কারবালা ও

হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর শাহাদত

সাইয়েদ ইবনে তাউস

আল হোসেইনী প্রকাশনী


কারবালা ও হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর শাহাদত

সাইয়েদ ইবনে তাউস

প্রকাশকঃ

মেজর (অবঃ) মোঃ আবদুল ওয়াহেদ

আল হোসেইনী প্রকাশনী

পাক পাঞ্জাতন পরিষদ

বাড়ী নং-১২ , সড়ক নং-৬ ,

সেক্টর-৬ , উত্তরা , ঢাকা

প্রকাশকালঃ

১০ মুহররম , ১৪১৫ হিজরী

২১ জুন , ১৯৯৪ ইংরেজী

৭ আষাড় , ১৪০১ বাংলা

প্রচ্ছদঃ

আরিফুর রহমান


এই বইটি আল হাসানাইন ( আ .) ওয়েব সাইট কর্তৃক আপলোড করা হয়েছে ।

http://alhassanain.org/bengali


ভূমিকা

الْحمْدُ للّه الْمُتجلّى لعباده منْ أُفُق الاْلْباب، الْمُجْلى عنْ مُراده بمنْطق السُّنّة والْكتاب، الّذى نزّه أوْلي أهُ عنْ دار الْغُرُور، وسما بهمْ إلى أنْوار السُّرُور الصلاة و السلام علی محمد خاتم الانبی أ و علی اله المنتجبین الازکی أ سیّما علی سبطه المظلوم سیّد الشهد أ من الان الی یوم اللق أ

“ কারবালা ও হযরত ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদত ” সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হোসাইন ইবনে আলী (আ.)-এর জীবন চরিত সম্পর্কে রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ লোহুফ ’ -এর বাংলা অনুবাদ। সাইয়েদ ইবনে তাউস নামক একজন প্রসিদ্ধ মনিষী গ্রন্থটি আরবীতে রচনা করেন। বলা যায় যে , এটি হচ্ছে এ সম্পর্কিত একটি পূর্ণাঙ্গ , নির্ভরযোগ্য ও একই সাথে সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ। কলেবরে ছোট হলেও প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে সন্নিবেশিত হয়েছে। একটি অনুবাদ গোষ্ঠি কর্তৃক বইটি ফার্সি থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

বইটি তিনটি ভাগে বিন্যস্তঃ

প্রথম অধ্যায়-জন্ম থেকে ১০ই মহররম পর্যন্ত ইমাম হোসাইনের (আ.) জীবন চরিত।

দ্বিতীয় অধ্যায়-আশুরার দিন কারবালার ঘটনা ও শহীদগণের নিহত হওয়ার বিস্তারিত বিবরণ।

তৃতীয় অধ্যায়-হযরত ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের পর হতে আহলে বাইতের মদীনায় ফিরে আসা পর্যন্ত সময়কালের খুটিনাটি ঘটনাবলীর বিবরণ।

ইমাম হোসাইন (আ.) এর ঐতিহাসিক শাহাদতের সঠিক তথ্যাবলী জানার জন্য নির্ভরযোগ্য বই এর অত্যন্ত অভাব। বিশ্বের সর্বকালের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রকৃত মুক্তি ও স্বাধীনতা লাভের লক্ষে শহীদদের সর্দার ইমাম হোসাইন (আ.)-আত্মত্যাগের যে মহান ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন ক্ষমতাসীন স্বার্থান্বেষী মহলের অব্যাহত শত্রুতার কারণে দুনিয়ার বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে তা সঠিকভাবে আসতে পারেনি। মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন যে , ইমাম (আ.) একদল কুফাবাসী অনুসারীদের মিথ্যা আশ্বাসের উপর নির্ভর করে কারবালায় গিয়ে এক মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হন। প্রকৃত ঘটনা না জানার কারণেই সর্ব যুগের শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) সম্পর্কে এ ধরণের ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ রয়ে গেছে। অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে একটু চিন্তা করলেই দেখা যাবে যে , এজিদকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যেও যদি তিনি ইরাকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতেন তাহলে একদল সশস্ত্র অনুসারী যোগাড় করে সঙ্গে নিতেন , যা তিনি করেন নি।

এ যাত্রার সিদ্ধান্তের কথা জেনে তার আনেক শুভানুধ্যায়ী এর ভয়াবহ পরিণতির কথা তাকে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ইমাম (আ.) তার সিদ্ধান্তে এতই অটল ছিলেন যে , তিনি কারো কথায় কান না দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন নি ।

আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এর প্রিয়তম দৌহিত্র , জ্ঞানের দরজা হযরত আলী (আ.)-এর সন্তান , বেহেশতের যুবকদের সর্দার তিনি এ ধরনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অন্য কারো দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন এটা চিন্তাও করা যায় না। তদুপরি হুজুর (সা.) তার সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বানী করে গেছেন যে , কারবালার মাটিতে তিনি শহীদ হবেন।

মহান আল্লাহ তার এক প্রিয় বান্দাহকে দিয়ে কারবালার পবিত্র প্রান্তরে এমন এক শোকাবহ হৃদয়বিদারক ঘটনার অবতারণা করাবেন যা সর্বকালের স্বাধীনতাকামী মজলুমের মানুষের জন্য একমাত্র আদর্শ ও প্রেরণার চিরস্থায়ী উৎসে-পরিণত হয়ে থাকবে। এ মহান আত্মত্যাগ ও শ্রেষ্ঠ কোরবানীর মাধ্যমে যে মহা মূল্যবান শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন তা হচ্ছে , জালিম শাসকরা যত শক্তিশালীই হোক না কেন সত্যপন্থীদের দায়িত্ব হচ্ছে-ঈমানের উপর নির্ভর করে প্রতিপক্ষের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মোকাবিলায় শেষ রক্তবিন্দু ঢেলে দিয়ে সত্যের সাক্ষ্যদান করা। একমাত্র এ ধরনের চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমেই মেকী মানবতার কল্যাণকামী ও মেকী ঈমানের দাবীদারদের মুখোশ উন্মোচিত জনগণের ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়ে অনিবার্য ধ্বংস ও পতনকে ত্বরান্বিত করবে।

বিশ্বব্যাপী মিথ্যা ও জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সত্যপন্থীদের এ সংগ্রামে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদত মূল্যবান এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে থাকবে।

অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে হলেও এ বইটিতে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জীবনের বিভিন্ন দিক ও ঘটনাবলী নির্ভুল ও বিশ্বস্ততার সাথে উপস্থাপন করা হয়েছে । আশা করি প্রত্যেক সচেতন বাংলা ভাষাভাষী ভাই-বোন এ মহা মূল্যবান গ্রন্থটি পাঠ করে তাদের জীবনের জন্য এক নতুন প্রেরণার সন্ধান পাবেন।

বিনীত

প্রকাশক


প্রথম অধ্যায়

পূর্বাভাষ

সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) চতুর্থ হিজরী ৪ সনে শাবান মাসের ৫ম রাতে জন্মগ্রহণ করেন। এক রেওয়ায়েত অনুসারে ৩রা শাবান তিনি জন্ম নেন । কারো কারো মতে ৩য় হিজরীর রবিউল আওয়াল মাসের শেষ দিনে তার জন্ম হয় । তার জন্ম তারিখের ব্যাপারে ভিন্নতর রেওয়ায়েতও রয়েছে।

হযরত হোসাইন (আ.) এর জন্মগ্রহণের পর এক হাজার ফেরেশতা সাথে নিয়ে হযরত জিব্রাইল (আ.) মোবারকবাদ জানানোর জন্য রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে উপস্থিত হন। হযরত ফাতেমা (সা.আ.) নবজাতক সন্তানকে পিতার কাছে নিয়ে আসেন । নবী করিম (সা.) তাকে দেখে অত্যন্ত খুশী হন এবং তার নাম রাখেন হোসাইন ’ ।

উম্মুল ফজলের স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

ইবনে আব্বাস তাবাকাত ’ কিতাবে আব্দুল্লাহ ইবনে বাকার ইবনে হাবীব সাহমী সূত্রে হাতেম ইবনে সানআ হতে বর্ণনা করেন যে , আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিবের স্ত্রী উম্মুল ফজল বলেন- হোসাইন (আ.)এর জন্মের পূর্বে এক রাতে স্বপ্নে দেখলাম পয়গাম্বর (সা.) এর শরীর হতে এক টুকরা গোশত পৃথক হয়ে আমার কোলে এসে পড়ল । এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা সারাসরি রাসূল (সা.) এর কাছে জানতে চাইলাম । তিনি বললেন , তোমার স্বপ্ন যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে অচিরেই আমার কন্যা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিবে এবং আমি তাকে দুধ পান করানোর জন্য তোমার কছে দিব ।

কিছুদিন পর হযরত ফাতেমার (সা.আ.) ঘরে এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয় । দুগ্ধপানের জন্য সেই শিশু চলে আসে আমার কোলে । একদিন তাকে রাসূল (সা.) এর খেদমতে নিয়ে গেলাম । তিনি নবজাতককে নিজের হাটুর উপর বসালেন এবং একের পর এক চুমু দিতে লাগলেন । এ সময় তার এক ফোটা পেশাব রাসূলে খোদার জামায় পড়ে গেল । তখন খুব জোরে আমি নবী (সা.) এর কোল থেকে তাকে ছিনিয়ে নিলাম । যার ফলে সে কেদে উঠল । রাসূল (সা.) রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন- হে উম্মুল ফজল! আমার জামা ধোয়া হবে ; কিন্তু তুমি আমার সন্তানকেই কষ্ট দিয়েছো । ” এরপর আমি হোসাইন (আ.) কে ওখানে রেখে পানি আনার জন্য বাইরে গেলাম । ফিরে এসে দেখি , রাসূল (সা.) কাদছেন । জিজ্ঞেস করলাম- ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কেন কাদছেন ? তিনি বললেন- একটু আগে ফেরেশতা জিব্রাইল এসে আমাকে বলে গেল যে , আমার একদল পথভ্রষ্ট উম্মত আমার এই সন্তানকে হত্যা করবে । মুহাদ্দেসগণ বর্ণনা করছেন যে , হযরত হোসাইন (আ.) এর বয়স যখন ১ বছর , তখন ১২ জন ফেরেশতা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর কাছে অবতীর্ণ হন যাদের আকৃতি ছিল ভিন্ন ধরনের এবং চেহারা ছিল রক্তিম । তাদের পাখাগুলো ছিল উন্মুক্ত । তারা বলল হে মুহাম্মদ কাবিলের পক্ষ থেকে হাবিলের উপর যে জুলুম হয়ছে ঠিক একই জুলুম আপনার সন্তানের উপর আপতিত হবে । এতে হাবিলকে যে সওয়াব দেয়া হয়েছে , সে রকম সওয়াব তাকেও দেয়া হবে । আর তার হত্যাকরীদের শাস্তি ও আযাব হবে কাবিলের শাস্তির মত । ঐ সময় আসমানসমূহে আল্লাহর কোন নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা ছিলেন না । বরং সবাই রাসূল (সা.) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে হোসাইন (আ.) এর নিহত হওয়ার ব্যাপারে শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন-সঙ্গে ঐ শাহাদতের বিনিময়ে মহান আল্লাহ যে সওয়াব ও প্রতিদান নির্ধারণ করেছেন , সে সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন । একইভাবে হযরত হোসাইন (আ.) এর কবরের মাটি এনে রাসূল (সা.) কে দেখান ।

এ অবস্থার মধ্যেই নবী (সা.)বলেন- আল্লাহ তুমি ঐ ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত কর , যে আমার সন্তান হোসাইনকে অপমানিত করবে । তুমি ঐ লোককে হত্যা কর , যে আমার হোসাইনে হত্যা করবে । আর তার হত্যাকারীকে তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে দিওনা। ”


হোসাইন (আ.) এর শাহাদত সম্পর্কে জিব্রাইল (আ.) এর সংবাদ প্রদান

হযরত হোসাইন (আ.) এর বয়স যখন দু বছর তখন রাসূলে খোদা (সা.) এক সফরে গমণ করেন । সফর কালে তিনি পথিমধ্যে দাড়িয়ে বলে উঠলেন-

انّا لله و انّ الیه راجعون (ইন্নানিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন) এ বাক্য উচ্চারণের সাথে সাথে তার অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে । কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলেন- জিব্রাইল (আ.) এই মাত্র আমাকে সেই ভূমির খবর দিয়ে গেল , যে ভূমি ফোরাত নদীর সাথে মিশেছে এবং তার নাম কারবালা । বলেছে যে , আমার সন্তান হোসাইনকে সে জমিতেই হত্যা করা হবে । জিজ্ঞাসা করা হল ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার হত্যাকারী কে ? এরশাদ করলেন , ঐ ব্যক্তির নাম হল ইয়াজিদ । মনে হচ্ছে , আমি এখন হোসাইন নিহত হওয়া এবং দাফন হওয়ার স্থান দু টি চোখে দেখতে পাচ্ছি । আল্লার রাসূল ঐ সফর থেকে চিন্তিত অবস্থায় ফিরে আসেন এবং (মসজিদে নববীর) মিম্বরে দাড়িয়ে খোৎবা প্রদান করেন , লোকদের উপদেশ দেন এবং তার পাশে অবস্থানরত হাসানের (আ.) মাথায় ডান হাত এবং হোসাইনের (আ.) মাথায় বাম হাত রেখে আসমানের দিকে মাথা তুলে বললেন- ইয়া আল্লাহ! মুহাম্মদ তোমার বান্দা এবং তোমার রাসূল । এ দু জন আমার বংশের পবিত্র এবং সম্মানিত ব্যক্তি । তাদেরকে আমার উম্মতের মাঝে আমার উত্তরাধিকারী হিসেবে রেখে যাচ্ছি । জিব্রাইল (আ.) আমাকে জানিয়েছে যে , আমার এই সন্তানদের লাঞ্ছিত করা হবে । ইয়া আল্লাহ তাদেরকে তুমি শাহাদতের সূধা পান করাও । তাদেরকে শহীদদের সর্দার বানাও এবং তাদের হত্যাকারী এবং লাঞ্ছনাকারীদের জন্য তা অশুভ কর ।

রাসূলে খোদা (সা.) এর কথা এ পর্যন্ত পৌছার সাথে সাথে মজলিশে কান্নার রোল উঠল। পয়গম্বর (সা.) জিজ্ঞেস করলেন- তোমরা কি তার জন্য কান্নাকাটি করছ ? এরপর তিনি মজলিস থেকে বের হয়ে গেলেন । একটু পরেই মসজিদে ফিরে আসলেন । কিন্ত তার চেহারার রং পরিবর্তিত এবং চিন্তাগ্রস্থ ছিল । এবারও কান্না জড়িত কন্ঠে খুব সংক্ষিপ্ত খুতবা দিলেন এবং বললেন-

হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের মধ্যে দু টি বড় জিনিস আমানত হিসেবে রেখে যাচ্ছি । একটি: হল কুরআন , দ্বিতীয়টি: আহলে বাইত। হাউজে কাউছারের পাড়ে আমার সাথে দেখা করার আগ পর্যন্ত উভয়ে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হবেনা । জেনে রাখবে যে , শেষ বিচারের দিন আমি এ দুই আমানতের অপেক্ষায় থাকব । আমি আমার আহলে বাইত সম্পর্কে তোমাদের কাছে কিছুই চাইনা । তবে হ্যাঁ , আল্লাহ তা ’ আলা যতটুকু হুকুম দিয়েছেন ততটুকুই তোমাদের প্রতি আমার আহবান । আল্লাহ আমাকে হুকুম দিয়েছেন যেন তোমাদের কাছে আমার আহলে বাইতের মহব্বত দাবী করি । কাজেই তোমরা ভালভাবে লক্ষ কর-আমার আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা নিয়ে এবং তাদের প্রতি জুলুম করে যেন কেউ কিয়ামতের দিন আমাদের সাথে সাক্ষাত না করে । মনে রেখ যে , কিয়ামতের দিন ৩টি পতাকার পশ্চাতে আমার উম্মতের ৩ টি দল আমার সম্মুখে হাজির হবে। এর মধ্যে-

প্রথম পতাকাঃ প্রথম পতাকাটি হচ্ছে কালো , ফেরেশতারা এই পতাকা দেখে বিচলিত হয়ে পড়বে । সেই পতাকার অধীনস্থ লোকেরা আমার সামনে এসে দাড়াবে । তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করব- তোমরা কে ? তারা আমার নাম ভূলে বলবে , আমি তাওহীদপন্থী এবং আরবের লোক । তাদেরকে বলব যে , আমি হলাম আহমাদ-আরব ও আজমের পয়গাম্বর । তারা বলবে- আমরা আপনার উম্মত । তখন জিজ্ঞাসা করব- আমার অবর্তমানে আহলে বাইত (আ.) ও কুরআনের সাথে কিরূপ আচরণ করেছ ? তারা বলবে-কুরআনের প্রতি অবহেলা এবং তার হুকুম অনুযায়ী আমল ও কাজ ত্যাগ করেছি আর আপনার আহলে বাইতকে (আ.)ধ্বংস করে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছি । এরপর আমি তাদের দিক হতে আমার চেহারা ফিরিয়ে নেব । ওরা পিপাসার্ত এবং কালো অন্ধকার চেহারা নিয়ে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে ।

দ্বিতীয় পতাকাঃ দ্বিতীয় পতাকার পশ্চাতের লোকেরা এগিয়ে আসবে । তাদের পতাকা প্রথম পতাকার চাইতে অধিক কালো । আমি তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করব- আমার পরে আামার বড় ও ছোট দুই আমানতের সাথে কি ধরনের আচরণ করেছ ? কুরআন ও আহলে বাইতে (আ.) এর সঙ্গে কি ধরনের ব্যবহার করেছ । জবাবে বলবে- কুরআনের বিরোধিতা করেছি এবং আপনার আহলে বাইতকে লাঞ্ছিত করেছি । তাদেরকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত করেছি । আমি তাদেরকে বলব , দূর হও আমার সম্মুখ থেকে । তারা কালো চেহারা ও পিপাসার্ত কন্ঠে চলে যাবে।

তৃতীয় পতাকাঃ তৃতীয় পতাকা সামনে নিয়ে আরেক দল আমার কাছে উপস্থিত হবে । তাদের চেহারা থেকে নূর ঠিকরে পড়বে । আমি তাদের জিজ্ঞেস করব-তোমরা কে ? তারা বলবে-আমরা কালেমা তাইয়্যেবায় বিশ্বাসী , তাকওয়া ও পরহেজগারীর অনুসারী , রাসূলে আকরাম (সা.) এর উম্মত । আমরাই হলাম সত্যের একনিষ্ঠ অনুসারী , যাদের ধর্মে সামান্যতম নড়বড় বা সংশয়ের সৃষ্টি হয়নি । আমরা মহান রাব্বুল আলামিনের কিতাব কুরআন মজিদকে হাতে ধারণ করে এর হালালকে হালাল এবং হারামকে হারাম মেনে চলেছি । আমরা আমাদের নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) এর আহলে বাইতকে ভালবাসতাম । তাদেরকে নিজের মত মনে করেছি এবং তাদের সাহায্যের বেলায় সামান্যতম অবহেলাও প্রদর্শন করিনি । তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি । আমি তাদেরকে বলব- তোমাদের জন্য সুসংবাদ , আমি হলাম তোমাদের নবী মুহাম্মদ । তোমরা এখন যে রকম বললে দুনিয়াতেও ঐ রকম ছিলে । এরপর আমি তাদেরকে হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করাব । তারা সহাস্য বদনে আনন্দিত হয়ে বেহেশতের দিকে চলে যাবে । ওখানেই তারা চিরকাল থাকবে ।

মুআবিয়ার মৃত্যু ও ইয়াজিদের চিঠি

মুআবিয়া হিজরী ৬০ সালের রজব মাসে মারা যায় । ইয়াজিদ মদীনার তৎকালীন গভর্ণর ওলিদ ইবনে ওতবার কাছে এক পত্র লিখল । ঐ পত্রে নির্দেশ ছিল যে আমার আনুগত্যের পক্ষে মদীনার সব লোক বিশেষ করে হোসাইনের কাছ থেকে বাইআত গ্রহণ কর । হোসাইন যদি বাইআত করতে অস্বীকার করে তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দাও এবং আমার কাছে পাঠিয়ে দাও । ওলিদ মারওয়ানকে দরবারে ডেকে পাঠায় এবং এ ব্যাপারে তার পরামর্শ জানতে চায় । মারওয়ান বলল যে , হোসাইন (আ.) শির নত করবে না এবং কিছুতেই ইয়াজিদের হাতে বাইআত করবে না । তবে আমি যদি তোমার স্থানে থাকতাম এবং তোমার মত ক্ষমতার অধিকারী হতাম তাহলে কালবিলম্ব না করে হোসাইনকে হত্যা করতাম । যদি এমন হয় তাহলে আমার কামনা হল , এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চাইতে দুনিয়াতে আমার না আসাই ভাল ছিল। কেননা , এত বড় বদনামীর বোঝা মাথায় নেয়ার চাইতে সেটাই উত্তম হত ।

এরপর সরকারী দূতকে প্রেরণ করল এবং হযরত হোসাইনকে (আ.) নিজের ঘরে ডেকে পাঠাল । হোসাইন (আ.) তার পরিবার ও বন্ধুদের মধ্য থেকে ৩০ জন সঙ্গী সাথে নিয়ে ওয়ালিদের কাছে আসে । ওয়ালিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর তাকে জানাল আর ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করার অনুরোধ জানাল । হোসাইন (আ.) বললেন , আমার বাইয়াত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় , তা গোপনে ও লোকচক্ষুর অন্তরালে সম্পন্ন হতে পারে না । তবে কাল সকালে জনসাধারণকে যখন বাইয়াতের জন্য আহবান করবে তখন আমাকেও অবহিত করবে । মারওয়ান বলল হোসাইনের কথায় কর্ণপাত করো না এবং তার অজুহাত গ্রহণ করতে যেওনা । যদি বাইয়াত করতে অস্বীকার করে তবে প্রাণে বাচিয়ে রেখো না । হোসাইন (আ.) অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং বললেন তুমি ধ্বংস হও । হে নষ্টা মেয়ের ছেলে । তুমি কি আমাকে হত্যার আদেশ দিচ্ছ ? আল্লাহর কসম , তুমি মিথ্যা বলেছ । এ কথা বলে তুমি নিজেকে হেয় ও অপমানিত করেছ । এরপর তিনি ওয়ালিদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন হে আমির! আমরা নবুওতের ঘরের আহলে বাইত , আমরাই রেসালতের খনি । ফেরেশতারা আমাদের ঘরেই আনাগোনা করেন । আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্যই মানুষের দিকে তার রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন । এই রহমতের সমাপ্তি হবে আমাদের নামেই । আর ইয়াজিদ হল একটা মদখোর ফাসেক , খুনী এবং প্রকাশ্যে শরীয়ত লংঘনকারী লোক । আমার মত কোন লোক ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত করবে না । তবে কাল ভোর হোক । এ সময়ের মধ্যে আপনিও ভেবে চিন্তে দেখেন । আমিও চিন্তা ভাবনা করে দেখব যে , আমাদের মধ্যে কে খেলাফতের জন্য অধিকতর যোগ্য । এ কথা বলার সাথে সাথে তিনি ওয়ালিদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন । মারওয়ান ওয়ালিদকে লক্ষ্য করে বলল , তুমি আমার উপদেশের প্রতি কর্ণপাত করনি । আমার অবাধ্যতা করেছ । ওয়ালিদ বললেন ধ্বংস তোমার জন্য । তুমি কি আমার দ্বীন ও দুনিয়া ধ্বংস করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছ । খোদার কসম আমি চাই না যে , দুনিয়ার রাজত্ব আমার হাতে থাকার জন্য আমি হোসাইনকে (আ.) হত্যা করব । আল্লাহর কসম , আমি বিশ্বাস করি না যে , কেউ হোসাইন (আ.) এর রক্তের বোঝা মাথায় নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে । এ ধরনের লোকের অবশ্যই নেক আমলের পাল্লা হালকা হবে এবং তার ক্ষমা পাওয়ার আশাও সুদূর পরাহত । মহান আল্লাহ তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না । গোনাহ থেকে তাকে পবিত্র করবেন না । তার জন্য কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে ।

সে রাত কেটে গেল । খুব ভোরে হোসাইন (আ.) ঘর থেকে বেরিয়ে নতুন কোন খবরের অপেক্ষা করছিলেন । মারওয়ান তাকে দেখতে পেল এবং বলল হে আবু আব্দুল্লাহ , আমি তোমার হিতাকাংখী ; তুমি আমার উপদেশ শ্রবণ কর , তাহলে কল্যাণ লাভ করতে পারবে। হোসাইন (আ.) জিজ্ঞেস করলেন তোমার উপদেশ কি ? বল দেখি। বলল- আমি তোমাকে আদেশ করছি যে , তুমি অবশ্যই ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার হাতে বাইয়াত কর । কেননা তোমার দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য এ কাজ মঙ্গলজনক হবে । হোসাইন (আ.) বললেন-

انّا لله و انّ الیه راجعون (ইন্নানিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন) যদি তাই হয় আমাকে দ্বীন ইসলাম থেকে বিদায় নিতে হবে । কেননা নবী (সা.) এর উম্মত ইয়াজিদের খেলাফত রাজত্বের হাতে বন্দী হয়ে পড়েছে । আমি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে , আবু সুফিয়ানের বংশধরদের জন্য খেলাফত হারাম । ইত্যবসরে হোসাইন (আ.) ও মারওয়ানের মধ্যে এ মর্মে বহু কথা কাটাকাটি হয় । শেষ পর্যন্ত ক্রুদ্ধাবস্থায় মারওয়ান চলে গেল ।

শাহাদত বরণ সম্বন্ধে হোসাইন (আ.) অবহিত ছিলেন

এ পর্যায়ে লেখকের বক্তব্য হলো , গবেষণার মাধ্যমে আমি যতদুর অবহিত হয়েছি তাতে পরিস্কার বুঝা যায় যে , হোসাইন (আ.) তার শাহাদত বরণ এবং ভবিষ্যত ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আবগত ছিলেন। তারই আলোকে তিনি সঠিক দায়িত্বই পালন করেছেন।

একদল রাবী তাদের নিজস্ব সনদ অনুযায়ী আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে বাবুইয়া আল কুমী থেকে রেওয়ায়েত করেছেন , যার বিবরণ আমিغبار سلطان الوری لسکان الشری বইতে দিয়েছি। কিতাবে আমালীতে বর্ণিত রেওয়ায়েতের সনদ মুফাজ্জাল ইবনে ওমর পর্যন্ত পৌছেছে। ঐ রেওয়ায়েতে ইমাম সাদেক (আ.) তার মহান পিতার বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে , একদিন হযরত হোসাইন ইবনে আলী তার ভাই ইমাম হাসান (আ.) এর বাড়ীতে গেলেন। যখন তার দৃষ্টি তার ভাইয়ের চেহারায় পড়ল দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। হাসান (আ.) জিজ্ঞেস করলেন , আপনি কাদছেন কেন ? তিনি বললেন আপনার উপর যে জুলুম ও অত্যাচার হবে তার কথা চিন্তা করেই আমি কাদছি। হাসান (আ.) বললেন , আমার উপর যে জুলুম করা হবে , তা হচ্ছে সেই বিষ যা গোপনভাবে আমাকে পান করানো হবে। এর মাধ্যমে আমাকে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত করে হত্যা করা হবে। কিন্ত "لا یوم کیومک یا ابا عبد الله " অর্থাৎ তোমর শাহাদত দিবসের মত কোন দিন পৃথিবীতে পাওয়া যাবেনা। কেননা ৩০ হাজার লোক যারা সবাই দাবী করে যে , তারা মুসলমান এবং আমার নানা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত তারা তোমাকে ঘিরে ফেলবে এবং তোমাকে হত্যা আর তোমার সন্মান হানি , তোমার পরিবার পরিজনকে বন্দী করা ও তোমার সম্পদ লুন্ঠনের জন্য তৈরী হবে। এ অবস্থাতেই মহান আল্লাহ বনি উমাইয়ার প্রতি ঘৃণা ও অভিস্পাত বর্ষণ করবেন। আসমান রক্ত বৃষ্টি ঝরাবে। এমন কি বন জঙ্গলে পশু-পক্ষী আর সমুদ্রের মাছগুলো পর্যন্ত তোমার জন্য কান্নাকাটি করবে।

হয়ত কোন কোন সংকীর্ণমনা লোক- যারা শাহাদত কত বড় সৌভাগ্য ও কল্যাণের জিনিষ তা না জেনে ধারণা করে যে , মহান আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন না যে , মানুষ নিজেকে বিপদের সন্মুখীন করুক। এরপর কেন হযরত হোসাইন (আ.) শাহাদাতের পথ বেছে নেন ? আসলে এটা সম্পূর্ণ ভূল ধারণা , শাহাদাত হলো মানুষের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য । মাকতাল ” নামক কিতাবের রচয়িতা এ আয়াতের তাফসীরে ইমাম সাদেক (আ.) হতে বর্ণনা করেন যে , আসলাম থেকে বর্ণিতঃ আমরা নাহাবান্দ যুদ্ধ কিংবা অন্য কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম।

মুসলমানরা যুদ্ধের সারি বিন্যস্ত করল। দুশমনরাও আমাদের সামনে সারিবদ্ধ হয়েছে। কোন যুদ্ধেই এত লম্বা চওড়া সারি দেখিনি। রোমীরা তাদের শহর পিছনে রেখে যুদ্ধের জন্য তৈরী হচ্ছিল। ইত্যবসরে মুসলমানদের মাঝ থেকে এক ব্যক্তি দুশমনদের উপর হামলা করে। জনতা বলে উঠল-لا اله الا الله- التقی نفسه الی التهلکة অর্থাৎ হায় , লোকটি নিজেকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করল। উপস্থিত লোকদের মধ্যে আবু আইয়ুব আনছরী বললেন , তোমরা কি এ লোকটি নিয়েই আয়াতের ব্যাখ্যা করছ , যে দুশমনদের উপর হামলা করেছে এবং শাহাদাত বরণ করেছে। অথচ প্রকৃত অবস্থা তা নয়। বরং এ আয়াত নাযিল হয়েছে আমাদের বেলায়। কেননা , আমরা রাসূলে খোদার (সা.) সাহায্যার্থে নিজেদের জান ও মাল উৎসর্গ করেছি অথচ নিজেদের সংশোধনের উদ্যোগ নেইনি । যার ফলে আমাদের পার্থিব কাজ কর্ম তছনছ হয়ে যায়। এরপর থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে পয়গাম্বর (সা.) এর সাহায্য থেকে পিছপা হব , যাতে আমাদের জীবন সম্পদ সুন্দর ও গুছানো হয়। এ অবস্থাতেই অবতীর্ণ হয়েছিল।

( ولا تُلْقُوا بأيْديكُمْ إلى التّهْلُكة)

এ আয়াতের মর্মার্থ হলো , যদি তোমরা রাসূলে খোদাকে সাহায্য করা থেকে হাত গুটাও এবং ঘরে বসে থাক তাহলে নিজেদের হাতেই নিজের ধ্বংস ও অকল্যাণ ডেকে আনবে। আর মহান আল্লাহকে নিজেদের প্রতি রাগান্বিত করবে। এ আয়াত আমাদের প্রতি প্রতিবাদ স্বরূপ। কেননা আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বলেছি যে , আমরা আমাদের ঘরে থাকব। এ আয়াতে ইসলামের দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুপ্রেরণা দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি দুশমনের উপর হামলা করে এবং আপন সঙ্গীদেরও অনুপ্রাণিত করে তার বেলায় এ আয়াত নাযিল হয়নি। অথবা যে ব্যক্তি শাহাদাত বরণ এবং আখেরাতে সওয়াব লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে তাদের কথা এখানে বলা হয়নি। বইয়ের ভূমিকায় আমরা বলেছি যে , আল্লাহর ওলিরা সত্যের পথে তরবারী ও তীরের আঘাতকে ভয় করে না। এ বইতে অপর যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে তাতেও এ সত্যটি আরো পরিস্কাররূপে ফুটে উঠবে।


মদীনা হতে ইমাম হোসাইনের (আ.) হিজরত

ওয়ালিদ ও মারওয়ানের সাথে সাক্ষাতের পরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ লিখেছেন- ঐদিন ভোরে অর্থাৎ ৬০ হিজরীর ৩রা শাবান ইমাম হোসাইন (আ.) মক্কার দিকে রওয়ানা হন । আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর তার খেদমতে উপস্থিত হন । তারা বলেন যে , আপনি মক্কাতেই অবস্থান করুন । তিনি বললেন- রাসূলে খোদার (সা.) তরফ থেকে আমার উপর যে নির্দেশ আছে তা আমাকে পালন করতেই হবে । ইবনে আব্বাস ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন । পথে তিনি বলছিলেন-واحسینا হায় হোসাইন ! এরপর আব্দুল্লাহ ইবনে উমর আসেন এবং বললেন- এখানকার পথহারা লোকদের সংশোধন করাই উত্তম হবে । যুদ্ধের পদক্ষেপ নিবেন না । তিনি বললেন-

اما علمت ان من هوان الدنیا علی الله ان راس یحیی بن زکریا اهدی الی بغی من بغایا بنی اسرائیل

“ আপনি কি জানেন না , দুনিয়া এতখানি নিকৃষ্ট যে , ইয়াহিয়া ইবনে যাকারিয়া (আ.) এর মাথা বানি ইসরাইলের এক অবাধ্যের কাছে হাদিয়া হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । আপনার কি জানা নেই যে বনি ইসরাইল সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ৭০ জন নবীকে হত্যা করে । এরপর বাজারে এসে তারা কেনা কাটায় মশগুল হয় । অর্থাৎ যেন কোন ঘটনাই ঘটেনি । তবুও মহান আল্লাহ তাআলা তাদের আযাব ত্বরান্বিত করেননি । তাদেরকে অবকাশ দেন । আর অবকাশ দানের পরই চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করেন । হে আব্দুল্লাহ ! মহান আল্লাহর ক্রোধ ও আযাবকে ভয় করুন এবং আমার সাহায্য থেকে পিছপা হবেন না । ”

হোসাইন (আ.) এর প্রতি কুফাবাসীর দাওয়াত

কুফাবাসীরা হযরত হোসাইন (আ.) এর মক্কা আগমন এবং ইয়াজিদের হাতে বাইআত গ্রহণে তার অস্বীকৃতির খবর জানত । এ খবর পেয়েই তারা সুলাইমান ইবনে সা দ খাজায়ীর ঘরে সমবেত হয় । সমাবেশে সুলাইমান ইবনে সা দ দাড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন । বক্তব্য শেষে তিনি বলেন ওহে আলীর অনুসারীরা! তোমরা সবাই শুনেছ যে , মুআবিয়া মরে গেছে এবং নিজের হিসাব কিতাবের জন্য আল্লাহর দরবারে পৌছে গেছে । তার কৃতকর্মের ফল সে পাবে । তার ছেলে ইয়াজিদ ক্ষমতায় বসেছে । আপনারা আরো জানেন যে , হোসাইন ইবনে আলী (আ.) তার সাথে বিরোধিতা করেছেন এবং তিনি উমাইয়ার জালিম ও খোদাদ্রোহীদের দূরাচার থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন । তোমরা তার পিতার অনুসারী । হোসাইন (আ.) আজ তোমাদের সমর্থন ও সহযোগিতার মুখাপেক্ষী । যদি এ ব্যপারে নিশ্চিত হও যে , তাকে সাহায্য করবে এবং তার দুশমনদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে , তাহলে লিখিত আকারে নিজের প্রস্তুতির কথা তাকে জানিয়ে দাও । যদি ভয় পাও এবং আশংকা কর যে , তোমাদের মধ্যে গাফলতি ও দুর্বলতা প্রকাশ পাবে , তাহলেও তাকে জানিয়ে দাও , তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও । তাকে ধোকা দিও না । এরপর তিনি নিম্নোক্ত বিষয়বস্তুর উপর একটি পত্র লেখেন-

بسم الله الرحمن الرحیم

এ পত্র হোসাইন ইবনে আলী (আ.) সমীপে সুলাইমান ইবনে সা দ খাজায়ী , মুসাইয়্যেব ইবনে নাজরা , রেফাআ ইবনে শাদ্দাদ , হাবিব ইবনে মাজাহের আব্দুল্লাহ ইবনে ওয়ায়েলসহ একদল মুমিন ও অনুসারীর পক্ষ হতে প্রেরিত হল ।

সালামের পর আল্লাহর তা ’ রিফ ও প্রশংসা যে , তিনি আপনার ও আপনার পিতার দুশমনদের ধ্বংস করেছেন । সেই জালিম ও রক্তপিপাসু , যে উম্মতের শাসন ক্ষমতা তাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে অন্যায়ভাবে চেপে বসেছে এবং মুসলমানদের বাইতুল মাল আত্মসাৎ করেছে , মন্দ লোকদের বাচিয়ে রেখেছে , আল্লাহর সম্পদকে অবাধ্য দুরাচারীদের হাতে তুলে দিয়েছে , সামুদ সম্প্রদায় যেভাবে আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হয়েছে তারাও সেভাবে আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত হোক । আপনি ছাড়া আমাদের আজ কোন নেতা নেই । কজেই আপনি যদি কষ্ট করে আমাদের শহরে তাশরীফ আনেন তাহলে বড়ই অনুগ্রহ হবে । আশা করি , আপনার মাধ্যমে আল্লাহ পাক আমাদেরকে সঠিক পথে হেদায়েত করবেন ।

কুফার গভর্ণর নোমান ইবনে বশির দারুল এমারাত ’ প্রাসাদে রয়েছে । কিন্তু আমরা তার পেছেনে জামাত ও জুমার নামাজে শরীক হইনি । ঈদের দিন তার সাথে ঈদগাহে যাইনি । যদি শুনতে পাই যে , আপনি কুফায় আসছেন তাহলে তাকে কুফা থেকে বিতাড়িত করে সিরিয়া পাঠিয়ে দেব । হে পয়গাম্বরের সন্তান আপনার প্রতি সালাম , আপনার পিতার পবিত্র রুহের প্রতি সালাম ।

و السلام علیک و رحمة الله و برکته

و لا حول ولا قوة الا بالله العلی العظیم

চিঠিখানা লেখার পর পাঠিয়ে দিল । দুইদিন অপেক্ষার পর আর একদল লোককে প্রায় ১৫টি চিঠি নিয়ে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর কাছে পাঠিয়ে দিল । ঐ সব চিঠির প্রত্যেকটিতে দুই কি তিন বা চার জনের স্বাক্ষর ছিল । কিন্তু হোসাইন (আ.) এত সব চিঠিপত্র পাওয়ার পরও নীরব রইলেন তাদের কোন পত্রের উত্তর দিলেন না । এমন কি মাত্র এক দিনেই ৩০০ টি চিঠি এসে তার হাতে পৌছে । এরপরও পর্যায়ক্রমে একের পর এক চিঠি আসছিল । তার চিঠি ১২হাজার ছাড়িয়ে যায় । সর্বশেষ যে চিঠিখানা তার হাতে এসে পৌছে তা ছিল হানি ইবনে হানি ছবিয়ী এবং সায়ীদ ইবনে আব্দুল্লাহ হানাফীর । তারা উভয়ে ছিল কুফার অধিবাসী । ঐ পত্রে তারা লিখেন-

بسم الله الرحمن الرحسم

ইবনে হোসাইন আলী (আ.) এর খেদমতে তার ও তার পিতার অনুসারীদের পক্ষ হতে প্রেরিত হলো । সালাম বাদ জনগন আপনার আগমনের অপেক্ষায়। আপনি ছাড়া কাউকে তারা চায় না । হে নবীর সন্তান ! অতি শীঘ্র আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন । কেননা , বাগ-বাগিচাগুলোতে সবুজের সমারোহ এসেছে , ফলগুলো পেকেছে , লতাগুল্ম জেগে উঠেছে এবং সবুজ পত্রে গাছের সৌন্দর্য শোভায় মাতিয়ে তুলেছে । আসুন আপনি আমাদের মাঝে আসুন । কেননা আপনার সৈন্যদলের মাঝেই তো আপনি আসবেন ।

و السلام علیک و رحمة الله وبرکته و علی ابیک من قبلک

চিঠি পাওয়ার পর পত্র বাহক দু জনের কাছে হোসাইন ইবনে আলী (আ.) জিজ্ঞেস করেন এ চিঠিগুলো কে কে লিখেছে । তারা বলল , হে আল্লাহর রাসুলের সন্তান! পত্রের লেখকরা হলেন-শাব্স ইবনে রাবায়ী , হাজার ইবনে আবজার , ইয়াজিদ ইবনে হারেছ , ইয়াজিদ ইবনে রোয়াম , উরওয়া ইবনে কাইছ , আমর ইবনে হাজ্জাজ এবং মুহাম্মদ ইবনে ওমর ইবনে আতারেদ ।

মুসলিম ইবনে আকিলের কুফা গমন

এরুপ পরিস্থিতিতে হোসাইন ইবনে আলী (আ.)একদিন কাবাঘরের পাশে গিয়ে রুকন ও মাকামে ইব্রাহীমের মাঝখানে দাড়িয়ে দু রাকত নামায আদায় এবং মহান আল্লাহর দরবারে পরিস্থিতির কল্যাণকর পরিণতির জন্য দোয়া করেন । অতঃপর মুসলিম ইবনে আকিলকে ডেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন ।

এরপর ইমাম হোসাইন (আ.) কুফাবাসীর চিঠির জবাব লিখে মুসলিম ইবনে আকিলের মাধ্যমে প্রেরণ করেন। জবাবী পত্রে তাদের আমন্ত্রণ কবুলের ওয়াদা দিয়ে লেখা ছিল- আমি আমার চাচাত ভাই মুসলিম বিন আকিলকে তোমাদের কাছে পাঠালাম যাতে তোমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ করে সে সম্পর্কে আমাকে অবহিত করে ।

মুসলিম ইমামের পত্র নিয়ে কুফায় আসেন । কুফাবাসী হোসাইন ইবনে আলী (আ.) ও মুসলিম ইবনে আকিলকে পেয়ে আনন্দিত হল । তাকে মুখতার ইবনে আবী ওবায়দা সাকাফীর বাড়িতে থাকতে দিলেন । অনুসারীরা দলে দলে মুসলিম ইবনে আকিলের সাথে সাক্ষাত করতে আসতে লাগল । প্রত্যেক দল আসার সাথে সাথে মুসলিম ইমামের পত্র পড়ে শুনাতে থাকেন । আনন্দে দর্শনার্থীদের অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করছিল । দেখতে দেখতে আঠারশো লোক তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে ।


ইবনে যিয়াদ কুফার গভর্ণর নিযুক্ত

আব্দুল্লাহ ইবনে মুসলিম বাহেলী , এমারা ইবনে ওয়ালীদ এবং ওমর ইবনে সাআদ ইয়াজিদের কাছে এক পত্র পাঠিয়ে মুসলিম ইবনে আকিলের আগমন সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন । ঐ পত্রে নোমান ইবনে বশীরকে কুফার গভর্ণরের পদ থেকে সরিয়ে অপর কাউকে নিয়োগ দানের অনুরোধ জানায় । ইয়াজিদ বসরার গভর্ণর ওবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কাছে একটি পত্র লিখে বসরার সাথে কুফার গভর্ণরের দাযিত্বও তাকে প্রদান করে । ঐ পত্রে মুসলিম ও হোসাইনের কর্মতৎপরতা সম্পর্কে বিবরণ দেয় । পত্রে কড়া নির্দেশ প্রদান করে যে , মুসলিমকে গ্রেফতার ও হত্যা কর। ইবনে যিয়াদ চিঠি পাওয়ার পর কুফা গমনের উদ্দেশ্যে তৈরী হয়ে যায় ।

হোসাইন (আ.) বসরার একদল গণ্যমান্য লোক- যেমন ইয়াজিদ ইবনে মাসউদ নাহশেলী , মনজর ইবনে জারুদ আবদী প্রমুখের কাছে লেখা পত্রে তাদেরকে হোসাইন (আ.) এর সমর্থন ও আনুগত্যের আহবান জানিয়েছিলেন। পত্রটি তার গোলাম সুলাইমান ওরফে আবু রযিনের মাধ্যমে তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ইয়াজিদ ইবনে মাসউদ বনি তামিম , বনি হানজালা ও বনি সাআদ গোত্রকে একত্রিত করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেন- হে বনি তামিমঃ তোমাদের মাঝে আমার বংশ ও মর্যাদা কিরূপ ? তার আল্লাহর শপথ করে বলল অনেক মহান ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আপনি । আমাদের গোত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরবের প্রতীক আপনি। সবার চাইতে সম্মানিত এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি বললেন আমি একটা উদ্দেশ্যে তোমাদের আহবান করেছি , তোমাদের পরামর্শ কামনা করছি এবং তোমাদের সাহায্য চাই। তারা বললেন আল্লাহর কসম ! আপনার কথা আমাদের শিরোধার্য ! বলুন আপনার উদ্দেশ্য , তিনি বললেন হে বনু তামিম! তোমরা জেনে রেখ যে , মুয়াবিয়া মরে গেছে , খোদার কসম সে এক পচা মরা লাশ যার অবর্তমানে আমাদের কোন হাহুতাশ নেই। জেনে রেখ যে , তার মৃত্যূতে গোনাহ ও জুলুমের দরজা ভেঙ্গে গেছে। জুলুমের ভিত্তি নড়বড়ে হয়েছে।

মুয়াবিয়া জনগণের কাছ থেকে বাইআত গ্রহণ করেছে , যাতে তার ছেলে ইয়াজিদ খেলাফতের রক্ষাকবচ হয়। সে তা শক্ত ও মজবুত করার জন্য সর্ব প্রকার চেষ্টা চালায়। কিন্ত তার সকল প্রচেষ্টা দুর্বলতায় তলিয়ে যায়। ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে শলাপরামর্শ করেছে এবং অপমানিত হয়েছে। বর্তমানে তার দুশ্চরিত্র , মদখোর ছেলে ইয়াজিদ খেলাফতের মসনদে বসে মুসলমানদের খলিফা হওয়ার দাবী করছে। জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতি ব্যতিরেকে নিজেকে আমীরুল মু ’ মেনীন বলে প্রচার করছে। অথচ তার জ্ঞান ও সহনশীলতা অতি তুচ্ছ ও নগণ্য। নিজের পা রাখার মত সত্যের পথও সে চিনে না। সে কি করে গোটা উম্মতের নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবে ?

