন তারা পরস্পরকে জানালো এবং মুসলিমের কাছে জড়ো হলো।
জাযারি বলেন যে , মুসলিম কিনদাহ গোত্রের দায়িত্ব দেন আব্দুল্লাহ বিন আযীয কিনদিকে এবং তাকে বললেন তার সামনে হাঁটতে। এরপর তিনি বনি মাযহাজ ও আসাদ গোত্রের দায়িত্ব দিলেন মুসলিম বিন আওসাজা আসাদিকে , তামীম ও হামাদান গোত্রের দায়িত্ব দিলেন আবু সামামাহ সায়েদীর উপর , মদীনার (ব্যাটালিয়নের) দায়িত্ব দিলেন আব্বাস বিন জাদাহ জাদালেকে এবং রাজ প্রাসাদের দিকে রওনা দিলেন। যখন উবায়দুল্লাহর কাছে এ সংবাদ পৌঁছালো , সে প্রাসাদের ভিতরে লুকালো এবং এর দরজা বন্ধ করে দিলো। মুসলিম প্রাসাদকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেললেন আর রাস্তাগুলো ও মসজিদ মানুষে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো এবং তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত জড়ো হতে লাগলো। পরিস্থিতি উবায়দুল্লাহর জন্য অস্থিরতার সৃষ্টি করলো। তার সাথে ত্রিশ জন প্রহরী এবং তার পরিবার ও সম্মানিত লোক ও পরামর্শকদের মাঝে বিশ জন ছাড়া কেউ ছিলো না। সম্মানিত ব্যক্তিরা রোমানদের বিল্ডিং দুটো সংযোগকারী দ্বিতীয় দরজা দিয়ে এসেছিলো এবং জনতা উবায়দুল্লাহ ও তার পিতাকে (যিয়াদকে) গালিগালাজ করছিলো। উবায়দুল্লাহ কাসীর বিন শিহাব হারিসিকে ডাকলো এবং তাকে আদেশ দিলো তার সাথে আরেকজনকে সাথে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে এবং মুসলিমকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য জনতাকে সতর্ক করতে। এছাড়া সে মুহাম্মাদ বিন আল আশআসকে যেতে বললো এবং বনি কিনদা ও হাদরামাওতের মধ্য থেকে তার সমর্থকদের সাথে নিয়ে একটি পতাকা মাটিতে গাড়তে বললো এবং উচ্চ কণ্ঠে বলতে বললো যে , এ পতাকার তলে যে আসবে সে নিরাপদ থাকবে। একইভাবে সে ক্বাক্বা বিন শাওর , শাবাস বিন রাব’ ঈ তামিমি , হাজ্জার বিন আবজার আজালি এবং শিমর বিন যিলজাওশান যাবাবিকেও একই কাজ করতে বললো। সে সর্দারদের ও সম্মানিতদের তার নিজের সাথে রাখলো , তাদের ছাড়া থাকতে চাইলো না যেহেতু তার সাথে খুব কম লোক ছিলো।
তারা বাইরে গেলো এবং জনতাকে তিরস্কার করতে লাগলো মুসলিম বিন আক্বীলকে সমর্থন দানের জন্য। এরপর উবায়দুল্লাহ সম্মানিত ব্যক্তিদের ও সর্দারদের বললো সেসব লোককে মিথ্যা অঙ্গীকারের মাধ্যমে ধোঁকা দিতে যারা তাদের প্রতি অনুগত ছিলো এবং তাদেরকে তিরস্কার করতে এবং সতর্ক করতে যারা তাদের প্রতি অবাধ্য হয়েছিলো। তারা তাই করলো যেভাবে তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিলো , এতই সফলতার সাথে যে যখন লোকজন তাদের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কথা শুনলো তখন তারা চলে যেতে শুরু করলো এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে নারীরা তাদের সন্তান ও ভাইদের কাছে আসতে শুরু করলো এবং তাদের ফিরে যেতে বলতে লাগলো এ বলে যে , অন্য যারা আছে তারাই কাজের (মুসলিমকে সাহায্য করার) জন্য যথেষ্ট। একইভাবে পুরুষরাও আসতে লাগলো (তাদের আত্মীয়দের নিয়ে যেতে) এবং জনতা চলে যেতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত মুসলিমের সাথে ছিলো ত্রিশ জন লোক।
যখন তিনি মসজিদে মাগরিবের নামায পড়লেন ত্রিশ জন লোক তাকে অনুসরণ করলো। এ পরিস্থিতি দেখে তিনি যখন বনি কিনদাহর দরজার দিকে ফিরলেন [ইরশাদ] মাত্র দশ জন তার সাথে রইলো দরজায় পৌঁছানো পর্যন্ত । কিন্তু তিনি দরজা দিয়ে বের হলেন কেউ তার সাথে ছিলো না। এরপর তিনি পিছন ফিরলেন এবং দেখলেন কেউ তার সাথে নেই যে তাকে পথ দেখাবে এবং তাদের বাসায় আশ্রয় দিবে অথবা শত্রুর হাত থেকে তাকে রক্ষা করবে। এ কারণে মুসলিম কুফার অলিতে গলিতে লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরতে লাগলেন। [ইরশাদ]
মাসউদী বর্ণনা করেন যে , যখন মুসলিম তার ঘোড়া থেকে নেমে কুফার রাস্তায় ঘুরতে লাগলেন তিনি জানতেন না কোন দিকে তিনি যাচ্ছেন , যতক্ষণ পর্যন্তনা তিনি বনি জাবালার বাড়ির পাশ দিয়ে গেলেন , যা কিনদাহর একটি শাখা গোত্র। তিনি তাওআহ নামে এক মহিলার বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন , যে ছিলো আশআস বিন ক্বায়েসের দাসী , যে তাকে মুক্ত করে দিয়েছিলো এবং পরে উসাইদ হাযরামি তাকে বিয়ে করেছিলো এবং তার ঘরে বিলাল নামে একটি সন্তান হয়েছিলো। বিলাল কিছু লোকের সাথে বাইরে গিয়েছিলো এবং তাওআহ তার জন্য দরজায় বসে অপেক্ষা করছিলো। যখন মুসলিম তাকে দেখলেন , তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং একট পানির জন্য অনুরোধ করলেন। মহিলা তার জন্য পানি আনলো। পানি পান করে মুসলিম দরজায় বসে পড়লেন। যখন মহিলা পানির কাপটি ঘরে রেখে ফিরে এসে মুসলিমকে দেখলো এবং বললো ,“ হে আল্লাহর দাস , তুমি কি পানি পান করো নি ?” মুসলিম“ হ্যাঁ ” বললেন , মহিলা বললো ,“ সুবহানাল্লাহ , হে আল্লাহর বান্দাহ , উঠো আল্লাহ যেন তোমাকে শক্তি দেন। এখন তোমার পরিবারের কাছে ফেরত যাও। কারণ আমার দরজায় তোমার বসে থাকা ঠিক নয়। না আমি তোমাকে তা করার জন্য অনুমতি দিচ্ছি। ” মুসলিম দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহর দাসী , এ শহরে না আছে আমার কোন বাড়ি , না আছে আমার গোত্র। আপনি ছিলেন উদার ও সদয়দের একজন। হয়তো বা ভবিষ্যতে আমি এর প্রতিদান আপনাকে দিতে পারবো ।”
মহিলা তাকে জিজ্ঞেস করলো সে কী করতে পারে তার জন্য। মুসলিম বললেন ,“ আমি মুসলিম বিন আক্বীল , এ লোকগুলো আমাকে ধোঁকা দিয়েছে এবং জালিয়াতি করেছে এবং আমাকে নিরাপদ স্থান থেকে বের করে এনেছে। ” মহিলা (আশ্চর্য হয়ে) জিজ্ঞেস করলো সত্যিই সে মুসলিম বিন আক্বীল কিনা , তিনি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন। সে তখন তাকে বাড়িতে প্রবেশ করতে বললো এবং মুসলিম তা করলেন। মহিলা তাকে আলাদা একটি ঘর দিলো , যা সে নিজে ব্যবহার করতো না এবং তার জন্য দস্তরখান বিছিয়ে দিলো এবং খাওয়ার জন্য খাবার দিলো , কিন্তু মুসলিম খেতে পারলো না। হঠাৎ তাওআহর ছেলে ফিরে আসলো [‘ কামিল ’ ] এবং খেয়াল করলো যে তার মা ঐ ঘরে বার বার প্রবেশ করছে। সে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো ঐ ঘরে তার কী কাজ , সে যতই জিজ্ঞেস করলো সে উত্তর দিলো না। ছেলে তাকে জোর করলো এবং শেষ পর্যন্ত সে বলে দিলো তা গোপন রাখার এবং অন্য কাউকে বলবে না এ অঙ্গীকার গ্রহণের মাধ্যমে আর তাই ছেলেটি চুপ করে রইলো।
আর উবায়দুল্লাহর বিষয়ে , যখন হৈচৈ ও চিৎকার থেমে গেলো সে তার সমর্থকদের বললো কেউ রয়ে গেছে কিনা দেখতে। তারা দেখলো কেউ নেই এবং তাকে তা জানালো। তখন উবায়দুল্লাহ মসজিদে এলো ইশার নামাযের আগে এবং তার সমর্থকদের মিম্বরের চারপাশ ঘিরে বসালো। এরপর সে আদেশ দিলো যে ঘোষণা করা হোক যে ,“ ইশার নামাযের জন্য উপস্থিত’ থাকবে না এমন প্রত্যেক সেনাপতি , গোত্রপতি এবং যোদ্ধার রক্ত আমাদের জন্য বৈধ। ” একারণে মসজিদ মানুষে ভরে গেলো এবং উবায়দুল্লাহ ইশার নামায পড়ালো। এরপর সে মিম্বরে উঠলো এবং আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললো ,“ আম্মা বা’ আদ , নিশ্চয়ই আক্বীলের ছেলে এক অজ্ঞ ও মূর্খ ব্যক্তি , এসেছে বিভেদ ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দিতে , যা তোমরা সবাই দেখেছো। যে তাকে বাড়িতে আশ্রয় দিবে তার রক্ত আমাদের জন্য বৈধ হবে এবং আমরা তাকে অর্থ দিয়ে পুরস্কৃত করবো যে তাকে আমাদের কাছে ধরে আনবে। ” এরপর সে জনতাকে উপদেশ দিলো অনুগত থাকার জন্য এবং তার সাথে থাকার জন্য। এরপর সে হাসীন বিন নামীরকে আদেশ দিলো সব রাস্তা বন্ধ করে দিতে এবং বাড়িগুলো তল্লাশী করতে। হাসীন ছিলো পুলিশ বাহিনীর প্রধান এবং বনি তামীম গোত্রের।
আবুল ফারাজ বলেন যে , মুসলিমকে আশ্রয়দানকারী বৃদ্ধা মহিলা (তাওআহ)-এর ছেলে সকালে ঘুম থেকে উঠলো এবং আব্দুর রহমান বিন আল আশআসকে বললো যে মুসলিম তার বাড়িতে আছে তার মায়ের মেহমান হিসেবে। আব্দুর রহমান দ্রুত তার বাবা মুহাম্মাদ বিন আশআসের কাছে গেলো , যে সে সময় উবায়দুল্লাহর সাথে বসেছিলো। সে পুরো ঘটনাটি ফিসফিস করে তার (সৎ) বাবাকে বললো। উবায়দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো সে কী বলছে। মুহাম্মাদ বললো যে ,“ সে সংবাদ এনেছে যে , আক্বীলের সন্তান (মুসলিম) আমাদের বাড়িগুলোর একটিতে রয়েছে। ” উবায়দুল্লাহ তার লাঠি দিয়ে তার শরীরের পাশে গুতো দিয়ে বললো ,“ এখনই যাও এবং তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। ”
আবু মাখনাফ বলেন যে , কুদামাহ বিন সা’ আদ বিন যায়েদাহ সাক্বাফি তার কাছে বর্ণনা করেছে যে , উবায়দুল্লাহ বনি ক্বায়েস গোত্র থেকে সত্তর জন লোককে পাঠালো আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস সালামির অধীনে মুহাম্মাদ বিন আল আশআসের সাথে এবং তারা সেই বাড়িতে এলো যেখানে মুসলিম ছিলেন।
‘ কামিল-ই-বাহাই ’ তে বর্ণিত আছে যে , যখন মুসলিম বিন আক্বীল ঘোড়ার ডাক শুনতে পেলেন , তিনি নামায দ্রুত শেষ করলেন। এরপর তিনি তার বর্ম পড়লেন এবং তাওআহ্কে বললেন ,“ নিশ্চয়ই আপনি আমার উপকার করেছেন এবং আমার প্রতি সদয় ছিলেন এবং আপনি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শাফায়াত পাওয়ার অংশীদার হয়েছেন , যিনি মানুষ ও জিনের অভিভাবক। গত রাতে আমি আমার চাচা আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) কে স্বপ্নে দেখেছি , যিনি বললেন আগামীকাল আমি তার পাশে থাকবো। ”
‘ মাক্বাতিল ’ -এ আছে যে , যখন সকালের নামাযের সময় ঘনিয়ে এলো তাওআহ মুসলিমের জন্য পানি নিয়ে এলেন যেন সে অযু করতে পারে এবং বললো ,“ হে আমার অভিভাবক , আপনি কি কাল রাতে ঘুমান নি ?” মুসলিম বললেন ,“ আমি কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়েছিলাম এবং আমার চাচা আমিরুল মুমিনীন (আলী আ.)-কে দেখলাম , আমাকে আদেশ করছেন দ্রুত এগোবার জন্য এবং দ্রুত শেষ করার জন্য , তাই এ থেকে আমি বুঝতে পেরেছি আজ আমার জীবনের শেষ দিন। ”
‘ কামিল-ই-বাহাই ’ তে আছে যে , যখন শত্রুসৈন্যরা তাওআহর বাড়িতে পৌঁছালো মুসলিম ভয় পেলেন তারা হয়তো তার (মহিলার) বাড়িটি আগুনে পুড়িয়ে ফেলবে এবং তাই তিনি বাইরে বেরিয়ে এলেন এবং চুয়াল্লিশ জন শত্রুকে হত্যা করলেন।
সাইয়েদ ইবনে তাউস ও শেইখ জাফর ইবনে নিমা বলেন যে , মুসলিম তার বর্ম পড়লেন এবং তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং তার তরবারি দিয়ে তাদের আঘাত করে তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।
‘ মুসলিম বিন আক্বীল ঘোড়াতে চড়লেন ’ -এ বর্ণনা শুধু সাইয়েদ ইবনে তাউস এবং ইবনে নিমার কাছ থেকে এসেছে এবং আমি আর কাউকে তা বর্ণনা করতে দেখিনি কিন্তু বাকী সব বর্ণনা এর সত্যতা বহন করে। মাসউদী তার‘ মুরুজুয যাহাব ’ -এ বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন যে তাওআহর বাড়িতে প্রবেশের আগে মুসলিম তার ঘোড়ায় চড়েছিলেন এবং এরপর ঘোড়া থেকে নেমে কুফার রাস্তায় ঘুরছিলেন। তিনি জানতেন না কোন দিকে তিনি যাচ্ছেন যতক্ষণ পর্যন্তনা আশআস বিন ক্বায়েসের দাসীর বাড়িতে তিনি পৌঁছালেন এবং পানি চাইলেন। সে তাকে পানি পান করতে দিলো এবং জিজ্ঞেস করলো তিনি কে। মুসলিম তার কাছে নিজের পরিচয় দিলেন এবং সে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লো এবং তাকে তার মেহমান হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালো।
আবুল ফারাজ বলেন যে , যখন মুসলিম অনেক ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ও লোকদের কণ্ঠ শুনতে পেলেন তিনি বুঝতে পারলেন তারা তার জন্য এসেছে এবং তিনি তার তরবারি খাপমুক্ত করলেন। লোকজন বাড়িতে প্রবেশ করলো এবং ছড়িয়ে গেলো। তা দেখে তিনি তাদের ভীষণভাবে আক্রমণ করলেন , যখন তারা এ অবস্থা দেখলো তারা দৌঁড়ে ছাদে উঠে গেলো এবং পাথর ও জ্বলন্ত লাকড়ি তার মাথায় ছুঁড়ে মারতে লাগলো। যখন মুসলিম এগুলো দেখলেন তিনি নিজেকে নিজে বললেন ,“ নিশ্চয়ই এ সংগ্রাম আক্বীলের সন্তানকে হত্যা করার জন্য। হে আমার সত্তা , অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাও। ” এরপর তিনি তার তরবারি তুলে তাদেরকে রাস্তায় মোকাবিলা করলেন।
মাসউদী এবং অন্যরা বলেছেন যে , যুদ্ধ চলতে লাগলো মুসলিম বিন আক্বীল ও বুকাইর বিন হুমরান আহমারির মাঝে , বুকাইর তার তরবারি দিয়ে মুসলিম বিন আক্বীলের মুখে আঘাত করলো , যা ওপরের ঠোঁট কেটে নিচের ঠোঁটের উপর পড়লো এবং তাও কেটে ফেললো। মুসলিম ভয়ানক আঘাত করলেন তার মাথার ওপরে এবং আরেকটি তার কাঁধের ওপরে যা তার পেট পর্যন্ত পৌঁছালো। মুসলিম নিচের যুদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন ,
“ আমি শপথ করে বলছি , আমি শুধু নিহত হবো স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে। যদিও আমি মৃত্যুকে ভয়ানক বিষয় বলে ভাবি , প্রত্যেক ব্যক্তি একদিন এক খারাপের মুখোমুখি হবে। আমি আশঙ্কা করি যে আমাকে ধোঁকা দেয়া হবে এবং বিভ্রান্ত করা হবে। ”
যখন মুহাম্মাদ বিন আশআস তা শুনতে পেলো সে তার কাছে গেলো এবং বললো ,“ আমরা তোমাকে মিথ্যা বলবো না এবং ধোঁকাও দিবো না। ” এরপর সে মুসলিমকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলো। মুসলিম তার আশ্বাস গ্রহণ করলেন। তারা তাকে একটি খচ্চরের পিঠে চড়িয়ে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে গেলো। যখন মুহাম্মাদ বিন আশআস মুসলিমকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছিলো তখন সে তার তরবারি ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলো। একজন কবি মুহাম্মাদের (বিন আশআসের) এ কৌতুক সম্বন্ধে বলেছেন ,“ তুমি তোমার চাচাকে পরিত্যাগ করেছো এবং তাকে সাহায্য করাতে আলস্য করেছো। হায় , তুমি যদি সেখানে না থাকতে সে হয়তো একটি নিরাপদ স্থান অর্জন করতো। হায় , তুমি তাকে হত্যা করেছো যাকে মুহাম্মাদ (সা.) এর সন্তান পাঠিয়েছিলো , তুমি লজ্জাহীনভাবে তার তরবারি ও ঢাল তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিলে।৬ ”
ওপরের কবিতাটি হুজর বিন আদির সম্বন্ধেও বলা হয়েছে যার সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করবো।
তিনি তাদের একচল্লিশ জনকে হত্যা করেছিলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব বলেন যে , যখন মুসলিম অনেক জনকে হত্যা করে ফেললেন এবং এ খবর উবায়দুল্লাহর কাছে পৌঁছে গেলো তখন সে মুহাম্মাদ বিন আল আশআসের কাছে একজনকে সংবাদ দিয়ে পাঠালো যে ,“ আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি একজনের বিরুদ্ধে (যুদ্ধ করতে) এবং আদেশ করেছি তাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতে অথচ তোমার লোকদের মাঝে একটি গুরুতর ফাটল দেখা যাচ্ছে। তাহলে তোমার অবস্থা কী হবে যদি আমরা এর বদলে অন্য কারো কাছে পাঠাই ?” মুহাম্মাদ উত্তর পাঠালো ,“ হে সেনাপতি , আপনি কি মনে করেন আপনি আমাদের পাঠিয়েছেন কুফার কোন সবজি বিক্রেতা অথবা বিদেশী শরণার্থীর বিরুদ্ধে ? আপনি কি জানেন না যে আপনি আমাদেরকে পাঠিয়েছেন এক ভয়ানক সিংহ ও এক তরবারির ওস্তাদ এবং বিখ্যাত যোদ্ধার বিরুদ্ধে যে সৃষ্টির সেরা ব্যক্তির পরিবার থেকে এসেছে ?” । উবায়দুল্লাহ উত্তর পাঠালো ,“ তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দাও যতক্ষণ পর্যন্তনা তোমরা তার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারো। ”
কোন কোন বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে মুসলিম ছিলেন সিংহের মত এবং তার বাহুতে এত শক্তি ছিলো যে তিনি মানুষকে তার দুহাত তুলে ছাদের উপর ঢিল দিয়ে ফেলতে পারতেন।
সাইয়েদ ইবনে তাউস তার‘ মালহুফ ’ -এ লিখেছেন যে , যখন মুসলিম (আ.) অনেক ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনতে পেলেন , তিনি তার বর্ম পড়লেন এবং তার ঘোড়ায় চড়লেন। এরপর তিনি উবায়দুল্লাহর সৈন্যদলকে আক্রমণ করলেন এবং তাদের অনেককে হত্যা করলেন। মুহাম্মাদ বিন আল আশআস তাকে উচ্চ কণ্ঠে বললো ,“ হে মুসলিম , তোমার জন্য নিরাপত্তা আছে। ” যখন মুসলিম তা শুনলেন তিনি বললেন ,“ কিভাবে ধোঁকাবাজ ও খারাপ লোকদের অঙ্গীকারের উপর একজন নির্ভর করতে পারে ?” এরপর তিনি তাদের দিকে ফিরলেন এবং যুদ্ধ শুরু করলেন হুমরান বিন মালিক খাসা’ মির কবিতা আবৃত্তি করে ,“ আমি শপথ করে বলছি , আমি শুধু নিহত হব স্বাধীন ব্যক্তি হিসেবে , যদিও আমি মৃত্যুকে ভয়ানক বিষয় বলে ভাবি , অথবা তা ঠাণ্ডাকে প্রচণ্ড তাপে পরিণত করে এবং সূর্যের রশ্মিকে ভিন্নপথে পরিচালিত করে (চিরদিনের জন্য) । প্রত্যেক মানুষ একদিন এক খারাপের মুখোমুখি হবে , আমি আশঙ্কা করি যে আমাকে প্রতারিত করা হবে এবং বিভ্রান্ত করা হবে। ”
তখন সৈন্যরা হৈচৈ শুরু করলো এবং চিৎকার করে বললো ,“ কেউ তোমাকে মিথ্যা বলবে না এবং ধোঁকাও দিবে না। ” কিন্তু তিনি তাদের কথায় কোন কান দিলেন না। তখন সৈন্যদের এক বিরাট দল তাকে আক্রমণ করলো। তিনি তার শরীরে অনেকগুলো আঘাত পেলেন এবং একজন লোক পিছন দিক থেকে তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো। মুসলিম তার ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন এবং তাকে গ্রেফতার করা হলো।
ইবনে শাহর আশোবের‘ মানাক্বিব ’ -এ লেখা হয়েছে যে মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) তীর ও পাথরে এত গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন যে তার শক্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো এবং একটি দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়েছিলেন। এরপর তিনি বললেন ,“ তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আমার দিকে পাথর ছুঁড়ে মারছো যা একজন অবিশ্বাসীর প্রতি করা হয় অথচ আমি হচ্ছি নৈতিকতা সম্পন্ন নবীর পরিবারের সদস্য! নবীর পরিবারের প্রতি কি তোমাদের কোন শ্রদ্ধা নেই তার অধিকার থাকা সত্ত্বেও ?” তখন মুহাম্মাদ বিন আল আশআস বললো ,“ নিজেকে হত্যা করো না , নিশ্চয়ই তুমি আমার নিরাপত্তায় আছো। ” মুসলিম বললেন ,“ আমি আত্মসমর্পণ করবো না তোমার হাতে বন্দী হওয়ার জন্য , যতক্ষণ আমার শক্তি আমার সাথে রয়েছে। আল্লাহর শপথ , তা কখনোই হবে না। ” এ বলে তিনি তাদের আক্রমণ করলেন এবং তারা দূরে পালিয়ে গেলো।
এরপর মুসলিম বললেন ,“ হে আল্লাহ! পিপাসা আমাকে মেরে ফেলছে। ” তখন তারা সব দিক থেকে তাকে আক্রমণ করলো এবং বুকাইর বিন হুমরান আহমারি তরবারির আঘাতে তার ওপরের ঠোঁট কেটে ফেললো। তখন মুসলিম তাকে তার বাঁকা তরবারি দিয়ে আঘাত করলেন যা তার পেট চিরে ফেললো ও তাকে হত্যা করলো। তখন কেউ একজন তার পিছন দিক থেকে তাকে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করলো এবং তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন ; আর এভাবে তিনি গ্রেফতার হয়ে গেলেন।
শেইখ মুফীদ , জাযারি এবং আবুল ফারাজ বলেন যে , মুসলিম সারা শরীরে আহত ছিলেন এবং যুদ্ধ করে ক্লান্ত ছিলেন। শব্দ করে শ্বাস নিতে নিতে তিনি একটি বাড়ির দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন। মুহাম্মাদ বিন আল আশআস তার কাছে এলো এবং বললো যে সে তাকে নিরাপত্তা দিবে। মুসলিম জনতার দিকে ফিরলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন তারা সবাই এর সাথে একমত কিনা এবং তারা উত্তরে হ্যাঁ বললো শুধুমাত্র উবায়দুল্লাহ (অথবা আব্দুল্লাহ) বিন আব্বাস সালামি ছাড়া , সে বললো ,“ এর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। ” একথা বলে সে এক পাশে সরে দাঁড়ালো। মুসলিম উত্তর দিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , যদি তোমরা আমাকে নিরাপত্তা না দাও আমি কখনোই আমার হাত তোমাদের হাতে দিবো না। ” তারা একটি খচ্চর আনলো এবং তাকে এর উপর উঠালো। তারা তাকে সব দিক থেকে ঘেরাও করলো এবং তার তরবারি নিয়ে নিলো। মুসলিম তখন খুব হতাশ হয়ে গেলেন , তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগলো। তিনি বুঝতে পারলেন এ লোকগুলো তাকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করবে এবং তাই তিনি বললেন ,“ এটি হচ্ছে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। ” মুহাম্মাদ বিন আল আশআস বললো ,“ আমি আশা করি তোমার জন্য কোন বিপদ হবে না। ” মুসলিম বললেন ,“ এটি কি শুধুই আশা ? তাহলে তোমার নিরাপত্তার অঙ্গীকার কোথায় ? নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর কাছে ফেরত যাবো। ”
এরপর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন এবং উবায়দুল্লাহ বিন আব্বাস সালামি বললো ,“ যে ব্যক্তি আশা করে যা তুমি আশা করেছো এবং সে যখন এ অবস্থায় আসে যার মধ্যে তুমি এখন আছো তার কাঁদা উচিত নয়। ” মুসলিম বললেন ,“ আমি আমার জন্য কাঁদছি না এবং না আমি ভয় পাই মৃত্যুকে , যদিও মৃত্যুর সাথে বন্ধুত্ব আমি করি না। কিন্তু আমি কাঁদছি আমার আত্মীয় স্বজনের জন্য এবং আমার পরিবারের লোকদের জন্য যারা এখানে শীঘ্রই এসে পৌঁছাবে এবং আমি কাঁদছি হোসেইন ও তার পরিবারের জন্য। ” এরপর মুসলিম মুহাম্মাদ বিন আল আশআস এর দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ আমি বিশ্বাস করি যে তুমি তোমার নিরাপত্তার অঙ্গীকার পূরণ করতে ব্যর্থ হবে। ” এরপর তিনি চাইলেন যে একজন দূত পাঠানো হোক ইমাম হোসেইন (আ.) কে পরিস্থিতি জানিয়ে যেন তিনি এখানে না আসেন।
শেইখ মুফীদ বর্ণনা করেন যে , মুসলিম মুহাম্মাদ বিন আল আশআসকে বললেন ,“ হে আল্লাহর বান্দাহ , আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তুমি তোমার নিরাপত্তার অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারবে না যা তুমি আমাকে দিয়েছো , তাই একটি ভালো কাজ করো। কাউকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পাঠাও যে আমার কথা তার কাছে বর্ণনা করবে। কারণ আমি মনে করি তিনি আজ অথবা আগামীকাল এখানে আসার জন্য তার পরিবারসহ রওনা হবেন। দূত তার কাছে জানাবে যে তাকে মুসলিম বিন আক্বীল পাঠিয়েছে , যাকে তারা বন্দী করেছে এবং সে মনে করে আজকে সন্ধ্যার আগেই তাকে সম্ভবত হত্যা করা হবে। সে খবর পাঠাচ্ছে যে: আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক , আপনি আপনার পরিবার নিয়ে পিছন ফিরে যান। কুফার লোকদের সুযোগ দেবেন না আপনাকে ধোঁকা দেয়ার জন্য। এরাই হচ্ছে আপনার পিতার সাথীরা , যাদের সম্পর্কে আপনার পবিত্র পিতা (ইমাম আলী) চাইতেন যেন তিনি মারা যান এবং এভাবে তাদের কাছ থেকে মুক্তি পান। কুফার লোকেরা আপনার কাছে মিথ্যা বলেছে এবং যাকে মিথ্যা বলা হয়েছে তার কোন সিদ্ধান্তনেই। ” একথা শুনে মুহাম্মাদ বিন আল আশআস বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তোমার সংবাদ পৌঁছে দিবো। ”
জাফর বিন হুযাইফা থেকে আযদি বর্ণনা করেন যে , মুহাম্মাদ বিন আল আশআস আয়াস বিন আতাল তাইকে ডাকলো যে মালিক বিন আমর বিন সামামাহর সন্তান ছিলো। আয়াস ছিলো একজন কবি এবং মুহাম্মাদের বিশ্বস্ত , সে তাকে বললো ,“ ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে যাও এবং তাকে এই চিঠিটি দাও। ” এরপর সে বিষয়বস্তু লিখলো যা মুসলিম তাকে বলেছিলো এবং বললো ,“ এগুলো হচ্ছে তোমার ভ্রমণের রসদ এবং এগুলো হচ্ছে তোমার পরিবারের জন্য খরচ (তোমার অনুপস্থিতিতে) । ” আয়াস বললো ,“ আমার একটি উটের প্রয়োজন কারণ আমার উট দুর্বল হয়ে গেছে। ” মুহাম্মাদ বললো ,“ আমার এ জিন পরানো উটটি নাও এবং যাও। ” আয়াস চলে গেলো এবং চার রাত পরে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে যুবালা হতে পৌঁছালো এবং তার কাছে সংবাদ পৌঁছে দিলো এবং মুসলিমের চিঠি হস্তান্তর করলো। তার কথা শোনার পর ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,
“ যা কিছু নির্ধারিত হয়ে আছে তা ঘটবে এবং আমরা আশা করি আল্লাহ আমাদের ও মানুষের দুষ্কর্মের মাঝে ফয়সালা করে দিবেন। ” মুসলিম বিন আকীল (আ.) যখন হানি বিন উরওয়াহর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন আঠারো হাজার লোক তার কাছে বাইয়াত করেছিলো। মুসলিম আবিস বিন শাবীব শাকিরিকে পাঠালেন একটি চিঠি দিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে , যা ছিলো এরকম ,“ আম্মা বা’ আদ , যে পানির খোঁজে যায় সে তার পরিবারের কাছে এ সম্পর্কে মিথ্যা বলে না। কুফার জনগণের মধ্য থেকে আঠারো হাজার পুরুষ আমার কাছে আনুগত্যের শপথ করেছে। তাই আমার চিঠি পাওয়ার পর দ্রুত এগোন , কারণ সব মানুষ আপনার সাথে আছে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইচ্ছা মুয়াবিয়ার সন্তানের সাথে নেই। সালাম। ”
ওপরের চিঠিটি উল্লেখিত হয়েছে‘ মুসীরুল আহযান ’ -এ , যা আবিস বিন আবি শাবীব শাকিরি এবং ক্বায়েস বিন মুসাহহির সায়দাউইর সাথে পাঠানো হয়েছিলো ,“ আম্মা বা’ আদ , যে পানির সন্ধানে যায় সে এ সম্পর্কে তার পরিবারের কাছে মিথ্যা বলে না। কুফার সব লোক আপনার পক্ষে এবং তাদের মধ্য থেকে আঠারো হাজার পুরুষ আমার কাছে আনুগত্যের শপথ করেছে। আমার চিঠি যখনই পড়বেন , দ্রুত আসবেন , সালাম ও আল্লাহর রহমত ও বরকত আপনার ওপরে।”
মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের দরবারে
আর মুসলিমের বিষয়ে , মুহাম্মাদ বিন আল আশআস তাকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রাসাদে নিয়ে গেলো। মুহাম্মাদ একা সেখানে প্রবেশ করলো এবং তাকে বললো যে সে মুসলিমকে বন্দী করেছে কিন্তু তাকে নিরাপত্তার আঙ্গীকারও দিয়েছে। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তোমার সেই অধিকার নেই বরং আমি তোমাকে পাঠিয়েছিলাম তাকে আমার কাছে ধরে আনার জন্য। ” মুহাম্মাদ তা শুনে চুপ হয়ে গেলো। যখন মুসলিম প্রাসাদের দরজায় বসে ছিলেন তিনি একটি জগ দেখলেন ঠাণ্ডা পানিতে পূর্ণ এবং সামান্য একটু চাইলেন। মুসলিম বিন আমর বাহিলি বললো ,“ তুমি কি দেখছো এ পানি কত ঠাণ্ডা ? আল্লাহর শপথ , তুমি এ থেকে এক ফোঁটাও পাবে না যতক্ষণ না তুমি জাহান্নামের ফুটন্ত পানি পান করবে। ” মুসলিম তাকে জিজ্ঞেস করলেন তার পরিচয় কী। সে উত্তর দিলো ,“ আমি সত্যকে স্বীকৃতি দিয়েছি আর তুমি তা পরিত্যাগ করেছো। আমি হলাম সেই ব্যক্তি যে জাতির ও ইমামের কল্যাণকামী অথচ তুমি তার জন্য অকল্যাণ কামনা করেছো এবং আমি তার প্রতি অনুগত আর তুমি তাকে অমান্য করেছো। আমি মুসলিম বিন আমর বাহিলি। ” মুসলিম উত্তর দিলেন ,“ তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক , কী নিষ্ঠুর ও সহানুভূতিহীন এবং কর্কশ ব্যক্তি তুমি। হে বাহিলার সন্তান , নিশ্চয়ই তুমি জাহান্নামের ফুটন্ত পানি পান করার বিষয়ে এবং জাহান্নামে চিরদিন থাকার বিষয়ে আমার চেয়ে বেশী যোগ্য। ” তখন আমারাহ বিন আতবাহ তাকে পানি দিতে বললো।
ইরশাদ ও ইবনে আসীরের‘ কামিল ’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে আমর বিন হুরেইস তার পরামর্শককে পানি আনতে পাঠালো। পরামর্শক একটি পানির জগ , একটি মুখ মোছার রুমাল ও একটি পেয়ালা আনলো এবং মুসলিমকে পানি পান করতে দিলো। [কামিল] যখন মুসলিম পেয়ালাটি নিলেন পানি পান করার জন্য তখন তা তার নিজের রক্তে ভরে গেলো , তাই তিনি তা পান করতে পারলেন না। তিন বার তার কাপ পানিতে পূর্ণ করা হলো এবং যখন তৃতীয় বারের মত পানি ভরা হলো তখন তার সামনের দাঁত এর ভিতরে পড়লো। মুসলিম বললেন ,“ আলহামদুলিল্লাহ , এ পানি যদি আমার জন্য হতো তাহলে আমি তা পান করতে পারতাম। ”
এরপর মুসলিমকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের সামনে নেয়া হলো এবং তিনি তাকে সালাম বললেন না। একজন প্রহরী বললো ,“ কেন তুমি সেনাপতিকে সালাম বললে না ?” মুসলিম উত্তর দিলেন ,“ কেন তাকে আমি সালাম বলবো যখন সে আমাকে হত্যা করতে চায় এবং যদি সে আমার মৃত্যু না চায় তাহলে তার জন্য আমার প্রচুর সালাম রয়েছে। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আমার জীবনের শপথ , তুমি অবশ্যই মরবে। ” মুসলিম বললেন ,“ তাই কি হবে ?” এতে উবায়দুল্লাহ আবার হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। তখন মুসলিম বললেন ,“ যদি তাই হয় তাহলে আমাকে কিছু সময় দাও যেন আমি আমার আত্মীয়দের কারো কাছে আমার অসিয়ত করে যেতে পারি। ” উবায়দুল্লাহ তাতে সায় দিলো। মুসলিম উমর বিন সা’ আদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ আমাদের মাঝে আত্নীয়তা রয়েছে। আমি চাই তোমার কাছে একান্তে কিছু বলতে। ” উমর রাজী হলো না। এতে উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তোমার চাচাতো ভাইয়ের আশা পূরণ করতে অস্বীকার করো না। ” তা শুনে উমর উঠে দাঁড়ালো [ইরশাদ] এবং মুসলিমের সাথে এমন এক জায়গায় বসলো যেখানে উবায়দুল্লাহ তাদের দেখতে পারে [কামিল] ।
মুসলিম বললেন ,“ আমি কুফাতে প্রায় সাত শত দিরহাম ঋণী হয়েছি , তাই তা শোধ করো মদিনাতে আমার যে সম্পত্তি আছে তা বিক্রয় করে। ” [কামিল]“ এবং আমার মৃত্যুর পর আমার লাশ উবায়দুল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে দাফন করো। এছাড়া কাউকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পাঠাও যে তাকে ফেরত পাঠাবে। ” উমর উবায়দুল্লাহর কাছে গেলো এবং বললো , যা মুসলিম তাকে বলেছে। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ একজন বিশ্বস্ত লোক বিশ্বাসঘাতকতা করে না কিন্তু কোন কোন সময় একজন বিশ্বাসঘাতক একটি বিশ্বস্ততা পূরণ করে। আর (মুসলিমের) সম্পদের বিষয়ে তুমি যা করতে চাও কর এবং হোসেইনের বিষয়ে , যদি সে আমাদের দিকে না আসে আমরা তার দিকে যাবো না। কিন্তু সে যদি আমাদের মোকাবিলা করে তাহলে আমরা তার (ক্ষতি করা) থেকে নিজেদের বিরত রাখবো না। তার (মুসলিমের) লাশ সম্পর্কে , আমরা অবশ্যই এ বিষয়ে তোমার হস্তক্ষেপ গ্রহণ করবো না। ” অন্যরা বলে যে , সে বলেছিলো ,“ আর লাশের বিষয়ে , আমরা তাকে হত্যা করার পর এটি আমাদের মাথা ব্যথা নয় , তা নিয়ে তোমার যা ইচ্ছা করতে পারো। ” এরপর সে মুসলিমের দিকে ফিরলো এবং বললো ,“ হে আক্বীলের সন্তান , জনগণ ঐক্যবদ্ধ ছিলো এবং পরস্পর একমত ছিলো , কিন্তু তুমি এলে এবং তাদের বিভক্ত করলে এবং বিভেদ সৃষ্টি করলে। ” মুসলিম উত্তর দিলেন ,“ তা ঠিক নয় , এ শহরের লোকদের অভিমত হচ্ছে যে তোমার পিতা (যিয়াদ) অনেক ধার্মিক লোককে হত্যা করেছে। সে তাদের রক্ত ঝরিয়েছে এবং খোসরো (প্রাচীন ইরানের শাসক) ও সিযারদের (রোমের শাসক) অনুসরণ করেছে। আমরা এসেছি ন্যায়বিচারের আদেশ দিতে এবং পবিত্র কোরআন ও (নবীর) সুন্নাহর দিকে আমন্ত্রণ জানাতে। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ হে সীমালঙ্ঘনকারী , এগুলোর সাথে তোমার সম্পকর্কী ? কেন তুমি তা জনগণের ভিতরে করো নি যখন তুমি মদীনায় মদপানে ব্যস্ত ছিলে ?” (আউযুবিল্লাহ) মুসলিম বললেন ,“ আমি মদ পান করেছি ? আল্লাহর শপথ , তিনি জানেন যে তুমি সত্য কথা বলছো না , না আমি সেরকম যেরকম তুমি আমাকে বর্ণনা করছো , অথচ মদপান হচ্ছে তাদের অভ্যাস যারা ক্রোধ ও শত্রুতায় (উবায়দুল্লাহ ও তার পিতা) মুসলমানদের রক্ত ঝরায় এবং যে উল্লাস ও আনন্দ প্রকাশ করে যেন সে কখনোই কোন অশ্লীল কাজ করে নি (ইয়াযীদের কথা ইঙ্গিত করে) । ” উবায়দুল্লাহ প্রচণ্ড রাগান্বিত হলো এবং বললো ,“ আল্লাহ আমাকে হত্যা করুক যদি আমি তোমাকে হত্যা না করি এমনভাবে যেভাবে ইসলামে কাউকে কোন দিন হত্যা করা হয় নি। ” মুসলিম বললেন ,“ এটি তোমার জন্যই শোভা পায় যে তুমি ইসলামে নতুন কিছু আবিষ্কার (বিদ ’ আত) চালু করবে যা কোন দিন ঘটে নি। তুমি একজন জঘন্য খুনী , নির্যাতনকারী বদমাশ , খারা প্রকৃতির এবং নীচ শ্রেণীর মানুষ , তাদের সবার চাইতে যারা তোমার আগে চলে গেছে। ” তখন উবায়দুল্লাহ তাকে , ইমাম হোসেইন (আ.) কে ও ইমাম আলী (আ.) ও হযরত আক্বীল (আ.) কে গালিগালাজ করতে লাগলো এবং এ সময় মুসলিম তার সাথে কথা বললেন না।
মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিব (আ.) কে হত্যা
মাসউদী বলেন , যখন তাদের কথা শেষ হলো এবং মুসলিম উবায়দুল্লাহর সাথে কঠোর ভাষায় কথা বললেন , সে আদেশ করলো মুসলিমকে প্রাসাদের ছাদে নিয়ে যেতে এবং বুকাইর বিন আহমারিকে বলা হলো তার মাথা কেটে ফেলতে ও তার প্রতিশোধ নিতে।
জাযারি বলেন যে , মুসলিম (আ.) মুহাম্মাদ বিন আল আশআসকে বলেছিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি কখনই আত্মসমর্পণ করতাম না যদি না তুমি আমাকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার দিতে। তাই আমাকে নিরাপত্তা দাও তোমার তরবারিটি দিয়ে যেহেতু তোমার অঙ্গীকার ভঙ্গ করা হয়েছে।” এরপর তারা তাকে প্রাসাদের ছাদে নিয়ে গেলো এবং তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছিলেন এবং তাঁর প্রশংসা ও তাসবীহ করছিলেন। তখন তারা তাকে সে জায়গায় নিলো যেখান থেকে মুচিদের দেখা যায় এবং তার পবিত্র মাথাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো যা নিচে পড়ে গেলো (আল্লাহর রহমত ও করুণা তার উপর বর্ষিত হোক) । তার হত্যাকারী ছিলো বুকাইর বিন হুমরান যাকে মুসলিম এর আগে আহত করেছিলো। এরপর তার দেহটিও নিচে ফেলে দেয়া হলো। যখন বুকাইর নিচে নেমে এলো উবায়দুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ মুসলিম কী বলছিলো যখন তুমি তাকে ছাদে নিয়ে গেলে ?” সে বললো যে , মুসলিম আল্লাহর প্রশংসা করছিলো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছিলো। আমি যখন তাকে হত্যা করতে চাইলাম আমি তাকে বললাম আমার কাছে আসতে এবং বললাম ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে তোমার উপর ক্ষমতা দিয়েছেন আর এভাবে আমি তোমার উপর প্রতিশোধ নিচ্ছি।” এরপর তাকে আঘাত করলাম কিন্তু তা ব্যর্থ হলো। তখন মুসলিম বললো ,“ হে কৃতদাস , তুমি কি তোমার প্রতিশোধ নাও নি আমাকে আহত করে ?” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়েও এ রকম মর্যাদাবোধ ?” বুকাইর বললো ,“ এরপর আমি তাকে দ্বিতীয় আঘাত করলাম এবং তাকে হত্যা করলাম। ”
তাবারি বলেন যে , মুসলিমকে প্রাসাদের ছাদে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হলো এবং দেহটি নিচে জনতার দিকে ছুঁড়ে দেয়া হলো। আদেশ দেয়া হলো যে তার লাশ ময়লা ফেলার জায়গার নিয়ে যাওয়া হোক এবং সেখানে ঝুলিয়ে রাখা হোক।
হানি বিন উরওয়াহ মুরাদির শাহাদাত
মাসউদী বলেন যে , বুকাইর বিন হুমরান আহমারি মুসলিমের মাথা কেটে নিচে ছুঁড়ে দিলো এবং এরপর তার দেহটিও ছুঁড়ে ফেললো। এরপর উবায়দুল্লাহ আদেশ দিলো যে হানিকে বাজারে নিয়ে যাওয়া হোক এবং তার মাথা কেটে ফেলা হোক তার হাত বাঁধা অবস্থায়। হানি তার মুরাদ গোত্রের লোকদের ডাক দিলেন , যাদের প্রধান ও মুখপাত্র তিনি নিজেই ছিলেন , তাকে সাহায্য করার জন্য। হানি যখন ঘোড়ায় চড়তেন (যুদ্ধের জন্য) বনি মুরাদের চার হাজার বর্ম পরিহিত লোক ও আট হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে তার সাথে থাকতো এবং যদি কিনদা গোত্রের লোকেরা থাকতো যাদের সাথে তার চুক্তি ছিলো , তাহলে ত্রিশ হাজার বর্ম পরিহিত মানুষ তার সাথে থাকতো। তা সত্ত্বেও প্রয়োজনের সময় কেউ তাকে সাড়া দিলো না ঢিলেমি এবং ধোঁকার কারণে।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , মুহাম্মাদ বিন আল আশআস উবায়দুল্লাহর কাছে এলো এবং হানির বিষয়ে সুপারিশ করলো এ বলে যে ,“ আপনি জানেন হানি এ শহরে এবং গোত্রের মধ্যে তার পরিবারও কী মর্যাদা রাখে। তার লোকজন জানে যে আমি এবং আমার সাথীরা তাকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি , তাই আমি আপনাকে আল্লাহর সকম ¡ দিয়ে অনুরোধ করছি তাকে আমার কাছে তুলে দিন , কারণ আমি এ শহরের লোকদের সাথে কোন শত্রুতা চাই না। ” উবায়দুল্লাহ তা করার অঙ্গীকার করলো কিন্তু পরে অনুতাপ করলো এবং তৎক্ষণাৎ আদেশ দিলো যে হানিকে বাজারে নিয়ে যাওয়া হোক এবং তার মাথা কেটে ফেলা হোক। তারা তার হাত দুটো একত্রে বাঁধা অবস্থায় তাকে বাজারে নিয়ে গেলো সে যায়গায় যেখানে ভেড়া জবাই করা হয় , তখন তিনি উচ্চ কণ্ঠে বলছিলেন ,“ হে মাযহাজ , আজকে আমার জন্য মাযহাজের কেউ নেই ? হে মাযহাজ , মাযহাজ কোথায় ?” যখন হানি অনুভব করলেন কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসছে না তিনি তার হাত দড়ি থেকে টান দিলেন এবং চিৎকার শুরু করলেন ,“ কোন একটি লাঠি , একটি চাকু , একটি পাথর এমনকি একটি হাড়ও কি নেই যা দিয়ে একটি মানুষ নিজেকে রক্ষা করতে পারে ?” প্রহরীরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তার হাত শক্ত করে বাঁধলো এবং তাকে তার মাথা এগিয়ে দিতে বললো (যেন তারা তার মাথা কেটে ফেলতে পারে) । এতে তিনি উত্তর দিলেন ,“ আমি এ বিষয়ে উদার নই এবং আমাকে হত্যা করতে তোমাদের সাহায্য করবো না। ” তখন রাশীদ নামের উবায়দুল্লাহর এক তুর্কী চাকর হানির ওপরে তার তরবারি দিয়ে আঘাত করলো যা তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হলো। হানি বললেন ,“ নিশ্চয়ই প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকে। হে আল্লাহ (আমি আসছি) তোমার রহমত ও তোমার বেহেশতের দিকে। ” এরপর সে দ্বিতীয় আঘাত করলো যা হানিকে শহীদ করে দিলো (আল্লাহর রহমত ও শান্তি তার উপর বর্ষিত হোক) ।
ইবনে আসীরের‘ কামিল ’ -এ লেখা আছে যে আব্দুর রহমান বিন হাসীন মুরাদি তুর্কী সেই চাকরের সাক্ষাৎ পেয়েছিলো (যে হানিকে হত্যা করেছিলো) , সে উবায়দুল্লাহর সাথে ভ্রমণে ছিলো এবং সে তাকে হত্যা করেছিলো।
আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর আসাদি হানি ইবনে উরওয়াহ ও মুসলিম বিন আক্বীলের হত্যা সম্পর্কে বলেন (কবি ফারাযদাক্বের উদ্ধৃতি দিয়ে) ,“ যদি তুমি না জান মৃত্যু কী , তাহলে হানির দিকে তাকাও বাজারে এবং আক্বীলের সন্তানের দিকে , যার চেহারা তরবারির আঘাতে ক্ষতে ঢাকা ছিলো এবং অন্যজন , যে ছাদ থেকে মৃত্যুর দিকে পড়েছে , ইবনে যিয়াদের ক্রোধ তাদের দুজনকেই আঘাত করেছে এবং তারা পথের ওপরে প্রত্যেক ভ্রমণকারীর কাছে বীরে পরিণত হয়েছে। তুমি দেখেছো একটি মাথাবিহীন মৃতদেহ , মৃত্যু যার রং পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং তার রক্ত প্রবাহিত হয়েছে প্রচুর , নদীর মতো , একজন যুবক যে ছিলো এক যুবতীর চাইতেও লাজুক , ছিলো ধারালো তরবারির চাইতেও ভেদকারী , আসমা কি নিরাপদ কোন বাহনে চলেছে যা হাঁটার গতিতে চলছে এবং মাযহাজ (গোত্র) তাকে প্রতিশোধ নিতে বলছে এবং মুরাদ , তার চারদিকে ঘোরাফেরা করছে ? এবং তাদের সবাই‘ প্রশ্নকারী ও যাকে প্রশ্ন করা হয় ’ তাদের ভয়ে আছে। তাই যদি তুমি তোমার দুই অভিভাবকের (মৃত্যুর) প্রতিশোধ না নাও তাহলে তুমি অবৈধ (সন্তান) ও নীচ। ”
উবায়দুল্লাহ মুসলিম ও হানি দুজনের মাথাকেই ইয়াযীদের কাছে পাঠালো , যে তাকে একটি ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দিলো , যা ছিলো এরকম ,“ আমি সংবাদ পেয়েছি হোসেইন ইরাকের দিকে আসছে। রাস্তাগুলোর উপর প্রহরী নিয়োগ করো , রসদ জোগাড় করো এবং সতর্ক থাক। সন্দেহজনকদের কারাগারে অথবা হাজতে বন্দী করো এবং তাদের হত্যা করো যারা তোমার সাথে যুদ্ধ করে। ”
‘ ইরশাদ ’ -এ বলা হয়েছে যে ইয়াযীদ বলেছে ,“ সন্দেহের উপর ভিত্তি করে লোকজনকে গ্রেফতার করো এবং অভিযুক্তদের হত্যা করো এরপর আমাকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত রাখো। ”
মাসউদী বলেন , মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) মঙ্গলবার দিন ৬০ হিজরির ৮ই জিলহজ্বে কুফাতে বিদ্রোহ করেন। ঐ দিনই ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ছেড়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন এবং মুসলিম ৯ই জিলহজ্ব বুধবার , আরাফাতের দিন শাহাদাতবরণ করেন। এরপর উবায়দুল্লাহ আদেশ দিলো মুসলিমের দেহ ঝুলিয়ে রাখতে এবং তার মাথা দামেশকে পাঠিয়ে দিলো। এটিই হচ্ছে বনি হাশিমের প্রথম দেহ যা (শহরের) দরজায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিলো এবং প্রথম মাথা যা দামেশকে পাঠানো হয়েছিলো।
‘ মানাক্বিব ’ -এ লেখা আছে দুটো মাথাই হানি বিন হাবূহ ওয়াদিঈকে দিয়ে দামেশকে পাঠানো হয়েছিলো এবং দামেশকের (শহরের) দরজায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিলো।
শেইখ ফখরুদ্দীনের‘ মাক্বতাল ’ -এ উল্লেখ আছে যে , মুসলিম ও হানির দেহ বাজারে মাটিতে হিঁচড়ে নেয়া হয়েছিলো। যখন মাযহাজ গোত্রের লোকেরা তা জানতে পারলো তারা তাদের ঘোড়ায় চড়লো এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করলো তাদের পরাজিত করা পর্যন্ত এবং মুসলিম ও হানির লাশ তাদের কাছ থেকে নিয়ে নিলো। এরপর তারা লাশের গোসল দিল এবং কাফন পরিয়ে দাফন দিলো। আল্লাহর রহমত তাদের উপর বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর কঠিন অভিশাপ বর্ষিত হোক তাদের হত্যাকারীদের উপর।
সংযোজনী
‘ হাবিবুস সিয়ার ’ -এ উল্লেখ আছে , হানি বিন উরওয়াহ ছিলেন কুফার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং একজন অসাধারণ শিয়া এবং বলা হয় যে তিনি নবী (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তার সাথী হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন। যখন তাকে শহীদ করা হয় তখন তিনি ছিলেন উননব্বই বছরের বৃদ্ধ। তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদা প্রমাণিত হয় উবায়দুল্লাহর সামনে তার বক্তব্যের মাধ্যমে , যা ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসউদী বলেন যে , তিনি ছিলেন এজন শিয়া এবং মুরাদ গোত্রের প্রধান। বর্ম সজ্জিত অশ্বারোহী চার হাজার ও পদাতিক আট হাজার ব্যক্তি তার সাথী হতো। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কে মুসলিম ও হানির শাহাদাত সম্পর্কে জানানো হলো তিনি বললেন ,“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন ” এবং আরও বললেন ,“ তাদের দুজনের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। ”
এছাড়া তিনি লোকজনের উপস্থিতিতে একটি চিঠি পড়লেন ,“ আল্লাহর নামে , যিনি সর্বদয়ালু , সর্ব করুণাময় , আমাদের কাছে এ হৃদয়বিদারক সংবাদ এসে পৌঁছেছে যে , মুসলিম , হানি এবং আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতুরকে শহীদ করা হয়েছে। ”
হানি বিন উরওয়াহর কবর যিয়ারত
মুহাম্মাদ বিন মাশহাদির‘ মাযার ’ -এ , সাইয়েদ ইবনে তাউসের‘ মিসবাহুয যায়ের ’ -এ , শেইখ মুফীদের‘ মাযার ’ -এ এবং শেইখ শহীদের‘ মাযার ’ -এ (আল্লাহ তাদের আত্মাকে আরও পবিত্র করুন) কুফার মসজিদে দোআর বিষয়ে উল্লেখ আছে যে ,“ তার (হানি বিন উরওয়াহ) কবরের পাশে দাঁড়াও এবং মুহাম্মাদ (সা.) ও তার পরিবারের উপর সালাম পাঠাও ; এরপর বল ,‘ আল্লাহর শান্তিও রহমত আপনার উপর বর্ষিত হোক হে হানি বিন উরওয়াহ , সালাম বর্ষিত হোক হে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ধার্মিক ও মুখলেস দাস (শেষ পর্যন্ত) । ” এরপর দুরাকাত নামায পড়ো হাদিয়া হিসেবে এবং তাকে বিদায় জানাও।
এছাড়া হানি ছিলেন তাদের একজন যারা ইমাম আলী (আ.) এর সাথে থেকে জামালের যুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। ইবনে শাহর আশোবের‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখ আছে যে , তিনি সে যুদ্ধে এ যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন ,“ এটি একটি যুদ্ধ যার পথ প্রদর্শক হচ্ছে একটি উট , তাদের সামনে তাদের নারী যে ভুল পথের সর্দার , অথচ আলী হলেন অভিভাবকদের অভিভাবক এবং মালিক। ”
সাইয়েদ মোহসীন কাযমি তার‘ তাকমেলাহ ’ তে লিখেছেন ,“ হানি প্রশংসাযোগ্য ব্যক্তিদের একজন ছিলেন এবং আমরা যা উল্লেখ করেছি তা (তার গুণ সম্পর্কে) প্রমাণ করে। ” এরপর তিনি বলেন ,“ আগে সাইয়েদ মাহদী বাহারুল উলুম হানির (আন্তরিকতা) সম্পর্কে সন্দেহে ছিলেন। এরপর তিনি তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করলেন এবং অনুতপ্ত হলেন এবং ক্ষমা চেয়ে হানির প্রশংসায় কবিতা লিখেছেন। ”
এ লেখক (আব্বাস কুম্মি) বলেন যে , উল্লেখিত সাইয়েদ মাহদী বাহারুল উলুম তার‘ রিজাল ’ -এ হানির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে , বিভিন্ন সূত্রের খবরগুলো একমত যে হানি বিন উরওয়াহ মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) কে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন এবং জনশক্তি ও অস্ত্রশক্তি সংগঠিত করেন। তিনি মুসলিমকে উবায়দুল্লাহর হাতে তুলে দিতে অস্বীকার করেন , এমনকি এর জন্য জীবন কোরবান করতেও প্রস্তুত ছিলেন , তখনও যখন তাকে হয়রানি করা হয়েছে , মারধর করা হয়েছে , নির্যাতন করা হয়েছে , বন্দী করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তার দুহাত বাধা অবস্থায় তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর এটি হচ্ছে তার নৈতিক গুণাবলীর ও সফল পরিসমাপ্তির পরিষ্কার প্রমাণ। তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথী ও শিয়া (অনুসারী) হিসেবে বিবেচিত যারা তার জন্য জীবন কোরবান করেছেন। যে কথাগুলো তিনি উবায়দুল্লাহকে বলেছেন তা তার (আন্তরিকতার) প্রমাণ। তা ছিলো ,“ যে ব্যক্তি এসেছে তিনি আপনার চাইতে এবং আপনার অভিভাবকের (ইয়াযীদের) চাইতে খিলাফতের জন্য বেশী যোগ্য। ” এছাড়া শেইখ ফখরুদ্দীন তুরেইহির‘ মুনতাখাব ’ -এ উল্লেখ আছে যে , তিনি বলেছিলেন ,“ যদি মুহাম্মাদ (সা.) এর পরিবারের কোন শিশুও আমার পায়ের নিচে লুকিয়ে থাকে আমি তা তুলবো না যতক্ষণ না তা কেটে ফেলা হবে। ” এ ধরনের বক্তব্য যা তিনি দিয়েছেন তা সাক্ষী দেয় যে তিনি যা করেছেন তা তার দূরদৃষ্টি ও বুদ্ধির কারণে এবং ঘৃণা বা অহংকারের জন্য নয় এবং শুধু এ কারণেও নয় যে , তিনি মুসলিমকে আশ্রয় দিয়েছিলেন (আর তাই তাকে রক্ষা করতে বাধ্য ছিলেন) ।
ইমাম হোসেইন (আ.) এর নিচের কথাগুলো এর সাক্ষী হয়ে আছে। যখন ইমাম তার ও মুসলিমের শাহাদাতের সংবাদ পেলেন তিনি তাদের জন্য আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করলেন এবং কয়েক বার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং বললেন ,“ একটি হৃদয় বিদারক সংবাদ আমাদের কাছে পৌছেছে যে মুসলিম বিন আকীল , হানি বিন উরওয়াহ এবং আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতুরকে শহীদ করা হয়েছে।”
সাইয়েদ ইবনে তাউসের‘ মালহুফ ’ -এ উল্লেখ আছে যে যখন মুসলিম ও হানির সংবাদের পর আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতূরের শাহাদাতের খবর ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পৌছলো , তার চোখ দুটো পানিতে পূর্ণ হয়ে গেলো এবং তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমাদের জন্য ও আমাদের অনুসারীদের জন্য রহমতের মাক্বাম দান করো এবং আমাদেরকে তোমার নেয়ামতপূর্ণ বিশ্রামস্থলে একত্রিত করো , নিশ্চয়ই তুমি সব কিছুর উপর শক্তি রাখো। ”
আমাদের অভিভাবকরা (ওলামা) (আল্লাহর রহমত তাদের উপর বর্ষিত হোক) হানির প্রতি সালাম উল্লেখ করেছেন এবং এখনও তার কবর যিয়ারত করছেন। তারা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন যে তিনি ছিলেন প্রশান্তিলাভকারী শহীদ। (যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন) তারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন এবং এভাবে তার রহমত ও করুণায় প্রবেশ করেছেন , আর তার প্রতি সালাম হলো ,“ আল্লাহর অপার শান্তি... (শেষ পর্যন্ত) । ”
এরপর বলা হয়েছে যে , সালামের বিষয়বস্তু শুধু সাধারণ কোন সংবাদ নয় এবং যদি তা হয়েও থাকে তাহলে এর বিষয়বস্তু প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন প্রশান্তিলাভকারী শহীদ , একজন উচ্চ মর্যাদাবান ব্যক্তি এবং তার শেষ ছিলো সুন্দর। আমি আমাদের শেইখদের যেমন , মুফীদ এবং অন্যান্য আলেমদের দেখেছি তারা হানিকে সম্মানিত ব্যক্তিদের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তার নামের শেষে বলেছেন ,“ আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন ,” অথবা“ আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন” এবং আমি কোন আলেমকে পাই নি তার সমালোচনা করতে বা তাকে তিরস্কার করতে।
আর যে ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে যে , উবায়দুল্লাহ যখন কুফায় এলো হানি তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়েছিলেন এবং অন্যান্য গণ্যমান্য লোকদের সাথে তার সাথে দেখা সাক্ষাৎ বজায় রাখলেন যতক্ষণ না মুসলিম বিন আকীল ¡ তার বাড়িতে এলেন। ঘটনাটি কোন ক্রমেই হানির বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে না। কারণ তা ছিলো তাক্বিয়ার (সতর্কতার) কারণে। হানি ছিলেন একজন সুপরিচিত ব্যক্তি এবং উবায়দুল্লাহ তাকে তাই বিবেচনা করতো এবং তার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতো। যদি এ পরিস্থিতিতে তিনি নিজেকে একাকী ও উবায়দুল্লাহর কাছ থেকে সরিয়ে রাখতেন তাহলে তার সতর্কতা অবলম্বন ব্যর্থ হয়ে যেতো - যা একজন মুসলমানের দায়িত্বের ভিত্তি। তাই তার জন্য প্রয়োজন ছিলো উবায়দুল্লাহর সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তার সাথে প্রায়ই সাক্ষাৎ করা যেন তিনি তার সন্দেহের মধ্যে না পড়েন। কিন্তু যখন মুসলিম তার বাড়িতে এলেন , তিনি উবায়দুল্লাহর কাছে যাওয়া কমিয়ে দিলেন এবং অসুস্থ হওয়ার ভান করলেন , কিন্তু যা তিনি চিন্তা করেন নি তাই ঘটলো।
আর তাড়াহুড়া করে মুসলিমের বিদ্রোহ করাতে তার বাধা দেয়ার কারণ হতে পারে তার দূরদৃষ্টির জন্য এবং তিনি চেয়েছিলেন আরও বেশী বেশী লোক জমা হোক এবং যেন বিরাট সংখ্যায় অস্ত্র সংগৃহীত হতে পারে এবং যেন ইমাম হোসেইন (আ.) নিজে কুফাতে আসেন। এভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে , আর যদি কখনো যুদ্ধ শুরু হয় তা যেন ইমামের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হয় এবং তার নিজের বাড়িতে উবায়দুল্লাহকে হত্যা করাতে বাধা দেয়ার বিষয়ে ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে যে এ বিষয়ে বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে। কেউ বলেন যে , হানি নিজে পরিকল্পনা করেন যে তিনি অসুস্থতার ভান করবেন যেন উবায়দুল্লাহ যখন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসবে তখন যেন মুসলিম তাকে হত্যা করতে পারে এবং উল্লেখ আছে যে , মুসলিম বলেছিলেন যে একজন মহিলা কেঁদেছিলো এবং বাড়ির ভিতরে উবায়দুল্লাহকে হত্যা না করার জন্য অনুরোধ করেছিলো। সাইয়েদ মুরাতাযা একা তার‘ তানযিয়াহুল আম্বিয়াহ ’ গ্রন্থে এ কারণ উল্লেখ করেছেন। মুসলিমকে আশ্রয় দানের বিষয়ে হানির কাছে উবায়দুল্লাহর প্রশ্ন এবং এর উত্তরে হানির জবাবে ছিলো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি মুসলিমকে আমার বাসায় আমন্ত্রণ জানাই নি এবং না আমি তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম। সে আমার বাড়িতে এসেছে এবং আমার অনুমতি চেয়েছে সেখানে থাকার জন্য এবং আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারি নি , এভাবে এর দায় দায়িত্ব আমার উপর পড়ে।” এ কথাগুলো হানি বলেছিলেন উবায়দুল্লাহর হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এবং সতর্কতা অবলম্বনের কারণে এবং এটি সম্ভব নয় যে মুসলিম হানির কাছে আশ্রয় নিবেন তাকে না জানিয়েই এবং তার কাছ থেকে শপথ না নিয়েই , যার কারণে হানি তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকবেন। আবার এটিও সম্ভব নয় যে হানি একজন গণ্যমান্য শিয়া হয়ে মুসলিমের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বেখবর থাকবেন। এভাবে তা প্রমাণ করে , যা‘ রওযাতুস সাফা ’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে , তা নির্ভরযোগ্য নয় , যে হানি মুসলিমকে বলেছিলেন ,“ তুমি আমাকে এক বিরাট সমস্যা ও কষ্টে ফেলেছো এবং যদি তুমি আমার দরজা দিয়ে প্রবেশ না করতে আমি তোমাকে দূর করে দিতাম। ” -এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং এ বক্তব্য আর কোথাও উল্লেখিত হয় নি।
ইবনে আবিল হাদীদ তার‘ শারহে নাহজুল বালাগাহ ’ তে হানি সম্পর্কে দুটো বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। একটি তার প্রশংসা করে , অপরটি তাকে তিরস্কার করে। যেটি প্রশংসা করে তা হলো ইমাম আলী (আ.) সম্পর্কে তার এ বক্তব্যের জন্য যে ,“ তাকে স্বীকৃতি দেয়াতে আমিই প্রথম ছিলাম এবং তাকে অস্বীকার করার বিষয়ে আমি প্রথম হবো না। ” সাইয়েদ (র.) হানিকে প্রশংসা করে বর্ণনাটি উল্লেখ করেছেন এবং যেটি তিরস্কার করে তাতে (নাহজুল বালাগাহ , ক্ষমতায়ন অধ্যায়ে) উল্লেখ করেছেন যে ইমাম আলী (আ.) বলেছেন ,“ রাজত্বের চাবি হচ্ছে প্রশস্ত বক্ষ।” ৭
একে প্রত্যাখ্যান করে তিনি (সাইয়েদ) বলেন যে এটি গল্প ছাড়া কিছু নয় এবং রেওয়ায়েত হওয়ার ভিত্তি রাখে না। কারণ এতে বর্ণনাকারীদের উল্লেখ নেই। এছাড়া এটি অন্য কোন বই থেকে বা ইতিহাসে ও জীবনীমূলক বই থেকেও উল্লেখিত হয় নি। ঐতিহাসিকরা সেই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন যে মুয়াবিয়া জনগণকে তার ছেলে ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হওয়ার জন্য আদেশ করেছিলো এবং যারা সম্মত হয়েছিলো এবং যারা অস্বীকার করেছিলো তাদের বিষয়ে এবং অন্যান্য বিষয়েও উল্লেখ করেছেন , কিন্তু ওপরের ঘটনাটি সেখানে অনুপস্থিত। তাই যদি এ ঘটনা সত্য হতো তাহলে তার উল্লেখ থাকতো , কারণ তা উল্লেখযোগ্য একটি বিষয়। এছাড়া হানি ইয়াযীদের প্রতি আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করেছিলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করতে গিয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং তার জন্য নিহত হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে তারা তার ওপরে উল্লেখিত দোষ উল্লেখ করতেন যদি তা সত্য হতো। হানির বিষয়টি ছিলো আল হুর (আ.) এর মত যিনি তওবা করেছিলেন তিনি যা করেছিলো তার জন্য এবং তার তওবা কবুল হয়েছিলো। তার বিষয়টি ছিলো হানির চেয়েও গুরুতর। তাই হানি ক্ষমা লাভে আরও যোগ্যতা রাখেন (যদি সে কখনো ভুল করে থাকে) ।
আবুল আব্বাস মুবাররাদ বলেন যে , মুয়াবিয়া খোরাসানের শাসনভার কাসীর বিন শিহাব মাযহাজিকে অর্পণ করে। কাসীর সেখানে অনেক সম্পদ আত্মসাৎ করে এবং হানি বিন উরওয়ার বাড়িতে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। যখন এ সংবাদ মুয়াবিয়ার কাছে পৌঁছালো সে এক আদেশ দিলো হানির রক্ত ঝরাতে হবে , কোন ক্ষমা ছাড়া। তাই হানি কুফা ত্যাগ করলেন এবং মুয়াবিয়ার কাছে আশ্রয় নিতে গেলেন। মুয়াবিয়া তাকে চিনতে পারলো না। যখন সব লোক চলে গেলো তখন হানি তার জায়গায় বসে রইলেন। যখন মুয়াবিয়া তাকে জিজ্ঞেস করলো তখন তিনি বললেন তিনি হানি বিন উরওয়াহ। মুয়াবিয়া বললো ,“ তোমার এই দিনটি অন্য দিনগুলোর মত নয়। যখন তোমার বাবা গর্ব করে বলেছিলো: আমি আমার সিঁথি চিরুনী দিয়ে আঁচড়াই এবং আমার জোব্বা পরিধান করি। আমি চড়ি একটি মাদী ঘোড়ায় যার লেজ ও কেশর কালো এবং আমি যখন হাঁটি আর আমার পাশে থাকে বনি আতীফের সর্দাররা এবং যদি নিপীড়ন আমার পথের দিকে আসে আমি মাথা বিচ্ছিন্ন করি। ” হানি বললেন ,“ নিশ্চয়ই আমি আজকে বেশী সম্মানিত গতকালের চেয়ে।” মুয়াবিয়া এর কারণ জিজ্ঞেস করলো , হানি বললেন যে , ইসলামের কারণে। মুয়াবিয়া বললো ,“ কাসীর বিন শিহাব কোথায় ?” হানি বললেন ,“ সে আমার সাথে আছে এবং আপনার দলের অন্তর্ভুক্ত। ” মুয়াবিয়া বললো ,“ তুমি কি দেখেছো সে কত সম্পদ আত্মসাৎ করেছে ? তাহলে তার কাছ থেকে এর একটি অংশ তুমি নিয়ে নাও এবং এর এক অংশ তাকে দাও। ”
এছাড়া , বর্ণনায় আছে যে ইয়াযীদের সৈন্যরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাহায্যকারীদের একজনকে কারবালায় গ্রেফতার করে এবং তাকে ইয়াযীদের কাছে নিয়ে যায়। ইয়াযীদ তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,“ তুমি কি সেই ব্যক্তির সন্তান যে বলেছিলো: আমি আমার সিঁথি চিরুনী দিয়ে আঁচড়াই ?” ব্যক্তিটি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো , তখন ইয়াযীদ তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
পরিচ্ছেদ - ৯
মেইসাম বিন ইয়াহইয়া আত-তাম্মারের শাহাদাত
মুসলিম বিন আক্বীলের শাহাদাতের সময়ে আরও যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিলো তা হচ্ছে আত-তাম্মার ও রুশাইদ আল হাজারির শাহাদাত। এছাড়া এখানে হুজর বিন আদি এবং আমর বিন হুমাক্বের শাহাদাতের ঘটনা উল্লেখ করাও যথাযথ হবে।
মেইসাম ছিলেন আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) এর একজন বিশিষ্ট ও পছন্দনীয় সাথী ; প্রকৃতপক্ষে তিনি , আমর বিন হুমাক্ব , মুহাম্মাদ বিন আবু বকরএবং ওয়েইস ক্বারনি ছিলেন তার শিষ্য। তাদের মেধা ও যোগ্যতা খেয়াল রেখে ইমাম আলী (আ.) তাদেরকে ইলমে লাদুন্নি (লুকানো জ্ঞান) এবং রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন যা তাদের কাছ থেকে মাঝে মাঝে প্রকাশিত হতো। একবার আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে মেইসাম , যিনি ইমাম আলী (আ.) এর ছাত্রদের একজন ছিলেন এবং তার কাছ থেকে কোরআনের তাফসীর শিখেছিলেন এবং যাকে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া‘ জাতির একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব’ বলে উল্লেখ করেছিলেন , বলেছিলেন যে ,“ হে আব্বাসের সন্তান , আমাকে কোরআনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে যা ইচ্ছা জিজ্ঞেস করো যেহেতু আমি কোরআনের আয়াতসমূহ ইমাম আলী (আ.) এর সামনে তেলাওয়াত করেছি এবং এর ব্যাখ্যা তার কাছ থেকে গ্রহণ করেছি।” আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস তার কাজের মহিলাকে বললেন ,“ আমার জন্য একটি কাগজ ও কলম নিয়ে এসো।” এরপর লিখে নিতে শুরু করলেন ।
বর্ণিত হয়েছে যে , যখন মেইসামকে ক্রুশে ঝোলানোর আদেশ দেয়া হলো তিনি চিৎকার করে বললেন ,“ হে জনতা , যে চায় বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) এর রহস্যময় উক্তিগুলো শুনতে , সে যেন আমার কাছে আসো।” এ কথা শুনে জনতা তার চারদিকে জড়ো হলো এবং তিনি বিস্ময়কর হাদীসসমূহ বর্ণনা করতে শুরু করলেন । এ সম্মানিত ব্যক্তি (আল্লাহর রহমত হোক তার উপর) রোযা রাখতেন এবং তা এমন ছিলো যে অতিরিক্ত ইবাদত ও রোযা রাখার কারণে তার চামড়া শুকিয়ে গিয়েছিলো।
‘ কিতাব আল গারাত’ -এ ইবরাহীম সাক্বাফি বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম আলী (আ.) মেইসামকে প্রচুর জ্ঞান ও গোপন রহস্য শিক্ষা দিয়েছিলেন যা তিনি মাঝে মাঝে লোকদের বলতেন। কুফার লোকেরা এগুলো শুনে সন্দেহে পড়তো এবং ইমাম আলী (আ.) এর বিরুদ্ধে যাদু ও ধোঁকার অভিযোগ তুলতো (কারণ তারা তা হজম করতে পারতো না এবং বুঝতেও পারতো না)। একদিন ইমাম আলী (আ.) তার সত্যিকার অনুসারী ও সংশয়ে ভোগে এমন একটি বড় দলের সামনে বললেন ,“ হে মেইসাম , আমার মৃত্যুর পর তোমাকে ধরা হবে এবং ক্রুশে ঝোলানো হবে। আর এর আগের দিন তোমার মুখ ও নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে যা তোমার দাড়িকে রাঙিয়ে দিবে। তৃতীয় দিন একটি অস্ত্র তোমার পাকস্থলীর ভেতর ঢুকিয়ে দেয়া হবে যা তোমার মৃত্যু ঘটাবে। তাই সেই দিনটির দিকে তাকিয়ে থাকো। যে জায়গায় তোমাকে ঝোলানো হবে তা আমর বিন হুরেইসের বাড়ির দিকে মুখ করা। তুমি সে দশ জনের একজন হবে যাদেরকে ঝোলানো হবে এবং তোমার ক্রুশের কাঠ হবে সবচেয়ে খাটো এবং তা মাটির নিকটবর্তী থাকবে ; আমি তোমাকে সেই খেজুর গাছটি দেখাবো যার কাণ্ডে তোমাকে ঝোলানো হবে।”
এর দুদিন পরই তিনি তাকে খেজুর গাছটি দেখালেন। এরপর থেকে সব সময় মেইসাম গাছটির কাছে আসতেন এবং দোআ পড়তেন , আর বলতেন ,“ কী বরকতময় একটি খেজুর গাছ তুমি , কারণ তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তুমি বড় হচ্ছো আমার জন্য।”
ইমাম আলী (আ.) এর শাহাদাতের পর মেইসাম প্রায়ই খেজুর গাছটি দেখতে যেতেন ঐ সময় পর্যন্ত যখন তা কেটে ফেলা হলো। এরপর তিনি গাছের কাণ্ডের অংশগুলো দেখাশোনা করে রাখতেন। তিনি আমর বিন হুরেইসের কাছে যেতেন এবং বলতেন ,“ আমি তোমার প্রতিবেশী হবো , তাই এলাকার অধিকার ভালোভাবে পূর্ণ করো।” আমর এর অর্থ বুঝতে না পেরে বলতো ,“ তুমি কি ইবনে মাসউদ অথবা ইবনে হাকীমের বাড়ি কিনতে চাও ?”
কিতাবুল ফাযায়েলে লেখা আছে , ইমাম আলী (আ.) মাঝে মাঝেই কুফার মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসতেন এবং মেইসামের কাছে বসতেন এবং তার সাথে কথা বলতেন। একদিন তিনি যথারীতি মেইসামের কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আমি কি তোমাকে সুসংবাদ দিবো ?”
মেইসাম জিজ্ঞেস করলেন , তা কী ? তিনি বললেন ,“ একদিন তোমাকে ঝোলানো হবে।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ হে মাওলা (অভিভাবক) , আমি কি মুসমলান হিসেবে মৃত্যুবরণ করবো ?” ইমাম (আ.) হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন।
আক্বিক্বি বর্ণনা করেন যে , আবু জাফর ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বীর (আ.) মেইসামকে খুব ভালোবাসতেন , আর মেইসাম ছিলেন একজন বিশ্বাসী , সমৃদ্ধির সময় কৃতজ্ঞ এবং বিবাদে সহনশীল।
হাবীব বিন মুযাহির ও মেইসাম আত-তাম্মারের সাক্ষাৎ
‘ মানহাজুল মাক্বাল’ -এ শেইখ কাশশি থেকে বর্ণিত হয়েছে , যিনি তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা উল্লেখ করেছেন ফযল বিন যুবাইর পর্যন্ত , যিনি বর্ণনা করেন যে: একদিন মেইসাম তার ঘোড়ায় বসা ছিলেন এবং তিনি হাবীব বিন মুযাহির আসাদির পাশ দিয়ে গেলেন , তখন তিনি বনি আসাদ গোত্রের কিছু লোকের মাঝে ছিলেন। তারা পরস্পরের সাথে এমনভাবে কথা শুরু করলেন যে তাদের ঘোড়াগুলোর মাথাগুলো একসাথে হলো। হাবীব বললেন ,“ নিশ্চয়ই আমি একজন টাকওয়ালা বৃদ্ধ মানুষকে দেখছি , যার একটি বড় পেট রয়েছে , যে দারুর-রিযক্বের কাছে তরমুজ বিক্রি করে। তাকে ক্রুশে ঝোলানো হবে নবীর আহলুল বাইত (পরিবার) (আ.) এর প্রতি তার ভালোবাসার কারণে এবং ক্রুশেই তার পেট ফুটো করা হবে।” মেইসাম বললেন ,“ আমিও একজন লাল চেহারার মানুষকে চিনতে পারছি যার লম্বা সিঁথি রয়েছে যে নবী (সা.) এর নাতিকে রক্ষায় এবং সাহায্য করতে যাবে এবং নিহত হবে ; আর তার ছিন্ন মাথা কুফায় প্রদর্শিত হবে।” এ কথা বলে দুজনেই পরস্পরকে ছেড়ে গেলেন। যে লোকগুলো সেখানে ছিলো তারা তাদের কথাবার্তা শুনলো এবং তারা বললো ,“ আমরা এ দুজনের চেয়ে বড় মিথ্যাবাদী কখনো দেখি নি।” তারা তখনও চলে যায় নি এমন সময় রুশাইদ হাজারি এলেন তাদের (মেইসাম ও হাবীবকে) খুঁজতে এবং লোকদেরকে তাদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বললো তারা চলে গেছে এবং তাদের কথাবার্তা বর্ণনা করলো। রুশাইদ বললেন , আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক মেইসামের ওপরে , সে একটি বাক্য বলতে ভুলে গেছে ,“ যে ব্যক্তি ছিন্ন মাথা কুফায় নিয়ে আসবে সে একশ দিরহাম পুরস্কার পাবে।” এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। যখন লোকেরা তার কাছে এ কথা শুনলো তারা বললো ,“ নিশ্চয়ই এ হচ্ছে তাদের দুজনের চেয়ে বড় মিথ্যাবাদী।” পরে এ লোকগুলো বলেছে যে , কিছুদিন পরই আমরা মেইসামকে আমর বিন হুরেইসের বাড়ির কাছে ক্রুশে দেখলাম এবং হাবীব বিন মুযাহিরের ছিন্ন মাথা কুফায় ঘোরাতে দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে তাকে শহীদ করার পর। এভাবে আমরা নিজের চোখে তা ঘটতে দেখলাম যা ঐ ব্যক্তিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
মেইসাম বলেন যে , একদিন ইমাম আলী (আ.) আমাকে ডাকলেন এবং বললেন ,“ সে সময়ে তোমার কী অবস্থা হবে , হে মেইসাম , যখন ঐ ব্যক্তি , যার পিতার পরিচয় জানা যায় না , কিন্তু বনি উমাইয়া তাকে নিজেদের মাঝে অন্তর্ভূক্ত করেছে (অর্থাৎ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ) , তোমাকে ডাকবে এবং তোমাকে আদেশ করবে যেন তুমি আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও ?”
আমি বললাম ,“ হে বিশ্বাসীদের আমির , আল্লাহর শপথ আমি কখনই আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবো না।” তিনি বললেন ,“ সে ক্ষেত্রে তোমাকে হত্যা করা হবে এবং ক্রুশে ঝোলানো হবে।” আমি বললাম ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তা সহ্য করবো এবং তা হবে আল্লাহর রাস্তায় খুবই কম।”
ইমাম বললেন ,“ হে মেইসাম , তুমি (বেহেশতে) আমার সাথে থাকবে আমার মর্যাদায়।”
সালেহ বিন মেইসাম বর্ণনা করেন যে , আবু খালিদ তাম্মার আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে: একদিন আমি এক শুক্রবারে ফোরাত নদীতে মেইসামের সাথে ছিলাম যখন একটি ঝড় শুরু হলো। মেইসাম , যিনি যিয়ান নামে একটি নৌকাতে বসা ছিলেন , বের হয়ে এলেন এবং ঝড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন ,“ নৌকাকে শক্ত করে বাঁধো। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি একটি ভীতিকর ঝড় শুরু হবে। আর মুয়াবিয়া এইমাত্র মারা গেছে।” যখন পরবর্তী শুক্রবার এলো , সিরিয়া থেকে এক দূত এলো , আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার কাছে কী সংবাদ আছে জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো ,“ সেখানে জনগণ ভালো অবস্থায় আছে , মুয়াবিয়া মাত্র মারা গেছে এবং জনগণ ইয়াযীদের কাছে আনুগত্যের শপথ করছে।” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোন দিন সে মারা গেছে , সে বললো , গত শুক্রবার।
বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) তার রহস্যগুলো একটি কূপের কাছে বর্ণনা করতেন
শহীদ আল আউয়াল শেইখ মুহাম্মাদ বিন মাকি বর্ণনা করেছেন যে: মেইসাম একদিন বলেছিলেন ,“ একদিন আমার মাওলা (অভিভাবক) বিশ্বাসীদের আমির ইমাম আলী (আ.) আমাকে কুফা থেকে বের করে মরুভূমিতে নিয়ে গেলেন এবং আমরা জা’ ফি মসজিদে পৌঁছলাম। এরপর তিনি ক্বিবলার দিকে ফিরলেন এবং চার রাকাত নামায পড়লেন। তিনি নামায শেষ করে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তার হাত উঠিয়ে বললেন ,“ হে আমার রব , কিভাবে আমি আপনাকে ডাকবো যখন আমি আপনাকে অমান্য করেছি এবং কিভাবে আমি আপনাকে না ডাকতে পারি যখন আমি আপনাকে চিনেছি এবং আমার অন্তরে আপনার ভালোবাসা উপস্থিত। আমি আমার গুনাহপূর্ণ হাত দুটো উঠিয়েছি আপনার কাছে এবং আমার চোখ দুটো আশায় পূর্ণ (দীর্ঘ এক দোআর শেষ পর্যন্ত)।”
এরপর তিনি নিঃশব্দে একটি দোআ পড়লেন এবং সিজদায় গেলেন এবং‘ আল আফউ’ (হে ক্ষমাকারী) বললেন একশ বার। এরপর তিনি উঠলেন এবং মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলেন এবং আমি তাকে অনুসরণ করতে শুরু করলাম মরুভূমিতে পৌঁছা পর্যন্ত। এরপর ইমাম একটি দাগ টানলেন এবং বললেন ,“ সাবধান। এ দাগ অতিক্রম করো না।”
এ কথা বলে তিনি আমার কাছ থেকে চলে গেলেন। রাত অন্ধকার হওয়ায় আমি নিজেকে বললাম ,“ তুমি তোমার মাওলাকে একাকী ছেড়ে দিয়েছো তার বেশ কিছু শত্রু থাকার পরও। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে তোমার কী কৈফিয়ত হবে ? আল্লাহর শপথ , আমি তাকে অনুসরণ করবো তার অবস্থা জানার জন্য তার আদেশ অমান্য করা হলেও।”
তখন আমি তাকে অনুসরণ করলাম এবং দেখলাম তার শরীরের ওপরের অংশের সাথে তিনি তার মাথা একটি কুয়ার ভিতরে উপুড় হয়েছেন এবং এর সাথে কথা বলছেন এবং এর কথাও শুনছেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে তার সাথে কেউ আছে , তাই তিনি আমার দিকে ফিরলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন ,“ কে ?” আমি বললাম ,“ আমি মেইসাম” । তিনি বললেন ,“ আমি কি তোমাকে আদেশ করি নি দাগ অতিক্রম না করতে ?” আমি বললাম ,“ হে আমার মাওলা , আমি আশঙ্কা করলাম হয়তো আপনার শত্রুরা আপনার ক্ষতি করবে। তাই আমি অস্বস্তিতে ছিলাম।” তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ তুমি কি শুনেছো আমি কী বলেছি (কূপকে) ?” আমি বললাম ,“ না।” তিনি বললেন ,“ হে মেইসাম , আমার অন্তর রহস্যগুলো বহন করছে এবং যখন তা এর কারণে সংকীর্ণ হয়ে আসে আমি আমার দুহাত দিয়ে মাটি খুঁড়ি এবং পাথরের নিচে রহস্যগুলো চাপা দিই এবং বাদাম গাছ মাটি থেকে জন্মায় এবং আমার বীজগুলোর (বংশের) মাঝে তা প্রকাশ পায়।”
শেইখ মুফীদ‘ ইরশাদ’ -এ লিখেছেন যে , মেইসাম ছিলেন বনি আসাদ গোত্রের এক মহিলার দাস। ইমাম আলী (আ.) তাকে কিনলেন এবং তাকে মুক্ত করে দিলেন। তিনি তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলেন যার উত্তরে তিনি বললেন যে তার নাম ছিলো সালিম। ইমাম বললেন ,“ রাসূল (সা.) আমাকে জানিয়েছেন যে তোমার বাবা ইরানে তোমার নাম রেখেছিলেন মেইসাম।”
মেইসাম উত্তর দিলেন ,“ নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল (সা.) এবং আমিরুল মুমিনীন (আ.) সত্য বলেন। আল্লাহর শপথ , ওটাই আমার নাম।” ইমাম বললেন ,“ তাহলে সেই নামে ফিরে যাও যে নামে নবী তোমাকে সম্বোধন করেছেন এবং সালিম নাম পরিত্যাগ করো ; আর তোমার ডাকনাম (কুনিয়া) হওয়া উচিত আবু সালিম।”
একদিন ইমাম আলী (আ.) তাকে বলেছিলেন ,“ আমার মৃত্যুর পর তোমাকে গ্রেফতার করা হবে এবং ক্রুশে ঝোলানো হবে এবং একটি অস্ত্র তোমার পেটে ঢোকানো হবে। এরপর তৃতীয় দিন রক্ত বেরিয়ে আসবে তোমার নাক মুখ থেকে যা তোমার দাড়িকে রাঙিয়ে দিবে। তাই অপেক্ষা করো সে রঙের জন্য। তোমাকে ক্রুশে ঝোলানো হবে আমর বিন হুরেইসের দরজায় , তুমি হবে দশম জন (আরও নয় জনের সাথে ক্রুশ বিদ্ধ হবে)। আর তোমার ক্রুশের কাঠটি হবে সবচেয়ে খাটো এবং অন্যান্যদের চাইতে মাটির সবচেয়ে কাছে। আসো , আমি তোমাকে খেজরু গাছটি দেখাবো যার কাণ্ডে তোমাকে ঝোলানো হবে।”
এরপর তিনি তাকে খেজুর গাছটি দেখালেন। মেইসাম প্রায়ই সেই গাছটি দেখতে যেতেন এবং এর নিচে দোআ পড়তেন , আর বলতেন ,“ কী রহমতপূর্ণ খেজুর গাছই না তুমি , আমাকে তোমার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আমার জন্য।” তিনি প্রায়ই গাছটির কাছে যেতেন এবং এর যত্ন নিতেন যতক্ষণ না তা কেটে ফেলা হলো। তিনি কুফায় সে জায়গাটিকে জানতেন যেখানে তাকে ঝোলানো হবে। তিনি প্রায়ই আমর বিন হুরেইসের সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতেন এবং বলতেন ,“ আমি শীঘ্রই তোমার প্রতিবেশী হতে যাচ্ছি , তাই আমার প্রতি সদয় প্রতিবেশী হও।” আমর জিজ্ঞেস করতেন ,“ তুমি কি ইবনে মাসউদ অথবা ইবনে হাকীমের বাড়ি কিনতে যাচ্ছো ?” কারণ সে জানতো না মেইসাম কী বলছেন।
যে বছর তাকে শহীদ করা হলো সে বছর মেইসাম হজ্বে গেলেন এবং এরপর উম্মু সালামা (আ.) এর কাছে গেলেন। উম্মু সালামা জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে এবং তিনি বললেন যে তিনি মেইসাম। তখন তিনি বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি প্রায়ই নবীকে তোমার নাম স্মরণ করতে শুনেছি মধ্যরাতে।” এরপর মেইসাম উম্মু সালামার কাছে ইমাম হোসেইন (আ.) সম্পর্কে খোঁজ নিলেন , তিনি জানালেন তিনি বাগানে আছেন। তিনি বললেন ,“ দয়া করে তাকে বলুন যে আমি তাকে সালাম জানাতে খুবই পছন্দ করবো , কিন্তু আল্লাহ চাইলে , আমরা দুই জাহানের রবের সামনে পরস্পর সাক্ষাৎ করবো।” উম্মু সালামা কিছু সুগন্ধি আনতে বললেন এবং মেইসামের দাড়িতে তা মাখিয়ে দিলেন এবং বললেন ,“ খুব শীঘ্রই তা রক্তে রঞ্জিত হবে ।”
এরপর মেইসাম কুফাতে গেলেন এবং গ্রেফতার হলেন এবং তাকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। উবায়দুল্লাহকে বলা হলো ,“ এ ব্যক্তি হলো আলীর সবচেয়ে প্রিয়।” সে বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , এ ইরানী ব্যক্তি ?” সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। তখন উবায়দুল্লাহ মেইসামকে জিজ্ঞেস করলো ,“ তোমার রব কোথায় ?” মেইসাম উত্তর দিলেন ,“ ওঁত পেতে আছেন অত্যাচারীদের জন্য , আর তুমি হলে অত্যাচারীদের একজন।” তখন উবায়দুল্লাহ মেইসামকে বললো ,“ তুমি ইরানী (অনারব) হওয়া সত্ত্বেত্ত তুমি যা বুঝাতে চাও তাই বলছো (তোমার আরবী খুবই ভালো)। তাহলে আমাকে বলো তোমার মাওলা (ইমাম আলী) কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছে যে , আমি তোমাকে নিয়ে কী করবো ?” মেইসাম বললেন ,“ হ্যাঁ , তিনি বলেছিলেন যে আমি দশম জন যাদেরকে তুমি ক্রুশে ঝোলাবে এবং আমার ক্রুশের কাঠ হবে সবচেয়ে নিচু এবং আমি তাদের চাইতে মাটির কাছে থাকবো।” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আল্লাহর শপথ , সে যা বলেছে আমি তার ঠিক উল্টোটা করবো।” মেইসাম বললেন ,“ তুমি কিভাবে উল্টোটা করবে যখন আল্লাহর শপথ ইমাম আলী (আ.) রাসূলুল্লাহর (সা.) কাছ তা থেকে শুনেছেন এবং তিনি জিবরাঈলের কাছে শুনেছেন , যিনি আবার শুনেছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছ থেকে ? তুমি কিভাবে তাদের বিরোধিতা করবে ? এবং আমি এমনকি কুফার সে জায়গাটিও জানি যেখানে আমাকে ঝুলানো হবে এবং ইসলামে আমিই হবো প্রথম ব্যক্তি যাকে মুখে লাগাম পরানো হবে।”
এরপর মেইসামকে কারাগারে বন্দী করা হলো মুখতার বিন আবু উবাইদা সাক্বাফির সাথে। মেইসাম মুখতারকে বললেন ,“ তুমি এখান থেকে মুক্তি পাবে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর রক্তের প্রতিশোধ নিতে উঠে দাঁড়াবে এবং তুমি তাকে হত্যা করবে যে আমাদেরকে হত্যা করবে।” যখন উবায়দুল্লাহ মুখতারকে হত্যা করতে আদেশ দিলো ইয়াযীদ থেকে একটি সংবাদ এলো মুখতারকে ছেড়ে দেয়ার আদেশ দিয়ে। সে তাকে মুক্ত করে দিলো এবং মেইসামকে ক্রুশবিদ্ধ করার আদেশ দিলো।
তিনি কারাগার থেকে বাইরে বের হয়ে এলেন এবং এক ব্যক্তির মুখোমুখি হলেন যে তাকে বললো ,“ তোমার কি এ অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করার ক্ষমতা নেই ?” মেইসাম মুচকি হাসলেন এবং গাছটির দিকে ঈশারা করে বললেন ,“ আমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে এর জন্য এবং একে বড় করা হয়েছে আমার জন্য।” যখন মেইসামকে ক্রুশে ঝোলানো হলো আমর বিন হুরেইসের বাড়ির দরজায় , জনতা তার চারদিকে জমা হলো , সে বললো ,“ আল্লাহর শপথ সে প্রায়ই বলতো যে সে আমার প্রতিবেশী হবে।” তখন মেইসামকে ক্রুশবিদ্ধ করা হলো। আমর তার কাজের মহিলাকে বললো নিচের মাটি ঝাড়ু দিয়ে দিতে এবং তাতে পানি ছিটিয়ে দিতে এবং তা জীবাণুমুক্ত করতে। মেইসাম তখন বনি হাশিমের মর্যাদা বর্ণনা করতে শুরু করলেন ক্রুশে থেকেই। উবায়দুল্লাহর কাছে সংবাদ পৌঁছালো যে দাসটি তাকে অপমান করেছে। এতে সে তার মুখে লাগাম পরানোর আদেশ দিলো। আর এভাবে মেইসাম ইসলামের প্রথম ব্যক্তি হলেন যাকে মুখে লাগাম পরানো হলো। মেইসামকে শহীদ করা হলো ইমাম হোসেইন (আ.) কারবালায় আসার দশ দিন আগে। তৃতীয় দিন একটি অস্ত্র (সম্ভবত বর্শা) তার পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হলো এবং তিনি চিৎকার করে বললেন ,“ আল্লাহু আকবার” এবং দিন শেষে তার রক্ত নাক ও মুখ দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার ওপরে বর্ষিত হোক)।
বর্ণিত হয়েছে যে , সাত জন খেজুর বিক্রেতা শপথ করলো যে তারা মেইসামের লাশটি সেখান থেকে নিয়ে যাবে ও কবর দিবে। রাত্রে তারা সেখানে এলো যখন প্রহরীরা আগুন কমিয়ে দিয়েছিলো এবং তাদেরকে দেখতে পেলো না। তারা তাকে ক্রুশ থেকে নামিয়ে আনলো এবং বনি মুরাদের রাস্তার পাশে একটি স্রোতধারার পাশে কবর দিলো এবং ক্রুশটি ময়লা ফেলার স্থানে ফেলে দিলো। যখন সকাল হলো অশ্বারোহীরা তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লো কিন্তু তাদেরকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলো।
আমি (এই বইয়ের লেখক) বলি যে , মেইসামের বংশধরদের মাঝে একজন হলো আবুল হাসান মেইসামী আলী বিন ইসমাইল বিন শুয়াইব বিন মেইসাম আত তাম্মার , যিনি একজন শিয়া মুতাকাল্লিম (জ্ঞানী ব্যক্তি) ছিলেন মামুন ও মুতাসিমের শাসনামলে। তিনি নাস্তিক ও বিরোধীদের সাথে বিতর্কে যেতেন এবং তার সমসাময়িক ছিলেন আবু হুযাইল আল্লাফ , যে বসরাতে মুতাযিলাদের সর্দার ছিলো।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , আলী বিন মেইসাম আবু হুযাইল আল্লাফকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ তুমি কি বিশ্বাস কর না যে ইবলীস (শয়তান) সব ভালো কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং সে খারাপের দিকে আমন্ত্রণ জানায় ?” আবু হুযাইল হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। আলী বললেন ,“ তাহলে কি সে খারাপের দিকে আহ্বান জানায় সেটিকে খারাপ না জেনেই এবং ভালো কাজ থেকে বিরত থাকে সেটিকে ভালো না জেনেই ?” আবু হুযাইল উত্তর দিলো ,“ হ্যাঁ , সে সব জানে।” আবুল হাসান (আলী) বললেন ,“ এভাবে প্রমাণিত হয় যে , যা ভালো অথবা খারাপ শয়তান সব জানে।” আবু হুযাইল একমত হলো। এতে আলী বললেন ,“ তাহলে বলো নবীর পরে ইমাম সম্পর্কে , সে কি সব জানতো - কী ভালো ও কী খারাপ ?” আবু হুযাইল না-সূচক উত্তর দিলো। আলী বললো ,“ তাহলে শয়তান তোমার ইমামের চাইতে বেশী জ্ঞানী।” তা শুনে আবু হুযাইল বোবা হয়ে গেলো।
রুশাইদ আল হাজারির শাহাদাত (আল্লাহ তার আত্মাকে আরও পবিত্র করুন)
হাজার হলো শহরগুলোর একটি যেখানে বাহরাইনের গভর্নরের দপ্তর অথবা এর উপশহর। বিশ্বাসীদের আমির ইমাম আলী (আ.) তাকে নাম দেন রুশাইদ আল বালায়া (পরীক্ষার রুশাইদ) এবং তাকে পরীক্ষা ও মৃত্যুর বিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ দেন (ইলমুল বালায়া ওয়াল মানায়া)। এ কারণে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতেন কিভাবে একজন ব্যক্তি মারা যাবে এবং কিভাবে কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা হবে এবং তিনি যা বলতেন তা সত্য বলে প্রমাণিত হতো।
আমরা মেইসামের ঘটনার সময় বর্ণনা করেছি যে তিনি কিভাবে হাবীব ইবনে মুযাহিরের (শাহাদাতের) বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। আমার মনে আছে শেইখ বাহাই তার‘ তা’ লীক্বাহ’ তে বলেছেন যে শেইখ কাফা’ মি রুশাইদকে ইমাম আলী (আ.) এর কুলীদের একজন বলে উল্লেখ করেছেন ।
‘ ইখতিসাস’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে: যখন যিয়াদ (উবায়দুল্লাহর বাবা) রুশাইদকে ধাওয়া করছিলো তখন তিনি আত্মগোপনে চলে যান। একদিন তিনি আবু আরাকাহর কাছে এলেন যে তার কিছু বন্ধুর সাথে নিজের বাড়ির দরজায় বসেছিলো এবং তিনি সেখানে প্রবেশ করলেন । আবু আরাকাহ শঙ্কিত হয়ে পড়লো এবং তাকে অনুসরণ করলো ভীতি নিয়ে। এরপর সে রুশাইদকে বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য! তুমি আমাকে হত্যা করেছো এবং আমার সন্তানদের এতিম বানিয়েছো এবং ধ্বংস ছড়াচ্ছো।” রুশাইদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন , কেন সে তা বললো। আবু আরাকাহ বললো ,“ এই লোকগুলো তোমার খোঁজে আছে আর তুমি আমার বাসায় এসেছো যখন এখানে উপস্থিত লোকজন তোমাকে দেখছে ?” রুশাইদ বললেন ,“ তাদের একজনও আমাকে দেখে নি।” আবু আরাকাহ বললো ,“ তুমি কি আমার সাথে কৌতুক করছো ?” তখন সে তাকে ধরলো , তার হাত বাধলো এবং তাকে এক ঘরে বন্দী করলো এবং দরজা বন্ধ করে তার বন্ধুদের কাছে এসে বললো ,“ আমার মনে হয় যে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি আমার বাড়িতে প্রবেশ করেছে।” তারা বললো যে তারা কাউকে দেখে নি। সে তার প্রশ্নটি আবার করলো এবং তারা না-সূচক উত্তর দিলো , তাই সে চুপ করে গেলো। এরপর সে ভয় পেলো যে হয়তো আর কেউ তাকে দেখে থাকবে এবং তাই সে যিয়াদের দরবারে গেলো খোঁজ নিতে যে তারা রুশাইদকে নিয়ে কোন আলোচনা করেছে কিনা এবং তারা জানে কিনা (যে রুশাইদ তার বাড়িতে আছে) , তাহলে সে তাকে তাদের হাতে তুলে দিবে। তাই সে গেলো এবং যিয়াদকে সালাম জানিয়ে তার কাছে বসে পড়লো। সেখানে একটি ঠাণ্ডা পরিবেশ ছিলো। তখন হঠাৎ সে রুশাইদকে দেখতে পেলো একটি খচ্চরের ওপরে বসা , যিয়াদের দিকে আসছে। তাকে দেখা মাত্রই তার চেহারার রং বদলে গেলো এবং হতবাক হয়ে গেলো এবং তার মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেলো। রুশাইদ সেখানে প্রবেশ করলেন এবং যিয়াদকে সালাম দিলেন। তাকে দেখে যিয়াদ উঠে দাঁড়ালো ও তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো। এরপর তাকে স্বাগত জানালো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো সে কেমন আছে এবং তার পরিবারের খোঁজ খবর নিলো এবং তার দাড়িতে আদর করে হাত বুলিয়ে দিলো। রুশাইদ সেখানে কিছু সময়ের জন্য বসলো তারপর উঠে দাঁড়ালো ও চলে গেলো । আবু আরাকাহ যিয়াদকে জিজ্ঞেস করলো ,“ তোমার রব তোমাকে রহম করুন , কে ছিলো এই মর্যাদান ব্যক্তি ?” সে বললো যে , ঐ ব্যক্তি ছিলো তার সিরিয়ার বন্ধুদের একজন , যে তাকে দেখতে এসেছিলো। তা শুনে আবু আরাকাহ উঠে দাঁড়ালো এবং তার বাড়ির দিকে দ্রুত ছুটে গেলো। সে সেখানে প্রবেশ করে দেখলো রুশাইদ সে অবস্থায়ই আছে যে অবস্থায় সে তাকে রেখে গিয়েছিলো। আবু আরাকাহ বললো ,“ এখন যেহেতু তুমি এ কৌশল জানো যা আমি এইমাত্র দেখলাম , তোমার যা ইচ্ছা করো এবং বাড়িতে এসো যখন তোমার ইচ্ছা।”
আবু আরাকাহর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে একটি বর্ণনা
লেখক বলেন , ওপরে উল্লেখিত আবু আরাকাহ বাজিলাহ গোত্রের এবং ইমাম আলী (আ.) এর সাথীদের একজন। কিন্তু বারক্বি বলেন যে , সে ইয়েমেনের লোক ছিলো এবং তাকে ইমামের সাথীদের একজন বলে গণ্য করেন যেমন ছিলেন , আসবাগ বিন নুবাতাহ , মালিক আশতার এবং কুমাইল বিন যিয়াদ। আবু আরাকাহর পরিবার শিয়া জীবনী লেখকদের এবং ইমাম আলী (আ.) এর হাদীস বর্ণনাকারীদের কাছে সুপরিচিত , যেমন বাশীর নাববাল এবং শাজারাহ যারা ছিলো মায়মুন বিন আবু আরাকাহর সন্তান। ইসহাক বিন বাশীর , আলী বিন শাজারাহ এবং হাসান বিন শাজারাহ ছিলেন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত । রুশাইদের সাথে আবু আরাকাহর আচরণ তার মর্যাদা কম থাকার কারণে ছিলো বলে নয় , বরং তা ছিলো তার জীবনের ভয়ের কারণে এবং রুশাইদ ও ইমাম আলী (আ.) এর অন্যান্য সাথীদের খোঁজে যিয়াদ শক্তভাবে লেগেছিলো। তাদের ও যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখতো , তাদের আতিথেয়তা করতো অথবা তাদেরকে আশ্রয় দিতো সে তাদের নির্যাতন করতো। এখানে হানির সম্মান ও পৌরুষ পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে তিনি মুসলিম বিন আক্বীলের মেহমানদারী করেছিলেন (কঠোর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও) এবং তাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন ও তার জন্য জীবন কোরবান করেছিলেন। আল্লাহ তার কবরকে আরও মর্যাদা দিন এবং তাকে সুন্দর বেহেশত দান করুন। আবি হাইয়ান বাজালি থেকে শেইখ কাশশি এবং তিনি রুশাইদের কন্যা ক্বিনওয়া থেকে বর্ণনা করেন যে: আবু হাইয়ান বলেন , আমি ক্বিনওয়াকে বললাম সে তার বাবার কাছ থেকে যা শুনেছে তার সবটুকু বর্ণনা করতে। সে বললো , আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি যে , ইমাম আলী (আ.) আমাকে জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে ,“ হে রুশাইদ , কিভাবে তুমি সহ্য করবে যখন ঐ ব্যক্তি (যিয়াদ) যাকে বনি উমাইয়া তাদের অন্তর্ভুক্ত করেছে , তোমাকে ডেকে আনবে এবং তোমার পা , হাত এবং জিহ্বা কেটে ফেলবে ?”
আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে বিশ্বাসীদের আমির , এর পরিণাম কি বেহেশত হবে ?”
ইমাম বললেন ,“ হে রুশাইদ , তুমি আমার সাথে আছো এ পৃথিবীতে এবং আখেরাতেও।”
ক্বিনওয়া বলেন যে , অবৈধ সন্তান উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ , (উবায়দুল্লাহ কথাটি বর্ণনাকারীর ভুল। সঠিকটি হবে তার পিতা যিয়াদ) তাকে ডাকলো। এরপর সে রুশাইদকে বললো ইমাম আলী (আ.) এর সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করতে এবং প্রহরী তাকে আঘাত করলো তা বলার জন্য। জারজ (যিয়াদ) বললো ,“ তোমাকে এ সম্পর্কে জানানো হয়েছে , অতএব কিভাবে তুমি মরতে চাও ?” রুশাইদ বললো ,“ আমার বন্ধু (ইমাম আলী) আমাকে আগেই জানিয়েছেন যে , আমাকে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে শক্তি প্রয়োগ করা হবে এবং যখন আমি তা করতে অস্বীকার করবো আমার দুই হাত , পা এবং আমার জিহ্বা কেটে ফেলা হবে।” যিয়াদ বললো ,“ এখন আল্লাহর শপথ , আমি তার কথা মিথ্যা প্রমাণিত করবো।” এরপর সে তাকে সামনে এগিয়ে আনার আদেশ করলো এবং বললো তার হাত ও পা কেটে ফেলতে , কিন্তু জিহ্বাকে আস্ত রাখতে। আমি (ক্বিনওয়া) তার হাত ও পা ধরে বললাম ,“ হে প্রিয় বাবা , আপনার উপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য কি আপনি ব্যথা অনুভব করছেন ?” তিনি বললেন ,“ না , কিন্তু ঐ ব্যক্তির মত যে জনতার ভিতরে আটকা পড়েছে।” যখন তারা তাকে প্রাসাদের বাইরে নিয়ে এলো জনগণ তার কাছ থেকে একটু দূরে জমায়েত হতে লাগলো। তিনি বললেন ,“ যাও আমার জন্য কালি এবং কাগজ আনো যেন লিখে যেতে পারি তোমাদের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত কী ঘটবে।” তখন একজন নাপিতকে পাঠানো হলো তার জিহ্বা কেটে ফেলার জন্য এবং সে রাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক)।
ফুযাইল বিন যুবাইর বলেন যে , একদিন ইমাম আলী (আ.) সাথীদের সাথে বারনা নামের একটি বাগানে গেলেন এবং একটি খেজর গাছের ছায়ায় বসলেন। তিনি কিছ খেজুর চাইলেন । যা গাছগুলো থেকে তোলা হয়েছে এবং তার কাছে সেগুলো আনা হলো , রুশাইদ হাজারি বললেন ,“ হে বিশ্বাসীদের আমির , এ খেজুরগুলো কেমন ?”
তিনি উত্তরে বললেন ,“ হে রুশাইদ , তোমাকে এ খেজুর গাছের কাণ্ডে ক্রুশবিদ্ধ করা হবে।”
রুশাইদ বলেন , আমি প্রত্যেক সকাল ও বিকালে গাছটিকে পানি দিতাম। ইমাম আলী (আ.) এর শাহাদাতের পর আমি যখন ঐ গাছের পাশ দিয়ে গেলাম , আমি দেখলাম যে গাছটির ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছে , আমি নিজেকে বললাম ,“ আমার শেষ তাহলে নিকটবর্তী হয়েছে।” কিছুদিন পর একজন সর্দার এসে বললো যে আমাকে সেনাপতি দেখতে চেয়েছেন। আমি প্রাসাদে গেলাম এবং দেখলাম খেজুর গাছের কাঠগুলো সেখানে রাখা হয়েছে। আরেকদিন যখন আমি গিয়েছিলাম আমি দেখলাম যে গাছের দ্বিতীয় অংশটিকে একটি গোলকে পরিণত করা হয়েছে এবং একটি কুয়ার দুই দিকে বাঁধা হয়েছে তা থেকে পানি তোলার জন্য। আমি নিজেকে বললাম ,“ নিশ্চয়ই আমার বন্ধু আমাকে মিথ্যা বলেন নি।”
(অন্য আরেক দিন) সেই সর্দার আমার কাছে এলো এবং বললো ,“ সেনাপতি তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। আমি যখন প্রাসাদে ঢুকলাম , দেখলাম গাছের কাণ্ডটি সেখানে রাখা আছে এবং সে গোলকটিও (রিং)। আমি গোলকটির কাছে গেলাম এবং একে পা দিয়ে আঘাত করে বললাম ,“ তোমাকে লালন-পালন ও বড় করা হয়েছে আমার জন্য।” এরপর আমি উবায়দুল্লাহর কাছে গেলাম এবং সে বললো ,“ তোমার মাওলা যে মিথ্যা কথা বলেছে তা আমার কাছে বর্ণনা করো।” আমি বললাম ,“ আল্লাহর শপথ আমি মিথ্যাবাদী নই , না তিনি মিথ্যাবাদী ছিলেন। আমার মাওলা আমাকে আগেই জানিয়েছেন যে তুমি আমার হাত , পা ও জিহ্বা কেটে ফেলবে।” সে বললো ,“ নিশ্চয়ই আমি তার কথাকে মিথ্যা প্রমাণিত করবো। তাকে নিয়ে যাও এবং তার হাত ও পা কেটে ফেলো ।” যখন তারা তাকে তার লোকজনের কাছে নিয়ে গেলো , তিনি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বর্ণনা করতে লাগলেন। তখন তিনি বললেন ,“ আমাকে জিজ্ঞেস করো , কারণ এ জাতির কাছ থেকে আমি একটি জিনিস পাই যা তারা আমাকে ফেরত দেয় নি।” তা শুনে এক ব্যক্তি ইবনে যিয়াদের কাছে গেলো এবং বললো ,“ আপনি কী করেছেন , আপনি তার হাত ও পা কেটে দিয়েছেন আর সে জনতার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বর্ণনা করছে।” ইবনে যিয়াদ আদেশ দিলো তাকে ফিরিয়ে আনতে। যখন তাকে ফিরিয়া আনা হলো ইবনে যিয়াদ আদেশ দিল তার জিহ্বা কেটে ফেলতে এবং এরপর তাকে ক্রুশবিদ্ধ করতে।
শেইখ মুফীদ যিয়াদ বিন নসর হারিসি থেকে বর্ণনা করেন যে ,“ আমি যিয়াদের সাথে ছিলাম যখন তারা রুশাইদ আল হাজারিকে ফেরত আনলো।” যিয়াদ তাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ আলী তোমাকে কী বলেছিলো যে , আমরা তোমাকে নিয়ে কী করবো ?” রুশাইদ বললেন যে ,“ তুমি আমার হাত ও পা কেটে ফেলবে এরপর আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করবে।” যিয়াদ বললে ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তার ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত করবো। তাকে বলে যেতে দাও।” যখন রুশাইদ বের হয়ে যাচ্ছিলেন যিয়াদ বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তার জন্য এর চাইতে খারাপ বিবেচনা করি না যা তার মাওলা তাকে আগেই বলেছে , তাই তাকে ক্রুশে ঝুলাও ।” এ কথা শুনে রুশাইদ বললেন ,“ তা হতে পারে না। আরেকটি ভবিষ্যদ্বাণী থেকে যায় যা ইমাম আলী (আ.) আমাকে আগেই জানিয়েছেন।” যিয়াদ বললো ,“ তার জিভ কেটে ফেলো।” এতে রুশাইদ বললো ,“ আল্লাহর শপথ , এ হচ্ছে বিশ্বাসীদের আমির (আ.) এর ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবতা।”
হুজর বিন আদির শাহাদাত
হুজর বিন আদি ছিলেন ইমাম আলী (আ.) এর সাথীদের একজন এবং তিনি ভাতা পেতেন। তাকে হুজর আল খায়ের (কল্যাণের হুজর) বলে ডাকা হতো। তিনি সুপরিচিত ছিলেন তার রোযা , অনেক ইবাদত ও দোআর জন্য। বলা হয় যে তিনি দিন ও রাতে এক হাজার রাকাত নামায পড়তেন এবং জ্ঞানী সাথীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এছাড়াও আরও কম বয়সে তিনি সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। সিফফীনের যুদ্ধে তিনি ছিলেন কিনদা গোত্রের পতাকাবাহী এবং নাহরেওয়ানের যুদ্ধে (ইমাম আলীর সৈন্যদলের) তিনি ছিলেন বাম পাশের অংশের ডান শাখার অধিনায়ক।
ফযল বিন শাযান বলেন যে , সম্মানিতদের , সর্দারদের ও ধার্মিক তাবেঈনদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন জানদাব বিন যুহাইরাহ (যাদুকরদের হত্যাকারী) , আব্দুল্লাহ বিন বুদাইল , হুজর বিন আদি , সুলাইমান বিন সুরাদ , মুসাইয়্যাব বিন নাজাবাহ , আল-ক্বামাহ , আশতার , সাঈদ বিন কায়েস এবং তাদের মত আরও। যুদ্ধ তাদেরকে কিনে নিয়েছিলো এবং তারা (সংখ্যায়) বৃদ্ধি পেয়েছিলেন এবং তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে থেকে শহীদ হয়েছিলেন।
যখন মুগীরা বিন শা’ বাহকে কুফার গভর্নর বানানো হলো , সে মিম্বরে উঠলো এবং ইমাম আলী (আ.) ও তার শিয়াদেরকে গালি-গালাজ করলো। সে উসমানের হত্যাকারীদের অভিশাপ দিলো এবং তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করলো। হুজর তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,
) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّـهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ(
“ হে যারা বিশ্বাস করো , ন্যায়বিচারের জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও , আল্লাহর জন্য সাক্ষী হয়ে , যদি তা তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেও হয়। ” [সূরা নিসা: ১৩৫]
“ আমি সাক্ষ্য দেই যে , যে ব্যক্তিকে তুমি গালিগালাজ করেছো তার মর্যাদা তার চাইতে অনেক বেশী যাকে তুমি প্রশংসা করেছো। আর যাকে তুমি বাহবা দিয়েছো সে বদনামের যোগ্য তার চাইতে বেশী যাকে তুমি অপবাদ দিয়েছো। ” মুগীরা বললো ,“ দুর্ভোগ তোমার জন্য , হে হুজর , এ ধরনের কথাবার্তা থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো এবং বাদশাহর ক্রোধ থেকে নিজেকে দূরে রাখো যা বৃদ্ধি পাবে তোমাকে হত্যা করা পর্যন্ত। ” কিন্তু হুজর এতে সামান্যতম দমেন নি এবং এ বিষয়ে তিনি সব সময় বিরোধিতা করতেন। একদিন যথারীতি মুগীরা মিম্বরে উঠলো এবং সে দিনগুলো ছিলো তার জীবনের শেষ সময় এবং ইমাম আলী (আ.) ও তার শিয়াদের অভিশাপ দিতে লাগলো। হঠাৎ হুজর দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন এবং উচ্চ কন্ঠে বললেন যা মসজিদে যারা ছিলো সবাই শুনতে পেলো ,“ এই , তুমি কি তাকে জানো না যাকে তুমি অস্বীকার করছো ? তুমি বিশ্বাসীদের আমিরকে অপবাদ দিচ্ছো ও অপরাধীদের প্রশংসা করছো ?”
হিজরি ৫০ সনে , মুগীরা মৃত্যুবরণ করে এবং কফা ও বসরার উপকন্ঠ যিয়াদ বিন আবীহর নিয়ন্ত্রণে আসে , যে তখন কুফাতে আসে। যিয়াদ হুজরকে ডাকলো , যে তার পুরাতন বন্ধু ছিলো এবং বললো ,“ আমি শুনেছি তুমি মুগীরার সাথে কী আচরণ করেছো এবং সে তা সহ্য করে গেছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ আমি তা সহ্য করবো না। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি আলীর জন্য বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা আল্লাহ আমার অন্তর থেকে মুছে দিয়েছেন এবং তা (তার) শত্রুতা ও হিংসা দিয়ে বদলে দিয়েছেন। এছাড়া মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে শত্রুতা ও বিদ্বেষ আল্লাহ মুছে দিয়েছেন আমার অন্তর থেকে তার জন্য ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব দিয়ে। যদি তুমি সঠিক পথে থাকো তোমার পৃথিবী ও বিশ্বাস নিরাপদ থাকবে , কিন্তু যদি তোমার হাত দিয়ে ডানে বামে আঘাত কর , তাহলে তুমি তোমাকে ধ্বংস করবে এবং তোমার রক্ত আমাদের জন্য বৈধ হয়ে যাবে। আমি সতর্ক করার আগে শাস্তি দেয়া অপছন্দ করি এবং না আমি গ্রেফতার করা পছন্দ করি কোন কারণ ছাড়া। হে আল্লাহ , আপনি সাক্ষী থাকুন। ” হুজর বললো ,“ সেনাপতি আমাকে কখনোই দেখবেন না তা করতে যা তিনি অপছন্দ করেন এবং আমি তার উপদেশ গ্রহণ করবো। ” এ কথা বলে হুজর বের হয়ে এলেন । এভাবে তিনি গোপনীয়তা অবলম্ব করনেলন এবং এরপর থেকে সতর্ক থাকলেন। যিয়াদ তাকে পছন্দ করতো। শিয়ারা হুজরের সাথে সাক্ষাৎ করতে লাগলো এবং তার বক্তব্য শুনতে লাগলো। যিয়াদ সাধারণত শীতকালে বসরায় এবং গ্রীষ্মকালে কুফায় কাটাতো। (তার অনুপস্থিতিতে) সামারাহ বিন জুনদাব ছিলো বসরায় তার প্রতিনিধি এবং কুফাতে আমর বিন হুরেইস।
একদিন আম্মারা বিন উক্ববাহ যিয়াদকে বললো ,“ শিয়ারা হুজরের সাথে দেখা করছে এবং তারা তার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে এবং আমি আশঙ্কা করছি যে হয়তো তারা আপনার অনুপস্থিতিতে বিদ্রোহ করে বসবে। ” যিয়াদ হুজরকে ডাকলো এবং তাকে সতর্ক করলো এবং বসরার উদ্দেশ্যে গেলো তার নিজের জায়গায় আমর বিন হুরেইসকে রেখে। শিয়ারা হুজরের সাথে সাক্ষাৎ করতে থাকলো এবং যখন তিনি মসজিদে বসতেন , জনতা তার কথা শুনতে আসতো। তারা মসজিদের অর্ধেক দখল করে রাখতো এবং যারা তাদেরকে দেখতে আসতো তারাও তাদের ঘিরে বসতো যতক্ষণ না সারা মসজিদ ভরে যেতো। তাদের হৈচৈ বৃদ্ধি পেলো এবং তারা মুয়াবিয়ার বদনাম ও যিয়াদকে গালাগালি করতে লাগলো। যখন আমর বিন হুরেইসকে একথা জানানো হলো সে মিম্বরে উঠলো। শহরের গণ্যমান্যরা তাকে ঘিরে বসলো এবং সে তাদেরকে আমন্ত্রণ জানালো আনুগত্যের জন্য এবং বিরোধিতার বিষয়ে সতর্ক করলো। হঠাৎ হুজরের লোকজনের মধ্যে একটি দল লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো এবং তাকবীর দিতে থাকলো। তারা তার কাছে গেলো এবং তাকে অভিশাপ দিতে লাগলো এবং তাকে পাথর ছুঁড়ে মারতে লাগলো। আমর মিম্বর থেকে নেমে গেলো এবং প্রাসাদে গেলো এবং দরজা বন্ধ করে দিলো ; আর যিয়াদকে এ বিষয়ে লিখলো।
যখন যিয়াদ এ বিষয়ে জানতে পারলো তখন সে কা‘ ব বিন মালিকের কবিতা আবৃত্তি করলো ,“ গ্রামে সকাল হওয়ার সময় থেকে আমাদের সর্দারেরা তাদের আপত্তি জানালো , (এ বলে) কেন আমরা আমাদের বীজ বপন করবো যদি আমরা (মাঠে) তা আমাদের তরবারি দিয়ে রক্ষা করতে না পারি। ” এরপর সে বললো ,“ আমি (ভেতরে) শূন্য , যদি আমি কুফাকে হুজরের হাত থেকে নিরাপদ না করি এবং তাকে অন্যদের জন্য উদাহরণ না বানাই। হে হুজর , তোমার মায়ের জন্য আক্ষেপ , তোমার রাতের খাদ্য তোমাকে খেঁকশিয়ালের কাছে এনেছে। ” এটি একটি প্রবাদ যে , এক ব্যক্তি এক রাতে খাবারের খোঁজে বের হলো কিন্তু সে নিজেই খেঁকশিয়ালের খাবারে পরিণত হলো। এরপর সে (যিয়াদ) কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো এবং প্রাসাদে প্রবেশ করলো। সে একটি সিল্কের জোব্বা এবং একটি সবুজ পালকের কোট গায়ে বেরিয়ে এলো এবং মসজিদে প্রবেশ করলো। তখন হুজর তার বন্ধুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে মসজিদে বসা ছিলেন। যিয়াদ মিম্বরে উঠলো এবং একটি হুমকিমূলক বক্তব্য রাখলো। সে কুফার সম্মানিত ব্যক্তিদের বললো ,“ তোমাদের স্বজনের মধ্যে যারা হুজরের সাথে বসে আছে ডাকো এবং তোমাদের ভাইদের ও সন্তানদের এবং নিকটজনদের , যারা তোমাদের কথা শুনবে তাদেরকে নিজেদের কাছে , যতক্ষণ না তাদরেকে তোমরা তার কাছ থেকে আলাদা করছো। ” তারা তাই করলো এবং বেশীরভাগই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো এবং যখন যিয়াদ দেখলো যে হুজরের অনুসারীদের সংখ্যা কমে গেছে সে শাদ্দাদ বিন হাইসাম হিলালিকে ডাকলো , যে ছিলো পুলিশ বাহিনীর প্রধান এবং তাকে বললো হুজরকে তার কাছে আনতে। সে এলো এবং হুজরকে সেনাপতির ডাকে সাড়া দিতে বললো। হুজরের সাথীরা বললো ,“ না , আল্লাহর শপথ , আমরা তা মানবো না। ” তা শুনে শাদ্দাদ তার পুলিশ বাহিনীকে বললো তাদের তরবারি খুলে তাদেরকে সবদিক থেকে ঘেরাও করতে। এভাবে তারা হুজরকে ঘেরাও করলো। বাকর বিন উবাইদ আমুদি আঘাত করলো আমর বিন হুমাক্বের মাথায় এবং তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। আযদ গোত্র থেকে দুজন , আবু সুফিয়ান এবং আজালান তাকে মাটি থেকে তুললো এবং তাকে আযদ গোত্রের উবায়দুল্লাহ বিন মালিকের ঘরে নিয়ে গেলো , যেখানে তিনি লুকিয়ে ছিলেন কুফা ত্যাগের আগ পর্যন্ত। উমাইর বিন যাইদ কালবি হুজরের শিষ্যদের একজন ছিলো , সে বললো ,“ আমাদের মাঝে আমার কাছে ছাড়া কারো কাছে তরবারি নেই , আর তা যথেষ্ট নয়। ” হুজর বললেন ,“ তাহলে তুমি কী পরামর্শ দিচ্ছো ?” সে বললো ,“ উঠো এবং তোমাদের আত্মীয়দের কাছে যাও যেন তারা তোমাকে রক্ষা করতে পারে।” হুজর উঠলেন এবং স্থান ত্যাগ করলেন। যিয়াদ , যে তাদের দিকে মিম্বরে বসে তাকিয়ে ছিলো , উচ্চ কন্ঠে বললো ,“ হে হামাদান , তামীম , হাওয়াযিন , বাগীয , মাযহাজ , আসাদ ও গাতাফান গোত্রের সন্তানরা , উঠো এবং বনি কিনদার ঘরগুলোর দিকে যাও হুজরের দিকে এবং তাকে এখানে নিয়ে এসো। ”
যখন হুজর তার বাড়িতে এলেন তিনি দেখলেন যে তার সমর্থকদের সংখ্যা কম। তিনি তাদের মুক্ত করে দিয়ে বললেন ,“ তোমরা সবাই ফিরে যাও , কারণ তোমাদের প্রতিরোধের শক্তি নেই এবং তোমাদেরকে হত্যা করা হবে। ” যখন তারা ফেরত যেতে চেষ্টা করলো মাযহাজ ও হামাদান গোত্রের অশ্বারোহী সৈনিকরা এসে পড়লো এবং তাদের মুখোমুখি হলো এবং ক্বায়েস বিন যাইদ গ্রেফতার হলো এবং অন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। হুজর বনি হারবের রাস্তার দিকে গেলেন যা বনি কিনদার একটি শাখা এবং সোলাইমান বিন ইয়াযীদ কিনদির বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। তারা তার পিছনে পিছনে দৌড়ে সুলাইমানের বাড়িতে পৌঁছে গেলো। সুলাইমান তার তরবারি খুললো বাইরে গিয়ে মোকাবেলার জন্য , তখন তার কন্যা কাঁদতে শুরু করলো । হুজর তাকে থামালেন এবং তার বাড়ি ত্যাগ করলেন একটি চিমনীর ভিতর দিয়ে। এরপর তিনি বনি আনবারাহর দিকে গেলেন যা ছিলো বনি কিনদারই আরেকটি শাখা এবং আব্দুল্লাহ বিন হুরেইসের বাড়ি , সেখানে তিনি আশ্রয় নিলেন - যিনি ছিলেন মালিক আশতার নাখাঈর ভাই। আব্দুল্লাহ তাকে হাসিমুখে স্বাগতম জানালেন। হুজরের কাছে হঠাৎ খবর এলো যে ,“ পুলিশ আপনাকে নাখার রাস্তায় খুঁজছে , কারণ এক কালো কৃতদাসী তাদেরকে সংবাদ দিয়েছে এবং তারা আপনাকে খুঁজছে। ” হুজর আব্দুল্লাহর সাথে বেরিয়ে এলেন রাতের অন্ধকারে এবং রাবি’ আ বিন নাজিয আযদির বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। যখন পুলিশ বাহিনী তাকে পেতে ব্যর্থ হলো তখন যিয়াদ মুহাম্মাদ বিন আল আশআসকে ডাকলো এবং বললো ,“ হয় হুজরকে আনো , নয়তো আমি তোমাদের সব খেজুর গাছ ধ্বংস করে দিবো এবং তোমাদের বাড়িঘর গুঁড়ো করে দেবো এবং তোমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারবে না , আমি তোমাদের টুকরো টুকরো করে ফেলবো” । মুহাম্মাদ বললো ,“ আমাকে কিছু সময় দিন যেন আমি তাকে খুঁজতে পারি। ” যিয়াদ বললো ,“ আমি তোমাকে তিন দিনের সময় দিচ্ছি , যদি এ সময়ের মধ্যে হুজরকে আমার কাছে আনো তাহলে তোমরা মুক্ত , আর নয়তো তোমরা নিজেদেরকে মৃতদের মধ্যে গণ্য করতে পারো। ” সৈন্যরা মুহাম্মাদকে কারাগারের দিকে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো আর তার চেহারার রঙ বদলে গেলো। সে সময় হুজর বিন ইয়াযীদ কিনদি নামে এক ব্যক্তি , যে বনি মুররাহ গোত্রের একজন ছিলো , তার জিম্মাদার হলে তারা তাকে ছেড়ে দিলো।
হুজর রাবি ’ আর বাড়িতে এক দিন ও এক রাতের জন্য ছিলেন , এরপর তিনি রুশাইদ নামে একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে , যে ছিলো ইসফাহানের লোক , পাঠালো মুহাম্মাদ বিন আল আশাসের কাছে একটি সংবাদ দিয়ে যে ,“ আমাকে জানানো হয়েছে উদ্ধত অত্যাচারী (যিয়াদ) তোমার সাথে কী আচরণ করেছে। ভয় পেয়ো না , কারণ আমি তোমার কাছে আসবো। এরপর তুমি যিয়াদের কাছে যাবে তোমার কিছু লোকজন নিয়ে এবং তাকে বলো আমাকে নিরাপত্তা দিতে এবং আমাকে মুয়াবিয়ার কাছে পাঠাতে , যেন সে সিদ্ধান্ত নেয় আমাকে নিয়ে কী করা উচিত। ” তাই হুজর বিন ইয়াযীদ , জারীর বিন আব্দুল্লাহ এবং মালিক আশতারের ভাই আব্দুল্লাহকে সাথে নিয়ে মুহাম্মাদ যিয়াদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলো এবং হুজরের সংবাদ দিলো। যিয়াদ তা শুনলো ও একমত হলো। তারা হুজরের কাছে একজন দূতকে পাঠালো তাকে জানানোর জন্য এবং তিনি যিয়াদের কাছে এলেন । তাকে দেখে যিয়াদ তাকে বন্দী করার আদেশ দিলো। তাকে দশ দিন কারাগারে বন্দী রাখা হলো এবং যিয়াদ আর কিছু করলো না হুজরের অন্যান্য সমর্থকদের ধাওয়া করা ছাড়া।
যিয়াদ হুজরের সমর্থকদের পিছু ধাওয়া করতে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্তনা সে যারা পালিয়ে গিয়েছিলো তাদের বারো জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হলো। এরপর সে কুফার চারটি এলাকার সর্দারদের ডাকলো , যারা ছিলো: আমর বিন হুরেইস , খালিদ বিন আরফাতাহ , ক্বায়েস বিন ওয়ালীদ এবং আবু মূসা আশআরীর সন্তান আবু বুরদা। সে তাদেরকে বললো ,“ তোমরা সবাই হুজর সম্পর্কে যা দেখেছো সে বিষয়ে সাক্ষ্য দিবে। ” আর তারা সাক্ষ্য দিলো যে , হুজর দল গঠন করেছিলো এবং খলিফাকে গালি দিচ্ছিলো , যিয়াদকে তিরস্কার করছিলো এবং সে আবু তুরাবকে (ইমাম আলীকে) নির্দোষ বলছিলো এবং তার উপর আল্লাহর রহমতের জন্য দোআ করছিলো এবং তার শত্রুও প্রতিপক্ষদের সাথে নিজের সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলো এবং যারা তার সাথে আছে তারা তার বন্ধুদের মধ্যে সর্দার এবং তারাও একই মত পোষণ করে। যিয়াদ তাদের সাক্ষ্য পড়ে দেখলো এবং বললো ,“ আমি এ সাক্ষ্যকে স্বীকৃতি দেই না এবং আমি মনে করি এটি অসম্পূর্ণ। আমি চাই আরেকটি চিঠি এ রকম কথাসহ লেখা হোক। ”
তাই আবু বুরদা লিখলো ,“ আল্লাহর নামে যিনি দয়ালু , করুণাময়। এটি এক সাক্ষ্য দিচ্ছি আবু মূসার সন্তান , আবু দারদা , রাব্বুল আলামীনের জন্য যে , হুজর বিন আদি অবাধ্য হয়েছে এবং দলত্যাগ করেছে। সে খলিফাকে অভিশাপ দিয়েছে এবং ফাসাদ ও যুদ্ধের দিকে আহ্বান করেছে। সে একদল সৈন্য জামায়েত করেছে এবং খিলাফত থেকে মুয়াবিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানিয়েছে। সে আল্লাহ সম্পর্কে অশ্লীল অবিশ্বাস চাষ করেছে। ” যিয়াদ বললো ,“ তোমরা স্বাক্ষর দাও। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো যেন এ মূর্খ বিশ্বাসঘাতকের মাথা কেটে ফেলা হয়। ” এরপর অন্যান্য তিন এলাকার সম্মানিত লোকেরাও একইভাবে সাক্ষ্য দিলো। এরপর সে জনগণকে ডাকলো এবং বললো ,“ তোমরা সাক্ষ্য দাও যেভাবে চার এলাকার লোকেরা সাক্ষ্য দিয়েছে। ” তাই সত্তর জন সাক্ষ্য দিলো। যাদের মধ্যে ছিলো ইসহাক , মূসা , এবং ইসমাইল , যারা ছিলো তালহা বিন উবায়দুল্লাহর সন্তান।
মুনযির বিন যুবাইর , আম্মারাহ বিন উক্ববাহ , আব্দুর রাহমান বিন হিবার , উমর বিন সা’ আদ বিন আবি ওয়াক্কাস , ওয়ায়েল বিন হুজর হাযরামি , যিরার বিন হুবাইরাহ , শাদ্দাদ বিন মুনযির - যে ইবনে বাযীহ নামে সুপরিচিত ছিলো , হাজ্জাজ বিন আবজার আজালি , আমর বিন হাজ্জাজ , লুবাইদ বিন আতারুদ , মুহাম্মাদ বিন উমাইর বিন আতারুদ , আসমা বিন খারেজা , শিমর বিন যিলজাওশান , যাজর বিন ক্বায়েস জু ’ ফি , শাবাস বিন রাব ’ ঈ , সিমাক বিন মুহযিমা আসাদি - যে ছিলো কুফার চারটি মসজিদের একটির রক্ষনাবেক্ষণকারী , যেগুলো তৈরী করা হয়েছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর হত্যার আনন্দে এবং তারা আরও দুজনের নাম এতে অন্তর্ভুক্ত করলো কিন্তু তারা তা স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করলো। দুজন ছিলো শুরেইহ বিন আল হারস ক্বাযী এবং শুরেইহ বিন হানি। যখন শুরেইহ বিন আল হারসকে হুজর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো সে বললো ,“ সে সব সময় রোযা রাখে এবং সারা রাত ইবাদতে মগ্ন থাকে। ” শুরেইহ বিন হানি বললো ,“ আমি শুনেছি আমার নাম এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (আমার অনুমতি ছাড়া) তাই আমি তা বাতিল করছি। ”
যিয়াদ এরপর সাক্ষীদের প্রমাণপত্র ওয়ায়েল বিন হুজর এবং কাসীর বিন শিহাবের কাছে দিলো এবং তাদেরকে হুজর বিন আদি এবং তার সাথীদেরসহ সিরিয়ার দিকে পাঠিয়ে দিলো। সে তাদের আদেশ দিলো রাতে পুলিশ বাহিনীর সাথে কুফার বাইরে রওনা দিতে এবং তারা ছিলো চৌদ্দ জন। যখন তারা আযরামের কবরস্থানে পৌঁছলো , যা কুফার একটি স্টেশন , হুজরের একজন শিষ্য ক্বাবীসাহ বিন যাবীয়াহ আবাসির চোখ পড়লো তার নিজের বাড়ির উপর। সে দেখলো তার কন্যারা বাড়ি থেকে দেখছে এবং সে ওয়ায়েল এবং কাসীরের কাছে অনুরোধ করলো তাকে তার বাড়ির কাছে নিয়ে যেতে যেন সে অসিয়ত করে যেতে পারে। যখন তারা তাকে বাড়ির কাছে নিয়ে গেলো তার কন্যারা কাঁদতে শুরু করলো । সে কিছক্ষণের জন্য চুপ করে থাকলো এবং তাদেরকেও চুপ করতে বললো এবং তারা তা করলো। তখন সে বললো ,“ আল্লাহকে ভয় করো ও সবর করো। কারণ এ ভ্রমণে আমি আমার রবের কাছ থেকে ভালো সমাপ্তি আশা করছি দুটো বিষয়ে যে , হয় আমাকে হত্যা করা হবে - যা উত্তম সফলতা , অথবা আমাকে মুক্তি দেয়া হবে এবং আমি তোমাদের কাছে সুস্বাস্থ্যে ফিরে আসবো। যিনি তোমাদের রিয্ক্ব দিয়েছিলেন এবং দেখাশোনা করেছিলেন তিনি ছিলেন আল্লাহ এবং তিনি জীবিত এবং কখনও মৃত্যুবরণ করবেন না এবং আমি আশা করি তিনি তোমাদের পরিত্যাগ করবেন না এবং তোমাদের কারণে আমার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। ” এ কথা বলে সে ফেরত এলো এবং তার লোকজন তার জন্য দোআ করলো।
এরপর তারা আরও এগুলো এবং মারজ আযরাত পৌঁছালো , যা সিরিয়া থেকে কিছু মাইল দূরে এবং তাদেরকে সেখানে বন্দী করে রাখা হলো। মুয়াবিয়া ওয়ায়েল বিন হুজর এবং কাসীরকে তার কাছে ডেকে পাঠালো। যখন তারা এলো সে চিঠি খুললো এবং সিরিয়াবাসীদের উপস্থিতিতে পড়লো। যার বিষয়বস্তু ছিলো এরকম:“ আল্লাহর দাস মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান সমীপে , যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ান থেকে। আম্মা বা’ আদ , আল্লাহ আমিরুল মুমিনীনের জন্য একটি সুন্দর বিচার করেছেন এবং তার শত্রুদের সরিয়ে দিয়েছেন এবং বিদ্রোহীদের স্বেচ্ছাচারিতা ধ্বংস করেছেন। যুবকদের বন্ধু আলীর অনুসারী বিদ্রোহীরা , আমিরুল মুমিনীনের অবাধ্য হয়েছে হুজর বিন আদির নেতৃত্বে এবং মুসলমানদের দল থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে এবং আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের ক্রোধকে দমিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের উপর আমাদের আধিপত্য দান করেছেন। এরপর আমি কুফার ধার্মিক , সম্মানিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের ডেকেছি এবং তারা সাক্ষী দিয়েছে যা তারা দেখেছে এবং আমি তাদের পাঠিয়েছি পরহেজগার ও ধার্মিক লোকদের সাক্ষীপত্র সাথে দিয়ে , যাদের স্বাক্ষর চিঠির শেষে যুক্ত করা আছে। ”
যখন মুয়াবিয়া এ চিঠি পড়লো তখন সে এ সম্পর্কে সিরিয়াবাসীদের অভিমত চাইলো। ইয়াযীদ বিন আল আসাদ বাজালি বললো ,“ তাদেরকে সিরিয়ার গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে দিন যেন আহলে কিতাবরা (খৃস্টান ও ইহুদী) তাদের কাজ শেষ করে। ” হুজর তখন মুয়াবিয়ার কাছে একটি সংবাদ পাঠালো এ বলে ,“ আমরা এখনও আমিরুল মুমিনীনের বাইয়াতের মধ্যেই আছি। আমরা তা পরিত্যাগ করি নি এবং না আমরা প্রতিবাদ করেছি। আমাদের শত্রুরা ও অকল্যাণ কামনাকারীরা আমাদের বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দিয়েছে। ” যখন মুয়াবিয়া এ সংবাদ পেলো সে বললো ,“ নিশ্চয়ই যিয়াদ আমাদের দৃষ্টিতে হুজরের চাইতে বেশী নির্ভরযোগ্য। ” এরপর সে হাদাবাহ বিন ফায়ায কুযাঈকে (যার এক চোখ অন্ধ ছিলো) আরও দুজন লোকসহ রাতের বেলা পাঠালো হুজর এবং তার সাথীদের আনার জন্য। যখন কারিম বিন আফীফ খাস’ আমি তাকে দেখলো সে বললো ,“ আমাদের অর্ধেককে হত্যা করা হবে এবং অন্য অর্ধেককে মুক্তি দেয়া হবে। ” মুয়াবিয়ার দূত তাদের কাছে এলো এবং তাদের ছয় জনকে মুক্ত করে দিলো সিরিয়াবাসীদের মধ্যস্থতায়। অন্য আট জনের বিষয়ে মুয়াবিয়ার দূত বললো ,“ মুয়াবিয়া আদেশ পাঠিয়েছেন যদি তোমরা আলীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ কর ও তাকে অভিশাপ দাও তাহলে আমরা তোমাদের মুক্ত করে দিবো , আর নয়তো তোমাদেরকে হত্যা করা হবে এবং আমিরুল মুমিনীন বিশ্বাস করেন যে তোমাদের রক্ত ঝরানো আমাদের জন্য বৈধ তোমাদের শহরের লোকদের সাক্ষ্যের কারণে , কিন্তু আমির দয়া দেখিয়েছেন , যদি তোমরা ঐ ব্যক্তির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ কর , তোমাদের মুক্তি দেয়া হবে। ” যখন তারা একথা শুনলো তারা তা পালন করতে অস্বীকার করলো , তাই তাদের হাত থেকে দড়ি খুলে ফেলা হলো এবং তাদের কাফন আনা হলো। আর তারা উঠলো এবং সারা রাত ইবাদতে কাটালো।
যখন সকাল হলো , মুয়াবিয়ার সাথীরা তাদেরকে বললো ,“ হে (বন্দী) দল , গত রাতে আমরা দেখেছি যে তোমরা অনেক নামায পড়েছো ও দোআ করেছো , এখন আমাদের বল যেন আমরা জানতে পারি উসমান সম্পর্কে তোমরা কী বিশ্বাস রাখো ?” তারা বললো ,“ সে ছিলো প্রথম ব্যক্তি যে অন্যায় আদেশ দিয়েছে এবং ভুল পথ তৈরী করেছে। ” তারা বললো ,“ আমিরুল মুমিনীন তোমাদেরকে আরও ভালো জানেন। ” তখন তারা তাদের মাথার কাছে দাঁড়ালো এবং বললো ,“ তোমরা এখন ঐ ব্যক্তির (ইমাম আলীর) সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করছো , নাকি না ?” তারা বললো ,“ না , বরং আমরা তার সাথে বন্ধুত্ব রাখি। ” তা শুনে মুয়াবিয়ার দূতদের প্রত্যেকে এক একজনকে ধরলো তাদেরকে হত্যা করার জন্য। তখন হুজর তাদের বললো ,“ অন্তত আমাদের অযু করতে দাও এবং আমাদের কিছু সময় দাও যেন আমরা দুরাকাত নামায পড়তে পারি , কারণ আল্লাহর শপথ , যখনই আমি অযু করেছি আমি নামায পড়েছি। ” তারা এতে সম্মত হলো এবং তারা নামায পড়লো। নামায শেষ করে হুজর বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি কখনই এত সংক্ষিপ্ত নামায পড়ি নি। পাছে লোকে মনে করে আমি তা করেছি মৃত্যুকে ভয় করে। ” হাদাবাহ বিন ফায়ায আ’ ওয়ার তার দিকে এগুলো একটি তরবারি নিয়ে তাকে আক্রমণ করার জন্য , তখন হুজর কাপতে শুরু করলেন। হাদাবাহ বললো ,“ তুমি বলেছিলে তুমি মৃত্যুকে ভয় কর না , আমি এখনও বলছি তোমাকে তোমার মাওলার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে এবং আমরা তোমাকে ছেড়ে দিবো। ” হুজর বললেন ,“ কিভাবে আমি ভয় পাবো না , যখন কবর প্রস্তুত এবং কাফন পরা হয়েছে এবং তরবারি কোষমুক্ত হয়েছে , আল্লাহর শপথ যদিও আমি ভয় পাই , আমি ঐ ধরনের কথা উচ্চারণ করি না যা আল্লাহর ক্রোধ আনে। ”
এ বইয়ের লেখক বলেন যে , আমি একটি রেওয়ায়েত স্মরণ করতে পারি যে , হুজর ইমাম আলী (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলেন যখন তিনি (ইমাম-আলী আ.) মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন ইবনে মুলজিমের তরবারি থেকে। তিনি ইমামের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং কবিতা আবৃতি করলেন ,“ দুঃখ রোযাদার মাওলার জন্য , (যিনি) পরহেজগার , এক সাহসী সিংহ , এবং নৈতিক গুণাবলীর দরজা। ” যখন ইমাম আলী (আ.) তার দিকে তাকালেন এবং তার কবিতা শুনলেন , তিনি বললেন ,“ তখন তোমার অবস্থা কী হবে যখন তোমাকে বলা হবে আমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে , তখন তুমি কী বলবে ?”
হুজর বললেন ,“ হে আমিরুল মুমিনীন , আমাকে যদি টুকরো টুকরোও করা হয় এবং জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করা হয় , তবুও আমি তা আপনার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার চাইতে বেশী পছন্দ করি। ” ইমাম বললেন ,“ তুমি ভালো কাজ সম্পাদনে সফল হও , হে হুজর! তোমাকে হয়তো আল্লাহ প্রচুর পুরস্কার দিবেন তোমার নবী (সা.) এর পরিবারের প্রতি তোমার ভালোবাসার জন্য।”
এরপর হুজরের বাকী ছয় জন সাথীকে তরবারির নিচে দেয়া হলো। আব্দুর রহমান বিন হিসসান আনযী এবং কারীম বিন আফীফ খাসা’ আমি বাদ রইলো এবং তারা বললো ,“ আমাদেরকে মুয়াবিয়ার কাছে নিয়ে যাও , যেন আমরা সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারি যার বিষয়ে সে আমাদের আদেশ করেছে। ” তখন তাদেরকে মুয়াবিয়ার কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। যখন কারীম সেখানে প্রবেশ করলো , সে বললো ,“ আল্লাহ , আল্লাহ , হে মুয়াবিয়া , নিশ্চয়ই তুমি এ নশ্বর বাড়ি থেকে চিরস্থায়ী বাড়ির দিকে যাবে , তখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে কেন তুমি আমাদের রক্ত ঝরিয়েছো। ” মুয়াবিয়া বললো ,“ তাহলে আলী সম্পর্কে তোমার কী বলার আছে ?” সে বললো ,“ যা তুমি বলো। আমি আলীর ধর্ম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন করছি যার ভালোবাসা ও আনুগত্যের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ইবাদত করতাম। ” তখন শিমর বিন আব্দুল্লাহ খাস’ আমী উঠে দাঁড়ালো এবং তার পক্ষ হয়ে আবেদন করলো এবং মুয়াবিয়া তাকে তখন ক্ষমা করে দিলো , কিন্তু একটি শর্ত দিয়ে যে , সে একমাস কারাগারে থাকবে এবং মুয়াবিয়া যতদিন না বলবে সে কুফা ত্যাগ করতে পারবে না।
এরপর সে আব্দুর রহমান বিন হিসসানের দিকে ফিরলো এবং বললো“ হে রাবিয়া গোত্রের ভাই , আলী সম্পর্কে তোমার কী বলার আছে ?” সে বললো ,“ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আলী তাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী স্মরণ করতেন এবং ভালোর দিকে ডাকতেন এবং খারাপকে নিষেধ করতেন এবং অন্যদের দোষ ত্রুটি ক্ষমা করতেন। ” মুয়াবিয়া বললো ,“ তাহলে উসমান সম্পর্কে তোমার কী বলার আছে ?” সে উত্তর দিলো ,“ সে ছিলো প্রথম ব্যক্তি যে নিপীড়নের দরজা খুলেছিলো এবং ধার্মিকতার দরজা বন্ধ করেছিলো। ” এ কথা শুনে মুয়াবিয়া বললো ,“ নিশ্চয়ই তুমি নিজেকে হত্যা করেছো। ” সে বললো ,“ বরং আমি তোমাকে হত্যা করেছি। ” মুয়াবিয়া তখন তাকে যিয়াদের কাছে ফেরত পাঠালো এ সংবাদ দিয়ে যে ,“ সে হচ্ছে তাদের মধ্যে নিকৃষ্ট যাদেরকে তুমি আমার কাছে পাঠিয়েছো। তাকে কঠিন নির্যাতন করো , কারণ সে তার যোগ্য এবং তাকে হত্যা করো যত খারাপভাবে সম্ভব হয়। ” যখন তাকে যিয়াদের কাছে পাঠানো হলো সে তাকে ক্বায়েস নাতিফের কাছে পাঠালো যে তাকে জীবন্তকবর দিল।
যে সাত জনকে শহীদ করা হয়েছিলো তারা ছিলেন:
১) হুজর বিন আদি
২) শারীক বিন শাদ্দাদ হাযরামি
৩) সাইফী বিন ফুযাইল শাইবানি
৪) ক্বাবীসাহ বিন যাবীয়াহ আবাসি
৫) মাযহার বিন শিহাব মিনক্বারি
৬) কুদাম বিন হাইয়্যান আনযি এবং
৭) আব্দুর রহমান বিন হিসসান আনযি
(আল্লাহর রহমত ও বরকত হোক তাদের ওপরে)
এ বইয়ের লেখক বলেন যে , হুজরের শাহাদাত মুসলমানদের ওপরে এক ব্যাপক প্রভাব ফেলে , যারা মুয়াবিয়াকে এর জন্য তিরস্কার করেছিলো। আবুল ফারাজ ইসফাহানি বলেন যে , আবু মাখনাফ বলেন , ইবনে আবি যায়েদা আমার কাছে বর্ণনা করেন আবু ইসহাক থেকে যে , সে বলেছে ,“ আমি স্মরণ করতে পারি লোকজন বলছিলো প্রথম বেইজ্জতি যা কুফার উপর আপতিত হয়েছিলো তা ছিলো হুজরের শাহাদাত , মুয়াবিয়ার ভাই হিসেবে যিয়াদকে গ্রহণ এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাত। ”
মৃত্যুর সময় মুয়াবিয়া বলেছিলো ,“ আমি গভীর সমস্যায় পড়বো ইবনুল আদবারের জন্য। ” ইবনুল আদবার বলা হতো হুজর বিন আদিকে কারণ তার পিতাকে“ আদবার ” ডাকা হতো কারণ তার পিঠে তিনি একটি তরবারির আঘাত পেয়েছিলেন এবং রেওয়ায়েত এসেছে যে খোরাসানের গভর্নর রাবি বিন যিয়াদ হারিসি যখন হুজর এবং তার সাথীদের শাহাদাতের সংবাদ পেলেন তখন মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করলেন। তিনি তার দুহাত তুললেন (আকাশের দিকে) এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , যদি আপনি আমাকে বিবেচনা করেন তাহলে এ মুহূর্তে আমাকে মুত্যু দিন। ” এরপর তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।
ইবনে আসীর তার‘ কামিল ’ -এ বলেন যে হাসান বসরী বলেছেন:য়ামবিয়া তার ভিতরে চারটি বৈশিষ্ট্য রাখতো। তার প্রত্যেকটি ছিলো তার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। প্রথম সে মুসলিম জাতির উপর নিজেকে চাপিয়ে দেয় তরবারির শক্তি দিয়ে এবং খিলাফতের বিষয়ে তাদের মতামত নেয়ার তোয়াক্কা করে নি যখন নবী (সা.) এর সাহাবীরা এবং অন্যান্য সম্মানিত ও উদার ব্যক্তিরা তাদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয়টি হচ্ছে , সে তার বিদ্রোহী সন্তান ইয়াযীদকে (খলিফা হিসেবে) নিয়োগ দেয় , যে ছিলো মদখোর , সিল্কের পোশাক পড়তো এবং তাম্বুরীন বাজাতো। তৃতীয়টি হলো , সে যিয়াদকে তার ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছিলো যখন নবী (সা.) বলেছেন ,“ শিশু সন্তান (ঐ নারীর) স্বামীর এবং ব্যভিচারীর জন্য পাথর ” এবং চতুর্থটি হচ্ছে যে , সে হুজর এবং তার সাথীদের হত্যা করেছে। হুজর ও তার সাথীদের বিষয়ে তার দুর্ভোগ হোক।
বর্ণিত হয়েছে যে জনগণ বলতো ,“ প্রথম যে বেইজ্জতি কুফার উপর আপতিত হয়েছিলো তা ছিলো হাসান বিন আলী (আ.) এর শাহাদাত , হুজর বিন আদির শাহাদাত এবং যিয়াদকে আবু সুফিয়ানের সন্তান বলে গ্রহণ করা। ”
হিনদ বিনতে যাইদ আনসারিয়া একজন শিয়া মহিলা ছিলেন যে হুজরের প্রশংসায় কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।
এ বইয়ের লেখক বলেন যে , ঐতিহাসিকরা হুজরের শাহাদাত সম্পকে আরও কিছু কারণ নথিভুক্ত করেছেন। তারা বলেন যে , একবার যিয়াদ শুক্রবার দিন খোতবা দিচ্ছিলো এবং তা দীর্ঘায়িত করে ফেললো। এ কারণে নামায বাতিল হয়ে গেলো। তা অনুমান করে হুজর বিন আদি উচ্চ কন্ঠে বলে উঠেন ,“ নামায ” , কিন্তু যিয়াদ তাকে উপেক্ষা করলো এবং চালিয়ে যেতে থাকলো। হুজর আবার বলে উঠলেন ,“ নামায ” , কিন্তু সে খোতবা দিতেই থাকে। হুজর শঙ্কিত হলেন যে নামাযের সময় অতিক্রম হয়ে যাবে , তাই তিনি কিছু বালি তার হাতে নেন এবং নামাযের জন্য উঠে দাঁড়ান। তা দেখে অন্যরাও দাঁড়িয়ে গেলো। এ দেখে যিয়াদ মিম্বর থেকে নেমে গেলো এবং নামায আদায় করলো। এরপর সে এ বিষয়ে মুয়াবিয়ার কাছে অতিরঞ্জিত করে লিখলো। মুয়াবিয়া লিখে পাঠালো যে হুজরকে শিকলে বেঁধে তার কাছে পাঠাতে। যখন যিয়াদ তাকে গ্রেফতার করতে চাইলো তার গোত্রের লোকেরা উঠে দাঁড়ালো এবং তাকে রক্ষা করলো। হুজর তাদের থামালেন এবং তাকে শিকলে বাঁধা হলো ও মুয়াবিয়ার কাছে পাঠানো হলো। যখন তিনি মুয়াবিয়ার কাছে গেলেন তিনি বললেন ,“ শান্তিবর্ষিত হোক আমিরুল মুমিনীনের উপর। ” মুয়াবিয়া বললো ,“ আমি কি আমিরুল মুমিনীন ? আল্লাহর শপথ আমি তোমাকে ক্ষমা করবো না এবং না তোমার কোন যুক্তি গ্রহণ করবো। তাকে নিয়ে যাও ও মাথা কেটে ফেলো। ” তার দায়িত্বে যারা ছিলো হুজর তাদেরকে বললেন ,“ কমপক্ষে আমাকে দু রাদকাত নামায পড়তে দাও। ” তাকে সময় দেয়া হলো এবং তিনি তা দ্রুত সম্পাদন করলেন এবং বললেন ,“ আমি যদি ভয় না পেতাম (যে পাছে তোমরা মনে কর আমি মৃত্যুকে ভয় করি) তাহলে আমি তা দীর্ঘায়িত করতাম। ” তখন তিনি যারা উপস্থিত ছিলো তাদের দিকে ফিরে বললেন ,“ আমাকে কবর দাও শিকলগুলো ও আমার দেহের রক্তসহ , কারণ আমি আগামীকাল কিয়ামতের দিন উঁচু রাস্তায় মুয়াবিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করতে চাই। ”
‘ আসাদুল গাবাহ ’ তে লেখা আছে যে হুজর ছিলেন তাদের একজন যারা ভাতা পেতেন দুহাজার পাঁচশত। তাকে শহীদ করা হয় ৫১ হিজরিতে এবং তার কবর আযরাতে সুপরিচিত এবং তিনি ছিলেন (অন্যদের জন্য) একজন অসিয়ত সম্পাদনকারী।
একই বইয়ের লেখক বলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) যে চিঠি মুয়াবিয়াকে লেখেন তাতে এ কথাগুলো লেখা ছিলো ,
“ তুমি কি হুজর বিন আদি এবং অন্যান্য ইবাদতকারীদের হত্যাকারী নও যারা নিপীড়ন প্রতিরোধ করেছিলো এবং বিদ ’ আতকে গুরুতর অন্যায় মনে করতো এবং যারা আল্লাহর পথে কোন তিরস্কারকে ভয় করতো না ? তুমি তাদেরকে হত্যা করেছো নিপীড়ন ও অবিচারের মাধ্যমে যদিও তাদেরকে নিরাপত্তা দেয়ার অঙ্গীকার করেছিলে। ”
আমর বিন হুমাক্বের শাহাদাত
আমর বিন হুমাক্ব (যেমনটি আগে বলা হয়েছে যে তিনি হুজর বিন আদির সাথে মসজিদে উপস্থিত ছিলেন) রুফা’ আহ বিন শাদ্দাদের সাথে কুফা থেকে পালিয়ে যান এবং মাদায়েনে পৌঁছান এবং সেখান থেকে মসূল যান। সেখানে তারা এক বড় পর্বতে আশ্রয় নেন। যখন এ সংবাদ মসূলের গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন বালতা ’ আহ হামাদানির কাছে পৌঁছল সে কিছু অশ্বারোহী সৈনিক ও শহরের একদল মানুষ নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হলো। আমরের শরীরে পানি এসেছিল (একটি রোগ) , তাই তার সাহস হলো না তাদের মুকাবিলা করার। কিন্তু রুফা ’ আহ , যে ছিলো শক্তিশালী যুবক , তার ঘোড়ায় চড়লো এবং আমরকে বললো তাকে সে রক্ষা করবে। আমর বললেন ,“ কী লাভ ? নিজেকে রক্ষা করো এবং এদের মাঝ থেকে পালাও। ” ঘোড়সওয়াররা তাকে ধাওয়া করলো কিন্তু সে তাদেরকে তীর দিয়ে আঘাত করলো , তাই তারা ফিরে গেলো।
তারা আমরকে গ্রেফতার করলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো সে কে। তিনি উত্তর দিলেন ,“ এমন একজন যাকে মুক্ত করে দিলে তোমাদের জন্য ভালো হবে এবং যদি আমাকে হত্যা কর তাহলে তোমরা খুব বড় ক্ষতিতে পড়বে। ” কিন্তু তিনি তার পরিচয় প্রকাশ করলেন না। তারা তাকে মসূলের শাসনকর্তা আব্দুর রহমান বিন উসমান সাক্বাফির কাছে নিয়ে গেলো , যে ছিলো মুয়াবিয়ার ভাগ্নে এবং পরিচিত ছিলো ইবনে উম্মুল হাকাম নামে। সে তার সম্পর্কে মুয়াবিয়ার কাছে লিখলো। মুয়াবিয়া উত্তর দিলো ,“ সে সেই লোক যে স্বীকার করেছে যে সে উসমানকে একটি বর্শা দিয়ে নয় বার আহত করেছে। তাই এখনও তাকে শাস্তি দাও নি ? তাকে একটি বর্শা দিয়ে নয় বার আহত করা উচিত। ” তারা তাকে বের করে আনলো এবং বর্শার নয়টি আঘাত করলো এবং আমর সম্ভবত প্রথম বা দ্বিতীয় আঘাতেই মৃত্যুবরণ করলেন , পরে তার মাথা কেটে ফেলা হয় এবং মাথাটি মুয়াবিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইসলামে তার মাথাই প্রথম যা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো হয়।
লেখক বলেন যে , ইসলামের ইতিহাসের বইগুলোতে বিষয়টি ঐতিহাসিকরা (যারা শিয়া নয়) এভাবে বর্ণনা করেছেন শুধু মুয়াবিয়া যে তাকে খুন করেছিলো তা জায়েয করার জন্য। আর বিশিষ্ট শিয়া বর্ণনাকারী শেইখ কাশশি বর্ণনা করেছেন যে , একবার নবী (সা.) এক দল লোককে পাঠালেন এ আদেশ দিয়ে যে ,“ রাত্রির এ রকম সময়ে তোমরা পথ হারিয়ে ফেলবে। তখন বাম দিকে যাবে এবং তোমরা এক ব্যক্তির সাক্ষাৎ পাবে যার এক পাল ভেড়া থাকবে। তোমরা তাকে পথের দিশা জিজ্ঞেস করবে কিন্তু সে তোমাদের পথ দেখাবে না যতক্ষণ না তোমরা তার সাথে খাবার খাও। এরপর সে একটি ভেড়া জবাই করবে এবং তোমাদের জন্য কাবাব তৈরী করবে এবং তোমাদের সাথে খাবে। এরপর সে তোমাদের পথ দেখাবে। তোমরা আমার সালাম তার কাছে পৌঁছে দিও এবং তাকে জানিও মদীনায় আমার উপস্থিতি সম্পর্কে। ”
তারা যাত্রা করলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তাদের পথ হারিয়ে ফেললেন। তাদের একজন বললেন ,“ নবী কি আমাদের বলেন নি বাম দিকে যেতে ?” তারা বাম দিকে গেলেন এবং এক লোকের সাক্ষাৎ পেলেন যার সম্পর্কে নবী (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন এবং তাকে পথের কথা জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি আমর বিন হুমাক্ব ছাড়া আর কেউ ছিলো না। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন ,“ নবী কি মদীনায় উপস্থিত হয়েছেন ?” তারা হ্যা-সূচক উত্তর দিলেন এবং তিনি তাদের সাথে রইলেন এবং নবীর (সা.) কাছে গেলেন এবং সেখানেই রইলেন আল্লাহ যতক্ষণ চাইলেন। এরপর নবী (সা.) তাকে বললেন ,“ সে জায়গায় ফেরত যাও যেখান থেকে তুমি এসেছো , যখন বিশ্বাসীদের আমির আলী কুফার দায়িত্ব পাবে , তার কাছে যেও। ”
আমর ফেরত চলে গেলেন। যখন ইমাম আলী (আ.) কুফার খলিফা হলেন তখন তিনি তার কাছে এলেন এবং সেখানেই বাস করতে লাগলেন। ইমাম আলী (আ.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ এখানে কি তোমার কোন বাড়ি আছে ?” এতে তিনি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন।
ইমাম বললেন ,“ তাহলে তোমার বাড়ি বিক্রি করে দাও এবং আযদি (গোত্র)-এর মাঝে একটি বাড়ি কিনো। কারণ আগামীকাল যখন আমি তোমাদের মাঝ থেকে চলে যাবো তখন কিছু লোক তোমার পিছু ধাওয়া করবে , আযদি গোত্রের লোকেরা তোমাকে রক্ষা করবে যতক্ষণ না তুমি কুফা ত্যাগ কর এবং মসূলের দুর্গে হাজির হও। তুমি একটি পক্ষাঘাতগ্রস্থ লোকের পাশ দিয়ে যাবে , তুমি তার পাশে বসবে এবং পানি চাইবে। সে তোমাকে পানি দিবে এবং তোমার বিষয়ে খোঁজ- খবর দিবে। তখন তুমি তোমার অবস্থা তার কাছে বর্ণনা করো এবং তাকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিও। সে ইসলাম গ্রহণ করবে এবং এরপর তুমি তোমার হাত দুটো তার উরুদুটোর উপর রাখবে এবং আল্লাহ তাকে তার রোগ থেকে মুক্তি দিবেন। এরপর ওঠো এবং হাঁটো যতক্ষণ না একজন অন্ধ লোকের পাশ দিয়ে যাবে , যে পথের উপর বসে থাকবে। তুমি পানি চাও সে তোমাকে তা দিবে এবং এরপর সে তোমার সম্পর্কে জানতে চাইবে , তখন তুমি তোমার অবস্থার কথা তাকে বর্ণনা করো এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিও। সে ইসলাম গ্রহণ করবে এবং এরপর তোমার দুহাত তার দুচোখের উপর রেখো। আল্লাহ , যিনি সম্মানিত ও প্রশংসিত তাকে দৃষ্টি দান করবেন। সেও তোমার সাথে সাথে আসবে এবং নিশ্চয়ই এ দুব্যক্তি হবে তারা যারা তোমাকে কবর দিবে। এরপর কিছু অশ্বারোহী ব্যক্তি তোমার পিছু ধাওয়া করবে এবং যখন তুমি অমুক সময়ে অমুক জায়গায় দুর্গের কাছে পৌঁছবে তারা তোমার কাছে আসবে। তখন তুমি ঘোড়া থেকে নেমে গুহায় প্রবেশ করো। নিশ্চয়ই মানুষ ও জীনদের মাঝে সবচেয়ে নিকৃষ্টরা তোমাকে হত্যার জন্য একত্র হবে। ”
ইমাম আলী (আ.) যা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন তা ঘটলো এবং আমর তাই করলেন যা তাকে করতে বলা হয়েছিলো। যখন তারা দুর্গে পৌঁছল আমর ঐ দুই লোককে বললেন ওপরে যেতে এবং তাকে বলতে বললেন তারা কী দেখছে। তারা ওপরে উঠলো এবং বললো যে তারা কিছু অশ্বারোহীকে দেখছে তাদের দিকে আসতে। তা শুনে আমর তার ঘোড়া থেকে নেমে গুহায় প্রবেশ করলেন এবং তার ঘোড়া পালিয়ে গেলো। যখন তিনি গুহায় প্রবেশ করলেন তখন একটি কালো সাপ , যেটি সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলো , তাকে কামড় দিলো। যখন অশ্বারোহীরা কাছে পৌঁছল তারা দেখলো তার ঘোড়া দৌড়াচ্ছে এবং বুঝতে পারলো যে আমর কাছে ভিতরেই আছে। তারা তার খোঁজ করতে লাগলো এবং তাকে গুহার ভিতরে দেখতে পেলো। তারা তার শরীরের যেখানেই স্পর্শ করলো তার মাংস খুলে এলো (প্রচণ্ড বিষের কারণে) । তখন তারা তার মাথা কেটে ফেললো এবং তার মাথাকে মুয়াবিয়ার কাছে নিয়ে গেলো , যে আদেশ দিলো তার মাথাকে বর্শার আগায় রাখতে ; ইসলামে এটিই হলো প্রথম মাথা যা বর্শার আগায় রাখা হয়েছিলো।
পরে বর্ণনা করা হবে যে জাহির , যিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে কারবালায় শহীদ হন , আমর বিন হুমাকের শিষ্য ছিলেন এবং তিনিই তাকে কবর দেন।‘ ক্বামক্বাম ’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে , আমর বিন হুমাক্ব ছিলেন কাহিন বিন হাবীব বিন আমর বিন ক্বাহিন বিন যাররাহ বিন আমর রাবি ‘ আ খুযাইর সন্তান। তিনি নবী (সা.) এর কাছে আসেন হুদাইবিয়ার সন্ধির পর। অন্যরা বলেন যে , তিনি বিদায় হজ্বের বছরে ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রথম বর্ণনাটি আরও নির্ভরযোগ্য বলে মনে হয়। (ক্বামক্বাম) বইয়ের লেখক আমর বিন হুমাক থেকে বর্ণনা করেন যে , তিনি নবী (সা.) এর পিপাসা মিটিয়েছিলেন , যিনি তার জন্য দোআ করেছিলেন ,“ হে রব , তাকে যৌবনপূর্ণ জীবন দাও। ” আর এভাবে তিনি আশি বছরে পৌঁছালেন কিন্তু তার চুল ও দাড়ি একটিও সাদা হলো না। তিনি ইমাম আলী (আ.) এর শিয়াদের একজন ছিলেন এবং তার সাথে থেকে জামাল , সিফফীন ও নাহরেওয়ানের যুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন তাদের একজন যারা হুজর বিন আদিকে সমর্থন করতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তার সাথীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
তিনি ইরাক ত্যাগ করেন যিয়াদের ভয়ে এবং মসূলের গুহায় আশ্রয় নেন। মসূলের গভর্নর তাকে গ্রেফতার করার জন্য তার সৈন্যদের পাঠায়। যখন তারা গুহায় প্রবেশ করলো , তারা তাকে মৃত দেখতে পেলো , কারণ তাকে সাপে কামড় দিয়েছিলো। তার কবর মসূলে সুপরিচিত এবং তা যিয়ারতের তীর্থস্থান এবং বিরাট মর্যাদা রাখে। তার কবরের উপর একটি গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে। সাইফুদ দৌলা ও নাসিরুদ দৌলার চাচাত ভাই আবু আব্দুল্লাহ সাঈদ বিন হামাদান এটির সংস্কার কাজ শুরুকরেন ৩৩৬ হিজরির শা’ বান মাসে। সেখানে মাযার নির্মাণ নিয়ে শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে সংঘর্ষ হয়। শেইখ কাশশি বর্ণনা করেন যে , তিনি (আমর) ইমাম আলী (আ.) এর শিষ্যদের একজন ছিলেন এবং যারা তার দিকে রুজু করতো তাদের মধ্যে ছিলেন প্রথম।
‘ ইখতিসাস’ বইতে ইমাম আলী (আ.) এর ঘনিষ্ঠ সাথীদেরকে গণনা করা হয়েছে। জাফর বিন হোসেইন বর্ণনা করেন মুহাম্মাদ বিন জাফর মুয়াদ্দাব থেকে যে , তিনি বলেছেন ,“ রাসূল (সা.) এর সাহাবীদের মাঝ থেকে ইমাম আলী (আ.) এর চারটি স্তম্ভ ছিলো , যারা হলেন- সালমান , মিকদাদ , আবুযার এবং আম্মার। তাবেঈনদের মাঝে ওয়াইস বিন আনীস ক্বারানী (যিনি কিয়ামতের দিন রাবি ’ আ ওযামর গোত্রের সমান সংখ্যক লোকের জন্য সুপারিশ করবেন) এবং আমর বিন হুমাক্ব। জাফর বিন হোসেইন বলেন যে , আমর বিন হুমাক্ব ইমাম আলী (আ.) এর কাছে ঐ মর্যাদা রাখতেন যেমন সালমান রাখতেন রাসূল (সা.) এর কাছে। এরপর আছে রুশাইদ আল হাজারি , মেইসাম আত-তাম্মার , কুমাইল বিন যিয়াদ নাখা’ ঈ , ইমাম আলী (আ.) এর মুক্ত দাস ক্বামবার , মুহাম্মাদ বিন আবু বকর , ইমাম আলী (আ.) এর মুক্ত দাস মুযরে এবং আব্দুল্লাহ বিন ইয়াহইয়া , যার সম্পর্কে জামালের দিন ইমাম বলেছিলেন ,
“ হে ইয়াহইয়ার সন্তান , আমি সুসংবাদ দিচ্ছি যে তুমি এবং তোমার বাবা শারতাতুল খামীস-এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তোমাদেরকে আরশে নির্বাচন করেছেন। ”
এরপর আছে , জানাদ বিন যুহাইর আমিরি এবং আমিরের সব সন্তান ইমাম আলী (আ.) এর শিয়া ছিলো , হাবীব বিন মুযাহির আসাদি , আল হারস বিন আব্দুল্লাহ আ’ ওয়ার হামাদানি , মালিক বিন হুরেইস আশতার , আলাম আযদি , আবু আব্দুল্লাহ জাদালি , জুয়েইরাহ বিন মুসাহহির আবাদি।
একই বইয়ে বর্ণিত আছে যে , আমর বিন হুমাক্ব ইমাম আলী (আ.) কে বলেছিলেন যে , আমি আপনার কাছে সম্পদের বা এ পৃথিবীর সম্মানের খোঁজে আসি নি কিন্তু আমি আপনার কাছে এসেছি যেহেতু আপনি নবীর চাচাতো ভাই এবং সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং নারী জাতির সর্দার ফাতিমা (আ.) এর স্বামী এবং নবীর চিরঞ্জীব বংশধরের পিতা এবং মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে আপনার অবদানই সবচেয়ে বেশী। আল্লাহর শপথ , যদি আপনি আমাকে আদেশ করেন পর্বতগুলোকে তাদের জায়গা থেকে সরিয়ে দিতে এবং সমুদ্রের গভীর থেকে পানি তুলে আনতে আমি আপনার আদেশ মেনে চলবো যতক্ষণ না আমার মৃত্যু হয়। আমি সব সময় আপনার শত্রুদের আঘাত করবো আমার হাতের তরবারি দিয়ে এবং আপনার বন্ধুদের সাহায্য করবো এবং আল্লাহ যেন আপনার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং আপনাকে বিজয় দান করেন। এরপরও আমি বিশ্বাস করি না যে , আমি তা সম্পন্ন করতে পেরেছি যা আপনার প্রাপ্য। ” ইমাম আলী (আ.) তার জন্য দোআ করলেন ,
“ হে আল্লাহ , তার অন্তরকে আলোকিত করুন এবং তাকে সঠিক পথ দেখান। আমার ইচ্ছা হয় তোমার মত যদি একশ ’ জন আমার শিয়াদের মধ্যে থাকতো। ”
একই বইতে আছে ইসলামের শুরুতে আমর বিন হুমাক্ব ছিলেন তার গোত্রের একজন উট রক্ষক। তার গোত্র রাসূল (সা.) এর সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলো। একবার নবী (সা.) এর কিছু সাহাবী তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলো যাদেরকে নবী পাঠিয়েছিলেন ধর্ম প্রচার করতে। তারা নবীকে বলেছিলেন যে তাদের কাছে ভ্রমণের রসদ ছিলো না এবং তারা পথও চিনতো না। নবী (সা.) বললেন ,
“ পথে তোমরা একজন সুঠাম সুন্দর পুরুষের সাক্ষাৎ পাবে যে তোমাদের খাওয়াবে। তোমাদের পানির পিপাসা মেটাবে এবং পথ দেখিয়ে দিবে এবং সে বেহেশতের অধিবাসীদের একজন হবে।”
তারা আমরের কাছে পৌঁছালেন , যে তাদেরকে উটের গোশত ও দুধ খাওয়ালেন এবং তিনি নবীর কাছে এলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করলেন , ঐ সময় পর্যন্ত যখন খিলাফত মুয়াবিয়ার কাছে পৌঁছলো (যা ইতোমধ্যেই আলোচিত হয়েছে) ।
এরপর তিনি মসূলের যূও নামে এক জায়গায় লোকজনের কাছ থেকে আলাদা হয়ে রইলেন। মুয়াবিয়া তাকে লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , আল্লাহ যুদ্ধের আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন এবং ফাসাদ ঠাণ্ডা করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ ধার্মিকদের সফলতা দান করেছেন। তুমি তোমার বন্ধুদের চাইতে কম দূরে নও বা কম অপরাধীও নও। তারা আমার আদেশের সামনে মাথা নত করে দিয়েছে এবং আমাকে দায়িত্ব পালনে সাহায্য করতে দ্রুত এগিয়ে এসেছে। কিন্তু এখনও তুমি নিজেকে সরিয়ে রেখেছো ; তাই আমার কাজে সাহায্য করতে আসো যেন তোমার পিছনের গুনাহগুলো এর মাধ্যমে ক্ষমা করে দেয়া হয়। সম্ভবত আমি আমার পূর্বসূরীদের মত খারাপ নই। যদি তুমি আত্মসম্মানবোধ রাখো ও রোযাদার , অনুগত এবং ভালো ব্যবহারের লোক হও তাহলে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নিরাপত্তায় আমার কাছে আশ্রয় নাও। তোমার হৃদয়কে হিংসা থেকে এবং তোমার নফসকে ঘৃণা থেকে পরিষ্কার করো এবং আল্লাহ সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট। ”
আমর মুয়াবিয়ার কাছে যেতে অস্বীকার করলেন , তাই সে কিছু লোককে পাঠালো যারা তাকে হত্যা করলো এবং তার মাথাকে মুয়াবিয়ার কাছে আনলো। তারা তার মাথাকে তার স্ত্রীর কাছে পাঠালো। তিনি তা তার কোলে রেখে বললেন ,“ দীর্ঘদিন তাকে তোমরা আমার কাছ থেকে দূরে রেখেছো এবং এখন তাকে হত্যা করেছো ও তাকে আমার কাছে এনেছো উপহার হিসেবে। কত সদয় না এ উপহার , যা আমার আনন্দ এবং যে নিজেও আমাকে পছন্দ করতো। হে দূত , আমার সংবাদ মুয়াবিয়ার কাছে পৌঁছে দাও এবং তাকে বল যে আল্লাহ অবশ্যই তার রক্তের প্রতিশোধ নিবেন এবং শীঘ্রই তাঁর ক্রোধ ও অভিশাপ আসবে। তুমি একটি গুরুতর অপরাধ করেছো এবং হত্যা করেছো একজন ধার্মিক সাধক ব্যক্তিকে। হে দূত , মুয়াবিয়াকে পৌঁছে দিও আমি যা বলেছি। ” দূত তার সংবাদ মুয়াবিয়ার কাছে পৌঁছে দিলে মুয়াবিয়া মহিলাকে ডাকলো এবং তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো , “ তুমি কি এ শব্দগুলো উচ্চারণ করেছো ?” সে উত্তর দিলো ,“ হ্যাঁ , আমি সেগুলো বলেছি এবং না আমি এর জন্য আফসোস করি , আর না আমি এর জন্য দুঃখিত। ” মুয়াবিয়া তাকে বললো তার শহর থেকে চলে যেতে। উত্তরে সে বললো ,“ আমি অবশ্যই তা করবো , কারণ তোমার শহর আমার জন্মস্থান নয় এবং আমি একে কারাগার মনে করি , এবং আমার হৃদয়ে এর কোন স্থান নেই। এখানে অনেক সময় গেছে যে আমি ঘুমাই নি এবং আমার অশ্রুক্রমাগত ঝরেছে। এখানে আমার ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এখানে আমি এমন কিছু পাই নি যা আমার চোখকে আলোকিত করবে। ”
আব্দুল্লাহ বিন আবি সারহ কালবি মুয়াবিয়াকে বললো ,“ হে আমিরুল মুমিনীন , সে এক মুনাফিক্ব মহিলা। তাকে তার স্বামীকে অনুসরণ করতে দিন। ” যখন মহিলা এ কথা শুনলো সে তার দিকে তাকিয়ে বললো ,“ হে ব্যাঙের পেটের ঘা , তুমি কি তাকে হত্যা কর নি যে তোমাকে পোষাক দিয়েছিলো দয়া করে এবং তোমাকে একটি আবা (লম্বা পোষাক) দান করেছিলো ? নিশ্চয়ই তুমি ধর্ম ত্যাগ করেছো এবং নিশ্চয়ই মুনাফিক্ব হলো সে যে অন্যায়ভাবে পিছু ধাওয়া করে এবং আল্লাহর দাস হিসাবে নিজেকে দাবী করে ; আর তার কুফুরীকে আল্লাহ কোরআনে নিন্দা জানিয়েছেন। ” তা শুনে মুয়াবিয়া তার কুলীকে বললো তাকে বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে। মহিলা বললো ,“ হিন্দের সন্তানের বিষয়ে আশ্চর্য হই , যে তার আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেছে এবং আমাকে কঠোর ভাষা ব্যবহার করতে বাধা দিয়েছে! আল্লাহর শপথ , আমি আমার ধারালো লোহার মত কঠোর ভাষা দিয়ে তার পেট চিরে ফেলবো , আমি যদি রাশীদের কন্যা আমিনা হয়ে থাকি। ”
আবু আব্দুল্লাহ ইমাম হোসেইন (আ.) মুয়াবিয়াকে চিঠি লিখলেন ,“ তুমি কি রাসূল (সা.) এর সাহাবী আমর বিন হুমাক্বের হত্যাকারী নও , যে ছিলো একজন ধার্মিক মানুষ , যার দেহ চিকন হয়ে গিয়েছিলো ও তার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিলো অতিরিক্ত ইবাদতের কারণে ? কোন চেহারা নিয়ে তুমি তাকে নিরাপত্তা (-এর অঙ্গীকার) দিয়েছিলে এবং আল্লাহর নামে শপথ করেছিলে ? যদি কোন পাখিকে একই অঙ্গীকার দেয়া হতো তাহলে তা পাহাড় থেকে নেমে তোমার কোলে আসতো। আর তুমি আল্লাহর মুখোমুখি হয়েছো এবং অঙ্গীকারকে তুচ্ছ মনে করেছো ?”
মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের দুই শিশু সন্তানের শাহাদাত
শেইখ সাদুক্ব ¡ তার‘ আমালি ’ তে বর্ণনা করেছেন তার পিতা (ইবনে বাবাওয়েইহ আউওয়াল) থেকে , তিনি আলী বিন ইবরাহীম থেকে , তিনি তার পিতা থেকে , তিনি ইবরাহীম বিন রাজা থেকে , তিনি আলী বিন জাফর থেকে , তিনি উসমান বিন দাউদ হাশমি থেকে , তিনি হাম্মাদ বিন মুসলিম থেকে , তিনি হুমরান বিন আইয়্যান থেকে , তিনি আবু মুহাম্মাদ থেকে যিনি কুফার একজন সম্মানিত ব্যক্তি , তিনি বলেন: যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হয় দুটি ছেলে শিশুকে তার শিবির থেকে গ্রেফতার করা হয় এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। উবায়দুল্লাহ কারাগারের রক্ষীকে ডেকে বললো ,“ এ বাচ্চা ছেলে দুটোকে নিয়ে যাও এবং বন্দী করে রাখো। তাদেরকে ভালো খাবার অথবা ঠাণ্ডা পানি দিও না এবং তাদেরকে হয়রানি করো। ”
বাচ্চা ছেলে দুটো দিনের বেলা রোযা রাখলো এবং যখন রাত হলো কারা রক্ষী তাদের জন্য দুটো বার্লির রুটি এবং এক জগ পানি আনলো। এভাবে যখন এক বছর পার হয়ে গেলো তাদের একজন আরেকজনকে বললো ,“ আমরা অনেক দিন কারাগারে কাটালাম এবং আমাদের জীবন চলে যাচ্ছে , আর আমাদের শরীরও ভেঙ্গে গেছে। যখন বৃদ্ধ কারারক্ষী আমাদের কাছে আসবে আমরা তার কাছে আমাদের মর্যাদা এবং বংশের কথা খুলে বলবো যেন সে আমাদের প্রতি দয়ার্দ্র হয়। ” যখন প্রতিদিনের মত রাতের বেলায় বৃদ্ধ কারারক্ষী দুটো বার্লির রুটি ও এক জগ পানি নিয়ে এলো ছোট ছেলেটি বললো ,“ হে শেইখ , আপনি কি নবী (সা.) কে চেনেন ?” সে বললো ,“ কিভাবে আমি তাকে না জানবো , কারণ তিনি আমার নবী। ” তখন শিশুটি বললো ,“ তাহলে আপনি কি জাফর বিন আবি তালিব (আ.) কে চেনেন ?” এতে সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো এবং বললো ,“ আল্লাহ তাকে দুটো পাখা দিয়েছেন বলে তিনি ফেরেশতাদের সাথে উড়েন যেখানে তার ইচ্ছা। ” শিশুটি বললো ,“ আপনি কি আলী বিন আবি তালিব (আ.) কে চেনেন ?” বৃদ্ধ লোকটি বললো ,“ হ্যাঁ , আমি তাকে চিনি , কারণ আমার নবীর চাচাতো ভাই। ” শিশুটি বললো ,“ হে শেইখ , আমরা আপনার নবীর বংশধর এবং আমরা মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিব (আ.) এর সন্তান। আমরা আপনার অধীনে এ কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে আছি। আপনি আমাদের ভালো খাবার দেন না এবং কারাগারে আমাদের হয়রানি করেন। ” কারারক্ষী তাদের পায়ে পড়ে গেলো এবং বললো ,“ আমার জীবন তোমাদের জন্য কোরবান হোক , হে আল্লাহর বাছাইকৃত নবীর বংশ , কারাগারের দরজা তোমাদের জন্য উন্মুক্ত , তোমরা যেতে পারো যেখানে তোমাদের ইচ্ছা। ” যখন রাত নামলো সে দুটো বার্লির রুটি এবং এক জগ পানি আনলো এবং তাদেরকে পথ দেখিয়ে দিল। এরপর বললো ,“ রাতের বেলা ভ্রমণ করো এবং দিনের বেলা লুকিয়ে থেকো যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদেরকে মুক্তি দেন। ”
শিশু দুটি রাতে বেরিয়ে পড়লো এবং একজন বৃদ্ধা মহিলার বাড়িতে গিয়ে বললো ,“ আমরা দুজন ছোট মানুষ , ভ্রমণে আছি এবং রাস্তা চিনি না। আর রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। আজ রাতের জন্য আপনার বাড়িতে আমাদের আশ্রয় দিন ; আর আমরা সকাল হওয়ার সাথে সাথে চলে যাবো। ” বৃদ্ধা মহিলা বললো ,“ হে আমার প্রিয় শিশুরা , তোমরা কারা ? আমি কখনো এরকম সুগন্ধ পাই নি যা তোমাদের শরীর থেকে বেরোচ্ছে। ” তারা বললো ,“ হে শ্রদ্ধেয় মহিলা , আমরা নবীর বংশধর এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কারাগার থেকে পালিয়েছি মৃত্যু থেকে বেঁচে। ” মহিলা বললো , “ হে প্রিয় শিশুরা , আমার মেয়ের জামাই একজন খারাপ লোক যে কারবালায় গণহত্যায় উপস্থিত ছিলো উবায়দুল্লাহর বিশ্বস্তজন হয়ে। আমি ভয় পাচ্ছি হয়তো সে তোমাদের দেখে ফেলবে ও হত্যা করবে। ” শিশুরা উত্তর দিলো ,“ আমরা শুধু এখানে এক রাত থাকতে চাই এবং যখনই সকাল হবে আমরা এখান থেকে চলে যাবো। ” বৃদ্ধা মহিলা একমত হলো এবং তাদের জন্য কিছু খাবার আনলো। শিশুরা খাবার খেলো ও পানি পান করলো এবং ঘুমাতে গেলো। ছোট ভাইটি বড় ভাইকে বললো ,“ হে প্রিয় ভাই , আমি চাই এ রাতটি আমরা শান্তিতে কাটাই , কাছে আসো যেন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরতে পারি এবং ঘুমাতে যাই এবং পরস্পরকে চুমু দিতে পারি। হয়তো মৃত্যু আমাদেরকে আলাদা করে ফেলবে। ” তারা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলো এবং ঘুমিয়ে গেলো।
যখন রাত বেশী হলো বৃদ্ধা মহিলার মেয়ের বদমাশ জামাই এলো এবং দরজায় আস্তে টোকা দিলো। মহিলা জিজ্ঞেস করলো ,“ কে ?” সে বললো যে সে তার মেয়ের জামাই। মহিলা তাকে বললো ,“ কেন তুমি এত রাতে এসেছো। ” লোকটি বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , দরজা খোল আমি পাগল হয়ে যাওয়ার আগেই এবং তাড়া করতে গিয়ে আমার তলপেট ফেটে যাওয়ার আগেই এবং যা আমার উপর ঘটে গেছে সে জন্য। ” মহিলা বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , কী হয়েছে তোমার ?” সে বললো ,“ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের হাত থেকে দুটো শিশু পালিয়েছে এবং সে ঘোষণা দিয়েছে তাদের একজনের মাথা যে তাকে এনে দিবে সে তাকে এক হাজার দিরহাম পুরস্কার দিবে এবং তাদের দুজনের মাথার জন্য দুহাজার দিরহাম দিবে এবং আমি (তাদের খোঁজে) কষ্ট করেছি এবং কিছুই আমার হাতে পৌঁছে নি। ” বৃদ্ধা মহিলা বললো ,“ কিয়ামতের দিন নবী (সা.) এর ক্রোধকে ভয় করো। ” সে বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , এ পৃথিবীকে অবশ্যই চাইতে হবে। ” সে বললো ,“ তুমি এ পৃথিবী দিয়ে কী করবে যদি এর সাথে পরকাল না থাকে ?” লোকটি উত্তর দিলো ,“ হঠাৎ করে তুমি তাদের পক্ষে কথা বলছো যেন তুমি জানো তারা কোথায় আছে। আসো যেন আমি তোমাকে সেনাপতির কাছে নিয়ে যেতে পারি। ” মহিলা বললো ,“ আমার মত বৃদ্ধা মহিলার সাথে কী কাজ থাকতে পারে সেনাপতির ?” সে বললো ,“ আমি তাদের খোঁজে আছি। দরজা খোল যেন আমি একটু বিশ্রাম নিতে পারি এবং সকালে চিন্তা করবো তাদের খোঁজে আমি কী উপায় অবলম্বন করবো। ” মহিলা দরজা খুললো এবং তার জন্য খাবার আনলো। সে খাবার খেলো ও ঘুমালো।
মধ্যরাতে লোকটি বাচ্চাদের নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলো এবং এর দিকে লাগাম ছাড়া উটের মত এগিয়ে গেলো। সে নিয়ন্ত্রণহীন উটের মত চিৎকার করতে লাগলো এবং দেয়াল হাতড়াতে লাগলো এবং এক পর্যায়ে ছোট ভাইটির শরীরের একপাশে তার হাত স্পর্শ করলো। বাচ্চাটি জিজ্ঞেস করলো সে কে। সে উত্তর দিল যে সে এ বাড়ির মালিক এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করলো তারা কারা ? ছোট ভাইটি বড় ভাইকে ঘুম থেকে জাগালো এবং বললো ,“ ভাই , ওঠো , কারণ আমরা তার শিকার হয়েছি যার ভয় করছিলাম। ” লোকটি আবার তাদেরকে জিজ্ঞেস করলো তারা কারা। এতে তারা বললো ,“ আপনি কি আমাদের নিরাপত্তা দিবেন যদি আমরা আমাদের পরিচয় বলি ?” সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিল। তারা বললো ,“ আপনি কি নিরাপত্তার অঙ্গীকার এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের দায়িত্ব স্বীকার করছেন ?” সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিল। তারা আবার বললো ,“ নবী মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ সাক্ষী ?” সে একমত হলো। তারা বললো ,“ আল্লাহ হলেন বিচারক এবং সাক্ষী তার উপর যা এখন আমরা আপনাকে বলবো। ” সে তা গ্রহণ করলো। তখন শিশুরা বললো ,“ আমরা আপনার নবী (সা.) এর বংশধর এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কারাগার থেকে পালিয়েছি আমাদেরকে হত্যা করা হবে এ ভয়ে। ” সে উত্তর দিলো ,“ তোমরা মৃত্যু থেকে পালিয়েছো কিন্তু আবার এর শিকার হয়েছো। আল্লাহর প্রশংসা যিনি আমাকে তোমাদের উপর বিজয় দিয়েছেন। ” এ কথা বলে সে উঠলো এবং বাচ্চাদের হাত বেঁধে ফেললো। সকাল পর্যন্ত বাচ্চাদের হাত বাঁধা রইলো। যখন সকাল হলো লোকটি তার কালো কৃতদাস ফালীহকে ডাকলো এবং বললো ,“ এ দুই শিশুকে ফোরাতের তীরে নিয়ে যাও এবং তাদের মাথা কেটে ফেলো এবং তা আমার কাছে আনো , যেন তা আমি উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে পারি ও দুহাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করতে পারি। ” দাসটি তার তরবারি তুলে নিলো এবং শিশুদের সাথে হাঁটতে শুরু করলো । তারা বাড়ি থেকে দূরেও পৌঁছে নি এমন সময় একটি শিশু তাকে বললো ,“ হে কালো কৃতদাস , তুমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর মুয়ায্যিন বেলালের মত দেখতে। ” কৃতদাসটি বললো ,“ আমার প্রভু আমাকে আদেশ করেছেন তোমাদেরকে হত্যা করতে কিন্তু আমাকে বলো , তোমরা কারা ?” তারা বললো ,“ আমরা তোমার নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর বংশধর এবং মৃত্যুর ভয়ে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কারাগার থেকে পালিয়েছি। বৃদ্ধা মহিলা আমাদেরকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন , আর তোমার প্রভু আমাদেরকে হত্যা করতে চান। ” কৃতদাস তাদের পায়ে পড়ে গেলো এবং তাদের পায়ে চুমু দিয়ে বললো ,“ আমার জীবন তোমাদের জন্য কোরবান হোক এবং আমার চেহারা তোমাদের জন্য ঢাল হোক। হে আল্লাহর নির্বাচিত নবীর সন্তানরা , আল্লাহর শপথ , আমি এ কাজ করবো না যা কিয়ামতের দিন মুহাম্মাদ (সা.) এর ক্রোধ ডেকে আনবে। ” এ কথা বলে সে তার তরবারি ছুঁড়ে ফেলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং অপর তীরে সাঁতরে চলে গেলো। যখন তার মালিক তা দেখলো সে চিৎকার করে বললো ,“ তুমি আমার কথা অমান্য করেছো। ” এর উত্তরে সে বললো ,“ আমি কখনোই তোমার অবাধ্য হই নি যতক্ষণ না তুমি আল্লাহর আবাধ্য হয়েছো এবং এখন যেহেতু তুমি আল্লাহর অবাধ্য হয়েছো আমি তোমাকে এ পৃথিবীতে ও আখেরাতে পরিত্যাগ করছি। ”
তখন লোকটি (বাড়িতে এসে) তার ছেলেকে ডাকলো এবং বললো ,“ আমি তোমার জন্য বৈধ ও অবৈধ উপায়ে রোযগার করেছি আর এ পৃথিবী এমন যে তা অর্জন করতে হবে। তাই এ বাচ্চা দুটোকে ফোরাতের তীরে নিয়ে যাও এবং তাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে সেগুলো আমার কাছে আনো , যেন আমি সেগুলোকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে পারি এবং এর জন্য দুহাজার দিরহাম পুরস্কার পেতে পারি। ” তার ছেলে তরবারি তুলে নিলো এবং তাদের আগে আগে হাঁটতে লাগলো। তারা তখনও দূরে যায় নি এমন সময় একটি শিশু তাকে বললো ,“ হে যুবক , আমি কতই না আশঙ্কা করছি যে তোমার যৌবন জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। ” যুবকটি জিজ্ঞেস করলো তারা কারা ? তারা বললো ,“ আমরা নবীর বংশধর এবং তোমার বাবা চায় আমাদের হত্যা করতে। ” তা শুনে যুবকটি তাদের পায়ে পড়ে গেলো এবং তাতে চুমু দিয়ে ঠিক কৃতদাসটির কথাই বললো এবং নদীতোপিঝয়ে পড়ে সাতরে আরেক তীরে চলে গেলো। যখন তার বাবা তা দেখলো সে চিৎকার করে বললো ,“ তুমি আমাকে অমান্য করেছো ?” সে উত্তর দিলো ,“ আল্লাহর আনুগত্য তোমার আনুগত্যের চাইতে আমার কাছে প্রিয়তর। ” তা শুনে সেই অভিশপ্ত ব্যক্তি বললো ,“ আমি ছাড়া তোমাদেরকে হত্যা করতে কেউ প্রস্তুত নয়। ” এ কথা বলে সে তরবারি নিলো এবং তাদের দিকে এগিয়ে গেলো।
যখন তারা ফোরাতের তীরে পৌঁছলো , সে তার তরবারি খাপ থেকে বের করলো। যখন শিশুরা খোলা তরবারি দেখলো তাদের চোখ অশ্রুপূর্ণ হয়ে উঠলো। তারা বললো ,“ হে শেইখ , আমাদেরকে বাজারে নিয়ে যান এবং আমাদেরকে বিক্রি করে দিন এবং কিয়ামতের দিন নবীর ক্রোধকে আমন্ত্রণ জানাবেন না। ”
সে বললো ,“ না , অবশ্যই আমি তোমাদের হত্যা করবো এবং তোমাদের মাথাকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যাবো এবং এর জন্য তার কাছ থেকের পুরস্কার পাবো । ” তারা বললো ,“ হে শেইখ , আপনি কি নবীর সাথে আমাদের সম্পর্কের কথা বিবেচনা করেন না ?” এতে সে বললো ,“ অবশ্যই তোমরা নবীর সাথে এ রকম কোন সম্পর্ক রাখো না। ” তারা বললো ,“ হে শেইখ , তাহলে আমাদেরকে উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে চলুন যেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আমাদের নিয়ে কী করবে। ” সে বললো ,“ আমার আর কোন পথ নেই তোমাদের রক্ত ঝরিয়ে তার নৈকট্য অর্জন করা ছাড়া। ” শিশুরা বললো ,“ হে শেইখ , আমরা যে শিশু এর জন্যও কি কোন করুণা বোধ করেন না ?” এতে সে বললো ,“ আল্লাহ আমার অন্তরে কোন করুণা দেন নি।” তখন তারা বললো ,“ হে শেইখ , যেহেতু এখন আর কোন আশা নেই তাই আমাদের সময় দিন দুরাকাত নামায পড়ার জন্য। ” সে বললো ,“ যত খুশী নামায পড়ো যদি এতে তোমাদের লাভ হয়। ” শিশুরা চার রাকাত নামায পড়লো। এরপর আকাশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে বললো ,“ হে চিরঞ্জীব , হে প্রজ্ঞাবান , হে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক , আমাদের মাঝে ন্যায়বিচার করে দিন। ” লোকটি উঠে দাঁড়ালো এবং বড় ভাইয়ের মাথা কেটে ফেললো এবং মাথাটি একটি ব্যাগে রাখলো। ছোট ভাইটি , যে বড় ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেলো , বললো ,“ আমি চাই রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে আমার বড় ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত অবস্থায়। ” লোকটি বললো ,“ ভয় পেয়ো না , কারণ শীঘ্রই আমি তোমাকে তোমার ভাইয়ের কাছে পাঠাবো। ” একথা বলে সে ছেলেটির মাথা কেটে ফেললো এবং তার মাথাকেও ব্যাগে রাখলো। এরপর সে তাদের দেহ দুটিকে ফোরাত নদীতে নিক্ষেপ করলো।
এরপর সে মাথাগুলো উবায়দুল্লাহর কাছে আনলো যে তখন তার সিংহাসনে বসেছিলো একটি বাঁশের লাঠি হাতে। লোকটি শিশুদের মাথাকে উবায়দুল্লাহর দিকে ফিরিয়ে রাখলো। উবায়দুল্লাহ তা দেখে উঠে দাঁড়ালো এবং বসলো , তিন বার। এরপর সে বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , তুমি তাদের কোথায় পেলে ?” সে বললো ,“ আমাদের পরিবারের এক মহিলা তাদের আশ্রয় দিয়েছিলো। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তাহলে কি তুমি অতিথির অধিকার রক্ষা কর নি ?” সে না- সূচক উত্তর দিলো। উবায়দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো ,“ তারা তোমাকে কী বলেছিলো ?” সে বললো ,“ তারা বলেছিলো আমাদেরকে বাজারে নিয়ে যান এবং বিক্রি করে দিন এবং আমাদের হাত বেঁধে দিন এবং নবী (সা.) এর ক্রোধ অর্জন করবেন না কিয়ামতের দিন। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তখন তুমি কি উত্তর দিলে ?” সে বললো , আমি বললাম ,“ না , অবশ্যই আমি তোমাদের হত্যা করবো এবং তোমাদের মাথা উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যাবো এবং এর মাধ্যমে তার কাছ থেকে দুহাজার দিরহাম পুরস্কার লাভ করবো। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তখন তারা কী উত্তর দিলো ?” সে বললো ,“ তারা বললো , তাহলে আমাদের উবায়দুল্লাহর কাছে জীবিত নিয়ে যান যেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে আমাদের নিয়ে কী করবে। ”“ তখন তুমি কী বললে ?” বললো উবায়দুল্লাহ। সে বললো ,“ আমি বললাম , না , তোমাদের রক্ত ঝরানোর মাধ্যমে বরং আমি তার নৈকট্য চাই। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ কেন তুমি তাদেরকে আমার কাছে জীবিত আনো নি , তাতে আমি তোমাকে চার হাজার দিরহাম পুরস্কার দিতে পারতাম ?” সে বললো ,“ আমার অন্তর আমাকে অন্য কোন চিন্তা করতে অবকাশ দেয় নি তাদের রক্ত ঝরানোর মাধ্যমে আপনার নৈকট্য অর্জন ছাড়া। ” উবায়দুল্লাহ তখন তাকে জিজ্ঞেস করলো তারা তখন কী বললো। সে বললো , তারা বললো ,“ কমপক্ষে নবীর সাথে আমাদের সম্পর্ককে সম্মান করুন।” আর আমি বললাম ,“ অবশ্যই তোমরা নবীর সাথে এমন সম্পর্ক রাখো না। ” উবায়দুল্লাহ বলেছিলো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য। এরপর তারা কী বললো ?” সে বললো , তখন তারা বললো ,“ আপনি কি আমাদের শিশুত্বের উপর কোন করুণা রাখেন না ?” আমি বললাম ,“ আল্লাহ আমার অন্তরে কোন করুণা রাখেন নি। ” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , তারা তোমাকে আর কী বললো ?” সে বললো ,“ তখন তারা বললো ,“ আপনি আমাদের সামান্য সময় দিন যেন আমরা কিছু রাকাত নামায পড়তে পারি। ” আমি উত্তর দিলাম ,“ যত খুশী পড় , যদি তোমাদের কোন লাভ হয়।” তখন শিশুরা চার রাকাত নামায পড়লো। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ শিশুরা নামায শেষ করে কী বললো ?” সে বললো , তারা আকাশের দিকে চোখ তুলে বললো ,“ হে চিরঞ্জীব , হে প্রজ্ঞাবান , হে সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক , আমাদের মাঝে ন্যায়বিচার করে দিন। ” এ কথা শুনে উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আল্লাহ নিশ্চয়ই তোমাদের মাঝে বিচার করে দিয়েছেন। কে এগিয়ে আসবে এ অভিশপ্ত লোককে হত্যা করতে ?” তা শুনে এক সিরিয় ব্যক্তি এগিয়ে এলো। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তাকে একই জায়গায় নিয়ে যাও যেখানে সে শিশুদের হত্যা করেছে এবং তার মাথা বিচ্ছিন্ন করো এবং তার রক্ত ঝরাও তাদের রক্তের ওপরে এবং দ্রুত তার মাথা আমার কাছে নিয়ে আসো। ” লোকটি ঠিক তা-ই করলো যা তাকে বলা হলো এবং তার মাথা যখন আনা হলো তা একটি বর্শার মাথায় রাখা হলো এবং বাচ্চারা এর দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারলো বললো“ এ হচ্ছে নবীর বংশধরের হত্যাকারী। ”
পরিচ্ছেদ - ১০
ইমাম হোসেইন (আ.) এর মক্কা থেকে ইরাকের দিকে যাত্রার নিয়ত
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে হতে] মুসলিম বিন আক্বীলের আন্দোলন হয় ৬০ হিজরির জিলহজ্বের আট তারিখে এবং তিনি শহীদ হন আরাফাতের দিন , অথাৎ নয় জিলহজ্ব। ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের জন্য যাত্রা করেন তারউইয়াহর দিন অর্থাৎ জিলহজ্বের আট তারিখে যেদিন মুসলিম আন্দোলন করেন। যখন ইমাম মক্কায় ছিলেন তখন হিজায ও বসরার একদল লোক তার সাথে এবং তার পরিবার ও শিষ্যদের সাথে যোগ দেয়।
যখন ইমাম ইরাকের দিকে যাওয়ার নিয়ত করলেন তিনি কা‘ বা তাওয়াফ করলেন এবং সাফা ও মারওয়ার মাঝে হাঁটলেন। এরপর তিনি তার ইহরাম খুলে ফেললেন এবং এটিকে উমরাহ হিসেবে ঘোষণা করলেন। তিনি বড় হজ্ব পালনের জন্য অপেক্ষা করতে পারলেন না , কারণ তিনি আশঙ্কা করলেন তাকে মক্কায় গ্রেফতার করা হবে এবং ইয়াযীদের কাছে বন্দী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হবে।
[মালহুফ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে , তারউইয়াহর দিন (৮ই জিলহজ্ব) আমর বিন সাঈদ বিন আল আস মক্কায় এক বড় সৈন্যদল নিয়ে প্রবেশ করে। ইয়াযীদ তাকে আদেশ দিয়েছিলো যদি সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে দেখে তাহলে যেন তাকে আক্রমণ করে এবং যদি সম্ভব হয় তাকে হত্যা করে। তাই ইমাম সেদিনই মক্কা ত্যাগ করলেন।
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন যে ,“ আমি দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাক যাত্রা করার আগে কা‘ বার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এবং জিবরাঈলের হাত তার হাতে। জিবরাঈল উচ্চ কণ্ঠে বলছে: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার (হুজ্জাতের) কাছে বাইয়াত করার জন্য দ্রুত অগ্রসর হও। ”
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে] বর্ণিত আছে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন , তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং নিচের খোতবাটি দিলেন ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর , শুধু আল্লাহর ইচ্ছায় এবং আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তি নেই এবং তাঁর রহমত বর্ষিত হোক তাঁর রাসূলের উপর , নিশ্চয়ই মৃত্যু আদমের সন্তানের সাথে বাঁধা আছে যেভাবে একজন যুবতীর গলায় হার থাকে। আমি কতই না চাই ও আশা করি আমার পূর্ব পুরুষদের সাথে মিলিত হতে যেভাবে (নবী) ইয়াকুব (আ.) নবী ইউসুফ (আ.) এর সাক্ষাৎ করার আশায় ছিলেন। নিশ্চয়ই আমি যাচ্ছি আমার শাহাদাতের স্থানের দিকে যা আমার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি মরুভূমির নেকড়েরা (বনি উমাইয়া) আমার শরীরের প্রতিটি অংশ পৃথক করে ফেলছে নাওয়াউইস ও কারবালার মধ্যবর্তী স্থানে এবং তাদের খালি উদর পূর্ণ করছে।
ভাগ্যের কলমে যা লেখা হয়েছে তা থেকে পালানোর কোন সুযোগ নেই এবং আমাদের আহলুল বাইতের খুশী আল্লাহর খুশীতেই নিহিত। নিশ্চয়ই আমরা তাঁর পরীক্ষাগুলো সহ্য করবো এবং সহনশীল ব্যক্তির জন্য পুরস্কারটি লাভ করবো। নবী (সা.) ও তার সন্তানের মাঝে যে রশি তা তার কাছ থেকে ছিন্ন করা যাবে না , বরং আমরা সবাই তার সাথে সত্যের (আল্লাহর) কাছে একত্র হবো। এতে তার (নবীর) চোখগুলো প্রশান্ত হবে আমাদের কারণে , আর আল্লাহ যা শপথ করেছেন তা পূর্ণ করবেন তাদের মাধ্যমে। তাই যে-ই আমাদের জন্য তার জীবন কোরবান করতে চায় এবং আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে , সে যেন আমাদের সাথে বের হয়ে আসে , কারণ আমি আগামীকাল সকালে রওনা দিচ্ছি , ইনশাআল্লাহ। ”
আমাদের অভিভাবক হাদীসবেত্তা মির্জা নূরী তার বই‘ নাফসুর রাহমান ’ -এ লিখেছেন যে , নাওয়াউইস হলো খৃস্টানদের একটি কবরস্থান , বর্তমানে যেখানে আল হুর বিন ইয়াযীদ আর রিয়াহির কবর রয়েছে শহরের উত্তর পশ্চিম অংশে। আর কারবালা , এটি একটি ভূমি যা একটি স্রোতধারার তীরে অবস্থিত এবং পশ্চিম দিক থেকে শহরের দিকে বইছে ইবনে হামযার কবরের পাশ দিয়ে। এতে কিছু বাগান ও মাঠ রয়েছে আর শহরটি এদের মধ্যবর্তী স্থানে।
[মালহুফ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে , যেদিন ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করলেন সেদিন রাতে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় ভাই , আপনি খুব ভালো জানেন কুফার লোকেরা কারা। তারা আপনার পিতা (ইমাম আলী)-এর সাথে এবং ভাই (হাসান)-এর সাথে প্রতারণা করেছিলো এবং আমি আশঙ্কা করছি যে তারা আপনার সাথেও একই আচরণ করবে। যদি আপনি যথাযথ মনে করেন , এখানেই থাকুন , কারণ আপনি এখানে সবচেয়ে সম্মানিত ও নিরাপদ। ”
ইমাম বললেন ,“ হে ভাই , আমি আশঙ্কা করছি ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া আমাকে আমার অগোচরে মাসজিদুল হারামে আক্রমণ করে বসবে এবং এভাবে পবিত্র আশ্রয়স্থান এবং আল্লাহর ঘর আমার কারণে লঙ্ঘিত হবে। ”
ইবনে হানাফিয়া বললেন ,“ যদি এরকম শঙ্কায় থাকেন তাহলে ইয়েমেন চলে যান অথবা মরুভূমির কোন কোণায় চলে যান যেখানে আপনি নিরাপদ থাকবেন এবং কেউ আপনার গায়ে হাত দিতে পারবে না। ” ইমাম উত্তর দিলেন যে , তিনি প্রস্তাবটি চিন্তা করে দেখবেন।
যখন সকাল হলো , ইমাম যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন এবং এ সংবাদ মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়াহর কাছে পৌঁছলো। তিনি এলেন এবং তার উটের লাগাম ধরলেন যার ওপরে ইমাম বসেছিলেন এবং বললেন ,“ হে আমার ভাই , আপনি কি আমার সাথে অঙ্গীকার করেন নি যে আপনি আমার প্রস্তাবটি বিবেচনা করবেন , তাহলে এত দ্রুত আপনি কেন যাচ্ছেন ?”
ইমাম উত্তর দিলেন ,“ তুমি চলে যাওয়ার পর , রাসূল (সা.) আমার কাছে এসেছিলেন এবং বললেন , হে হোসেইন , ইরাকের দিকে দ্রুত যাও , কারণ আল্লাহ তোমাকে শহীদ হতে দেখতে চান। ”
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বললেন ,“ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তার দিকে ফিরবো। ” তারপর মুহাম্মাদ আরও বললেন ,“ তাহলে এ অবস্থায় এ নারীদের আপনার সাথে নেয়ার কী প্রয়োজন ?”