فأُقْسمُ باللّه قسما مبْرُورا لجهادُهُ على الدّين أفْضلُ منْ جهاد الْمُشْركين

“ আল্লাহর নামে কঠিন শপথ নিয়ে বলছি-দ্বীনের হেফাজতের জন্য ইয়াজিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা মুশরিকদের সাথে জিহাদ করার চাইতে উত্তম। ” কিন্ত হোসাইন ইবনে আলী (আ.) তোমাদের নবীর (সা.) মেয়ের সন্তান। এক ভদ্র , সম্ভ্রান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতম পুরুষ। তার যোগ্যতা , ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানের বর্ণনা দিযে শেষ করা যাবে না। তিনি খেলাফতের জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। কেননা , ইসলাম গ্রহণে তিনি অগ্রগামী , ইসলামের খেদমতে তার অবদান অতি উত্তম এবং রাসূলে খোদা (সা.) এর সাথে তার আত্মীয়তার বন্ধন সর্বজনবিদিত। ছোটদের প্রতি তিনি দয়াপরবশ এবং বড়দের প্রতি সদ্ব্যবহারকারী। তিনি সর্বোত্তম ইমাম ও পরিচালক। যার মাধ্যমে মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতি তার দলিল ও যুক্তি চুড়ান্ত করেছেন এবং তোমাদেরকে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন। কাজেই সত্যের আলোর সামনে তোমরা নিজেদের দৃষ্টিশক্তি হারিও না। সত্যের পথ চেনার পরিবর্তে বাতিলের গর্তে নিজেদের নিক্ষেপ করো না। জামালের যুদ্ধেই সাখার ইবনে কাইছ তোমাদের গায়ে কলংক লেপন করেছে। কিন্ত আজ তোমাদের নবীর (সা.) সন্তানদের সাহায্য করে সে কলংক ধুয়ে মুছে সাফ করতে হবে। খোদার কসম! যে কেউ তার সাহায্য থেকে বিরত হবে , আল্লাহ তার সন্তানদের অপমানিত ও বংশধার সংকুচিত করবেন। দেখ আমি যুদ্ধের পোশাক পরিধান করেছি এবং লৌহবর্ম গয়ে দিয়েছি। এ কথাও জেনে রেখ যে , যদি কেউ নিহত না হয় তবুও সে মৃত্যূবরণ করবেই। পলায়ণ মানুষকে রক্ষা করবে না। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তোমাদের কাছে আমাদের বক্তব্যের সদুত্তর চাই।

বনি হানজালা জবাব দিল। তাদের পক্ষ থেকে বলা হল- ওহে খালেদের পিতা! আমরা আপনার ধনুকের তীরের ন্যায়। যেদিকেই নিক্ষেপ করবেন লক্ষ্যচ্যূত হব না। আমরা আপনার সম্প্রদায়ের সৈনিক ও অশ্বারোহী। আমাদেরকে যেদিকেই পাঠাবেন বিজয় ও সাফল্য আপনার হস্ত চুম্বন করবে। খোদার কসম যে দুর্গম পথেই রওয়ান হবেন আমরা আপনার সাথে আছি। যে কোন কঠিন মূহুর্তে আমরা আপনার সঙ্গীহারা হব না। খোদার কসম আমাদের তরবারী নিয়ে আপনার পাশে দাড়াব এবং আমাদের শরীর দিয়ে আপনার হেফাজত করব। কাজেই যে ভাবে ইচ্ছা পদক্ষেপ নিন।

এরপর বনি সাআদ কথা শুরু করে এবং বলে-হে আবু খালেদ! আপনার বিরোধিতা এবং আপনার রায় ও হুকুমের বাইর যাওয়া আমাদের কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় বিষয়। তবে সাখার ইবনে কাইছ আমাদের হুকুম দিয়েছেন , যেন যুদ্ধ না করি। আমরা ঐ হুকুমটি পছ্ন্দ করেছি এবং এ পর্যন্ত যুদ্ধ করিনি। এতে আমাদের মর্যাদা রক্ষা পেয়েছে। এখন যেহেতু পরিস্থিতি অন্য রকম কাজেই আমাদেরকে পরামর্শের সুযোগ দিন। এরপরই আমাদের মতামত জানাব। এ সময় বনি তামিম বলে উঠল- হে আবু খালেদ! আমরা আপনার দলের , আপনার সাথে একাত্ম। কখনো রাগান্বিত হলে আপনার সাথে আমরাও রাগান্বিত হব। সফরে আপনার সাথেই থাকব। হুকুম ও নির্দেশ দানের এখতিয়ার আপনার । আপনি আহবান করুন আমরা নিশ্চয় সারা দেব। হুকুম দিন তা অবশ্যই পালন করব। ইয়াজিদ ইবনে মাসউদ বনি ইবনে সাআদের দিকে ফিরে বললেন- হে বনি সাআদঃ আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি , যদি হোসাইন (আ.) কে সাহায্য না কর তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের মধ্য থেকে হানাহানি ও রক্তপাত তুলে নিবেন না। সবসময় আত্মকলহ রক্তারক্তিতে লেগে থাকতে হবে।

এরপর হোসাইন (আ.)-এর কাছে এ মর্মে পত্র লিখেনঃ

بسم الله الرحمن الرحیم আপনার পত্র পেয়েছি এবং অবগত হয়েছি যে , আমাকে আপনার সাহায্যের জন্য আহাবান করেছেন। যাতে আপনার আনুগত্যের দ্বারা আমি লাভবান হই। নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহ কল্যাণ ও সৎকাজ সম্পাদনকারী অথবা মুক্তির দিশারী থেকে কোন দিন পৃথিবীকে বঞ্চিত রাখবেন না। আপনি আহমদী পবিত্র বৃক্ষের শাখা । যার মূল খাতেমুন্নাবীয়ীন এবং তার শাখা আপনি। আপনি শুভ লক্ষণ ও সৌভাগ্যবান পাখীর মত আমাদের মাঝে আসুন। আমি বনি তামিমকে আপনার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত করেছি। এখন তারা সমবেত হয়ে আপনার সাহায্যের জন্য উদগ্রীব। তৃষ্ণার্ত উট যে রকম পানির জন্য পরাজয়কে ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় ঠিক তেমনি পরিস্থিতি বিরাজ করছে আমাদের মাঝে। এখন বনি সাআদকেও আপনার সাহায্যের জন্য প্রস্তুত করেছি। তাদের অন্তরের হিংসা-দ্বেষগুলোকে বর্ষার বৃষ্টিপাতের মত আমার উপদেশ ও জ্বালাময়ী বক্তৃতার সাহায্যে সম্পূর্ণ ধুয়ে ফেলেছি।এ চিঠি পড়ে ইমাম হোসাইন (আ.) অত্যন্ত খুশী হন। তার জন্য তিনি দোয়া করে বললেন আল্লাহ তোমাকে ভয়াবহ কিয়ামতের দিন হেফাজত করুন। তোমাকে সম্মানিত করুন। যেদিন তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবে সেদিন তোমাকে পানি পান করিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করুন। পত্র লেখক ইয়াজিদ ইবনে মাসউদ হোসাইন (আ.) এর খেদমতে গমন ও তার সাহায্যের জন্য প্রস্তুতি নেন। কিন্ত বসরা থেকে রওনা হওয়ার পূর্বেই খবর পান যে , হোসইন (আ.)শাহাদত বরণ করেছেন। এজন্য তিনি খুব করে কাদলেন। অতিশয় মর্মাহত হলেন।

হযরত হোসাইন (আ.) এর পত্র পেয়ে ইয়াজিদ ইবনে মাসউদের প্রতিক্রিয়া ছিল এরূপ। কিন্ত মানজার ইবনে জারুদের প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্নরূপ। তার মেয়ে বাহরিয়া ছিল ইবনে যিয়াদের স্ত্রী। সে আশংকা করল যে , এর পিছনে ইবনে যিয়াদের কোন চক্রান্ত থাকতে পারে। তাই সে চিঠি এবং পত্রবাহককে ইবনে যিয়াদের হাতে তুলে দিল। ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ কালবিলম্ব না করেই পত্রবাহককে ফাসিকাষ্ঠে ঝুলায়। এরপর মসজিদের মিম্বারে গিয়ে খুতবা প্রদান করে। এতে বসরাবাসীকে তার বিরোধিতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টির ব্যাপারে হুশিয়ার করে দেয়। ঐ রাত সে বসরায় কাটায়। সকালে তার ভাই ওসমান ইবনে যিয়াদকে তার স্থলাভিষিক্ত করে খুব দ্রুত কুফায় দিকে রওনা হয়। কুফার কাছে পৌছাতেই সওয়ারী হতে নেমে পড়ে এবং সেখানেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে রাতের প্রথমভাগে কুফায় প্রবেশ করে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার কারণে কুফাবাসী মনে করল যে , ইমাম হোসাইন এসেছেন। তার আগমনে তার পরস্পরকে সুসংবাদ ও অভিনন্দন জানতে লাগল। যখন তার নিকটে গেল এবং চিনতে পারল যে , হযরত হোসাইন (আ.) নয় ইবনে যিয়াদ এসেছে। তখন সেখান থেকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল । ইবনে যিয়াদ দারুল ইমারা প্রবেশ করে সেখানেই রাত্রি যাপন করল। খুব ভোরে দারুল ইমারা ’ থেকে বেরিয়ে আসল এবং মিম্বারে উঠে খুতবা দিল । জনগণকে ইয়াজিদের সাথে বিরোধিতার ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করল , আর তার অনুগত্য করলে অনুগ্রহ দেখানোর আশ্বাস দিল।

মুসলিমের আত্মগোপন

মুসলিম ইবনে আকিল এ সংবাদ শুনে ভয় পেলেন । হয়তো ইবনে যিয়াদ তার কুফা অবস্থানের সংবাদ জেনে ফেলতে পারে । এমনকি তার অনিষ্ট সাধন করতে পারে এজন্যে তিনি মুখতারের ঘর থেকে এসে হানি ইবনে উরওয়ার ঘরে আশ্রয় নেন ।

হানি ইবনে উরওয়া তাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলেন । এর পর থেকে তার ঘরে অনুসারীদের আনাগোনা বাড়তে থাকে । ইবনে যিয়াদ মুসলিম ইবনে আকিলের বাসস্থান খুজে বের করার জন্য কিছু গুপ্তচর নিযুক্ত করেছিল । হানি ইবনে উরওয়ার ঘরে আত্মগোপন করেছে বলে জানতে পারার পর মুহাম্মদ ইবনে আশআছ , আসমা ইবনে খারেজা ও আমর ইবনে হাজ্জাজকে তলব করে বলল- হানি কেন আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলনা । তারা বলল জানিনা। তবে হানি অসুস্থ বলেই শুনেছি । ইবনে যিয়াদ বলল যে , আমি শুনেছি যে , তার অসুস্থতা সেরে গেছে এবং সে তার ঘরের পেছন দরজায় বসে । যদি জানতে পারি যে , সে সত্যিই অসুস্থ তাহলে তাকে দেখতে যাব ।

তবে তুমি গিয়ে তাকে বল যে , আমাদের অধিকার যেন খর্ব না করে । আমার সাক্ষাতে যেন আসে । কেননা আমি চাই না যে , তার মত আরবের সম্মানিত ব্যক্তি আমার কাছ থেকে দূরে থাকুক । তার প্রতি অন্যায় হোক । এ তিন ব্যক্তি রাতের প্রথম ভাগে হানির ঘরে উপস্থিত হয়ে বললেন- আপনি কেন আমীরের সাথে সাক্ষাতে যাচ্ছেন না । অথচ তিনি আপনার কথা জিজ্ঞেস করেছেন। বলেছেন যে , অসুস্থ বলে জানতে পারলে আমি তার সাক্ষাতে যাব । হানি বললেন অসুস্থের কারণেই যেতে পারিনি । তারা বলল ইবনে যিয়াদ জানতে পেরেছে যে , রাতের বেলা আপনি ঘরের দরজায় বসেন । কাজেই আপনার না যাওয়াতে তিনি অসন্তুষ্ট । আপনার মত গোত্রপতির পক্ষ থেকে অবহেলা ও অবজ্ঞা তিনি বরদাশত করতে পারেন না । আমরা আপনাকে শপথ করে বলছি যে , আমাদের সাথে বাহনে চড়ে তার সাক্ষাতে চলুন । হানি তার পোশাক পরিধান করে নিজস্ব বাহনে চললেন। দারুল ইমারার নিকট পৌছেই যেন অনুভব করলেন তার সামনে অনেক সমস্যা । হিশাম ইবনে আসমা ইবনে খাজোকে সম্বোধন করে বললেন-ভ্রাতৃস্পুত্র খোদার কসম! আমি এই লোককে (ইবনে যিয়াদ) ভয় পাচ্ছি । তোমার কি মত ? বলল-চাচাজান। খোদার কসম আপনার ব্যাপারে আমার কোন ভয় নেই । আপনি এসব দুশ্চিন্তা বাদ দিন । কিন্তু হাসসান জানত না যে ইবনে যিয়াদ কি জন্য হানিকে ডেকে পাঠিয়েছে। হানি তার সঙ্গীদের সহ ইবনে যিয়াদের কাছে উপস্থিত হন । ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ হানির দিকে দৃষ্টি দিতেই বলে উঠল :اتتک بخائن رجلاه অর্থাৎ যে ব্যক্তি তোমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পাগুলো কি তাকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছে ? অতঃপর তার নিকটে বসা শরীহ কাজীর দিকে তাকিয়ে হানির প্রতি ইঙ্গিত করেন এবং ওমর ইবনে মাদীকারুব যুবাইদীর কবিতাটি পাঠ করল-

أُريدُ حياتهُ ويُريدُ قتْلى

عذيرك منْ خليلك منْ مُرادٍ

যার অর্থ হল এই যে , আমি চাই হানি জীবিত থাকুক , কিন্তু সে তার ঘরে আমার ক্ষতি করার চক্রান্ত করছে । ” হানি জিজ্ঞেস করলেন- হে আমীর আপনার এ কথার উদ্দেশ্য কি ? বলল চুপ কর হানি: তোমার ঘরে যে , আমীরুল মোমেনীন ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে তার কারণ কি ? মুসলিম ইবনে আকিলকে তোমার ঘরে এনেছ এবং তার জন্য লড়াকু সৈন্য যোগাড় করেছ । তোমার প্রতিবেশীদের ঘরে তাদের জমায়েত করেছ । তুমি কি মনে করেছ যে , আমার কাছে এসব গোপন রয়েছে ? হানি বলল আমি এমন কাজ করিনি । ইবনে যিয়াদ বলল তুমি করেছ । হানি আবারও অস্বীকার করলেন । ইবনে যিয়াদ বলল আমার গোলাম মাকালকে ডাক । মাকাল ছিল তার গুপ্তচর , সে মুসলিম এবং তার সহকর্মীদের তথ্য সংগ্রহে নিযুক্ত ছিল । মা ’ কাল ইবনে যিয়াদের পাশে দাড়াল । হানির দৃষ্টি যখন তার উপর পড়ল , তিনি বুঝতে পারলেন যে , সে গুপ্তচর ছিল । তিনি বললেন হে আমীর আল্লাহর কসম আমি মুসলিমকে ঘরে ডেকে আনিনি । তিনিই আমার ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন । তাকে বের করে দিতে আমার লজ্জা হয়েছে। তাই আশ্রয় দিয়েছি । তাকে মেহমান হিসেবে আশ্রয় দিয়েছি । এখন যেহেতু আপনি জানতে পেরেছেন , আমাকে অনুমতি দিন আমি বাড়ী গিয়ে তাকে বলে দেই আমার ঘর ছেড়ে যেখানে ইচ্ছা চলে যান । যাতে আমার জিম্মা শেষ হয় এবং ঘরের মধ্যে আশ্রয় দেয়া থেকে রেহাই পাই । ইবনে যিয়াদ বলল- মুসলিমকে হাজির না করে আমার সামনে থেকে নড়তে পারবে না । তিনি বললেন- আল্লাহর কসম আমি কখোনই একাজ করব না । হত্যা করার জন্য আমি আমার মেহমান আপনার হাতে তুলে দিব ? খোদার কসম কেউ যদি আমাকে সাহায্য না করে এবং আমি একাকীও হই তবুও তার আগে মৃত্যূবরণ না করা পর্যন্ত তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব না । ইবনে যিয়াদ বলল মুসলিমকে আমার সামনে হাজির করতেই হবে না হলে তোমার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে । হানি বললেন- এমন কাজ করলে তোমার ঘরের চারপাশে অনেক নাঙ্গা তরবারী ছুঠে আসবে । ইবনে যিয়াদ বলল ওহে হতভাগা আমাকে তরবারীর ভয় দেখাও । হানি ভেবেছিল তার গোত্রের লোকেরা তার কথা শুনতে পাচ্ছিল । ইবনে যিয়াদ তাকে লাঠির সাহায্যে তার কপালে নাকে মুখে প্রচণ্ড আঘাত শুরু করল । এমন বেদম প্রহার করল যে , তাতে তার নাক ফেটে দরদর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ল । কপাল ও মুখের চামড়া ফেটে গেল , লাঠি ভেঙ্গে কয়েক টুকরা হয়ে গেল। হানি চট করে একজন দেহরক্ষীর হাত থেকে তরবারী কেড়ে নিল কিন্তু দেহরক্ষী তাকে শক্ত করে ধরে রাখল। ইবনে যিয়াদ চিৎকার দিয়ে উঠল তাকে ধরে ফেল। হানিকে গ্রেফতার করা হল এবং দারুল ইমারার একটি কক্ষে বন্দি করে রাখা হল। ইবনে যিয়াদের নির্দেশে কয়েকজন রক্ষীকে তার পাহারায় নিযুক্ত রাখা হল। এ সময় আসমা ইবনে খারেজা , বর্ণনান্তরে হাসসান ইবনে আসমা বসা থেকে উঠে দাড়াঁল এবং বলল-হে আমীর আপনি হানিকে আপনার কাছে উপস্থিত করার জন্য আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এখন তাকে আপনার সামনে উপস্থিত করেছি।আপনি তাকে বেদম প্রহার করেছেন , তাকে রক্তে রঞ্জিত করেছেন। আপনি মনে করেন যে , তাকে হত্যা করতে পারবেন ? ইবনে যিয়াদ রাগান্বিত হয়ে গর্জে উঠল । তুমিও আমাদের কাছে উপস্থিত । তাকেও মারধর করার হুকুম দেয়া হল । যার ফলে তিনি চুপ হয়ে গেলেন। এরপর তাকে গ্রেফতার করে দারুল ইমারার একটি কক্ষে আটক রাখা হল।নিজেকে এ অবস্থায় দেখে তিনি বলে উঠলেন-

) إنّا للّه وإنّا إليْه راجعُون(

মনে হয় , দারুল ইমারায় প্রবেশের সময় হানি যে কথা বলেছিল তা মনে পড়ে গেল। নিজে নিজে বলল-হানি এখন তোমার কাছে আমার মৃত্যুর সংবাদ বলছি।

আমর ইবনে হাজ্জাজ যার মেয়ে ছিল ইবনে যিয়াদের স্ত্রী , যখন হানির মৃত্যূর সংবাদ পেল মাজহাজ গোত্রের লোকদের নিয়ে রওনা হল এবং দারুল ইমারাকে ঘেরাও করে চিৎকার দিয়ে বলল- আমি আমর ইবনে হাজ্জাজ এবং এই জনসমষ্টি হল মাজহাজ গোত্রের সম্মানিত লোক ও অশ্বারোহী দল । আমরা বাদশাহর আনুগত্য ত্যাগ করিনি । মুসলমানদের দল পরিত্যাগ করিনি । কিন্তু শুনতে পেয়েছি যে , আমাদের নেতা হানিকে হত্যা করা হয়েছে । ইবনে যিয়াদ তাদের কথা শুনে শুরাইহ কাজীকে হুকুম দিল যে , যাও হানিকে দেখে এসো এবং তার গোত্রকে সংবাদ দাও যে , হানি জীবিত আছে , শোরাইহ ইবনে যিয়াদের কথানুযায়ি কাজ করল এবং তাদের উদ্দেশ্যে বলল হানি নিহত হয়নি । মাজহাজ গোত্র একথা শুনেই রাজী হয়ে গেল এবং তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে চলে গেল ।

মুসলিম ইবনে আকিলের সংগ্রাম

হানির নিহত হওয়ার সংবাদ মুসলিম ইবনে আকিলের কাছে পৌছার পর যত লোক তার হাতে বাইআত করেছিল , তাদের সহ তিনি ইবনে যিয়াদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বের হন । ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ এ সময় দারুল ইমারায় আশ্রয় নেয় এবং প্রাসাদের ভীতরে ঢোকার সবগুলো দরজা বন্ধ করে দেয় । তার দলীয় লোকেরা মুসলিমের সঙ্গী সাথীদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় । আর যারা যিয়াদের সাথে দারুল ইমারার (প্রাসাদ) ভেতরে ছিল তারা মুসলিমের বাহিনীকে সিরিয়া থেকে সৈন্য বাহিনী আসার হুমকি দিচ্ছিল । ঐ দিন এভাবেই কেটে গেল এবং রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে এল । এ সময় মুসলিমের সঙ্গী সাথীরা ধীরে ধীরে বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল । পরস্পর বলাবলি করতে লাগল আমরা কেন গোলযোগ আর বিশৃংখলার আগুন জ্বালাচ্ছি । আমাদের তো উচিৎ ঘরে বসে থাকা আর মুসলিম ও ইবনে যিয়াদের ব্যাপারে নিজেকে না জড়ানো । আল্লাহই তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিবেন । এভাবে সবাই চলে গেল। শেষ পর্যন্ত ১০ জন লোক ছাড়া আর কেউই মুসলিমের সাথে রইল না । এবার তিনি মসজিদে এসে মাগরিবের নামাজ পড়লেন , নামাজের পর দেখলেন ঐ দশ জনও সেখানে নেই । তিনি অত্যন্ত অসহায়ভাবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন । অলিগলির পথ চলতে চলতে তিনি তাওয়া ’ নাম্নী এক মহিলার ঘরে এসে পানি চাইলেন । মহিলা পানি দিলে তা মুসলিম তা পান করলেন এবং তাকে আশ্রয় দিলেন । কিন্তু তার ছেলে গিয়ে ইবনে যিয়াদকে ব্যপারটা জানিয়ে দিল । ইবনে যিয়াদ মুহাম্মদ ইবনে আশআসকে একদল লোকসহ মুসলিমকে গ্রেফতার করে আনার জন্য পাঠান । তারা মহিলার ঘরের প্রাচীরের বাইরে এসে পৌছল। মুসলিম তাদের ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ শোনার পর নিজেই বর্ম পরিধান করে নিজের ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন এবং তাদের বেশ কিছু লোককে হত্যা করলেন । আশআস চিৎকার দিয়ে বলল হে মুসলিম তোমাকে নিরাপত্তা দিলাম । মুসলিম বললেন-ধোকাবাজ , ফাসেক লোকদের নিরাপত্তা দেয়ার কোন দাম নেই । তিনি একাই লড়তে লাগলেন আর হামরুন ইবনে মালেক খাসআমীর এ পংক্তিগুলো বীরত্বগাথা হিসেবে পড়তে ছিলেন-

أقْسمْتُ لا أُقْتلُ إلاّ حُرّا

وإنْ ر أيْتُ الْموْت شيْئاً نُكْرا

أكْرهُ أنْ أُخْدع أوْ أُغرّا

أوْ أخْلط الْبارد سُخْناً مُرّا

كُلُّ امْرىً يوْما يُلاقى شرّا

أضْربُكُمْ ولا أخافُ ضرّا

আমি শপথ করেছি-স্বাধীনভাবেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব

যদিও মৃত্যুর শরাব আমার কাছে অতি তিক্তও হয়।

আমি চাই না , আমাকে ধোকা দেয়া হোক বা বন্দী হই-

অথবা স্বচ্ছ শীতল জল ময়লা পানিতে মিশ্রিত করব।

প্রত্যেকেই এই জগতে একদিন না একদিন সমস্যায় বন্দী হবে

তবে তরবারী দিয়ে আমি তোমাদের উপর আঘাত হানতে

ভয় করব না কিছুতেই।

ইবনে যিয়াদের বাহীনি চিৎকার দিয়ে উঠল-হে মুসলিম! মুহাম্মদ ইবনে আশআস তোমার কাছে মিথ্যা বলছেনা। তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছে না। মুসলিম এ কথায় কর্ণপাত করলেন না। অবশেষে ঢাল ও তরবারী ভেঙ্গে যাওয়ায় তার মধ্যে দূর্বলতা দেখা দিলে ইবনে যিয়াদের বাহিনী তার উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এরি মধ্যে এক ব্যক্তি পিছন দিক থেকে তীরের সাহায্যে তাকে আঘাত করে , যার ফলে তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে ঢলে পড়লেন । তাকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হল। ইবনে যিয়াদের সামনে হাজির করা হলে মুসলিম তাকে সালাম করল না । জনৈক দেহরক্ষী বলল-আমীরকে তুমি সালাম কর। মুসলিম বললেন-ওহে হতভাগা। সে আমার আমীর নয়। ইবনে যিয়াদ সদম্ভে বলল-অসুবিধা নেই । সালাম কর বা না কর তুমি নিহত হবেই। মুসলিম বললেন-আমাকে যদি হত্যা কর তা বড় কোন ব্যাপার নয়। কেননা , তোমরা চাইতে অপবিত্র ও নিকৃষ্ট লোক এর আগে আমার চাইতে উৎকৃষ্ট লোকদের হত্যা করেছে। তাছাড়া তুমি তো কাপুরুষোচিতভাবে লোকদের হত্যা কর। তাদের হাত পা কেটে গড়াগড়ি দাও , নিজের কুৎসিত চেহারা নগ্নভাবে ফাঁস কর , দুশমনের উপর যখন বিজয়ী হও , তাদের বেলায় নিকৃষ্ট ধরনের কাজ আঞ্জাম দাও। অন্য কেউ করার জন্য কোন নিকৃষ্ট কাজও তো অবশিষ্ট রাখ না। কাজেই এসব হিংস্র কাজের জন্য তোমার চেয়ে উপযুক্ত লোক তো পাওয়া দুস্কর। ইবনে যিয়াদ বলল-ওহে বিশৃংখলা ও অরাজকতা সৃষ্টিকারী অপরাধী। তোমার ইমামের বিরুদ্ধে তুমি বিদ্রোহ করেছ। মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছ । আর তুমি এবং তোমার পিতা যিয়াদ , যে ছিল ছাকীফ গোত্রের বনি এলাজ সম্প্রদায়ের গোলাম-তোমরা দু জনেই ফিতনার আগুন জ্বালিয়েছ। আশা করি , আল্লাহ পাক আমাকে শাহাদাত নছীব করবেন এবং সে কাজটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও অপবিত্র লোকের মাধ্যমে সম্পাদন করবেন। ইবনে যিয়াদ বললঃ হে মুসলিম , ক্ষমতার জন্য লালায়িত ছিলে। সেই ক্ষমতা লাভের জন্য চেষ্টা করেছ। কিন্তু আল্লাহর ইচছা হয়নি। তিনি সে পদটি তার যোগ্য লোককে প্রদান করেছেন। মুসলিম বললেন-ওহে মরাজানার ছেলে ! সেই ক্ষমতার যোগ্য ব্যক্তি কে ? ইবনে যিয়াদ বলল- ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া। মুসলিম বললেন-আলহামদুলিল্লাহ-আমরা রাজি আছি যে , মহান আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের মাঝে ফায়সালাকারী হবেন। ইবনে যিয়াদ বলল-তুমি কি মনে কর যে , খেলাফতের ব্যাপারে তোমার কোন অংশীদারিত্ব আছে ? মুসলিম বললেন , আল্লাহর কসম! শুধু মনে করা নয় , এ ব্যাপারে আামার দৃঢ় প্রত্যয় ও আস্থা রয়েছে। ইবনে যিয়াদ বলল- মুসলিম তুমি এই শহরে কেন এসেছ ? এখানকার শান্তি শৃংখলা কেন বিঘ্নিত করেছ ? কেন অনৈক্যের সৃষ্টি করেছ। মুসলিম বললেন-আমি অশান্তি , অনৈক্য ও বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য এ শহরে আসিনি। তবে তুমি যেহেতু নিকৃষ্ট কাজ করে যাচ্ছ , সৎ কাজের মূলোৎপাটন করেছ , জনগণের ইচ্ছা ও মতামত ছাড়াই নিজেকে তাদের আমীর বলে দাবী করেছ এবং তাদেরকে আল্লাহর নির্দেশের বিরোধী কাজগুলো করার জন্য বাধ্য করেছ এবং ইরান ও রোমের বাদশাহদের মতো আচরণ করছ সেহেতু আমরা এসেছি , মানুষকে সৎকাজের দিকে আহবান জানানো এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য। তাদেরকে কুরআন ও পয়গম্বর (সা.) এর সুন্নতের অনুসারী করার উদ্দেশ্যে। আমাদের মধ্যে সেই উপযুক্ততা রয়েছে। এ বক্তব্য শোনার পর ইবনে যিয়াদ চেঁচিয়ে উঠল এবং আলী ও হাসান-হুসাইন (আ.)কে গালমন্দ দিতে শুরু করল। মুসলিম বললেন-তুমি এবং তোমার পিতাই গালমন্দের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। ওহে আল্লাহর দুশমন! তোমরা যা ইচ্ছা কর।


মুসলিম ও হানির শাহাদত

ইবনে যিয়াদ বকর ইবনে হামারানকে দারুল ইমারার ছাদের উপর মুসলিমকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার হুকুম দিল । মুসলিম যাওয়ার সময় তাছবীহ পাঠ করছিলেন এবং আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন । ছাদের উপর পৌছা পর্যন্ত তিনি রাসূলে পাকের (সা.)উপর দরুদ পাঠ করতে থাকলেন ।

তার মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে গেল । তার হত্যাকারী অত্যন্ত ভীত বিহ্বলভাবে ছাদ থেকে নেমে আসল । ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞেস করল তোমার কি হল । বলল- হে আমীর যখন তাকে হত্যা করছিলাম তখন কুৎসিত কাল চেহারার এক লোক দেখলাম যে , আমার মুখোমুখি দাড়িয়ে দাতে নিজের আঙ্গুল কামড়াচ্ছে । তাকে দেখে এত ভয় পেয়েছি যে জীবনে কোন কিছুতেই এরূপ ভয় পাইনি । ইবনে যিয়াদ বলল- বোধহয় মুসলিমকে হত্যা করাতে তোমার মনে ভয় ধরে গেছে । এরপর হানিকে নিয়ে আসার হুকুম দিল । হত্যার উদ্দেশ্যে তাকে যিয়াদের কাছে নিয়ে যাওয়া হল । তখন হানি বারবার বলছিলেন-

وامذْحجاهُ و أيْن منّى مذْحجُ! واعشيرتاهُ و أيْن منّى عشيرتى !

“ কোথায় আমার গোত্রের লোকেরা ? কোথায় আমার আত্মীয়-স্বজন ?

জল্লাদ বলল-তোমার গর্দান নোয়াও । হানি বললেন খোদার কসম! আমার প্রাণ ও গর্দান দান করার জন্য আমি বদান্যতা দেখাব না । আমাকে হত্যা করার কাজে তোমাকে সহায়তা করব না । রশীদ নামক ইবনে যিয়াদের এক গোলাম তরবারীর আঘাত হেনে তাকে শহীদ করল ।

মুসলিম ও হানির মৃত্যুশোকে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর আসাদী এই কবিতাগুলো রচনা করেন। এক বর্ণনা মতে এ কবিতার রচয়িতা ফারাযদাক এবং কেউ কেউ বলেছেন যে , সালমান হানাফী তা রচনা করেছেন।

فإنْ كُنْت لا تدْرين ما الْموْتُ فانْظُرى

إلى هانى فى السُّوق وابْن عقيل

إلى بطلٍ قدْ هشّم السّيْفُ وجْههُ

وآخرُ يُهْوى منْ طمارٍ قتيل

أصابهُما فرْخُ الْبغيّ ف أصْبحا

أحاديث منْ يسْري بكُلّ سبيل

ترى جسدا قدْ غيّر الْموْتُ لوْنهُ

ونضحُ دمٍ قدْ سال كُلُّ مسيل

فتىً كان أحْيى منْ فتاةٍ حييّةٍ

و أقْطع منْ ذى شفْرتيْن صقيل

أيرْكبُ أسْمأُ الْهماليج آمنا

وقدْ طلبْتهُ مذْحجُ بذُحُول

تطُوفُ حواليه مُرادٌ وكُلُّهُم

على رقْبةٍ منْ سائلٍ ومسُول

فإنْ أنْتُمْ لمْ تث أرُوا ب أخيكُم

فكُونُوا بغايا أُرْضيتْ بقليل

অর্থাৎ যদি মৃত্যু কি তা না চেন , কুফার বাজারে মুসলিম এবং হানিকে দেখ। সেই বীরপুরুষ যার চেহারাকে তরবারী ক্ষ-বিক্ষত করেছে। অপর বীরপুরুষকে হত্যার পর ছাদের উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়া হয়েছে। নাপাক ইবনে যিয়াদ তাদের হত্যা করেছে। পরের দিনই মানুষের মুখে মুখে বর্ণিত হয়েছে সে নির্মম হত্যাকাণ্ড। দেখবে এমন লোককে-মৃত্যু যার রঙ বদলে দিয়েছে। পথে পথে তার রক্ষ প্রবাহিত হয়েছে। সে বীরপুরুষের একজন নারীদের চাইতেও লাজুক আর দ্বিতীয়জন ধারালো তরবারীর চাইতেও ক্ষুরধার। আসমা ইবনে হারেছা যে হানিকে ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে গেল , সে কি ঘোড়ায় চড়ে ঘুরতে পারবে এবং নিহত হওয়ার হাত থেকে রেহাই পাবে ? অথচ মাসহাজ গোত্র তার কাছ থেকে হানির রক্তের বদলা নিতে বদ্ধপরিকর। এ সময় মুরাদ গোত্র হানির চারদিকে ঘুরছিল এবং পরস্পর থেকে তার অবস্থা জিজ্ঞেস করছিল-তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল। হে মুরাদ গোত্র। তোমরা যেখানেই থাক , যদি তোমাদের ভাই হানির রক্তের প্রতিশোধ না নাও তাহলে তোমরা সেই ভবঘুরে মেয়েদের মতই হবে-যারা অল্প পয়সায় রাজি হয়ে যায়। ”

ইবনে য়িয়াদ মুসলিম ইবনে আকিল ও হানি ইবনে ওরওয়াকে শহীদ করার খবর জানিয়ে ইয়াজিদকে চিঠি লিখল । কয়েক দিন পর পত্রের জবাব আসল । ইয়াজিদ তার কাজের জন্য তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে লিখল- শুনেছি যে , হোসাইন কুফার দিকে আসছে । কিন্তু এ সময় তোমাকে ধরপাকর করতে হবে । প্রতিশোধ নিতে হবে । কারো বিরোধিতার আশংকা ও আলামত দেখা দিলে সাথে সাথে তাকে কারাগারে নিক্ষেপ কর ।

হযরত হোসাইনের ইরাক অভিমুখে যাত্রা

হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) হিজরী ৬০ সালের জিলহজ্বের ৩ তারিখ মঙ্গলবার বর্ণনান্তরে ৮ই জিলহজ্ব বুধবার মুসলিমের মৃত্যূর খবর পাওয়ার আগেই মক্কা থেকে বের হন। কারণ , তিনি যেদিন মক্কাত্যাগ করেন সেদিনই মুসলিম ইবনে আকিলকে কুফায় শহীদ করা হয় । বর্ণিত আছে , হোসাইন (আ.) ইরাকের উদ্দেশ্য যাত্রা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পর জন সমাবেশে দাড়িয়ে বলেন-

ألْحمْدُ للّه ما ش أ اللّهُ ولا قُوّة إلاّ باللّه و صلّى اللّهُ على رسُوله وسلّم. خُطّ الْموْتُ على وُلْد آدم مخطّ الْقلادة على جيْد الْفتاة، وما أوْلهنى إلى أسْلا فى إشْتياق يعْقُوب إلى يُوسُف و خيْر لى مصْرعٌ أنا لاقيه، ك أنّى ب أوْصالى تقطّعُها عُسْلانُ الْفلوات بيْن النّواويس و كرْبل أ، فيمْلانّ منّى أكْراشا جُوّفا و أجْربةً سغْبا، لا محيص عنْ يوْم خُطّ بالْقلم. رضى اللّه رضانا أهْل الْبيْت، نصْبرُ على بلائه ويُوفّينا أجْر الصّابرين، لنْ تشُذّ عنْ رسُول اللّه صلّى اللّه عليه و آله لحْمتُهُ، وهي مجْمُوعةٌ لهُ في حظيرة الْقُدْس، تقرُّ بهمْ عيْنُهُ ويُنْجزُ بهمْ وعْدُهُ، منْ كان باذلا فينا مُهْجتهُ ومُوطّنا على لق أ اللّه نفْسهُ فلْيرْحلْ معنا، فإنّنى راحلٌ مُصْبحا إنْ ش أ اللّهُ تعالى

“ মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলে খোদার প্রতি দরুদ । এরপর তিনি ফরমান , মহান আল্লাহ আদম (আ.) এর সন্তানদের উপর মৃত্যূর দাগ একে দিয়েছেন , যা তাদের জন্য সৌন্দর্য , যেমন যুবতীদের গলায় হারের দাগ (সৌন্দর্য) একে দেয় । আমি আমার পূর্ব পূরুষদের দেখার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছি । যেমনি ভাবে হযরত ইউসুফকে দেখার জন্য হযরত উয়াকুব উদগ্রীব ছিলেন । আমার নিহত হওয়ার জন্য একটি ভূখণ্ড নির্ধারিত রয়েছে যেখানে আমি গিয়ে পৌছব। আমি বোধ হয় দেখতে পাচ্ছি যে , মরুভূমির নেকড়েরা নাওয়ামীস ও কারবালার মধ্যবর্তী স্থানে আমার দেহকে টুকরা টুকরা করছে , যাতে তাদের ক্ষুধার্ত পেটগুলোকে সান্তনা দেয় । সত্যিই ভাগ্যের লিখন থেকে পালানো যায়না । মহান আল্লাহ যাতে খুশী আমাদের পরিবারও তাতে খুশী । আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বালা মুসিবত আসে তাতে আমরা ধৈর্য ধারণ করব। তিনি ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দান করবেন আমরা যে পয়গম্বরে খোদার (সা.)দেহেরই অংশ । আমরা রাসূলে পাক (সা.) থেকে কোন আবস্থাতেই পৃথক হব না । বেহেশতে তার সাথেই থাকব । এভাবেই তার সন্তুষ্টির ভাগী হওয়া যাবে আর আল্লাহ তার রাসূল (সা.) কে যে ওয়াদা দিয়েছেন তা পূর্ণ হবে । যারা আমাদের সাথে জানকে বাজী রেখে লড়তে প্রস্তুত এবং শাহাদত বরণ ও আল্লাহর সাথে মুলাকাতের জন্য উদগ্রীব তারা আমাদের সাথে আসুন , আল্লাহর সাহায্যে আগমীকাল আমরা মক্কা থেকে বের হয়ে যাব । ”

বর্ণিত আছে , আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জাবীর তাবারী ইমামী তার দালায়েলুল ইমামাহ ’ গ্রন্থে নিজস্ব বর্ণনা সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে , আবু মুহাম্মদ ওয়াকেদী ও যারারা ইবনে খালাজ বলেছেন যে , হোসাইন (আ.) ইরাকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার পূর্বে আমরা তার সাথে সাক্ষাত করে কুফাবাসীর অবহেলা সম্পর্কে তাকে অবহিত করি । তাকে আমরা বলেছি যে , কুফাবাসীর অন্তরসমূহ আপনার সাথে কিন্তু তাদের তরবারীগুলো আপনাকে হত্যার জন্য প্রস্তুত । এ কথা শুনে হোসাইন (আ.) হাত তুলে আকাশের দিকে ইশারা করেন । আসমানের দরজাগুলো খুলে গেল এবং অগনিত ফেরেশতা নাজিল হল-যাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না । অতঃপর তিনি বললেন , আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর যদি এমন না হত যে , আমার দেহ কারবালা প্রান্তরের নিকটবর্তী হবে , যদি সওয়াব হাতছাড়া হওয়ার ভয় না করতাম তাহলে এই শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে তাদের সাথে লড়াই করতাম । কিন্ত আমি নিশ্চিত যে , আমার ছেলে আলী ছাড়া আমি এবং আমার সকল সঙ্গীদের নিহত হওয়ার স্থান ওখানেই নির্ধারিত ।

মুতায়াম্মার ইবনে মুসান্না মাকতালুল হোসাইন নামক কিতাবে বর্ণনা করেছেন যে , তালবিয়ার দিনগুলো আসার সাথে সাথে আমর ইবনে সাআদ ইবনে আস বিরাট বাহিনী নিয়ে মক্কায় উপনীত হয় । ইয়াজিদের পক্ষ থেকে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় যে , সম্ভব হলে হোসাইনকে যেন হত্যা করে , যদি যুদ্ধ করতে হয় তার সাথে যুদ্ধ করবে । কিন্ত ঐ দিনই ইমাম হোসাইন মক্কা থেকে বেরিয়ে হয়ে যান ।

হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ.) হতে বর্ণিত মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া সেই এক রাতে হযরত হোসাইনের খেদমতে উপস্থিত হন , যার পরের দিনই সেখানেই তার যাত্রা করার কথা ছিল । তিনি বললেন- ভাইজান , আপনি জানেন যে , কুফাবাসী আপনার পিতা ও ভাইয়ের সাথে প্রতারণা করেছে । আমি আশংকা করছি তারা আপনার সাথেও প্রতারণা করবে । যদি ভাল মনে করেন মক্কায় থাকুন , কেননা আপনি আতি প্রিয় ও সম্মানিত ব্যাক্তি । তিনি বললেন – আমার ভয় হচ্ছে ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়া অতর্কিতে আল্লাহর ঘর হেরেমে এসে আমাকে হত্যা করবে এবং এর ফলে আমার দ্বারা আল্লাহর ঘরের মানহানি হবে । মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া বললেন – আপনার যদি এই আশংকা হয় , তাহলে ইয়ামেনের দিকে গমন করুন । কেননা সেখানে আপনি সম্মানিত হবেন । ইয়াজিদও আপনার নাগাল পাবে না । অথবা মরুভূমির কোথাও গিয়ে বসবাস করুন । বললেন-তোমার এই প্রস্তাব আমি চিন্তা করে দেখব ।


হযরত হোসাইনের কাফেলার মক্কা ত্যাগ

রাতের শেষ ভাগে হোসাইন (আ.) মক্কা থেকে যাত্রা করেন । এ সংবাদ মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়ার কাছে পৌছল । তিনি তাড়াতাড়ি এসে হযরত হোসাইন (আ.)যে উটনীতে সওয়ার ছিলেন , তার লাগাম ধরে বললেন- ভাইজান ! আপনি কি আমাকে ওয়াদা দেননি যে , আমার প্রস্তাব চিন্তা করে দেখবেন । বললেন-হ্যাঁ । জিজ্ঞেস করলেন- তাহলে যাওয়ার জন্য এত তাড়াহুরা করছেন কেন ? ইমাম বললেন- তুমি যাওয়ার পর রাসূল (সা.) আমার কাছে আসেন এবং বলেন-

یا حسین اخرج الی العراق فانّ الله قد ش أ ان یراک قتیلا

“ হে হোসাইন! তুমি ইরাকের দিকে যাও । কেননা , আল্লাহ তোমাকে নিহত হিসাবে দেখতে চান । ” মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া বললেন-انّ لله و انّ الیه راجعون

এখন যে নিহত হওয়ার জন্য যাচ্ছেন , এই মহিলাদের কেন সাথে নিয়ে যাচ্ছেন । হোসাইন (আ.) বললেন- রাসূলে খোদা (সা.)আমাকে বলেছেন যে-

انّ الله قد ش أ ان یراهن سبایا

“ মহান আল্লাহ এসব মহিলাকে বন্দিনী হিসেবে দেখতে চান । ” এ অবস্থাতেই মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া তাকে বিদায় দেন এবং চলে যান । মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব কুলাইনি কিতাবে রাসায়েল নামক গ্রন্থে হামজা ইবনে হামরান থেকে বর্ণনা করেন যে , আমরা হোসাইন (আ.) এর প্রস্থান এবং মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার ঘটনা বর্ণনা করছিলাম । ঐ মজলিসে ইমাম জাফর সাদেক (আ.) উপস্থিত ছিলেন । আমাকে বললেন- হে হামজা ; তোমাকে একটা হাদীস বলব । যার ফলে এ মজলিস শেষ হওয়ার পর তুমি মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া সম্পর্কে আমার কাছে কোন কিছু জানতে চাইবে না । সে হাদীস হল- হোসাইন (আ.) মক্কা থেকে যখন রওয়ানা হন তখন একটি কাগজে লিখে দেন-

بسم الله الرحمن الرحیم

হোসাইন ইবনে আলীর পক্ষ হতে বনি হাশিম গোত্রের উদ্দেশ্যে লেখা। অতঃপর যে কেউ আমার সাথে আসবে শাহাদত বরণ করবে , যে ব্যক্তি আসবে না , জয়ী হবে না। ওয়াসসালাম।

হযরত হোসাইন (আ.)তানঈম হয়ে যাতে আরক ” নামক স্থানে উপনীত হন। সেখানে ইরাক হতে আগত বশর ইবনে গালিবের সাথে তার সাক্ষাত হয়। তার কাছে জিজ্ঞেস করলেন-ইরাকের লোকেরা কেমন ? বলল-অন্তরে আপনাকে ভালবাসেন , কিন্তু তাদের তরবারী বনি উমাইয়াদের পক্ষে। তিনি বললেন-ঠিকই বলেছেন। আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন , তার ইচ্ছাই চুড়ান্ত।

কাফেলা পুনরায় চলে যেতে লাগল । দ্বি-প্রহরের দিকে ছা ’ লাবার ’ বাড়ীতে গিয়ে পৌছল। সেখানে হযরত হোসাইন (আ.) সামান্য ঘুমিয়ে পড়েন। একটু পরেই তিনি সজাগ হয়ে বলেন-এক গায়েবী কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম , বলছিল যে , আপনারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন আর মৃত্যু খুব দ্রুত আপনাদেরকে বেহেশতের মাঝে নিয়ে যাচ্ছে। তার ছেলে আলী শুনে বলে উঠল-

یا ابه افلسنا علی الحق ؟ হে পিতা । আমরা কি সত্যের উপর নই ? বললেন-খোদোর কসম। নিশ্চয়ই আমরা সত্যের উপর রয়েছি। আলী বলল-

اذن لا نبالی بالموت

“ তাহলে আমরা মৃত্যুর মোটেও তোয়াক্কা করি না। ” হযরত হোসাইন (আ.)বললেন-প্রিয় বৎস! আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। ঐ রাতে তিনি সা লাবার বাড়ীতেই অবস্থান করেন।

আবু হিররার সাথে হোসাইন (আ.)-এর সাক্ষাত

খুব ভোরে আবু হিররা নামক এক লোক কুফা হতে এসে পৌছলেন। হযরত হোসাইনকে (আ.) সালাম দিয়ে বললেন-হে রাসূলেন সন্তান। আপনি কেন আল্লাহর হেরেম ও রাসূলে পাকের হেরেম ছেড়ে আসলেন ? বললেন-বনি উমাইয়ারা আমার ধনসম্পদ কেড়ে নিয়েছে। কিছুদিন ধৈর্য ধরেছি , তারা গালি দিয়েছে , সহ্য করেছি। এখন তারা আমাদের রক্ত ঝরাতে চায় , তাই বেরিয়ে এসেছি। খোদার কসম! এই জালিমরা আমাকে হত্যা করবে। তবে মহান আল্লাহ তাদের গায়েই অপমানের পোষাক পরাবেন। প্রতিশোধের তরবারী তাদের উপর উত্থিত করবেন। তাদের উপর এমন লোককে ক্ষমতাসীন করবেন যে , সাবা ’ জাতির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মহিলার মত স্বেচ্ছাচারী হবে । একখা বলার পর তিনি সেখান থেকে চলে যান।

হযরত হোসাইনের (আ.) সান্নিধ্যে যুহাইর ইবনে ক্বীন

বনি ফারারা ও বাজিলা গোত্রের কিছু লোক বর্ণনা করেছেন যে , আমরা মক্কা থেকে যুহাইর ইবনে ক্বীনের সঙ্গে বের হই এবং হযরত হোসাইনের (আ.) পেছনে থেকে পথ চলছিলাম । পথিমধ্যে তার পাশাপাশি এসে পৌছলাম। কিন্তু যুহাইর যেহেতু তার সাথে সাক্ষাতের আগ্রহী ছিল না , সেহেতু হযরত হোসাইন (আ.) যেখানে মনযিল(যাত্রা বিরতি) করতেন আমরা তার একটু দুরত্বে মনযিল করতাম। একদিন হযরত হোসাইন (আ.)একস্থানে যাত্রা বিরতি করেন। আমরাও সেখানে যাত্রা বিরতি করতে বাধ্য হই। যখন খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম , এমন সময় হযরত হোসাইন (আ.)-এর পক্ষ হতে এক লোক এসে সালাম দিয়ে-হে যুহাইর ইবনে ক্বীন। হযরত হোসাইন (আ.) আমাকে আপনার কাছে একথা বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে-আপনি তার কাছে আসুন। একথা শোনার পর হাত থেকে খাবার পড়ে গেল , চিন্তার সমুদ্রে যেন আমি ডুবে গেলাম।

کان علی رؤسهم الطیر

‘ তাদের মাথার উপরে যেন পাখি বসে আছে ’ -এটি একটি আরবী প্রবাদ। (মানুষ যখন চিন্তায় তন্ময় হয়ে যায় তখনই এ প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়) যুহাইরের স্ত্রী দীলাম বিনতে ওমর বললেন-সুবহানাল্লাহ! আল্লাহর রাসূলের নাতি তোমাকে ডেকেছেন , এরপরও তুমি যাবে না । তার খেদমতে উপস্থিত হতে তোমার অসুবিধা কি ? তার কথা শুনতে আপত্তি কিসের ? যুহাইর ইবনে ক্বীন উঠে দাড়ালেন এবং হযরত হোসাইনের কাছে গমন করলেন । কিছুক্ষণ পরে সহাস্য বদনে ফিরে এলেন এবং নির্দেশ দিলেন যেন তাবু তুলে নিয়ে হযরত হোসাইন (আ.)এর পাশে তা স্থাপন করা হয়। এরপর যুহাইর তার সাথীদের বললেন , যার ইচ্ছা আমার সাথে আস। নচেত এটাই তোমাদের সাথে আমার শেষ দেখা।

হযরত হোসাইন (আ.)সেখান থেকে রওনা হয়ে যুবালার বাড়ীতে উপনীত হলেন । ওখানে গিয়েই তিনি মুসলিম ইবনে আকীলের শাহাদাত বরণের সংবাদ অবহিত হলেন। তার সঙ্গীরাও সংবাদটি জানতে পারলেন। এরপর যারা পার্থিব নেতৃত্ব কর্তৃত্বের আশায় হোসাইনের (আ.) সাথে এসেছিল তারা ফিরে গেল । কেবল তার পরিবার-পরিজন এবং একান্ত অনুরক্ত সঙ্গীরা রয়ে গেল।মুসলিমের শাহাদতের সংবাদে মাতম উঠল।সবার চোখে অশ্রু প্রবাহিত হল। কিন্তু হযরত হোসাইন (আ.)তো শাহাদতের আশায় ছিলেন অটল অবিচল।

কবি ফরাযদাক হযরত হোসাইনের (আ.)সাথে সাক্ষাত করলেন। বললেন হে নবীদুলাল যে কুফাবাসী আপনার চাচাত ভাই মুসলিম ইবনে আকীলকে হত্যা করল , তাদের উপর আপনি কিভাবে আস্থা রাখতে পারেন ? হোসাইন (আ.) কেদে দিলেন এবং বললেন-আল্লাহ মুসলিমকে ক্ষমা করুন । চিরন্তন জীবন এবং অনন্ত রোজীর ভাগী হয়েছেন। বেহেশতে প্রবেশ করেছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন। তিনি তার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন । কিন্তু আমরা এখনো আঞ্জাম দেইনি। এরপর এ কবিতাগুলো আবৃত্তি করলেন-

فإنْ تُكُن الدُّنْيا تُعدّ نفيسةً

فإنّ ثواب اللّه أعْلا و أنْبلُ

وإنْ تكُن الاْبْدانُ للْموْت أُنْشئتْ

فقتْلُ امْرءٍ بالسّيْف فى اللّه أفْضلُ

وإنْ تكُن الاْرْزاقُ قسْما مُقدّرا

فقلّةُ حرْص الْمرْء فى السّعْى أجْملُ

وإنْ تكُن الاْمْوالُ للتّرْك جمْعُها

فما بالُ متْرُوكٍ به الْمرْءُ يبْخلُ

পৃথিবী যদিও খুব দামী বলে গণ্য হয় , কিন্তু নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর পক্ষ হতে সওয়াবের মর্যাদা অনেক বেশী। মানুষের দেহ যদি মৃত্যুর জন্যই সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে তরবারীর আঘাতে আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া অতি উত্তম। মানুষের জীবিকা যদি পূর্ব থেকেই বন্টিত ও নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে জীবিকা অর্জনে মানুষ অধিক লোভাতুর না হওয়াই সুন্দর। সম্পদের আহরণ ও সঞ্চয় যদি রেখে চলে যাওয়ার জন্য হয়ে থাকে , তাহলে মানুষ কেন এমন জিনিস নিয়ে কৃপণতা করে , যা তাকে পেলে চলে যেতে হবে। ”

কায়েস ইবনে মাসহার এর শাহাদত

হযরত হোসাইন (আ.)কুফায় সুলাইমান ইবনে সা দ খাজায়ী , মুসাইয়েব ইবনে নাজিয়া , রেফাআ ইবনে সাদ্দাদ এবং তার একদল অনুসারীর বরাবরে একখানা পত্র লিখলেন এবং কায়েস ইবনে মাসহার সায়দাভীকে দিয়ে তা পাটিয়ে দিলেন , কায়েস কুফার নিকটে পৌছতেই ইবনে যিয়াদের গুপ্তচর হোসাইন ইবনে নুমাইর তাকে দেখতে পান। সে তাকে তল্লাশী করতে চাইল। তিনি হযরত হোসাইন (আ.)-এর চিঠিখানা বের করে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। হোসাইন ইবনে নুমাইর তাকে ইবনে যিয়াদের নিকট নিয়ে গেল। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞেস করল-তুমি কে ? বললেন-আমীরুল মু ’ মেনীন আলী ইবনে আবি তালেব (আ.) এবং তার ছেলের অনুসারী। জিজ্ঞেস করল-চিঠি কেন তুমি ছিড়ে ফেলেছ ? কায়েস বললেন-তুমি যাতে চিঠির বিষয়বস্তু অবহিত না হও , তার জন্য। ইবনে যিয়াদ জানতে চাইল-চিঠি কার কার কাছে লেখা হয়েছিল ? বললেন-কুফার কিছু অধিবাসীর উদ্দেশ্যে হযরত হোসাইন (আ.) পাঠিয়েছিলেন। যাদের নাম আমার জানা নেই। ইবনে যিয়াদ ক্রুদ্ধ হয়ে বলল-খোদার কসম! তাদের নাম না বলা পর্যন্ত তোমাকে ছাড়বনা। অথবা বিকল্প পথ হল , মিম্বারে গিয়ে হোসাইন এবং তার বাপ ও ভাইকে গালমন্দ করতে হবে । অন্যথায় তরবারীর আঘাতে তোমাকে টুকরা টুকরা করে ফেলব। কায়েস বললেন-যাদের উদ্দেশ্যে পত্র লেখা হয়েছে , কিছুতেই তাদের নাম তোমাকে বলবনা। তবে মিম্বরে গিয়ে হোসাইন এবং তার পিতার নামে গালমন্দ দিতে প্রস্তুত আছি । এরপর তিনি মসজিদের মিম্বরে আসলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও তারীফ এবং রাসূলে খোদার (সা.) উদ্দেশ্যে দরূদ পাঠালেন । এরপর হযরত আলী ইবনে আবী তালেব (আ.) এবং হাসান ও হোসাইন (আ.) এর জন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর রহমত কামনা করলেন। এরপর বললেন হে জনতা! আমি হলাম হযরত হোসাইনের (আ.)পক্ষ হতে তোমাদের কাছে প্রেরিত দূত। তিনি এখন অমুক স্থানে অবস্থান করছেন। তোমরা তার দিকে ধাবিত হও এবং তাকে সাহায্য কর। এ সংবাদ ইবনে যিয়াদের কাছে পৌছে গেল । সাথে সাথে হত্যার নির্দেশ দিল। তাকে দারুল ইমারা ’ প্রাসাদের ছাদের উপর নিয়ে মাটিতে নিক্ষেপ করা হল। তাতে তিনি শাহাদত বরণ করলেন । হযরত হোসাইনের (আ.) কাছে তার শাহাদতের খবর পৌছার পর খুব কান্নাকাটি করলেন এবং বললেন-আল্লাহ আামাদের অনুসারীদের জন্য একটি ভাল জায়গা নির্বাচন করুন। দয়া করে আমাদেরকে এমন জায়গায় একত্রিত করুন। হে আল্লাহ! তুমি সব কিছুর উপরই কর্তৃত্বশালী , ক্ষমতাবান। বর্ণিত আছে যে , হাজেয ’ নামে প্রসিদ্ধ এক লোকের বাড়িতে বসেই চিঠিখানা প্রেরণ করেন। বর্ণনান্তরে ভিন্নমতও রয়েছে।

হযরত হোসাইনের (আ.) সামনে হোর ইবনে এযিদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি

হযরত হোসাইন (আ.) আরো অগ্রসর হলেন। কুফা পৌছতে মাত্র দুই মনযিল বাকি। হটাৎ ১০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে হোর বিন এযিদ হযরত হোসাইন (আ.)-এর কাছে উপস্থিত হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন-হে হোর! তুমি কি আমাদের সাহায্য করার জন্য এসেছ ? নাকি আমাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য এসেছ ? হোর বলল , আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করতেই এসেছি। হোসাইন (আ.) বললেন-

لا حوْل ولا قُوّة إلاّ باللّه الْعليّ الْعظيم

তখনই দু জনের মাঝে কথাবার্তা বিনিময় হয়। পরিশেষে হযরত আবু আবদিল্লাহ হোসাইন (আ.) বললেন-তোমরা যেসব চিঠি পাঠিয়েছ বা তোমাদের দূতেরা যা বলেছে , তোমার এখনকার মত যদি তার বিপরীত হয় তাহলে যেখান থেকে এসেছি , সেখানেই ফিরে যাব। কিন্তু হোর এবং তার সাথীরা হযরত হোসাইন (আ.)-এর প্রত্যাবর্তনে বাধা দিল। হোর বলল , হে রাসূলের সন্তান! এমন কোন পথ বেছে নিন যা কুফায়ও যাবে না মদীনায়ও না। যাতে ইবনে যিয়াদের কাছে কোন কৈফিয়ত দিতে পারি। বলব যে , হোসাইন এমন পথে চলে গেছে যে , তাকে আমি দেখতে পাইনি। হযরত হোসাইন (আ.) বাম দিকের পথটা বেছে নিলেন এবং আজীব হাজানাতে ’ উপনীত হলেন। ঐ সময়ই ইবনে যিয়াদের একটি চিঠি হোরের হাতে এসে পৌছল। ঐ চিঠিতে হোরকে হোসাইনের ব্যাপারে তার গৃহিত ব্যবস্থার কারণে কড়া ভাষায় তিরস্কার করা হয় এবং আরো কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়।

হোর ও তার সাথীরা , হযরত হোসাইন (আ.)-এর পথ রুদ্ধ করে দাড়ায় এবং তাকে যেতে নিষেধ করে। হযরত হোসাইন (আ.)বললেন , তুমি কি বলনি যে , আমি ভিন্ন পথ ধরে চলি , যা মদীনা কিংবা কুফার পথ নয়। বলল-হ্যাঁ , বলেছিলাম। কিন্তু আমীর ইবনে যিয়াদের চিঠি এসে পৌছেছে , ঐ চিঠিতে নির্দেশ দিয়েছেন , যাতে আপনার উপর কঠোরতা আরোপ করি। তাছাড়া তার হুকুম অনুসরণ করছি কি না পর্যবেক্ষণ করার জন্য আমার বিরুদ্ধে গুপ্তচর নিয়োগ করেছে।

একথা শোনার পর হযরত হোসাইন (আ.) আপন সঙ্গী-সাথীদের মাঝে দাড়িয়ে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসূলের প্রতি দরুদ পাঠানোর পর বললেন- হে জনতা আমাদের সামনে যে পনিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে তা আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। সত্যিই দনিয়া পাল্টে গেছে। মন্দ ও কুৎসিৎ দিকগুলো প্রকাশ করে দিয়েছে। ভাল দিকগুলোকে পশ্চাতে ফেলে দিয়েছে। ক্রমাগত মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সে চলছে। অথচ পার্থিব জগতের কিছু নেই। গ্লাস থেকে পানি ঢেলে ফেলার পর যে দু এক ফোটা পানি থেকে যায় দুনিয়ার ততটুকুই অবশিষ্ট রয়েছে। লবণাক্ত জমির মতই একটি হীন জীবন প্রবাহ এখানে বর্তমান। আপনারা কি দেখতে পাচ্ছেন না যে , এখানে সত্যের উপর আমল করা হচ্ছে না এবং বাতিলকে বাধা দেয়া হচ্ছে না। এর ফলশ্রুতি হচ্ছে , মু ’ মিন আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়াকেই অগ্রাধিকার দেয়। সত্যিই আমি মৃত্যুকে সৌভাগ্য এবং জালিমদের সাথে জীবন যাপনকে অন্যায় ছাড়া অন্যকিছু মনে করছি না।

لا أرى الْموْت إلاّ سعادةً والْحياة مع الظّالمين إلاّ برما

এ বক্তব্য শোনার পর যুহা্ইর ইবনে ক্বীন দাড়িয়ে বললেন- হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান আপনার বক্তব্য শুনেছি । আমাদের কাছে এই অস্থায়ী জগতের কোন মূল্য নেই। দুনিয়ার জীবন যদি স্থায়ী হত এবং তাতে চিরদিন থাকতাম তবুও আপনার পথে নিহত হওয়াকে এই স্থায়ী জীবনের উপর অগ্রাধিকার দিতাম। এরপর হেলাল ইবনে নাফে বাজলী উঠে দাড়ালেন এবং বললেন-খোদার কসম মৃত্যু এবং শাহাদতকে আমরা ভয় পাইনা।আমাদের সেই নিয়ত ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রতিষ্ঠিত আছি। আপনার দুশমনদের সাথে দুশমনি এবং আপনার বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব রাখি। এরপর যুবাইর ইবনে খুজাইর উঠে দাড়ালেন এবং বললেন-হে পয়গম্বরের পুত্র আপনাকে দিয়ে আল্লাহ আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। যাতে আপনার সহযোগী হয়ে লড়াই করে আপনার পথে আমাদের দেহগুলো টুকরো টুকরো করি এবং বিনিময়ে কিয়ামেতের ময়দানে আপনার নানাজানের সুপারিশ নছিব হয়।


হযরত হোসাইন (আ.) কারবালায়

হোসাইন (আ.) উঠে দাড়ালেন এবং ঘোড়ায় সওয়ার হলেন । কিন্তু হোর এর বাহিনী কখনো তাকে সম্মুখ দিক থেকে বাধা দিচ্ছিল , কখনো তার পেছন থেকে এগিয়ে আসছিল। এভাবে মুহররমের ২ তারিখ কারবালা প্রান্তরে উপনীত হলেন। সেখানে পৌছার পর হযরত হোসাইন (আ.) জিজ্ঞেস করলেন-এই ভূমির নাম কি ? বললেন-কারবালা। বললেন-হে আল্লাহ ; বালা মুছিবত হতে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। এরপর তিনি বললেন-

هذا موْضعُ كرْب وبل أ أنْزلُوا، هاهُنا محطُّ رحالنا ومسْفكُ دمائنا، وهاهُنا واللّه محلُّ قُبُورنا

এখানে দুঃখ ও বালা-মুছিবতের স্থান নেমে পড় , এখানেই আমাদের অবতরণের , রক্ত ঝরানোর এবং আমাদের কবরের স্থান।

আমার নানা রাসূলে খোদা (সা.) আমাকে এ সংবাদ দিয়েছেন।এরপর সবাই নেমে পড়লেন। হোর এবং তার সঙ্গীরাও এক দিকে তাবু পেলল।

যয়নবের অস্থিরতা

হোসাইন (আ.)বসে আপন তরবারিতে ধার দিচ্ছিলেন । আর এ কবিতাগুলো আবৃত্তি করছিলেন-

يا دهْرُ أُفٍّ لك منْ خليل

كمْ لك بالاْشْراق والاْصيل

منْ طالبٍ وصاحبٍ قتيل

والدّهْرُ لا يقْنعُ بالْبديل

وكُلُّ حيٍّ سالكُ سبيل

أ وإنّما الاْمْرُ إلى الْجليل

হে যুগ! তোমার বন্ধুত্বের স্থায়িত্ব নেই। বন্ধুর সাথে শত্রুতা ছাড়া তোমার জন্য কাজ নেই। সকাল বিকাল তুমি অনেক বন্ধুকে হ্যা করেছ , অথচ তোমার এ শত্রুতা কারো কাছেই স্পষ্ট নয়। প্রতিটি প্রানীই মৃত্যু পথযাত্রী তবে তুমি ছাড়া আর কারো কাছেই মানুষ চিরন্তন জীবন পায় না। ”

হযরত যয়নব আলাইহিস সালাম কবিতাগুলো শুনলেন এবং বললেন-ভাইজান , একথাগুলো এমন লোকের , যে জানে যে , নিশ্চিতভাবেই নিহত হবে। হোসাইন (আ.) বললেন , হ্যাঁ , প্রিয় বোন , ব্যাপার তেমনই। যয়নব (আ.) বললেন-হায় , হোসাইন (আ.) নিজের শাহাদত ও মৃত্যুর কথাই বলছে। এসময় মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করলেন। মুখে মাথায় আঘাত করছিল এবং কাপড় ছিড়ে ফেলছির। উম্মে কুলসুম চিৎকার দিয়ে বলছিল-

وامُحمّداهُ واعليّاهُ واأُمّاهُ وا أخاهُ واحُسيْناهُ واضيعتاهُ بعْدك يا أبا عبْد اللّه

“ হে আবু আবদিল্লাহ , আপনার পরে আমাদের যে অসহায় করুণ অবস্থা নেমে আসবে তার থেকে পানাহ চাই। হযরত হোসাইন (আ.) তাদের সান্তনা দিয়ে বললেন-প্রিয় বোন! আল্লাহর রাস্তায় ধৈর্যের পরিচয় দাও। কেননা , আসমানের বাসিন্দারা , জমিনের অধিবাসীরা সকল মানুষই তো ধ্বংস হয়ে যাবে।

এরপর বললেন-হে উম্মে কুলসুম , হে যয়নাব , হে ফাতেমা , হে রোবাব , সাবধান! আমি যখন নিহত হব , তখন যেন গায়ের কাপড় ছিন্ন না কর। চেহারায় যেন আঘাত না কর । এমন কথা মুখ দিয়ে বল না , যা আল্লাহ পছন্দ করেন না ।

অপর রেওয়ায়তে বর্ণিত , যয়নব (আ.)হযরত হোসাইন (আ.) থেকে একটু দূরে মহিলাদের মাঝে বসা ছিলেন। কবিতাগুলোর ভাবার্থ তার কানে পৌছার সাথে সাথে এমনভাবে দৌড়ে আসলেন যেন মাথার কাপড় ছিল না এবং গায়ের কাপড়ের আচল ঝুলছিল। তিনি বললেন-

واثكْلاهُ، ليْت الْموْت أعْدمنى الْحياة،

“ হায় , মৃত্যু এসে যদি আমাকে নিয়ে যেত। ” আমার মা যাহরা , পিতা আলী ও ভাই হাসান দুনিয়াতে নেই। তোদের স্মৃতি ও আমাদের আশ্রয় হিসাবে তুমিই আছ। হেসাইন (আ.) তার দিকে তাকিয়ে বললেন-বোন! শয়তান যেন তোমার সনশীলতা ছিনিয়ে না নেয়। যয়নব (আ.) বলেন-আমার প্রাণ তোমার জন্য উৎসর্গিত। তুমি কি আসলেই নিহত হবে ? হোসাইন (আ.) তার দুঃখ ও বেদনাকে অন্তরে চেপে রাখলেন , কিন্তু দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন-

لوْ تُرك الْقطا لنام

“ শিকারীরা যদি (কাতা নামীয়) পাখিটিকে তার আপন জালে ছেড়ে দিত তাহলে সে তার নীড়ে শান্তিতে ঘুমাতো। ”

এ কথায় তিনি ইঙ্গিত করলেন যে , বনি উমাইয়া যদি তাকে শান্তিতে থাকতে দিত তাহলে মদীনা থেকে আমি বেরিয়ে আসতাম না। ” হযরত যয়নাব (সা.আ.) এ কথা শুনে বললেন , ভাইজান! আপনি কি নিজেকে দুশমনদের হাতে বন্দি বলে মনে করছেন এবং জীবন সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছেন ? একথা চিন্তা করতেই আমার হৃদয় জ্বলে পুড়ে যায় একথা বলেই মুখে দু হাতে প্রচণ্ড আঘাত করে টান দিয়ে নিজের কাপড় ছিড়ে ফেললেন এবং বেহুশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। হোসাইন (আ.) উঠে দাড়ালেন এবং যয়নাবের মুখে পানি ছিটিয়ে দিলেন। তাতে তার হুশ ফিরে এল। তিনি কঠোরভাবে তাকে সান্তনা দিলেন এবং তার নানা রাসূলে খোদা (সা.) ও পিতা আলী (আ.)-এর জীবনের দুঃখ মছিবতগুলোর বর্ণনা দিলেন। যেন হোসাইন (আ.)-এর শাহাদতকে সেই তুলনায় তুচ্ছ মনে করে অন্তরে সান্তনা পায়।

হোসাইনের (আ.) আহলে বাইত (আ.)ও পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে আনার কারণ হয়তো এটাই ছিল যে , তিনি যদি আহলে বাইতকে (আ.) হেজাজে অথবা অন্য কোন শহরে রেখে আসতেন তাহলে এযিদ ইবনে মুয়াবিয়া-লানাতুল্লাহ আলাইহ সৈন্য পঠিয়ে তাদেরকে বন্দী করে নিয়ে আসত এবং তাদের প্রতি নির্যাতন চালাত। যাতে হোসাইন (আ.) আল্লাহর রাস্তায় শাহাদত বরণের সিদ্ধান্ত ত্যাগ করে এযিদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে বিরত হন।


দ্বিতীয় অধ্যায়

আশুরার ঘটনাবলী , শহীদানের শাহাদতের দৃশ্যপট ইমাম পরিবারের তাবু লুটপাট

ওবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ ইমাম হোসাইনের (আ.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের উস্কানী দেয় । তাদেরকে সত্যের পথ থেকে ফিরিয়ে নেয়। তার সেনাবাহিনী এ ডাকে সাড়া দেয়। ওমর বিন সা দকে পরকালীন জীবন , তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থের বিনিময়ে খরিদ করে তাকে সেনা অধিনায়ক নিযুক্ত করে। ওমর এ প্রস্তাব গ্রহণ করে চার হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ইমাম হোসাইন (আ.) এর সাথে যুদ্ধের জন্য কুফা থেকে যাত্রা করে। ইবনে যিয়াদ একের পর এক সেনাদল পাঠাতে থাকে। ছয়ই মুহাররম রাত পর্যন্ত ইবনে সা দের সেনাবাহিনীর সংখ্যা দাড়ায় বিশ হাজার। এ বাহিনী হযরত হোসাইন (আ.)এর গতিরোধ করে ইমাম বাহিনীর পানি বন্ধ করে দেয়।

কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.) এর প্রথম ভাষণ

(কারবালার ময়দানে তৃষ্ণার্ত ইমাম বাহিনী এক দিকে-অপর দিকে ওমর বিন সা দের বিশাল বাহিনী। এ অবস্থায় শত্রু সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ইমাম তার তরবারীর উপর ভর দিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে প্রথম যে ভাষণ প্রদান করেন তা নিম্নরূপ।)

أُنْشُدُكُمُ اللّه هلْ تعْرفُوننى ؟ قالُوا: أللّهُمّ نعمْ، أنْت ابْنُ رسُول اللّه وسبْطه

খোদার কসম দিয়ে বলছি , তোমরা আমাকে চেন ? তারা বললঃ হ্যাঁ , আপনি আওলাদে রাসূল এবং তারই নাতি। খোদার শপথ করে বলছি , তোমারা কি জানো আমার নানা ছিলেন রাসূলে খোদা (সা.) । তারা জবাব দেয় , হ্যাঁ খোদার কসম দিয়ে বলছি , আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি। তোমরা কি জানো আমার পিতা আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) । তারা বলল জ্বি , হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ। আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি তোমরা কি জানো আমার মা জননী ফাতেমা যাহরা (আ.) ছিলেন মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর কন্যা । সবাই বলল- খোদার কসম করেই বলছি তাই ঠিক। আল্লাহর শপথ করে বলছি তোমরা কি জানো আমার নানী ছিলেন খাদিজা বিনতে খোওয়াইলিদ (রা.) যিনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম মহিলা। তারা জবাবে বলল-হ্যাঁ খোদার শপথ তাই ঠিক। ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন আল্লাহর শপথ করে বলো-তোমরা কি জানো সাইয়্যেদুশ শোহাদা হামজা (রা.) ছিলেন আমার পিতার চাচা ? তারা বললঃ হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ। হযরত বললেন-আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি তোমরা কি জান জাফর তাইয়ার (রা.) ছিলেন আমার চাচা ? তারা বললঃ জ্বি হ্যাঁ , আল্লাহর কসম আমরা জানি। ইমাম বললেন , আল্লাহর শপথ করে বলছি-তোমরা কি জানো রাসূল (সা.) এর তরবারী মোবারক আমার হাতে রয়েছে তারা জবাবে বলল-হ্যাঁ আমরা জানি। হযরত (আ.) আবারো আল্লাহর শপথ করে বললেন-তোমরা কি জান আমার মাথার এ পাগড়ীটি মহানবী (সা.) এর পাগড়ী ? তারা বলল , জ্বি হ্যাঁ , আমরা তা জানি। ইমাম (আ.)আবার আল্লাহর শপথ নিয়ে বললেন-তোমাদের কি জানা আছে আলী (আ.) প্রথম ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং জ্ঞান ও ধৈর্যের ক্ষেত্রে অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন-তিনি ছিলেন নারী-পুরুষ সকলের মওলা(অভিভাবক) । তারা বললঃ জ্বি হ্যাঁ আমার জানি। ইমাম বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন , আল্লাহর শপথ-

قال فبم تسْتحلُّون دمى

তাহলে আমার রক্ত কি করে তোমরা হালাল মনে করছ ? অথচ আমার পিতা হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন। কিয়ামত দিবসে লিওয়াউল হামদ (হামদের পতাকা) তার হাতেই থাকবে। তারা জবাব দিল-তুমি যা কিছু বলেছ আমরা সবই জানি কিন্তু-

ونحْنُ غيْرُ تارك يك حتّى تذُوق الْموْت عطْشانا !!!

পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠগত হওয়া পর্যন্ত আমরা তোমাকে ছাড়বনা।

হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর ভাষণ সমাপ্ত হচ্ছিল।তার কন্যাগণ ও বোন হযরত জয়নাব (আ.) ভাষণ শুনছিলেন আর বুকে হাত মেরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। তাদের কান্না ছির হৃদয় বিদারক। ইমাম (আ.) তার ভাই আব্বাস এবং ছেলে আলীকে তাদের কাছে পাঠিয়ে বললেন-মহিলাদেরকে সান্তনা দাও কেননা আমার জীবনের শপথ করে বলছি- এরপর ইবনে যিয়াদই কাদবে।

বর্ণনাকারী বলেন , ওমর বিন সা দের নামে লেখা আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদের পত্র পৌছে গেল । ঐ পত্রে তাকে উস্কানি দিয়ে বলা হয় দ্রুত যেন যুদ্ধ শুরু করা হয়। এ কাজে বিলম্ব না হয়। এ পত্র পাওয়া মাত্রই অশ্বারোহী সেনাদল ইমাম হোসাইন (আ.) এর তাবুর দিকে অগ্রসর হয়।

আব্বাস (রা.) নিরাপদঃ

শিমার তাবুর কাছে এসে চিৎকার দিয়ে বলে উঠেاین بنو اختی কোথায় আমার ভাগ্নেরা ? কোথায় আমার ভাগ্নে আবদুল্লাহ , জাফর , আব্বাস ও উসমান ? হোসাইন (আ.) বললেনঃ শিমার ফাসেক হলেও তোমরা তার কথার জবাব দাও যেহেতু সে তোমাদের মামা। আব্বাস ও তার ভাই জবাব দিলেন-কি বলতে চাও ? শিমার বললঃ হে আমার ভাগ্নেরা তোমরা নিরাপদ। তোমাদের ভাই হোসাইনের সাথে নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিওনা । আমীরুল মো ’ মেনীন ইয়াজিদের আনুগত্য কর ।

আব্বাস (আ.) বললেন-তোমর ধ্বংস হোক , আল্লাহর দুশমন। আমাদের জন্য কি মন্দ ও লজ্জাকর নিরাপত্তার কথা বলছ ?

أتأْمُرْنا أنْ نتْرُك أخانا وسيّدنا الْحُسيْن بْن فاطمة وندْخُل فى طاعة اللُّعن أ أوْلاد اللُّعن أ

আমাদেরকে ফাতেমা (আ.) এর সন্তান হোসাইন (আ.) এর সহযোগিতা ছেড়ে অভিশপ্তের সন্তান অভিশপ্তের আনুগত্য করতে বলছ ?

এ জবাব শুনে শিমার তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে তার সেনাবাহিনীর কাছে পিরে যায়।

ইবনে যিয়াদের বাহিনীর পক্ষ হতে অতি দ্রুত যুদ্ধ শুরুর তোড়জোড় এবং ইমামের ভাষণে তাদের মধ্যে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া না হওয়ায়-হযরত আব্বাস (রা.) কে ইমাম (আ.) বললেন-যদি পারো আজকে তাদেরকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখ। আজ রাতে নামাযের মধ্যেই কাটাবো। আল্লাহই ভাল জানেন আমি নামায পড়া ও কুরআন তিলাওয়াতকে কতই না ভাণবাসি । আব্বাস (রা.) এসে তাদেরকে যুদ্ধ না করার অনুরোধ জানালো । ওমর বিন সা দ চুপ তাকল। মনে হচ্ছিল সে যুদ্ধ বিলম্বিত করতে আগ্রহী ছিল না।

আমর বিন হাজ্জাজ যুবাইদী বলল , খোদার কসম আমাদের প্রতিপক্ষ যদি তুর্কী বা দায়লমী হতো আর তারা এ দরখাস্ত করলে আমরা অবশ্যই গ্রহণ করতাম । অথচ এরা হচ্ছে আল্লাহর রাসূল (সা.) এর আওলাদ । কি করে তদের প্রস্তাব নাকচ করতে পারি ? অবশেষে এ প্রস্তাব গৃহীত হয়ে যুদ্ধ বিলম্বিত হয়।

ইমাম হোসাইন (আ.)মাটিতে বসে পড়েন হটাৎ তার ঘুম এসে যায়। কিছুক্ষণ পরই ঘুম থেকে জেগে উঠেন । হযরত যয়নব (রা.) কে লক্ষ করে বলেন-প্রিয় বোনটি আমার! নানা রাসূলে খোদা (সা.) , পিতা আলী (আ.) , মা ফাতেমা (সা.আ.) ও ভাই হাসান (আ.) কে স্বপ্নে দেখেছি। আমাকে বলেছেনঃ হে হোসাইন! অতিশীঘ্রই আমাদের সাতে মিলিত হবে। ’ কোন কোন বর্ণনা মতে তারা বলেছিল- হে হোসাইন। (আ.) আগামীকালই আমাদের সাথে মিলিত হবে। ” যয়নব (আ.) এ কথা শুনে মাথায় হাত চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার দিয়ে কেদে উঠলেন। হোসাইন (আ.) বললেন , চিৎকার দিওনা , এমন কাজ করো না যাতে জনগণ আমার দুর্নাম করে ।

রাত এসে গেল। জীবনের সর্বশেষ রাত্রিতে হোসাইন (আ.) তার সাথী-সঙ্গীদের সমবেত করে মহান আল্লাহর প্রশংসার পর বললেনঃ

أمّا بعْدُ، فإنّى لا أعْلمُ أصْحابا أصْلح منْكُمْ، ولا أهْل بيْتٍ أفْضل منْ أهْل بيْتى ، فجزاكُمُ اللّهُ عنّى جميعا خيْرا، وهذا اللّيْلُ قدْ غشيكُمْ فاتّخذُوهُ جملا، ولْي أخُذْ كُلُّ رجُلٍ منْكُمْ بيد رجُلٍ منْ أهْل بيْتى ، وتفرّقُوا فى سواد هذا اللّيْلُ وذرُونى وهؤُل أ الْقوْم، فإنّهُمْ لا يُريدُون غيْرى

আমি আমার সাথী-সঙ্গীদের চেয়ে কোন সাথীকে অধিক নেককার এবং আমার আহলে বাইতের (আ.) চেয়ে কোন পরিবারকে অধিক উত্তম মনে করি না। মহান আল্লাহ তোমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। এখন রাত , অন্ধকার সবকিছু ছেয়ে ফেলেছে। তোমরা এ রাতের অন্ধকারকে পথিকের উটের মতো মূল্য দাও। তোমরা সবাই আমার আহলে বাইতের এক একজনকে নিয়ে রাতের আধারে পালিয়ে যাও । আমাকে শত্রু সেনাদের সামনে থাকতে দাও , কেননা তারা একমাত্র আমাকেই চায় ।

নাসেখুত তাওয়ারিখ গ্রন্থে ইমাম হোসাইন (আ.) এর বক্তব্যের বর্ণনা নিম্নরূপ।

ইমাম হোসাইন (আ.) তার বাহিনীর উদ্দেশ্যে বলেন- আমি তোমাদের নিকট হতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) তুলে নিলাম । তোমার নিজের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও। ” এরপর আহলে বাইত (আ.) এর উদ্দেশ্যে বলেন- তোমাদেরকেও যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি। এ বিশাল বাহিনীর মোকাবিলায় যুদ্ধ করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। কেনন্ প্রতিপক্ষ সংখ্যা ও সাজসরঞ্জামের দিক থেকে তোমাদের তুলনায় অনেক বেশী। তদের এ সেনাপরিচালনাও আমাকে হত্যা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। তোমরা আমাকে এ সেনাবাহিনীর সামনে আবস্থান নিতে দাও। আল্লাহই সর্বাবস্থায় আমায় সাহায্য করবেন। তার রহমতের দৃষ্টি আমার উপর থেকে উঠিয়ে নেবেন না । যেমন আমার পূত পবিত্র পূর্ব পুরুষগণ থেকে তার দৃষ্টি তুলে নেননি। এ ভাষণের পর ইমাম বাহিনীর অনেকেই চলে যান। তবে তার আত্মীয়-স্বজনরা তার সাথেই থেকে যান। এক মনীষী এ প্রসঙ্গে কবিতার ভাষায় বলেন-

گفت ای گروه هرکه ندارد هوای ما

سرگیرد و یرون رود از کربلای ما

ناداده تن بجواری و نا کرده ترک سر

هرگز نیافت راه بدولت سرای ما

برگردد آنکه با هوس کشور است

سرنا ورد با فسر شاهی گدای ما

این عرضه نیست جلوهگه روبه و گراز

شیرافکن است بادیه ابتلای ما

ما پروریم دشمن در خون کشیم دوت

أ کس ر وقوف نیست بچون و چرای ما

মুরুজুজ্জাহাব গ্রন্থের মতেঃ এ ভাষণের পর হোসাইন (আ.) এর বাহিনীর ১১শ লোকের মধ্যে তার পরিবারের ৭২ জন ছাড়া সবাই রাতের অন্ধকারে ইমামকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। হোসাইন (আ.) এর ভাই , সন্তান ও আবদুল্লাহ জাফরের সন্তানরা বলে উঠে-

ولم نفْعلُ ذلك لنبْقى بعْدك! لا أرانا اللّهُ ذلك أبدا

কেন আপনাকে ছেড়ে চলে যাব এটা কি আমাদের বেচে থাকার জন্য ? মহান আল্লাহ আমাদের জন্য কখনও এমন দিন যেন না দেন।

এ বক্তব্য প্রথমে উপস্থাপন করেন আব্বাস বিন আলী (আ.)এরপর আহলে বাইতের (আ.) সবাই তার কথায় সমর্থন দেন।

এপর হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) মুসলিম বিন আকিলের সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন-মুসলিমের শাহাদত তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। আমি তোমাদের চলে যাওয়ার অনুমতি দিচ্ছি।

অন্য বর্ণনা মতে ইমামের ভাষণ শুনার পর আহলে বাইত সমস্বরে বলতে লাগল-

হে আওলাদে রাসূল , মানুষ আমাদের কি বলবে ? আর আমরা জনগণকে জবাবই বা কি দেব ? আমরা কি বলব আমাদের নেতা আমাদের বুযুর্গ এবং মহানবীর সন্তান (আ.)কে একা ফেরে এসেছি ? তার সাহায্যার্থে দুশমনের দিকে একটি তীরও নিক্ষেপ করিনি।বর্শা কাজে লাগাইনি , তরবারী চালাইনি ? খোদার কসম আপনাকে ছেড়ে যাব না। নিজের জীবন দিয়ে হলেও আপনার প্রতিরক্ষা করব , প্রয়োজনে আল্লাহর রাস্তায় আপনার সাথে শাহাদতের শরবত পান করব। আপনার শাহাদতের পর আমাদের বেছে থাকাকে আল্লাহ অকল্যাণজনক করুক।

এরপর মুসলিম বিন আজুসা দাঁড়ায়ে বললঃ হে আল্লাহর নবীর আওরাদ! দুশমনের এ বিশাল বেষ্টনীর মধ্যে আপনাকে ফেলে রেখে আমরা চলে যাব ? খোদার কসম এ কাজ আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহ আপনার পর আমাদের জীবন নছীব না করুন।আমরা যুদ্ধ করব আপনার দুশমননের বুকে বর্শা ভেঙ্গে যাওয়া পর্যন্ত তরবারী চালাবো তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়বো । যদি কোন অস্ত্র না থাকে পাথর নিয়ে তাদের প্রতিহত করব। প্রয়োজনে জীবন বিলিয়ে দেব।তবুও আপনাকে ছেড়ে যাব না।

সাইদ বিন আব্দুল্লাহ হানাফী বললোঃ হে মহানবীর আওলাদ (আ.)! খোদার শপথ করে বলছি আপনাকে একা রেখে আমরা যাব না। আমরা আল্লাহর দরবারে প্রমাণ করব আপনার সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (সা.) এর অসিয়ত রক্ষা করেছি। আপনার পথে যদি নিহত হই এরপর জীবিত হই এরপর জীবন্ত দগ্ধ হই আর তা যদি সত্তরবারও হয় আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনার মৃত্যুর আগেই নিজের মৃত্যুকে দেখতে চাই। আপনার পথে জীবন না বিলিয়ে কিভাবে থাকতে পারি ? অথচ মৃত্যু তো জীবনে একবারই আসে। এ মৃত্যুর পরই চিরন্তন সম্মান ও সৌভাগ্য লাভ করবো।

এরপর যুহাইর বিন কেইন দাড়িয়ে বলল খোদার শপথ। হে মহানবীর আওলাদ (আ.) আপনি আপনার পরিবার পরিজনকে আল্লাহ জীবন্ত রাখার পরিবর্তে প্রয়োজনে হাজারবার নিহত হওয়া আবার জীবন্ত হওয়াকে আমি অধিক পছন্দ করি। ইমাম (আ.) এর সহযোগী একদল সমস্বরে বলে উঠে-

আমাদের জীবন আপনার জন্য উৎসর্গিত। আমার আমাদের জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে আপনার প্রতিরক্ষা করব , এ পথে জীবন দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব পালন করব।

ঐ রাতেই মুহাম্মদ বিন বশির হাজরামীর কাছে এ সংবাদ পৌছে যে , তার ছেলে সেই সীমান্তে বন্দী হয়েছে। মুহাম্মদ বিন বশির বললেন-তার ব্যাপার আল্লাহর উপর ছেড়ে দিচ্ছি। আমার জীবনের শপথ আমার ছেলে বন্দী থাকুক এবং তারপরও আমি জীবিত থাকি এটা আমি মোটেই পচন্দ করি না। ইমাম হোসাইন (আ.) তার কথা শুনছিলেন। বললেন- আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। আমি তোমার উপর থেকে আমার বাইয়াত তুলে নিচ্ছি। তুমি তোমার সন্তানের মুক্তির জন্য পদক্ষেপ নাও। ” জবাবে মুহাম্মদ বললঃ আপনাকে ছেড়ে গেলে হিংস্রপ্রাণী আমাকে জীবিত অবস্থায় টুকরা টুকরা করে খেয়ে ফেলুক। ইমাম (আ.) বললেন- এ ইয়ামেনী জামাগুলো তোমার ছেলেকে দাও যাতে তার ভাইয়ের মুক্তির জন্য কাজে লাগাতে পারে। এরপর এক হাজার দিনার মূল্যের পাঁচটি জামা তাকে দান করলেন।

বর্ণনাকারী বলেছেন-

ঐ রাতটি ইমাম (আ.) ও তার সঙ্গীদের মুনাজাত ও আহাজারীতে কাটে। একদল রুকু অপর দল সিজদা বা অন্যান্য ইবাদতে গোটা রাত কাটিয়ে দেয়। ঐ রাতে ওমর বিন সাদের বাহিনীর বত্রিশ জন ইমাম হোসাইন (আ.) এর সৈন্যদলে যোগ দেয়। অধিক নামায আদায় ও পূর্ণতার বিভিন্ন গুণে হযরত হোসাইন (আ.) এর চরিত্রই ছিল অনন্য । ইবনে আবদুল বার রচিত ইকদুল ফরিদ গ্রন্থের ৪র্থ খণ্ডের বর্ণনামতে , আলী বিন হোসাইন (আ.)কে জিজ্ঞেস করা হয় আপনার পিতার সন্তান এত কম কেন ? তিনি বলেন-একটি সন্তানও বিস্ময়কর ব্যাপার। কেননা রাত দিনে তিনি হাজার রাকাআত নামায আদায় করতেন। এতে করে তার স্ত্রীর সাথে সময় কাটানোর ফুরসত ছিল না।

আশুরার দিন ভোরে ইমাম হোসাইন (আ.) তাবিুর ভিতরের অংশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার নির্দেশ দিলেন। আতর গোলাব ছিটালেন । বর্ণিত হয়েছে যে , বারির বিন খোজাইর হামাদানী এবং আবদুর রহমান বিন আবদে রাব্বিহী ইমাম হোসাইন (আ.) তাবু থেকে বের হবার পর পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য তাবুর পশ্চাতে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় বারির আব্দুর রহমানের সাথে হাসি ঠাট্টা শুরু করে।আব্দুর রহমান বলল ,হে বারির তুমি হাসছো অথচ এখন হাসার বা হাস্যকর কথা বলার সময় নয়।

বারির বললঃ আমার সম্প্রদায়ের সবাই জানে আমি যৌবনে ও বার্ধক্যে কখনও অনর্থক কথা বলা পছন্দ করিনি। তবে শহীদ হতে যাচ্ছি এ আনন্দে আজকে এ হাস্যকর কথা বলছি। খোদার শপথ এ বাহিনীর মোকাবিলায় তরবারী চালানো এবং কিছুসময় তাদের সাথে যুদ্ধ করা ছাড়া আর কিছুই বাকী নেই। এরপরই তো বেহেশতী হুরের সান্নিধ্য পাব।


আশুরার দিন ভোরে

ওমর বিন সাদের অশ্বারোহী বাহিনী অগ্রসর হল। ইমাম হোসাইন (আ.) বারির বিন খুজাইরকে তাদের কাছে পাঠালেন। বারির তাদেরকে উপদেশ দিলেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু তারা বিন্দু মাত্র কর্ণপাত করেনি। এসব নছিহত তাদের মনে কোন প্রভাব ফেলেনি। এরপর ইমাম হোসাইন (আ.) তার উটে মতান্তরে অশ্বে আরোহণ করে ওমর বিন সাদের বাহিনীর সামনে দাঁড়ালেন। তাদেরকে গভীর মনযোগ দিয়ে তার কথা শোনার আহবান জানালেন। তারা নিরবে শুনতে লাগলো। ইমাম হোসাইন (আ.) অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের শব্দ ও বাক্য প্রয়োগ করে মহান আল্লাহর প্রমংসা এবং মুহাম্মদ (সা.) ফেরেশতাকুল ও সকল নবীদের উপর দরুদ পড়ার পর বললেন-

تبّا لكُمُ أيّتُها الْجماعةُ وترْحا حين إسْتصْرخْتُمُونا والهين ف أصْرخْناكُمْ مُوجفين سللْتُمْ عليْنا سيْفا لنا فى ايمانكُمْ وحششْتُمْ عليْنا نارا إقْتدحْناها على عدُوّنا وعدُوّكُمْ ف أصْبحْتُمْ أُلبّاً لاعْدائكُمْ على أوْليائكُمْ

হে জনগোষ্ঠী! তোমাদের এজন্য ধ্বংস হোক যে , তোমরা জটিল পরিস্থিতিতে আমার সাহায্য চেয়েছো। আমি তোমাদের সাহায্যের জন্য ছুটে এসেছি।কিন্তু যে তরবারী আমার সাহায্যে পরিচালনার শপথ তোমরা নিয়েছিলে আজ আমাকে হত্যার জন্য সে তরবারী হাতে নিয়েছো। তোমরা যে আগুন আমাকে জ্বালানোর জন্য প্রজ্বলিত করছো আমি চেয়েছিলাম এ আগুন দিয়ে আমার ও তোমাদের দুশমনদেরকে জ্বালিয়ে দেবো। আজ তোমরা সবাই নিজের বন্ধুকে হত্যা আর দুশমনদের সাহায্যে ছুটে এসেছ। অথচ তারা তোমাদের মাঝে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেনি। তাদের সহযোগীতার ফলে তোমাদের আনন্দ বা অনুগ্রহ পাওয়ার কোন আশা নেই। তোমাদের জন্য আফসোস। কেন তোমরা ফেতনার আগুন জ্বালানোর জন্য পঙ্গপালের মত ঝাপিয়ে পড়েছ। পতঙ্গের মত পাগল হয়ে নিজেদেরকে আগুন নিক্ষেপ করছে।

হে সত্য বিরোধীরা , হে অমুসলিমের দল , হে কুরআনকে প্রত্যাখ্যানকারীরা , হে কথা বিকৃতিকারী , হে অপরাধীর দল , ওহে শয়তানের কুমন্ত্রণায় পতিত গোষ্ঠী , হে মহানবী (সা.) এর শরীয়ত ও সুন্নতকে স্তব্ধকারী আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত দল , এ অপবিত্র জনগোষ্ঠীকে সহযোগীতা করে আমাদের সহযোগীতা থেকে হাত গুটিয়েছো ? হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ তোমাদের চরিত্রে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র পূর্ব থেকেই ছিল। তোমাদের মূল ও শাখা-প্রশাখা এ প্রতারণায় সমানভাবে জড়িত হয়ে পড়েছে। এ কুচিন্তা তোমাদের মাঝে বলিষ্ঠভাবে স্থান পেয়েছে। তোমরা সবচেয়ে নাপাক ফল যা নিজের দর্শককে কষ্ট দেয়। স্বল্প আহার যা ডাকাতরাই গিলে খেতে পারে।

ألا وإنّ الدّعيّ ابْن الّدعي قدْ ركز بيْن اثْنتيْن: بيْن السّلّة والذّلة وهيْهات منّا الذّلّةُ ي أبى اللّهُ لنا ذلك ورسُولُهُ والْمُؤْمنُون

জেনে রাখ ,জারজের ছেরে জারজ (ইবনে যিয়াদ) আমাকে দু বস্তুর এখতিয়ার দিয়েছে। নাঙ্গা তরবারী হাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হবো না হয় অপমানের পোষাক-পরিধান করে ইয়াজিদের বাইয়াত মেনে নেবো। তবে অপমান আমাদের থেকে বহু দূরে। আল্লাহ তার রাসূল মুমিনগণ এবং পবিত্র ঘরে লালিত সন্তানরা ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও বীরত্বের প্রতীকগণ কখনও অপমানকে মেনে নেবে না। তারা ইজ্জতের উপর আঘাত হেনে এ ধরনের লোকদের আনুগত্য করার চেয়ে মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে। জেনে রাখ যদিও আমার সঙ্গী কম তবুও আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব। ভাষণশেষে ফরওয়া বিন মুসাইক মুরাদীর কবিতার কয়েকটি লাইন উদ্বৃত করলেন লাইন ক ’ টি ছিল-

فإنْ نهْزمْ فهزّامُون قدْما

وإنْ نُغْلبْ فغيْرُ مُغلّبينا

وما إنْ طبُّنا جُبْنٌ ولكنْ

منايانا ودوْلة آخرينا

إذا ما الْموْتُ رفّع عنْ أُناسٍ

كلاكلهُ أناخ بآخرينا

فأفْنى ذلكُمْ سروات قوْمى

كما أفْنى الْقُرُون الاْوّلينا

فلوْ خلْد الْمُلُوكُ إذا خُلدْنا

ولوْ بقي الْكرامُ إذاً بقينا

فقُلْ للشّامتين بنا: أفيقُوا

سيلْقى الشّامتُون كما لقينا

আমরা যদি বিজয়ী হই আর দুশমন বিজিত হয় তাতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। কেননা আমরা সবসময় বিজয়ী ছিলাম। যদি পরাভূত বা নিহত হই আমাদের নিজেদের কারণে হব না এবং ভয়ভীতির পথে নিহত হব ন। বরং আমাদের মৃত্যুর সময় এসে গেছে এবং যুগের আবর্তনে বিজয়ের পালা অন্যের ভাগে পড়েছে। যদি মৃত্যুদূত এই জনগোষ্ঠীর দরজা থেকে সরে যায় তবে অন্য গোষ্ঠীকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে।

আমাদের সম্প্রদায়ের বুজর্গগণ তোমাদের হাতে ঐরুপ মৃত্যুবরণ করেছে যেরূপ যুগ যুগ ধরে মানুষ মৃত্যুর হাতে বলি হয়েচে। রাজা-বাদশাহরা যদি এ জগতে চিরস্থায়ী হতো আমরাও চিরস্থায়ী হতাম। যদি মহান ব্যক্তিগণ এ দুনিয়ায় বেচে থাকতেন আমরাও বেচে থাকতাম।

যারা আমাদের ভৎসনা করছে তাদেরকে বলে দাও নিজেকে নিয়ে চিন্তা করো , অযথা ভৎসনা করো না। কেননা আমরা যে মৃত্যুর সম্মুখিন হয়েছি ভৎসনাকারীরাও একই মৃত্যুর সম্মুখিন হবে।

এ কবিতার চরণগুলো আবৃত্তির পর বললেন-আল্লাহর কসম আমার মৃত্যুর পর তোমরা বেশীদিন বাচতে পারবে না। তোমাদের জীবন কোন সওয়ারীতে আরোহণ এবং নেমে পড়ার অধিক সময় স্থায়ী হবে না। সময় যাতাকলের মত তোমার মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে। আর তোমরা যাতাকলের মধ্যেপড়া গমের মত পিষে যাচ্ছ। আমার পিতা আলী (আ.) রাসূলে খোদা (সা.) থেকে যা শুনেছেন তাই তোমাদের সামনে ব্যক্ত করেছি।

فاجمعوا امرکم و شرکائکم ثم لا یکون امرکم علیکم غمّة ثم اقضوا الی و لا تنظرون ان توکلت علی الله ربی و ربکم

এখন তোমরা তোমাদের মতামত ঠিক করো , বন্ধুদের সাথে মিলিত হও , পরামর্শ করো যাতে তোমাদের কাছে বিষয়টি অস্পষ্ট না থাকে। এরপর আমাকে হত্যার জন্য পদক্ষেপ নিও আমাকে সময় দিও না , আমি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করেছি যিনি আমার ও তোমাদের পালনকর্তা । সৃষ্টির সকল কাজের ক্ষমতা তারই হাতে।আর আমার পরওয়ারদিগার সর্বদা সঠিকভাবে অনড় অটল রয়েছেন।

এ ভাষণের পর ইমাম শত্রুপক্ষকে ভৎসনা করে বললেন-হে খোদা , তোমার রহমতের বারি এদের জন্য বন্ধ করে দাও। বছরের পর বছর এমন দুর্ভিক্ষ দাও , হযরত ইউসুফ (আ.) এর সময়কার মত দুর্ভিক্ষ দাও। সাকাফী গোলামকে তাদের উপর আধিপত্য দাও যাতে মৃত্যুর তিক্ত স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করাতে পারে।কেননা এরা আমার সাথে মিথ্যা বলেছে , প্রতারণা করেছে।

গোলঅম সাকাফী বলতে সম্ভবতঃ হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে বুঝিয়েছেন। তিনি ছিলেন সাকাফী গোত্রের লোক। আল্লামা মাজলিসী ও মুহাদ্দেস কোমীর মতে সাকাফী গোলাম বলতে মোখতার বিন আবি উবাইদা সাকাফীকে বুঝানো হয়েছে। – অনুবাদক।

তুমিই আমার পরওয়ারদিগার আমি তোমারই উপর তাওয়াক্কুল করেছি তোমারই দিকে মনোনিবেশ করেছি সবাই তোমারই দিকে ফিরে যাবে।

এরপর ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন এবং রাসূলে খোদার মোরতাজা নামক ঘোড়াটি চাইলেন এবং নিজের সাথীদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করলেন।

হযরত ইমাম বাকের (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে , হোসাইন (আ.)এর সাথীদের মধ্যে ৪৫জন ছিলেন অশ্বারোহী আর একশো জন ছিলেন পদাতিক। অন্যান্য বর্ণনাতেও এ সংখ্যার সমর্থন পাওয়া যায়।


ওমর সাদের মাধ্যমেই যুদ্ধ শুরু

বর্ণিত হয়েছে ওমর বিন সাদ সামনে অগ্রসর হয়ে হোসাইন (আ.) এর সঙ্গীদের দিকে একটি তীর নিক্ষেপ করল এবং বলল হে জনতা আমীরের কাছে সাক্ষী দিও আমিই প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছি।এরপরই বৃষ্টির মত তীর ছুড়তে শুরু করে। হোসাইন (আ.) তার সাথীদের বললেনঃ

قُومُوا رحمكُمُ اللّهُ إلى الْموْت، إلى الْموْت الّذى لا بُدّ منْهُ، فإنّ هذه السّهامُ رسُلُ الْقوْم إليْكُم

আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত করুন। ওঠো , মৃত্যুর জন্য , কেননা মৃত্যু থেকে বাচার উপায় নেই। এ তীরসমূহ এমন সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে নিক্ষেপতি হচ্ছে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে চায়।এরপর ইমাম হোসাইন (আ.) এর সাথীরা দুটি অভিযান চালায় এবং দীর্ঘসময় পর্যন্ত যুদ্ধ চালায়। হোসাইন বাহিনীর অনেকেই শাহাদত বরণ করেন। এ সময় ইমাম হোসাইন (আ.) নিজের চেহারায় হাত বুলিয়ে বললেন-

إشْتدّ غضبُ اللّه على الْيهُود إذْ جعلُوا لهُ ولدا، واشْتدّ غضبُهُ على النّصارى إذْ جعلُوهُ ثالث ثلاثةٍ، واشْتدّ غضبُهُ على الْمجُوس إذْ عبدُوا الشّمْس والْقمر دُونهُ، واشْتدّ غضبُهُ على قوْمٍ اتّفقتْ كلمتُهُمْ على قتْل ابْن بنْت نبيّهمْ. أما واللّه لا أُج يبُهُمْ إلى شيْءٍ ممّا يُريدُون حتّى ألْقى اللّه تعالى و أنا مُخضّبٌ بدمى

ইহিুদী সম্প্রদায়ের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত তখনই গুরুতর হয়েছে যখন তারা আল্লাহর সন্তান আছে বলে ঘোষণা দিয়েছে এবং বলেছে-ওজাইর আল্লাহর পুত্র। আর নাসারাদের উপর তখনই গজব তীব্রতর হয়েছে যখন তারা আল্লাহকে তিন খোদার একজন হিসেবে স্থির করেছে।

অগ্নিপূজকদের উপর খোদায়ী অভিসম্পাত তখনই তীব্রতর হয়েছে যখন থেকে তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে সূর্য ও চন্দ্রের পূজা শুরু করে।

আল্লাহর গজব ঐ জনগোষ্ঠীর উপর যারা সম্মিলিতভাবে মহানবী (সা.) এর নাতিকে হত্যার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। খোদার শপথ আমি এ জনগোষ্ঠির কথা শুননো না , ইয়াজিদের নামে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করব না , এতে যদি রক্তমাখা বদন নিয়েও আল্লাহর সাক্ষাৎ হয়।

আবু তাহের মুহাম্মদ বিন হোসাইন (আ.) তাবারসী তার বিরচিত মাআলেমুদ্দিন গ্রন্থে হযরত ইমাম সাদেক (আ.) থেকে বর্ণনা করেন যে , আমি আমার পিতার মুখে শুনেছি- ইমাম হোসাইন (আ.) যখন ওমর বিন সাদের মুখোমুখি হন এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা তার সাহায্যার্থে আকাশ থেকে একদল ফেরেশতা পাঠালেন এবং তারা হযরতের (আ.) মাথার উপর উড়তে থাকে। ইমাম হোসাইন (আ.) স্বাধীনভাবে দুটির যে কোন একটি গ্রহণ করার সুযোগ পেলেন। হয় ফেরেশতাগণ তার সাহায্য করবে , এতে দুশমনরা ধ্বংস হবে । অথবা শহীদ হবেন এবং আল্লাহর দিদারে চলে যাবেন। ইমাম হোসাইন (আ.) আল্লাহর দিদারের পথ বেছে নেন।

এরপর ইমাম হোসাইন (আ.) বলিষ্ঠ কন্ঠে বললেন-

أما منْ مُغيثٍ يُغيثُنا لوجْه اللّه، أما منْ ذابٍّ يذُبُّ عنْ حرم رسُول اللّه

তোমাদের কেউ আছ কি যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমাকে সাহায্য করবে ? কেউ আছ কি দুশমনদেরকে রাসূলে খোদা (সা.) এর হেরেম থেকে দূরে সরাবে ?