তিনি বললেন ,“ রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেছেন যে , আল্লাহ চান , তাদেরকে বন্দী দেখতে। ”
তিনি মুহাম্মাদকে সালাম দিলেন ও রওনা করলেন।
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) এর কাছে মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়ার সরে থাকা সম্পর্কে হামযা বিন হুমরানের প্রশ্ন এবং ইমামের উত্তর এই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের তৃতীয় ভাগে‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আল্লামা মাজলিসির আলোচনায় ইতোমধ্যেই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন যে ,“ যখন হোসেইন বিন আলী (আ.) ইরাকের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বইগুলো ও সাক্ষ্যপত্রগুলোকে উম্মু সালামা (আ.) এর কাছে আমানত হিসেবে রাখলেন এবং যখন ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) ফেরত এলেন উম্মু সালামা এগুলো তার কাছে হস্তান্তর করলেন। ”
মাসউদী তার‘ ইসবাত আল ওয়াসিয়াহ ’ বইতে লিখেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কুফার লোকদের কাছে একটি চিঠি লেখার পর কুফাতে যেতে চাইলেন এবং কুফাতে মুসলিম বিন আক্বীলকে পাঠানোর আগে উম্মে সালামা (আ.) তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আমি তোমাকে সেখানে না যাওয়ার জন্য মনে করিয়ে দিচ্ছি। ” ইমাম তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলেন , এতে তিনি উত্তর দিলেন ,“ আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে , আমার সন্তান হোসেইনকে ইরাকে শহীদ করা হবে এবং তিনি আমাকে একটি মাটি ভর্তি বোতল দিয়েছেন , যা আমি আমার কাছে সযত্নে রেখেছি এবং (প্রায়ই) তা পরীক্ষা করি। ”
ইমাম বললেন ,“ হে প্রিয় মা , আমাকে বাধ্য করা হবে মৃত্যুবরণ করতে। যা নির্দিষ্ট করা হয়েছে তা থেকে পালাবার কোন পথ নেই এবং মৃত্যুর কোন বিকল্প নেই। আমি নিজে জানি সে দিনকে , সময়কে এবং স্থানকে যেখানে আমাকে শহীদ করা হবে। এরপর আমার মাযার , যেখানে আমাকে কবর দেয়া হবে , তার পাশে যে জায়গায় আমাকে শহীদ করা হবে তাও আমি জানি , যেভাবে আমি আপনাকে চিনি। এরপর আপনি যদি চান আমি আপনাকে আমার কবরের স্থানটি দেখাতে পারি এবং তাদেরটিও যাদেরকে আমার সাথে শহীদ করা হবে। ” উম্মে সালামা উত্তর দিলেন তিনি তাই চান। ইমাম হোসেইন (আ.) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলেন এবং (কারবালার) ভূমি ওপরে উঠলো এবং তিনি তাকে ও অন্যান্যদেরকে নিজের কবরের স্থান দেখালেন। এরপর তিনি এ থেকে কিছু মাটি নিলেন এবং তাকে বললেন আগের মাটির সাথে মিশিয়ে নিতে (যা নবী- সা. আগে তাকে দিয়েছিলেন) । এরপর তিনি বললেন ,“ আমাকে (মহররমের) দশম দিনে যোহর নামাযের পর শহীদ করা হবে। আপনার উপর সালাম হে প্রিয় মা , আমরা আপনার উপর সন্তুষ্ট। ”
উম্মে সালামা তার কথা মনে রাখলেন এবং আশুরার (দশম দিনের) জন্য অপেক্ষায় রইলেন। মাসউদী তার‘ মুরুজুয যাহাব ’ বইতে লিখেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে চাচাতো ভাই , আমি শুনলাম আপনি ইরাকের দিকে যেতে চান অথচ সেখানকার লোক প্রতারক ও ঝগড়াটে। তাড়াহুড়ো করবেন না এবং আপনি যদি চান এ অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন এবং যদি আপনি মক্কায় থাকতে না চান , তাহলে ইয়েমেন যান , কারণ তা এক কোণায় অবস্থিত এবং সেখানে আপনার অনেক বন্ধু ও ভাই রয়েছে। এরপর সেখানে থাকুন এবং আপনার দূতদের বিভিন্ন দিকে পাঠান , কুফাবাসীদের এবং ইরাকে আপনার অনুসারীদের কাছে চিঠি লিখুন যেন তারা সেখানে তাদের সেনাপতিদের ক্ষমতাচ্যুত করে এবং যদি তারা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করায় সফল হয় এবং সেখানে আপনার সাথে ঝগড়া করার কেউ না থাকে তাহলেই শুধু আপনি সেখানে প্রবেশ করুন , কারণ আমি তাদের বিশ্বাস করি না এবং যদি তারা তা না করে , তাহলে সেখানেই থাকুন এবং আল্লাহর আদেশের জন্য অপেক্ষা করুন , কারণ ইয়েমেনে অনেক দুর্গ ও উপত্যকা আছে। ” তা শুনে ইমাম বললেন ,“ হে চাচাতো ভাই , আমি জানি যেমিত আন্তরিকভাবে আমার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং আমার প্রতি সহানুভূতিশীল , কিন্তু মুসলিম বিন আক্বীল আমাকে লিখেছে যে কুফাবাসীরা আমার প্রতি আনুগত্যের শপথ করেছে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়েছে আমাকে সমর্থন দেয়ার জন্য। তাই সবশেষে আমি সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ”
আব্দুল্লাহ বললেন ,“ আপনি কুফাবাসীদের দুবার পরীক্ষা করেছেন। এ লোকেরাই আপনার বাবা ও ভাইকে সমর্থন দিচ্ছিলো। অথচ আগামীকাল তারা হতে পারে আপনার হত্যাকারীদের অন্তর্ভুক্ত , তাদের সেনাপতিদের পক্ষ নিয়ে। এরপর যদি আপনি তাদের দিকে যান এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে এ বিষয়ে জানানো হয় তাহলে সে তাদেরকে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পাঠাবে এবং যে লোকগুলো আপনাকে সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখেছে তারাই আপনার সবচেয়ে বড় শত্রুহয়ে দাঁড়াবে। যদি আপনি আমার কথা সমর্থন না করেন , নারী ও শিশুদেরকে আপনার সাথে নেবেন না। কারণ আল্লাহর শপথ , আমি শঙ্কিত যে আপনাকে উসমানের মত হত্যা করা হবে যখন তার নারী ও শিশুরা তা দেখছিলো। ”
ইবনে আব্বাসকে ইমাম উত্তর দিলেন ,
“ আল্লাহর শপথ , আমার কারণে কা‘ বার পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার চাইতে (সেখানে নিহত হওয়ার চাইতে) আমি অন্য যে কোন জায়গায় নিহত হতে ভালোবাসি। ” তখন ইবনে আব্বাস তাকে বুঝানোর সব আশা হারালেন এবং উঠে চলে গেলেন। এরপর তিনি আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরের কাছে গেলেন এবং নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলেন ,
“ হে চাতক , তোমার একটি খালি জায়গা আছে , তোমার ডিম প্রসব করো এবং কণ্ঠ উঁচু করো , তোমার আসন শূন্য , তোমার ঠোঁটকে মাটিতে যেখানে ইচ্ছা আঘাত করো। হোসেইন ইরাকের দিকে যাচ্ছে এবং তোমার জন্য হিজাযকে পিছনে রেখে যাচ্ছে। ”
আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর শুনলো যে ইমাম কুফার দিকে যাচ্ছেন , সে মক্কায় ইমামের উপস্থিতিতে অস্থির ও দুঃখিত ছিলো। কারণ সেখানকার লোকেরা তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সমকক্ষ ভাবতো না। তাই তার কাছে এর চেয়ে বড় কোন সংবাদ ছিলো না যে ইমাম মক্কা ত্যাগ করছেন। তখন সে ইমামের কাছে এলো এবং বললো ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আপনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ? আমি আল্লাহকে ভয় করি তাদের অত্যাচারে এবং আল্লাহর পরহেজগার বান্দাদের প্রতি তাদের অশ্রদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার মাধ্যমে। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,
“ আমি কুফা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ” ইবনে আল যুবাইর বললো ,“ আল্লাহ আপনাকে সফলতা দিন , যদি আপনার মত আমার বন্ধু থাকতো আমি সেখানে যেতে অস্বীকার করতাম। ” সে আশঙ্কা করলো হয়তো ইমাম তাকে এ জন্য অভিযুক্ত করবেন তাই বললো ,“ যদি আপনি এখানে থেকে যান এবং আমাকে ও হিজাযের লোকদেরকে আপনার হাতে বাইয়াত করতে আহ্বান জানান। আমরা এতে একমত হব এবং দ্রুত আপনার কাছে অগ্রসর হব , কারণ খিলাফতের জন্য ইয়াযীদ ও তার পিতা থেকে আপনিই বেশী যোগ্য। ”
আবু বকর বিন হুরেইস বিন হিশাম ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলো এবং বললো ,“ নিশ্চয়ই আত্মীয়তা দাবী করে আপনার প্রতি আমি যেন দয়াপূর্ণ হই এবং আমি জানি না আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আপনি আমাকে কী ভাবেন। ”
ইমাম বললেন ,“ হে আবু বকর , তুমি কোন ধোঁকাবাজ নও। ”
আবু বকর বললো ,“ আপনার পিতা ছিলেন আরও যোগ্য এবং জনগণ তাকে আরও বেশী চাইতো ও তাকে বিবেচনা করতো। তারা তার প্রতি আরও অনুগত ছিলো। তারা তার চারপাশে অনেক সংখ্যায় হাঁটতো যখন তিনি মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন , শুধু সিরিয়ার লোকেরা ছাড়া , এবং তিনি ছিলেন মুয়াবিয়ার চাইতে ক্ষমতাধর । এরপরও তারা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং পৃথিবীর লালসা নিয়ে তারা তার উপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এরপর তারা তাকে রাগ গিলে ফেলতে বাধ্য করেছিলো। তারা তাকে অমান্য করছিলো এবং ঐ পর্যন্ত বিষয়টি পৌঁছলো যে তিনি আল্লাহর মর্যাদা ও সন্তুষ্টির দিকে চলে গেলেন (নিহত হলেন) । এরপর তারা একই কাজ করলো আপনার ভাইয়ের সাথে , আপনার পিতার মত এবং আপনি এসব কিছুর সাক্ষী ছিলেন। তবুও আপনি তাদের কাছে যেতে চান যারা আপনার পিতা ও ভাইয়ের সাথে বিদ্রোহ করেছিলো এবং তাদের নিপীড়ন করেছিলো ? এরপর আপনি তাদের সাথে থেকে সিরিয়া ও ইরাকীদের বিরুদ্ধে এবং যে নিজেকে তৈরী করেছে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চান , অথচ সে বেশী শক্তিশালী এবং লোকেরা তাকে ভয় করে এবং তার সফলতা কামনা করে ? তাই , যদি সে এ সংবাদ পায় যে আপনি তার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন , তখন সে তাদেরকে ঘুষ দিতে পারে এবং নিশ্চয়ই তারা এ পৃথিবীকে চায়। এরপর ঐ লোকগুলোই যারা আপনাকে সাহায্য করবে বলে অঙ্গীকার করেছে তারাই আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হবে এবং যারা আপনাকে ভালোবাসে বলে দাবী করে তারাই আপনাকে ত্যাগ করবে সাহায্যকারীহীন অবস্থায় এবং তারা তাদের সাহায্যে যাবে। তাই আল্লাহকে স্মরণ করুন নিজের বিষয়ে। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,“ হে চাচাতো ভাই , আল্লাহ যেন তোমাকে উদারভাবে পুরস্কৃত করেন , তুমি আমাকে আন্তরিকভাবে পরামর্শ দিয়েছো , কিন্তু আল্লাহর সিদ্ধান্ত অবশ্যই ঘটবে। ”
আবু বকর বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আমি আপনাকে আল্লাহর আশ্রয়ে দিলাম। ”
তাবারির‘ তারীখ ’ -এ লেখা আছে যে , আযদি বলেছেন , আবু জাব্বাব ইয়াহইয়া বিন আবু হাইয়াহ বর্ণনা করেন আদি বিন হুরমালা আসাদি থেকে , তিনি আব্দুল্লাহ বিন সালিম এবং মাযরি বিন মাশমাইল আসাদি থেকে যে , তারা বলেছেন যে: আমরা কুফা থেকে মক্কায় গেলাম হজ্ব পালন করতে , তারউইয়াহর দিন (৮ই জিলহজ) আমরা মক্কায় প্রবেপশ করলাম। যোহরের সময় আমরা দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) এবং আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরকে , কা‘ বা ও হাজারুল আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে। আমরা তাদের দিকে গেলাম এবং ইবনে আল যুবাইরকে শুনলাম ইমাম হোসেইন (আ.) কে বলছেন যে ,“ আপনি চাইলে এখানে থাকতে পারেন এবং কর্তৃত্বে থাকুন। আমরা আপনার সমর্থক , সাহায্যকারী , আপনার হিতাকাঙ্ক্ষী এবং আপনার অনুগত।”
ইমাম বললেন ,“ আমার পিতা আমাকে বলেছিলেন যে , এক ব্যক্তির রক্ত এখানে অন্যায়ভাবে ঝরানো হবে আর আমি সেই ব্যক্তি হতে চাই না। ”
ইবনে আল যুবাইর বললেন ,“ তাহলে এখানে থাকুন এবং বিষয়টি আমার উপর ছেড়ে দিন। কারণ আমি আপনাকে মেনে চলবো এবং কোন ধোঁকা দিবো না। ”
ইমাম বললেন ,“ আমি তা করতে চাই না। ”
এরপর তারা ফিসফিস করে কথা বলা শুরু করলেন এবং এক পর্যায়ে যোহরের সময় জনতাকে চিৎকার করে বলতে শুনলাম মিনার দিকে দ্রুত এগোবার জন্য । তখন আমরা দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) কা‘ বা তাওয়াফ করা শুরু করেছেন , এরপর তিনি সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করলেন এবং তার কিছু চুল কেটে ফেললেন। এরপর তিনি তার উমরাহ শেষ করে কুফার দিকে রওনা করলেন। আর আমরা অন্যান্য লোকদের সাথে মিনা গেলাম।
সিবতে ইবনে জাওযী তার‘ তাযকিরাতুল খাওয়াস’ -এ লিখেছেন যে , যখন মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া ইমাম হোসেইন (আ.) এর কুফা রওনা হওয়ার সংবাদ পেলেন তখন তিনি অয করছিলেন এবং তার সামনে একটি জগ ছিলো। তিনি প্রচুর কাঁদলেন। তখন মক্কায় এমন কেউ ছিলো না যে তার চলে যাওয়াতে দুঃখিত ও ব্যথিত হয় নি। কারণ তারা তাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছিলেন তাকে তা থেকে বিরত রাখতে। এরপর তিনি নিচের কবিতা আবৃত্তি করলেন ,
“ আমি রওনা দিবো , কারণ কোন যুবকের জন্য মৃত্যুতে লজ্জা নেই , যখন সে তা চায় যা সঠিক এবং সে সংগ্রাম করে একজন মুসলমানের মত , যে ন্যায়পরায়ণ লোকদের উদ্বুদ্ধ করেছে তার জীবন কোরবান করার মাধ্যমে , যে অভিশপ্তদের ছত্রভঙ্গ করেছে এবং অপরাধীদের বিরোধিতা করেছে। যদি আমি বেঁচে থাকি আমি আফসোস করবো না (যা আমি করেছি) এবং যদি আমি মারা যাই আমি যন্ত্রণা পাবো না। অপমান ও বেইজ্জতির ভিতরে তোমাদের বেঁচে থাকা যথেষ্ট হোক। ”
এরপর তিনি কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন ,
) وَكَانَ أَمْرُ اللَّـهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا(
“ এবং আল্লাহর কাছে সিদ্ধান্ত- অপরিবর্তনীয়। ” [সূরা আল আহযাব: ৩৮]
পরিচ্ছেদ - ১১
ইমাম হোসেইন (আ.) এর মক্কা থেকে কুফা রওনা করা সম্পর্কে
ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করেন তারউইয়াহর দিন (৮ই জিলহজ্ব) মুসলিম বিন আক্বীলের শাহাতাদের সংবাদ পাওয়ার আগে , যিনি ঐ দিনগুলোতে কুফায় বিদ্রোহ করেছিলেন। তার সাথে ছিলো তার আত্মীয়স্বজন , সন্তানরা এবং শিয়ারা।
‘ মাতালিবুস সা’ উল ’ ও অন্যান্য বইতে উল্লেখ আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে কাফেলায় ৮২ জন পুরুষ ছিলো।
‘ আল মাখযূন ফি তাসলীয়াতিল মাহযুন ’ -এ লেখা আছে যে ইমাম হোসেইন (আ.) তার সহযাত্রীদের একত্র করেন যারা তার সাথে ইরাক যাওয়ার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তাদের প্রত্যেককে দশটি স্বর্ণমুদ্রা ও তাদের মালপত্র বইবার জন্য একটি উট দিলেন। এরপর তিনি মঙ্গলবার , ৮ই জিলহজ্বে , তারউইয়াহর দিনে মক্কা ত্যাগ করেন , সাথে ছিলো ৮২ জন পুরুষ , যারা ছিলো তার শিয়া , বন্ধু , দাস ও পরিবার।
[ইরশাদ গ্রন্থে আছে] কবি ফারাযদাক্ব বলেন , আমি একষট্টি হিজরিতে হজ্বে গেলাম। যখন আমি উট চালিয়ে পবিত্র স্থানে উপস্থিত হলাম আমি দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করছেন অস্ত্র ও রসদপত্রসহ। আমি জিজ্ঞেস করলাম এটি কার কাফেলা। তারা বললো , তিনি হোসেইন বিন আলী (আ.) । আমি তার দিকে গেলাম এবং সালাম জানিয়ে বললাম ,“ আল্লাহ যেন আপনার আশা পূর্ণ করেন এবং আপনার আশা যেন পূর্ণ হয় , হে নবীর সন্তান , আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক , কী আপনাকে হজ্ব থেকে দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছে ?”
তিনি উত্তর দিলেন ,“ আমি যদি দ্রুত স্থান ত্যাগ না করি আমাকে গ্রেফতার করা হবে। ” এরপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কে। আমি বললাম যে আমি একজন আরব এবং তিনি এ বিষয়ে আর কিছু আমাকে জিজ্ঞেস করলেন না। এরপর বললেন ,“ ইরাকের লোকজন সম্পর্কে আপনার কাছে কী সংবাদ আছে ?”
আমি বললাম ,“ নিশ্চয়ই আপনি এক প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রশ্ন করেছেন। জনগণের হৃদয় আপনার সাথে আছে , কিন্তু তাদের তরবারি আপনার বিরুদ্ধে এবং ভাগ্য অবতরণ করে আকাশ থেকে এবং আল্লাহ করেন যা তাঁর ইচ্ছা। ”
ইমাম বললেন ,“ আপনি সত্য কথা বলেছেন , সমস্ত বিষয়ই আল্লাহ থেকে।
) كُلَّ يَوْمٍ هُوَ فِي شَأْنٍ(
প্রতিদিন তিনি এক নতুন জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাশে আছেন। [সূরা রাহমান: ২৯]
যদি তাঁর সিদ্ধান্তও আমরা যা আশা করি তা একই হয় তাহলে আমরা তাঁকে তাঁর রহমতের জন্য ধন্যবাদ দেই এবং (শুধু) তাঁর সাহায্য চাইতে হবে তাঁকে ধন্যবাদ দেয়ার জন্য। এরপর যদি আশাকে ভাগ্য বন্ধ করে দেয় তাহলে যার পবিত্র নিয়ত আছে এবং যে পরহেজগার তার মর্যাদা লঙ্ঘিত হবে না।”
আমি বললাম ,“ জ্বী , আল্লাহ যেন আপনাকে সফলতা দেন আপনার আশায় এবং নিরাপত্তা দেন তা থেকে যা থেকে আপনি ভয় করেন।” এরপর আমি তাকে হজ্বের অঙ্গীকার ও নিয়মকানুন সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম। তিনি সেগুলোর উত্তর দিলেন এবং আমাকে সালাম দিয়ে সরে গেলেন। এভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন হলাম।
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করলেন , ইয়াহইয়া বিন সাঈদ বিন আল আস একজন লোক নিয়ে তার সাথে সাক্ষাত করলো যাদেরকে আমর বিন সাঈদ পাঠিয়েছিলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো তিনি কোথায় যাচ্ছেন এবং তাকে আদেশ করলো যেন তিনি ফিরে যান। ইমাম তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করলেন না , এতে তাদের ভিতরে ঝগড়া শুরু হলো এবং তারা পরস্পরকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে লাগলো। কিন্তু ইমাম এবং তাদের সাথীরা তাদেরকে দৃঢ়তার সাথে পতিহত করলেন।
‘ ইক্বদুল ফারীদ’ -এ বলা হয়েছে যে , যখন আমর বিন সাঈদ ইমামের মক্কা ত্যাগের কথা জানতে পারলো সে বললো ,“ আকাশ ও জমিনের মাঝে যত উট আছে তাতে চড়ো এবং তাকে ধরো।” লোকজন তার কথায় আশ্চর্য হলো এবং পিছু ধা ওয়া করতে গেলো। কিন্তু তার কাছে পৌঁছাতে পারলো না।
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] তানঈম নামে একটি জায়গায় ইমাম পৌঁছালেন এবং ইয়েমেন থেকে আসা এক কর আদারকারী কাফেলার সাক্ষাত পেলেন যাদেরকে বাহীর বিন রায়সান ইয়াযীদের কাছে পাঠিয়েছিলো। মালপত্রের মাঝে ছিলো সবুজ উদ্ভিদ (ইয়েমেনী জাফরান) এবং কাপড় চোপড়। ইমাম হোসেইন (আ.) (যুগের ইমাম হিসেবে এবং ইয়াযীদ খিলাফতের দখলদার হওয়ার কারণে) তা ক্রোক করলেন এবং উটের চালকদের বললেন ,
“ তোমাদের মাঝে যে চায় আমাদের সাথে ইরাক পর্যন্ত যেতে সে আসতে পারো। এর জন্য আমরা তাদেরকে মজুরী দিবো এবং আমরা তাদের সাথে ভালো আচরণ করবো। আর যে ফিরে যেতে চাইবে আমরা তাদেরকে এ স্থান পর্যন্ত মজুরী দিবো এবং তারা যেতে পারে।”
তখন তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক তাদের মজুরী নিলো ও চলে গেলো , আর অন্যরা যারা তাদের সাথে এলো তাদেরকে যথাযথ মূল্য ও কাপড় চোপড় দেয়া হলো।
[‘ কামিল’ গ্রন্থে আছে] এরপর তিনি আবা ফারাযদাক্বের সাক্ষাত পেলেন। তাদের সাক্ষাতের বিষয়বস্তু পূর্বের বর্ণনার মতই এগিয়ে গেলেন এবং সাফাহ পৌঁছালেন এবং সেখানে তিনি আব্দুল্লাহ বিন জাফরের চিঠি পেলেন যা ইমাম হোসেইন (আ.) কে পাঠানো হয়েছিলো তার দুই ছেলে আউন ও মুহাম্মাদকে সাথে দিয়ে।
এর বিষয়বস্তু ছিলো এরকম:
“ আম্মা বা’ আদ , আমি আল্লাহর নামে আপনাকে বলছি , আমার চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে ফিরে আসুন , কারণ আমি আশঙ্কা করছি , যে দিকে আপনি যাচ্ছেন তার পরিণতি হবে মৃত্যু ও আপনার পরিবারের পুরোপুরি ধ্বংস। আর তা যদি ঘটে তাহলে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে , কারণ আপনি হচ্ছেন হেদায়াতের আলো এবং বিশ্বাসীদের আশা। আপনি তাড়াহুড়া করবেন না , কারণ আমি এ চিঠির পর পরই আসছি। সালাম।”
তাবারি বলেন যে , আব্দুল্লাহ বিন জাফর আমর বিন সাঈদ বিন আল আসের কাছে গেলেন এবং বললেন ,“ ইমাম হোসেইন (আ.) কে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে এবং তাকে ন্যায়বিচার ও সদয় ব্যবহারের অঙ্গীকার করে চিঠি লিখুন এবং তাকে রাজী করান ; আর তাকে অনুরোধ করুন ফিরে আসার জন্য , যেন তিনি সন্তুষ্ট হন এবং ফিরে আসেন।” আমর বিন সাঈদ বললো ,“ তোমার যা ইচ্ছা লেখ এবং তা আমার কাছে আনো যেন আমি সেখানে আমার সীলমোহর দিতে পারি।” আব্দুল্লাহ চিঠিটি লিখলেন এবং আমর এর কাছে আনলেন এবং বললেন ,“ তোমার ভাই ইয়াহইয়াকে এ চিঠি দিয়ে পাঠাও যেন ইমাম আশ্বস্ত হন যে , এ চিঠি তোমার চেষ্টা।” সে তাই করলো। আমর বিন সাঈদ ছিলো ইয়াযীদের নিয়োগকৃত মক্কার গভর্নর।
ইয়াহইয়া এবং আব্দুল্লাহ বিন জাফর চিঠিটি নিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে গেলো এবং তা দিলো। ইয়াহইয়া চিঠিটি পড়লো। যখন তারা ফিরে এলো , তারা বললো যে আমরা চিঠিটি ইমাম হোসেইন (আ.) কে দিয়েছিলাম এবং তাকে অনুরোধ করেছিলাম ফিরে আসতে। কিন্তু তিনি কারণ দেখালেন:
“ আমি স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছি এবং তিনি আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি তা পালন করবো , তাতে আমার লাভ হোক বা না হোক।”
সে বললো স্বপ্নটি তাকে বলতে , তিনি বললেন ,“ আমি স্বপ্নটির বর্ণনা কাউকে দেই নি এবং না আমি তা করবো , যতক্ষণ না আমি আমার রবের কাছে পৌঁছাই।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে] বর্ণিত আছে যে , যখন আব্দুল্লাহ ইমামকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হলেন তিনি তার দুই ছেলে আউন ও মুহাম্মাদকে বললেন তার সাথে থাকতে , তার সাথে যেতে এবং তার পক্ষ হয়ে তাকে নিরাপত্তা দিতে (যদি প্রয়োজন হয়)। এরপর তিনি ইয়াহইয়া বিন সাঈদের সাথে মক্কায় ফিরে এলেন।”
তাবারি বলেন যে , আমর বিন সাঈদের চিঠির বিষয়বস্তু ছিলো:“ আল্লাহর নামে যিনি সর্ব দয়ালু , সর্বকরুণাময় , আমর বিন সাঈদ থেকে হোসেইন বিন আলীর প্রতি। আম্মা বা’ আদ , আমি অনুরোধ করছি যেন আল্লাহ আপনাকে সে জিনিস থেকে দূরে রাখেন যা আপনার ধ্বংসের কারণ হবে এবং আপনাকে পুরস্কারের পথ দেখান। আমাকে জানানো হয়েছে যে আপনি ইরাকের দিকে যাচ্ছেন , আমি আপনাকে দুহাতে আল্লাহর নিরাপত্তায় দিলাম এবং আমি আশঙ্কা করছি যে তা আপনার ধ্বংস আনতে পারে। আমি আব্দুল্লাহ বিন জাফর ও ইয়াহইয়া বিন সাঈদকে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি , তাই আমার কাছে দ্রুত আসুন। আমি আপনার কাছে নিরাপত্তার , দয়ার , নৈতিকতার , সদ্ব্যবহারের অঙ্গীকার করছি এবং আল্লাহ এর সাক্ষী , নিশ্চয়তা দানকারী , এর উপর রক্ষক ও অভিভাবক এবং আপনার উপর সালাম।”
ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে উত্তর দিলেন ,“ আম্মা বা’ আদ , যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বান করে এবং নৈতিক কাজগুলো করে এবং বলে যে সে একজন মুসলমান , সে আল্লাহ ও তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় নি। আর তুমি আমাকে নিরাপত্তা , নৈতিকতা ও দয়ার দিকে আহ্বান করছো যখন শ্রেষ্ঠ নিরাপত্তা হচ্ছে আল্লাহর কাছ থেকে। আর যে ব্যক্তি এ পৃথিবীতে আল্লাহকে ভয় করে না সে পরকালে তাঁর আশ্রয় পাবে না। আমরা আল্লাহর কাছে চাই যেন আমরা তাকে এ পৃথিবীতে ভয় করি , যেন পরকালে তার নিরাপত্তা পেতে পারি। যদি তোমার উদ্দেশ্য হয় এ চিঠির মাধ্যমে , দয়া ও নৈতিকতা , তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে সদয়ভাবে পুরস্কৃত করেন এ পৃথিবীতে এবং আখেরাতে।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) ইরাকের দিকে দ্রুত এগোলেন এবং পিছনের দিকে তাকালেন না এবং যাতুল ইরক্বে পৌঁছালেন। এ জায়গাতে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হলো। শেইখ তূসি তার‘ আমালি’ তে বর্ণনা করেছেন আম্মারাহ দেহনি থেকে , তিনি বলেন আবু তুফাইল আমাকে বলেছেন যে: মুসাইয়াব বিন নাজাবাহ ইমাম আলী (আ.) এর কাছে আব্দুল্লাহ বিন সাবাকে ধরে নিয়ে এলেন। ইমাম আলী (আ.) জিজ্ঞেস করলেন , কী হয়েছে। তিনি বললেন ,“ এ ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসূল সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে।” ইমাম জিজ্ঞেস করলেন সে কী বলেছে। মুসাইয়াব কী বললো আমি শুনতে পেলাম না , কিন্তু আমি ইমাম আলী (আ.) কে বলতে শুনলাম ,“ হায় , এক ব্যক্তি (ইমাম হোসেইন আ.) একটি দ্রুতগামী ও (অস্ত্র ও রসদ) সজ্জিত উটে চড়ে তোমাদের কাছে আসবে হজ্ব অথবা উমরাহ না করে এবং তাকে হত্যা করা হবে।” যখন ইমাম হোসেইন (আ.) যাতুল ইরক্বে [মালহুফ] পৌঁছালেন , তিনি বিশর বিন গালিবের সাক্ষাত পেলেন যে ইরাক থেকে আসছিলো। তিনি তার কাছ থেকে সেখানকার জনগণের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলেন। সে বললো ,“ আমি জনগণকে দেখেছি যে তাদের হৃদয় আপনার পক্ষে , কিন্তু তাদের তরবারি বনি উমাইয়ার পক্ষে।”
ইমাম বললেন ,“ বনি আসাদের এ ভাই সত্য বলছে। আল্লাহ তাই করেন যা তার ইচ্ছা এবং আদেশ করেন যা তার ইচ্ছা।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] যখন উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ এ সংবাদ পেলো যে , ইমাম হোসেইন (আ.) কুফার দিকে আসছেন , সে তার পুলিশ কর্মকর্তা হাসীন বিন তামীমকে ক্বাদিসিয়া দিকে পাঠালো। সে এক সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করলো ক্বাদিসিয়া থেকে খাফফান পর্যন্ত এবং ক্বাদিসিয়া থেকে ক্বাতক্বাতানিয়া পর্যন্ত। এরপর সে জনগণের কাছে ঘোষণা করলো , হোসেইন বিন আলী ইরাকের দিকে আসছে।
মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব মুসাউই বর্ণনা করেন যে , যখন ওয়ালীদ বিন উতবা সংবাদ পেলো যে ইমাম ইরাকের দিকে যাচ্ছেন সে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে চিঠি লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , হোসেইন ইরাকের দিকে আসছে এবং সে ফাতিমা (আ.) এর সন্তান এবং ফাতিমা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কন্যা। সাবধান হও! পাছে তুমি তার সাথে খারাপ ব্যবহার কর এবং এ পৃথিবীতে তোমার ও তোমার আত্মীয়দের উপর দুর্যোগ ডেকে আনো যা কোনদিন শেষ হবে না ; আর বিশিষ্ট লোকেরা ও সাধারণ জনগণ এ পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত তা ভুলবে না।” কিন্তু উবায়দুল্লাহ ওয়ালীদের কথায় কোন কান দিলো না।
রায়আশি , তার ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে বর্ণনা করেন যে , বর্ণনাকারী বলেছেন: আমি হজ্বে গেলাম এবং আমার সাথীদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলাম এবং একা হাঁটতে শুরু করে পথ হারিয়ে ফেললাম। হঠাৎ আমার দৃষ্টি পড়লো কিছু তাঁবু ও খচ্চরের উপর , আমি তাদের দিকে এগিয়ে গেলাম এবং জিজ্ঞেস করলাম তারা কারা , তারা বললো যে তাবুগুলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে , এ হোসেইন কি আলী ও ফাতিমা (আ.) এর সন্তান ? তারা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। আমি খোঁজ নিলাম কোন তাঁবুতে তিনি আছেন , তারা তা দেখিয়ে দিলো। আমি গেলাম এবং দেখলাম ইমাম দরজায় বসে একটি বালিশে ঠেস দিয়ে একটি চিঠি পড়ছেন। আমি তাকে সালাম দিলে তিনি উত্তর দিলেন। আমি বললাম ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক , কেন আপনি এমন খালি মরুভূমিতে তাঁবু ফেলেছেন যেখানে কোন মানুষ জন নেই , নেই কোন দুর্গ।”
ইমাম বললেন ,
“ লোকজন আমাকে ভয় দেখিয়েছে এবং এ চিঠিগুলো কুফার লোকদের , যারা আমাকে হত্যা করবে। কোন পবিত্রতাকে ভূলুণ্ঠিত করা বাদ না রেখে যখন তারা এ অপরাধ করবে , আল্লাহ তাদের উপর এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিবেন যে তাদেরকে হত্যা করবে এবং তাদেরকে বেইজ্জতি করবেন এক দাসীর লোকদের চেয়ে বেশী।”
আমি (লেখক) বলি যে , আমরা দৃঢ়ভাবে অনুভব করি যে ,“ দাসীর লোকদের” কথাটি একটি ভুল। আর সঠিকটি হলো দাসীর ফারাম (ঋতুস্রাবের কাপড়) , কারণ বর্ণনায় এসেছে যে ইমাম হোসেইন (আ.) বলেছেন ,“ আল্লাহর শপথ , তারা আমাকে ছাড়বে না যতক্ষণ না তারা আমার হৃৎপিণ্ডের রক্ত না ঝরাবে , এরপর যখন তারা তা করবে আল্লাহ এক ব্যক্তিকে তাদের উপর নিয়োগ দিবেন যে তাদেরকে অপমানিত করবে একজন মহিলার ফারামের চাইতে বেশী।” আর ফারাম হচ্ছে ঋতুস্রাবের কাপড়।
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] যখন ইমাম বাতনে উম্মাহর হাজির নামক স্থানে পৌঁছালেন তিনি ক্বায়েস বিন মুসাহহির সায়দাউইকে কুফায় পাঠালেন। কেউ কেউ বলেন যে , তিনি তার সৎ ভাই আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতুরকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তখনও মুসলিম বিন আকীলের শাহাদাতের সংবাদ পান নি। তিনি তার সাথে একটি চিঠি পাঠালেন ,
“ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। হোসেইন বিন আলী থেকে তার বিশ্বাসী ও মুসলমান ভাইদের কাছে। আমি আল্লাহর প্রশংসা করি যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। আম্মা বা’ আদ , আমি মুসলিম বিন আলীর কাছ থেকে চিঠি পেয়েছি , যা আমাকে জানিয়েছে আপনাদের সদিচ্ছা সম্পর্কে এবং আপনাদের সম্মানিত লোকদের আনুগত্য সম্পর্কে যে , তারা আমাদেরকে সাহায্য করবে আমাদের অধিকার ফিরে পেতে। আমি আল্লাহর কাছে , যিনি সম্মানিত ও প্রশংসিত , অনুরোধ করি যেন আমরা সদয় আচরণের সাক্ষাত পাই এবং যেন আপনাদের পুরস্কার দেন শ্রেষ্ঠতম পুরস্কারের মাধ্যমে। আমি মক্কা ত্যাগ করেছি মঙ্গলবার , জিলহজ্বের আট তারিখে , তারউইয়াহর দিনে। যখন দূতরা আপনাদের কাছে পৌঁছবে , তখন আপনাদের কাজ দ্রুত করুন এবং নিজেদের প্রস্তুত করুন , কারণ আমি কয়েক দিনের মধ্যেই আপনাদের কাছে পৌঁছে যাবো। সালামুন আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।”
মুসলিম , ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে তার শাহাদাতের সাতাশ দিন আগে চিঠি লিখেছিলেন , যা ছিলো এরকম ,“ আম্মা বা’ আদ , যে ব্যক্তি পানির খোঁজে যায় সে তার পরিবারের কাছে সে সম্পর্কে মিথ্যা বলে না , (কুফার) আঠারো হাজার লোক আমার হাতে আনুগত্যের শপথ করেছে। তাই আমার চিঠি পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত আসুন।” কুফার লোকজন ইমামের কাছে লিখেছিলো ,“ এখানে আপনার একলক্ষ তরবারি আছে (আপনাকে সাহায্য করার জন্য)। তাই দেরী করবেন না।”
ক্বায়েস বিন মুসাহহির সায়দাউই কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন ইমামের চিঠি নিয়ে। যখন তিনি ক্বাদিসিয়াহ পৌঁছালেন , হাসীন বিন তামীম তাকে গ্রেফতার করলো এবং তাকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে পাঠিয়ে দিলো। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ মিম্বরে বসো এবং অভিশাপ দাও মিথ্যাবাদীর সন্তান মিথ্যাবাদীর ওপরে” (ইমাম হোসেইনকে উদ্দেশ্য করে , আউযুবিল্লাহ)।
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে’ ] অন্য এক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে যে , যখন তিনি কুফার কাছাকাছি পৌঁছালেন হাসীন বিন তামীম তাকে তল্লাশী করার জন্য থামালেন । কায়েস ইমামের চিঠিটি বের করে ছিঁড়ে ফেললেন। তাই হাসীন তাকে উবায়দুল্লাহর কাছে পাঠালো। যখন তাকে উবায়দুল্লাহর সামনে দাঁড় করানো হলো , সে তাকে প্রশ্ন করলো যে সে কে। ক্বায়েস বললেন ,“ আমি বিশ্বাসীদের আমির ইমাম আলী (আ.) এর এবং তার সন্তানের শিয়া।” সে তাকে জিজ্ঞেস করলো কেন সে চিঠি ছিঁড়ে ফেলেছে। ক্বায়েস বললেন ,“ যেন তুমি জানতে না পারো সেখানে কী ছিলো।” উবায়দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো কে তা লিখেছিলো এবং কাকে সম্বোধন করে লেখা হয়েছিলো। ক্বায়েস বললেন ,“ এটি ছিলো হোসেইন বিন আলী থেকে কুফার একদল লোকের কাছে যাদের নাম আমি জানি না।” উবায়দুল্লাহ ক্রোধান্বিত হয়ে উঠলো এবং বললো ,“ তুমি আমার কাছ থেকে যেতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্তনা তুমি তাদের নাম বলবে অথবা মিম্বরে উঠবে এবং অভিশাপ দিবে হোসেইন বিন আলীকে , তার বাবাকে এবং তার ভাইকে। নয়তো আমি তোমার (দেহের) প্রত্যেক জোড়া খুলে ফেলবো।” ক্বায়েস বললেন ,“ আমি তাদের নাম প্রকাশ করবো না কিন্তু আমি অভিশাপ দিতে প্রস্তুত।” একথা বলে মিম্বরে উঠলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করতে শুরু করলেন । এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সালাম পেশ করলেন এবং ইমাম আলী (আ.) , ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রশংসা শুরু করলেন এবং তাদের উপর আল্লাহর প্রচুর রহমত প্রার্থনা করলেন। এরপর তিনি অভিশাপ দিলেন উবায়দুল্লাহ , তার বাবা এবং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বনি উমাইয়ার প্রত্যেক অত্যাচারীর ওপরে। এরপর তিনি বললেন ,“ হে জনতা , আমাকে ইমাম হোসেইন (আ.) আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন এবং আমি তাকে অমুক জায়গায় ছেড়ে এসেছি। আপনারা তার ডাকে সাড়া দিন।” যখন উবায়দুল্লাহকে জানানো হলো ক্বায়েস কী বলেছে সে আদেশ দিলো যেন তাকে প্রাসাদের ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। এভাবে তাকে শহীদ করা হলো (তার উপর আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক)।
[ইরশাদ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে , তাকে তার দুহাত বাঁধা অবস্থায় নিচে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিলো এবং তার হাড়গুলো ভেঙ্গে যায় এবং তার ভিতরে তখনও প্রাণের কিছু চিহ্ন উপস্থিত ছিলো। তখন মালিক বিন উমাইর লাখমি এসে তার মাথা কেটে ফেলে। যখন লোকজন তাকে এ কাজের জন্য তিরস্কার করলো সে বললো ,“ আমি চেয়েছিলাম তাকে ব্যথা থেকে মুক্তি দিতে এবং তাই আমি তা করেছি।”
ইমাম হোসেইন (আ.) হাজির (জায়গার নাম) ত্যাগ করলেন এবং আরবদের এক পানি পানের জায়গায় পৌঁছালেন যেখানে আব্দুল্লাহ বিন মূতী’ আদাউই বাস করতো। যখন সে ইমামকে দেখলো সে তার কাছে গেলো এবং বললো ,“ আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কোরবান হোক , হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আপনি এখানে কেন ?” সে ইমামকে উট থেকে নামতে সাহায্য করলো এবং তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। ইমাম বললেন ,
“ তুমি অবশ্যই শুনে থাকবে মুয়াবিয়া মারা গেছে এবং ইরাকের লোকেরা আমাকে লিখেছে ও আমাকে তাদের দিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে।”
আব্দুল্লাহ বিন মূতী’ বললো ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমি আপনাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি কুরাইশ এবং আরবদের মর্যাদার পাশাপাশি ইসলামের মযর্দা বিবেচনা করতে। আল্লাহর শপথ , আপনি যদি রাজ্য চান , যা বনি উমাইয়াদের হাতে আছে , তারা অবশ্যই আপনাকে হত্যা করবে এবং যখন তারা আপনাকে হত্যা করবে , এরপর আর কাউকে ভয় করবে না। আল্লাহর শপথ , এভাবে ইসলাম , কুরাইশ এবং আরবদের মর্যাদা লঙ্ঘিত হবে। তাই তা করবেন না এবং কুফাতে যাবেন না এবং নিজেকে বনি উমাইয়াদের কাছে অরক্ষিত করবেন না।” কিন্তু ইমাম একমত হলেন না এবং আরও এগিয়ে যেতে চাইলেন। উবায়দুল্লাহ আদেশ দিলো ওয়াক্বিসা থেকে সিরিয়া এবং বসরা পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ করে দিতে , যেন কেউ সেখানে প্রবেশ করতে না পারে এবং বের হতে না পারে। ইমাম হোসেইন (আ.) (কুফাতে) কী হচ্ছে না জানা অবস্থায় আরও এগিয়ে কিছু বেদুইনের সাক্ষাত পেলেন। তিনি তাদের কাছে খোঁজ নিলেন এবং তারা উত্তর দিলো ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা এছাড়া বেশী কিছু জানি না যে আমরা সেখানে ঢুকতেও পারছি না বের হয়েও আসতে পারছি না।” ইমাম আরও এগিয়ে গেলেন।
বর্ণিত হয়েছে যে , যখন তিনি খুযাইমিয়াহতে পৌঁছালেন তিনি সেখানে তাঁবু গাড়লেন এক রাত ও এক দিনের জন্যে। সকালে তার বোন হযরত যায়নাব (আ.) তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় ভাই , আমি কি আপনার কাছে বলবো না কাল রাতে আমি কী শুনেছি ?” ইমাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কী শুনেছেন। তিনি উত্তর দিলেন , রাতে আমি যখন একটি কাজে তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়েছি আমি এক আহ্বানকারীকে শুনলাম বলছে ,“ হে চোখগুলো সংগ্রাম কর এবং অশ্রুতে ভরে যাও , কে আমার পরে এ শহীদদের জন্য কাঁদবে যাদের ভাগ্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে অঙ্গীকার পূরণের জন্য।”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে প্রিয় বোন , যা নির্ধারিত হয়েছে তা অবশ্যই ঘটবে।”
তাবারি তার‘ তারীখ’ -এ বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম আরও এগিয়ে গেলেন এবং যারূদের ওপরে পানির জায়গায় পৌঁছালেন।
আবু মাখনাফ বলেন , বনি ফাযারার এক ব্যক্তি , যার নাম সাদ্দি , আমাকে বলেছে যে , হাজ্জাজ বিন ইউসুফের দিনগুলোতে আমরা আল হারস বিন আবি রাবি’ আর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম যা খেজুর বিক্রেতাদের রাস্তায় অবস্থিত ছিলো , যুহাইর বিন ক্বাইনের মৃত্যুর পর তা বনি আমর বিন ইয়াশকুর থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো এবং সিরীয়রা সেখানে আসতো না। মাখনাফ বলেন যে , আমি বনি ফাযারার লোককে বললাম ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে মক্কা থেকে তোমাদের আসার কথা বর্ণনা কর। সে বললো , আমরা মক্কা ত্যাগ করলাম যুহাইর বিন ক্বাইন বাজালির সাথে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর পাশাপাশি চলছিলাম , আমরা কোন জায়গায় ইমামের সাথে তাঁবু গাড়া অপছন্দ করছিলাম। যখনই হোসেইন বিন আলী কোন জায়গা ত্যাগ করতেন যুহাইর পিছনে থেকে যেতেন এবং যদি হোসেইন কোন জায়গায় থামতেন , যুহাইর সেখান থেকে সরে পড়তেন যতক্ষণ না আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে তার পাশাপাশি তাঁবু গাড়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। অতএব আমরা এক পাশে তাঁবু গাড়লাম এবং হোসেইন অন্য পাশে। আমরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিলাম যখন হোসেইন (আ.) এর দূত এলো আমাদের কাছে , আমাদের সালাম জানালো এবং তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করলো। এরপর বললো ,“ হে যুহাইর , আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম হোসেইন) আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন আপনাকে তার কাছে আমন্ত্রণ জানাতে।” আমাদের হাতে যা ছিলো (খাবার) আমরা তা রেখে দিলাম , যেন এমন হয়েছে যে পাখি আমাদের মাথায় স্থির হয়ে বসে আছে।
আবু মাখনাফ বলেন যে , যুহাইরের স্ত্রী দুলহাম বিনতে আমর আমাকে বলেছে যে: আমি যুহাইরকে বললাম ,“ রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সন্তান তোমার কাছে দূত পাঠিয়েছেন , কেন তার সাথে গিয়ে দেখা করছো না ? সুবহানাল্লাহ , আমি চাই তুমি তার কাছে যাও এবং শোন তিনি কী বলতে চান। এরপর ফিরে আসো।” সে বললো যে , যুহাইর গেলেন এবং অল্প সময় পরেই উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে ফেরত এলেন। এরপর তিনি আদেশ দিলেন যেন তার মালপত্র ও তাঁবু ইমাম হোসেইন (আ.) এর শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি আমাকে বললেন ,“ আমি তোমাকে তালাক দিয়েছি। তোমার পরিবারের কাছে ফেরত যাও , কারণ আমি চাই তুমি ভালো ছাড়া আর কিছু আমার কাছ থেকে না পাও।”
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে , যুহাইর বিন ক্বাইন বললেন ,“ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করার জন্য যতক্ষণ না আমি তার জন্য আমার জীবন কোরবান করি।” এরপর তিনি তার স্ত্রীকে তার মোহরানা দিয়ে দিলেন এবং তাকে তার চাচাতো ভাইয়ের কাছে হস্তান্তর করলেন যেন সে তাকে তার আত্মীয়দের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। মহিলা উঠে দাঁড়ালেন এবং তার স্বামীকে বিদায় জানালেন অশ্রুসজল চোখে এবং বললেন ,“ আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করুন এবং তোমার জন্য কল্যাণ প্রেরণ করুন । আমি শুধু চাই যে কিয়ামতের দিন হোসেইনের নানা (সা.) এর সামনে আমাকে মনে রাখবে।”
তাবারি বলেন যে: এরপর যুহাইর তার সাথীদের বললেন ,“ যে চায় আমার সাথে আসতে সে আসতে পারে , নয়তো এটিই হচ্ছে আমার সাথে তার শেষ চুক্তি এবং আমি একটি ঘটনা তোমাদের কাছে বর্ণনা করতে চাই - যখন আমরা লানজারের এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম এবং আল্লাহ আমাদের বিজয় দিলেন। আমরা অনেক গণিমত হাতে পেলাম যখন সালমান বাহিলি (কেউ বলে সালমান ফারসী) আমাদের বললেন ,‘ তোমরা কি এই বিজয়ে সন্তুষ্ট যা তোমাদের দেয়া হয়েছে এবং যে সম্পদ তোমরা লাভ করেছো ?’ আমরা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলাম। তখন তিনি বললেন ,‘ যখন তোমরা মুহাম্মাদের বংশধর যুবকদের সর্দার (ইমাম হোসেইন আ.)-এর সাক্ষাত পাবে তখন তার পাশে থেকে যুদ্ধ করতে আরও খুশী হয়ো এখনকার এ সম্পদ লাভের চাইতে’ ।” যুহাইর বললেন ,“ আমি তোমাদেরকে আল্লাহর আশ্রয়ে দিচ্ছি।” এরপর যুহাইর পুরো সময় ইমামের সাথীদের মাঝে রইলেন শাহাদাত লাভ করা পর্যন্ত।
বর্ণিত হয়েছে , যখন যুহাইরকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে শহীদ করা হয় তখন তার স্ত্রী তার দাসকে কারবালায় পাঠিয়েছিলেন তার মালিককে কাফন পরানোর জন্য।
সিবতে ইবনে জাওযির‘ তাযকিরাহ’ তে লেখা আছে যে , যুহাইরকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে শহীদ করা হয়েছিলো। যখন তার স্ত্রী এ সংবাদ পেলো সে তার দাসকে বললো ,“ যাও , তোমার মালিককে কাফন পরিয়ে দাও।” যখন সেই দাস এলো , সে দেখলো ইমামের দেহ কোন কাফন ছাড়াই পড়ে আছে। সে নিজেকে বললো ,“ আমি কিভাবে আমার মালিককে কাফন পরাবো আর হোসেইন তা ছাড়া থাকবে। আল্লাহর শপথ , তা কখনোই ঘটতে পারে না।” এরপর সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে কাফন পরিয়ে দিলো এবং যুহাইরকে আরেকটি কাফন পরালো।
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] আব্দুল্লাহ বিন সুলাইমান এবং মুনযির বিন মুশমাইল আসাদি বনি আসাদের দু ব্যক্তি , বর্ণনা করেছে যে , আমরা আমাদের হজ্ব পালন করলাম এবং আমরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাক্ষাত ছাড়া কিছুই চাইলাম না , তার বিষয়টি কত দূর পৌঁছেছে জানার জন্য। আমরা আমাদের ঘোড়াগুলোকে দ্রুত ছোটালাম যারূদে পৌঁছা পর্যন্ত এবং তাকে পেলাম। হঠাৎ আমরা দেখলাম একটি লোককে কুফা থেকে আসতে। যখন সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে দেখলো সে তার পথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করলো। ইমাম নিজে থামলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য , কিন্তু সে কোন ভ্রক্ষেপ করলো না এবং চলে গেলো। আমরা তার দিকে অগ্রসর হলাম এবং একজন আরেকজনকে বললাম , আসো , আমরা ঐ কুফার লোকটির কাছে যাবো এবং তার কাছে জানবো কুফার অবস্থা কী। এ কথা বলে আমরা তার কাছে গেলাম ও তাকে সালাম দিলাম। সে আমাদের সালামের উত্তর দিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম সে কোন গোত্রের লোক। সে বললো সে বনি আসাদ গোত্রের। আমরা বললাম আমরাও বনি আসাদ গোত্রের। তখন আমরা তাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো তার নাম বাকর। আমরাও আমাদের বংশ বললাম তার কাছে এবং তার কাছে কুফার অবস্থা জানতে চাইলাম। সে বললো , হ্যাঁ , আমি কুফার ঘটনাবলী সম্পর্কে জানি। আমি তখনও কুফা ত্যাগ করি নি যখন মুসলিম বিন আক্বীল ও হানি বিন উরওয়াহকে শহীদ করা হয়। আমি দেখেছি তাদের পা দড়িতে বাধাঁ এবং তাদের মৃতদেহ কুফার রাস্তায় হিঁচড়ে নেয়া হচ্ছে।
তখন আমরা ইমামের দিকে গেলাম এবং তার সাথে হাঁটতে শুরু করলাম যতক্ষণ না রাতে তিনি সালাবিয়াহতে থামলেন। আমরা কাছে গেলাম ও তাকে সালাম দিলাম। আমাদের সালামের উত্তর দিলেন এবং আমরা বললাম ,“ আমাদের কাছে আপনার জন্য সংবাদ আছে। যদি আপনি চান তা প্রকাশ্যে আপনার কাছে বলবো এবং যদি আপনি চান আমরা তা আপনাকে গোপনে বলবো।” তিনি আমাদের দিকে তাকালেন এবং বললেন ,“ তাদের কাছে কোন কিছু গোপন নেই।” তখন আমরা বললাম ,“ আপনি কি ঐ উটের আরোহীকে দেখেছিলেন যে গতকাল আমাদের দিকে আসছিলো ?”
ইমাম বললেন ,“ হ্যাঁ , আমি তাকে দেখেছি এবং আমার ইচ্ছা ছিলো তার কাছ থেকে খোঁজ খবর নেয়ার।”
আমরা বললাম ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা আপনার পক্ষ থেকে তাকে জিজ্ঞেস করেছি , সে ছিলো আমাদের গোত্রের , বুদ্ধিমান , সৎ এবং সুস্থ বিচারবোধসম্পন্ন এবং সে বললো সে তখনও কুফা ত্যাগ করে নি যখন সে দেখেছে মুসলিম বিন আক্বীল এবং হানি বিন উরওয়াহকে শহীদ করা হয়েছে এবং তাদের লাশ কুফার রাস্তায় হেঁচড়ানো হচ্ছে।”
ইমাম বললেন ,“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্ন ইলাইহি রাজিউন। তাদের দুজনের উপর আল্লাহর রহমত হোক।”
তিনি এ কথা বেশ কয়েকবার বললেন। তারপর আমরা বললাম ,“ আমরা আল্লাহর নামে আপনাকে ও আপনার পরিবারকে বলছি এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। আপনার কোন সাথী এবং সমর্থক কুফায় নেই। আমরা আশঙ্কা করছি হয়তো সেখানকার লোকেরা আপনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।”
তখন ইমাম আক্বীলের সন্তানদের দিকে তাকালেন এবং বললেন ,“ তোমাদের এখন কী মতামত যেহেতু আক্বীলকে শহীদ করা হয়েছে ?”
তারা উত্তর দিলো ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা ফিরে যাবো না যতক্ষণ না মুসলিমের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করি , অথবা নিজেরা নিহত হই।”
তখন ইমাম আমাদের দিকে তাকালেন ও বললেন ,“ তাদের (মৃত্যুর) পরে জীবনে ভালো আর কিছু নেই।”
তখন আমরা সন্দেহাতীতভাবে বুঝতে পারলাম যে তিনি যেতে চাচ্ছেন এবং বললেন ,“ আল্লাহ তোমাদের প্রতি সদয় হোন।”
এরপর বললেন ,“ আল্লাহর রহমত হোক তোমাদের দুজনের উপর।”
তখন তার সাথীরা বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , নিশ্চয়ই আপনি মুসলিমের চাইতে বেশী মর্যাদা রাখেন। আপনি যদি কুফায় যান জনগণ আপনার ডাকে সাড়া দিবে।” তখন ইমাম চুপ করে গেলেন এবং সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। এরপর তিনি তার সাথীদের ও দাসদের বললেন তারা যেন যত পারে তত পানি নেয় এবং এগিয়ে যায় ।
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে] বর্ণিত আছে , যখন সকাল হলো , কুফাবাসীদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি , যার নাম আবু হিররাহ , এলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) কে সালাম দিলো ও বললো ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , কেন আপনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে এসেছেন ?”
ইমাম বললেন ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য হে আবু হিররাহ , বনি উমাইয়া আমার সম্পদ জব্দ করেছে কিন্তু আমি তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করেছি। তারা আমাকে অপমান করেছে এবং আমি সহ্য করেছি , কিন্তু এরপর আমার রক্ত ঝরাতে চেয়েছে (হারাম শরীফে)। আল্লাহর শপথ , একদল অত্যাচারী লোক আমাকে হত্যা করবে এবং আল্লাহ তাদেরকে অপমানিত করবেন এবং তাদের উপর একটি ধারালো তরবারি নিয়োগ দিবেন। এরপর আল্লাহ তাদের উপর এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দিবেন যে তাদেরকে অপমানিত করবে সাবার সম্প্রদায়ের চাইতে বেশী। যার শাসক ছিলো একজন নারী যে তাদের সম্পদ ও জীবনকে শাসন করতো।”
সম্মানিত শেইখ আবু জাফর কুলাইনি বর্ণনা করেন , হাক্বাম বিন উতাইবাহ থেকে যে , এক ব্যক্তি সালাবিয়াহতে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে সাক্ষাত করে , যখন তিনি কারবালা (অথবা কুফা) যেতে চাচ্ছিলেন। সে এলো এবং ইমামকে সালাম জানালো। তিনি উত্তর দিলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন সে কোথাকার লোক।
সে বললো সে কুফার লোক । ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , হে কুফার ভাই , যদি আমি মদীনায় তোমার সাক্ষাত পেতাম তাহলে আমার বাড়িতে জিবরাঈলের চিহ্ন দেখাতাম যেখানে সে আমার নানার কাছে ওহী এনেছিলো। হে কুফার ভাই , নিশ্চয়ই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা আমাদের প্রশ্ন করেছে এবং জ্ঞান লাভ করেছে , তাই এটি অবাস্তব যে আমরা এটি (শাহাদাত লাভ করা) জানবো না।” এরপর তিনি দ্রুত এগোলেন এবং যুবালাহ পৌঁছালেন , যেখানে তিনি আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতূরের শাহাদাতের সংবাদ পেলেন।
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে] অন্য এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি সেখানে (যুবালাহতে) মুসলিম বিন আক্বীলের শাহাদাত সম্পর্কে সংবাদ পেলেন।
[‘ ইরশাদ’ , তাবারির গ্রন্থে আছে] এরপর তিনি একটি চিঠি বের করলেন এবং অন্যান্যদের উপস্থিতিতে তা পড়লেন ,
“ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আম্মা বা’ আদ , আমরা একটি হৃদয়বিদায়ক সংবাদ লাভ করেছি যে , মুসলিম বিন আক্বীল , হানি বিন উরওয়াহ এবং আব্দুল্লাহ বিন ইয়াক্বতূরকে শহীদ করা হয়েছে এবং যারা আমাদের শিয়া বলে দাবী করেছিলো তারা আমাদের পরিত্যাগ করেছে। তোমাদের মধ্যে যারা চলে যেতে চায় তারা যেতে পারে , তাদেরকে তিরস্কার করা হবে না এবং তাদের কাছ থেকে বাইয়াত উঠিয়ে নেয়া হয়েছে।”
তাই লোকজন তার কাছ থেকে চলে যেতে শুরু করলো । তার সাথে শুধু তারা রইলো যারা তার সাথে মদীনা থেকে এসেছিলো এবং ঐ অল্প কয়েকজন যারা পথে তার সাথে যোগ দিয়েছিলো। তিনি এ পদক্ষেপ নিলেন , কারণ তার সাথের বেদুইনরা ভেবেছিলো তিনি এমন কোথাও যাচ্ছেন যেখানে লোকজন তার আনুগত্য করবে। তাই ইমাম তাদেরকে অন্ধকারে রাখতে চাইলেন না এবং শুধু তাদেরকে চাইলেন যারা তার সাথে থাকবে এবং যারা জানতো শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে। কারণ ইমাম সবসময় স্মরণে রেখেছিলেন নবী ইয়াহইয়াকে (যাকারিয়া নবীর সন্তানকে) এবং ইঙ্গিত দিতেন যে তাকেও একইভাবে হত্যা করা হবে এবং তার কাটা মাথা উপহার হিসেবে নেয়া হবে (যেমন ঘটেছিলো নবী ইয়াহইয়ার বেলায়)।
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে ইমাম আলী বিন হোসেইন যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন ,“ আমরা মক্কা থেকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে ছিলাম এবং তিনি এমন কোন জায়গায় থামেন নি ও তা ছেড়ে আসেন নি যেখানে নবী ইয়াহইয়া (আ.) কে স্মরণ করেন নি। তখন একদিন তিনি বললেন: আল্লাহর দৃষ্টিতে এ পৃথিবীর নিকৃষ্ট জিনিসগুলোর একটি হলো ইয়াহইয়ার মাথাকে বনি ইসরাইলের এক ব্যাভিচারিণীর কাছে উপহার হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে’ আছে] যখন সকাল হলো , তিনি তার সাথীদের বললেন প্রচুর পরিমাণ পানি সংগ্রহ করতে এবং তারা আরও এগিয়ে গেলেন এবং বাতনুল আক্ববাহতে পৌঁছালেন এবং সেখানেই থামলেন। সেখানে তিনি আমর বিন লযন নামে বনি ইকরিমাহর এক ব্যক্তির সাক্ষাত পেলেন এবং সে ইমামকে জিজ্ঞেস করলো তিনি কোথায় যেতে চাচ্ছেন। ইমাম বললেন যে তিনি কুফায় যেতে চাচ্ছেন। একথা শুনে সে বললো ,“ আমি আল্লাহর নামে আপনাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করছি , কারণ তরবারির মাথা ও ধারালো কিনারা ছাড়া আর কেউ আপনার মেযবান হবে না। যদি ঐ লোকেরা (কুফাবাসীরা) , যারা আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে , যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করতো এবং আপনার জন্য বিষয়গুলো ঠিকঠাক করে নিতো তাহলে তাদের কাছে যাওয়া ভালো ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি’ পায়্র উল্টো যেভাবে আমি আপনাকে জানালাম। তাই আমার মতে আপনি সেখানে যাওয়া পরিত্যাগ করুন।”
ইমাম বললেন ,“ হে আল্লাহর দাস , আমি বেখবর নই যা তুমি বলেছো। কিন্তু কেউ আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে যেতে পারে না।”
তারপর তিনি বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , এ লোকগুলো আমাকে ছাড়বে না যতক্ষণ না তারা আমার হৃৎপিণ্ডের রক্ত ঝরাবে এবং যখন তারা তা করে সারবে তখন আল্লাহ এক ব্যক্তিকে তাদের ওপরে নিয়োগ দিবেন যে তাদেরকে জাতিগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশী অপমানিত করবেন।”
শেইখ আবুল ক্বাসিম জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন ক্বাওলাওয়েইহ ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে , যখন ইমাম হোসেইন বিন আলী (আ.) বাতনুল উক্ববাতে পৌঁছালেন তিনি তার সাথীদের বললেন ,“ আমি দেখতে পাচ্ছি আমাকে হত্যা করা হচ্ছে।”
তারা জিজ্ঞেস করলেন ,“ কেন , হে আবা আবদিল্লাহ ?” তিনি উত্তর দিলেন তিনি এ সম্পর্কে স্বপ্ন দেখেছেন। তারা জিজ্ঞেস করলো তা কী। তিনি বললেন ,
“ আমি দেখলাম কিছু কুকুর আমাকে আহত করছে এবং সাদা-কালো মিশ্রিত রঙের একটি কুকুর সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট।”
এ কথা বলে তিনি আরও এগোলেন এবং শারাফে পৌঁছালেন এবং সকালে তার লোকজনকে প্রচুর পরিমাণ পানি সংগ্রহ করে নিতে বললেন এবং আরও এগিয়ে গেলেন।
পরিচ্ছেদ - ১২
আল হুর বিন ইয়াযীদ আর-রিয়াহির কাছে সংবাদ , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে তার সাক্ষাত এবং তাকে কুফায় যেতে বাধা দেয়া
[‘ ইরশাদ’ , তাবারির গ্রন্থে আছে] এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) শারাফ থেকে আরও সামনে এগিয়ে গেলেন দুপুরের পর পর্যন্ত। যখন তারা পথ চলছিলেন তার একজন সাথী উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ আল্লাহু আকবার।” ইমাম হোসেইন (আ.) তার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাকে তাকবীর দেয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন , তিনি খেজুর গাছ দেখছেন। তার একদল সাথী বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা এ এলাকায় কখনোই খেজুর গাছ দেখি নি।” ইমাম তখন তাদের জিজ্ঞেস করলেন তারা কী মনে করছে। এতে তারা বললো ,“ আমাদের অভিমত হলো ওগুলো ঘোড়ার কান।”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমিও তা দেখছি।” এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ এখানে কি কোন আশ্রয় নেবার জায়গা আছে , যেন আমরা সেদিকে পিঠ রাখি এবং সামনের দিকে তাদের মুখোমুখি হই।”
তারা বললো ,“ জ্বী , যু হুসাম নামে একটি পাহাড় আছে আপনার পাশে , আমরা যদি দ্রুত বাম দিকে যাই তাহলে সেখানে তাদের আগে পৌঁছাবো এবং আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে।” ইমাম বাম দিকে ঘুরলেন এবং তারাও পিছু পিছু ঘুরলো। কিছু সময় পরে ঘোড়াগুলোর মাথা ও ঘাড় দৃশ্যমান হলো এবং তারা নিশ্চিত হলেন। ইমাম ও তার সাথীরা তাদের দিক বদলালেন এবং তারা তা দেখে ফেললো এবং তাদের দিকে দ্রুত এগোল। তাদের বর্ষা , তরবারিগুলোর তীক্ষ্ণ মাথা মৌমাছির চাকের মত ছিলো এবং তাদের পতাকাগুলো পাখির ডানার মত উড়ছিলো। ইমাম য হুসামের দিকে দ্রুত এগোলেন এবং তাদের আগে পৌঁছালেন। এরপর ইমাম সেখানে তাঁবু গাড়তে আদেশ দিলেন। প্রায় এক হাজার ঘোড়সওয়ারী আল হুর বিন ইয়াযীদ তামিমির অধীনে ইমাম ও তার সাথীদের সামনা সামনি এসে পৌঁছলো।
ইমাম ও তার সাথীরা মাথায় পাগড়ী পড়েছিলেন এবং তাদের তরবারি খাপমুক্ত করলেন ইমাম তখন তার সাথীদের বললেন ,“ তাদেরকে পানি দাও এবং তাদের ঘোড়াগুলোকেও।”
তারা বাটি ও পেয়ালা পানিতে ভরে ঘোড়াগুলোকে পান করতে দিলেন। যখন প্রত্যেকটি ঘোড়া তিন থেকে চার বার পানি পান করলো , এরপর তারা তা সরিয়ে নিয়ে অন্যটিকে দিলেন। তারা এমন করলেন যতক্ষণ না সবকটিকেই পান করালেন।
আলী বিন তা’ আন মুহারাবি বলেন যে , সেদিন আমি আল হুরের সাথে ছিলাম এবং সেখানে পৌঁছেছিলাম সবার শেষে। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) আমার ও আমার ঘোড়ার পিপাসা দেখলেন তখন বললেন ,“ তোমার রাওইয়াহকে বসাও।”
আমি ভাবলাম তিনি পানির মশকের কথা বলছেন। যখন ইমাম বুঝতে পারলেন আমি বুঝি নি , তখন বললেন ,“ ঘোড়াকে বসাও।”
যখন আমি তা করলাম তিনি আমাকে পান করতে বললেন । আমি পানি পান করতে চাইলাম কিন্তু পানি মশক থেকে পড়ে গেলো। তখন ইমাম আমাকে বললেন ,“ তোমার মশক বাঁকা করো।”
আমি বুঝতে পারলাম না কী করবো , তখন ইমাম নিজে উঠলেন এবং মশক উঁচু করলেন এবং আমি তা থেকে পান করলাম এবং আমার ঘোড়াকেও পান করতে দিলাম।
আল হুর কাদিসিয়া থেকে এসেছিলো , যেখানে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ হাসীন বিন নামীরকে পাহারায় রেখেছিলো। এরপর সে আল হুর বিন ইয়াযীদকে এক হাজার সৈন্য দিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে পাঠায়। আল হুর ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইলো যোহরের নামাযের সময় পর্যন্ত। ইমাম (আ.) হাজ্জাজ বিন মাসরুক্বকে আযান দিতে বললেন। [ইরশাদ] ইমাম ইকামতের সময় একটি জামা , একটি আবা ও জুতো পরে বেরিয়ে এলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলেন এবং বললেন ,
“ হে জনতা , আমি তোমাদের কাছে আসি নি যতক্ষণ না তোমাদের চিঠি ও দূতরা আমাকে তোমাদের কাছে আসতে আহ্বান করেছে , কারণ তোমাদের কোন ইমাম ছিলো না এবং তোমরা চেয়েছিলে যে আল্লাহ তোমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করবেন আমার মাধ্যমে সঠিক পথ ও সত্যের দিকে। যদি তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার রক্ষা কর , আমি তোমাদের কাছে এসেছি , তাই অঙ্গীকার স্বীকার করো ও সাক্ষ্য দাও যেন আমি স্বস্তিলাভ করি। তারপর যদি তোমরা একমত না হও এবং আমার আগমনকে অপছন্দ কর তাহলে আমি সেখানে চলে যাবো যেখান থেকে এসেছি।”
তাদের মধ্যে থেকে কেউ উত্তর দিলো না। তখন ইমাম মুয়ায্যিনকে বললেন ইকামত দিতে। যখন মুয়ায্যিন তা করলো ইমাম হোসেইন (আ.) আল হুরের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ যদি তুমি চাও , তুমি তোমার সাথীদের সাথে নামায পড়তে পারো।”
আল হুর বললেন ,“ না , বরং আমরা চাই আপনি ইমামতি করবেন এবং আমরা নামায পড়বো।” তখন ইমাম নামাযের ইমামতি করলেন এবং তারা অনুসরণ করলো। নামাযের পর ইমাম নিজের তাঁবুতে ফিরলেন এবং তার সাথীরা তার চারদিকে জড়ো হলেন। আল হুরও তাঁবুতে গেলো যা তার সাথীরা তার জন্য খাটিয়েছিলো এবং তার একদল সাথী তার চারদিকে বসলো। আর অন্যরা তাদের সারিতে ফিরে গেলো এবং ঘোড়ার লাগামকে টেনে আরও কাছে এনে এর ছায়াতে বসে পড়লো।
যখন আসরের সময় হলো , ইমাম তার সাথীদেরকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে আদেশ দিলেন এবং তারা রাজী হলো। এরপর তিনি মুয়ায্যিনকে আযান ও ইকামত দিতে বললেন। সে তা করলো। ইমামকে আবার নামাযে ইমামতি করার জন্য আহ্বান করা হলো এবং তিনি করলেন। তিনি সালাম পেশ করে তাদের দিকে ফিরলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করে বললেন ,“ আম্মা বা’ আদ , হে জনতা , যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রাপ্য অধিকারের স্বীকৃতি দাও তাহলে আল্লাহ তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আর আমরা মুহাম্মাদ (সা.) এর আহলুল বাইত এবং আমরা এ বিষয়ে (খিলাফতে) তাদের চাইতে বেশী অধিকার রাখি যারা এর দাবী করে। তারা তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও অত্যাচারের বীজ বপন করেছে। যদি তোমরা আমাদের অপছন্দ কর এবং অধিকারকে স্বীকৃতি না দাও এবং যদি আমার কাছে লেখা চিঠিতে যা লিখেছো এবং তোমাদের দূতদের মাধ্যমে আমার কাছে যে সংবাদ পৌঁছেছো তা থেকে তোমাদের অভিমত ভিন্ন হয় তাহলে আমি তোমাদের কাছ থেকে চলে যাবো।”
আল হুর বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আপনি যে চিঠি ও দূতদের কথা বলছেন তা সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।” তখন ইমাম তার একজন সাথীকে ডাক দিলেন এবং বললেন ,“ হে উতবা বিন সামআন , আমার কাছে তাদের চিঠি ভর্তি বস্তা দুটি নিয়ে এসো।”
তিনি বস্তা ভর্তি চিঠি নিয়ে এলেন এবং তাদের সামনে ছড়িয়ে দিলেন। আল হুর বললো ,“ আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত নই যারা আপনাকে চিঠি লিখেছে। আমাদের আদেশ দেয়া হয়েছে যখন আমরা আপনাকে কুজে পাবো তখন আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হতে এবং এরপর আপনাকে কুফাতে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে যেতে ।”
ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই এর চাইতে মৃত্যু তোমার আরও নিকটে।”
এরপর তিনি তার সাথীদেরকে ঘোড়ায় চড়তে বললেন এবং তারা তা করলো। যখন তারা চলে যেতে শুরু করলো আল হুর তাদের পথ আটকালো। ইমাম বললেন ,“ আল হুর , তোমার মা তোমার মৃত্যুতে শোক পালন করুক , তুমি কী করতে চাও ?”
আল হুর বললেন ,“ আমি চাই আপনাকে সেনাপতি উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে যেতে।”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তা করবো না।”
আল হুর বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমিও আপনাকে ছাড়বো না।” তারা তিন বার তা পুনরাবৃত্তি করলেন এবং তাদের সংলাপ উত্তপ্ত হলো। আল হুর বললেন ,“ আমাকে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশ দেয়া হয় নি। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে আপনার সাথে থাকার জন্য যতক্ষণ না আমি আপনাকে কুফায় নিয়ে যাই। তাই এখন যখন আপনি কুফায় যেতে অস্বীকার করছেন এমন এক রাস্তা ধরুন যা কুফায় বা মদীনায় যায় না। আর এটি হলো আমাদের দুজনের মধ্যে সন্ধি। এরপর আমি সেনাপতিকে একটি চিঠি লিখবো এবং আপনি ইয়াযীদ অথবা উবায়দুল্লাহর কাছে লিখবেন এবং আল্লাহ যেন সদয় হন। যেন আমি আপনার বিষয়ে জড়িয়ে না যাই।” ইমাম তার ঘোড়াকে ক্বাদিসিয়া ও উযাইবের দিকে ঘুরালেন এবং আল হুর ও তার সাথীরা তাদের পাশাপাশি বাম দিকে চললো।
আযদি থেকে তাবারি বর্ণনা করেন যে , উক্ববাহ বিন আবু এইযার বর্ণনা করেছে যে: ইমাম হোসেইন (আ.) বাইযাহতে একটি খোতবা দেন তার ও আল হুরের সাথীদের মাঝে। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলেন এবং বললেন ,
“ হে জনতা , রাসূল (সা.) বলেছেন যে , যখন তোমরা দেখবে কোন অত্যাচারী শাসক আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা হালাল করছে এবং তাঁর সাথে চুক্তি ভঙ্গ করছে এবং নবীর সুন্নাহর বিরোধিতা করছে এবং আল্লাহর বান্দাদের সাথে অন্যায় ও জবরদস্তিমূলক আচরণ করছে এবং তখন যদি কোন ব্যক্তি তার কথা ও কাজের মাধ্যমে তার বিরোধিতা না করে তাহলে আল্লাহর উপর তা বাধ্যতামূলক হয়ে যায় ঐ ব্যক্তিকে ঐ অত্যাচারীর মর্যাদা দেয়া। জেনে রাখো এ শাসকদল (বনি উমাইয়ারা) শয়তানের আদেশ মেনে চলছে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করছে এবং দুর্নীতিকে প্রতিদিনকার নিয়ম বানিয়েছে। তারা অধিকারসমূহকে এক জায়গায় জমা করেছে এবং মুসলমানদের সম্পদের ভাণ্ডারকে তাদের নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে এবং আল্লাহর হারামকে অনুমতি দিয়েছে এবং তারহালালকে নিষেধ করে দিয়েছে। সব মানুষের চাইতে আমি সবচেয়ে যোগ্য তাদের বিরোধিতা করাতে। তোমরা চিঠি দিয়েছো আমাকে এবং অঙ্গীকার করেছো যে আমাকে আমার শত্রুর কাছে তুলে দেবে না এবং আমাকে পরিত্যাগ করবে না। যদি তোমরা তোমাদের আনুগত্যের শপথে এখনও দৃঢ় থাকো তাহলে তোমরা সত্যপথে আছো। আমি হোসেইন , আলী ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কন্যা ফাতিমার সন্তান। আমার জীবন তোমাদের সাথে সম্পৃক্ত এবং আমার পরিবার তোমাদের (পরিবারের) সাথে। তোমাদের উচিত আমার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং তোমরা যদি তা না কর এবং বিশ্বাস ভঙ্গ করে থাকো এবং তোমাদের ঘাড় থেকে আনুগত্যের শপথ তুলে নিয়ে থাকো তাহলে আমি আমার জীবনের শপথ করে বলছি যে , তা তোমাদের কাছ থেকে নতুন কিছু নয়। তোমরা তাই করেছো আমার পিতা , ভাই এবং চাচাতো ভাই মুসলিম (বিন আক্বীল)-এর সাথে , যে তোমাদের ধোঁকার শিকার হয় সে অসহায় হয়ে যায়। তোমরা তোমাদের হাত থেকে তোমাদের অংশ চলে যেতে দিয়েছো এবং তোমাদের সৌভাগ্য উল্টে ফেলেছো। যে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে সে নিজেই ধোঁকার মুখোমুখি হবে এবং খুব শীঘ্রই আল্লাহ আমাকে তোমাদের কাছ থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন। তোমাদের উপর আল্লাহর শান্তি , রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] উক্ববাহ বিন আবু এইযার বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) যী হুসামে থামলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করে বললেন ,“ আম্মা বা’ আদ , তোমরা দেখেছো কী অসততা এসেছে। পৃথিবীর রং বদলেছে এবং অপরিচিত হয়ে গেছে। এর ধার্মিকতা বিদায় নিয়েছে এবং তা ঐ পর্যন্ত চলেছে যে ভালোর শেষটুকু যা আছে তা পানি পান করার পাত্রের তলায় যে পাতলা ময়লার স্তর জমে তার মত। জীবনের মূল্য কমে এসেছে মৃত্যুর চারণভূমির মত। তোমরা কি দেখছো না যে সত্য অনুসরণ করা হচ্ছে না এবং ভুলকে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে না ? ন্যায়পরায়ণ বিশ্বাসী হলো সে যে ন্যায়পরায়ণতা আশা করে। আমি নিজে মৃত্যুকে একটি সমৃদ্ধি ভাবি , আর অত্যাচারীদের সাথে বেঁচে থাকাকে ঘৃণ্য ছাড়া কিছু ভাবি না।”
বর্ণনাকারী বলেন যে , যুহাইর বিন ক্বাইন বাজালি উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ তোমরা কি কিছু বলতে চাও , নাকি আমাকে অনুমতি দিবে এর জন্য ?” তারা তাকে বলতে বললো। তখন তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলেন এবং ইমামকে উত্তর দিলেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আপনার আল্লাহ আপনার পথ প্রদর্শক হোন! আপনি যা বলেছেন আমরা শুনেছি। আল্লাহর শপথ , যদি এ পৃথিবীর কোন দিন মৃত্যু না হতো এবং এখানে আমাদের জীবন হতো চিরস্থায়ী , আপনার সাথী হওয়া ও সাহায্যকারী হওয়ার পরিণতিতে যদি আমাদের এ পৃথিবী ত্যাগ করতে হতো , তাতেও আমরা রাজী হতাম এ পৃথিবীতে আপনাকে ছাড়া থাকার চাইতে।” এ কথা শুনে ইমাম তার প্রশংসা করলেন এবং তার জন্য দোআ করলেন।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে নাফে’ বিন হিলাল বাজালি তার জায়গা থেকে উঠলেন এবং বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা আল্লাহর চিরস্থায়ীত্বকে ঘৃণা করি না এবং আমরা আপনার উদ্দেশ্য ও অন্তর্দৃষ্টির উপর দৃঢ় (আস্থায়) আছি। আমরা তার বন্ধু হবো যারা আপনার বন্ধু হবে এবং শত্রু হবো আপনার শত্রুদের প্রতি।”
বুরাইর বিন খুযাইর উঠলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আল্লাহ আপনার মাধ্যমে আমাদের প্রতি সদয় হয়েছেন , আমরা যেন আপনার সামনে থেকে যুদ্ধ করি এবং আমাদের দেহগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায় , যেন কিয়ামতের দিন আপনার নানা আমাদের জন্য শাফায়াত করেন।”
[‘ কামিল’ ,‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] আল হুর , যিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর পাশাপাশি পথ চলছিলেন তার কাছে এসে বললেন ,“ হে হোসেইন , আমি আপনাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি আপনার জীবন নিয়ে ভাবার জন্য এবং আমি নিশ্চিত , যদি আপনি যুদ্ধ করেন তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবে নিহত হবেন।”
ইমাম বললেন ,“ তুমি কি আমাকে মৃত্যুকে ভয় পাওয়াতে চাও ? এর চেয়ে বড় দুর্যোগ তোমার উপর কী আসতে পারে আমাকে হত্যার চাইতে ? আউস গোত্রের এ ভাইয়ের কথাগুলো আমি পুনরাবৃত্তি করছি যে তার চাচাতো ভাইকে বলেছিলো যখন সে আল্লাহর রাসূল (সা.) কে সাহায্য করতে চেয়েছিলো। তার চাচাতো ভাই তার জন্য শঙ্কিত হলো এবং বললো: কোথায় যাচ্ছো তুমি , কারণ তোমাকে হত্যা করা হবে। এতে সে উত্তর দিয়েছিলো: আমি যাবো , কারণ একজন যুবকের জন্য মৃত্যুতে কোন লজ্জা নেই যখন সে সঠিক (কাজটি) করতে চায় , একজন মুসলমানের মত সংগ্রাম করে , সৎকর্মশীল লোকদের উদ্বুদ্ধ করে তার জীবন দিয়ে এবং অভিশপ্তদের ছত্রভঙ্গ করে এবং অপরাধীদের বিরোধিতা করে। যদি আমি বেঁচে থাকি আমি আফসোস করবো না (সে জন্য যা করেছি) এবং যদি আমি মৃত্যুবরণ করি , আমি কষ্ট পাবো না। তোমার জন্য অপমানের ভেতর ও ঘৃণিত হয়ে বেঁচে থাকা যথেষ্ট হোক।”
যখন আল হুর এ কথাগুলো শুনলেন তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) থেকে সরে এসে তার সাথীদের সাথে পথের অপর পাশে হাঁটতে শুরু করলেন এবং ইমাম তার সাথীদের নিয়ে পথের অন্যপাশে চলতে লাগলেন।
[তাবারির ,‘ কামিল’ গ্রন্থে বর্ণিত] উযাইব আল হিজানাতে তারা পৌঁছালেন যা ছিলো নোমানের ঘোড়াসমূহের চারণভূমি। তাই এর নাম ছিলো হিজানাত। হঠাৎ করেই চার জন উট আরোহী (নাফে’ বিন হিলাল , মুজমে বিন আব্দুল্লাহ , উমর বিন খালিদ এবং তিরিম্মাহ বিন আদি) কুফার দিক থেকে হাজির হলেন নাফে’ বিন হিলালির কামিল নামের ঘোড়াটিকে টানতে টানতে। তিরিম্মাহ বিন আদি ছিলেন তাদের নেতা। তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর মুখোমুখি হলেন। যখন তিরিম্মাহর দৃষ্টি ইমাম (আ.) এর উপর পড়লো তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলেন ,
“ হে আমার উট , আমার হৈচৈ কে ভয় করো না এবং সূর্য উঠার আগেই আমাদের একটি ভালো কাফেলার কাছে নিয়ে চলো , যে শ্রেষ্ঠ ভ্রমণকারী । যতক্ষণ না তুমি একজন দৃঢ় দৃষ্টি সম্পন্ন সাহসী মানুষের কাছে পৌঁছাও , যিনি সম্মানিত ও উদার , যাকে আল্লাহ এনেছেন একটি উত্তম কাজের জন্য এবং তিনি একজন সাহায্যকারী এবং আল্লাহ তাকে জীবিত রাখুন পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত। আল্লাহর রাসূলের পরিবার হলো সম্মান ও মর্যাদার , তারা হচ্ছেন ফর্সা ও আলোকিত চেহারার সর্দার ; যারা তাদের শত্রুদেরকে আক্রমণ করেন বাদামী বর্শা ও ধারালো তরবারি দিয়ে। হে , যার হাতে আছে লাভ ও লোকসানের ক্ষমতা , হোসেইনকে সাহায্য করুন এ রকম বিদ্রোহী লোকজনের বিরুদ্ধে যারা অবিশ্বাসের সর্বশেষ টুকরো , সাখর (আবু সুফিয়ান)-এর দুই সন্তান , ইয়াযীদ , যে মদ পানকারী এবং ইবনে যিয়াদ , যে ব্যাভিচারী ও একজন অবৈধ সন্তান।”
যখন এই ব্যক্তিরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পৌছলো , আল হুর তাদের দিকে গেলো এবং বললো ,“ এরা কুফার অধিবাসী , আমি তাদের বন্দী করবো অথবা কুফাতে পাঠিয়ে দিবো।”
ইমাম বললেন ,“ আমি আমার জীবন দিয়ে তাদের রক্ষা করবো , কারণ এ লোকগুলো আমার সাথী এবং তারা আমার অন্যান্য সাথীদের মতই অধিকার রাখে। যদি তুমি তাদের সাথে আমাদের চুক্তির বিরোধিতা করো আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো।”
তা শুনে আল হুর সরে গেলেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তখন তাদের দিকে ফিরে বললেন ,“ কুফার লোকদের সম্পর্কে আমাকে বলো।” তাদের মধ্যে একজন মুজমে বিন আব্দুল্লাহ আয়েদি বললেন ,“ তাদের সর্দাররা বিরাট অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেছে এবং তাদের টাকার থলে পূর্ণ করেছে। শাসক তাদের আত্মা কিনে নিয়েছে এবং তাদেরকে তাদের দৃঢ় সাথী বানিয়ে নিয়েছে এবং সবাই আপনার বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়েছে। আরও কিছু লোক আছে যাদের হৃদয়গুলো আপনার সাথে কিন্তু আগামীকাল তাদের তরবারি আপনার মুখের উপর উম্মুক্ত হবে।” তখন ইমাম তার দূত ক্বায়েস বিন মুসাহহির সাইদাউই সম্পর্কে খোঁজ নিলেন। তারা বললেন ,“ হাসীন বিন নামীর তাকে গ্রেফতার করে ইবনে যিয়াদের কাছে পাঠিয়েছে এবং সে ক্বায়েসকে আদেশ দিয়েছে আপনাকে ও আপনার পিতাকে অভিশাপ দিতে। ক্বায়েস মিম্বরে উঠেন এবং সালাম পাঠান আপনাকে ও আপনার পিতাকে এবং নিন্দা করেন যিয়াদ ও তার বাবাকে। তিনি জনগণকে আমন্ত্রণ জানান আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং তাদেরকে আপনার আগমন সম্পর্কে সংবাদ দেন। তখন ইবনে যিয়াদ আদেশ দেয় যেন তাকে প্রাসাদের ছাদ থেকে ফেলে দেয়া হয়।” ইমাম নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাঁদতে শুরু করলেন এবং কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন ,
) فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيل(
“ তাদের কেউ কেউ অঙ্গীকার পূরণ করেছে , এবং তাদের মধ্যে কেউ আছে অপেক্ষা করছে (অঙ্গীকার পূরণের জন্য) এবং তারা একটুও বদলায়নি ।” [সূরা আহযাব: ২৩]
“ হে আল্লাহ , আমাদেরকে এবং তাদেরকে বেহেশতে স্থান দিন এবং আমাদের একত্র করুন আপনার দয়া ও পুরস্কারের ভাণ্ডারপূর্ণ বিশ্রামস্থলে।”
তখন তিরিম্মাহ বিন আদি তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আমি আপনার সাথে খুব অল্প কয়েকজন মানুষ দেখতে পাচ্ছি এবং যদি তারা (শত্রুরা) আপনার সাথীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাহলে তারা তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আমি কুফা ত্যাগ করার আগে বিশাল সংখ্যার একদল মানুষকে দেখলাম যা আমি এক জায়গায় জমায়েত হতে আগে কখনো দেখি নি। যখন আমি খোঁজ নিলাম এর পেছনে কী কারণ আমাকে বলা হলো তাদেরকে সাজানো হচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য।
আমি আল্লাহর নামে আপনাকে অনুরোধ করছি তাদের দিকে সামান্যও অগ্রসর না হতে এবং একটি সুরক্ষিত শহরে যান এবং সেখানে অবস্থান করুন আপনি সিদ্ধান্ত নেয়া পর্যন্ত এবং আপনার কর্ম-পরিকল্পনা নিয়ে ভাবুন। আমার সাথে আসুন। আমি আপনাকে আজা পর্বতে নিয়ে যাবো। যা সুরক্ষিত। এ পর্বত আমাদের জন্য ঢালের কাজ করেছে গাসসান ও হামীরের রাজাদের বিরুদ্ধে , নোমান বিন মুনযির এবং লাল চামড়া ও সাদা চামড়ার (বিদেশীদের) বিরুদ্ধে এবং আমরা এতে (সব সময়) আশ্রয় নিয়েছি। আল্লাহর শপথ , আমরা কখনোই অপমানিত হই নি। আমি আপনার সাথে যাবো এবং সেখানে আপনার জন্য জায়গা দিবো। তখন আপনি আপনার দূতদের বনি তাঈ’ র কাছে পাঠাতে পারেন যারা আজা ও সালামি পর্বতে বাস করে , যতক্ষণ না ঘোড়সওয়ার ও পদাতিক সৈন্যরা আপনার চার পাশে জমা হয়। দশ দিন পার হবে না বিশ হাজার (বনি তাঈ’ র) লোক তৈরী হয়ে যাবে এবং তাদের জীবন থাকতে আপনার কাছে কাউকে পৌঁছতে দিবে না।”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ আল্লাহ তোমাকে ও তোমার লোকদের উদারভাবে পুরস্কৃত করুন , আমরা এ লোকগুলোর সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি যার কারণে আমি ফিরতে পারি না এবং আমরা জানি না আমাদের ও তাদের কী ঘটবে।”
আবু মাখনাফ বলেন যে , জামীলা বিন মারসাদ বর্ণনা করেছেন তিরিম্মাহ বিন আদি থেকে যে তিনি বলেছেন:“ আমি ইমামকে বিদায় জানালাম এবং বললাম , আল্লাহ আপনাকে খারাপ জিন ও মানুষের কাছ থেকে আশ্রয় দিন। আমি কুফা থেকে আমার পরিবারের জন্য রসদ এনেছি এবং তাদের রিয্ক্ব আমার কাছে। আমি ফেরত যাবো এবং তাদের কাছে তা হস্তান্তর করবো। এরপর আমি আপনার কাছে ফেরত আসবো এবং আপনার সাথীদের সাথে যোগদান করবো।”
ইমাম বললেন ,“ তোমার উপর আল্লাহর রহমত হোক , তাহলে তাড়াতাড়ি যাও।” আমি অনুভব করলাম তার আরও লোকজনের প্রয়োজন , তাই আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে বললেন। তিরিম্মাহ বলেন , আমি আমার পরিবারের কাছে গেলাম এবং যা আমার কাছে ছিলো তাদের কাছে হস্তান্তর করলাম এবং তাদের কাছে অসিয়ত করে এলাম। তারা আমাকে বললো ,“ আমরা আপনাকে কখনো এত তাড়াহুড়া করতে দেখি নি।” আমি তাদের কাছে আমার উদ্দেশ্য বর্ণনা করলাম এবং বনি না’ আলের রাস্তা অতিক্রম করলাম এবং উযাইবুল হিজানাতের নিকটবর্তী হলাম। সেখানে আমি সামা’ আহ বিন বাদারের সাক্ষাত পেলাম যে আমাকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ দিলো , আর তাই আমি ফেরত চলে এলাম।
লেখক (শেইখ আব্বাস কুম্মি) বলেন যে , আবু জাফর তাবারির বর্ণনা অনুযায়ী , যিনি আযদি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন , এটি প্রমাণ করে যে তিরিম্মাহ বিন আদি কারবালায় উপস্থিত ছিলেন না এবং সেখানকার শহীদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বরং যখন তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের সংবাদ শোনেন তখন ফিরে যান। কিন্তু আবু মাখনাফের সুপরিচিত‘ মাক্বতাল’ অনুযায়ী তিরিম্মাহ থেকে বর্ণনা এসেছে যে , তিনি বলেছেন ,“ আমি ভীষণভাবে আহত ছিলাম এবং কারবালার শহীদদের মাঝে পড়েছিলাম। আমি শপথ করছি যে সে সময় আমি ঘুমিয়ে যাই নি। আমি দেখলাম বিশজন ঘোড়সওয়ার আসছে” ইত্যাদি। তাই এ বর্ণনার উপর নির্ভর করা যায় না এবং তা সংবাদকে দুর্বল করে ফেলে। আল্লাহ তাকে উপযুক্ত পুরস্কার দিন।
ইমাম (আ.) আরও এগিয়ে গেলেন এবং ক্বাসরে বনি মাক্বাতিলে পৌঁছালেন এবং সেখানে থামলেন। তিনি সেখানে একটি তাঁবু খাঁটানো দেখতে পেলেন এবং খোঁজ নিলেন সেটি কার তাঁবু। লোকজন বললো যে তা উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর জু’ ফির। ইমাম বললেন যে , তিনি তার সাথে দেখা করতে চান এবং একজনকে পাঠালেন তাকে ডেকে আনতে। [‘ মানাক্বিব’ ] ইমামের দূত হাজ্জাজ বিন মাসরুক্ব জু’ ফি তার কাছে গেলেন এবং বললেন ,“ ইমাম হোসেইন (আ.) , আলীর সন্তান , আপনার সাথে দেখা করতে চান।” সে বললো ,“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আল্লাহর শপথ আমি কুফা ছেড়েছি শুধু হোসেইন বিন আলীর সাথে দূরত্ব রাখার জন্য। আমি তার সাথে দেখা করতে চাই না , না আমি চাই তিনি আমাকে দেখতে পান।” হাজ্জাজ্ব ফেরত এলেন এবং তার কথাগুলো ইমামকে বললেন। ইমাম উঠলেন এবং তার সাথে সাক্ষাত করতে গেলেন। যখন তিনি উবায়দুল্লাহর কাছে গেলেন তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং বসলেন। এরপর ইমাম তাকে আমন্ত্রণ জানালেন সাহায্য করার জন্য । এতে সে আগের কথাই বললো এবং নিজেকে সরিয়ে নিলো। ইমাম বললেন ,
“ এখন যেহেতু তুমি আমাদের সাহায্য করা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছো সেক্ষেত্রে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো না। আল্লাহর শপথ , যে আমাদের ডাক শোনে এবং এতে সাড়া দেয়ার জন্য দ্রুত এগোয় না সে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
উবায়দুল্লাহ বললো ,“ আপনার শত্রুদের পক্ষ নেয়ার বিষয়ে আল্লাহ চাইলে তা ঘটবে না।” তখন ইমাম হোসেইন (আ.) উঠে দাঁড়ালেন এবং তার তাঁবুর দিকে ফিরে গেলেন।
এখানে উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর জু’ ফি সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করা প্রাসঙ্গিক হবে। মির্যা (মুহাম্মাদ আসতারাবাদী) তার‘ রিজালে কাবীর’ বইতে নাজাশি থেকে বর্ণনা করেন যে , উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর জু’ ফি একজন ঘোড়সওয়ার এবং কবি ছিলো। তার কাছে একটি বই ছিলো বিশ্বাসীদের আমির ইমাম আলী (আ.) থেকে। মির্যা তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা রক্ষা করে বলেন যে , উবায়দুল্লাহ ইমাম হোসেইন (আ.) কে জিজ্ঞেস করলো কী কলপ তিনি ব্যবহার করেন। ইমাম বললেন ,“ তুমি যা ভাবছো তা নয় , এটি মেহদী ও ওয়াসমাহ।”
এছাড়া‘ ক্বামক্বাম’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে , উল্লেখিত উবায়দুল্লাহ ছিলো খলিফা উসমানের শিয়া (অনুসারী)। সে ছিলো আরবদের মাঝে সাহসী ঘোড়সওয়ার যোদ্ধা। সে মুয়াবিয়ার পক্ষে সিফফীনের যুদ্ধে যুদ্ধ করেছে খলিফা উসমানের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে। যখন ইমাম আলী (আ.) শহীদ হন সে কুফায় ফেরত আসে এবং সেখানেই বাস করতে থাকে। যখন লোকজন ইমাম হোসেইন (আ.) কে হত্যা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে , সে কুফা ত্যাগ করে যেন তার হত্যায় তাকে অংশীদার হতে না হয়।
তাবারি বর্ণনা করেন আযদি থেকে , যিনি বর্ণনা করেন আব্দুর রহমান বিন জানদাহ আযদি থেকে যে: ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের পর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ কুফার সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে পরিদর্শন করে। সে উবায়দুল্লাহ বিন আল হুরকে দেখতে পেলো না এবং কিছু দিন পর যখন সে ফিরে এলো সে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের সাথে সাক্ষাত করতে গেলো। উবায়দুল্লাহ (বিন যিয়াদ) তাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ হে হুরের সন্তান , তুমি কোথায় ছিলে ?” সে বললো যে সে অসুস্থ ছিলো। এতে উবায়দুল্লাহ জিজ্ঞেস করলো ,“ তুমি কি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলে , না শারীরিকভাবে ?” সে বললো ,“ আমার হৃদয় অসুস্থ নয় ; আর শরীরের বিষয়ে , আল্লাহ আমাকে সুস্থতা দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন।” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তুমি মিথ্যা বলছো , আসলে তুমি আমাদের শত্রুদের সাথে ছিলে।” উবায়দুল্লাহ (বিন আল হুর) বললো ,“ যদি আমি তোমার শত্রুদের সাথে উপস্থিত থাকতাম তাহলে তা প্রকাশ হয়ে যেতো , কারণ আমার মত একজন লোক দৃষ্টির আড়ালে থাকতে পারে না।” যখন ইবনে যিয়াদ তার দিক থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিলো সে চুরি করে সরে পড়লো এবং তার ঘোড়ায় চড়ে স্থান ত্যাগ করলো। এরপর উবায়দুল্লাহ ফিরে বললো ,“ আল হুরের সন্তান কোথায় ?” লোকজন বললো সে এইমাত্র চলে গেলো। সে আদেশ দিলো যে তাকে তার কাছে ফেরত আনতে। রক্ষীরা তার পিছনে ছুটে গেলো এবং তাকে সেনাপতির আহ্বানে সাড়া দিতে বললো। সে বললো ,“ তাকে বলো আমি তার কাছে কখনোই পায়ে হেঁটে আসবো না।” এ কথা বলে সে ফিরে চললো এবং আহমার বিন যিয়াদ তাঈ’ র বাড়িতে পৌঁছল। সে তার সাথীদের জড়ো করলো এবং তারা কারবালার শহীদদের জায়গায় গেলো। সেখানে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলো এবং মাদায়েনে গেলো। এ বিষয়ে সে কবিতা লিখলো ,“ প্রতারক , ধোঁকাবাজ সেনাপতি , যে প্রকৃতই একজন ধোঁকাবাজ , বলে যে কেন আমি ফাতিমা (আ.) এর সন্তান হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি নি , যখন আমি লজ্জিত এবং আফসোস করি কেন আমি তাকে সাহায্য করি নি এবং যে ভালো কাজ করতে অবহেলা করে তার লজ্জিত হওয়া উচিত এবং তওবা করা উচিত।”
তার কবিতা অনুযায়ী সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য না করে লজ্জিত ছিলো। সে কিছু কবিতা লিখেছিলো যা এ বইয়ে শোকগাঁথাগুলোর মাঝে উল্লেখ করা হবে।
এছাড়া বর্ণিত হয়েছে যে সে অনুতাপে তার দুটো হাত একত্র করেছিলো এবং বলেছিলো ,“ আমি নিজেকে কী করেছি ?” এরপর সে নিচের কবিতা পাঠ করেছিলো ,
“ হায় অনুতাপ , হায় দুঃখ এবং যতদিন আমি বেঁচে আছি এ অনুতাপ আমার আত্মা ও ঘাড়ের উপর থাকবে , যখন হোসেইন আমাকে ক্বাসরে বনি মাক্বাতিলের পথভ্রষ্ট ও মুনাফিক্বদের বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য করার জন্য বলেছিলো , যখন বলেছিলো তুমি কি আমাদের পরিত্যাগ করবে এবং চলে যাবে ? তখন যদি আমি মুস্তাফা (সা.) এর সন্তানের প্রতিরক্ষায় আমার জীবন কোরবান করতাম। তাহলে আমি কিয়ামতের দিন সফলতা লাভ করতাম। তিনি (ইমাম) আমার দিকে পিঠ ফিরালেন এবং বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন। যদি অনুতপ্ত হৃদয় চিরে দেখানো যেতো , আমার হৃদয় যেন ছিঁড়ে যায়। এটি অতি সত্য যে যারা হোসেইনকে সমর্থন দিয়েছে এবং সাহায্য করেছে তারা সফলতা অর্জন করেছে এবং তারা সৎকর্মশীল এবং যারা মুনাফিক্ব ছিলো তারা অভিশপ্ত হয়েছে।”
আবু হানিফা দিনাওয়ারি এ কবিতাগুলোর কিছু উল্লেখ করে বলেন যে উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর কুফার সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত এবং একজন যোদ্ধা ছিলেন।
সম্মানিত সাইয়েদ মাহদী বাহারুল উলুম তার‘ রিজাল’ -এ বলেন যে , শেইখ নাজ্বাশি উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর জু’ ফিকে আদি শিয়াদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সে হচ্ছে ঐ একই ব্যক্তি যার পাশ দিয়ে ইমাম গিয়েছিলেন আল হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহির সাথে সাক্ষাতের পর এবং তার সাহায্য চেয়েছিলেন , কিন্তু সে অস্বীকার করেছিলো।
শেইখ সাদুক্ব তার‘ আমালি’ তে ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ক্বাতক্বাতানিয়াতে পৌঁছালেন , তিনি দেখলেন একটি তাঁবু খাঁটানো আছে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন সেটি কার তাঁবু। লোকজন বললো তা উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর হানাফির (বরং সঠিক নাম হলো উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর জু’ ফি)। ইমাম তাকে একটি সংবাদ পাঠালেন এ বলে ,“ তুমি একজন খারাপ ও অপরাধী ব্যক্তি। তুমি যা করেছো তার জন্য আল্লাহ তোমাকে হিসাব নেয়ার জন্য ডাকবেন। যদি তুমি আল্লাহর দিকে ফিরে আসো এবং আমাকে সাহায্য কর তাহলে আমার নানা তোমার জন্য আল্লাহর সামনে শাফায়াত করবেন।”
সে বললো ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , যদি আমি আপনাকে সাহায্য করতে আসি আমি হবো প্রথমদের একজন যে আপনার সামনে আপনার জন্য জীবন কোরবান করবে। আপনি আমার ঘোড়াটি নিতে পারেন। আমি এতে বসে যত কাজ করেছি , তাতে আমি যা চেয়েছি তা অর্জন করেছি এবং কেউ আমার কাছে পৌঁছতে পারে নি। এটি আমাকে রক্ষা করেছে। তাই আমি এটি আপনাকে উপহার দিচ্ছি , তা নিন।” এ কথা শুনে ইমাম তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন ,“ তোমাকে অথবা তোমার ঘোড়ার কোনটিরই প্রয়োজন আমার নেই। আমি চাই না আমার দলে পথভ্রষ্ট লোক প্রবেশ করুক। এখান থেকে পালিয়ে যাও এবং আমাদের পক্ষেও এসো না অথবা আমাদের বিপক্ষেও না। কারণ যে ব্যক্তি আমাদের আহলুল বাইতের ডাক শোনে কিন্তু আমাদের সাহায্য করতে দ্রুত এগোয় না , আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুনে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলবেন।”
শেইখ মুফীদ তার‘ ইরশাদ’ -এ বলেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ক্বাসরে বনি মাক্বাতিলে পৌঁছালেন , তিনি সেখানে একটি তাঁবু খাটানো দেখতে পেলেন (আগে যা বর্ণিত হয়েছে সে রকমই , শেষ পর্যন্ত)।
সাইয়েদ তাবাতাবাঈ‘ বাহারুল উলূম’ -এ বর্ণনা করেন যে , শেইখ জাফর বিন মুহাম্মাদ ইবনে নিমা তার‘ শারহুস সার ফী ইহওয়ালিল মুখতার’ -এ লিখেছেন যে উবায়দুল্লাহ বিন আল হুর বিন মুজমে’ বিন খুযাইম জু’ ফি কুফার সম্মানিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তার কাছে এলেন এবং তাকে তার (ইমামের) দলে যোগ দিতে আহ্বান জানালেন। কিন্তু সে অস্বীকার করলো। পরে সে এমন অনুতপ্ত হলো যে , সে চেয়েছিলো যেন তার মৃত্যু হয় এবং সে কবিতা আবৃত্তি করেছিলো (ওপরে বর্ণিত)। তার অন্যান্য সুপরিচিত কবিতা হলো:
“ লালসাপূর্ণ বনি উমাইয়াহ শান্তিতে ঘুমায় , অথচ তাফের নিহতদের পরিবার তা থেকে বঞ্চিত। ইসলাম মূর্খ লোকদের গোত্রের হাতে ছাড়া আর কোথাও ধ্বংস হয় নি , যাদের সেনাপতি বানানো হয়েছে এবং তাদের ঠাট-বাট প্রকাশ্য , ধর্মের বর্শা অত্যাচারীদের হাতে , যখন এর এক অংশ বেঁকে যায় , তা তারা সোজা করে না। আমি শপথ করেছি যে আমার আত্মা সব সময় শোকাভিভূত থাকবে , দুঃখিত থাকবে এবং আমার চোখ থাকবে অশ্রুতে পূর্ণ। যা আমার জীবন কালে কখনো শুকোবে না , যতক্ষণ না বনি উমাইয়াহর সর্দাররা অপমানিত হয় তাদের মৃত্যু পর্যন্ত।”
এরপর তিনি আরও বলেন যে , এ উবায়দুল্লাহ মুখতারের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলো এবং ইবরাহীম বিন মালিক আশতারের সাথে ছিলো উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। ইবরাহীম অস্বস্তিতে ভুগছিলেন এবং মুখতারকে বললেন ,“ আমি আশঙ্কা করছি প্রয়োজনের মুহূর্তে সে আমাদের ধোঁকা দিতে পারে।” মুখতার বললেন ,“ তাকে সম্পদ দাও এবং তার চোখ অন্ধ করে দাও।” তখন ইবরাহীম এগিয়ে গেলেন উবায়দুল্লাহকে সহ এবং তিফরিত পৌঁছে সেখানে থামলেন। তিনি কর সংগ্রহ করলেন এবং তা তার সাথীদের মাঝে বন্টন করলেন। তিনি উবায়দুল্লাহকে পাঁচ হাজার দিরহাম পাঠালেন। এতে সে ক্রোধান্বিত হয়ে বললো ,“ তুমি নিজের জন্য দশ হাজার দিরহাম রেখেছো অথচ আমি (মর্যাদায়) তোমার চাইতে কম নই।” এবং ইবরাহীম যতই শপথ করে বললেন যে এর চাইতে সে বেশী রাখে নি , সে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলো। ইবরাহীম তাকে নিজের অংশটিও দিলেন কিন্তু এতেও সে সন্তুষ্ট হলো না। এরপর সে মুখতারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো এবং তার সমর্থনের অঙ্গীকার ভঙ্গ করলো। সে কুফার কিছু গ্রাম লুট করলো এবং মুখতারের কিছু লোককে হত্যা করলো এবং লুটকৃত সম্পদের পুরোটা নিয়ে বসরাতে মুস’ আব বিন যুবাইরের কাছে গেলো। মুখতার তার সৈন্যদেরকে তার পিছনে পাঠালো যারা তার বাড়ি ধ্বংস করে দিলো।
পরে উবায়দুল্লাহ অনুতপ্ত হয়েছিলো যে কেন সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করে নি এবং কেন সে মুখতারের সাথে থাকে নি এবং বলেছিলো ,“ যখন মুখতার জনগণকে প্রতিশোধের জন্য আহ্বান করলো , আহলুল বাইতের অনুসারীরা এগিয়ে এলো। যারা তাদের বর্মের ওপরে হৃদয় সাজিয়েছিলো ; তারা প্রত্যেক মৃত্যুর নদীতে ও যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলো এবং তারা নবীর দৌহিত্রকে এবং তার পরিবারকে সাহায্য করেছিলো , তাদের লক্ষ্য রক্তের প্রতিশোধ নেয়া ছাড়া আর কিছু ছিলো না। এভাবে তারা বেহেশতে ও এর সুবাসের ভেতরে প্রবেশ করলো। আর তা সব সোনা ও রূপার চাইতে উত্তম। হায় যদি আমিও ভারতীয় ও পূর্ব দেশীয় তরবারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতাম। আফসোস , যদি আমি আপনার সমর্থকদের দলে প্রবেশ করতাম তাহলে আমি প্রত্যেক বিদ্রোহী ও সীমালঙ্ঘনকারীকে হত্যা করতাম।” এ কবিতাগুলো উদ্ধৃত করার পর সাইয়েদ বাহারুল উলূম বলেন যে , আমার মতে , এত কিছুর পরও আল হুর জু’ ফি ছিলো একজন বিশ্বাসী , কিন্তু অপরাধী। আপনারা দেখেছেন সে ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করতে অস্বীকার করেছিলো এবং দেখেছেন মুখতারের প্রতি তার মনোভাব। কিন্তু সে অনুতাপ করেছিলো ও তওবা করেছিলো , আমরা আশ্চর্য হয়েছি যে নাজ্জাশি তাকে ধার্মিকদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তার বইয়ের শুরুতে তাকে স্থান দিয়েছেন। (ওপরে যা বলা হয়েছে) এ অনুযায়ী আমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর করুণা আশা করি , যিনি তাকে আদেশ করেছিলেন পালিয়ে যেতে , যেন সে ডাক শুনতে না পায় , যাতে জাহান্নামে মুখ নিচু করে নিক্ষিপ্ত হতে না হয় , এবং তিনি আল্লাহর কাছে কিয়ামতের দিন তার জন্য শাফায়াত করবেন। কারণ সে অনেক অনুতপ্ত হয়েছিলো এবং তওবা করেছিলো সে যা করেছিলো তার জন্য। আল্লাহ ভালো জানেন তার অবস্থা সম্পর্কে এবং তার শেষ সম্পর্কে (এখানেই আল্লামা তাবাতাবাঈর‘ বাহারুল উলূম’ - এর আলোচনা শেষ হয়েছে)।
লেখক (শেইখ আব্বাস কুম্মি) বলেন , যে আল হুর জু’ ফির বংশধর ছিলো শিয়া , যার মাঝে ছিলো আদীম , আইউব ও যাকারিয়া , যারা ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) এর সাথী ছিলেন। নাজ্জাশি তাদের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন এবং বলেন যে আদীম ও আইউব নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং তিনি একটি বইকে যাকারিয়ার লেখা বলে উল্লেখ করেছেন।
পরিচ্ছেদ - ১৩
কুফার পথে ইমাম হোসেইন (আ.)