ইমাম হোসাইন (আ.) এর দিকে হোর ইবনে ইয়াজিদের আগমন

এ সময় হোর বিন ইয়াজিদ রিয়াহী ওমর বিন সাদকে লক্ষ্য করে বললেন-

اتقاتل هذا الرجل ؟

“ হোসাইনের সাথে যুদ্ধ করতে চাও ? ওমর জবাব দেয়-

إيْ واللّه قتالاً أيْسرُهُ أنْ تطير الرُّؤُوسُ وتطيح الاْيْدي

হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ এমন যুদ্ধ করব যাতে সহজেই শরীর থেকে মাথাগুলো বিচ্ছিন্ন করা যায় আর হাতগুলো ধড় থেকে পৃথক করা যায়।

এ কথাগুলো শোনার পর হোর তার সাথীদের কাতার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এ সময় তার শরীর কাপছিল। মুহাজির বিন আউস বলল-হে হোর , তোমার আচরণ সন্দেহজনক। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কুফার মধ্যে সবচেয়ে বড় বীর কে ? তোমাকে বাদ দিয়ে আমি অন্য কারো নাম নেব না , কেন কাপছো ? হোর বলল , আল্লাহর কসম আমি নিজেকে বেহেশত ও দোজখের মাঝামাঝি দেখছি । তবে খোদার শপথ বেহেশত থেকে অন্য কিছুকে প্রাধান্য দেব না। এতে যদি আামর শরীর টুকরা টুকরা হয় বা জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করা হয়। এরপর হাক মেরে অশ্বের উপর সওয়ার হয়ে হোসাইন (আ.) এর দিকে অগ্রসর হন। দু হাত মাথায় রেখে বলতে শুরু করেন-

أللّهُمّ إنّى تُبْتُ إليْك فتُبْ عليّ، فقدْ أرْعبْتُ قُلُوب أوْليائك و أوْلاد بنْت نبيّك

হে আল্লাহ! তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি আমার তওবা কবুল কর ; আমি তো তোমার বন্ধুদের এবং তোমার নবী নন্দিনীর সন্তানদের ভয় দেখিয়েছি।

ইমাম হোসাইন (আ.) কে লক্ষ্য করে আরজ করলেন- আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গীত। আমি তো সেই ব্যক্তি যে আপনার সাথে কঠোর ব্যবহার করেছে আপনাকে মদিনা যেতে দেয়নি। আমি ভাবতেই পারিনি এরা পরিস্থিতি এ পর্যায়ে নিয়ে আসবে। আমি তওবা করেছি , আল্লাহর দিকে ফিরে এসেছি। আমার তওবা কি গৃহীত হবে ? ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন এসো , আল্লাহ তোমার তওব কবুল করবেন। নেমে এসো। ”

হোর বলল , নেমে আসার চেয়ে আপনার পথে আরোহণ অবস্থায় যুদ্ধ করা অনেক উত্তম বলে মনে করি। শেষ পর্যন্ত তো অশ্ব থেকে পড়ে যেতেই হবে। আমি যেহেতু প্রথম ব্যক্তি যে আপনার পথ রুদ্ধ করেছিলাম অনুমতি দিন আমিই প্রথম ব্যক্তি হতে চাই , যে আপনার পথে প্রথম শহীদ হবো। এমন ব্যক্তি হতে চাই কেয়ামত দিবসে আপনার নানা মুহাম্মদ (সা.) এর সাথে করমর্দন (মুসাহাফা) করব।

লিখকের মতে , হোরের উদ্দেশ্য ছিল প্রথম অবস্থায় শাহাদত বরণ করা। কেননা এর পূর্বেও একটি দল নিহত হয়। বর্ণিত হয়েছে একদল লোকের শাহাদতের পরই ইমাম হোসাইন (আ.) তাকে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন। হোর বীরের মত দুশমনের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। বেশ কিছুসংখ্যক বীরকে ধরাশায়ী করে নিজে শাহাদতের শরবত পান করেন। তার দেহ ইমাম হোসাইন (আ.) এর কাছে আনা হল-ইমাম তার মুখমণ্ডল থেকে ধুলাবালি সরাচ্ছিলেন আর বলছিলেন-

أنْت الْحُرُّ - كما سمّتْك أُمُّك حُرّا- فى الدُّنْيا والاّْخرة

তুমি সত্যই হোর বা মুক্ত যেমন তোমার মা তোমার নাম রেখেছে হোর (মুক্ত) তুমি দুনিয়া ও আখেরাতেও মুক্ত।

বর্ণিত হয়েছে-এরপর বারির বিন খোজাইরের মত যাহেদ ও আবেদ ব্যক্তিত্ব ময়দানে অবতীর্ণ হলেন , ইয়াজিদ বিন মা কাল তার সাথে যুদ্ধের জন্য ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ল। তারা দু জন মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে আল্লাহর কাছে সত্যের পথ নির্ণয়ের জেদ ধরে কামনা করল-যে বাতিল সে যেন প্রতিপক্ষের হাতে নিহত হয়। প্রচণ্ড লড়াইয়ের পর বারির তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। কিছুক্ষণ পর তিনিও শাহাদত বরণ করেন।

তারপর ওহাব বিন জেনাহ কালবী ময়দানে সমর নৈপুণ্য প্রদর্শন করে কারবালায় অবস্থানরত মা ও স্ত্রী ও পরিবারের কাছে ফিরে আসলেন। মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন , মা জননী আামর উপর আপনি সন্তুষ্ট আছেন ?

জবাবে মা বললেন-আমি তোমার উপর রাজী ও খুশী নই যতক্ষণ না তুমি হোসাইন (আ.) এর সাহায্যার্থে প্রাণ না দেবে।

তার স্ত্রী বলল-আমাকে বিপদে ফেলো না। আমার অন্তরে কষ্ট দিও না। তার মা বললেন প্রিয় ছেলেটি আামার-তার কথায় কান দিও না। নবী নন্দিনীর সন্তানদের পথে ফিরে যাও , যুদ্ধ করো। এতেই কিয়ামত দিবসে তার নানার শাফায়াতের সৌভাগ্য লাভ করবে। ওহাব ময়দানে গিয়ে যুদ্ধ করতে করতে দু হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তার স্ত্রী তাবুর একটি স্তম্ভ হাতে নিয়ে তার সামনে এসে বলল-আমার মাতা-পিতা তোমার জন্য উৎসর্গিত। পবিত্র আহলে বাইত ও রাসূলে খোদা(সা.) এর সম্মানিত আওলাদগণের সাহায্যার্থে যুদ্ধ করুন। ওহাব এসে তাকে নারীদের তাবুতে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন। তার স্ত্রী স্বামীর দামান ধরে বলল-আমি মরে যেতে পারি তবুও ফিরে যাব না। ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন-আমার আহলে বাইতের সাহায্যের জন্য আল্লাহ তোমাদের উত্তম পুরুস্কার দান করুন। (ওহাবের স্ত্রীকে বললেন) তুমি নারীদের তাবুতে ফিরে যাও , সে ফিরে যায় আর ওহাব দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে শাহদত বরণ করে।

এরপর মুসলিম বিন আওসাজা ময়দানে এসে দুশমনের মোকাবিলায় প্রচণ্ড যুদ্ধ চালিয়ে অনেক দুশমনকে ঘায়েল করে ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন। মুমূর্ষ অবস্থায় দেখে ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন-হে মুসলিম , আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। এরপর কুরআনের এ আয়াত তিলাওয়াত করেন।

( فمنْهُمْ منْ قضى نحْبهُ ومنْهُمُ منْ ينْتظرُ وما بدّلُوا تبْديلاً)

তাদের কেউ শাহাদত বরণ করেন আর কেউ অপেক্ষায় আছেন আল্লাহ তার নেয়ামত কখনও পরিবর্তন করেন না।

হাবিব তার কাছে এসে বলল- তোমার মৃত্যু আমার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু তোমাকে ধন্যবাদ যে বেহেশতে চলে যাচ্ছ। মুসলিম খুব ক্ষীণ কন্ঠে বলল আল্লাহ তোমাকে সন্তুষ্ট রাখুন। সুসংবাদ দিন। হাবিব বলল- যদি অন্য কোন অসুবিধা না হয় তাহলে আমার বিশ্বাস তোমার পরপরই আমি নিহত হব। আমাকে কিছু অসিয়ত করলে খুশী হব। ” মুসলিম ইমাম হোসাইন (আ.) এর দিকে ইঙ্গিত করে বলল আমার অসিয়ত হল এই মহান ব্যক্তির সাহায্যে এবং তারই পথে আমৃত্যু লড়াই করবে। হাবিব বলল তোমার অসিয়ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। এরপরেই মুসলিম শাহাদত বরণ করেন।

এবার আমর বনি কারতা আনসারী সামনে আসলেন । ইমাম হোসাইন (আ.) এর কাছে যুদ্ধের অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেন। অনুমতি পাওয়া মাত্র দুশমনের উপর ঝাপিয়ে পড়লেন। ইমাম হোসাইনের (আ.) সমর্থনে যুদ্ধ করে ইবনে যিয়াদের বহু সৈন্য নিধন করলেন। কথার সত্যতা আর ভীরু কাপুরুষ বাহিনীর জিহাদের অবিচলতা প্রদর্শন করলেন সামনে। ইমাম হোসাইন (আ.) এর দিকে যে তীরটি এসেছে তার হাত দ্বারা সেগুলো ফিরাতে থাকে। তরবারীর যে আঘাতই এসেছে নিজে বুক পেতে নিয়েছেন। তার শরীরে যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তি ছিল হোসাইন (আ.) এর পবিত্র বদনে কোন আঘাত আসতে দেননি। শেষ পর্যন্ত সারা শরীর আহত হয়ে ভূমিতে লুটে পড়েন।

ইমাম হোসাইন (আ.) কে লক্ষ্য করে বললেন-হে রাসূলের আওলাদ আমি কি প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পেরেছি ? ইমাম বললেন-হ্যাঁ তুমি আমাদের পূর্বেই বেহেশতে পৌছে যাবে। আমার সালাম রাসূলে খোদা (সা.)-কে পৌছাবে। আর বলবে ইমাম হোসাইন (আ.) একটু পরেই আপনার সান্নিধ্যে আসছে। আমর পুনরায় যুদ্ধ শুরু করে নিহত হন।

এবার কালো দাস ময়দানে

এরপরই কালো দাস আবুজর ইমাম হোসাইন (আ.)এর সামনে এসে দাড়ালে ইমাম বললেন- আমি তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি তুমি এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাও , নিজের জীবন রক্ষা করো কেননা তুমি আমাদের সাথে শান্তি ও কল্যাণের জন্যই এসেছ। নিজেকে হত্যার মুখে ঠেলে দিও না। আবুজর দৃঢ়চিত্তে বলল-হে মহানবীর আওলাদ আমি আনন্দ ও ভাল অবস্থায় আপনার সাথে থাকবো আর বিপদকালে আপনাকে ছেড়ে চলে যাব ?

واللّه إنّ ريحى لمُنتْنٌ وإنّ حسبى للئيمٌ ولوْنى لاسْودُ

খোদার শপথ আমার গন্ধ অনেক খারাপ আমার বংশ নিম্নমানের আর আমার রং কালো , আপনি দয়া করে আমাকে একটু সুযোগ দিন। চিরশান্তিময় বেহেশতে পৌছে দিন যাতে আমি সুবাসিত হতে পারি , আমার বংশও উন্নত হয় এবং রঙও শুভ্র হয়। খোদার শপথ আপনাকে ছেড়ে যাব না। আমার কালো রক্তকে আপনার পবিত্র খুনের সাথে মিশিয়ে ফেলব। এপরপর যুদ্ধ করে শাহাদাতের শরবত পান করেন।

আমার বিন খালেদ সাইয়্যেদী ইমাম হোসাইন (আ.)এর সামনে এসে বলল-হে আবু আব্দুল্লাহ আপনার জন্য আমার জীবন উৎসর্গিত। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই আপনার সাথীদের সাথে মিলিত হব , আমি বেচে থাকব আর আপনাকে আহলে বাইত (আ.)-এর সামনে নিহত অবস্থায় দেখব এটা আমি মোটেও পছন্দ করব না। ইমাম হোসাইন (আ.) বললেন-যাও (জেহাদের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়) কিছু সময় পর আমিও পৌছে যাব। আমর দুশমনের উপর প্রচণ্ড হামলা চালিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

হানজালা বিন সা দ শামী ইমাম হোসাইন (আ.) এর সামনে দাড়ালেন। ইমাম (আ.) এর দিকে নিক্ষেপিত তীর , বর্শা এবং তরবারীর আঘাত তার মুখে ও বুক পেতে নিলেন , যাতে ইমাম (আ.) এর গায়ে না লাগে। এরপর ইবনে যিয়াদের সেনাবাহিনীকে আল্লাহার আযাবের ভয় দেখিয়ে , ফেরআউনের কওমকে একজন মুমিন যেভাবে ভয় দেখিয়েছেন , সে আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন-

( يا قوْم إنّى أخافُ عليْكُمْ مثْل يوْم الاْحْزاب مثْل د أب قوْم نُوحٍ وعادٍ وثمُود والّذين منْ بعْدهمْ، وما اللّهُ يُريدُ ظُلْما للْعباد. ويا قوْم إنّى أخافُ عليْكُمْ مثْل يوْم التّناد، يوْم تولُّون مُدْبرين ما لكُمْ من اللّه منْ عاصمٍ)

মুমিন ব্যক্তিটি বলল , হে আমার সম্প্রদায় , আমি তোমাদের জন্য পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের শাস্তির দিনের অনুরূপ দুর্দিনের আশংকা করি। যেমন ঘটেছিল নূহ , আদ , সামুদ এবং তাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে । আল্লাহ তো বান্দাদের প্রতি কোন জুলুম করতে চান না।

হে আমার কওম , আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি কিয়ামত দিবসের যেদিন তোমরা পশ্চাৎ ফিরে পালাতে চাইবে , আল্লাহ শাস্তি হতে তোমাদের রক্ষা করার কেউ থাকবে না।(সূরা গাফের , আয়াত নং -৩০ -৩৩)

يا قوْم لا تقْتُلُ حُسيْنا فيسْحتُكُمُ اللّهُ بعذابٍ وقدْ خاب من افْترى

হে সম্প্রদায়! ইমাম হোসাইন (আ.)-কে হত্যা করো না। কেননা আল্লাহ তোমাদের উপর আযাব অবতীর্ণ করে তোমাদের ধ্বংস করে দেবে। যে কেউ মহান আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করবে সে অবশ্যই ধ্বংসপ্রাপ্ত ।

এরপর ইমাম হোসাইন (আ.) এর প্রতি মুখ করে বললেন-আমার পরওয়ারদিগারের কাছে কি আমি যেতে পারব না। আমার ভাইদের সাথে মিলিত হতে পারব না ? ইমাম বললেন , হ্যাঁ , যাও ঐ দিকে যাও দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু থেকে উত্তম ; যাও এমন বাদশাহীর দিকে যা চিরন্তন-অক্ষয়। হানজালা শত্রুদের সাথে তীব্র লড়াইয়ে লিপ্ত হলেন। বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করার পর শাহাদত বরণ করেছেন।

জোহরের নামাযের সময় ইমাম হোসাইন (আ.) যুহাইর বিন কাইন ও সাঈদ বিন আব্দুল্লাহর মাধ্যমে-যারা সারিবদ্ধ হয়নি তার সামনে সারিবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দিলেন। ইমাম হোসাইন (আ.) তার সাথীদের নিয়ে সালাতুল খাওফ (ভয়ের নামায) পড়ছিলেন । এ সময় ইমাম হোসাইন (আ.) এর দিকে শত্রুপক্ষ একটি তীর নিক্ষেপ করল। সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ অগ্রসর হয়ে ইমাম (আ.) এর সামনে দাঁড়ালেন। দুশমনের পক্ষ থেকে আগত সকল তীর তিনি বুক পেতে নিলেন। তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন। আর বলছিলেন-হে খোদা! এ সম্প্রদায়ের উপর অভিশাপ দাও যেমন আভসম্পাত করেছে আদ ও সামুদ সম্প্রদায়ের উপর। আমার সালাম মহানবীর দরবারে পৌছে দাও , আমার ক্ষতবিক্ষত বদনের যখম সম্পর্কে তাকে অবহিত করো। কেননা তোমার নবী (সা.) এর আওলাদগণের সাহায্যে আমার উদ্দেশ্যই ছিল তোমার পূর্ণ প্রতিদান লাভ করা। এসব মনের আকুতি ব্যক্ত করতে করতে তিনি শহীদ হলেন। তার শাহাদতের পর তার শরীরে তরবারী ও বর্শার অসংখ্য আঘাত ছাড়াও ত্রিশটি তীর বিদ্ধ অবস্থায় পরিলক্ষিত হয়।

তারপরই খান্দানী ও অধিক নামায আদায়কারী ব্যক্তিত্ব সুদেয় বিন আমর বিন আবি মোতা ’ অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ শুরু করেন। তীব্র লড়াইয়ের চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখান। তিনি চতুর্মুখী আক্রমণে ধরাশায়ী হয়ে পড়েন। নড়াচড়ার ক্ষমতাও রহিত হয়। হটাৎ শুনতে পেলেন ইবনে যিয়াদের বাহিনী বলছে বংশধরকে-হোসাইন নিহত হয়েছেন। এ কথা কানে আসামাত্র অজ্ঞান অবস্থায় নিজের জুতার ভেতর থেকে একটি ছোরা বের করে তুমুল লড়াই করার পর শাহাদাত বরণ করেন।

বর্ণনাকারী বলেন-ইমাম হোসাইন (আ.) এর সঙ্গী-সাথীরা তার সাহায্যে প্রাণ দেয়ার কাজে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। যেমন কবি বলেন-

قوْمٌ إذا نُودُوا لدفْع مُلمّةٍ

والْخيْلُ بيْن مُدعّسٍ ومُكرْدسٍ

لُبسُوا الْقُلُوب على الدُّرُوع ك أنّهُمْ

يتهافتُون إلى ذهابٍ الاْنْفُس

ইমাম হোসাইন (আ.) এর সাথীরা এমন বীর পুরুষ তাদেরকে যখন বিপদ উত্তরণের জন্য আহ্বান করা হয় অথচ দুশমনের দল তীর বর্শা বা তরবারী নিয়ে সম্মিলিত আক্রমণ চালায়-তখন তারা বীরত্বের বর্ম পরিধান করে নিজেদেরকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে কুন্ঠিত হয় না।

আলী আকবর (আ.)-এর বীরত্ব

ইমাম হোসাইন (আ.)এর সঙ্গীরা ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত অবস্থায় একে একে ভূমিতে লুটিয়ে পড়েন। আহলে বাইত ছাড়া আর কেউ বেচে নেই।

এ সময় সবচেয়ে সুন্দর অবয়ব , সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী আলী বিন হোসাইন (আ.) তার পিতার কাছে এসে যুদ্ধের অনুমতি প্রার্থনা করেন। ইমাম হোসাইন (আ.) তৎক্ষণাৎ অনুমতি দেন। এরপর তার দিকে উদ্বেগের দৃষ্টি ফেলেন আর ইমামের দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল । অশ্রুসিক্ত অবস্থায় বললেনঃ

أللّهُمّ اشْهدْ، فقدْ برز إليْهمْ غُلامٌ أشْبهُ النّاس خلْقا وخُلُقا ومنْطقا برسُولك صلّى اللّه عليه و آله ، وكُنّا إذا اشْتقْنا إلى نبيّك نظرْنا إليْه

হে খোদা ,তুমি সাক্ষী থাক! তাদের দিকে এমন এক যুবক অগ্রসর হয়েছে যে শরীরের গঠন , সৌন্দর্য চরিত্র ও বাক্যালাপে তোমার রাসূল (সা.) এর সাদৃশ্যপূর্ণ। আমরা যখন তোমার নবী (সা.) এর দিকে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতাম এ যুবকের দিকেই তাকাতাম। এরপর ওমর বিন সা দের প্রতি লক্ষ্য করে সুউচ্চকন্ঠে বললেনঃ

يابْن سعْدٍ قطع اللّهُ رحمك كما قطعْت رحمى

হে সা দের ছেলে দুশমনের মোকাবিলায় প্রচণ্ড লড়াই শুরু করেন। বহুসংখ্যক শত্রুসৈন্য হত্যা করে ক্লান্ত-শ্রান্ত-তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পিতা ইমাম হোসাইনের (আ.) কাছে এসে বললেনঃ

يا أبت، ألْعطشُ قدْ قتلنى ، وثقْلُ الْحديد قدْ أجْهدنى ، فهلْ إلى شرْبةٍ منْ الْم أ سبيلٌ؟

হে মহান পিতা , পিপাসায় আমার জীবন ওষ্ঠাগত , যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় আমি ক্লান্ত , আমাকে একটু পানি দিয়ে জীবন বাচাতে দাও। ইমাম হোসাইন (আ.) কান্নাবিজড়িত কন্ঠে বললেন-اغوْثاهُ হায় কে সাহায্য করবে। প্রিয় ছেলে ফিরে যাও , যুদ্ধ চালাও সময় ঘনিয়ে এসেছে। একটু পরেই আমার নানা মুহাম্মদ (সা.)-এর সাক্ষাৎ করবে। তার হাতের পেয়ালা এমনভাবে পান করবে-এরপর আর কখনও পিপাসা হবে না। আলী ময়দানে ফিরে যান , জীবনের মায়া ত্যাগ করে শাহাদতের জন্য প্রস্তুতি নেন।

প্রচণ্ড হামলা শুরু করেন। হটাৎ মুনকিজ বিন মুররা আবদী (আল্লাহর লানত তার উপর বর্ষিত হোক) আলী বিন হোসাইন (আ.) এর দিকে তীর নিক্ষেপ করেন। এ তীরের আঘাতে তিনি ধরাশায়ী হয়ে পড়েন। চিৎকার দিয়ে বলেনঃ

يا أبتاهُ عليْك منّى السّلامُ، هذا جدّى يقْرؤُك السّلامُ ويقُولُ لك: عجّل الْقُدُوم عليْنا

বাবা! খোদা হাফেজ , আপনার প্রতি সালাম। আামর সামনেই নানা মুহাম্মদ (সা.) আপনাকে সালাম জানাচ্ছেন আর বলছেন- হে হোসাইন তাড়াতাড়ি আমাদের সাথে মিলিত হও। ” এরপরই একটি চিৎকার দিয়ে শাহাদাতের শরবত পান করেন।

হোসাইন (আ.) নিহত সন্তানের মাথার কাছে দাড়ালেন।

ووضع خدّهُ على خدّه

তার গালে গাল লাগিয়ে চুমু খেলেন আর বললেনঃ

قتل اللّهُ قوْما قتلُوك

হে বৎস! আল্লাহ সে সম্প্রদায়কে হত্যা করবে যে তোমাকে হত্যা করেছে। এরা আল্লাহর কাছে কতই না অপরাধ করেছে , আল্লাহর রাসূলের সম্মানে কতই না আঘাত হেনেছে।

على الدُّنْيا بعْدك الْعفأُ

বর্ণিত হয়েছে যয়নব (আ.) তাবু থেকে বের হয়ে ময়দানের দিকে ছুটে চললেন এবং ভয়ানক চিৎকার দিয়ে বললেন-

يا حبيباهُ يابْن أخاهُ হে আদরের ধন , হে ভাতিজা , আপন ভাতিজার লাশের কাছে এসে গড়িয়ে গড়িয়ে কেদেছিলেন। ইমাম হোসাইন (আ.) এসে তাকে নারীদের তাবুতে ফিরিয়ে নেন। এরপরই আহলে বাইতের যুবকরা একে একে ময়দানে অবতীর্ণ হলেন এবং ফরিয়াদ করে বললেন-হে আমার চাচাতো ভাইয়েরা , হে আমার বংশধরগণ ধৈর্য ধারণ করো। আল্লাহর শপথ , আজকের দিনের পর কোনদিন অপমানিত লাঞ্ছিত হবে না।

কবি বলেনঃ

এসেছে নিশি , পূর্ণশশী তুমি তো আসনি

জীবন ওষ্ঠাগত , আমার জীবন হে আলী আসনি

খাচার পাখী মরুর দিকে উড়ে গেল

কিন্তু হে হোমা পাখী তার কাছেও আসনি

আমার সম শরৎ অন্তর তোমার দিদারে হতো বসন্ত

হে গোলাপ পুষ্প কেন তুমি আসনি

ছাড়লাম অশ্রু , গেলাম সবার আগে তোমার গমন পথে

তোমার প্রতীক্ষায় হলাম পেরেশান-তুমি তো আসনি

অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় ছিলাম তুমি যদি আস

তোমার পায়ে জান করব কোরবান , তুমি তো আসনি।

কাসেম বিন হাসান (আ.) ময়দানে আসলেন

রাবী বলেছেনঃ এমন একজন যুবক ময়দানে এসে যুদ্ধ শুরু করলেন যার চেহারা ছিল পূর্ণ চাঁদের মতো। ইবনে ফুজাইল আযদী তার মাথায় এমন জোরে তরবারী চালিয়ে দেয় এতে তার মাথা দু ভাগ হয়ে যায়। তিনি ধূলায় লুটিয়ে পড়ে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেনঃ হে চাচা! হোসাইন (আ.) শিকারী বাজপাখির মতো ময়দানে ঝাপিয়ে পড়লেন । ক্রোধান্বিত বাঘের মত ইবনে ফুজাইলের উপর হামলা চালান। এতে তার হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার চীৎকার শুনে কুফাবাসী সৈন্যরা তাকে রক্ষার জন্য হামলা চালায় কিন্তু সে ঘোড়ার পায়ের নীচে ছিন্নভিন্ন ও ধূলিস্যাৎ হয়ে যায়।

ময়দান ধূলায় ছেয়ে যায়। দেখলাম হোসাইন (আ.) কাসেমের শিয়রে উপস্থিত হলেন। সে তখনও হাত-পা নাড়ছিল। হোসাইন (আ.) বললেন-

بُعْدا لقوْمٍ قتلُوك، ومنْ خصمهُمْ يوْم الْقيامة فيك جدُّك

সে সম্প্রদায়ের প্রতি অভিশাপ-যারা তোমাকে হত্যা করেছে। কিয়ামত দিবসে তোমার হত্যার বিচার যারা চাইবেন তারা হলেন তোমার নানা ও বাবা। ”

এরপর বললেনঃ

عزّ واللّه على عمّك أنْ تدْعُوهُ فلا يُجيبُك، أوْ يُجيبُك فلا ينْفعُك صوْتُهُ

আল্লাহর শপথ! তোমার চাচাকে কেউ আহ্বান করলে তিনি সাড়া দেবেন না এটা হতেই পারে না , যদিও তোমার কোন উপকারে নাও আসে।

খোদার শপথ! আজ এমন একটি দিন যেদিন তোমার চাচার দুশমনের সংখ্যা অধিক আর বন্ধুর সংখ্যা অনেক কম। ”

একথা বলেই ইমাম কাসেমকে বুকে তুলে আহলে বাইতের শহীদগণের সারিতে রেখে দেন।

হেসাইন (আ.) যখন দেখলেন যুবকদের দু হাত কর্তিত অবস্থায় ধূলায় লুটিয়ে আছে , শাহাদাতের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। উচ্চকন্ঠে ফরিয়াদ করলেনঃ

هلْ منْ ذابٍّ يذُبُّ عنْ حرم رسُول اللّه؟ هلْ منْ مُوحّدٍ يخافُ اللّه فينا؟ هلْ منْ مُغيثٍ يرْجُو اللّه بإغاثتنا؟

কেউ আছ কি যে দুশমনদেরকে রাসূলে খোদা (সা.) এর পবিত্র হেরেম থেকে তাড়িয়ে দেবে ? এক আল্লাহর পূজারী কেউ আছ যে আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। কেউ আছ যে আল্লাহর জন্যই আামাদের সাহায্য করবে ?

ইমাম (আ.) এর এ কথাগুলো তাবুতে অবস্থানকারী নারীদের কানে পৌছলে তাবুর ভেতর কান্নার রোল পড়ে যায়।

কবি বলেন-

বিশ্বাসের পথে দুঃখ-যাতনা কতই না সুখের

নিজের জীবন দিয়ে সকলের জীবন ক্রয় কতই না আনন্দের।

তোমার মত বন্ধুর কদমে জান দেয়া কতই না সৌভাগ্যের।

কারবালার ধুলাকালিতে রক্তে গড়াগগি কতই না আনন্দের।

তোমার মত বাদশাহর সামনে থেকে কিসের চিন্তা , শংকা

তোমার পথে হাতযুগল কর্তিত হওয়া কতই না খুশীর বিষয়।

দুধের শিশুর শাহাদাত

হোসাইন (আ.) তাবুর দরজায় এসে যয়নবকে বললেন-

ناولينى ولدى الصّغير حتّى أُودّعهُ

আমার ছোট ছেলেকে দাও-তার কাছে থেকে বিদায় নেই।

দুধের শিশুকে হাতে তুলে নিয়ে ইমাম (আ.) তাকে চুমু দেয়ার জন্য উপরের দিকে উঠাচ্ছেন এমন সময় হারমালা বিন কাহেল আসাদীর (আল্লাহর লানত তার উপর আপতিত হোক) একটি তীর এসে শিশুর গলায় বিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে আলী আসগর শাহাদাত বরণ করেন। হোসাইন (আ.) বললেনঃ এ শিশুকে নাও , নিজের হাত মোবারক শিশুর গলার রক্তস্রোতে রাখলেন। যখন তার হাত তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়ে , আকাশের দিকে রক্ত ছুড়ে বললেন-

“ এসব মুছিবত আমার জন খুবই সহজ। কেননা , এসবই আল্লাহর রাস্তায় হচ্ছে আর আল্লাহ দেখছেন। ”

হযরত ইমাম বাকের (আ.) বলেন-ঐ সব রক্তকণা যা ইমাম হোসাইন আকাশের দিকে নিক্ষেপ করেন একটুও যমীনে ফিরে আসেনি।

প্রখ্যাত লেখক জুরজী যায়েদান লিখেছেন-এ দুধের শিশুর শাহাদাত হোসাইন বিন আলীর নিষ্পাপ ও মজলুম হওয়াকে দুনিয়ায় প্রমাণ করে দিয়েছে। কেননা যদি সে শহীদ না হতো সম্ভাবনা ছিল বনি উমাইয়ার প্রচারযন্ত্র জনগণকে এই বলে বিভ্রান্ত করতো যে , হোসাইন (আ.) তার একদল সঙ্গী-সাথী নিয়ে রাজত্ব লাভের জন্য যুদ্ধের ময়দানে এসেছেন। আমরা প্রতিরক্ষার জন্যই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি , আর এর ফলে তার সঙ্গী-সাথীসহ নিহত হয়েছে , এতে আমাদের কোন দোষ নেই। ”

কিন্তু জনতার প্রশ্ন যদি ধরে নেয়া হয় হোসাইন (আ.) ও তার সাথীরা অপরাধী এবং যুদ্ধাংদেহী , দুধের শিশু তো যুদ্ধ করতে আসেনি , কাউকে হত্যা করেনি-তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হল কেন ? এ নিষ্পাপ দুধের শিশুর রক্তে কারবালা রঞ্জিত হল কেন ?

কবি বলেনঃ

হোসাইন এসেছে ময়দানে

আর আলী আসগর তার কোলে।

নীরব ঠোঁটে সে বলেছে তার মনের জ্বালা

শংকাহীন পানিবিহীন অবস্থায়

তার কোলে মাথা ঝুকিয়েছে

রংবিহীন ঠোঁট খুনরাঙা অন্তরের দৃষ্টি

চিন্তিত শংকিত , কারবালার

পরিস্থিতি রহিত করেছে

সব ধৈর্য ও হুশ।

দুধ নেই তাতেও নেই কান্না , পানি নেই

তবুও নেই আহাজারি

কখনও বের করেছেন জিহ্বা অতি আরামে

তার নিরব ঠোঁটে লালাও নেই আজ

আকবরের মতো আসগরও আল্লাহর

পথে যাত্রী মাছের মতো

লাফাচ্ছে ডাঙায় , কিন্তু তার

ঠোঁটে রয়েছে মুচকি হাসি।

বাদশাহর আগমনে প্রতীক্ষায় বাঁশির সুর

বেজে উঠলো আপাদমস্তক তার

রক্তে রঞ্জিত আর আলী আসগর

তার কোলে , এ তৃষ্ণার্ত মেহমানের

গলে বিষাক্ত তীর মারাত্মকভাবে

হল বিদ্ধ।

হযরত আবুল ফজল (আ.) এর ত্যাগ ও শাহাদত

রাবী বলেনঃ হোসাইন (আ.) পিপাসায় কাতর হয়ে ফোরাতের তীরে উপস্থিত হলেন। সাথে রয়েছে তার ভাই আব্বাস। ইবনে সা দের বাহিনী ঝাপিয়ে পড়ল দু জনার উপর। তাদের পথ বন্ধ করল। বনি দারম গোত্রের এক দুরাচার আবুল ফজল আব্বাস (আ.) এর দিকে তীর নিক্ষেপ করলে তার পবিত্র মুখে বিদ্ধ হয়। ইমাম হোসাইনই (আ.) তা টেনে বের করে নেন তার হাত রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। রক্তগুলো ছুড়ে ফেলে বললেন-হে খোদা! এ জনগোষ্ঠী তোমার নবী নন্দিনীর সন্তানের উপর এ জুলুম চালাচ্ছে এদের বিরুদ্ধে তোমার দরবারে বিচার দিচ্ছি । ইবনে সা দের বাহিনী মুহূর্তের মধে ইমাম হোসাইন (আ.) থেকে হযরত আব্বাস (আ.) কে ছিনিয়ে নেয়। চতুর্মুখী আক্রমণ , তরবারীর সম্মিলিত আঘাতে হযরত আব্বাস (আ.) তার শাহাদাতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কবি তাই বলেছেন-

أحقُّ النّاس أنْ يُبْكى عليْه

فتىً أبْكى الْحُسيْن بكرْبل أ

أخُوهُ وابْنُ والده عليٍّ

أبُو الْفضْل الْمُضرّجُ بالدّم أ

ومنْ واساهُ لا يثْنيه شيْءٌ

وجادلهُ على عطشٍ بم أ

কতই না উত্তম ব্যক্তি যার জন্য ইমাম হোসাইন (আ.) কারবালার এ কঠিন মুছিবতের সময়ও কেদেছেন। তিনি ছিলেন হোসাইনের ভাই তার বাবা ছিলেন আলী , তিনি তো আর কেও নন রক্তাক্ত বদন আবুল ফজল আব্বাস। তিনি ছিলেন ইমাম হোসাইনের সহমর্মী , কোন কিছুই তাকে এ পথ থেকে সরাতে পারেনি। প্রচণ্ড পিপাসা নিয়ে ফোরাতের তীরে পৌছেন কিন্তু হোসাইন যেহেতু পান করেন নি তিনিও তাই পানি মুখে নেননি।

অন্য কবি বলেন-

মুষ্ঠির মাঝে পানি লইলেন-মন ভরে পান করে নিবারিবেন তৃষ্ণা কিন্তু যখনই হোসাইনের পিপাসার কথা মনে পড়লো-হাতের মুটোয় পানিতে অশ্রু ফেলে ফিরে আসলেন।

হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ.) এর মহান আত্মত্যাগ সকল লেখক , চিন্তাশীলদের দৃষ্টিতেই গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লামা মাজলিশী তার বিখ্যাত গ্রন্থ বিহারের ’ মধ্যে লিখেন-হযরত আব্বাস ফোরাতের তীরে গেলেন। যখনই অঞ্জলী ভরে পানি পান করতে চাইলেন হটাৎ হোসাইন (আ.) ও তার আহলে বাইতের পানির পিপাসার যন্ত্রণার কথা মনে পড়ল। পানি ফোরাতেই ফেলে দিলেন পান করলেন না।

একজন আরবী কবি বলেন-

بذلت ایا عباس نفسا نفسیة

لنصر حیسن عزبالجد عن مثل

ابیت التذاذ الم أ قبل التذاذه

فحسن فعال المرء علی الاصل

فانت اخوه السبطین فی یوم مفخر

وفی یوم بذل الم أ انت ابو الفضل

আবুল ফজল আব্বাস তার সবচেয়ে মূল্যবান প্রাণ হোসাইন (আ.) এর জন্যই উৎসর্গ করেছেন। হোসাইন (আ.) পান করার পূর্বে তিনি নিজে পান করলেন না মানুষের কর্মের সর্বোত্তম কর্ম ও মূল কাজই তিনি করলেন , আপনি তো গৌরবের দিবসে রাসূলের দুই নাতির ভাই আর আপনিই তো পানি পানের দিবসে করেছেন আত্মত্যাগ হে আবুল ফজল।

পানি টলটলায়মান-বাদশাহ তৃষ্ণায় ওষ্ঠাগত ,

উদ্দম তার অন্তরে হাতে রয়েছে পানির মশক ,

মুরতাজার সিংহ শাবকেরে হামলা করল এমনভাবে

এ যেন অগণিত নেকড়ের মাঝে এক বাঘ।

এমন একটি বদন কেউ দেখেনি

যাতে কয়েক হাজার তীর

এমন একটি ফুল কেউ দেখেনি

যাতে রয়েছে কয়েক হাজার কাটা।

যুদ্ধের ময়দানে শহীদগণের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.)

ইমাম হোসাইন (আ.) ময়দানে এসে শত্রুপক্ষকে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানালেন। দুশমনের খ্যাতনামা বীর একে একে ইমাম (আ.) এর আঘাতে ধরাশায়ী হচ্ছে। তাদের বহুসংখ্যক নিহত হওয়ার পর ইমাম (আ.) হটাৎ বলে উঠলেন-

ألْقتْلُ أوْلى منْ رُكُوب الْعار

والعارُ اولى من دُخُول النار

লজ্জার বাধনে থাকার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়

জাহান্নামে যাওয়ার চেয়ে লজ্জাই শ্রেয়

একজন বর্ণনাকারী লিখেছেনঃ আল্লাহর শপথ! দুশমন বেষ্টিত সন্তান , পরিবার ও সাথীদের লাশ চোখের সামনে। এ অবস্থায় হোসাইন (আ.) এর চেয়ে অধিক দৃঢ়চিত্ত বীর আর কেউ হতে পারে না। যখনই শত্রুবাহিনী সম্মিলিত হামলা চালাতো তিনি তাদের দিকে তরবারী হানতেন পুরো বাহিনী চতুর্দিকে নেকড়ের মত ছিটকে পড়তো। এক হাজারের অধিক সৈন্য এক সাথে তার উপর হামলা চালায়। ইমাম (আ.) এর সামনে এসে পঙ্গপালের মতো পালাতে থাকে। একটু দূরে গিয়েই বলতে থাকে-

لا حوْل و لا قُوّة إلاّ بااللّه

লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে-দুশমন প্রায় তাবুর কাছে পৌছে গেছে । এমন সময় হোসাইন (আ.) ফরিয়াদ করে বললেন-

ويْحكُمْ يا شيعزة آل أبى سُفْيان، إنْ لمْ يكُنْ لكُمْ دينُ وكْنُتْم لا تخافُون الْمعاد فكُونُوا أحْرارا فى دُنْياكُمْ

হে আবু সুফিয়ানের বংশের দল , যদি তোমাদের দীন না থেকে , পরকালেকে ভয় না -ও করো অন্ততপক্ষে দুনিয়ায় স্বাধীন থাকো। তোমাদের বংশ , বুনিয়াদের দিকে তাকাও যদি আরব হয়ে থাক , তোমরা তাই দাবী করছ।

শিমার বলল-হে ফাতেমার সন্তান কি বলছ ? ইমাম (আ.) বললেনঃ

أُقاتلُكُمْ و تُقاتلُوننى و النّسأُ ليْس عليْهنّ جُناحُ

আমি তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব আর তোমরা আমার সাথে যুদ্ধ করবে। নারীরা তো কোন অপরাধ করেনি। আমি যতক্ষণ জীবিত আছি এসব অকৃতজ্ঞ , মূর্খ ও জালেমদেরকে আমার তাবুতে ঢুকতে দেব না। শিমার বলল তোমার এ প্রস্তাব গ্রহণ করলাম। এরপরই শিমারের নেতৃত্বে ইমাম হোসাইন (আ.) কে হত্যার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। তারা ইমাম হোসাইন (আ.) এর উপর হামলা করে। ইমাম (আ.) ও পাল্টা হামলা চালান। এ সময় ইমাম পিপাসায় কাতর হয়ে পড়েন। শত্রুদের কাছে একটু পানি চান কিন্তু তারা এক ফোটা পানিও দেয়নি। এ সময়ের মেধ্যে ইমামের পবিত্র বদন ৭২টি আঘাতে জর্জরিত হয়ে যায়।

فوقف يسْتر يحُ ساعةً و قدْ ضعُف عن الْقتال

তিনি থমকে দাড়িয়ে গেলেন। দুর্বলতার কারণে কিছু সময় যুদ্ধ করতে সক্ষম হননি। দাড়িয়ে আছেন এমন সময় একটি পাথর এসে তার পেশানীতে আঘাত হানল। রক্তধারা গড়িয়ে পড়ে জামা ভিজতে শুরু করে। তিনি নিজের জামা দিয়ে রক্তস্রোত বন্ধ করতে চেষ্টা করেন এমন সময় একটি বিষাক্ত ত্রিশূল এসে ইমামের বুকে বিদ্ধ হয়-ইমাম হোসাইন (আ.)-এর মুখ দিয়ে বের হযে আসে-

بسْم اللّه و باللّه و على ملّة رسُول اللّه

এরপর আকাশের পানে মুখ করে ইমাম বলতে লাগলেন-

“ হে খোদা , তুমি জানো এ বাহিনী যাকে হত্যা করছে নবী নন্দিনীর ছেলেদের মধ্যে সে ছাড়া আর কেউ নেই। ” এরপর নিজেই ত্রিশূলটি টেনে বের করেন আর রক্ত বন্যার মতো গড়িয়ে পড়তে থাকে। এর ফলে তিনি যুদ্ধ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি নীরব নিথর অবস্থায় দাড়িয়ে আছেন কিন্তু যেই তাকে হত্যার জন্য এগিয়ে আসে সেই আল্লাহর নিকট হোসাইনের হন্তা হিসেবে চিহ্নিত হবার ভয়ে আবার পিছু হটে। এরপর কান্দা গোত্রের মালেক বিন ইয়াসার ইমাম হোসাইনের (আ.) সামনে দাড়িয়ে তাকে অত্যন্ত খারাপ গালি দিয়ে ইমামের মাথায় তরবারী চালিয়ে দেয় । তাতে তার পাগড়ী ভেদ করে মাথায় ঢুকে পড়ে। ইমামের গোটা পাগড়ী রক্তে রঞ্জিত হয়। ইমাম একখানা রুমাল দিয়ে মাথা বাধলেন ও মাথায় দেয়ার জন্য একটি টুপি চাইলেন। এরপর পাগড়ী দিয়ে মাথা ভালভাবে বাধলেন। ইবনে যিয়াদের বাহিনী একটু বিরতি দিয়েই চতুর্দিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলে।

আব্দুল্লাহ বিন হাসান (আ.)-এর শাহাদত

আব্দুল্লাহ বিন হাসান বিন আলী (আ.) ছিলেন নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর) । নারীদের তাবু থেকে বের হয়ে ইমাম হোসাইন (আ.) এর সামনে দাড়ালেন। যয়নব (আ.) দৌড়ে এসে তাকে তাবুতে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন। কিন্তু এ কিশোর রাজী না হয়ে বলল-খোদার শপথ! আমার চাচার কাছ থেকে দূরে যাব না। এ সময় আবহুর বিন কাব অন্য বর্ণনামতে , হারমালা বিন কাহেল (লানাতুল্লাহে আলাইহিমা) ইমাম হোসাইন (আ.) এর গায়ে তরবারী চালানোর জন্য উদ্যত হয়। কিশোর আব্দুল্লাহ চিৎকার দিয়ে বলে) হে জারজ আবহুর! তোর ধ্বংস হোক। আমার চাচাকে হত্যা করতে চাও ? এ চিৎকার শোনার পরও এ নাপাক ইমামের গায়ে তরবারীর আঘাত হানতে গেলেই কিশোর নিজের হাত দিয়ে তা ফিরাতে চেষ্টা করে। তরবারীর আঘাত তার হাতে লাগলে সে চিৎকার দিয়ে ওঠে। হে চাচা! ইমাম হোসাইন (আ.) তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন- ভাতিজা এ মুছিবতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর , আল্লাহর দরবারে কল্যাণ কামনা কর। কেননা মহান আল্লাহ তোমাকে নেককার বান্দাদের কাতারে শামিল করবেন। হটাৎ হারমালা বিন কাহেল দূর থেকে আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়ে। ফলে ইমাম হোসাইনের (আ.) কোলেই আব্দুল্লাহ শহীদ হন। তারপরই শিমার বিন জিলজওশন তাবুতে হামলা চালায় , নিজের বর্শার আঘাতে তাবু দ্বিখণ্ডিত করে চিৎকার দিয়ে বলে আগুন নিয়ে এসো , তাবুতে যারা আছে তাদেরসহ আগুন লাগিয়ে দাও। হোসাইন (আ.) বললেন , হে শিমার! তুমি আমার আহলে বাইতকে পুড়িয়ে মারার জন্য আগুন চাচ্ছ! আল্লাহ তোমাকেও আগুনে জ্বালাবেন। শাবছ ’ এসে শিমারের এ কাজের তিরস্কার করে। শিমার লজ্জিত হযে তাবুতে আগুন দেয়া বন্ধ রাখে। হোসাইন (আ.) বললেন , আমার জন্য এমন একটি পুরানো জামা নিয়ে এসো যাতে কেউ ঐ জামার প্রতি আসক্ত না হয়। আর আমার পোশাকের নিচে আমি এজন্য পরিধান করব যেন আমার শরীর পোশাকবিহীন না থাকে। ইমামের জন্য ইয়েমেন থেকে পাওয়া একটি জামা আনা হল। তিনি জামার একাংশ ছিড়ে মূল জামার নীচে পরিধান করলেন। কিন্তু ইমামের শাহাদাতের পর আবহুর বিন কাব তার শরীর থেকে সব জামা খুলে ইমামের পবিত্র বদনকে উলঙ্গ অবস্থায় ফেলে রাখে। এ কাজের ফলে তার দু হাত গ্রীষ্মকালের শুকনো কাঠ , শীতকালের বরফের মত ঠাণ্ডা হয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। মৃত্যু পর্যন্ত তাকে এ শাস্তি ভোগ করতে হয়।

রাবী বলেছেনঃ ইমাম হোসাইন (আ.) যখমের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েন। দুশমনের অসংখ্য তীর তার বদনে কাটার মতো বিদ্ধ ছিল। সালেহ বিন ওহাব মুযনী তার পাজরে একটি বর্শা নিক্ষেপ করলে ইমাম অশ্ব থেকে যমিনে লুটিয়ে পড়লেন। তার মাথা মাটির সাথে লাগিয়ে বলছিলেন-