আমাদের শেইখ সাদুক্ব , তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারার মাধ্যমে বর্ণনা করেন আমর বিন ক্বায়েস মাশরিক্বি থেকে , যিনি বলেন যে: আমি আমার চাচাতো ভাইসহ ক্বাসরে বিন মাক্বাতিলে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে উপস্থিত হলাম।
আমরা ইমামকে সালাম দিলাম এবং আমার চাচাতো ভাই তাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ আপনার চুলের রঙ কলপের জন্য না রাসায়নিক রঙ-এর জন্য ?”
ইমাম উত্তর দিলেন ,“ তা কলপ করা হয়েছে , কারণ আমরা বনি হাশিমের লোকেরা , দ্রুত বৃদ্ধ হয়ে যাই।”
এরপর ইমাম আমাদের দিকে ফিরে বললেন ,“ তোমরা কি আমাকে সাহায্য করতে এসেছো ?” আমি বললাম ,“ আমার এক বিরাট পরিবার আছে এবং আমার কাছে অন্য লোকদের আমানত আছে। আমি জানি না এর পরিণতি কী হবে , তাই আমি চাই না যে লোকদের সম্পদ (যা আমার কাছে আছে) ধ্বংস হোক।” আমার চাচাতো ভাইও একই রকম কথা বললো। তখন ইমাম বললেন ,“ তাহলে এখান থেকে চলে যাও এবং আমাদের ডাক শোনার জন্য অথবা আমাদের দুঃখ দেখার জন্য থেকো না , কারণ যে আমাদের ডাক শোনে এবং আমাদের দুঃখ দেখেও আমাদের সাহায্য করতে দ্রুত এগোয় না , তখন তা মহান প্রসংশিত আল্লাহর অধিকার হয়ে যায় তাকে জাহান্নামের আগুনে মাথা নিচের দিকে দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] এরপর রাতের শেষ অংশে ইমাম আদেশ দিলেন পানি নেয়ার জন্য এবং ক্বাসরে বনি মাক্বাতিল ত্যাগ করলেন।
উক্ববাহ বিন সাম’ আন বলেন যে , আমরা ইমামের সাথে গেলাম এবং তিনি ঘোড়ার পিঠে বসে সামান্য ঘুমিয়ে নিলেন। যখন তিনি জেগে উঠলেন , বললেন ,“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন , আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।”
এরপর তিনি তা দুবার অথবা তিন বার বললেন। তার সন্তান আলী বিন হোসেইন (আ.) একটি ঘোড়াতে যাচ্ছিলেন। তিনি তার কাছে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন ,“ আপনি কেন হঠাৎ আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং তাঁর কাছে ফেরত যাওয়ার কথা বললেন ?” ইমাম বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , ঘুমিয়ে পড়েছিলাম এবং আমি দেখলাম একজন ঘোড়সওয়ার আমার পিছন থেকে আমার কাছে এলো এবং বললো ,‘ এই লোকগুলো আরও এগিয়ে যাচ্ছে , আর মৃত্যু তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে ।’ আমি অনুভব করলাম তারা আমাদের রুহ যারা আমাদেরকে আমাদের মৃত্যু সম্পর্কে জানাচ্ছে।”
আলী বিন হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে প্রিয় বাবা , আপনার রব যেন খারাপ কোন কিছুনা আনেন , আমরা কি সত্যের উপর নই ?” ইমাম বললেন ,“ কেন নয় , তাঁর শপথ যার কাছে সব দাস ফেরত যায়।” তখন আলী বললেন ,“ তাহলে আমরা ভয় করি না , কারণ আমরা সত্যের উপর মৃত্যুবরণ করবো।”
ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ তোমাকে অনেক পুরস্কার দিন , সে পুরস্কার যা বাবার কাছ থেকে পুত্রের জন্য যথাযোগ্য।”
[‘ ইরশাদ’ ,‘ কামিল’ গ্রন্থে আছে] যখন সকাল হলো , ইমাম হোসেইন (আ.) ফজরের নামায পড়লেন এবং দ্রুত তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং বাম দিকে ঘুরে স্থান ত্যাগ করলেন। তিনি চেষ্টা করলেন তার সাথীদেরকে সরিয়ে নিতে (আল হুরের সৈন্যদের থেকে)। তখন আল হুর বিন ইয়াযীদ তার কাছে এলো এবং তাকে এবং তার সাথীদেরকে তা করতে বাধা দিলো। আল হুর যত চেষ্টা করলো তাদেরকে কুফা নিতে তারা তা প্রতিরোধ করলো এবং থেমে গেলো। তারা একইভাবে চললেন এবং নাইনাওয়াতে পৌঁছালেন। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) সেখানে থামলেন একজন অস্ত্রে সজ্জিত অশ্বারোহী কাঁধে ধনুক নিয়ে কুফা থেকে হাজির হলো। সবাই থামলো এবং তাকে দেখতে লাগলো। যখন সে কাছে এলো সে আল হুরকে ও তার সাথীদেরকে সালাম দিলো কিন্তু ইমাম ও তার সাথীদের সালাম দিলো না। এরপর সে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের একটি চিঠি আল হুরের কাছে হস্তান্তর করলো যার বিষয়বস্তু ছিলো এরকম:
“ আম্মা বা’ আদ , আমার চিঠি ও দূত তোমার কাছে পৌঁছাবার সাথে সাথে হোসেইনের প্রতি কঠোর হও এবং তাকে তৃণহীন ভূমিতে , যেখানে কোন দুর্গ ও পানি নেই সেখানে থামতে বাধ্য করো। আমি আমার দূতকে নির্দেশ দিয়েছি তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হতে যতক্ষণ না তুমি আমার আদেশ পালন করেছো , সালাম।”
যখন আল হুর উবায়দুল্লাহর চিঠি পড়লো সে তাদেরকে বললো ,“ এটি সেনাপতি উবায়দুল্লাহর চিঠি , এতে তিনি আমাকে আদেশ দিয়েছেন যেন আমি আপনাদের থামাই যেখানে এ চিঠি আমার কাছে পৌঁছাবে এবং এ হলো তার দূত , যে আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না যতক্ষণ না আমি তার আদেশ পালন করি।”
[তাবারি বর্ণনা করেন] তখন ইয়াযীদ বিন মুহাজির আবুল শা’ সা কিনদি ইবনে যিয়াদের দূতের দিকে তাকালেন এবং বললেন ,“ তুমি কি মালিক বিন নুমাইর নও ?” সে হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলো। সে ছিলো বনি কিনদা গোত্র থেকে। আবুল শা’ সা বললেন ,“ তোমার মা তোমার জন্য কাঁদুক , কী আদেশ তুমি এনেছো ?” সে বললো ,“ আমি আমার ইমামের আদেশ ছাড়া কী এনেছি এবং তার প্রতি আমার আনুগত্যের শপথ পূরণ করেছি।” আবুল শা’ সা বললেন ,“ তুমি তোমার আল্লাহকে অমান্য করেছো এবং সে বিষয়ে তোমার ইমামকে মেনেছো যা তোমাকে ধ্বংস করবে এবং তুমি বেইজজতি ও জাহান্নামের আগুন অর্জন করবে , কত খারাপ এক ইমাম তোমার। আল্লাহ কোরআনে বলেন ,
) وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنْصَرُون(
এবং আমরা তাদেরকে ইমাম বানিয়েছি যারা (জাহান্নামের ) আগুনের দিকে আহ্বান করে এবং কিয়ামতের দিনে তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। [সূরা ক্বাসাস: ৪১]
আর তোমার ইমাম তাদের একজন।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে’ আছে] আল হুর এভাবে ইমাম এবং তার সাথীদেরকে সে জায়গায় থামতে বাধ্য করলো যেখানে কোন লোকালয় বা পানি ছিলো না। ইমাম বললেন ,“ তোমাদের জন্য আক্ষেপ , আমাদেরকে ত্যাগ করো যেন আমরা এ গ্রামে (নাইনাওয়া অথবা ঘাযিরিয়া) অথবা ঐখানে (শুফিয়া) তাঁবু ফেলতে পারি।”
আল হুর বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি আপনাকে তা করতে অনুমতি দিতে পারি না। তারা ঐ লোকটিকে আমার উপর গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে।” তখন যুহাইর বিন ক্বাইন বললেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমি দেখতে পাচ্ছি বিষয়টি এর চেয়ে খারাপ হবে। এদের সাথে যুদ্ধ করা আমাদের জন্য এখন সহজ হবে তাদের পরে যে দল আসবে তাদের সাথে যুদ্ধ করার চাইতে। আমার জীবনের শপথ , পরে এত লোক আসবে যে তাদের মোকাবেলা করা আমাদের শক্তির বাইরে হবে।” ইমাম বললেন ,“ আমি তাদের বিরুদ্ধে (প্রথমে) যুদ্ধ করবো না।”
এ কথা বলে তিনি ঘোড়া থেকে নামলেন , যে দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার , ২রা মহররম ৬১ হিজরি।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার সাথীদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং একটি খোতবা দিলেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলেন এবং তার নানার কাছে সালাম পাঠালেন এবং এরপর বললেন ,“ তোমরা দেখেছো তারা কী করেছে (শেষ পর্যন্ত)” এবং একটি খোতবা দিলেন যা আমরা আগে উল্লেখ করেছি যেটি তিনি আল হুরের সাথে সাক্ষাতের পর দিয়েছিলেন।
পরিচ্ছেদ - ১৪
কাববালায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর আগমন , উমর বিন সা’ আদের প্রবেশ ও তখনকার পরিস্থিতি
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কারবালার সমতল ভূমিতে এসে থামলেন , [কামিল] তিনি জায়গাটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। লোকজন উত্তর দিলো যে জায়গাটির নাম‘ আক্বার’ । ইমাম বললেন ,
“ হে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমরা আক্বার (আক্বার শব্দের অর্থ উদ্ভিদশূন্য , বন্ধ্যা) থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।”
সিবতে ইবনে জাওযী তার‘ তাযকিরাহ’ তে লিখেছেন যে ইমাম হোসেইন (আ.) জিজ্ঞেস করলেন জায়গাটির নাম কী। লোকজন উত্তর দিলো যে তা কারবালা এবং একে নাইনাওয়া বলেও ডাকা হয় যা সেখানে একটি গ্রামের নাম। তখন ইমাম (আ.) কাঁদতে শুরু করলেন এবং বললেন , উম্মু সালামা আমাকে জানিয়েছেন: একদিন জিবরাঈল রাসূল (সা.) এর কাছে এলেন এবং তুমি (ইমাম হোসেইন) আমার সাথে ছিলে। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ বললেন ,
“ আমার সন্তানকে ছেড়ে দাও।” এ কথা শুনে আমি তোমাকে ছেড়ে দিলাম এবং রাসূলুল্লাহ তোমাকে তার কোলে বসালেন। জিবরাঈল তাকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ আপনি কি এ বাচ্চাকে ভালোবাসেন ? রাসূলুল্লাহ হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন। তখন জিবরাঈল বললেন ,“ আপনার উম্মত তাকে হত্যা করবে এবং যদি আপনি চান আমি আপনাকে ঐ জায়গার মাটি দেখাবো যেখানে তাকে শহীদ করা হবে।” রাসূলুল্লাহ সে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তখন জিবরাঈল তার পাখা কারবালার দিকে প্রসারিত করলেন এবং রাসূলুল্লাহকে জায়গাটি দেখালেন।
তাই ইমাম হোসেইন (আ.) কে যখন বলা হলো জায়গাটির নাম কারবালা তখন তিনি মাটি শুঁকলেন এবং বললেন ,“ এ হলো সেই জায়গা যার কথা জিবরাঈল রাসূলুল্লাহকে জানিয়েছিলেন এবং আমাকে এখানে হত্যা করা হবে।”
এরপর শা’ বি থেকে সিবতে ইবেন জাওযি বর্ণনা করেন যে , যখন ইমাম আলী (আ.) সিফফীনের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি নাইনাওয়ার সামনে উপস্থিত হলেন , যা ছিলো ফোরাত নদীর কাছে একটি গ্রাম। ইমাম সেখানে থামলেন এবং তার সাথীদের মধ্যে যারা অযুর পানি দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন তাদের বললেন ,“ আমাকে এ জায়গাটির নাম বলো।” তারা বললো যে , এটি হলো কারবালা। একথা শুনে তিনি খুব কাঁদলেন এবং তার চোখের পানিতে মাটি ভিজে গেলো , তিনি বললেন , একদিন আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে গেলাম যখন তিনি কাঁদছিলেন , আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি কেন কাঁদছেন।
তিনি বললেন ,“ এ মুহূর্তে জিবরাঈল আমার কাছে এসেছিলো এবং আমাকে জানালো আমার সন্তান হোসেইনকে হত্যা করা হবে কারবালা নামের এক জায়গায় যা ফোরাত নদীর কাছে। এরপর জিবরাঈল এক মুঠো মাটি তুললেন এবং তা আমাকে দিলেন ; আমি তা শুঁকলাম , আর তাই আমি অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না।”
এছাড়া‘ বিহারুল আনওয়ার’ -এ খারায়েজ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম মুহাম্মদ আল বাক্বির (আ.) বলেছেন যে , একদিন ইমাম আলী (আ.) তার সঙ্গীদের সাথে নিয়ে কারবালা থেকে এক বা দুই মাইল দূরে গেলেন। এরপর তিনি আরও এগিয়ে গেলেন এবং মাক্বদাফান নামে এক জায়গায় পৌঁছলেন এবং সেখানে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। এরপর বললেন ,
“ দুশ’ নবী ও নবীদের সন্তানদেরকে এখানে শহীদ করা হয়েছে এবং এটি থামার জায়গা , বিরাট প্রশান্তিলাভকারী শহীদদের শহীদ হওয়ার জায়গা , যা প্রাচীন লোকেরা অর্জন করতে পারে নি এবং তাদের পরে যারা আসবে তারাও তাতে পৌঁছতে পারবে না।”
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে আছে] যখন ইমাম হোসেইন (আ.) সে জায়গায় পৌঁছলেন , তিনি জায়গাটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। লোকজন উত্তরে বললো তা কারবালা। ইমাম বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমি আপনার আশ্রয় চাই কারব (দুঃখ) এবং বালা (মুসিবত) থেকে।”
এরপর তিনি বললেন ,“ এখানে দুঃখ ও মুসিবত বাস করে , তাই এখানে নামো এবং এটি আমাদের থামার জায়গা। এখানে আমাদের রক্ত ঝরানো হবে এবং এখানে আমাদের কবর দেয়া হবে। আমার নানা , আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে এ বিষয়ে আগেই বলেছেন।”
সবাই তার আদেশ মানলেন এবং ঘোড়া থেকে নামলেন এবং আল হুরও তার সাথীদের নিয়ে অন্য এক জায়গায় তাঁবু গাড়লেন।
[‘ কাশফুল গুম্মাহ’ গ্রন্থে আছে] সবাই তার আদেশ মানলো এবং ঘোড়া থেকে নেমে তাদের জিনিসপত্র নামালো। আর আল হুর তার সৈন্যদলকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর উল্টো দিকে ঘোড়া থেকে নামালেন। এরপর আল হুর উবায়দুল্লাহকে চিঠি লিখলেন এ কথা জানিয়ে যে ইমাম হোসেইন (আ.) কারবালাতে থেমেছেন।
‘ মুরুজুয যাহাব’ -এ উল্লেখ করা হয়েছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) কারবালার দিকে অগ্রসর হলেন পাঁচ শত ঘোড়সওয়ার এবং আরও একশত পদাতিক বাহিনী নিয়ে যারা ছিলেন তার পরিবার ও সাথীদের অন্তর্ভুক্ত।
‘ মানাক্বিব’ থেকে‘ বিহারুল আনওয়ার’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে , যুহাইর বিন ক্বাইন বললেন ,“ আমাদেরকে সাথে নিয়ে যান যেন ফোরাত নদীর তীরে কারবালায় আমরা থামতে পারি এবং আমরা সেখানে তাঁবু ফেলবো। তখন যদি তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে , আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো এবং আল্লাহর সাহায্য চাইবো।” ইমামের চোখ থেকে অশ্রুগড়িয়ে পড়লো এবং তিনি বললেন ,
“ হে আল্লাহ , আমি আপনার কাছে কারব (দুঃখ) ও বালা (মুসিবত) থেকে আশ্রয় চাই।”
ইমাম সেখানে থামলেন এবং আল হুরও এক হাজার সৈন্যসহ তার মুখোমুখি হয়ে ঘোড়া থেকে নামলেন। তখন ইমাম কাগজ ও কলম আনার জন্য আদেশ করলেন এবং কুফার ভদ্র সর্দারদের কাছে একটি চিঠি লিখলেন ,
“ হোসেইন বিন আলী থেকে , সুলাইমান বিন সুরাদ , মুসাইয়্যাব বিন নাজাবাহ , রুফা’ আহ বিন শাদ্দাদ , আব্দুল্লাহ বিন ওয়া’ আল এবং বিশ্বাসীদের দলের প্রতি। আম্মা বা’ আদ , তোমরা ভালো করেই জানো যে , রাসূলুল্লাহ (সা.) বেঁচে থাকতে বলেছিলেন যে , যদি কোন ব্যক্তি দেখতে পায় শাসক নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী (শেষ পর্যন্ত)।” যা আগে তার খোতবাতে উল্লেখ করা হয়েছে তার নিজের সাথী ও আল হুরের সাথীদের উপস্থিতির আলোচনায়। এর পর তিনি কাগজটি ভাঁজ করলেন এবং তার ওপরে নিজের সীল এঁটে দিলেন এবং তা ক্বায়েস বিন মুসাহ্হার সাইদাউইকে দিলেন ( শেষ পর্যন্ত) , যা ইতোমধ্যেই বর্ণনা করা হয়েছে।
যখন তিনি ক্বায়েসের শাহাদাতের সংবাদ পেলেন তাঁর চোখ থেকে অশ্রুঝরে পড়লো এবং তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমাকে এবং আমার শিয়াদের (অনুসারীদের) জন্য আপনার কাছে সুউচ্চ মর্যাদা দিন এবং আমাদের জড়ো করুন আপনার রহমতের বিশ্রামস্থলে , কারণ আপনি সব কিছুর উপর শক্তি রাখেন।”
তখন তার শিয়াদের (অনুসারীদের) মধ্য থেকে হিলাল বিন নাফে’ বাজালি লাফ দিয়ে সামনে এগুলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আপনার নানা রাসূলুল্লাহ (সা.) সব মানুষের অন্তরে তার ভালোবাসা জোর করে প্রবেশ করাতে পারেন নি , না তিনি পেরেছিলেন তার আদেশের অনুগত করতে ; কারণ তাদের মাঝে ছিলো মুনাফিক্বরা , যারা বলতো তারা তাকে সাহায্য করবে কিন্তু তারা তাদের অন্তরে চেয়েছিলো তাকে ধোঁকা দিতে। তার সামনে তাদের মনোভাব ছিলো মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং তার পিছনে মাকাল ফলের চাইতে তিতা , ঐ সময় পর্যন্ত যখন আল্লাহ তার নবীকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন। আর আপনার বাবা ছিলেন তার মতই। একদল একত্র হলো তাকে সাহায্য করার জন্য কিন্তু তাকে যুদ্ধ করতে হলো নাকেসীন , অত্যাচারী ক্বাসেতীন এবং বিকৃত মন মারেক্বীনদের বিরুদ্ধে। এরপর ইমাম আলী (আ.) এর সমাপ্তি এলো এবং তিনি বেহেশতের প্রশান্তির দিকে চলে গেলেন। আর আজ এখন যারা আমাদের সাথে আছে তারাও সেদিনের লোকদের মতই এবং লোকজন তাদের অঙ্গীকার ও আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করে আর কারও ক্ষতি করে নি , শুধু নিজেদেরই ক্ষতি করেছে এবং আল্লাহ আমাদেরকে তাদের কাছে অমুখাপেক্ষী করেছেন। আপনি সহনশীলতা ও হিতাকাঙ্ক্ষার সাথে যেখানে ইচ্ছা আমাদের নিয়ে যান - তা পূর্ব অথবা পশ্চিমে হোক। আল্লাহর শপথ , আমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে ভয় করি না , না আমরা তার সাথে মোলাকাত অপছন্দ করি। আমরা দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির সাথে সুযোগ গ্রহণ করবো এবং আপনার বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব করবো এবং আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে শত্রুতা রাখবো।”
তখন বুরাইর বিন খুযাইর হামাদানি উঠলেন এবং বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , হে আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সন্তান , আল্লাহ আপনার মাধ্যমে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন যেন আমরা আপনার সামনে টুকরো টুকরো হতে পারি এবং কিয়ামতের দিন আপনার নানা আমাদের জন্য সুপারিশ করেন। যারা তাদের নিজেদের নবীর নাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তারা মুক্তি পাবে না। ধিক তাদের ওপর , তারা সামনে কিয়ামতে যা দেখবে সে জন্য এবং তারা সেখানে গোঙাবে এবং আর্ত চিৎকার করবে জাহান্নামে।”
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) তার সন্তানদের , ভাইদের ও আত্মীয়দেরকে নিজের চারদিকে জড়ো করলেন এবং কিছু সময়ের জন্য কাঁদলেন ও বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমরা আপনার রাসূলের বংশধর। লোকজন আমাদেরকে আমাদের বাড়িঘর থেকে টেনে বের করেছে এবং আমাদেরকে তাড়া করেছে এবং আমাদেরকে আমাদের নানার জায়গা (মদীনা) থেকে চাপ প্রয়োগ করে বের করে দিয়েছে। বনি উমাইয়া আমাদের উপর অত্যাচার করেছে। হে আল্লাহ , আমাদের অধিকারকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিন এবং এ অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।”
এরপর তিনি সেখান থেকে অগ্রসর হলেন এবং বুধবার অথবা মঙ্গলবার ৬১ হিজরির ২রা মহররমের দিন কারবালায় প্রবেশ করলেন। এরপর তিনি তার সাথীদের দিকে ফিরে বললেন ,“ লোকজন পৃথিবীর দাস এবং ধর্ম শুধু তাদের মুখের কথা এবং তারা এর যত্ন নিবে যতক্ষণ তা তাদের জন্য আনন্দদায়ক এবং যখন পরীক্ষার উত্তপ্ত পাত্র এসে যায় তখন থাকে শুধু গুটিকয়েক ধার্মিক ব্যক্তি।”
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ এটি কি কারবালা ?”
লোকজন উত্তর দিলো , হ্যাঁ। তিনি বললেন ,“ এ জায়গা হলো দুঃখ ও মুসিবতের জায়গা এবং এ জায়গা আমাদের উটগুলোর বিশ্রামস্থান , আমাদের থামার জায়গা , আমাদের শাহাদাতের জায়গা , যেখানে আমাদের রক্ত ঝরানো হবে।”
তখন তারা সেখানে ঘোড়া থেকে নামলেন এবং আল হুর এক হাজার সৈন্যের সাথে ঘোড়া থেকে নামলেন মুখোমুখি হয়ে। এরপর তিনি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে লিখলেন যে , হোসেইন কারবালায় শিবির গেড়েছে।
ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের চিঠি
“ আম্মা বা’ আদ , হে হোসেইন , আমাকে জানানো হয়েছে যে , তুমি কারবালায় থেমেছো। ইয়াযীদ আমাকে লিখেছে , আমি যেন বিছানায় মাথা না রাখি এবং সন্তুষ্ট না হই যতক্ষণ না আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে পাঠাচ্ছি অথবা তুমি আমার কাছে এবং ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়ার কাছে আত্মসমর্পণ কর। সালাম।”
যখন এ চিঠি ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পৌঁছলো , তিনি তা পড়লেন এবং তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন ,“ যে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি খোঁজে সে কখনই সফলতা লাভ করে না।”
দূত তাকে চিঠির উত্তর দিতে বললে ইমাম বললেন ,“ তার জন্য কোন উত্তর নেই , আছে গযব (আল্লাহর)।”
যখন দূত উবায়দুল্লাহর কাছে পৌঁছলো এবং ইমামের বাণী তার কাছে পৌঁছে দিলো সে ক্রোধান্বিত হলো এবং উমর বিন সা’ আদের দিকে তাকালো এবং তাকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য নিয়োগ দিলো। এর আগে উবায়দুল্লাহ রেই শহরের শাসনভার উমর বিন সা’ আদকে দান করেছিলো। যখন উমর অপারগতা প্রকাশ করলো উবায়দুল্লাহ তাকে সে পদ ফেরত দিতে বললো যা তাকে দান করা হয়েছিলো। উমর কিছুটা সময় চেয়ে নিলো এবং এরপর তার কাছ থেকে শাসনভার কেড়ে নেয়া হবে এ ভয়ে রাজী হলো।
লেখক বলেছেন যে এটি (যুদ্ধ করতে উমর বিন সা’ আদের অপারগতা প্রকাশ) আমার কাছে সত্য বলে মনে হয় না। নির্ভরযোগ্য জীবনী লেখকগণ এবং ঐতিহাসিকরা একমত যে উমর বিন সা’ আদ কারবালায় পৌঁছায় ইমাম হোসেইন (আ.) সেখানে প্রবেশের একদিন পর এবং তা ছিলো মহররমের তিন তারিখ (তাই তা প্রমাণ করে যে সে তার জন্য শুরু থেকেই প্রস্তুত ছিলো)।
শেইখ মুফীদ , ইবনে আসীর এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে , উমর বিন সা’ আদ বিন আবি ওয়াক্কাস পর দিন চার হাজার ঘোড়সওয়ার সৈন্য নিয়ে কুফা ত্যাগ করে কারবালার দিকে রওনা দিলো। ইবনে আসীর বলেন যে , উমর বিন সা’ আদের কারবালায় যাওয়ার কারণ হলো যে , উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ আগে তাকে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলো‘ দাশতি’ -তে ,সুসজ্জিত চার হাজার সৈন্য দিয়ে। কারণ দাইলামের লোকেরা এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলো এবং দ্বিতীয়ত উবায়দুল্লাহ তাকে রেই শহরের দায়িত্ব দিয়েছিলো। উমর বিন সা’ আদ হাম্মামুল আ’ য়ানে তাঁবু গেড়েছিলো। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিষয়টি এ পর্যায়ে পৌঁছলো , উবায়দুল্লাহ উমর বিন সা’ আদকে ডাকলো এবং বললো ,“ যাও , হোসেইনের মোকাবিলা করো এবং কাজ শেষ করে তোমার অবস্থানে ফিরে যাও।” উমর বিন সা’ আদ নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলো , তখন উবায়দুল্লাহ বললো ,“ ঠিক আছে , তাহলে তুমি তা ফেরত দাও যা তোমাকে দেয়া হয়েছে।” যখন উবায়দুল্লাহ এরকম বললো তখন উমর জবাব দিলো ,“ আজকের দিনটি আমাকে সময় দিন যেন আমি একটি সিদ্ধান্তনিতে পারি।” এ কথা বলে সে স্থান ত্যাগ করলো এবং হিতাকাঙ্ক্ষীদের কাছে মতামত চাইলো। তাদের সকলে তাকে তা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দিলো। তার ভাগ্নে হামযা বিন মুগীরা বিন শা’ বাহ তার কাছে এলো ও বললো ,“ আমি আপনাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি হোসেইনকে মোকাবিলা না করার জন্য , কারণ তা করলে আপনি গুনাহ করবেন এবং তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। আল্লাহর শপথ , যদি আপনাকে পৃথিবী , এর সম্পদ ও পৃথিবীর উপর রাজত্ব ছাড়তে হয় , তাহলেও এটি আপনার জন্য উত্তম তার চাইতে যে , আপনি আল্লাহর কাছে যাবেন আর হোসেইনের রক্ত আপনার ঘাড়ে থাকবে।”
উমর বললো সে তা করবে না এবং সারারাত ভেবে কাটালো এই বলে ,“ আমি কি রেই-এর শাসনভার প্রত্যাখ্যান করতে পারি , অথচ তা আমার স্বপ্ন , নাকি ফেরত আসবো হোসেইনের হত্যায় অভিযুক্ত হয়ে ? যদি আমি তাকে হত্যা করি আমি জাহান্নামে চলে যাবো , যেখান থেকে পালানোর কোন পথ নেই অথচ রেই-এর শাসনভার আমার চোখের জ্যোতি।”
এরপর সে উবায়দুল্লাহর কাছে ফিরে গেলো এবং বললো ,“ আপনি আমাকে এ কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সব মানুষ তা শুনেছে। যদি আপনি চান আপনি আমাকে এ কাজে পাঠাতে পারেন অথবা কুফার সম্মানিতদের মাঝে থেকে অন্য কাউকে হোসেইনের বিরুদ্ধে পাঠাতে পারেন , যে আমার চাইতে যোগ্য হবে।” এরপর সে তাদের কারো কারো নাম উল্লেখ করলো। উবায়দুল্লাহ বললো ,“ যদি আমাকে অন্য কাউকে পাঠাতে হয় তাহলে আমি তোমার মতামত জিজ্ঞেস করবো না। তাই এখন যদি তুমি কারবালায় যেতে প্রস্তুত থাকো আমাদের সৈন্যদলের উপর আদেশের দায়িত্ব নিয়ে , তাহলে যাও অথবা যে পদ তোমাকে দেয়া হয়েছে তা ফেরত দাও।” এ কথা শুনে উমর বললো ,“ আমি নিজেই যাবো।” এ কথা বলে সে রওনা দিলো এবং শেষ পর্যন্ত ইমাম হোসেইন (আ.) এর উল্টোদিকে তাঁবু ফেললো।
লেখক বলছেন যে , ইমাম আলী (আ.) যে ভবিষ্যদ্বাণী বাণী করেছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছিলো। সিবতে ইবনে জাওযি তার‘ তাযকিরাহ’ তে বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম আলী (আ.) এর মর্যাদা এখানে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। একদিন তিনি উমর বিন সা’ আদের সাক্ষাত পান , যখন সে বালক ছিলো , এবং বললেন ,“ হে সাদের সন্তান , আক্ষেপ তোমার জন্য , তখন তোমার অবস্থা কেমন হবে যেদিন তুমি বেহেশত ও দোযখের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকবে এবং তুমি দোযখ পছন্দ করবে ?” যখন উমর কারবালায় পৌঁছলো সে নাইনাওয়াতে থামলো।
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] যখন উমর বিন সা’ আদ কারবালায় পৌঁছলো , সে উরওয়াহ বিন ক্বায়েস আহমাসিকে ডাকলো এবং বললো ,“ হোসেইনের কাছে যাও এবং জিজ্ঞেস করো কেন সে এখানে এসেছে এবং সে কী চায়।” সে বললো , সে যেতে লজ্জাবোধ করছে , কারণ সে ছিলো তাদের একজন যারা তাকে আসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এরপর উমর একই বিষয়ে তার সৈন্যদলের যাকেই বললো সে অপারগতা প্রকাশ করলো। কারণ তারা ছিলো তাদের অন্তুর্ভুক্ত যারা ইমামকে চিঠি লিখেছিলো। তখন কাসীর বিন আব্দুল্লাহ শা’ বি , যে ছিলো একজন সাহসী ব্যক্তি এবং যে কোন কাজ থেকে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতো না , উঠে দাঁড়ালো এবং বললো ,“ আমি যাবো এবং আপনি যদি চান আমি তাকে হত্যা করবো।” উমর বললো ,“ আমি তাকে হত্যা করতে চাই না , তার কাছে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো কেন সে এখানে এসেছে।” কাসীর গেলো এবং আবু সামামাহ সায়েদি তাকে দেখলেন এবং বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আল্লাহ আপনাকে বন্ধুত্ব দিন , এক ব্যক্তি আপনার দিকে আসছে যে এথিপ বীর বাসিন্দাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম এবং যে সবচেয়ে উদ্ধত এবং যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী রক্ত ঝরিয়েছে।” এরপর আবু সামামাহ নিজে উঠে দাঁড়ালেন এবং তার কাছে গেলেন এবং তাকে বললেন তার তরবারি নামিয়ে রাখতে। সে তা করতে অস্বীকার করলো এবং বললো ,“ আমি শুধু একজন দূত , যদি চাও আমি তা তোমার কাছে বলবো অথবা ফিরে যাবো।” আবু সামামাহ বললেন ,“ সে ক্ষেত্রে আমি আমার হাত রাখবো তোমার তরবারির হাতলের উপর এরপর তুমি তোমার সংবাদ পৌঁছাতে পারো।” সে বললো ,“ না , আমি তোমার হাতকে সেখানে পৌঁছতে দিবো না।” আবু সামামাহ বললেন ,“ তাহলে তুমি তোমার সংবাদ আমার কাছে বলো আমি তা হোসেইনের কাছে পৌঁছে দিবো। কিন্তু আমি তোমাকে তার কাছে যেতে দিবো না , কারণ তুমি একজন বদমাশ ব্যক্তি।” তারপর তারা পরস্পরকে গালিগালাজ করতে লাগলো , যতক্ষণ না উমর বিন সা’ দের কাছে কাসীর ফেরত গেলো এবং তাকে সব জানালো।
উমর কুররাহ বিন ক্বায়েস হানযালিকে ডাকলো এবং বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , হোসেইনের কাছে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো কেন সে এখানে এসেছে এবং সে কী চায়।”
যখন ইমাম (আ.) কুররাহকে দেখলেন , তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ কেউ কি এ লোককে চেনে ?” হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ হ্যাঁ , সে তামীমের হানযালা উপগোত্রের এবং সে আমাদের বোনের ছেলে , আমি তাকে বিশ্বাসী হিসেবে জানতাম এবং কখনো ভাবিনি সে এখানে এভাবে আসবে।” কুররাহ এসে ইমামকে সালাম জানালো এবং উমরের সংবাদ পৌঁছে দিলো। ইমাম উত্তর দিলেন ,“ তোমাদের শহরের লোকেরা আমাকে চিঠি লিখেছে এবং আমাকে এখানে আসার জন্য অনুরোধ করেছে , কিন্তু যদি তোমরা আমার উপস্থিতিকে ঘৃণা করো তাহলে আমি ফিরে যাবো।”
তখন হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ হে কুররাহ , আক্ষেপ তোমার জন্য , তুমি কি অত্যাচারীদের কাছে ফেরত যাচ্ছো ? এ মানুষটিকে সাহায্য করো যার পিতৃপুরুষদের কারণে আল্লাহ তোমাকে দয়া করবেন।” কুররাহ বললো ,“ আমি ফিরে যাবো এবং ইমামের সংবাদ উমরের কাছে পৌঁছে দিবো এবং এ বিষয়ে চিন্তা করবো।” সে ফিরে গেলো এবং উমরের কাছে পৌঁছে দিলো যা ইমাম তাকে বলেছেন। তখন উমর বললো ,“ আমি আশা করি আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবেন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে।”
এরপর সে উবায়দুল্লাহর কাছে লিখলো ,“ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম , আম্মা বা’ আদ , যখন আমি আমার গন্তব্যে পৌঁছেছি , আমি হোসেইনের কাছে একজন দূত পাঠালাম তাকে জিজ্ঞেস করে কেন সে এখানে এসেছে এবং সে কী চায়। সে উত্তর দিয়েছে যে , এ শহরের লোকেরা তাকে চিঠি লিখেছে এবং তার কাছে দূত পাঠিয়েছে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে। তাই সে এখানে এসেছে। সে বলছে যে: যদি এ লোকেরা আমার উপস্থিতি পছন্দ না করে এবং তাদের কথার বিপরীত দিকে চলে গিয়ে থাকে , যা আমার কাছে তাদের দূত মারফত জানানো হয়েছিলো তাহলে আমি ফিরে চলে যাবো।” হাসান বিন আয়েয আসাবি বলেছে যে , আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম যখন উমরের চিঠি উবায়দুল্লাহর কাছে পৌঁছে। উবায়দুল্লাহ যখন এ চিঠি পড়লো সে বললো ,“ যখন সে আমাদের থাবার ভিতর আটকা পড়েছে সে পালাবার আশা করছে। এখন পালানোর পথ নেই।”
এরপর সে উমর বিন সা’ আদের কাছে চিঠি লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , আমি তোমার চিঠি পেয়েছি এবং তুমি সেখানে যা লিখেছো তা বুঝতে পেরেছি। হোসেইন ও তার সাথীদের কাছে একটি প্রস্তাব দাও যে তারা ইয়াযীদের প্রতি বাইয়াত হোক। যদি সে তা করে আমরা দেখবো কী করা যায়। সালাম।” যখন উমর চিঠি পেলো সে বললো ,“ আমি শঙ্কায় ছিলাম যে উবায়দুল্লাহ ন্যায়বিচার করবে না।”
মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব বলেন যে , উমর বিন সা’ আদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের এ প্রস্তাব ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে পৌঁছায় নি , কারণ সে জানতো যে ইমাম কখনোই ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হবেন না , এরপর উবায়দুল্লাহ সবরুপষকেফকার বড় মসজিদে জমায়েত হতে আদেশ দিলো। তারপর সে বেরিয়ে এসে মিম্বরে উঠলো এবং বললো ,“ হে জনগণ , তোমরা আবু সুফিয়ানের পরিবারকে ভালোভাবেই পরীক্ষা করেছো এবং তোমরা তাদেরকে যেমন চেয়েছো তেমন পেয়েছো ; এ হলো বিশ্বাসীদের আমির ইয়াযীদ। যার আচার-ব্যবহার সুন্দর , যার চেহারা ভালো এবং তার প্রজাদের প্রতি দয়ালু। সে প্রত্যেকের অধিকার দেয় এবং তার রাজ্যে রাস্তাগুলো নিরাপদ। তার পিতা মুয়াবিয়াও তার সময় একই রকম ছিলো। তার পরে তার সন্তান ইয়াযীদও আল্লাহর বান্দাহদের সম্মান করেন এবং তাদেরকে সম্পদ দিয়ে ধনী করেন এবং তাদের মর্যাদা দেন। তিনি তোমাদের অধিকারকে একশ গুণ বৃদ্ধি করেছেন এবং আমাকে আদেশ করেছেন তা আরও বৃদ্ধি করতে এবং তোমাদেরকে প্রস্তুত করতে তার শত্রু হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। তাই তার কথা শোন এবং তার আদেশ পালন করো।” এ কথা বলে সে মিম্বর থেকে নেমে গেলো এবং লোকজনের মাঝে প্রচুর উপহার বিতরণ করলো এবং তাদেরকে হোসেইনের বিরুদ্ধে উমর বিন সা’ আদকে সাহায্য করতে পাঠালো।
[‘ মানাক্বিব’ গ্রন্থে আছে] উবায়দুল্লাহ কারবালাতে সৈন্য পাঠাতে থাকলো যতক্ষণ না উমর বিন সা’ আদের সাথে বিশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য [মালহুফ] জমায়েত হলো মহররমের ছয় তারিখ পর্যন্ত। [তাসলীয়াতুল মাজালিস অনুযায়ী] এরপর উবায়দুল্লাহ একজনকে পাঠালো শাবাস বিন রাব’ ঈর কাছে এ কথা বলে ,“ আমার কাছে আসো যেন আমি তোমাকে হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠাতে পারি।” সে অসুস্থ থাকার ভান করলো এবং নিজেকে সরিয়ে নিলো। উবায়দুল্লাহ তাকে একটি চিঠি পাঠালো এ বলে ,“ আম্মা বা’ আদ , আমার দূত আমাকে জানিয়েছে যে তুমি অসুস্থতার ভান করছো এবং আমি শঙ্কিত যে তুমি না জানি তাদের একজন যারা
) وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُون(
‘ যখন তারা বিশ্বাসীদের সাথে মিলিত হয় তারা বলে: আমরা বিশ্বাস করি ; কিন্তু যখন তারা তাদের শয়তানদের কাছে ফেরত যায় , তারা বলে , নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সাথে আছি , আমরা শুধু মশকরা করছিলাম।’ [সূরা বাকারা: ১৪]
যদি তুমি আমাদের আনুগত্যে দৃঢ় থাকো , আমাদের কাছে দ্রুত আসো।”
শাবাস ইশার নামাযের পর এলো যেন উবায়দুল্লাহ তার চেহারা না দেখতে পারে যা অসুস্থতা মুক্ত ছিলো। যখন শাবাস এলো উবায়দুল্লাহ তাকে স্বাগত জানালো এবং তাকে তার কাছে বসালো এবং বললো ,“ আমি চাই যে তুমি সে লোকটির (হোসেইনের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাও এবং উমর বিন সা’ আদকে সাহায্য করো।” শাবাস বললো যে , সে তা অবশ্যই করবে [মানক্বিব] । সে তাকে এক হাজার অশ্বারোহী দিয়ে পাঠালো।
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে , তাবারি উল্লেখ করেন] এরপর উবায়দুল্লাহ উমর বিন সা’ আদকে লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , হোসেইন ও তার সাথীদেরকে পানি পানে বাধা দাও। তারা এক ফোঁটা পানিও যেন না পায় যেভাবে (খলিফা) উসমান বিন আফফানের সাথে আচরণ করা হয়েছিলো।”
উমর বিন সা’ আদ সাথে সাথে আমর বিন হাজ্জাজকে পাঁচ শত অশ্বারোহী দিয়ে ফোরাত নদীর তীরে পাঠালো এবং ইমাম ও তার সাথীদের পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিলো। তারা তাদেরকে এক ফোঁটা পানি নিতে দিলো না এবং তা ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের তিন দিন আগে থেকে (সাত মহররম) ।
[তাবারির গ্রন্থে উল্লেখ আছে] উবায়দুল্লাহ বিন হাসীন আযদি ছিলো বাজিলা গোত্রের (সৈন্যদলের) অন্তর্ভুক্ত , সে উচ্চ কণ্ঠে বললো , [ইরশাদ]“ হে হোসেইন , তুমি কি পানিকে বেহেশতের নহরের মত দেখতে পাও ? আল্লাহর শপথ , তুমি এর এক ফোঁটাও স্বাদ নিতে পারবে না যতক্ষণ না তৃষ্ণায় মৃত্যুবরণ কর।”
ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তর দিলেন ,“ হে আল্লাহ , তাকে তৃষ্ণায় মৃত্যু দাও এবং তাকে কখনো ক্ষমা করো না।”
হামিদ বিন মুসলিম বলেছে যে ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তাকে তার অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গিয়েছিলাম। আল্লাহর শপথ যিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই , আমি তাকে পানি পান করতে দেখলাম তার কণ্ঠনালী পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত এরপর সে তা বমি করে ফেললো। তখন সে চিৎকার করে বললো: পিপাসা , পিপাসা , এবং পানি পান করলো তার কণ্ঠনালী পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত এবং সে তৃপ্ত হলো না , সে এ অবস্থায় রইলো মৃত্যু পর্যন্ত (তার উপর আল্লাহর অভিশাপ) ।”
পরিচ্ছেদ - ১৫
কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.)
‘ বিহারুল আনওয়ার’ -এ লেখা হয়েছে যে , উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ (কারবালায়) উমর বিন সা’ আদের কাছে সৈন্য পাঠাতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্তনা অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈান্যর সংখ্যা ত্রিশ হাজারে পৌঁছায়। এরপর উবায়দুল্লাহ উমরের কাছে লিখে পাঠায় ,“ আমি তোমার জন্য সৈন্যদল (এর সংখ্যা) সম্পর্কে কোন অজুহাতের সুযোগ রাখি নি। তাই আমাকে তোমাদের বিষয়ে সংবাদ জানানোর কথা মনে রেখো , প্রত্যেক সকালে ও বিকালে।” উবায়দুল্লাহ যুদ্ধের জন্য উমরকে উস্কাতে শুরু করে ছয় মহররম থেকে।
হাবীব বিন মুযাহির ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলেন এবং তাকে বললেন ,“ হে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সন্তান , বনি আসাদের একটি শাখা গোত্র কাছেই আছে। যদি আপনি অনুমতি দেন , আমি তাদের কাছে যাবো এবং আপনাকে সাহায্য করার জন্য তাদেরকে আহ্বান জানাবো ; সম্ভবত আল্লাহ তাদের মাধ্যমে আপনাকে রক্ষা করবেন।” ইমাম তাকে অনুমতি দিলেন এবং হাবীব রাতের অন্ধকারে , ছদ্মবেশ নিয়ে তাদের দিকে গেলেন। তারা তাকে চিনতে পারলো এবং তার কাছে জানতে চাইলো তিনি কী চান। হাবীব বললেন ,“ আমি তোমাদের কাছে শ্রেষ্ঠ উপহার নিয়ে এসেছি। আমি তোমাদের কাছে এসেছি তোমাদেরকে আহ্বান জানাতে রাসূলের নাতিকে সাহায্য করার জন্য। তিনি এখানেই আছেন একদল বিশ্বাসীকে সাথে নিয়ে। তাদের প্রত্যেকে এক হাজার লোকের চাইতে উত্তম এবং তারা তাকে পরিত্যাগ করবে না , বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না এবং তাকে তুলে দিবে না (শত্রুর হাতে) । উমর বিন সা’ আদ তাদেরকে ঘেরাও করে আছে , তোমরা আমার গোত্রের লোক , তাই আমি তোমাদেরকে যুদ্ধের দিকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আজ আমার কথা শোন এবং তাকে সাহায্য করো , যেন পৃথিবীতে ও আখেরাতে সম্মান লাভ করতে পারো। আমি আল্লাহ শপথ করে বলছি , তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহর পথে শহীদ হবে রাসূলুল্লাহর নাতির সাথে থেকে , সে মুহাম্মাদ (সা.) এর বন্ধুদের মাঝে উচ্চ মাক্বাম অর্জন করবে।” এ কথা শুনে তাদের মাঝে উবায়দুল্লাহ বিন বাশীর নামে এক লোক উঠে দাড়ালো এবং বললো ,“ আমি সর্বপ্রথম এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করছি।” এরপর সে এ কবিতাটি আবৃত্তি করলো ,“ জাতি জানে অশ্বারোহীরা প্রস্তুত যুদ্ধের জন্য। আমি একজন যোদ্ধা , সাহসী , বনের সিংহের মত।” তখন গোত্রের লোকেরা জড়ো হলো এবং নব্বই জন প্রস্তুত হলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করতে যাওয়ার জন্য।
সে মুহূর্তে তাদের মাঝে একজন লোক উমর বিন সা’ আদকে গিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালো এবং সে ইবনে আযরাক্বকে পাঠালো বনি আসাদের দিকে চারশ অশ্বারোহী সৈন্য দিয়ে। যখন তারা (বনি আসাদ সাহায্য করার জন্য) ইমাম হোসেইন (আ.) এর সৈন্যদলের দিকে আসছিলো তখন উমর বিন সা’ আদ তাদেরকে ফোরাত নদীর তীরে থামিয়ে দিলো। তাদের মধ্যে তর্ক শুরুহলো এবং তা ভয়ানক এক যুদ্ধে পরিণত হলো। হাবীব বিন মুযাহির আযরাক্বকে উচ্চ কণ্ঠে ডেকে বললেন ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , আমাদের উপর থেকে হাত সরাও।” কিন্তু আযরাক্ব তা করতে অস্বীকৃতি জানালো। যখন বনি আসাদ উপলব্ধি করলো যে তারা তাদের প্রতিরোধ করতে অক্ষম , তখন তারা তাদের গোত্রের দিকে ফিরে গেলো। সে রাতে তারা তাদের স্থান ত্যাগ করলো উমর বিন সা’ আদের ভয়ে। হাবীব ইমাম (আ.) এর কাছে ফিরে এলেন এবং তাকে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানালেন এবং ইমাম বললেন ,“ কোন শক্তি ও ক্ষমতা নেই আল্লাহর সাথে ছাড়া যিনি সর্বোচ্চ সবচেয়ে বড়।”
উমর বিন সা’ আদের লোকেরা পিছনে সরে এলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীদের জন্য পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিলো। এতে প্রচণ্ড পিপাসা তাদেরকে কষ্ট দিচ্ছিলো। ইমাম একটি তীর তুলে নিলেন এবং নারীদের তাঁবুর পিছনে চলে গেলেন এবং পশ্চিম দিকে নয় কদম মেপে মাটি খুঁড়তে লাগলেন। মিষ্টি পানি সেখানে বেরিয়ে এলো। যা ইমাম এবং তার সাথীরা পান করলেন এবং তাদের মশকে ভরে নিলেন , এরপর পানি অদৃশ্য হয়ে গেলো এবং আর খুঁজে পাওয়া গেলো না।
যখন এ সংবাদ উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে পৌছলো সে একজনকে উমর বিন সা’ আদের কাছে পাঠালো এ বলে ,“ আমি সংবাদ পেয়েছি হোসেইন কুয়া খুঁড়ছে এবং তার সাথীদের নিয়ে সেখান থেকে পানি পান করছে। তাই যখন এ চিঠি তোমার কাছে পৌঁছবে , সাবধান হবে এবং যতটুকু সম্ভব তাদের কুয়া খুঁড়তে এবং পানি পান করতে বাধা দিবে। এরপর তাদেরকে কষ্ট দাও যেভাবে (খলিফা) উসমান বিন আফফানকে কষ্ট দেয়া হয়েছিলো।” যখন এ চিঠি উমর বিন সা’ আদের কাছে পৌঁছালো সে তাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো।
মুহাম্মাদ বিন তালহা এবং আলী বিন ঈসা ইরবিলি বর্ণনা করেন যে , যখন পিপাসা বৃদ্ধি পেলো , ইমামের সাথীদের মধ্য থেকে একজন ধার্মিক ব্যক্তি ইয়াযীদ বিন হাসীন হামাদানি , ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে গেলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমাকে অনুমতি দিন উমর বিন সা’ আদের কাছে যেতে এবং পানি সম্পর্কে তার সাথে কথা বলতে , সম্ভবত সে তা থেকে বিরত থাকবে।”
ইমাম একমত হলেন এবং ইয়াযীদ বিন হাসীন হামাদানি উমর বিন সা’ দের কাছে গেলেন কিন্তু তাকে সালাম জানালেন না। উমর বললো ,“ হে হামাদানের ভাই , তুমি কি আমাকে মুসলমান মনে করো না , কারণ তুমি আমাকে সালাম দাও নি ?” ইয়াযীদ বিন হাসীন বললেন ,“ তুমি যদি মুসলমানই হতে , যে রকম তুমি বলছো , তাহলে তুমি তার জন্য , তার ভাইদের জন্য , তার পরিবারের নারী সদস্য ও পরিবারের জন্য ফোরাতের পানি বন্ধ করতে না যেন তারা তৃষ্ণায় মারা যায় , যে পানি শুকর ও বন্য কুকুররা পান করে। তুমি তাদেরকে তা থেকে (পানি) নিতে দিচ্ছো না এবং এরপর দাবী কর যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে স্বীকৃতি দাও ?” উমর বিন সা’ আদ তার মাথা নিচু করলো (লজ্জায়) এবং বললো ,“ হে হামাদানের ভাই , আমি ভালো করেই জানি যে তাদের উপর অত্যাচার করা অবৈধ। কিন্তু উবায়দুল্লাহ , সমস্ত সমাজকে বাদ দিয়ে আমাকে একটি কঠিন কাজের জন্য বাছাই করেছে এবং আমি তা করার জন্য তৎক্ষণাৎ রওনা করেছি। আল্লাহর শপথ , আমি বুঝতে পারছি না এবং এক বিপজ্জনক বাঁকে আমি থেমে আছি , যা আমি পছন্দ করছি না। আমি কি রেই-এর শাসকের পদ পরিত্যাগ করবো যা আমি চাই অথবা আমি ফিরে যাবো ইমামের রক্ত আমার ঘাড়ে নিয়ে। তার হত্যা হবে (জাহান্নামের) আগুনে প্রবেশ করার একটি কারণ , যা এড়ানো যাবে না। কিন্তু রেই-এর রাজ্য আমার চোখের শীতলতা।”
আবু জাফর তাবারি এবং আবুল ফারাজ ইসফাহানি বলেন যে: যখন ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীদের পিপাসা বৃদ্ধি পেলো , তিনি তার ভাই আব্বাস বিন আলী (আ.) কে ডাকলেন এবং তাকে ত্রিশ জন অশ্বারোহী এবং বিশ জন পদাতিক সৈন্য ও বিশটি মশক দিয়ে নদীতে পাঠালেন। তারা নদীতে পৌঁছলো রাতের বেলা এবং নাফে’ বিন হিলাল বাজালি একদম সামনে ছিলেন একটি পতাকা নিয়ে। আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদি তাকে দেখলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো তিনি কে। নাফে’ তার পরিচয় প্রকাশ করলেন। এতে আমর বললো ,“ স্বাগতম হে ভাই , কেন এখানে এসেছো ?” নাফে’ বললো ,“ আমি পানি নিতে এসেছি যা তোমরা আমাদের জন্য অবরোধ করে রেখেছো।” আমর বললো ,“ যাও তৃপ্তিসহ পান করো।” নাফে’ বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি এ থেকে এক ফোঁটাও পান করবো না যতক্ষণ না ইমাম এবং তার সাথীরা পান করেন , যারা তৃষ্ণার্ত।” এ কথা শুনে আমর বিন হাজ্জাজের সাথের লোকেরা তাদের দিকে ফিরলো এবং আমর বললো ,“ কোন পথ নেই , আমাদেরকে নিয়োগই করা হয়েছে যেন আমরা তাদেরকে পানির কাছে পৌঁছতে বাঁধা দেই।” যখন নাফে’ র লোকেরা কাছাকাছি এলো , তিনি পদাতিক সৈন্যদের বললেন মশক ভরে নিতে। তারা মশকগুলো দ্রুত ভরে নিলো এবং আমর বিন হাজ্জাজ এবং তার সাথীরা তাদেরকে আক্রমণ করলো। তখন আব্বাস বিন আলী (আ.) এবং নাফে’ বিন হিলাল তাদেরকে আক্রমণ করলেন এবং তাদেরকে তাদের সারিতে ফেরত পাঠালেন। তখন তারা বললো ,“ যাও , আমরা তাদের থামিয়ে দিয়েছি।” আমর বিন হাজ্জাজ এবং তার লোকেরা ফিরে এলো এবং তাদের কিছু সংখ্যক পিছন দিকে বিতাড়িত হলো। আমরের লোকদের মধ্যে সাদা’ নামে এক ব্যক্তি নাফে’ র বর্শার আঘাতে আহত হলো। সে আঘাতকে সামান্য মনে করে এর প্রতি কোন মনোযোগ দিলো না , কিন্তু পরে তার ক্ষত বেড়ে গেলো এবং এতে সে মৃত্যুবরণ করলো। এভাবে ইমামের সাথীরা তার কাছে মশকগুলো নিয়ে গেলেন।
[তাবারীর গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) আমর বিন ক্বারতাহ আনসারীকে উমর বিন সা’ আদের কাছে বলে পাঠালেন ,“ আমার সাথে দেখা করার জন্য আজ রাতেই সৈন্যদলের মাঝখানে আসো।” উমর বিশ জন অশ্বারোহী নিয়ে এলো এবং ইমামও একই সংখ্যায় সাথী নিয়ে গেলেন। যখন তারা মুখোমুখি হলেন , ইমাম তার সাথীদের দূরে সরে যেতে বললেন এবং উমরও তার সাথীদের তাই করতে বললো। দুদলই দূরে সরে গেলো এবং তারা কথা বলতে লাগলেন পরস্পরের সাথে এবং রাতের এক অংশ পার হয়ে গেলো। এরপর তারা তাদের সৈন্যদলের কাছে ফিরে গেলেন এবং কেউ জানে না তাদের মাঝে কী আলোচনা হয়েছিলো। কিন্তু সুস্থ মস্তিস্কের লোকেরা বলে যে ইমাম উমর বিন সা’ আদকে বললেন ,“ ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আমার সাথী হও এবং তার দল ত্যাগ করো।” উমর বললো ,“ আমার বাড়ি ধ্বংস করা হবে (যদি আমি তা করি) ।” ইমাম বললেন ,“ আমি তা (আবার) তৈরী করে দিবো তোমার জন্য।”
সে বললো ,“ আমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।” ইমাম বললেন ,“ আমি তোমাকে আমার হিজাযের সম্পত্তি থেকে তার চেয়ে ভালো কিছু দিবো।” কিন্তু উমর তা নিয়ে সন্তুষ্ট হলো না। এ ধরনের সংবাদ লোকজনের ভেতর আলোচিত হতো , কিন্তু তারা কিছু শোনে নি ও জানতো না।
শেইখ মুফীদ বর্ণনা করেন যে , ইমাম একজনকে উমর বিন সা’ আদের কাছে বলে পাঠালেন যে , তিনি তার সাথে কথা বলতে চান। এরপর তারা রাতে দেখা করেন এবং পরস্পরের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন। এরপর উমর বিন সা’ আদ তার জায়গায় ফেরত এসে উবায়দুল্লাহকে লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , আল্লাহ (ঘৃণার) আগুনকে নিভিয়ে দিয়েছেন এবং জনগণকে একমতে উপস্থিত করেছেন এবং উম্মতের বিষয়গুলো ঠিক করে দিয়েছেন। হোসেইন আমার কাছে অঙ্গীকার করেছে যে , সে যে জায়গা থেকে এসেছে সে জায়গায় ফিরে যাবে অথবা কোন ইসলামী সীমান্ত শহরে চলে যাবে এবং অন্যান্য সাধারণ মুসলমানের মতই জীবন যাপন করবে। অথবা সে ইয়াযীদের কাছে যাবে এবং তার হাতে হাত রাখবে এবং তাদের ভিতর মতপার্থক্য দূর হবে এবং এ প্রস্তাব হলো তাই যা আপনি পছন্দ করেন এবং যাতে উম্মতের সোজা পথ নিহিত আছে।”
আবুল ফারাজ লিখেছেন যে , উমর একজন দূতকে এ প্রস্তাব দিয়ে উবায়দুল্লাহর কাছে পাঠালো এবং তাকে জানালো যে ,“ যদি কোন দায়লামি তা আপনার কাছে চাইতো এবং আপনি তাতে রাজী না হতেন , সেক্ষেত্রে আপনি অবিচার করতেন।”
তাবারি এবং ইবনে আসীর বর্ণনা করেন , উক্ববা বিন সাম’ আন থেকে যে , তিনি বলেছেন: আমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে মদীনা থেকে মক্কায় এলাম এবং মক্কা থেকে ইরাক এবং তার একটি খোতবাও নেই যা আমি শুনি নি , হোক তা মদীনাতে , মক্কায় অথবা ইরাকের পথে এবং তার সৈন্যদলের মাঝে , তার শাহাদাত পর্যন্ত। আল্লাহর শপথ , যে সংবাদটি মানুষের কাছে সুপরিচিত যে , ইমাম হোসেইন (আ.) সিরিয়া যেতে এবং ইয়াযীদের হাতে হাত দিতে একমত হয়েছিলেন অথবা ইসলামী সীমান্ত শহরে চলে যেতে চেয়েছিলেন , তা কখনোই তিনি বলেন নি , বরং তিনি বলেছিলেন যে ,“ আমাকে যেতে দাও যেন আমি এ প্রশস্ত পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে পারি যতক্ষণ পর্যন্তনা আমি জনগণের অবস্থা কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা দেখি।”
পরিচ্ছেদ - ১৬
শিমর বিন যিলজওশনের কারবালায় আগমন এবং নয় মহররমের রাতের ঘটনাবলী
যখন উমর বিন সা’ আদের চিঠি উবায়দুল্লাহর কাছে পৌঁছলো , সে তা পড়লো এবং বললো [‘ ইরশাদ’ ]“ এ চিঠি এমন এক মানুষ থেকে এসেছে যে সর্দারের হিতাকাঙ্ক্ষী এবং তার সম্প্রদায়ের প্রতি করুণাময়।” এ কথা শুনে শিমর বিন যিলজওশান উঠে দাঁড়ালো এবং বললো ,“ আপনি কি তার দাবীর সাথে একমত হবেন যখন সে (ইমাম হোসেইন) আপনার কাছে এসে আপনার প্রদেশে শিবির গেড়েছে ? আল্লাহর শপথ , যদি সে আপনার রাজ্য থেকে চলে যায় আপনার হাতে হাত (আত্মসমর্পণ) না দিয়ে , তাহলে সে শক্তিশালী হয়ে উঠবে , আর আপনি হয়ে যাবেন দুর্বল ও বিপর্যস্ত। সে যা বলে তার সাথে একমত হবেন না , কারণ তা পৌরুষহীনতার লক্ষণ। আদেশ করুন যেন সে তার সাথীদের নিয়ে আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর আপনি যদি তাদের শাস্তিদেন তাহলে আপনি এর যোগ্য এবং তা করার অধিকার রাখেন।”
উবায়দুল্লাহ বললো ,“ নিশ্চয়ই তোমার মতামত সঙ্গত। আমার চিঠি উমর বিন সা’ আদের কাছে নিয়ে যাও যেন সে আমার আদেশ হোসেইন ও তার সাথীদের কাছে পৌঁছে দেয় , যেন তারা আমার আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে কোন শর্ত ছাড়াই। যদি তারা একমত হয় তাহলে সে যেন তাদেরকে আমার কাছে জীবিত পাঠিয়ে দেয় এবং যদি তারা একমত না হয় সে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। যদি উমর বিন সা’ আদ তা করতে রাজী হয় , তুমি তাকে মেনে চলবে , কিন্তু যদি সে রাজী না হয় , তাহলে তুমি হবে সৈন্যদলের সর্বাধিনায়ক। এরপর তার (হোসেইনের) মাথা কেটে তা আমার কাছে পাঠিয়ে দিবে।” এরপর সে উমর বিন সা’ আদের কাছে লিখলো ,“ আম্মা বা’ আদ , আমি তোমাকে এ উদ্দেশ্যে পাঠাই নি যে , তুমি হোসেইকে রক্ষা করবে এবং তার বিষয়ে উদাসীন হবে , আর না তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়ার জন্য , না খোঁড়া যুক্তি দেয়ার জন্য এবং না তার জন্য সুপারিশ করার জন্য। এরপর দেখো , যদি হোসেইন এবং তার সাথীরা আমার আদেশের পত্রি আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও যুদ্ধ ছাড়া। যদি সে রাজী না হয় তাহলে তাকে আক্রমণ করো এবং হত্যা করো। এরপর তার প্রত্যেক অঙ্গকে বিচ্ছিন্ন করো , কারণ সে এর যোগ্য। এরপর যখন তুমি তাকে হত্যা করবে তখন ঘোড়াগুলোকে তার পিঠে ও বুকের উপর চালিয়ে দাও পায়ের নিচে পিষতে , যার যোগ্য সে এবং সে একজন অকতজ্ঞ ব্যক্তি এবং অত্যাচারী (আউযুবিল্লাহ) । যদিও আমি জানি তার মৃত্যুর পর তা করলে তার কোন ক্ষতি করবে না কিন্তু আমি নিজের কাছে শপথ করেছি যে , যদি আমি তাকে হত্যা করি তাহলে আমি এ রকম করবো , এরপর যদি তুমি আমার আদেশ মেনে চল তাহলে আমি তোমাকে উপহার প্রদান করবো যা অনুগতদের প্রাপ্য এবং যদি তুমি একমত না হও , তাহলে আমার সৈন্যবাহিনী থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নাও এবং দায়িত্ব দিয়ে দাও শিমর বিন যিলজওশানকে , যাকে আমি তা করতে আদেশ দিয়েছি। সালাম।”
আবুল ফারাজ বর্ণনা করেন যে , উমর বিন সা’ আদের কাছে উবায়দুল্লাহ একটি সংবাদ পাঠায় যে ,“ হে সা’ আদের সন্তান , তুমি আরামপ্রিয় ও অপব্যায়ীদের একজন। এ ব্যক্তির (হোসেইনের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো এবং তার বিরুদ্ধে সহিংসতা ব্যবহার করো এবং তার কোন অনুরোধে রাজী হয়ো না যতক্ষণ না সে আমার আদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।”
তাবারির‘ তারিখ’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে , আযদি বলেছেন: হুরেইস বিন হাসিরাহ বর্ণনা করেছে আব্দুল্লাহ বিন শারীক আমরি থেকে যে , যখন শিমর চিঠিটি লিখিয়ে নিল , সে আব্দুল্লাহ বিন আবি মাহলের সাথে উঠে দাঁড়ালো যে ছিলো উম্মুল বানীন (আ.) এর চাচা , যিনি (উম্মল বানীন) ছিলেন হিযাম বিন খালিদের কন্যা ও আমিরুল মুমীনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) এর স্ত্রী। উম্মুল বানীন ইমাম আলী (আ.) থেকে চার জন সন্তান লাভ করেন: আব্বাস , আব্দুল্লাহ , জাফর ও উসমান। আব্দুল্লাহ বিন আবি মাহল বিন হিযাম বিন খালিদ বিন রাবি’ আ বিন ওয়াহীদ বিন কা‘ ব বিন আমির বিন কিলাব বলে যে ,“ আল্লাহ যেন নেতার (বিষয়গুলো) শুদ্ধ করে দেন , আমাদের ভাগ্নেরা হোসেইনের সাথে আছে , তাই যদি আপনি যথাযথ মনে করেন তাহলে তাদের প্রতি একটি নিরাপত্তার দলিল লিখে দিন।” উবায়দুল্লাহ বললো ,“ তাই হবে।” এরপর সে তার লেখককে বললো তাদের জন্য একটি নিরাপত্তার দলিল লিখে দিতে। আব্দুল্লাহ চিঠিটি কারবালায় পাঠালো কিরমান নামে তার একজন দাসকে দিয়ে একটি সংবাদ দিয়ে যে ,“ তোমার মামা (আব্দুল্লাহ বিন মাহল) নিরাপত্তার এ দলিলটি তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন।” যুবকটি উত্তর দিলো ,“ আমাদের মামার কাছে আমাদের সালাম পৌঁছে দাও এবং তাকে বলো যে , আমরা তার নিরাপত্তার প্রয়োজন বোধ করি না। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিরাপত্তা সুমাইয়াহর সন্তানের নিরাপত্তার চাইতে উত্তম।”
শিমর উমর বিন সা’ আদের কাছে উবায়দুল্লাহর চিঠিটি আনলো। উমর যখন তা পড়লো সে বললো ,“ দুর্ভোগ তোমার জন্য , তুমি কী এনেছো ? তোমার বাড়ি ধ্বংস হোক , তুমি আমার জন্য যা এনেছো তা অত্যন্ত খারাপ। আল্লাহর শপথ , আমি জানি যে তুমি তাকে তা করতে বাধা দিয়েছো যা আমি তাকে লিখেছিলাম। তুমি বিষয়টি নষ্ট করছো , যা শান্তি আনতে পারতো ; আল্লাহর শপথ , হোসেইন আত্মসমর্পণ করবে না , কারণ তার রয়েছে মহান আত্মা।” শিমর বললো ,“ এখন বলো , তুমি কী করতে চাও ? তুমি কি সর্দারের আদেশ মানবে এবং তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ? যদি তা না হয় , তাহলে দায়িত্ব আমার কাছে হস্তান্তর করো।” উমর বললো ,“ না তুমি এ সম্মান পাবে না এবং তুমি পদাতিক সৈন্যদের অধিনায়ক হবে।”
এরপর উমর বিন সা’ আদ তার সৈন্যদলসহ ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে রওনা দিলো বৃহস্পতিবার , নয় মহররমের রাতে।
আব্বাস বিন আলী (আ.) এর কাছে নিরাপত্তা দানের প্রস্তাব
শিমর এলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের দিকে ফিরে দাঁড়ালো এবং উচ্চ কণ্ঠে বললো ,“ আমাদের বোনের (গোত্রের) পুত্র সন্তানরা কোথায় ?”
এ কথা শুনে হযরত আব্বাস , আব্দুল্লাহ , জাফর এবং উসমান বের হয়ে এলেন এবং জানতে চাইলেন সে কী চায়। শিমর বললো ,“ হে আমার বোনের সন্তানরা , তোমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হচ্ছে।” তারা বললেন ,“ তোমার ও তোমার নিরাপত্তার উপর অভিশাপ , তুমি আমাদের নিরাপত্তার প্রস্তাব দিচ্ছো আর রাসূলের সন্তানের তা নেই ?”
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে আছে] অন্য এক বর্ণনায় এরকম বর্ণিত আছে যে: হযরত আব্বাস (আ.) উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ তোমার হাত কাটা যাক , কী খারাপ নিরাপত্তাই না তুমি আমাদের জন্য এনেছো। হে আল্লাহর শত্রু , তুমি কি চাও আমরা আমাদের ভাই ও আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি এবং অভিশপ্ত পিতাদের অভিশপ্ত সন্তানদের আনুগত্য করি ?”
তখন উমর বিন সা’ আদ তার সৈন্যদলের উদ্দেশ্যে বললো ,“ প্রস্তুত হও , হে আল্লাহর সেনাবাহিনী , আর জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো।” তখন সবাই ঘোড়ায় চড়লো এবং আসরের নামাযের পর ইমাম হোসেইন (আ.) কে আক্রমণ করতে এগিয়ে গেলো।
[‘ কামিল’ গ্রন্থে আছে] ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে ,“ মহররমের তাসূআহতে (নবম দিনে) , ইমাম হোসেইন (আ.) এবং তার সাথীরা কারবালায় সিরিয়া থেকে আসা সৈন্যদল কর্তৃক সবদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন এবং তারা তাদের মালপত্র নামিয়ে নিলেন। মারজানাহর সন্তান (উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ) এবং উমর বিন সা’ আদ তাদের সৈন্যদলের বিশালত্বে খুশী ছিলো এবং ইমাম হোসেইন এবং তার সাথীদেরকে দুর্বল ভাবলো। তারা জানতো যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর কোন সাহায্যকারী ও সহযোগিতাকারী ইরাকে ছিলো না। আমার পিতা সেই নির্যাতিত ভ্রমণকারীর জন্য কোরবান হোক।”
যখন উমর বিন সা’ আদ তার সৈন্যদের ঘোড়ায় চড়ার আদেশ দিল তারা মান্য করলো এবং অগ্রসর হলো যতক্ষণ না ইমাম হোসেইন (আ.) এর তাঁবুগুলোর নিকটবর্তী হলো। [ইরশাদ , কামিল ,তাবারি] ইমাম তার তাবুর সামনে বসে ছিলেন তার তরবারির উপর ঠেস দিয়ে এবং তার মাথা ছিলো তার হাঁটুর উপর এবং তন্দ্রা গিয়েছিলেন। যখন হযরত যায়নাব (আ.) সৈন্যদের হৈচৈ শুনলেন তিনি দৌড়ে গেলেন ইমামের দিকে এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন ,“ ভাইজান , আপনি কি হৈচৈ শুনতে পাচ্ছেন যা আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ?” ইমাম তার মাথা উঠিয়ে বললেন ,“ আমি এইমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম এবং তিনি আমাকে বললেন যে , আগামীকাল আমি তার সাথে মিলিত হবো।” তা শুনে হযরত যায়নাব (আ.) নিজের চেহারায় আঘাত করতে লাগলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ তুমি কেঁদো না , হে প্রিয় বোন , চুপ থাকো , তোমার উপর আল্লাহর রহমত হোক।”
[তাবারি ,‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] হযরত আব্বাস (আ.) ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে ইমাম , সৈন্যরা আমাদের দিকে এসেছে।” ইমাম উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন , [ইরশাদ , তাবারি]“ হে আব্বাস , তোমার জন্য আমার জীবন কোরবান হোক , হে প্রিয় ভাই , ঘোড়ায় চড় এবং তাদের কাছে যাও এবং জিজ্ঞেস করো কী হয়েছে। তারা কী চায় এবং কেন তারা আমাদের দিকে এসেছে।”
হযরত আব্বাস , যুহাইর বিন ক্বাইন এবং হাবীব বিন মুযাহির সহ বিশ জনের একটি সৈন্যদল নিয়ে তাদের দিকে গেলেন এবং বললেন ,“ নতুন করে কী হয়েছে এবং তোমরা কী চাও ?” তারা বললো ,“ সেনাপতির কাছ থেকে আদেশ এসেছে যে আমরা তোমাদের যেন আদেশ দেই আত্মসমর্পণ করতে অথবা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি।” আব্বাস উত্তর দিলেন ,“ তাহলে অপেক্ষা করো যেন আমি আবু আব্দুল্লাহকে জানাতে পারি তোমরা যা বলেছো।” তারা থামলো এবং বললো ,“ তার কাছে যাও এবং আমরা যা তোমাদের বলেছি জানিয়ে দাও এবং ফিরে আসো তার উত্তর নিয়ে।” হযরত আব্বাস (আ.) দ্রুত ঘোড়া চালিয়ে ইমামের কাছে গেলেন এবং তাদের সংবাদ পৌঁছে দিলেন , আর তার সাথীরা সেখানে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের সাথে কথা বলতে লাগলেন।
যুহাইর বিন ক্বাইনকে হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ তুমি যদি তাদের সাথে কথা বলতে চাও , বলো , এবং যদি চাও , আমি তাদের সাথে কথা বলবো।” যুহাইর বললেন ,“ যেহেতু আপনি কথা বলা শুরু করেছেন , আপনি বলতে পারেন।” তখন হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আগামীকাল , কিয়ামতের দিন , আল্লাহর সামনে নিকৃষ্ট যে ব্যক্তি দাঁড়াবে সে হলো যে রাসূল (সা.) এর সন্তান ও তার পরিবারকে এবং তার আহলুল বাইত এবং তার শহরের ধার্মিক লোকদের , যারা মধ্যরাতের নামাযের জন্য দাঁড়ায় এবং আল্লাহকে প্রচুর স্মরণ করে , তাদেরকে হত্যা করবে।” উরওয়াহ বিন ক্বায়েস বললো ,“ নিজেকে যত খুশী কষ্ট দাও।” এ কথা শুনে যুহাইর বললেন ,“ হে উরওয়াহ , আল্লাহকে ভয় করো , কারণ আমি হিতাকাঙ্ক্ষী , আমি তোমাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি হে উরওয়াহ , কারণ তুমি পথভ্রষ্টদের সাহায্যকারী হবে এবং ধার্মিকদের হত্যা করবে।” উরওয়াহ বললো ,“ তুমি ঐ পরিবারের শিয়াদের (অনুসারীদের) অন্ত র্ভুক্ত ছিলে না বরং খলিফা উসমানের শিয়া ছিলে।” যুহাইর বললেন ,“ এখানে আমার উপস্থিতি কি তোমাকে বুঝাচ্ছে না যে আমি তাদের শিয়াদের একজন ? আল্লাহর শপথ , আমি তাদের একজন নই যারা ইমামকে চিঠি লিখেছে এবং আমি তার কাছে আমার দূত পাঠাই নি এবং না আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত যারা তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বরং আমি পথে ইমামের দেখা পেয়েছি এবং রাসূলকে স্মরণ করেছি এবং তার দিকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। এরপর আমি বুঝতে পারলাম যে তিনি তার শত্রুদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাই আমি তার দলে প্রবেশ করেছি এবং সিদ্ধান্তনিয়েছি তাকে সাহায্য করার জন্য এবং তার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য এবং আমি তার জন্য আমার জীবন কোরবান করবো , এভাবে আমি আল্লাহর ও তার রাসূলের অধিকার পাহারা দিব যা তোমরা পরিত্যাগ করেছো।”
আর হযরত আব্বাস (আ.) , তিনি ফিরে এলেন এবং যা তারা তাকে বলেছে , পৌঁছে দিলেন। ইমাম উত্তর দিলেন ,“ যাও যদি পারো তাদের বলো আগামীকাল পর্যন্ততা পিছিয়ে দিতে , যেন আমরা আজ রাতে আমাদের রবের ইবাদত করতে এবং দোআ করতে এবং তওবা করতে পারি , কারণ আল্লাহ জানেন যে আমি নামায , কোরআন তেলাওয়াত ,প্রচুর দোআ করতে এবং ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করতে ভালোবাসি।”
হযরত আব্বাস তাদের দিকে গেলেন এবং যখন তিনি ইমামের কাছে ফিরে এলেন তখন উমর বিন সা’ আদের একজন দূত তার সাথে ছিলো। দূত সেখানে থামলো যেখান থেকে তার কণ্ঠের আওয়াজ শোনা যায় এবং বললো , [ইরশাদ]“ আমরা আপনাকে আগামীকাল পর্যন্ত সময় দিয়েছি। এরপর যদি আপনি আত্মসমর্পণ করেন , আমরা আপনাকে সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে যাবো এবং যদি আপনি প্রত্যাখ্যান করেন আমরা আপনাকে ছাড়বো না।” একথা বলে সে ফিরে গেল।
পরিচ্ছেদ - ১৭
আশুরার (দশ মহররম) রাতের ঘটনাবলী
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) তার সাথীদের রাতের বেলা জড়ো করলেন , ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেন যে , আমি তাদের কছে গেলাম শোনার জন্য তারা কী বলেন এবং সে সময় আমি অসুস্থ ছিলাম। আমি শুনলাম ইমাম তার সাথীদের বলছেন ,
“ আমি আল্লাহর প্রশংসা করি সর্বোত্তম প্রশংসার মাধ্যমে এবং তাঁর প্রশংসা করি সমৃদ্ধির সময়ে এবং দুঃখ দুর্দশার মাঝেও। হে আল্লাহ , আমি আপনার প্রশংসা করি এ জন্য যে , আপনি আমাদের পরিবারে নবুয়াত দান করতে পছন্দ করেছেন। আপনি আমাদের কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং ধর্মে আমাদেরকে বিজ্ঞজন করেছেন এবং আমাদেরকে দান করেছেন শ্রবণ শক্তি ও দূরদৃষ্টি এবং আলোকিত অন্তর। তাই আমাদেরকে আপনার কৃতজ্ঞ বান্দাহদের দলে দাখিল করুন। আম্মা বা’ আদ , আমি তোমাদের চেয়ে বিশস্ত এবং ধার্মিক কোন সাথীকে পাই নি , না আমি আমার পরিবারের চাইতে বেশী বিবেচক , স্নেহশীল , সহযোগিতাকারী ও সদয় কোন পরিবারকে দেখেছি। তাই আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন এবং আমি মনে করি শত্রুরা একদিনও অপেক্ষা করবে না এবং আমি তোমাদের সবাইকে অনুমতি দিচ্ছি স্বাধীনভাবে চলে যাওয়ার জন্য এবং আমি তা তোমাদের জন্য বৈধ করছি। আমি তোমাদের উপর থেকে আনুগত্য ও শপথের দায়ভার তুলে নিচ্ছি (যা তোমরা আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করেছিলে) । রাতের অন্ধকার তোমাদের ঢেকে দিয়েছে , তাই নিজেদের মুক্ত করো ঘূর্ণিপাক থেকে অন্ধকারের ঢেউয়ের ভেতরে। আর তোমাদের প্রত্যেকে আমার পরিবারের একজনের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ো গ্রাম ও শহরগুলোতে , যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের মুক্তি দান করেন। কারণ এ লোকগুলো শুধু আমাকে চায় এবং আমার গায়ে হাত দেয়ার পরে তারা আর কারো পেছনে ধাওয়া করবে না।”
এ কথা শুনে তার ভাইয়েরা , সন্তানরা , ও ভাতিজারা এবং আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানরা বললেন ,“ আামরা তা কখনোই করবো না আপনার পরে বেঁচে থাকার জন্য। আল্লাহ যেন কখনো তা না করেন।” হযরত আব্বাস বিন আলী (আ.) সর্বপ্রথম এ ঘোষণা দিলেন এবং অন্যরা তাকে অনুসরণ করলেন।
ইমাম তখন আক্বীল বিন আবি তালিবের সন্তানদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ মুসলিমের আত্মত্যাগ তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে , তাই আমি তোমাদের অনমতি দিচ্ছি চলে যাওয়ার জন্য।” তারা বললেন ,“ সুবহানাল্লাহ , লোকেরা কী বলবে ? তারা বলবে আমরা আমাদের প্রধানকে , অভিভাবককে এবং চাচাতো ভাইকে , যে শ্রেষ্ঠ চাচাতো ভাই , পরিত্যাগ করেছি এবং আমরা তার সাথে থেকে তীর ছুড়িনি , বর্শা দিয়ে আঘাত করি নি এবং তার সাথে থেকে তরবারি চালাই নি এবং তখন আমরা (এ অভিযোগের মুখে) বুঝতে পারবো না কী করবো ; আল্লাহর শপথ , আমরা তা কখনোই করবো না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের জীবন , সম্পদ ও পরিবার আপনার জন্য কোরবানী করবো। আমরা আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করবো এবং আপনার পাশে থেকে পরিণতিতে পৌঁছে যাবো। আপনার পরে জীবন কুৎসিত হয়ে যাক (যদি বেঁচে থাকি) ।”
এরপর মুসলিম বিন আওসাজা উঠলেন এবং বললেন ,“ আমরা আপনাকে কি পরিত্যাগ করবো ? তারপর যখন আল্লাহর সামনে যাবো তখন তার সামনে আপনার অধিকার পূরণের বিষয়ে আমরা কী উত্তর দিবো ? না , আল্লাহর শপথ , আমি আমার এ বাঁকা তরবারি শত্রুদের হৃৎপিণ্ডে ঢুকিয়ে দিবো এবং আমি তাদেরকে আমার তরবারি দিয়ে আঘাত করতেই থাকবো যতক্ষণ না এর শুধু হাতলটা আমার হাতে থাকে। আর যদি তাদের সাথে যুদ্ধ করার মতো আমার হাতে কোন অস্ত্র আর না থাকে তাহলে আমি তাদেরকে পাথর দিয়ে আক্রমণ করবো। আল্লাহর শপথ , আমরা আপনার হাত থেকে আমাদের হাত তুলে নিবো না যতক্ষণ না আল্লাহর কাছে প্রমাণিত হয় যে আমরা আপনার বিষয়ে নবীর সম্পর্ককে সম্মান দিয়েছি। আল্লাহ শপথ , যদি এমনও হয় যে , আমি জানতে পারি যে আমাকে হত্যা করা হবে এবং এরপর আমাকে আবার জাগ্রত করা হবে এবং এরপর হত্যা করা হবে এবং পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং আমার ছাই চারদিকে ছড়িয়ে দেয় হবে এবং তা যদি সত্তর বারও ঘটে , তারপরও আমি আপনাকে পরিত্যাগ করবো না যতক্ষণ না আপনার আনুগত্যে আমি নিহত হই। তাহলে কিভাবে আমি তা পরিত্যাগ করবো যখন জানি যে মৃত্যু শুধু একবার আসবে যার পরে এক বিরাট রহমত আমার জন্য অপেক্ষা করছে ?”
এরপর যুহাইর বিন ক্বাইন উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমি খুবই ভালোবাসবো যদি আমাকে হত্যা করা হয় এবং এরপর জীবিত করা হয় এবং এরপর আবারও হত্যা করা হয় এবং তা এক হাজারবার ঘটে এবং এভাবে সর্বশক্তিমান ও মহান আল্লাহ যেন আপনাকে ও আপনার পরিবারকে নিহত হওয়া থেকে রক্ষা করেন।”
এরপর অন্যান্য সব সাথীরা তানরপাবি ত্ত করেন , [তাবারি] তারা বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা আপনাকে পরিত্যাগ করবো না , বরং আমাদের জীবন আপনার জীবনের জন্য কোরবানী হবে। আমরা আপনাকে রক্ষা করবো আমাদের ঘাড় , চেহারা ও হাত দিয়ে। এরপর আমরা সবাই মৃত্যুবরণ করবো দায়িত্ব পালন শেষে।”
নিচের যুদ্ধ কবিতাটি তাদের আলোচনাকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলে ,
“ হে আমার অভিভাবক , যদি আমার শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসন আরশ পর্যন্ত পৌঁছায় তবুও আমি আপনার চাকর হয়ে এবং আপনার দরজায় ভিক্ষুক হয়ে থাকবো এবং যদি আমি আমার হৃদয় ও এর ভালোবাসাকে আপনার কাছ থেকে তুলে নিই তাহলে কাকে আমি ভালোবাসবো এবং আমার হৃদয়কে কোথায় নিয়ে যাবো ?”
আল্লাহ তাদেরকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিষয়ে উদারভাবে দান করুন। এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) তার তাঁবুতে ফিরে গেলেন।
“ আল্লাহ সেই যুবকদের পুরস্কৃত করুন যারা ধৈর্যের সাথে সহ্য করেছেন , তারা ছিলেন পৃথিবীর যে কোন জায়গায় অতুলনীয়। তারা ছিলেন উত্তম চরিত্রের প্রতিচ্ছবি এবং বাটির পানি মিশ্রিত দুধ নয় যা পরে পেশাবে পরিণত হয়।”
সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেছেন যে , মুহাম্মাদ বিন বাশার হাযরামীকে বলা হলো যে ,“ তোমার ছেলেকে‘ রেই’ শহরের সীমান্তে গ্রেফতার করা হয়েছে।” তিনি উত্তর দিলেন ,“ আমি তাকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করলাম। আমার জীবনের শপথ , তার গ্রেফতার হওয়ার পর আমি বেঁচে থাকতে চাই না।” ইমাম হোসেইন (আ.) তার কথাগুলো শুনতে পেলেন এবং বললেন ,“ তোমার আল্লাহ তোমার উপর রহমত করুন , আমি তোমার কাছ থেকে বাইয়াত তুলে নিলাম , তুমি যেতে পারো এবং তোমার ছেলেকে মুক্ত করার চেষ্টা করো।”
তিনি বললেন ,“ আমি যদি আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হই আমি হিংস্র পশুদের শিকার হয়ে যাবো।” এতে ইমাম বললেন ,“ তাহলে এ ইয়েমেনী পোষাকগুলো দিয়ে তোমার অন্য ছেলেকে পাঠাও , যেন সে তাকে এগুলোর বিনিময়ে মুক্ত করতে পারে।”
তিনি মুহাম্মাদ বিন বাশারকে পাঁচটি পোষাক দিলেন যার মূল্য এক হাজার স্বর্ণের দিনার।
হোসেইন বিন হামদান হাযীনি তার বর্ণনা ধারা বজায় রেখে আবু হামযা সূমালি থেকে বর্ণনা করেন এবং সাইয়েদ বাহরানি বর্ণনার ক্রমধারা উল্লেখ না করেই তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেছেন যে: আমি ইমাম আলী আল যায়নুল আবেদীনকে বলতে শুনেছি , শাহাদাতের আগের রাতে আমার বাবা তার পরিবার এবং সাথীদের জড়ো করলেন এবং বললেন ,“ হে আমার পরিবারের সদস্যরা এবং আমার শিয়ারা (অনুসারীরা) , এ রাতকে ভেবে দেখো যা তোমাদের কাছে বহনকারী উট হয়ে এসেছে এবং নিজেদেরকে রক্ষা করো , কারণ লোকেরা আমাকে ছাড়া কাউকে চায় না। আমাকে হত্যা করার পর তারা তোমারদেরকে তাড়া করবে না। আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত করুন। নিজেদেরকে রক্ষা করো। নিশ্চয়ই আমি আনুগত্য ও শপথের দায়ভার তুলে নিলাম যা তোমরা আমার হাতে করেছো।” এ কথা শুনে তার ভাইয়েরা , আত্মীয়- স্বজন ও সাথীরা একত্রে বলে উঠলো ,“ আল্লাহর শপথ হে আমাদের অভিভাবক , হে আবা আবদিল্লাহ আমরা আপনার সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করবো না , তাতে লোকেরা বলতে পারে যে আমরা আমাদের ইমামকে , প্রধানকে এবং অভিভাবককে পরিত্যাগ করেছি এবং তাকে শহীদ করা হয়েছে। তখন আমরা আমাদের ও আল্লাহর মাঝে ওজর খুঁজবো। আমরা আপনাকে কখনোই পরিত্যাগ করবো না যতক্ষণ না আমরা আপনার জন্য কোরবান হই।” ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই আগামীকাল আমাকে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের সবাইকে আমার সাথে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের কাউকে রেহাই দেয়া হবে না।” তারা বললেন ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং আমাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন আপনার সাথে শহীদ হওয়ার জন্য। তাহলে কি আমরা পছন্দ করবো না যে আমরা আপনার সাথে উচ্চ মাক্বামে (বেহেশতে) থাকবো , হে রাসূলুল্লাহর সন্তান ?” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ তোমাদের উদারভাবে পুরস্কৃত করুন।” এরপর তিনি তাদের জন্য দোআ করলেন। যখন সকাল হল , তাদের সবাইকে শহীদ করে ফেলা হল।
তখন ক্বাসিম বিন হাসান (আ.) জিজ্ঞেস করলেন ,“ আমি কি শহীদদের তালিকায় আছি ?” তা শুনে ইমাম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন এবং বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , তুমি মৃত্যুকে তোমার কাছে কিভাবে দেখো ?”
ক্বাসিম বললেন ,“ মধুর চেয়ে মিষ্টি।”
ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই , আল্লাহর শপথ , তোমার চাচা তোমার জন্য কোরবান হোক , তুমি তাদের একজন যাদেরকে শহীদ করা হবে আমার সাথে কঠিন অবস্থার শিকার হওয়ার পর এবং আমার (শিশু) সন্তান আব্দুল্লাহকেও (আলী আসগার) শহীদ করা হবে।”
এ কথা শুনে ক্বাসিম বললেন ,“ হে চাচাজান , তাহলে কি শত্রুরা মহিলাদের কাছে পৌঁছে যাবে দুধের শিশু আব্দুল্লাহকে (আলী আসগারকে) হত্যা করতে ?”
ইমাম বললেন ,“ আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হবে তখন , যখন আমি প্রচণ্ড পিপাসার্ত হয়ে ফিরে আসবো তাঁবুতে এবং পানি অথবা মধু চাইতে , কিন্তু কিছুই পাওয়া যাবে না। তখন আমি অনুরোধ করবো আমার সন্তানকে আমার কাছে আনার জন্য যেন আমি তার ঠোঁটে চুমু দিতে পারি (এবং এর মাধ্যমে স্বস্তিপাই) । সন্তানকে আনা হবে এবং আমার হাতে দেয়া হবে এবং একজন (শত্রুদের মাঝ থেকে) জঘন্য ব্যক্তি একটি তীর ছুঁড়বে তার গলায় এবং বাচ্চাটি চিৎকার করে উঠবে। তখন তার রক্ত আমার দুহাতে ভরে যাবে এবং আমি আমার হাত দুটো আকাশের দিকে তুলে বলবো: হে আল্লাহ , আমি সহ্য করছি এবং হিসাব নিকাশ আপনার কাছে ছেড়ে দিচ্ছি। তখন শত্রুদের বর্শা আমার দিকে দ্রুত ছুঁড়ে দেয়া হবে এবং তাঁবুর পেছনে খোড়া গর্তের ভিতর আগুন গর্জন করতে থাকবে। এরপর আমি তাদেরকে আক্রমণ করবো। সে সময়টি হবে আমার জীবনের সবচেয়ে তিক্ত সময়। এরপর আল্লাহ যা চান তাই ঘটবে।”
এ কথা বলে ইমাম কাঁদতে লাগলেন এবং আমরাও অশ্রু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সন্তানের তাঁবু থেকে কান্নার সুর উঠলো।
আবু হামযা সুমালি থেকে কুতুবুদ্দীন রাওয়ানদি বর্ণনা করেন যে , ইমাম আলী আল যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন যে: আমি আমার বাবার (ইমাম হোসেইনের) সাথে ছিলাম তার শাহাদাতের আগের রাতে। তখন তিনি তার সাথীদের সম্বোধন করে বললেন:“ এ রাতকে তোমাদের জন্য বর্ম মনে করো কারণ এ লোকগুলো আমাকে চায় এবং আমাকে হত্যা করার পর তারা তোমাদের দিকে ফিরবে না , এখন তোমাদেরকে ক্ষমা করা হচ্ছে এবং (এখনও) তোমরা সক্ষম।”
তারা বললো ,“ আল্লাহর শপথ , তা কখনোই ঘটবে না।” ইমাম বললেন ,“ আগামীকাল তোমাদের সবাইকে হত্যা করা হবে এবং কাউকে রেহাই দেয়া হবে না।” তারা বললো ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন আপনার সাথে শহীদ হওয়ার জন্য।” তখন ইমাম তাদের জন্য দোআ করলেন এবং তাদের মাথা তুলতে বললেন। তারা তাই করলেন এবং বেহেশতে তাদের মর্যাদা দেখতে পেলেন এবং ইমাম তাদের প্রত্যেককে সেখানে তাদের স্থান দেখালেন। এর ফলে প্রত্যেকে তাদের চেহারা ও বুক তরবারির দিকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন বেহেশতের সেই মর্যাদায় প্রবেশ করার জন্য।
শেইখ সাদুক্বের‘ আমালি’ তে ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে , তিনি বলেছেন যে: সাথীদের সাথে ইমামের আলোচনার পর তিনি আদেশ দিলেন তার সেনাদলের চারদিকে একটি গর্ত খোঁড়ার জন্য। গর্ত খোঁড়া হলো এবং তা জ্বালানী কাঠ দিয়ে পূর্ণ করা হলো। এরপর ইমাম তার ছেলে আলী আকবার (আ.) কে পানি আনতে যেতে বললেন ত্রিশ জন ঘোড়সওয়ার ও বিশ জন পদাতিক সৈন্যসহ। তারা বেশ ভীতির ভিতর ছিলেন এবং ইমাম নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করতে লাগলেন ,
“ হে সময় , বন্ধু হিসেবে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত , প্রভাত হওয়ার সময় ও সূর্যাস্তের সময় , কত সাথী অথবা সন্ধানকারী লাশে পরিণত হবে , সময় এর পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে না , বিষয়টি ফায়সালার ভার থাকবে সর্বশক্তিমানের কাছে এবং প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকে আমার পথে ভ্রমণ করতে হবে।”
এরপর তিনি তার সাথীদের আদেশ করলেন ,“ পানি পান করো , যা এ পৃথিবীতে তোমাদের শেষ রিয্ক্ব এবং অযু করো এবং গোসল করে নাও। তোমাদের জামা কাপড়গুলো ধুয়ে নাও , কারণ সেগুলো হবে তোমাদের কাফন।”
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে] ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন যে , আমার বাবার শাহাদাতের আগের রাতে আমি জেগে ছিলাম এবং আমার ফুপু হযরত যায়নাব (আ.) আমার শুশ্রূষা করছিলেন। আমার বাবা তার তাঁবুতে একা ছিলেন এবং আবু যার গিফারীর দাস জন তার সাথে ছিলো এবং সে উনার তরবারি প্রস্তুত করছিলো ও মেরামত করছিলো। আমার বাবা এ কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন ,“ (হে) সময় , বন্ধু হিসেবে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত প্রভাত হওয়ার সময় এবং সূর্যাস্তের সময় , কত সাথী অথবা সন্ধানকারীই না লাশে পরিণত হবে , সময় এর বদলে অন্য কাউকে নিয়ে সন্তুষ্ট হবে না , বিষয়টির ফায়সালার ভার থাকবে সর্বশক্তিমানের কাছে এবং প্রত্যেক জীবিত প্রাণীকে আমার পথে ভ্রমণ করতে হবে।”
তিনি তা দুবার অথবা তিন বার বললেন এবং বুঝতে পারলাম তিনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন এবং আমি শোকার্ত হলাম কিন্তু নীরবে তা সহ্য করলাম এবং বুঝলাম যে আমাদের উপর দুরযোগ নেমে এসেছে। আমার ফুপু যায়নাব ও (আ.) তা শুনতে পেয়েছিলেন। অনুভূতি এবং দুশ্চিন্তা নারীদের বৈশিষ্ট্য , তাই তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। তিনি নিজের পোষাক ছিড়ে মাথার চাদর ছাড়া আমার বাবার দিকে দৌড়ে গেলেন এবং বললেন: আক্ষেপ এ মর্মান্তিক ঘটনার জন্য , আমার যেন মৃত্যু হয়ে যায়। আজ আমার মা ফাতিমা (আ.) , আমার বাবা আলী (আ.) এবং আমার ভাই হাসান (আ.) আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। হে তাদের উত্তরাধিকারী , যারা বিদায় নিয়েছে , হে জীবিতদের আশা।
ইমাম তার বোনের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় বোন , শয়তান যেন তোমার সহনশীলতা কেড়ে না নেয়।” তার চোখ অশ্রুতে পূর্ণ হয়ে গেলো এবং এরপর তিনি বললেন ,“ যদি মরুভূমির পাখিকে রাতে মুক্তি দেয়া হয় তাহলে সে শান্তিতে ঘুমাবে।”
তখন তিনি (যায়নাব) বললেন ,“ আক্ষেপ , তাহলে কি আপনি নৃশংসভাবে এবং অসহায়ভাবে নিহত হবেন ? তা আমার হৃদয়কে আহত করছে এবং তা আমার জীবনের উপর অত্যন্ত কঠিন।”
এরপর তিনি (যায়নাব) তার চেহারায় আঘাত করতে শুরু করলেন , জামার কলার ছিঁড়ে ফেললেন এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তখন ইমাম উঠে দাঁড়ালেন এবং তার চেহারায় পানি ছিটিয়ে দিয়ে এবং বললেন ,“ হে প্রিয় বোন , নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো এবং একমাত্র আল্লাহর কাছে সান্তনা চাও এবং জেনো যে পৃথিবীর ওপরে যারা আছে তারা সবাই মৃত্যুবরণ করবে এবং আকাশের বাসিন্দারাও ধ্বংস হয়ে যাবে শুধু আল্লাহর সূরত (সত্তা) ছাড়া। আল্লাহ যিনি তার ক্ষমতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন , আবার তাদেরকে জীবিত করবেন এবং তারা সবাই তার কাছে ফেরত যাবে। আর আল্লাহ অদ্বিতীয়। আমার নানা আমার চাইতে উত্তম ছিলেন। আমার বাবা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন এবং আমার মা আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। প্রত্যেক মুসলমানের ওপরে বাধ্যতামূলক যে সে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর উদাহরণ অনুসরণ করবে।”
এরপর তিনি একই ধরনের কথাবার্তা দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় বোন , আমি তোমাকে শপথের মাধ্যমে অনুরোধ করছি যখন আমি শহীদ হয়ে যাবো তখন নিজের (জামার) কলার ছিঁড়ো না , চেহারায় আঘাত করো না অথবা আমার জন্য বিলাপ করো না।”
এরপর তিনি হযরত যায়নাব (আ.) কে নিয়ে এলেন এবং তাকে আমার কাছে বসালেন , তারপর নিজের সাথীদের কাছে গেলেন। এরপর তিনি তাদেরকে আদেশ দিলেন তাদের তাঁবুগুলোকে পরস্পরের কাছে বাঁধার জন্য এবং খুঁটিগুলো এক সাথে বাঁধার জন্য যেন তাদের দিকে তা বৃত্ত হয়ে দাঁড়ায় এবং তিন দিক থেকে শত্রুদের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়ার জন্য যেন তারা সামনের দিকেই শুধু তাদের মোকাবিলা করতে পারে।
এরপর ইমাম তার তাঁবুতে ফেরত গেলেন এবং সারারাত আল্লাহর কাছে ইবাদত , দোআ এবং তওবায় কাটালেন এবং তার সাথীরাও তার অনুসরণ করলেন এবং দোআ শুরু করলেন ।
বর্ণনা করা হয়েছে যে , তাদের দোআর আওয়াজ মৌমাছিদের গুনগুনের মত শোনা যাচ্ছিলো। তারা রুকু ও সিজদায় , দাঁড়িয়ে ও বসে ইবাদতে ব্যস্তছিলেন। প্রচুর নামায এবং শ্রেষ্ঠ নৈতিকতা ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য সাধারণ বিষয়। ইমাম ছিলেন সে রকম যেমন ইমাম মাহদী (আ.) যিয়ারতে নাহিয়াতে উল্লেখ করেছেন ,
“ পবিত্র কোরআন যিনি পৌঁছে দেন
এবং উম্মতের যিনি অস্ত্র
এবং যিনি আল্লাহর আনুগত্যের পথে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন
শপথ ও ঐশী চুক্তি রক্ষাকারী
আপনি সীমা অতিক্রমকারীদের পথকে ঘৃণা করতেন
বিপদগ্রস্তদের প্রতি দানশীল
যিনি রুকু ও সিজদাকে দীর্ঘ করতেন
(আপনি) পৃথিবী থেকে বিরত ছিলেন
আপনি এটিকে সব সবসময় দেখেছেন তার দৃষ্টিতে যাকে তা শীঘ্রই ছেড়ে যেতে হবে।”
‘ ইক্বদুল ফারীদ’ -এ আবু আমর আহমেদ বিন মুহাম্মাদ কুরতুবি মারওয়ানি বর্ণনা করেছেন যে , লোকজন ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) কে জিজ্ঞেস করলো কেন তার বাবার এত অল্প সংখ্যক সন্তান ছিলো। এতে ইমাম বললেন ,“ আমি এতেও আশ্চর্য হই যে তার এ অল্প সংখ্যক সন্তানও জন্ম নিয়েছিলো কারণ তিনি প্রতিদিন এক হাজার রাকাত নামায পড়তেন। কোথায় তিনি স্ত্রীদের সাথে সাক্ষাতের সময় পেতেন ?”