بسْم اللّه و باللّه و على ملّة رسُول اللّه

একটু পরেই যমীন থেকে মাথা তুললেন। এ সময় হযরত যয়নব (আ.) তাবু থেকে বেরিয়ে এসে সুউচ্চ কন্ঠে ফরিয়াদ করলেন-

وا أخاهُ، وا سيّداهُ، وا أهْل بيْتاه

“ হে ভাই আমার , হে আমাদের নেতা , হায় আহলে বাইত। ”

তারপর বললেন-

ليْت السّم أ اُطْبقتْ على الارْض، و ليْت الجبال تدكْدكتْ على السّهْل

হায় আসমান যদি যমিনে ভেঙ্গে পড়তো , হায়! পাহাড় যদি ছিন্নভিন্ন হয়ে যমীনে পড়তো। ” এ সময় শিমার চিৎকার দিয়ে তার সৈন্যদের বলল , কিসের অপেক্ষা করছ , হোসাইনকে শেষ করে দিচ্ছ না কেন ? সেনাবাহিনী চতুর্দিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলে সম্মিলিতভাবে ইমামের শরীরে হামলা চালায়। যুরআ বিন শুরাইক ইমাম হোসাইন (আ.)-এর বাম কাধে তরবারীর আঘাত হানে। তিনি পল্টা হামলা করলে সে নিহত হয়। আরেক ব্যক্তি তার অপর কাধে আঘাত হানে। তাতে তিনি নুয়ে পড়েন। বিভীষিকা ও ক্লান্তিতে চেহারা মলিন হয়ে পড়ে। বার বার উঠতে চেষ্টা করেন , কিন্তু দুর্বলতা ও ক্লান্তিতে বসে পড়েন। সেনান বিন আনাস নাখয়ী ইমাম হোসাইন (আ.) এর গলায় বর্শার আঘাত হেনে তা টেনে বের করে। এরপর বুকে নিক্ষেপ করে তা বুকের হাড়ে বিদ্ধ হয়ে যায় , এরপর একটি তীর তার গলায় বিদ্ধ করে। এতে করে ইমাম হোসাইন (আ.) ধরাশায়ী হয়ে পড়েন । তারপরও ইমাম উঠে দাড়ান এবং নিজের গলা থেকে তীর বের করে ফেলেন। দু হাতে রক্ত চেপে ধরে যখন হাত ভরে যায় সে রক্ত দিয়ে নিজের চেহারা মোবারক রঞ্জিত করেন। আর বলেন-এ অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাৎ করব। রক্ত ছাড়াই খেজাব লাগিয়েছি। এরা আমার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে।

ওমর বিন সা দ তার ডানপাশে দাড়ানো এক ব্যক্তিকে বলল , যাও হোসাইনের কাজ সাঙ্গ করে এস। খুলী বিন ইয়াজিদ আসবাহী হোসাইন (আ.) এর বদন থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার জন্য উদ্যোগ নেয় , কিন্তু তার শরীরে কাপন সৃষ্টি হয় , সে ফিরে যায়। সেনান বিন আনাস অশ্ব থেকে নেমে পড়ে। ইমাম হোসাইন (আ.) এর ঘাড়ে তরবারী বসিয়ে দেয় । আর বলে-খোদার শপথ , তোমর মাথা বিচ্ছেদ করেই ছাড়বো। আমি জানি তুমি মহানবীর আওলাদ , মাতা-পিতার দিক থেকে সর্বোত্তম মানুষ । এরপর এ মহান বদন থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এ প্রসঙ্গে কবি বলেছেন-

فأىُّ رزيّةٍ عدلتْ حُسيْنا

غداة تُبيرُهُ كفّا سنانٍ

ইমাম হোসাইন (আ.)এর মুসিবতের সাথে কোন মুসিবতের তুলনা করবে। সেদিনের বিপদ কতই না জঘন্য যেদিন অপবিত্র ও অপরাধী সেনান বিন আনাসের হাত তাকে হত্যা করেছে এবং শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করেছে।

মরহুম মুহাদ্দেস কোমীর বর্ণনামতে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর হন্তা ছিল শিমার । এরপর বর্তমান গ্রন্থের হুবহু বর্ণনা দেন। নাসেখুত তাওয়ারিখ গ্রন্থে হোসাইন (আ.) এর হন্তা সম্পর্কে বিভিন্ন মানুষের মতামত উল্লেখ করে লিখেছেন , অধিকাংশের মতে শিমার জিল জওশন ছিল ইমামের হন্তা। এটাই অধিক সমর্থনযোগ্য। তবে হতে পারে খুলী এবং সেনান তাকে সহযোগিতা করেছে। – অনুবাদক

আবু তাহের মুহাম্মদ বিন হাসান তরসী তার মায়ালেমুদ্দিন গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে , ইমাম সাদেক (আ.) বলেছেন-হোসাইন (আ.) যখন শহীদ হলেন ফেরেশতাগণ দলে দলে তার শিয়রে আসে। তারা বলতে থাকে , হে খোদা তোমার মনোনীত এবং নবী নন্দিনীর সন্তানকে এরা এভাবে হত্যা করল। মহান আল্লাহ হযরত ইমামে যামানের (মাহদী) ছবি তাদের সামনে প্রদর্শন করে বললেন-এ ব্যক্তির মাধ্যমে ইমাম হোসাইন (আ.) এর দুশমনদের প্রতিশোধ নেব। বর্ণিত হয়েছে , সেই সেনান বিন আনাসকে মোখতার পাকড়াও করে এবং তার আংগুলগুলোর প্রতিটি গিট বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর তার হাত-পা কেটে দেয়। বাকী অংশে জয়তুনের তেল ঢেলে তাকে সেখানে নিক্ষেপ করে চরম শান্তি দিয়ে হত্যা করে। রাবী বলেছেন , ফেরেশতাদের আগমনের পরই কালো ও অন্ধকারময় প্রচণ্ড ধূলাবালি আকাশকে ছেয়ে ফেলে। এ অন্ধকারে কোন কিছুই দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল না। ইবনে সা দের বাহিনী মনে করল তাদের উপর বুঝি আযাব নাযিল হয়েছে। কিছুক্ষণ পর এ অন্ধকার দূরীভূত হয়।

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর অন্তিম মুহূর্ত

হেলাল বিন নাফে বর্ণনা করেন যে , আমি ওমর বিন সা দের সেনাবাহিনীর সাথে দাড়িয়েছিলাম। এমন সময় একজন হটাৎ চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে , হে আমীর আপনাকে শুভ সংবাদ। শিমার ইমাম হোসাইন (আ.) কে হত্যা করেছে। আমি সৈন্যদের সারি থেকে বের হয়ে হোসাইন (আ.) এর সামনে দাড়িয়ে দেখছিলাম তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত অতিক্রম করছেন।

فو اللّه ما رأيْتُ قتيلا مُضمّخا بدمه أحْسن منْهُ و لا أنْور وجْها، و لقدْ شغلنى نُورُ وجْهه و جماُل هيْ أته عن الْفكْرة فى قتْله

খোদার কসম রক্তাক্ত অবস্থায় নিহত মানুষের মধ্যে এরূপ উত্তম ও আকর্ষণীয় চেহারা আর কখনও দেখিনি। ইমাম হোসাইন (আ.) এর চেহারায় উদ্ভাসিত হয়েছিল নূর। তার এ নূর ও ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্যে তাকে শহীদ করার চিন্তা আমি পরিত্যাগ করলাম।

এ সময় ইমাম হোসাইন (আ.) পানি চাইলেন।

فسمعْتُ رجُلا يقُولُ لهُ: و اللّه لا تذوقُ الم أ حتى ترد الحامية فتشْرب منْ حميمها!! فقال لهُ الحُسيْنُ عليه السلام : يا ويْلك! أنا لا أردُ الحامية و لا أشْربُ منْ حميمها، بلْ أردُ على جدّى رسُول اللّه ص و أسْكُنُ معهُ فى داره

আমি শুনলাম এক ব্যক্তি বলছে খোদার শপথ আমাদের বশ্যতা স্বীকার না করলে পানি দেব না যতক্ষণ না তা হবে জালাতনের গরম পানি। আমি শুনলাম ইমাম (আ.) বলছেন আমি তোমাদের কাছে নত হব না আমি আমার নানা রাসূলের (সা.) সান্নিধ্যে পৌছব এবং বেহেশতে তার সাথে এক সাথে থাকব আর তথাকার সুমিষ্ট পানি পান করবো এবং তোমাদের জুলুমসমূহের বিচার চাইব।

হেলাল বলল ইমাম (আ.) এর একথাগুলো শুনে সেনাবাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে এমন আচরণ করে মনে হয় আল্লাহ তাদের কারো অন্তরে বিন্দুমাত্র দয়া রাখেননি। ইমাম (আ.) তার কথা বলা শেষ না করতেই তার শরীর থেকে মাথা মোবারক বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আমি তাদের এ নির্দয় আচরণ দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। আমি বললাম আল্লাহর কসম কোন অবস্থাতেই তোমাদের সাথে থাকব না। এরপর ইবনে সাদের বাহিনী হোসাইন (আ.) কে উলঙ্গ করে ফেলে। তার জামা পরিধান করে ইসহাক বিন হাবিয়া হাজরামী। এতে তার শরীরে শ্বেত রোগের সৃষ্টি হয় এবং শরীরের সকল পশম ঝরে পড়ে। বর্ণিত হয়েছে , তার জামায় প্রায় একশ ’ নব্বইটি তরবারী , তীর ও বর্শার আঘাতের চিহ্ন ছিল। হযরত ইমাম সাদেক (আ.) বললেন , হোসাইন (আ.) এর বদনে ৩৩টি বর্শা এবং ৪৩টি তরবারীর আঘাত ছিল। হোসাইন (আ.) এর পাজামা নিয়ে যায় আবহোর বিন কাব। বর্ণিত হয়েছে , এ পাজামা পরিধান করার পর সে অবশ হয়ে যায়।

হোসাইন (আ.) এর পাগড়ী নিয়ে যায় আখনাস বিন মারসাদ বিন আলকামা। অন্য বর্ণনামতে জাবের বিন ইয়াজিদ আওদী পাগড়ী নিয়ে যায়। এ পাগড়ী মাথায় পরিধান করার সাথে সাথে তার মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে। তার জুতা মোবারক নিয়ে যায় আসওয়াদ বিন খালেদ , আংটি নিয়ে যায় বোজদিল বিন সালিন কালবী। এ আংটি নেয়ার অপরাধে পরবর্তীতে তার আংগুল কর্তন করা হয়। এই বোজদিল বিন সালিনকে মোখতার সাকাফী বন্দী করে তার হাত-পা কেটে ছেড়ে দেয়। এ অবস্থায় রক্ত ঝরতে থাকে অবশেষে এ রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। ইমাম হোসাইন (আ.) এর চামড়ার রুমালটি নিয়ে যায় কায়েস বিন আশসাস। বাতারা নামক বর্মটি নিয়ে যায় ওমর বিন সা দ। ওমর বিন সা দ নিহত হলে মোখতার সে বর্মটি ওমর সাদের হত্যাকারীকে দান করেন।

ইমাম (আ.) এর তরবারী জামী বিন খালফ আওদী অন্য বর্ণনামতে , বনি তামিম গোত্রের আসওয়াদ বিন হানজালা নামক এক ব্যক্তি হস্তগত করে। ইবনে আবি আস আদের বর্ণনামতে , ইমাম (আ.) এর তরবারী ফালাফেস নাহশালী নিয়ে যায়। মুহাম্মদ বিন যাকারিয়া একথা বর্ণনার পর লিখেন , এ তরবারী পরবর্তীতে হাবিব বিন বুদালের কন্যার হাতে পৌছে। এখানে উল্লেখ্য , যে তরবারী তারা লুন্ঠন করেছে তা জুলফিকার ছিল না। কেননা জুলফিকার রাসূলে পাক (সা.) ও ইমামদের অন্যান্য স্মৃতিবহুল সম্পদের সাথে সংরক্ষিত রয়েছে। এ কথাটি বিভিন্ন রাবী সত্যায়ন করেছেন এবং হুবহু বর্ণনাও করেছেন।

তাবু লুট ও অগ্নিসংযোগ

রাবী বলেছেন , ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শাহাদাতের পর একটি ছোট মেয়ে তাবু থেকে বাইরে আসে। এক ব্যক্তি তাকে বলে , হে আল্লাহর দাসী , তোমার বাবা হোসাইন (আ.) নিহত হয়েছে। মেয়েটি বলল , একথা শুনেই আমি চিৎকার দিয়ে নারীদের কাছে দৌড়ে যাই। তারাও আমার চিৎকার শুনে উঠে আসে। সবাই মাতম আহাজারি শুরু করে। এরপরই সেনাবাহিনী অতি দ্রুত মহানবীর আওলাদ এবং হযরত ফাতেমার চোখের মণিদের তাবুতে আক্রমণ চালায়। নারীদের মাথা থেকে চাদর ছিনিয়ে নেয়। নবী বংশের বীরাঙ্গনারা তাবু থেকে বেরিয়ে পড়লেন। তাদের কান্নায় আত্মীয়-স্বজন ও প্রিয়জনদের বিচ্ছেদের ফরিয়াদে আকাশ-পাতাল মাতমে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। আল্লামা মাজলিসী (রহ.) লিখেছেন , কোন কোন গ্রন্থে এমনও পরিদৃষ্ট হয়েছে যে ফাতেমা সোগরা বলেছেন , আমি তাবুর দরজায় দাড়িয়ে আমার বাবার মাথাবিহীন লাশ এবং ধূলায় পড়ে থাকা প্রিয়জন-সহচরদের দেহগুলো দেখছিলাম। দুশমনের ঘোড়াগুলো যখন এসব লাশের উপর দিয়ে দলে দলে চলছিল আমি কান্নায় ফেটে পড়ছিলাম। চিন্তায় ছিলাম পিতার অবর্তমানে বনি উমাইয়া গোষ্ঠী আমাদের সাথে কি আচরণই না করে বসে। আমাদেরকে কি তারা হত্যা করে না বন্দী করে নিয়ে যায়। হটাৎ এক ব্যক্তিকে দেখলাম সে বর্শা উচিয়ে নারীদেরকে একদিকে হাকিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। নারীগণ আশ্রয় গ্রহণ করার জন্য ছুটোছুটি করছে। এ সময় নারীদের বোরকা ও অলংকার সব লুন্ঠন হয়ে গেছে , আর নারীগণ চিৎকার দিয়ে বলছিল-

وا جداهُ واابتاه وا عليّاهُ واقلّة ناصراه واحسناهُ

হে নানা! হে বাবা! হে আলী , কেউ নেই আজ আমাদের আশ্রয় দেবে ? কেউ নেই আমাদের সাহায্য করবে ?

ফাতেমা (সোগরা) বলেন-

এ দৃশ্য দেখে আামর বুকে কম্পন এসে যায় , সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। ঐ ব্যক্তির ভয় থেকে রক্ষার জন্য আমার ফুফু উম্মে কুলসুমকে খুজতে শুরু করি । হটাৎ দেখলাম ঐ লোকটি আমার দিকে আসছে। তার অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য পালাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু সে এসেই গেল। বর্শার ফলক দিয়ে আমার বুকে আঘাত হানল , আমি উপড়ে যমিনে পড়লাম। সে আমার কান দু টুকরা করে ফেলে , আর কানের অলংকার ও চাদর ছিনিয়ে নেয়। সরে যাওয়ার সাথে সাথে দেখলাম আমার মাথা ও মুখমণ্ডল রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে। আমি বেহুশ হয়ে গেলাম। হাটাৎ দেখি আমার ফুফু আমার শিয়রে বসে কাদছেন আর বলছেন , প্রাণের ফাতেমাঃ ওঠো আমরা যাই , জানি না মেয়েদের বিশেষ করে তোমার ভাই আলী বিন হোসাইনের কি অবস্থা হয়েছে। আমি উঠে দাড়ালাম , বললাম ফুফুজান , কোন কাপড় আছে কি যাতে আমার মাথা ঢাকতে পারি ? তিনি বললেন-মা দেখছ না তোমার ফুফুও আজ খালি মাথায় , কাপড় নেই। দেখলাম সত্যিই তো তার মাথা খালি আর গোটা শরীর চাবুক ও বর্শার ফলকের আঘাতে কালো হয়ে গেছে। আমরা একসাথেই তাবুর দিকে অগ্রসর হলাম , দেখলাম তাবুতে যা ছিল সব লুটতরাজ হয়ে গেছে আর আমার ভাই আলী বিন হোসাইন (আ.) মাটির উপর পড়ে আছে। অধিক পিাপসা আর অসুস্থতায় মাথা তুলতে পারছেন না। তার এ অসহায় অবস্থা ও নাজুক পরিস্থিতি দেখে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। – অনুবাদক

হামীদ বিন মুসলিম বর্ণনা করেন , বকর বিন গায়েল গোত্রের এক নারী তার স্বামীসহ ওমর বিন সাদের সেনাবাহিনীর সাথে ছিল। যখন দেখল সৈন্যরা হোসাইন (আ.) এর তাবুর নারীদের উপর হামলা চালিয়েছে এবং তাদের সম্পদ সব লুট করে নিয়েছে তরবারী হাতে সে তাবুর দিকে অগ্রসর হয়ে বলল , হে বকর বিন ওয়ায়েলের সম্প্রদায়! তোমাদের কি ব্যক্তিত্ব বীরত্ব কিছুই নেই যে , তোমারা এখানে থাকতে নবী বংশের নারীদের পোষাক লুটতরাজ হচ্ছে ? এরপর ফরিয়াদ করে বলেঃ

لا حُكْم الا للّه، يا لثارات رسُول اللّه

আল্লাহ ছাড়া কারো হুকুম চলবে না। হে রাসূলের (সা) বীরাঙ্গনাগণ। তার স্বামী এসে তার হাতে ধরে তাবুতে ফিরিয়ে নেয়।

রাবী বলেছেন-তাবু লুটতরাজ শেষ হওয়ার পর তাবুসমূহে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তাবু থেকে বোরকাবিহীন অবস্থায় নবী পরিবারের নারীরা বের হতে বাধ্য হয়। কান্নার রোল পড়ে যায়। অপমানিত হয়ে দুশমনের হাতে বন্দী হয়। তার কসম দিয়ে বলে-আমাদেরকে হোসাইন (আ.)-এর হত্যা স্থানে নিয়ে যাও। তাদেরকে যখন সে স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় চিৎকার দিয়ে কেদে ওঠে এবং মাথা ও মুখে হাত চাপড়াতে থাকেন।

قال: فو اللّه لا أنْسى زيْنب ابْنة عليٍّ و هى تنْدُبُ الْحُسيْن ع و تُنادي بصوْتٍ حزينٍ و قلْبٍ كئيبٍ:وامُحمّداهُ، صلّى عليْك ملائكةُ السّم أ. هذا حُسيْنُ بالْعر أ، مُرمّلُ بالدّم أ، مُقطّعُ الاعْض أ، واثكْلاهُ، و بناتُك سبايا

রাবী বলেন-খোদার শপথ যয়নব বিনতে আলী (আ.) তার ভাইয়ের জন্য যেভাবে কেদেছেন তা কোন দিন ভুলব না। করুণ বিলাপ ও হৃদয়বিদারক আওয়াজে তিনি বলছিলেন , হে নানা মুহাম্মদ (সা.) আপনার উপর ফেরেশতাগণ দরুদ পড়েন। এই যে আপনার হোসাইন রক্তে রঞ্জিত। তার শরীরের অংশ বিচ্ছিন্ন আর আপনার মেয়েরা আজ বন্দী।

মহান আল্লাহ মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) , আলী মোরতাজা (আ.) , ফাতিমা যাহরা (আ.) , সাইয়্যেদুশ শুহাদা হামজা (রা.)-এর কাছে এ অত্যাচারের অভিযোগ পেশ করছি। হে মুহাম্মদ (সা.)! এই যে আপনার হোসাইন কারবালার যমীনে খালী পায়ে উলঙ্গ পড়ে আছে মরুর বাতাস তার গায়ে বালি ছিটাচ্ছে।

এই যে আপনার হোসাইন (আ.) জারজ সন্তানদের হাতে নিহত হযেছে। হায় আফসোস! আজ এমন দিনে আমার নানা মুহাম্মদ (সা.) দুনিয়ায় নেই।

হে মুহাম্মদ (সা.)এর সাহাবীগণ এরা তো মহানবী (সা.) এর সন্তান। তাদেরকে সাধারণ কয়েদীর মতো বেধে নিয়ে যাচ্ছে।

অন্য বর্ণনায় এসেছে , যয়নব (আ.) আরজ করছিলেন , হে মুহাম্মদ (সা.)! তোমার মেয়েরা বন্দী আর ছেলেরা নিহত হয়েছে মরু বলি তাদের লাশের উপর গড়িয়ে পড়েছে। এই যে তোমার হোসাইন (আ.) । তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে গেছে। তার পাগড়ী ও চাদর সব লুট হয়ে গেছে।

আমার পিতা উৎসর্গ হোক ঐ ব্যক্তির প্রতি , সোমবার দুপুরের সময় দুশমন বাহিনী যাকে হত্যা করেছে এবং তার সম্পদ লুট করেছে আমার পিতা কোরবান হোক এ ব্যক্তির জন্য যার তাবুগুলোও লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে।

ب أبى منْ لا غائبُ فيُرْتجى ، و لا جريحُ فيُداوى ب أبى منْ نفْسى لهُ الفدأُ

আমার পিতা উৎসর্গিত ঐ ব্যক্তির জন্য যার বদনে জখম এমন নয় যে , মলম লাগানো যেতে পারে। তার জন্য উৎসর্গিত যার জন্য প্রাণ দিতে পারাই জীবনের চরম চাওয়া পাওয়া।

ب أبى الْمهْمُومُ حتّى قضى .ب أبى الْعطشانُ حتى مضى

আমার পিতা তার জন্য উৎসর্গিত হোক যে মনে চরম দুঃখ নিয়ে ইন্তেকাল করেছেন , আমার পিতা তার জন্য উৎসর্গিত হোক যে পিপাসায় কাতর অবস্থায় শাহাদত বরণ করেছেন। আমার পিতা তার জন্য কোরবান যার নানা ছিলেন আল্লাহর নবী মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.) । আমার পিতা উৎসর্গিত যে হেদায়েতের মশাল নবীর নাতি আমার নানা মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) , নানী খাদিজাতুল কোবরা , পিতা আলী আল মুরতাজা (আ.) , নারীদের নেত্রী মা ফাতিমাতুয যাহরা (আ.) সবার জন্য আমার জীবন উৎসর্গিত।

فو اللّه أبْكتْ و اللّه كُلّ عدُوٍّ و صديقٍ

রাবী বলেনঃ

খোদার কসম হযরত যয়নবের (আ.) কান্নায় বন্ধু-শত্রু সবাই কেদেছে। এরপর সকিনা তার বাবার লাশ জড়িয়ে ধরে পড়লেন। একদল আরব এসে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এ সময় ওমর বিন সা দ তার সেনাবাহিনীর মধ্যখান থেকে চিৎকার দিয়ে বলল-

منْ ينْتدبُ للْحُسيْن فيُوطّى الْخيْل ظهْرهُ؟

কে আছে যে হোসাইন (আ.) এর লশের উপর ঘোড়া দাবড়াবে ?

দশজন অশ্বারোহী এ দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এ দশজনের নাম নিম্নরূপ

১। ইসহাক বিন হাররা-যে ইমামের জামা হরণ করেছে

২। আখনাস বিন মারসাদ

৩। হাকিম বিন তোফাইন সামরানী

৪। আমর বিন সাবিহ সায়দাবী

৫। রেজা বিন মুনকায আবদী

৬। সালেন বিন খুসহিমা জু ’ ফী

৭। ওয়াহেয বিন নায়েম

৮। সালেহ বিন ওহাব জু ’ ফী

৯। হানি বিন শাবস হাজরামী

১০। উসাইদ বিন মালেক (আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপরে)

এ দশ দুরাচার হোসাইন (আ.) এর মাথাবিহীন পবিত্র দেহের উপর ঘোড়া চালিয়ে তার পবিত্র সিনা মোবারক ও পেছনের হাড়গুলো গুড়ো গুড়ো করে দিয়েছে। এ দশজন কুফায় এসে ইবনে যিয়াদের সামনে দাড়ায়। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞেস করলো-তোমরা কারা ? তাদের মধ্যে উসাইদ বিন মালেক বলে ওঠে-

نحْنُ رضضْنا الصّدْر بعْد الظّهْر

بكُلّ يعْبوبٍ شديدٍ الاسْر

আমরা ঐ দল যারা হোসাইন (আ.) দেহের উপর ঘোড়া চালিয়ে তার হাড়-মজ্জা গুড়ো করে দিয়েছি।

ইবনে যিয়াদ তাদেরকে ততটা গুরুত্ব দেয়নি। সামান্য কিছু পুরুস্কার দিয়েই তাদেরকে বিদায় করে। আবু আমর যাহেদ বলেছেন-এ দশজনের জীবন বৃত্তান্ত পর্যালোচনা করে দেখেছি-এরা সবাই জারজ সন্তান। পরবর্তীকালে এ দশজনকেই মোখতার বন্দী করে হাত-পা লোহার পেরেক দিয়ে ছিদ্র করে এবং নির্দেশ দেয় তাদের উপর মৃত্যু না ঘটা পর্যন্ত যেন ঘোড়া চালানো হয়।


তৃতীয় অধ্যায়

কুফা ও সিরিয়ার উদ্দেশ্যে নবী বংশের বন্দীদের যাত্রা

উমর ইবনে সা দ ইমাম হোসাইন (আ.) এর পবিত্র মাথা খওলা ইবনে ইয়াযীদ আসহাবী এবং হামীদ ইবনে মুসলিম আযদীর মাধ্যমে আশুরার দিন বিকেল বেলা ইবনে যিয়াদের কাছে প্রেরণ করে। এরপর উমর ইবনে সা দের আদেশে ইমাম হোসাইন (আ.) এর সঙ্গী-সাথী ও বনী হাশিমের নিহত যুবকদের লাশের মাথা কেটে শিমার ইবনে জুল জওশন , কায়স ইবনে আশ্আস্ এবং আমর বিন হাজ্জাজের কাছে কুফায় পাঠানো হয়। ঐ সব কর্তিত মাথা ইবনে যিয়াদের কাছে আনা হয়। উমর ইবনে সা দ আশুরার দিন এবং পরের দিন (১১ মুহররম) দুপুর পর্যন্ত কারবালায় থেকে গেল। তারপর সে ইমাম পরিবারের বন্দী সদস্যদের নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হল। ইমাম পরিবারের মহিলাদেরকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় খোলা মাথায় এবং হাওদা বিহীন উঠের উপর বসান হয়েছিল। অথচ এ সব পূণ্যবতী মহিলা ছিলেন মহান নবীর পবিত্র আমানত। আর তাদেরকেই তুর্কী ও রোমের যুদ্ধবন্দীদের মত সবচেয়ে কঠিন দুরবস্থা , শোক ও বেদনার মধ্য দিয়ে বন্দীত্বের শিকল পড়ানো হয়েছিল।

কবি এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ

یصلی علی المبعوث من ال هاشم

ویغزی بنوه إن ذا لعجیب

হাশেমী বংশোদ্ভূত নবীর (সা.) উপর তারা (নবী বংশের হত্যাকারীরা) দরুদ ও সালাম পাঠ করে। আর তারাই তার (সা.) বংশধরদের সাথে যুদ্ধ করে। সত্যিই এটা অত্যন্ত আশ্চর্যজনক।

اترجو امة قتلت حسینا

شفاعة جده یوم الحساب

যারা হোসাইনকে (আ.) শহীদ করেছে তারা কি করে কিয়ামত দিবসে তার মাতামহের (সা.) শাফায়াতের প্রত্যাশা করে ?

বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসাইন (আ.)এর সঙ্গী-সাথীদের কর্তিত মাথার সংখ্যা ছিল ৭৮। আর যে সব গোত্র কারবালায় ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল তারা ইবনে যিয়াদ ও ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করার জন্য ঐসব কর্তিত মাথা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল। কায়স ইবনে আশআসের নেতৃত্বে কিন্দা গোত্র ১৩ টি মাথা , শিমার ইবনে জুল জওশনের নেতৃত্বে হাওয়াযিন গোত্র ১২টি মাথা , বনী তামীম গোত্র ১৭ টি মাথা , বনী আসাদ গোত্র ১৬টি মাথা , বনী মুযহাজ গোত্র ৭ টি মাথা এবং আরো অন্যান্য গোত্র ১৩ টি মাথা কুফায় নিয়ে আসে।

শহীদদের দাফন এবং কুফায় বন্দী আগমন

রাবী থেকে বর্ণিতঃ উমর ইবনে সাদ কারবালা থেকে বেরিয়ে গেলেই বনী আসাদ গোত্রের একদল ব্যক্তি কারবালায় এসে শহীদদের জানাযার নামায পড়ে এবং যে স্থানগুলো এখন শহীদদের কবর হিসেবে প্রসিদ্ধ সেখানেই তারা শহীদদের লাশগুলো দাফন করে। ইবনে সা দ বন্দী নবী পরিবারের সাথে আগমন করে। আর তারা কুফার নিকটবর্তী হওয়া মাত্রই কুফাবাসীরা তাদেরকে দেখার জন্য সেখানে সমবেত হয়। কুফা নগরীর এক মহিলা ছাদ থেকে উচ্চঃস্বরে জিজ্ঞেস করলঃ "من ای الاساری أنتنّ " তোমরা কোন দেশের বন্দী রমণী ? নবী পরিবারের বন্দী রমণীগণ তাকে বললেন- "نحن أساری ال محمد " আমরা নবী পরিবারের বন্দী রমণী। ঐ মহিলা ছাদ থেকে নেমে এসে ঘর থেকে পোশাক পরিচ্ছদ , মাথার চাদর ওড়না এনে তাদেরকে দিল । অসুস্থ , কৃশকায় এবং শোকাভিভূত আলী ইবনুল হোসাইন (আ.) এবং ইমাম হাসান (আ.)এর পুত্র দ্বিতীয় হাসান যিনি পিতৃব্য ইমাম হোসাইন (আ.) কে সাহায্যার্থে কারবালার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আহত হয়েছিলেন তিনিও যুদ্ধ বন্দীদের মাঝে ছিলেন। মাসাবিহ গ্রন্থের লেখক বর্ণনা করেছেনঃ ইমাম হাসান (আ.) এর পুত্র দ্বিতীয় হাসান শত্রুপক্ষের ১৭ জনকে হত্যা করেন এবং তার দেহ আঠারো বার জখম হলে তিনি অশ্ব পৃষ্ঠ থেকে পড়ে যান। তার মামা আসমা বিন খারেজাহ তাকে মাটি থেকে তুলে কুফায় নিয়ে চিকিৎসা করেন। সুস্থ হয়ে গেলে দ্বিতীয় হাসান মদীনায় ফিরে আসেন। যায়দ এবং আমরের বন্দীদের মধ্যে ইমাম হাসান মুজতাবার সন্তানগণও ছিলেন। এরপর কুফাবাসীরা কান্না কাটির উদ্যোগ নিলে ইমাম আলী ইবনুল হোসাইন (আ.) তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন।

اتنوحون و تبکون من أجلنا؟ فمن ذا الذی قتلنا ؟

তোমরা আমাদের জন্য কাদতে চাও ? তাহলে কে আমাদেরকে হত্যা করেছে

হযরত যয়নাবের (আ.) ভাষণ

বশীর বিন হাযীম আল-আসাদী থেকে বর্ণিত খোদার শপথ , আমি আমীরুল মুমেনীন হযরত আলীর (আ.) কন্যা হযরত যয়নাবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বক্তা রমণীকে আর দেখিনি। যেন তার কন্ঠ দিয়ে হযরত আলী (আ.) এর বাণীগুলো নিঃসৃত হচ্ছিল।

و قدْ أوْم أتْ الى النّاس أن اسْكُتُوا، فارْتدّت الانْفاسُ و سكنت الاجْراسُ

তিনি উপস্থিত জনতাকে নীরবতা অবলম্বন করতে বললে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ যেন স্তিমিত হয়ে গেল। এমন কি উটের ঘন্টাধ্বনিও আর শোনা গেল না। এরপর হযরত যয়নাব (আ.) নিম্নোক্ত ভাষণ দিলেন ,

ثُمّ قالتْ: ألْحمْدُ للّه، و الصّلاةُ على جدّى مُحمّدٍ و آله الطّيّبين الاخْيار. أمّا بعْدُ: يا أهْل الْكُوفة، يا أهْل الْختْل و الْغدْر، أتبْكُون؟! فلا رق أت الدّمْعةُ، و لا هد أت الرّنّةُ، انّما مثلُكُمْ كمثل الّتى نقضتْ غزْلها منْ بعْد قُوّةٍ أنْكاثا، تتّخذون أيْمانكُمْ دخلا بيْنكُمْ. ألا و هْلْ فيكُمْ الا الصّلفُ و النّطفُ، والصّدْرُ الشّنفُ، و ملقُ الام أ، و غمْزُ الاعْد أ؟! أوْ كمرْعى على دمْنةٍ. أوْ كفضّةٍ على ملْحُودةٍ، ألا س أ ما قدّمْتُمْ ل أنْفُسكُمْ أنْ سخط اللّهُ عليْكُمْ و فى الْعذاب أنْتُمْ خالدوُن. أتبْكُون و تنْتحبون؟! ايْ و اللّه فابْكُوا كثيرا، واضْحكُوا قليلا. فلقدْ ذهبْتُمْ بعارها و شنارها، و لنْ ترْحضُوها بغسْلٍ بعْدها أبدا. و أنّى ترْحضُون قتْل سليل خاتم النُّبُوّة، و معْدن الرّسالة، و سيّد شباب أهْل الْجنّة، و ملاذ خيرتكُمْ، و مفْزع نازلتكُمْ، و منار حُجّتكُمْ، و مدْرة سُنّتكُمْ. ألا س أ ما تزرون، و بُعْدا لكُمْ و سُحْقا، فلقدْ خاب السّعْيُّ، و تبّت، الايْدي، و خسرت الصّفْقةُ، و بُؤْتُمْ بغضبٍ من اللّه، و ضُربتْ عليْكُمُ الذّلّةُ والْمسْكنةُ. ويْلكُمْ يا أهْل الْكُوفة، أتدْرُون أيّ كبدٍ لرسُول اللّه فريْتُمْ؟! و أيّ كريمةٍ لهُ أبْرزْتُمْ؟! و أيّ دمٍ لهُ سفكْتُمْ؟! و أيّ حُرْمةٍ لهُ انْتهكْتُمْ؟! لقدْ جئْتُمْ بها صلْع أ عنْق أ سوْد أ فقُم أ. و فى بعْضها: خرْق أ شوْه أ، كطلاع الارْض و مل أ السّم أ. أفعجبْتُمْ أنْ مطرت السّمأُ دما، و لعذابُ الاخرة أخْزى و أنْتُمْ لا تُنْصرُون، فلا يسْتخفّنّكُمْ الْمهْلُ، ف أنّهُ لا يحْفُزُهُ البدارُ و لا يخافُ فوْت الثّار، و انّ ربّكُمْ لبالْمرْصاد

মহান আল্লাহর প্রশংসা এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার পবিত্র বংশধরদের উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করার পর তিনি বললেন , হে কুফাবাসীরা .হে প্রতারক ও চক্রান্তকারীরা , তোমরা কি এখন আমাদের জন্য কাদছ ? এখনো আমাদের নয়ন অশ্রু দ্বারা সিক্ত , এখনো আমাদের কান্না থামেনি। তোমরা ঐ রমণীর ন্যায় যে সূতা দিয়ে সুন্দর করে কাপড় বোনার পর আবার সেই কাপড় থেকে সূতাগুলো আলাদা করে ফেলে। তোমরা তোমাদের ঈমানের রজ্জুকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছ। আত্মপ্রশংসা , বিশৃংখলা এবং দাসীদের মত হিংসা দ্বেষ , চাটুকারিতা এবং উপেক্ষা করার মত দোষ ছাড়া আর কোন ভাল গুনই তোমাদের নেই। তেমার পচা আবর্জনার ভেতরে জন্মানো উদ্ভিদের ন্যায় , যা খাওয়ার অযোগ্য।

আর তোমারা সৌন্দর্য বিবর্জিত ও অব্যাবহার্য রূপার মত। তোমরা পরকালের জন্য কত মন্দ পাথেয়ই না সংগ্রহ করেছ যার ফলে তোমরা খোদার রোষানলে আপতিত হয়েছ এবং তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী ব্যবস্থ্ করা হয়েছে। আমাদেরকে হত্যা করার পর কি তোমরা আমাদের জন্য অশ্রু বিসর্জন করছো এবং নিজেদেরকে ধিক্কার দিচ্ছো ? খোদার শপথ তোমরা বেশী বেশী কাদবে এবং কম হাসবে। নিশ্চয় তোমরাইতো নিজেদেরকে কালের কলংকে কলংকিত ও কলুষিত করেছ যা থেকে তোমরা কখনো পরিত্রাণ পাবেনা। বেহেশতের যুবকদের নেতা নবী দৌহিত্র যিনি ছিলেন যুদ্ধ ও সংকটজনক পরিস্থিতিতে তোমাদের আশ্রয়স্থল , যিনি ছিলেন শত্রুদের মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে তোমাদের নেতা যার কাছে তোমরা ধর্ম ও শরীয়তের বিধি বিধানের শিক্ষা নিতে , তাকে হত্যা করার মত জঘন্য অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত কিভাবে সম্ভব ? জেনে রেখো যে , তোমরা কত বড় পাপের বোঝা বহন করছ। খোদা তোমাদেরকে তার দয়া ও করুনা থেকে বঞ্চিত করুক । তোমাদের ধ্বংস হোক। নিঃসন্দেহে তোমাদের শ্রম বিফল হয়েছে এবং তোমাদের হাত পাপ দ্বারা কলুষিত হয়ে গেছে। আর তোমাদের পাপের ব্যবসা তোমাদের জন্য ক্ষতিই ডেকে এনেছে। নিশ্চয়ই তোমরা খোদার রোষানলের দিকেই প্রত্যাবর্তন করেছ। অপমান লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা তোমাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। হে কুফাবাসীরা! তোমাদের জন্য আক্ষেপ। তোমরা জান কি যে , তোমারা মহানবীর (সা.) কত বড় কলিজার টুকরা ছিন্ন ভিন্ন করেছ। তোমারা জান কি যে , তোমারা তার নিস্পাপ পর্দাবৃতা কন্যা ও রমণীদের পর্দা ছিনিয়ে নিয়ে তাদেরকে বেআব্রু করেছ ! ! তেমারা জান কি , মহানবীর (সা.) কত বড় রক্ত তোমরা ঝরিয়েছ এবং তার কত বড় বেইজ্জতি তোমরা করেছ। তোমরা জান কি যে , কত বড় জঘন্য অন্যায় করেছ এবং আকাশ ও পৃথিবীর সমান অত্যাচার ও জুলুম করেছ। নিঃসন্দেহে পরকালের শাস্তি সবচেয়ে কঠিন ও অপমানজনক আর কিয়ামত দিবসে তেমাদের কোন সাহায্যকারীই থাকবে না। মহান আল্লাহ প্রদত্ত সুযোগ যেন তোমাদের কোন কাজে না আসে এবং তোমাদের পাপের বোঝাও যেন না কমে । কারণ তিনি (মহান আল্লাহ) তাড়াহুড়া করে প্রতিশোধ গ্রহণ করেন না এবং শহীদের রক্ত বৃথা যাওয়ার কোন আশংকা নেই। তোমাদের প্রতিপালক অবশ্যই তোমাদের ধরার অপেক্ষায় আছেন।

انّ ربّکم لبالمرصاد

বর্ণনাকারী বলেনঃ খোদার শপথ এ বক্তৃতাটি শোনার পর জনগণ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে কাদতে লাগল এবং নিজেদের আঙ্গুলগুলো দাত দিয়ে দংশন করতে লাগল । যে বৃদ্ধ লোকটি আমার পাশে দাড়িয়ে ছিল এবং যার দাড়ি চোখের জলে ভিজে গিয়েছিল সে বলতে লাগল , আমার পিতা মাতা আপনাদের চরণতলে উৎসর্গ হোক। আপনাদের মধ্যে যারা বৃদ্ধ তারা বৃদ্ধদের মধ্যে সর্বোত্তম , আপনাদের যুবকরাই সর্বোত্তম যুবক এবং আপনাদের রমণীরাই সর্বশ্রেষ্ঠ নারী এবং আপনাদের বংশই সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ যারা কস্মিনকালেও লাঞ্ছিত ও পর্যদস্ত হবে না ।

ফাতেমা বিনতে হোসাইনের ভাষণ

যায়দ বিন মুসা বিন জাফর থেকে বর্ণিতঃ ইমাম হোসাইন তনয়া ফাতেমা সুগরা কারবালা থেকে কুফায় আগমন করার পর এ ভাষণটি দিয়েছিলেনঃ-

الحمد لله عدد الرمل و الحصی وزنة العرش الی الشّری احمده و اومن به و اتوکل علیه

বালুকণা ও পাথরের সংখ্যা যেমন অগণিত ও অননুমেয় তদ্রুপ মর্ত্যলোকে যা কিছু আছে সেগুলো সহ আরশ পর্যন্ত যা কিছু আছে সে গুলোর ওজনের পরিমাণ মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি। তার উপর বিশ্বাস স্থাপন ও ভরসা করছি। আর সাক্ষ দিচ্ছি যে মহান আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় । তার কোন শরীক বা অংশীদার নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তার বান্দা ও প্রেরিত পুরুষ। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে , হযরত মুহাম্মদের (সা.) বংশধরদেরকে শরীয়তসিদ্ধ বৈধ কোন কারণ ছাড়াই অসহায় অবস্থায় ফোরাত নদীর তীরে হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের মস্তক দেহচ্যুত করা হয়েছে। হে মহা প্রভু আল্লাহ তোমার সম্পর্কে মিথ্যারোপ করা ও মিথ্যা বলা থেকে আমি আশ্রয় প্রর্থনা করছি । হে খোদা , নবীর অসি হিসেবে জনগণকে হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের হাতে বায়াত করার প্রদত্ত আদেশ সংক্রান্ত তোমার মহান নবীর (সা.) বাণী সমূহের বিরোধী কোন উক্তিই আমি করব না । হযরত আলী ইবনে আবু তালিবের ন্যায্য অধিকার জবর দখল করা হয়েছিল। আর তারই সন্তানকে (হোসাইন) কারবালায় একদল লোকের হাতে বিনা দোষে নিহত হতে হয়েছে। আর এসব লোকেরা ছিল বাহ্যতঃ মুসলমান কিন্তু অন্তরে ঠিকই তারা কুফরী পোষণ করত। ঐ সব লোক ধ্বংস হোক যারা হোসাইনের জীবদ্দশায় এবং তার শাহাদতের সময় তাকে জুলুম ও উৎপীড়নের হাত থেকে হেফাযত করেনি। হে খোদা , তুমিতো হোসাইন (আ.) কে মহৎ গুনাবলী ও জ্ঞানের অধিকারী করে অত্যন্ত প্রশংসিত ও পবিত্র অন্তঃকরণ সহকারে তোমার সান্নিধ্যে নিয়ে গেছো । হে খোদা কোন কুৎসা রটনাকারীরই কুৎসা তাকে কস্মিনকালেও তাকে তোমার ইবাদত ও বন্দেগী করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি । তুমি শৈশবে তাকে ইসলামের দিকে পথ প্রদর্শন করেছ এবং যখন তিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হয়েছেন তখন তাকে উত্তম গুণাবলী দিয়ে প্রশংসিত করেছ। তিনি আজীবন তোমার পথে এবং তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মুসলিম উম্মাহকে সদুপদেশ দিয়েছেন। তিনি ইহকালের প্রতি নিরাসক্ত এবং পরকালের জন্য উদগ্রীব ছিলেন। আর তিনি তোমার পথে তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বদা সংগ্রাম ও জিহাদ করেছেন। হে খোদা! তুমি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছ , তাকে তুমি মনোনীত করেছ এবং সঠিক পথে তাকে পরিচালিত করেছ।

أمّا بعْدُ، يا أهْل الكُوفة، يا أهْل الْمكْر و الْغدْر و الْخيل أ. فإ نّا أهْلُ بيْتٍ ابْتلانا اللّه بكُمْ، و ابْتلاكُمْ بنا، فجعل بل أنا حسنا، و جعل علْمهُ عنْدنا و فهْمهُ لديْنا. فنحْنُ عيْبةُ علْمه و وعأُ فهْمه و حكْمته و حُجّته على أهْل الاْ رْض فى بلاده لعباده. أكْرمنا اللّه بكرامته و فضلّنا بنبيّه مُحمّدٍ ص على كثيرٍ ممّنْ خلق تفْضيلا بيّنا. فكذّبْتُمُونا، و كفّرْتُمُونا. و ر أيْتُمْ قتالنا حلالا و أمْوالنا نهْبا. ك أنّنا أوْلادُ تُرْكٍ و كإ بُل كما قتلْتُمْ جدّنا بالاْْمس، و سُيُوفُكُم تقْطُرُ منْ دمائنا أهْل الْبيْت

হে কুফাবাসীরা! হে ষড়যন্ত্রকারী ও ধোকাবাজরা , সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদেরকে দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করেছেন। আর তিনি আমাদেরকে এ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রশংসিত করেছেন। তিনি তার জ্ঞান ও বিদ্যাকে আমানতস্বরূপ আমাদেরকে প্রদান করেছেন। তাই আমরাই তার জ্ঞান , বিদ্যা ও প্রজ্ঞার আধার। আমরাই সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য মহান আল্লাহর সঠিক প্রমাণ বা হুজ্জাত। মহান আল্লাহ আমাদের মাঝেই মহানবী (সা.) কে প্রেরণ করে আমাদেরকে সবার উপর প্রাধান্য দিয়েছেন এবং উচ্চ মর্য়াদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আর তোমরা আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছ ও কুফরীর অপবাদ দিয়েছ তোমরা আমাদের রক্ত ঝরানো এবং আমাদের সম্পদ লুন্ঠন করা বৈধ করেছ। আমরা যেন বিধর্মী অমুসলিম তুর্কী ও কাবুলী যুদ্ধবন্দী। যেমনিভাবে গতকাল তোমরা আমাদের পিতামহের রক্ত ঝরিয়েছ ঠিক তেমনি তোমাদের অন্তরে আমাদের প্রতি তোমাদের পুরানো শত্রুতা থাকার কারণে আজও তোমাদের তলোয়ার থেকে আমাদের (আহলে বাইতের) রক্ত ঝরছে।

তোমরা খোদার সম্পর্কে যে মিথ্যারোপ করেছ এবং যে ষড়যন্ত্রে তোমরা লিপ্ত হয়েছ সে জন্য তেমার খুব স্ফুর্তি ও আনন্দ উল্লাস করছ। তবে জেনে রেখো যে , মহান আল্লাহ সবচেয়ে বড় ষড়যন্ত্রকারী। তাই তোমরা আমাদের রক্ত ঝরাবে এবং আমাদের সম্পদ লুন্ঠন করতে পেরে আর অধিক আনন্দিত হয়ো না। কারণ এসব বিপদাপদ পূর্ব থেকেই আল্লাহর কাছে লিপিবদ্ধ ছিল। আর এটা তার জন্য অত্যন্ত সহজ। যাতে করে তোমরা ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে হতাশ ও মনঃক্ষুন্ন না হও এবং লাভ ও মুনাফা অর্জন করতে পেরে অযথা উল্লাসিত না হও। কারণ মহান আল্লাহ চক্রান্তকারী ও উদ্ধতদেরকে পছন্দ করেন না।

হে কুফাবাসীরা , তোমাদের ধ্বংস হোক। তোমরা খোদার অভিশাপ ও শাস্তির অপেক্ষা করতে থাক যা অতি শীঘ্রই একের পর এক তোমাদের উপর অবতীর্ণ হবে এবং নিজেদের কু-কর্মের জন্য তোমরা সাজা প্রাপ্ত হবে। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে পারস্পরিক কলহ , বিবাদ , দ্বন্দ-সংঘাতে লিপ্ত করে তোমাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। আর এরপর আমাদের প্রতি যে অন্যায় ও জুলুম করেছ সে জন্য তোমরা কিয়ামত দিবসে চিরস্থায়ী নরকের মহাযন্ত্রনাদায়ক আগুনে দগ্ধ হওয়ার শাস্তি অবশ্যই পাবে। মনে রেখো , অত্যাচারী গোষ্ঠির উপর মহান আল্লাহর অভিশাপ।

الا لعنة الله علی القوم الظالمین

হে কুফাবাসীগণ , তোমাদের জন্য আক্ষেপ , তোমরা কি জান , কোন হাতে আমাদেরকে তীর ধনুক ও তরবারী আক্রমণের শিকার করেছ , তোমরা কোন সাহসে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছ ? খোদার শপথ তোমাদের অন্তর পাষাণ এবং বিবেক বুদ্ধি বিবর্জিত , তোমাদের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি লোপ পেয়েছে। হে কুফাবাসীরা , শয়তান তোমাদেরকে ধোকা দিয়েছে , তোমাদেরকে সৎ পথ থেকে বিচ্যুত করেছে এবং তোমাদের চোখের উপর অজ্ঞতার আচ্ছাদন টেনে দিয়েছে যার ফলে তোমরা কখনো সুপথ প্রাপ্ত হবে না। হে কুফাবাসীগণ , তোমাদের ধ্বংস হোক। তোমরা জান কি যে তোমাদের কাধে মুহাম্মদ (সা.) এর বংশধদের রক্ত ঝরানোর পাপ রয়েছে এবং তোমাদের থেকে সে রক্তের প্রতিশোধ অবশ্যই গ্রহণ করা হবে ?