[‘ মানাক্বিব’ -এ] বর্ণিত আছে যে , যখন সেহরীর সময় হলো তখন ইমাম হোসেইন (আ.) একটি বিছানায় শুলেন এবং তন্দ্রায় গেলেন। তারপর তিনি জেগে উঠলেন এবং বললেন ,“ তোমরা কি জানো আমি এখন স্বপ্নে কী দেখলাম ?” লোকজন বললো ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , কী দেখেছেন ?” ইমাম বললেন ,“ আমি দেখলাম কিছু কুকুর আমাকে আক্রমণ করেছে এবং একটি সাদাকালো কুকুর তাদের মধ্য থেকে আমার প্রতি বেশী হিংস্রতা দেখাচ্ছে এবং আমি ধারণা করছি , যে আমাকে হত্যা করবে সে এ জাতির মধ্যে একজন কুষ্ঠরোগী হবে। এরপর আমি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) কে দেখলাম তার কিছু সাথীর সাথে। তিনি আমাকে বললেন ,‘ হে আমার প্রিয় সন্তান , তুমি মুহাম্মাদ (সা.) এর বংশের শহীদ , বেহেশতের অধিবাসীরা ও আকাশের ফেরেশতারা তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছে , আজ রাতে তুমি আমার সাথে ইফতার করবে। তাই তাড়াতাড়ি করো , আর দেরী করো না। এ ফেরেশতারা আকাশ থেকে এসেছে তোমার রক্ত সংগ্রহ করতে এবং একটি সবুজ বোতলে তা সংরক্ষণ করতে।’ নিশ্চয়ই আমি বুঝতে পারছি যে আমার শেষ অতি নিকটে এবং এখন সময় হয়েছে এ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার এবং এতে কোন সন্দেহ নেই।”
আযদি থেকে তাবারি বর্ণনা করেছেন , তিনি আব্দুল্লাহ বিন আল-আসিম থেকে , তিনি যাহহাক বিন আব্দুল্লাহ বিন মাশরিক্বি থেকে , যিনি বলেন যে: আশুরার (দশই মহররম) রাতে ইমাম হোসেইন (আ.) এবং তার সব সাথীরা সারা রাত নামায , তওবা , দোআ ও কান্নায় কাটালেন। তিনি বলেন যে , একদল রক্ষী আমাদের পাশ দিয়ে গেল যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কোরআন এর এ আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন ,
) لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ ( ১ ৭ ৮ ) مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيزَ الْخَبِيثَ مِنَ الطَّيِّبِ(
“ যারা অবিশ্বাস করে তারা যেন মনে না করে যে আমরা তাদের যে সময় দিচ্ছি তা তাদের জন্য ভালো , আমরা তাদের সময় দিচ্ছি শুধু এজন্যে যেন তারা গুনাহতে বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য রয়েছে অপমানকর শাস্তি। আল্লাহ বিশ্বাসীদের সে অবস্থায় ফেলে রাখবেন না যে অবস্থায় তোমরা আছো , যতক্ষণ পর্যন্তনা ভালোর কাছ থেকে খারাপকে আলাদা করবেন।” [সূরা আলে ইমরান: ১৭৮-১৭৯]
যখন প্রহরীদের মধ্যে একজন অশ্বারোহী এ আয়াত শুনলো সে বললো ,“ কা‘ বার রবের শপথ , নিশ্চয়ই আমরা (আয়াতে উল্লেখিত) ভালো দল যাদেরকে তোমাদের কাছ থেকে আলাদা করা হয়েছে।”
যাহ্হাক বলেন যে , আমি লোকটিকে চিনতে পারলাম এবং তখন বুরাইর বিন খুযাইরকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি তাকে চিনেছেন কিনা। তিনি উত্তরে‘ না’ বললেন। আমি বললাম , সে আবু হারব সাবী’ ই আব্দুল্লাহ বিন শাহর। সে বিদ্রূপকারী , একজন সীমালঙ্ঘনকারী , যদিও ভালো বংশের লোক , সাহসী ও খুনী। সাঈদ বিন ক্বায়েস তাকে তার কোন অপরাধের কারণে গ্রেফতার করেছিলো। বুরাইর বিন খুযাইর তার দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ হে বদমাশ , (তুমি কি মনে করো) আল্লাহ তোমাকে ভালোদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ?” সে জিজ্ঞেস করলো তিনি কে , এতে বুরাইর তার পরিচয় দিলেন। সে বললো ,“ ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন , হে বুরাইর আমি তাহলে ধ্বংস হয়ে গেলাম ?” বুরাইর বললেন ,“ তুমি কি তোমার বড় গুনাহর জন্য তওবা করছো ? আল্লাহর শপথ , আমরা সবাই ভালোর দল , আর তোমরা সবাই খারাপ দল।” সে বললো ,“ আমিও তোমার কথার সত্যতার সাক্ষী দিচ্ছি।” যাহহাক বলেন , তখন আমি তাকে বললাম ,“ তাহলে কি বুদ্ধিমত্তা তোমার কল্যাণে আসবে না ?” সে বললো ,“ আমি তোমার জন্য কোরবান হই , (যদি আমি তা করি) তাহলে কে ইয়াযীদ বিন আযরাহ আনযীর সাথে থাকবে যে বর্তমানে আমার সাথে আছে।” এ কথা শুনে বুরাইর বললেন ,“ আল্লাহ তোমার অভিমত ও তোমার নীতি নষ্ট করুন , কারণ নিশ্চয়ই তমিু সব কিছুতে ব্যর্থ এক ব্যক্তি।” যাহহাক্ বলেন যে , তখন আবু হারব ফেরত গেলো এবং সেই রাতে আমাদের প্রহরী ছিলেন আযরাহ বিন ক্বায়েস আহমাসি , যিনি অশ্বরোহীদলের অধিনায়ক ছিলেন।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , সে রাতে উমর বিন সা’ আদের দল থেকে বাইশ জন ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের সাথে যোগ দিয়েছিলো।
‘ ইক্বদুল ফারীদ’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে উমর বিন সা’ আদের কাছে ইমাম হোসেইন (আ.) এর তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি গ্রহণের অনুরোধের কথা শুনে উমর বিন সা’ আদের পক্ষের বত্রিশজন কুফাবাসী তাকে বললো ,“ আল্লাহর রাসূলের সন্তান তোমাকে তিনটি প্রস্তাবের একটি গ্রহণ করতে বলছেন , আর তুমি এতে একমত হচ্ছো না।” এ কথা বলে তারা তাদের দল ত্যাগ করে ইমামের কাছে চলে এলো এবং তার পাশে থেকে যুদ্ধ করলো যতক্ষণ না তারা সকলে শহীদ হয়ে গেল ।
পরিচ্ছেদ - ১৮
আশুরার দিনের ঘটনাবলী
দুই বাহিনীর সমর সজ্জা এবং কুফার জনগণের মাঝে ইমামের প্রতিবাদ ও যুক্তিতর্ক পেশ
ইমাম হোসেইন (আ.) তার সাথীদের নিয়ে ফজরের নামায পড়লেন। নামায শেষে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং একটি সংক্ষিপ্ত খোতবা দিলেন। তিনি আল্লাহর হামদ ও তাসবীহ করার পর বললেন ,“ নিশ্চয়ই সর্বশক্তিমান ও মহান আল্লাহ চেয়েছেন যেন তোমরাও আমার মত শহীদ হও , অতএব সহ্য করো। ”
এ বর্ণনাটি‘ ইসবাত আল ওয়াসিইয়াহ ’ তে মাসউদী উল্লেখ করেছেন।
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] এরপর ইমাম নবী (সা.) এর ঘোড়া‘ মুরতাজায ’ কে আনতে বললেন এবং এর পিঠে সওয়ার হলেন এবং তার সাথীদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলেন এবং তারা যার যার অবস্থান নিলেন।
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] তার সাথে ছিলো বত্রিশ জন অশ্বারোহী এবং চল্লিশ জন পদাতিক সৈন্য।
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে , তার সাথে ছিলো পঁয়তাল্লিশ জন অশ্বারোহী এবং একশত পদাতিক সৈন্য। এছাড়াও এ সম্পর্কে অন্যান্য সংবাদ পাওয়া যায়।
‘ ইসবাত আল ওয়াসিইয়াহ ’ তে বর্ণিত আছে যে ,“ সেদিন ইমামের সাথে লোকজনের সংখ্যা ছিলো একষট্টি জন। সর্বশক্তিমান ও মহান আল্লাহ তার ধর্মকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাহায্য করেছিলেন এক হাজার ব্যক্তি দিয়ে। ” যখন ইমাম (আ.) কে জিজ্ঞেস করা হলো এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে , তিনি বললেন যে , এক হাজারের মধ্যে ছিলেন তালুতের সাহাবী তিনশত তের জন। বদরের যুদ্ধে নবী (সা.) এর সাথী ছিলো তিনশত তেরজন এবং তিনশত তেরজন হবে ইমাম আল মাহদী (আ.) এর সাথী। আর বাকী একষট্টি জন কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে শহীদ হন।
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে’ আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) যুহাইর বিন ক্বাইনকে ডান দিকের বাহিনীর দায়িত্ব দেন এবং হাবীব বিন মুযাহিরকে বাম দিকের এবং সেনাবাহিনীর মূল পতাকা দেন তার ভাই আব্বাস (আ.) কে। তারা তাঁবুর সামনে তাঁবুর দিকে তাদের পিঠ রেখে অবস্থান নিলেন। এরপর ইমাম আদেশ দিলেন যেন তাঁবুর পিছনে রাখা জ্বালানী কাঠ গর্তে রাখা হয় যা রাতে খোঁড়া হয়েছিলো এবং এতে আগুন লাগাতে বললেন , পাছে শত্রুরা পিছন দিক থেকে আক্রমণ করে।
দশ তারিখ সকালে উমর বিন সা’ আদ তার সৈন্যদের সাজালো। [কামিল , তাবারি] সে আব্দুল্লাহ বিন যুহাইর আযদিকে মদীনা বাহিনীর দায়িত্ব দিল। এছাড়া সে ক্বায়েস বিন আল আশআসকে রাবীয়াহ ও কিনদা গোত্রের বাহিনীর দায়িত্ব দিল এবং রাবা ’ , মাযহাজ ও আসাদ গোত্রের দায়িত্ব দিলো আব্দুর রহমান বিন আবু সাবারাহ হানাফিকে এবং তামীম ও হামাদান গোত্রের দায়িত্ব দিল আল হুর বিন ইয়াযীদ রিয়াহিকে। আল হুর ছাড়া তাদের সবাই উমর বিন সা’ আদের সাথে ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাত পর্যন্ত। তবে তিনি (হুর) ইমামের কাছে চলে গিয়েছিলেন এবং তার সাথে থেকে শাহাদাত অর্জন করেছিলেন। আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদিকে উমর ডান শাখার দায়িত্ব দিলো , শিমর বিন যিলজাওশানকে বাম শাখার এবং উরওয়াহ বিন ক্বায়েস আহমাসিকে অশ্বারোহীদলের প্রধান , শাম বিন রাব ’ ঈ ইয়ারবুঈকে পদাতিক সৈন্যদের প্রধান এবং সেনাদলের পতাকা দিলো তার দাস দুরাইদকে।
আবু মাখনাফ বর্ণনা করেন আমর বিন মুররাহ জামালি থেকে , তিনি বলেন আবু সালাহ হানাফি তাকে বলেছেন যে: আব্দুর রাহমান বিন আবদ রাব্বাহ আনসারির এক দাস তাকে বলেছে যে , আমি আমার মালিকের সাথে ছিলাম , যখন সেনাদল যুদ্ধের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ফিরলো , তখন ইমাম একটি তাঁবু গাড়ার আদেশ দিলেন এবং একটি পানির মশক আনতে বললেন এবং বড় একটি পেয়ালা পানিতে ভর্তি করতে বললেন। তিনি তাঁবুতে প্রবেশ করলেন এবং নূরাহ ব্যবহার করলেন (প্রাচীন দিনের চুন ও পানির মিশ্রন , চুল উঠিয়ে ফেলার জন্য) । আমার মালিক আব্দুর রাহমান এবং বুরাইর বিন খুযাইর হামাদানি ইমামের তাঁবুর দরজায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং প্রত্যেকেই চাইলেন যে তারা ইমামের পরে সুযোগ পেলে নূরাহ ব্যবহার করবেন। আব্দুর রহমানের সাথে বুরাইর কৌতুক করলেন। এতে তিনি বললেন ,“ আমাকে বিরক্ত করো না , কারণ এখন অনর্থক কথা বলার সময় নয়। ” বুরাইর বললেন , “ যারা আমাকে জানে তারা ভালোভাবে জানে যে আল্লাহর শপথ আমি কখনো ফালতু আড্ডা দেই নি আমার যুবক বয়সে এবং না আমার বৃদ্ধ বয়সে । বরং আমি আনন্দ অনুভব করছি তা ভেবে যা আমার জন্য আসছে। আল্লাহর শপথ , সেনাদল তাদের তরবারিগুলো দিয়ে আমাদের বিদ্ধ করবে এবং আমি তাদের তরবারির মাধ্যমে নিহত হওয়াকে পছন্দ করছি। ” এরপর ইমাম তার নূরাহ ব্যবহার শেষ করলেন , আমরা গেলাম এবং নূরাহ ব্যবহার করলাম , এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং কোরআন আনতে বললেন এবং তা ইমাম নিজের সামনে রাখলেন। ইমামের সাথীরা তার সামনে থেকে কঠিন যুদ্ধ করলেন এবং যখন আমি তাদেরকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখলাম তখন (ভয়ে) তাদেরকে পিছনে ফেলে পালিয়ে গেলাম।
আবু মাখনাফ বর্ণনা করেছেন আবু খালিদ কাবেলি থেকে এবং শেইখ মুফীদ বর্ণনা করেছেন আমাদের অভিভাবক ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) থেকে যে: যখন সকালে সেনাদল ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে অগ্রসর হলো তখন তিনি তার দুহাত আকাশের দিকে তুললেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , তুমি আমার শক্তি সব কঠিন অবস্থায় এবং আমার আশা সব দুর্যোগে এবং তুমি আমার সাহায্যকারী এবং মজুদ শক্তি সব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে যা আমার ওপরে আপতিত হয়। যত দুঃখ হৃদয়ে আসে , সমাধানের পথ বন্ধ হয় এবং বন্ধুরা চলে যায় এবং শত্রুরা উল্লাস করে , আমি সেগুলো আপনার কাছে এনেছি এবং আপনার কাছে সেসব বিষয়ে অভিযোগ করছি এবং আপনি ছাড়া আমি কারও দিকে ফিরি না। আপনি সেগুলো দূর করে দিয়েছেন এবং তা যথেষ্ট। আপনি সব রহমতের মালিক এবং সব গুণাবলীর অধিকারী , আপনি সব আশার শেষ আশা। ”
এরপর সৈন্যবাহিনী ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে অগ্রসর হলো এবং তার তাবুগুলো ঘেরাও করে ফেললো।
[তাবারি বর্ণনা করেছেন] আযদি বলেন যে , আব্দুল্লাহ বিন আসিম বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন যাহহাক মাশরিকি থেকে যে , তিনি বলেছেন : যখন সৈন্যবাহিনী আমাদের দিকে অগ্রসর হল এবং গর্তটি দেখতে পেলো যা আমরা খুঁড়েছিলাম ও আগুন দিয়ে ভর্তি করেছিলাম , তখন তারা আমাদেরকে পিছন দিয়ে আর আক্রমণ করতে পারলো না। হঠাৎ এক ব্যক্তি একটি ঘোড়ায় চড়ে অস্ত্র সজ্জিত অবস্থায় আমাদের দিকে এলো এবং কোন কথা না বলে তাঁবুগুলো পর্যবেক্ষণ করলো। এরপর সে পিছনে ফিরে গেলো এবং চিৎকার করে বললো , হে হোসেইন , কিয়ামতের আগেই তুমি আগুনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছো। ” (আউযুবিল্লাহ) । ইমাম বললেন ,“ সে কি শিমর বিন যিলজাওশান ?”
সাথীরা হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন। [ইরশাদ] ইমাম বললেন ,“ হে ছাগল চড়ানো মহিলার সন্তান , তুমি এর জন্য আরও বেশী যোগ্য। ”
মুসলিম বিন আওসাজা তার দিকে একটি তীর ছোঁড়ার চেষ্টা করলেন কিন্তু ইমাম তাকে থামালেন। মুসলিম বললেন ,“ দয়া করে তার দিকে তীর ছুঁড়তে দিন কারণ এ বদমাশটি সবচেয়ে বেশী অত্যাচারীদের একজন , আল্লাহ তাকে হত্যা করা আমার জন্য সম্ভব করেছেন। ”
ইমাম বললেন ,“ তোমার তীর ছুঁড়ো না , আমি পছন্দ করি না যে যুদ্ধ আমার দিক থেকে শুরু হোক। ”
[তাবারি বর্ণনা করেছেন] ইমাম হোসেইনের একটি ঘোড়া ছিল , যার নাম ছিলো লাহিক্ব , সেটি তিনি তার ছেলে আলীকে (আকবারকে) দিয়েছিলেন। যখন পদাতিক বাহিনী নিকটবর্তী হল , ইমাম তার উট চেয়ে পাঠালেন এবং তাতে চড়ে উচ্চ কণ্ঠে বললেন , যা বেশীরভাগ মানুষ শুনতে পেলো , হে জনতা , আমি যা বলছি তা শোন এবং তাড়াহুড়ো করো না , যেন আমি (উপদেশ দেয়ার) দায়িত্ব পালন করতে পারি যা আমার কর্তব্য এবং যেন আমি তোমাদের দিকে আমার আগমন সম্পর্কে আমার যুক্তি পেশ করতে পারি। এরপর যদি তোমরা আমার যুক্তি গ্রহণ করো এবং আমার কথা বিশ্বাস করো এবং আমার প্রতি ন্যায়বিচার করো তাহলে তোমরা সৌভাগ্যবান হবে এবং আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তোমাদের কোন ওজর থাকবেনা এবং যদি তোমরা আমার কথা গহর ণ না করো এবং আমার সাথে অন্যায় আচরণ করো তাহলে৮
) فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَيَّ وَلَا تُنْظِرُونِ(
তোমাদের পরিকল্পনা ও তোমাদের সাথীদেরকে জড় করো এবং তোমাদের পরিকল্পনা যেন দ্বৈত অর্থ বহন না করে , তারপর তা আমার উপর প্রয়োগ করো এবং (আমাকে) কোন সময় দিও না। [সূরা ইউনূস: ৭১]
) إِنَّ وَلِيِّيَ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتَابَ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّالِحِين(
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার ওয়ালি যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনিই সৎকর্মশীলদের দেখাশোনা করেন। [সূরা আ ’ রাফ: ১৯৬]
যখন তার বোনরা তার কথা শুনতে পেলেন তারা তার কন্যাদের সাথে কাঁদতে ও বিলাপ করতে লাগলেন। ইমাম তার ভাই আব্বাস বিন আলী (আ.) এবং তার সাথে তার সন্তান আলী আকবারকে পাঠালেন তাদের সান্ত্বনা দিতে ও শান্ত করতে। এরপর তিনি বললেন ,“ আমার জীবনের শপথ , তাদের আরও অনেক কান্না বাকী আছে। ”
যখন তারা চুপ করলেন [ইরশাদ] ইমাম আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ করলেন এবং তাঁকে স্মরণ করলেন যেভাবে তাঁকে স্মরণ করা উচিত। এরপর তিনি সালাম পাঠালেন রাসূলুল্লাহ (সা.) , ফেরেশতাদের ও নবী (আ.) দের কাছে। তিনি এমন সুন্দর ভাবে কথা বললেন যে কেউ তার আগে তা করে নি এবং তার পরেও নয়। এরপর তিনি বললেন:
আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন (আ.) এর খোতবা
“ আম্মা বা’ আদ , বিবেচনা করো আমার পরিবার সম্পর্কে এবং গভীরভাবে ভাবো আমি কে , এরপর নিজেরদের তিরস্কার করো। তোমরা কি মনে করো যে আমাকে হত্যা করা এবং আমার পবিত্রতা ও সম্মান লুট করা তোমাদের জন্য বৈধ ? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি , তার ওয়াসী ও তার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান নই , যিনি ছিলেন বিশ্বাস গ্রহণে সবার আগে এবং সাক্ষী ছিলেন সে সব কিছুর ওপরে যা নবী আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন ? শহীদদের সর্দার হামযা কি আমার পিতার চাচা ছিলেন না ? জাফর , যিনি বেহেশতে দুপাখা নিয়ে উড়েন , তিনি কি আমার চাচা নন ? নবীর হাদীস কি তোমাদের কাছে পৌঁছে নি যেখানে তিনি আমার সম্পর্কে ও আমার ভাই সম্পর্কে বলেছেন আমরা দুজন জান্নাতের যুবকদের সর্দার ? তাই যদি আমি যা বলছি তার সাথে একমত হও , এবং নিশ্চয়ই আমি যা বলেছি তা সত্য ছাড়া কিছু নয় , তাহলে তা উত্তম , কারণ আল্লাহর শপথ , যে সময় থেকে আমি বুঝেছি আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপছন্দ করেন তখন থেকে আমি কখনোই কোন মিথ্যা বলিনি। আর যদি তোমরা আমি যা বলছি তা বিশ্বাস না করো , তাহলে তোমাদের মাঝে নবীর জীবিত সাহাবীগণ আছে , তাদের কাছে যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করো এবং তারা আমার বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষী দিবে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারি , আবু সাঈদ খুদরি , সাহল বিন সাদ সা’ য়েদি , যায়েদ বিন আরক্বাম এবং আনাস বিন মালিককে জিজ্ঞেস করো , তারা তোমাদের বলবে যে তারা আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এই হাদীস শুনেছে। এটি কি তোমাদের জন্য আমার রক্ত ঝরানোর চাইতে যথেষ্ট নয় ?”
তখন অভিশপ্ত শিমর বিন যিলজাওশান বললো ,“ আমি আল্লাহর ইবাদত করি ঠোঁট দিয়ে এবং তুমি যা বলছো তা আমি বুঝি না। ” এ কথা শুনে হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ আমি দেখছি তুমি আল্লাহর ইবাদত করো সত্তুর ধরনের সন্দেহ নিয়ে এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সত্য কথা বলেছো এবং তুমি বুঝতে পারো না ইমাম যা বলেন , কারণ আল্লাহ একটিতখা(মর্র ) মোহর তোমার হৃদয়ের ওপরে মেরে দিয়েছেন। ”
ইমাম বললেন ,“ যদি তোমরা এতে সন্দেহ পোষণ করো , তোমরা কি এতেও সন্দেহ করো যে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নাতি ? আল্লাহর শপথ , পূর্বে ও পশ্চিমে , আমি ছাড়া নবীর কোন নাতি নেই তোমাদের মধ্যে অথবা অন্যদের মধ্যে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য , আমি কি তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে হত্যা করেছি যে তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও ? অথবা আমি কি কারো সম্পদ বেদখল করেছি অথবা কাউকে আহত করেছি যার প্রতিশোধ তোমরা আমার উপর নিতে চাও ?”
যখন কেউ তাকে উত্তর দিলো না , তিনি উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে শাবাস বিন রাব ’ ঈ , হে হাজ্জার বিন আবজার , হে ক্বায়েস বিন আল আশআস , হে ইয়াযীদ বিন হুরেইস , তোমরা কি আমার কাছে চিঠি লিখো নি যে , ফল পেকেছে এবং আশপাশের ভূমিতে ফুল ফুটেছে এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে আসুন , যা আমার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ?”
তারা উত্তর দিলো যে তারা এ ধরনের কোন চিঠি লিখে নি। ইমাম বললেন ,“ সুবহানাল্লাহ , আল্লাহর শপথ অবশ্যই তোমরা তা লিখেছিলে। ”
এরপর তিনি বললেন ,“ হে জনতা , এখন যদি তোমরা আমার আগমনকে পছন্দ না করো তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও যেন আমি কোন আশ্রয়ের জায়গায় চলে যেতে পারি। ”
ক্বায়েস বিন আল আশআস বললো ,“ তুমি যা বলছো তা আমরা জানি না , আমার চাচাতো ভাইদের (বনি উমাইয়ার) কাছে আত্মসমর্পণ করো , তারা তোমার সাথে সেভাবে আচরণ করবে যেভাবে তুমি চাও। ” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , নিকৃষ্ট মানুষের মত আমি তোমাদের হাতে হাত দিবো না , না আমি পালিয়ে যাবো কোন দাসের মত। ”
এরপর তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন , হে আল্লাহর দাসেরা ,
) وَإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَنْ تَرْجُمُونِ(
নিশ্চয়ই আমি আমার ও তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি , পাছে তোমরা আমাকে পাথর মারো (হত্যা করো) । [সূরা দুখান: ২০]
) إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ مِنْ كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ(
আমি আশ্রয় নিই আমার ও তোমাদের রবের কাছে , প্রত্যেক দাম্ভিক থেকে , যে হিসাব দিনে বিশ্বাস করে না। [সূরা মু ’ মিন: ২৭]
এরপর ইমাম তার উট থেকে নেমে পড়লেন এবং উক্ববাহ বিন সাম ’ আনকে বললেন এর পাগুলো বাঁধতে।
যুহাইর বিন ক্বাইন কুফার লোকদের মাঝে বক্তব্য রাখলেন
[তাবারির গ্রন্থে] আযদি বলেন যে , আসাদ শামি আমাকে তার গোত্রের কাসির বিন আব্দুল্লাহ শা ’ আবির কাছ থেকে , যে কারবালায় উপস্থিত ছিল , বর্ণনা করেছে যে , যখন আমরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর উপর অবরোধ আরোপ করলাম , মোটা লেজ বিশিষ্ট একটি ঘোড়ায় চড়ে যুহাইর বিন ক্বাইন আমাদের দিকে এলো , সে অস্ত্রে সুসজ্জিত ছিলো। সে বললো ,“ আল্লাহর ক্রোধ সম্পর্কে সচেতন হও। একজন মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক যে সে তার মুসলমান ভাইকে সতর্ক করবে। আমরা এখনও ভাই এবং একই ধর্মের অনুসারী। যতক্ষণ পর্যন্তনা তরবারি আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয় ততক্ষণ আমরা একই বিশ্বাসের অধিকারী , তাই তোমাদের উপদেশ দেয়া আমার উপর বাধ্যতামূলক কিন্তু যখন তরবারি আমাদের মাঝে চলে আসবে তখন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে এবং তখন আমরা হবো আরেক জাতি এবং তোমরা অন্য এক। আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা করেছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) বংশধর দিয়ে , যেন তিনি জানতে পারেন তোমরা এবং আমরা কী করি। আমরা এখন তোমাদের আহ্বান করছি তাকে (ইমাম হোসেইনকে) সাহায্য করার জন্য এবং তোমাদেরকে আহ্বান করছি উচ্ছৃঙ্খল পিতার উচ্ছৃঙ্খল সন্তান উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদকে পরিত্যাগ করার জন্য , যার কাছ থেকে তোমরা খারাপ ছাড়া আর কিছু দেখোনি। তারা তোমাদের চোখে লোহার রড বিদ্ধ করে , তোমাদের হাত ও পা কেটে ফেলে , তারা তোমাদেরকে ক্রুশ বিদ্ধ করে এবং তোমাদের কান ও নাক কেটে ফেলে। তারা তোমাদের মাঝে ধামিক ও বুদ্ধিমানদের হত্যা করে যেমন , হুজর বিন আদি ও তার সাথী হানি বিন উরওয়াহ এবং তার মতো অন্যদের। ” বর্ণনাকারী বলে যে , যখন তারা তার বক্তব্য শুনলো তারা যুহাইরকে গালাগালি করতে লাগলো এবং উবায়দুল্লাহর প্রশংসা করতে লাগলো এবং বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা এখান থেকে পিছু হটবো না যতক্ষণ পর্যন্তনা আমরা তোমার অভিভাবক ও তার সাথে যারা আছে তাদের সবাইকে হত্যা করি অথবা তাকে তার সাথীদেরসহ সেনাপতি উবায়দুল্লাহর কাছে পাঠাই যুদ্ধ ছাড়া। ”
তখন যুহাইর বললেন ,“ হে আল্লাহর দাসেরা , ফাতিমা (আ.) এর সন্তান সুমাইয়ার সন্তানের চাইতে বন্ধুত্বের ও সাহায্যের জন্য যোগ্যতর। যদি তোমরা তাকে সাহায্য না করো , তাহলে আল্লাহর শপথ , তাকে আশ্রয় দাও এবং তাকে হত্যা করো না। তাকে তার চাচাতো ভাই ইয়াযীদের কাছে নিয়ে যাও। আমার জীবনের শপথ , ইয়াযীদ তোমাদের উপর খুশী হবে যদি তোমরা তাকে হত্যা না কর। ” তা শুনে শিমর তার দিকে একটি তীর ছুঁড়ে বললো ,“ চুপ করো , তোমার কণ্ঠ বন্ধ হোক , নিশ্চয়ই তুমি তোমার অতিরিক্ত বক্তৃতায় আমাদের ক্লান্তকরে ফেলেছো। ” যুহাইর বললেন ,“ হে বেদুইনের সন্তান , আমি তোমার সাথে কথা বলছি না। নিশ্চয়ই তুমি একটা পশু এবং আল্লাহর শপথ , আমি মনে করি তুমি কোরআনের দুটি আয়াতও সঠিকভাবে তেলাওয়াত করতে পারো না। তাই আমি তোমাকে সুসংবাদ দিচ্ছি কিয়ামতের দিনে অপমান ও যন্ত্রনাদায়ক আযাবের। ” শিমর বললো ,“ খুব শীঘ্রই আল্লাহ তোমাকে ও তোমার অভিভাবককে হত্যা করবে। ” যুহাইর বললেন ,“ তুমি কি আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাচ্ছো ? আল্লাহর শপথ , ইমামের সাথে মৃত্যুবরণ করা আমার কাছে বেশী পছন্দনীয়। ”
এরপর যুহাইর অন্য লোকদের দিকে ফিরলো এবং বললো ,“ হে আল্লাহর দাসেরা , সতর্ক হও , হয়তো এই ঘৃণ্য অত্যাচারীরা এবং তাদের সহযোগীরা তোমাদের ধোঁকা দিবে। আল্লাহর শপথ , মুহাম্মাদ (সা.) এর শাফায়াত তাদের কাছে পৌঁছবে না যারা তার বংশের ও পরিবারের রক্ত ঝরাবে এবং যারা তাদেরকে সাহায্য করে ও তাদের পবিত্রতা রক্ষা করে তাদেরকে হত্যা করবে। ”
তখন এক ব্যক্তি উচ্চকণ্ঠে তাকে ডেকে বললো ,“ আবু আব্দুল্লাহ (ইমাম হোসেইন) বলেছেন যে , আমার জীবনের শপথ , হে যুহাইর , ফেরত আসো। নিশ্চয়ই তুমি উপদেশ দিয়েছো এবং তিরস্কার করেছো , ফেরাউনের জাতির ভেতর ঐ বিশ্বাসীর মত , যে তার সম্প্রদায়কে উপদেশ দিয়েছিলো ও তিরস্কার করেছিলো। ”
বুরাইর বিন খুযাইরের বক্তব্য
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ বর্ণিত আছে যে মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব বলেছেন যে , উমর বিন সা’ আদের সেনাবাহিনী ঘোড়ায় চড়লো এবং সামনে অগ্রসর হলো। ইমামও তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং তার কিছু সাথীদের নিয়ে তাদের দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি বুরাইর বিন খুযাইরকে , যিনি তার সামনে ঘোড়ার পিঠে চলছিলেন , বললেন তুমি এ লোকগুলোর সাথে কথা বলতে পারো , তাই বুরাইর সামনে এগিয়ে গেলেন এবং বললেন ,“ হে জনতা , আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর আমানত তোমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন। তারা তার বংশধর , পরিবার , কন্যাগণ এবং আহলুল বাইত। তাই বলো তোমাদের হৃদয়ে কী আছে এবং কিভাবে তাদের সাথে আচরণ করতে চাও ?” তারা বললো ,“ আমরা চাই তাকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের হাতে তুলে দিতে , যেন সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাকে নিয়ে কী করতে হবে। ” বুরাইর বললেন ,“ তোমরা কি একমত নও যে তোমরা তাকে চলে যেতে দিবে যেখান থেকে তিনি এসেছেন ? হে কুফার জনগণ , তোমরা কি চিঠিগুলোর কথা ভুলে গেছো যা তোমরা তাকে লিখেছিলে এবং সেই অঙ্গীকারের কথা যা তোমরা তাকে করেছিলে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে ? তোমাদের জন্য আক্ষেপ , তোমরা নবীর আহলুল বাইতকে আমন্ত্রণ জানিয়েছো এবং অঙ্গীকার করেছো তার জন্য জীবন উৎসর্গ করবে এবং যখন তারা এসেছেন , তোমরা চাচ্ছো তাকে যিয়াদের সন্তানের কাছে তুলে দিতে এবং তার জন্য পানি পাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছো ? নবীর ইন্তেকালের পর কত খারাপ ভাবেই না তোমরা তার বংশধরের সাথে আচরণ করেছো , তোমাদের কী হয়েছে ? আল্লাহ যেন কিয়ামতের দিন তোমাদের পিপাসা না মেটান কারণ নিশ্চয়ই তোমরা একদল পরিপূর্ণ বদমাশ মানুষ। ”
কুফার লোকদের মাঝ থেকে কিছু লোক বললো ,“ তুমি কী বলছো আমরা বুঝি না। ” বুরাইর বললেন ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর , যে আমাকে তোমাদের মাঝে সঠিক দৃষ্টি সম্পন্ন করেছেন। হে আল্লাহ , আমি তাদের বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে তোমার কাছে এসেছি , হে আল্লাহ তাদের ভিতরে ভীতির সৃষ্টি করো যতক্ষণ না তারা তোমার কাছে উপস্থিত হয় যেন তুমি তাদের প্রতি ক্রোধান্বিত হও। ” তা শুনে তারা তার দিকে তীর ছুঁড়তে লাগলো এবং বুরাইর পিছনে হটে এলেন। ইমাম আরও অগ্রসর হলেন এবং তাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং তাদের সারিগুলো দিকে তাকালেন শান্তবৃষ্টির মত। তিনি উমর বিন সা’ আদকে কুফার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন এবং বললেন ,“ ধন্যবাদ আল্লাহর প্রাপ্য , যিনি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং একে মৃত্যু ও ক্ষয়ের বাড়ি বানিয়েছেন এবং যিনি এর মানুষদেরকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করেন। সে ব্যক্তি ধোঁকা খেয়েছে যে এই পৃথিবীর প্রতারণার শিকার হয়েছে , কারণ যে এর উপর নির্ভর করে সে তাকে হতাশ করে। যে এখানে আকাঙ্ক্ষা করে সে তাকে রিক্ত হস্তকরে। আমি দেখতে পাচ্ছি তোমরা জড়ো হয়েছো এমন একটি কাজের জন্য যা তোমাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ আনবে। তিনি তোমাদের দিক থেকে তার চেহারা ঘুরিয়ে নিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তার ক্রোধে ঢেকে দিয়েছেন এবং তোমাদের কাছ থেকে তার রহমত সরিয়ে নিয়েছেন। তাই আমাদের রব হলেন শ্রেষ্ঠ রব ও আর তোমরা হচ্ছো নিকৃষ্টতম দাস। তোমরা আল্লাহকে মেনে চলার অঙ্গীকার করেছো এবং তার রাসূল মুহাম্মাদ (সা.) কে বিশ্বাস করেছো। এরপরও তোমার তার পরিবারকে এবং বংশধরকে আক্রমণ করেছো এবং তাদেরকে হত্যা করতে চাও। [ইরশাদ] শয়তান তোমাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং তোমাদেরকে সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভুলিয়ে দিয়েছে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য , তোমাদের পথ ও লক্ষ্যের উপর। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছে ফেরত যাবো। এ এক জাতি যারা বিশ্বাস গ্রহণের পর কুফুরী গ্রহণ করেছে , তাই বিদায় হে অত্যাচারী জাতি। ”
তখন উমর বিন সা’ আদ বললো ,“ তোমাদের জন্য আক্ষেপ , তাকে উত্তর দাও , কারণ সে আলীর সন্তান। সে যদি সারা দিন তোমাদের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে তার বক্তব্য শেষ হবে না , না সে ক্লান্ত হবে । ” তখন শিমর এগিয়ে এলো এবং বললো ,“ হে হোসেইন , তুমি কী বলছো ব্যাখ্যা কর যেন আমরা বুঝতে পারি। ” ইমাম বললেন ,“ আমার বক্তব্যের মূল কথা হল যে আমি তোমাদের বলছি আল্লাহকে ভয় করার জন্য এবং আমাকে হত্যা করো না। কারণ আমাকে হত্যা ও আমার পবিত্রতা ধ্বংস করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। কারণ আমি তোমাদের নবী (সা.) এর কন্যার সন্তান এবং আমার নানী খাদিজা (আ.) , তোমাদের নবীর স্ত্রী। তোমরা হয়তো আমার নানাকে বলতে শুনে থাকবে যে , হাসান এবং হোসেইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার। ”
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আছে যে‘ মানাক্বিব ’ -এ বর্ণনার ক্রমধারাসহ বর্ণিত আছে যে , আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান বিন আব্দুল্লাহ বিন হাসান তার বাবা থেকে বর্ণনা করেন , তিনি তার বাবা থেকে , তিনি আব্দুল্লাহ থেকে যে , তিনি বলেছেন যে , উমর বিন সা’ আদ তার সৈন্যবাহিনীকে প্রস্তুত করলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে আক্রমণ করার জন্য এবং সারিবদ্ধ করলো এবং তাদের সাজালো এবং যথাযথ জায়গায় পতাকা উড়ালো এবং ডান ও বাম শাখার নেতৃত্বে অধিনায়ক নির্বাচন করার পর সে তার সেনাবাহিনীর দিকে ফিরলো এবং তাদেরকে তাদের যার যার জায়গায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করতে বললো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) কে ধরতে বললো। এরপর তারা ইমাম হোসেইন (আ.) কে সবদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো। তিনি বের হয়ে এলেন এবং তাদের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে চুপ থাকার ইঙ্গিত করলেন , কিন্তু তারা তা শুনতে অস্বীকার করলো। তখন ইমাম বললেন ,“ তোমাদের জন্য দুর্ভোগ , তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা চুপ করছো না এবং আমি যা বলছি তা শুনছো না ? আমি তোমাদেরকে ধার্মিকতার পথে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। যে আমাকে মান্য করবে সে প্রজ্ঞাবান হবে। আর যে আমাকে মান্য করবে না সে ধ্বংস হবে। তোমরা সবাই আমার অবাধ্য হচ্ছো এবং আমার কথায় কান দিচ্ছো না। এর কারণ হলো তোমরা তোমাদের পেট হারামে পূর্ণ করেছো এবং তোমাদের হৃদয়গুলোতে মোহর মারা হয়েছে। আক্ষেপ তোমাদের জন্য। তোমরা কি ন্যায়পরায়ণ নও এবং শুনতে অক্ষম ?”
এ কথা শুনে লোকেরা পরস্পরকে চুপ না থাকার জন্য বকাঝকা করতে লাগলো। তখন ইমাম এক খোতবা দিলেন যা , ইনশাআল্লাহ এর পরে উল্লেখ করা হবে (যেভাবে সাইয়েদ ইবনে তাউস ‘ মালহুফ ’ -এ উল্লেখ করেছেন) ।
এরপর তিনি ডাকলেন ,“ উমর বিন সা’ আদ কোথায় ?” কেউ তাকে ডাকলো , কিন্তু সে ইমামের মুখোমুখি হতে অপছন্দ করলো , ইমাম তাকে বললেন ,“ হে উমর , তুমি কি আমাকে হত্যা করতে চাও যেন অবৈধ পিতার অবৈধ সন্তান তোমাকে রেই ও জুরজানের শাসনভার দেয় ? আল্লাহর শপথ , তোমার এই চাওয়া কখনোই পূরণ হবে না , কারণ আমার (হত্যার) পর তুমি কখনো আনন্দ পাবে না , না এ পৃথিবীতে না আখেরাতে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি কুফাতে একটি তরবারির মাথায় তোমার মাথা এবং শিশুরা এর দিকে লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়ে মারছে। ”
উমর ইমামের কথায় খুবই ক্রোধান্বিত হল। সে তখন তার চেহারা তার দিক থেকে ফিরিয়ে তার সেনাবাহিনীকে বললো ,“ তোমরা কিসের জন্য অপেক্ষা করছো ? তাদের আক্রমণ করো , কারণ তারা এক লোকমা খাবার ছাড়া কিছু নয়। ”
কুফাবাসীদের প্রতি ইমাম হোসেইন (আ.) এর বক্তব্য
সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার উটে চড়লেন (অন্যরা বলেন তার ঘোড়ায়) এবং তাদের ইশারা করলেন চুপ করার জন্য। এরপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ ও মর্যাদা বর্ণনা করলেন যা তার প্রাপ্য। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় সালাম পাঠালেন ফেরেশতা , নবী ও রাসূলদের উপর। তারপর বললেন ,“ হে জনতা , তোমরা যেন ধ্বংস হও , দুর্দশাগ্রস্ত হও। তোমরা উৎসাহের সাথে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে তোমাদের সাহায্য করার জন্য এবং আমরা তা করার জন্য দ্রুত অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু তোমরা এখন সে তরবারিগুলো কোষমুক্ত করেছো যা আমরা তোমাদের দিয়েছি এবং তোমরা আমাদের জন্য আগুন জ্বালিয়েছো যা আমরা তোমাদের ও আমাদের শত্রুদের জন্য জ্বালিয়েছিলাম। তোমরা তোমাদের শত্রুদের পক্ষ নিয়েছো এবং তাদের সাথে থেকে তোমাদের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অগ্রসর হয়েছো , যদিও তারা তোমাদের সাথে ন্যায়পরায়ণ আচরণ করে নি , না তোমরা তাদের কাছ থেকে কোন দয়া ও সদয় আচরণ আশা কর। তোমাদের উপর শত দুর্ভোগ আসুক। তোমরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো যখন তরবারিগুলো এখনও তাদের খাপে রয়েছে , হৃদয়গুলো শান্তিতে আছে , মতামতগুলো যথাযথভাবে স্পষ্ট এবং ভুল থেকে মুক্ত। কিন্তু তোমরা পঙ্গপালের মত , যারা যুদ্ধের দিকে ” দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং মথের (প্রজাপতি) মত , একজনের উপর আরেকজন যেমন পড়ে। তোমরা ধ্বংস হও , হে যারা দাসীদের প্রেমিক , যারা দলত্যাগ করেছো , যারা কোরআন পরিত্যাগ করেছো , যারা সঠিক বক্তব্যকে বদলে নিয়েছো , যারা খারাপের স্তম্ভ , হে যারা শয়তানদের দ্বারা উস্কানি পাচ্ছো এবং যারা আসমানী আদেশ ছিন্নকারী , তোমরা তাদের পক্ষ নিচ্ছো এবং আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো ? হ্যাঁ , নিশ্চয়ই প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করা তোমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য , যা তোমাদের পিতৃপুরুষেরা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা থেকে শাখা বেরিয়েছে। তোমরা নোংরা এবং এর বিস্বাদ ফল এর বপনকারীর গলায় আটকে যায় এবং তা অত্যাচারীদের কাছে আনন্দের। সাবধান , এখন অবৈধ পিতার অবৈধ সন্তান (উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ) আমাকে তরবারি কোষমুক্ত করা ও অপমান সহ্য করার মাঝে স্থাপন করেছে এবং আমরা অপমান গ্রহণ করবো তা কখনোই হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূল এবং পবিত্র কোলগুলো যা আমাদের দুধ খাইয়েছে , যারা ভদ্র ও যারা অপমান ঘৃণা করে তারা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে যে , আমরা ঘৃণ্য মানুষদের কাছে মাথা নোয়াবো এবং তারা আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এ বিষয়ে যুদ্ধের ময়দানে পৌরুষের সাথে নিহত হতে। জেনে রাখো , আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো যদিও আমার সাথে রয়েছে অল্প কয়েকজন মানুষ এবং যদিও কিছু ব্যক্তি আমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। ”
ইবনে আবিল হাদীদ মুতাযিলি তার‘ শরহে নাহজুল বালাগা ’ তে যা উল্লেখ করেছেন তা এখানে উদ্ধৃতি দেয়া যথাযথ হবে। যারা অত্যাচার ও অপমানের মুখে মাথা নোয়াতে অস্বীকার করে তাদের বিষয়ে তিনি বলেছেন , সম্মানিত অভিভাবক , যিনি যুদ্ধের আবেগ শিক্ষা দিয়েছেন এবং উচ্চ স্থান অধিকার করেছেন , অপমানিত হওয়ার বদলে তরবারির নিচে সম্মানের সাথে জীবন দিয়েছেন , তিনি হলেন আবু আব্দুল্লাহ হোসেইন বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) তাকে ও তার সাথীদেরকে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছিল , কিন্তু তিনি অপমান গ্রহণ করেন নি , (তারপর তিনি আগের খোতবাটি উল্লেখ করেছেন) । তিনি (ইবনে আবিল হাদীদ) আরও বলেন যে ,“ আমি বসরার নেতা আবু যাইদ ইয়াইয়া বিন যাইদ আলাউইকে বলতে শুনেছি যে , মুহাম্মাদ বিন হামীদ তাঈ ’ র যে কবিতা আবু তাম্মায সংকলন করেছেন তা ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য যথাযথ হয়: মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়া সহজ ছিলো , কিন্তু তার প্রাণ তাকে এদিকে ফেরত পাঠিয়ে দিলো , যিনি অত্যাচারকে ঘৃণা করতেন , যেন ভয় হলো ধর্মদ্রোহিতা , তাই তিনি মৃত্যুর ঘূর্ণিবায়ুতে দৃঢ় ছিলেন , তিনি মৃত্যুকে বললেন , তোমার তরবারির নিচে রয়েছে পুনরুত্থান , তিনি মৃত্যুর পোষাক পড়লেন , রাত্র তখনও আসে নি যখন তা সবুজ রেশমের পোষাকে পরিণত হল।”
সিবতে ইবনে জাওযি বলেন যে , আমার দাদা‘ তাবসিরাহ ’ তে বলেছেন যে ইমাম হোসেইন (আ.) কুফার দিকে গেলেন , কারণ তিনি দেখতে পেয়েছিলেন ইসলামের খোদায়ী আইন ভঙ্গ করা হচ্ছিলো , তাই তিনি এর মূলনীতিগুলোকে দৃঢ় ও শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। যখন তারা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেললো এবং তাকে (উবায়দুল্লাহ বিন) যিয়াদের আদেশের সামনে মাথা নত করতে বললো , তিনি তা করতে অস্বীকার করলেন এবং অপমান ও অসম্মানের ওপরে শহীদ হওয়াকে মর্যাদা দিলেন এবং উদগ্রীব সত্তাগুলো এরকমই হয়। তারপর তিনি কিছু কবিতা উল্লেখ করেছেন ,“ যখন তারা দেখলেন জীবন তাদের জন্য অপমানকর এবং সম্মানিত মৃত্যু অবৈধ নয় , তারা সে ধরনের জীবনের স্বাদ নিতে অস্বীকার করলেন যে জীবনে অপমান নিহিত রয়েছে। তখন তারা এমন মৃত্যুবরণ করলেন যাতে কোন তিরস্কার ছিলো না। এটি আশ্চর্য কিছু নয় যে অভিশপ্ত আরব ও অনারব কুকুরগুলো এক পুরুষ সিংহকে খেয়ে ফেলেছে , কারণ ওয়াহশি প্রতারণা ছিলো হাম্মাহর মৃত্যুর কারণ এবং আলী খুন হয়েছিলেন ইবনে মুলজিমের তরবারিতে।”
এখানে আমরা কিছু উক্তি উল্লেখ করছি আহলুল বাইতের (আ.) এর প্রশংসায়। ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য বিলাপ করেছেন লেখক সাইয়েদ হায়দার:“ জাতি চেয়েছিলো যে তিনি অত্যাচারিত হন , কিন্তু আল্লাহ এবং বিদ্যুৎগতি তরবারি তা অস্বীকার করলো , কিভাবে তিনি তার মাথা নত করবেন অপমান ও অসম্মানের সামনে যিনি আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হন নি , তিনি মেনে নিতে অস্বীকার করলেন , বরং চাইলেন একটি সম্মানের জীবন এবং চাইলেন যুদ্ধক্ষেত্রকে পরিষ্কার করতে যেন এর ওপরে তাকে ছুড়ে ফেলা হয় এবং তিনি শুয়ে পড়তে পারেন ; তিনি একটি সেনাবাহিনীর সাথে লড়লেন , তার সত্ত্বার প্রতিটি অংশ এক একটি বিরাট সেনাবাহিনী ছিলো। তিনি লোকদের আত্মাগুলোকে তরবারির সাথে বিয়ে দিলেন যার মোহরানা ছিলো মৃত্যু এবং মেহদি ছিলো রক্ত। ”
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) ফারওয়া বিন মাসীক মুরাদির কবিতা আবৃত্তি করেন:
আমরা আমাদের শত্রুদের যদি পরাজিত করি , আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে থাকবো , যদি আমরা পরাজিত হই , তা হবে শুধু একবার , যারা আমাদের দুঃখ কষ্টে উল্লাস করে তাদের বলো , জেগে ওঠো , কারণ তোমরাও শেষ পর্যন্ত আমাদের মত হবে , যখন মৃত্যু এর থাবা কারো ঘাড় থেকে সরিয়ে নেয় , তা অবশ্যই অন্যদের সাথে লেগে থাকবে , তাই আল্লাহর শপথ , তোমরা পৃথিবীতে একটি ঘোড়ায় চড়ার মত সময়ের চাইতে বেশী আর থাকবে না , তখন পৃথিবী তোমাদের যাতার মত ঘোরাবে এবং ঘুরবে এর অক্ষকে কেন্দ্র করে , এটি আমার বাবা (আ.) আমাকে দিয়েছেন , যিনি তা পেয়েছেন আমারা নানা (সা.) থেকে।
) فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَيَّ وَلَا تُنْظِرُون(
তোমাদের পরিকল্পনা ও তোমাদের সাথীদেরকে জড় করো এবং তোমাদের পরিকল্পনা যেন দ্বৈত অর্থ বহন না করে , তারপর তা আমার উপর প্রয়োগ করো এবং (আমাকে) কোন সময় দিও না। [সূরা ইউনূস: ৭১]
) إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ(
“ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর উপর নির্ভর করি , আমার রব এবং তোমাদের রব , কোন জীবিত প্রাণী নেই , যার কপালের চুল তার হাতে নেই। নিশ্চয়ই আমার রব সঠিক পথের ওপরে আছেন। ” [সূরা হুদ: ৫৬]
হে আল্লাহ , তাদের কাছ থেকে আকাশের বৃষ্টি তুলে নিন এবং তাদেরকে অনাবৃষ্টিতে জড়িয়ে যেতে দিন ইউসুফ (আ.) এর সময়ের মত এবং বনি সাকীহর এক ব্যক্তিকে (মুখতার বিন আবু উবায়দা সাক্বাফীকে) তাদের উপর নিয়োগ দিন , যে তাদের গলায় তিক্ত পেয়ালা ঢেলে দিবে। কারণ তারা মিথ্যা বলেছে এবং আমাদের পরিত্যাগ করেছে। আপনি আমাদের রব , আপনার ওপরে আমরা নির্ভর করি এবং আপনার দিকেই আমরা ফিরি এবং আপনার সামনেই (সবকিছুর) শেষ।
এরপর তিনি তার উট থেকে নামলেন এবং রাসূল (সা.) এর ঘোড়ায় চড়লেন , যার নাম ছিলো মুরতাজায এবং তার সাথীদেরকে সাজাতে শুরু করলেন ।
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] উমর বিন সা’ আদ সামনে এগিয়ে এলো এবং ইমামের সেনাদলের দিকে একটি তীর ছুঁড়লো এবং বললো ,“ সেনাপতির সামনে সাক্ষী থেকো যে আমিই ছিলাম প্রথম যে তীর ছুঁড়েছিলো। ” তখন তার অধীনে যারা ছিলো তারা তীর ছুঁড়তে লাগলো বিরাট সংখ্যায় যা পাখির মত দেখাতে লাগলো। ইমাম তার সাথীদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,
“ আল্লাহ তাঁর রহমত তোমাদের উপর বর্ষণ করুন , জাগো অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মুখোমুখি হতে এবং এই তীরগুলো সেনাবাহিনীর দূত যা আমাদের দিকে আসছে। ”
এরপর তারা দিনের এক অংশে আক্রমণ করে এবং ইমামের একদল সাথী নিহত হন। বর্ণনাকারী বলেন যে ইমাম হোসেইন (আ.) নিজের দাড়ি ধরে বললেন ,
“ আল্লাহর ক্রোধ চরম হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ইহুদীদের উপর যখন তারা বলেছিলো তাঁর একটি ছেলে আছে এবং তাঁর রাগ খৃস্টানদের উপর পরে যখন তারা তাঁকে তিন জনের একজন বানিয়েছিলো এবং তাঁর ক্রোধ গিয়ে অগ্নি উপাসকদের (মাজুসদের) উপর পড়েছিলো যখন তারা তাঁর পরিবর্তে সূর্য ও চাঁদের ইবাদত করতে শুরু করেছিলো এবং এখন আল্লাহর ক্রোধ পড়বে এ সম্প্রদায়ের উপর যারা একত্রিত হয়েছে নবীর নাতিকে হত্যার জন্য। সাবধান , আল্লাহর শপথ , আমি তাদের আশার সাথে একমত হবো না যতক্ষণ না আমি আমার রবের সাথে মিলিত হই আমার রক্তে ভিজে। ”
আমাদের অভিভাবক ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বর্ণনা করেন যে , আমি আমার বাবা ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) কে বলতে শুনেছি যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এবং উমর বিন সা’ আদ (তার উপর আল্লাহর অভিশাপ)-এর মুখোমুখি হলো এবং যুদ্ধ শুরু হলো। আল্লাহ বিজয়কে পাঠালেন (ফেরেশতার আকার দিয়ে) ইমাম হোসেইন (আ.) এর জন্য , যারা তাদের পাখা নাড়ছিলো তার মাথার উপর। তারা তাকে শত্রুর ওপরে বিজয় অথবা আল্লাহর সাক্ষাত বেছে নিতে বললেন এবং তিনি আল্লাহর সাক্ষাতকে প্রাধান্য দিলেন।
সম্মানিত উস্তাদ এবং অনেক বইয়ের লেখক , সাইয়েদ আব্দুল্লাহ বিন শুব্বার হাসানী কাযমী তার বই‘ জালাউল উয়ুন ’ -এ লিখেছেন যে , সে মুহূর্তে একদল জিন উপস্থিত হলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করার জন্য এবং অনুমতি চেয়েছিলো যুদ্ধ করার জন্য , কিন্তু তিনি তাদের অনুমতি দিলেন না এবং এ পৃথিবীতে অপমানকর জীবনের চাইতে সম্মানের সাথে শাহাদাতকে বেছে নিলেন। তার ওপরে সালাম।
পরিচ্ছেদ - ১৯
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের যুদ্ধের প্রশংসা ও তাদের শাহাদাত
আবুল হাসান সাঈদ বিন হিবাতুল্লাহ , যিনি কুতুবুদ্দিন রাওয়ানদি নামে সুপরিচিত , বর্ণনা করেছেন তার সূত্র উল্লেখ করে ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) থেকে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার শাহাদাতের আগে তার সাথীদের বলেন যে , তার নানা রাসূল (সা.) তাকে বলেছেন , “ হে আমার প্রিয় সন্তান , তোমাকে হত্যা করা হবে ইরাকে এবং এটি এমন এক স্থান যেখানে নবীরা , তাদের উত্তরাধিকারীরা এবং রাসূলরা পরস্পরের সাথে সাক্ষাত করেছে এবং একে আমূরা বলা হয়। তোমাকে সে স্থানে হত্যা করা হবে তোমার একদল সাথীর সাথে। তোমার যুদ্ধ হবে শুধু ঠাণ্ডা ও প্রশান্তির। ”
তাই সুসংবাদ গ্রহণ করো যে আল্লাহর শপথ , যদি তারা আমাদের হত্যা করে , আমরা আমাদের রাসূল (সা.) এর কাছে চলে যাবো।
আবু হামযা সুমালী , ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন , তার শাহাদাতের আগের রাতে আমার পিতা তার পরিবার ও সাথীদের একত্র করলেন এবং বললেন ,
“ হে আমার পরিবারের লোকেরা ও আমার শিয়ারা (অনুসারীরা) , এ রাতকে ভেবে দেখো তোমাদের কাছে এসেছে একটি বহনকারী উট হয়ে এবং নিজেদেরকে রক্ষা করো , কারণ এই লোকেরা আমাকে ছাড়া কাউকে চায় না। এরপর যদি তারা আমাকে হত্যা করে তারা তোমাদর পিছু নিবে না। আল্লাহ তোমাদের ওপর রহমত করুন , নিজেদেরকে রক্ষা করো। নিশ্চয়ই আমি আনুগত্য ও শপথের দায়ভার তুলে নিচ্ছি যা তোমরা আমার হাতে করেছো। ”
এ কথা শুনে তার ভাইয়েরা , আত্মীয়রা এবং সাথীরা একযোগে বলে উঠলেন ,“ আল্লাহর শপথ , হে আমাদের অভিভাবক , হে আবা আবদিল্লাহ আমরা আপনার সাথে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করবো না , তাতে লোকে বলবে আমরা আমাদের ইমাম , আমাদের প্রধান ব্যক্তি এবং অভিভাবককে পরিত্যাগ করেছি , তাকে শহীদ করা পর্যন্ত। তখন আমরা আল্লাহ ও আমাদের মাঝে ওজর খোঁজ করবো। আমরা আপনাকে ত্যাগ করবো না , যতক্ষণ না আপনার জন্য কোরবান হই। ” ইমাম বললেন , “
“ নিশ্চয়ই আমি আগামীকাল নিহত হব এবং তোমাদের সবাই আমার সাথে নিহত হবে এবং তোমাদের কাউকে রেহাই দেয়া হবে না। ” এতে তারা বললো ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর , যে তিনি আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং আপনার সাথে শহীদ হওয়ার সম্মান দান করেছেন। তাই আমরা কি পছন্দ করবো না যে আমরা আপনার সাথে উচ্চ সম্মান (স্থান) অর্জন করি , হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান ?” ইমাম বললেন ,
“ আল্লাহ তোমাদের উপযুক্ত পুরস্কার দিন। ”
তখন তিনি সবার জন্য দোআ করলেন , যখন সকাল হলো , তাদের সবাইকে শহীদ করা হলো। শেইখ সাদুক্ব ¡¡ বর্ণনা করছেন সালিম বিন আবু জা ’ দাহ থেকে , যিনি বলেন , আমি কা‘ আব আল আহবারকে বলতে শুনেছি যে ,“ আমাদের বইগুলোতে উল্লেখ আছে যে , মুহাম্মদ (সা.) এর সন্তানদের মধ্যে একজনকে হত্যা করা হবে এবং তারা (শহীদরা) বেহেশতে প্রবেশ করবে তার সাথীদের যখম শুকানোর আগেই এবং হুরগণ তাদের স্পর্শ করবে। ” তাই যখন ইমাম হাসান (আ.) আমাদের পাশ দিয়ে গেলেন , আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম তিনিই সেই ব্যক্তি কিনা (যার কথা বইগুলোতে উল্লেখ আছে) , তিনি‘ না ’ বললেন এবং যখন ইমাম হোসেইন (আ.) আমাদের পাশ দিয়ে গেলেন , আমরা তাকে একই প্রশ্ন করলাম তিনি‘ হ্যাঁ ’ বললেন।
বর্ণিত আছে যে , ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) কে জিজ্ঞেস করা হল যে , দয়া করে আমাদের কাছে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের অবস্থা ও তাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে বর্ণনা করুন। ইমাম বললেন ,
“ তাদের চোখের উপর থেকে পর্দা সরিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং তারা বেহেশতে তাদের স্থান দেখতে পাচ্ছিলেন। তাই তারা জীবন উৎসর্গ করতে পরস্পরকে অতিক্রম করলেন যেন তারা হুরদের সাথে সাক্ষাত করতে পারেন , তাদের সোহাগ পেতে পারেন এবং বেহেশতে তাদের স্থানে পৌঁছে যেতে পারেন। ”
এটি যিয়ারতে নাহিয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। শহীদদের নামের উদ্ধৃতি দেয়ার পর বলা হয়েছে ,
“ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ আপনাদের চোখের সামনে থেকে পর্দা তুলে নিয়েছিলেন এবং আপনাদের উপহার দিয়েছিলেন বিছানো বিছানা ও বিরাট উপহারসমূহ। ”
ধারাবাহিক বর্ণনাকারীদের মধ্যে‘ মা ’ আনিয়াল আখবার ’ গ্রন্থে ইমাম মুহাম্মাদ আত তাক্বী (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে , তিনি তার পবিত্র পূর্ব পুরুষ (আ.) দের কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন , যা ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) পর্যন্ত পৌঁছেছে , তিনি বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিজয় কঠিন হয়ে দাঁড়ালো , তার সহযাত্রীরা তাকে ভিন্ন অবস্থায় দেখতে পেলেন , যা অন্যদের মত নয়। পরিস্থিতি যত কঠিন হতে থাকলো তাদের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেলো এবং তারা কাঁপতে লাগলেন এবং তাদের অন্তর ভীতিপূর্ণ ছিল। কিন্তু ইমাম হোসেইন (আ.) এবং তার কিছু বিশিষ্ট সাথী ছিলেন হাসিমুখে ও প্রশান্তিতে। তারা পরস্পরকে বলছিলেন ,“ তোমরা দেখছো না তারা মৃত্যুকে সামান্যতম ভয় পায় না। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ সহ্য কর , হে সম্মানিতদের সন্তানরা , মৃত্যু একটি সাঁকো ছাড়া কিছু নয়। যা তোমাদেরকে কষ্টের ও দুর্দশার জায়গা থেকে অনন্ত বেহেশত ও চির প্রশান্তির জায়গায় নিয়ে যাবে। তাই তোমাদের মধ্যে কে আছে যে চায় না কারাগার থেকে মুক্তি এবং প্রাসাদগুলোর দিকে দ্রুত যেতে ? আর তোমাদের শত্রুদের জন্য মৃত্যু হলো এমন যে , তাদেরকে প্রাসাদগুলো থেকে কারাগারে স্থানান্তরিত করা হবে এবং আল্লাহর ক্রোধের শিকার হবে। আমি আমার বাবা ইমাম আলী (আ.) থেকে শুনেছি , যিনি রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেছেন যে , এ পৃথিবী বিশ্বাসীদের জন্য কারাগার এবং অবিশ্বাসীদের জন্য বেহেশত। আর মৃত্যু হল তাদের (বিশ্বাসীদের) জন্য বেহেশতে প্রবেশের একটি সাঁকো এবং তাদের (অবিশ্বাসীদের) জন্য জাহান্নামে প্রবেশের পথ , না আমি মিথ্যা বলছি এবং না আমাকে মিথ্যা বলা হয়েছে। ”
কুরাইশদের মূর্তিপূজকদের পথভ্রষ্টতা ও বিধ্বংসী বিদ্রোহ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন ,
) وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مِنَ الْأَنْبَاءِ مَا فِيهِ مُزْدَجَرٌ (৪) حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ فَمَا تُغْنِ النُّذُر(
এবং নিশ্চয়ই তাদের কাছে সতর্ক বাণীর কিছু অংশ এসেছে , যেখানে আছে আত্মনিয়ন্ত্রণ (খারাপ থেকে) , পরিপূর্ণ প্রজ্ঞা , কিন্তু (তারা) সতর্ক বাণী গ্রহণ করে নি। ” [সূরা ক্বামার : ৪-৫]
উমর বিন সা’ আদের সেনাবাহিনীর অবস্থা ছিলো সে রকম। আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীদের বারবার বক্তৃতা , উপদেশ , প্রমাণ পূর্ণভাবে উপস্থিত করা এবং তাদের ভুল শুধরে দেয়া , কোনটিই তাদের কাজে লাগে নি।
আল হুর বিন ইয়াযীদ আর রিয়াহি ইমাম হোসাইন (আ.) এর সাথে যোগ দিলেন
যখন আল হুর দেখতে পেলেন লোকেরা ইমাম হোসেইনকে (আ.) হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং যখন তিনি ইমামকে বলতে শুনলেন ,
“ কেউ কি নেই যে আল্লাহর নামে আমাদের সাহায্য করতে দ্রুত আসবে ? কেউ কি নেই যে নবীর পরিবারকে সাহায্য করবে ?”
তখন আল হুর উমর বিন সা’ আদকে বললেন ,“ হে উমর , তুমি তাহলে সত্যিই এ মানুষটির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে ?’ সে বললো ,“ হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ , যুদ্ধ যদি সহজে ঘটে তাহলে তাতে মাথা গড়াবে এবং হাতগুলো কাটা যাবে। ” আল হুর বললেন ,“ তাহলে কি তার প্রস্তাব তোমার কাছ অগ্রহণযোগ্য ?” উমর বললো ,“ যদি পরিস্থিতি আমার হাতে থাকতো , আমি অবশ্যই তার অনুরোধে রাজী হতাম , কিন্তু তোমার সেনাপতি তা গ্রহণ করবে না। ” আল হুর তাকে ছেড়ে গেলেন এবং সবার কাছ থেকে দূরে আলাদা দাঁড়িয়ে রইলেন , তার সহযোগী কুররাহ বিন কায়েস তার সাথে ছিল। আল হুর বললেন ,“ হে কুররাহ , তুমি কি তোমার ঘোড়াকে আজ খাইয়েছো ?” সে না বললো। আল হুর বললেন ,“ তাহলে তুমি কি চাও না এর পিপাসা মেটাতে ?” কুররাহ বলে যে , আমি সন্দেহ করলাম যে , সম্ভবত সে যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চায় এবং সে চাইছিলো না যে আমি তাকে চলে যেতে দেখবো , তাই আমি বললাম ,“ আমি তা এখন করবো। ” এ কথা শুনে আল হুর সেখান থেকে সরে গেলেন। কুররাহ বলে যে ,“ আল্লাহর শপথ , যদি আল হুর শুধু আমার কাছে পাশক্র করতো সে কী করতে চাইছিলো আমি ও তার সাথে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে যেতাম। ” এরপর আল হুর ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে যাওয়া শুরু করল।
মুহাজির বিন আওস তাকে বললো ,“ হে ইয়াযীদের পুত্র , তুমি কী করতে চাচ্ছো ? তুমি কি অবরোধ আরোপ করতে চাও ?” আল হুর তাকে কোন উত্তর দিলেন না , কিন্তু তিনি কাঁপছিলেন। মুহাজির বললো ,“ সত্যিই , তোমার অবস্থা সন্দেহজনক , আমি তোমাকে কখনও কোন যুদ্ধে এই অবস্থায় দেখি নি যে অবস্থায় তুমি এখন আছো। যদি আমাকে প্রশ্ন করা হতো কে কুফাবাসীর মধ্যে সবচেয়ে সাহসী , আমি তোমার নাম বলতে দ্বিধা করতাম না। এ কী অবস্থায় এখন আমি তোমাকে দেখছি ?” আল হুর বললেন ,“ আমি নিজেকে বেহেশত ও দোযখের মাঝে দেখছি। আল্লাহর শপথ , আমি বেহেশতের উপর কোন কিছুর মর্যাদা দিব না , যদি আমাকে কেটে টুকরো করে অথবা পড়িয়েওু ফেলা হয়। ” এরপর আল হুর তার ঘোড়াকে আঘাত করলেন [মালহুফ] এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে যাওয়ার জন্য ঘুরলেন।
আল হুর তার দুহাত মাথার উপর রেখেছিলেন (বন্দীর মত) এবং বলছিলেন ,“ হে আল্লাহ , আমি আপনার দিকে ফিরছি , তাই আমাকে গ্রহণ করুন , কারণ আমি আপনার বন্ধুদের ও নবীর নাতির সন্তানদের হৃদয়ে ভয়ের সৃষ্টি করেছি। ”
[‘ ইরশাদ ’ ,‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] তাবারি বলেন যে , যখন তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীদের নিকটবর্তী হলেন , তিনি তার ঢাল উল্টো করে দিলেন এবং তাদেরকে সালাম জানালেন। এরপর তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে গেলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমি আপনার জন্য কোরবান হই , আমি ই আপনাকে ফিরে যাওয়া থেকে থামিয়েছি এবং আপনার সাথে আগাগোড়া ছিলাম এবং আপনাকে বাধ্য করেছি এখানে নামতে। কিন্তু আমি জানতাম না যে এই লোকগুলো আপনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করবে এবং আপনাকে বর্তমান অবস্থায় আনবে , আল্লাহর শপথ , যদি আমি জানতাম যে তারা আাপনার সাথে এ রকম করবে আমি সে কাজের দায়িত্ব নিতাম না যা আমি করেছি। তাই আমি এখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি সেজন্য যা আমি করেছি , তাই আপনি কি মনে করেন আমার তওবা গ্রহণ করা হবে ?”
ইমাম হোসেইন (আ.) উত্তরে বললেন ,“ আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করুন , তোমার ঘোড়া থেকে নেমে আসো। ”
আল হুর বললেন ,“ আমার জন্য ঘোড়ায় চড়ে থাকা এবং আপনার খেদমত করা ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উত্তম। এভাবেই শেষ পর্যন্ত আমাকে ঘোড়া থেকে নামতে হবে (যখন আমি আহত হব) । ”
তখন ইমাম বললেন ,“ তোমার উপর তোমার রব রহমত করুন , যা চাও করো। ”
তখন তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ হে কুফার লোকেরা , তোমাদের মায়েরা তোমাদের হারাক , তোমরা আল্লাহর সৎকর্মশীল বান্দাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে , এরপর যখন তিনি তোমাদের কাছে এলেন , তোমরা তাকে শত্রুর হাতে তুলে দিলে , অথচ তোমরা তার জীবন রক্ষার্থে জীবন দিতে চেয়েছিলে! এখন তোমরা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছো তাকে হত্যা করার জন্য! তোমরা তাকে আটক করেছো এবং তার জামার কলার ধরেছো এবং তাকে চারদিক থেকে ঘেরাও করেছো যেন তিনি আল্লাহর প্রশস্তশহরগুলোতে পালিয়ে যেতে না পারেন। তিনি এখন তোমাদের মাঝে বন্দী , এখন তিনি নিজের কোন কল্যাণ করতে পারেন না এবং এ থেকে খারাপকে দূরও করতে পারেন না। তোমরা তাকে , তার নারীদের , সন্তানদের ও পরিবারকে ফোরাত নদীর পানি থেকে বঞ্চিত রেখেছো যা ইহুদী , খৃস্টান ও সাবেঈ এবং ইরাকের শুকর ও কুকরদের জন্য উম্মুক্ত আছে , তাতে ঝাঁপ দেয়ার জন্য , আর তারা পিপাসায় মৃত্যুবরণ করবে ? মুহাম্মদ (সা.) এর মৃত্যুর পর তার বংশধরের সাথে কি খারাপ আচরণই না করেছো তোমরা। আল্লাহ যেন চরম পিপাসার দিনে (কিয়ামতে) তোমাদের পিপাসা না মেটান। ” এ কথা শুনে কিছু সৈন্য তাকে আক্রমণ করলো এবং তার দিকে তীর ছোঁড়া আরম্ভ করলো। তখন আল হুর এলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে দাঁড়ালেন।
সিবতে ইবনে জাওযির‘ তাযকিরাহ ’ তে উল্লেখ আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তখন উচ্চ কণ্ঠে শাবাস বিন রাবঈ , হাজ্জার বিন আবজার , কায়েস বিন আল আশআস এবং ইয়াযীদ বিন আল হারসকে ডাকলেন এবং বললেন ,
“ তোমরা কি আমার কাছে চিঠি লিখো নি ?”
তারা বললো ,“ আপনি যা বলছেন তা আমরা জানি না। ” আল হুর বিন ইয়াযীদ , যে তাদের নেতা ছিলেন , বললেন ,“ হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ , আমরা আপনার কাছে লিখেছিলাম এবং আমরাই আপনাকে এখানে এনেছি। তাই আল্লাহ ফালতু কাজ ও ফালতু কাজের লোকদের দূরে রাখুন। আল্লাহর শপথ , আমি আখেরাতের উপর এই পৃথিবীকে অগ্রাধিকার দিবো না ” এ কথা বলে তিনি তার ঘোড়াকে ফিরিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সারিতে প্রবেশ করলেন। ইমাম বললেন ,
“ স্বাগতম , তুমি স্বাধীন এ পৃথিবীতে এবং আখেরাতেও । ”
[ইবনে নিমা থেকে] বর্ণিত আছে যে , আল হুর ইমাম হোসেইন (আ.) কে বললেন যে ,“ যখন উবায়দুল্লাহ আমাকে আদেশ দিলো আপনার দিকে আসতে আমি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলাম , আমি শুনলাম একটি কণ্ঠ আমাকে পিছন থেকে ডেকে বলছে ,“ হে আল হুর , কল্যাণের সংবাদ নাও , আমি ঘুরে তাকালাম কিন্তু কাউকে দৃশ্যমান পেলাম না। আল্লাহর শপথ , তখন আমি আশ্চর্য হলাম , এই সুসংবাদ কিসের জন্য , কারণ আমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যাচ্ছি এবং আমি তখনও আপনাকে সাহায্য করার ইচ্ছা করি নি। ” ইমাম বললেন ,
“ কিন্তু এখন তুমি (শেষ পর্যন্ত) কল্যাণে পৌঁছেছো। ”
এরপর উমর বিন সা’ আদ চিৎকার করে বললো ,“ হে দুরাইদ , পতাকা কাছে নিয়ে এসো। ” যখন সে তা কাছে আনলো , উমর একটি তীর তার ধনুকে বসালো এবং ছুঁড়লো এবং বললো ,“ সাক্ষী থাকো যে আমি ছিলাম প্রথম ব্যক্তি যে তীর ছুঁড়ে ছিলো। ” তখন অন্যরা তাকে অনুসরণ করলো এবং যুদ্ধের জন্য চ্যালেঞ্জ জানালো।
মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের মধ্যে কেউ ছিল না যে এতে আহত হয় নি। বলা হয় , তীর বৃষ্টির পর ইমাম (আ.) এর অল্প কিছু সাথী রক্ষা পান এবং পঞ্চাশ জন শাহাদাত লাভ করেন।
[তাবারির গ্রন্থে] আযদি বলেন যে , বনি কালব গোত্রের আবজানাব আমার কাছে বর্ণনা করেছে যে , আমাদের গোত্রে এক ব্যক্তি ছিলো যার নাম ছিলো আব্দুল্লাহ বিন উমাইর , যে ছিলো বনি আলীম শাখার। সে কুফায় বসবাস শুরু করলো হামাদান গোত্রের বনি জা ’ আদের কুয়ার কাছে। তার স্ত্রী উম্মে ওয়াহাব ছিলো আমর বিন কাসিত গোত্রের আবদের কন্যা। সে নুখাইলাতে এক দল সৈন্যকে কুঁচকাওয়াজ করতে দেখে ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে। আবদুল্লাহ বলে যে ,“ আল্লাহর শপথ , মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমার প্রবল ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এখন আমি যুদ্ধ করতে চাই তাদের বিরুদ্ধে যারা নবীর নাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর আল্লাহর কাছে আমার পুরস্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চাইতে কম হবে না। ” তখন সে তার স্ত্রীর কাছে গেল এবং তাকে জানালো সে কী শুনেছে এবং সে কী চায়। স্ত্রী উত্তর দিলো ,“ তুমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছো তা সঠিক। তোমার আল্লাহ তোমাকে সব বিষয়ে ধার্মিকতার পথ দেখান। যাও এবং আমাকেও সাথে নাও। ” তখন সে চলে এলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলো এবং তার সাথেই ছিল যতক্ষণ না উমর বিন সা’ আদ তাদের দিকে তীর ছুঁড়লো এবং তার সেনাবাহিনী তাকে অনুসরণ করলো।
এরপর যিয়াদের দাস ইয়াসার এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের দাস , সারিম যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলো এবং যুদ্ধের জন্য আহ্বান করলো। তা শুনে হাবীব বিন মুযাহির এবং বুরাইর (বিন খুযাইর) দাঁড়ালেন উত্তর দিতে , কিন্তু ইমাম হোসেইন (আ.) তাদেরকে ইশারা করলেন বসে থাকতে। তখন আবদুল্লাহ বিন উমাইর কালবি উঠে দাঁড়ালেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অনুমতি চাইলেন। ইমাম দেখলেন সে বাদামী রঙের ও লম্বা মানুষ , শক্তিশালী বাহু ও প্রশস্ত কাঁধের অধিকারী। তিনি বললেন ,
“ আমার মতে সে এক মারাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বী , তুমি যেতে পারো যদি তুমি তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চাও। ”
যখন আব্দুল্লাহ তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন , তারা জিজ্ঞেস করলো ,“ তুমি কে ?” আবদুল্লাহ তাদেরকে তার বংশধারা বললো। তারা বললো: আমরা তোমাকে চিনি না ,হাযইর বিনাইকন ¡ , হাবীব বিন মুযাহির অথবা বুরাইর বিন খুযাইরের আসা উচিত ছিলো। ইয়াসার সালিমের কাছে নগ্ন তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। আব্দুল্লাহ বললেন ,“ হে জারজ সন্তান , তুমি কি একজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অপছন্দ করো ? যে-ই তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসবে সে তোমার চাইতে ভালো হবে। ” এ কথা বলে তিনি তৎক্ষণাৎ ইয়াসারকে আক্রমণ করলেন এবং তরবারির আঘাতে তাকে হত্যা করলেন। কেউ চিৎকার করে বললো ,“ এই দলটি তোমার পিছনে লেগে আছে। ” আব্দুল্লাহ তা শুনলো না যতক্ষণ পর্যন্তনা সালিম ঘোড়া চালিয়ে তাকে তার তরবারি দিয়ে আঘাত করলো। আবদুল্লাহ তার বাম হাত বাড়িয়ে দিলেন , তাতে তার আঙ্গুলগুলো কেটে গেলো। এরপর আব্দুল্লাহ তাকে আক্রমণ করলেন এবং তাকে হত্যা করলেন।
দুজনকে হত্যা করার পর আব্দুল্লাহ কবিতা আবৃত্তি করলেন ,“ যদি তোমরা আমাকে না জানো , আমি বনি কালব থেকে , এটি যথেষ্ট যে আমার পরিবার বনি উলেইম থেকে , আমি একজন যোদ্ধা এবং একজন মানুষ যার আছে শক্তিশালী স্নায়ু। আমি তেমন নই যে দুশ্চিন্তার সময় কুঁকড়ে যায়। হে উম্মে ওয়াহাব , আমি তোমার কাছে দায়বদ্ধ একজন মানুষের তরবারি ও বর্শা সম্পর্কে আল্লাহতে বিশ্বাস করে। ”
তার স্ত্রী উম্মে ওয়াহাব , তাঁবুর একটি খুঁটি এক হাতে নিয়ে তার স্বামীর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন ,“ আমার পিতামাতা তোমার জন্য কোরবান হোক , নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর পবিত্র বংশধরের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করো। ” আবদুল্লাহ তার দিকে অগ্রসর হলেন তাকে তাঁবুতে ফেরত পাঠাতে। কিন্তু তিনি তার জামা ধরে বললেন ,“ আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না যতক্ষণ না আমি তোমার সাথে নিহত হই। ”
ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে উচ্চ কণ্ঠে ডেকে বললেন ,“ নবীর পরিবারের কারণে তোমাকে যথাযথ পুরস্কার দেয়া হোক , ফিরে আসো , তোমার উপর আল্লাহ রহম করুন , নারীদের কাছে ফেরত আসো , কারণ জিহাদ নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ” এ কথা শুনে তিনি ফেরত এলেন।
[‘ ইরশাদ ’ ,‘ কামিল ’ এবং তাবারির গ্রন্থে আছে] এরপর আমর বিন হাজ্জাজ তার সেনাবাহিনীসহ ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের ডান দিকে আক্রমণ করলো। যখন তারা কাছে এলো , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো তাদের দিকে বর্শা তাক করে। তাদের ঘোড়াগুলো বর্শার দিকে এগোতে ভয় পেলো এবং পিছনে ফিরে গেলো। তখন ইমামের সাথীরা তাদের দিকে তীর ছুঁড়ে তাদের কিছুকে হত্যা করলো এবং অন্যদেরকে আহত করলো।
[‘ কামিল ’ , তাবারির গ্রন্থে] বনি তামীমের এক লোক আব্দুল্লাহ বিন হাওযাহ সামনে অগ্রসর হয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর মুখোমুখি এবং তাঁকে চিৎকার করে ডাকলো। ইমাম বললেন ,“ কী চাও ?”
অভিশপ্ত উত্তর দিলো ,“ তুমি (জাহান্নামের) আগুনের সুসংবাদ লাভ করো। ” (আউজুবিল্লাহ) ইমাম বললেন ,
“ না , তুমি যে রকম বলছো সে রকম নয়। আমি রাহমানুর রাহীম এবং শাফায়াতকারী প্রভুর দিকে যাত্রা করছি , যাকে মানা হয়। ”
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন সে কে এবং তাকে বলা হলো যে সে হাওযাহর সন্তান। ইমাম বললেন ,
“ হে আল্লাহ , তাকে (জাহান্নামের) আগুনে নিক্ষেপ করুন। ”
হঠাৎ করে ঐ ব্যক্তির ঘোড়া উত্তেজিত হয়ে উঠলো এবং তাকে পিঠ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। [‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] কিন্তু বাম পা জিনে আটকে গেলো এবং তার ডান পা আকাশের দিকে উঠে থাকলো , তখন মুসলিম বিন আওসাজা আক্রমণ করলেন এবং তার ডান পা কেটে ফেললেন। ঘোড়াটি তাকে নিয়ে দৌঁড়াতে শুরু করলো এবং তার মাথা মরুভূমির পাথর ও গাছে বাড়ি খেতে লাগলো যতক্ষণ না তার মৃত্যু হলো। এভাবে তার রুহ দ্রুত এগিয়ে গেলো (জাহান্নামের) আগুনের দিকে।
[তাবারির গ্রন্থে] আযদি বর্ণনা করেন আতা ’ আবিন সায়েব থেকে , সে বর্ণনা করেছে জাব্বার বিন ওয়াএল থেকে এবং সে তার ভাই মাসরূক্ব বিন ওয়াএল থেকে যে , আমি সেনাবাহিনীর সাথে ছিলাম যারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছিলো। আমি অনুরোধ করলাম একেবারে সামনে থাকার জন্য যেন , ইমামের মাথাটি পাই এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে সম্মান লাভ করি। যখন আমরা তার কাছে পৌঁছালাম আমাদের মাঝ থেকে ইবনে হাওযাহ নামে এক ব্যক্তি আরও এগিয়ে গেলো এবং বললো ,“ হোসেইন কি তোমাদের মাঝে আছে ?” কিন্তু ইমাম তাকে উত্তর দিলেন না। যখন সে তা তিন বার বললো , ইমাম বললেন ,
‘ হ্যাঁ , হোসেইন এখানে , তুমি কী চাও ?”
সে বললো ,“ হে হোসেইন (জাহান্নামের) আগুনের সুসংবাদ নাও। ” (আউজুবিল্লাহ) , ইমাম বললেন ,
“ নিশ্চয়ই তুমি মিথ্যা বলছো , আমি ক্ষমাশীল ও শাফায়াতকারী প্রভুর দিকে যাত্রা করছি , যাকে মানা হয়। তুমি কে ?”
সে উত্তর দিল সে হাওযাহর সন্তান। বর্ণনাকারী বলে যে , ইমাম তখন তার দুহাত আকাশের দিকে এতো উঁচুতে তুললেন যে আমরা তার কাপড়ের নিচে বাহুর নিচে সাদা অংশ দেখতে পেলাম এবং বললেন ,
“ হে রব , তাকে (জাহান্নামের) আগুনে দ্রুত পাঠাও। ”
এ কথা শুনে ইবনে হাওযাহ ক্রোধান্বিত হলো এবং চাইলো ইমামের দিকে ঘোড়া ছোটাতে , কিন্তু তাদের মাঝে ছিলো একটি গর্ত। হঠাৎ করে তার পা জিনে পেঁচিয়ে গেলো এবং ঘোড়াটি তাকে হেঁচড়ে নিলো যতক্ষণ না সে পড়ে গেলো। তখন তার পা এবং উরু আলাদা হয়ে গেলো এবং তার দেহের অন্য অংশ জিন থেকে ঝুলে রইলো। এ দৃশ্য দেখে মাসরূক্ব ফিরে এলো এবং অশ্বারোহীদের পিছনে লুকালো। বর্ণনাকারী আরও বলেছে যে ,“ আমি তাকে (মাসরূক্বকে) তার ফেরত আসা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম , সে বললো , আমি এই পরিবার থেকে এমন আশ্চর্য জিনিস দেখেছি যে আমি কখনোই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না। ”
বুরাইর বিন খুযাইরের শাহাদাত
[তাবারির গ্রন্থে আছে] যুদ্ধ শুরু হলো। আযিদ বলেন যে , ইউসুফ বিন ইয়াযীদ আমাকে বলেছে আফীফ বিন যুহাইর বিন আবি আখনাস থেকে , যে কারবালার উপস্থিত ছিলো , সে বলে , বনি আবদাল ক্বায়েসের বনি সালিমার এক শাখা উমাইয়া বিন রাবি ’ আর এক ব্যক্তি ইয়াযীদ বিন মা’ ক্বাল এগিয়ে এলো। সে বুরাইরকে বললো ,“ হে বুরাইর বিন খুযাইর , তুমি কি দেখতে পাচ্ছো আল্লাহ তোমাকে কী করেছেন ?” বুরাইর বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , আল্লাহ আমার সাথে যথাযথ ব্যবহার করেছেন এবং তোমাদের জন্য খারাপকে বের করে এনেছেন। ” ইয়াযীদ বললো ,“ তুমি মিথ্যা বলছো এবং এর আগে তুমি কখনো মিথ্যা বলো নি , তুমি কি মনে করতে পারো যে একবার আমি তোমার সাথে বনি লওযানে হাঁটছিলাম , তুমি আমাকে বলেছিলে উসমান বিন আফফান নিজেকে নিজে হত্যা করেছে , আর মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান একজন পথভ্রষ্ট লোক এবং সে অন্যকে পথভ্রষ্ট করে অথচ সত্যিকার এবং সৎকর্মশীল ইমাম এবং পথপ্রদর্শক হচ্ছে আলী বিন আবি তালিব ?” বুরাইর বললেন ,“ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে এখনও এটিই আমার বিশ্বাস। ইয়াযীদ বিন মা’ ক্বাল বললো ,“ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি তুমি পথভ্রষ্টদের একজন। ” তখন বুরাইর বললেন , “ তাহলে তুমি কি চাও আমরা পরস্পরকে অভিশাপ দেই এবং যে মিথ্যা বলে তার ওপরে আল্লাহর অভিশাপ প্রার্থনা করি। তারপর যে সঠিক পথে আছে সে তাকে হত্যা করবে যে ভুল পথে আছে। এরপর আমি আসবো তোমার সাথে যুদ্ধ করতে। ”
বর্ণনাকারী বলে যে এরপর উভয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলো এবং তাদের দুহাত উঠিয়ে আল্লাহর অভিশাপ চাইলো মিথ্যাবাদীর উপর এবং যেন সঠিক পথের অনুসারী পথভ্রষ্টকে হত্যা করে। এরপর তারা পরস্পর যুদ্ধ শুরু করলো । তাদের মধ্যে তরবারি আঘাত বিনিময় হলো এবং ইয়াযীদ বিন মা’ ক্বাল একটি হালকা ও অকৃতকার্য আঘাত করলো বুরাইরকে , তখন বুরাইর তার মাথার ওপরে আঘাত করলেন , যা তার মাথা ফেটে মগজে পৌঁছালো। সে একটা বলের মত মাটিতে গড়িয়ে পড়লো এবং বুরাইরের তরবারি তার মাথায় আটকে রইল এবং তিনি উপর নিচ করতে লাগলেন টেনে বের করার জন্য।
তখন রাযী বিন মানকায আযদি বুরাইরকে আক্রমণ করলো এবং তাকে জড়িয়ে ধরলো। তারা দুজনেই ধস্তাধস্তি করলো যতক্ষণ না বুরাইর তাকে নিচে ফেলে দিলেন ও তার বুকের উপর বসলেন। তখন রাযী চিৎকার করে বললো ,“ আমাকে রক্ষাকারীরা কোথায় ?” তা শুনে কা‘ আব বিন জাবির বিন আমর আযদি এগিয়ে এলো তাকে সাহায্য করতে , তখন আমি বললাম ,“ এ হলো বুরাইর বিন খুযাইর। কোরআনের ক্বারী , যে আমাদেরকে মসজিদে কোরআন শিখিয়েছে। ” সে বুরাইরকে তার বর্শা দিয়ে আক্রমণ করলো , যখন বুরাইর বর্শার তীক্ষ্ম মাথা অনুভব করলেন তিনি নিজেকে তার উপর ছুঁড়ে দিলেন এবং তার নাকে কামড় দিলেন। কিন্তু কাআব তার বর্শা তার ভিতরে ঢুকিয়ে দিল এবং হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিল এবং বর্শার মাথাটি তার পিঠে প্রবেশ করলো। এরপর সে তাকে মাথায় আঘাত করলো এবং তরবারি দিয়ে আঘাত করতে শুরু করলো যতক্ষণ পর্যন্তনা তার মৃত্যু হলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
আফীফ বিন যুহাইর বিন আবি আখনাস বলে যে , আমি যেন দেখতে পাচ্ছি রাযীকে , যে মাটিতে পড়েছিলো , উঠে দাঁড়াচ্ছে তার জামা থেকে ধুলো ঝেড়ে এবং কাআবকে বলছে ,“ আযদ (গোত্র) এর ভাই , তুমি আমার উপকার করেছো এবং আমি তা কখনও ভুলবো না। ”
ইউসুফ বিন ইয়াযীদ বলে যে , আমি আফীফকে জিজ্ঞেস করলাম সে সত্যিই তা নিজ চোখে দেখেছে কিনা , এতে সে উত্তর দিল যে ,“ আমি তা দেখেছি আমার নিজের চোখে এবং শুনেছি আমার নিজ কানে। ”
যখন কা‘ ব বিন জাবির ফেরত এলো , তার স্ত্রী এবং তার বোন নাওয়ার বিনতে জাবির তাকে বললো ,“ তুমি ফাতিমা (আ.) এর সন্তানের বিরোধীদের পক্ষ নিয়েছো এবং কোরআন তেলাওয়াতকারীদের প্রধানকে হত্যা করেছো ? আল্লাহর শপথ এখন থেকে আমি আর কখনও তোমার সাথে কথা বলবো না। কা‘ ব বিন জাবির নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলো:
“ তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছো এবং জানানো হবে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সকাল সম্পর্কে , যখন বর্শাগুলো বেগে ঠেলে দেয়া হচ্ছিলো , আমি কি সে কাজ করি নি যা তোমরা ঘৃণা করো ? সে দিন ভাবতে পারছিলাম না আমি কী করবো , আমার সাথে আমার বর্শা ছিলো , যা নিশানা করতে ব্যর্থ হয় নি এবং একটি সাদা ঝকমকে তরবারি ছিলো , যা ছিলো ধারালো ও ভয়ানক , আমি তা কোষমুক্ত করলাম এবং একটি দলকে আক্রমণ করলাম যাদের ধর্ম আমাদের মত ছিলো না , যা ছিলো হারবের সন্তানের আনুগত্য , আমি তাদের বয়েসী আর কাউকে দেখিনি যারা তীব্র যুদ্ধ করলো। ওরা তারা যারা তাদের সম্মান রক্ষা করে , তারা বর্শা ও তরবারির বিরুদ্ধে ধৈর্য ধরেছিলো এবং যুক্ষক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলো , এতে যদি তাদের কোন লাভ হতো , যখন তোমরা উবায়দুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে , তাকে এই সংবাদ দিও যে আমি খলিফার প্রতি অনুগত এবং তার আদেশ পালনকারী , আমিই সে যে রাবইরকে হত্যা করেছি এবং মানকাযের ¡ সন্তানদের উপকার করেছি , যখন সে সাহায্যের জন্য ডাক দিয়েছিলো। ”
আমর বিন ক্বারতাহ আনসারীর শাহাদাত
এরপর আমর বিন ক্বারতাহ অগ্রসর হলেন এবং ইমামকে রক্ষার জন্য আক্রমণ করলেন এবং বলছিলেন ,“ আনসারদের ব্যাটালিয়ন জানে যে আমি অঙ্গীকারের এলাকা রক্ষাকারী , আমি ধারালো তরবারি দিয়ে আঘাত করি যুবকের মত , আমার সত্তা এবং আমার পরিবার হোসেইনের সামনে তুচ্ছ মূল্যের। ”
এখানে ইমাম হোসেইন (আ.) কে যে কোন ব্যক্তির পরিবারের চাইতে মূল্যবান বলা হচ্ছে। উমর বিন সা’ আদ ইমামকে বলেছিলো ,“ আমার বাড়ি ধ্বংস করা হবে ইত্যাদি। ” (১৫তম অধ্যায়ে বলা হয়েছে)
সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেন যে , মুসলিম বিন আওসাজার শাহাদাতের পর আমর বিন ক্বারতাহ আনসারি এগিয়ে এলেন এবং ইমামকে অনুরোধ করলেন তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি দেয়ার জন্য। যখন ইমাম তাকে অনুমতি দিলেন , তিনি এমন শক্তিতে আক্রমণ করলেন যা ছিলো ঐ ব্যক্তির মত যে বেহেশতে যেতে চায়। এভাবে তিনি সংগ্রাম করলেন বেহেশতের সর্দারের খেদমতে যতক্ষণ পর্যন্তনা তিনি যিয়াদের সেনাবাহিনী থেকে একটি দলকেই হত্যা করলেন। কোন তীর ছিলো না যা ইমামের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো আর তিনি তা ঢাল দিয়ে ঠেকান নি এবং কোন তরবারি ছিলো না যা ইমামের দিকে আসছিলো আর তিনি তার নিজের উপর নেন নি। তাই ইমাম কোন আঘাত পেলেন না যতক্ষণ আমর বেঁচে ছিলেন। যখন তিনি পুরো শরীরে আহত হয়ে গেলেন তিনি ইমামের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ হে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সন্তান , আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করেছি ?” ইমাম বললেন ,
“ অবশ্যই , তুমি আমার আগে বেহেশতে যাচ্ছো। তাই আমার সালাম পৌঁছে দিও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে এবং তাকে বলো যে আমি তোমার পরেই আসছি। ”
এরপর আমর সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করলেন এবং শাহাদাত অর্জন করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
[তাবারির গ্রন্থে ,‘ কামিল ’ গ্রন্থে] বর্ণিত আছে যে , আমরের ভাই আলী বিন ক্বারতাহ উমর বিন সা’ আদের সেনাবাহিনীতে ছিলো। যখন সে তার ভাইকে পড়ে যেতে দেখলো সে চিৎকার করে বললো ,“ হে হোসেইন , হে মিথ্যাবাদী এবং মিথ্যাবাদীর সন্তান ,” (আউযুবিল্লাহ)“ তুমি আমার ভাইকে পথভ্রষ্ট করেছো এবং প্রতারিত করেছো এবং তাকে হত্যা করেছো। ” ইমাম বললেন , “ আল্লাহ তোমার ভাইকে পথভ্রষ্ট করেন নি , প্রকৃতপক্ষে সে ছিলো হেদায়েত প্রাপ্ত , আর তুমি হলে যে পথভ্রষ্ট। ”
অভিশপ্ত বললো ,“ আল্লাহ যেন আমাকে হত্যা করেন যদি আমি তোমাকে হত্যা না করি অথবা মৃত্যুবরণ করি তোমার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে। ” এ কথা বলে সে ইমামকে আক্রমণ করলো এবং নাফে ’ বিন হিলালরামদি অগ্রসর হলেন এবং তার দিকে মুখ করে দাড়ালেন। এরপর তিনি তাকে আক্রমণ করলেন একটি বর্শা দিয়ে এবং তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন , তার সাথীরা তাকে উদ্ধার করতে এলো এবং তাকে নিয়ে গেলো। এরপর সে তার ক্ষতস্থানের চিকিৎসা করলো ও আরোগ্য লাভ করলো।
[তাবারির গ্রন্থে আছে] আযদি বলেন যে নযর বিন সালেহ আবু যুহাইর আবাসি বলেন যে , যখন আল হুর বিন ইয়াযীদ ইমাম হোসাইন (আ.) এর কাছে গেলেন ও তার দল ভুক্ত হলেন , বনি তামীমের এক লোক , যার নাম ইয়াযীদ বিন সুফিয়ান বললো ,“ আল্লাহর শপথ , যদি আমার চোখ আল হুরের উপর পড়ে , আমি তাকে আমার বর্শা দিয়ে হত্যা করবো। ” যখন দুই সেনাবাহিনী পরস্পরকে আক্রমণ করছিলো ও পরস্পরকে হত্যা করছিলো , আল হুর ছিলেন একদম সামনে এবং তিনি যুদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন ,“ আমার ঘোড়ার ঘাড় এবং বুক দিয়ে আমি আমাকে তাদের দিকে নিক্ষেপ করবো বার বার , যতক্ষণ না (পশুটি) রক্তের পোষাক পড়ে। ” এবং তিনি নিচের যুদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেন ,“ আমি আল হুর , মেহমানের একজন মেযবান , আমি তোমাদের ঘাড়ে বিদ্যুৎগতির তরবারি দিয়ে আঘাত করি তাকে রক্ষার জন্য , যিনি খীফের (মিনায়) মাটিতে অবতরণ করেছেন এবং আমি এর জন্য আফসোস করি না। ”
বর্ণনাকারী বলে যে , তার ঘোড়ার লেজ ও ভ্রুদুটো আহত হয়েছিলো তরবারির আঘাতে এবং রক্ত এর মধ্য থেকে প্রবাহিত হচ্ছিল। ইবনে যিয়াদের পুলিশ বাহিনীর প্রধান হাসীন বিন তামীম , যাকে পাঠানো হয়েছিলো উমর বিন সা’ আদকে সাহায্য করার জন্য এবং তাকে ইয়াযীদ বিন সুফিয়ানের অধীন পুলিশ বাহিনীর অধিনায়ক বানানো হয়েছিলো , ইয়াযীদ বিন সুফিয়ানকে বললো ,“ এই হলো আল হুর বিন ইয়াযীদ , যাকে তুমি চাও। ” তখন সে আল হুরের দিকে অগ্রসর হলো এবং বললো ,“ হে আল হুর বিন ইয়াযীদ , তুমি কি যুদ্ধ চাও ?” আল হুর হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলেন এবং সে তার দিকে এলো। হামীম বললো ,“ আল্লাহর শপথ মনে হলো যেন তার জীবন ছিলো আল হুরের হাতে , সে তাকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করলো। ”
হিশাম বিন মুহাম্মাদ বর্ণনা করেছে আবু মাখনাফ থেকে , যে বলেছে , ইয়াইয়া বিন উরওয়াহ আমাকে বলেছে যে , (মুহররমের) দশ তারিখে নাফে ’ বিন হিলাল আক্রমণ করছিলেন নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ,
“ আমি হিলালের সন্তান , আমার ধর্ম আলীর ধর্ম। ” মাযাহিম বিন হুরেইস নামে এক ব্যক্তি তার দিকে এলো এবং বললো ,“ আমি উসমানের বিশ্বাসে বিশ্বাসী। ” নাফে ’ বললো ,“ যা হোক , তুমি শয়তানের বিশ্বাসে বিশ্বাসী। ” এ কথা বলে তিনি তাকে আক্রমণ করলেন এবং শেষ পর্যন্ততাকে হত্যা করলেন।
তখন আমর বিন হাজ্জাজ সেনাবাহিনীর দিকে ফিরলো এবং উচ্চকণ্ঠে বললো ,“ হে বোকার দল , তোমরা জানো তোমরা কার সাথে যুদ্ধ করছো ? তোমরা সাহসী কুফাবাসীদের সাথে যুদ্ধ করছো , যারা জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তাই কেউ একা একা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে যেও না , কজন তারা অথবা কজনই বেঁচে আছে এবং অল্প সময় বাকী আছে। আল্লাহর শপথ , যদি তোমরা শুধু পাথর দিয়েও তাদের আক্রমণ কর , তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। ” তখন উমার বিন সা’ আদ বললো ,“ তুমি যা বলেছো সত্য এবং তার মতামত গ্রহণ করা হলো। ” তখন সে ঘোষণা করলো কেউ যেন তাদের সাথে একা একা যুদ্ধ করতে না যায়।
বর্ণিত আছে আমর বিন হাজ্জাজ ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের দিকে অগ্রসর হলো এবং বললো ,“ হে কুফাবাসী , তাদেরকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকো যারা তোমাদের এবং তোমাদের সম্প্রদায়ের কথা শোনে এবং তাকে হত্যা করতে দ্বিধা করো না যে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে এবং ইমামকে অমান্য করেছে। ” ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,
“ হে আমর বিন হাজ্জাজ , তুমি কি লোকজনকে আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছো ? আমরা কি ধর্ম থেকে বেরিয়ে গেছি আর তোমরা তার উপর দৃঢ় আছো ? আল্লাহর শপথ , যখন তুমি তোমার এই খারাপ কাজগুলো নিয়ে মরবে তখন তুমি জানতে পারবে কে ধর্ম থেকে বেরিয়ে গেছে এবং কে জাহান্নামের (আগুনের) জন্য যোগ্য। ”
মুসলিম বিন আওসাজার শাহাদাত
এরপর আমর বিন হাজ্জাজ ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের ডান দিকের শাখাকে আক্রমণ করে ফোরাত নদীর দিক থেকে , সাথে ছিলো উমর বিন সা’ আদের ডান দিকের বাহিনী , এবং তারা কিছসময়ের জন্য যুদ্ধ করলো।মুসলিম বিন আওসাজা ছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের মাঝে যিনি শাহাদাত লাভ করলেন। এরপর আমর বিন হাজ্জাজ এবং তার সাথীরা ফিরে গেলো।
[‘ মানাক্বিব ’ -এ আছে] উল্লেখ করা দরকার যে , মুসলিম বিন আওসাজা কুফায় মুসলিম বিন অক্বীলের (আ.) প্রতিনিধি ছিলেন। তাকে অর্থ সংগ্রহ , অস্ত্রশস্ত্র কেনা ও ইমাম হোসেইন (আ.) এর পক্ষে বাইয়াত গ্রহণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো।
মুসলিম (বিন আওসাজা) কারবালায় বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন , নিচের যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করতে থাকা অবস্থায় ,
“ যদি তোমরা আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো , (জেনে রাখো) আমি একজন পুরুষ সিংহ , আমি বনি আসাদের সর্দার ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের একজন , যারা আমাদের উপর অত্যাচার করছে তারা সঠিক পথ এবং অমুখাপেক্ষী সর্বক্ষমতাশীল রবের ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে। ”
তিনি শত্রুদের সাথে অনেক যুদ্ধ করলেন এবং সেনাদলের যুদ্ধ সহ্য করলেন এবং এক পর্যায়ে পড়ে গেলেন।
বর্ণনাকারী বলে যে , যখন ধুলোর মেঘ নিচে নেমে গেলো মুসলিমকে রক্তে মাখামাখি অবস্থায় দেখা গেলো। ইমাম হোসেইন (আ.) তার মাথার দিকে গেলেন , তখনও তিনি বেঁচে ছিলেন। ইমাম বললেন ,
“ তোমার রব তোমার উপর রহমত করুন , হে মুসলিম বিন আওসাজা ,
) مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا(
বিশ্বাসীদের মাঝে এমনও ব্যক্তিরা রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে যা অঙ্গীকার করেছে তার উপর বিশ্বস্তআছে , তাদের কেউ অঙ্গীকার পূরণ করেছে এবং তাদের মাঝে কেউ আছে যে অপেক্ষা করছে (পূরণ করার জন্য) এবং তারা একটুও বদলায়নি। ” [সূরা আহযাব: ২৩]
তখন হাবীব বিন মুযাহির তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আমার জন্য খুবই অপছন্দনীয় তোমাকে কাদা ও রক্তে মাখা অবস্থায় দেখা হে মুসলিম ,তুমি যেন জান্নাতের সুসংবাদ পাও। ” তখন মুসলিম নরম কণ্ঠে বললেন ,“ তোমার আল্লাহও যেন তোমাকে অনুগ্রহের সুসংবাদ দেন।” হাবীব বললেন ,“ যদি আমি না জানতাম যে আমাকেও তোমার পথ (শাহাদাত) অনুসরণ করতে হবে এবং তোমার কাছে পৌঁছাতে হবে , আমি আনন্দের সাথে তোমাকে অনুরোধ করতাম তোমার অন্তরের শেষ ইচ্ছার অসিয়ত আমাকে করে যাওয়ার জন্য যতক্ষণ না আমি তোমার আত্মীয়দের ও ধর্মের সাথীদের অধিকার পূরণ করতাম। ” মুসলিম বললেন ,“ আমি এই সর্দারকে তোমার জন্য সুপারিশ করছি। ” তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন ,“ তার জন্য তোমার জীবন কোরবান করা উচিত। ” হাবীব বললেন ,“ কা‘ বার রবের ক্বসম , আমি অবশ্যই তা করবো। ” দেরী হলো না , তিনি তাদের হাতে শাহাদাত বরণ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) । তার এক দাসী কন্যাকে চিৎকার করতে শোনা গেল ,“ হে আওসাজার পুত্র , হে মালিক। ” আমর বিন হাজ্জাজের সাথীরা হাত তালি দিল ,“ আমরা মুসলিম বিন আওসাজাকে হত্যা করেছি। ” তখন শাবাস তার সাথীদের দিকে ফিরলো এবং বললো , “ তোমাদের মায়েরা তোমাদের জন্য কাঁদুক। তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে হত্যা করছো এবং নিজেদেরকে পৃথক করছো অন্যের জন্য। তারপর আনন্দ করছো যে তোমরা মুসলিম বিন আওসাজাকে হত্যা করেছো। তাঁর শপথ যাকে আমি বিশ্বাস করি , আমি তাকে (মুসলিমকে) যুদ্ধক্ষেত্রে দেখেছি মুসলমানদের সম্মানসহ। আমি তাকে আযারবাইজানের সমতলে যুদ্ধক্ষেত্রে দেখেছি যখন কোন মুসলমান তাদের স্থান থেকে নড়ে নি , সে ছয় জন মুশরিককে হত্যা করেছিলো। যখন এ ধরনের মানুষ মারা যায় , তোমরা এতে উল্লাস প্রকাশ করো ?”
মুসলিম বিন আওসাজার হত্যাকারী ছিলো মুসলিম বিন আব্দুল্লাহ যাবাবি এবং আবদুর রহমান বিন আবি খাশকার বাজালি।
এরপর শিমর ইমামের বাম দিকের সেনাদলকে আক্রমণ করলো। তারা তার এবং সেনাবাহিনীর সামনে দাঁড়ালো এবং তাদেরকে হটিয়ে দিলো তাদের তরবারি দিয়ে। এরপর ইমাম এবং তার সাথীদেরকে সব দিক থেকে আক্রমণ করা হলো এবং আব্দুল্লাহ বিন উমাইর কালবি , যিনি আগে দুব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন , তিনি শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার ওপরে বর্ষিত হোক) । হানি বিন সাবাত হাযরামি এবং বুকাইর বিন হাঈ তামিমি তাকে হত্যা করে। তিনি ছিলেন ইমামের সাথীদের মাঝে দ্বিতীয় শহীদ।
এরপর ইমামের সাথীরা কুফার সৈন্যদের সাথে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তাদের অশ্বারোহীরা , সংখ্যায় বত্রিশ জন , কুফার সেনাবাহিনীকে চতুর্দিক থেকে আক্রমণ করেন এবং তাদের সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।
আবু তুফাইল যেমন বলেন তাদের সম্পর্কে ,“ এটি কী ধরনের সেনাদল , ঢেউয়ের মত , শক্তিশালী পশু চিতা ও সিংহের মত , সেখানে আছে বৃদ্ধ , যুবক এবং সর্দাররা , যারা ঘোড়ায় চড়ে আছে ; তাদের মাঝখান থেকে পালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন , যখন সূর্যরশ্মি তাদের পতাকার নিচে অস্ত যায় , এর শক্তি চোখকে দুর্বল করে দেয় , তাদের শ্লোগান নবীর শ্লোগানের মত এবং তাদের পতাকার মাধ্যমে আল্লাহ ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন।
[তাবারির গ্রন্থে আছে] যখন উরওয়া বিন ক্বায়েস , যে ছিলো অশ্বারোহী দলের অধিনায়ক , এই পরিস্থিতি দেখলো যে তার অশ্বারোহী সৈন্যরা সব দিক থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে , সে আবদুর রহমান বিন হাসীনকে পাঠালো উমর বিন সা’ আদের কাছে এই সংবাদ দিয়ে ,“ তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না যে সকাল থেকে আমার অশ্বারোহী বাহিনী এই ছোট্ট দলটির সাথে পা টেনে টেনে চলছে ? পদাতিক সৈন্য ও তীরন্দাজদের তাদের দিকে পাঠাও। ” তখন উমর বিন সা’ আদ শাবাস বিন রাবঈর দিকে ফিরলো এবং বললো ,“ তুমি কি হোসেইনকে আক্রমণ করবে ?” শাবাস বললো ,“ গৌরব আল্লাহর , তুমি কি শহরগুলোর সর্দার এবং কুফাবাসীদের নেতাকে তীরন্দাজদের সাথে পাঠাতে চাও ? তুমি কি আর কাউকে পাচ্ছো না যে একাজটি করতে পারে ?” শাবাস ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে করা পছন্দ করছিলো না। আবু যুহাইর আবাসি বলে যে , যুহাইর মুসআব , আব বিন যুবাইরের খিলাফত কালে আমি তাকে (শাবাস) বলতে শুনেছি যে , “ আল্লাহ কখনও কুফাবাসীদের কল্যাণ দান করবেন না এবং তাদেরকে সাফল্য দান করবেন না। আশ্চর্যের কিছু নেই যে আমরা আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) এর সারিতে থেকে যুদ্ধ করেছি এবং তার পরে তার সন্তান (ইমাম হাসান)-এর সাথে থেকে আবু সুফিয়ানের সন্তানদের বিরুদ্ধে , পাঁচ বছর। এরপর আমরা তার সন্তান হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি যে ছিলো পৃথিবী বাসীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , মুয়াবিয়ার ও ব্যভিচারী সুমাইয়ার সন্তানের দলে থেকে। বেইজ্জতি , কী বেইজ্জতি!”
এরপর উমর বিন সা’ আদ হাসীন বিন তামিমকে ডেকে পাঠালো এবং তাকে পদাতিক সৈন্য ও পাঁচশত তীরন্দাজ দিয়ে পাঠালো। তারা অগ্রসর হলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার সাথীদের কাছে পৌঁছালো। তারা তাদের দিকে তীর ছুঁড়লো এবং তাদের ঘোড়াগুলোকে অক্ষম করে দিল এবং সবাই পায়দল এলো।
আযদি বলেন যে , নামীর বিন ওয়াহলাহ বর্ণনা করেছে আইউব বিন মাশরাহ হেইওয়ানি থেকে যে , সে সব সময় বলতো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি আল হুর বিন ইয়াযীদের ঘোড়াকে অক্ষম করেছিলাম। আমি একটি তীর ছুঁড়েছিলাম যা এর পেট ফুটো করে ঢুকে পড়েছিলো , সেটি চিৎকার করলো এবং গড়িয়ে পড়ে গেলো (মাটিতে) । হঠাৎ আল হুর সিংহের মত ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাদের উপর তরবারি নিয়ে লাফ দিয়ে পড়লো এই বলে ,“ যদিও তোমরা আমার ঘোড়ার পা কেটে দিয়েছো , আমি একটি পুরুষ সিংহের চাইতে সাহসী। ” আল্লাহর শপথ , আমি তার মত কাউকে দেখি নি যে সৈন্যদের সারিগুলোর ক্ষয়-ক্ষতি করলো। তার গোত্রের প্রধানরা তাকে জিজ্ঞেস করলো ,‘ তুমি কি আল হুরকে হত্যা করেছো ?” সে বললো ,“ আল্লার শপথ , আমি তাকে হত্যা করি নি , বরং অন্য একজন তাকে হত্যা করেছে। আমি তাকে হত্যা করতে চাইনি। আবু ওয়ারদাক তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলো। এতে সে বললো ,“ কারণ সে ছিলো পরহেজগারদের একজন। যদি আমার এ কাজ গুনাহ হয় এবং আল্লাহর কাছে আমাকে যেতে হয় তাদের আহত করা এবং সেনাবাহিনীতে উপস্থিত থাকার দায়ভার নিয়ে তাহলে তা অনেক সহজ হবে , তাঁর কাছে তাদের হত্যার দায়ভার ঘাড়ে নিয়ে যাওয়ার চাইতে। ” আবু ওয়াদাক বললো ,“ তুমিও তাদের হত্যার গুনাহ নিয়ে আল্লাহর কাছে যাবে। এখন আমাকে বলো যে ,মিততাদের একটি ঘোড়াকে পিছু ধাওয়া করেছিলে , অন্য একটির দিকে তীর ছুঁড়েছিলে এবং তাদের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে ছিলে এবং তুমি এই কাজ বেশ কয়েক বার করেছো এবং তোমার সাথী সৈন্যদের উৎসাহ দিয়েছো। যদি তোমাদেরকে আক্রমণ করা হয়ে থাকে এবং তোমরা পালিয়ে ছিলে এবং তোমাদের কিছু সাথী তোমাদের উদাহরণ অনুসরণ করেছে তাহলে তাদের হত্যায় তোমাদের সকলের সহযোগিতা ছিলো , তাই তোমরা তাদের রক্ত ঝরানোতে সমান অংশীদার। ” নামীর বললো ,“ হে আবু ওয়াদাক , তুমি আমাদেরকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করছো , কিয়ামতের দিনে তুমি যদি আমাদের হিসাব নিকাশের দায়িত্বে থাকো , আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা না করুন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো। ”
এটি উত্তম যে আমরা তাদের সম্পর্কে বর্ণনা করি ,“ এই জাতি কি কিয়ামতের দিনে (হোসাইনের) নানার সুপারিশ আশা করে হোসেইনকে হত্যা করার পর ? না , কখনোই নয় , আল্লাহর শপথ এরা কোন সুপারিশকারী খুঁজে পাবে না এবং কিয়ামতের দিনে তারা গযবে ঢেকে যাবে। ”
[তাবারির গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে] তারা তাদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেন দুপুর পর্যন্ত। কুফার সেনাবাহিনী তাদেরকে এক দিক থেকে ছাড়া কোন দিক থেকে আক্রমণ করতে পারলো না , কারণ তাদের তাঁবুগুলো ছিল একসাথে যুক্ত। যখন উমর বিন সা’ আদ তা দেখলো সে তার সৈন্যদেরকে বললো তাঁবুগুলোকে বাম ও ডান দিক থেকে আক্রমণ করে সেগুলো উপড়ে ফেলতে এবং তাদেরকে ঘেরাও করে ফেলতে। ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের মধ্যে তিন-চার জন তাঁবুগুলোকে পাহারা দিচ্ছিলেন। তারা আক্রমণকারীদের আক্রমণ করলেন তাঁবুগুলোর মাঝ থেকে এবং যে-ই তাঁবু উপড়ে ফেলতে বা লুট করতে আসছিলো তারা তাকে হত্যা করছিলেন অথবা তীর ছুঁড়ে আহত করছিলেন। তখন উমর বিন সা’ আদ বললো ,“ তাঁবুর কাছে যেও না , উপড়ে ফেলতে বা লুট করতে চেষ্টা করো না বরং সেগুলো পুঁড়িয়ে দাও ” । তখন তারা তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দিলো এবং খুঁটি উপড়ে ফেলা ও লুট করা থেকে বিরত রইলো। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,
“ তাদেরকে তাঁবুগুলো পুড়তে দাও। যদি তারা তা করে তাহলে আগুন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। ”
সেরকমই ঘটলো যেমন বলা হলো এবং একটি দল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেলেন এক দিক থেকে।
[তাবারির গ্রন্থে আছে] (আব্দুল্লাহ বিন) উমাইর কালবির স্ত্রী দৌঁড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবশে করলেন এবং তার স্বামীর মাথার কাছে বসলেন (যিনি ইতোমধ্যে) শহীদ হয়েছেন , যা আগেই বর্ণনা করা হয়েছে এবং তার কাছ থেকে ধুলো পরিষ্কার করে বললেন ,“ বেহেশত তোমার জন্য আনন্দদায়ক হোক। ”
যখন শিমর তাকে দেখলো , সে তার দাস রুস্তমকে আদেশ করলো ,
“ তার মাথায় আঘাত করো। ” সে তার মাথায় আঘাত করলো এবং তা দুভাগ হয়ে গেলো এবং তিনি সে জায়গাতেই শাহাদাত বরণ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
এরপর শিমর বিন যিলজাওশান আক্রমণ করলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর একটি তাঁবুতে পৌঁছে গেলো এবং তার তরবারি দিয়ে সেটাকে আঘাত করে বললো ,“ আমার কাছে আগুন নিয়ে এসো , যেন আমি তা এর ভেতরে যা আছে তা সহ পুড়িয়ে ফেলতে পারি। ” এ কথা শুনে নারীরা চিৎকার করতে শুরু করলেন এবং ভয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন ইমাম হোসেইন (আ.) উচ্চকণ্ঠে বললেন ,
“ হে যিলজওশনের সন্তান , তুমি কি আগুন আনতে বলছো আমার পরিবারসহ তাঁবু পুড়িয়ে ফেলতে। আল্লাহ যেন তোমাকে (জাহান্নামের) আগুনে পোড়েন। ”
আযদি বলেন যে , সুলাইমান বিন আবি রাশিদ বর্ণনা করেছে হামীদ বিন মুসলিম থেকে , সে বলেছে যে , আমি শিমর বিন যিলজাওশানকে বললাম ,“ সুবহানাল্লাহ ,এ তোমাকে মানায় না , তুমি আল্লাহর ক্রোধের স্বাদ নিতে চাও শিশু ও নারীদের হত্যা করে ? আল্লাহর শপথ , সেনাপতি তোমার উপর সন্তুষ্ট থাকবে যদি তুমি শুধু পুরুষদের হত্যা করো। ” তখন শিমর জিজ্ঞেস করলো আমি কে। আমি বললাম ,“ আমি প্রকাশ করবো না আমি কে ?” আমি তা বললাম কারণ আল্লাহর শপথ , আমি শংকিত ছিলাম সে অন্যান্যদের সামনে আমাকে কটু কথা বলবে। তখন তার কাছে এক লোক এলো যার আদেশ সে শাবাস বিন রাযী থেকে বেশী মানতো এবং বললো ,“ আমি তোমার কাছে এর চেয়ে খারাপ বক্তব্য এর আগে শুনি নি , না আমি দেখেছি তোমাকে এরকম হীন অবস্থায় নিজেকে স্থাপন করতে। এখন কি তুমি মেয়েদেরকে ভয় দেখানো শুরু করেছো ?” আমি দেখলাম যে তা শুনে শিমর লজ্জিত হলো এবং পিছনে সরে গেলো। তখন যুহাইর বিন ক্বাইন তাকে ও তার সাথীদেরকে আক্রমণ করলেন তার দশ জন সাথী নিয়ে এবং তাদেরকে তাঁবুগুলো থেকে হটিয়ে দিলেন এবং তারা দূরে চলে গেলো এবং তারা শিমরের এক সাথী আবু উযরাহ যাবাবিকে হত্যা করলেন। তা দেখে পুরো সেনাবাহিনী তাদেরকে আক্রমণ করলো এবং ক্ষতি করলো। ইমামের অনেক সাথী পড়ে যেতে লাগলেন। তাদের একজন ও অথবা দুজন পড়লেই তা দেখা যাচ্ছিলো অথচ শত্রুদের জন্য সে রকম ছিলো না। কারণ তারা ছিলো সংখ্যায় অনেক।
আবু সামামা সায়েদি কর্তৃক নামাযের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া ও হাবীব বিন মুযাহিরের শাহাদাত
[তাবারি গ্রন্থে বর্ণিত আছে] যখন আবু সামামাহ আমর বিন আব্দুল্লাহ সায়েদি দেখলেন তার সাথীরা একের পর এক নিহত হচ্ছেন , তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আমি আপনার জন্য কোরবান হই , আমি দেখতে পাচ্ছি সেনাবাহিনী আপনার কাছে চলে এসেছে। কিন্তু আল্লাহ চাহে তো তারা আপনাকে হত্যা করতে পারবে না যতক্ষণ না তারা আমাদের হত্যা করে। আর আমি চাচ্ছি যে আল্লাহর সামনে নামায পড়ে যাবো (আপনার ইমামতিতে) , যার সময় হয়ে গেছে। ” তখন ইমাম তার মাথা তুললেন এবং বললেন ,
“ তুমি নামাযের (সময়ের) কথা মনে করিয়ে দিয়েছো , আল্লাহ তোমাকে ইবাদতকারী ও তেলাওয়াতকারীদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করুন এবং নিশ্চয়ই এটি হচ্ছে নামাযের উত্তম সময়। ”
এরপর তিনি বললেন ,
“ তাদেরকে বলো আমাদের উপর থেকে হাত তুলে নিতে যতক্ষণ না আমরা নামায শেষ করি। ”
এ কথা শুনে হাসীন বিন তামীম বললো ,“ তোমার নামায কবুল হবে না। ” হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ তুমি মনে করো আল্লাহর রাসূলের সন্তানের নামায কবুল হবে না , আর তোমার মত মদ পানকারীর নামায কবুল হবে ?”
তখন হাসীন বিন তামীম তাকে আক্রমণ করলো এবং হাবীব বিন মুযাহির তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে এগিয়ে গেলেন। হাবীব তার মাথার সামনের দিকে আঘাত করলেন যা ভেতরে ঢুকে গেলো এবং হাবীব তাকে ফেলে দিলেন (ঘোড়া থেকে) । তখন তার সাথীরা তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো এবং তাকে সরিয়ে নিলো। হাবীব বিন মুযাহির বললেন ,“ আমি শপথ করে বলছি যদি আমরা সংখ্যায় তোমাদের মত হতাম অথবা তার অর্ধেকও হতাম তোমরা আমাদের দিকে পিছন দিয়ে পালাতে , হে খারাপ উৎসের মানুষ ও পুরুষত্বহীনেরা। ”
ঐদিন হাবীব বলছিলেন ,“ আমি হাবীব এবং আমার বাবা মুযাহির , যখন সে যুদ্ধক্ষেত্রের একজন অশ্বারোহী তখন তা ভয়ঙ্কর , তোমরা অস্ত্রে সুসজ্জিত এবং সংখ্যায় অনেক , কিন্তু আমরা আরও অনুগত , সহনশীল (তোমাদের চাইতে) আমাদের নফস উচ্চস্থানীয় এবং সত্য সুস্পষ্ট এবং (আমরা) আরও ধার্মিক এবং বেশি ধৈর্যশীল তোমাদের চাইতে। ”
হাবীব বিন মুযাহির ভীষণ আক্রমণ করলেন [‘ মালহুফ ’ ] যতক্ষণ না তিনি বাষট্টি জনকে হত্যা করলেন। [তাবারি] তখন তামীম গোত্রের একজন তাকে আক্রমণ করলো এবং তরবারি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলো এবং তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার ওপরে) । তার হত্যাকারী ছিলো বনি আক্বাফান গোত্রের বুদাইল বিন সারীম। বনি তামীমের অন্য এক ব্যক্তি তাকে তরবারি দিয়ে মাথায় আঘাত করে , ফলে তিনি (আবার) মাটিতে পড়ে যান , যখন তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন , হাসীন বিন তামীম তার মাথায় তরবারি দিয়ে আঘাত করে এবং তিনি (আবার) পড়ে যান। তখন বনি আক্বাফানের সেই ব্যক্তি (বুদাইল) তার ঘোড়া থেকে নেমে আসে এবং তার মাথা কেটে নেয়। এ দেখে হাসীন বললো ,“ তার হত্যাতে আমিও তোমার সাথে একজন অংশীদার। ” এতে সে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি ছাড়া কেউ তাকে হত্যা করেনি। ” হাসীন বললো ,“ তার মাথাটি আমাকে দাও যেন তা আমি আমার ঘোড়ার ঘাড়ে ঝুলাতে পারি যেন মানুষ দেখতে পায় ও বুঝতে পারে যে আমিও তার হত্যায় অংশগ্রহণ করেছি। এরপর তুমি তা ফেরত নিতে পারবে এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে বহন করে নিতে পারবে। কারণ আমি পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা করি না। ” লোকটি তা অস্বীকার করলো কিন্তু তার সাথীরা তাকে রাজী হতে বাধ্য করলো।
এরপর সে হাবীবের মাথাটি হাসীনকে দিলো যা সে তার ঘোড়ার ঘাড় থেকে ঝুলিয়ে দিলো এবং সারিগুলোর মাঝখান দিয়ে প্রদক্ষিণ শুরু করলো এবং ফিরে এলো।
বনি তামীমের ব্যক্তিটি হাবীব এর মাথাটি তার ঘোড়ায় উঠিয়ে নিলো এবং উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রাসাদে নিয়ে গেলো। হাবীবের সন্তান ক্বাসিম , যে বালেগ হওয়ার নিকটবর্তী ছিলো , তার বাবার মাথাটি দেখলো এবং তা চিনতে পারলো , সে তাকে অনুসরণ করলো এবং প্রাসাদের ভিতর প্রবেশ করলো এবং তার সাথেই আবার বেরিয়ে এলো , যতক্ষণ না তার দৃষ্টি তার উপর পড়লো। সে বললো ,“ হে বৎস , কেন তুমি আমাকে অনুসরন করছো ?” কিশোর উত্তর দিল যে তা কিছু নয়। লোকটি তাকে বললো ,“ কী ব্যাপার আমাকে বলো ?” এতে কিশোরটি বললো ,“ যে মাথাটি তোমার কাছে আছে তা আমার বাবার। তা আমার কাছে দাও যেন আমি তা দাফন করতে পারি। ” লোকটি বললো ,“ প্রিয় বৎস , সেনাপতি এর দাফনে খুশী হবেন না এবং আমি চাই সেনাপতি আমাকে প্রচুর পুরস্কার দিবেন এর জন্য। ” বালক বললো ,“ কিন্তু আল্লাহর শপথ , তুমি এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছো যিনি তোমার চাইতে উত্তম ছিলেন। ” এ কথা বলে বালকটি কাঁদতে লাগলো। দিন গেলো এবং বালকটি বড় হয়ে উঠলো। তার অন্য কোন দুঃখ ছিলো না শুধু তার বাবার হত্যাকারীর পিছু নেয়া ছাড়া যেন তাকে অসচেতনভাবে পায় ও বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারে। মুস’ আাব বিন যুবাইরের সময়ে‘ বাজমিরা ’ র যুদ্ধে এই বালক তার সেনাবাহিনীতে প্রবশে করো। সে তার বাবার হত্যাকারীকে একটি তাঁবুতে দেখতে পেলো এবং তাকে অনুসরণ করলো এবং তার জন্য ওঁত পেতে থাকলো। সে তার তাঁবুতে প্রবেশ করলো যখন ঐ ব্যক্তি দুপুরের পরে একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছিলো , সে তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলো ও তাকে হত্যা করলো।
আযদি বলেন যে , যখন হাবীব বিন মুযাহির নিহত হন , ইমাম হোসেইন (আ.) ভেঙ্গে গেলেন , এরপর বললেন ,“ আমি নিজেকে এবং আমার বিশ্বস্তসাথীদেরকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করছি।” কোন কোন শাহাদাতের বইতে (মাক্বাতিলে) আছে যে ইমাম বলেছেন ,“ তোমার যা অর্জন তা আল্লাহর কারণে , হে হাবীব , তুমি একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। তুমি এক রাতে পুরো কোরআন তেলাওয়াত করেছিলে। ”
আল হুর বিন ইয়াযীদ আর রিয়াহির শাহাদাত
বর্ণনাকারী বলেন যে আল হুর নিচের যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করতে শুরু করলেন:
“ আমি শপথ করেছি নিহত না হতে যতক্ষণ না হত্যা করি এবং আমি আহত হবো না আরও অগ্রসর হওয়া ব্যতীত , আমি তাদেরকে আক্রমণ করবো ধারালো তরবারি দিয়ে , আমি পিছু হটবো না এবং পালিয়েও যাবো না (যুদ্ধক্ষেত্র থেকে) । ”
এছাড়া তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলেন:
“ আমি আল হুর , আমি মেহমানের একজন মেযবান , আমি তোমাদের ঘাড় বিদ্যুৎগতি তরবারি দিয়ে আঘাত করি , তার প্রতিরক্ষায় যে খীফের মাটিতে (মীনায়) অবতরণ করেছে এবং আমি এর জন্য আফসোস করি না। ”
তিনি এমন একটি তরবারি হাতে ধরে ছিলেন যা থেকে মৃত্যু বর্ষিত হচ্ছিলো। যেমনটি ইবনে মুতায তার সম্পর্কে বলেন ,“ আমার একটি তরবারি আছে যা মৃত্যু বিকিরণ করে , যখনই তা কোষমুক্ত হয় তা থেকে রক্ত ঝরতে শুরুকরে। ”
আল হুর তার সাথী যুহাইর বিন ক্বাইনের সাথে আক্রমণ করলেন। যদি যুদ্ধে তাদের একজন শত্রুদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যেতো অন্যজন আসতেন তাকে রক্ষায় ও উদ্ধার করতেন। তারা এ কাজ করতেই থাকলেন যতক্ষণ না পদাতিক সৈন্যরা আল হুরকে সবদিক থেকে আক্রমণ করলো ও তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
বনি কিনদা গোত্রের উবায়দুল্লাহ বিন আমর বাদি বলেন ,“ ভুলে যেও না সাঈদ বিন আব্দুল্লাহকে ও আল হুরকেও , যারা যুহাইরের সাথে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাহায্য করেছিলো। ”
ফাত্তাল নিশাপুরি তার‘ রওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ -এ আল হুর বিন ইয়াযীদের শাহাদাত সম্পর্কে বলেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) আল হুরের মাথার কাছে এলেন , তখন তার রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো। তিনি বললেন ,
“ সাবাস হুর , তুমি স্বাধীন এই পৃথিবীতে ও আখেরাতে যেভাবে তোমার মা তোমায় নাম দিয়েছেন। ”
এরপর তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করলেন:
“ শ্রেষ্ঠ আল হুর হলো বনি রিয়াহের আল হুর , বর্শাঘাত বিনিময়ের সময় আল হুর শ্রেষ্ঠ আল হুর , যে তার জীবনের সাথে উদার ছিলো যখন সকালে হোসেইন ডাক দিলো। ”
শেইখ সাদুক্ব ও একই বর্ণনা দিয়েছেন ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে। শেইখ আবু আলী মুনতাহাল মাকাল বলেন যে , আল হুর বিন ইয়াযীদ বিন নাজিয়্যাহ বিন সাঈদ ছিলেন বনি ইয়ারবু থেকে।
সাইয়েদ নি’ মাতুল্লাহ জাযায়েরি তুসতারি তার‘ আনওয়ারে নু’ মানিয়া ’ -তে লিখেছেন যে , একদল বিশ্বস্তব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে , যখন শাহ ইসমাইল সাফাভি বাগদাদের নিয়ন্ত্রণ নিলেন তিনি কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর মাযার যিয়ারতে এলেন। তিনি কিছু লোককে শুনতে পেলেন আল হুর সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করতে। তাই তিনি কবরের মাথার কাছে এলেন এবং আদেশ করলেন তা খুঁড়তে। জনগণ দেখতে পেলো আল হুর তার কবরে ঘুমাচ্ছেন তাজা রক্তে ভিজে এবং একটি রুমাল তার কপালে বাঁধা ছিলো। শাহ ইসমাইল তার কপাল থেকে রুমালটি খুলতে চাইলেন , যা ঐতিহাসিক সংবাদ অনুযায়ী ইমাম হোসেইন (আ.) বেঁধেছিলেন। যখন রুমালটি খোলা হল তাজা রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগলো এবং কবর ভরে গেলো। তখন রুমালটি আবার তার জায়গায় বাঁধা হলো এবং রক্ত বের হওয়া বন্ধ হলো। তারপর তারা আবার রুমালটি খুললেন কিন্তু রক্ত বের ওয়া শুরুহলো। তারা ভিন্ন পন্থায় রক্ত বন্ধ করতে চেষ্টা করলেন কিন্তু পারলেন না এবং শেষ পর্যন্তএ রুমালটি বেঁধে দিলেন , এভাবে আল হুরের উচ্চ মর্যাদা তাদের কাছে নিশ্চিত হলো এবং শাহ একটি মাযার নির্মাণ করতে আদেশ করলেন কবরের ওপরে এবং একজন চাকর নিয়োগ করলেন তা দেখাশোনা করার জন্য।
‘ ওয়াসায়েলুশ শিয়া ’ গ্রন্থের লেখক সম্মানিত হাদীস বিশারদ শেইখ মুহাম্মাদ বিন হাসান আল হুর আমেলি ছিলেন আল হুর বিন ইয়াযীদ আর রিয়াহির বংশধর , যা শেইখ আহমাদ তার‘ দুররুল মুলুক ’ -এ উল্লেখ করেছেন।
[তাবারির গ্রন্থে উল্লেখ আছে] আবু সামামাহ সায়েদি তার চাচাতো ভাইকে হত্যা করলেন , যে তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করতো এবং যোহরের নামায পড়লেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর ইমামতিতে সালাতুল খওফ (ভীতি) পদ্ধতিতে।
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে] অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে , যুহাইর বিন ক্বাইন এবং সাঈদ বিন আব্দুল্লাহকে ইমাম বললেন তার সামনে দাঁড়াতে যেন তিনি যোহরের নামাযের ইমামতি করতে পারেন। তারা তা করলেন এবং ইমাম তার অর্ধেক সাথীদের সাথে নিয়ে নামায পড়লেন।
বর্ণিত আছে , সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ হানাফি ইমামের সামনে দাঁড়ালেন এবং এ কারণে তীরগুলোর লক্ষ্যে পরিণত হলেন। ইমাম যেদিকেই ফিরলেন , সাঈদ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন যতক্ষণ না তিনি সম্পূর্ণ আহত অবস্থায় পড়ে গেলেন। তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , আদ ও সামুদ গোত্রের উপর আপনার অভিশাপের মত অভিশাপ তাদের উপর পাঠান। হে আল্লাহ , আমার সালাম পৌঁছে দিন আমার নবীর কাছে এবং তাকে জানান আমি কী ধরনের ব্যথা ও আঘাত বহন করেছি , কারণ আমি আপনার পুরস্কার আকাঙ্ক্ষা করি আপনার নবীর সন্তানকে রক্ষা করার জন্য। ” এ কথা বলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) । তরবারির আঘাত ব্যতীত তার দেহে ছিলো তেরটি তীরের আঘাত।
ইবনে নিমা বলেন যে কিছু কিছু ব্যক্তি বলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) এবং তার সাথীরা ইশারার মাধ্যমে একা একা নামায পড়েছিলেন।
[তাবারির গ্রন্থে আছে] ইবনে আসীর এবং অন্যরা বলেন যে যোহরের নামায শেষ হওয়ার পর তারা প্রচণ্ড আক্রমণ করে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে চলে আসে। তখন সাঈদ ইমামের ঢাল হিসাবে দাঁড়ালেন এবং তাকে সবদিক থেকে রক্ষা করলেন , আর এ কারণে শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেন। সবদিক থেকে তীর আসতে লাগলো এবং তিনি পড়ে গেলেন। শহীদদের প্রতি সালামে বলা হয়েছে ,“ সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ হানাফির উপর সালাম , যখন ইমাম হোসেইন তাকে অনুমতি দিলেন তাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য , তখন বলেছিলেন , না , আল্লাহর শপথ , আমরা আপনাকে একা ফেলে যাবো না। এরপর আপনি মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন এবং ইমামকে রক্ষা করেছিলেন এবং আপনি আল্লাহর অনুগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন বসবাসের স্থানে (বেহেশতে) । আল্লাহ যেন আমাদেরকে আপনার সাথে শহীদদের কাতারে জমা করেন এবং আল্লাহ যেন আপনার বন্ধুত্ব আমাদের দান করেন সর্বোচ্চ সম্মানিতদের স্থানে। ”
আমরা বলি: এই কথাগুলোর উপর একটু ভাবুন যা প্রশান্তিলাভকারী শহীদদের এবং কারবালার অন্যান্য শহীদদের মর্যাদা প্রমাণ করে , যা বুদ্ধিমানদের কল্পনাকে অতিক্রম করে গেছে। তাদের সম্মান সম্পর্কে এতটুকুই যথেষ্ট।
ইবনে নিমাও উল্লেখিত সাঈদের শাহাদাত বর্ণনা করেছেন তাবারী ও ইবনে আসীরের ভাষায়। এরপর তিনি বলেন যে , তখন উমর বিন সা’ আদ আমর বিন হাজ্জাজকে পাঠালো তীরন্দাজদের দিয়ে। তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর বাকী সঙ্গী-সাথীদের দিকে তীর ছুঁড়লো এবং তাদের ঘোড়াগুলোকে হত্যা করলো। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে ইমামের সাথে আর কোন ঘোড় সওয়ার রইলো না। তিনি বললেন ,
“ কমবয়েসী ঘোড়াগুলো কি তাদের পতাকার নিচে দাঁড়াবে আমাদের ছেড়ে ? অথচ আমরা হচ্ছি তাদের সর্দারদের নেতা ? যখন কোন দুর্যোগ আমাদের শহরে প্রবেশ করতে চায় , আমাদের সে শক্তি আছে তা দূরে সরিয়ে দেয়ার এবং কেউ ছাউনির নিচে ঝকঝকে তরবারি নিয়ে হাঁটে না এবং আমাদের দল থেকে কেউ তাকে পাহারা দেয় না। ”
[তাবারির গ্রন্থে বর্ণিত আছে] যুহাইর বিন ক্বাইন বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করছিলেন এবং বলছিলেন ,“ আমি যুহাইর , ক্বাইনের সন্তান। আমি তোমাদেরকে হোসেইনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবো আমার তরবারি দিয়ে , কারণ সে নবীর দুই নাতির একজন , যিনি ধার্মিক ও পবিত্র বংশধর , এতে কোন মিথ্যা নেই যে তিনিই ইমাম , আমি তোমাদেরকে হত্যা করবো এবং এতে কোন আফসোস করবো না এবং আমার ইচ্ছে হয় যদি আমি দুভাগে ভাগ হতে পারতাম (তাহলে আমি দুগুণ যুদ্ধ করতাম) । ”
[তাবারির গ্রন্থে আছে] এরপর যুহাইর তার হাত ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাঁধে রাখলেন এবং বললেন ,“ এগিয়ে যান , কারণ আপনি হেদায়েতপ্রাপ্ত ও একজন হাদী (পথপ্রদর্শক) । আজ আপনি আপনার নানা নবী এবং (ইমাম) হাসান এবং মুরতাযা আলী (আ.) এর সাথে এবং দুপাখা বিশিষ্ট সুসজ্জিত ব্যক্তি আপনার চাচা জাফর এবং হামযা জীবন্ত শহীদ আল্লাহর সিংহের সাথে সাক্ষাত করবেন। ”
[মুহাম্মাদ বিন আবি তালিবের‘ মাক্বাতাল ’ -এ আছে] এরপর তিনি আক্রমণ করলেন এবং একশ বিশ জনকে হত্যা করলেন। [তাসলিয়াতুল মাজালিস , তাবারি , কামিল] এরপর কাসীর বিন আব্দুল্লাহ শা ’ আবি এবং মুহাজির বিন আওস তামিমি তাকে আক্রমণ করলো এবং তাকে মাটিতে ফেলে দিলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) । যখন যুহাইর তার ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,
“ হে যুহাইর , আল্লাহ যেন তোমাকে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে না রাখেন এবং তোমার হত্যাকারীদের উপর তার গযব ফেলেন যেভাবে তিনি তাদের করেছিলেন তাদের যারা বাঁদর ও শুকরে পরিণত হয়েছিলো। ”
নাফে ’ বিন হিলালের শাহাদাত
নাফে ’ বিন হিলাল জামালি (অথবা বাজালি) তার নাম খোদাই করেছিলেন তার তীরগুলোতে এবং সেগুলোকে বিষে চুবিয়ে ছিলেন এবং সেগুলো শত্রুদের দিকে একের পর এক ছুঁড়ছিলেন এই বলে ,“ আমি এই তীরগুলো ছুঁড়ছি যার দাঁতগুলো বিষ বহন করে , যারা ভয় পায় তাদের তাতে কোন লাভ হবে না , এগুলো বিষমাখা যা শত্রুদেরকে পলায়নের উপর রাখে এবং এর আঘাত যমীনকে রক্তে ভরে দেয়। ”
তিনি একের পর এক তীর ছড়ঁতে থাকেন তা সব শেষ হওয়া পর্যন্ত। এরপর তিনি তার হাত তরবারির উপর রাখলেন ও বললেন ,“ আমি ইয়েমেনি গোত্র বাজালাহর এক যুবক , আমি অনুসরণ করি হোসেইন ও আলীর ধর্ম , আজকে আমাকে শহীদ করা হবে এবং তা আমার হৃদয়ের আশা এবং আমি আমার এর কাজগুলোর সাথে সাক্ষাত করবো। ”
তাবারি বলেন যে , তিনি উমর বিন সা’ আদের সাথীদের মাঝ থেকে বারো জনকে হত্যা করেন , তাদেরকে ছাড়াই যাদেরকে তিনি আহত করেছেন , যতক্ষণ না তার দুই হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হলো। এরপর তাকে শিমর বন্দী করে এবং সে তার সাথীদের বলে তাকে মাটিতে হিঁচড়ে উমর বিন সাদের কাছে নিতে। উমর বিন সা’ আদ তাকে বললো ,“ দুর্ভোগ হোক তোমার , তুমি নিজের এ কী করেছো। ” নাফে ’ বললেন ,“ নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার নিয়ত সম্পর্কে জানেন। ” বর্ণনাকারী বলে যে রক্ত তার দাড়িতে বইছিলো আর সে বলছিলো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তোমাদের বারোজনকে হত্যা করেছি , তাদের ছাড়া যাদেরকে আহত করেছি এবং তার জন্য নিজেকে তিরস্কার করি না। যদি আমার হাতদুটো উপস্থিত থাকতো এবং আমার কব্জিগুলো থাকতো , তোমরা আমাকে বন্দী করতে পারতে না। ” শিমর উমর বিন সা’ আদকে বললো , “ আল্লাহ তোমার বিষয়গুলো সহজ করে দিন , তাকে হত্যা করো। ” উমর বললো ,“ তুমি তাকে এনেছো , তুমি তাকে হত্যা করো , যদি চাও ?” তা শুনে শিমর তার তরবারি কোষমুক্ত করলো। নাফে ’ বললেন ,“ তুমি যদি মুসলমান হতে , তুমি আমাদের রক্ত ঘাড়ে নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে ঘৃণা করতে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর , যিনি আমাদের মৃত্যু নির্ধারিত করেছেন সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে অভিশপ্তদের হাতে। ” (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক।)
আব্দুল্লাহ ও আবদুর রহমান গিফারির শাহাদাত
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা তাদের ক্ষয়-ক্ষতি দেখতে পেলেন এবং বুঝতে পারলেন যে তারা ইমাম ও তার আত্মীয়দের রক্ষায় অক্ষম তখন তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দেয়ার জন্য দ্রুত এগোলেন। আব্দুল্লাহ ও আবদুর রহমান , যারা উরওয়া গিফারীর সন্তান ছিলেন , তারা ইমামের কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে আবা আবদিল্লাহ শত্রু আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে এবং সবদিক থেকে আপনার দিকে দ্রুত এগোচ্ছে , তাই আমরা চাই আপনার সামনে নিহত হতে এবং আপনার জন্য জীবন কোরবান করতে। ” ইমাম বললেন ,
“ স্বাগতম , আমার কাছে এসো। ”
তারা ইমামের কাছে এলেন এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে লাগলেন। তাদের একজন বললেন , “ নিশ্চয়ই বনি গিফার এবং খানদাফ এবং বনি নিযার জানে যে , আমি ব্যভিচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি আমার সুস্পষ্ট ও বিদ্যুৎগতি তরবারি দিয়ে। হে জাতি , সম্মানিত পিতাদের সন্তানদের রক্ষা করো , সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে যাদের কাছে আছে পূর্বাঞ্চলের তরবারি ও ধারালো বর্শা। ”
[তাবারির গ্রন্থে] বর্ণনাকারী বলেন যে , দুজন জাবিরি ব্যক্তি , সাইফ বিন হুরেইস এবং মালিক বিন আবদ , যারা ছিলো চাচাতো ভাই ও দুধভাই , ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলেন এবং তারা কাঁদছিলেন। ইমাম তাদের জিজ্ঞেস করলেন ,
“ হে আমার ভাইয়ের সন্তানেরা , কেন তোমরা কাঁদছো ? আল্লাহর শপথ , আমি চাই তোমাদের চোখগুলো জ্বলজ্বল করবে। ”
তারা বললেন ,“ আল্লাহ আমাদেরকে আপনার জন্য কোরবান করুন , আমরা আমাদের জন্য কাঁদছি না , বরং আপনার জন্য কাঁদছি , আমরা দেখছি আপনাকে ঘেরাও করে ফেলা হয়েছে , আর আমরা আপনাকে রক্ষায় অক্ষম। ” ইমাম বললেন ,
“ হে আমার ভাইয়ের সন্তানেরা , আল্লাহ যেন তোমাদের এই বিবেক ও সমবেদনার জন্য উপযুক্ত পুরস্কার দান করেন। ”
[‘ মানাক্বিব ’ গ্রন্থে আছে] তখন তারা আরও অগ্রসর হলেন এই বলে ,“ আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান ” এবং ইমামও তাদের সালামের জবাব দিলেন। এরপর তারা আক্রমণ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তাদের উপর বর্ষিত হোক) ।
হানযালা বিন আল-আস’ আদ শাবামির শাহাদাত
[তাবারির গ্রন্থে ,‘ কামিল ’ গ্রন্থে আছে] এরপর হানযালা বিন আল-আস’ আদ শা ’ বামি এলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে দাঁড়ালেন [মালহুফ] এবং তাকে তীর , বর্শা ও তরবারি থেকে রক্ষা করতে শুরু করলেন তার চেহারা ও ঘাড় দিয়ে [তাবাবি , কামিল] এবং উচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগলেন ,
) يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ مِثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ (৩০) مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِلْعِبَادِ (৩ ১ ) وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ (৩২) يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ مَا لَكُمْ مِنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ(
হে আমার সম্প্রদায় , আমি শংকিত যে তোমাদের তা হতে পারে যা দলগুলোর ঘটেছিলো , যেমন নূহ , আদ ও সামুদ ও তাদের পর যে লোকেরা এসেছিলো এবং আল্লাহ তার দাসদের উপর কোন অবিচার চান না , হে আমার সম্প্রদায় , আমি তোমাদের জন্য শংকিত সে দিনের বিষয়ে যেদিন চিৎকার করে (পরস্পরকে) ডাকার দিন , যেদিন তোমরা পিছনের দিকে ফিরে যাবে , (যখন) তোমাদের কোন রক্ষাকর্তা থাকবে না আল্লাহর ক্রোধ থেকে এবং যাকে আল্লাহ পথভ্রষ্ট হতে দেন তার জন্য কোন হাদী নেই। [সূরা মু ’ মিন: ৩০-৩৩]
হে জনতা , হোসেইনকে হত্যা করো না , হয়তো আল্লাহ তাঁর ক্রোধে তোমাদের ধ্বংস করে দিবেন এবং যে মিথ্যা বলে সে অবশ্যই হতাশ হবে। ”
[তাবারি ,‘ কামিল ’ ] ইমাম তাকে উচ্চ কণ্ঠে ডাকলেন ,
“ হে আস’ আদের সন্তান , তোমার আল্লাহ তোমার উপর রহমত বর্ষণ করুন , তারা গযবের যোগ্য হয়ে গেছে সে সময় থেকে যখন যুদ্ধের আগে সঠিক পথের দিকে তোমার দাওয়াত তারা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সে সময় থেকে যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং তোমার সাথীদের রক্ত ঝরানো বৈধ মনে করেছে। তাই তোমার ধার্মিক ভাইদের হত্যা করার পর তাদের পালাবার পথ কোথায় ?”
হানযালা বললেন ,“ আপনি সত্য বলেছেন , আমি আপনার জন্য কোরবান হই , এখন সময় হয়েছে অন্য বাসায় যাওয়ার এবং ভাইদের সাথে মিলিত হওয়ার। ”
[‘ তাবারি ’ র গ্রন্থ ,‘ মাশহুদ ’ গ্রন্থে] ইমাম বললেন , “ হ্যাঁ , সেদিকে যাও , যা তোমার জন্য উত্তম এ পৃথিবী ও তাতে যা আছে তা থেকে , সেই রাজ্যের দিকে যাও যা কখনো ক্ষয়ে যাবে না। ”
এ কথা শুনে হানযালা বললেন ,“ আপনার উপর শান্তিবর্ষিত হোক হে আবা আবদিল্লাহ আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক আপনার ও আপনার পরিবারের উপর , আল্লাহ যেন বেহেশতে আমাদেরকে আপনার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ” ইমাম বললেন ,“ তাই হোক। ”
এরপর হানযালা এগিয়ে গেলেন [মালহুফ] এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করলেন , এবং যুদ্ধের ভয় সহ্য করলেন যতক্ষণ না তাকে শহীদ করা হল (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
[তাবারি গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে] তখন দুজন জাবিরি ভাই এগিয়ে এসে বললেন , আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক হে রাসূলুল্লাহর সন্তান। ”
ইমাম বললেন ,
“ তোমাদের উপর শান্তিবর্ষিত হোক। ”
তারা শহীদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তাদের উপর বর্ষিত হোক) ।
শাওযিব ও আবিসের শাহাদাত
বর্ণনাকারী বলেন যে , আবিস বিন শাবিব শাকিরি তার আত্মীয় শাওযিবের কাছে এলেন এবং বললেন ,“ তোমার হৃদয়ের আশা কী ?” তিনি বললেন ,“ আমি কী চাই ? আমি চাই তোমার পাশে থেকে যুদ্ধ করতে। আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সন্তানদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে , যতক্ষণ না আমি শহীদ হই। ” আবিস আরও বললেন ,“ আমি তোমার বিষয়েও একই জিনিস চাই , অতএব আরও এগিয়ে যাও ইমামের দিকে যেন তিনি তোমাকে তার সাথীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেন , যেভাবে তোমার পূর্ববর্তীরা অগ্রসর হয়েছে যেন আমিও তোমাকে বিবেচনা করতে পারি। এই মহুর্তে যদি আমার চাইতে নিকটতর অন্য কেউ আমার সাথে থাকতো আমি তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে আমার আগে পাঠাতাম , তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে প্রচুর পুরস্কার লাভের আশায়। আজ আমাদের কাজকর্মের শেষ দিন , কারণ আজকের পরে আর কোন কাজকর্ম থাকবে না , শুধু থাকবে হিসাব নিকাশ। ” এরপর শাওযিব এগিয়ে এলেন এবং ইমামকে অভিবাদন জানালেন এবং যুদ্ধ করলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
শাকির হলো ইয়েমেনর একটি গোত্র এবং হামাদান গোত্রের শাখা , যা পৌঁছেছে শাকির বিন রাবি ’ য়াহ বিন মালিক পর্যন্ত। আবিস ছিলেন উপরোক্ত গোত্র থেকে এবং শাওযিব ছিলেন তার মিত্র এই অর্থে যে তিনি তার সাথে থাকতেন এবং তার বিশ্বস্তবন্ধু ছিলেন কিন্তু তার কর্মচারী বা মুক্ত দাস ছিলেন না , যা কেউ কেউ মনে করেন। এর বিপরীতে , আমাদের শেইখ , হাদীস বিশারদ (হোসেইন) নূরী যিনি‘ মুসতাদরাকুল ওয়াসায়েল ’ -এর লেখক , বলেন যে , সম্ভবত , শওযিবের সম্মান আবিসের চাইতে বেশি ছিলো। কারণ তার বিষয়ে বলা হয় যে তিনি (শাওযিব) শিয়া মাযহাবে অগ্রগামীদের একজন ছিলেন।
[তাবারি গ্রন্থে আছে] এরপর আবিস বিন আবি শাবীব ইমাম হোসেইন (আ.) কে বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ পৃথিবীর উপর আত্মীয়দের ও অন্যদের মাঝে এমন কেউ নেই যে আমার কাছে আপনার চাইতে বেশী প্রিয়। যদি আমার জীবনের চাইতে বেশি প্রিয় এমন কিছু থাকতো যা দিয়ে আমি জুলুমকে প্রতিরোধ করতে পারতাম তাহলে আমি তাই করতাম। শন্তিবর্ষিত হোক আপনার উপর হে আবা আবদিল্লাহ আমি আল্লাহকে আমার সাক্ষী ডাকি যে , আমি আপনার পিতা ও আপনার পথের উপর (দৃঢ়) আছি। ” এ কথা বলে তিনি তরবারি কোষমুক্ত করলেন। তার কপালে ছিলো একটি আঘাত। তিনি শত্রুকে আক্রমণ করলেন।
আযদি বলেন যে , নামীর বিন রামালাহ বর্ণনা করেছে রাব ’ ঈ বিন তামীম হামাদান থেকে , যে যুদ্ধে উপস্থিত ছিলো: আমি দেখেছি আবীস যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগোচ্ছে এবং তাকে চিনতে পেরেছিলাম। আমি তাকে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে দেখেছিলাম। সে ছিলো সাহসী লোক। তাই আমি বললাম ,“ হে জনতা , দেখো এ লোক হচ্ছে সিংহদের মধ্যে সিংহ। সে আবু শাবীবের সন্তান। কেউ যেন তার মোকাবিলায় না যায়। ” তখন আবিস উচ্চ কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন ,“ তোমাদের মধ্যে কি কোন পুরুষ নেই ?” এ কথা শুনে উমর বিন সা’ আদ বললো ,“ তাকে পাথর ছুঁড়ে মারো। ” লোকজন তাকে পাথর ছুঁড়ে মারতে শুরু করলো । যখন আবিস তা দেখলেন তিনি তার বর্ম ও শিরস্ত্রাণ খুলে ফেললেন। প্রশংসা আল্লাহর সেই ব্যক্তির উপর , যে বলেছে ,“ যে ভয়ভীতি ছাড়া তার ঘাড় দিয়ে ধারালো বর্শার সাথে সাক্ষাত করে এবং তার মাথাকে শিরস্ত্রাণ মনে করে যখন বর্শা অগ্রসর হয়। সে কোন বর্ম পরে না শুধু পবিত্র চরিত্রের বর্ম ছাড়া। ”
একজন ইরানী কবি বলেছেন ,“ তিনি তার বর্ম সরিয়ে বললেন , আমি একটি চাঁদ , মাছ নই এবং তিনি তার শিরস্ত্রান খুলে বললেন ,‘ আমি কোন মোরগ নই এবং তিনি বেরিয়ে এলেন কোন বমর্বা শিরস্ত্রাণ ছাড়াই , অলঙ্কৃত হয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য নব বধূর মত। ”
এরপর তিনি শত্রুদেরকে আক্রমণ করলেন (বর্ণনাকারী বলেন যে) আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তিনি দুশ মানুষের একটি দলকে পিছনে হটিয়ে দিচ্ছেন। এরপর তারা তার দিকে সবদিক থেকে অগ্রসর হলো এবং তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বষির্তেহাক তার উপর) । আমি তার মাথাকে দেখলাম একটি দলের হাতে যারা নিজেদের মধ্যে তর্ক করছিলো যে তারা তাকে হত্যা করেছে। এরপর তারা উমর বিন সা’ আদের কাছে এলো , সে বললো“ ঝগড়া করো না , কারণ কোন এক ব্যক্তি তাকে হত্যা করেনি। ” সে তাদেরকে ফিরিয়ে দিলো।
আবুল শা’ সা কিনদির শাহাদাত
আযদি বলেন যে , ফুযাইল বিন খাদীজ কিনদি আমাকে বলেছে যে , আবল শা ’ সা ইয়াযীদ বিন যিয়াদ (অথবা মুহাজির) কিনদি , যে বনি বাহদুলা গোত্রের ছিলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং একশত তীর ছুঁড়ে মারলেন শত্রুদের দিকে। যার মধ্যে শুধু পাঁচটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ। যখনই তিনি একটি তীরড়ছিলেছন , উচ্চস্বরে বলছিলেন আমি বাহদুলার সন্তান এবং আরজালার অশ্বারোহী। ”
তার সম্পর্কে ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে আল্লাহ , তার তীর ছোঁড়াকে দৃঢ় করো এবং পুরস্কার হিসেবে তাকে বেহেশত দান করো। ”
যখন তিনি তার সব তীর খরচ করে ফেললেন তখন উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,“ মাত্র পাঁচটি তীর আমার ব্যর্থ হয়েছে আর আমি জানি আমি পাঁচ ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। ” আবুল শা ’ সা কিনদি শাহাদাত বরণকারী প্রথম দলটিতে ছিলেন। সে দিন তিনি নিচের যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন ,
“ আমি ইয়াযীদ এবং আমার পিতা মুহাজির , আমি জঙ্গলের সিংহের চাইতে সাহসী , ইয়া রব , আমি হোসাইনের একজন সাহায্যকারী এবং সা’ আদের সন্তানের সাথে সম্পর্ক ছেদ করেছি এবং আমার ডান হাতে রয়েছে ধারালো ও ধ্বংসাত্মক তরবারি। ”
ইয়াযীদ বিন মুহাজির উমর বিন সা’ আদের সাথে কুফা থেকে এসেছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে , কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে তারা ইমামের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে তখন তিনি ইমামের পক্ষে যোগ দিলেন এবং তার জন্যে যুদ্ধ করলেন এবং শাহাদাত অর্জন করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বার্ষিত হোক তার উপর) ।
ইমাম হোসেইন (আ.) এর একদল সাথীর শাহাদাত
উমর বিন খালিদ সাইদাউই , জাবির বিন হুরেইস সালমানি , উমর বিন খালিদের দাস সা’ আদ এবং মুজমে ’ বিন আব্দুল্লাহ আয়েযি , সবাই বেরিয়ে এলেন তাদের তরবারি নিয়ে যুদ্ধের শুরুতে। তারা কুফার সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করলেন এবং তাদের সারিতে ঢুকে পড়লেন। শত্রুরাও তাদের আক্রমণের জবাব দিলো এবং তাদেরকে ঘোরাও করে ফেললো এবং তাদেরকে তাদের সাথীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। এ দৃশ্য দেখে আব্বাস বিন আলী (আ.) দ্রুত তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে তাদের থাবা থেকে উদ্ধার করলেন। তারপর যখন শত্রুরা আবার এগিয়ে এলো তারা তাদেরকে আক্রমণ করলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা তারা সবাই এক জায়গায় শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তাদের উপর) ।
সুয়েইদ বিন আমর বিন আবি মুতা ’ র শাহাদাত
আযদি বলেন যে , যুহাইর বিন আবদুর রহমান খাস’ আমি আমাকে বলেছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের মধ্যে শেষ ব্যক্তি যে তার সাথে ছিলেন , তিনি ছিলেন সুয়েইদ বিন আমর বিন আবি মুতা ’ । তিনি শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছিলেন এবং তিনি সারা শরীরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় শহীদদের সাথে মাটিতে পড়ে যান। যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পান তিনি শুনতে পেলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হয়েছে। তিনি ভয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারা তার তরবারি নিয়ে গিয়েছিলো , কিন্তু তার ছিলো একটি ছোরা এবং তিনি তা হাতে তুলে নিলেন। তিনি তাদের সাথে কিছু সময়ের জন্য যুদ্ধ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত শাহাদাত লাভ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) । তার হত্যাকারীরা ছিলেন উরাওয়াহ বিন বাতা ’ তুগলাবি এবং যায়েদ বিন রাককাদ। তিনি ছিলেন (কারবালায়) শেষ শহীদ।
সাইয়েদ ইবনে তাউস তার প্রশংসা করে বলেন যে , তিনি ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি এবং প্রচুর নামায পড়তেন। তিনি হিংস্র সিংহের মত যুদ্ধ করেছিলেন এবং দৃঢ় ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না (অজ্ঞান হয়ে) পড়ে গেলেন শহীদদের মাঝে।
আমি (লেখক) বলি যে , শিয়া ও সুন্নী ঐতিহাসিকদের ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ও মাক্বতালের লেখকদের বর্ণনায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের শাহাদাতের ক্রমধারা এবং তাদের সর্বমোট সংখ্যা ও তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবিতায় মতভেদ রয়েছে। কেউ আগের লোকদের আলোচনা করেছেন শেষে এবং পরের লোকদের আগে। কেউ কেউ শুধতাদের নাম ওদ্ধয কবিতা উল্লেখ করেছেন এবং অন্যরা কিছু সাথীর শাহাদাত বর্ণনা করেছেন কিন্তু বাকীদের বর্ণনা দেন নি।
এখন পর্যন্ত আমি নির্ভর করেছি নির্ভরযোগ্য প্রাচীন ঐতিহাসিকদের সংবাদের উপর , তাই এক দল শহীদের বর্ণনা বাদ পড়েছে , যাদের শাহাদাতের আলোচনা বাকী রয়ে গেছে আমার। তাই আমি তাদের শাহাদাত আলোচনা করছি সেই ক্রমধারায় যা শেই মুহাম্মাদ বিন আলী বিন শাহর আশোব উল্লেখ করেছেন তার কিতাব“ মানাক্বিব ” -এ।
এ ক্রমধারা অনুযায়ী আল হুর প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন। এরপর বুরাইর বিন খুযাইর , যাদের শাহাদাত ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে। এরপর ওয়াহাব বিন আব্দুল্লাহ বিন হাববাব কালবি যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলেন , তার মা-ও সেদিন তার সাথে ছিলেন , যিনি তাকে বলেছিলেন , “ উঠো , হে আমার সন্তান এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) এর নাতিকে রক্ষা করো।” ওয়াহাব বললেন ,“ নিশ্চয়ই আমি কৃপণতা করবো না। ” এরপর তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলেন এবং বলছিলেন ,“ যদি তোমরা আমাকে না চেনো , আমি বনি কালব গোত্রের , শীঘ্রই তোমরা আমাকে ও আমার তরবারিকে দেখবে এবং তোমরা দেখবে আমার আক্রমণ ও যুদ্ধে আমার প্রভাব , আমি আমার প্রতিশোধ নিবো আমার সাথীদের প্রতিশোধের পর এবং আমি দুঃখ ও কষ্ট দূর করবো আমার দুঃখের আগে , আমার সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করা কোন কৌতুককর বিষয় নয়। ” তিনি কুফার সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করলেন এবং তাদের একটি দলকে একের পর এক হত্যা করলেন। এরপর তিনি তার মা ও স্ত্রীর কাছে ফিরলেন এবং তাদের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বললেন , “ হে মা ,তুমি কি এখন সন্তুষ্ট ?‘ তিনি উত্তর দিলেন ,“ আমি সন্তুষ্ট হবো না যতক্ষণ না তুমি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সামনে শহীদ হও। ” এরপর তার স্ত্রী বললেন ,“ আমি তোমাকে আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি যেন আমাকে বিধবা করো না , যাও এবং নবীর নাতির সাথে থেকে যুদ্ধ করো , যেন তিনি কিয়ামতের দিন তোমার জন্য সুপারিশ করেন। ” ওয়াহাব ফিরলেন এ কথা বলে ,“ আমি তোমার কাছে অঙ্গীকার করছি , হে ওয়াহাবের মা , তাদেরকে বর্শা ও তরবারি দিয়ে আঘাত করবো , সেই যুবকের তরবারি চালানোর মত যে সর্বশক্তিমান আল্লাহতে বিশ্বাসী , যেন এই জাতিকে যুদ্ধের তিক্ত স্বাদ দিতে পারি , আমি বীর এবং এক যুবক , যার আছে ধারালো তরবারি , আমি যুদ্ধের সময় ভীত নই। প্রজ্ঞাবান আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট। ”
এরপর তিনি তাদের উপর আক্রমণ চালালেন এবং উনিশ জন অশ্বারোহী ও বারো জন পদাতিক সৈন্যকে হত্যা করলেন। তার দুটো হাতই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এ দৃশ্য দেখে তার মা তাঁবুর একটি খুটি হাতে নিয়ে তার দিকে দৌড়ে গেলেন এই বলে ,“ আমার পিতামাতা তোমার জন্য কোরবান হোক , আল্লাহর নবীর পরিবারের রাস্তায় সংগ্রাম করো। ” ওয়াহাব এগিয়ে এলেন তার মাকে তাঁবুতে ফেরত আনতে , তখন তিনি (তার মা) তার জামা ধরে বললেন ,“ আমি ফিরবো না যতক্ষণ না আমাকে তোমার সাথে হত্যা করা হয়। ” যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এ দৃশ্য দেখলেন তিনি বললেন ,
“ আল্লাহ যেন তোমাকে উপুক্ত পুরস্কার দান করেন আমার পরিবারের অধিকারের কারণে। নারীদের কাছে ফেরত যাও , আল্লাহ তোমার উপর রহমত করুন। ”
এ কথা শুনে তিনি ফেরত এলেন এবং ওয়াহাব যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত গেলেন এবং তাকে হত্যা করা হলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
ওয়াহাবের স্ত্রী এলেন এবং তার মাথার পাশে বসলেন এবং তার স্বামীর চেহারা থেকে রক্ত মুছে দিতে শুরু করলেন । যখন শিমর তাকে দেখলো সে তার দাসকে আদেশ দিলো তাকে তার লাঠি দিয়ে আঘাত করতে। সে তাই করলো এবং তিনি ছিলেন প্রথম নারী যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর পক্ষে শহীদ হয়েছিলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
শেইখ সাদুক্বের‘ রওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ ও‘ আমালি ’ তে বর্ণিত হয়েছে যে , ওয়াহাব বিন ওয়াহাব এবং তার মা আগে খৃস্টান ছিলেন এবং তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা ইমামের সাথে করবালা আসেন এবং আশুরার দিনে ওয়াহাব তার ঘোড়ায় চড়েন এবং তাঁবুর একটি খুঁটি তার হাতে ছিলো। তিনি যুদ্ধ করলেন এবং শত্রুপক্ষের সাত অথবা আট জনকে হত্যা করেন। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং উমর বিন সা’ আদের কাছে নেয়া হয় , সে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করার আদেশ দেয়।
আল্লামা মাজলিসি বলেন , তিনি এক বর্ণনাতে দেখেছেন যে , ওয়াহাব আগে খৃস্টান ছিলেন , এরপর তিনি তার মা সহ ইসলাম গ্রহণ করেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর হাতে। যখন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন তিনি তরবারি দিয়ে চব্বিশ জন পদাতিক সৈন্য ও বারোজন অশ্বারোহী সৈন্যকে হত্যা করেন। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং উমর বিন সা’ দের কাছে আনা হয় , যে তাকে বলেছিলো ,“ কী সাহস-ই না তুমি রাখো। ” এরপর সে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আদেশ দেয়। তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় এবং তার মাথাটি ইমাম হোসেইন (আ.) এর তাঁবুর দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয়। তার মা তার মাথাটি তুলে তাতে চুমু দেন এরপর তা ছুঁড়ে মারেন উমর বিন সা’ দের সৈন্যবাহিনীর দিকে যা একজন সৈন্যকে আঘাত করে ও হত্যা করে। এরপর তিনি তাঁবুর একটি খুঁটি তুলে নেন এবং অন্য দুজনকে হত্যা করেন যতক্ষণ না ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে দেখলেন এবং বললেন ,
“ হে ওয়াহাবের মা , ফিরে আসো , তুমি এবং তোমার সন্তান আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকবে এবং নারীদের কাছ থেকে জিহাদ তুলে নেয়া হয়েছে। ”
তা শুনে তিনি ফেরত এলেন এবং বললেন ,“ হে রব , আমাকে হতাশ করেন না। ” ইমাম তাকে বললেন ,
“ তোমার রব তোমাকে হতাশ না করুন , হে ওয়াহাবের মা। ”
এরপর আমর বিন খালিদ আযদি সাইদাউই যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) কে বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আমি আপনার সাথীদের সাথে মিলিত হতে চাই এবং আমি আপনাকে একাকী ও শহীদ হতে দেখতে অপছন্দ করি। ”
ইমাম উত্তর দিলেন ,
“ এগিয়ে যাও এবং খুব শীঘ্রই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো। ”
তিনি আরও অগ্রসর হয়ে বললেন ,“ হে আমার সত্তা , দয়ালু রবের দিকে অগ্রসর হও , রুহানীয়াতের ও মিষ্টি উদ্ভিদের সুসংবাদের দিকে , আজ তোমরা যা ভাল কাজ করেছো তার প্রতিদান পাবে , যা ফলকে লেখা আছে পুরস্কার দানকারী রবের নিকট , ভয় পেয়ো না , ভীত হয়ো না , কারণ প্রত্যেক জীবিত জিনিস ধ্বংস হবে এবং তোমার শান্তির বেশির ভাগ অংশ হলো ধৈর্য হে বনি কাহতানের আযদের দল। ” এরপর তিনিদ্ধযকরলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ বর্ণিত আছে যে , তখন তার সন্তান খালিদ তাকে অনুসরণ করলেন এই বলে , “ বনি কাহতানের মৃত্যুতে ধৈর্য ধরো যেন দয়ালু , মর্যাদাবান , গৌরব , প্রকাশ এবং সম্মানিত , চিরস্থায়ী ’ ও দানশীল প্রভুর সন্তুষ্টি‘ অর্জন করতে পারো , হে প্রিয় বাবা , আপনি শ্রেষ্ঠ মুক্তার প্রাসাদে , মুগ্ধকারী বেহেশতে পৌঁছে গেছেন। ” তিনি আরও অগ্রসর হলেন এবং যুদ্ধ করলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা তিনিও শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
তারপর সা’ আদ বিন হানযালা তামিমি , যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সেনাবাহিনীর মাঝে সম্মানিতদের একজন ছিলেন , যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এই বলে ,“ তরবারি ও বর্শার সামনে ধৈর্য ধরো , এর উপর ধৈর্য ধরো বেহেশতে প্রবেশের জন্য এবং হুর আল আইনের কাছে পৌঁছার জন্য , যে বিজয় ও সফলতা আশা করে এবং তা সন্দেহ ও অনুমান নয়। হে আমার সত্তা , সংগ্রাম করো প্রশান্তির জন্য এবং চেষ্টা করো সৎকর্মশীলতা অর্জন করতে। ”
তিনি ভীষণভাবে আক্রমণ করলেন এবং শেষ পর্যন্ত শহীদ হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর উমাইর বিন আব্দুল্লাহ মাযহাজি বেরিয়ে এলেন এ যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে: “ বনি সা’ আদ ও মাযহাজ জানে যে , যুদ্ধের সময় আমি একজন ভয়ানক সিংহ , আমি সুসজ্জিত সৈন্যের মাথায় আঘাত করি আমার তরবারি দিয়ে এবং যোদ্ধাকে মাটিতে ফেলে দেই এবং তাকে নেকড়ে ও খোঁড়া হায়েনার খাদ্য বানাই। ” তিনি যুদ্ধ করতে থাকেন যতক্ষণ পর্যন্তনা মুসলিম যাবাবি এবং আব্দুল্লাহ বাজালি তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
মুসলিম বিন আওসাজা তাকে অনুসরণ করলেন , যার শাহাদাত ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আবদুর রহমান ইয়াযনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এই বলে ,“ আমি আবদুল্লাহর সন্তান এবং ইয়ামানের বংশধর , আমি হোসেইন ও হাসানের ধর্মে আছি , আমি তোমাদের আঘাত করি ইয়েমেনিবযেকর তরবারি দিয়ে যার মাধ্যমে আমি , যিনি আশ্রয় দেন , তার সাক্ষাত আশা করি। ” এরপর তিনি শাহাদাত লাভ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর ইয়াহইয়া বিন সালীম মাযানি বের হয়ে এলেন নিচের যুদ্ধ কবতিাটি আবৃত্তি করে ,“ আমি সেনাবাহিনীকে আঘাত করবো আমার ফয়সালাকারী তরবারি দিয়ে , এক বিদ্যুৎগতি তরবারি যা শত্রুদের দিকে দ্রুত এগোয় , আমি অদক্ষ নই , না আমি ভীত , না আমি এগিয়ে আসতে থাকা মৃত্যুকে ভয় করি ” এবং তিনিও একই ভাগ্য বরণ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
কুররাহ বিন আবি কুররাহ গিফারি তাকে অনুসরণ করলেন নিচের যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করে:“ গিফারের পুরো বংশ জানে এবং নিযারের বংশের পরে বনি খানদাদও জানে যে , উত্তপ্ত যুদ্ধের সময় আমি এক সিংহ এবং আমি আঘাত করি ব্যভিচারী দলকে তরবারি দিয়ে , সৎকর্মশীলদের বংশকে রক্ষায়। ” তিনি আটষট্টিজন ব্যক্তিকে হত্যা করলেন এবং নিহত হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর মালিক বিন আনাস কাহিলি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এই বলে ,“ আলীর সন্তানরা আল্লাহ ভক্ত আর উমাইয়ার সন্তানরা শয়তানের ভক্ত। ” এরপর তিনি চৌদ্দ জনকে হত্যা করলেন এবং কেউ কেউ বলেন যে তিনি আঠারো জনকে হত্যা করেন এবং নিজে শহীদ হন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
আমি (লেখক) দৃঢ় ভাবে অনুভব করি যে , মালিক বিন আনাস কাহিলি নামে যাকে ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে তিনি আনাস বিন হুরেইস কাহিলি ছাড়া অন্য কেউ নন , যিনি নবী (সা.) এর সাহাবী ছিলেন। ইবনে আসীর জাযারি তার আসাদুল গাবাহতে বলেছেন যে , আনাস বিন মালিক কুফার অধিবাসী ছিলেন। আশআস বিন সালীম বর্ণনা করেন তার বাবা থেকে , যিনি বলেন যে , রাসূল (সা.) একবার বলেছিলেন ,
“ আমার এই সন্তানকেই (ইমাম হোসেইনকে ইংগিত করে) ইরাকের এক জায়গায় হত্যা করা হবে , তখন যে থাকবে তার উচিত তাকে সাহায্য করা। ” এভাবে তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে শহীদ হন।
শেইখ নিমা তার‘ মুসীরুল আহযান ’ -এ বলেন যে , আনাস বিন হুরেইস কাহিলি যুদ্ধক্ষেত্রে এলেন এ বলে ,“ আমাদের গোত্র কাহিল এবং দাওদানও জানে , যেমন জানে খানদাফ ও ক্বায়েস আইলান যে , আমার জাতি এখন সমস্যার সম্মুখীন , হে জাতি , ভয়ানক সিংহে পরিণত হও এবং স্বাগতম জানাও এই সম্প্রদায়কে বিদ্যুৎগতির তরবারি দিয়ে , আলীর বংশধর দয়ালখোদার অনুসারী , আর হারবের বংশধর শয়তানের অনুসারী। ”
আমি (লেখক) বলি যে , তাকে কাহিলি বলা হয় এজন্য যে তার পূর্ব পুরুষ ছিলেন কাহিল।‘ যিয়ারতে নাহিয়া ’ তে বলা হয়েছে ,“ শান্তিবর্ষিত হোক আনাস বিন আল কাহিলি আল আসাদির উপর। ”
এরপর আমর বিন মুতা জু ’ ফি বেরিয়ে এলেন এই বলে ,“ আজ তরবারির আঘাত করা আমাদের জন্য আনন্দের , হোসইনের জন্য সহিংস আক্রমণ , এর মাধ্যমে আমরা সফলতা আশা করি এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা চাই যখন আশ্রয়ের কোন আশা থাকবে না। ” তাকে হত্যা করা হয় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
তারপর আসেন জন বিন মালিক ,‘ আবুযার গিফারির মুক্ত দাস [‘ মালহুফ ’ গ্রন্থ অনুযায়ী] তিনি (জন) ছিলেন একজন কালো দাস। ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে বলেছিলেন ,
“ আমি তোমাকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি , কারণ তুমি আমাদের মাঝে ছিলে আনন্দের সময় , তাই নিজেকে আমাদের পথে বন্দী করো না। ”
জুন উত্তর দিলেন ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমি আপনাদের খাবার পরিবেশন করেছিলাম খুশীর (এবং নিরাপত্তার) দিনগুলিতে , তাই কিভাবে আমি আপনাকে কষ্টের সময় ছেড়ে যাবো ? আল্লাহর শপথ , আমার ঘামের গন্ধ নোংরা , আমার বংশধারা নিচু এবং আমার রং হচ্ছে কালো। তাহলে বেহেশতের অনুমতি দিন , যেন আমার গন্ধ সুগন্ধে পরিণত হয় , আমার বংশধারা সম্মানিত হয় এবং আমার চেহারা আলোকিত হয়ে যায়। আল্লাহর শপথ , না , আমি আপনাকে ছেড়ে যাবো না , যতক্ষণ না আমার এই কালো রক্ত আপনার পবিত্র রক্তের সাথে মিশে যায়। ” এরপর তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলেন এই বলে ?“ মুহাম্মাদ (সা.) এর সন্তানদের রক্ষায় কালো তরবারির আঘাতকে মুশরিকরা কেমন অনুভব করে , আমি তাদেরকে রক্ষা করবো আমার কথা ও হাত দিয়ে এবং আমি কিয়ামতের দিন বেহেশত আশা করি এর মাধ্যমে। ” এরপর তাকে শহীদ করা হয় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] তিনি (জন) পঁচিশ জনকে হত্যা করেন এবং নিজে শহীদ হন। ইমাম হোসেইন (আ.) এলেন এবং তার মাথার পাশে দাঁড়ালেন এবং বললেন ,
“ হে আল্লাহ , তার চেহারাকে আলোকিত করে দিন , তার গন্ধকে সুগন্ধ করে দিন , তাকে অন্তর্ভুক্ত করুন ধার্মিকদের মাঝে এবং তাকে মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিন।”
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) বর্ণনা করেন যে , যখন লোকজন কারবালার সমতলে শহীদদের কবর দিতে এলো , তারা দেখলো দশ দিন পরে জনের লাশ থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হচ্ছে।
এরপর আনীস বিন মা ’ কাল আসবাহি বেরিয়ে এলেন আবৃত্তি করতে করতে ,“ আমি আনীস , মা ’ কালের সন্তান এবং আমার ডান হাতে আছে ক্ষুরধার তরবারি , যা আমি মাথাগুলোর উপর তুলে ধরি যুদ্ধের সময় , সম্মানিত হোসাইনের প্রতিরক্ষায় , যাকে বিশিষ্টতা দান করা হয়েছে এবং তিনি আল্লাহর রাসূলের সন্তান , যিনি সব নবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ” তিনি বিশ জনের বেশীকে হত্যা করলেন এবং শাহাদাত অর্জন করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
তারপরে এসেছিলেন ইয়াযীদ বিন মুহাজির (আবুল শা ’ সা কিনদি) । যার শাহাদাত আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি।
এরপর হাজ্জাজ বিন মাসরুক্ব জু ’ ফি , ইমাম হোসেইন (আ.) এর মুয়াযযিন , যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে এলেন এই বলে ,“ সামনে এগিয়ে যান হে হোসেইন , যিনি পথপ্রদর্শক এবং হেদায়েতপ্রাপ্ত , আজ আপনি দেখা করবেন আপনার নানার সাথে , আপনার পিতা আলীর সাথে যিনি ছিলেন উদার , যাকে আমরা কোরআনের মাধ্যমে চিনেছি। ” তিনি পঁচিশ জনকে হত্যা করলেন এবং নিজে নিহত হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর সাঈদ বিন আবদল্লাহ হানাফি , হাবীব বিন মুযাহির আসাদি , যুহাইর বিন ক্বাইন বাজালি এবং নাফে ” বিন হিলাল জামালি শাহাদাত বরণ করেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) । তাদের শাহাদাত ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হয়েছে।
জানাদাহ বিন হুরেইস আনসারি তাদের অনুসরণ করলেন এই বলে ,“ আমি জানাদ এবং হুরেইসের সন্তান , আমি না ভীত , না পুরুষত্বহীন , যতক্ষণ না আমার উত্তরাধিকারীরা আমার কাছ থেকে সম্পদ বুঝে নেয়। আজ আমার দেহ মাটির উপর পড়ে থাকবে। ” এরপর তাকে শহীদ করা হয় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর তার সন্তান আমর বিন জানাদাহ বেরিয়ে এলেন এই বলে ,“ হিনদের সন্তানের গলা টিপে ধরো এবং এ বছর তাদের দিকে ছুঁড়ে দাও মুহাজির ও আনসারদের অশ্বারোহী বাহিনী , যারা মুহাম্মাদ (সা.) এর দিনগুলিতে তাদের বর্শায় রঙ লাগিয়েছিলো মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে এবং আজ সেগুলো রঙীন হবে ব্যভিচারীদের রক্তে , আজ সেগুলো রঙিন হবে নীচ লোকদের রক্তে , যারা কোরআন পরিত্যাগ করেছে খারাপের প্রতিরক্ষায় , তারা এসেছে বদরের (যুদ্ধের) রক্তের প্রতিশোধ নিতে , যারা এ জন্য এনেছে ধারালো তরবারি ও বর্শা। আমি আমার রবের শপথ করে বলছি , আমি আমার ধারালো তরবারি দিয়ে আঘাত করতেই থাকবো এই খারাপ লোকগুলিকে , আযদির উপর তা যথাযথ কর্তব্য যে সেতিপদ্রি ন তার শত্রুর মোকবিলা করবে এবং তাকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিবে এবং আক্রমণ করবে আরও অগ্রসর হয়ে। ” এরপর তিনি যুদ্ধ করলেন ও নিহত হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপরে এক যুবক যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে আসেন যার বাবা ইতোমধ্যেই শহীদ হয়েছেন। তার মা তাকে বলেছিলেন ,“ হে প্রিয় সন্তান , বের হও এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) নাতির সামনে যুদ্ধ করো ।” যখন যুবকটি বেরিয়ে এলেন , ইমাম তাকে দেখলেন এবং বললেন ,
“ এই যুবকটির বাবাকে হত্যা করা হয়েছে , সম্ভবত তার মা পছন্দ করবে না সে যুদ্ধক্ষেত্রে বেরিয়ে আসুক। ”
যুবকটি বললো ,“ বরং আমার মা আমাকে তা করতে আদেশ করেছেন। ”
এরপর সে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলো এই আবৃত্তি করে ,“ আমার অভিভাবক হলেন হোসেইন এবং কী শ্রেষ্ঠই না অভিভাবক , যিনি সুসংবাদ দানকারী ও সতর্ককারী রাসূল (সা.) এর অন্তরের আনন্দ , আলী (আ.) তার বাবা ও ফাতিমা (আ.) তার মা। তোমরা কি এমন কাউকে জানো যে তার সমান ? তার চেহারা ঝলমলে তারার মত এবং তার কপাল পূর্ণচাঁদের মত উজ্জ্বল। ”
যখন তিনি শহীদ হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) তার মাথাটি ইমাম হোসেইন (আ.) এর তাঁবুর দিকে ছুঁড়ে দেয়া হলো। তার মা তার মাথা তুলে নিয়ে বললেন ,“ সাবাস আমার সন্তান , হে আমার হৃদয়ের সন্তুষ্টি , হে আমার চোখের শান্তি। ” এ কথা বলে তিনি তা ছুঁড়ে দিলেন এক ব্যক্তির দিকে যে এর আঘাতে নিহত হলো। এরপর তিনি তাবুর একটি খুটি তুলে নিলেন এবং তাদেরকে আক্রমণ করলেন এই বলে ,“ আমি আমার প্রভুর একজন দুর্বল ও বৃদ্ধা দাসী , যার বাড়ি খালি এবং সে জীর্ণ ও দুর্বল হয়ে গেছে , কিন্তু আমি তোমাদেরকে আঘাত করবো ভয়ানকভাবে , সম্মানিতা ফাতিমা (আ.) এর সন্তানদের প্রতিরক্ষায়। ” তিনি তা দিয়ে দুজনকে হত্যা করলেন , তা দেখে ইমাম তাকে ডেকে ফেরত আনলেন এবং তার জন্য দোআ করলেন।
আমি (লেখক) দৃঢ়ভাবে অনুভব করি যে , যুবকটি মুসলিম বিন আওসাজা আসাদির সন্তান ছাড়া আর কেউ ছিলেন না।‘ রওযাতুল ইহবাব ’ ও‘ রওযাতুশ শুহাদা ’ তে উল্লেখিত মুসলিম বিন আওসাজা ও তার সন্তানের শাহাদাতের ঘটনাটি প্রায় একই রকম (আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন) ।
এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) এর তুর্কী কৃতদাস , যিনি কোরআনের একজন হাফেয ছিলেন তিনি বেরিয়ে এলেন এই যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করে ,“ সমুদ্রে আগুন ধরে যাবে আমার তরবারি ও বর্শার আঘাতে এবং বায়ুমণ্ডলপূর্ণ হয়ে যাবে আমার ছোঁড়া তীরে , যখন তরবারি আমার ডান হাতে চলে আসে , হিংসুকদের হৃদয় ফেটে যায়। ”
তিনি বহু লোককে হত্যা করলেন এবং কেউ কেউ বলেন তিনি সত্তর জনকে হত্যা করলেন এবং তারপর তার ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তার কাছে এলেন এবং কাঁদলেন এবং তার দাসের গালের উপর নিজের গাল রাখলেন। তিনি (দাস) তার চোখ খুললেন এবং ইমাম হোসাইন (আ.) এর মুখটি দেখলেন এবং মচকি হেসে আসমানী বাসস্থানের ’ দিকে চলে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
তারপরে এলেন মালিক বিন দাওদান , যিনি বললেন ,“ তোমাদের দিকে এই আঘাত মালিকের কাছ থেকে , যে ভয়ানক সিংহ , তার আঘাত , যে রক্ষা করে উদার ও সম্মানিত লোকদের , যে পুরস্কার আশা করে আল্লাহর কাছ থেকে যিনি নেয়ামতের মালিক। ” এরপর তিনি শাহাদাত লাভ করেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর আবু সামামাহ সায়েদি তার অনুসরণ করলেন এই বলে ,“ সমবেদনা জানাচ্ছি মুস্তাফা (সা.) এর বংশধর ও তার কন্যাদেরকে , শত্রুদের দ্বারা মুহাম্মাদ (সা.) এর সন্তান অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে , যিনি মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , সমবেদনা জানাচ্ছি যাহরা (আ.) কে যিনি নবীর কন্যা এবং তার স্বামীকে , যিনি নবীর পরেই ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডার , সমবেদনা জানাচ্ছি পূর্ব ও পশ্চিমের বাসিন্দাদের এবং হোসেইনের সেনাবাহিনীর জন্য কান্না , যিনি সৎকর্মশীল , তাই কে আছে আমার সংবাদ পৌঁছে দিবে নবী ও তার কন্যার কাছে যে , আপনার সন্তান বিপদে পড়েছে। ” এরপর তিনি শহীদ হয়ে গেলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
তারপরে এলেন ইবরাহীম বিন হাসানী আসাদি , যিনি বলছিলেন ,“ আমি তোমাদের হাড়ের সংযোগস্থলে এবং পায়ের গোড়ায় আঘাত করবো তরবারি দিয়ে যেন এই জাতি আমার রক্ত ঝরায় এবং যেন আবু ইসহাক শাহাদাত অর্জন করে , জাতি বলতে আমিঝবাচ্ছি ব্যভিচারী নারীদের বদমাশ সন্তানদের। ” এরপর তাকে হত্যা করা হয় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
এরপর আমর বিন ক্বারতাহ এলেন , যার শাহাদাত আমরা আগেই বর্ণনা করেছি।
তারপর এলেন আহমাদ বিন মুহাম্মাদ হাশমি , যিনি বলছিলেন ,“ আজ আমি পরীক্ষা করবো আমার বংশধারা এবং আমার ধর্মকে আমার ধারালো তারবারি দিয়ে যা আমার ডান হাতে রয়েছে এবং আমি যুদ্ধে আমার ধর্মের প্রতিরক্ষা করবো এর মাধ্যমে। ” শেষ পর্যন্ততিনি নিহত হলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখ আছে যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর একদল সাহাবী প্রথম আক্রমণে শহীদ হন। তারা হলেন: (১) নাঈম বিন আজালান , (২) ইমরান বিন কা‘ আব বিন হুরেইস আশজা ’ ঈ , (৩) হানযালাহ বিন আমর শাইবানি , (৪) ক্বাসিত বিন যুহাইর , (৫) কিনানাহ বিন আতীক্ব , (৬) আমর বিন মাশী ’ য়াহ , (৭) যারগামাহ বিন মালিক , (৮) আমির বিন মুসলিম , (৯) সাইফ বিন মালিক নামিরি , (১০) আবদুর রহমান আরহাবি , (১১) মুজমে ’ আয়েযি , (১২) হাব্বাব বিন হুরেইস , (১৩) আমর জানদা ’ ঈ , (১৪) জাল্লাস বিন আমর রাসিবী , (১৫) সাওয়ার বিন আবি উমাইর ফাহমি , (১৬) আম্মার বিন আবি সালামা ওয়ালানি (১৭) মাসউদ বিন হাজ্জাজ , (১৮) আব্দুল্লাহ বিন উরওয়াহ গিফারি , (১৯) যুহাইর বিন বাশীর খাস’ আমি , (২০) আম্মার বিন হিস্সান , (২১) আব্দুল্লাহ বিন উমাইর , (২২) মুসলিম বিন কাসীর , (২৩) যুহাইর বিন সালীম , (২৪) ও (২৫) আব্দুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহ বিন যাইদ বাসারি , (২৬) উমরোহ , ইমাম হোসেইন (আ.) এর দাস , (২৭) ও (২৮) ইমাম আলী (আ.) এর দুজ মুক্ত দাস , (২৯) ইবনে হুমাক্বের দাস যাহির আমর (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তাদের উপর) ।
আমার (লেখকের) অভিমত , উল্লেখিত শেষ নামটি ভুল ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে , সঠিক নাম হবে যাহির যিনি আমর বিন হুমাক্বের দাস ছিলেন। যিয়ারতে নাহিয়াতে এবং এ সম্পর্কিত যিয়ারতে রাজাবিয়াহতে (যেভাবে‘ মিসবাহুর যায়ের ’ -এ উল্লেখ আছে) উল্লেখ আছে“ যাহিরের উপর শান্তিবর্ষিত হোক যে আমর বিন হুমাক্ব খুযাইর দাস ছিলেন। ” ইনিই ওপরে উল্লেখিত ব্যক্তি।
বিখ্যাত ক্বারী মো ’ মান মিসরি বলেন যে , আমর বিন হুমাক্ব ছিলেন রাসূল (সা.) এর মুহাজির সাহাবীদের একজন এবং তাবেঈন যার জন্য নবী (সা.) বেহেশত ঘোষণা করেছিলেন , যিনি ইমাম আলী (আ.) এর সাথে (বিশ্বস্ত) ছিলেন। ইমাম আলী (আ.) এর শাহাদাতের পরও আমর জীবিত ছিলেন। আবার , যখন মুয়াবিয়া তার পিছু নিলো তিনি এক দ্বীপে পালিয়ে গেলেন , তার সাথে ছিলেন ইমাম আলী (আ.) এর আরেক সাথী যাহির। দুজনেই মধ্যরাতে এক উপত্যকায় অবতরণ করেন এবং একটি সাপ আমরকে কামড় দেয়। যখন সকাল হলো এবং জায়গাটি ফুলে উঠলো এবং আমর যাহিরকে বললেন ,“ আমার কাছে থেকে সরে যাও , কারণ আমি আমার বন্ধু রসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে জীন ও মানুষ আমায় হত্যা জড়িত থাকবে এবং শীঘ্রই অ্র আমাকে হত্যা করা হবে। ” তারা কথা বলছিলেন হঠাৎ তারা কিছু ঘোড়ার ঘাড় দেখতে পেলেন , যারা আমরের সন্ধানে ছিলো। যাহিরকে আমর বললেন ,“ হে যাহির , নিজেকে লুকাও , যখন তারা আমাকে হত্যা করবে এবং আমার মাথা নিয়ে যাবে এবং আমার দেহ ফেলে যাবে , তুমি আমাকে কবর দিও। ” যাহির বললো ,“ না , আমি তা করবো না , বরং আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো আমার তীর দিয়ে এবং তা যখন শেষ হয়ে যাবে , আমিও তোমার সাথে নিহত হবো। ” আমর বললেন ,“ আমি যা করতে বলছি করো। আল্লাহ এতে তোমাকে সফলতা দিবেন। ” তখন যাহির নিজেকে লুকিয়ে ফেললো এবং লোকজন এলো এবং তাকে (আমরকে) হত্যা করলো। এরপর তারা আমরের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো এবং তা সাথে নিয়ে গেলো। তা ছিলো ইসলামে প্রথম মাথা যা বর্শার মাথায় বিদ্ধ করা হলো। যখন তারা চলে গেলো যাহির তার লুকানো স্থান থেকে বেরিয়ে এলেন এবং আমরকে কবর দিলেন। তারপর তিনি জীবিত ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা কারবালাতে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে শহীদ হলেন।
এ বর্ণনাতে প্রমাণিত হয় যে , যাহির ইমাম আলী (আ.) এর বিশিষ্ট সাহাবীদের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন রাসূল (সা.) এর সাহাবী আমর বিন হুমাকের সমমর্যাদার এবং ইমাম আলী (আ.) এর শিষ্য। তিনি ছিলেন (আল্লাহর) সৎকর্মশীল বান্দাহ , অত্যধিক ইবাদত তাকে বৃদ্ধ , শীর্ণকায় এবং তার রঙকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছিলো। আমরকে দাফন করার সৌভাগ্য তার হয়েছিলো , তার আনন্দ পূর্ণতা পায় ইমাম হোসেইনকে সাহায্য করার সময় এবং তিনি শাহাদাত লাভ করেন।
যাহিরের বংশধরদের মধ্যে ছিলেন আবু জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন সিনান , যিনি ইমাম মূসা আল কাযিম (আ.) , ইমাম আলী আল রিদা (আ.) এবং ইমাম মুহাম্মাদ আল জাওয়াদ (আ.) এর সাথীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এছাড়া উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ঐতিহাসিকরা কিছু নাম উল্লেখ করেছেন যারা দশই মহররম উপস্থিত ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করার জন্য , কিন্তু তারা নিজেদেরকে রক্ষা করে এবং পালিয়ে যায়।
১) আবদুর রহমান বিন আবদ রাব্বাহ আনসারি। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে , সে বলেছে ,“ আমি যখন পড়ে যেতে দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের , আমি (ভয়ে) পালিয়ে গেলাম তাদেরকে পিছনে রেখে। ”
২) মারক্বা ’ বিন তামামাহ আসাদি। তাবারি এবং ইবনে আসীর বলেন যে , তিনি তার তীরের থলেটি মাটিতে রাখলেন এবং হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং যুদ্ধ করছিলেন ঐ পর্যন্ত যখন তার আত্মীয়দের মধ্যে এক দল তার কাছে এলো এবং তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিল এবং তাকে বললো তাদের কাছে ফেরত যেতে। তিনি তাদের সাথে ফিরে গেলেন এবং উমর বিন সা’ আদ তাকে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে নিয়ে গেলো এবং তার বিষয়ে বললো। উবায়দুল্লাহ তাকে যারাহতে নির্বাসন দিল। ফিরোযাবাদি বলেন যে , যারাহ হলো জ্বল উদ্ভিদ-এর ভূমি এবং মিসর ও তারাবুলুসের একটি জায়গার নাম এবং বাহরাইনে একটি পাহাড়ের নাম যেখানে ঝর্না রয়েছে।
৩) তাবারি এবং ইবনে আসীর বলেন যে , উক্ববাহ বিন সাম ’ আনকে উমর বিন সা’ আদ গ্রেফতার করে এবং সে ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর স্ত্রীর (ইমরুল ক্বায়েস ক্বালবির কন্যা ও সাকিনাহ (আ.) এর মা) চাকর। যখন উমর জিজ্ঞেস করলো কী পদে সে অধিষ্ঠিত ছিলো , সে উত্তর দিলো , সে ছিলো একজন দাস এবং তার কোন ক্ষমতা ছিলো না। তাই উমর তাকে মুক্তি দিয়ে দিলো।
৪) যাহ্হাক বিন আব্দুল্লাহ মাশরিকি , আমরা তার সম্পর্কে বর্ণনা করা যথাযথ মনে করছি। লূত বিন ইয়াহইয়া আযদি বলে যে , আব্দুল্লাহ বিন আল আসিম হামাদানি তাকে বলেছে যে , যাহ্হাক বিন আব্দুল্লাহ মাশরিক্বি তাকে বলেছে যে , আমি মালিক বিন নযর আরহাবির সাথে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে উপস্থিত হলাম। আমরা তাকে অভিনন্দন জানালাম ও তার কাছে বসলাম। ইমাম আমাদের সালামের জবাব দিলেন এবং আমাদের স্বাগতম জানানোর পর জিজ্ঞেস করলেন কেন আমরা সেখানে এসেছি। আমরা বললাম ,“ আমরা এখানে এসেছি আপনাকে সালাম জানাতে এবং সুস্থতার জন্য দোআ করতে , এছাড়া আপনাকে আবার দেখতে। এছাড়া আমরা এসেছি আপনাকে জানাতে সে কুফার জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য , তাই যেন আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ আমার জন্য যথেষ্ট এবং শ্রেষ্ঠ বিচারক। ” আমরা তার কাছে লোকজনের খারাপ দিকগুলো বর্ণনা করলাম , এরপর আমরা তাকে বিদায়ী সালাম জানালাম এবং তার অনুমতি চাইলাম। ইমাম বললেন ,“ কেন তোমরা আমাকে সাহায্য করছো না ?” মালিক বিন নযর বললো ,“ আমি ঋণগ্রস্ত , এবং আমার ছেলে-মেয়ে আছে। ” এবং আমি বললাম ,“ আমিও ঋণগ্রস্ত যদিও আমার ছেলে মেয়ে নেই , তাই যদি আপনি অঙ্গীকার করেন ঐ সময়ে আমাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য যখন আপনার প্রতিরক্ষা আপনার জন্য কোন লাভ বয়ে আনবেনা , তাহলে আমি আপনার সাথে থাকবো। ” ইমাম বললেন ,“ সে ক্ষেত্রেমিততা করতে পারো। ” তাই আমি তার সাথে রয়ে গেলাম। যাহ্হাক বিন আব্দুল্লাহ ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে রয়ে গেলো আশুরার দিন পর্যন্ত এবং সে আশুরার দিন ও রাত সম্পর্কে বর্ণনা করেছে। সে আরও বলেছে যে , যখন আমি দেখলাম ইমামের সব সাথীরা শহীদ হয়ে গেছে এবং শত্রুরা তার ও তার পরিবারের উপর হাত তুলছে এবং সুয়েইদ বিন খাস’ আমি এবং বাশীর বিন আমর হাযরামী শুধু আছে , আমি তার কাছে এলাম এবং বললাম ,“ হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আপনি কি মনে করতে পারেন আমাদের মাঝে কী চুক্তি ছিলো এবং আমি কথা দিয়েছিলাম যে , যতক্ষণ যোদ্ধারা আপনার সাথে থাকবে ততক্ষণ আমি আপনার সাথে থাকবো এবং তাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করবো , যদি তা না হয় তাহলে আমি মুক্ত হয়ে যাবে এবং আপনি এতে একমত ছিলেন।” ইমাম বললেন ,“ তুমি সত্য বলেছো , কিন্তু তুমি নিজেকে কিভাবে রক্ষা করবে ? যদি তা পারো , তোমার স্বাধীনতা আছে। ”
সে সময় সাথীদের ঘোড়াগুলো যখন আহত হচ্ছিলো এবং তীর ছোঁড়া হচ্ছিলো , আমি গোপনে সাথীদের একটি তাঁবুতে আমার ঘোড়া লুকিয়ে ফেললাম এবং মাটিতে দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করতে লাগলাম। এরপর আমি ইমামের সামনে দুজনকে হত্যা করলাম এবং অন্য একজনের হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেললাম। সেদিন ইমাম আমাকে বেশ কয়েক বার বললেন ,“ কারো হাত বিচ্ছিন্ন করো না , আল্লাহ যেন তোমার হাত বিচ্ছিন্ন না করেন। আল্লাহ যেন তোমাকে নবীর বংশধরের উসিলায় পুরস্কার দান করেন ” ।
তারপর যখন তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন আমি তাঁবু থেকে আমার ঘোড়াটি আনলাম এবং এর ওপরে বসলাম। এরপর আমি একে হাঁকালে এটি সেনাবাহিনীর মাঝ থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেলো। তারা আমাকে রাস্তা দিলো এবং আমি বেরিয়ে গেলাম এবং পনেরো জন অশ্বারোহী আমার পিছু নিলো যতক্ষণ না আমি ফোরাতের তীরে শাফিয়াহ গ্রামে গিয়ে পৌঁছালাম। তারা আমার কাছে এলো এবং যখন আমি পিছনে ফিরলাম কাসীর বিন আব্দুল্লাহ শা ’ আবি , আইউব বিন মুশরেহ হেইওয়ানি এবং ক্বায়েস বিন আব্দুল্লাহ সায়েদি আমাকে চিনতে পারলো। তারা বললো ,“ এতো যাহ্হাক বিন আব্দুল্লাহ মাশরিক্বি , আমাদের চাচাতো ভাই। আমরা তোমাদের আল্লাহর নামে অনুরোধ করছি তার উপর থেকে হাত তুলে নাও। ” তা শুনে বনি তামীমের তিন জন তাদের পক্ষ নিলো এবং অন্যরাও অনুসরণ করলো। এভাবে আল্লাহ আমাকে রক্ষা করলেন।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (কারবালায়) ইমাম হোসেইন (আ.) এর পক্ষ না নেওয়াতে তিরস্কৃত হওয়ার সময় যথার্থ বেলইছেন ,“ সাথীদের একজনের নামও (যারা কারবালায় শহীদ হবে) মোছা যেতো না এবং অন্য কেউ যুক্তও হতে পারতো না , আমরা তাদের নাম জানতাম তাদের সাথে সাক্ষাতের আগেই। ”
মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া বলেছিলেন ,“ তাদের (ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের) নাম এবং তাদের পিতাদের নাম আমাদের কাছে লিখা ছিলো। আমার পিতা-মাতা তাদের জন্য কোরবান হোক , হায় যদি আমি তাদের সাথে থাকতাম , আমিও এ বিরাট সফলতা অর্জন করতে পারতাম। ”
সম্মানিত ও বিশ্বস্ত শেইখ মুহাম্মাদ বিন হাসান সাফ্ফার কুম্মি , যিনি ২৯০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন , তার বই‘ বাসায়েরুদ দারাজাত ’ -এ বলেছেন হুযাইফা গিফারি থেকে যে , যখন ইমাম হাসান (আ.) মুয়াবিয়ার সাথে শান্তিচুক্তি করেন এবং মদীনাতে ফেরত আসেন আমি তাঁর সাথে ছিলাম। একটি উটের উপর একটি বস্তা ছিলো তার সাথে সবসময় এবং ইমাম তা তাঁর দৃষ্টির আড়াল হতে দিচ্ছিলেন না। একদিন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে আবা মুহাম্মাদ , আমি আপনার জন্য কোরবান হই , এটি কিসের বস্তা যা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না ?” ইমাম বললেন ,“ হে হুযাইফা , তুমি কি জানো না এতে কী আছে ?
আমি উত্তরে না বললাম। ইমাম হাসান (আ.) বললেন ,“ এটি একটি রেজিস্টার খাতা। ”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কিসের রেজিস্টার। তিনি বললেন ,“ এটি একটি রেজিস্টার যাতে আমাদের শিয়াদের নামগুলো রয়েছে। ”
আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ দয়া করে আমার নামটি এতে দেখান। ” ইমাম আমাকে বললেন পরদিন সকালে আসতে। আমি সকালে গেলাম আমার ভাতিজাকে নিয়ে। যে পড়তে জানতো , আর আমি পড়তে জানতাম না। ইমাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কেন এত সকালে এসেছি। আমি বললাম যে , আমি তা দেখতে এসেছি যা তিনি শপথ করেছেন। ইমাম হাসান (আ.) জিজ্ঞেস করলেন ,“ তোমার সাথে এ যুবকটি কে ?”
আমি বললাম , সে আমার ভাতিজা এবং সে পড়তে জানে , আর আমি পড়তে জানিনা। তিনি আমাদের বসতে ইশারা করলেন। ইমাম আদেশ দিলেন রেজিস্টারটি আনতে। রেজিস্টার আনা হলো এবং আমার ভাতিজা তা খুলে ধরলো দেখার জন্য , এর অক্ষরগুলো জ্বলজ্বল করছিলো। এরপর পড়তে পড়তে সে হঠাৎ বললো ,“ হে চাচা , এই যে আমার নাম। ” আমি বললাম , “ তোমার মা তোমার জন্য শোক পালন করুক , আমার নাম পড়ো। কিছুক্ষণ সন্ধানের পর সে আমাকে আমার নাম দেখালো এবং আমরা খুব উৎফুল্ল হলাম এবং আর এ যুবক ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে কারবালায় শহীদ হয়ে গিয়েছিলো।
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের অবস্থা সম্পর্কে পুনরায় আলোচনা
শাহাদাতের বইগুলোতে আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা তার কাছে একের পর এক আসতে থাকলেন এবং বললেন ,“ শান্তিবর্ষিত হোক আপনার উপর হে রাসূলুল্লাহর সন্তান।” ইমাম তাদের সালামের উত্তর দিচ্ছিলেন এবং বলছিলেন ,“ শীঘ্রই আমরাও তোমাদের অনুসরণ করবো। ” এরপর তিনি কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন ,
) مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنْتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا(
“ বিশ্বাসীদের মাঝে এমন ব্যক্তিরা আছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকারে বিশ্বস্ত আছে ; তাদের কেউ তার অঙ্গীকার পূরণ করেছে এবং তাদের কেউ অপেক্ষা করছে (অঙ্গীকার পূরণের জন্য) এবং তারা একটুও বদলায়নি। ” [সূরা আহযাব: ২৩]
“ মৃত্যুর পেয়ালা তাদের উপর ঘুরছে এবং তারা পৃথিবীর উপর চোখ বন্ধ করে নিয়েছে মাতালের মত , তাদের দেহগুলো তাঁর ভালোবাসায় মৃত্যুর কাছে পৌঁছেছে এবং তাদের আত্মা উচ্চ আকাশের উপর পর্দাতে আরোহণ করেছে এবং তারা তাদের বন্ধুর কাছে ছাড়া অন্য কোন স্থান দখল করে নি , কিন্তু তারা দুশ্চিন্তার কারণে ওপরে উঠেনি। ”
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা তার জন্য জীবন কোরবান করতে পরস্পর প্রতিযোগিতা করেছিলেন। তারা তেমনি ছিলেন যেমনটি তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে ,“ তারা একদল যাদেরকে দুশ্চিন্তার সময় প্রতিরক্ষার কাজে ডাকা হয় এবং সৈন্যদের কিছু ব্যস্তআছে তাদের বর্শা দিয়ে আঘাত করাতে এবং কিছু আছে সাহস যোগাতে , তারা তাদের হৃদয়কে পরেছে বর্মের ওপরে , যেন তারা জীবন উৎসর্গ করতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ”
শেইখ ইবনে নিমা তাদের বীরত্ব , আত্মত্যাগ ও (নবীর সন্তানের) প্রতিরক্ষা সম্পর্কে বলেন , “ যখন তারা গমের রঙের বর্শা তুলে নেয় এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেয় , তখন জঙ্গলের সিংহ ভয়ে পালিয়ে যায় , ভয়ানক যুদ্ধের যাঁতাকলে তারা যুদ্ধের অস্ত্র , যখন তারা ঘেরাও করে , শত্রুরা তখন ক্ষতির সম্মুখীন হয় , যখন তারা তাদের পাগুলোকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে গেড়ে দেয় তখন তাদের প্রতিশ্রুত স্থান হচ্ছে কিয়ামতের দিন। ”
ইবনে আবিল হাদীদ তার শারহে নাহজুল বালাগাতে বলেন যে , কারবালায় উমর বিন সা’ আদের বাহিনীর এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ,“ দুর্ভোগ হোক তোমার , তোমরা আল্লাহর রাসূলের সন্তানকে হত্যা করছো ?” এতে সে উত্তর দিয়েছিলো ,“ তোমাদের দাঁতের মাঝে পাথর রাখো (অর্থাৎ চুপ থাকো) । যদি তুমি (সেই দিনটি) দেখতে যা আমরা দেখেছি , তুমিও তা- ই করতে আমরা যা করেছি। সাহসী ব্যক্তিরা তরবারিতে সজ্জিত হয়ে ছিলো , যারা পুরুষ সিংহের মত ছিলো , আমাদের আক্রমণ করেছিলো , তারা সাহসীদের ছুঁড়ে দিয়েছিলো ডানে ও বামে এবং মৃত্যুর উপর পড়ছিলো। তারা নিরাপত্তা গ্রহণ করে নি , না সম্পদের জন্য লোভাতুর ছিলো। তাদের জন্য কিছুই ছিলো না শুধু ছিলো রাজত্ব লাভ অথবা মৃত্যু। আমরা যদি অল্প সময়ের জন্যও তাদের উপর থেকে হাত সরিয়ে রাখতাম তারা আমাদের পুরো সেনাবাহিনীকেই নিশ্চিহ্ন করে দিতো , আমরা তখন কী করতাম ?”
শেইখ আবু আমর কাশশি বলেন যে , হাবীব ছিলেন ঐ সত্তর জন লোকের একজন যারা ইমাম হোসেইন (আ.) কে সাহায্য করেছিলেন। তারা এগিয়ে দিচ্ছিলেন তাদের বুক বর্শার দিকে এবং চেহারাগুলোকে তরবারির ধারালো কিনারার দিকে , তাদেরকে নিরাপত্তার আশ্বাস ও প্রচুর সম্পদ দেয়ার কথা বলা হয়েছিলো , কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এ বলে ,“ রাসূল (সা.) এর কাছে কোন ওজর পেশ করার মত আমাদের কিছুই থাকবে না যদি আমরা বেঁচে থাকি ও ইমাম হোসেইন (আ.) কে হত্যা করা হয় , যতক্ষণ না আমরা সকলেই নিহত হই। ”
আমি (লেখক) বলি যে , আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা সব মুসলমানের উপর এক বিরাট অধিকার রাখেন।
পরিচ্ছেদ - ২০
ইমাম হোসেইন (আ.) এর পরিবারের (আহলুল বাইতের) সদস্যদের যুদ্ধ এবং তাদের শাহাদাত (আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন)
আবুল হাসান আলী বিন হোসেইন আল আকবার (আ.) এর শাহাদাত
যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীরা শহীদ হয়ে গেলেন এবং কেউ ছিলো না তার পরিবার ছাড়া , যারা ছিলেন ইমাম আলী (আ.) , জাফর বিন আবি তালিব (আ.) , আক্বীল বিন আবি তালিব (আ.) ও ইমাম হাসান (আ.) এর সন্তানেরা , তারা একত্রিত হলেন এবং পরস্পরকে বিদায় জানালেন এবং যুদ্ধ করতে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা সে রকম ছিলেন যাদের সম্পর্কে বলা হয় ,“ তারা একদল , যখন যুদ্ধের ভিতর প্রবেশ করে তোমরা ভুল করে মনে কর তারা সূর্য কিন্তু তাদের চেহারা হচ্ছে চাঁদ , তারা কোন অবস্থাতেই দয়ালু হওয়া থেকে বিরত হন না , পৃথিবী তাদের সাথে ন্যায়পূর্ণ অচরণ করলেও অথবা তাদেরকে অত্যাচার করলেও , তাই যখন কোন আবেদনকারী দুঃসময়ে সাহায্যের জন্য ডাকে , তারা নিজেদেরকে এগিয়ে দেন এবং জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন। ”
অন্যরা বলে ,“ তাদের চেহারা উজ্জ্বল , বশংধারা সম্মানিত , ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তিরা , সর্বোচ্চ মর্যাদার , যখন মেহমান হঠাৎ করে এসে যায় তাদের কাছে , তাদের কুকুরগুলো চিৎকার করে না , না তারা প্রশ্ন করে ঘনিয়ে আসা অন্ধকারের বিষয়ে। ”
কা‘ আব বিন মালিক বলেন ,“ তারা একদল , বনি হাশিম গোত্র থেকে , যার ভিত্তিতে আছে এক শক্তিশালী দেয়াল এবং তা এমন এক ক্ষমতা যা হস্তান্তর করা যায় না , তারা এক দল যাদের কারণে আল্লাহ সৃষ্টিকুলের প্রতি করুণাময় এবং যার দাদার (ইমাম আলীর) মাধ্যমে রাসূল (সা.) কে সাহায্য করা হয়েছিলো , যাদের চেহারা আলোকিত , যাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় উদারতা তাদের হাত থেকে বইছে , যখন ফাঁকিবাজ পৃথিবী তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় খোঁজে। ”
সম্মানিত শেইখ আলী বিন ঈসা ইরবিলি তার‘ কাশফুল গুম্মাহ ’ -তে বর্ণনা করেছেন আওয়াম বিন হাওশাবের‘ ইতরাতুত তাহেরা ’ কিতাব থেকে যে , তিনি বলেছেন , আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে , একবার রাসল (সা.) একদল কুরাইশা যুবকের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন যাদের চেহারা তরবারির মত উজ্জ্বল ছিলো , যতক্ষণ পর্যন্তনা দুঃখ তাঁর চেহারায় দৃশ্যমান হলো। তাকে বলা হলো ,“ ইয়া রাসূলুল্লাহ , আপনার কী হয়েছে ?” তিনি বললেন ,“ আমরা এক পরিবার যাদের জন্য আল্লাহ আখেরাতকে এ পৃথিবীর উপর স্থান দিয়েছেন , আমি এই মাত্র মনে করলাম কিভাবে আমার পরিবারকে হত্যা ও নির্বাসনের মুখোমুখি হতে হবে আমার উম্মতের হাতে। ”
[‘ ইরশাদ ’ -এ বর্ণিত আছে] আলী আকবার (আ.) , যার মা ছিলেন আবি মুররাহ বিন উরওয়াহ বিন মাসউদ সাক্বাফির কন্যা লায়লা , যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন।
আলী আকবার (আ.) এর নানা উরওয়াহ বিন মাসউদ সম্পর্কে বর্ণনা
উরওয়াহ বিন মাসউদ ছিলেন ইসলামি দুনিয়ার চারজন সম্মানিত ব্যক্তির একজন এবং এর আগে কাফেরদের মধ্যে দুই জন সর্দারের একজন , যার সম্পর্কে কোরআন বলেছে যে সে বলেছিলো ,
) لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ(
“ কেন কোরআন দুই শহরের কোন ব্যক্তির ওপরে নাযিল হলো না , (যে) বিখ্যাত ?” [সূরা যুখরুফ: ৩১]
তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যাকে কুরাইশরা পাঠিয়েছিলো হোদায়বিয়াতে শান্তিচুক্তি করার জন্য তাদের ও রাসূল (সা.) এর শান্তিচুক্তি করার জন্য , তখন পর্যন্ততিনি অবিশ্বাসী ছিলেন। হিজরি নবম বছরে যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তায়েফ থেকে ফেরত এলেন , তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং অনুমতি চাইলেন নিজের শহরে ফেরত গিয়ে জন গণের মাঝে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য। তিনি ফেরত গেলেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানালেন এবং যখন তিনি নামাযের জন্য আযান দিচ্ছিলেন তখন তার গোত্রের এক ব্যক্তি তার দিকে তীর ছুঁড়ে এবং তিনি শাহাদাত বরণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তার শাহাদাতের খবর পেলেন তিনি বললেন ,“ উরওয়াহর উদাহরণ হচ্ছে ইয়াসীনের সেই বিশ্বাসীর মত , যে তার গোত্রকে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো এবং তারা তাকে হত্যা করেছিলো। ”
‘ শারহে শামায়েলে মুহাম্মাদিয়া ’ তে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে , তিনি বলেছেন ,“ যদি কেউ ঈসা বিন মারইয়াম (আ.) এর দিকে তাকায় সে উরওয়াহ বিন মাসউদের সাথে তার সবচেয়ে বেশী মিল পাবে। ”
জাযারি বর্ণনা করেছেন ইবনে আব্বাস থেকে‘ আসাদুল গাবাহ ’ তে যে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,“ ইসলামে চার জন সর্দার রয়েছে , বুশর বিন বিলাল আবাদি , আদি বিন হাতিম , সুরাক্বাহ বিন মালিক মাদালজি এবং উরওয়াহ বিন মাসউদ সাক্বাফি। ”
[‘ মালহুফ ’ -এ বর্ণিত আছে] আলী বিন হোসেইন ছিলেন সব মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তিনি তার বাবার কাছ থেকে যুদ্ধের জন্য অনুমতি চাইলেন। ইমাম (আ.) তাকে অনুমতি দিলেন এবং এরপর তার দিকে ভগ্ন হৃদয়ে তাকালেন এবং তার চোখ থেকে অশ্রুবইতে লাগলো এবং তিনি কাঁদলেন।
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ গ্রন্থে] বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি তার দাড়ি আকাশের দিকে তুললেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , এ লোকগুলোর উপর সাক্ষী থাকো , যে যুবক চরিত্রে ও বক্তব্যে তোমার রাসূলের সবচেয়ে নিকটবর্তী , সে তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যখনই আমরা চাইতাম তোমার রাসূলের চেহারা দেখতে আমরা তার দিকে তাকাতাম। হে আল্লাহ , তাদের কাছ থেকে পৃথিবীর নেয়ামতগুলো ফিরিয়ে নাও এবং তাদের মধ্যে বিভেদষ্টিসকরে দাও এবং তাদের ছত্রভঙ্গ করে দাও। তাদের নীতিকে হেয় করো এবং তাদেরকে তাদের সর্দারদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে দিও না , কারণ তারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো আমাদের সাহায্য করার জন্য। এরপর তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ”
এরপর তিনি উমর বিন সা’ আদকে উচ্চ কণ্ঠে ডাকলেন ,“ তোমার কী হয়েছে ? আল্লাহ তোমার বংশ শেষ করুন , আল্লাহ তোমার কাজকে ব্যর্থ করে দিন এবং তিনি যেন কাউকে তোমাদের উপর শক্তিশালী করেন , যে তোমাদের বিছানায় তোমাদের মাথা কেটে ফেলবে যেভাবে তোমরা আমাদের গর্ভ চিরেছো এবং আমার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পবিত্রতা বিবেচনা করো নি। ”
এরপর তিনি একটি আওয়াজ তুললেন এবং কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেন ,
) إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى آدَمَ وَنُوحًا وَآلَ إِبْرَاهِيمَ وَآلَ عِمْرَانَ عَلَى الْعَالَمِينَ(
“ নিশ্চয়ই আল্লাহ বাছাই করেছিলেন আদম ও নূহ ও ইবরাহীমের বংশধর ও ইমরানের বংশধরদের , বিশ্ব জগতের ওপরে। ” [সূরা আল ইমরান: ৩৩]
আলী বিন হুসেইন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন এ কথা বলে ,“ আমি আলী বিন হোসেইন বিন আলী , আল্লাহর ঘরের ক্বসম , আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে আত্মীয়তা রাখি এবং শাবাস (বিন রাব ’ ঈ) এবং নীচ ও হীন শিমরের ওপরে শ্রেষ্ঠত্ব রাখি । আমি তরবারি দিয়ে তোমাদের আঘাত করবো যতক্ষণ না তা বাঁকা হয়ে যায় , হাশেমী আলাউই (আলীর রক্তজ) যুবকের তরবারি , আমি আমার বাবার প্রতিরক্ষা করতেই থাকবো এবং আল্লাহর শপথ , অবৈধ সন্তানের সন্তান আমাদের ওপরে কর্তৃত্ব করবে না। ”
তিনি শত্রুদের বার বার আক্রমণ করলেন এবং তাদের অনেককে হত্যা করলেন।
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে] তিনি এতো বিরাট সংখ্যককে হত্যা করলেন যে শত্রুবাহিনী কাঁদতে শুরু করলো । বর্ণিত আছে যদিও তিনিষ্ণতাতর্ছিলেন তারপরও তিনি একশ বিশ জনকে হত্যা করেছিলেন।‘ মানাক্বিব ’ -এ বর্ণিত আছে তিনি সত্তর জনকে হত্যা করার পর তার বাবার কাছে ফিরলেন অনেকগুলো আঘাত নিয়ে।
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ ,‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] তিনি বললেন ,“ হে বাবা , পিপাসা আমাকে মেরে ফেলছে এবং লোহার (অস্ত্রের ও বর্মের) ওজন আমার শক্তি শেষ করে দিয়েছে। কোন পানি আছে কি যাতে আমি শক্তি ফিরে পাই এবং শত্রুদের উপর আঘাত করি ?”