তোমরা মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এর ভ্রাতা হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) ও তার বংশধরদের সাথে যে শত্রুতা করেছ সে জন্য তোমাদের মধ্য থেকে কেউ দম্ভোক্তি করে বলেছঃ

نحن قتلنا علیها و بنی علی

بسیوف هندیة و رماح

وسبینا نسائهم سبی ترک

ونطحناهم فایّ نطاح

আমারা ভারতে নির্মিত তরবারী ও বর্শা দিয়ে আলী ও তার বংশধরদেরকে হত্যা করেছি। আমরা তার বংশীয়া মহিলাদেরকে বিধর্মী তুর্কী যুদ্ধবন্দীদের মত বন্দী করেছি। ” ঐ সব পুণ্যাত্মা যাদেরকে মহান আল্লাহ সব ধরনের পাপ-পংকিলতা থেকে পবিত্র করে দিয়েছেন তাদেরকে হত্যা করে যে ব্যক্তি গর্ব ও আনন্দ উল্লাস করছে তার মুখে (কলংকের) প্রস্তর ও ধুলো নিক্ষিপ্ত-প্রক্ষিপ্ত হোক। হে অপবিত্র ব্যক্তি তুই তোর ক্রোধাগ্নি গলাধঃকরণ কর আর তোর পিতা যেমনিভাবে বসেছিল তদ্রুপ কুকুরের মত তোর আপন জায়গায় বসে পড়। যে ব্যক্তি যেমন কর্ম করবে তেমন প্রতিফলও সে প্রাপ্ত হবে। তোমাদের জন্য আক্ষেপ. মহান আল্লাহ আমাদেরকে যে জন্য সকলের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আমাদের সাথে হিংসা করছ বলে।

فما ذنبنا إن جاش دهرا بحورنا

وبحرک ساج ما یواری الدعا مصا

আমাদের বংশের মহৎ গুণাবলী যদি কালজয়ী হয় তাহলে কি এতে আমাদের অপরাধ হবে অথচ তোমাদের পাপ ও কুকীর্তিসমূহ ইচ্ছে করলেও তোমরা কখনো গোপন রাখতে পারবে না।

ذلك فضْلُ اللّه يُؤ تيه منْ يشأُ و اللّهُ ذُوالْفضْل الْعظيم و منْ لمْ يجْعل اللّهُ لهُ نُورا فما لهُ منْ نُور

এটা হচ্ছে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে এ অনুগ্রহ দান করেন। কারণ তিনিইতো বিশাল অনুগ্রহের মালিক আর মহান আল্লাহ যাকে (হেদায়তের) আলো দেন না সে কখনোই (হেদায়তের) আলোর সন্ধান পায় না ।

হযরত ফাতেমা সুগরার ভাষণ সমাপ্ত হলে উপস্থিত জনতা উচ্চস্বরে কাদতে কাদতে বললঃ হে পুণ্যাত্মাদের বংশধর। আপনি আমাদের অন্তরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। আমাদের কলিজাকে আপনি শোক দুঃখ আর বেদনা অনলে ভস্মীভূত করেছেন। আপনি থামুন আর বলবেন না। অতঃপর হযরত ফাতেমা সুগরা কথা বলা বন্ধ করলেন ।

হযরত উম্মে কুলসুমের ভাষণ

বর্ণনাকারী বলেনঃ হযরত আলী (আ.) এর কন্যা উম্মে কুলসুম (আ.) উচ্চস্বরে ক্রন্দনরত ও হাওদার উপর উপবিষ্টাবস্থায় ঐ দিন এ ভাষণটি দেনঃ

فقالتْ: يا أهْل الْكُوفة، سُوْءا لكُمْ، ما لكُمْ خذلْتُمْ حُسيْنا و قتلْتُمُوُهُ و انْتهبْتُمْ أمْوالهُ و ورثْتُمُوهُ و سبيْتُمْ نس أهُ و نكبْتُمُوهُ؟! فتبّا لكُمْ و سُحْقا. ويْلكُمْ، أتدْرون أيُّ دواةٍ دهتْكُمْ؟ و أيّ وزْرٍ على ظُهُوركُمْ حملْتُمْ؟ و أيّ دم أ سفكْتُمُوها؟ قتلْتُمْ خيْر رجالاتٍ بعْد النّبيّ ص ، و نُزعت الرّحْمةُ منْ قُلُوبكُمْ ألا انّ حُزْب اللّه هُمُ الغالبُون و حزْبُ الشيْطان هُمُ الْخاسرُون

হে কুফাবাসীগণ , তোমাদের অবস্থা কতই খারাপ। তোমারা কেন হোসাইন (আ.) কে অপদস্ত ও হত্যা করেছ ? কেন তার সম্পদ লুন্ঠন করেছ ? কেন তার স্ত্রী-কন্যাদেরকে বন্দী করেছ ? এতসব করে এখন তার জন্য কাদছো ? তোমাদের জন্য আক্ষেপ , তোমাদের ধ্বংস ও অমঙ্গল হোক। তোমরা কি জান যে তোমরা কত বড় পাপ করেছ ? তেমরা কি জান তোমরা অন্যায় ভাবে কি ধরণের রক্ত ঝরিয়েছ ? তোমরা জান কি কোন ধরনের অন্তঃপুর বাসিনীদেরকে তোমরা পর্দার অন্তরাল থেকে জনসমক্ষে বের করে এনেছ ? তোমরা জান কি তোমরা কোন পরিবারের অলংকারসমূহ বলপূর্বক ছিনিয়ে নিয়েছ এবং কাদের সম্পদ লুন্ঠন করেছ ? আর তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছ মহানবীর (সা.) পর যার মান মর্যাদার অধিকারী কেউ নেই ? তোমাদের অন্তর থেকে দয়া মায়া তুলে নেয়া হয়েছে । জেনে রেখো যে আল্লাহর দলই সফলকাম এবং শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্থ। অতঃপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করলেন

قتلْتُمْ أخى صبْرا فويْلٌ لامّكُمُ

ستُجْزوْن نارا حرُّها يتوقّدُ

سفكْتُمْ دم أ حرّم اللّهُ سفْكها

و حرّمها الْقُرآنُ ثُمّ مُحمّدُ

ألا ف أبْشروا بالنّار انّكُمْ غدا

لفى سقرٍ حقّا يقينا تخلّدُوا

و أنّى لابْكى فى حياتى على أخى

على خيْر منْ بعْد النّبيّ سيُولدُ

بدمْعٍ غريزٍ مُسْتهلٍّ مُكفْكفٍ

على الْخدّ منّى دائما ليْس يُحْمدُ

তোমরা আমার ভ্রাতাকে হত্যা করেছ , তোমাদের কাজের জন্য আক্ষেপ ,

তোমরা শীঘ্রই এমন নরকে প্রবেশ করবে যার তাপ দগ্ধ করে দেয় ,

মহান আল্লাহ , পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.) যে রক্ত ঝরানো

হারাম করে দিয়েছেন সে রক্তই তোমরা ঝরিয়েছ।

তোমরা একে অপরকে নরকাগ্নির সুসংবাদ দাও

নিশ্চয় তোমরা নরকাগ্নিতে চিরকাল দগ্ধ হবে

মহানবীর (সা.) পরে আমার যে ভ্রাতা মঙ্গলের উপর ছিলেন তার জন্য আমি আমার সারাটা জীবন ক্রন্দন করব।

আমার গন্ডদেশ দিয়ে সর্বদা প্রবাহিত থাকবে অশ্রু যা কখনো শুকাবে না ।

এ সময় জনগণ উচ্চস্বরে কাদছিল। মহিলারা শোকে তাদের কেশমালা এলোমেলো করেছিল এবং মাথায় ধুলো মাটি মেখেছিল। তারা নিজেদের মুখমণ্ডলে আচড় দিচ্ছিল এবং মুখে থাপ্পর মারছিল। তারা উচ্চস্বরে ফরিয়াদ ও ওয়াওয়াইলা ’ বলছিল। পুরুষরা কাদছিল এবং চুল দাড়ি উপড়ে ফেলছিল। ঐদিনের চেয়ে অন্য কোন সময় লোকদের এত অধিক কাদতে দেখা যায়নি।

ইমাম আলী ইবনুল হোসাইন যয়নুল আবেদীনের ভাষণ

হযরত ফাতেমা সুগরার ভাষণ সমাপ্ত হওয়ার পর ইমাম যয়নুল আবেদীন জনগণকে নীরবতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেন । জনতা নীরব হলে তিনি (যয়নুল আবেদীন) দাড়িয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করেন এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর নাম উচ্চারণ করে তার উপর দরুদ ও সালাম পাঠ করেন। তারপর তিনি বললেনঃ

أيُّها النّاسُ منْ عرفنى فقدْ عرفنى ، و منْ لمْ يعْرفْنى ف أنا أُعرّفُهُ بنفْسى : أنا عليُّ بْنُ الْحُسيْن بْن عليّ بْن أبي طالبٍ. أنا ابْنُ الْمذْبُوح بشطّ الْفُرات منْ غيْر ذحْلٍ و لا تراتٍ. أنا ابْنُ من انْتُهك حريمُهُ و سُلب نعيمُهُ وانْتُهب مالُهُ و سُبى عيالُهُ. أنا ابْنُ منْ قُتل صبْرا و كفى بذلك فخْرا. أيُّها النّاسُ، ناشدْتُكُمُ اللّه هلْ تعْلمُون أنّكُمْ كتبْتُمْ الى أبى و خدعْتُمُوهُ و أعْطيْتُمُوهُ منْ أنْفُسكُمْ الْعهْد والْميثاق والْبيْعة و قاتلْتمُوهُ و خذلْتُمُوهُ؟! فتبّا لما قدّمْتُمْ لانْفُسكُمْ و سوْءا لر أيكُمْ ب أيّة عيْنٍ تنْظُرون الى رسول اللّه ص اذْ يقُولُ لكُمْ: قتلْتُمْ عتْرتى وانْتهكْتُمْ حُرْمتى فلسْتُمْ منْ أُمّتى ؟ !

হে জনতা , যারা আমাকে চিনে তাদের কাছে নতুন করে আমার পরিচিতি তুলে ধরার প্রয়োজন নেই। আর যার আমাকে চিনে না তাদের কাছে আমি নিজেই আমার পরিচিতি তুলে ধরছি। আমি আলী ইবনুল হোসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) । আমি এমন এক ব্যক্তির সন্তান যার মান সম্ভ্রম পদদলিত করা হয়েছে , যার সম্পদ লুন্ঠন করা হয়েছে এবং যার আহলে বাইত (পরিবার পরিজনকে) বন্দী করা হয়েছে। আমি এমন এক ব্যক্তির সন্তান যাকে ফোরাত নদীর তীরে কোন প্রকার রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করা ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে । আমি এমন এক ব্যক্তির সন্তান যাকে অনেক কষ্ট ও যাতনা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে । আর এটাই আমার গৌরববোধের জন্য যথেষ্ট। হে লোকসকল , তোমাদের কাছে আল্লাহর শপথ করে বলছি তোমরাইতো আমার পিতার কাছে চিঠির পর চিঠি দিয়েছ। তারপর যখন তিনি তোমাদের কাছে আসলেন তখন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করলে !! তোমরা আমার পিতার সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলে , তার হাতে বায়াত করেছিলে। আর এগুলো করার পর তোমরাই তাকে হত্যা করলে। তোমরা যে পাথেয় পরকালের জন্য সঞ্চয় করেছ তা ধ্বংস হোক আর তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আকীদা বিশ্বাস কতই না মন্দ। কিয়ামতের দিনে মহানবী (সা.) যখন তোমাদেরকে বলবেন , তোমারা আমার দৌহিত্রকে হত্যা করেছ এবং আমার মান সম্ভ্রম পদদলিত করেছ। তোমরা আমার উম্মতের অন্তর্ভূক্ত নও। তখন তোমরা তাকে কি জবাব দিবে ? একথাগুলো বলার পর চারিদিকে জনতার মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। আর তখন লোকেরা একে অন্যকে বলছিল , তোমার ধ্বংস হয়ে গেছ। তোমরা কি জানতে না ” ? ইমাম যয়নুল আবেদীন বললেন ,

" رحم الله عبدا قبل نصیحتی وحفظ وصیتی فی الله و فی رسوله و اهل بیته فانّ لنا فی رسول الله اسرة حسنة "

“ মহান আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর দয়া করুন যে আমার উপদেশ গ্রহণ করবে এবং মহান আল্লাহ , রাসূল (সা.) ও তার আহলে বাইত সংক্রান্ত আমার নসিহত সংরক্ষণ করবে। কারণ মহানবী (সা.)ই আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। ” তখন জনগণ সমস্বরে বলে উঠলঃ হে নবী (সা.) এর বংশধর , আমরা সবাই আল্লাহর নির্দেশের গোলাম আপনার অনুগত এবং আপনার সাথে যে ওয়াদা করেছি তা রক্ষা করব। কখনোই আমরা আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব না। আপনি যা আদেশ করবেন আমরা তাই করব। যারাই আপনার বিরুদ্ধে লড়বে আমরাও তার বিরুদ্ধে লড়ব। যারা আপনার সাথে সন্ধি করবে আমরাও তাদের সাথে সন্ধি করব। আমরা ইয়াজিদের কাছে ইমাম হোসাইনের রক্তের বদলা চাইব। যারা আপনার উপর জুলুম করেছে তাদের সাথে আমরা সম্পর্কচ্ছেদ করব। উপস্থিত জনতার বক্তব্য শোনার পর ইমাম বললেন , চক্রান্তকারী গাদ্দারেরা দূর হও আমার সামনে থেকে। চক্রান্ত , ষড়যন্ত্র ও দাগাবাজী ছাড়া আর কোন গুণই নেই তোমাদের। আমার পিতার সাথে যে আচরণ করেছ আমার সাথেও সেরূপ আচরণ করতে চাচ্ছ ? মহান আল্লাহর শপথ , এধরনের আচরণ আর তোমাদের দ্বারা করা সম্ভব হবে না। কারণ আমার পিতার আহলে বাইতের ব্যাপারে আমার অন্তরে যে সব ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা এখনো আরোগ্য লাভ করেনি এবং আমার পিতামহ (মহানবী) , পিতা এবং আমার ভাইদের প্রতি আপতিত বিপদাপদের কথা আমরা এখনো ভুলে যাইনি। ঐ সব বিপদের তিক্ত স্মৃতি এখনো আমার অন্তরে জাগরুক থেকে আমার বক্ষদেশকে ভারী ও শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলেছে। আমি তোমাদের কাছে এতটুকুই প্রত্যাশা করছি যে , তোমরা আমাদেরকে সাহায্যও করো না এবং আমাদের বিরুদ্ধে লড়াইও করো না। এরপর ইমাম যয়নুল আবেদীন আবৃত্তি করলেন।

لا غروان قتل الحسین فشیخه

قد کان خیرا من حسین و اکرما

فلا تقرحو یا اهل کوفان بالذی

اصیب حسین کان ذالک اعظما

قتیل بشط النهر روحی فدائه

جز أ الذی اراده نار حهنّما

অর্থাৎ হোসাইন (আ.) যদি নিহত হয় এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ আলী ইবনে আবু তালিব হোসাইনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়েও নিহত হয়েছেন। হে কুফাবাসীরা হোসাইনের উপর যে সব বিপদ আপতিত হয়েছে তার জন্য তোমরা খুশী হয়ো না। হোসাইন (আ.) এর উপর আপতিত বিপদসমূহ অন্য সব বিপদ অপেক্ষা ভয়ংকর ছিল। ফোরাত নদীর তীরে শহীদ হোসাইনের চরণতলে আমার প্রাণ উৎসর্গ হোক। হোসাইন (আ.) এর হত্যাকারীদের পুরস্কার হচ্ছে নরকাগ্নি।

ইমাম যয়নুল আবেদীন উপরোক্ত পংক্তিগুলো আবৃত্তি করার পর এ পংক্তিটিও আবৃত্তি করলেন ।

رضینا منکم رأسأ برأس

فلا یوم لنا ولا علینا

অর্থাৎ তোমরা আমাদের সাথে ধোকাবাজীও করনা বা আমাদের বিরুদ্ধেও যেও না । (আমাদেরকে সাহায্যও করো না আর আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণও করো না) এতে করে আমরা তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকব ।

আহলে বাইতের কুফার শাসনকর্তার প্রাসাদে আগমন বর্ণিত আছেঃ

ইবনে যিয়াদ দারুল ইমারাহ ’ বা প্রাসাদে আসন গ্রহণ করল এবং জনতাকে প্রবেশের অনুমতি দিল। ইমাম হোসাইন (আ.) এর পবিত্র মাথা এনে ইবনে যিয়াদের সামনে রাখা হল । ইমামের বন্দী পরিবার পরিজন ও সন্তান সন্ততিদেরকে ইবনে যিয়াদের দরবারে হাজির করা হল । হযরত আলী (আ.) এর কন্যা সভায় প্রবেশ করে এক কোণায় বসে পড়লেন। কেউ তাকে চিনতেও পারলনা। ইবনে যিয়াদ জিজ্ঞেস করল , এ মহিলাটি কে ? তাকে বলা হল , ইনি হযরত আলী (আ.) এর কন্যা যয়নাব (আ.) । ইবনে যিয়াদ হযরত যয়নাব (আ.) কে লক্ষ্য করে বলল , খোদার সমস্ত প্রশংসা যিনি তোমাদেরকে অপদস্ত করেছেন এবং তোমাদের মিথ্যাবাদিতাকে ফাস করে দিয়েছেন। হযরত যয়ানাব (আ.) বললেন-

انّما يفْتضحُ الْفاسقُ و يكْذبُ الْفاجرُ، و هُو غيْرُنا

“ যারা ফাসেক-লম্পট তারাই অপদস্ত হয় ; লম্পট লোকেরাই মিথ্যা কথা বলে। আর আমরা ফাসেক-ফাজের বা লম্পট নই। ইবনে যিয়াদ তখন তাকে বলল , খোদা তোমার ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করেছে সে সম্পর্কে তোমার কি অভিমত ? হযরত যয়নাব (সা.আ.) প্রত্যুত্তরে বললেন-

ما رأیت الا جمیلا هول أ قوم کتب الله علیهم القتل فبرزوا الی مضاجعهم

“ তাদের সাথে খোদা যে আচরণ করেছেন সেটা ছিল উত্তম আচরণ। কারণ এদের জন্য মহান আল্লাহ শাহাদতের মর্যাদা লিখে রেখেছিলেন। আর তারা তাদের চিরস্থায়ী বাসস্থানের দিকেই চলে গেছেন। আমি পূণ্য ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই প্রত্যক্ষ করছি না। আর অতিশীঘ্রই মহান আল্লাহ তোকে ও এদেরকে হিসাব কিতাবের জন্য একত্রিত করবেন। আর তখন তারা তোর সাথে ঝগড়া বিবাদ করবে। আর তখনই বুঝতে পারবি কারা পরকালে সফলকাম ও মুক্তিপ্রাপ্ত হবে। তোর মা তোর জন্য কাদুক হে মারজানার পুত্র। ” একথা শুনে ইবনে যিয়াদ এতই ক্ষুদ্ধ হল যেন সে এক্ষুনি হযরত যয়নাবকে হত্যা করে ফেলবে।

ঐ সভায় উপস্তিত উমর ইবনে হারীস ইবনে যিয়াদকে বলল , এ হলো একজন সামান্য নারী। মহিলাদেরকে তাদের কথায় ধরতে হয়না। অর্থাৎ তাদেরকে শাস্তি দেয়া হয় না। ” এ কথা শোনার পর ইবনে যিয়াদ যয়নাবকে হত্যা করার অভিপ্রায় ত্যাগ করে। সে হযরত যয়নাবকে লক্ষ্য করে বললঃ হোসাইনকে নিহত করে আল্লাহ আমার প্রাণকে জুড়িয়ে দিয়েছেন। হযরত যয়নাব (আ.) এর প্রত্যুত্তরে বললেন , আমার জীবনের শপথ। আমাদের বয়ঃজ্যেষ্ঠদেরকে তুই হত্যা করেছিস এবং আমার বংশ ও বংশধরদেরকে ছিন্ন ভিন্ন করেছিস। আর এতে যদি তোর প্রাণ জুড়িয়ে থাকে তাহলে আসলেই তোর প্রাণ জুড়িয়েছে। ” ইবনে যিয়াদ তখন বললঃ যয়নাব এমনই একজন মহিলা যে কাব্যিক ছন্দে কথা বলে। আর আমার জীবনের শপথ তার পিতাও একজন কবি ছিলেন। ” ইবনে যিয়াদের এ উক্তি শুনে হযরত যয়নাব (আ.) বললেন. হে ইবনে যিয়াদ কবিতা ও কাব্যের সাথে মহিলার কি সম্পর্ক ? এরপর ইবনে যিয়াদ ইমাম যয়নুল আবেদীনকে (আ.) লক্ষ্য করে বলল এ যুবকটি কে ? তাকে বলা হল , ইনি আলী ইবনুল হোসাইন (আ.) । তখন ইবনে যিয়াদ বলল আল্লাহ কি তাকে এখনও হত্যা করেনি ? ইমাম যয়নুল আবেদীন বললেনঃ আলী ইবনুল হোসাইন নামে আমার এক ভাই ছিল লোকেরা তাকে হত্যা করেছে। ” ইবনে যিয়াদ একাথা শুনে বলল বরং খোদাই তাকে হত্যা করেছে। ” ইমাম যয়নুল আবেদীন তখন বললেন

) للّـهُ يتوفّى الْأنفُس حين موْتها والّتي لمْ تمُتْ في منامها)

আল্লাহই মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়। আর যে সব মানুষ নিদ্রাকালে মৃত্যুবরণ করেনি তাদের প্রাণও হরন করেন।(সূরা যুমারঃ৪৩)

ইবনে য়িয়াদ একথা শোনার পর বলল , আমার কথার জবাব দেয়ার সাহস তোমার কি করে হল ? অতঃপর পাপিষ্ট ইবনে যিয়াদ ইমাম যয়নুলকে (আ.) বাহিরে নিয়ে হত্যা করার আদেশ দিল। হযরত যয়নাব ইবনে যিয়াদের আদেশ শোনা মাত্রই উত্তেজিত হয়ে বললেন-

يا ابْن زيادٍ انّك لمْ تُبْق منّا أحدا، فإنْ كُنْت عزمْت على قتْله فاقْتُلْنى معهُ

“ হে ইবনে য়িয়াদ ,তুই আমাদের মাঝে কাউকেই জীবিত রাখিসনি। যদি তুই যয়নুলকে হত্যা করতে চাস তাহলে আমাকেও হত্যা করে ফেল। ” ইমাম যয়নুল ফুফুকে লক্ষ্য করে বললেন , হে ফুফুজান , আমি যতক্ষণ ইবনে যিয়াদের সাথে কথা বলব আপনি চুপ করে থাকুন। ” তারপর ইমাম যয়নল আবেদীন (আ.) ইবনে যিয়াদকে লক্ষ্য করে বললেন-

أبالْقتْل تُهدّدنى يا ابْن زيادٍ أما علمْت أنّ الْقتْل لنا عادةُ و كرامتُتنا الشّهادةُ

হে ইবনে যিয়াদ তুই আমাকে হত্যার ভয় দেখাচ্ছিস ? অথচ তোর কি জানা নেই যে নিহত হওয়া আমাদের কাছে স্বাভাবিক এবং শাহাদতই আমাদের গৌরব। এরপর ইবনে যিয়াদের আদেশক্রমে ইমাম এবং আহলে বাইতকে কুফার জামে মসজিদের পাশে অবস্থিত একটি গৃহে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়। হযরত যয়নাব নির্দেশ দিলেন যে সব মহিলা উম্ম ওয়ালাদ বা দাসী তারা ছাড়া আর কোন মহিলা যেন আমাদের গৃহে প্রবেশ না করে। কারণ যেমনিভাবে আমাদের বন্দীত্বের শিকলে বাধা হয়েছে তেমনি ভাবে মহিলারাও (দাসীরাও) দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ।

ইবনে যিয়াদ ইমাম হোসাইনের (আ.) দেহচ্যুত মাথা মোবারক কুফার রাস্তায় রাস্তায় প্রদর্শন করার আদেশ দেয়। এ ব্যাপারে আমরা ইমাম হোসাইন (আ.) এর শানে একজন আলেমের শোকগাথা উদ্ধৃত করা সমীচীন মনে করছি।

ر أسُ ابْن بنْت مُحمّدٍ و وصيّه

للنّاظرين على قناةٍ يُرْفعُ

و الْمُسْلمُون بمنْظرٍ و بمسْمعٍ

لا مُنْكرُ منْهُمْ و لا مُتفجّعُ

كحُلتْ بمنْظرك الْعُيُونُ عمايةً

و أصمّ رُزْءُك كُلّ أُذُن تسْمعُ

أيْقظْت أجْفانا و كُنْت لها كرى

و أنمْت عيْنا لمْ تكُنْ بك تهْجعُ

ما روْضةُ الا تمنّتْ أنّها

لك حُفْرةُ و لخظّ قبْرك مضْجعُ

জনসমক্ষে প্রদর্শনীর জন্য মহানবীর দৌহিত্র ও উত্তরাধিকারীর মস্তক বর্শার মাথায় গাথা হয়েছে। আর মুসলমানরা তা দেখছে এবং শুনছে। তাদের মধ্যে কেউই এ গর্হিত কাজে বাধা দিচ্ছে না বা তাদের অন্তর ব্যথিত হচ্ছে না। যে এই বিভৎস দৃশ্যটি প্রত্যক্ষ করছে তার চোখ অন্ধ হয়ে যাক। হে হোসাইন , তোমার মুসিবতের কথা শুনেও যে ব্যক্তি তা প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসেনি তার কর্ণদ্বয় বধির হয়ে যাক। হে হোসাইন তুমি তোমার শাহাদতের দ্বারা ঐসব চোখগুলোকে জাগ্রত করেছ যারা তোমার জীবদ্দশায় নিদ্রামগ্ন ছিল। আর ঐসব চোখগুলোকে নিদ্রামগ্ন করেছ যারা তোমার জীবদ্দশায় তোমার ভয়ে ঘুমাতে পারত না । হে হোসাইন , পৃথিবীর বুকে এমন কোন উদ্যান ছিল না যে তোমার সমাধিস্থল ও চিরস্থায়ী আবাস হওয়ার আকাঙ্খা করেনি।

আবদুল্লাহ ইবনে আফীফের বীরত্ব ও শাহাদাত

বর্ণিত আছেঃ ইবনে যিয়াদ মিম্বরে দাড়িয়ে মহান আল্লাহর প্রশংসা করার পর ভাষণের মধ্যে বলতে লাগলঃ ঐ খোদার শুকরিয়া আদায় করছি যিনি আমীরুল মুমেনীন ইয়াজিদ ও তার অনুসারীদেরকে সাহায্য করেছেন এবং মিথ্যাবাদীর পুত্র মিথ্যাবাদী হোসাইন ইবনে আলীকে হত্যা করেছেন। (নাউজুবিল্লাহ) যখন সে একথা বলল তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আফীফ আল-আযদী প্রতিবাদ করে বললেন , হে মারজানার পুত্র তুই , তোর পিতা আর যে তোকে কুফার শাসনকর্তা করেছে সে ও তার পিতাই আসলে প্রকৃত মিথ্যাবাদী। হে খোদার শত্রু , মহান নবীদের বংশধরদেরকে হত্যা করে মুসলমানদের মিম্বরে আরোহণ করে এ ধরনের মিথ্যা উক্তি করছিস ? এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে , আব্দুল্লাহ ইবনে আফীফ আল-আযদী একজন পূণ্যবান , দুনিয়াত্যাগী সাধক পুরুষ ছিলো। উষ্ঠের যুদ্ধে তার বাম চোখ এবং সিফফীনের যুদ্ধে তার ডান চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি কুফার জামে মসজিদে সারা দিনরাত ইবাদত-বন্দেগী ও নামায-রোযায় মগ্ন থাকতেন। ইবনে যিয়াদ আব্দুল্লাহ ইবনে আফীফের এ কথাগুলো শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হল এবং বলতে লাগলঃ এ কথ কে বলল ? আব্দুল্লাহ ইবনে আফীফ তখন উচ্চস্বরে বলে উঠলেন , হে খোদার শত্রু , আমিই এ কথাগুলো বলছি। মহানবীর (সা.) পবিত্র বংশধরদেরকে হত্যা করেছিস যাদেরকে মহান আল্লাহ সব ধরনের পাপ-পংঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে দিয়েছেন ? আর এরপরও নিজেকে মুসলমান মনে করছিস ?!!! হায় মহানবী (সা.) যাকে অভিশপ্তের পুত্র অভিশপ্ত বলে অভিহিত করেছেন সেই পাপিষ্ঠ অপবিত্র ইবনে যিয়াদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারদের বংশধরেরা আজ কোথায় ? এ কথায় ইবনে যিয়াদের ক্রোধ আরো বেড়ে গেল , তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল এবং সে বলতে লাগল , আব্দুল্লাহকে আামর সামনে ধরে আনো। ” শক্তিশালী রক্ষীরা চারদিক থেকে আব্দুল্লাহর দিকে ছুটে গেল। কিন্তু আযদ গোত্রপতিরা যারা সম্পর্কে আব্দুল্লাহর জ্ঞাতি ও সম্পর্কে চাচাত ভাই তারা সবাই আব্দুল্লাহকে রক্ষীদের হাত থেকে রক্ষা করে এবং নিরাপদে মসজিদ থেকে তার গৃহে পৌছে দেয়। ইবনে যিয়াদ এ ঘটনার পর সৈন্যদেরকে আদেশ দেয় , !ঐ অন্ধ আযদীর ঘরে গিয়ে ওকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এস। খোদা যেমনিভাবে ওর দু চোখ অন্ধ করে দিয়েছে ঠিক তেমনিভাবে ওর অর্ন্তচক্ষুও যেন অন্ধ করে দেন। ” ইবনে যিয়াদের এ আদেশ পেয়ে একদল সৈন্য আব্দুল্লাহর গৃহে হানা দেয়। আর এ খবর শোনামাত্রই আযদ গোত্র আব্দুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য ইয়ামানী কবীলাসমূহের সাথে একত্রিত হয়। আযদ ও অন্যান্য গোত্রের একত্রিত হওয়ার সংবাদ পেয়ে ইবনে যিয়াদ মাযার গোত্রসমূহকে ” একত্রিত করে তাদেরকে মুহাম্মদ বিন আশ ’ আশের নেতৃত্বে আযদ ও ইয়ামানী গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রেরণ করে। এক ভীষণ যুদ্ধ বেধে যায় এবং একদল লোকও যুদ্ধে নিহত হয়। ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা এক পর্যায়ে আব্দুল্লাহর ঘরে পৌছে যায় এবং দরজা ভেঙ্গে ঘরে প্রবেশ করে। তখন আব্দুল্লাহও তাকে অভয় দিয়ে বলতে থাকেন , ভয় পেয়ো না। আমাকে তরবারীটা দাও। ” তখন সে তরবারীটা এনে আব্দুল্লাহকে দেয় এবং আব্দুল্লাহও নিম্নোক্ত কবিতা আবুত্তি করতে করতে আত্মরক্ষা করার জন্য যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।

أنا ابْن ذى الْفضل عفيف الّطاهر

عفيفُ شيْخى و ابْنُ أُمّ عامر

كمْ دارٍع منْ جمْعكُمْ و حاسرٍ

و بطلٍ جدلْتُهُ مُغاورٍ

আমি পুণ্যাত্মা আফীফ তনয় ,

আমার পিতা আফীফ যিনি উম্মু আমেরের সন্তান

আমি তোমাদের মধ্য থেকে কত বর্মধারী , বীর ও সিপাইদের বিরুদ্ধে লড়েছি। ”

আব্দুল্লাহর মেয়ে তখন বলছিলঃ হে পিতা , হায় আমি যদি পুরুষ হতাম তাহলে তোমার পাশাপাশি নবীবংশ হত্যাকারী এসব পাপিষ্ঠ নরাধমদের বিরুদ্ধে লড়তাম। ”

ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা চারদিক থেকে আব্দুল্লাহর উপর আক্রমণ চালাচ্ছিল। আর আব্দুল্লাহও একাই লড়ে যাচ্ছিলেন। যারাই যে দিক থেকে তার কাছাকাছি পৌছে যেত অমনি তার মেয়ে তাকে জানিয়ে দিত। । অবশেষে শত্রুদের চাপ চারদিক থেকে বেড়ে গেল এবং তারা আব্দুল্লাহকে ঘিরে ফেলল। তখন আব্দুল্লাহর মেয়ে চীৎকার করে বলল , হায় পিতা , পিতা , কঠিন বিপদের সম্মুখীন অথচ তার কোন সাহায্যকারী নেই। ” আব্দুল্লাহ চারদিকে তরবারী ঘুরিয়ে বলতে লাগলেনঃ

أُقْسمُ لوْ يفْسحُ لى عنْ بصرى

ضاق عليْكُمْ موْردى و مصْدرى

খোদার শপথ , আমি যদি অন্ধ না হতাম তাহলে তোমাদের অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। ” ইবনে যিয়াদের সৈন্যরা তার সাথে অবিরাম লড়ে যেতে লাগল এবং অবশেষে তাকে বন্দী করে ইবনে যিয়াদের কাছে নিয়ে গেল। ইবনে যিয়াদ আব্দুল্লাহকে দেখামাত্রই বলে উঠল ,

الْحمْدُ لله الّذى أخْزاك ঐ খোদার সমস্ত প্রশংসা যিনি তোমাকে অপদস্থ করেছেন। ” আব্দুল্লাহ প্রত্যুত্তরে বললেন-

يا عدُوّ الله و بماذا أخْزانى اللهُ

হে খোদার দুশমন , আল্লাহ কেন আমাকে অপদস্থ করবেন ? আমি শপথ করে বলছি , যদি আমি অন্ধ না হতাম তাহলে তোর অবস্থা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। ” ইবনে যিয়াদ তখন তাকে বলল , হে খোদার দুশমন , উসমান ইবনে আফফানের ব্যাপারে তোর অভিমত কি ? আব্দুল্লাহ , ইবনে যিয়াদকে গালি দিয়ে বললেন , হে বনি ইলাজের ক্রীতদাস , হে মারজানা তনয় , উসমানকে নিয়ে তোর এত মাথাব্যথা কেন ? উসমান যদি অন্যায় করে থাকে তাহলে মহান আল্লাহ তার ও অন্যান্যদের মাঝে ন্যায়পরায়ণতার সাথে ফয়সালা করে দেবেন। তুই এ ব্যাপারে নিজকে , তোর পিতাকে এবং ইয়াজিদ ও তার পিতাকে জিজ্ঞেস করে দেখ। ” ইবনে যিয়াদ প্রত্যুত্তরে বলল , তোর মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত আর কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। আব্দুল্লাহ মহান আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন , তোর জন্মেরও আগে আমি খোদার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম , আমাকে শাহাদাতের মর্তবা দান কর এবং সবচে ’ নিকৃষ্ট ব্যক্তির হাতে যেন আমার মৃত্যু হয়। ” কিন্তু আমার দু চোখ যখন অন্ধ হয়ে গেল তখন শাহাততের সৌভাগ্য অর্জনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন আমি আমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌছে যাচ্ছি বলেই মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি। ” অতঃপর ইবনে যিয়াদ আব্দুল্লাহর মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করলে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার মৃতদেহ কুফার কোন এক গলিতে ঝুলিযে রাখা হয়।

বর্ণিত আছেঃ উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদ পত্রযোগে ইয়াজিদকে ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদত ও তার আহলে বাইতকে বন্দী করার ব্যাপারে অবহিত করে। উবায়দুল্লাহ মদীনার শাসনকর্তা আমর বিন সাঈদ বিন আসের কাছে একই ধরনের চিঠি লিখে । চিঠি পৌছানো মাত্রই আমর বিন সাঈদ বিন আস মসজিদে নববীর মিম্বারে দাড়িয়ে ভাষণ দেয় এবং হোসাইন (আ.) এর শাহাদাত সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে এ সংবাদ শোনা মাত্রই হাশিমী বংশীয়দের মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায় এবং তারা শোক প্রকাশ করতে থাকে। আকীল ইবনে আবী তালেবের কন্যা যয়নাব বিলাপ করে বলতে থাকেনঃ মহানবী (সা.) যখন তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করবেন ,

ماذا تقُولُون اذْ قال الّنبىُ لكُمْ

ماذا فعلْتُمُ و أنْتُمْ آخرُ الاْ مم

بعتْرتى و أهْل مُفْتقدى

منْهُمْ أُسارى و منْهُمْ ضُرّجُوا بدم

ما كان هذا جزائى اذْ نصحْتُ لكُمْ

أنْ تخْلُفُونى بسُوءٍ فى ذوى رحمى

আমার আহলে বাইতের সাথে আমার মৃত্যুর পর তোমরা কি আচরণ করেছ অথচ তোমরাই ছিলে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত ? তাদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যককে বন্দী করেছ আর কিছুসংখ্যককে হত্যা করেছ। তোমাদেরকে না আমি উপদেশ দিয়েছিলাম যে আমার আহলে বাইতের সাথে খারাপ আচরণ করবে না। অথচ এই তার প্রতিদান। তখন তোমরা তাকে (সা.) কি জবাব দেবে ? ঐ দিন দিবাগত রাতে মদীনাবাসীরা শুনতে পেল যে , কে যেন অদৃশ্যলোক থেকে বলছে-

ماذا تقُولُون اذْ قال الّنبىُ لكُمْ

ماذا فعلْتُمُ و أنْتُمْ آخرُ الاْ مم

بعتْرتى و أهْل مُفْتقدى

منْهُمْ أُسارى و منْهُمْ ضُرّجُوا بدم

ما كان هذا جزائى اذْ نصحْتُ لكُمْ

أنْ تخْلُفُونى بسُوءٍ فى ذوى رحمى

أيُّها الْقاتلُون جهْلا حُسيْنا

أبْشرُوا بالْعذاب و التّنْكيل

كُلُ أهْل السّم أ يدْعُو عليْكُمْ

منْ نبّى و مالكٍ و قتيل

قد لعنتم علی لسان ابن داود

و موسی و صاحب الانجیل

যারা ইমাম হোসাইনকে (আ.) অজ্ঞতাবশত হত্যা করছে তাদেরকে শাস্তি ও দুর্ভাগ্যর সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে । নবী-পয়গম্বর- ফেরেশতা ও শহীদগণসহ সকল আকাশবাসী হোসাইন (আ.) এর হত্যাকারীদেরকে অভিশাপ দিচ্ছে। হযরত সুলাইমান (আ.) হযরত মূসা (আ.) ও তোমাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন।

ইবনে যিয়াদ কর্তৃক বন্দী ইমাম পরিবারকে সিরিয়ায় প্রেরণ

ইবনে যিয়াদের চিঠি পেয়ে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার পর ইয়াজিদ ইবনে যিয়াদকে লিখল , হোসাইন (আ.) এর মস্তক ও যারা তার সাথে নিহত হয়েছে তাদের কর্তিত মাথা ইমাম হোসাইন (আ.) এর বন্দী পরবিার-পরিজনসহ সিরিয়ায় পাঠিয়ে দাও। ইবনে যিয়াদ মাহফার বনি সা ’ লাবা আল আনেদীর নেতৃত্বে ইমাম হোসাইন (আ.) ও তার নিগত সঙ্গী-সাথীদের মাথা এবং বন্দী আহলে বাইত (আ.) কে সিরিয়ায় প্রেরণ করে। কাফির মুশরিক যুদ্ধবন্দীদেরকে যেমনিভাবে মুখমণ্ডল অনাবৃত করে রাখা হয় ঠিক তেমনিভাবে মিহফার বন্দী নবী-পরিবারকে সিরিয়ায় নিয়ে যায়।

সিরিয়ায় আহলে বাইত (আ.)-এর করুণ অবস্থা

বন্দী আহলে বাইত (আ.) এর কাফেলা দামেশক শহরের সদর দরজার নিকটবর্তী হলে হযরত উম্মে কুলসুম (আ.) শিমারের কাছে গিয়ে বললেন , তোমার সাথে একটু কথা আছে। ” শিমার তাকে জিজ্ঞেস করল , কি কথা ? কথন উম্মে কুলসুম তাকে বললেন ,

قالتْ: اذا دخلْت بِنا الْبلد فاحْمِلْنا فى درْبٍ قلِيلِ النّظارةِ، و تقدّم اليْهِمْ أنْ يُخْرِجُوا هذِهِ الرُّؤ وس مِنْ بيْنِ الْمحامِلِ و يُنحُّونا عنْها، فقدْ خزينا مِنْ كثْرةِ النّظرِ اليْنا و نحْنُ فى هذِهِ الْحالِ

“ এ শহরে প্রবেশ করানোর সময় আমাদেরকে এমন ফটক দিয়ে শহরের ভিতরে নিয়ে যাও যেখান । অল্পসংখ্যক দর্শক জড়ো হয়েছে এবং তোমার সিপাইদেরকে বল তারা এই মাথাগুলোকে পতাকাসমূহের মধ্য থেকে বাইরে বের করে আনে এবং এবং আমাদের (বন্দী নবী পরিবার) ওগুলো থেকে দূরে রাখে। করাণ আমরা ইতোমধ্যে অনেক অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়েছি। আর আমরা তো বন্দী অবস্থার মধ্যেই রয়েছি। শিমারের মাঝে বিশেষ ধরনের কুফরী ও পাপ-পঙ্কিলতা (কলুষতা) থাকার কারণে হযরত উম্মে কুলসুমের এ কথায় সে মোটেও কান দিল না বরং উল্টো আদেশ দিল , কর্তিত মস্তকগুলোকে বর্শাগ্রে বেধে পতাকাসমূহের মাঝেই রাখা হয়। ” আর এভাবেই বন্দী নবী পরিবারকে দর্শকদের উপস্থিতিতে দামেশকের প্রধান ফটকের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করানো হল। শহরের প্রধান জামে মসজিদের দরজার সামনে যেখানে যুদ্ধবন্দীদেরকে রাখা হত সেখানেই বন্দী নবী পরিবারকে রাখা হয়। বর্ণিত আছে যে , একজন জ্ঞানী তাবেয়ী সিরয়িায় যখন ইমাম হোসাইনের কর্তিত মাথা মোবারক দেখতে পান তখন থেকে এক মাসের জন্য তিনি নিজ বান্ধবদের সাথেও দেখা দেননি , আত্মগোপন করেছিলেন। একমাস পর যখন তাকে দেখা গেল তখন তাকে আত্মগোপন করার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল। তিনি জবাবে বলেছিলেন , !তোমরা দেখতে পাচ্ছ না যে আমরা কত বড় দুর্ভাগ্য ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছি ? তারপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করলেন ,

“ তোমরা কারা ? তখন ঐ মেয়েটি বলল , আমি হোসাইনের (আ.) কন্যা সাকীনা। ” আমি তাকে বললাম , আমি আপনার প্রপিতামহের একজন সাহাবা । আমার নাম সাহল বিন সা ’ দ। আমার দ্বরা যদি আপনাদের কোন উপকার হয় তাহলে আমাকে বলুন। ” তখন তিনি (সাকীনা) বললেলঃ

جاؤُا بِر أسِك يابْن بِنْتِ مُحمّدٍ

مُترمِّلا بِدِمائِهِ ترْميلا

و ك أنّما بِك يابْن بِنْتِ مُحمّدٍ

قتلُوا جِهارا عامِدين رسولا

قتلُوك عطْشانا و لمّا يترقّبُوا

فى قتْلِك التّنْزيل و التّ أويلا

و يُكبِّرُون بِ أنْ قُتِلْت و أنّما

قتلُوا بِك التّكْبير والتّهْليلا

হে নবী দৌহিত্র সিরিয়ায় আপনার রক্তাক্ত মাথা আনা হয়েছে। আপনাকে হত্যা করার অর্থই হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ (সা.)কে প্রকাশ্যে ও ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা। হে নবী দৌহিত্র , আপনাকে তৃষ্ণার্তাবস্থায় ওরা হত্যা করেছে এবং পবিত্র কোরআনের বিধান লংঘন করেছে। আপনাকে হত্যা করার সময় তারা তাকবীর-ধ্বনি দিয়েছেন। আসলে তারা আপনাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে তাকবীর ও তাহলীলেরই ধ্বংস সাধন করেছে। ”

একজন সিরিয়াবাসী বৃদ্ধের কাহিনী

বর্ণিত আছেঃ বন্দী নবী পরিবারকে যখন দামেশ্কের জামে মসজিদের দরজার সামনে জড় করা হল তখন তাদের (আ.) সামনে একজন বৃদ্ধ এসে বলল , মহান আল্লাহর সব প্রশংসা যিনি তোমাদেরকে হত্যা ও ধ্বংস করেছেন এবং তোমাদের পুরুষদেরকে হত্যা করে দেশের শহর ও জনপদসমূহকে নিরাপদ করেছেন। তিনি আমীরুল মুমেনীন ইয়াজিদকে তোমাদের উপর বিচয়ী করেছেন। ” ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) তখন ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে বললেন , তুমি কি এ আয়াতটা …

( قُلْ لا أسْألُكُمْ عليْهِ أجْرًا إِلّا الْمودّة فِي الْقُرْبى)

হে নবী বলে দিন একমাত্র আমার নিকটাত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া তোমাদের কাছে এ রিসালাতের(দাওয়াতের) দায়িত্ব পলন করার জন্য কোন প্রতিদানই প্রত্যাশা করি না। ” (সূরা আস-সূরা , আয়াত নং-২৩) পবিত্র কোরআনে পড়নি ? তখন বৃদ্ধ লোকটি বলল , হ্যাঁ পড়েছি। ” তখন ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বললেন , জেনে রাখ আমরাই মহানবীর নিকটাত্মীয়। আচ্ছা তুমি কি বনী ইসরাইলের এ আয়াটি

( وآتِ ذا الْقُرْبى حقّه)

(বনী ইসরাইল , আয়াত নং-২৬)

( নিকটাত্মীয়ের অধিকার। ” ) পড়নি ? ইমাম (আ.) বললেন , আমরাই মহানবীর নিকটাত্মীয় অর্থাৎذا الْقُرْبى (যাল-কুরবা) । ” তোমরা কি এ আয়াতটি

( واعْلمُوا أنّما غنِمْتُمْ مِنْ شيْءٍ فأنّ لِلّهِ خُمُسهُ ولِلرّسُولِ ولِذِي الْقُرْبى)

আর জেনে রাখো যখন তোমরা কোন জিনিস গণীমত লাভ করবে তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ , তার রাসূল ও নিকটাত্মীয়দের জন্য … । (সূরা আনফাল , আয়াত নং-৪১) বৃদ্ধ লোকটি বলল , হ্যাঁ , আমি পড়েছি। ” তখন ইমাম বললেন , আমরাই যাল কুরবা অর্থাৎ নিকটাত্মীয়। ” আচ্ছা তুমি কি কোরআনের এ আয়াতটি

( إِنّما يُرِيدُ اللّهُ لِيُذْهِب عنْكُمُ الرِّجْس أهْل الْبيْتِ ويُطهِّركُمْ تطْهِيرًا)

“ হে নবীর আহলে বাইত নিশ্চয় মহান আল্লাহ তোমাদেরকে সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান। ’ (সূরা আহযাব , আয়াত নং-৩৩) পড়নি ? বৃদ্ধলোকটি বলল হ্যাঁ , পড়েছি। ” ইমাম (আ.) বললেন , আমরাই মহানবীর আহলে বাইত। মহান আল্লাহ আমাদের শানেই এ আয়াতটি নাযিল করেছেন। ” বৃদ্ধলোকটি ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) এর এ কথাগুলো শুনে নির্বাক হযে গেল এবং যে সব কথা সে কিছুক্ষন আগে বলেছিল সে জন্য সে অনুতপ্ত হয়ে বলল , খোদার শপথ , কোরআনের এ আয়াতগুলো কি তোমাদের শানেই নাযিল হয়েছে ? তখন ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বললেন , মহান আল্লাহ ও আমার দাদা মহানবীর (সা.) কসম , এ আয়াতগুলো আমাদের শানেই অবতীর্ণ হয়েছে। ” ঐ বৃদ্ধলোকটি এ কথা শুনে কেদে ফেলল এবং মাথা থেকে পাগড়ী খুলে মাটিতে ফেলে দিল এবং আকাশের দিকে মাথা তুলে প্রার্থনা করল , হে খোদা , আমি মহানবীর (সা.) বংশধরদের মনুষ্য ও জ্বীন শত্রুদের থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। ” এরপর সে ইমাম (আ.) কে বলল , আমার তওবা কি কবুল হবে ? ইমাম (আ.) তাকে বললেন , হ্যাঁ , যদি তুমি তওবা কর তাহলে মহান আল্লাহ তোমার তওবা কবুল করবেন। তুমি তো আমাদের সাথেই আছ। ” তখন বৃদ্ধ লোকটি বলল , আমি তওবা করলাম। ” ইয়াজিদ যখন বৃদ্ধলোকটির এ কাহিনীটি শুনল তখন তাকে কতল করার আদেশ দিল এবং তাকে হত্যা করা হল।

ইয়াজিদের সভায় বন্দী আহলে বাইতের প্রবেশ

এরপর মহানবীর (সা.) বন্দী পরিবার-পরিজনকে দড়িতে বেধে ইয়াজিদের দরবারে আনা হয় । ঠিক এ সময় ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বললেন,

( أنْشِدُك اللّهُ يا يزيدُ، ما ظنُّك بِرسُولِ اللّهِ ص لوْ رآنا على هذِهِالصِّفةِ)

হে ইয়াজিদ, তোমাকে, খোদর নামে শপথ করে বলছি, মহানবী (সা.) সম্পর্কে তুমি কেমন ধারণা পোষণ কর, যদি তিনি আমাদেরকে এ অবস্থায় দেখতে পেতেন?” ইয়াজিদের নির্দেশে বন্দী নবী-পরিবারকে যে সব রশি দিয়ে বধা হয়েছিল সেগুলো কেটে ফেলা হল। তারপর ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র মাথা ইয়াজিদের সামনে রাখা হয় এবং নবী-পরিবারের মহিলাদেরকে ইয়াজিদের পিছনে দাড় করানো হয় যাতে করে তারা ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র মাথা দেখতে না পান। কিন্তু ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) এ দৃশ্য দেখে ফেললেন। হযরত যয়নাবের (আ.) দৃষ্টি ইমাম হোসাইনের (আ.) এ দৃশ্য দেখে ফেললেন। হযরত যয়নবের (আ.) দৃষ্টি ইমাম হোসাইনের (আ.) কর্তিত মাথার দিকে পড়ামাত্রই দুই গ্রীবাদেশে হাত রেখে অতি করুণ স্বরে বলে উঠলেন, “ ওয়া হেসাইনাহ (হায় হোসাইন), হায় রাসুলুল্লাহর (সা.) দৌহিত্র, হায় পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদীনার সন্তান, হায় ফাতেমা যাহরার সন্তান, হায় মুস্তাফার (সা.) দৌহিত্র। বর্ণনাকারী বলেনঃ হযরত যয়নব (আ.) উক্ত সভায় যারাই উপস্থিত ছিল তাদের সবাইকে কাদালেন। এর এ সময় পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ (তার উপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক) চুপ করে ছিল। এ সময় বনী হাশিমের যে মহিলাটি ইয়াজিদের গৃহে বাস করত সে ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্য শোক প্রকাশ করতে লাগল এবং উচ্চস্বরে বলতে লাগল, “ ইয়া হাবীবাহ (হায় প্রিয় হোসাইন), হায় আহলে বাইতের নেতা, হায় হযরত মুহাম্মদের (সা.) দৌহিত্র, হায় অনাথদের আশ্রয় ও ভরসাস্থল, হায় খোদার শত্রুদের হাতে নিহত শহীদ। যারাই তার ফরিয়াদ শুনতে পেল তারাই কাদতে লাগল। এরপর ইয়াজিদ খায়যুরান কাঠের নির্মিত একটি লাঠি আনার আদেশ দিল এবং সেই লাঠি দিয়ে সে ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র দাঁত ও ঠোটে আঘাত করতে লাগল। আবু বারযা আসলামী ইয়াজিদকে লক্ষ্য করে বললেন, “ ইয়াজিদ তোমার জন্য আক্ষেপ, তুমি লাঠি দিয়ে হযরত ফাতেমার (আ.) পুত্র হোসাইনের (আ.) মুখে আঘাত করছ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি মহানবীকে (সা.) হাসান ও হোসাইনের গালে চুম্বন করতে দেখেছি এবং তিনি (সা.) বলতেনঃ

أنْتُما سيِّدا شبابِ أهْلِ الْجنّة

তোমরা দু ভাই বেহেশতের যুবকদের নেতা। তোমাদের হত্যাকারীদেরকে আল্লাহ হত্যা করবেন ও অভিশাপ দিন এবং তোদেরকে নিকৃষ্ট বাসস্থান জাহান্নামে প্রবেশ করান। ইয়াজিদ এ কথা শুনে অত্যন্ত ক্ষেপে গেল। পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের নির্দেশে আবু বারযাহকে টেনে হিচড়ে দরবার থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনার পর ইয়াজিদ ইবনে যে বারীর কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল,

ليْت أشْياخى بِبدرٍ شهِدُوا

جزع الْخزْرجِ مِنْ وقْعِ الاسلْ

فأهلُّوا وسْتهلُّوا فرحا

أ ثُمّ قالُوا: يا يزيدُ لا تُشلْ

قدْ قتلْنا الْقوْم مِنْ ساداتِهِمْ

و عدلْناهُ بِبدرٍ فاعْتدلْ

لعِبتْ هاشِمُ بِالْمُلْكِ فلا

خبر جأ و لا وحْيٌ نزلْ

لسْتُ مِنْ خِنْدِف انْ لمْ أنْتقِمْ

مِن بنى أحْمد ما كان فعلْ

হায় আমার পূর্ব পুরুষেরা যারা বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছে তারা যদি আজ দেখতে পেত যে খাযরাজ গোত্র আমাদের তরবারীর আঘাতে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে কাদছে তখন তারা অত্যন্ত আনন্দিত ও উল্লাসি হত এবং বলত সাবাস হে ইয়াজিদ , তোমার শক্তি অটুট থাকুক। আমরা হাশেমী গোত্র প্রধানদেরকে হত্যা করেছি এবং তাদের থেকে বদরের যুদ্ধের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছি। আমি যদি আহমদের কৃতকার্যের জন্য তারই বংশধরদের উপর প্রতিশোধই গ্রহণ না করি তাহলে আমি কি করে খিন্দিকের বংশধর হব ?