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] তা শুনে ইমাম হোসেইন (আ.) কেঁদে ফেললেন এবং বললেন ,“ হে সাহায্যকারী , হে প্রিয় সন্তান , অল্প সময়ের জন্য যুদ্ধ করো এবং খুব শীঘ্রই তুমি তোমার নানা মুহাম্মাদ (সা.) এর সাক্ষাত পাবে। তুমি তার উপচে পড়া পেয়ালা থেকে পান করবে এবং আর কখনোই পিপাসার্ত হবে না। ”
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , তোমার জিভ বের করো। ”
এ কথা বলে ইমাম (আ.) তার জিভ তার মুখে দিলেন এবং তা চুষতে দিলেন। এরপর তিনি তাঁর আংটি আলীর মুখে দিলেন এবং বললেন ,“ যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত যাও এবং আমি আশা করি রাত আসার আগেই তোমার দাদা তোমার হাতে পেয়ালা উপচে পড়া একটি পানীয় দিবেন যা পান করার পর তুমি আর কখনো পিপাসা অনুভব করবেনা। ”
আলী আকবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত গেলেন এবং বললেন ,“ যুদ্ধের জন্য বাস্তবতাগুলো পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং তারপর এর প্রমাণগুলো , আকাশের রবের শপথ , আমরা তোমাদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হবো না যতক্ষণ না তরবারি খাপে প্রবেশ করে। ” এরপর তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান যতক্ষণ পর্যন্তনা দুইশত লোককে হত্যা করেন।
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] কুফার সেনাবাহিনী তাকে হত্যা করা থেকে দূরে সরে রইলো , মুররাহ বিন মুনক্বিয আবাদি লেইসির দৃষ্টি তার উপর পড়লো এবং সে বললো ,“ আরবদের গুনাহ আমার উপর পড় – ক যদি সে আমার পাশ দিয়ে যায় এবং তা করে যা সে করছে এবং আমি তার মাকে তার জন্য শোকার্ত করি না।” ৯
যখন তিনি সেনাবাহিনীকে আক্রমণে ব্যস্তছিলেন , মুররাহ বিন মুনক্বিয তার সামনে গেলো এবং একটি বর্শা ছুঁড়ে দিলো তার দিকে যা তাকে মাটিতে ফেলে দিলো। তা দেখে সেনাবাহিনী তাকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেললো এবং তাকে টুকরো টুকরো করে ফেললো তাদের তরবারি দিয়ে।“ যদি ভারতীয় তরবারিগুলো তাদের মাংস খেয়ে থাকে তাহলে সম্মানিত লোকদের মাংস সব সময়ই এর শিকার ছিলো।” ১০
‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখ করা হয়েছে যে , মুররাহ বনি মুনক্বিয আবাদি হঠাৎ তার বর্শা আলী আকবারের পিঠে ঢুকিয়ে দেয় এবং অন্যরা তাকে তাদের তরবারি দিয়ে আক্রমণ করে। আবুল ফারাজ বলেন তিনি অবিরাম আক্রমণ করলেন যতক্ষণ না একটি তীর তার কণ্ঠ ভেদ করলো। তিনি রক্তে ভিজে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন ,“ হে প্রিয় বাবা , আপনার উপর সালাম , এই
যে আমার দাদা আল্লাহর রাসূল আমাকে ডাকছেন তাড়াতাড়ি করার জন্য। ” এরপর তিনি একটি আওয়াজ তুললেন এবং মৃত্যুবরণ করলেন (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , তখন ইমাম হোসেইন (আ.) আলী আকবারের পাশে এলেন এবং তার নিজের গাল রাখলেন তার গালের উপর। [তাবারির ,‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ গ্রন্থে] হামিদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেছে যে , আমি আশুরার দিন নিজে ইমাম হোসেইন (আ.) কে বলতে শুনেছি ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , আল্লাহ যেন তাকে হত্যা করেন যে তোমাকে হত্যা করেছে , তারা দয়ালু আল্লাহর বিরুদ্ধে কী সাহস-ই না সঞ্চয় করেছে এবং রাসূলের পবিত্রতা লংঘন করেছে। ”
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) এর চোখ থেকে অনেক অশ্রুঝরতে লাগলো এবং তিনি বললেন ,“ দুর্ভোগ এ পৃথিবীর উপর , তোমার (শাহাদতের) পরে। ”‘ রওযাতুস সাফা ’ - তে আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার পাশে বসে অনেক কাঁদতে লাগলেন যা কেউ এর আগে তাকে করতে দেখে নি।১১
আলী আকবার (আ.) এর যিয়ারত যেভাবে ইমাম সাদিক্ব (আ.) উল্লেখ করেছেন তাতে আছে ,“ আমার বাবা মা কোরবান হোক তার জন্য যার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো , যাকে হত্যা করা হয়েছিলো কোন অপরাধ ছাড়াই , আমার বাবা মা কোরবান হোক ঐ রক্তের জন্য যা আকাশে আল্লাহর বন্ধুর কাছে পৌঁছেছিলো , আমার বাবা মা কোরবান হোক আপনার উপর যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে দত্রুএগিয়েছিলেন তার বাবার উপস্থিতিতে যিনি আপনাকে উৎসর্গ করেছেন আল্লাহর পথে , এরপর তিনি আপনার জন্য কাঁদলেন এবং তার হৃদয় পোড়া মাটি হয়ে গেলো। তিনি আপনার রক্ত আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন , যার এক ফোঁটাও ফেরত আসে নি এবং আপনার জন্য তার চিৎকার কখনো বিলীন হবে না। ”
[‘ মাকাতিলাত তালিবিইন ’ ,‘ মালহুফ ’ , তাবারির গ্রন্থে আছে] শেইখ মুফীদ বলেন যে , সাইয়েদা যায়নাব (আ.) , যিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর বোন ছিলেন , ছুটে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন ,“ হায় আমার ভাই , হায় আমার ভাতিজা। ” তিনি এলেন এবং নিজেকে আলী আকবার (আ.) এর লাশের উপর ছুঁড়ে দিলেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তার মাথালেত ধরলেন এবং তাকে (বোনকে) তাঁবুতে ফেরত আনলেন। এরপর তিনি যুবকদেরকে ডাকলেন , বললেন ,“ তোমাদের ভাইকে নিয়ে যাও। ” [তাবারির গ্রন্থে ,‘ মাকাতিলাত তালিবিঈন ’ -এ আছে] তারা তাকে শাহাদাতের স্থান থেকে আনলেন এবং ঐ তাঁবুর সামনে এনে রাখলেন যার সামনে থেকে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন।
পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে আহলুল বাইত (আ.) এর মধ্যে প্রথম কোন ব্যক্তি শহীদ হয়েছিলেন তা নিয়ে। কেউ বলেন প্রথম শহীদ ছিলেন আলী আকবার , অন্যরা বলেন যে , তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আক্বীল এবং তাবারি , জাযারি (ইবনে আসীর) আবুল ফারাজ ইসফাহানি , দাইনূরী , শেইখ মুফীদ , সাইয়েদ ইবনে তাউস এবং অন্যদের সাথে আমরা একমত যে , আলী আকবার (আ.) ছিলেন প্রথম শহীদ (আহলুল বাইতের মাঝ থেকে) , এবং শহীদদের নামসহ সালামে (যিয়ারতে) এর প্রমাণ রয়েছে , যার কথাগুলো এরকম ,“ শান্তি বর্ষিত হোক যিনি প্রথম শহীদ , যিনি ছিলেন আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বন্ধুর বংশ থেকে। ”
শেইখ নাজিমুদ্দিন ইবনে নিমা বলেন যে ,“ আহলুল বাইত (আ.) এর মাঝ থেকে বেশ কিছু ব্যক্তি বেঁচে ছিলেন যখন আলী আকবার (আ.) যুদ্ধক্ষেত্রে গেলেন। ” তার এ কথা দুর্বল এবং তিনি যা ইচ্ছা করেছিলেন তা হয়তো ওপরের বর্ণনার মতই কিন্তু তার বক্তব্যের ধারা তা নিশ্চিত করে বলে না।
আলী আকবার (আ.) এর বয়স নিয়েও মতভেদ রয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে শাহর আশোব এবং মুহাম্মাদ বিন আবি তালিবের অভিমত যে , তিনি আঠারো বছর বয়সী ছিলেন , কিন্তু শেইখ মুফীদ বলেন , তার বয়স ছিলো উনিশ বছর। তাই এ বর্ণনা অনুযায়ী তিনি ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) এর চাইতে কম বয়সী ছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে , তিনি পঁচিশ বছর বয়সের ছিলেন অথবা তার কম এবং তাই ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) এর চাইতে বয়সে বড় ছিলেন এবং এটিই সঠিক ও বেশী পরিচিত।
বিশিষ্ট গবেষক ও ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ বিন ইদ্রিস হিল্লি‘ হাজ্ব ’ কিতাবের শেষে আবু আব্দুল্লাহ ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রতি সালাম সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বলেন ,“ এরপর তার ছেলে আলী আকবার (আ.) এর প্রতি সালাম উচ্চারণ করতে হবে যার মা ছিলেন লায়লা , আবি মুররাহ বিন উরওয়াহ সাক্বাফির কন্যা। তিনি ছিলেন আশুরার দিন হযরত আবু তালিব (আ.) এর পরিবারের মধ্য থেকে প্রথম শহীদ। তিনি উসমানের খিলাফত কালে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার দাদা ইমাম আলী (আ.) থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবি উবাইদাহ এবং খালাফ আল আহমার তার প্রশংসার কবিতা লিখেছেন। ”
শেইখ মুফীদ তার ইরশাদ গ্রন্থে বলেন , কারবালায় যিনি শহীদ হয়েছেন তিনি ছিলেন আলী আসগার (ছোট) যার মা ছিলেন বনি সাক্বিফ থেকে এবং আলী আকবার (বড়) ছিলেন ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) , যার মা ছিলেন শাহযানান , যিনি ছিলেন খুসরুপারভিজের কন্যা অথবা একজন দাসী।১২
আবুল ফারাজ বর্ণনা করেন মুগীরা থেকে যে , মুয়াবিয়া একবার জিজ্ঞেস করেছিলো ,“ কে খেলাফতের জন্য বেশী যোগ্য ?” তাকে বলা হলো ,“ আপনি ” । সে বললো ,“ না , মানুষের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য হচ্ছে এ পদের জন্য আলী বিন হোসেইন বিন আলী , যে নিজের মাঝে একত্র করেছে বনি হাশিমের সাহস , বনি উমাইয়ার উদারতা এবং (বনি) সাক্বিফের মর্যাদা। ”
মনে রাখা দরকার যে , কিছু কিছু বর্ণনা ও যিয়ারত অনুযায়ী তার একটি সন্তান ও একটি পরিবার ছিলো। ইসলামের বিস্বস্ত ব্যক্তিত্ব শেইখ কুলাইনি বর্ণনা করেছেন আলী বিন ইবরাহীম কুম্মি থেকে , তিনি তার পিতা থেকে , তিনি আহমাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আবি নসর বাযানতি থেকে যিনি বলেছেন , আমি ইমাম আলী আল রিদা (আ.) কে জিজ্ঞেস করলাম ,“ যদি কোন ব্যক্তি কোন মহিলাকে বিয়ে করে এবং তার পিতার দাসীকেও বিয়ে করে ?” ইমাম বললেন ,“ এতে কোন ক্ষতি নেই। ” আমি বললাম , আমার কাছে আপনার পিতা থেকে খবর পৌঁছেছে যে , যে ইমাম আলী বিন হোসেইন (যায়নুল আবেদীন) (আ.) বিয়ে করেছিলেন (ইমাম) হাসান বিন আলী (আ.) এর কন্যাকে এবং তার দাসীকে এবং আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছে এ সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে। ” ইমাম বললেন ,“ বিষয়টি এরকম নয়। নিশ্চয়ই ইমাম আলী বিন হোসেইন (যায়নুল আবেদীন) (আ.) বিয়ে করেছিলেন ইমাম হাসান বিন আলী (আ.) এর কন্যাকে এবং আলী বিন হোসেইন (আ.) (আলী আকবার)-এর দাসীকে , যিনি কারবালায় শহীদ হয়েছিলেন। ”
হামিরিও তার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে তা উল্লেখ করেছেন।
(আবু হামযা) সুমালি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে একটি দীর্ঘ যিয়ারত বর্ণনা করেছেন কারবালার শহীদ আলী বিন হোসেইন সম্পর্কে , এতে বলা হয়েছে ,“ আল্লাহর সালাম আপনার ওপরে এবং আপনার বংশধরের ওপরে এবং আপনার পরিবারের ওপরে এবং আপনার পূর্ব পুরুষদের ওপরে এবং আপনার সন্তানদের ওপরে। ” তার মা কারবালায় উপস্থিত ছিলেন কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কোন সংবাদ আমরা পাই নি এবং আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ গ্রন্থে আছে] প্রথম ব্যক্তি যিনি আহলুল বাইত থেকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আক্বীল। তিনি এ যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন ,“ আজ আমি দেখা করবো আমার বাবা মুসলিমের সাথে এবং সেই যুবকদের সাথে আমি সাক্ষাত করবো যারা নবীর ধর্মের জন্য সব কিছু কোরবান করেছিলেন , তারা একদল যারা মিথ্যা বলতে জানে না , কিন্তু তারা ছিলো ন্যায়পরায়ণ ও সম্মানিত বনি হাশিমের বংশধারা , যারা সম্মানিতদের অভিভাবক। ”
তিনি তিন বার আক্রমণ করেন এবং আটানব্বই জনকে হত্যা করেন এবং শেষ পর্যন্ত আমর বিন সাবীহ সাইদাউই এবং আসাদ বিন মালিক তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
আবুল ফারাজ বলেন , তার মা ছিলেন ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর কন্যা রুকাইয়া। শেইখ মুফীদ এবং তাবারি বলেন যে , উমর বিন সা’ আদের সেনাবাহিনীর এক ব্যক্তি আমর বিন সাবীহ আব্দুল্লাহর দিকে একটি তীর ছুঁড়ে এবং তিনি তার হাত কপালে রাখলেন নিজেকে রক্ষা করার জন্য। তীরটি তার হাত ভেদ করে কপালে বিদ্ধ হয়ে গেলো এবং তিনি তা আলাদা করতে পারলেন না। অন্য ব্যক্তি একটি বর্শা তার বুকে ঢুকিয়ে দিলো এবং তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
ইবনে আসীর তার‘ কামিল ’ -এ বলেছেন যে , মুখতার (বিন আবু উবাইদাহ) যায়েদ বিন রিককাদ হাবাবিকে ডেকে পাঠালেন। সে এলো এবং বললো ,“ আমি তাদের মধ্য থেকে এক যুবকের হাতকে একটি তীরের মাধ্যমে কপালে বিদ্ধ করে আটকে দিয়েছিলাম এবং সেই যুবক ছিলো আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আক্বীল। আমি যখন তার দিকে একটি তীর ছুঁড়লাম সে বলছিলো ,“ হে আল্লাহ , এ লোকগুলো মনে করে আমরা হীন ও নীচ। হে আল্লাহ তাদেরকে হত্যা করো যেভাবে তারা আমাদের হত্যা করেছে। ” আমি তার দিকে আরেকটি তীর ছুঁড়লাম এবং আমি যখন তার দিকে গেলাম সে মারা গিয়েছিলো। তখন আমি তার হৃৎপিণ্ডথেকে একটি তীর টেনে বের করেছিলাম , যা তাকে হত্যা করেছিলো। আমি তার কপালের তীরটি ওপরে নিচে টানতে শুরু করলাম , কিন্তু এর হাতল চলে এলো কিন্তু এর মাথা ভিতরে রয়ে গেলো। ” তা শুনে মুখতারের লোকেরা তার দিকে ছুটে এলো , কিন্তু সে তাদের তরবারি দিয়ে আক্রমণ করলো। ইবনে কামিল বললো ,“ তাকে বর্শা ও তরবারি দিয়ে হত্যা করো না বরং তাকে তোমাদের তীর ও পাথর দিয়ে হত্যা করো। ” তারা তার দিকে তীর ছুঁড়লো এবং সে মাটিতে পড়ে গেলো এবং তাকে জীবন্তপুড়িয়ে ফেলা হলো (আল্লাহর অভিশাপ তার ওপরে) ।
আউন বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তাবারি বলেন যে , সেনাবাহিনী তাদরেকে সব দিক থেকে ঘিরে ফেলে ছিলো আব্দুল্লাহ বিন ক্বাতাবাহ তা ’ ঈ নাবহানি আক্রমণ করলো আউন বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিবকে এবং তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার ওপরে) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ আছে যে তিনি এ যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন ,“ যদি তোমরা আমাকে না চিনো আমি জাফরের সন্তান , যে ছিলেন সত্যবাদী শহীদ , যিনি বাস করেন আলোকিত বেহেশতে , সবুজ পাখায় ভর করে তিনি সেখানে উড়েন এবং কিয়ামতের দিন এটি সম্মানের জন্য যথেষ্ট। ” এরপর তিনি তিন জন অশ্বারোহীকে এবং আঠারো জন পদাতিক সৈন্যকে হত্যা করলেন এবং আব্দুল্লাহ বিন ক্বাতাবাহ তাঈ ’ তাকে হত্যা করে।
আবুল ফারাজ (ইসফাহানি) বলেন যে , তার মা ছিলেন সাইয়েদা যায়নাব আক্বীলা (আ.) , যিনি ছিলেন ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কন্যা সাইয়েদা ফাতিমা আয-যাহরা (আ.) এর কন্যা।
সুলাইমান বিন ক্বিব্বাহ আউনের জন্য প্রশংসা কবিতায় বলেছেন ,“ কাঁদো আউনের জন্য যদি কাঁদতে চাও , যিনি দুর্দশার সময় তাকে (ইমাম) কখনো ছেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না , আমার জীবনের শপথ , নিকটাত্মীয়দের বিরাট দুঃখ-কষ্ট সইতে হয়েছে , তাই কাঁদো এক দীর্ঘ দুর্যোগের কারণে। ”
তার মাতা আক্বীলা (যায়নাব) থেকে ইবনে আব্বাস ফাদাকের বর্ণনা পেয়েছেন , যিনি তার মা ফাতিমা (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে ,“ ইমাম আলী (আ.) এর কন্যা আমাদের আক্বীলা বিচক্ষণ নারী যায়নাব , আমাদের বলেছেন (ইত্যাদি) । ”
মনে রাখা ভালো যে , আব্দুল্লাহ বিন জাফরের ছিলো আউন নামে দুটি ছেলে , যাদের উপাধি দেয়া হয়েছিলো আকবার (বড়) এবং আসগার (ছোট) । তাদের একজনের মা ছিলেন যায়নাব আক্বীলা (আ.) এবং অন্যজন মুসাইয়াব বিন নাজাবাহ ফাযারির কন্যা জুম ’ আর পুত্র। তাদের মধ্যে কে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে কারবালায় শহীদ হয়েছিলেন তার বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এটি সুস্পষ্ট যে , (কারবালায়) যিনি শহীদ হন তিনি ছিলেন আউন আল আকবার (বড় জন) । যিনি ছিলেন সাইয়েদা যায়নাবের পুত্র। আর আউন আল আসগারকে হত্যা করা হয়েছিলো হিররাহর ঘটনায় , অভিশপ্ত মুসরিফ বিন আক্বাাহর লোকেরা তাকে হত্যা করেছিলো। আবুল ফারাজ ইসফাহানি তাই বলেছেন।
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিবের শাহাদাত
[তাবারি বর্ণনা করেছেন] আমির বিননাহ শাল তামিমি আক্রমণ করে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিব (আ.) কে এবং তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার ওপরে বর্ষিত হোক) ।
আবুল ফারাজ (ইসফাহানি) বলেন যে , তার মা খাওসা ছিলেন বনি বকর ওয়ায়েল গোত্রের হাফসাহর কন্যা।
তার সম্মানে প্রশংসা কবিতায় সুলাইমান বিন কিববাহ বলেছেন ,“ যখন সে তাদের মাঝে পড়ে গেলো , যার ছিলো রাসূলের নামে নাম , তারা তাদের ধারালো তরবারি তার মাথার উপর তুললো। তাই যদি তুমি কাঁদতে চাও হে আমার চোখগুলো , তাহলে উদারভাবে কাঁদো এক সামুদ্রিক ঝড়ের মত অশ্রুনিয়ে। ”
‘ মানাক্বিব ’ -এ বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে গেলেন এই বলে ,“ আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি শত্রুদের বিরুদ্ধে , যারা এক অন্ধ জাতি এবং ধ্বংস ছড়ায় , যারা কোরআনের বৈশিষ্ট্য , দৃঢ় ওহী এবং এর যুক্তিকে বদলে নিয়েছে , তারা অবিশ্বাসী ও উদ্ধতদের পক্ষ নিয়েছে। ” এরপর তিনি দশ জনকে তরবারি দিয়ে হত্যা করলেন এবং আমির বিন নাহশাল তামিমি তাকে হত্যা করলো।
আবুল ফারাজ বলেন , তারপরে তার ভাই উবায়দুল্লাহ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফরকে শহীদ করা হয় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার ওপরে) ।‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখকরা হয়েছে যে , বিশর বিন হুয়েইতার ক্বানাসি তাকে হত্যা করে।
আব্দুর রহমান বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত
উসমান বিন খালিদ বিন আল আসীর জাহনি এবং বিশর বিন সওত হামাদানি ক্বানাসি আক্রমণ করে আব্দুর রহমানকে এবং তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখিত আছে যে , তিনি এ যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন ,“ আমার বাবা ছিলেন আক্বীল , তাই বনি হাশিমে আমার স্থান জেনে নাও , আর (বনি হাশিম) তারা পরস্পর ভাই এবং খুবই সৎ , কোরআনের উস্তাদ , এ হলো হোসেইন যার ভিত্তি উচ্চ সম্মানিত এবং সে বৃদ্ধ ও যুবক উভয়ের অভিভাবক। ”
তিনি সতেরো জনকে হত্যা করলেন। মাদায়েনি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , উসমান বিন খালিদ বিন আল-আশীম এবং এক হামাদানি ব্যক্তি তাকে হত্যা করেছিলো। এও বলা হয়েছে যে , মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বিন আক্বীলের মা ছিলেন এক দাসী এবং উসমান বিন খালিদ জাহনি তাকে হত্যা করে।
‘ তারীখে তাবারি ’ তে আছে যে , মুখতার দুব্যক্তিকে কুফায় গ্রেফতার করে যারা আব্দুর রহমান বিন আক্বীলের হত্যার অংশগ্রহণ করেছিলো এবং তার পোষাক লুট করেছিলো। সে তাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তাদের পুড়িয়ে ফেলে , আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর।
জাফর বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তা মা ছিলেন বিন কিলাব গোত্রের আমীরের কন্যা উম্মুস সাগার। অন্যরা বলেন যে , তার মা ছিলেন খাওসা , যিনি আমর বিন আমির কিলাবির কন্যা ছিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এ বলে ,“ আমি উপত্যকার যুবক , এক ভবঘুরে , আমি হাশিম পরিবার থেকে যারা প্রভাবশালী , এবং নিশ্চয়ই আমরাই নেতা , এ হলো হোসেইন যিনি সব পবিত্রদের মাঝে সবচেয়ে পবিত্র। ”
আব্দুল্লাহ বিন উরওয়াহ খাস’ আমি তার দিকে একটি তীর ছুঁড়ে এবং তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ বলা হয়েছে যে , তিনি দুজনকে হত্যা করেন , অন্যরা বলেন তিনি পনেরো জন অশ্বারোহী সৈন্যকে হত্যা করেন। বিশর বিন সওত হামাদানি তাকে হত্যা করে।
আব্দুল্লাহ আল আকবার বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তার মা ছিলেন এক দাসী। আবু মারহাম আযদি এবং লাক্বীত বিন আয়াস জাহনি তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) ।
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) ও মুহাম্মাদ বিন আবু সাঈদ বিন আকীল১৩ বিন আবু তালিব আল আহওয়াল (ট্যারা চোখ বিশিষ্ট) থেকে আবুল ফারাজি ইসফাহানি বর্ণনা করেছেন যে , তার মা ছিলেন এক দাসী এবং লাক্বীত বিন ইয়াসির জাহনি তাকে ঘেরাও করে এবং তাকে হত্যা করে। মাদায়েনি বর্ণনা করেছেন আবু মাখনাফ থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন সুলাইমান বিন রাশিদ থেকে এবং সে হামিদ বিন মুসলিম থেকে।
মুহাম্মাদ বিন আলী বিন হামযা বলেন যে , তার পরে জাফর বিন মুহাম্মাদ বিন আক্বীল শহীদ হন। অন্যরা বলেন হিররা ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়েছিলো। কিন্তু আবুল ফারাজ ইসফাহানি বলেন যে ,“ আমি মুহাম্মাদ বিন আক্বীলের সন্তান জাফর নামে কাউকে বংশ তালিকার বইগুলোতে পাইনি। ”
মুহাম্মাদ বিন আলী বিন হামযা বর্ণনা করেছেন আক্বীল বিন আব্দুল্লাহ বিন আক্বীল বিন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আক্বীল বিন আবি তালিব থেকে যে , আলী বিন আক্বীল , যার মা ছিলেন একজন দাসী তিনিও আশুরার দিন (কারবালায়) শহীদ হয়েছিলেন। আবু তালিবের বংশধর থেকে যত ব্যক্তিকে আশুরার দিন হত্যা করা হয়েছিলো তাদের সংখ্যা ছিলো বাইশ। যাদের বিষয়ে মতভেদ আছে তাদের ছাড়াই।
ইবনে কুতাইবাহ তার‘ মা ’ আরিফ ’ -এ বলেন যে , আক্বীলের সন্তানরা , যারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে গিয়েছিলেন তারা ছিলেন নয় জন , যাদের মধ্যে মুসলিম বিন আকীল ছিলেন সবচেয়ে সাহসী।
ক্বাসিম বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর শাহাদাত
তার মা ছিলেন একজন দাসী। [‘ তাসলিয়াতুল মাজলিস’ -এ আছে] যখন ইমাম হোসেইন (আ.) দেখলেন ক্বাসিম প্রস্তুতি নিয়েছে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করার জন্য। তিনি তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং তারা উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারালেন। এরপর ক্বাসিম যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন , কিন্তু ইমাম তাকে অনুমতি দিলেন না। তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর হাত ও পায়ে অনবরত চুমু দিতে লাগলেন যতক্ষণ না তিনি অনুমতি দিলেন।কাসিক যুদ্ধ ক্ষেত্রে গেলেন এবং তার চোখ থেকে অনবরত অশ্রু ঝরছিলো এবং তিনি বলছিলেন ,“ যদি তোমরা আমাকে না জানো , আমি হাসানের সন্তান , নবীর নাতি , যিনি ছিলেন বাছাইকৃত ও বিশ্বস্ত , এ হলো হোসেইন যাকে বন্দী করা হয়েছে যেভাবে বন্ধকের মালিকরা বন্দী করে , সেই লোকদের মাঝে যারা বৃষ্টির পানি থেকে বঞ্চিত হবে। ” তিনি ভয়ানক যুদ্ধ করলেন এবং অত্যন্ত অল্প বয়েসী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তরবারি দিয়ে পয়ত্রিশ জনকে হত্যা করছিলেন।
‘ মানাক্বিব ’ -এ উল্লেখ আছে যে , তিনি এ যুদ্ধ কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন ,“ নিশ্চয়ই আমি ক্বাসিম , আলীর বংশধর , কা‘ বার রবের শপথ , আমরা শ্রেষ্ঠত্ব রাখি নবীর সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে , শিমর (বিন) যিলজাওশান ও অবৈধ সন্তানের চাইতে। ”
শেইখ সাদুক্বের‘ আমালি ’ তে আছে যে , আলী বিন হোসেইন (আল আকবর)-এর পরে , ক্বাসিম বিন হাসান যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এ বলে ,“ অস্থির হয়ো না , হে আমার সত্তা , কারণ প্রত্যেকেই ধ্বংস হবে , কারণ আজ তুমি বেহেশতবাসীদের সাথে সাক্ষাত করবে। ” তিনি তিন ব্যক্তিকে হত্যা করলেন এবং তারা তাকে ঘোড়া থেকে মাটিতে ফেলে দিলো। ফাত্তাল নিশাপুরিও একই বর্ণনা দিয়েছেন।
কিন্তু আবুল ফারাজ , শেইখ মুফীদ এবং তাবারি আবু মাখনাফ থেকে বর্ণনা করেন এবং তিনি সুলাইমান বিন আবি রাশিদ থেকে , তিনি হামীদ বিন মুসলিম থেকে , যে বলেছে ,“ এক কিশোর , নতুন চাঁদের টুকরোর মত সে ছিলো , যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করলো , তার হাতে ছিলো এক তরবারি এবং সে একটি শার্ট ও একটি আবা (লম্বা আচকান) পড়েছিলো। সে জুতো পরেছিলো যার একটির ফিতা ছেঁড়া ছিলো। আমি যদি ভুলে না গিয়ে থাকি তা ছিলো বাম পায়ের। উমর বিন সা’ আদ বিন নুফাইল আযদি বললো ,“ আমি তাকে আক্রমণ করতে চাই। ” আমি বললাম , “ সুবহানালাহ , কেন ? এ বাহিনী , যা তাকে চারদিক থেকে ঘেরাও করেছে , নিশ্চিত ভাবে তাকে হত্যা করবে। ” সে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি তাকে আক্রমণ করবো। ” সে তাকে আক্রমণ করলো এবং তার দিকে ফেরার আগেই সে তার মাথার উপর আঘাত করলো তার তরবারি দিয়ে , যা তা দুভাগ করে ফেললো। কিশোরটি মুখ নিচে দিয়ে মাটিতে পড়ে গেলো এবং উচ্চকণ্ঠে বললো ,“ হায় , হে প্রিয় চাচা , আমার সাহায্যে আসুন ।” ইমাম হোসেইন (আ.) লাফ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে গেলেন এক শিকারী বাজপাখির মত এবং আক্রমণ করলেন ক্রুদ্ধ সিংহের মত। তিনি উমরকে তার তরবারি দিয়ে আক্রমণ করলেন এবং সে তা হাত দিয়ে ঠেকাতে গেলো , যা বিচ্ছিন্ন হয়ে তার কনুই থেকে ঝুলতে লাগলো। [ইরশাদ] তখন সে চিৎকার দিলো যা সমগ্র সেনাবাহিনী শুনতে পেলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার উপর থেকে হাত তুলে নিলেন। তখন কুফার সেনাবাহিনী ঘেরাও করলো উমরকে উদ্ধার করতে।
[‘ তাসলিয়াতুল মাজালিস’ -এ আছে] যখন সেনাবাহিনী আক্রমণ করলো তাদের ঘোড়ার বুক তাকে (উমরকে) আঘাত করলো এবং যখন তারা চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো সে তাদের ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে গেলো এবং নিহত হলো। যখন ধুলো নেমে গেলো আমি দেখলাম ইমাম হোসেইন (আ.) ক্বাসিমের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন যার পা মাটিতে লম্বা হয়ে ছিলো। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ বিদায় হোক সে জাতির , যারা তোমাকে হত্যা করেছে , আর কিয়ামতের দিনে তাদের শত্রুহবে তোমার দাদা (রাসূল সা.) । ”
এরপর তিনি বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , তোমার চাচার ওপরে এটি অত্যন্ত কষ্টকর যে তিনি তোমার সাহায্যে আসতে পারেন নি যখন তুমি তাকে ডেকেছিলে অথবা তিনি সাড়া দিয়েছিলেন কিন্তু তাতে তোমার কোন লাভ হয়নি। ” (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তাঁর উপর।)
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , এখানে আছে অনেক হত্যাকারী এবং তার সাহায্যকারীদের সংখ্যা খুবই কম। ”
এরপর তিনি তাকে বুকে চেপে ধরলেন এবং তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে এলেন যে , তার পা দুটো মাটিতে ঘষা খাচ্ছিলো। [তাবারির গ্রন্থে আছে] ইমাম হোসেইন (আ.) তার বুক চেপে ধরলেন ক্বাসিমের বুকে। আমি নিজেকে বললাম ,“ তিনি তাকে নিয়ে কী করতে চান ?” এরপর তিনি তাকে এনে তার সন্তান আলী বিন হোসেইন (আল আকবার) এবং তার পরিবারের অন্য শহীদদের পাশে রাখলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম“ এ কিশোরটি কে ?” আমাকে বলা হলো , সে ক্বাসিম বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিব।১৪
বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ ইয়া রব , তাদের সংখ্যা কমিয়ে দাও , তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো , তাদের প্রত্যেককে পরিত্যাগ করো এবং তাদেরকে কখনও ক্ষমা করো না। সহ্য কর হে আমার চাচাতো ভাইয়েরা , সহ্য করো হে আমার পরিবার , আজকের পর তোমরা কখনো আর অপমানিত হবে না। ”
সাইয়েদ মুরতাযা আলামুল হুদার (হেদায়েতের পতাকা) এক দীর্ঘ যিয়ারতে আছে যে ,“ শান্তি বর্ষিত হোক হাসান বিন আলীর সন্তান ক্বাসিম এর উপর এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত হোক তার উপর , শান্তিবর্ষিত হোক আপনার উপর হে আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তির সন্তান , শান্তিবর্ষিত হোক আপনার ওপরে হে আল্লাহর রাসূলের সুগন্ধ , শান্তিবর্ষিত হোক আপনার ওপরে যার আশা অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিলো এ পৃথিবীর মাধ্যমে। যে তার অন্তরের আরোগ্য আনতে পারে নি আল্লাহর শত্রুদের মাধ্যমে , যতক্ষণ না মৃত্যু তার দিকে দ্রুত এগিয়ে এলো এবং তার আশা মৃত্যুবরণ করলো , শুভেচ্ছা হে রাসূলের প্রিয় ব্যক্তির প্রিয় , কত সফলই না আপনার সংগ্রাম এবং কত উচ্চই না আপনার সম্মান এবং কত সুন্দরই না আপনার ফেরার স্থান। ”
আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন আলী বিন আবু তালিবের শাহাদাত
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ রয়েছে যে ক্বাসিমের শাহাদাতের আগে আব্দুল্লাহ বিন হাসান যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন যার সম্পর্কে আমরা আগে আলোচনা করেছি। কিন্তু আরও সঠিক হলো যে , তিনি ক্বাসিমের পর যুদ্ধক্ষেত্রে গেছেন এই কথা বলে ,“ যদি আমাকে না জানো আমি হলাম হায়দারের সন্তান , জঙ্গলের এক পুরুষ সিংহ এবং আমি শত্রুর উপর এক ঘূর্ণিঝড়। ”
তিনি তার তরবারি দিয়ে বারো জনকে হত্যা করলেন এবং হানি বিন সাবীত হাযরামি তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত তার উপর বর্ষিত হোক) , যার (হানির) চেহারা তখন কালো হয়ে যায়।
আবুল ফারাজ থেকে ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) বর্ণনা করেছেন যে , হুরমালাহ বিন কাহিল আসাদি তাকে হত্যা করে এবং তার শাহাদাতের বিষয়ে পরে ইমাম হোসেনইন (আ.) এর শাহাদাতের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা হবে।
আবু বকর বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
ক্বাসিম (আ.) এর মা ছিলেন এক দাসী। আবুল ফারাজ উদ্ধৃতি দিয়েছেন মাদায়েনি থেকে , তিনি তার সূত্র থেকে , তিনি আবু মাখনাফ থেকে , তিনি সুলাইমান বিন রাশিদ থেকে যে আব্দুল্লাহ বিন উক্ববাহ গানাউই তাকে হত্যা করে।
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বের (আ.) থেকে উমাইর ও ইবনে শিমরের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে , উক্ববাহ গানাউই তাকে হত্যা করে।
সুলাইমান বিন কিব্বাহ তার কবিতায় তাকে এভাবে স্মরণ করেছেন ,“ আমাদের রক্তের (দায় দায়িত্ব) এক ফোঁটা গানির বংশের ঘাড়ে এবং অন্য রক্ত (বনি) আসাদের উপর করা হয় যা গোনা যায় না। ”
আবুল ফারাজ মনে করেন তার শাহাদাত ঘটেছে ক্বাসিমের আগে। কিন্তু তাবারি , ইবনে আসীর , শেইখ মুফীদ এবং অন্যরা তার শাহাদাতকে (ক্বাসিমের) পরে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) এর সন্তানদের শাহাদাত
[‘ ইরশাদ ’ গ্রন্থে আছে] যখন হযরত আব্বাস (আ.) তার পরিবারের বেশীর ভাগকে শহীদ হয়ে যেতে দেখলেন। তিনি তার আপন ভাইদের ডাকলেন , যেমন আব্দুল্লাহ , জাফর এবং উসমানকে। এরপর বললেন ,“ হে আমার মায়ের সন্তানেরা , তোমাদের কোন সন্তানাদি নেই। যুদ্ধক্ষেত্রে আমার আগে যাও এবং জীবন বিসর্জন দাও , যেন আমি প্রত্যক্ষ করি আল্লাহ ও তার রাসূলের (সা.) সম্পর্কে তোমাদের সততা ।’ ১৫
আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
আব্দুল্লাহ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এবং ভীষণ যুদ্ধ করলেন এবং হানি বিন সাবীত হাযরামির সাথে তরবারির আঘাত বিনিময় করলেন এবং শেষ পর্যন্তহানি তাকে হত্যা করলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) । ‘
মানাক্বিব ’ -এ এই যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবিতা আছে ,“ আমি এক সাহায্যকারীর সন্তান , যিনি ছিলেন অসাধারণ , অপূর্ব সব কাজের সম্পাদনকারী আলী , যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসূলের তরবারি , প্রতিশোধ গ্রহণকারী , যার (তরবারি) থেকে শক্তি প্রকাশিত হতো প্রতিদিন। ”
জাফর বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তিনি বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন এবং‘ মানাক্বিব ’ -এ আছে তিনি বলছিলেন ,“ নিশ্চয়ই আমি জাফর , অসাধারণত্বের অধিকারী , দানশীল আলীর সন্তান , যিনি ছিলেন নবীর উত্তরাধিকারী , প্রবীণ এবং অভিভাবক , আমি আমার পিতার সাথে সামঞ্জস্যশীল এবং মামার সাথেও। আমি হোসেইনকে রক্ষা করি যিনি উদারতা ও সৌন্দর্যের অধিকারী। ”
হানি বিন সাবীত তাকে আক্রমণ করে ও হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার ওপরে) ।
ইবনে শহর আশোব বলেন যে , খাওলি আসবাহি একটি তীর ছুঁড়ে যা তার কপাল অথবা চোখে বিদ্ধ হয়।
উসমান বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তিনি এ যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবিতাটি আবৃত্তি করা অবস্থায় যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন ,“ নিশ্চয়ই আমি উসমান , মর্যাদার অধিকারী , আমার অভিভাবক হচ্ছেন আলী যিনি ছিলেন সৎকর্ম সম্পাদনকারী , এ হলো হোসেইন- ইনসাফের অভিভাবক , যুবক ও বৃদ্ধদের সর্দার। ”
তার বয়স ছিলো একুশ বছর , তিনি গেলেন এবং তার ভাইদের জায়গায় দাঁড়ালেন (আগে যারা গিয়েছিলেন) ।
আবুল ফারাজ এবং অন্যরা বলেন যে , খাওলী বিন ইয়াযীদ একটি তীর ছুঁড়ে তার দিকে যা তাকে ফেলে দেয়।
‘ মানাক্বিব ’ -এ আছে যে , একটি তীর তার পাশে বিদ্ধ হলো এবং তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন। বনি আবান বিন দারিম গোত্রের এক ব্যক্তি তাকে হত্যা করে এবং তার (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) মাথা নিয়ে যায়। বর্ণিত আছে ইমাম আলী (আ.) বলেছেন যে , “ আমি তাকে নাম দিয়েছি আমার (দ্বীনি) ভাই উসমান বিন মাযউনের নামে। ”
মুহাম্মাদ আল আসগার বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তার মা ছিলেন একজন দাসী। [তাবারি , আবুল ফারাজ উল্লেখ করেছেন] । বনি আবান বিন দারিম গোত্রের এক ব্যক্তি তাকে হত্যা করে এবং তার মাথা নিয়ে যায় (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
আবু বকর বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত
তার নাম জানা যায় না (তার কুনিয়া হলো আবু বকর) , এবং তার মা ছিলো মাসউদ বিন খালিদের কন্যা লায়লা।
[তাবারির গ্রন্থে আছে] এক হামাদানি ব্যক্তি তাকে হত্যা করে। মাদায়েনি বর্ণনা করেন যে , তার লাশ পাওয়া যায় একটি স্রোতধারার পাশে , কিন্তু তার হত্যা সম্পর্কে জানা যায়নি।
‘ মানাক্বিব ’ -এ আছে যে আবু বকর বিন আলী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন এ যুদ্ধের কবিতাটি আবৃত্তি করে ,“ আমার অভিভাবক আলী বেশ কিছু উন্নত গুণাবলীর অধিকারী , মর্যাদাবান , দয়ালু ও সম্মানিত হাশিমের বংশধর। এ হলো হোসেইন আল্লাহর রাসূলের সন্তান , আমরা তাকে ধারালো তরবারি দিয়ে রক্ষা করি , আমার জীবন আপনার জন্য কোরবান হোক , হে আমার সম্মানিত ভাই। ” তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা যাহর (অথবা যাজর) বিন বাদার জু ’ ফি অথবা উক্ববাহ গানাউই তাকে হত্যা করে (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
‘ মানাক্বিব ’ -এ রয়েছে যে এরপর তার ভাই উমর যুদ্ধক্ষেত্রে এলেন এ যুদ্ধ ক্ষেত্রের কবিতাটি আবৃত্তি করে ,“ হে আল্লাহর শত্রুরা , উমরের পথ ছাড়ো , সিংহকে ছেড়ে দাও যেন সে তোমাদেরকে আঘাত করতে পারে তার তরবারি দিয়ে এবং সে পালাবে না। হে যাজর , হেযাজর , আমার ওপরে তোমার প্রতিশোধ নাও। ” এরপর তিনি যাজরকে হত্যা করলেন , যে ছিলো তার ভাইয়ের হত্যাকারী এবং যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন।
আমরা বলি যে , ঐতিহাসিকদের কাছে ও জীবনী লেখকদের কাছে জানা নেই যে , উমর কারবালায় উপস্থিত’ ছিলেন কিনা তার ভাই ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে।‘ উমদাতুত তালিব ’ -এর লেখক তার বক্তব্যের শেষে এসে বলেছেন যে , উমার তার ভাই ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছিলো এবং তার সাথে কুফা যায় নি। তার সম্পর্কে বর্ণনা যে , তিনি কারবালায় উপস্থিত ছিলেন তা সঠিক নয়। উমর ৭৭ বছর বয়সে তাস’ আতে ইন্তেকাল করেন।
আবুল ফারাজ বলেন , মুহাম্মাদ বিন আলী বিন হামযা বলেন যে , আশুরার দিনে , ইবরাহীম বিন আলীও কারবালায় শহীদ হন এবং তার মা ছিলেন এক দাসী , কিন্তু অন্যরা তার উল্লেখকরেন নি এবং আমি জীবনীমূলক বইগুলোতে ইবরাহীম বিন আলী নামে কাউকে পাই নি।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে ,‘ মাসাবীহ ’ -এর লেখক বলেছেন যে , হাসান বিন হাসান আল মুসাননাহ তার চাচার সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন আশুরার দিনে এবং তরবারি দিয়ে সত্তর জনকে হত্যা করেছিলেন। তিনি আঠারোটি আঘাত পেয়েছিলেন এবং তার ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তার মামা আসমা বিন খারেজা তাকেফকাতে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানে সুস্থতা লাভ করেছিলেন , এরপর তিনি তাকে মদীনায় পাঠিয়ে দেন।
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ খাওয়ারেযমির‘ মাক্বতাল ’ থেকে উল্লেখ আছে যে , আশুরার দিনে একটি বাচ্চা বেরিয়ে এলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর তাঁবু থেকে , কানে তার দুখানা দুল ছিলো। সে খুব ভীত ছিলো এবং সে ডান বায়ে তাকাচ্ছিলো এবং তার কানের দুলগুলো কাঁপছিলো। হানি বিন সাবীত তাকে আক্রমণ করে ও হত্যা করে। শাহারবান(ইমাম হোসেইন (আ.) এর স্ত্রী) ভাষা হারিয়ে তার দিকে তাকালেন এবং একটি কথাও বললেন না।
আবুজাফর তাবারি বর্ণনা করেছেন হিশাম কালবি থেকে , তিনি আবুল হুযাইল থেকে , তিনি সাকুনি নামে এক ব্যক্তি থেকে যে বলেছে যে , খালিদ বিন উবায়দুল্লাহর দিনগুলোতে আমি হানি বিন সাবীত হাযরামিকে দেখলাম , যে বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো , (হাযরাম গোত্রের) লোকজনের এক জমায়েতে বলছিলো যে ,“ আমি কারবালায় উপস্থিত ছিলাম হোসেইনকে হত্যার দিন এবং অন্য নয় জন ব্যক্তির সাথে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরছিলাম। ঘোড়াগুলো হাঁটছিলো ও ছুটছিলো এখানে সেখানে। হঠাৎ হোসেইনের পরিবারের একটি ছোট্ট বাচ্চা বেরিয়ে এলো তাঁবু থেকে , পরনে ছিলো জামা ও প্যান্ট। তার হাতে ছিলো তাঁবুর একটি খুঁটি এবং সে ডানে বামে তাকাচ্ছিলো ভয়ে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি তার কানের দুটো দুল কাঁপছে যখন সে মাথা ঘোড়াচ্ছিলো এবং আমি যেন এখনও দেখতে পাচ্ছি একজন ঘোড়সওয়ার ঘোড়া ছুটিয়ে তার দিকে গেলো এবং তার কাছে পৌঁছে নিচু হলো এবং তাকে তরবারি দিয়ে দুটুকরো করে ফেললো। ” হিশাম বলে যে , সাকুনি বলেছে যে , শিশুটির হত্যাকারী ছিলো হানি বিন সাবীত নিজেই এবং সে তিরস্কারের ভয়ে নিজের নাম গোপন করেছিলো। আমার চোখ এমন শিশুদের আর দেখেনি যাদের দুঃখ মানুষের হৃৎপিণ্ডকে আগুনে ঝলসে দেয়।
আব্বাস বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর শাহাদাত
শেইখ মুফীদ তার‘ ইরশাদ ’ -এ এবং শেইখ তাবারসি তার‘ আ ’ লামুল ওয়ারা ’ -তে বলেছেন যে , সেনাবাহিনী ইমাম হোসেইন (আ.) কে আক্রমণ করলো এবং তার সৈন্যদের ছড়িয়ে দিলো এবং তাদের পিপাসা বৃদ্ধি পেলে ইমাম তার ভাই আব্বাস (আ.) কে নিয়ে ফোরাতের দিকে ঘোড়া ছোটালেন। উমর বিন সা’ আদের বাহিনী তাদের পথ আটকে দিলো এবং বনি দারিম থেকে এক ব্যক্তি তাদের উদ্দেশ্যে বললো ,“ আক্ষেপ তোমাদের জন্য , ফোরাতের দিকে তাদের রাস্তা বন্ধ করে দাও যেন তারা সেখানে পৌঁছতে না পারে। ” ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে আল্লাহ , তাকে পিপাসার্ত করুন। ” সে ক্রোধান্বিত হলো এবং ইমামের দিকে একটি তীর ছুঁড়ে মারলো যা তার থুতনি ভেদ করলো। ইমাম তীরটি টেনে বের করলেন এবং নিজের তালু দিয়ে তার নিচে চেপে ধরলেন। এতে তার হাত রক্তে পূর্ণ হয়ে গেলো। তখন তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমি তোমার কাছে অভিযোগ করছি তারা কী আরচণ করছে তোমার রাসূল (সা.) এর কন্যার সন্তানের সাথে। ”
এরপর তারা তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ফিরে এলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী হযরত আব্বাস (আ.) কে ঘেরাও করে ফেললো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। আব্বাস একা একা যুদ্ধ করলেন এবং শহীদ হয়ে গেলেন। যায়েদ বিন ওয়ারখা হানাফি এবং হাকীম বিন তুফাইল তাঈ ’ যৌথভাবে তাকে হত্যা করে তাকে বেশ কিছু আঘাতে আহত করার পর এবং তার নড়াচড়া করার মত শক্তি আর ছিলো না। সাইয়েদ ইবনে তাউস কিছুটা একই রকম বর্ণনা দিয়েছেন।
হাসান বিন আলী তাবারসি বর্ণনা করেন যে , (বনি দারিম গোত্রের) অভিশপ্তের তীরটি ইমাম হোসেইন (আ.) এর কপালে বিদ্ধ হয় এবং আব্বাস তা তুলেন। কিন্তু পূর্ববর্তী বর্ণনাটিই বেশী পরিচিত।
তাবারি বর্ণনা করেন হিশাম থেকে , তিনি তার পিতা মুহাম্মাদ বিন সায়েব থেকে , তিনি ক্বাসিম বিন আল আসবাগ বিন নাবাতাহ থেকে যিনি বলেছেন , (কারবালায়) ইমাম হোসেইন (আ.) শহীদ হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলো এমন একজন আমাকে বলেছে যে , যখন হোসেইনের সেনাদল প্রাণ হারালো তিনি তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং ফোরাত নদীর দিকে গেলেন। বনি আবান বিন দারিম গোত্রের এক লোক বললো ,“ আক্ষেপ তোমাদের জন্য , তার এবং ফোরাত নদীর মাঝখানে অবস্থান নাও যেন তার শিয়ারা (অনুসারীরা) তার সাথে যুক্ত হতে না পারে। ” তিনি ঘোড়া ছোটালেন এবং সেনাবাহিনীও তাকে অনুসরণ করলো এবং ফোরাত নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিলো। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ হে আল্লাহ , তাকে পিপাসার্ত করুন। ” আবানি লোকটি একটি তীর ছুঁড়লো যা ইমামের থুতনি ভেদ করলো , ইমাম তীরটি টেনে বের করলেন এবং তার হাতের তালু দিয়ে তার নিচে চেপে ধরলেন , যা রক্তে পূর্ণ হয়ে গেলো এবং তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমি আপনার কাছে অভিযোগ করি কী আচরণ তারা করছে আপনার রাসূল (সা.) এর কন্যার সন্তানের সাথে। ”
আল্লাহর শপথ , বেশী সময় যায় নি যখন আমি দেখলাম তার (আবানি লোকটির) প্রচণ্ডতৃষ্ণা পেয়ে বসলো এবং কখনোই নিবারণ হলো না।
ক্বাসিম বিন আল আসবাগ আরও বলেন যে , আমি তার সাথে ছিলাম যে বাতাস করছিলো তাকে (আবানি লোকটিকে) এবং একটি মিষ্টি শরবত , এক জগ দুধ ও পানি রাখা ছিলো। সে বলছিলো ,“ দুর্ভোগ তোমাদের উপর। তৃষ্ণা আমাকে মেরে ফেলছে। ” এক জগ অথবা এক কাপ পানি যা তার পরিবারের তৃষ্ণা মিটাচ্ছিলো , তাকে দেয়া হলো , সে তা পান করলো ও বমি করলো। এরপর কিছু সময় ঘুমালো। এরপর আবার সে বলতে শুরু করলো ,“ দুর্ভোগ তোমাদের উপর , আমাকে পানি দাও , তৃষ্ণা আমাকে মেরে ফেলছে। ” আল্লাহর শপথ এ রকম কোন দৃশ্য এর আগে দেখা যায় নি এবং তার পেট উটের মত ফেটে গেলো।
আমরা (লেখক) বলি যে , ইবনে নিমার বর্ণনা থেকে প্রমাণিত হয় যে এই লোকটির নাম ছিলো যারাআহ বিন আবান বিন দারিম।
ক্বাসিম বিন আল আসবাগ বর্ণনা করেছেন এক ব্যক্তি থেকে যে কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.) কে দেখেছিলো , তিনি একটি খাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নদীর তীরের কাছেই , ফোরাত নদীতে যাওয়ার জন্য এবং আব্বাস ছিলেন তার সাথে। সে সময় উমর বিন সা’ আদের জন্য উবায়দুল্লাহর চিঠি এসে পৌঁছায় যাতে লেখা ছিলো ,“ হোসেইন ও তার সাথীদের জন্য পানি সরবরাহ বন্ধ করে দাও এবং তাদেরকে এক ফোটাও স্বাদ নিতে দিও না। ” উমর বিন সা’ আদ পাঁচশত লোক দিয়ে আমর বিন হাজ্জাজকে পানির কাছে পাঠালো। আব্দুল্লাহ বিন হাসীন আযদি উচ্চকণ্ঠে বললো ,“ হে হোসেইন , তুমি কি দেখছো পানি বইছে বেহেশতের মত ? আল্লাহর শপথ , তুমি এ থেকে এক ফোঁটাও পাবে না যতক্ষণ না তুমি ও তোমার সাথীরা তৃষ্ণায় ধ্বংস হয়ে যাও। ” যারা ’ আহ বিন আবান বিন দারিম বললো ,“ তার ও ফোরাত নদীর মাঝে অবস্থান নাও। ” এরপর সে একটি তীর ছোঁড়ে ইমামের দিকে যা তার থুতনিতে বিদ্ধ হয় এবং তিনি বললেন ,“ হে আল্লাহ তাকে তৃষ্ণায় মরতে দাও এবং কখনোই তাকে ক্ষমা করো না। ” ইমাম (আ.) এর জন্য এক পেয়ালা পানীয় আনা হলো কিন্তু তিনি তা পান করতে পারলেন না অনবরত রক্ত ঝরার কারণে। তিনি রক্তকে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং বললেন ,“ একইভাবে আকাশের দিকে। ”
শেইখ আব্দুস সামাদ বর্ণনা করেন আবুল ফারাজ থেকে , তিনি আব্দুর রহমান বিন জওযি থেকে যে , এর পরে আবানি ব্যক্তিটি (যারআহ) পাকস্থলি পোড়া এবং ঠাণ্ডা পিঠের রোগে আক্রান্ত হয়েছিলো এবং চিৎকার করতো।
‘ উমদাতুত তালিব ’ -এর লেখক আব্বাস (আ.) এর সন্তানদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন যে , তার (আব্বাসের) কুনিয়া ছিলো আবুল ফযল এবং উপাধি ছিলো সাক্কা (পানি বহনকারী) । তাকে এ উপাধি দেয়া হয়েছিলো কারণ তিনি তার ভাইয়ের জন্য আশুরার দিন পানি আনতে গিয়েছিলেন , কিন্তু তিনি সেখানে পৌঁছানোর আগেই শহীদ হয়ে যান। তার কবরটি (ফোরাত) নদীর তীরে তার শাহাদাতের স্থানেই আছে। সে দিন তিনি ছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর পতাকাবাহী।
আবু নসর বুখারি বর্ণনা করেছেন মুফাযযাল বিন উমার থেকে যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন ,“ আমার চাচা আব্বাস ছিলেন বুদ্ধিমান এবং তার ছিলো দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি আবু আব্দুল্লাহর (ইমাম হোসেইনের) সাথে থেকে যুদ্ধ করেছেন এবং মুসিবতের ভিতর দিয়ে গেছেন শহীদ হওয়া পর্যন্ত। বনি হানিফা তার রক্তের দায়ভার বইছে। তিনি ছিলেন চৌত্রিশ বছর বয়েসী যখন তাকে হত্যা করা হয়। তার এবং উসমান , জাফর এবং আব্দুল্লাহরও মা ছিলেন উম্মুল বানীন , যিনি ছিলেন হিযাম বিন খালিদ বিন রাবি ’ আর কন্যা। ”
এরপর তিনি আরও বলেন যে , বর্ণিত আছে যে আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) তার ভাই আক্বীলকে , যিনি ছিলেন বংশধারা বিশেষজ্ঞ এবং আরবের পরিবারগুলোকে ভালো জানতেন , একজন নারীর খোঁজ দেয়ার জন্য বললেন যে সাহসী আরব পরিবারের হবে , যেন তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন এবং তিনি বদলে তার জন্য একজন বীর সন্তান গর্ভে ধারণ করবেন। আক্বীল বললেন ,“ তাহলে উম্মুল বানীন কিলাবিয়াহকে বিয়ে করুন , কারণ তার বাবার মত কোন সাহসী বীর আরবদের মাঝে নেই। ” এভাবে তিনি তাকে বিয়ে করলেন। দশই মহররমে শিমর যিলজওশান কিলাবি এলো এবং আব্বাসকে ও তার ভাইদেরকে ডাকলো এ বলে ,“ আমার ভাগ্নেরা কাথায় ?” তারা তার কথার উত্তর দিলেন না। ইমাম হোসেইন (আ.) তার ভাইদের বললেন ,“ তাকে উত্তর দাও , যদিও সে একজন কামুক ব্যক্তি , কারণ সে তোমাদের মামাদের একজন (একই গোত্রের) । ”
তারা জিজ্ঞেস করলেন ,“ তুমি কী চাও ?” শিমর বললো ,“ আমার কাছে আসো , কারণ তোমরা নিরাপত্তার মাঝে আছো , নিজেদেরকে হত্যা করো না তোমাদের ভাইয়ের সাথে। ” এ কথা শুনে তারা তার তীব্র নিন্দা করলো এবং বললো ,“ তুমি কুৎসিত হয়ে যাও এবং যা তুমি এনেছো (নিরাপত্তার দলিল) তাও কুৎসিত হোক , আমরা কি আমাদের অভিভাবক ও সর্দারকে পরিত্যাগ করে তোমার নিরাপত্তায় প্রবেশ করবো ?” তিনি (আব্বাস) তার তিন ভাইয়ের সাথে সেদিন শহীদ হন।
শেইখ সাদুক্ব ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে ,“ আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক আব্বাসের উপর , তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন এবং কষ্ট ভোগ করেছেন। তিনি তার জীবনকে উপহার দিয়েছেন তার ভাইয়ের জন্য এবং তার দুটো হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো এবং মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন দুটো পাখার মাধ্যমে যা দিয়ে তিনি উড়েন বেহেশতে ফেরেশতাদের সাথে। যেভাবে তিনি (আল্লাহ) জাফর বিন আবি তালিব (আ.) কে উপহার দিয়েছিলেন এবং আব্বাস (আ.) এমন মর্যাদা পেয়েছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে যে কিয়ামতের দিনে সব শহীদ এর জন্য ঈর্ষান্বিত হবে। ”
আবুল ফারাজ (ইসফাহানি) বলেন যে , আব্বাস বিন আবি তালিব (আ.) এর কুনিয়্যাহ ছিলো আবুল ফযল , এবং তার মা ছিলেন উম্মুল বানীন (আ.) । তিনি ছিলেন তার বড় ছেলে। তিনি ছিলেন আপন ভাইদের মধ্যে শহীদ হওয়ার জন্য শেষ জন যেহেতু তার সন্তান ছিলো , কিন্তু তার অন্য ভাইদের কোন সন্তান ছিলো না। তিনি তাদের সবাইকে তার নিজের আগে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠান এবং সবাই শাহাদাত বরণ করেন এবং তাদের উত্তরাধিকার তার উপর বর্তায়। এরপর তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করেন এবং শহীদ হয়ে যান। উবায়দুল্লাহ (আব্বাসের সন্তান) তাদের সবার উত্তরাধিকার লাভ করেন এবং তার চাচা উমার বিন আলী এ বিষয়ে তার সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। তখন তিনি তাকে সম্পদ দানের মাধ্যমে তার সাথে সমঝোতা করেন এবং এতে তিনি রাজী হন।
জারমি বিন আবুল আলা যুবাইর থেকে বর্ণনা করেন এবং তিনি তার চাচা থেকে যে , আব্বাস (আ.) এর বংশধর তাকে সাক্কা নামে উল্লেখ করেছেন এবং তাকে কুনিয়্যাহ দিয়েছেন আবুল ক্বিরবাহ (অর্থাৎ মশকের পিতা , কারণ তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) ও তার পরিবারের জন্য পানি আনতে প্রচণ্ড সংগ্রাম করেছিলেন) । কিন্তু আমি তার কোন ছেলেকে এরকম কিছু বলতে কখনো শুনি নি।
আব্বাসের প্রশংসায় একজন বলেন ,“ এই যুবকের উপর কান্নাকাটি করা অধিকতর উপযুক্ত যার মৃত্যুতে কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.) কেঁদেছিলেন , তিনি ছিলেন তার ভাই ও তার পিতা আলীর সন্তান। আবুল ফযল রক্তে ভিজে ছিলেন এবং তার ভাইকে সাহায্য করেছিলেন , তিনি নিজে ছিলেন তৃষ্ণার্ত কিন্তু তার জন্য পানি আনতে সংগ্রাম করেছিলেন ” ।
তার বিষয়ে কুমাইত (আসাদি) বলেন ,“ আবুল ফযলের স্মরণ একটি আনন্দ ও অন্তরের রোগের শিফা , যিনি অবৈধ জন্মের লোকদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন , আর তারা যুদ্ধ করেছিলো তার বিরুদ্ধে , যিনি ছিলেন বৃষ্টির পানি যারা পান করে তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত। ”
আব্বাস (আ.) এর ছিলো সুন্দর চেহারা , তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন অনেক লম্বা যখন তিনি কোন শক্তিশালী ঘোড়ায় উঠতেন তার পা দুটো মাটি স্পর্শ করতো। আশুরার দিন তিনি ছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.) এর পতাকাবাহী।
ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে ,“ ইমাম হোসইেন (আ.) তার সৈন্যদলকে সারিবদ্ধ করলেন এবং তার পতাকা তুলে দিলেন আব্বাস (আ.) এর হাতে। ”
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) বলেন যে , যায়েদ বিন ওয়াক্বাদ জাহামি (অথবা বিন ওয়ারক্বা ’ হানাফি) এবং হাকীম বিন তুফাইল তাঈ ’ আব্বাসকে হত্যা করেছিলো।
মুয়াবিয়া বিন আম্মার থেকে বর্ণিত , যিনি বর্ণনা করেছেন ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) থেকে যে , চার জন শহীদ ভাইয়ের মা উম্মুল বানীন বাক্বীতে (মদীনার কবরস্থানে) যেতেন এবং কান্নাকাটি করতেন তার ছেলেদের জন্য হৃদয় ছেঁড়া ও দুঃখ ভরা কথার মাধ্যমে। লোকেরা জমায়েত হতো এবং তার কথাগুলো শুনতো। একদিন মারওয়ান (বিন হাকাম) আসলো এবং তার বিলাপ শুনে কাঁদতে লাগলো (যদিও সে ছিলো নিজে দয়ামায়াহীন) ।
ইবনে শাহর আশোব তার‘ মানাক্বিব ’ -এ বলেছেন যে , সাক্কা (পানি বহনকারী) , হাশেমীদের চাঁদ , হোসেইনের পতাকাবাহক এবং তার আপন ভাইদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আব্বাস পানির খোজে গেলেন। তারা তাকে আক্রমণ করলো এবং তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন ,“ আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না যখন সে আমাকে উচ্চকণ্ঠে ডাকে , অথবা যতক্ষণ না আমি পরীক্ষিত যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করি এবং মাটিতে পড়ে যাই , আমার জীবন কোরবান হোক তার উপর যিনি মুসতাফার জীবন , নিশ্চয়ই আমি আব্বাস , যে পানি আনে , আর আমি যুদ্ধের দিনে ভয় পাইনা। ”
তিনি শত্রুসৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন , কিন্তু যায়েদ বিন ওয়ারক্বা ’ জাহনি যে একটি গাছের পিছনে ওঁৎ পেতে ছিলো , সে তার ডান হাতকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো হাকীম বিন তুফাইল সমবোসির সহে যাগিতায়। এরপর তিনি তরবারি বাম হাতে নিলেন এবং যুদ্ধের কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , তোমরা আমার ডান হাত কেটে ফেলেছো , আমি আমার ধর্মকে প্রতিরক্ষা করতেই থাকবো যেমন করবে আমার সত্যবাদী ইমাম , পবিত্র ও বিশ্বস্ত নবীর সন্তান। ”
তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন এবং ক্লান্তহয়ে পড়লেন এবং হাকীম বিন তুফাইল তাঈ একটি গাছের পিছনে লুকিয়ে ছিলো , সে তার বাম হাতে আঘাত করলো ও তা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। আব্বাস বললেন ,“ হে আমার সত্তা , কাফেরদের ভয় পেয়ো না , সর্ব ক্ষমতাবান আল্লাহর রহমতের ও ক্ষমতাপ্রাপ্তদের অভিভাবক রাসূলের সুসংবাদ তোমার কাছে আসুক , তারা আমার বাম হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে অন্যায়ভাবে , হে আল্লাহ তাদেরকে (জাহান্নামের) আগুনে পোড়ান। ”
অভিশপ্ত ব্যক্তি তাকে হত্যা করলো লোহার বর্শা দিয়ে। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে দেখতে পেলেন ফোরাত নদীর তীরের কাছে , তিনি কাঁদলেন এবং বললেন ,“ তোমরা তোমাদের কাজের মাধ্যমে অবিচার করেছো হে অভিশপ্ত জাতি এবং রাসূল (সা.) এর কথার বিরোধিতা করেছো , শ্রেষ্ঠ নবী কি আমাদেরকে তোমাদের কাছে আমানত রেখে যান নি , আমরা কি সৎকর্মশীল নবীর বংশধর নই , তোমাদের মধ্য থেকে যাহরা (আ.) কি আমার মা নন , আহমাদ (সা.) সৃষ্টির মধ্যে কি শ্রেষ্ঠ নন , অভিশাপ তোমাদের উপর পড়েছে এবং তোমরা যা করেছো তার জন্য অপমানিত হবে এবং খুব শীঘ্রই তোমরা চরম আগুনের মুখোমুখি হবে (জাহান্নামে)” ।
আমরা বলি , যদি কেউ চায় ভাই , পরিবার এবং সাথীদের মৃত্যুতে ইমাম হোসেইন (আ.) এর অবস্থা বুঝতে তার উচিত ইমাম আলী (আ.) এর অবস্থার উপর ভাবা যখন তার সম্মানিত সাথীগণ এবং বন্ধুগণ (সিফফীনের যুদ্ধে) মৃত্যুবরণ করেন , যেমন আম্মার বিন ইয়াসির , মালিক আশতার , মুহাম্মাদ বিন আবু বকর , আবুল হাইসাম বিন তীহান , খুযাইমাহ বিন সাবীত এবং অন্যরা। বর্ণিত আছে যে , এক শুক্রবার , তার শাহাদাতের আগে , ইমাম আলী (আ.) একটি খোতবা দেন , যার মাধ্যমে তিনি তাদের স্মরণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন ,“ কোথায় আমার ভাইয়েরা যারা সোজা রাস্তায় ছিলো এবং কোথায় তারা চলে গেছে যারা সত্যকে ভালোবাসতো ? কোথায় আম্মার ? কোথায় ইবনে তীহান ? কোথায় যুশ শাহাদাতাইন (খুযাইমাহ বিন সা’ বীত) ? এবং অন্যরা কোথায় , যারা ছিলো তাদের মত যারা নিজেদের মধ্যে মৃত্যুবরণ করার জন্য প্রতিজ্ঞা করেছিলো এবং তাদের মাথাগুলো পাঠানো হয়েছিলো বদমাশ লোকের কাছে ?” এরপর তিনি হাতে তার পবিত্র দাড়ি ধরলেন এবং খুব কাঁদলেন , এরপর বললেন ,“ আফসোস ভাইদের জন্য যারা কোরআন তেলাওয়াত করতো এবং দৃঢ় ছিলো , যারা তাদের দায়িত্ব জানতো এবং সেগুলো পরিপূর্ণ করতো , তারা সুন্নাহগুলোকে জীবিত করতো এবং বিদ ’ আতকে পদদলিত করতো। তাদেরকে সংগ্রাম করার জন্য আহ্বান করা হয়েছিলো এবং তারা এর দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছিলো। ”
বর্ণিত আছে , যখন আম্মার বিন ইয়াসির সিফফীনে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) এর এক দল সাথীর সাথে শহীদ হয়েছিলেন এবং যখন রাত নেমে এলো ইমাম আলী (আ.) শহীদদের মধ্যে হেঁটে বেড়াতে লাগলেন। যখন তিনি দেখলেন আম্মার মাটিতে পড়ে আছেন , তিনি তার মাথাটি তুলে নিজের উরুর উপর রাখলেন এবং কাঁদলেন। এরপর বললেন ,“ হে মৃত্যু , কোন সময় পর্যন্ততুমি আমার কাছ থেকে দূরে থাকবে যখনমিতআমার বেন্ধদর মাঝ থেকে কাউকে অব্যহতি দাও নি , আমি দেখছিমিততাদের বেছে নিচ্ছো যাদের আমি ভালোবাসি , মনে হয় যেন তুমি তাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছো প্রমাণ সহকারে। ”
ইমাম আলী (আ.) এর পূর্ণ কাব্যকর্মের প্রথম দুই লাইন হচ্ছে ,“ হে মৃত্যু , যে আমাকে রেহাই দেবে না। আমাকে মুক্তি দাও কারণ তুমি আমার সব বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছো। ”
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ রয়েছে যে , হযরত আব্বাস (আ.) নিজেকে একা দেখতে পেয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে এলেন এবং বললেন ,“ আপনি কি আমাকে অনুমতি দিচ্ছেন ?” ইমাম খুব কাঁদলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় ভাই , তুমি আমার পতাকাবাহক। তুমি যদি চলে যাও আমার সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। ” আব্বাস বললেন ,“ আমার হৃদয় সংকুচিত হয়ে আসছে এবং আমি জীবন থেকে তৃপ্ত হয়েছি এবং আমি আমার ভাইদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চাই এ মুনাফিক্বদের উপর। ” ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ তাহলে পানি আনো এ বাচ্চাদের জন্য। ” আব্বাস এগোলেন এবং উপদেশ দিলেন এবং সতর্ক করলেন (সা’ আদের) সেনাবাহিনীকে , কিন্তু তাতে কোন ফল হলো না , এরপর তিনি ইমামের কাছে ফেরত এলেন এবং তাকে জানালেন। তিনি বাচ্চাদের কান্না শুনতে পেলেন ,“ আহ , পিপাসা। ” তিনি একটি মশক নিলেন এবং তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং ফোরাত নদীর দিকে গেলেন। চার হাজার ব্যক্তি , যারা ফোরাত নদী পাহাড়া দিচ্ছিলো তাকে সব দিক থেকে ঘেরাও করলো এবং তার দিকে তীর ছুঁড়লো। তিনি তাদের আক্রমণ করলেন এবং আশি জন ব্যক্তিকে হত্যা করলেন এবং তাদের দুভাগ করে ফেললেন , এরপর ফোরাত নদীতে প্রবেশ করলেন। তিনি পানি পান করার চেষ্টা করলেন কিন্তু হঠাৎ তার মনে হলো ইমাম ও তার পরিবারের পিপাসার কথা। তখন তিনি পানি ফেলে দিলেন এবং মশকটি ভরে নিলেন। তিনি মশকটি তার ডান কাঁধে ঝুলিয়ে তাঁবুর দিকে ফিরে চললেন। তারা তার পথ বন্ধ করে দিলো এবং সব দিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো। তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করলেন যতক্ষণ না নওফেল তার তরবারি দিয়ে তার ডান হাত কেটে ফেললো। তখন তিনি মশকটি তার বাম কাঁধে নিলেন। নওফেল তখন তার বাম হাত কব্জি থেকে কেটে ফেললো এবং তিনি মশকটি দাঁতে ধরে রাখলেন। তখন একটি তীর এসে মশকটিতে বিদ্ধ হলো এবং পানি পড়ে গেলো। আরেকটি তীর তার হৃৎপিণ্ডেবিদ্ধ হলো এবং তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন এবং উচ্চকণ্ঠে ডাক দিলেন ,“ হে আমার অভিভাবক , আমার কাছে আসুন। ” যখন ইমাম তার মাথার কাছে এলেন তিনি তাকে রক্তে ও বালিতে মাখামাখি দেখলেন এবং কাঁদতে লাগলেন।
তার শাহাদাতের বিষয়ে তুফাইল বলেন যে , এক ব্যক্তি তাকে আক্রমণ করে এবং তার মাথায় আঘাত করে একটি লোহার রড দিয়ে যাতে তার মাথা ফেটে যায় এবং তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন এবং চিৎকার করে বললেন ,“ হে আবা আবদিল্লাহ আমার সালাম আপনার উপর। ”
ইবনে নিমা বলেন যে , হাকীম বিন তুফাইল আব্বাসের জামা খুলে নেয় এবং তার দিকে একটি তীর ছুঁড়ে।
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আছে , যখন আব্বাস (আ.) শহীদ হয়ে গেলেন ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ এখন আমার পিঠ বাঁকা হয়ে গেলো এবং আমার গতি কমে গেলো। ”
আমি (লেখক) বলি যে , ইমাম হোসেইন (আ.) কে হযরত আব্বাস (আ.) এর সাহায্য করা আমাকে মনে করিয়ে দেয় তার (আব্বাসের) পিতা আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আ.) এর কথা যিনি তার চাচাতো ভাই রাসূল (সা.) কে সাহায্য করেছিলেন। তাই আমি তা বইটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য উল্লেখকরবো।
জাহিয তার কিতাব‘ উসমানিয়া ’ -তে ইবনে আবীল হাদীদ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে , আবু বকর হিযরতের আগে মক্কায় কঠিন কষ্টের ভিতর ছিলেন। কিন্তু আলী বিন আবি তালিব (আ.) ছিলেন নিরাপদ। না কেউ তার পিছনে লেগে ছিলো , না তিনি কারো পিছে লেগেছিলেন। এর প্রতিবাদ করে আবু জাফর ইসকাফি বলেন যে , আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে একটি হাদীস উল্লেখ করেছি যে , ইমাম আলী (আ.) ইসলাম গ্রহণ করেন যখন তিনি ছিলেন একজন কিশোর এবং সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন। তিনি কুরাইশ মুশরিকদের তিরস্কার করতেন তার জিভ ও হৃদয় দিয়ে এবং তাদের জন্য তিনি ছিলেন এক বোঝা এবং তিনি উপত্যকায় (অবরোধের সময় নবীর সাথে) বন্দী ছিলেন , কিন্তু আবু বকর ছিলেন না। তিনি অবরোধের অন্ধকার ও সংকীর্ণ পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিশ্বস্তসাথী ছিলেন এবং অত্যাচারের তিক্ত পেয়ালা পান করেছিলেন আবু লাহাব , আবু জাহল এবং অন্যান্যদের হাতে এবং বন্দীত্বের আগুনে পুড়েছিলেন। তিনি নবীর সাথে থেকে দুঃখ-কষ্ট বয়েছিলেন এবং বিরাট কষ্টের বোঝা নিজ কাঁধে বয়েছিলেন এবং বিপদজনক কাজগুলো পালন করতেন। তিনিই ছিলেন সে ব্যক্তি যিনি রাতে চুরি করে উপত্যকা থেকে বেরিয়ে কুরাইশদের সম্মানিত ব্যক্তি যেমন তময়েম বিন আদি এবং অন্যান্যদের সাথে দেখা করতেন আবু তালিব (আ.) এর আদেশে এবং খাদ্যসামগ্রীর বোঝা হাজার ভয় ও কাপুনির মাঝে বহন করে নিয়ে আসতেন বনি হাশিমের জন্য। যদি আবু জাহলের মত শত্রুরা তাকে দেখতে পেতো তাহলে তারা তার রক্ত ঝরাতো। নিশ্চয়ই আলী (আ.) ই ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি এ ধরনের কাজ করতেন অবরোধের দিনগুলোতে (তা কি আবু বকর ছিলেন ?)।
ইমাম আলী (আ.) তার বিখ্যাত খোতবায় সে সময়ে তার অবস্থা বর্ণনা করে বলেছেন , “ তারা একত্রে শপথ করলো যে , তারা আমাদের সাথে লেনদেন করবেনা এবং বিবাহ সম্পর্ক করবে না। তারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগুন জ্বালালো এবং তারা আমাদের পুরো বনি হাশিমকে কষ্টের পাহাড়ে ঠেলে দিলো। আমাদের মাঝে যারা বিশ্বাসী ছিলো তারা পুরস্কারের আশা করলো (আমাদের সাহায্য করার বিনিময়ে) এবং অবিশ্বাসীরা তাদের পরিবারকে সাহায্য করছিলো। কুরাইশদের সবগুলো গোত্র একত্র হলো তাদের বিরোধিতা করতে এবং তাদের খাদ্যসামগ্রী আটকে দিয়েছিলো। তারা সকাল সন্ধ্যা অপেক্ষা করতো অনাহারে তাদের মৃত্যুর জন্য এবং কোন পথ ছিলো না সমঝোতার ও উন্নতির। তাদের মনোবল বিদায় নিলো এবং তাদের আশা মরে গেলো। ”
আবু জাফর ইসকাফি বলেন যে , কোন সন্দেহ নেই যে আবু উসমান জাহিয মিথ্যার প্রভাবে পথ হারিয়েছে এবং ভুল ও বিশ্বাসঘাতকতার পথ অতিক্রম করেছে। শেষ পর্যন্তসে ছিলো বিভ্রান্ত এবং কিছুই বুঝে নি এবং বলেছে যা সে বলছে। সে ধারণা করেছে যে , ইমাম আলী (আ.) হিজরতের আগে কোন কষ্ট করেন নি এবং শুধু হিজরতের পর বদরের (যুদ্ধের) দিন থেকে তিনি দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত হন।
হযরত আব্বাসের বীরত্বের বিবরণ
উল্লেখ করা প্রয়োজন বীরত্ব হচ্ছে একটি আত্মিক গুণ যা শুধু বুদ্ধি দ্বারা অনুভব করা যায় কিন্তু পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বোঝা যায় না। এটিকে সরাসরি বুঝা যায় না , শুধু এর প্রভাব দেখা যায়। যদি কোন ব্যক্তি জানতে চায় যাইদ কোন সাহসী মানুষ কিনা তাহলে তাকে দেখতে হবে সে সময়ে যখন সব সাহসীরা তাকে ঘেরাও করে ফেলবে এবং মৃত্যু তার সময়কে সংক্ষিপ্ত করে দিবে এবং যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে সে পড়ে যাবে। যদি সে অস্থির হয়ে যায় , ভীত হয়ে কাঁপে এবং পালিয়ে নিষ্কতি পায় এবং নিজের উপর অপমান ও নীচতার বোঝা তুলে নেয় এবং পলাতকের অপমানকর বর্ম পরিধান করে তরবারির দিকে লেজমুখি হয়ে , তাহলে জেনে রাখুন যে , সে বীরত্ব থেকে বহু দূরে। কিন্তু যদি সে তৎক্ষনাৎ আক্রমণ করে এবং তার তরবারির (আঘাতের) কণ্ঠকে সুন্দর বাঁশীর আওয়াজ মনে করে এবং সে যুদ্ধের সারিতে দ্রুত ঢুকে পড়ে যেন সে আনন্দে অগ্রসর হচ্ছে এবং ভয়ের ঢেউয়ের ভেতরে শান্ত হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং তরবারির আঘাত বরণ করাকে প্রশান্তি মনে করে এবং বর্শার আঘাতকে লাভজনক সুসংবাদ মনে করে , তার ঘাড় দিয়ে তরবারিকে স্বাগত জানায় যেন তা সুগন্ধি কাঠ , তরবারির আঘাতের আওয়াজ তার কাছে নারী কণ্ঠের গান মনে হয় যারা তার জন্য গাইছে - তাহলে জেনে রাখুন সে সাহসের লাগাম ধরে আছে হাতে এবং সে সাহসীর পোষাক পড়ে আছে যা আল্লাহর পছন্দ। আমরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের ও পরিবারের যুদ্ধ সম্পর্কে যা বলেছি তাতে পাঠক বুঝতে পারছেন তাদের সবাই ছিলেন সাহসিকতার চূড়ান্তস্তরে ও গতির অতি উচ্চ মাক্বামে এবং শুধু আব্বাস (আ.) যিনি তাদের মাঝে ছিলেন অতি উচ্চতায় অবস্থানকারী এবং তার মাঝে ছিলো এগুলোর সিংহভাগ এবং বাকী সবাই ছিলেন তার তুলনায় তার ফসল সংগ্রহকারী। তার ছিলো দৃঢ় বিশ্বাস , গভীর দূরদৃষ্টি এবং আল্লাহর কাছে ছিলেন এমন স্থানে আসীন যে কিয়ামতের দিন সকল শহীদ তার বিষয়ে ঈর্ষান্বিত হবেন। আর তা কেন-ই বা হবে না যেহেতু তার বাবা ছিলেন আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) ।
মাসউদী তার‘ মুরুজুয যাহাব ’ গ্রন্থে জামালের যুদ্ধ সম্পর্কে বলেন যে , শত্রুরা ইমাম আলী (আ.) এর ডান দিক ও বাম দিকে আক্রমণ করলো এবং তাদেরকে পিছনে হটিয়ে দিল। আক্বীলের একজন সন্তান ইমাম আলী (আ.) এর কাছে এলেন। তিনি ঘোড়ার জিনের কাভারের উপর মাথা রেখে তন্দ্রা গিয়েছিলেন। তিনি বললেন ,“ হে প্রিয় চাচাজান , আপনি আমাদের ডান ও বাম দিকের সারি কোথায় আছে দেখেছেন এবং আপনি ঘুমাচ্ছেন ?” ইমাম আলী (আ.) বললেন , “ হে ভাতিজা , চুপ থাকো , তোমার চাচার (মৃত্যুর) একটি নির্দিষ্ট দিন আছে যা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আল্লাহর শপথ , তোমার চাচা ভয় পায় না যে সে নিজে মৃত্যুর দিকে দ্রুত এগিয়ে যাক অথবা মৃত্যু তার দিকে দ্রুত আসুক। ”
এরপর তিনি তার সন্তান মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়াকে আদেশ করলেন , যিনি ছিলেন যুদ্ধে তার পতাকাবাহক , বসরার বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য। মুহাম্মাদ কিছু ঢিলেমি দেখালেন কারণ তিনি একদল তীরন্দাজের মুখোমুখি ছিলেন। তিনি অপেক্ষা করলেন তাদের তীর শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য। ইমাম আলী (আ.) তার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ কেন তুমি আক্রমণ করলে না ?” তিনি বললেন ,“ কোন পথ ছিলো না তীর ও বর্শার মুখোমুখি হওয়া ছাড়া , তখন আমি অপেক্ষা করলাম তাদের তীর খরচ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যেন এরপর আমি তাদেরকে আক্রমণ করতে পারি। ” ইমাম বললেন ,“ এখন তীরের ভিতর দিয়ে আগাও কারণ মৃত্যু তোমার বর্ম ।”
এ কথা শুনে মুহাম্মাদ আক্রমণ করলেন এবং বর্শা ও ধাবমান তীরের মাঝে পড়লেন। ইমাম আলী (আ.) তার কাছে এলেন এবং তাকে তরবারির হাতল দিয়ে আঘাত করে বললেন ,“ তোমার মায়ের রক্ত তোমাকে বাধা দিয়েছে। ” এরপর তিনি তার কাছ থেকে পতাকা নিয়ে নেন এবং আক্রমণ করেন এবং অন্যরা তার সাথে আক্রমণ করেন এবং বসরার বাহিনী ছাইয়ের মত বাতাসে উড়ে যাওয়ার মত উড়ে গেলো।
ওপরে উল্লেখিত মুহাম্মাদ বিন হানাফিয়া আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) এর সন্তান। যুহরি বলেন যে , তিনি ছিলেন মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান ও বীর। অন্য দিকে জাহিয তার সম্পর্কে বলেন যে , সবাই ঐক্যমত পোষণ করে যে , তিনি ছিলেন অতুলনীয় এবং তার বয়সে সত্যিকার পুরুষ। তিনি পূর্ণতা ও গুণে সকলকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন এবং তার বীরত্ব ছিলো প্রমাণিত যা ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন সিফফীনের যুদ্ধের সময়ে এবং এটি প্রমাণ হিসাবে যথেষ্ট যে তিনি ছিলেন ইমাম আলী (আ.) এর পতাকা বাহক। এরপরও তিনি তীরন্দাজদের সামনে (উল্লেখিত ঘটনায়) স্লথ ছিলেন যেন তারা তাদের তীরগুলো খরচ করে ফেলে। কিন্তু আমার মা বাবা আব্বাস (আ.) এর জন্য কোরবান হোক , যিনি ছিলেন তার ভাই ইমাম হোসেইন (আ.) এর পতাকাবাহক , তার বাহিনীর অধিনায়ক , যিনি অগ্রসর হয়েছিলেন চার হাজার সৈন্যের সারির ভিতরে যাদেরকে ফোরাত নদী পাহারা দেওয়ার জন্য মোতায়েন করা হয়েছিলো এবং তিনি তাদের তীরন্দাজদের বিরুদ্ধে পাহাড়ের মত দৃঢ় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি একটুও কাঁপেন নি , না কোন ভয় করেছেন। বরং বলেছেন ,“ আমি মৃত্যুকে ভয় করি না যদি তা আমার উপর আসেও। ”
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে , তিনি (হযরত আব্বাস) ইমাম হোসেইন (আ.) এর কিছু সাথীকে উদ্ধার করেছিলেন যারা চার দিক থেকে শত্রু সৈন্যদের মাধ্যমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। আর জেনে রাখুন তিনি নিজেকে তার ভাই ইমাম হোসেইন (আ.) এর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন (আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হোক , হে আবাল ফযল) ।
পরিচ্ছেদ - ২১
আমাদের অভিভাবক ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাত এবং দুধের শিশুর এবং আব্দুল্লাহ বিন হাসান (আ.) এর শাহাদাত
এ অধ্যায়টি অশ্রুপ্রবাহিত করে এবং বিশ্বাসীদের হৃদয়কে এবং কলিজাকে পুড়ে ফেলে , (অত্যাচারের বিরুদ্ধে) অভিযোগ আল্লাহর কাছে এবং শুধু তারই সাহায্য প্রার্থনা করা হয়।
শাহাদাতের কিছু কিছু বইয়ে বর্ণিত আছে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) দেখলেন তার বন্ধু ও আত্মীয়দের মধ্যে বাহাত্তরজন শহীদ হয়ে গেছেন তখন তিনি তার পরিবারের তাঁবুর দিকে ফিরে উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ হে সাকিনা , হে ফাতিমা , হে উম্মে কুলসুম , আমার সালাম সবার ওপরে। ” তা শুনে সাকিনা বললেন ,“ কিভাবে সে ব্যক্তি মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে না পারে যার বন্ধুরা ও সাহায্যকারীরা ইতোমধ্যে শাহাদাত বরণ করেছে। ” সাকিনা বললেন ,“ আব্বাজান , তাহলে আমাদেরকে দাদার আশ্রয়ে ফেরত নিয়ে আসুন। ” ইমাম বললেন ,“ হায় , যদি মরুভূমির পাখিকে রাতে মুক্ত করে দেয়া হয় সে শান্তিতে ঘুমাবে। ” তা শুনে তার পরিবারের নারী সদস্যরা কাঁদতে শুরু করলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তাদেরকে সান্ত্বনা দিলেন।
বর্ণিত আছে (একই বইতে) যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তখন উম্মে কুলসুম (আ.) এর দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ আমি তোমাকে তোমার বিষয়ে কল্যাণের আদেশ দেই। আমি রওনা করছি যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এ শত্রুদের মাঝে। ”
তা শুনে সাকিনা কাঁদতে লাগলেন। ইমাম তাকে খুব বেশী ভালোবাসতেন। তিনি তাকে তার বুকের সাথে চেপে ধরলেন এবং তার অশ্রুমুছে দিয়ে বললেন ,“ জেনে রাখো আমার প্রিয় সাকিনা , খুব শীঘ্রই তুমি আমার জন্যে আমার পরে কাঁদবে , যখন মৃত্যু আমাকে ঘেরাও করে ফেলবে। তাই এখন তোমার অশ্রুদিয়ে আমার বুককে ভারী করে দিও না যতক্ষণ আমার দেহতে রুহ আছে। যখন আমি শহীদ হয়ে যাবো তখন তুমি আমার জন্য কান্নাকাটি করার জন্য অধিকতর যোগ্য , হে নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ”
ইমাম বাক্বির (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে ,“ যখন ইমাম হোসেইন (আ.) সিদ্ধান্ত নিলেন শহীদ হবেন তিনি তার সবচেয়ে বড় কন্যা ফাতিমা (আ.) কে ডাকলেন। তিনি তাকে একটি মুখবন্ধ খাম দিলেন এবং একটি খোলা অসিয়ত দিলেন। ইমাম আলী বিন হোসেইন (যায়নুল আবেদীন) (আ.) সে সময় অসুস্থ ছিলেন , পরে ফাতিমা চিঠিটি ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) কে দিয়েছিলেন এবং তার কাছ থেকে তা আমাদের কাছে এসেছে। ”
মাসউদীর‘ ইসবাত আল ওয়াসিয়া ’ -তে বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) কে অসুস্থ অবস্থাতে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে (আল্লাহর) সম্মানিত নামগুলো এবং নবীদের নিদর্শনগুলো দিলেন। তিনি তাকে বললেন যে , তিনি (ঐশী) প্রজ্ঞা ,নথিপত্র , বইগুলো এবং অস্ত্রশস্ত্র উম্মু সালামা (আ.) এর কাছে দিয়েছেন এবং তাকে পরামর্শ দিয়েছেন তা তার কাছে হস্তান্তর করার জন্য।
একই বইতে বর্ণিত আছে যে , ইমাম জাওয়াদ (আ.) এর কন্যা এবং ইমাম হাদী (আ.) এর বোন খাদিজা বলেছেন যে , যতটুকু জানা যায় ইমাম হোসেইন (আ.) তার বোন সাইয়েদা যায়নাব (আ.) কে অসিয়ত করে যান এবং ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) এর ইমামতের দিনগুলোতে মুহাম্মাদ (সা.) এর পরিবারের জ্ঞান তার (যায়নাব) মাধ্যমে ছড়িয়ে যায় , যেন ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) কে শত্রুদের কাছ থেকে গোপন রাখা যায় তার জীবন রক্ষার জন্য।
কুতুবুদ্দীন রাওয়ানদি তার‘ দাওয়াত ’ -এ বর্ণনা করেছেন ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) থেকে যে , দশই মহররম আমার বাবা আমাকে তার বুকের সাথে চেপে ধরেন যখন তার শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো এবং তিনি বললেন , হে প্রিয় সন্তান , এ দোআ মনে রাখো যা সাইয়েদা ফাতিমা (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে এবং তিনি জিবরাঈল থেকে পেয়েছেন এবং যা আমার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কারণ এটি সব আশা পূর্ণ হওয়ার জন্য , গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে , দুশ্চিন্তায় , কঠিন পরিস্থিতিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে উপকারী। দোআটি এমন:
بِحَقِّ يس وَالْقُرْآنِ الْحَكيمِ وَ بِحَقِّ طه وَ الْقُرْآنِ الْعَظيمِ يا مَنْ يَقْدِرُ عَلى حَوآئِجِ السّآئِلينَ يا مَنْ يَعْلَمُ ما فِى الضَّميرِ يا مُنَفِّساً عَنِ الْمَكْرُوبينَ يا مُفَرِّجاً عَنِ الْمَغْمُومينَ يا راحِمَ الشَّيْخِ الْكَبيرِ يا رازِقَ الطِّفْلِ الصَّغيرِ يا مَنْ لايَحْتاجُ اِلَى التَّفْسيرِ صَلِّ عَلى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ وَافْعَلْ بى كَذا و كَذا
আমরা (লেখক) বলি , ইমাম হোসেইন (আ.) এর অন্য একটি দোআ দশই মহররমের সকালে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তৃতীয় আরেকটি তার কাছ থেকে পাওয়া গেছে একই দিন , যা শেইখুত তাইফা (তূসী) শা ’ বানের তৃতীয় দিনের দোআয় উল্লেখ করেছেন যেখানে তিনি বলেছেন , এরপর ইমাম হোসেইন (আ.) এর দোআটি পড়ো কাউসারের দিনে (আশুরার দিনে) ।
কাফ ’ আমি বর্ণনা করেছেন যে আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন (আ.) এর শেষ দোআ ছিলো (শেষ পর্যন্ত) ।
যে শিশুটি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসেছিলো এবং শহীদ হয়েছিলো তা উল্লেখ করার পর ‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আছে , ইমাম হোসেইন (আ.) ডান দিকে ফিরলেন এবং কাউকে দেখলেন না , এরপর তিনি বাম দিকে ফিরলেন এবং কাউকে দেখলেন না। ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) বেরিয়ে এলেন যার একটি তরবারি তোলার ক্ষমতা ছিলো না (অসুস্থতার কারণে) । উম্মে কুলসুম (আ.) (যায়নাব (আ.) এর বোন) তার অনুসরণ করলেন এবং ডাক দিলেন ,“ হে প্রিয় সন্তান , ফিরে আসো। ” তিনি বললেন ,“ প্রিয় ফুপু , আমাকে ছেড়ে দিন যেন আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সন্তানের জন্য জিহাদ করতে পারি। ” ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে দেখলেন এবং বললেন , “ হে উম্মে কুলসুম , তাকে থামাও , পাছে এ পৃথিবী থেকে মুহাম্মাদ (সা.) এর বংশ লোপ পেয়ে যায়। ”
দুধের শিশু আব্দুল্লাহ (আলী আল আসগার)-এর শাহাদাত
তার মা ছিলেন রাবাব , যিনি ছিলেন ইমরুল ক্বায়েস বিন আদির কন্যা এবং তার মা ছিলেন হিন্দ আল হানূদ। সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) তার যুবকদের ও বন্ধুদের লাশ দেখতে পেলেন তিনি শহীদ হওয়ার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ কেউ কি আছে আল্লাহর রাসূলের পরিবারকে রক্ষা করবে ? তওহীদবাদী কেউ কি আছে যে আল্লাহকে ভয় করবে আমাদের বিষয়ে ? কোন সাহায্যকারী কি আছে যে আল্লাহর জন্য আমাদেরকে সাহায্য করতে আসবে ? কেউ কি আছে যে আমাদের সাহায্যে দ্রুত আসবে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারের বিনিময়ে ?”
নারীদের কান্নার আওয়াজ উঁচু হলো এবং ইমাম তাঁবুর দরজায় এলেন এবং যায়নাব (আ.) কে ডাকলেন ,“ আমাকে আমার দুধের শিশুটিকে দাও যেন বিদায় নিতে পারি। ” এরপর তিনি তাকে দুহাতে নিলেন এবং উপুড় হলেন তার ঠোঁটে চুমু দেয়ার জন্য। হুরমালা বিন কাহিল আসাদি শিশুটির দিকে একটি তীর ছুঁড়লো , যা তার গলা ভেদ করে তার মাথা আলাদা করে ফেললো (আল্লাহর রহমত ও রবকত তার উপর বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক তার হত্যাকারীর উপর) । এক কবি এ বিষয়ে বলেছেন ,“ এবং সে ব্যক্তি যে নিচু হয়েছিলো তার বাচ্চাকে চুমু দেয়ার জন্য কিন্তু তার আগেই তীর তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় তার গলায় চুমু দেয়ার জন্য। ”
এরপর তিনি সাইয়েদা যায়নাব (আ.) কে উচ্চ কণ্ঠে ডাকলেন তাকে ফেরত নেয়ার জন্য। তিনি শিশুর রক্ত তার হাতের তালুতে নিলেন এবং আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন ,“ প্রত্যেক কষ্টই আমার জন্য সহজ যখন আল্লাহ তা দেখছেন। ”
দুধের শিশুটি সম্পর্কে শেইখ মুফীদ বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তাঁবুর সামনে বসলেন এবং শিশু আব্দুল্লাহকে তার কাছে আনা হলো। বনি আসাদের এক লোক তাকে হত্যা করলো তীর ছুঁড়ে।
আযদি বলেন যে , আক্বাবাহ বিন বাশীর আসাদি ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি আমাকে বলেছেন ,“ হে বনি আসাদ , আমাদের রক্তের একটি দায় ভার তোমাদের উপর আছে। ” আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে আবা জাফর , কোন গুনাহতে আমার অংশ রয়েছে ? এবং কোন সেই রক্ত ?”
ইমাম বললেন ,“ একটি শিশুকে আনা হয়েছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে যিনি তাকে তার কোলে ধরলেন , তোমাদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি , বনি আসাদের , তার দিকে একটি তীর ছোঁড়ে এবং তার মাথা আলাদা করে ফেলে। ইমাম তার রক্ত জমা করলেন এবং যখন তার দুহাতের তালু রক্তে পূর্ণ হলো তিনি তা যমীনে ছিটিয়ে দিলেন এবং বললেন: সর্বশক্তিমান আল্লাহ , যদি আপনি আকাশ থেকে সাহায্য বন্ধ করে দিয়ে থাকেন তাহলে আমাদের উপর তা দান করুন যা এর চেয়ে ভালো এবং এই দুষ্কৃতিকারীদের উপর আমাদের হয়ে প্রতিশোধ নিন ।”
সিবতে ইবনে জওযি তার‘ তাযকিরাহ ’ -তে বর্ণনা করেছেন হিশাম বিন মুহাম্মাদ ক্বালবি থেকে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) দেখলেন তারা তাকে হত্যা করবেই , তিনি কোরআন আনলেন এবং তা খুলে মাথার উপর রাখলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ আল কোরআন এবং আমার নানা , আল্লাহর রাসূল (সা.) হলেন আমার ও তোমাদের মধ্যে বিচারক। হে জনতা , কিভাবে তোমরা আমার রক্ত ঝরানোকে বৈধ মনে করছো ? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি নই ? আমার নানা থেকে কি হাদীস পৌঁছায়নি তোমাদের কাছে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে যে আমরা জান্নাতের যুবকদের সর্দার ? তাহলে জিজ্ঞেস করো জাবির (বিন আব্দুল্লাহ আনসারি)-কে , যায়েদ বিন আরকামকে এবং আবু সাঈদ খুদরীকে , জাফর তাইয়ার কি আমার চাচা নন ?”
শিমর উত্তর দিলো ,“ খুব শীঘ্রই তুমি জ্বলন্ত আগুনের (জাহান্নামের) দিকে দ্রুত যাবে। ” (আউযুবিল্লাহ) । ইমাম বললেন ,“ আল্লাহু আকবার , আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি দেখেছেন একটি কুকুর তার গলা পূর্ণ করছে তার আহলুল বাইত (আ.) এর রক্ত দিয়ে এবং আমি বুঝতে পারছি সেটি তুমি ছাড়া কেউ নয়। ”
শিমর বললো ,“ আমি শুধু জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করবো , যদি আমি বুঝি তুমি কী বলছো। ” ইমাম হোসেইন (আ.) ফিরে দেখলেন তার শিশুপুত্র পিপাসায় কাঁদছে। তিনি তাকে কোলে নিলেন এবং বললেন ,“ হে জনতা , যদি তোমরা আমার প্রতি দয়া না দেখাও , কমপক্ষে এ বাচ্চার উপর দয়া করো। ” এক ব্যক্তি একটি তীর ছুঁড়লো যা তার গলা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। ইমাম কেঁদে বললেন ,“ হে আল্লাহ , আপনি বিচারক হোন আমাদের মাঝে ও তাদের মাঝে , যারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলো সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং এর বদলে আমাদের হত্যা করেছে। ” একটি কণ্ঠ আকাশ থেকে ভেসে এলো ,“ তাকে ছেড়ে দাও হে হোসেইন , কারণ এক সেবিকা তাকে শুশ্রূষা করার জন্য বেহেশতে অপেক্ষা করছে। ” এরপর হাসীন বিন তামীম একটি তীর ছোঁড়ে তার ঠোঁটের দিকে এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে।
ইমাম কাঁদলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমি তোমার কাছে অভিযোগ করি , তারা যেভাবে আমার সাথে , আমার ভাই , আমার সন্তানদের এবং আমার পরিবারের সাথে আচরণ করেছে। ”
ইবনে নিমা বলেন যে , তিনি বাচ্চাটিকে তুললেন এবং তার পরিবারের শহীদদের সাথে রাখলেন।
মুহাম্মাদ বিন তালহা তার গ্রন্থ‘ মাতালিবুস সা’ উল ’ -এ‘ ফুতূহ ’ নামের গ্রন্থ থেকে উল্লেখ করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর একটি শিশু পুত্র ছিলো , তার দিকে একটি তীর ছোঁড়া হয় যা তাকে হত্যা করে এবং এরপর ইমাম তার তরবারি দিয়ে একটি কবর খোরেন তার জন্য এবং তার জন্য দোআ করে তাকে দাফন করেন।
‘ ইহতিজাজ ’ -এ উল্লেখ আছে যে যখন ইমাম হোসেইন (আ.) একা হয়ে গেলেন এবং তার সাথে তার সন্তান আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) এবং দুধের শিশু আব্দুল্লাহ ছাড়া কেউ ছিলো না , তিনি বাচ্চাটিকে তুলে ধরলেন বিদায় জানানোর জন্য , তখন একটি তীর এলো এবং তার গলা ভেদ করে তাকে হত্যা করলো। ইমাম ঘোড়া থেকে নামলেন এবং তার তরবারির খাপ দিয়ে একটি কবর খুঁড়লেন এবং এরপর রক্তে ভেজা বাচ্চাকে বালির নিচে দাফন করলেন। এরপর তিনি তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং শোকগাঁথা আবৃত্তি করলেন। শাহাদাতের লেখকরা এবং ইহতিজাজের লেখকও বলেন যে , ইমাম এরপর তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং যুদ্ধের জন্য এগিয়ে গেলেন এই বলে ,“ এ জাতি অবিশ্বাস করেছে এবং তারা রাব্বুল আলামীনের পুরস্কার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে , এ জাতি হত্যা করেছে আলীকে এবং তার সন্তান হাসানকে , যিনি ছিলেন উত্তম এবং সম্মানিত পিতা-মাতার সন্তান। তারা ঘৃণা ও বিদ্বেষে পূর্ণ ছিলো এবং তারা জনতাকে ডাক দিয়েছে এবং জমা হয়েছে হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। অভিশাপ এ নীচ জাতির উপর যারা বিভিন্নদলকে একত্র করেছে‘ দুই পবিত্র আশ্রয়স্থানের ’ লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এভাবে মুশরিকদের বংশধর উবায়দুল্লাহর জন্য তারা যাত্রা করেছে এবং মুরতাদদের আনুগত্য করার জন্য অন্যদেরকে আহ্বান করেছে আল্লাহর বিরোধিতা করে আমার রক্ত ঝরানোর জন্য , এবং সা’ আদের সন্তান আমাকে হত্যা করেছে আক্রমণাত্মকভাবে এক সেনাবাহিনীর সাহায্যে যা প্রবল প্লাবনের মত এবং এ সব আমার কোন অপরাধের প্রতিশোধের জন্য নয় , শুধু এ কারণে যে , আমার গর্ব হচ্ছে দুই নক্ষত্র , আলী যিনি ছিলেন নবীর পরে শ্রেষ্ঠ এবং নবী ছিলেন কুরাইশ পিতা- মাতার সন্তান , আমার বাবা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং আমি দুজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান , রূপার মত যা বেরিয়ে এসেছে স্বর্ণ থেকে , আমি হচ্ছি রূপা , দুই স্বর্ণালীর সন্তান , আর কারো নানা কি আমার নানার মত , অথবা তাদের পিতা আমার পিতার মত , এরপর আমি দুজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির পুত্র সন্তান , আমার মা ফাতিমাতুয যাহরা এবং বাবা যিনি মুশরিকদের পিঠ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন বদর ও হুনাইনের যুদ্ধে এবং যিনি শৈশবকাল থেকেই রবের ইবাদত করেছেন যখন কুরাইশরা ইবাদত করতো একসাথে দুই মূর্তির , লাত ও উযযার , তখন আমার বাবা নামায পড়েছেন দুই কিবলার দিকে ফিরে। আর আমার বাবা হলেন সূর্য এবং আমার মা চাঁদ , আর আমি এক নক্ষত্র , দুই চাঁদের সন্তান এবং তিনি (আলী) উহুদের দিনে এমন মোজেযা দেখিয়েছেন সেনাবাহিনীকে দুভাগ করে দেয়ার মাধ্যমে , যা হিংসা দুর করেছিলো এবং আহযাবে (এর যুদ্ধে) ও মক্কা বিজয়ে। যেদিন দুই সেনাবাহিনীতে একটি কথাই ছিলো - মৃত্যু এবং এ সবই আল্লাহর রাস্তায় করা হয়েছিলো , কিন্তু কিভাবে এই নীচ জাতি এ দুই সন্তানের সাথে আচরণ করেছে - যারা সৎকর্মশীল নবী ও আলীর সন্তান , দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধের দিনে যারা লাল গোলাপের মত। ”
এরপর তিনি সেনাবাহিনীর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন তার তরবারি খাপমুক্ত করে , জীবনকে পরিত্যাগ করে এবং হৃদয়ে মৃত্যুর দৃঢ় সিন্ধান্ত নিয়ে। তিনি বলছিলেন ,“ আমি আলীর সন্তান , যিনি ছিলেন পবিত্র ও হাশিমের বংশধর এবং এ মর্যাদা আমার জন্য যথেষ্ট যখন আমি গর্ব করি , আমার নানা আল্লাহর রাসূল সবার চেয়ে সম্মানিত। আমরা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর বাতি এবং আমার মা ফাতিমা যাহরা (আ.) , যিনি আহমাদ (সা.) এর কন্যা এবং আমার চাচা যিনি দুপাখার অধিকারী বলে পরিচিত এবং আমাদের মাঝে আছে আল্লাহর কিতাব এবং তা সত্যসহ নাযিল হয়েছে এবং আমাদের মধ্যেই আছে বৈধতা এবং কল্যাণপূর্ণ ওহী এবং আমরা হলাম সব মানুষের মধ্যে আল্লাহর আমানত এবং আমরা গোপনে ও প্রকাশ্যে ঘোষণা করি যে কাউসারের উপর আমরা কর্তৃত্ব রাখি এবং আমরা আমাদের অনুসারীদের পান করাবো নবীর পেয়ালা দিয়ে , যা অস্বীকার করা যায় না এবং আমাদের অনুসারীরা হলো অনুসারীদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং যারা আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে কিয়ামতের দিন তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। ”
মুহাম্মাদ বিন আবু তালিব বলেন আবু আলী সালামি তার ইতিহাসে বর্ণনা করেছেন যে , এ শোকগাঁথাটি ইমাম হোসেইন (আ.) এর নিজের সৃষ্টি এবং এর মত কোন শোকগাঁথা নেই:
“ যদিও এ পৃথিবীকে প্রিতীকর মনে করা হয় , আল্লাহর পুরস্কার হচ্ছে সুমহান ও বিশেষ বৈশিষ্টের অধিকারী এবং যদি দেহকে তৈরী করা হয়ে থাকে মৃত্যুর জন্য তাহলে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া মানুষের জন্য সবচেয়ে ভালো এবং যদি রিয্ক্ব বিতরণ করা হয় ও নিশ্চয়তা থাকে তাহলে মানুষের উচিত না তা অর্জনের জন্য কঠিন চেষ্টা করা এবং যদি এ সম্পদ জমা করার ফলাফল হয় তা পেছনে ফেলে যাওয়া তাহলে কেন মানুষ লোভী হবে ?”
এরপর তিনি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে আহ্বান করলেন এবং যে-ই কাছে এলো তৎক্ষনাৎ নিহত হলো এবং লাশের স্তুপ জমা হলো। এরপর তিনি সেনাবাহিনীর ডান অংশকে আক্রমণ করলেন এবং বললেন ,“ অপমান হওয়ার মৃত্যু চাইতে উত্তম এবং অপমান জাহান্নামের আগুনে প্রবেশের চাইতে উত্তম। ”
এরপর তিনি সেনাবাহিনীর বাম অংশকে আক্রমণ করলেন এবং বললেন ,“ আমি হোসেইন , আলীর সন্তান , আমি শপথ করেছি যে শত্রুদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবো না এবং আমার বাবার পরিবারকে রক্ষা করবো , যতক্ষণ না আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর ধর্মের উপর নিহত হই। ”
কিছু বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে , আল্লাহর শপথ , আমি তার মত কোন বীর দেখি নি , যে তার সন্তান , পরিবার ও বন্ধুদের হারিয়ে ভেঙ্গে গেছে। যোদ্ধারা তার ওপরে প্রথমে আক্রমণ চালালো এবং তিনিও তাদের আক্রমণের সমান জবাব দিলেন এবং তিনি তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন যেভাবে নেকড়ে ভেড়ার সাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং তাদের তিনি বিতাড়িত করলেন এবং পঙ্গপালের মত ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। তিনি অস্ত্রে সুসজ্জিত ত্রিশ হাজার সৈন্যের বাহিনীকে আক্রমণ করলেন এবং তারা তার সামনে পঙ্গপালের মত ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো। এরপর তিনি তার জায়গায় ফেরত এলেন এবং বললেন ,“ কোন ক্ষমতা নেই ও কোন শক্তি নেই শুধু আল্লাহর কাছে ছাড়া যিনি উচ্চ ও মহান। ”
‘ ইসবাত আল ওয়াসিয়াহ ’ তে বর্ণিত আছে যে তিনি নিজ হাতে আঠারোশ যোদ্ধাকে হত্যা করেন।
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আছে যে , ইবনে শাহর আশোব এবং মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব বলেছেন যে , তিনি অবিরাম আক্রমণ করলেন যতক্ষণ না তিনি উনিশশত পঞ্চাশ ব্যক্তিকে হত্যা করলেন , আহতদের সংখ্যা ছাড়াই। উমর বিন সা’ আদ সেনাবাহিনীকে উচ্চ কণ্ঠে বললো ,“ আক্ষেপ তোমাদের জন্য , তোমরা জানো তোমরা কার সাথে যুদ্ধ করছো ? সে হলো ভুড়িওয়ালার সন্তান (এখানে সে ইমাম আলী (আ.) কে বিদ্রুপ করতে চেয়েছে , আউযুবিল্লাহ) সে হচ্ছে আবরদের ঘাতকের সন্তান। তাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করো। ” চার হাজার তীরন্দাজ তাকে ঘেরাও করে ফেললো এবং তাঁবুর দিকে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিলো।
মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব , ইবনে শাহর আশোব এবং সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তখন বললেন ,“ দুর্ভোগ তোমাদের উপর হে আবু সুফিয়ানের পরিবারের অনুসারীরা , যদি তোমরা অধার্মিক লোক হও এবং কিয়ামতের দিনটিকে ভয় না পাও তাহলে কমপক্ষে স্বাধীন চিন্তার লোক হও এবং বুঝতে চেষ্টা করো যদি তোমরা আরবদের বংশধর হও।”
শিমর বললো ,“ হে ফাতিমার সন্তান , তুমি কী বুঝাতে চাও ?”
ইমাম বললেন ,“ আমি বলছি যে আমরা পরস্পর যুদ্ধ করবো কিন্তু নারীরা তো কোন দোষ করে নি। আমার পরিবারের তাঁবু লুট করা থেকে বিরত থাকো যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি। ”
শিমর বললো ,“ নিশ্চয়ই তোমার অধিকার আছে। ” তখন সে উচ্চ কণ্ঠে ডাকলো ,“ তাঁবুগুলো থেকে ফেরত আসো এবং তাকে তোমাদের লক্ষ্যে পরিণত করো এবং সে দয়ালু সমকক্ষ। ” তখন পুরো সেনাবাহিনী তার দিকে ফিরলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) পানি পান করতে চাইলেন। যখনই তিনি ফোরাত নদীর দিকে যেতে চাইলেন , সেনাবাহিনী তাকে আক্রমণ করলো এবং নদী থেকে ফিরিয়ে দিলো।
ইবনে শাহর আশোব বলেন জালুদি থেকে আবু মাখনাফ বর্ণনা করেছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) আক্রমণ করেন আ ’ ওয়ার সালামি ও আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদিকে যারা চার হাজার সৈন্যসহ ফোরাত নদীর তীর পাহারা দেয়ার জন্য নিয়োজিত ছিলো। তখন তিনি তার ঘোড়াকে নদীতে প্রবেশ করালেন এবং যখন ঘোড়া তার মুখ পানিতে রাখলো পান করার জন্য ইমাম বললেন ,“ হে আমার ঘোড়া , তুমি তৃষ্ণার্ত এবং আমিও এবং যতক্ষণ না তুমি পান করো আমি আমার তৃষ্ণা মিটাবোনা। ” যখন ঘোড়াটি ইমামের এ কথাগুলি শুনলো সে তার মাথা তুলে ফেললো এবং পানি খেলো না , যেন সে বুঝতে পেরেছে ইমাম কী বলেছেন। ইমাম বললেন , “ আমি পান করবো এবং তুমিও পান করো। ” তিনি তার হাত লম্বা করে দিলেন এবং হাতের তালু পানিতে পূর্ণ করলেন। তখন সেনাবাহিনীর এক ব্যক্তি চিৎকার করে বললো ,“ হে আবা আব্দিল্লাহ , তুমি শান্তিতে পানি পান করছো অথচ তোমার তাঁবুগুলো লুট করা হচ্ছে ?” তা শুনে ইমাম পানি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং আক্রমণ করলেন। তিনি শত্রুবাহিনীকে দুভাগ করে এগিয়ে দেখতে পেলেন তার তাঁবুগুলি নিরাপদ আছে।
আল্লামা মাজলিসি তার‘ জালাউল উয়ুন ’ -এ বলেছেন যে , আবারও তিনি তার পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং তাদেরকে সহনশীল হওয়ার আদেশ করলেন এবং তাদেরকে পুরস্কার ও প্রতিদানের শপথ করলেন , এরপর বললেন ,“ তোমাদের চাদরগুলো পরো , পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও এবং জেনে রাখো আল্লাহ তোমাদের সাহায্য ও নিরাপত্তা দানকারী এবং তোমাদেরকে শত্রুদের খারাপ আচরণ থেকে মুক্তি দিবেন এবং তোমাদের উত্তম পরিসমাপ্তি ঘটাবেন। তার ক্রোধ তোমাদের শত্রুদের ঢেকে ফেলবে বিভিন্ন দুর্যোগে এবং তিনি তোমাদের উপর বিশেষ বরকত ও আশ্চযজর্নক উপহার দিবেন এ পরীক্ষার পরে। অভিযোগ করো না , এমন কিছু বলো না যা তোমাদের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। ”
‘ বিহারুল আনওয়ার ’ -এ আছে যে আবুল ফারাজ বলেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) নদীর দিকে গেলেন এবং শিমর বললো ,“ তুমি নদীর দিকে যাবে না , বরং তুমি আগুনের দিকে যাবে। ” (আউযুবিল্লাহ) । এক ব্যক্তি উচ্চ কণ্ঠে বললো ,“ ও হোসেইন , তুমি কি দেখছো না মাছের পেটের মত ফোরাত নড়াচড়া করছে ? আল্লাহর শপথ , তুমি অবশ্যই এর স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তৃষ্ণায় মারা যাও। ” ইমাম বললেন ,“ ইয়া রব , তাকে তৃষ্ণার কারণে মৃত্যু দাও। ” বর্ণনাকারী বলে যে (একই) ব্যক্তি বলতো ,“ আমাকে পান করার জন্য পানি দাও। ” তাকে পানি দিলে সে তা থেকে পান করতো এবং বমি করে ফেলতো। আবারও সে বলতো ,“ আমাকে পান করার জন্য পানি দাও কারণ তৃষ্ণা আমাকে মেরে ফেলছে। ” এ রকম চলতে থাকলো যতক্ষণ পর্যন্তনা সে মৃত্যুমুখে পতিত হলো (আল্লাহর অভিশাপ তার উপর) ।
আবু হাতূফ নামে এক ব্যক্তি একটি তীর ছোঁড়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে যা তার কপালে বিদ্ধ হয়। তিনি তা টেনে বের করলেন এবং রক্ত তার চেহারা ও দাড়ি ভিজিয়ে দিলো। তখন তিনি বললেন ,“ হে আমার রব , আপনি কি দেখছেন এ খারাপ লোকদের হাতে আমাকে কী সহ্য করতে হচ্ছে ? ইয়া রব , তাদের সংখ্যা কমিয়ে দিন এবং তাদের শেষটিকেও হত্যা করুন এবং তাদের একটিকেও পৃথিবীর উপর রেখেন না এবং তাদের ক্ষমা করবেন না। ”
এরপর তিনি তাদের আক্রমণ করলেন এক ভয়ঙ্কর সিংহের মত এবং কেউ ছিলো না যে তার কাছে পৌঁছতে পারে , তিনি তাদের পেট কেটে হত্যা করলেন। তারা সব দিক থেকে তাকে তীর ছুঁড়তে লাগলো যেগুলোর আঘাত তিনি বুকে ও ঘাড়ে নিলেন এবং বললেন ,“ কত খারাপ আচরনই না তোমরা করলে মুহাম্মাদ (সা.) এর বংশধরদের সাথে তার মৃত্যুর পর। আমাকে হত্যা করার পর তোমরা আল্লাহর কোন বান্দাহকে হত্যা করতে আর ভয় পাবে না এবং আমাকে হত্যা করা তোমাদের কাছে তাদের হত্যাকে সহজ করে দিবে। আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে তিনি তোমাদের হাতে আমাকে অপমানের বদলে আমাকে শাহাদাত দান করবেন এবং এরপর আমার প্রতিশোধ নিবেন এমন মাধ্যমে যে তোমরা তা কখনো চিন্তাও করতে পারবেনা। ”
এ কথাগুলো শুনে হাসীন বিন মালিক সাকনি বল লো ,“ হে ফাতিমার সন্তান , কিভাবে আল্লাহ আমাদের উপর তোমার প্রতিশোধ নিবেন ?” ইমাম বললেন ,“ তিনি তোমাদের যুদ্ধে ঢেকে ফেলবেন এবং তোমাদের রক্ত ঝরাবেন , এরপর এক ভয়ানক শাস্তিতোমাদের উপর আসবে। ” এরপর তিনি যুদ্ধ করলেন যতক্ষণ না অনেক আঘাতে জর্জরিত হলেন। ইবনে শাহর আশোব ও সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন আঘাতের সংখ্যা ছিলো বাহাত্তর।
ইবনে শহর আশোব আবু মাখনাফ থেকে তিনি ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে ,“ ইমাম হোসেইন (আ.) এর শরীরে বর্শার তেত্রিশটি আঘাত ও তরবারির চৌত্রিশটি আঘাত ছিলো। ”
ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) বলেন যে ,“ ইমাম হোসেইন (আ.) বর্শা , তরবারি ও তিনশ বিশটির বেশী তীর থেকে আঘাত পেয়েছিলেন। ”
অন্য এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে আঘাতের সংখ্যা ছিলো তিনশ ষাটটি। অন্য আরেক বর্ণনা অনুযায়ী আঘাতের সংখ্যা ছিলো তিনশ তিনটি এবং এটিও বলা হয় যে তার আঘাতের সংখ্যা এক হাজার তিনশতে পৌঁছে। তীর তার বর্ম ভেদ করে সজারুর কাটার মত এবং বর্ণনা করা হয় যে তার সব আঘাত ছিলো দেহের সামনের দিকে।
বর্ণিত আছে যে (অতিরিক্ত) যুদ্ধ ইমাম হোসেইন (আ.) কে ক্লান্তকরে ফেলে এবং তিনি বিশ্রাম নেয়ার জন্য খানিক ক্ষণের জন্য থামেন। সে সময় একটি পাথর তার কপালে ছোঁড়া হয় এবং তিনি তার জামার সামনের দিক উচু করলেন তা (রক্ত) মোছার জন্য। তখন একটি বিষ মাখানো তিন মাথার তীর তার বুক ভেদ করলো। কিছু বর্ণনায় আছে যে , তা তার হৃৎপিণ্ডভেদ করলো এবং তিনি বললেন ,“ আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর সাহায্যে এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বিশ্বাসের ওপরে। ” এরপর তিনি তার মাথা আকাশের দিকে তুললেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , তুমি জানো তারা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে হত্যা করতে যে ছাড়া পৃথিবীতে নবীর আর কোন সন্তান নেই। ” এরপর তিনি তীরটি টেনে বের করলেন তার (বুক অথবা) পিঠ থেকে এবং রক্ত প্রবাহিত হলো ছোট্ট একটি নদীর মত। তিনি তা দিয়ে তার হাতের তালু ভরে ফেললেন এবং তা আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং একটি ফোঁটাও তা থেকে মাটিতে ফিরে এলো না। এরপর তিনি তার অন্য হাতের তালু রক্তে ভরে ফেললেন এবং তা মাথায় ও দাড়িতে মাখলেন এবং বললেন ,“ আমি চাই আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর সাথে আমার রক্তে রঙ্গীন হয়ে মিলিত হতে এবং আমি বলবো , হে রাসূলুল্লাহ , অমুক অমুক ব্যক্তি আমাকে হত্যা করেছে। ”
শেইখ মুফীদ ইমাম হোসেইন (আ.) এর ঘোড়ায় চড়া ও ফোরাত নদীর তীরের দিকে যাওয়া এবং তার ভাই আব্বাস (আ.) এর শাহাদাত বর্ণনা করার পর বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) ফোরাত থেকে ফিরে তার তাঁবুর দিকে আসেন। শিমর বিন যিলজাওশান , তার কিছু সহযোগী নিয়ে তার কাছে এলো এবং তাকে সব দিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো। মালিক বিন বিশর কিনদি নামে এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে ইমাম হোসেইন (আ.) কে গালাগালি করতে লাগলো এবং তার তরবারি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করলো। তা তার রাতে পড়ার টুপি কেটে মাথায় পৌঁছে গেলো এবং রক্ত প্রবাহিত হতে শুরু করলো এবং টুপিটি ভরে ফেললো। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ তুমি এ হাত দিয়ে আর কখনো খাবে না ও পান করবে না এবং তুমি উঠে দাঁড়াবে (কিয়ামতের দিন) অত্যাচারীদের সাথে। ” তিনি মাথা থেকে টুপিটি সরালেন এবং একটি রুমাল চেয়ে তা দিয়ে মাথা বাঁধলেন। এরপর তিনি আরেকটি টুপি পড়লেন এবং তার উপর একটি পাগড়ী বাঁধলেন।
আমরা (লেখক) বলি যে , তাবারিও এরকমই বর্ণনা করেছেন , কিন্তু বলেছেন তিনি রাতের টুপির বদলে একটি আরবীয় রুমাল পড়েছিলেন এবং আরও বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) ক্লান্তহয়ে পড়েছিলেন এবং তখন কিনদার এক ব্যক্তি (মালিক বিন বিশর) এগিয়ে এলো এবং তার মাথার রুমালটি নিয়ে নিলো যা পশম দিয়ে তৈরী ছিলো। সে সেই রুমালটি তার স্ত্রী উম্মে আব্দুল্লাহর কাছে নিয়ে এলো যে ছিলো আল হুরের কন্যা এবং হোসেইন বিন আল হুর বাদির বোন। যখন সে তা থেকে রক্ত ধোয়ার চেষ্টা করলো , তার স্ত্রী বুঝতে পারলো যে তা ছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর এবং সে বললো ,“ তুমি আল্লাহর রাসূল (সা.) এর নাতির কাপড় চুরি করে এনেছো আমার বাড়িতে ? তা নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। ” তার বন্ধুরা বলে যে সে (মালিকের স্ত্রী) মৃত্যু পর্যন্ত রাগ করে ছিলো।
তাবারি বলেন যে , আবু মাখনাফ বর্ণনা করেছে , শিমর দশ জন কুফী পদাতিক সৈন্যকে একত্র করলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর নারীদের তাঁবগুলোর দিকে অগ্রসর হলো এবং ইমাম ও তার পরিবারের মাঝখানে অবস্থান গ্রহণ করলো। ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,“ দুর্ভোগ তোমাদের উপর , যদি তোমরা ধর্মহীন মানুষ হয়ে থাকো এবং ফেরত যাওয়ার দিনকে (কিয়ামতকে) ভয় না পাও , কমপক্ষে তোমাদের পৃথিবীতে স্বাধীন চিন্তাসম্পন্ন এবং মর্যাদাবান লোক হও। তোমার আমার পরিবারের কাছ থেকে অসভ্য ও নির্বোধ লোকদের দূরে রাখো। ” শিমর বললো ,“ হে ফাতিমার সন্তান , নিশ্চয়ই তোমার অধিকার আছে। ” এরপর সে তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে অগ্রসর হলো। তাদের মাঝে ছিলো আবুল জুনুব আব্দুর রহমান জু ’ ফি , ক্বাশ ’ আম বিন আমর বিন ইয়াযীদ জু ’ ফি , সালেহ বিন ওয়াহাব ইয়াযবী , সিনান বিন আনাস নাখাই এবং খাত্তলি বিন ইয়াযীদ আসবাহি। শিমর তাদের উস্কানি দিলো ইমাম হোসেইন (আ.) কে হত্যা করার জন্য। সে আবুল জুনুবকে বললো , যে অস্ত্রে সুসজ্জিত ছিলো ,“ এগিয়ে যাও। ” সে বললো ,“ তুমি কেন আরও এগোচ্ছো না ?” শিমর উত্তর দিলো ,“ তুমি কি আমাকে মুখের উপর উত্তর দাও ?” সে বললো ,“ তাহলে তুমি কি আমাকে আদেশ করছো ?” তারা পরস্পরকে গালিগালাজ শুরু করলো এবং আবুল জুনুব , যে ছিলো এক সাহসী লোক বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি কত যে চাই এ বর্শাটি তোমার চোখে ঢুকিয়ে দিতে। ” শিমর তাকে ছেড়ে দিলো এবং বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমার ইচ্ছা করছে তোমাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করতে। ”
বর্ণনায় আছে যে শিমর , সঙ্গে দশ জন পদাতিক সৈন্য নিয়ে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ফিরলো এবং তিনি তাদেরকে আক্রমণ করলেন ও ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। তখন তারা তাকে আরও কঠিনভাবে ঘেরাও করলো। সে মুহূর্তে একটি শিশু ইমাম হোসেইন (আ.) এর দিকে ছুটে এলো ইমামের পরিবারের তাঁবু থেকে। ইমাম উচ্চ কণ্ঠে তার বোন সাইয়েদা যায়নাব (আ.) কে ডাক দিলেন ,“ এর যত্ন নাও । ” শিশুটি শুনলো না এবং দৌড় দিলো ইমামের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত এবং তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। শেইখ মুফীদ তাকে চিহ্নিত করেছেন আব্দুল্লাহ বিন (ইমাম) হাসান নামে , শিশুটি বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমি আমার চাচার কাছ থেকে সরে যাবো না। ”
[তাবারির গ্রন্থে আছে] বাহর বিন কা‘ আব ইমাম হোসেইন (আ.) কে আঘাত করলো তার তরবারি দিয়ে এবং শিশুটি বললো ,“ দুর্ভোগ হোক তোমার হে খারাপ চরিত্রের লোকের সন্তান। তুমি কি আমার চাচাকে হত্যা করতে চাও ?” অভিশপ্ত শয়তান তাকে তার তরবারি দিয়ে আঘাত করলো , তা শিশুটি তার দুহাতের উপর নিলো এবং তা গোশত পর্যন্ত কাটলো এবং ঝুলতে লাগলো। শিশুটি কেঁদে উঠলো ,“ ও মা , আমার সাহায্যে আসো। ” ইমাম তাকে কোলে তুলে নিলেন এবং বললেন ,“ হে ভাতিজা , সহ্য করো এ পরীক্ষা এবং তা তোমার জন্য বরকত মনে করো। তুমি শীঘ্রই মিলিত হবে তোমার ধার্মিক পিতৃপুরুষদের সাথে যারা হলেন আল্লাহর রাসূল (সা.) , ইমাম আলী বিন আবি তালিব (আ.) , হামযা (আ.) , জাফর (আত তাইয়ার) (আ.) এবং (ইমাম) হাসান বিন আলী (আ.) । ” এরপর তিনি তার হাত তুললেন দোআ করার জন্য এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , আকাশের বৃষ্টি ও পৃথিবীর প্রাচুর্য তাদের জন্য স্থগিত করে দাও। ইয়া রব , যদি তুমি তাদের আরও কিছু দিনের জন্য জীবন দাও , তাহলে তাদেরকে বিতাড়িত করো এবং শাসকদেরকে তাদের উপর সব সময় অসন্তুষ্ট রাখো , কারণ তারা আমাদের আমন্ত্রণ করেছে সাহায্য করার জন্য কিন্তু এরপর আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং আমাদেরকে হত্যা করেছে। ”
[‘ মালহুফ ’ গ্রন্থে আছে] সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , হুরমালাহ তার (আব্দুল্লাহ বিন হাসানের) দিকে একটি তীর ছুঁড়লো এবং তাকে হত্যা করলো , তখন সে তার চাচা ইমাম হোসেইন (আ.) এর হাতের উপর ছিলো (আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক তার উপর) ।
ইবনে আবদ রাব্বাহ তার‘ ইকদুল ফারীদ ’ গ্রন্থে বলেন যে , সিরিয়ার এক সৈন্যের দৃষ্টি পড়ে আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন আলী (আ.) এর উপর , যিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে খুবই সুন্দর এবং সে বললো ,“ আমি এ কিশোরকে হত্যা করতে চাই। ” এক ব্যক্তি তাকে বললো ,“ দুর্ভোগ তোমার উপর , তার উপর থেকে হাত সরিয়ে নাও। ” কিন্তু সে কোন কান দিলো না এবং তাকে আঘাত করলো তরবারি দিয়ে এবং তাকে হত্যা করলো। যখন তরবারি তার কাছে পৌঁছে গেলো তিনি চিৎকার করে উঠলেন ,“ হে চাচা , আমার সাহায্যে আসেন। ” ইমাম বললেন ,“ এই তো আমি , এ তার কণ্ঠ যার আছে অল্প কজন সাথী এবং প্রচুর হত্যাকারী। ” ইমাম তার হত্যাকারীকে আক্রমণ করলেন এবং তার হাত বিচ্ছিন্ন করে দিলেন এবং অন্য একটি আঘাতে তাকে হত্যা করলেন।
আমি (লেখক) বলি যে , ইবনে আবদ রাব্বাহ পরিষ্কারভাবে ভুল করেছে। সে ক্বাসিম বিন হাসানকে আব্দুল্লাহ বিন হাসান বলে চিহ্নিত করেছে , ক্বাসিম বিন হাসানের শাহাদাত আমরা ইতোমধ্যেই আলোচনা করেছি।
তাবারি বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তখন পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ করেন এবং তাদেরকে তার কাছে ঠেলে সরিয়ে দেন।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , পদাতিক সৈন্যরা ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদেরকে বাম ও ডান দিক থেকে আক্রমণ করে এবং তাদেরকে হত্যা করে যতক্ষণ না তিন থেকে চারজন ইমামের সাথে রয়ে যান।
তাবারি এবং (ইবনে আসীর) জাযারি একই ভাবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে মাত্র তিন থেকে চারজন সাথী ছিলো তিনি একটি লম্বা জামা চাইলেন যা চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। তা ছিলো ইয়েমেনের এবং খুব সূক্ষ্ণভাবে সেলাই করা , তিনি এর দুই পাশের কিছু অংশ ছিঁড়ে দিলেন যেন তা তার শরীর থেকে খুলে নেয়া না হয়। তার একজন সাথী বললেন ,“ আমার মনে হয় আপনার পোশাকের নিচে বর্ম পড়লে ভালো করতেন ।” ইমাম বললেন ,“ তা হলো অপমানকর জামা এবং তা পড়া আমার জন্য মানায় না ।” বলা হয় যখন তিনি নিহত হন , বাহর বনি কা‘ আব তার জামাটি তার শরীর থেকে লুট করে নিয়ে যায় , তা আবরণহীন অবস্থায় রেখে।
আযদি বলেন যে , আমর বিন শুয়াইব বর্ণনা করেছে মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান থেকে যে , বাহর বিন কা‘ বের দুহাত দিয়ে শীতকালে পুঁজ বের হতো এবং গ্রীস্মকালে তা কাঠের লাঠির মত শুকিয়ে যেতো।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) বলেছিলেন যে ,“ আমার জন্য একটি জামা আনো যা আমি আমার পোশাকের নিচে পড়বো যেন তারা আমাকে খালি গা করতে না পারে। ” পাতলা বর্ম আনা হলো , তিনি বললেন ,“ এগুলো মর্যাদাহীন ব্যক্তিদের পোষাক। ” এরপর তিনি একটি জীর্ণ ছেঁড়া জামা চাইলেন এবং তা ছিঁড়ে পোষাকের নিচে পড়লেন। যখন তিনি শহীদ হলেন তখন তা তার শরীর থেকে খুলে নেয়া হয়েছিলো।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , যখন মাত্র তিন জন সাথী ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে ছিলো তিনি শত্রুদের দিকে ফিরলেন এবং ঐ তিন জন তাকে রক্ষা করতে দাঁড়ালেন এবং সেনাবাহিনীকে তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা তারা শহীদ হয়ে গেলেন এবং ইমাম একা হয়ে গেলেন। তিনি মাথায় এবং শরীরে আহত ছিলেন , এরপর তিনি তাদের আক্রমণ করলেন বাম দিক ও ডান দিক থেকে এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন।
হামীদ বিন মুসলিম বলে যে ,“ আল্লাহর শপথ , আমি একজন বিদ্ধস্ত মানুষকে এত বীরত্ব প্রদর্শন করতে দেখি নি যার পুত্র সন্তানদের এবং বন্ধুদের হত্যা করা হয়েছে , তবুও তার হৃদয় ছিলো অপরাজেয়। পদাতিক সৈন্যরা তাকে আক্রমণ করেছে এবং তিনি তাদেরকে মোকাবিলা করেছেন এক নেকড়ের মত যে ভেড়ার পালকে আক্রমণ করে এবং তাদেরকে ডান বামে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ” যখন শিমর তা দেখলো , সে অশ্বারোহীদের ডাকলো এবং পদাতিক সৈন্যদের সারির পেছনে তাদের অবস্থান নিতে বললো। এরপর সে তীরন্দাজদের আদেশ করলো ইমামের প্রতি তীর ছুঁড়তে। এমন সংখ্যায় তীর তার দেহে বিদ্ধ হলো যে তা দেখতে সজারুর কাটার মত লাগলো , তখন তিনি তাদের উপর থেকে তার হাত সরিয়ে নিলেন এবং তারা এগিয়ে এলো এবং তার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকলো।
যায়নাব (আ.) তাঁবুর দরজায় এলেন এবং উমর বিন সা’ আদকে উচ্চ কণ্ঠে ডাকলেন , “ দুর্ভোগ তোমাদের জন্য হে উমর (বিন সা’ আদ) আবু আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হচ্ছে আর তুমি তাকিয়ে দেখছো ?” সে কোন উত্তর দিলো না এবং তিনি আবার বললেন ,“ দুর্ভোগ তোমার উপর , তোমাদের মধ্যে কি একজন মুসলমানও নেই ?” কিন্তু আবারও কেউ উত্তর দিলো না।
তাবারি বলেন যে , উমর বিন সা’ আদ ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে গেলো এবং যায়নাব (আ.) বললেন ,“ হে উমর বিন সা’ আদ , আবু আব্দুল্লাহকে হত্যা করা হচ্ছে আর তুমি তাকিয়ে দেখছো ?”
বর্ণনাকারী বলে যে , আমি যেন এখনও দেখতে পাচ্ছি তার গাল ও দাড়িতে অশ্রু ঝরছে এবং সে যায়নাব (আ.) এর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) অনেক আঘাতে ক্লান্তহয়ে পড়লেন এবং তাকে সজারুর মত (তীরের কারণে) দেখতে লাগছিলো। সালেহ বিন ওয়াহাব ইয়াযনী একটি বর্শা তার একপাশে বিদ্ধ করে এবং তিনি ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে যান বাম গালের ওপরে। এরপর তিনি বললেন ,“ আল্লাহর নামে , এবং আল্লাহর অনুমতিতে এবং আল্লাহর রাসূলের বিশ্বাসের ওপরে। ” এরপর উঠে দাঁড়ালেন।
বর্ণনাকারী বলে যে , সাইয়েদা যায়নাব (আ.) তাঁবুর দরজা থেকে বেরিয়ে এলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে আমার ভাই , হে আমার অভিভাবক , হে আমার পরিবার , হায় যদি আকাশ পৃথিবীতে ভেঙ্গে পড়তো এবং পাহাড়গুলো চূর্ণ হয়ে মরুভুমিতে ছড়িয়ে যেতো!”
বর্ণিত হয়েছে , শিমর তার সাথীদের উচ্চ কণ্ঠে ডেকে বললো ,“ এ মানুষটির জন্য তোমরা অপেক্ষা করছো কেন ?” তখন তারা তাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করলো।
হামীদ বিন মুসলিম বলে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) একটি পশমী লম্বা জামা পড়েছিলেন এবং মাথায় পাগড়ী এবং চুলে ওয়াসমাহর কলপ ছিলো। আমি তাকে শহীদ হওয়ার আগে বলতে শুনলাম , যখন তিনি পায়ের উপর ছিলেন , কিন্তু যুদ্ধ করছিলেন যেন ঘোড়ায় চড়ে আছেন এবং নিজেকে তীর থেকে রক্ষা করছিলেন এবং অশ্বারোহী বাহিনী সব দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছিলো এবং তিনি তাদের তরবারি দিয়ে আক্রমণ করলেন ,“ তোমরা একত্রে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছো ? আল্লাহর শপথ , আমার পরে তোমরা আর কাউকে হত্যা করবে না যার হত্যাতে আল্লাহ তোমাদের উপর এর চাইতে বেশী ক্রোধান্বিত হবেন। আল্লাহর শপথ , আমি চাই যে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসুন তোমাদের ঘৃণার পরিবর্তে এবং তিনি আমার প্রতিশোধ নিন তোমাদের উপর এমন এক মাধ্যমে যে সম্পর্কে তোমরা সচেতন নও। সাবধান , যদি তোমরা আমাকে হত্যা করো , আল্লাহও তোমাদেরকে হত্যা করবেন এবং তোমাদের রক্ত ঝরাবেন। এরপর তিনি তোমাদের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিবেন না যতক্ষণ না তিনি ভয়ানক শাস্তিকে দ্বিগুণ করবেন। ”
বর্ণিত আছে যে , তিনি সেদিন দীর্ঘ সময়ের জন্য বেঁচে ছিলেন এবং সেনাবাহিনী যদি চাইতো তাকে হত্যা করতে পারতো। কিন্তু তারা এ বিষয়ের জন্য একে অন্যকে উপযুক্ত মনে করলো এবং প্রত্যেক দল চাইলো অন্যরা তাকে হত্যা করুক। শিমর তাদের মাঝে চিৎকার করে বললো , “ কিসের জন্য তোমরা অপেক্ষা করছো ? এ লোককে হত্যা করো। তোমাদের মা তোমাদের জন্য কাঁদুক। ” এরপর তারা তাকে সবদিক থেকে আক্রমণ করলো।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , যারাহ বিন শারীক তার বাম হাতকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং তার কাঁধে তরবারির আরেকটি আঘাত বসিয়ে দেয় এবং তিনি তার মুখের উপর পড়ে গেলেন।
তাবারি বলেন যে , তখন তারা পিছনে হটে গেলো এবং তিনি ছিলেন খুবই খারাপ অবস্থায় এবং তিনি উঠে দাঁড়ালেন ও পড়ে গেলেন। সেই মুহূর্তে সিনান বিন আনাস বিন আমর নাখাই তাকে বর্শা দিয়ে আঘাত করলো এবং মাটিতে ফেলে দিলো।
শেইখ মুফীদ ও তাবারসি বলেন যে , খাওলি বিন আল আসবাহি দ্রুত এগিয়ে এলো এবং ঘোড়া থেকে নেমে এলো তার মাথা বিচ্ছিন্ন করতে , কিন্তু সে কাঁপতে লাগলো। শিমর বললো , “ আল্লাহ তোমার হাত ভেঙ্গে দিক , কেন তুমি কাঁপছো ?” এরপর সে ঘোড়া থেকে নেমে এলো এবং তার মাথা কেটে ফেললো।
আবুল আব্বাস আহমেদ বিন ইউসুফ দামিশকি ক্বিরমানি , যিনি ১০১৯ হিজরিতে মারা যান , তার‘ আখবারুল দাওল ’ গ্রন্থে বলেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর পিপাসা তীব্র হয়ে উঠলো , কিন্তু তারা তাকে পানি পান করার জন্য পানি দেয় নি। এক পেয়ালা পানি তার হাতে এলো এবং তিনি উপুড় হলেন তা পান করার জন্য। হাসীন বিন নামীর তার দিকে একটি তীর ছুঁড়লো , যা তার থুতনি ভেদ করলো এবং পেয়ালাটি রক্তে ভরে গেলো। তখন তিনি তার দুহাত আকাশের দিকে তুলে বললেন ,“ হে আল্লাহ , তাদের সংখ্যা কমিয়ে দাও , তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকেও পৃথিবীর উপর ছেড়ে দিও না। ” তখন তারা তাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করলো এবং তিনি তাদেরকে বাম ও ডান দিকে তাড়িয়ে দিলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা যারাহ বিন শারীক তার বাম কাঁধে আঘাত করে এবং আরেকটি আঘাত কাঁধে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। শিমর তখন তার ঘোড়া থেকে নেমে এসে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তা খাওলি আসবাহির হাতে হস্তান্তর করে। এরপর তারা তার জামা- কাপড় লুট করে।১৬
আমি (লেখক) বলি যে , সাইয়েদ ইবনে তাউস , ইবনে নিমা , শেইখ সাদুক্ব , তাবারি , ইবনে আসীর জাযারি , ইবনে আব্দুল বির , মাসউদী এবং আবুল ফারাজ বলেছেন যে , অভিশপ্ত সিনান (বিন আনাস) তার মাথা বিচ্ছিন্ন করেছিলো।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , সিনান এগিয়ে এলো এবং বললো ,“ যদিও আমি জানি যে সে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নাতি এবং তার মা-বাবা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , তবুও আমি তার মাথা কাটবো। ” এরপর সে তার পবিত্র ঘাড়ে আঘাত করে তার তরবারি দিয়ে এবং তার পবিত্র ও সম্মানিত মাথা আলাদা করে ফেলে।
একজন কবি এ সম্পর্কে বলেছেন ,“ কোন দুর্যোগ হোসেইনের দুর্যোগ থেকে বড় হতে পারে যখন সিনানের হাত তাকে হত্যা করছিলো। ”
আবু তাহির মুহাম্মাদ বিন হাসান (অথবা হোসেইন) বারাসি (অথবা নারাসি)‘ মা’ আলিমুদ দ্বীন ’ গ্রন্থে বলেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর বিষয়টি এই পর্যায়ে পৌঁছে যায় , তখন ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে কাঁদতে থাকে এবং বলে , “ হে আল্লাহ এ হোসেইন আপনার মেহমান , সে আপনার রাসূলের নাতি ” , তখন আল্লাহ ইমাম আল ক্বায়েম (আল মাহদী)-এর একটি ছবি দেখালেন এবং বললেন ,“ আমি তাদের উপর প্রতিশোধ নিবো এর মাধ্যমে। ”
বর্ণিত হয়েছে যে , মুখতার সিনানকে গ্রেফতার করে এবং তার প্রতিটি আঙ্গুল একের পর এক কেটে ফেলে। এরপর সে হাত দুটো ও পা দুটো কেটে ফেলে এবং তাকে একটি বড় পাত্রে ছুঁড়ে ফেলে , যাতে ছিলো ফুটন্তজলপাই তেল।
বর্ণনাকারী বলেন , যে মুহূর্তে তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর মাথা কেটে ফেললো এক প্রচণ্ডঘুর্ণিঝড় আবির্ভূত হলো এবং পুরো দিগন্তকে অন্ধকারে ছেয়ে ফেললো। এরপর এক লাল ঝড় বইলো যার কারণে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না এবং সেনাবাহিনী ভাবলো আল্লাহর অভিশাপ বোধ হয় নামলো। এরকম এক ঘন্টা চললো এবং তার পর থামলো।
হিলাল বিন নাফে ’ বলেন যে , আমি উমর বিন সা’ আদের সাথীদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং কেউ একজন চিৎকার করে বললো ,“ অধিনায়ক , সুসংবাদ নিন , শিমর হোসেইনকে হত্যা করেছে। ” তখন আমি তার শাহাদাতের স্থানে গেলাম এবং তার পাশে দাঁড়ালাম এবং তিনি মারা যাচ্ছিলেন। আল্লাহর শপথ , আমি এর চেয়ে ভালো কোন লাশ যা রক্তে ভেজা ছিলো এবং তার চেহারার চাইতে আলোকিত কোন চেহারা দেখিনি। তার চেহারার আলো এবং অসাধারণ সৌন্দর্য আমাকে তার মৃত্যু ভুলিয়ে দিলো।
এ অবস্থায় তিনি পানি চাইলেন এবং এক ব্যক্তি তাকে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , তুমি তা পাবে না যতক্ষণ না জ্বলন্তআগুনে (জাহান্নামে) প্রবেশ কর। ” (আউযুবিল্লাহ) । আমি ইমামকে বলতে শুনলাম ,“ দুর্ভোগ হোক তোমার , আমি জ্বলন্ত আগুনের দিকে যাচ্ছি না , না আমি সেখানে ফুটন্তপানির স্বাদ নিবো , বরং আমি যাচ্ছি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) এর কাছে এবং আমি বাস করবো তার সত্যপূর্ণ বাসস্থানে আল্লাহর আশ্রয়ে , যিনি সর্বশক্তিমান এবং আমি পবিত্র পানি পান করবো এবং এরপর আমি তার কাছে অভিযোগ করবো তোমরা আমার সাথে কী করেছো ” । তা শুনে তাদের সবাই ক্রুদ্ধ হলো। যেন তাদের বুকের ভেতর কোন দয়ামায়া ছিলো না এবং এ পরিস্থিতিতে যখন তিনি তাদের সাথে কথা বলছিলেন তারা তার মাথা কেটে নিলো। আমি তাদের নৃশংসতায় আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম এবং বললাম ,“ আমি আর কোন দিন কোন কাজে এখন থেকে তোমাদের সাথে থাকবো না। ”
কামালুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন তালহা তার‘ মাতালিবুস সা’ উল ’ -এ বলেন যে , আল্লাহর হাবীব রাসূলুল্লাহ (সা.) এর নাতির মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিলো একটি ধারালো তরবারি দিয়ে। এরপর তার মাথাকে ওপরে তুলে বর্শার আগায় , যা ধর্মত্যাগীদের জন্য করা হয় , এবং তারা একে প্রদর্শন করে বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এবং তারা তার পরিবার ও সন্তানদেরকে নিয়ে যায় অসম্মানের সাথে এবং উটের উপর তাদের চড়িয়ে দেয় বসার জন্য কোন জিন ছাড়াই। একথা জেনেও যে , তারা রাসূলের বংশধর , অথচ তাদের প্রতি ভালোবাসা বাধ্যতামূলক যেভাবে কোরআনে ও প্রকৃত বিশ্বাসে উল্লেখ আছে। যদি আকাশগুলো ও পৃথিবীর কথা বলার শক্তি থাকতো তাহলে তারা তাদের জন্য কাঁদতো ও বিলাপ করতো। যদি অবিশ্বাসীরা এ বিষয়ে জানতো তারা তাদের জন্য কাঁদতো ও বিলাপ করতো। যদি আইয়ামে জাহেলিয়াত (অজ্ঞতার যুগ)-এর সময়কার উদ্ধত লোকগুলো উপস্থিত থাকতো তারাও তাদের জন্য কাঁদতো এবং তাদের শাহাদাতে পরস্পরকে সমবেদনা জানাতো। যদি নিপীড়নকারী অত্যাচারীরা শাহাদাতের ঘটনাবলীর সময় উপস্থিত থাকতো তারা তাদের সহযোগিতা ও সাহায্য করতো। আক্ষেপ সেই দুর্যোগের জন্য যা খোদাভীরুদের হৃদয়কে আঘাত করেছে এবং তা উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছে। আক্ষেপ সেই ভয়ানক দুর্যোগের জন্য যা বিশ্বাসীদের হৃদয়কে করেছে শোকার্ত ও ব্যথাতুর করেছে তাদের জন্য যারা ভবিষ্যতে আসবে। আফসোস নবীর বংশধরের জন্য , যাদের রক্ত ঝরানো হয়েছে , এবং মুহাম্মাদ (সা.) এর পরিবারের জন্য যাদের তরবারি গতি হারিয়ে ফেলেছে এবং আলীর বংশধরের জন্য আফসোস যারা সাহায্য থেকে বঞ্চিত ছিলো এবং তাদের অভিভাবকদের হত্যা করা হয়েছিলো। আফসোস হাশিমীদের জন্য। যাদের পবিত্রতা লংঘন করা হয়েছিলো এবং যাদের রক্ত ঝরানো বৈধ বলে মনে করা হয়েছিলো।
আলী বিন আসবাত থেকে‘ নাওয়াদির ’ -এ বর্ণিত হয়েছে , তিনি বর্ণনা করেছেন তার কিছু সাথী থেকে , যে ইমাম মুহাম্মাদ আল বাক্বির (আ.) বলেছেন ,“ দশই মহররম , আমার বাবা (ইমাম যায়নুল আবেদীন আ.) ভীষণ অসুস্থ ছিলেন এবং তাঁবুর ভিতরে ছিলেন। আমি দেখলাম আমার বন্ধুরা এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করছে ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে এবং তার জন্য পানি আনছে। একবার তিনি সেনাবাহিনীর ডান অংশকে আক্রমণ করলেন এবং তার পর বাম অংশ এবং একবার মাঝখানের অংশকে। তারা তাকে হত্যা করলো এমনভাবে যে রাসূল (সা.) তাদেরকে একটি পশুকেও এভাবে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। তারা তাকে হত্যা করে তরবারি , বর্শা , পাথর , লম্বা লাঠি এবং ছোট লাঠি দিয়ে। এরপর তারা তার দেহকে ঘোড়ার খুর দিয়ে পদদলিত করে। ”
আমি (লেখক) বলি যে , ইমাম হোসেইন (আ.) শুক্রবার দিন , ১০ই মহররম শাহাদাত বরণ করেন , একষট্টি হিজরিতে , যোহরের নামাযের পর। তিনি সাতান্ন বছর বয়সী ছিলেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে তাকে শহীদ করা হয়েছিলো শনিবার অথবা সোমবার , কিন্তু অধিকতর সঠিক বলে মনে হয় শুক্রবার।
আবুল ফারাজ (ইসফাহানি) বলেন যে , আম্মাহগণ (যারা শিয়া নন) সোমবার সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা একটি ভুল এবং তা কোন রেওয়াতে সমর্থিত নয়। এটি এজন্য যে , যে মহররমে (৬১ হিজরি) শাহাদাত ঘটে তার প্রথম দিনটি ছিলো ভারতীয় জ্যোর্তিরবিদ্যার দিনক্ষণের সকল হিসাবে বুধবার , তাই ১০ই মহররম সোমবার হতে পারে না (বরং শুক্রবার) , এবং এটি একটি প্রমাণ যা রেওয়াতের সত্যতাকে নিশ্চিত করে।
শেইখ মুফীদ ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাত সম্পর্কে ১০ই মহররমকে উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন তা ছিলো শুক্রবারের প্রভাত। অন্যরা বলেন শনিবার , উমর বিন সা’ আদ তার বাহিনী জড়ো করেছিলো এবং পূর্ববর্তী সংবাদ অনুযায়ী তা ছিলো শুক্রবার। আর কারবালায় প্রবেশ সম্পর্কে শেইখ মুফীদ বলেন তা ছিলো ২রা মহররম বৃহস্পতিবার , একষট্টি হিজরিতে।
সিবতে ইবন জওযির‘ তাযকিরাহ ’ তে বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হয় শুক্রবার , যোহর ও আসরের নামাযের মধ্যবর্তী সময়ে। কারণ তিনি তার সাথীদের নিয়ে সালাতুল খওফ পড়েছিলেন।
একই বইতে উল্লেখ আছে তার হত্যাকারীদের সম্পর্কে বেশ কিছু সংবাদ আছে। হিশাম বিন মুহাম্মাদ (কালবি) বলেন যে , সিনান বিন আনাস নাখাঈ ছিলো হত্যাকারী , অন্যজন ছিলো হাসীন বিন নামীর , যে তার দিকে একটি তীর ছুঁড়ে ছিলো এবং এগিয়ে এসে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ছিলো। এরপর সে তার ঘোড়ার ঘাড় থেকে তালিঝয়ে দেয় যে ন (উবায়দুল্লাহ) ইবনে যিয়াদ এতে খুশী হয়। তৃতীয় নামটি হলো মুহাজির বিন আওস তামিমি , চতুর্থ জন কাসীর বিন আব্দুল্লাহ শা ’ আবি , পঞ্চম জন শিমর বিন যিলজাওশান। আমরা বলি ষষ্ঠ জন ছিলো খাওলি বিন ইয়াযীদ বিন আসবাহি (আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক ইমাম হোসেইন (আ.) এর সকল হত্যাকারীদের উপর) ।
মুহাম্মাদ বিন তালহা শাফেঈ এবং আলী বিন ঈসা ইরবিলি ইমামি বলেন যে , উমর বিন সা’ আদ তার সাথীদের আদেশ করলো ,“ সামনে যাও এবং তার মাথা কেটে ফেলো। ” নাসর বিন হারশাহ যাবাবি সামনে অগ্রসর হলো এবং ইমাম হোসেইন (আ.) এর ঘাড়ে বার বার আঘাত করলো। উমর বিন সা’ আদ ক্রোধান্বিত হলো এবং তার ডান দিকে দাঁড়ালো এক ব্যক্তিকে ইশারা করার পর বললো ,“ আক্ষেপ তোমার জন্য , এগিয়ে যাও এবং হোসেইনকে মুক্তি দাও। ” খাওলি বিন ইয়াযীদ (আল্লাহ তাকে চিরকালের জন্য জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করান) এগিয়ে এলো এবং তার মাথা কেটে ফেললো।
দায়নূরী বলেন যে , সিনান বিন আওস নাখাঈ একটি বর্শা তার দিকে ঠেলে দেয় এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। তখন খাওলি বিন ইয়াযীদ আসবাহি অগ্রসর হলো তার মাথা বিচ্ছিন্ন করার জন্য। তার হাত কাঁপছিলো এবং তার ভাই কা‘ বাল বিন ইয়াযীদ তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে এবং তার ভাই খাওলির হাতে তা দেয়।
ইবনে আবদ রাব্বাহ বলেন যে , সিনান বিন আনাস তাকে হত্যা করে এবং খাওলি বিন ইয়াযীদ আসবাহি , যে ছিলো বনি হামীর থেকে , তার মাথা কেটে ফেলে। সে তার মাথাটি উবায়দুল্লাহর কাছে নিয়ে গেলো এবং বললো ,“ আমার ঘোড়ার থলেতে প্রচুর সম্পদ তুলে দিন ...। ” (যা পরে উল্লেখ করা হবে।)
ইমাম জাফর আস সাদিকা.(আ.) বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) এর উপর একটি আঘাত করা হলো , তিনি তার ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন এবং তারা দৌঁড়ে আসলো তার মাথা কেটে ফেলতে। একটি কণ্ঠ আকাশ থেকে শোনা গেলো ,“ হে , যে জাতি তাদের নবীর ইন্তেকালের পর উদ্ধত হয়ে গেছে এবং পথভ্রষ্ট হয়েছে , আল্লাহ যেন তাদের রোযা ও ঈদুল ফিতরের অনুগ্রহ দান না করেন। ” তখন তিনি (ইমাম আ.) বললেন , অতএব আল্লাহর শপথ , তারা সমৃদ্ধি লাভ করে নি এবং তারা বৃদ্ধি পেতে থাকবে যতক্ষণ না প্রতিশোধ গ্রহণকারী (ইমাম মাহদী) উঠে দাঁড়াবেন ইমাম হোসেইনের জন্য।
ইবনে ক্বাওলাওয়েইহ কুম্মি বর্ণনা করেছেন হালাবি থেকে , যিনি বর্ণনা করেছেন ইমাম সাদিক্ব (আ.) থেকে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) কে শহীদ করা হলো , কুফার সেনাবাহিনীর মধ্যে কেউ একজন চিৎকার দিলো। যখন তাকে এজন্য তিরস্কার করা হলো , সে বললো ,“ কেন আমি কাঁদবো না যখন আমি দেখছি যে আল্লাহর রাসূল (সা.) দাঁড়িয়ে আছেন একবার তিনি পৃথিবীর দিকে দেখছেন এবং অন্য সময় তেমাদেরদ্ধেযর দিকে দেখছেন এবং আমি ভয় পাচ্ছি পাছে তিনি পৃথিবীবাসীর উপর অভিশাপ দেন এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাও। ” কুফার সেনাবাহিনী বললো , “ সে পাগল। ” তাদের মধ্যে যারা অনুতপ্ত ছিলো তারা বললো ,“ আল্লাহর শপথ , আমরা আমাদের প্রতি কী করেছি ? আমরা বেহেশতের যুবকদের সর্দারকে হত্যা করেছি সুমাইয়াহর সন্তানের জন্য। ” এরপর তারা উবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো এবং তাদের অবস্থা সে পর্যন্ত পৌঁছলো যা হওয়া উচিত। বর্ণনাকারী বলেন আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম ,“ আমি তোমাদের জন্য কোরবান হই , কে ছিলো সেই আহ্বানকারী ?” তারা বললো ,“ আমরা অনুমান করি তিনি ছিলেন জিবরাঈল। ”
মাশহাদির বর্ণনায় আছে যে , উম্মে সালামা (আ.) এর কাছে সালামা গেলেন , তখন তিনি কাঁদছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ আপনি কাঁদছেন কেন ?” তিনি বললেন , আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) কে স্বপ্নে দেখলাম তার মাথা ও দাড়ি ধুলায় মাখা। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে রাসূলুল্লাহ (সা.) আপনার কী হয়েছে যে আপনি ধুলায় মাখা ? তিনি বললেন ,“ এই মাত্র আমি আমার হোসেইনের হত্যাকাণ্ডপ্রত্যক্ষ করেছি। ”
ইবনে হাজারের‘ সাওয়ায়েক্বে মুহরিক্বা ’ -এ বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের দিন যে চিহ্নগুলি দেখা গিয়েছিলো তার মধ্যে একটি ছিলো আকাশ এত কালো হয়ে গিয়েছিলো যে , দিনের বেলা তারা দেখা গিয়েছিলো। যে কোন পাথর তুললে তার নিচে তাজা রক্ত দেখা গিয়েছিলো এবং আরও বলা হয় আকাশ লাল হয়ে গিয়েছিলো তার শাহাদাতে এবং সূর্য পীচের মত কালো। তারাগুলো দিনের বেলা দেখা যাচ্ছিলো এবং মানুষ মনে করেছিলো কিয়ামতের দিন (পুনরুত্থানের দিন) চলে এসেছে। সে দিন সিরিয়াতে যে কোন পাথর উঠানো হয়েছিলো তার নিচে তাজা রক্ত দেখা গিয়েছিলো।
তৃতীয় অধ্যায়
শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী সম্পর্কে
পরিচ্ছেদ - ১
শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী
বর্ণনাকারী বলে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর শাহাদাতের পর তারা তার পোশাক লুট করে নিয়ে যায়। তার গায়ের জামা নিয়ে যায় ইসহাক বিন হেইওয়াহ হাযরামি , সে তা পরার পর তার কুষ্ঠ রোগ দেখা দেয় এবং তার চুল পড়ে যায়।
বর্ণিত আছে যে , তার জামা একশত বা তার বেশী তীর , বর্শা এবং তরবারির আঘাতের চিহ্ন বহন করছিলো।
ইমাম জাফর সাদিক্ব (আ.) বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর দেহতে তেত্রিশটি বর্শার আঘাত ও চৌত্রিশটি তরবারির আঘাত ছিলো। তার পাজামা নিয়ে যায় বাহর বিন কা‘ আব তামিমি এবং বর্ণিত আছে যে সে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিলো এবং তার পাগুলো অবশ হয়ে গিয়েছিলো। তার পাগড়ি কেড়ে নেয় আখনাস বিন মুরসিদ হাযরামি যে তা মাথায় পড়েছিলো এবং অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তার স্যান্ডেলগুলো কেড়ে নেয় আসাদ বিন খালিদ এবং তার আংটি নেয় বাজদুল বিন সালীম কালবি যে তার আঙ্গুল কেটে তা নিয়ে যায় (আল্লাহর অভিশাপ তার ওপরে) । যখন মুখতার তাকে (বাজদুলকে) গ্রেফতার করলো সে তার হাত ও পা কেটে ফেলেছিলো , সে তার রক্ত প্রবাহিত হতে দিয়েছিলো যতক্ষণ না তার মৃত্যু হয়। ইমামের গোসলের পর পড়ার জন্য পশমের তৈরী লম্বা জামা ছিলো তা লুট করে নিয়ে যায় ক্বায়েস বিন আল আশআস। তার বর্ম নিয়ে যায় উমর বিন সা’ আদ এবং যখন তাকে হত্যা করা হয় মুখতার তা উপহার দেয় তার হত্যাকারী আবি উমরোহকে। তার তরবারি নিয়ে যায় জামী ’ বিন খালক আউদী , আবার এও বর্ণিত হয়েছে যে , এক তামিমি ব্যক্তি আসাদ বিন হানযালাহ অথবা ফালাফিস মুনশালি তা নিয়ে যায়। তার বিদ্যুৎগতি তরবারিটি যুলফিক্বার ছিলো না , ছিলো অন্য একটি যা ছিলো নবুয়ত ও ইমামতের একটি আমানত এবং তার বিশেষ আংটিও যা তার পরিবারের নিরাপত্তা হেফাযতে ছিলো।
শেইখ সাদুক্ব থেকে মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন যে , ইমাম জাফর আস সাদিক্ব (আ.) কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো ইমাম হোসেইন (আ.) এর আংটি সম্পর্কে যে , কে তা নিয়েছে যখন তার পোশাক লুট করা হয়েছে। ইমাম (আ.) উত্তর দিলেন ,“ যে রকম বলা হয় তেমন নয়। ইমাম হোসেইন (আ.) ওসিয়ত করে দিয়ে যান তার সন্তান ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) এর কাছে এবং হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন তার আংটি এবং ইমামতের জিনিসপত্র যা এসেছিলো আল্লাহর রাসূল (সা.) থেকে আমিরুল মুমিনীন আলী (আ.) এর কাছে। ইমাম আলী (আ.) তা ইমাম হাসান (আ.) এর কাছে হস্তান্তর করেন এবং ইমাম হাসান (আ.) তা ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে দিয়ে যান , যা পরবর্তীতে আমার পিতা (ইমাম মুহাম্মাদ আল বাকির (আ.)-এর কাছে আসে এবং তা আমার কাছে পৌঁছেছে। এটি আমার কাছে আছে এবং আমি জুম ’ আর দিন পড়ি এবং তা পড়ে নামায পড়ি। ” মুহাম্মাদ বিন মুসলিম বলেন যে , আমি শুক্রবার দিন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম এবং তার সাথে নামায পড়লাম। যখন তিনি নামায শেষ করলেন তিনি তার হাত আমার দিকে লম্বা করলেন এবং আমি আংটিটি দেখলাম তার আঙ্গুলে যাতে খোদাই করে লেখা আছে“ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই , আল্লাহ সাথে সাক্ষাতে প্রস্তুত আছি ।” তখন ইমাম বললেন ,“ এটি হলো আমার প্রপিতামহ আবু আব্দুল্লাহ হোসেইন (আ.) এর আংটি ।”
শেইখ সাদুক্বের‘ আমালি ’ ও‘ রাওযাতুল ওয়ায়েযীন ’ -এ বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর ঘোড়া তার কেশর ও কপালকে তার রক্তে রঞ্জিত করে নেয় এবং দৌঁড়াতে শুরু করে ও চিৎকার করতে থাকে। যখন নবীর নাতনীরা তার চিৎকার শুনতে পেলেন তারা তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন এবং ঘোড়াটিকে দেখলেন তার আরোহী ছাড়া , এভাবে তারা জানতে পারলেন ইমাম হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে গেছেন।
ইবনে শহর আশোব তার‘ মানাক্বিব ’ -এ এবং মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) এর ঘোড়া সেনাবাহিনীর ঘেরাও থেকে পালিয়ে এলো এবং তার কপালের চুল রক্তে ভেজালো। সে দ্রুত নারীদের তাঁবুর দিকে ছুটে গেলো এবং চিৎকার করতে লাগলো। এরপর সে তাঁবুর পিছনে গেলো এবং তার মাথাকে মাটিতে আঘাত করতে লাগলো যতক্ষণ না মৃত্যুবরণ করলো। যখন সম্মানিতা নারীরা দেখলেন ঘোড়াটিতে আরোহী নেই তারা বিলাপ শুরু করলেন এবং সাইয়েদা উম্মে কুলসুম (আ.) তার মাথাতে হাত দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে মুহাম্মাদ , হে নানা , হে নবী , হে আবুল ক্বাসিম , ও আলী , ও জাফর , ও হামযা , ও হাসান , এই হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে পড়ে গেছে এবং তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তার পাগড়ী ও পোষাক লুট করে নিয়ে গেছে। ” এ কথা বলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
সুপরিচিত যিয়ারতে নাহিয়াতে আছে ,“ এবং আপনার ঘোড়া তাঁবুর দিকে চলে গেলো , ডাক দিতে দিতে এবং কাঁদতে কাঁদতে , এরপর যখন আপনার পরিবারের নারী সদস্যরা আপনার ঘোড়াকে আরোহী ছাড়া দেখলেন এবং ঘোড়ার জিনকে বাঁকা দেখলেন , তারা তাঁবু থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন , আগোছালো চুল নিয়ে , তাদের চেহারাতে আঘাত করে মাথার চাদর ছাড়া , বিলাপ করে , কাঁদতে কাঁদতে , সম্মানিত হওয়ার পর হতাশ অবস্থায় , তারা শাহাদাতের জায়গাটিতে দৌঁড়ে গেলেন এবং শিমর (অভিশপ্ত) আপনার বুকের উপর বসেছিলো , তার তরবারি চালাচ্ছিলো (আপনার ঘাড়ে) আপনাকে জবাই করার জন্য এবং আপনার চুল তার মুঠিতে ধরা ছিলো , সে আপনাকে জবাই করছিলো তার ভারতীয় তরবারি দিয়ে , আপনার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেলো এবং আপনার শ্বাস প্রশ্বাস থেমে গেলো (আপনার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হলো) এবং আপনার মাথা বর্শার আগায় তোলা হল ।” ১৭
পরিচ্ছেদ- ২
ইমাম হোসেইন (আ.) এর জিনিসপত্র লুট ও তার আহলুল বাইতের কান্না ও বিলাপ
সাইয়েদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেন যে , একজন নারী গৃহকর্মী ইমাম হোসেইন (আ.) এর তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো এবং এক ব্যক্তি তাকে বললো ,“ হে আল্লাহর দাসী , তোমার সর্দারকে হত্যা করা হয়েছে। ” সে বলে যে , আমি আমার গৃহকর্তার কাছে দৌঁড়ে গেলাম এবং কাঁদতে শুরু করলাম , এ দেখে সব নারীরা উঠে দাঁড়ালেন এবং বিলাপ শুরু করলেন । বলা হয়েছে যে , তখন সেনাবাহিনী একত্রে এগিয়ে আসে রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশধর ও যাহরা (আ.) এর চোখের আলো হোসেইন (আ.) এর তাঁবু লুট করার জন্য এবং নারীদের কাঁধ থেকে চাদর ছিনিয়ে নেয়ার জন্য। রাসূলুল্লাহর (সা.) পরিবারের কন্যারা এবং তার আহলুল বাইত একত্রে বিলাপ শুরু করলেন এবং কাঁদলেন তাদের সাথী ও বন্ধুদের হারিয়ে।
হামীদ বিন মুসলিম বলে যে , বকর বিন ওয়ায়েলের পরিবারের এক নারী , যে তার স্বামীর সাথে ছিলো , যে উমর বিন সা’ আদের সঙ্গে ছিলো , দেখলো যে , সেনাবাহিনী নারীদের তাঁবুগুলোর দিকে এগিয়েছে এবং তাদের বোরখা ছিনিয়ে নিচ্ছে , সে একটি তরবারি তুলে নিলো এবং তাঁবুগুলোর দিকে ফিরে চিৎকার করে বললো ,“ হে বকরের পরিবার , তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) কন্যাদের লুট করছে , কোন বিচার ও কোন রায় নেই আল্লাহর কাছে ছাড়া , উঠে দাঁড়াও এবং আল্লাহর নবীর রক্তের প্রতিশোধ নাও। ” তা শুনে তার স্বামী তাকে ধরে নিয়ে গেলো।
বর্ণিত আছে যে , নারীদের তাঁবু থেকে টেনে বের করে তাঁবুগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। নবী পরিবারের নারীদের মাথার চাদর ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিলো , তারা ছিলেন খালি পায়ে এবং বন্দীদের মত সারি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। তারা বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং তারা বলেছিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , আমাদেরকে হোসেইনের শাহাদাতের জায়গাটিতে নিয়ে চলো ।” যখন তাদের দৃষ্টি শহীদদের উপর পড়লো তারা বিলাপ করতে শুরু করলেন এবং তাদের চেহারায় আঘাত করতে লাগলেন। বলা হয়েছে , আল্লাহর শপথ আমি আলী (আ.) এর কন্যা যায়নাব (আ.) কে ভুলতে পারি না যিনি হোসেইনের (আ.) জন্য কাঁদছিলেন এবং শোকাহত কণ্ঠে বলেছিলেন ,“ হে মুহাম্মাদ , আকাশের ফেরেশতাদের সালাম আপনার উপর , এ হলো হোসেইন , যে পড়ে গেছে (নিহত হয়েছে) , যার শরীর রক্তে ভিজে গেছে এবং তার শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছে এবং আপনার কন্যারা বন্দী হয়েছে। আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করি এবং মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা.) এর কাছে এবং আলী মুরতাযা (আ.) ও ফাতিমা যাহরা (আ.) ও শহীদদের নেতা হামযার কাছে , হে মুহাম্মাদ (সা.) , এই হলো হোসেইন , যে মরুভূমিতে গড়িয়ে পড়েছে এবং বাতাস তার উপর শ্বাসকষ্ট পাচ্ছে এবং সে নিহত হয়েছে অবৈধ সন্তানদের হাতে , আহ শোক , ওহ মুসিবত , আজ আমার নানা রাসূল (সা.) পৃথিবী থেকে চলে গেছেন , হে মুহাম্মাদ (সা.) এর সাথীরা , আসুন , দেখুন মুস্তাফার (সা.) বংশকে কিভাবে কয়েদিদের মত বন্দী করা হয়েছে। ”
অন্য আরেক বর্ণনায় নিচের কথাগুলি এসেছে ,“ হে মুহাম্মাদ (সা.) , আপনার কন্যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আপনার বংশকে হত্যা করা হয়েছে। বাতাস তাদের উপর ধুলো ফেলছে। এ হলো হোসেইন , তার মাথা ঘাড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং তার পোষাক ও চাদর লটু করা হয়েছে। আমার বাবা কোরবান হোক তার জন্য যার দলকে সোমবার দিন হামলা করা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার তাঁবুর দড়ি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার সাথে সাক্ষাত এখন আর সম্ভব নয় এবং তার আঘাতগুলো সুস্থ হবার নয়। আমার পিতার জীবন তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য আমার জীবন কোরবান। আমার পিতা কোরবান হোক তার জন্য যিনি দুঃখের ভিতর ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় নিহত হয়েছেন। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার দাড়ি থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়েছে। আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার নানা মুহাম্মাদ আল মুস্তাফা (সা.) , আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যারা নানা আকাশগুলোর রবের রাসূল। আমার পিতা কোরবান হোক খাদিজাতুল কুবরা (আ.) এর জন্য। আমার পিতা কোরবান হোক আলী আল মুরতাযার জন্য ; আমার পিতা কোরবান হোক ফাতিমা যাহরা (আ.) এর উপর যিনি নারীদের সর্দার । আমার পিতা তার জন্য কোরবান হোক যার জন্য সূর্য ফিরে এসেছিলো যেন তিনি নামায পড়তে পারেন। ”
বর্ণনাকারী বলেন , আল্লাহর শপথ , এ কথাগুলো শুনে প্রত্যেকেই , হোক সে বন্ধু অথবা শত্রু , কেঁদেছিলো। এরপর সাকিনা (আ.) তার পিতার দেহ জড়িয়ে ধরেন এবং বেদুইনরা চারিদিকে জমা হয় এবং তাকে তার কাছ থেকে টেনে সরিয়ে নেয়।
কাফ ’ আমির‘ মিসবাহ ’ -তে আছে যে , সাকিনা (আ.) বলেছেন যে , যখন হোসেইন (আ.) শহীদ হয়ে যান , আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম এবং আমি তাকে বলতে শুনলাম ,“ হে আমার শিয়ারা (অনুসারীরা) আমাকে স্মরণ করো যখন পানি পান করো এবং আমার জন্য কাঁদো যখন ভ্রমণকারী অথবা শহীদের কথা শোন। ” তা শুনে আমি ভয়ে উঠে পড়ি এবং কান্নার কারণে আমার চোখ ব্যথা করছিলো এরপর আমি আমার মুখে আঘাত করতে থাকি।১৮
পরিচ্ছেদ - ৩
শহীদদের মাথা , নারীদের অলংকার এবং মজলুমদের সর্দারের উট লুট করে নেয় কুফার সেনাবাহিনী
শেইখ মুফীদ বলেন যে , তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর জিনিসপত্র এবং উটগুলো এবং তার পরিবারের নারী সদস্যদের বোরখাগুলো পর্যন্তলুট করে নিয়ে যায়।
হামীদ বনি মুসলিম বলে যে ,“ আল্লাহর শপথ , আমি আমার নিজের চোখে দেখেছি যে , তারা মহিলাদের ও কন্যাদের কাঁধ থেকে বোরখা গায়ের জোরে ছিনিয়ে নিয়েছে।
আযদি বলেন যে , সুলাইমান বিন আবি রাশিদ বর্ণনা করেছে হামীদ বিন মুসলিম থেকে যে , আমি আলী বিন হোসেইন আল আসগার (ইমাম যায়নুল আবেদীন)-এর বিছানার পাশে গেলাম , তিনি অসুস্থ ও শয্যাশায়ী ছিলেন। শিমর বিন যিলজওশান তার সাঙ্গপাঙ্গ সহ তার কাছে আক্রমণাত্মক ভাবে উপস্থিত হলো এবং বললো ,“ আমরা কি তাকে হত্যা করবো ?” আমি বললাম ,“ সুবহানালাহ , আমরা কি বাচ্চাদেরও মারবো ? এ বাচ্চা ছেলেটি এখনই মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গেছে ” । আমি তার উপর লক্ষ্য রাখলাম এবং তাকে রক্ষা করলাম যখনই কেউ তার কাছে আসতে চাইলো , যতক্ষণ না উমর বিন সা’ আদ সেখানে এলো। সে বললো ,“ কেউ যেন নারীদের তাঁবুতে না ঢোকে এবং কেউ যেন এ অসুস্থ বাচ্চাকে বিরক্ত না করে। যারা তাদের জিনিসপত্র লুট করেছে তাদের উচিত সেগুলো তাদেরকে ফেরত দেয়া। ” আল্লাহর শপথ , কেউ কিছু ফেরত দেয়নি।
কিরমানির‘ আখবারুদ দাওল ’ -এ বর্ণিত আছে শিমর (তার উপর আল্লাহর গযব বর্ষিত হোক) সিদ্ধান্তনিলো (ইমাম) আলী আল আসগার (যায়নুল আবেদীন) কে হত্যা করবে , যিনি অসুস্থ ছিলেন। যায়নাব (আ.) বিনতে আলী বিন আবি তালিব (আ.) এলেন এবং বললেন , “ আল্লাহর শপথ , তোমরা তাকে হত্যা করবে না যতক্ষণ না আমাকে হত্যা করো। ” তা শুনে শিমর তার উপর থেকে হাত উঠিয়ে নিলো।
‘ রাওযাতুস সাফা ’ তে বর্ণিত আছে যে , শিমর অসুস্থ ইমাম (যায়নুল আবেদীন আ.)-এর তাঁবুতে প্রবেশ করলো। সে তাকে দেখলো বালিশের উপর শুয়ে আছেন। শিমর তার তরবারি বের করলো তাকে হত্যা করবে বলে , তখন হামীদ বিন মুসলিম বললো ,“ সুবহানাল্লাহ , কিভাবে তুমি এ বাচ্চা ছেলেটিকে মারবে ? তাকে হত্যা করো না। ” কেউ বলে যে উমর বিন সা’ আদ শিমরের হাত ধরে ফেললো এবং বললো ,“ তুমি কি আল্লাহর সামনে লজ্জিত নও ? তুমি এ অসুস্থ ছেলেটিকে মারতে চাও ?” শিমর বললো ,“ সেনাপতি উবায়দুল্লাহ থেকে আমাদের প্রতি আদেশ আছে হোসেইনের প্রত্যেক পুত্রসন্তানকে হত্যা করার জন্য। ” উমর তাকে বার বার থামালো এবং শেষে সে পিছু হটলো। এপর সে আদেশ করলো মুস্তাফা (সা.) এর বংশধরদের তাঁবু জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য।
ইবনে শাহর আশোবের‘ মানাক্বিব ’ -এ বর্ণিত আছে যে , আহমাদ বিন হাম্বাল বলেন যে , কারবালায় ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) অসুস্থ হওয়ার কারণ ছিলো এই যে , তিনি একটি লম্বা বর্ম পরেছিলেন এবং তিনি এর অতিরিক্ত অংশ ছিঁড়ে ফেলেন খালি হাতে (এ জন্য তার জ্বর এসে যায়) ।
শেইখ মুফীদ বলেন যে , অভিশপ্ত উমর বিন সা’ আদ তাঁবুগুলির সামনে এলো এবং নারীরা কাঁদতে এবং বিলাপ করতে শুরু করলেন তার সামনে। সে তার সাঙ্গপাঙ্গদের দিকে ফিরলো এবং বললো ,“ কেউ যেন নারীদের তাঁবুতে না ঢোকে এবং কেউ যেন অসুস্থ বাচ্চাকে বিরক্ত না করে ।” নারীরা তার কাছে চাইলেন যা কিছু তাদের কাছ থেকে লুট করে নেয়া হয়েছে তা ফেরত দেয়া হোক যেন তারা নিজেদের ঢাকতে পারেন (বোরখাতে) । সে বললো ,“ এ মহিলাদের কাছ থেকে যা কিছু লুট করা হয়েছে তা তাদের ফেরত দেয়া উচিত। ” আল্লাহর শপথ , কেউ কিছু ফেরত দেয় নি। এরপর সে কিছু পাহারাদার নিয়োগ করে নারীদের তাঁবুগুলির জন্য এবং অসুস্থ ইমামের জন্য এবং বলে ,“ এদের পাহারা দাও , কেউ যেন এখানে প্রবেশ না করে এবং তাদের হত্যা না করে। ” এ কথা বলে সে তার তাঁবুতে ফিরে যায় এবং তার সাথীদের মাঝে উচ্চকণ্ঠে বলে ,“ কে আছে স্বেচ্ছায় হোসেইনের উপর ঘোড়া চালাবে ?”
তাবারি বলেন যে , সিনান বিন আনাস এলো উমর বিন সা’ আদের কাছে এবং তার তাঁবুর দরজায় দাঁড়ালো এবং বললো ,“ আমার ঘোড়ার জিনের ব্যাগ ভর্তি করে দাও পুরস্কারে , কারণ আমি বাদশাহকে হত্যা করেছি যার দরজায় পাহারা ছিলো। আমি তাকে হত্যা করেছি যে ছিলো শ্রেষ্ঠ তার বাবা ও মায়ের দিক থেকে এবং যখন পূর্বপুরুষের আলোচনা হয়েছে তার ছিলো শ্রেষ্ঠ পূর্বপুরুষ ।” ১৯ উমর বিন সা’ আদ বললো ,“ তুমি পাগল এবং কখনো তোমার চিন্তার সুস্থতা আসবেনা। তাকে আমার কাছে আনো। ” তাকে আনা হলো এবং উমর তার বেত দিয়ে তার হাতে আঘাত করলো এবং বললো ,“ হে পাগল , তুমি যা উচ্চারণ করেছো তা যদি ইবনে যিয়াদ শোনে সে তোমার মাথা উড়িয়ে দিবে। ”
উক্ববাহ বিন সা’ মআনকে উমর বিন সা’ আদ গ্রেফতার করে যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর স্ত্রী রাবাবের কর্মচারী ও দাস ছিলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো ,“ তুমি কে ?” সে বললো ,“ আমি একজন দাস। ” তখন তাকে মুক্ত করে দেয়া হয় এবং আমরা তার ব্যাপারে বর্ণনা করেছি মারক্বা বিন সামামাহর সাথে , পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে।
বর্ণিত আছে উমার বিন সা’ আদ তার সাঙ্গপাঙ্গদের মাঝে উচ্চকণ্ঠে বললো ,“ তোমাদের মধ্যে কে স্বেচ্ছায় হোসেইনের দেহের উপর ঘোড়া চালাবে ?” তাদের মধ্যে দশ জন স্বেচ্ছায় তা করার জন্য এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে ছিলো ইসহাক্ব বিন হেইওয়াহ হাযরামি , যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর জামা লুটে নিয়েছিলো এবং পরে শয্যাশায়ী হয়ে গিয়েছিলো কুষ্ঠরোগে এবং আহবাস বিন মারসাদ হাযরামি। তারা এগিয়ে গেলো এবং তাদের ঘোড়া চালালো যতক্ষণ পর্যন্তনা ইমাম হোসেইন (আ.) এর পিঠ ও বুক ভেঙ্গে পিশে ফেললো। আমাকে জানানো হয়েছে যে এ ঘটনার পর আহবাশ বিন মারসাদ যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ছিলো , তখন একটি অজানা তীর এসে তাকে বিদ্ধ করলো এবং সে মৃত্যু মুখে পতিত হলো।
সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , উমর বিন সা’ আদ তার সাঙ্গপাঙ্গদের মাঝে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করে ,“ কে চায় স্বেচ্চায় হোসেইনের পিঠ ও বুকের উপর ঘোড়া চালাতে ?” দশ জন লোক তা করার জন্য স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে ছিলো , ইসহাক বিন হেইওয়াহ হাযরামি , যে ইমাম হোসেইন (আ.) এর জামা লুটে নিয়েছিল , অন্যরা ছিলো আখনাস বিন মুরসিদ , হাকীম বিন তুফাইল সুমবোসি , উমর বিন সাবীহ সাইদাউই , রাজা ’ বিন মানকায আবাদি , সালীম বিন খাইসামাহ জুফী , ওয়াহেয বিন নায়েম , সালেহ বিন ওয়াহাব জুফী , হানি বিন সাবীত হাযরামি এবং উসাইদ বিন মালিক (আল্লাহর অভিশাপ তাদের সবার উপর) । তারা ইমাম হোসেইন (আ.) এর দেহ ঘোড়ার খরেু পিষ্ট করে যতক্ষণ না তার বকু ও পিঠ পিষে যায়। বর্ণনাকারী বলে যে এ দশ জন উবায়দুল্লাহর কাছে আসে এবং উসাইদ বিন মালিক তাদের মধ্যে থেকে বলে যে , “ আমরা শক্তিশালী ঘোড়ার খুর দিয়ে পিঠের পরে বুক পিষেছি। ” (উবায়দুল্লাহ) ইবনে যিয়াদ বললো ,“ তোমরা কারা ?” তারা বললো ,“ আমরা হোসেইনের পিঠ ঘোড়ার পায়ের নিচে পিষ্ট করেছি যতক্ষণ পর্যন্তনা তার বুকের হাড় গুড়ো হয়ে গেছে। ” সে (উবায়দুল্লাহ) তাদেরকে কিছু উপহার দিলো।
আবু আমর যাহিদ বলে যে , আমরা ঐ দশ জন সম্পর্কে অনুসন্ধান করেছি এবং সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে , তাদের সবাই ছিলো জারজ। (পরে) মুখতার তাদের সবাইকে গ্রেফতার করেন এবং তাদের হাত ও পা লোহার বেড়ায় বাঁধেন। এরপর তিনি আদেশ দেন ঘোড়া দিয়ে তাদের পিঠ পিষ্ট করতে , যতক্ষণ পর্যন্তনা তারা মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলো।
সমাপ্ত
তথ্যসূত্র :
১ লেখক বলেন যে , আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে বাস্তবে , উপরে উল্লেখিত আয়াত ইমাম হোসেইন (আ.) ও নবী ইয়াহইয়া (আ.) কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে (এবং ঈসা (আ.) কে উদ্দেশ্যে করে নয়) কারণ তাদের দুজনের জীবন ছিলো প্রায় একই রকম এবং তাদের মায়ের গর্ভ ধারণের সময়সীমা ছিলো একই রকম। বর্ণিত হয়েছে যে , নবী ইয়াহইয়া (আ.) তার মায়ের গর্ভে ছিলেন ছয় মাস যেমন ছিলেন ইমাম হোসেইন (আ.) , অথচ ঈসা (আ.) এর বিষয়ে অনেক হাদীস পাওয়া যায় যে তার মা তাকে খুব অল্প সময়ের জন্য গর্ভে বহন করেছিলেন , যেমন , নয় ঘন্টা , প্রত্যেক ঘন্টা এক মাসের সমান এবং তা গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। বর্ণিত হয়েছে যে , উম্মুল ফযল , যিনি ছিলেন আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের স্ত্রী , যিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর যত্ন নিতেন , তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রশংসা করে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।
২ ইবনে শাহর আশোব‘ মানাক্বিব’ -এ লিখেছেন যে , একদিন জিবরাঈল অবতরণ করলেন এবং দেখলেন যে , হযরত ফাতিমা (আ.) ঘুমাচ্ছেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) অস্থিরতা অনুভব করছেন এবং কাঁদছেন। জিবরাঈল বসে পড়লেন এবং সান্ত্বনা দিলেন এবং শিশুর সাথে খেলা করলেন যতক্ষণ পর্যন্তনা হযরত ফাতিমা (আ.) জেগে উঠলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে এ কথা জানালেন। সাইয়েদ হাশিম হোসেইন বাহরানি তার‘ মাদিনাতুল মা’ আজিয’ -এ শারহাবীল বিন আবি আউফ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) জন্ম নিয়েছিলেন উচ্চতম বেহেশতের ফেরেশতাদের একজন অবতরণ করলেন এবং বড় সমুদ্রে গেলেন এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে আল্লাহর বান্দাহ , শোক ও দুঃখের পোষাক পরো এবং শোক পালন করো , কারণ মুহাম্মাদ (সা.) এর সন্তান পড়ে আছে মাথাবিহীন , নির্যাতিত এবং পরাভূত অবস্থায়।”
৩ বলা হয়েছে যে , একদিন এক বেদুইন এসে ইমাম হোসেইন (আ.) কে সালাম জানালেন এবং তার কাছ থেকে কিছু চাইলেন এই বলে যে: আমি আপনার নানার কাছে শুনেছি যে ,“ যদি তোমাদের কোন কিছুর প্রয়োজন থাকে তাহলে এ ধরনের লোকের কাছে চাও: একজন সম্মানিত আরব , একজন উদার মালিক যে কোরআন বুঝে অথবা যাকে একটি সুন্দর চেহারা দান করা হয়েছে।” আরবদের সম্মান আপনার নানার কারণে , আর দানশীলতা আপনার রীতি , কোরআন আপনার নিজের বাড়িতে নাযিল হয়েছে এবং বিশেষ সৌন্দর্য আপনার মাঝে স্পষ্ট এবং আমি আপনার নানাকে বলতে শুনেছি:“ যে আমাকে দেখতে চায় তার উচিত আমার হাসান ও হোসেইনের দিকে তাকানো।” ইমাম বললেন ,“ বলুন আপনি কী চান ?” বেদুইন মাটিতে তার চাহিদা লিখলেন। ইমাম বললেন ,“ আমি আমার পিতা ইমাম আলী (আ.) কে বলতে শুনেছি যে , প্রত্যেক ব্যক্তির মূল্য তার ভালো কাজ অনুযায়ী এবং আমি আমার নানা রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি যে , অনুগ্রহের পরিমাপ ব্যক্তির প্রজ্ঞা অনুযায়ী। অতএব আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করবো , আপনি যদি সেগুলোর একটির উত্তর দেন , আমি আপনার চাহিদার এক তৃতীয়াংশ পূরণ করবো , আর যদি সেগুলোর দুটোর উত্তর দেন আমি আপনার চাহিদার দুই তৃতীয়াংশ পূরণ করবো , আর যদি আপনি তিনটিরই উত্তর দেন আপনার পুরো চাহিদাই পূরণ করা হবে।” এরপর তিনি একটি মুদ্রা ভর্তি ব্যাগ বের করলেন এবং বললেন ,“ যদি উত্তর দেন , তাহলে আপনি এ থেকে পাবেন।” বেদুইন বললো ,“ আমাকে জিজ্ঞেস করুন এবং কোন নিরাপত্তা নেই ও কোন শক্তি নেই একমাত্র আল্লাহর সাথে ছাড়া , যিনি সর্বোচ্চ , সবচেয়ে বড়।” ইমাম বললেন ,“ কী জিনিস একজন বান্দাহকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করে ?” তিনি বললেন ,“ আল্লাহর উপর আস্থা ।” এরপর তিনি (আ.) জিজ্ঞেস করলেন ,“ একজন মানুষের সৌন্দর্য কী ?” তিনি বললেন ,“ জ্ঞান , সাথে সহনশীলতা।” ইমাম বললেন ,“ কিন্তু যদি তা তার না থাকে ?” তিনি বললেন ,“ সম্পদ , সাথে উদারতা এবং দানশীলতা।” ইমাম বললেন ,“ আর যদি তা না থাকে ?” তিনি বললেন ,“ দারিদ্র্য , সাথে ধৈর্য” । ইমাম বললেন ,“ যদি তা তার না থাকে ?” তিনি বললেন ,“ বজ্রাঘাত (অভিশপ্ত) যা তাকে পুড়িয়ে ফেলবে।” ইমাম মুচকি হাসলেন এবং ব্যাগটি এগিয়ে দিলেন তার দিকে। অন্য একটি হাদীসে বলা হয় যে , ব্যাগটিতে এক হাজার আশরাফি (স্বর্ণমুদ্রা) এবং তার ব্যক্তিগত দুটো মূল্যবান পাথরের আংটি ছিলো যাদের প্রত্যেকটির মূল্য ছিলো দুশত দিরহাম।
৪ বনি ইসরাইলের বারোটি গোত্র সম্পর্কে কোরআনে উলেখ আছে ,“ এবং মূসার ক্বওমে আছে একদল , যারা পথ দেখায় সত্যের মাধ্যমে এবং এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার করে এবং আমরা তাদেরকে বারোটি গোত্রে বিভক্ত করেছি।” [সূরা আরাফ: ১৫৯-১৬০]
৫ মিদহাহ - একটি খেলা যা নুড়ি পাথর দিয়ে খেলা হয় , যেগুলো একটি গর্তের দিকে লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়।
৬. এ কবিতার রচনাকারী ছিলো আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর আসাদি এবং তার কবিতাটি ছিলো এরকম:“ তুমি কি মুসলিমকে পরিত্যাগ করো নি এবং তার পক্ষে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকো নি , মৃত্যু এবং পরাভূত হওয়ার ভয়ে ? তুমি লজ্জাহীনভাবে তাকে হত্যা করেছো যাকে পাঠিয়েছিলেন মুহাম্মাদ (সা.) এর নাতি। তিনি নিরাপদে থাকতেন যদি তুমি সেখানে না থাকতে , যদি তুমি বনি আসাদের হতে তাহলে তুমি তার সম্মান বুঝতে পারতে এবং কিয়ামতের দিনে আহমাদ (সা.) এর সুপারিশ অর্জন করতে পারতে।”
৭. হানির সমালোচনা করে ইবনে আবিল হাদীদ যে ব্যাখ্যা তার শারহে‘ নাহজুল বালাগা’ তে দিয়েছেন তা হলো এ কথা ,“ রাজত্বের হাতিয়ার হলো প্রশস্ত বক্ষ” , ঐ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যখন ইরাকের সর্দাররা মুয়াবিয়ার কাছে গিয়েছিলো যখন সে লোকদেরকে আদেশ করেছিলো ইয়াযীদের কাছে বাইয়াত হতে , হানি ছিলেন ইরাকের সর্দারদের প্রতিনিধি , যিনি মুয়াবিয়াকে অনুরোধ করেন ইয়াযীদের পক্ষে বাইয়াত নেয়ার বিষয়ে তাকে দায়িত্ব দেয়ার জন্য , কিন্তু উপরের ঘটনায় দেখা যায় যে , তিনি পরিষ্কারভাবে মুয়াবিয়ার বিরোধিতা করেছিলেন , তাই উল্লেখিত রেওয়ায়েতটি অসত্য ছাড়া কিছু নয়।
৮. তাবারি এবং‘ কামিল’
৯.‘ রাওদাতুস সাফা’ -তে উল্লেখ আছে যে , তিনি শত্রু বাহিনীকে বারো বার আক্রমণ করেছিলেন।
১০. শাহাদাতের কিছু বইতে উল্লেখ আছে যে , মুররাহ বিন মুনক্বিয তার কপাল ও মাথার সংযোগ স্থানে তরবারি দিয়ে আঘাত করে এবং সৈন্যরাও তাকে আঘাত করে তাদের তরবারি দিয়ে। আলী তার ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরেন , যে তাকে শত্রুদের মাঝখানে নিয়ে যায়। তারা তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলে তাদের তরবারি দিয়ে। যখন তার সমাপ্তি ঘনিয়ে এলো তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ হে প্রিয় বাবা , এই যে এখানে আমার প্রপিতামহ রাসূলুল্লাহ (সা.) , যিনি উপচে পড়া একটি পেয়ালা আমাকে পেশ করছেন , তাই দ্রুত আসুন , দ্রুত আসুন , কারণ তিনি তার হাতে আপনার জন্যও একটি পেয়ালা ধরে আছেন যেন আপনিও তা থেকে পান করতে পারেন।”
১১. আল্লামা তুরাইহি বর্ণনা করেছেন যে , যখন আলী বিন হোসেইন (আ.) কারবালার মাটিতে শহীদ হয়ে গেলেন , ইমাম হোসেইন (আ.) তার পাশে উপস্থিত হলেন একটি জামা , আবা (লম্বা আচকান) ও একটি পাগড়ী মাথায় , যার দুপ্রান্ত তার মাথার দুপাশে ঝুলে ছিলো। ইমাম বললেন ,“ এখন , হে আমার প্রিয় সন্তান , তুমি বন্দীত্ব থেকে এবং পৃথিবীর দুঃশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেয়েছো এবং খবু শীঘ্রই আমি তোমার সাথে মিলিত হবো” ।
১২. আল্লামা মাজলিসি বলেন যে , মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব এবং আবুল ফারাজ বলেন যে , তার মা ছিলেন লায়লা , যিনি ছিলেন আবি মুররাহ বিন উরওয়াহ বিন মাস’ উদ সাক্বাফি এবং আশুরার দিন তার বয়স ছিলো আঠারো বছর। দেখা যায় যে , আবুল ফারাজও মনে করেন তার বয়স ছিলো আঠারো বছর। কিন্তু আবুল ফারাজ তার‘ মাক্বাতিলুত তালিবিইন’ -এ এরকম বলেন নি বরং বলেছেন সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি মনে করতেন আলী আকবার উসমান বিন আফফান-এর খিলাফতের সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এটি হচ্ছে তার পূর্ববর্তী উদ্ধৃতির চেয়ে সঠিক চিন্তা।
১৩. আবু সাঈদ বিন আক্বীল ঐ ব্যক্তিই যে আব্দুল্লাহ বিন যুবাইরকে মুয়াবিয়ার সমাবেশে অপমানিত করেছিলো। ইবনে আবিল হাদীদ বর্ণনা করেছেন আবু উসমান থেকে যে: একবার হাসান বিন আলী (আ.) মুয়াবিয়ার সাথে দেখা করতে গেলেন , তখন আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর সেখানে বসেছিলো। মুয়াবিয়া কুরাইশদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করলো , তাই সে ইমামকে জিজ্ঞেস করলো ,“ কে বয়সে বড় ছিলো , যুবাইর নাকি আলী ?” ইমাম হাসান (আ.) জবাব দিলেন ,“ তারা (বয়সে) কাছাকাছি ছিলেন , আর আলী ছিলেন যুবাইরের চাইতে বয়সে বড় এবং আল্লাহ আলীর উপর রহমত করুন।” আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর বললো ,“ আল্লাহ যুবাইরের উপর রহমত করুন।” আবু সাঈদ বিন আক্বীল সেখানে উপস্থিত ছিলো , বললো ,“ হে আব্দুল্লাহ , কেন তুমি চঞ্চল হয়ে উঠো যদি কেউ তার পিতার উপরে রহমত পাঠায় ?” সে বললো ,“ আমিও আমার পিতার উপর রহমত পাঠাই।” আবু সাঈদ বললো ,“ তোমার বাবা না তার সমান ছিলো , না তার মত ছিলো।” সে বললো ,“ কেন , তার কি এতে কোন অংশ নেই ? তারা দুজনেই ছিলো কুরাইশ থেকে এবং দুজনেই খিলাফত দাবী করেছিলেন , কিন্তু তাদের একজনও সফল হন নি” । আবু সাঈদ বললেন ,“ তোমার মন থেকে তা দূর করে দাও , আলী (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কারণে কুরাইশদের মাঝে মর্যাদার আসনে ছিলেন , যা তুমি জান এবং যখন তিনি খিলাফতের দাবী করেছিলেন , তারা তার আনুগত্য স্বীকার করেছিলো এবং তিনি ছিলেন দলপতি। অন্যদিকে যুবাইর এক বিষয়ে উচ্চাশা পোষণ করেছিলো এবং তার অধিনায়ক ছিলো একজন নারী এবং যখন জামাল-এর যুদ্ধ তীব্র হলো সে পিছনে হটে গিয়েছিলো এবং মিথ্যা থেকে সত্য পৃথক হওয়ার আগেই সে পালিয়ে গিয়েছিলো। এক পক্ষাঘাতগ্রস্তব্যক্তি তার মাথা বিচ্ছিন্ন করেছিলো এবং তার পোষাক লুট করে নিয়েছিলো। আর আলী ছিলেন তার চাচাতো ভাই (রাসূলুল্লাহ সা.)-এর যুগের মত , যিনি আরো এগিয়ে গিয়েছিলেন। আল্লাহ যেন আলীর উপর রহমত করেন।” ইবনে যুবাইর বললো ,“ হে আবু সাঈদ , তুমি যদি অন্য কারো সাথে এ রকম কথা উচ্চারণ করতে , তাহলে তুমি বুঝতে পারতে।” আবু সাঈদ জবাব দিলো , যার কারণে (মুয়াবিয়াকে ইঙ্গিত করে) তুমি তাকে (আলীকে) গালিগালাজ কর সে নিজেই তোমার প্রতি অনুৎসাহী।” মুয়াবিয়া তাদের কথায় বাধা দিলো এবং তারা চুপ করে গেলো।
১৪.‘ মাদিনাতুল মা’ আজিয’ -এ আছে যে , ক্বাসিম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তার চাচা ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে ফেরত এলেন এবং বললেন ,“ হে প্রিয় চাচা , পিপাসা , পানি দিয়ে আমার পিপাসা মেটান।” ইমাম সহনশীল হওয়ার জন্য উপদেশ দিলেন এবং এরপর তার আংটিটি দিলেন তার মুখে রাখার জন্য। ক্বাসিম বলেছেন যে , যখন আমি আমার মুখে আংটিটি রাখলাম মনে হলো তা একটি পানির ঝরণার মত। আমার পিপাসা মিটলো এবং আমি যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত গেলাম।
১৫. আবু হানিফা দিনাওয়ারি বলেন যে , যখন আব্বাস বিন আলী (আ.) তা দেখলেন তিনি তার ভাই আব্দুল্লাহ , জাফর এবং উসমান বিন আলীকে , যারা ছিলেন ওয়াহীদের বংশধর উম্মুল বানীন আমিরিয়ার সন্তান , বললেন যে ,“ আমার জীবন তোমাদের জন্য কোরবান হোক , আরো এগিয়ে যাও এবং তোমাদের অভিভাবক (মাওলা হোসেইন আ.)-এর জন্য তোমাদের জীবন দাও।” তারা সবাই এগিয়ে গেলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) কে রক্ষা করতে লাগলেন তাদের চেহারা ও ঘাড় দিয়ে। হানি বিন সাওব (বা সাবীত) হাযরামি আক্রমণ করলো আব্দুল্লাহ বিন আলীকে এবং তাকে হত্যা করলো। এরপর সে তার ভাই জাফরকে আক্রমণ করলো এবং তাকেও হত্যা করলো। ইয়াযিদ বিন আসবাহি একটি তীর ছুঁড়লো উসমান বিন আলীকে এবং তাকে হত্যা করলো। এরপর সে এগিয়ে গিয়ে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করলো। সে তার মাথাকে উমর বিন সা’ আদের কাছে আনলো এবং এর একটি পুরস্কার চাইলো। উমর জবাব দিলো ,“ যাও , তোমার পুরস্কার চাও তোমার সেনাপতি উবায়দুলাহর কাছে। পুরস্কার আছে তার কাছে।” শুধু আব্বাস বিন আলী রয়ে গেলেন। তিনি ইমাম হোসেইন (আ.) এর পাশে থেকে যুদ্ধ করলেন এবং তাকে রক্ষা করলেন। তিনি সব জায়গায় তার সাথে ছিলেন শহীদ হওয়া পর্যন্ত।
১৬. দাইনূরী বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন পিপাসার্ত এবং এক পেয়ালা পানি চাইলেন এবং যখন তিনি তা ঠোঁটের কাছে তুললেন , হাসীন বিন নামীর তার মুখের দিকে একটি তীর ছুঁড়লো এবং তিনি তা পান করতে পারলেন না। তখন তিনি পেয়ালাটি মাটিতে রেখে দিলেন।
১৭.‘ মাদিনাতুল মা’ আজিয’ -এ ইবনে শাহর আশোব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে , আবু মাখনাফ বর্ণনা করেছে জালুদি থেকে যে: যখন ইমাম হোসেইন (আ.) মাটিতে পড়ে গেলেন , তার ঘোড়া তাকে রক্ষা করতে লাগলো। সেটি ঘোড় সওয়ারদের উপর লাফ দিয়ে উঠতে লাগলো এবং তাদেরকে জিন থেকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো। সেটি তাদেরকে তার পায়ের তলায় পিষলো এবং চক্কর দিতে থাকলো যতক্ষণ না চল্লিশ জনকে হত্যা করলো। এরপর সে নিজেকে ইমাম হোসেইন (আ.) এর রক্তে ভিজিয়ে নিলো এবং তাঁবুর দিকে ছুটে গেলো। সে উচ্চকণ্ঠে ডাকতে লাগলো এবং মাটিতে খুর দিয়ে আঘাত করতে লাগলো।
১৮. ইবনে আবদ রাব্বাহ তার‘ ইক্বদুল ফারীদ’ -এ বর্ণনা করেছেন হাম্মাদ বিন মুসলিমাহ থেকে , তিনি সাবীত থেকে , তিনি বর্ণনা করেছেন আনাস বিন মালিক থেকে যে: যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দাফন করলাম , সাইয়েদা ফাতিমা যাহরা (আ.) আমার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে আনাস , কীভাবে তোমার অন্তর সায় দিলো রাসূলুল্লাহ (সা.) চেহারায় মাটি ঢালতে ?” এ কথা বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন এবং উচ্চকণ্ঠে বললেন ,“ হে প্রিয় বাবা , আপনি রাজী হয়েছেন যখন আপনার রব আপনার সাক্ষাত চেয়েছেন , হে আমার প্রিয় বাবা যার নিকটবর্তী তার রব (শেষ পর্যন্ত) ।” ফাতিমা (আ.) এর অবস্থা ছিলো এরকম তার পিতার দাফনের পর , তাহলে কী নেমে এসেছিলো সাকিনা (আ.) র উপর যখন তিনি তার পিতার রক্তাক্ত লাশ জড়িয়ে ধরেছিলেন , যা ছিলো মাথাবিহীন এবং তার পাগড়ী ও পোষাক লুট হয়ে যাওয়া , হাড়গুলো ভাঙ্গা ও বাকা পিঠসম্পন্ন ? এরপর তিনি তার অবস্থা এভাবে বর্ণনা করেছেন:“ কিভাবে তোমাদের অন্তর সায় দিলো যখন তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সন্তানকে হত্যা করলে ? কিভাবে তোমরা তার বুকের হাড়গুলো ভেঙ্গে পিষে ফেললে যা ছিলো‘ পবিত্র জ্ঞান’ -এর ভাণ্ডার ?”
১৯. তাবারি বলেন যে , সৈন্যবাহিনী সিনান বিন আনাসকে বললো ,“ তুমি হোসেইনকে হত্যা করেছো , যে ছিলো আলী ও রাসূলুল্লাহর কন্যার সন্তান এবং তুমি হত্যা করেছো সবচেয়ে বিপজ্জনক আরবকে যে বনি উমাইয়া থেকে রাজত্ব ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিলো। তাই তোমার অধিনায়কদের কাছে যাও এবং প্রচুর পুরস্কার চাও , কারণ যদি তারা তাদের সব সম্পদ তোমাকে দিয়ে দেয় হোসেইনের হত্যার বদলে , তাও হবে কম।”
সূচীপত্র
প্রথম অধ্যায় ৯
পরিচ্ছেদ - ১ ১০
ইমাম হোসেইন (আ.) এর কিছু গুণাবলী সম্পর্কে ১১
পরিচ্ছেদ - ২ ২৩
দ্বিতীয় অধ্যায় ৬২
পরিচ্ছেদ - ১ ৬৩
মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের মৃত্যু সম্পর্কে ৬৪
পরিচ্ছেদ - ২ ৬৮
মদীনার গভর্নর ও ইমাম হোসেইন (আ.) ৬৯
পরিচ্ছেদ - ৩ ৭৬
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথে ফেরেশতাদের কথাবার্তা ৮১
ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রতিরক্ষায় জিনদের সেনাবাহিনী ৮২
যাত্রার সময় (নবীর স্ত্রী) উম্মু সালামা (আ.) এর সাথে ইমাম হোসেইন (আ.) এর কথোপকথন ৮৪
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারীর সাথে ইমাম (আ.) এর কথোপকথন ৮৬
পরিচ্ছেদ - ৪ ৮৮
ইমাম হোসেইন (আ.) এর প্রতি কুফাবাসীদের চিঠি ৯১
পরিচ্ছেদ - ৫ ৯৪
নোমান বিন বাশীর কুফার জনগণকে সতর্ক করে দিলো ৯৭
নোমান বিন বাশীরের ব্যক্তিত্বের ওপরে একটি বর্ণনা ১০০
পরিচ্ছেদ - ৬ ১০২
বসরার সম্মানিত লোকদের প্রতি ইমামের চিঠি ১০৩
পরিচ্ছেদ - ৭ ১১০
কুফার উদ্দেশ্যে উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের বসরা ত্যাগ ১১১
পরিচ্ছেদ - ৮ ১১৫
কুফাতে উবায়দুল্লাহ ১১৬
মুসলিম বিন আক্বীল (আ.) উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের দরবারে ১৩৭
মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিব (আ.) কে হত্যা ১৪০
হানি বিন উরওয়াহ মুরাদির শাহাদাত ১৪২
পরিচ্ছেদ - ৯ ১৫২
মেইসাম বিন ইয়াহইয়া আত-তাম্মারের শাহাদাত ১৫৩
হাবীব বিন মুযাহির ও মেইসাম আত-তাম্মারের সাক্ষাৎ ১৫৬
বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) তার রহস্যগুলো একটি কূপের কাছে বর্ণনা করতেন ১৫৮
হুজর বিন আদির শাহাদাত ১৬৯
মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের দুই শিশু সন্তানের শাহাদাত ১৯২
পরিচ্ছেদ - ১০ ২০০
ইমাম হোসেইন (আ.) এর মক্কা থেকে ইরাকের দিকে যাত্রার নিয়ত ২০১
পরিচ্ছেদ - ১১ ২১০
ইমাম হোসেইন (আ.) এর মক্কা থেকে কুফা রওনা করা সম্পর্কে ২১১
পরিচ্ছেদ - ১২ ২২৯
পরিচ্ছেদ - ১৩ ২৪৬
কুফার পথে ইমাম হোসেইন (আ.) ২৪৭
পরিচ্ছেদ - ১৪ ২৫১
কাববালায় ইমাম হোসেইন (আ.) এর আগমন , উমর বিন সা ’ আদের প্রবেশ ও তখনকার পরিস্থিতি ২৫২
ইমাম হোসেইন (আ.) এর কাছে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের চিঠি ২৫৮
পরিচ্ছেদ - ১৫ ২৬৫
কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.) ২৬৬
পরিচ্ছেদ - ১৬ ২৭২
শিমর বিন যিলজওশনের কারবালায় আগমন এবং নয় মহররমের রাতের ঘটনাবলী ২৭৩
আব্বাস বিন আলী (আ.) এর কাছে নিরাপত্তা দানের প্রস্তাব ২৭৬
পরিচ্ছেদ - ১৭ ২৮০
আশুরার (দশ মহররম) রাতের ঘটনাবলী ২৮১
পরিচ্ছেদ - ১৮ ২৯৩
আশুরার দিনের ঘটনাবলী ২৯৪
আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন (আ.) এর খোতবা ২৯৯
কুফাবাসীদের প্রতি ইমাম হোসেইন (আ.) এর বক্তব্য ৩০৭
পরিচ্ছেদ - ১৯ ৩১৩
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের যুদ্ধের প্রশংসা ও তাদের শাহাদাত ৩১৪
ইমাম হোসেইন (আ.) এর সাথীদের অবস্থা সম্পর্কে পুনরায় আলোচনা ৩৭১
পরিচ্ছেদ - ২০ ৩৭৩
আবুল হাসান আলী বিন হোসেইন আল আকবার (আ.) এর শাহাদাত ৩৭৪
আলী আকবার (আ.) এর নানা উরওয়াহ বিন মাসউদ সম্পর্কে বর্ণনা ৩৭৬
আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৮৪
আউন বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৮৬
মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন জাফর বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৮৮
আব্দুর রহমান বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৮৯
জাফর বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৯০
আব্দুল্লাহ আল আকবার বিন আক্বীল বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৯১
ক্বাসিম বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর শাহাদাত ৩৯২
আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন আলী বিন আবু তালিবের শাহাদাত ৩৯৫
আবু বকর বিন হাসান বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৯৬
বিশ্বাসীদের আমির আলী (আ.) এর সন্তানদের শাহাদাত ৩৯৭
আব্দুল্লাহ বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৯৮
জাফর বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৩৯৯
উসমান বিন আলী বিন আবি তালিবের শাহাদাত ৪০০
আব্বাস বিন আলী বিন আবি তালিব (আ.) এর শাহাদাত ৪০৪
হযরত আব্বাসের বীরত্বের বিবরণ ৪১৫
পরিচ্ছেদ - ২১ ৪১৮
দুধের শিশু আব্দুল্লাহ (আলী আল আসগার)-এর শাহাদাত ৪২১
তৃতীয় অধ্যায় ৪৪৫
শাহাদাতের পরের ঘটনাবলী সম্পর্কে ৪৪৬
ইমাম হোসেইন (আ.) এর জিনিসপত্র লুট ও তার আহলুল বাইতের কান্না ও বিলাপ ৪৫০
শহীদদের মাথা , নারীদের অলংকার এবং মজলুমদের সর্দারের উট লুট করে নেয় কুফার সেনাবাহিনী ৪৫৩
তথ্যসূত্র : ৪৫৭