(ইবনে যে বারী কোরাইশ বংশীয় কাফির ছিল। তার আসল নাম আবদুল লাত। ইসরাম ধর্ম গ্রহণ করার পর মহানবী (সা.) তার নাম আব্দুল্লাহ রেখেছিলেন। ইবনে যে বারী এ কবিতাটি উহুদের যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিল। নাসেখ ’ গ্রন্থের রচয়িতা বলেন , প্রথম ও দ্বিতীয় কবিতা ইবনে যে বারীর রচিত। আর বাদ বাকী কবিতাসমূহ ইয়াজিদ কর্তৃক রচিত।)

হযরত যয়নাব (সা.আ.) এর ভাষণ

فقامتْ زيْنبُ ابْنةُ علِي و قالتْ :

ألْحمْدُ لِلّهِ ربِّ الْعالمين. و صلّى اللّهُ على مُحمّدٍ و آلِهِ أجْمعين، صدق اللّهُ كذلِك يقُولُ: ثُمّ كان عاقِبةُ الّذِين أساؤُا السُّواى أنْ كذّبُوا بِآياتِ اللّهِ و كانُوا بِها يسْتهْزِؤُن. أظننْت يا يزيدُ - حيْثُ أخذْت عليْنا أقْطار الارْضِ و آفاق السّمأ فأصْبحْنا نُساقُ كما تُساقُ الامأ - أنّ بِنا على اللّهِ هوانا، و بِك عليْهِ كرامةً!! و أنّ ذلِك لِعظيم خطرِك عِنْدهُ!! فشمخْت بِأنْفِك و نظرْت فى عطْفِك، جذْلان مسْرورا، حين رأيْت الدُّنْيا لك مُسْتوْسِقةً، والامُور مُتّسِقةً، و حين صفا لك مُلْكُنا و سُلْطانُنا، فمهْلا مهْلا، أنسيت قوْل اللّهِ عزّ و جلّ: و لا يحْسبنّ الّذِين كفرُوا أنّما نُمْلِى لهُمْ خيْرٌ لِأنْفُسِهِمْ إِنّما نُمْلِى لهُمْ لِيزْدادُوا إِثْما و لهُمْ عذابٌ مُهِينٌ. أمِن الْعدْلِ يابْن الطُّلقأ تخْديرُك حرائِرك و امائك و سُوقك بناتِ رسُولِ اللّهِ سبايا؟! قدْ هتكْت سُتُورهُنّ، و أبْديْت وُجُوههُنّ، تحْدو بِهِنّ الاعْدأ مِنْ بلدٍ الى بلدٍ، و يسْتشْرِفُهُنّ أهْلُ الْمنازِلِ و الْمناقِلِ، و يتصفّحُ وُجُوههُنّ الْقريبُ والْبعيدُ، والدّنِيُّ والشّريفُ، ليْس معهُنّ مِنْ رِجالِهِنّ ولِىُّ، و لا مِنْ حماتِهِنّ حمِيُّ. و كيْف تُرْتجى مُراقبةُ منْ لفظ فُوهُ أكْباد الازْكِيأ، و نبت لحْمُهُ بِدِمأ الشُّهدأ؟! و كيْف لا يسْتبْطأ فى بُغْضِنا أهْل الْبيْتِ منْ نظر اليْنا بِالشّنفِ والشّنآنِ و الاحنِ والاضْغانِ؟! ثُمّ تقُولُ غيْر مُتأثِّمٍ و لا مسْتعْظِمٍ :

لاهلُّوا وسْتهلُّوا فرحا

ثُمّ قالُوا: يا يزيدُ لا تُشلْ

مُنْتحِيا على ثنايا أبى عبْدِ اللّهِ سيِّدِ شبابِ أهْلِ الْجنّةِ تنْكُتُها بِمِحْصرتِك. و كيْف لا تقُولُ ذلِك، و قدْ نك أت الْقرْحة، واسْت أصلْت الشّافة بِاراقتِك دِم أ ذُرِّيّةِ مُحمّدٍ ص و نُجُومِ الارْضِ مِنْ آلِ عبْدِالْمُطّلِبِ؟! و تهْتِفُ بِ أشْياخِك، زعمْت أنّك تُناديهِمْ! فلترِدنّ وشيكا موْرِدهُمْ، و لتودّنّ أنّك شُلِلْت و بُكِمْت و لمْ تكُنْ قُلْت ما قُلْت و فعلْت ما فعلْت. أللّهُمّ خُذْ بِحقِّنا، وانْتقِمْ مِمّنْ ظلمْنا، و احْلُلْ غضبك بِمنْ سفك دمائِنا و قتل حُماتنا. فواللّهِ ما فريْت الا جِلْدك، و لا حززْت الاّ لحْمكْ. و لترِدنّ على رسُولِ اللّهِ ص بِما تحمّلْت مِنْ سفْكِ دِم أ ذُرِّيّتِهِ، وانْتهكْت مِنْ حُرْمتِهِ فى عِتْرتِهِ و لُحْمتِهِ، و حيْثُ يجْمعُ اللّهُ شمْلهُمْ ويلُمُّ شعْثهُمْ و ي أخُذُ بِحقِّهِمْ: و لا تحْسبنّ الّذين قُتِلُوا فى سبِيلِ اللّهِ أمْواتا بلْ أحْيأُ عِنْد ربِّهِمْ يُرِزقُون. و حسْبُك بِاللّهِ حاكِما، و بِمُحمّدٍ ص خصيما و بِجبْرئيل ظهيرا. و سيعْلمُ منْ سوّل لك و مكّنك مِنْ رِقابِ الْمُسْلِمين. بِئْس لِلظّالِمين بدلا و أيُّكُمُ شرُّ مكانا و أضْعفُ جُنْدا. و لئِنْ جرّتْ علىّ الدّواهى مُخاطبتك، أنّى لاسْتصْغِرُ قدْرك، و أسْتعْظِمُ تقْريعك، و أسْتكْثِرُ توْبيخك، لكِنِ الْعُيُونُ عُبْرى ، والصُّدُورُ حرّى ألا فالْعجبُ كُلُّ الْعجبِ لِقتْلِ حِزْبِ اللّهِ النُّجب أ بِحِزْبِ الشّيْطانِ الطُّلق أ. فهذِهِ الايْدى تنْطِفُ مِنْ دِمائِنا، و الافْواهُ تتحلّبُ مِنْ لُحُومِنا. و تِلْك الْجُثثُ الطّواهِرُ الزّواكى تنْتابُها الْعواسِلُ و تعْفِرُها أُمّهاتُ الْفراعِلِ

و لئِنِ اتّخذْتنا مغْنما لِتجِدُنا وشيكا مُغْرما، حين لا تجِدُ الاّ ما قدّمتْ يداك، و ما ربُّك بِظلاّمٍ لِلْعبيدِ. فالى اللّهِ الْمُشْتكى ، و عليْهِ الْمُعوّلُ. فكِدْ كيْدك، واسْع سعْيك، و ناصِبْ جهْدكْ، فو اللّهِ لا تمْحُونّ ذِكْرنا، و لا تُميتُ وحْينا، و لا تُدْرِكُ أمدنا، و لا ترْحضُ عنْك عارها. و هلْ ر أيُك الاّ فندا، و أيّامُك الاّ عددا، و جمْعُك الاّ بددا، يوْم يُنادِى الْمُنادِ :

ألاّ لعْنةُ اللّهِ على الظّالِمين

فالْحمْدُ لِلّهِ الّذى ختم لاوّلِنا بِالسّعادةِ والْمغْفِرةِ، و لاخِرِنا بِالشّهادةِ والرّحْمةِ

و نسْ ألُ اللّه أنْ يُكْمِل لهُمُ الثّواب، و يُوجِب لهُمْ الْمزيد، و يُحْسِن عليْنا الْخِلافة، انّهُ رحيمُ ودُودُ، و حسْبُنا اللّهُ و نِعم الْوكيل

হযরত যয়নাব (আ.) দাড়িয়ে বললেন, “ সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি এ নিখিল বিশ্বের প্রভু। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার বংশরদের সকলের উপর মহান আল্লাহর দরুদ ও সালাম। মহান আল্লাহ সত্য বলেছেন, “ যারা মন্দ কাজ এবং অপরাধ করেছে তাদের পরিণাম হচ্ছে এটাই যে তারা মহান আল্লাহর নিদর্শনসমূহ অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং সেগুলো উপহাস ও ঠাট্টার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। হে ইয়াজিদ, যেহেতু এ প্রশস্ত পৃথিবী ও আকাশকে আমাদের জন্য সংকীর্ণ করে দিয়েছিস। আমাদেরকে যুদ্ধ বন্দীদের মত এক শহর থেকে অন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছিস এতে করে তুই ভাবাছিস যে আল্লাহর কাছে আমরা অপদস্থ ও লাঞ্ছিত হয়েছি এবং খোদার কাছে তোর মর্যাদা বেড়ে গেছে? এ কারণেই কি তুই এত গর্ব করছিস? তোর পার্থিব জীবন নিরাপদ ও তোর সাম্রাজ্য এবং রাজত্ব সুদৃঢ় হয়েছে মনে করে তুই আজ উল্লসিত ও আনন্দে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিস? এত তাড়াহুড়া করিস নে। তুই কি মহান আল্লাহর বাণী যারা কুফরী করেছে তারা যেন অবশ্যই মনে না করে যে কয়দিনের সুযোগ তাদেরকে দেয়া হয়েছে তা তাদের সৌভাগ্যের সূচনা করেছে । না, আসলে ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। বরং এ সুযোগ তাদের পাপ ও অপরাধকে আরো বাড়িয়ে দেবে। এ কারণে তাদের জন্য পরকালে ভয়ঙ্কর শাস্তি রয়েছে। - ভুলে গিয়েছিস? হে তুলাকাদের সন্তান নিজের স্ত্রী, দাসী ও মহিলাদেরকে পর্দাবৃত করে রেখেছিস আর মহানবীর (সা.) কন্যাদেরকে মুখমণ্ডল খোলাবস্থায় এবং অনাবৃত করে শত্রুদের সাথে এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরাচ্ছিস অথচ তাদেরকে এ ঘোর দুর্দিনে সহায়তা করতে পারে এমন লোকেরা কেউ বেচে নেই- এটা কি ন্যায় বিচার ও ন্যায়পরায়ণতার নমুনা? যে ব্যক্তি মুক্তমনা মহামানবদের কলিজা দাত দিয়ে কামড়ায় এবং শহীদদের রক্তে যার অস্থি ও মাংসপিণ্ড হয়েছে তার কাছে কি দয়া ও মায়ার আশা করা সম্ভব?!! যে আমাদের সাথে সবসময় শত্রুতা পোষণ করে সে কেন আমাদের সাথে শত্রুতা করা থেকে বিরত থাকবে? আদৌ এটা কি সম্ভব? এখন যে ব্যক্তি শক্তি ও মদমত্ততায় নিমগ্ন সে কিভাবে নিজের পাপ ও অপরাধের কথা ভাববে? ক্ষমতার দর্পে ও অহংকারে নেশাগ্রস্থ হয়ে তুই এখন লাঠি দিয়ে বেহেশতের যুবকদের নেতা হোসাইন (আ.) এর দাতে আঘাত করছিস আর প্রকাশ্যে আবৃত্তি করছিসঃ

ف أهلُّوا وسْتهلُّوا فرحا

ثُمّ قالُوا: يا يزيدُ لا تُشلْ

আর তোর পক্ষে এ ধরনের উক্তি আর এ ধরনের কবিতা আবৃত্তি করা শোভা পায়। কারণ তোর হাত মহানবীর (সা.) বংশধরদের রক্তে রঞ্জিত। মর্তের উজ্জ্বল নক্ষত্রদেরকে যারা আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর ছিলেন তুই তাদেরকে ধ্বংস করেছিস। আর এ কাজ করে আসলে তুই নিজের মৃত্যু ও দুর্ভাগ্য ডেকে এনেছিস। এখন তুই তোর মৃত পূর্ব পুরুষদেরকে ডাকছিস আর ভাবছিস যে তারা তোর কথা শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু তুই জেনে রাখিস অচিরেই তুইও তাদের সাথে মিলিত হবে। আর তখনই তুই বুঝতে পারবি এবং আশা করবি হায় আমার দু হাত যদি অক্ষম হত এবং আমি যদি বোবা হতাম। আর যে জঘন্য কথা বলেছি তা যদি না বলতাম। যে অন্যায় করেছি তা যদি না করতাম। এখানে হযরত যয়নাব অভিশাপ দিয়ে বললেনঃ হে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সাথে যারা অত্যাচার করেছে তাদের উপর তুমি প্রতিশোধ গ্রহণ কর। তাদের কাছ থেকে আমাদের হক যা তারা আামদের থেকে কেড়ে নিয়েছে তা উদ্ধার কর এবং তাদেরকে দোযখের আগুনে দগ্ধ কর।

এরপর তিনি ইয়াজিদকে লক্ষ্য করে বললেন, “ হে ইয়াজিদ এ গর্হিত কাজ করে তুই নিজের চামড়া নিজেই তুলে ফেলেছিস এর নিজের দেহকে খণ্ডিত খণ্ডিত করেছিস (নবী বংশকে হত্যা করে তুই আসলে নিজেকেই বধ করেছিস) । আর অচিরেই তুই মহানবীর (সা.) বংশধরদেরকে হত্যা ও অপদস্থ করে পাপের যে মহাভারী বোঝা ঘাড়ে বহন করেছিস তা নিয়ে মহানবীর সামনে উপস্থিত হবি। সেদিন আল্লাহ মহানবীর (সা.) বংশধরদেরকে (যাদের তুই হত্যা করেছিস) একত্রিত করে তাদের হৃত অধিকার আদায় করবেন এবং প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। তুই ভাবিস না যে, যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তারা মৃত ,

( ولا تحْسبنّ الّذِين قُتِلُوا فِي سبِيلِ اللّهِ أمْواتًا بلْ أحْي أ عِنْد ربِّهِمْ يُرْزقُون)

যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত মনে করনা বরং তারা জীবিত ও মহান আল্লাহর কর্তৃক রিযিকপ্রাপ্ত। (সূরা আলে ইমরান , আয়াত নং -১৬৯ ) আর ঐ দিন মহান আল্লাহ বিচার করবেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) তোর সাথে বিবাদ করবেন এবং আল্লাহর ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) তাকে (সা.) সাহায্য করবেন। যে সব লোক তোকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তারা অচিরেই বুঝতে পারবে যে কত মন্দ, নিকৃষ্ট ও অত্যাচারীকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল। আর তোদের মধ্য থেকে কোন ব্যক্তি যে সবচে হতভাগা তাও তারা জানতে পারবে। সময়ের চাপে পড়ে আমাকে যদিও তোর সাথে কথা বলতে হচ্ছে তারপরও আমি তোকে তুচ্ছ বলেই মনে করি এবং আমি জানি যে তোকে তিরস্কার করা আসলে পছন্দনীয় কাজ। হায় ! নয়নগুলো থেকে অশ্রু ঝরছে আর বক্ষগুলো দুঃখের আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। আহ এটা ভাবতে কত অবাক লাগছে যে , আল্লাহর সৈন্যরা শয়তানের সৈন্যদের হাতে নিহত হচ্ছে। আমাদের রক্ত এদের হাত দিয়ে ঝরছে এবং বধ্যভূমিতে আজ শৃগাল-নেকড়ের খাদ্যে পরিণত হয়েছে!! বুনো পশুগুলো ঐসব পবিত্র মৃতদেহগুলোকে মাটির সাথে পদদলিত করেছে। হে ইয়াজিদ আজ আমাদেরকে বাহ্যত পরাজিত করে আমাদেরকে গনীমতের সম্পদ বলে মনে করছিস। তাহলে জেনে রাখ অচিরেই তোকে একাজের পরিণাম ভোগ করতে হবে। আর যা তুই পরকালের জন্য অগ্রিম পঠিয়েছিস কেবল সেটুকু ছাড়া আর কিছুই তোর থাকবে না। মহান আল্লাহ বান্দাদের প্রতি জুলুম করেন না। আমরা কেবল তারই সমীপে আমাদের অভিযোগ উত্থাপন করব এবং তিনিই আমাদের আশ্রয়স্থল। হে ইয়াজিদ, তুই তোর ঘৃণ্য অপতৎপরতায় ব্যস্ত থাক এবং সব ধরনের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা করে যা। তারপর খোদার কসম করে বলছি, তুই আমাদের নাম কখনো মুছে ফেলতে পরবি না। আমাদের রসূলের ওহীকে স্তব্ধ ও ধ্বংস করতে পারবি না এবং তোর নিজের পাপ থেকেও রেহাই পাবি না। কারণ তোর বিবেক বুদ্ধি বিকারগ্রস্থ। তোর আয়ুষ্কালও সীমিত। তোর সংগী-সাথীরা অবশ্যই ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে। যেদিন আহ্বানকারী যখন বলতে থাকবে, “ খোদার অভিশাপ অত্যাচারীদের উপর বর্ষিত হোক। ঐ আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি আমাদের ভাগ্যকে সৌভাগ্য ও ক্ষমার দ্বারা আরম্ভ করেছেন এবং তা শাহাদাত ও রহমত প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে সমাপ্ত করেছেন।

আমারা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি যেন তিনি আমাদের শহীদদের উপর তার নেয়ামতসমূহ পূর্ণ করে দেন এবং তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দান করেন এবং আমাদেরকে তাদের যোগ্য উত্তরসূরি করে দেন। কারণ তিনিই পরম দাতা ও দয়ালু। মহান আল্লাহই আমাদের সর্বোত্তম আশ্রয়স্থল। ইয়াজিদ হযরত যয়নাবের এ ভাষণ শোনার পর বলল,

يا صيْحةً تُحْمدُ مِنْ صوائِحِ

ما أهْون الْموْت على النّوائِحِ

বিলাপকারিণীদের বিলাপ ও কান্নার ধ্বনি কত পছন্দনীয়!! শোকগ্রস্থ বিলাপকারিণী মহিলাদের জন্য মৃত্যুবরণ করা কত সহজ!! এরপরই ইয়াজিদ সিরীয় নেতাদের সাথে বন্দী আহলে বাইতের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে সে ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করল। তারা আহলে বাইতকে হত্যা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করল। তবে নু মান বিন বাশীর এ সময় বলল, “ আমাদেরকে দেখতে হবে যে মহানবী (সা.) বন্দীদের সাথে কেমন আচরণ করেছেন। তিনি (সা.) যে রকম আচরণ করে থাকবেন ঠিক সেরকমই তোমাকে করতে হবে।

ইয়াজিদের রাজদরবারে একজন সিরীয় লোকের কাহিনী

এ সময় একজন সিরিয়াবাসী হযরত ফাতেমা বিনতে হোসাইনের দিকে তাকিয়ে বলল , আমীরুল মুমেনীন , আমাকে এ দাসীটি দিন। ” ফাতেমা ফুফী হযরত যয়নাবকে বললেন , ফুফী , এতিম হওয়ার পর আমাকে দাসী হিসেবে নিতে চাইছে। ” হযরত যয়নাব (আ.) তখন বললেন , না এ ফাসেক কখনোই এ ধরনের কাজ করতে পারবে না। ” তখন ঐ সিরীয় লোকটি ইয়াজিদকে জিজ্ঞেস করল , এ মেয়েটি কে ? ইয়াজিদ বলল , এ মেয়েটি হোসাইনের কন্যা ফাতেমা এবং ঐ মহিলাটি হযরত আলীর কন্যা যয়নাব। তখন সিরীয় লোকটি বলল , হে ইয়াজিদ তোর উপর খোদার লানত। তুই মহানবীর বংশধরদেরকে হত্যা করেছিস এবং তার (সা.) আহলে বাইতকে বন্দী করেছিস। খোদার কসম , আমি মনে করেছিলাম যে , এরা রোমের যুদ্ধবন্দী। ইয়াজিদ একথা শুনে ঐ সিরীয় লোকটিকে বলল , খোদার শপথ , তোকেও ওদের অন্তর্ভুক্ত করব। ” এরপর ইয়াজিদের নির্দেশে ঐ সিরীয় লোকটিকে হত্যা করা হয়।

বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিতঃ ইয়াজিদ এক বক্তাকে ডেকে পাঠিয়ে তাকে মিম্বার দাড়িয়ে ইমাম হোসাইন (আ.) ও হযরত আলী (আ.) কে গালি দিয়ে বক্তৃতা করতে বলে । ঐ বক্তাটি মিম্বরে উঠে হযরত আলী (আ.) ও ইমাম হোসাইন (আ.) এর বিরুদ্ধে কটুক্তি এবং মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের উচ্ছসিত প্রশংসা করে । ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) প্রতিবাদ করে বললেন ,

ويْلك أيُّها الْخاطِبُ، اشْتريْت مرْضاة الْمخْلُوقِ بِسخطِ الْخالِقِ

“ হে বক্তা , তোমার জন্য আক্ষেপ , তুমি স্রষ্টার অসন্তুষ্টির বদলে এক নগণ্য সৃষ্ট জীবের সন্তুষ্টি খরিদ করছ। অতঃপর তুমি এ কাজের মাধ্যমে নিজের বাসস্থান জাহান্নামের আগুনেই নির্ধারণ করে নিয়েছ।

ইবনে সিনান খাফফাজী কত সুন্দর ভাষায় শেরে খোদা হযরত আলী (আ.) এর প্রশংসা করেছেনঃ

أعلى الْمنابِرِ تُعْلِنُون بِسبِّهِ

و بِسيْفِهِ نُصِبتْ لكُمْ أعْوادُها

তোমারা মিম্বারে আরোহণ করে আমীরুল মুমেনীন হযরত আলীকে (আ.) গালি দিচ্ছো ? অথচ মিম্বরসমূহ তারই তরবারীর বদৌলতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (হযরত আলী অমিত বীরত্ব সহকারে মহানবীর পাশে দাড়িয়ে কাফির-মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং তাদেরকে পরাস্ত করেছেন। তার ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে ইসলামের বিজয় অর্জিত হয়েছে। মসজিদসমূহ আবাদ হয়েছে। আর এখন তোমরা তারই বিরুদ্ধে কথা বলছো , তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করছো) ।

ওই দিনই ইয়াজিদ ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)-এর কাছে তার তিনটি আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করল। এরপর ইয়াজিদের নির্দেশে আহলে বাইতকে এমন এক গৃহে অন্তরীণ করে রাখা হয় যেখানে তারা শীত ও তাপে কষ্ট পেতে থাকেন। সেখানে তাদের অবস্থান করার ফলে তাদের বদনমণ্ডল ফেটে গিয়েছির। তারা যত দিনই দামেশকে ছিলেন ততদিন ইমাম হোসাইন (আ.) এর জন্য শোক ও আহাযারী করেছিলেন।

হযরত সাকীনার (আ.) স্বপ্ন

হযরত সাকীনা (আ.) থেকে বর্ণিতঃ দামেশকে চারদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমি আকটি স্বপ্ন দেখি। অতঃপর তিনি দীর্ঘ স্বপ্নটি বর্ণনা করলেন এবং শেষে বললেন , স্বপ্নে দেখলাম একজন মহিলা হাওদায় মাথায় হাত রেখে বসে আছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম , মহিলাটি কে/ তখন আমাকে বলা হল , ইনি হযরত মুহাম্মদের (সা.) কন্যা ফাতেমা এবং তোমার পিতামহী। ” আমি একথা শুনে বললাম , খোদার শপথ , আমি তার কাছে যাব এবং আমাদের প্রতি যে অন্যায় ও অত্যাচার করা হয়েছে তা তাকে আমি জানাব। ” অতঃপর আমি দ্রুত তার কাছে গেলাম এবং তার সামনে দাড়ালাম এবং তাকে কেদে বললাম ,

يا أُمّتاهُ جحدُوا و اللّهِ حقِّنا، يا أُمّاهُ بدّدُوا و اللّهِ شمْلنا، يا أُمّتاهُ اسْتباحُوا و اللّهِ حريمنا، يا أُمّتاهُ قتلُوا و اللّهِ الْحُسيْن أبانا

পরিবারকে ধ্বংস করা হয়েছে আমাদের মান-সম্ভমের উপর আঘাত হানা হয়েছে , আমাদের পিতা হোসাইনকে (আ.) হত্যা করা হয়েছে। ” আমার একথা শুনে তিনি (সা.) বললেন , সাকীনা আর বলিসনে দাদু। তোর কথা শুনে আমার হৃদপিণ্ডের ধমনী ছিড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। এ জামাটি তোমার পিতা হোসাইনের। আমি এ জামাটি নিয়ে কাল কিয়ামত দিবসে খোদার দরবারে ফরিয়াদ করব। ” ইবনে লাহীয়াহ , আবুল আসওয়াদ মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণনা করেছেন , রাসূল জালুত(এক ইয়াহুদীর নাম) আমাকে দেখে বলল , খোদার শপথ আমি হযরত দাউদের (আ.) ৭০তম অধঃস্তন পুরুষ। ইহুদীরা আমাকে দেখলেই অত্যন্ত সম্মান করে। আর তোমরা মুসলমারা তোমাদের নবী (সা.) ও তার দৌহিত্রের মধ্যে কেলমাত্র এক পুরুষের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার (সা.) বংশধরদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করেছ । ”

রোম সম্রাটের দূতের কাহিনী

ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) থেকে বর্ণিতঃ ইমাম হোসাইনের (আ.) পবত্রি মস্তক পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের সামনে আনা হলে সব সময় সে মদপানের আসর বসাত এবং ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র মস্তক ইয়াজিদের সামনে রাখা হত। কোন একদিন রোম সম্রাটের দূত ইয়াজিদের উক্ত আসরে আসল এবং বলল , আরব জাহানের সম্রাট , এ মাথাটি কার ? ইয়াজিদ বলল , এ ব্যাপারে তুমি কেন মাথা ঘামাচ্ছ ? দূত বলল , আমি যখন রোম সম্রাটের কাছে উপস্থিত হব তখন আপনার সাম্রাজ্যে আমি যা দেখেছি সে সম্পর্কে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করবেন। আর আমি এ মস্তক এবং যার এ মস্তক তার সম্পর্কেও সম্রাটকে জানানোর ইচ্ছা করছি যাতে করে তিনিও (সম্রাট) আপনার সাথে আপনার এ বিজয় ও আনন্দে শরীক হতে পারেন। ” ইয়াজিদ তখন দূতকে বলল , এ মাথা হোসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিবের। দূত জিজ্ঞেস করল , ইনার মা কে ? তখন ইয়াজিদ বলল , হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কন্যা হযরত ফাতেমা (আ.) । তখন রোমান সম্রাটের দূত বলল , আপনার ও আপনার ধর্মের জন্য আক্ষেপ , আমার ধর্ম আপনার ধর্মাপেক্ষা উত্তম। কারণ আমার পিতা হযরত দাউদের (আ.) বংশধর। আমার বাবা ও তার (আ.) মাঝে অনেক পুরুষের ব্যবধান হওয়া সত্ত্বেও খ্রীষ্টানরা আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে এবং তারা আমার পায়ের মাটি তাবাররুক হিসেবে নিয়ে যায়। কিন্তু আপনারা আপনাদের নবীর দৌহিত্রকে হত্যা করেছেন। অতচ তার ও নবীর (সা.) মাঝে কেবলমাত্র এক পুরুষের ব্যবধান । কেমন আপনাদের ধর্ম ? এরপর সে ইয়াজিদকে বলল , আপনি হাফেরবা খুরের গির্জার কথা শুনেছেন ? ইয়াজিদ বলল , আচ্ছা বল তো দেখি। ” ঐ খ্রীষ্টান দূতটি বলল , ওমান ও চীনের মাঝে এমন এক সাগর রয়েছে যা অতিক্রম করতে এক বছর লাগে। আর ঐ সমুদ্রের কেন্দ্রস্থলে একটি মাত্র শহর ছাড়া আর কোন জনবসতি সেখানে নেই। ঐ শহরের আয়তন ৮০ বর্গ ফারসাং। ঐ শহরটির মত অতবড় শহর পৃথিবীতে আর নেই। ওখান থেকে ইয়াকুত পাথর এবং কর্পূর অন্যান্য দেশে রপ্তানী করা হয় এবং উদ ও আম্বর হচ্ছে সেখানকার প্রধান উদ্ভিদ । এ শহর খ্রীষ্টানদের নিয়ন্ত্রণে এবং খ্রীষ্টান সম্রাট ছাড়া সেখানে আর কারো শাসন কর্তৃত্ব চলে না। সেখানে অনেক গীর্জা আছে। ঐ গীর্জার মেহরাবে একটি স্বর্ণ নির্মিত হুক্কা রয়েছে এবং তাতে একটি খুর রয়েছে। এ ব্যাপারে জনশ্রুতি রয়েছে যে , উক্ত খুরটি যে গাধার পিঠে হযরত ঈসা (আ.) চড়তেন সে গাধাটির। ঐ হুক্কার চারপাশে রেশমী কাপড় দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। প্রতি বছর দূর দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্ত খ্রীষ্টান ঐ গীর্জা যিয়ারত করতে আসে। তারা ঐ হুক্কার চারপাশে প্রদক্ষিণ করে এবং ওটিতে চুমো দেয়। সেখানে তারা মহান আল্লাহর কাছে মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করে। খ্রীষ্টান-নাসারারা এ ধরনের আচরণ করে আর ঐ খুর সম্পর্কে তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে যে , এটা ঐ গাধার খুর যার উপর হযরত ঈসা (আ.) সওয়ার হতেন। আর তোমরা মুসলমানেরা নিজেদের নবীর দৌহিত্রকে হত্যা কর।

فلا بارك اللّهُ فيكُمْ و لا فى دينِكُمْ

মহান আল্লাহ তোমাদেরকে কখনো যেন মঙ্গল না দেন। ইয়াজিদ তখন ক্রুদ্ধ হয়ে বলল , এ খ্রীষ্টানটিকে হত্যা কর ; এ কিনা আমাকেই আমার সাম্রাজ্যের মধ্যে অপদস্ত করেছে। এর স্পর্ধা তো কম নয়। ” ঐ খ্রীষ্টানটি যখন বুঝতে পারল যে , তাকে হত্যা করা হবে তখন সে ইয়াজিদকে বলল , আমাকে আপনি কি হত্যা করবেন ? ইয়াজিদ বলল , অবশ্যই ” । তখন ঐ খ্রীষ্টানটি ইয়াজিদকে বলল , তাহলে আপনি জেনে রাখুন যে , গতরাতে আমি আপনাদের নবীকে (সা.) স্বপ্নে দেখেছি। তিনি আমাকে বলছিলেন , হে খ্রীষ্ট যুবক , তুমি বেহেশতী হবে। ” এ ধরনের সুসংবাদে আমর বিস্ময়ের সীমা ছিল না এবং আমি অত্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি এখন সাক্ষ্য দিচ্ছি যে , আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) তার রাসূল। ” এরপর ঐ খ্রীষ্টান লোকটি হোসইন (আ.) এর পবিত্র মাথা তুলে বুকে লাগাল , চুম্বন করল এবং নিহত হওয়া পর্যন্ত কাদতে লাগল।

মিনহালের ঘটনা

ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) একদিন বাইরে বের হলেন এবং দামেশকের বাজারের ভিতরে হাটছিলেন। মিনহাল বিন আমর তার সামনে এগিয়ে এসে বলল ,

كيْف أمْسيْت يابْن رسُولِ اللّهِ؟

“ হে মহানবীর (সা.) সন্তান , সিরিয়ায় আপনাদের দিনকাল কেমন কাটছে ? তিনি (আ.) বললেন ,

أمْسيْنا كمِثْلِ بنى اسْرائيل فى آلِ فرْعْون

“ ফেরআউন বংশীয়দের মাঝে বনী ইসরাইল যেমনিভাবে দিন কাটাত আমরাও তেমনিভাবে (উমাইয়া বংশীয়দের মাঝে) দিন কাটাচ্ছি (অর্থাৎ ফেরআউন বংশীয়রা বনী ইসরাইলেন পুরুষদেরকে হত্যা করত এবং নারীদেকে জীবিত রাখত) । হে মিনহাল , আরবরা অনারবদের উপর গর্ব করে বলে , হযরত মুহাম্মদ (সা.) আমাদের স্ব-গোত্রীয়। আর আমরা তারই আহলে বাইত। কিন্তু আমাদের থেকে আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। আমাদেরকে হত্যা ও ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে।

فانّا لِلّهِ و انّا اليْهِ راجِعُون مِمّا أمْسيْنا فيهِ يا مِنْهالُ

ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন (নিশ্চয় আমরা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছি আর তারই কাছে ফিরে যাব) কবি কত সুন্দর বলেছেন।

মহানবীর (সা.) সম্মানার্থে যারা তার মিম্বরের কাঠগুলোকে সম্মান করে অথচ তারাই তার (সা.) বংশধরদেরকে পিষ্ট করে মারছে। কোন আইনে মহানবী (সা.) এর বংশধরেরা তোমাদেরকে অনুসরণ করবে ? অথচ মহানবীর সঙ্গী-সাথী ও অনুসরণকারী হওয়ার কারণেই তো তোমাদের গৌরব।

يُعظِّمُون لهُ أعواد مِنْبرِهِ

و تحْت أقْدامِهِمْ أوْلادُهُ وُضِعُوا

بِ أىِّ حُكْمٍ بنُوهُ يتْبعُونكُمْ

و فخْرُكُمْ أنّكُمْ صحْبٌ لهُ تُبّعُ

একদিন , ইয়াজিদ আলী ইবনুল হোসাইন (আ.) ও আমর ইবনুল হোসাইনকে ডেকে পাঠাল। আমরের বয়স তখন এগারো বছর ছিল। ইয়াজিদ আমরকে বলল , তুমি কি আমার ছেলে খালেদের সাথে মল্লযুদ্ধ করবে ? তখন আমর ইয়াজিদকে বললেন , না , তবে আমাকে ও তোমার ছেলে খালেদকে তলোয়ার দাও। আমরা যুদ্ধ করব। ” একথা শুনে ইয়াজিদ বলল , পিতার রক্তধারা সন্তানদের মাঝে বহমান। তাই পিতার মত সন্তানরাও হয়(সাপের বাচ্চা সাপই হয়) । ”

شِنْشِنةٌ أعْرِفُها مِنْ أخْزمِ

هلْ تلِدُ الْحيّةُ الاّ الْحيّة

অতঃপর ইয়াজিদ ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) কে বলল , তোমার তিনটি মনস্কামনা পূরণ করার যে প্রতিজ্ঞা আমি করেছিলাম তা আমি পূরণ করব। এখন তুমি সেগুলো একে একে বল। তখন ইমাম (আ.) বললেন ,

প্রথমতঃ আমার পিতা হোসাইনের কর্তিত মাথা আমাকে ফিরিয়ে দাও। আমি তার সুন্দর বদনমণ্ডল দেখতে চাই।

দ্বিতীয়তঃ আমাদের যে সম্পদ লুন্ঠন করা হয়েছে তা আমাদের কাছে ফেরত দেয়া হোক।

তৃতীয়তঃ যদি আমাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাক তাহলে একজন বিশ্বস্ত লোকের সাথে নবীবংশের বন্দী মহিলাদেরকে মদীনায় পাঠিয়ে দিও।

ইয়াজিদ এ কথা শুনে বলল. পিতার মুখ কখনো দেখতে পাবে না। আমি তোমাকে হত্যা করব না। একমাত্র তুমি ব্যতীত আর কেউ মহিলাদেরকে মদীনায় নিয়ে যাবে না। তবে যে সম্পদ লুন্ঠন করা হয়েছে তার বদলে অনেক গুণ বেশী দামের ধন-সম্পদ আমি তোমাদেরকে দেব। ” ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) তখন বললেন , তোমার ধনসম্পদের এক কানা কড়িও আমাদের দরকার নেই। তোমার ধনসম্পদ থেকে আমাদেরকে কিছু দিতে হবে না। আমরা কেবল আমাদের লুন্ঠিত সম্পদগুলোই চাচ্ছিলাম। কারণ হযরত ফাতেমা (আ.) এর জামা , স্কার্ফ , হলার হার ও কামিজ ঐ সব লুন্ঠিত সম্পদের মধ্যে আছে। ” তখন ইয়াজিদ ঐ সব লুন্ঠিত নিয়ে আসার আদেশ দিল । সে ঐ সম্পদগুলো ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)-কে ফেরৎ দিল এবং তাকে আরো দুশো দিরহাম দিল। ইমাম যয়নুল আবেদীন ঐ দু শো দিরহাম ফকির মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। অতঃপর ইয়াজিদ বন্দী ইমাম পরিবারকে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার আদেশ দিল। তবে ইমাম হোসাইনের পবিত্র মাথা মোবারক সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র মাথা কারবালায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল এবং পবিত্র দেহের সাথে মাথাও দাফন করা হয়েছিল। এতদসংক্রান্ত অনেক বর্ণনা রয়েছে। তবে এ পুস্তিকার স্বল্প পরিসরে এগুলো সব বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

নবী পরিবারের পুনরায় কারবালায় গমন

ইমাম হোসাইনের পরিবার যখন ইরাকে প্রবেশ করলেন , তখন তারা কাফেলার পথ প্রদর্শককে বললেন , আমাদেরকে কারবালার উপর দিয়ে নিয়ে যাও। ” যখনই তারা কারবালায় পৌছালেন তখন সেখানে হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারী (রা.) , একদল বনী হশিম এবং নবী পরিবারের কয়েকজন পুরুষের সাথে তাদের সাক্ষাত হয়। এখানে উল্লেখ্য যে , হযরত জাবির (রা.) , বনী হাশিমের ঐ দল এবং নবী পরিবারের পুরুষ ব্যক্তিরা কারবালায় ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র সমাধি যিয়ারত করতে এসেছিলেন । সবাই কান্না কাটি করতে লাগল এবং শোকে-দুঃখে মুখ চাপড়াতে লাগলেন। তারা কারবালায় এমনভাবে মাতম করছিলেন যা দেখে এমন কোন হৃদয় নেই যা শোকানলে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়নি। কারবালার আশে পাশে যে সব আরব বেদুইনরা বসবাস করত তাদের মহিলারাও সেখানে মাতম ও শোক করার জন্য জড়ো হয়েছিল। এভাবে সেখানে অনবরত কয়েকদিন শোকানুষ্ঠান চলতে থাকে।

আবু হাব্বাব কলবী থেকে বর্ণিতঃ একদল চক ও কড়িমাটি সংগ্রহকারী বর্ণনা করেছেঃ আমরা এক রাতে হাব্বাহ নামক একটি স্থানে যাচ্ছিলাম। সে সময় আরা সবাই শুনতে পেলাম যে , জ্বীনরা ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্য বিলাপ করে চলছেঃ

مسح الرّسُولُ جبينهُ

فلهُ بريقٌ فِى الْخُدُودِ

أبْواهُ مِنْ علْيا قُريْشٍ

جدُّهُ خيْرُ الْجُدُودِ

ইমাম হোসাইনের কপালে চুম্বন করতেন রাসূল (সা.)

তার (ইমামের)গালে রয়েছে রাসূলের চুম্বনের ঔজ্জ্বল্য ,

হোসাইনের পিতা মাতা ছিলেন রাসূলের কুরায়শ

এবং তার মাতামহ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মাতামহ ;

আহলে বাইত (আ.) যখন মদীনার নিকটবর্তী হলেন

কারবালা থেকে নবী পরিবার (আ.) মদীনা পানে রওয়ানা হলেন। বশীর বিন জাযলাম থেকে বর্ণিতঃ মদীনার নকটবর্তী হওয়া মাত্রই যয়নুল আবেদীন (আ.) সওয়ারী থেকে নেমে পড়লেন , তাবু টানান হল এবং মহিলারাও সওয়ারী থেকে নামলেন । তখন ইমাম বললেন , হে বশীর , খোদা তোমার পিতাকে ক্ষমা করুন। তোমার পিতা কবি ছিলেন। তুমি কি কবিতা রচনা করতে পার ? বশীর তখন বললঃ জ্বী হ্যাঁ , আমিও একজন কবি। ” ইমাম একথা শুনে বশীরকে বললেন , মদীনায় গিয়ে জনগণকে আবু আবদিল্লাহ ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের সংবাদ জানাও। ” বশীর এরপর বলেছেন , আমি (ইমামের নির্দেশে) ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে অতিদ্রুত মদীনায় পৌছালাম। আমি মসজিদে নববীতে পৌছে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে করতে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করলামঃ

يا أهْل يثْرِب لا مُقام لكُمْ بِها

قُتِل الْحُسيْنُ ف أدْمُعى مِدْرارُ

ألْجِسْمُ مِنْهُ بِكرْبل أ مُضرّجٌ

و الرّ أسُ مِنْهُ على الْقناةِ يُدارُ

হে মদীনাবাসীরা এরপর আর মদীনায় থেকো না। কারণ ইমাম হোসাইন (আ.)-কে শহীদ করা হয়েছে। আর তার শাহাদতের কারণে আমার চোখ দিয়ে যেন বৃষ্টির মত অশ্রু ঝরছে। রক্তে রঞ্জিত ইমাম হোসাইনের (আ.) পবিত্র দেহ কারবালায় আর তার পবিত্র মাথা বর্শাগ্রে গেথে শহর থেকে শহরে ঘুরানো হচ্ছে। ” এরপর আমি বললাম , হে মদীনাবাসীরা , আলী ইবনুল হোসাইন (আ.) ফুপু ও বোনদের সহকারে তোমাদের কাছে এবং মদীনার দেওয়ালের পশ্চাতেই অবস্থান করছেন। আমি তার প্রেরিত দূত। আমি তোমাদেরকে তার আবস্থানস্থল নির্দেশ করব। আমার এ কথায় মদীনার সব মহিলাও তাবু ছেড়ে বেরিয়ে এসে ওয়া ওয়াইলা , ওয়া সাবুরাহ ” বলে উচ্চস্বরে বিলাপ করতে লাগল।

আমি ঐ দিনের বিলাপকারীদের মত এত অধিকসংখ্যক বিলাপকারী আর কোন দিন দেখিনি। ঐ দিনের ন্যায় আর কোন দিবসই মুসলমানদের জন্য এত তিক্তকর ছিল না। আমি ঐ দিন একজন মহিলাকে ইমাম হোসাইন (আ.) এর জন্য কাদতে এবং শোক প্রকাশ করতে দেখেছি। সে বলছিলঃ

نعى سيِّدى ناعٍ نعاهُ ف أوْجعا

ف أمْرضنى ناعٍ نعاهُ ف أفْجعا

و عيْنىّ جُودا بِالدّذمُوعِ و اسْكِبا

وجُودا بِدمْعٍ بعْد دمْعِكُما معا

على منْ دهى عرْش الْجليلِ فزعْزعا

و أصْبح الدّينِ والْمجْدِ أجْدعا

على ابْنِ نبِيِّ اللّهِ و ابْنِ وصِيِّهِ

و انْ كان عنّا شاحِط الدّارِ أشْسعا

দূত এসে আমাকে আমার নেতা ও মওলা (আ.) এর শাহাদতের সংবাদ দিয়েছে। আর এ সংবাদ মুনে আমার অন্তর ব্যথা বেদনায় ভরে গেছে এবং আমিও অসুস্থ হয়ে পড়েছি। হে আমার নয়নযুগল , অশ্রুপাতের ক্ষেত্রে উদার হও এবং বার বার অশ্রু ঝরাতে থাক ঐ পুণ্যাত্মার জন্য যার মুসিবত খোদার আরশকেও করেছে প্রকম্পিত। তাকে (আ.) শহীদ করার মধ্য দিয়ে ধার্মিকতা ও মান-সম্ভ্রমকেও কর্তন করা হয়েছে। মহানবী (সা.) এর দৌহিত্র এবং হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.)-এর সন্তান হোসাইনের জন্য অশ্রুপাত করতে থাক যিনি এ নগরী থেকে বহু দূরে চলে গেছেন। ”

এ শোকগাথা আবৃত্তি করার পর ঐ মহিলা বলতে লাগল , এ শোক সংবাদ বহনকারী হে দূত তুমি আমাদের দুঃখ-কষ্টকে ইমাম হোসাইনের (আ.) শাহাদাতের কারণে তাজা করে দিয়েছে এবং আমাদের অন্তরের ক্ষতসমূহ যা এখনও সেরে ওঠেনি তাতে আরো নতুন করে তাতে আরো ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। তুমি কে হে দূত ? আমি তখন বললাম , আমি বশীর বিন খাযলাম। আমাকে মওলা ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) পাঠিয়েছেন। বশীর থেকে বর্ণিতঃ মদীনাবাসীরা আমাকে রেখেই অতিদ্রুত মদীনার বাইরে চলে আসল। আমি ঘোড়ায় চড়ে ওখানে এলাম। দেখলাম রাস্তাঘাট লোকে লোকারণ্য । তিল ডরিমাণ জায়গা খালি নেই। ঘোড়া থেকে নেমে মানুষের কাধ ডিঙ্গিয়ে একদম তাবুর কাছে পৌছে গেলাম। ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) তাবুর ভিতরে ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি তাবুর বাইরে আসলেন। তার হাতে একটি রুমাল ছিল যা দিয়ে তিনি অশ্রু মুছছিলেন। তার পেছনে পেছনে একজন খাদেম একটি চেয়ার আনল। তিনি ঐ চেয়ারটির উপর বসলেন। কিন্তু তার দু চোখ বেয়ে অনবরত অশ্রুপাত হচ্ছিল। চতুর্দিকে কান্নার রোল পড়ে গেল। মহিলা ও দাসীদের ক্রন্দনধ্বনি তীব্র হয়ে উঠল। জনতা ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) কে সান্তনা দিতে লাগল। তবে ঐ স্থান জুড়ে কান্নাকাটিই চলছিল।

মদীনার উপকন্ঠে ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) ভাষণ

এ সময় ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) সবাইকে নীরবতা অবলম্বন করতে বললেন। লোকেরা কান্না থামাল। তিনি ভাষণে বললেনঃ

فقال: ( ألْحمْدُ لِلّهِ ربِّ الْعالمين، الرّحْمنِ الرّحيمِ، مالِكِ يوْمِ الدّينِ، بارِى ءِ الْخلائِقِ أجْمعين، الّذى بعْد فارْتفع فى السّمواتِ الْعُلى ، و قرُب فشهِد النّجْوى ، نحْمدُهُ على عظائِمِ الامُورِ، و فجائِعِ الدُّهُورِ، و ألمِ الْفواجِعِ، و مضاضةِ اللّواذِعِ، و جلِيلِ الرُّزْءِ، و عظِيمِ الْمصائِبِ الْفاظِعةِ الْكاظّةِ الْفادِحةِ الْجائِحةِ. أيُّها الْقوْمُ، انّ اللّه و لهُ الْحمْدُ ابْتلانا بِمصائِب جليلةٍ، و ثُلْمةٍ فى الاسْلامِ عظيمةٍ: قُتِل أبُو عبْدِ اللّهِ الحسين ع و عِتْرتُهُ، و سُبِى نِساؤُهُ و صِبْيتُهُ، و دارُوا بِر أسِهِ فى الْبُلْدانِ مِنْ فوْق عامِلِ السِّنانِ، و هذِهِ الرّزِيّةُ الّتى لا مِثْلُها رزِيّةُ. أيُّها النّاسُ، ف أيُّ رِجالاتٍ مِنْكُمْ يُسِرُّون بعْد قتْلِهِ؟! أمْ أىٍُّّ فُؤ ادٍ لا يحْزُنُ مِنْ أجْلِهِ أمْ أيّةُ عيْنٍ مِنْكُمْ تجْبسُ دمْعها و تضِنُّ عنْ انْهِمالِها؟! فلقدْ بكتِ السّبْعُ الشِّدادُ لِقتْلِهِ، وبكتِ الْبِحارُ بِ أمْواجِها، والسّمواتُ بِ أرْكانِها، و الارْضُ بِ أرْجائِها، و الاشْجارُ بِ أغْصانِها، والْحِيتانُ و لُججِ الْبِحارِ، و الْملائِكةُ الْمُقرّبُون و أهْلُ السّمواتِ أجْمعُون. أيُّها النّاسُ، أىُّ قلْبٍ لا ينْصدِعُ لِقتْلِهِ؟! أمْ أىُّ فُؤ ادٍ لا يحِنُّ اليْهِ؟! أمْ أىُّ سمْعٍ يسْمعُ هذِهِ الثُّلْمة الّتى ثُلِمتْ فى الاسلام و لا يُصمُّ؟! أيُّها النّاسُ، أصْبحْنا مطْرودين مُشرّدين مذُودين شاسِعين عنِ الامْصارِ، ك أنّنا أوْلادُ تُرْكٍ أوْ كابُل، مِنْ غيْرِ جُرْمٍ اجْترمْناهُ، و لا مكْرُوهٍ ارْتكبْناهُ، و لا ثُلْمةٍ فى الاسْلامِ ثلمْناها، ما سمِعْنا بِهذا فى آبائِنا الاوّلين، انْ هذا الاّ اخْتِلاقُ. و اللّهِ، لوْ أنّ النّبِىّ تقدّم اليْهِمْ فى قِتالِنا كما تقدّم اليْهِمْ فى الْوِصايةِ بِنا لما زادُوا على ما فعلُوا بِنا، فانّا لِلّهِ و انّا اليْهِ راجِعُون، مِنْ مُصيبةٍ ما أعْظمها و أوْجعها و أفْجعها و أكظّها و أفْظعها و أفْدحها، فعِنْد اللّهِ نحْتسِبُ فيما أصابنا و أبْلغ بِنا، انّهُ عزيزُ ذُو انْتِقامِ

“ ঐ আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যিনি ইহকাল ও পরকালের প্রভু , মহান বিচার দিবসের অধিপতি এবং সব কিছুর স্রষ্টা। ঐ আল্লাহর সমস্ত প্রশংসা যার সত্তাকে মানুষ বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করতে অক্ষম এবং সকল গুপ্ত বিষয় ও রহস্য তার কাছে উন্মোচিত ও প্রকাশিত। কালের সমস্যা , দুঃখ-কষ্ট ও যাতনা বড় বড় বিপদাপদ , কঠিন আাঘাত , ঘাত প্রতিঘাত এবং বেদনার সময়ও ঐ মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি (অর্থাৎ সুখে-দুঃখে সর্বাবস্থায় তিনি প্রশংসনীয়) । হে লোকসকল , ঐ খোদার প্রশংসা করছি যিনি ইসলামের উপর আপতিত বড় বড় মুসিবত ও বিপদাপদের মাধ্যমে আমাদেরকে পরীক্ষা করেছেন। নিশ্চয়ই আবু আব্দুল্লাহ ইমাম হোসাইন (আ.) এবং তার বংশধরদেরকে হত্যা করা হয়েছে , তার স্ত্রী , কন্যা ও আত্মীয়াদেরকে বন্দী করা হয়েছে। তার পবিত্র মাথঅ বর্শাগ্রে বেধে শহর থেকে শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা এমনই এক বিপদ যার তুল্য দ্বিতীয়টি আর নেই। হে লোকসকল , এ ঘটনার পর তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি হাসিখুশী থাকতে পারবে ? সে কোন হৃদয় যে এ মহাঘটনায় ব্যথিত ও দুঃখভারাক্রান্ত হবে না ? সে কোন নয়ন যা অশ্রুপাত করবে না অথচ সাত আসমান হোসাইন (আ.) এর জন্য কাদেছে , সাগরসমূহ তরঙ্গ তুলে ক্রন্দন করেছে , আকাশের স্তম্ভসমূহ শোকে-দুঃখে গর্জন করে উঠেছে এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তও ক্রন্দন করেছে। আরো ক্রন্দন করেছে গাছের ডাল-পালাসমূহ , মৎস , সমুদ্রের ঢেউমালা , নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা। সকল আকাশবাসী এ মহা বিপদে শোক করেছে , বিলাপ করেছে। হে লোকসকল , এমন কোন হৃদয় আছে কি যা হোসাইনের (আ.) প্রতি এখনও আকৃষ্ট হয়নি ? ইসলামের উপর আপতিত চরম সংকটের কথা শোনার মত ক্ষমতা কারো আছে কি ? হে লোকেরা , আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে এবং এমনভাবে আমাদেরকে শহর থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে যেন আমরা তুর্কিস্থান ও কাবুলের বিধর্মী যুদ্ধবন্দী। অথচ আমরা তো কোন পাপ করিনি বা আমাদের দ্বারা কোন মন্দ কাজও সংঘটিত হয়নি। এমন কি আমরা ইসলাম ধর্মের কোন বিকৃতি সাধন করিনি।

খোদার কসম. মহানবী (সা.) আমাদের ব্যাপারে উম্মতকে যে সব উপদেশ প্রদান করেছেন তদস্থলে তিনি যদি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশও দিতেন তাহলে তারা আমাদের সাথে যা করেছে এর চেয়ে বেশী কিছু করতে পারত না। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। আমাদের বিপদ কতবড় , কত বেদনাদায়ক , কত কঠিন কত তিক্ত। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি , যেন তিনি এমন বিপদাপদ ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করার জন্য আমাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেন। কারণ তিনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.)-এর বক্তৃতা যখন শেষ হল তখন সওহান বিন সা ’ সাআহ বিন সওহান যিনি রোগগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি উঠে দাড়িয়ে বললেন , হে নবীর (সা.) দৌহিত্র , আমার চলার শক্তি রহিত হয়ে আমি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলাম। আর এ কারণে আমি আপনাদেরকে সাহায্য করতে পারিনি । ” ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) সওহানের কথা গ্রহণ করলেন , তাকে ধন্যবাদ জানালেন এবং সওহানের পিতা সা ’ সাআর জন্য দোয়া করলেন।

মদীনার বাড়ীঘরের অবস্থা

এরপর ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) নিজ পরিবার-পরিজন সহকারে মদীনায় প্রবেশ করলেন। তিনি আত্মীয় ও বন্ধুদের ঘর-বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন যে , ঘরগুলো যেন নীরবে নিথরে (যারা ঘরে বসবাস করতো তাদের জন্য) বিলাপকারিনী মহিলাদের মত কাদছে , শোক করছে। এসব বাড়ীঘর ইমাম যয়নুল আবেদীনকে (আ.) ঘরের অধিবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছিল এবং নিহতের জন্য শোক প্রকাশ করছিল।

ইমাম হোসাইনের (আ.) গৃহ ফরিয়াদ করে বিলাপ করছিল আর বলছিল , হে লোকেরা যেহেতু আমি এভাবে শোক ও ফরিয়াদ করছি বলে আমাকে ক্ষমা কর। তোমরাও এ মহা বিপদের দিনে আমাকে সাহায্য কর। তারা আমার দিনরাতের সংগী , আধার রাত ও ভোর রাতের প্রদীপ , মর্যাদা ও গৌরবের প্রতীক , আমার শক্তি ও বিজয়ের উৎস এবং আমার চন্দ্র-সূর্য ছিলেন। তাদের মহত্ত্বের কারণে কত রাতে আমার ভীতি দূর হয়ে গেছে। তাদের অনুগ্রহ ও কৃপায় সম্মান বেড়েছে। তাদের প্রভাতী প্রার্থনা আমার কর্ণকুহরে এসে পৌছেছে। তাদের গুপ্তভেদের দ্বারা আমি সম্মানিত হয়েছি। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সভা উদযাপন করতেন , আর এ সব অনুষ্ঠান ও সভা আমার সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিত।

তাদের ফযীলত ও মহৎ গুণাবলী আমাকে মিষ্টি সৌরভে ভরপুর করে দিত। আমার শুষ্ক কাঠগুলো তাদের সদর্শনে সবুজ ও রসাল হয়ে পড়ত। তাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে আমার থেকে যাবতীয় অমঙ্গল দূর হয়ে যেত। আমার আশাকে তারা নব নব পল্লবে বিকশিত করেছিলেন। আর আমাকে নানাবিধ বিপদাপদ থেকে মুক্ত ও নিরাপদ রেখেছিলেন। প্রভাতকালে তাদেরকে পেয়ে অন্য সকল প্রাসাদ ও গ্রহের উপর আমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হত। আর এ কারণে আমি গর্ববোধ করতাম , সুখী ছিলাম। তাদের সান্নিধ্যে অনেক নিরাশা আশার আলোয় পরিণত হয়েছিল। অনেক বিপদাপদ ও ভয় বা ভীতি ক্ষয়প্রাপ্ত অস্থির মত আমার অস্তিত্বের সীমারেখার মাঝে লুক্কায়িত ছিল তাদেরই বদৌলতে সেগুলো দূরীভূত হয়ে গিযেছিল। কিন্তু অবশেষে মৃত্যুর তীর তাদেরকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করল। তারা অপরিচিত শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে তাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলেন। মর্যাদা ও সম্মানবোধ যা তাদের জীবদ্দশায় বিদ্যমান ছিল তা আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদেরকে হারিয়ে আজ উন্নত চারিত্রিক গুণাবলী যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মহান আল্লাহর বিধি-বিধানসমূহে তাদের জন্য বিলাপ করছে। হায় , ঐ পুণ্যাত্মার (হোসাইনের) রক্তপাত করা হয়েছে। হায় , পূর্ণত্বপ্রাপ্তদের সেনাদলের পতাকা আজ ভূলুন্ঠিত হযে গেছে। আজ যদি আমার সাথে মানবজাতি ক্রন্দন না করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যদি এ বিপদে শোকে প্রকাশ করার সময় আমাকে ত্যাগ করে তাহলে পুরোনো টিলা-পাহাড় এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত গৃহসমূহের দেওয়ালগুলোই আমার জন্য যথেষ্ট। কারণ ওগুলোও আমার মত ক্রন্দন করছে , বিলাপ করছে। আর আমার মত তারাও শোকাচ্ছন্ন এবং দুঃখভারাক্রান্ত। যদি তোমারা শুনতে পাও যে , নামায কিভাবে ঐ সব সত্যপন্থী শহীদের জন্য বিলাপ করেছে , দানশীলতা ও মহানুভবতা তাদের দর্শনপ্রার্থী এবং দর্শনের জন্য অপেক্ষমান ; মসজিদের মেহরাব তাদের বিচ্ছেদ বেদনায় ক্রন্দনরত এবং অভাবীদের অভাব তাদের দান পাওয়ার জন্য উচ্চস্বরে ফরিয়াদ করছে ; তাহলে অবশ্যই এসব ফরিয়াদ শুনে তোমরাও শোকাচ্ছন্ন ও দুঃখভারাক্রান্ত হতে এবং জানতে পারতে যে এ মহাবিপদে তোমরা দায়িত্ব পালন করনি। বরং যদি তোমরা আমার একাকিত্ব ও ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে এবং তাদের বিহনে আমার সভাগুলো যে খালি , এ অবস্থা যদি দেখতে পেতে তাহলে তোমাদের মানসপটে এমন এক চিত্র ফুটে উঠত যা সহিষ্ণু হৃদয়কে দুঃখ ও বেদনায় উদ্বেলিত করে ও বক্ষকে ভারী করে দেয়। যে সব গৃহ আমার সাথে হিংসা করত , আজ তারা আমাকে ভর্ৎসনা করছে। আমার উপর যুগের বিপদাপদ জয়ী হয়েছে। হায় , অধীর আগ্রহের সাথে ঐ গৃহকে দেখতে ইচ্ছে করছে যেখানে তাদের দেহ শায়িত । হায়! আক্ষেপ , আমি যদি মানুষ হতাম এবং তলোয়ারের সামনে যদি ঢালের মত দাড়িয়ে তাদের চরণতলে নিজকে উৎসর্গ করতে পারতাম যাতে করে তারা জীবতি থাকতে পারেন। হায় , যদি আামি ঐসব শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারতাম যারা তাদেরকে বর্শা দিয়ে আক্রমণ করেছে। হায় , আমি যদি তাদের কাছ থেকে শত্রুদের নিক্ষিপ্ত তীর ফিরিয়ে দিতে পারতাম। অথচ আমি এ মুহূর্তে কিছুই করতে পারলাম না। হায় , যদি আমি তাদের সুকোমল দেহের বাসস্থান হতে পারতাম এবং তাদের পবিত্র দেহকে যদি রক্ষা করতে পারতাম। আহ আমি ঐ সব মহান আত্মোৎসর্গকারী পুণ্যাত্মাদের অবস্থানস্থল হতে পারতাম তাহলে সর্বশক্তি ব্যয় করে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে তাদের দেহগুলোকে রক্ষা করতাম এবং তাদের পুরোনো হক বা অধিকার আদায় করে আনতাম। পাথরগুলোকে তাদের উপর পড়তে দিতাম না। তাদের সামনে অনুগত দাসের মত সব সময় উপস্থিত থাকতাম তাদের চরণতলে সম্মান ও মর্যাদার গালিচা বিছিয়ে দিতাম। তাহলে তাদের সহচর্য লাভ করার সৌভাগ্য হত এবং অন্ধকারে তাদের আলো থেকে উপকৃত হতাম। আহ! এসব আশা পূরণ হওয়ার জন্য আমি কত আগ্রহী। আমার মাঝে যারা বসবাস করতেন তাদের বিরহ বিচ্ছেদে আমি জ্বলছি। আমার ফরিয়াদ অন্য সব ফরিয়াদকে ছাড়িয়ে গেছে । তারা ছাড়া আর কোন ওষুধে আমি আরোগ্য লাভ করব না। তাদেরকে হারিয়ে আমি শোকের পোশাক পরিধান করেছি। আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারছি না। আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেছে। আর আমি বলছি হে শান্তিদাতা , তোমার সাথে আমার দেখা হবে রোজ হাশরের মাঠে।

মালিকশূন্য ঘরগুলো যখন কাদছিল তা বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে কুতাইবা কত সুন্দর বলেছেনঃ

مررْتُ على أبْياتِ آلِ مُحمّدٍ

فلمْ أرها أمْثالها يوْم حلّتِ

فلا يُبْعِدُ اللّهُ الدِّيار و أهْلها

و انْ أصْبحتْ مِنْهُمْ بِزعْمى تخلّتِ

ألا انّ قتْلى الطّفِّ مِنْ آلِ هاشِمٍ

أذلّتْ رِقاب الْمُسْلِمين فذلّتِ

و كانُوا غِياثا ثُمّ أضْحوا رزِيّةً

لقدْ عظُمتْ تِلْك الرّزايا و جلّتِ

ألمْ تر أنّ الشّمْسً أضْحتْ مريضةً

لِفقْدِ حُسيْنِ والْبِلادُ اقْشعرّتِ

মুহাম্মদের (সা.) বংশধরদের গৃহসমূহের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম ঐ ঘরগুলো যখন মহানবীর (সা.) বংশধরেরা এখানে থাকতেন এখন আর নেই। মহান আল্লাহ , এ গৃহ ও এ গৃহের মালিককে রহমত থেকে বঞ্চিত না করেন। আমার ধারণায় যদিও এ ঘরগুলো মালিকবিহীন হয়ে গেছে । তোমরা জেনে রেখো যে , কারবালায় শহীদদের নিহত হওয়ার কারণে মুসলমানদের ঘাড়ে অপমানের বোঝা অর্পিত হয়েছে। আর এখন তাদের উপর আপমানের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মহানবীর (সা.) বংশধরেরা সব সময় উম্মতের আশ্রয়স্থল ছিলেন। আর এখন তাদের উপর অর্পিত বিপদাপদই সকল বিপদাপদ অপেক্ষা ভয়ানক। তোমরা কি দেখনি যে , ইমাম হোসাইনের শাহাদাতে আকাশের সূর্য স্লান হয়ে গিযেছিল এবং পৃথিবী এ তীব্র বিপদে প্রকম্পিত হয়েছিল ?

তোমরা যে কেউ ইমাম হোসাইনের এ বিপদের কথা শুনবে যেমনিভাবে মহানবীর (সা.) বংশধরেরা শোকাভিভূত হয়েছিলেন ঠিক তেমনিভাবে তোমরাও শোকাভিভূত ।

ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) ক্রন্দন

বর্ণিত আছে যে , ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও সহিষ্ণু হওয়া সত্ত্বেও এ মহা বিপদের সময় অত্যন্ত কাদলেন এবং তার দুঃখ-কষ্টের অন্ত ছিল না। ইমাম জাফর সাদেক (আ.) থেকে বর্ণিত আছে যে ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) তার পিতার কথা স্মরণ করে চল্লিশ বছর কেদেছিলেন। তিনি এ দীর্ঘ চল্লিশ বছরে দিবাভাগে রোযা রাখতেন এবং ইবাদত-বন্দেগী করে রাত কাটাতেন। ইফতারের সময় যখন তার গোলাম তার সামনে খাবার ও পানি এনে বলত , প্রভু ইফতার করুন। ” তখন ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) বলতেন-

قُتِل ابْنُ رسُولِ اللّهِ ع جائِعا، قُتِل ابْنُ رسُولِ اللّهِ عطْشانا

“ মহানবীর (সা.) দৌহিত্র (আ.)-কে ক্ষুধার্তাবস্থায় হত্যা করা হয়েছে , তাকে তৃষ্ণার্তাবস্থায় হত্যা করা হয়েছে। ” তিনি বার বার এ কথা বলতেন এবং কাদতেন। যার ফলে খাবার ও পানির সাথে তার অশ্রু মিশে একাকার হয়ে যেত। তিনি আমৃত্য এ অবস্থার উপর ছিলেন।

ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) একজন দাস থেকে বর্ণিতঃ একদিন ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) মরুভূমির দিকে বের হলে আমিও তার (আ.) পিছু পিছু গেলাম। দেখলাম , তিনি একটি কঠিন পাথরের উপর কপাল রাখছেন। আমি দাড়িয়ে গেলাম ও তার কান্না শুনতে পেলাম। আমি শুনলাম তিনি এক হাজার বার

لا اله الاّ اللّهُ حقّا حقّا، لا اله الاّ اللّهُ تعبُّدا ورِقّا، لا اله الاّ اللّهُ ايمانا و تصْديقا

পড়লেন । তারপর তিনি সিজদা থেকে মাথা উঠালেন ; দেখলাম তার পবিত্র বদনমণ্ডল ও দাড়ি চোখের জলে ভিজে গেছে। আমি বললাম , হে আমার (প্রভু) মওলা আপনার দুঃখের কি শেষ নেই , আপনার কান্নার কি শেষ নেই ” তিনি একথা শুনে বললেন , তোমার জন্য আক্ষেপ , ইয়াকুব বিন ইসহাক বিন ইব্রাহীম নিজেও নবী ও নবী পুত্র ছিলেন। তার ১২জন সন্তান ছিল। মহান আল্লাহ তার এক পুত্রকে তার দৃষ্টিশক্তির অন্তরালে নিয়ে যান। শোক-দুঃখের ভারে তার চুলগুলো সাদা হয়ে গিয়েছিল , তার কোমর বাকা হয়ে গিয়েছিল এবং অনবরত কাদার ফলে তার দু চোখ অন্ধ হয়ে গিয়েছিল অথচ তার ঐ সন্তান ঠিকই জীবিত ছিল। আর আমি স্বচক্ষে আমার পিতা , ভাই এবং আমার পরিবারের ১৭ জনকে নিহত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি। তাই কি করে আমার শোক-দুঃখের অবসান হবে এবং কান্না থামবে ?

গ্রন্থ প্রণেতা বলেন-আমি ঐ সব পুন্যাত্মদের স্মরণে নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করছিঃ

منْ مُخْبِرُ الْمُلْبِسينا بِانْتِزاحِهِمُ

ثوْبا مِن الْحُزْنِ لا يبْلى و يُبْلينا

انّ الزّمان الّذى قدْ كان يُضْحِكُنا

بِقُرْبِهِمْ صار بِالتّفْريقِ يُبْكينا

حالتْ لِفُقْدانِهِمْ أيّامُنا فغدتْ

سُودا وكانتْ بِهِمْ بِيضا ليالينا

কে কারবালার শহীদদেরকে বলবে যে , তোমাদের বিরহ বিচ্ছেদে আমরা যে শোকের পোশাক পড়েছি তা কখনও পুরোনো ও ধ্বংস হবে না। বরং আমরা বৃদ্ধ ও মৃত্যুমুখে পতিত হব। এই তো সেদিন তাদের সান্নিধ্যে আমরা হাসিখুশী ছিলাম। আর এখন তাদের বিরহে আমরা কাদি। তাদেরকে হারিয়ে আমাদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেছে (আমাদের জীবন তিমিরাচ্ছন্ন হয়ে গেছে) । অথচ এককালে তাদের উজ্জ্বল আলোর প্রভাবে আমাদের অন্ধকার রাতগুলো দিনের মত আলোকিত ছিল।

বইটির এখানেই সমাপ্তি। যে কেউ এ বই সম্পর্কে জ্ঞাত তারা জানেন যে , কলেবরের দিকে থেকে ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইমাম হোসইনের জীবনী ও কারবালার ইতিহাসের ক্ষেত্রে যে সব বই পুস্তক লেখা হয়েছে সেগুলো থেকে এ বইটি সর্বাধিক উন্নত।


তথ্যসূত্রঃ

১ মুহাদ্দেস কুমী মুরুযুজ্জাহাব হতে বর্ণনা করেন যে-হানি ইবনে উরওয়া মুরাদী ছিলেন একজন বড়লোক এবং মুরাদ গোত্রের প্রধান। তিনি যখন পথ চলতেন চার হাজার বর্মধারী এবং আট হাজার পদাতিক লোক তার সাথে চলত। তার সাথে চুক্তিবদ্ধ কান্দা গোত্র ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরা যুক্ত হলে তার সৈন্য সংখ্যা দাড়াত ত্রিশ হাজার। হাবিবুস সিয়ারে বর্ণিত-হানি ছিলেন কুফার গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং প্রথম শ্রেণীর অনুসারী। কোন কোন রেওয়ায়েত অনুযায়ী তিনি রাসূলে খোদার (সা.) সাক্ষাত লাভ করেছেন। ৮৯ সালে হানি শাহাদত বরণ করেন।

২ নাছেখ লিখেছেন-মুসলিম ইবনে আকিল তার আশ্রয়দাতা হানি ইবনে উরওয়ার সাথে ইবনে যিয়াদের ব্যাপারে পরামর্শ করেন। হানি বলেন ক ’ দিন ধরে অসুস্থতার কারণে ঘরের বাহিরে যেতে পারিনি । তবে বন্ধু-বান্ধবরা ইবনে যিয়াদের কাছে আমার অসুস্থতার কথা বললে খুব শীঘ্রই সে আমাকে দেখতে আসবে। তুমি এ তরবারীটি হাতে নাও। ঘরের এক কোনায় আত্ম গোপন করে থাকবে। আমার দিকেই মনোযোগ রাখবে। যখন দেখবে যে , আমি মাথা থেকে পাগড়ি খুলে রেখেছি কোনরূপ চিন্তা না করে সাথে সাথে তাকে হত্যা করে ফেলবে। মনে রেখ , সে যদি তোমার হাত থেকে নিরাপদে বাচতে পারে তাহলে তোমাকে আর আমাকে প্রাণে বাচিয়ে রাখবে না।

ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদকে সংবাদ দেয়া হল যে কিছুদিন থেকে হানি অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী। হানিও তার কাছে লোক পাঠিয়ে অনুযোগের সাথে সুরে বলল যে , আমার অসুখের কথা জানতে পেরেও তুমি খবর নিলে না । ওবায়দুল্লাহ ক্ষমা প্রার্থনা করে বলল-আমি তোমার অসুস্থতার খবর জানতাম না। আজ রাতেই তোমাকে দেখতে আসব। এশার নামাজ পড়ার পর সে হানির বাড়ীতে আসল। প্রবেশের অনুমতি চাইল এবং হানির শয্যার পাশে বসল। তার গোলাম ছিল তার শিয়রে দাড়ানো। এর আগেই হানির নির্দেশে মুসলিম ইবনে আকিল হাতে তরবারী তুলে নেন এবং পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকেন। এরপর ইবনে যিয়াদ ও হানির মধ্যে সংলাপ শুরু হল। হানি বারবার নিজের অসুস্থতার কথা বলছিলেন। এর ফাকে তিনি মাথা থেকে পাগড়ী খুলে মাটিতে রাখেন। তার ধারণা ছিল মুসলিম পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী বেরিয়ে আসবে এবং কাজ সেরে ফেলবে। কিন্ত মুসলিম বেরিয়ে আসল না। পুনরায় তিনি পাগড়ীটি মাথায় দিলেন এবং মাটিতে নামিয়ে রাখলেন। এরপরও কোন খবর নেই। এভাবে তিনবার করলেন কিন্ত মুসলিম আসলেন না। হানি কয়েকটি কবিতা পংক্তি আওড়ালেন যেন মুসলিম শুনে বেরিয়ে এসে তার কাজ সমাধা করেন। এর একটি কবিতা ছিল

ما الانتظار بسلمی‌' لا یحییّوها حیّوا سلیما و حیوا من محییها

বেশ কয়েকবার তিনি এ পংক্তিগুলো পড়লেন। কবিতার পংক্তিগুলো বারবার আওড়ানোতে ইবনে যিয়াদ সন্দিহান হয়ে পড়ল। কোন চক্রান্তের আশংকা সে আচ করে জিজ্ঞেস করল-লোকটির কি হয়েছে যে , বারবার এ কবিতাটি আওড়াচ্ছে ? বলা হলো রোগের প্রচণ্ডতায় তিনি বকছেন। ইবনে যিয়াদ উঠে চলে গেল। এরপরই মুসলিম বেরিয়ে আসলেন। তখন হানি জিজ্ঞেস করলেন। কি হলো তোমার ? তাকে হত্যা করলে না কেন ? বললেন-দুই কারণে। এক কারণ হলো এক মহিলা আমার হাত ধরে খুব কান্নাকাটি করে শপথ দিয়ে বলল-আমাদের ঘরে ইবনে যিয়াদকে হত্যা কর না। দ্বিতীয় কারণ-রাসূলে খোদার (সা.) সে হাদীস আমার মনে পড়ল সেখানে তিনি বলেছেন।

ان الایمان قید الفتک و لا یفتک مسلم

ইমান মুসলমানকে গুপ্ত হত্যা থেকে রক্ষা করে। কোন মুসলমান অতর্কিত কোন মুসলমানকে হত্যা করে না। হানি বললেন-তুমি যদি তাকে হত্যা করতে তাহলে একজন ফাসেক , ফাজের ও কাফের লোকই হত্যা করা হতো। এখন আমাকেই ধংসের মুখে ঠেলে দিয়েছ। তুমি নিজেকেও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছ।

৩ যুহাইর ইবনে ক্বীন ছিলেন তার গোত্রের সম্মানিত ব্যক্তি। ৬০ হিজরীতে পরিবার-পরিজন নিয়ে হজ্ব পালন করেন এবং আসার সময় পথিমধ্যে হযরত হোসাইনের (আ.) সাথে সাক্ষাত করেন। ঐ সময়ই তার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে যায়। তার ত্যাগ ও তিতিক্ষার বর্ণনা বড়ই বিস্ময়কর ।

শেখ মুফিদ ইরশাদ ’ নামক কিতাবে লিখেছেন যে- হযরত হোসাইন (আ.) যখন এক ভাষণে বললেন- আমি আমার সঙ্গীদের চাইতে একনিষ্ঠ , নিঃস্বার্থ এবং আমার আহলে বাইতের চাইতে উত্তম আহলে বাইত আর কাউকে পাইনি। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন। আমি অনুমতি দিয়েছি যে , আপনারা আমাকে ছেড়ে চলে যান । কোন বাধা বা বিদায় গ্রহণ করতে হবে না। রাতের এই অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে আত্মরক্ষা করুন। এই খোৎবা (ভাষণ) শেষ হবার পর সঙ্গীদের একদল আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে বক্তব্য রাখলেন তন্মধ্যে যুহাইরও ছিলেন। তিনি বললেন-আল্লাহর কসম! আমি চাই যে , একবার নয় , হাজার বার নিহত হব , আবার জীবিত হয়ে নিহত হব। এর উসিলায় আপনি এবং রাসূলের (সা.) আহলে বাইতের উপর থেকে হত্যার আশংকা দূর করুন ।

৪ ফারাযদাক ইমাম ইবনে গালেব তামিমীর কবি নাম। তার পিতা ছিলেন তামিম গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং তার দাদা সাম্মা ইবনে নাজিয়াও ছিলেন ঐ গোত্রের সর্দার।

মুহাদ্দেস কুমী লিখেছেন-মুয়াবিয়া ইবনে আবদুল করীম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে , একদিন ফারাযদাকের কাছে গিয়েছিলাম । তিনি যখন নড়াচড়া করলেন , বুঝতে পারলাম যে , তার পাগুলো শিকলে বাধা। বললাম-এই বন্ধন কিসের ? জবাব দিলেন-আমি শপথ করেছি যে , যতক্ষণ কুরআন মুখস্ত না করছি , পায়ের এই জিঞ্জির খুলব না। ফারাযদাক ১১০ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন। নবী পরিবারের প্রশংসায় তার রচিত কবিতাগুলো জগৎ-বিখ্যাত । বিশেষতঃ আল্লাহর ঘরে হিশাম ইবনে আব্দুল মলিকের সাথে সংঘটিত ঘটনা এবং হযরত জয়নুল আবেদীনের প্রশংসায় তার রচিত প্রশস্তিগুলো অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ।

৫ নাসেখ লিখেছেনঃ সাহল বিন সা ’ দ বলেছেন , কোন কার্যউপলক্ষে বায়তুল মুকাদ্দাসে গেলাম এবং সেখান থেকে শামদেশে আসলাম। সে দেশে সবুজ বৃক্ষ , সুরম্য উদ্যান ও প্রবাহমান ঝরণার সমারোহ দেখলাম। দেখলাম সেখানকার প্রচীরসমূহ সাজান হয়েছে এবং বেপর্দা গায়িকা রমণীরা দফ বাজাচ্ছে। আমি ভেবেই পাচ্ছিলাম না যে কিসের জন্য এ আনন্দোৎসব। সে দশের এক অধিবাসীকে জিজ্ঞেস করলাম , আজ কি শামদেশের অধিবাসীদের উৎসবের দিন ? সে আমাকে বলল , তুমি কি বেদুইন নাকী ? আমি তাকে বললাম , না , আমি মহানবীর একজন সাহাবা। আমার নাম সহল বিন সা ’ দ সায়েদী। সেই শামদেশীয় লোকটি একথা শুনে আমাকে বলল , হে সাহল , তুমি আশ্চার্যান্বিত হচ্ছ না যে আকাশ থেকে কেন রক্তবৃষ্টি বর্ষিত হচ্ছে না এবং পৃথিবী কেন তার অধিবাসীদেরকে গিলে ফেলছে না ? আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম , কেন ? তখন লোকটি বলল , আজ ইরাক থেকে হোসাইন ইবনে আলীর কর্তিত মাথা উপঢৌকনস্বরূপ ইয়াজিদের দরবারে আনা হচ্ছে। আর সে জ্য জনতা আনন্দ স্ফূর্তি করছে। ” আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম , শহরের কোন দ্বার দিয়ে হোসাইনের (আ.) কর্তিত মাথা আনা হবে ? আমাকে তখন সাআত ফটকের কথা বলা হল। ঐ সময় আমি দেখতে পেলাম অনেক পতাকার সাথে বর্শাগ্রে গাথা শহীদদের কর্তিত মাথা মোবারক একটি বর্শার আগায় গাথা রয়েছে এবং তার পিছনে একটি মেয়ে মাহমাল বিহীন উটের পিঠে উপবিষ্ট আছে। ” তাদের কাছে গেলাম ও জিজ্ঞেস করলাম , আমাকে বললেন , যদি পারেন তাহলে যে বর্শাধারীর বর্শাগ্রে আমার পিতার কর্তিত মাথা রয়েছে তাকে কর্তিত মাথাটি আমাদের থেকে দূরে রাখতে বলুন যাতে করে জনতার দৃষ্টি যেন ঐ কর্তিত মাথাটির দিকে যায় এবং তারা যেন আমাদের (বন্দী নবী পরিবারের) দিকে তাকায়। ” সাহল বর্ণনা করেছেন (সাকীনার কতামত) আমি উক্ত বর্শাধারীর নিকটে গেলাম এবং তাকে চল্লিশটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বললাম , কিছু দূরে সরে যাও। ” সে স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে তার নিজের অবস্থান থেকে আরো সামনে চলে গেল। তাবেয়ী ঐসব ব্যক্তিদেরকে বলা হয় যারা মহানবীর (সা.) সাহাবাদের যুগ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মুকিম থাকাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

৬ হযরত যয়নাবের এ উক্তিতে মক্কা বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। ঐ দিন আবু সুফিয়ান (ইয়াজিদের পিতামহ) ও বনী উমাইয়া গোত্রের সবাই হযরত মুহাম্ম (সা.) এর সৈনিকদের হাতে বন্দী হয়েছিল এবং এদের ব্যাপারে যে কোন হুকুমই দিতে পারতেন। অথচ তিনি ওদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং বলেন , তোমরা আযাদ-মুক্ত (তুলাকা) । এ কারণেই বনী উমাইয়া গোত্র মহানবী (সা.) কর্তৃক মুক্তিপ্রাপ্ত (তুলাকা) বলে অভিহিত হত।

৭ হযরত যয়নাব উহুদের যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এ যুদ্ধে মুয়াবিয়ার মা হিন্দা মহানবীর চাচা হযরত হামযার যকৃত মুখে নিয়ে থেকে চেয়েছিল তবে সে মুখ থেকে আর তা বের করতে পারে নি। হযরত যয়নাবের এ উক্তির অর্থ হচ্ছেঃ যকৃত ভক্ষণকারিণীর সন্তানের কাছ থেকে দয়া-মায়ার আশা করা অবান্তর।

৮ দামেস্কের জামে মসজিদে ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) এর প্রদত্ত বক্তৃতার ভিন্ন ধরনের একাধিক বর্ণনা রয়েছে। আমরা মাকতালে খাওয়ারিযমী ’ গ্রন্থ থেকে এ ভাষণটির উদ্ধৃতি দেবঃ

খাওয়ারিযমী মাকতালে লিখেছেনঃ ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) ইয়াযিদকে বললেন , এ কাঠগুলোর উপর দাড়িয়ে আমাকে ভাষণ দেয়ার অনুমতি দাও। আাম এমন কিছু কথা বলব যা মহান আল্লাহকেও সন্তুষ্ট করবে এবং লোকদেরও তা শ্রবণ করে অশেষ পুণ্য অর্জিত হবে। ” ইয়াজিদ ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) কে অনুমতি না দিলে লোকেরা বলতে লাগল , হে আমীরুল মুমেনীন তাকে অনুমতি দিন। আমরা তার কথা শুনবো। ইয়াজিদ তখন জনতাকে লক্ষ্য করে বলল , একবার যদি সে মিম্বরে দাড়ায় তাহলে সে আমাকে ও আবু সুফিয়ানের বংশকে কালিমা লেপন না করে মিম্বর থেকে নামবে না। তখন জনতা বলল , এ যুবকটি কি বা করতে সক্ষম ? ইয়াযিদ বলল , সে এমন এক বংশের লেঅক যাদের অস্থিমজ্জার সাথে জ্ঞান মিশে রয়েছে। কিন্তু জনতার বার বার আবেদন ও চাপের মুখে ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) কে অবশেষে ইয়াযিদ অনুমতি দিতে বাধ্য হল। ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) মিম্বরে আরোহণ করে মহান আল্লাহর প্রশংসা পাঠ করলেন এবং একটি ভাষণ দেন যা উপস্থিত জনতাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে এবং ইমামের ভাষণ শুনে ফুপিয়ে কাদতে থাকে।

হে লোকসকল , আমাদেরকে (অর্থাৎ আহলে বাইত) ছয়টি জিনিস দেয়া হয়েছে এবং সাত বিগুজার দ্বারা অন্য সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে।আমাদেরকে বিদ্যা , নম্রতা , মহানুভবতা , বাগ্মিতা , সাহস এবং বিশ্বসীদের অন্তরের ভালবাসা দেয়া হয়েছে (যারা মুমিন তারাই আমাদেরকে ভালবাসে) । আমাদেরকে (আহলে বাইত) অন্য সবার উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে। কারণ , আমাদের (আহলে বাইতের) মধ্যেই রয়েছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ; সিদ্দীক (অর্থাৎ আলী ইবনে আবী তালেব) ও আমাদের। জাফর আল তাইয়াব ও আমাদের ; আল্লাহ ও তার রাসূলের ব্রাঘ্র হামযাও আমাদের ; সমগ্র বিশ্বের নারীদের নেত্রী (নবী কন্যা) হযরত ফাতেমা যাহরাও আমাদের ; মহানবীর দুই দৌহিত্র বেহেশতের যুবকদের নেতা হাসান ও হোসাইন (আ.) ও আমোদের । যে আমাকে চিনেছে ও জেনেছে সে তো আমাকে চিনেছে এবং জেনেছেই (কার কাছে নতুন করে আমার বংশ পরিচিতি তুলে ধরার প্রয়োজন নেই) । আর যে আমাকে চেনে না তার জ্ঞাতার্থে আমি আমার বংশ পরিচিতি তুলে ধরলাম।

আমি পবিত্র মক্কা ও মিনার সন্তান। আমি পবিদ্র যমযম ও সাফর সন্তান। আমি ঐ পুন্যাত্মার সন্তান যিনি চাদরের পার্শ্বদেশে বন্টন করার জন্য যাকাত রাখতেন। আমি ঐ পুণ্যাত্মার সন্তান যিনি রিদা ও ইয়ার অর্থাৎ ইহরাম পরিধানকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। সর্বশ্রেষ্ঠ হজ্জ পালনকারী ও লাব্বাইক উচ্চারণকারীরই আমি। আমি ঐ পুণ্যাত্মার সন্তান যিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ তাওয়াফ ও সাঈকারী। আমি মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফার (সা.) বংশধর ; আমি শেরে খোদা হযরত হযরত আলীর (আ.) দৌহিত্র। আমি ঐ পুণ্যাত্মর সন্তান যিনি কাফির ও মুশরিকদের মুখে কলেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ উচ্চারিত না হওয়া পর্যন্ত কাফির ও মুশরিকদের কুফরী ও শিরকের টুটি কর্তন করেছেন । (অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে বিরামহীনভাবে যুদ্ধ করেছেন) । আমি ঐ মহাত্মার সন্তান যিনি মহানবীর সান্নিধ্যে কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। আমি ঐ মহামানবের সন্তান যিনি দু ’ বার হিজরত করেছেন , দু ’ বার বায়আত করেছেন এবং দুই কিবলার দিকে (বাইতুল মুকাদ্দাস ও কাবা) নামায পড়েছেন , বদর ও হুনাইনের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন এবং কস্মিনকালেও কুফরী করেননি। আমি সৎ মুমিনের সন্তান। আমি নবীদের উত্তরাধিকারীর সন্তান। আমি খোদাদ্রোহীদের মূলোৎপাটনকারীদের সন্তান। আমি খোদার ধর্মের সাহায্যকারী সন্তান। আমি আল্লাহর ওয়ালী উল আম্বরের সন্তান। আমি ঐ পুন্যাত্মার সন্তান যিনি ক্রম ধ্বংস করেছেন। কাফির মুশরিকদের সম্মিলিত সেনাদলগুলোকে ছত্রভঙ্গ ও বিতাড়িত করেছেন। আমি হিজাযের সিংহের সন্তান ; আমি আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক মনোনীত যোগ্য ইমামের সন্তান ; আমি ঐ পুণ্যাত্মার সন্তান যিনি ছিলেন মক্কা , মদীনা , বতহা , বিহামা , খীফ , আকাবা , বদর ও উহুদের অধিবাসী (এ জন্য) তাকে মক্কী , মাদানী , আবতাহী , তিহামী , খীফী , আকাবী , বদরী ও উহুদী বলা হয়) , দুই মাশআরের উত্তরাধিকারী , হাসান ও হোসাইনের পিতা , কারামতের অধিকারী এবং খোদাদ্রোহীদের ছত্রভঙ্গকারী। উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হেদায়েতের আলোকবর্তিকা , খোদার পরাক্রম সিংহ , সকল অন্বেষণকারীর আকাঙ্ক্ষা ও উদ্দেশ্যস্থল এবং সকল বিজয়ীর উপর বিজয়ী যে মহাপুরুষটি ছিলেন তিনিই আমার পিতামহ হযরত আলী ইবনে আবু তালিব। আমি ফাতেমা যাহরার সন্তান ; আমি নারীদের নেত্রীর দৌহিত্র।

আমিপিবিত্রা বীর রমণী বতুলের (হযরত ফাতেমার উপাধি) দৌহিত্র। আমি মহানবীর (সা.) কলিজার টুকরার দৌহিত্র ও বংশধর।

এ ভাষণে ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজ পিতা ও পিতামহের গুণাবরী বর্ণনা করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে জনতা ঠুকরে টুকরে কাদতে থাকে। ইয়াজিদ এর ফলে বিদ্রোহের আশংকা করতে লাগল। তখনি বিদ্রোহের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সে মুয়াজ্জিনকে আযান দিতে বলে। মুয়াজ্জিনের ধ্বনি শোনামাত্রই ইমাম (আ.) বক্তৃতা থামিয়ে দিলেন এবং নীরবতা অবলম্বন করলে মুয়াজ্জিন যখন আল্লাহু আকবর ” বলল তখন ইমাম (আ.) বললেন , মহান আল্লাহর বিরাটত্ব ঘোষণা করছি যা অতুলনীয় এবং মানুষের বোধশক্তির বাইরে। কোন কিছুই আল্লাহ থেকে মহান নয়। ” এরপর মুয়াজ্জিন যখন আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ” বলল তখন ইমাম বললেন , আমার দেহের লোম , ত্বক , রক্ত , ও মাংস মহান আল্লাহর তৌহিদ অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয়ত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছি। ” মুয়াজ্জিন যখন আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ ” বলল তখন ইমাম (আ.) ইয়াজিদের দিকে মুখ করে বললেন , ইয়াজিদ , এই মুহাম্মদ (সা.) কি আমার পিতামহ না তোমার পিতামহ ? যদি তুমি বল যে , তিনি তোমার পিতামহ তাহলে তুমি মিথ্যা বললে। আর যদি বল যে তিনি আমার পিতামহ তাহলে কেন তুমি তার বংশধরদেরকে হত্যা করলে ? ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ.) এর জ্বালাময়ী এ বক্তৃতা সিরীয়বাসীদের পাষাণ অন্তরের উপর সুগভীর প্রভাব বিস্তার করেছিলে। বনী উমাইয়া গোত্র মিথ্যা পচারণা করে বেড়াত এবং বলত এরা খরিজী-ধর্মত্যাগী (নাউজুবিল্লাহ) । ইমামের এ ভাষণে বনী উমাইয়ার সকল মিথ্যাচার ও অপরাধ জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়ে যায়। এর ফলে ইয়াজিদ নবী পরিবারের সাথে কর্কশ ব্যবহারের পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। – অনুবাদক

৯ হযরত যয়নাবের (আ.) অবস্থা অনুভব করে যে সব কবিতা বা শোকগাথা রচনা করা হয়েছে তার কয়েকটি এখানে উদ্ধৃত করা অসমীচীন হবে না। যেমন-হায় ভ্রাতাঃ তোমার শাহাদাতের পর কত দুঃখ-কষ্ট সইতে হয়েছে আমাকে যে সব শহরে কখনও যাইনি সেখানে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে , কাটা গুল্মের উপর দিয়ে খালি পায়ে ও দৌড়ে পথ চলার কারণে এখনও আমার পায়ের পাতায় ফোস্কার চিহ্ন বিদ্যমান। যখনই হাত বাধা অবস্থায় ইয়াজিদের দরবারে প্রবেশ করেছি তখন আমি খোদার কাছে হাজার বার আমার মৃত্যু কামনা করছি।


সূচীপত্রঃ

প্রথম অধ্যায়

পূর্বাভাষ

উম্মুল ফজলের স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

হোসাইন (আ.) এর শাহাদত সম্পর্কে জিব্রাইল (আ.) এর সংবাদ প্রদান

মুআবিয়ার মৃত্যু ও ইয়াজিদের চিঠি ১১

শাহাদত বরণ সম্বন্ধে হোসাইন (আ.) অবহিত ছিলেন ১৩

মদীনা হতে ইমাম হোসাইনের (আ.) হিজরত ১৬

হোসাইন (আ.) এর প্রতি কুফাবাসীর দাওয়াত ১৬

মুসলিম ইবনে আকিলের কুফা গমন ১৯

ইবনে যিয়াদ কুফার গভর্ণর নিযুক্ত ২০

মুসলিমের আত্মগোপন ২৪

মুসলিম ইবনে আকিলের সংগ্রাম ২৭

মুসলিম ও হানির শাহাদত ৩১

হযরত হোসাইনের ইরাক অভিমুখে যাত্রা ৩৩

হযরত হোসাইনের কাফেলার মক্কা ত্যাগ ৩৬

আবু হিররার সাথে হোসাইন (আ.)-এর সাক্ষাত ৩৭

হযরত হোসাইনের (আ.) সান্নিধ্যে যুহাইর ইবনে ক্বীন ৩৮

কায়েস ইবনে মাসহার এর শাহাদত ৪০

হযরত হোসাইনের (আ.) সামনে হোর ইবনে এযিদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ৪১

হযরত হোসাইন (আ.) কারবালায় ৪৪

যয়নবের অস্থিরতা ৪৪

দ্বিতীয় অধ্যায় ৪৭

আশুরার ঘটনাবলী , শহীদানের শাহাদতের দৃশ্যপট ইমাম পরিবারের তাবু লুটপাট ৪৭

কারবালায় ইমাম হোসাইন (আ.) এর প্রথম ভাষণ ৪৭

আশুরার দিন ভোরে ৫৫

ওমর সাদের মাধ্যমেই যুদ্ধ শুরু ৫৯

ইমাম হোসাইন (আ.) এর দিকে হোর ইবনে ইয়াজিদের আগমন ৬০

এবার কালো দাস ময়দানে ৬৪

আলী আকবর (আ.)-এর বীরত্ব ৬৭

কাসেম বিন হাসান (আ.) ময়দানে আসলেন ৬৯

দুধের শিশুর শাহাদাত ৭১

হযরত আবুল ফজল (আ.) এর ত্যাগ ও শাহাদত ৭৩

যুদ্ধের ময়দানে শহীদগণের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) ৭৫

আব্দুল্লাহ বিন হাসান (আ.)-এর শাহাদত ৭৭

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর অন্তিম মুহূর্ত ৮১

তাবু লুট ও অগ্নিসংযোগ ৮৩

তৃতীয় অধ্যায় ৮৮

কুফা ও সিরিয়ার উদ্দেশ্যে নবী বংশের বন্দীদের যাত্রা ৮৮

শহীদদের দাফন এবং কুফায় বন্দী আগমন ৮৯

হযরত যয়নাবের (আ.) ভাষণ ৯০

ফাতেমা বিনতে হোসাইনের ভাষণ ৯২

হযরত উম্মে কুলসুমের ভাষণ ৯৭

ইমাম আলী ইবনুল হোসাইন যয়নুল আবেদীনের ভাষণ ৯৯

আবদুল্লাহ ইবনে আফীফের বীরত্ব ও শাহাদাত ১০৫

ইবনে যিয়াদ কর্তৃক বন্দী ইমাম পরিবারকে সিরিয়ায় প্রেরণ ১০৯

সিরিয়ায় আহলে বাইত (আ.)-এর করুণ অবস্থা ১১০

একজন সিরিয়াবাসী বৃদ্ধের কাহিনী ১১২

ইয়াজিদের সভায় বন্দী আহলে বাইতের প্রবেশ ১১৩

হযরত যয়নাব (সা.আ.) এর ভাষণ ১১৬

ইয়াজিদের রাজদরবারে একজন সিরীয় লোকের কাহিনী ১২১

হযরত সাকীনার (আ.) স্বপ্ন ১২২

রোম সম্রাটের দূতের কাহিনী ১২৩

মিনহালের ঘটনা ১২৫

নবী পরিবারের পুনরায় কারবালায় গমন ১২৭

আহলে বাইত (আ.) যখন মদীনার নিকটবর্তী হলেন ১২৮

মদীনার উপকন্ঠে ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) ভাষণ ১৩১

মদীনার বাড়ীঘরের অবস্থা ১৩৩

ইমাম যয়নুল আবেদীনের (আ.) ক্রন্দন ১৩৭

তথ্যসূত্রঃ ১৩৯

বিভাগ:
পৃষ্ঠাসমূহ: