ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা
(১৬শ খণ্ড)
ইমাম হুসাইন (আ.) রাসূলের ওয়াসী এবং ধর্মের পুনর্জাগরণের শহীদ
মূল:
আল্লামা সায়্যিদ মুরতাযা আসকারী
অনুবাদ:
এম , এ , কাইউম(এম , এ) ও এস , এম , এ , জাব্বার (এম , এ)
প্রকাশনায়: আহলে বাইত (আ.) বিশ্ব সংস্থা
এই বইটি আল হাসানাইন (আ.) ওয়েব সাইট কর্তৃক আপলোড করা হয়েছে ।
http://alhassanain.org/bengali
আমাদের কথা
রাজশাহী মুহাম্মদী ফাউণ্ডেশনের আমরা দু’ ভাই সম্মিলিতভাবে এই পুস্তকখানা অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষি লোকদের নিকট পৌঁছাতে পেরে মহান আল্লাহর সমীপে অজস্র সাজদায়ে শুকর জ্ঞাপন করছি। আমরা মানুষ হিসেবে নিঃসন্দেহে সীমিত চিন্তা ভাবনার অধিকারী। কাজেই আমাদের কারোর পক্ষেই‘ আমি সব কিছু জানি ’ এই কথা বলা উচিত হবে না। আমাদের জানার অন্ত নেই। ইতিহাস সম্পর্কে আমরা যতটুকু জানি তারও বাইরে হয়ত বহু অজানা রয়ে গেছে। অত্র পুস্তকখানার সম্মানিত লিখক কারবালার সঠিক ইতিহাস , ইমাম হুসাইনের আন্দোলনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য এবং আন্দোলনোত্তর সময়ে এর প্রভাব ইত্যাদি বিষয়কে প্রমাণপঞ্জির আলোকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। আশা করি , সুহৃদয় পাঠকবৃন্দ এই পুস্তকখানা পাঠ করে উক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে নতুন কিছু জানার সুযোগ পাবেন।
অনুবাদে আমরা আরবী প্রতিবর্ণের ক্ষেত্রে ই , ফা ,বা , প্রকাশিত‘ আরবী অভিধান’ এবং বাংলা প্রতিবর্ণের ক্ষেত্রে‘ সংসদ বাঙ্গালা অভিধানের ’ প্রদত্ত নিয়ম মালা অনুসরণ করেছি আর যথাসাধ্য সহজ ভাষায় অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি। তবুও কোথাও কোনোরূপ ভুলত্রুটি দৃষ্টিগোচর হলে , আশা করি অনুগ্রহপূর্বক তা আমাদেরকে অবগত করাবেন। তাহলে পরবর্তী সংস্করণে আমরা তা সংশোধন করার সুযোগ পাব ইনশা আল্লাহ্।
বিনীত
অনুবাদকবৃন্দ
ভূমিকা
আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’ লামীন , ওয়াস্সালাতু ওয়াস্সালামু’ আলা মুহাম্মাদ , ওয়া আলিহিত্ত্বাহিরীন , ওয়া আসহাবিহিল মুন্তাজাবীন , ওয়াল্লানাতু আলা আ’ দায়িহিম্ আজমা’ ঈন , লা সিয়্যামা আল্ মুনাফিকীন।
“ ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা ” শীর্ষক ধারাবাহিক আলোচনায় অত্র খণ্ডটিকে‘ কারবালা আন্দোলন ও ইসলামের পুনর্জাগরণে ইমাম হুসাইনের (আ:) ভূমিকা’ বিষয়টির জন্য নির্ধারণ করেছি। এতে আমরা সংক্ষিপ্তাকারে অথচ সামগ্রিকভাবে স্থান , কাল ও সামাজিক কারণগত উপাদানসহ , তাঁর (আ.) আন্দোলনের বিভিন্ন দিক এবং বিপ্লবের উদ্দেশ্যসমূহকে আলোচনা ও পর্যালোচনা করব।
যেহেতু সাইয়্যেদুশ শুহাদার (আ.) বিপ্লবের ক্ষেত্রসমূহ ক্রমান্বয়ে প্রস্তুত হয়েছে এবং অপকর্ম ও বিচ্যুতিসমূহের মূল এর বহু বছর পূর্বে প্রোথিত সেহেতু এই বিপ্লবের পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও আমরা বাধ্য হয়েই তার কারণ ও পটভূমিসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করব এবং এর মাধ্যমে মুহাম্মদী নির্ভেজাল ইসলাম হতে উম্মতের বিমুখ ও বিচ্যুতির কারণসমূহকে , দূরবর্তী অতীতের মাঝে অনুসন্ধান করব। পূর্ব হতেই প্রসিদ্ধ অনেক সাহাবার প্রাণের গভীরে চরম গোত্রীয় গোড়ামী বিরাজ করছিল যার প্রকাশ সকল সময়ই সর্বত্র ঘটেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাদিতে , ফলাফলকে নিজ ইচ্ছার অনুকুলে নিয়েছে । এই কারণে , এই মহান আন্দোলনের সৃষ্টিকারী উপাদান ও উৎসসমূহকে ভালভাবে বুঝার জন্যে প্রথমে ইসলাম পূর্ব আরবের সামাজিক অবস্থা এবং তারপর ইমাম হুসাইনের ঐতিহাসিক বিপ্লব পূর্ব মুসলমানদের অবস্থার সামগ্রিক বর্ণনা দান করছি :
১ ইসলাম পূর্ব আরবের সামাজিক অবস্থা
ইসলাম পূর্ব আরব উপদ্বীপে বিশেষ ধরনের সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল । গোত্র ও শ্রেণী ভিত্তিক ঐ সমাজের লোকেরা মরুভূমি অতিক্রমকারী কাফেলা সমূহের উপর আক্রমণ ও লুটতরাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। তবে বিশেষ কিছু শহরে সীমিত চাষাবাদ ছিল এবং ব্যবসা বাণিজ্যের উপর ভিত্তি করে তাদের জীবন পরিচালিত হত। তাদের কোনো প্রকারের প্রশাসন ছিল না । সভ্যতা ও সংস্কৃতি হতে তারা দূরে ছিল। বিভিন্ন গোত্র ও কাফেলার উপর আক্রমণের সময় একে অপরকে বন্দী করে উকায বাজারের ন্যায় মক্কার আশপাশের বাজারগুলিতে এবং অন্যান্য জায়গাতেও বিক্রি করত। আর এইভাবে জীবিকা নির্বাহ করত !
মক্কায় রাসূলের (সা.) আগমনকে আরবদের গৌরবের বিষয় জ্ঞান করে (!) এমন ধরনের জাতীয়তাবাদী চেতনাসম্পন্ন কিছু আরবের সাথে একবার কথা বলছিলাম ! তাদেরকে বললাম :“ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা ডাক্তারকে সেই জায়গাতেই প্রেরণ করেন যেখানে রোগী থাকে। মহান আল্লাহ্ও মক্কায় রাসূলকে (সা.) এই কারণেই প্রেরণ করেছিলেন যে , তৎকালীন পৃথিবীতে মক্কার অধিবাসীদের অপেক্ষা অধিক রোগাক্রান্ত আর কেউ ছিল না ।” এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হচ্ছে‘ যাইদ ইবনে হারিছা ’ র গল্পটি।
যাইদ ইবনে হারিছার ঘটনা
যাইদ ইবনে হারিছা , শৈশবকালে আত্মীয় স্বজনকে দেখার উদ্দেশ্যে তার মায়ের সাথে অপর এক গোত্রে গেলে , লুণ্ঠনকারীর দল তাদের উপর আক্রমণ করে এবং সে পালাতে না পারায় বন্দী হয় ও উকাযের বাজারে তাকে বিক্রয় করা হয়। খাদীজার কর্মচারী তাকে ক্রয় করেন এবং খাদীজা তাকে উপহার হিসেবে রাসূলকে দেন। তিনিও (সা.) তাকে মুক্ত করে দেন এবং তারপর সে যখন রাসূলকে (সা.) পরিত্যাগ করতঃ নিজ পিতা ও চাচার সাথে নিজ গোত্রে ফিরে যেতে সম্মত হল না তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) কা’ বার নিকটে এবং জনগণের মাঝে ঘোষণা দিলেন যে , যাইদ তাঁর পালিত পুত্র।
যাইদের ঘটনাটি ইসলাম পূর্ব আরবের জনগণের সাধারণ অবস্থার একটি দৃষ্টান্ত ছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর এই জনগণের অধিকাংশই হঠাৎ করে পরিবর্তিত হয়ে যায়। মক্কা ও মদীনা আলোর কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং এমন এক অবস্থায় উপনীত হয় যে , এক আনসার যুবক বদর যুদ্ধে রাসূলের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বলে :“ হে আল্লাহর রাসূল ! যে ব্যক্তি এই দলের সাথে যুদ্ধ করবে ও মারা যাবে তার পুরস্কার কী ?” উত্তরে তিনি বলেনঃ“ বেহেশ্ত ।” সেই যুবক বললেন :“ বাহ্ বাহ্ ! আমার এবং বেহেশ্তের মাঝে শুধুমাত্র এই খোরমাগুলিই ব্যবধান যা আমি খাচ্ছি !” সেগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়। হ্যাঁ , তখন যুদ্ধ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পরকালীন সুখের জন্যে। ইসলামের আলো , কুরআন ও রাসূল (সা.) তাদেরকে পরিবর্তিত করেন। কিন্তু অনুতাপ এই যে , অল্প সময়ের মধ্যেই , রাসূলের (সা.) ইন্তেকালের সাথে সাথে তাদের অনেকেই ইসলামের আলোকে অন্ধকারে রূপান্তরিত করে এবং তাঁর মিশনকে এমন জায়গায় পৌঁছায় যে , শহীদগণের সেনাপতির বিদ্রোহ এবং তাঁর হৃদয় বিদারক শাহাদত ব্যতীত ইসলামের পুনর্জীবন সম্ভব ছিল না।
২. ইমাম হুসাইনের (আ.) বিপ্লবের পূর্বে মুসলমানদের সামাজিক অবস্থা
পবিত্র কুরআনে কতিপয় সাহাবীর চিত্র
প্রথমে কুরআনুল কারীমের ভাষায় মুসলমানদের ব্যবহারিক চিত্রকে বর্ণনা করব যাতে করে তৎকালীন সমাজের আত্মিক ও নৈতিক অবস্থা এবং পরবর্তী বংশধরের উপর তার যে প্রভাব পড়েছে তার পূর্ণ পরিচিতির মাধ্যমে ইমাম হুসাইনের (আ.) আন্দোলনের উদ্দেশ্যকে আমরা ভালভাবে বুঝতে পারি।
ক .অপবাদ ও কুৎসা রটনা
বিশেষ একটি দল যারা রাসূল (সা.) এর পরিবারের উপর অপবাদ আরোপ করে এবং তারপর তা প্রচার করে , কুরআনুল কারীম তাদেরকে“ উসবাতুন মিনকুম ” অর্থাৎ তোমাদের মাঝ হতে শক্তিশালী একটি দল বলে উল্লেখ করে বলেছে:
) إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُم(
“ নিশ্চয় যারা সেই বৃহৎ অপবাদ রটনা করেছে তারা ছিল তোমাদের মাঝের শক্তিশালী একটি দল। তা তোমরা নিজেদের জন্য ক্ষতিকর ভেব না ।” ১
উম্মুল মু’ মিনীন আয়িশা ’ র বর্ণনা মতে ইফ্কের ঘটনাটি তাঁরই সাথে জড়িত।২ তবে অপর একটি বর্ণনা মতে“ মারিয়া কিব্তীয়ার ” সাথে জড়িত।
কিন্তু যাই হোক , ঘটনা যার ব্যাপারেই হোক , রাসূল (সা.) এর পরিবারের উপর অপবাদ আরোপ ! (আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি !) তাঁর মর্যাদা ও সম্মানের উপর আঘাত হানা হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে যে , এই ধরনের সুসংগঠিত শক্তিশালী দল , যারা আল্লাহর রাসূলের (সা.) পরিবারের প্রতি অপবাদ আরোপ ও কুৎসা রটনা করে , তারা কী মিথ্যা হাদীছকে আল্লাহর রাসূলের সাথে সম্পৃক্ত করবে না এবং জাল ও বানোয়াট হাদীছ বর্ণনা করবে না ?
খ .ব্যবসা বাণিজ্য ও খেলাধুলা
পবিত্র কুরআন সূরা জুমু’ আয় একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছে যা রাসূলের যুগে তিনি জুমু’ আর নামাযে খুৎবাদানরত অবস্থায় সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনাটি খুলাফা (সুন্নী) মতাদর্শের সমস্ত তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ্ বলেন :
) وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا قُلْ مَا عِندَ اللَّـهِ خَيْرٌ مِّنَ اللَّـهْوِ وَمِنَ التِّجَارَةِ وَاللَّـهُ خَيْرُ الرَّازِقِينَ(
আর যখন তারা কোনো ব্যবসা কিংবা চিত্তবিনোদন ও ক্রীড়া কৌতুক দেখে তখন তারা তোমাকে (রাসূল) দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে দিয়ে তার দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছুটে যায় ! বল , যা কিছু আল্লাহর নিকট আছে তা ক্রীড়া কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। মহান আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা ।” ৩
ঘটনাটি নিম্নরূপ
রাসূল আকরাম (সা.) জুমু’ আর নামাযের খুৎবা দানরত অবস্থায় ছিলেন , এমন সময় একটি বাণিজ্য কাফেলা মদীনায় প্রবেশ করে এবং ঢাক ঢোল বাজিয়ে জনগণকে পণ্য ক্রয়ের জন্যে আহ্বান করে। মদীনার লোকেরা রাসূলকে দণ্ডায়মান অবস্থায় পরিত্যাগ করতঃ বাণিজ্য কাফেলার দিকে ছুটে যায় , যাতে পণ্য ক্রয় এবং বিনোদন করার ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে না থাকে। আর মুসল্লীদের মধ্য হতে নারী পুরুষ মিলে মাত্র বিশজন লোক অবশিষ্ট থাকে ! এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে ,পবিত্র এ আয়াতের উপর ভিত্তি করে এই ধরনের লোকেরা যারা আল্লাহর রাসূলের বক্তব্য শ্রবণ এবং জুমু’ আর নামায অপেক্ষা ব্যবসা বাণিজ্য ও চিত্তবিনোদনকে অগ্রাধিকার দেয় , তাদের উপর কি আস্থা ও বিশ্বাস রাখা যেতে পারে ? শুধুমাত্র রাসূলের সাহাবী হওয়ার কারণেই কি এমন ধরনের লোকদের নিকট হতে আল্লাহর দ্বীন ও রাসূলের সুন্নতকে গ্রহণ করা যায় ? সেও আবার কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের সবার নিকট হতেই ?! যেমন কতিপয় মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি এমনই !
গ .মুনাফিকী ও কপটতা
সূরা তওবায় মহান আল্লাহ্ এমন ধরনের মুনাফিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন যে , শুধুমাত্র মহান আল্লাহ্ই তাদেরকে চিনেন ; এই মুনাফিকরা মদীনার চতুষ্পার্শ্বে এবং স্বয়ং মদীনার অভ্যন্তরেও রয়েছে। তারা কপটতার চর্চা করে এবং এক্ষেত্রে তারা অভিজ্ঞ । মহান আল্লাহ্ বলেনঃ
) وَمِمَّنْ حَوْلَكُم مِّنَ الْأَعْرَابِ مُنَافِقُونَ وَمِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ مَرَدُوا عَلَى النِّفَاقِ لَا تَعْلَمُهُمْ نَحْنُ نَعْلَمُهُمْ سَنُعَذِّبُهُم مَّرَّتَيْنِ ثُمَّ يُرَدُّونَ إِلَىٰ عَذَابٍ عَظِيمٍ(
“ মরুবাসীদের মধ্যে যারা তোমাদের আশেপাশে আছে তাদের কেউ কেউ মুনাফিক এবং মদীনাবাসীদের মধ্যেও কেউ কেউ , তারা কপটতায় সিদ্ধহস্ত। তুমি তাদেরকে জান না ; আমরা তাদেরকে জানি। আমরা তাদেরকে অচিরেই দুইবার শাস্তি দিব এবং অতঃপর তারা প্রত্যাবর্তিত হবে মহাশাস্তির দিকে !” (সূরা তওবা , আয়াত নং:১০১)
চিন্তা করছেন কী ! অতি সংগোপনে ও সিদ্ধহস্তে মুনাফিকী করা ! এমন ধরনের মুনাফিক যে , কুরআনের বর্ণনা অনুসারে রাসূল আকরামও (সা.) তাদেরকে চিনেন না !
এরা আবার রাসূলের চারদিকের লোকদেরই অংশ বিশেষ ! তারাও সুন্নী মতাদর্শে সাহাবা হিসেবে আখ্যায়িত। আর (কুল্লুহুম ’ ঊদূল) সকলেই ন্যায়পরায়ণ হিসেবে পরিচিত হয়েছে ! শুধুমাত্র এই কারণেই যে , একবার হলেও তো রাসূলকে দেখেছে !
ঘ. রাসূল আকরাম(সা.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র
সুন্নী ইতিহাস গ্রন্থ গুলিতে এসেছে : আল্লাহর রাসূল (সা.) তাবুকের অভিযান হতে সিপাহীদের নিয়ে ফিরে আসার সময় , পথিমধ্যে একটি উপত্যকায় পৌঁছলে মুনাফিকদের এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জানতে পারেন যে , তারা তাকে হত্যায় গভীর সংকল্পবদ্ধ। এই কারণে , সিপাহীরা উপত্যকাটির ভিতরে প্রবেশ করার উপক্রম হলে , রাসূল (সা.) গিরিপথের সম্মুখভাগে এগিয়ে গিয়ে যাত্রায় বিরতি দেন এবং আম্মার ও হুযায়ফাকে তাঁর সঙ্গে আসতে বলেন। আম্মার উটের লাগাম ধরে সামনে টানতে থাকেন আর হুযায়ফা উটটির পিছন হতে চালনা করেন। পথিমধ্যে মুনাফিকদের কন্ঠ শুনতে পান যে , তারা তাঁদেরকে অবরোধ করে ফেলেছে এবং রাসূলের উটটি এতে চমকে উঠলে হুজায়ফা ও আম্মার সেইটিকে নিয়ন্ত্রণ করেন , আর তারা মুখমণ্ডলে নেকাব পরিহিত থাকলেও হযরত হুযায়ফা তাদের বাহন দেখে অনেককেই সনাক্ত করতে পারেন। মুনাফিকরা এমন অবস্থা দেখে সেইখান হতে পলায়ন করে। রাসূল (সা.) বলেন :“ তোমরা কি জান , তারা কেন এসেছিল এবং কি চাচ্ছিল ?”
তাঁরা উত্তর দিলেন :“ হে আল্লাহর রাসূল ! আমরা তা জানি না !” তিনি বললেন :“ আমাকে এই গিরিপথ হতে নিচে ফেলে দেয়ার জন্যে এরা ষড়যন্ত্র করে ছিল !” সাহাবীগণ সবিনয়ে জানতে চাইলেনঃ“ তাদেরকে হত্যা করার জন্যে আপনি কি আদেশ দিবেন না ?” তিনি বললেনঃ“ আমি এতে সন্তুষ্ট নই যে , লোকেরা বলুক : মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহাবাদের রক্তে নিজের হাতকে রঞ্জিত করেছেন !” অতঃপর , আম্মার ও হুযায়ফার নিকট তিনি তাদের নামগুলি বললেন এবং তাদের উভয়কে বললেনঃ“ তোমরা এটিকে গোপন রেখ !” ৪
লেখক বলেন :“ আমি আজ পর্যন্ত বিভিন্ন গ্রন্থের উপর গবেষণা করে তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজনকে সনাক্ত করতে পেরেছি , সেই ব্যক্তি হচ্ছে“ আবু মূসা আশ্আরী ।”
আহলে বাইত (আ.) মতাদর্শের অনুসারীদের গ্রন্থসমূহে এসেছে : এই ষড়যন্ত্রটি“ আকাবায়ে হারশাতে ” ঘটেছিল এবং এইটি গাদীরে খুমের ঘটনার পরে সংঘটিত হয়েছিল , এই মতটি অধিকতর বিশুদ্ধ বলে মনে হয়। কারণ বিষয়টি ছিল হযরত আলীকে ইমামতের দায়িত্বে মনোনীত করা নিয়ে। তবে যাই হোক এবং যে কোনো বিষয় সম্পর্কিত হোক , সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই যে , তারা ছিল রাসূলের সাহাবা এবং তাদের তাঁকে হত্যা করার গভীর সংকল্প ছিল। তাদের সংখ্যা বিশ জনের কিছু বেশী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে , তাদের মধ্যে শুধুমাত্র একজনকেই সনাক্ত করতে পেরেছি , সে হচ্ছে আবু মূসা আশ্আরী।
ঙ. রাসূলের মুমূর্ষু অবস্থা ও উসামার সৈন্য
রাসূল (সঃ) মুমূর্ষু অবস্থায়ও ফেৎনা নিরসন এবং শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী সাহাবীদের অভ্যুত্থানের পথ রোধর জন্যে একটি পরিকল্পনা করেন। তিনি উসামার বাহিনীতে যোগদানের আদেশদানের মাধ্যমে সবাইকে মদীনার বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন । উসামা শহীদ যাইদ ইবনে হারিছার পুত্র এবং আঠার বছরের যুবক ছিলেন। উসামাকে সেনাপতি হিসেবে নির্বাচন করতঃ যুবক ও বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে আদেশ দেন যে , তারা সবাই যেন তার সেনাবাহিনীতে যোগদান করে। সকলকে উসামার নেতৃত্বে মদীনা হতে যাত্রা করতে বলেন । এই সেনাবাহিনীতে হযরত আবু বকর , উমর , আবু উবাইদা জাররাহ , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ , সা’ দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস , সা’ দ ইবনে উবাদা ’ র মত ব্যক্তিগণ এবং আরও প্রথিতযশা ও খ্যাতনামা সাহাবীগণ ছিলেন। তারা প্রথমতঃ ছিদ্র অন্বেষণকারীর পরিচয় দেন এবং বলেন :“ আঠার বছর বয়সের একজন যুবককে আমাদের নেতা মনোনীত করেছেন ?” আর এই কথা বলার পাশাপাশি যাওয়া থেকেও বিরত থাকেন! রাসূল আকরাম (সা.) তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করে বলেন:“ লা’ আনাল্লাহু মান্ তাখাল্লাফা’ আন্ জায়শি উসামাহ্ ।” “ যারা উসামার সেনাবাহিনীতে যোগদান করা হতে বিরত থাকবে আল্লাহ্ তাদের প্রতি লা’ নত করুন !”
উসামার সেনাবাহিনী যাত্রা করে মদীনা হতে কয়েক কিলোমিটার দূরে জারাফ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে। আর ঐ অবস্থায় রাসূলের অসুস্থতা তীব্র আকার ধারণ করে এবং এই সংবাদ সেনা শিবিরে পৌঁছিলে মুহাজির ও আনসারদের শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মদীনায় ফিরে আসেন। ফজরের সময় বাড়ীর দরজার সামনে হযরত বিলাল এসে“ আস্ সালাহ্ , আস্ সালাহ্ , ইয়া রাসূলাল্লাহ্ !” বলে আওয়াজ দেন , এই অবস্থায় রাসূল (সা.) যেহেতু হযরত আলীর (আ.) হাঁটুর উপর মাথা রেখে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে ছিলেন সেহেতু এই অবস্থাটিকে উম্মুল মু’ মিনীন আয়িশা সুবর্ণ সুযোগ মনে করেন এবং বিলালকে বলেন :“ রাসূল বলেছেন , আবু বকরকে আমার স্থানে নামায পড়াতে বলো !” আবু বকর মসজিদে গিয়ে রাসূলের স্থানে নামায আদায় করতে দাঁড়ালে রাসূলের জ্ঞান ফিরে আসে এবং তিনি আবু বকরের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। তখন তিনি বলেন :“ আমাকে উঠাও ! আমাকে উঠাও !” অতঃপর ওযু করেন। সহীহ্ বোখারীর বর্ণনা অনুসারে , তিনি পথ চলতে পারছিলেন না , তাঁর পা দু’ খানা মাটিতে ঘর্ষিত হচ্ছিল এই অবস্থায় তিনি দু’ জন লোকের কাঁধে ভর দিয়ে মসজিদে গমন করেন এবং আবু বকরের নামাযকে ভঙ্গ করে তিনি বসা অবস্থায় নামায পড়ান। নামাযের পর তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দান করেন এবং সেই দিনই তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন।
চ. ইন্তেকালের সময় এবং“ হাসবুনা কিতাবুল্লাহ্”
নামায সমাপ্ত করে রাসূল (সা.) বাড়ীতে ফিরে আসেন আর শীর্ষস্থানীয় সাহাবাগণ তাঁর চারিদিকে সমবেত হন। বাহ্যতঃ নামাযের ব্যাপারটিকে কেন্দ্র করে আবু বকর লজ্জিত হওয়ার কারণে অনুমতি নিয়ে সানাহ্ ’ তে তার বাড়ীতে চলে যান। তবে উমর ইবনুল খাত্তাব তার বিশেষ দল নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। সহীহ্ বোখারীর বর্ণনা অনুসারে রাসূল (সা.) বলেনঃ“ হালুম্মা আকতুবু লাকুম কিতাবান্ লান্ তাযিল্লু বা ’ দাহ্ ” অর্থাৎ এসো ! তোমাদের জন্যে এমন কিছু লিখে দিব যে , এরপর তোমরা কখনই পথভ্রষ্ট হবে না।৫
তারা যেহেতু জানতেন যে , রাসূল (সা.) কি লিখবেন , তার জন্যে তারা প্রতিক্রিয়া দেখালেন। হযরত উমর বললেনঃ“ হাসবুনা কিতাবুল্লাহ্ ” আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্যে যথেষ্ট !” রাসূলের একজন স্ত্রী , বাহ্যতঃ যয়নব বিনতে জাহ্হাশ হবেন , তিনি বললেনঃ“ আপনারা দেখেন , রাসূল কি চাচ্ছেন ! তিনি কি বলছেন , আপনারা কি তা শুনছেন না ?”
হযরত উমর বললেনঃ“ আন্তুন্না সাওয়াহিবু ইউসুফা ।” তোমরা ইউসুফের আসক্তা । রাসূলের অবস্থা যদি ভাল হয় তবে তাঁর কলার চেপে ধর এবং খরচা চাও । আর যদি তিনি অসুস্থ থাকেন তবে কান্না কাটি করো !” রাসূল তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন এবং যখন তাঁর আহ্বানে কেউ সাড়া দিতে যাচ্ছিল তখন হযরত উমর বললেনঃ“ ইন্নার রাজুলা লাইয়াহ্জুরু ” অর্থাৎ এই লোকটি ভুল বকছেন ! (সুব্হানাল্লাহ্ !)
সহীহ্ বোখারী , মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে এই কথাটি কে বলেছেন উল্লেখ করা হয়নি। তবে স্পষ্ট যে , দ্বিতীয় খলীফা ব্যতীত অপর কেউ এই ধরনের ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস রাখত না ! পরিশেষে অপর একদল লোক বললেন :“ হে আল্লাহর রাসূল ! আমরা কি নিয়ে আসব ?” তিনি প্রতি উত্তরে বললেন :“ না , এরপর আর কি নিয়ে আসবে ?” অর্থাৎ যদি তারা আনতেন এবং রাসূল (সা.) লিখতেনও তবুও শেষে তারা বলত :“ রাসূল (সা.) ভারসাম্যহীন অবস্থায় ছিলেন এবং ভুল বকছিলেন !” আর এইটি রাসূলের (সা.) অপর বক্তব্যগুলিও সন্দেহপূর্ণ ও দুর্বল প্রতিপন্ন হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াত। এই কারণে তিনি বললেন :“ আমার নিকট হতে চলে যাও , আমার নিকটে গণ্ডগোল করা সঙ্গত নয় !”
অবশেষে , রাসূল (সা.) হযরত আলীর (আ:) হাঁটুর উপর মাথা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। আল্লাহর রাসূলের (সা.) ইন্তেকালের সাথে সাথে মদীনার আনসারগণ ক্ষমতাকে হস্তহত করার লক্ষ্যে সকীফা’ য় সমবেত হন! লক্ষ্য করুন! যদি কোনো এলাকার মসজিদের একজন ইমাম সাহেব ইন্তেকাল করেন তবে লোকজন সমবেত হয়ে তার জানাযা , গোসল , কাফন ও দাফনের জন্যে নিজেদেরকে প্রস্তুত করেন। আর তার অপেক্ষা উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কোন ব্যক্তি , যেমন মারজায়ে তাক্বলীদ (যে আলেম ও ফকীহকে শরীয়তের বিধি বিধানের ক্ষেত্রে অন্যরা অনুসরণ করে) হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এখানে আল্লাহর রাসূলের পবিত্র (সা.) দেহ মোবারককে মাটির উপর রেখে দিয়ে স্বীয় আকাঙ্খা পূরণে রত হন !
সকীফাতে আনসারগণ সমবেত হন এবং অসুস্থ সা’ দ ইবনে উবাদাহ্ খাযরাজীর হাতে বাইআত করার উদ্দেশ্যে সেখানে তাকে নিয়ে যান । কিন্তু আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের দীর্ঘ দিনের প্রতিযোগিতা বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং পারস্পরিক শত্রুতার ক্ষেত্রে জাহেলী সাম্প্রদায়িকতা ও গোত্রীয় প্রবণতা জেগে উঠার ফলে আউস গোত্রটি সা’ দের ক্ষমতা গ্রহণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আনসারগণের বিপক্ষীয় দল অর্থাৎ কুরাইশী মুহাজিরগণও অতি দ্রুত মদীনার বাইরে থেকে আবু বকরকে এনে তাদের সাথে মিলিত হন এবং সুকৌশলে উমর , আবু উবাইদাহ্ জাররাহ এবং আরও কতিপয় মুহাজির যারা খিলাফতকে কুক্ষিগত করার চিন্তায় ব্যস্ত ছিলেন খাযরাজীদের বিপক্ষের কতিপয় আনসারের সহযোগিতায় আবু বকরের হাতে বাইআত করেন এবং তারপর আবু বকরের হাতে বাইআত গ্রহণের জন্যে জনগণকে বাধ্য করেন। অতঃপর মসজিদ অভিমুখে গমন করেন এবং পথিমধ্যে যাকেই পান তারই হাত ধরে আবু বকরের হাতে বাইআত করান।
অপরপক্ষে , রাসূলের (সা.) চাচা হযরত আব্বাস আমীরুল মু’ মিনীন আলীকে বললেন :“ ভাতিজা ! তুমি তোমার হাত বাড়াও , আমি বাইআত করি তাহলে লোকেরা বলবে যে , রাসূলের চাচা তাঁর ভাতিজার হাতে বাইআত করেছেন এবং অপর কেউ তোমার (উপযুক্ততার) ব্যাপারে মতভেদ করবে না !” ইমাম বললেন :“ ...রাসূলের কাফন দাফনের ব্যবস্থা করাই আমাদের উচিত , এটিই এখন আমাদের কাজ এবং এটিই যথেষ্ট !” যারা রাসূলের কাফন ও দাফনের কাজের জন্যে অবশিষ্ট ছিলেন তারা হলেন আব্বাস , ইবনে আব্বাস , ইমাম আলী (আ.) সহ মোট পাঁচজন !
সারকথা , ইমাম আলী (আ.) খেলাফতের ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করেন নি এবং শুধুমাত্র রাসূলের গোসল ও কাফনের কাজেই ব্যস্ত থাকেন। অতঃপর তাঁর জানাযার নামায আদায় করেন এবং অপর যারা উপস্থিত ছিলেন তারাও আল্লাহর রাসূলের উপর জানাযার নামায আদায় করেন। তারপর , সোমবার কিংবা মঙ্গলবারের আসরের সময় হতে বুধবারের রাত অর্থাৎ রাসূলের দেহ মোবারককে দাফন করা পর্যন্ত সবাই দলে দলে আসতে থাকেন এবং রাসূলের জানাযার নামায আদায় করতে থাকেন। কারণ সবার উপর এই জানাযার নামায ওয়াজিব ছিল ; অন্যদিকে তখন খিলাফতের জবরদখলের কাজের সমাপ্তি ঘটছিল এবং রাসূলের সাহাবীগণ খিলাফতকে তাদের নিজেদের কাঙ্খিত পথে নিয়ে যাচ্ছিলেন ও সঠিক পথ হতে বিচ্যুত করলেন।
৩ আবু বকরের কঠোর হস্তের শাসন ও রূঢ় রাজনীতি
ক) ফাতিমার (আ.) গৃহে অবস্থানগ্রহণকারী বিরোধীদের সাথে আচরণ
ইমাম আলী (আ.) ও তাঁর সঙ্গী সাথিদের বাইআত না করা এবং হযরত ফাতিমার (আ.) গৃহে তাঁদের অবস্থান গ্রহণ সম্পর্কিত হাদীছটি মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং জীবনচরিত , ইতিহাস , সহীহ্ ও মুসনাদ হাদীসগ্রন্থ , সাহিত্য , কালামশাস্ত্র , রিজালশাস্ত্র এবং অন্যান্য সকল গ্রন্থে এসেছে।
উমর ইবনুল খাত্তাব বলেন :“ আমাদেরকে খবর দেয়া হল যে , হযরত আলী , যুবাইর এবং অন্যান্যরা যাঁরা তাঁদের সাথে রয়েছেন বাইআত না করে ফাতিমার (আ.) গৃহে সমবেত হয়েছেন ।”
অপর একটি বর্ণনায় এসেছেঃ“ আবু বকর , উমরকে আলীর (আ.) সন্ধানে প্রেরণ করেন এবং বলেন : যে কোনো প্রকারে হোক তাঁকে আমার নিকটে নিয়ে এস !” উমর ইমাম আলী (আ.) এর নিকট আসেন এবং উভয়ের মাঝে বাক্য বিনিময়ের মাঝে ইমাম তাকে বলেন :“ যেই দুধের কিয়দংশ তোমার ভাগ তা ভালভাবে দোহন করো ! আল্লাহর শপথ ! তোমার আজকের লালসা , তোমার আগামী দিনের ক্ষেত্র রচনার জন্যে !”
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন :“ উমর প্রজ্বলিত আগুন নিয়ে হযরত ফাতিমার (আ:) বাড়ীর দরজায় আসেন ! ফাতিমা (আ.) তাকে বলেন :‘ হে খাত্তাবের পুত্র ! আমার গৃহে অগ্নিসংযোগের জন্যে তুমি এসেছ ?’ তিনি বললেন :‘ হ্যাঁ , হয় আগুন লাগাব আর না হয় অন্যান্যদের মত তোমরাও বাইআত কর !’ অর্থাৎ খলীফার হাতে বাইআত করা হচ্ছে অগ্রগণ্য , এমনকি নিষ্পাপ ও পবিত্র আহলে বাইত এবং যাঁদের শানে তাত্বহীরের আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে তাঁদের চাইতেও অগ্রগণ্য ! রাসূল আকরাম (সা.) নামাযের সময় তাঁদের বাড়ীর দরজায় দাঁড়াতেন এবং বলতেন :
) السلام علیکم یا اهل البیت: إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا(
“ আস্ সালামু’ আলাইকুম ইয়া আহলাল বাইত: হে আহলে বাইত ! মহান আল্লাহ্ তোমাদের থেকে সকল ধরনের অপবিত্রতাকে দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান ।”
উমর এই গৃহে আগুন লাগাতে উদ্যত হন কেন ? এই উদ্দেশ্যে যে , কেউ যাতে আবু বকরের খেলাফতের সাথে বিরোধিতা করার সাহস করতে না পারে । লৌহ শাসনের এ নীতি এমন যে , কোনো রকমের সীমারেখা চিনে না ! এমন রাজনীতি মুয়াবিয়ার ন্যায় রাজনীতিবিদদের জন্যে পথকে সুগম করে দেয় এবং ফলে এ থেকে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত না হতেই‘ ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়ার ’ মত শাসক ক্ষমতায় আসে যে আল্লাহর রাসূলের শহর মদীনায় তার অনৈসলামিক ও ধর্মদ্রোহী কর্মের প্রতিবাদকারীদের দমনের জন্য সৈন্য প্রেরণ করে যে সৈন্যরা সাহাবী ও তাবেয়ীদের হত্যা ও বিশ হাজার কুমারী মুসলিম নারীর সম্ভ্রমহানী করে। কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার অব্যবহিত পরে সংঘটিত হাররা নামে প্রসিদ্ধ এ ঘটনার ফলে সহস্র শিশু জন্মগ্রহণ করে যাদের পিতৃ পরিচয় ছিল না !! হ্যাঁ , ফাতিমার (আ:) গৃহের সম্মানহানীর মাধ্যমে পবিত্র মক্কা ও মদীনার সম্মানহানীর পথ উম্মুক্ত করা হয় এবং কা’ বায় অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করার জন্য‘ ইয়াযীদ ও হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের ’ পথ সুগম হয় এবং ইসলামের সমস্ত সুমহান মূল্যবোধের উপর কুরাইশী খিলাফত প্রাধান্য পায় ! অতএব , ইসলামের মান সম্মান খর্ব করার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল সকীফাতে ! সকীফাই মুয়াবিয়ার নির্মাতা , ইয়াযীদকে প্রতিপালন করেছে এবং হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের জন্ম দিয়েছে ! আহলে বাইতের বিরুদ্ধে লৌহ কঠিন দমন নীতি এবং ফাতিমা যাহরা (আ.) এর গৃহদ্বারে অগ্নিসংযোগের রাজনীতিই কারবালার সৃষ্টি করেছিল !
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন :“ আবু বকর মৃত্যুর সময় বলতেন , হায় ! ফাতিমার বাড়ীর সম্মানকে যদি রক্ষা করতাম এবং সেটিকে যদি বেগানা লোকদের সম্মুখে উন্মুক্ত না করতাম , এমনকি যদি তাঁরা যুদ্ধের জন্যেও সেইখানে একত্রিত হয়ে থাকতেন !” ৬
ইয়াকুবীর বর্ণনায় এসেছে যে , আবু বকর বলতেনঃ“ হায় ! আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার বাড়ীতে যদি অনুসন্ধান না চালাতাম এবং লোকজনকে সেইখানে প্রবেশ না করাতাম , এমনকি যুদ্ধের জন্যেও যদি তা বন্ধ করা হয়ে থাকে !৭
ফাতিমা যাহরার (আ.) বাড়ীতে প্রবেশকারী কতিপয় ব্যক্তির নাম , ঐতিহাসিকগণ নিম্নরূপ উল্লেখ করেছেনঃ
১. উমর ইবনুল খাত্তাব , ২. খালিদ ইবনে ওয়ালীদ , ৩. আব্দুর রহমান ইবনে আউফ , ৪. ছাবিত ইবনে ক্বায়িস শাম্মাস , ৫. যিয়াদ ইবনে লাবীদ , ৬. মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা , ৭. যায়িদ ইবনে ছাবিত , ৮. সালামাহ্ ইবনে সালামাহ্ ইবনে ওয়াক্কাশ , ৯. সালামাহ্ ইবনে আসলাম , ১০. উসাইদ ইবনে হুযাইর।৮
ফাতিমার (আ.) বাড়ীতে কিভাবে প্রবেশ করে
তাবারী বলেনঃ“ উমর ইবনুল খাত্তাব‘ আলীর ’ গৃহের নিকট আসেন , সেই গৃহে তালহা , যুবাইর এবং মুহাজিরদের কতিপয় লোক জমা হয়ে ছিলেন। যুবাইর কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে বেরিয়ে আসেন কিন্তু তাঁর পা কেঁপে উঠে। মাটিতে হোঁচট খান। তাঁর হাত থেকে তরবারিখানা মাটিতে পড়ে যায়। আগতরা সাথে সাথে তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকে বন্দী করে ।” ৯
আবু বকর জওহারী বলেন :“ আলী (আ.) বলছিলেন ,‘ আমি আল্লাহর বান্দা এবং আল্লাহর রাসূলের ভাই ’ এ অবস্থায়ই তাঁকে আবু বকরের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। তারা তাঁকে বলছিলেনঃ‘ বাইআত করো !’ তিনি বলেনঃ‘ এই বিষয়ে তোমাদের অপেক্ষা আমিই শ্রেয় ! তোমাদের হাতে বাইআত করব না বরং তোমরাই আমার হাতে বাইআত কর ! আল্লাহর রাসূলের সাথে আত্মীয়তার যুক্তি উপস্থাপন করে তোমরা খিলাফতকে আনসারদের কব্জা থেকে বের করে এনেছো এবং আনসারগণ তোমাদের যুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে শাসনক্ষমতাকে তোমাদের নিকট অর্পণ করেছে। তোমরা যে যুক্তি উপস্থাপন করেছো , আমিও তা উপস্থাপন করতঃ বলব , যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তবে আমাদের ব্যাপারে ন্যায়বিচার করো ! আনসারগণ তোমাদের জন্যে যা স্বীকৃতি প্রদান করেছে তা আমাদের জন্যে তোমরা স্বীকৃতি প্রদান করো ! আর তা না হলে , তোমরা জেনে শুনে অন্যায় করবে এবং তার দায় দায়িত্ব নিজ কাঁধে বহন করবে !’ উমর বলেন :‘ আপনি বাইআত না করা পর্যন্ত আপনাকে মুক্ত করা হবে না !’ আলী তাকে বললেন :‘ হে উমর ! আজ আবু বকরের শাসনক্ষমতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করো তাহলে আগামী দিন তা তোমার নিকট ফিরে আসবে ! না , আল্লাহর কসম ! তোমার বক্তব্য গ্রহণ করব না এবং তার হাতে বাইআত করব না !’
আবু বকর বললেন :‘ আমার নিকট যদি বাইআত না করেন তবে আপনাকে আমি বাধ্য করব না।’ ১০
সালিম ইবনে কাইস বলেনঃ“ সালমান ফারসীকে জিজ্ঞাসা করলাম যে , ফাতিমার (আ.) বিনা অনুমতিতে কী তারা তাঁর বাড়ীতে প্রবেশ করেছিলেন ? সালমান বলেন : আল্লাহর কসম ! হ্যাঁ , অনুমতি ছাড়াই প্রবেশ করেছিলেন এবং তখন তাঁর মাথায় চাদর ছিল না ! তিনি চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন : হে পিতা ! হে আল্লাহর রাসূল ! কবরে তোমার চক্ষুদ্বয় এখনও প্রশান্ত হয়নি অথচ আবু বকর ও উমর কি অন্যায়েই না রত হয়েছে ! আর এইগুলি উচ্চৈঃস্বরে তিনি বলছিলেন ।” হ্যাঁ , তারা এতদূর পর্যন্ত দুরাচার করেছিলেন যে , রাসুলের কন্যা ফাতিমার (আ.) পাঁজর ভেঙ্গে গিয়েছিল এবং তার গর্ভপাত ঘটেছিল যার ফলে তার গর্ভস্থ শিশু মুহ্সিন মৃত্যুবরণ করেছিল । তিনি নিজেও অন্তিম শয্যায় শায়িত হয়েছিলেন ! আর সেই অবস্থাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং বিশ্বজগতের প্রতিপালক ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারকের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন !
হ্যাঁ , এই সব সকীফা হতেই হয়েছিল ; তারা ফাতিমার গৃহের সম্মানহানী করে তাঁর বাড়ীতে প্রবেশ করে । ইয়াযীদও কাবা গৃহ ও আল্লাহর রাসূলের শহরের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করে সেইখানে সৈন্য সমাবেশ ঘটায় এবং গণহত্যা করে ও আল্লাহর ঘরের উপর পাথর বর্ষণ করে । ফাতিমার বাড়ীর মর্যাদা হানীর মাধ্যমে এ ধারার সূত্রপাত হয় এবং তা অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ কা’ বাকে গুঁড়িয়ে দেয় , আগুন লাগায় , চেঙ্গিজরা ইসলামী দেশগুলির উপর আক্রমণ করে , ক্রুসেডাররা (খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধারা) মুসলমানদের উপর গণহত্যা চালায় । আর আজকে ইসলামের লেবাসধারী কথিত মুসলিমরা(জংগী সংগঠন) মুসলিম নিধনে নেমেছে ।
এরা সকলেই সকীফার বৈঠক , সাহাবাদের জীবনধারা এবং আবু বকরের কর্মপদ্ধতি হতে শিক্ষা গ্রহণ করেছে ! অদ্ভুত ব্যাপার এই যে ,পরবর্তীতে এই ধরনের আচরণকে ইসলামের সুন্নত হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ছয়সদস্য বিশিষ্ট পরিষদ হযরত আলীর প্রতি আহ্বান জানায় যে , তিনি যেন আল্লাহর কিতাব , রাসূলের সুন্নত এবং শাইখাঈনের (আবু বকর ও উমর) আদর্শ অনুযায়ী আমল করেন ! প্রকৃতই ইসলামের নীতিবোধ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল ! যে ধারার রাজনীতি হযরত ফাতিমা যাহরার (আ.) বাড়ীর দরজায় আগুন লাগায় ; হযরত আলী (আ.) কী তদনুযায়ী আমল করতে পারেন এবং সেইটিকে কী সত্যায়ন করতে পারেন ?! আলীর পুত্র হুসাইন (আ.) কি ইসলামের মূলোৎপাটনকারী এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে নীরব থাকতে পারেন ?!
হ্যাঁ , বেহেশ্তবাসী যুবকদের সর্দার (নেতা) এই সৈন্যদের দ্বারাই নিহত হন , ফাতিমার বাড়ীতে হামলাকারী সৈন্য , সকীফার সৈন্য এবং কুরাইশী খিলাফতের সৈন্যদের দ্বারা !!
খ. আহলে বাইতের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ ও ফাদাক বাজেয়াপ্তকরণ
কয়েকদিন পর ক্ষমতার ভিত্তিগুলি সুদৃঢ় এবং সার্বিক অবস্থার উপর শাসকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল তখন তারা পরামর্শ করে হাশিমী বংশ বিশেষতঃ আল্লাহর রাসূলের আহলে বাইতের সদস্যদের অবরোধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই উদ্দেশ্যে , অতি সূক্ষ্ম নীলনকশার মাধ্যমে তাঁদের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করে এবং তারই প্রারম্ভিকা হিসেবে‘ ফাদাক ’ , যেটি রাসূল আকরাম (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় হযরত ফাতিমাকে (আ.) দান করেছিলেন , সেইটিকে বাজেয়াপ্ত করে। ঘটনাটির বিশদ বিবরণ নিম্নরূপ :
খয়বর বিজয় ও ইহুদীদের বিভিন্ন দুর্গ উন্মুক্ত হওয়ার পর , সেগুলিতে পুঞ্জীভূত বিপুল পরিমান অর্থ সম্পদ দ্বারা রাসূল (সা.) ও সমস্ত মুসলমান অর্থ সম্পদশালী হন। কারণ , রাসূলের অংশ‘ খুমস ’ পৃথক করার পর যুদ্ধের যাবতীয় গনিমত তাঁদের মাঝে বণ্টিত হয়। অবশ্য , কতিপয় দুর্গ যেহেতু যুদ্ধ ব্যতীতই হস্তগত হয়েছিল তাই আল্লাহর নির্দেশে তা আল্লাহর রাসূলের ইচ্ছাধীনে দেয়া হয়।১১
তার পূর্বেও যখন মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করেন তখন মদীনার চারিদিকে পানিতে প্লাবিত হত না এমন কিছু ভূমি তাঁকে উপহার দেয়া হয় এবং শহরের বিস্তৃতি ঘটার পাশাপাশি তার মূল্যও বৃদ্ধি পায়। মুখাইরিক নামক একজন ইহুদী আলেম যিনি রাসূলের মদীনায় প্রবেশের অপেক্ষায় ছিলেন , কুবা অঞ্চলে রাসূলের উপস্থিতির খবর শোনার সাথে সাথে তাঁর নিকট গমন করেন এবং আসমানী কিতাবসমূহে রাসূলের যে গুণাবলী দেখেছিলেন সেগুলি মিলিয়ে দেখার সাথে সাথে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ওহুদ যুদ্ধের সময় মহানবীর সাহায্যের জন্যে ইহুদীগোত্র বনী কুরাইযার প্রতি আহ্বান রাখেন ; কিন্তু তারা শনিবারে যুদ্ধ করা যাবে না এই অজুহাত দেখিয়ে তাকে সাহায্য করা হতে বিরত থাকে । যা হোক , মুখাইরিক ওহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন এবং শাহাদত বরণ করেন। যেহেতু তিনি বনী কুরাইযা গোত্রের ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন তাই তিনি ওসিয়ত করেন ,“ যদি আমি শহীদ হই তবে আমার সাতটি কৃষিবাগান রাসূলের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে ।”
সারকথা , প্রাথমিক পর্যায়ের চরম ও প্রাণ ওষ্ঠাগত দরিদ্রতার পর মহানবী (সা.) ও মুসলমানদের হাতে যুদ্ধের গনিমতের এক পঞ্চমাংশ , ফাই , আনফাল এবং সাফায়া (বিনা যুদ্ধে হস্তগত সম্পদ)সহ অন্য যে সকল সম্পদ এসেছিল এবং সেইসাথে রাসূলের উদ্দেশ্যে প্রেরিত অজস্র উপঢৌকন তাদেরকে সম্পদশালী করেছিল। রাসূলও (সা.) নিজ অংশ এবং যা কিছু তাঁর অধীনে ছিল সেগুলিকে , মুসলমানগণ বিশেষতঃ যেই সব মুহাজির মক্কায় তাঁদের যথাসর্বস্ব অর্থাৎ ধন সম্পদ , বাসস্থান সকল কিছু ত্যাগ করে এসেছিলেন তাঁদের মাঝে বণ্টন করে দেন । আবু বকর , উমর , আয়িশা প্রমুখের ন্যায় ব্যক্তিগণকে তাঁদের নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী একটি করে অংশ দান করেছিলেন। যেহেতু ফাতিমাকে (আ.) কিছুই দেন নি তাই অত্র আয়াতটি অবতীর্ণ হয় :
) وَآتِ ذَا الْقُرْبَىٰ حَقَّهُ(
অর্থাৎ নিকট আত্মীয়গণের হক প্রদান করেন !১২
ক্ষেত্রে হযরত খাদীজার (আ.) অবদানের প্রতিদানস্বরূপ একটি অংশ ছিল। তিনি মক্কার সেরা বিত্তশালী ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁর সমস্ত অর্থ সম্পদ ইসলামের পথে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন , যার ফলে ইসলাম তার সম্মানের সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হয়েছিল। এখন তিনি পৃথিবীতে নেই তবে মুসলমানদের মাঝে তাঁর একমাত্র উত্তরসূরী ছিলেন হযরত ফাতিমা যাহরা (আ.) । সুতরাং তাঁর সীমাহীন দানের স্বল্প হলেও প্রতিদান দেয়া উচিত এবং তাঁর হক আদায় করা কর্তব্য। এই কারণে রাসূল (সা.) আল্লাহর আদেশে‘ ফাদাক ’ বাগানটি হযরত ফাতিমাকে (আ.) প্রদান করেন। ফাতিমা (আ.) সেইটিকে নিজ সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করতঃ তাতে কর্মচারী ও কর্মী নিয়োগ করেন।
এখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা নবাগত শাসকগোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তে পৌঁছল যে , রাসূলের আহলে বাইতকে জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে কঠিন প্রতিকূল অবস্থা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে ফেলতে হবে , তাহলে প্রথমতঃ এই পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণকে তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে। দ্বিতীয়তঃ তাঁদেরকে নিজ সরকার ও প্রশাসনের প্রতি মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল বানানো যাবে। ফলে‘ রাসূল (সা.) কোনো সম্পদ রেখে যান না ” এই অজুহাত দেখিয়ে ফাদাক বাগানটিকে ফাতিমার (আ.) নিকট হতে ছিনিয়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অন্তর্ভূক্ত করেন ।
অতঃপর হযরত ফাতিমা (আ.) নিজ দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্যে রুখে দাঁড়ান , অভিযোগ পেশ করেন এবং তাদের সাথে বিতর্ক করেন। আবু বকর নিজ বর্ণিত একটি হাদীছ দ্বারা প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যমে তাঁর অধিকার দেয়া হতে বিরত থাকেন। ঘটনাটি নিম্নরূপঃ
গ. রাসূলুল্লাহর উত্তরাধিকারী সম্পদ , ফাতিমার অভিযোগ ও আবু বকরের উত্তর
আল্লাহর রাসূলের (সা.) ইন্তেকাল এবং সকীফার ঘটনার পর আবু বকর ও উমর প্রথমেই রাসূলের রেখে যাওয়া সমস্ত কৃষিভূমিকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে নেন। রাসূল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় অন্যান্য মুসলমানদেরকে যে সব জমি দান করেছিলেন , তারা উভয়ে (প্রথম ও দ্বিতীয় খলিফা) সেই জমিগুলির বিষয়ে কোন প্রতিবাদ এবং আপত্তিই করেন নি। কিন্তু ফাদাক যেটি রাসূল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায়ই নিজ কন্যা হযরত ফাতিমাকে (আ.) দান করেছিলেন সেটিকে বাজেয়াপ্ত করে নিজ অধীনে নিয়ে নেন। হযরত ফাতিমাকে (আ.) এই ব্যাপারে তাঁর পিতা আল্লাহর রাসূলের উত্তরাধিকার প্রমাণে বিতর্ক করতে বাধ্য করেন ।
দ্বিতীয় খলীফা উমর হতে বর্ণিত , তিনি বলেনঃ“ যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) পৃথিবী হতে বিদায় গ্রহণ করেন তখন আমি এবং আবু বকর উভয়ে মিলে আলীর নিকট গিয়ে বললাম ,রাসূলের (সা.) উত্তরাধিকার সম্পত্তি এবং তাঁর পরিত্যক্ত সম্পদের ব্যাপারে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি ?” তিনি বললেন :“ আমরা জনগণের মাঝে অধিকারের ক্ষেত্রে রাসূলের সর্বাধিক নিকটের ।” উমর বলেন : আমি বললাম ,“ খয়বর ভূমি কি হবে ?” তিনি বললেনঃ“ খয়বর ভূমিও অনুরূপ ।” আমি বল্লাম:“ ফাদাক ভূমি কি হবে ?” তিনি বললেন ,“ ফাদাক ভূমিও অনুরূপ ।” আমি বল্লাম:“ আল্লাহর শপথ ! আপনি এমন পর্যায়ে আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছেন যে :যেন করাত দিয়ে আমাদের ঘাড় কেটে ফেলবেন ! না , এমনটি হতে দিব না !” ১৩
আবু বকর ও উমর কর্তৃক‘ ফাদাক ’ আত্মসাৎ করার প্রকৃত ঘটনা এবং হযরত ফাতিমা (আ.) কর্তৃক তা ফিরিয়ে দেয়ার আবেদন সম্পর্কিত বিষয়টি সহীহ্ বোখারী , মুসলিম , মুসনাদে আহমাদ , সুনানে আবী দাউদ , নাসাঈ , তাবাকাতে ইবনে সা’ দ এবং সুন্নী মাযহাবের অন্যান্য নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে কোথাও সংক্ষিপ্ত , আবার কোথাও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবু বকরের সাথে তাঁর বিতর্ক ও আপত্তিমূলক সর্বশেষ বৈঠকটির ঘটনা এরূপ :
“ যখন হযরত ফাতিমা (আ.) তাঁর যাবতীয় দলীল প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন এবং আবু বকর সেগুলিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন ও আল্লাহর রাসূলের দানকৃত সম্পদের কোনো অংশ এবং তাঁর উত্তরাধিকার সম্পত্তি ফাতিমাকে ফিরিয়ে দেয়া থেকে বিরত থাকেন । তখন ফাতিমা যাহরা (আ.) এই বিতর্কটিকে মুসলমানদের সম্মুখে তুলে ধরা সঙ্গত মনে করেন এবং তাঁর পিতার সাহাবীদের নিকট হতে সাহায্য কামনা করেন। হাদীছবিদগণ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনানুসারে যেমন আবু বকর জওহারীর‘ সকীফা’ নামক গ্রন্থ হতে ইবনে আবিল হাদীদের বর্ণনা অনুসারে এবং‘ বালাগাতুন্ নিসা’ গ্রন্থে এসেছে যে , ফাতিমা (আ.) মসজিদে নববীতে যান ।”
জওহারী বলেনঃ“ যখন ফাতিমা (আ.) বুঝতে পারলেন যে , আবু বকর তাঁকে ফাদাক ফিরিয়ে দিবেন না , তখন তিনি মস্তকাবরণ ও চাদর পরেন এবং কয়েকজন নিকটাত্মীয় ও বনী হাশিম বংশের নারীকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদ অভিমুখে যাত্রা করেন। আর আল্লাহর রাসূলের (সা.) ন্যায় পদক্ষেপ ফেলে আবু বকর ও তার সভাসদদের নিকট উপস্থিত হন এবং পর্দার অন্তরালে দাঁড়ান। অতঃপর হৃদয় বিদারক কান্না ও পীড়াদায়ক ভাবে দুঃখ প্রকাশের মাধ্যমে লোকজনকে বিলাপ করতে বাধ্য করেন এবং সভার পরিবেশকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেন এবং তারপর অল্পক্ষণ নীরব থাকেন , যাতে কান্নার রোল থেমে যায় ও সবাই শান্ত হয় । অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি আদায় করেন এবং আল্লাহর রাসূলের উপর দরুদ প্রেরণ করে বলেন :
“ আমি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমা ! আমি আপনাদের অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছিঃ
) لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَاعَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيم(
“ নিশ্চয় তোমাদের মাঝ হতে তোমাদের নিকট একজন রাসূল এসেছেন। তোমাদেরকে যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্যে কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের হেদায়াতকামী , মু’ মিনদের প্রতি তিনি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু ।” ১৪
এখন যদি তোমরা তাঁর আত্মীয়তা সম্পর্কে জানতে চাও তবে দেখ যে , তিনি আমার পিতা , তোমাদের পিতা নন। তিনি আমার চাচাত ভায়ের ভ্রাতা , তোমাদের ভ্রাতা নন !”
বক্তব্যের এক স্থানে বলেনঃ এখন তোমরা ধারণা করছ যে , আমরা উত্তরাধিকার পাব না ?!
) أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُون(
“ তারা কি জাহিলিয়াতের ফয়সালা কামনা করে ? বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কে অধিকতর উত্তম ফয়সালাকারী ?” ১৫
হে আবু কুহাফার পুত্র ! পবিত্র কোরআন অনুযায়ী তুমি তোমার পিতার উত্তরাধিকার পাবে আর আমার পিতার উত্তরাধিকার আমি কি পাব না ?! এইটি সত্য যে ,তুমি এক আশ্চর্য ও কুৎসিত বিষয আনয়ন করছ এবং এক বড় অপবাদ আরোপ করেছো ! এই অপমান ও লজ্জাকে ভালভাবে মনে রেখ ! কারণ কিয়ামত দিবসে তুমি তার মুখোমুখি হবে ! আহ্ ! মহান আল্লাহ্ কি উত্তম বিচারক ! মুহাম্মদ (সা.) কি উত্তম প্রতিনিধি ও নিরাপত্তাদানকারী ! হ্যাঁ , আমাদের প্রতিশ্রুত দিন হচ্ছে কিয়ামত , বাতিলপন্থীরা সেইদিন ক্ষতিগ্রস্ত হবে !” অতঃপর তিনি নিজ পিতার কবরের অভিমুখে ফিরে তাকান এবং কাতরস্বরে বলেন :“ হে পিতা ! তোমার ইহ্ধাম ত্যাগের পর কি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং কত বিপদই না এসেছে , যদি তুমি থাকতে তবে এতটা প্রকট হত না ! আমরা বৃষ্টিবঞ্চিত পিপাসার্ত জমিনের ন্যায় তোমাকে হারিয়েছি আর তোমার জাতি উল্টে গেছে , তাদেরকে দেখ এবং তাদের অবস্থা থেকে পৃথক হয়ে যেও না ! হায় ! তোমার পরেই যদি আমরা মৃত্যুর সম্মুখীন হতাম !”
বর্ণনাকারী বলেনঃ ফাতিমা (আ.) এমন ভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন যে , লোকজন এতটা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল এবং ক্রন্দন করেছিল যে , তৎপূর্বে সেদিন পর্যন্ত তার কোনো নজীর দেখা যায় নি !”
অতঃপর তিনি আনসারগণের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলেনঃ“ হে তীক্ষ্ণ থাবা বিশিষ্ট জ্ঞানীরা ! হে দ্বীনের বাহুরা ! হে ইসলামের সাহায্যকারীরা ! তোমরা আমার সাহায্যের ব্যাপারে কেন অবহেলা করছ ? তোমরা আমার সহায়তার ব্যাপারে কেন শিথিলতা দেখাচ্ছ ? আমার অধিকারের ব্যাপারে কেন উপেক্ষা করছ ? আমার উপর কৃত অত্যাচারের ব্যাপারে কেন তোমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ?
তিনি কি রাসূল ছিলেন না , যিনি বলতেন :‘ মানুষের সম্মান , তাঁর সন্তান সন্ততির সম্মান রক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে ?’ তোমরা কত দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে গেলে এবং কত দ্রুত বিচ্যুতির শিকার হলে ! পৃথিবী হতে রাসূলের (সা.) বিদায়ের সাথে সাথে কী তাঁর দ্বীনকেও তোমরা মৃত্যুর মুখে ফেলবে ? হ্যাঁ , আমার জীবনের শপথ! তাঁর মৃত্যু চরম বেদনাদায়ক একটি ঘটনা যার শোক ছিল সর্ব বিস্তৃত , তার অনুপস্থিতি অতি গভীর ফাটলের সৃষ্টি করেছে যার ক্ষতিপূরণ অসম্ভব , তাঁর মৃত্যু জমিনকে অন্ধকার , পাহাড়গুলিকে দুর্বল এবং প্রত্যাশা সমূহকে হতাশায় পরিণত করেছে ! মর্যাদার আবরণগুলিকে ছিঁড়ে দিয়েছে এবং নিরাপত্তার সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে ! এই পরীক্ষাই ছিল যে সম্পর্কে মহান আল্লাহর কিতাব তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে তোমাদেরকে অবগত করে বলেছেন :
) وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِن قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِن مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ وَمَن يَنقَلِبْ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ فَلَن يَضُرَّ اللَّـهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللَّـهُ الشَّاكِرِينَ(
“ মুহাম্মদ (সা.) শুধু আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ ব্যতীত আর কিছুই ছিলেন না , তাঁর পূর্বেও অপর প্রেরিত পুরুষগণ ছিলেন , তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন তবে কি তোমরা অতীত জীবনে ফিরে যাবে ? যে কেউ তার অতীত জীবনে ফিরে যাবে সে আল্লাহর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না ; আর মহান আল্লাহ্ অতিসত্তর কৃতজ্ঞতা আদায়কারীদের পুরস্কার দেবেন ।” ১৬
হে নিদ্রাচ্ছন্ন লোকেরা ! তোমরা জেগে ওঠ ! তোমাদের সম্মুখে আমার পিতার উত্তরাধিকার নষ্ট হয়ে গেল ! আমার আহ্বান তোমাদের নিকট পৌঁছেছে , আমার কন্ঠ তোমরা শ্রবণ করছ , তোমাদের শক্তি সামর্থ্য আছে এবং গৃহ তোমাদের গৃহ ! তোমরা আল্লাহর নির্বাচিত লোক এবং তাদের মাঝে সর্বোত্তম , তোমরা (ধর্মের কারণে) আরবদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়েছিলে , বিপদে ভয় পাওনি এবং সমস্যা সত্ত্বেও তোমরা লড়াই করেছ ফলে ইসলামের যাঁতাকল তোমাদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে , তার দুধের ষ্ফুটন শুরু হয়েছে , যুদ্ধের আগুন নির্বাপিত হয়েছে , প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখা স্তিমিত হয়েছে , গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা মিটে গিয়েছে এবং দ্বীনের অবকাঠামো সুদৃঢ় হয়েছে ; এইসব অগ্রগতির পর এখন কি তোমরা পিছপা হবে ?! আর সেই সব কঠোরতা অবলম্বনের পর তোমরা কি এখন পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে ? আর সেই সব বীরত্ব ও সাহসিকতার পর এমন একটি দলকে তোমরা ভয় পাবে“ যারা নিজ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে এবং তোমাদের দ্বীনকে তিরস্কারের বস্তু হিসেবে গণ্য করেছে ?! কাফির নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর , কারণ তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী দলের অন্তর্গত নয় , সম্ভবতঃ তারা বিরত হবে ।” ১৭
সতর্ক থেক ! আমি এমন দেখছি যে , তোমরা স্বস্তিকামী , সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী হয়ে গেছ ! দ্বীন হতে যা কিছু অনুধাবন করেছিলে তা তোমরা অস্বীকার করেছ এবং যেই জিনিসকে তোমরা সুস্বাদু জেনেছিলে তাকে বমন করেছ !
) إِن تَكْفُرُوا أَنتُمْ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا فَإِنَّ اللَّـهَ لَغَنِيٌّ حَمِيدٌ(
“ যদি তোমরা এবং জমিনের বুকে যারা আছে , তারা সকলেই কাফির হয়ে যায় , তবে জেনে রেখ যে , মহান আল্লাহ্ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত ।” (সূরা ইব্রাহীম : ৮)
জেনে রেখ ! আমি তোমাদের সাথে পূর্ণ জ্ঞান ও অবগতিসহ কথা বলছি : অমনোযোগিতা , স্থবিরতা জড়তা , ভীতি এবং দুর্বল বিশ্বাস তোমাদেরকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে অতএব , তোমাদের মর্যাদার হানী হোক ,সেটিকে তোমাদের নিজেদের সফরের শেষ সম্বল বানাও এবং সত্যের প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শন কর , শান্তিতে থাক , লজ্জা ও অপমানকে আশ্রয় দাও এবং অপমানের পোশাক পরিধান কর , আর আল্লাহর আগুনের সাথে আঁতাত কর , এমন প্রজ্বলিত আগুন যা অন্তরসমূহকে বেষ্টন করবে ! তোমরা যা কিছু করছ তা আল্লাহর সম্মুখে রয়েছে !
) وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ(
“ যারা অত্যাচার করেছে তারা দ্রুত উপলব্ধি করতে পারবে যে , কোন স্থানে তারা প্রবেশ করবে !” ১৮
এ কথা স্পষ্ট যে , অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা এক সরকার যার শীর্ষে ছিলেন আবু বকর যিনি নিজেকে এই ধরনের ঘটনার জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছিলেন এরূপ অবস্থায় তিনি অবশ্যই মোলায়েম , নমনীয় ও জনগণের পছন্দমাফিক ভাষায় হযরত ফাতিমা যাহরার (আ.) কথার উত্তর দিবেন , তাই তিনি বলেন :“ হে সর্বোত্তমা নারী ! হে সর্বোত্তম পিতার কন্যা ! আল্লাহর শপথ , আমি আল্লাহর রাসূলের (সা.) সিদ্ধান্তের সীমা অতিক্রম করি নি এবং তাঁর আদর্শের বিপরীত আমল করিনি ; জাতির নেতা কখনও নিজ জাতিকে মিথ্যা বলেন না ! আপনি বাক অলঙ্কার ও কঠোরতার সাথে আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন এবং আমাদের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন , মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে ও আপনাকে ক্ষমা করুন ! আমি আল্লাহর রাসূলের যুদ্ধাস্ত্র , বাহন ও জুতা জোড়া আলীকে প্রদান করেছি কিন্তু সেইগুলি ছাড়া , আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি :
“ ইন্না মা’ আশিরাল্ আম্বিয়ায়ি লা নূরাছু যাহাবান্ ওয়া লা ফিয্যাতান্ ওয়া লা আরযান্ ওয়া লা’ আক্বারান্ ওয়া লা দারান্ ওয়া লাকিন্না নূরাছুল ঈমানা ওয়াল্ হিতমাতা ওয়াল ইলমা ওয়াস্ সুন্নাহ্ ।”
“ আমরা নবীরা সোনা , রূপা , ভূমি , বাগান ও ঘর বাড়ী উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাই না। বরং আমরা উত্তরাধিকার হিসেবে ঈমান , প্রজ্ঞা , জ্ঞান ও সুন্নত রেখে যাই ।”
অতএব , আমি নির্দেশ মতই আমল করেছি এবং তাঁর কল্যাণ কামনা করছি। আমার সাফল্য আল্লাহ্ প্রদত্ত , তাঁর উপর ভরসা করতঃ তাঁর নিকটই ফিরে যাব ।”
ফাতিমা (আ.) বলেন :“ তুমি কি ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর কিতাবকে পরিত্যাগ করেছ এবং সেইটিকে পিছনে ফেলে দিয়েছ ? কিন্তু মহান আল্লাহ্ এইটা কি বলেন নি:
) وَوَرِثَ سُلَيْمَانُ دَاوُود(
অর্থাৎ দাউদের নিকট হতে সুলায়মান (আ.) উত্তরাধিকার পান !” ১৯
সম্মানিত মহান আল্লাহ্ কি ইয়াহ্ইয়া ও যাকারিয়ার কথা বলতে গিয়ে বলেন নি :
) فَهَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا يَرِثُنِي وَيَرِثُ مِنْ آلِ يَعْقُوب(
“ (রাব্বি) হাব্লী মিল্লাদুনকা ওয়ালিয়্যান ইয়ারিছুনী ওয়া ইয়ারিছু মিন্ আলি ইয়া’ কূব ।”
“ প্রভু হে ! তোমার নিকট হতে আমাকে আমার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি দান কর , যিনি আমার ও ইয়াকুবের উত্তরসূরি হবেন ।” ২০
আরও তিনি বলেন :
) يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنْثَيَيْن(
অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে , এক পুত্রের উত্তরাধিকার সম্পত্তি হবে দুই কন্যার অংশের সমান।২১
তিনি আরও বলেনঃ
) إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِين(
অর্থাৎ যদি কেউ কোনো কল্যাণ (ধন সম্পত্তি) রেখে যান তবে ন্যায়ানুগ প্রথা মত তার পিতা মাতা ও আত্মীয় স্বজনের জন্যে ওসিয়ত করার বিধান তাদেরকে দেয়া হল। এইটি মুত্তাকীদের জন্যে একটি কর্তব্য ।” ২২
তোমরা ধারণা করেছ , আমি আমার পিতার কোনো রকমের অধিকার ও সম্পত্তি পাব না ? আমার ও আমার পিতার মাঝে কি আত্মীয়তা নেই ? মহান আল্লাহ্ কুরআনের কোনো আয়াতে তোমাদেরকে কি কোনো বিশেষত্ব দান করেছেন এবং তাঁর রাসূলকে তা হতে বঞ্চিত করেছেন ? অথবা তোমরা বলবে : আমার এবং আমার পিতার ধর্ম ভিন্ন ধরনের , ফলে আমি সম্পত্তি পাব না ?! আমি এবং আমার পিতা কী একই জাতির অন্তর্ভুক্ত নই ?! সম্ভবতঃ তোমরা কুরআনের সাধারণ ও বিশেষ বিধান সম্পর্কে আল্লাহর রাসূলের (সা.) চেয়ে বেশী জান !!
) أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ(
“ আফা হুকমাল্ জাহিলিয়্যাতি ইয়াব্গুন ?”
অর্থাৎ তবে কি তারা জাহিলী যুগের বিধি বিধান কামনা করে ?!” ২৩
সত্যিই , এর চেয়ে দৃঢ় দলিল প্রমাণ ও যুক্তি সম্ভব নয়। কিন্তু কি লাভ হবে , হযরত যাহরা (আ.) এর বক্তব্যগুলির শুধুমাত্র একটি উত্তর ছিল : আমি আবু বকর আল্লাহর রাসূলের নিকট শুনেছি যে , আমাদের নবীগণের নিকট হতে কোনো উত্তরাধিকার সম্পত্তি পাওয়া যায় না ; শুধু এতটুকুই ! এ কথা আমি নিজে শুনেছি !!
আশ্চর্য লাগে এই জন্যে যে , এটিকে অনেকে আবু বকরের ফযিলত হিসেবে গণ্য করেছে ! অর্থাৎ লিখা হয়েছে যে , আবু বকর সেই একক পুরুষ যিনি এই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন ! এই হাদীছটি আবু বকর ব্যতীত অপর কেউ আল্লাহর রাসূলের নিকট হতে শুনেন নি !! এমনকি উম্মুল মু’ মিনীন আয়িশাও বলেছেন :“ এই বিষয়টি আমার পিতা ব্যতীত অপর কারও নিকট হতে শুনি নি !”
আবু বকরের হাদীছটির মূল্যায়ন
১. আমরা জানি যে , এই কথার উপর জনগণ ঐকমত্য (ইজমা) পোষণ করেছেন যে , এই হাদীছটি শুধুমাত্র আবু বকর বর্ণনা করেছেন। হযরত ফাতিমা যাহরাও (আ.) তার বিপরীতে বলেন :“ তোমরা ইচ্ছাকৃত আল্লাহর কিতাবকে পরিত্যাগ করতঃ তাকে পশ্চাতে নিক্ষেপ করেছো !” কেননা মহান আল্লাহ্ বলেছেন :“ দাউদের নিকট হতে সুলায়মান উত্তরাধিকার সম্পত্তি পান এবং যাকারিয়া আল্লাহর নিকট উত্তরাধিকারী কামনা করেন ।” মহান আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ক্ষেত্রে অপরের চেয়ে আত্মীয় স্বজনদেরকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। উত্তরাধিকার সম্পত্তি সম্পর্কে আরও একাধিক আয়াত বর্ণিত হয়েছে।
২. আমরা জানি যে , ইসলামের আহ্কাম , যেগুলি উপযুক্ত বয়সে উপনীত (শরীয়তের দৃষ্টিতে বয়োপ্রাপ্ত) ব্যক্তিদের জন্য অবশ্য পালনীয় বিষয় , সেইগুলির প্রচারিত হওয়া উচিত এবং যাদের উপর ঐ বিধান প্রযোজ্য তাদের নিকট পৌঁছানো প্রয়োজন , তাহলেই তা পালন করতে পারবে । নামায , রোযা , হজ্ব , জিহাদ , খোমস , যাকাত এবং অন্যান্য বিষয় প্রচার ও বর্ণনা হওয়ার পর উপযুক্ত বয়সে উপনীত ব্যক্তিদের উপর ওয়াজিব হয়ে গেছে। এখন কিরূপে সম্ভব হতে পারে যে , রাসূল (সা.) যে বিধানটির মূল শ্রোতা ও প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত ফাতিমা (আ.) , সেইটি শুধুমাত্র আবু বকরকে বলবেন ?!
৩. হাদীছ শাস্ত্রের গ্রন্থ সমূহে সহীহ্ ও অসহীহ্ হাদীছসমূহের মূল্যায়ন ও পরিচিতির জন্যে কতকগুলি নির্দিষ্ট মাপকাঠি রয়েছে , তন্মধ্যে একটি হচ্ছে কুরআনের সাথে হাদীছের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করা বা না করা। আমরা‘ মা’ আলিমুল মাদ্রাসাতাঈন’ নামক পুস্তকের তৃতীয় খণ্ডে সেই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছি। রাসূল (সা.) হতে আমাদের নিকট একটি হাদীছ পৌঁছেছে ; তাতে এইভাবে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি‘ মিনাতে ’ ভাষণ দান কালে বলেনঃ“ আয়্যুহান্নাসু ! মা জাআকুম্ ’ আন্নী ইউওয়াফিকু কিতাবাল্লাহি ফাআনা কুল্তুহু ওয়া মা জাআকুম্ ইউখালিফু কিতাবাল্লাহি ফালাম্ আকুল্হু ।” অর্থাৎ হে লোকেরা ! আমার পক্ষ হতে তোমাদের নিকটে যা কিছু পৌঁছেছে এবং আল্লাহর কিতাবের সাথে অভিন্ন হয় , তা আমি বলেছি। পক্ষান্তরে , তোমাদের নিকট যা কিছু পৌঁছেছে এবং আল্লাহর কিতাবের পরিপন্থী হয় , তা আমি বলি নি ।” ২৪
অতএব , হাদীছ শাস্ত্রের দৃষ্টিতেও বিষয়টি স্পষ্ট ! হাদীছটির সনদে শুধুমাত্র একক ব্যক্তি রয়েছে অর্থাৎ কেবলমাত্র শাসক হওয়ার দাবীদার আবু বকর থেকে বর্ণিত এবং হাদীছটির মূলভাষ্যও কুরআনের বিভিন্ন অকাট্য ভাষ্যের বিপরীত। কিন্তু কি করা যেতে পারে , যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূলের (সা.) স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির পদকে অবৈধভাবে দখল করতে কোনো শঙ্কাবোধ করেনি , সেই ব্যক্তি অপর অকাট্য ভাষ্যের সাথেও বিপরীত মত পোষণ করতে কোনো দ্বিধা করবে না ।
আনসারগণ কেন নীরব ছিলেন ?
বর্ণিত হয়েছে যে , আমীরুল মু’ মিনীন আলী হযরত ফাতিমা(আ.) এবং ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইনকে সাথে নিয়ে স্বীয় অধিকার আদায় এবং ইসলামকে তার প্রকৃত মানদণ্ডের উপর ফিরিয়ে আনার জন্যে আনসারদের প্রত্যেকের বাড়ীতে গিয়ে তাদের সাহায্য কামনা করেন। হযরত ফাতিমা যাহরার (আ.) ভাষণেও লক্ষ্য করেছি যে , তিনি কিভাবে আনসারগণকে সম্বোধন ও তাদেরকে তিরস্কার করেছেন। তাদের নিকট তিনি আবেদন জানান যে , তাঁর অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তারা যেন তাঁকে সাহায্য করেন ,এতদসত্ত্বেও মদীনার আনসারগণ নীরব থাকেন এবং কোনরূপ ভূমিকাই পালন করেননি । কেন ? উত্তর এই যে , আনসারগণ বলতেন :
“ আমরা আবু বকরের নিকট বাইআত করেছি এবং বাইআত ভঙ্গ করা আমাদের জন্যে বৈধ নয় ! হায় ! যদি আপনারা সকীফাতে থাকতেন আর এই কথাগুলি বলতেন তবে আমরা আপনাদের নিকট বাইআত করতাম !” এইটি এই জন্যে যে , আরবরা যখনই কারো হাতে বাইআত করত এবং প্রতিশ্রুতি দিত তখনই নিহত হওয়া পর্যন্ত নিজ প্রতিশ্রুতির উপর দাঁড়িয়ে থাকত। হযরত ফাতিমা যাহরাও (আ.) বলেনঃ“ আলী সেই কাজটিই করেছেন যেইটি তাঁর করা উচিত ছিল ।” অর্থাৎ রাসূলের জানাযাকে পরিত্যাগ করতঃ সকীফাতে যাননি ।“ তোমাদের হিসাব নিকাশ আল্লাহর নিকট রয়েছে !”
এখানেও যদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ভাবা হয় তাহলে প্রতীয়মান হয় যে , ইসলামের বিধি বিধানের উপর জাহিলী যুগের প্রথা অগ্রারাধিকার পেয়েছে। প্রতিশ্রুতির উপর অনড় থাকা এবং বাইআতের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা অবশ্যই পছন্দনীয় ও গ্রহণযোগ্য কাজ তবে শর্ত হল এই যে , তা হতে হবে সত্য পথে এবং বাতিল হতে দূরে থাকতে হবে। ইসলামে অপরের আনুগত্য করা বন্ধন ও শর্তহীন নয়। উদাহরণ স্বরূপ , ইসলামে সন্তানের জন্যে পিতার আনুগত্য করা এবং স্ত্রীর জন্যে স্বামীর আনুগত্য করা আবশ্যক , তবে ইসলামের নীতি বিরোধী ও অবৈধ বিষয়ে তাদের আনুগত্য করা নিষেধ। যদি কোনো পিতা নিজ সন্তানকে চুরি করার জন্যে এবং নরহত্যার জন্যে বাধ্য করে অথবা কোনো পুরুষ নিজ স্ত্রীকে অবৈধ কাজের প্রতি আদেশ দেয় , তবে সেই সব ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা নিষেধ। এইটি ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। এই ব্যাপারে মুসলমানগণ ঐকমত্য পোষণ করেন এবং হাদীছে এসেছে :“ লা ত্বা ’ আতা লি মাখ্লূক্বিন্ ফী মা’ সিয়াতিল্ খালিক্বি ।” “ সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ অমান্য করে সৃষ্টিজীবের আনুগত্য করা নিষেধ ।”
কিন্তু কি করা যেতে পারে ! জ্ঞানহীনতা ও আরবগোত্রবাদ ইসলামের উপর অগ্রাধিকার পেয়েছে এবং তাই আনসারগণ বলছেন :“ আমরা বাইআতের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছি এবং নিজেদের প্রতিশ্রুতির উপর অনড় রয়েছি ।”
অতএব , আল্লাহর রাসূলের উপরও মিথ্যা আরোপ করা হয়েছে। এই কারণে যাহরা (আ.) আবু বকরকে বলেনঃ“ লাক্বাদ জি ’ তা শাইআন্ ফারিয়্যান ।” “ সত্যিই , তুমি বিস্ময়কর ও কুৎসিত অপবাদ আরোপ করেছো !” অযৌক্তিক এবং নিষিদ্ধ আনুগত্য , সত্য আনুগত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে !
ঘ. মালিক ইবনে নুয়াইরাকে হত্যা
মালিক ইবনে নুয়াইরা তামীমী , জাহিলী যুগে তামীম গোত্রের অন্যতম অভিজাত ব্যক্তি ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর , রাসূল আকরাম (সা.) তাঁকে নিজ প্রতিনিধি ও সাদ্কা (জাকাত) সংগ্রহের দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। যখন রাসূল (সা.) ইন্তেকাল করেন তখন তিনি শরয়ী সাদ্কাগুলিকে তার নিজ নিজ মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেন এবং নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন :
“ আমি বললাম , তোমাদের মালসমূহ ফিরিয়ে নাও এবং ভবিষ্যতের জন্যে চিন্তিত হবে না। এই ধর্মের জন্যে যদি কেউ পুনরায় উত্থিত হন তবে তার আনুগত্য করতঃ আমরা বলব , প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মুহাম্মদের ধর্ম ।”
তারীখে তাবারী , শরহে ইবনে আবিল হাদীদ , কানযুল উম্মাল , তারীখে আবিল ফিদা , ওয়াফিয়াতুল আ’ ইয়ান ইত্যাদি গ্রন্থে ঘটনাটির সারসংক্ষেপ এইরূপে এসেছে :“ খালিদ ইবনে ওয়ালীদ সৈন্যবাহিনীসহ‘ যেরার ইবনে আযুরকে ’ মালিকের গোত্রের নিকট প্রেরণ করে। সেই সৈন্যবাহিনীর অন্তর্গত আবু কাতাদাহ্ বলেন :‘ আমাদের বাহিনী রাত্রিতে তাদেরকে অবরোধ করে এবং এতে ভয় পাওয়ার কারণে মালিকের গোত্রের লোকেরা সমর সজ্জায় সজ্জিত হয় ও যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
আমরা তাদেরকে বল্লাম :‘ আমরা মুসলমান !’ তারা বলল :‘ আমরাও মুসলমান !’ আমাদের সেনাপতি বলল :‘ তাহলে কেন তোমরা যুদ্ধাস্ত্র হাতে নিয়েছো ?’ তারা বলল :‘ তোমরা কেন তোমাদের সঙ্গে অস্ত্র শস্ত্র এনেছো ?’ আমরা বললাম:‘ যদি তোমরা সত্য বলে থাক এবং মুসলমান হও তবে তোমাদের অস্ত্র শস্ত্রগুলি মাটিতে রেখে দাও !’ তারা মাটিতে অস্ত্র শস্ত্রগুলি রেখে দেয়। তারপর আমরা নামায আদায় করি এবং তারাও নামায আদায় করে ।”
ইবনে আবিল হাদীদ লিখেছেন :“ যখন তারা যুদ্ধাস্ত্রগুলি মাটিতে রেখে দেন তখন তাদের সকলকে বন্দী করে খালিদের নিকট আনা হয়। মালিক ইবনে নুওয়াইরা কথোপকথনের জন্যে খালিদের নিকট আসেন। মালিকের সুদর্শনা স্ত্রীও তার সাথে আসেন। তার স্ত্রীর উপর খালিদের দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে মালিককে সে বলে :“ আল্লাহর কসম ! পুনরায় তুমি তোমার গোত্রের লোকদের নিকট ফিরে যাবার সুযোগ পাবে না !”
খালিদ দাবি করল যে , মালিক ইবনে নুওয়াইরা ধর্মত্যাগী (মুর্তাদ) হয়ে গেছেন। মালিক সেই দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বলছিলেন :“ আমি যেইভাবে মুসলমান ছিলাম সেইভাবেই আছি !” খালিদের সৈন্যবাহিনীর অন্তর্গত আবু কাতাদাহ্ ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমরও মালিকের এই কথাগুলিকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিলেন ।”
মালিক বললেন :“ আমাদেরকে আবু বকরের নিকট প্রেরণ কর , যেন তিনি নিজে আমাদের বিচার করেন !” খালিদ বলল :“ আমি যদি তোমাকে ক্ষমা করি তবে আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করবেন না !” অতঃপর যুরারকে মালিকের মস্তক উচ্ছেদ করার জন্যে আদেশ দিল ! মালিক তার স্ত্রীর প্রতি হতাশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে খালিদকে বললেন :“ এই মহিলাই আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল !” খালিদ বলল :“ বরং আল্লাহ্ তোমাকে হত্যা করল ! কারণ তুমি ইসলাম হতে ফিরে গেছ !” মালিক বলল্লেন :“ আমি মুসলমান এবং ইসলামের প্রতি অনড় রয়েছি !”
মালিক যখন বলছিলেন , আমি মুসলমান তখন খালিদ তাকে হত্যা করে তার মাথা কেটে খাবার পাত্রে রাখে এবং সেই রাতেই তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় ! একজন কবি এইরূপ বলেন:
সাবধান ! সেই লুণ্ঠিত গোত্রটিকে বল :“ মালিকের পর এই কালোরাত্রি অতি দীর্ঘ হবে !”
মালিকের স্ত্রীর প্রতি প্রণয়াসক্ত খালিদ কাপুরুষের ন্যায় তাকে হত্যা করে এবং তার স্ত্রীর সাথে স্বীয় উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে! আর পরের দিনই সে অসহায় ও মস্তকবিহীন ঐ ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে (আনুষ্ঠানিকভাবে) বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়!
ইয়াকুবী লিখেছেন :“ আবু কাতাদাহ্ এই অবস্থা দেখে আবু বকরের নিকট গমন করেন এবং ঘটনার বর্ণনা প্রদান করে বলেন : আল্লাহর কসম ! এর পর থেকে খালিদের সেনাপতিত্বে আর যাব না , মালিক মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও খালিদ তাকে হত্যা করেছে ।”
অপর বর্ণনায় এসেছে যে , উমর আবু বকরকে বললেন :“ খালিদ একজন মুসলমানকে হত্যা করেছে এবং তার স্ত্রীর সাথে ব্যভিচার করেছে ! তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মেরে ফেলা উচিত !” আবু বকর বললেনঃ“ আমি তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করব না ! কারণ সে ইজতিহাদ করেছে এবং নিজ ইজতিহাদে ভুল করেছে !”
উমর বলল্লেন :“ অন্ততঃপক্ষে তাকে দায়িত্ব হতে অপসারণ করেন !” আবু বকর বলল্লেন :“ যেই তরবারিকে আল্লাহ্ নিজে কোষমুক্ত করেছেন , আমি তাকে কোষবদ্ধ করতে পারব না !”
মালিকের ভাই মুতাম্মীম ইবনে নুওয়াইরা সেই যুগের অন্যতম কবি ছিলেন । একবার তিনি মদীনায় আসেন এবং আবু বকরের সাথে ফজরের নামায আদায় করার পর দাঁড়িয়ে স্বীয় ধনুকের উপর ভর দিয়ে তার ভাই মালিকের হন্তাকে সম্বোধন করে এইরূপ বলেন :“ হে আযূরের পৌত্র ! তুমি কি জান , তাঁবুর অন্তরালে কি ধরণের সৎলোকের মস্তক উচ্ছেদ করেছো ?! তুমি আল্লাহর নামে তাকে নিরাপত্তা দিয়েছো এবং তারপর খিয়ানত করেছো ! পক্ষান্তরে তিনি যদি তোমাকে নিরাপত্তা দিতেন তবে আদৌ খিয়ানত করতেন না !”
খুলাফা (সুন্নী) মতাদর্শের কিতাবসমূহে বর্ণিত খালিদ ইবনে ওয়ালীদ এবং মালিক ইবনে নুওয়াইরার ঘটনাটির সারসংক্ষেপ হলো এই। আহলে বাইত (আ.) মতাদর্শের কিতাবসমূহে এই গল্পটির বর্ণনা নিম্নরূপে এসেছে :
আহলে বাইত (আ.) মতাদর্শের অনুসারীদের কিতাব সমূহে মালিকের ঘটনা
বিহারুল আনওয়ারে এসেছে :“ আল্লাহর রাসূল (সা:) যখন ইন্তেকাল করেন তখন মালিক ইবনে নুওয়াইরার সাথে বনী তামীম গোত্রের লোকেরা মদীনায় আসেন। মালিক , আল্লাহর রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তির অনুসন্ধান করেন। কারণ , জুমু’ আর দিনে রাসূলের মিম্বরের উপর তিনি আবু বকরকে খুৎবা দিতে দেখে জিজ্ঞেস করেন :‘ রাসূলের ওয়াসী (প্রতিনিধি) , যাঁর আনুগত্য করার জন্যে আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তিনি কোথায় ?’ লোকেরা বলল :’ হে বেদুইন ! এখানে নতুন ঘটনার অবতারণা হয়েছে এবং এমন এক নতুনত্বের সৃষ্টি হয়েছে যে সম্পর্কে তুমি অনবগত !’ মালিক বলল্লেন :‘ না , আল্লাহর কসম ! কোনো নতুনত্বের অবতারণা হয় নি বরং তোমরা আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূলের প্রতি খিয়ানত(বিশ্বাসঘাতকতা) করেছো !’ অতঃপর আবু বকরের দিকে ফিরে বলেন :“ কে তোমাকে এই মিম্বরের উপর আরোহণ করিয়েছে এবং আল্লাহর রাসূলের ওয়াসীকে তা হতে দূরে সরিয়েছে ?’ আবু বকর এইরূপ দেখে বলেন :‘ প্রস্রাবকারী এই বেদুইনকে আল্লাহর রাসূলের মসজিদ হতে বের করে দাও ! উমরের দাস কুনফুয এবং খালিদ ইবনে ওয়ালীদ উঠে দাঁড়ায় ও তাকে প্রহার করে বের করে দেয়। আবু বকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার পর খালিদ ইবনে ওয়ালীদকে ডেকে পাঠান এবং বলেন :’ তুমি দেখলে , জন সম্মুখে কি বলল ? আমি তার থেকে নিরাপদ নই !’ খালিদ রওনা হয় , বাহ্যিকভাবে তাকে নিরাপত্তা দেয় কিন্তু কাপুরুষের ন্যায় তাকে হত্যা করে আর সেই রাতেই তার স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ।” ২৫
ঙ. কান্দা অঞ্চলের লোকজনকে হত্যা ও বন্দী
যিয়াদ ইবনে লাবীদ , আল্লাহর রাসূলের পক্ষ হতে কান্দা ও হাযরা মাউত অঞ্চলের গভর্ণর ছিলেন। রাসূলের (সা.) ইন্তেকালের পর আবু বকর তাকে জনগণের নিকট হতে বাইআত গ্রহণের জন্যে এবং তাদের মালের যাকাত সংগ্রহের জন্যে আদেশ প্রদান করেন। যিয়াদও তাই করেন এবং এক পর্যায়ে‘ বনী যাহল ’ গোত্রের নিকট উপস্থিত হন এবং তাদের নিকট হতে আবু বকরের জন্যে বাইআত গ্রহণ করতে চান।
এই গোত্রের‘ হারিছ ইবনে মুয়াবিয়া’ নামক একজন গোত্রপতি যিয়াদকে বলেন :“ তুমি আমাদেরকে এমন একজন লোকের আনুগত্য ও অনুসরণ করতে বলছো , যার আনুগত্যের ব্যাপারে রাসূলের পক্ষ হতে আমাদের নিকট কোনো আদেশ আসে নি !” যিয়াদ বলেন :“ সত্যিই বলেছো , তার ব্যাপারে কোনো আদেশ ও প্রতিশ্রুতি নেই তবে আমরা অর্থাৎ মদীনার লোকেরা তাকে নির্বাচন করেছি ।”
হারিছ বলেন :“ বল , আমরা জানতে চাই যে , রাসূলের আহলে বাইতকে ক্ষমতা হতে কেন তোমরা বঞ্চিত করলে ? অথচ , তাঁরা এর জন্যে সর্বাধিক উপযুক্ত ছিলেন। আর মহান আল্লাহ্ বলেন:‘ ওয়া উলুল্ আরহামি বা ’ যুহুম্ আউলা বিবা ’ যিন্ ফী কিতাবিল্লাহি। ’ অর্থাৎ আত্মীয়গণ আল্লাহর বিধানে একে অন্যের চেয়ে অধিক হকদার ।” ২৬
এই বক্তব্যগুলি হতে জানা যায় যে , আল্লাহর এই বান্দা , রাসূলের হাদীছসমূহ শ্রবণ করে নি। গাদীরে খুমের ঘটনা এবং ইমাম আলীর নিয়োগের ব্যাপারেও অনবগত রয়েছে। কিন্তু তার জানা এই আয়াতটি থেকে তিনি এরূপ বুঝেছেন যে , রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি অবশ্যই তাঁর বংশের ও আল্লাহর পক্ষ হতে মনোনীত হবেন এবং এই জন্যে তার উপর ভিত্তি করে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
যিয়াদ বলল:“ মুহাজির ও আনসারগণ তোমার থেকে নিজেদের বিষয়ে অধিক জ্ঞাত !”
হারিছ বললেনঃ“ না , আল্লাহর কসম ! তোমরা এই মর্যাদার অধিকারীকে উপেক্ষা করেছো এবং তাঁদের ব্যাপারে তোমরা হিংসা করেছো ; আদৌ এমন হতে পারে না যে , রাসূল (সা.) পৃথিবী হতে চলে যাবেন আর কাউকেই তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করবেন না !” অন্যান্যরাও তাকে সত্যায়ন করলেন ।
যাই হোক , যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। যিয়াদ ইবনে লাবীদ‘ আবু বকরের ’ নিকট সাহায্য প্রার্থনা করল। আবু বকর চার হাজার সৈন্যের একটি দলকে তার সাহায্যের জন্যে প্রেরণ করলেন। যিয়াদ এই গোত্রগুলির উপর রাত্রিতে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাদের মাঝে কতক লোককে হত্যা করল এবং অবশিষ্ট দেরকে অর্থাৎ তাদের স্ত্রী , সন্তান সকলকে সম্পদসহ বন্দী করল। আশ্চর্যের বিষয় এই যে , ঐতিহাসিকগণ সর্বত্র এদেরকেই ধর্মত্যাগী এবং আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করতঃ লিখেছেন :“ মুসলমানরা তাদের সমস্ত ধন সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করেন !” অথচ তারা সকলেই মুসলমান ছিলেন এবং শুধুমাত্র রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি ও আবু বকরের নিকট বাইআত গ্রহণের বিষয়ে তাদের আপত্তি ও প্রশ্ন ছিল। কিন্তু তাদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হয় নি এবং তাদের সবাইকে ধর্মত্যাগী ও দ্বীন হতে বহির্ভূত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে ।”
অনুরূপ আরেকটি ঘটনা এই যে , খলীফার নিযুক্ত ব্যক্তির দ্বারা‘ রাবা ’ এলাকার অধিবাসিদের আত্মীয় স্বজন নিহত হওয়ার কারণে , তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং সেখান হতে গভর্ণরকে বিতাড়িত করে। আবু বকর‘ ইকরামা ইবনে আবী জাহলকে ’ লিখেন :“ পূর্ব দায়িত্বের স্থলে‘ রাবা ’ এলাকার লোকজনের নিকট গমন কর এবং তাদের সাথে যথোপযুক্ত ব্যবহার কর। কাজের শেষে , তাদের বন্দীদেরকে আমার নিকট প্রেরণ কর এবং তুমি‘ যিয়াদ ইবনে লাবীদের ’ সাথে মিলিত হও !”
ইকরামা গমন করতঃ তাদেরকে অবরোধ করে।‘ রাবা ’ এলাকার লোকেরা প্রস্তাব দেন :“ আমরা তোমাদের মতামত গ্রহণ করব ! এস , আমরা সন্ধি করি ! আমরা যাকাত প্রদান করব এবং বাইআত করব !” তারা উত্তরে শুনতে পান :“ তোমাদেরকে এইভাবে গ্রহণ করতে পারি যে , তোমরা নিম্নোক্ত শর্তগুলি গ্রহণ করবে:
১। তোমরা স্বীকার করবে যে , তোমরা নিজেরা বাতিলপন্থী এবং আমরা সত্যপন্থী।
২। তোমাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামে এবং আমাদের নিহত ব্যক্তিরা জান্নাতে যাবে।
৩। তোমাদের আত্মসমর্পণের পর , আমরা যেমন ইচ্ছা তেমনভাবে তোমাদের সাথে আচরণ করব ।”
‘ রাবা ’ এলাকার নিরুপায় লোকজন শর্তগুলি গ্রহণ করলেন এবং প্রাক্তন গভর্ণর হুযায়ফা , যাকে তারা বের করে দিয়েছিলেন , সে বলল:“ যদি তোমরা সত্যই বলে থাক তবে যুদ্ধাস্ত্র ব্যতীত সকলে শহরের বাইরে এসো !” তারা তাই করল। ইকরামা দুর্গে প্রবেশ করল এবং তাদের মাঝে অভিজাত ও মহান ব্যক্তিগণকে হত্যা করল , তাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে বন্দী করল , তাদের ধন সম্পদগুলিকে বাজেয়াপ্ত করল এবং সবগুলিকে আবু বকরের নিকট প্রেরণ করল।
আবু বকরের সিদ্ধান্ত ছিল , তাদের পুরুষগণকে হত্যা করবেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদেরকে সৈন্যদের মাঝে বিতরণ করবেন। কিন্তু হয়রত উমর বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন এবং বলেলন :“ এরা মুসলমান এবং আল্লাহর কসম খাচ্ছে যে , তারা ইসলাম ধর্ম হতে ফিরে যায় নি। অতএব , তাদেরকে মেরে ফেলা অনুচিত ।” আবু বকর তাদেরকে হত্যা করা হতে বিরত থাকলেন কিন্তু তাদেরকে মদীনায় বন্দী করে রাখলেন এবং তার মৃত্যুর পর হযরত উমর তাদেরকে মুক্ত করে দেন।‘ উমরের আরব জাতীয়তাবোধ তীব্র ছিল এবং আবু বকরের মৃত্যুর পর আরবের সমস্ত বন্দীকে তিনি মুক্ত করে দেন। ’
অতএব , বিষয়টি ধর্মত্যাগ ও ধর্ম হতে ফিরে যাওয়া সংক্রান্ত নয় বরং এই ঘটনাগুলি এবং‘ মালিক ইবনে নুওয়াইরার ’ ঘটনা হতে যা জানা যায় তা হচ্ছে আল্লাহর রাসূলের স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি , রাসূলের ওসিয়ত এবং জাতির নেতৃত্বদান ছিল মূল বিষয়। শাসকগোষ্ঠী প্রতিবাদী কন্ঠ স্তব্ধ করার জন্যে এবং গোলযোগ দমন করার জন্যে কঠোরতার রাজনীতি অবলম্বন করে এবং‘ ধর্মত্যাগীর ’ লেবেল লাগিয়ে তাদের সকলকে হত্যা করে নিজ পথ হতে কাঁটা দূরীভূত করেছেন।
আবু বকরের ওসিয়ত
আবু বকরের শাসনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল। তিনি তার নিজ বন্ধুদের জন্যে পথকে সুগম করার পর মৃত্যুশয্যায় উছমানকে আহ্বান করেন এবং বলেন :“ লিখ ! বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম , এইটি একটি অসিয়তনামা যার মাধ্যমে আব্দুল্লাহ ইবনে উছমান (আবু বকর) মুসলমানদেরকে আদেশ দিচ্ছেন। অতঃপর ।” এই অবস্থায় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়লে উছমান নিজে থেকেই লিখেন :“ আমি তোমাদের উপর আমার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে উমর ইবনে খাত্তাবকে মনোনীত করলাম ।” আবু বকরের জ্ঞান ফিরে এল এবং তিনি বলেলন :“ কি লিখেছ পড় দেখি !” উছমান যা লিখেছিলেন তা পড়লেন। আবু বকর তকবীর ধ্বনি দেয়ার মাধ্যমে নিজ সন্তুষ্টি ব্যক্ত করলেন এবং বলেলন :“ তুমি ভয় করেছো যে , আমি মারা যাব আর লোকজন বিভেদে লিপ্ত হয়ে পড়বে ?” উছমান বলেলন :“ হ্যাঁ ।” আবু বকর বলেলন :“ আল্লাহ্ তোমাকে ইসলাম ও মুসলমানদের পক্ষ হতে উত্তম পুরস্কার দান করেন !” অতঃপর ওসিয়ত নামা সমাপ্ত করেন এবং জনগণের নিকট তা পাঠ করে শুনানোর জন্যে আদেশ দেন।২৭
আমি বলব :“ সত্যিই ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে তারা কি করেছিলেন ! যখন আল্লাহর রাসূল (সা.) উম্মতের মধ্যে বিভেদের কথা চিন্তা করে তাদের জন্যে অসিয়তনামা লিখতে চান , তখন তারা তাঁর নিষ্পাপত্বের ঐশী মর্যাদার সাথে বেআদবী করে প্রলাপ বকার অপবাদ আরোপ করে বলেন :“ রাসূলের রোগ যন্ত্রণা তীব্রতা লাভ করেছে এবং“ ইন্নার রাজুলা লাইয়াহ্জুরু ” অর্থাৎ এই লোকটি প্রলাপ বকছেন !“ হাসবুনা কিতাবুল্লাহ্ ” অর্থাৎ আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্যে যথেষ্ট ! কিন্তু যখন আবু বকর নিজ অসিয়তনামা অসমাপ্ত রেখে অজ্ঞান হয়ে পড়েন তখন তার দীর্ঘদিনের বন্ধুরা , পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটিকে পূর্ণ করেন !“ মা লাকুম্ কাইফা তাহ্কুমূন ? তোমাদের কি হয়েছে , কিরূপ বিচার করছ ?!”
ইসলামের সূচনালগ্নের ইতিহাসের একাংশ উপস্থাপনের মাধ্যমে , এখন আমাদের নিকট তার সামান্য অংশ প্রকাশিত হয়েছে। আমীরুল মু’ মিনীন আলী (আ.) এর হৃদয় বিদারক ও মর্মস্পর্শী ভাষণ , বিষয়টিকে আমাদের নিকট গ্রহণ যোগ্য ও উপলব্ধি সহজতর করে দিচ্ছে :
“ জেনে রাখ ! আল্লাহর কসম , আবু কুহাফার পুত্র খিলাফতের পোশাককে এমন অবস্থায় পরিধান করেছেন যখন তিনি জানেন যে , খিলাফত ও আল্লাহর রাসূলের স্থলাভিষিক্ত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে আমার স্থান , ঠিক যাঁতার কেন্দ্রীয় পাথরের ন্যায়। যখন আমার অধিকারকে হরণ হতে দেখলাম এমন অবস্থায় ধৈর্য ধারণে বাধ্য হলাম যে ,আমার চোখে কাঁটা এবং আমার কণ্ঠ হাড় বিদ্ধ ছিল ।। এইভাবে প্রথমজন (আবু বকর) তার পথের শেষ প্রান্তে পৌছালেন এবং তা খাত্তাবের পুত্রকে উৎকোচ দিলেন ! কি বিস্ময়কর ব্যাপার ! তার জীবদ্দশায় যা ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলতেন মৃত্যুর সময় তা অপরকে প্রদান করলেন। আহ্ ! তিনি কিরূপ লোভাতুর ও দৃঢ়ভাবে তা দোহন করেছেন !” ২৮
৪ । উমরের খিলাফত ও ইসলামে বিকৃতির প্রসার
সমস্ত মতাদর্শের উপর ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে এই যে , ইসলাম শ্রেণী শাসন ও শ্রেণীবৈষম্যের অবসান ঘটিয়েছে এবং সমতা ও ভ্রাতৃত্বের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। পবিত্র কুরআন বলছে :“ ইয়া আয়্যুহান্নাসু ইন্না খালাক্বনাকুম্ মিন্ যাকারিন্ ওয়া উনছা ওয়া জা’ আলনাকুম শু ’ ঊবান্ ওয়া ক্বাবায়িলা লিতা ’ আরাফূ ইন্না আকরামাকুম্ ’ ইন্দাল্লাহি আত্ক্বাকুম ইন্নাল্লাহা ’ আলীমুন্ খাবীর ।” অর্থাৎ হে মানুষ ! আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে সৃষ্টি করেছি এবং বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। নিশ্চয় , তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যেই ব্যক্তি সর্বাধিক খোদাভীরু। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ ও সব কিছুর খবর রাখেন ।”
আমরা জানি , ইসলামের আবির্ভাব ও প্রসারের পূর্বে তৎকালীন পৃথিবীর বিদ্যমান সকল দেশেই রূপগত পার্থক্যছাড়া শ্রেণীশাসন চালু ছিল। ইরানে এক রকমের , রোমে আরেক রকমের , ভারত ও চীনে ভিন্ন রকমের , আর আরব উপদ্বীপ তখন সভ্যতা ও রাষ্ট্রীয়শাসন হতে বঞ্চিত থাকায় তাদের গোত্রসমূহে শ্রেণীভিত্তিক শাসন বলবৎ ছিল এবং তারা গোত্রপ্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত হত ।
ইসলাম বলে : তোমরা সকলে এক পিতা মাতা হতে উদ্ভূত। আর তোমাদের বিভিন্ন গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত করা হয়েছে শুধু এই জন্যে যে , যাতে করে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। আল্লাহর নিকট সেই অধিক প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ যে সর্বাপেক্ষা খোদাভীরু।
ইসলাম ও ইসলামী আহ্বান“ হে লোক সকল ” সম্বোধন দ্বারা শুরু ও প্রচার লাভ করেছে । অর্থাৎ সমস্ত মানবকে সম্বোধন করেছে এবং সবাইকে একই শ্রেণীতে স্থান দিয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় খলীফা তার খিলাফতের সূচনায় নিজ ইজতিহাদের দ্বারা ইসলামের মাঝেও শ্রেণীবৈষম্য আবিষ্কার করেন , কিরূপে ?
ইসলামে শ্রেণী বৈষম্যের শুরু
১ বিশেষ আর্থিক সুবিধাদান
ইসলামে যাকে‘ বাইতুল মাল ’ নামে অর্থাৎ‘ সর্ব সাধারণের সম্পদ ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে তা আল্লাহর রাসূলের (সা:) যুগে এবং আবু বকরের দুই বছরের খিলাফতকালে সমানভাবে মুসলমানদের মাঝে বিতরণ করা হত। হযরত উমর এই পদ্ধতিকে অপছন্দ করেন এবং বলেন :“ প্রত্যেক ব্যক্তি বিশেষতঃ মদীনায় উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্যে , তাদের নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী বার্ষিক ভাতা নির্ধারণ করতে হবে ।” অতঃপর তিনি নিজে বিভিন্ন ব্যক্তিকে শ্রেণীবিন্যস্ত করেন এবং বলেন :“ রাসূলের নিকটতম ব্যক্তি হওয়ার কারণে উম্মুল মু’ মিনীন আয়িশা (রাঃ) বার্ষিক বার হাজার দিরহাম , রাসূলের অপর সব স্ত্রী প্রত্যেকেই দশ হাজার দিরহাম , যারা বদর যুদ্ধে ঊপস্থিত ছিলেন তারা প্রত্যেকেই পাঁচ হাজার দিরহাম , ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ চার হাজার দিরহাম , খন্দকে অংশগ্রহণকারীগণ আড়াই হাজার দিরহাম করে পাবেন ।” এইভাবে বণ্টন করতে করতে এমন কতিপয় ব্যক্তির অংশে নির্ধারিত হয় মাত্র দুইশত দিরহাম। লক্ষ্য করুন , পার্থক্যের সীমারেখা কোথা হতে কোথায় ?!এই ব্যাপক বৈষম্য কেন ও কোন ইসলামী মানদণ্ডের ভিত্তিতে হয়েছে ?
আচ্ছা , এইরূপ শ্রেণীবিন্যাস হতে কি ঘটনার অবতারণা হতে পারে ? স্পষ্ট যে , বিশেষ শ্রেণীকে সুবিধা দানের বিষয়টি যেমন ইসলাম পূর্ব যুগে মক্কায় ছিল , ঠিক তদ্রূপভাবে ইসলামের ছত্রছায়ায় পুনরায় সৃষ্টি হয়। ফলে তালহা , যুবাইর , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং উছমানের মত ব্যক্তিরা এই সুবিধা লাভ করে অন্যদের থেকে নিজেদের বিশিষ্ট ভাবতে শুরু করেন !
২। বিশেষ বংশকে প্রাধান্য ও সুবিধাদান
সকীফা অভ্যুত্থানের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে , কুরাইশ গোত্রপতিরা , বনী হাশিম গোত্রকে বাদ দেয়ার মাধ্যমে , অত্যন্ত সূক্ষ্ণভাবে হিসাব নিকাশ করে ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেয় এবং ক্ষমতা শুধু তাদের মধ্যেই আবতির্ত হতে থাকে ; এই কারণেই দ্বিতীয় খলীফা ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরামর্শ পরিষদে কুরাইশ ব্যতীত একজনকেও স্থান দেন নি। ইসলামের প্রতি এত সব উৎসর্গ করার পরও আনসারগণকে তারা এমনভাবে পরিত্যাগ করেন যে , তাদের নিজেদের শহর মদীনার গভর্ণর হিসেবেও তাদের রাখা হয়নি । শুধুমাত্র ইমাম আলীর (আ.) যুগে সাহল ইবনে হুনাইফ আনসারী মদীনার গভর্ণর হন এবং উমর ইবনে আব্দুল আযীযের যুগেও একজন আনসার মদীনার গভর্ণর হয়েছিলেন।
হ্যাঁ , কুরাইশরা সরকারী সমস্ত পদ ও সুযোগ সুবিধাকে নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে বিশেষ বংশকে প্রাধান্য দানের মাধ্যমে ক্ষমতাকে ইসলামের বিকৃতির পথে ব্যবহার করে। এই কারণে শিয়াদের বিশেষ একটি অংশের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে আমীরুল মু’ মিনীন (আ.) এই বিচ্যুতি ও বিকৃতিগুলির অংশ বিশেষের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন :“ আমার পূর্বের শাসকরা , জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করেছেন এবং তাঁর সুন্নতকে পরিবর্তন করেছেন। এখন , জনগণকে যদি পূর্ব খলীফাদের নিয়ম নীতি হতে ফিরিয়ে আনতে চাই এবং শাসন প্রণালীকে আল্লাহর রাসূলের যুগের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনি তবে আমার সৈন্যরা আমার চারপাশ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। শুধুমাত্র আমার স্বল্প সংখ্যক শিয়া (অনুসারী) যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা.) সুন্নত হতে আমার ইমামতের অপরিহার্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে জানেন তারা আমার সঙ্গে থাকবেন । আপনারা কি জানেন ?! যদি আমি আদেশ দেই যে , মাক্বামে ইবরাহীমকে (আ.) সেই স্থানে স্থানান্তর করার যেইখানে আল্লাহর রাসূল (সা:) স্থাপন করেছিলেন , ফাদাক বাগানটি যদি ফাতিমার উত্তরসূরিদের নিকট ফিরিয়ে দেই , অনুদান ও অনুগ্রহের বহিগুলি যদি বন্ধ করি , বাইতুল মালকে আল্লাহর রাসূলের মত সমানভাবে যদি বণ্টন করি এবং তা বিত্তশালীদের হাতে অর্পণ না করি , আল্লাহর রাসূলের (সা.) মসজিদকে যদি প্রাথমিক অবস্থার ন্যায় উপস্থাপন করি এবং বন্ধকৃত দরজাগুলি খুলে দেই ও খোলা দরজাগুলিকে বন্ধ করি , অযুর ক্ষেত্রে পাদুকার উপর মসেহ্ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করি , নাবীয (খেজুর হতে প্রস্তুত মদ) পানকারীদের উপর যদি মদ্যপানের শাস্তি জারি করি , মোতা’ য়ে হজ্ব (উমরায়ে তামাত্তো সমাপ্ত করে এবং হজ্বে তামাত্তোর ইহরাম বাঁধার পূর্বে নিজ স্ত্রী কিংবা অপর কোন নারী হতে শরীয়ত সম্মতভাবে উপকৃত হওয়া)ও মোতায়ে নিসা’ কে (শরীয়ত সম্মতভাবে কোন নারীকে খণ্ডকালীন বিবাহ করা) বৈধ ঘোষণা করি , মৃত ব্যক্তির নামাযকে (সালাতুল জানাযা)যদি পাঁচ তকবীরে পড়ার আদেশ দেই এবং নামাযগুলিতে‘ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ’ কে ’ উচ্চৈঃস্বরে বলার জন্যে লোকজনকে আদেশ করি ; হ্যাঁ , এই সব বিষয়ের ব্যাপারে যদি আদেশ দেই তবে নিশ্চিত যে , তারা আমার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
আল্লাহর কসম ! আমি জনগণকে আদেশ দিলাম , রমাযান মাসে শুধুমাত্র ওয়াজিব নামাযগুলিকে জামাতবদ্ধ হয়ে আদায় করার। তাদেরকে শিক্ষা দিলাম , মুস্তাহাব নামাযগুলি জামাতবদ্ধ হয়ে আদায় করা বিদ্আত ; হঠাৎ করে আমার সেনাবাহিনীর কতিপয় লোক যারা যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সঙ্গে ছিলেন , তারা চিৎকার দিয়ে বলেন :“ হে ইসলামের অনুসারীরা ! উমরের সুন্নত রূপান্তরিত হয়ে গেল , আলী আমাদেরকে রমাযান মাসে মুস্তাহাব নামায আদায় হতে বারণ করছেন !” সত্যিই আমি ভীত এই জন্যে যে , আমার সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য বিদ্রোহ করে বসবে। আহ্ ! এই জাতি হতে কত কষ্টই না পেলাম ! তাদের অনৈক্য ও নেতার অনুসরণের ক্ষেত্রে আচরণ দেখে!” ২৯
মোট কথা , ইমাম অভিযোগ পেশ করছেন এবং স্পষ্টভাবে বলছেন :“ ইসলামী উম্মাকে , তাদের নবীর সুন্নতের প্রতি ফিরিয়ে আনতে তিনি কৃতকার্য হন নি ।” তিনি এই পথে এত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেন যে , পরিশেষে মৃত্যু কামনা করে বলেন :“ তোমাদের মধ্যকার নিকৃষ্টকে কি তোমাদের হতে বিরত রেখেছে যার আগমন অবশ্যম্ভাবী এবং যা আমাকে মুক্তি দিবে ! হে আল্লাহ্ ! আমি এদেরকে ক্লান্ত করে তুলেছি এবং এরাও আমাকে ক্লান্ত করে তুলেছে , এদেরকে আমার নিকট হতে এবং আমাকে এদের নিকট হতে মুক্তি দান কর !” ৩০
উছমানের খিলাফত ও বনী উমাইয়্যাদের আধিপত্য
তরবারির আঘাতপ্রাপ্ত দ্বিতীয় খলীফা উমরের নির্দেশে“ আলী , উছমান , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ , সা’ দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস , ত্বালহা ও যুবাইরের ” সমন্বয়ে গঠিত ছয় সদস্যের পরামর্শ বোর্ড খলিফা মনোনয়নের জন্য সমবেত হয় এবং উমরের পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ‘ হযরত উছমানকে ’ খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত করেন।৩১
উছমান খিলাফতের পদ গ্রহণ করার পর প্রথম ছয় বছর তার সরকার জনগণের সাথে নরম ও সদাচার করেন। কিন্তু তার শাসন ব্যবস্থার দ্বিতীয়ার্ধে , দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমরের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বনী উমাইয়্যাদেরকে ব্যাপক ভাবে জনগণের কাঁধে আরোহণ করান। নাহ্জুল বালাগার ব্যাখ্যাতে ইবনে আবিল হাদীদ বলেন :
“ উছমানের ব্যাপারে উমরের মন্তব্য এবং ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ছিল। কারণ বনী উমাইয়্যাদেরকে উছমান জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেন । ইসলামী ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রদেশগুলিতে তাদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করেন। তাদের নেতৃস্থানীয়দের বিজিত ভূমিসমূহ এবং উর্বর কৃষিক্ষেত্রসমূহের মালিকানা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করেন। তার যুগে বিজিত আর্মেনিয়ার গনিমতের পুরোটাই তার চাচাতো ভাই মারওয়ান ইবনে হাকামকে দান করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে খালিদ ইবনে উসাইদ তার নিকট অনুদান চাওয়ার কারণে তাকে তিনি চারলক্ষ দিরহাম প্রদান করেন। হাকাম ইবনে আবিল আস যাকে রাসূল (সা.) নির্বাসন দিয়েছিলেন এবং আবু বকর ও উমরও তাকে ফিরিয়ে আনতে রাজী হন নি , তিনি তাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনেন এবং তৎসঙ্গে তাকে একলক্ষ দিরহাম দান করেন।‘ নাহরয ’ নামক মদীনার বাজারের একটি অংশ , যেটি রাসূল (সা.) মুসলমানদেরকে ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন , সেইটি তিনি মারওয়ানের ভাই হারিছ ইবনে হাকামকে দান করেন। ফাতিমার (আ.) নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া‘ ফাদাক ’ বাগানটি মারওয়ানকে উপহার দেন।
মদীনার চতুষ্পার্শ্বস্থ চারণভূমি হতে মুসলমানদের মালিকানার অবসান ঘটিয়ে ইহ্শাম ইবনে উমাইয়্যার মালিকানায় দেন এবং তার একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রিপোলী হতে তানজা পর্যন্ত আফ্রিকা বিজয়ের ফলে অর্জিত গনিমত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবী সরাহকে দান করেন এবং তা হতে একজন মুসলমানকেও অংশ দেন নি। যে দিন তিনি‘ মারওয়ানকে ’ এক লক্ষ দিরহাম প্রদান করেন সেই দিন‘ আবু সুফিয়ানকেও ’ একলক্ষ দিরহাম দেন।
এ ছাড়া তিনি বেশ কিছু সমালোচনার যোগ্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন যেমন তার নির্দেশে সাহাবী আবুযর গিফারীকে রবাযা এলাকায় নির্বাসন দেয়া হয় এবং আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে তাঁর পাঁজর ভেঙ্গে যায়। তাছাড়া ইসলামের বিধিবিধান ও দণ্ডসমূহ প্রয়োগ বন্ধ করে দেন , অত্যাচারীদেরকে প্রতিহত করা নিষিদ্ধ করেন , ইসলামী ভুখণ্ডের অধিবাসীদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্যে অসৎ ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দান করেন। মুয়াবিয়াকে লেখা তার সর্বশেষ পত্রে তিনি একদল মুসলমানকে হত্যা করার আদেশ দেন। এই সব কারণে , উছমানকে তার বিদ্আত (নব উদ্ভাবন) সম্পর্কে অবগত করানোর উদ্দেশ্যে মিশর হতে আগত লোকদের সাথে মদীনার বহু লোক একত্রিত হন এবং তাকে তারা সতর্ক ও আচরণ সংশোধন করতে বলেন কিন্তু তিনি তার অপরাধ অব্যাহত রাখার কারণে তারা তাকে হত্যা করেন ।” ৩২
উছমান , আল্লাহর রাসূলের (সা.) সুন্নতের সাথে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে , উপরোল্লেখিত আচারণগুলি করেই ক্ষান্ত হলেন না । তিনি খৃষ্টানপাদ্রী তামীমদারীকে চাকুরি প্রদান করেন। তামীমদারী বাহ্যত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং উমরের যুগে জুমু’ আর নামাযের খুৎবার পূর্বে বক্তব্য দেয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন । তাকে তিনি বিশেষ প্রাধান্য দেন , সপ্তাহে দু’ দিন বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেন এবং রাসূলের হাদীছের বর্ণনা ও প্রচার প্রসার নিষিদ্ধ থাকায় তদস্থলে বিকৃত ইসরাঈলি বর্ণনাসমূহ ইসলামী সমাজে প্রচার করেন ।৩৩
মুয়াবিয়ার খিলাফত ও ইসলামের বিরুদ্ধে নব্য পরিকল্পনা
তিন খলীফা ও হযরত আলীর (আ.) খিলাফতের সমাপ্তির পর মুয়াবিয়া খলীফা হন। তিনি ইসলামের আবির্ভাবের পরও দীর্ঘ একুশ বছর জাহিলিয়াতের যুগের ন্যায় কাফির অবস্থায় থাকেন এবং এক মুহূর্তের জন্যেও কাফির নেতাদের সংস্পর্শ হতে দূরে সরেন নি , এমনকি যেই দিন তিনি তার পিতাকে ইসলামের প্রতি বাহ্যতঃ আকৃষ্ট হতে দেখেন তখন তিনি তিরস্কারমূলক কবিতার দ্বারা তার পিতাকে সম্বোধন করে বলেন :
“ হে সখর ! ইসলাম গ্রহণ করো না ! কারণ এই ইসলাম আমাদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবে ! আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুর পর যারা বদর যুদ্ধে টুকরো টুকরো হয়েছেন। সেই নিহত ব্যক্তিদের মাঝে আমার মামা ও চাচা ছিলেন এবং আমার মায়ের চাচা ছিলেন তাদের তৃতীয় ব্যক্তি । আমার প্রিয় ভাই হানযালাও নিহতদের অন্তর্ভূক্ত ছিল ,আমাদের শত্রুরা হল তারাই যারা আমাদের প্রাতের ঘুমকে জাগরণে পরিণত করেছে । এক মুহূর্তের জন্যেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে না ! কারণ আমাদের কাঁধে অপমানের বোঝা চাপাবে ! সেই সব উটের কসম , যেগুলি দ্রুতগতিতে মক্কার পানে ধাবিত হয় এবং হাজীগণকে মক্কায় নিয়ে আসে । আমাদের মৃত্যু সহজতর , আমাদের সেই শত্রুদের তিরস্কারের চেয়ে যারা বলবে : হার্বের পুত্র আবু সুফিয়ান , ভয় ও আতঙ্কের কারণে উজ্জার প্রতিমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ।” ৩৪
মক্কা বিজয়ের পর যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে মুয়াবিয়াও , বাহ্যতঃ এই ধর্ম গ্রহণ করেন এবং হুনাইন যুদ্ধের গনিমত , যেগুলি নতুন মুসলমান ও দুর্বল ঈমানদারদের অন্তর জয় করার জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছিল অর্থাৎ“ মুয়াল্লাফাতি কুলুবিহিম ”৩৫ এর অংশ হতে তাকে একশতটি উট এবং বিপুল পরিমাণ রূপা প্রদান করা হয়। তারপর তিনি মদীনায় গমন করেন এবং দুই বছরের কিছু বেশী সময় রাসূলের (সা.) সাহচর্য লাভ করেন।৩৬
সিরিয়া বিজয়ের পর হিজরীর বিশ সালে উমরের পক্ষ হতে এবং পরবর্তীতে উছমানের পক্ষ হতে সিরিয়ার প্রাদেশিক গভর্ণর হন। হিজরী চল্লিশ সালে নিজেকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করেন , তার রাজধানী ছিল দামেশক।
বর্তমান সিরিয়া , জর্ডান , ফিলিস্তিন এবং লেবাননের সমন্বয়ে তৎকালীন শাম বা সিরিয়া গঠিত হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলাম সম্পর্কে ততটুকুই জানত যা মুয়াবিয়া তাদেরকে জানিয়েছিলেন।
সিরিয়া বিজয়ের পূর্বে সেখানে রোম সমরাটের দরবার যেরূপ ছিল মুয়াবিয়ার দরবারও তার অনুরূপ ছিল এবং প্রাক্তন খলীফাদের মত ছিল না। মুয়াবিয়া সবসময় চেষ্টা করতেন যে , সিরিয়াতে যেন রাসূলের কোনো সাহাবী উপস্থিত না থাকেন এবং সিরিয়াবাসীকে ইসলামী সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে না পারেন।
রাসূলের সাহাবীদের মধ্যে উবাদাহ্ ইবনে সামিতের সাথে মুয়াবিয়ার আচরণটিও উল্লেখ্য। উবাদাহ্ আনসারদের সেই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা হিজরতের পূর্বে মিনার আকাবাতে রাসূলের হাতে বাইআত করেছিলেন। রাসূল তাঁকে আনসারগণের বারজন প্রতিনিধির অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।৩৭ দ্বিতীয় খলীফার যুগে‘ উবাদাহ্ ’ একবার মুয়াবিয়ার সুদ খাওয়াকে কেন্দ্র করে তার সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন৩৮ এবং দ্বিতীয়বার ভারবাহী উষ্ট্রের পিঠে মশক ভর্তি মদ নিয়ে কিছু লোক মুয়াবিয়ার প্রাসাদে যাচ্ছে দেখে মশকগুলোকে ছুরি দিয়ে ছিদ্র করে দেন।৩৯
বাইতুল মালের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সাহাবী আবুযর প্রতিবাদ করেন। আর এই প্রতিবাদের কারণে আবুযরকেও উছমানের আদেশে , হাওদাবিহীন একটি উটের পিঠে আরোহণ করিয়ে সিরিয়া হতে মদীনায় প্রেরণ করা হয়।৪০ উছমান যখন কুফার অধিবাসী ক্বারী ও মুফাসসিরবৃন্দকে সিরিয়াতে নির্বাসন দেন তখন তাদের সাথেও মুয়াবিয়া দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে উছমানের আদেশে তাদেরকে নিজ রাজধানী হতে হিমস শহরে নির্বাসিত করেন।৪১
ইসলামের উপর মুয়াবিয়া সর্বাধিক অলক্ষুণে যেই আঘাতটি হানেন তা হচ্ছে‘ জাল হাদীস রচনার আদেশ প্রদান’ এবং সেই জাল হাদীসগুলি রাসূলের (সা.) পবিত্র হাদীসসমূহের সাথে সম্পৃক্ত করেন। আমরা নিম্নে সেই ঘটনা বর্ণনা করছি ।
হাদীস রচনার মাধ্যমে মুয়াবিয়ার উদ্দেশ্য
তাবারী লিখেছেনঃ মুগাইরা ইবনে শু ’ বাকে মুয়াবিয়া কুফার গভর্ণর হিসেবে নিয়োগ দান করেন। তিনি নিজ প্রশাসনিক রাজধানীর দিকে যাত্রার পূর্বেই মুয়াবিয়া তাকে তার নিজের নিকট আহ্বান করেন এবং তাকে বলেন :“ আমি তোমাকে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা ও উপদেশ দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু তোমার গভীর অনুভব ক্ষমতা ও দূরদর্শিতার জন্যে আমি তা হতে বিরত থাকছি এবং সেই কর্মভার তোমার নিজ বোধশক্তির উপর অর্পণ করছি ! তবে আমি একটি বিষয় সম্পর্কে তোমাকে উপদেশ দিতে অবশ্যই পিছপা হব না , আর তা হচ্ছে এই যে ,সর্বপ্রথম আলীর প্রতি নিন্দা ও অপবাদ আরোপ করতে কখনই ভুলবে না এবং সদা সর্বদা উছমানের জন্যে মহান আল্লাহর নিকট রহমত ও মাগফিরাত কামনা করবে !৪২
দ্বিতীয়তঃ আলীর বন্ধু বান্ধব ও সাথিবর্গের দোষ ত্রুটি অন্বেষণ করা হতে এবং তাদের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করতে কোনো ক্রমেই বিরত হবে না ! পক্ষান্তরে উছমানের বন্ধু বান্ধবদেরকে নিজের পাশে রাখবে এবং তাদের সাথে সদয় আচরণ করবে !” মুগাইরা বলেন :“ আমি আমার নিজ পরীক্ষা দিয়েছি এবং এই ক্ষেত্রে আমার বহু অভিজ্ঞতা আছে। তোমার পূর্বে অন্যান্যদের পক্ষ হতে দায়িত্ব পালন করেছি এবং কেউ আমাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে নি ! তুমিও পরীক্ষা করলে হয়তো পছন্দ করবে এবং আমার প্রশংসা করবে অথবা তোমার নিকট আমার কাজ অপছন্দনীয় হবে এবং তুমি আমাকে তিরস্কার করবে !”
মুয়াবিয়া বলেন :“ না ! ইনশা আল্লাহ্ , তোমার প্রশংসা করব !” ৪৩
ইহ্দাছ গ্রন্থে মাদায়েনী লিখেছেনঃ
মুয়াবিয়া খিলাফত হস্তগত করার পর , তার সমস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে এই বিষয়ে আদেশ দেন :“ আবু তুরাব (হযরত আলী) ও তাঁর পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করে কেউ কোনো কথা বললে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নেই এবং তার রক্ত বিফলে যাবে !” ৪৪
কুফার এই জনগণের মাঝে , আলী বংশের হিতাকাঙ্খীরা সর্বাধিক নির্যাতন ও কষ্ট ভোগ করেন ।
অন্যদিকে মুয়াবিয়া তার সমস্ত কর্মচারীদেরকে লিখিত আদেশ দেন:“ আলীর অনুসারী ও তাঁর পরিবারের কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না !” আরও আদেশ দেন :“ উছমানের হিতাকাঙ্খী ও তাঁর প্রতি আগ্রহী প্রত্যেক ব্যক্তিকে এবং যারা তাঁর ফজিলতের উপর কোনো হাদীছ বর্ণনা করবেন ও তোমাদের শাসনের অধীনে জীবন যাপন করবেন , তাদের সবাইকে তোমাদের নিকটে টানবে এবং তাদেরকে সম্মান করবে। যখন কোনো ব্যক্তি উছমানের ফজিলত সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করবে তখন তা আমাকে লিখে জানাবে এবং বক্তার নাম , তার পিতার নাম ও তার বংশের নাম নথিভুক্ত করবে !”
এই আদেশটি কার্যকর হয় এবং আত্মবিক্রেতা ও প্রবৃত্তি পূজারীরা পার্থিব পদমর্যাদা লাভের আশায় হাদীছ জাল করা শুরু করে এবং উছমানের ফজিলত বর্ণনার মাত্রা বেড়ে যায় ! কারণ , মুয়াবিয়া টাকা পয়সা , পদমর্যাদা , রাষ্ট্রীয় সুবিধা এবং যা কিছু তার হাতে ছিল , সেইগুলিকে নির্দ্বিধায় এই পথে ব্যয় করেন। অপরিচিত ও অখ্যাত কোনো ব্যক্তিও যদি মুয়াবিয়ার কর্মচারীদের নিকট গমন পূর্বক উছমানের গুণ ও ফজিলতের ক্ষেত্রে হাদীছ হিসেবে কোনো কিছু বর্ণনা করতো তাদের পছন্দের পাত্রে পরিণত হত ; তারা তার নাম রেজিষ্ট্রি করত এবং সে লোক রাজদরবারে বিশেষ মর্যাদা ও প্রাধান্য পেত।
কিছু দিন পর মুয়াবিয়ার দ্বিতীয় আদেশ প্রেরিত হয়। এই আদেশপত্রে তিনি তার কর্মচারীদেরকে লিখলো :“ এখন উছমানের ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদীছ সংগৃহীত হয়েছে এবং সব শহরেই তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ! অতএব , আমার পত্র যখন তোমাদের নিকট পৌঁছিবে তখন লোকজনকে আহ্বান করবে যে , তারা যেন প্রথম যুগের সাহাবী ও প্রথম তিন খলীফার ফজিলতের বিষয়ে হাদীছ বর্ণনা করেন , আর তাতে (হযরত আলী) আবু তুরাবের ফজিলত বর্ণনাকারী একটি হাদীছও যেন না থাকে । তার ফজিলতে বর্ণিত এমন কোন হাদীছ যেন না থাকে যার অনুরূপ হাদীছ প্রথম তিন খলীফা ও ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবাদের শানে থাকবে না কিংবা তার সম্পর্কে ঐ ফজিলতের বিপরীত বৈশিষ্ট্যের হাদীছ বর্ণনা করবে ! এটি আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ এবং আমাকে সর্বাধিক আনন্দিত করে ! কারণ এই কাজ আবু তুরাব ও তাঁর অনুসারীদের দলীল ও যুক্তিসমূহের ভিত্তি নস্যাৎ করার জন্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধারাল একটি হাতিয়ার হবে ! যেসব হাদীছ উছমানের ফজিলত বর্ণনা করে তাদের জন্যে তা কঠিনতর ও অধিকতর ধ্বংসাত্মক হবে !”
জনগণের নিকট মুয়াবিয়ার আদেশ পাঠ করে শুনানো হয় এবং তার সাথে সাহাবীদের মর্যাদা বর্ণনা করে বহু মিথ্যা হাদীছও তৈরী করা হয় যেগুলিতে সত্যের কোনো গন্ধও ছিল না ! সরলপ্রাণ লোকেরাও এই হাদীছগুলি দেখার সাথে সাথে গ্রহণ করতেন। ক্রমান্বয়ে এই হাদীছগুলি এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে ,মিম্বরগুলিতে(বক্তব্যের মঞ্চ) পুনরাবৃত্তি হতে থাকে এবং তদনুযায়ী শিশুদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হাতে অর্পণ করা হয় , যুবকরাও সেইগুলির প্রতি আসক্ত হয়। তখনকার লোকেরা যেমনভাবে কুরআন শিক্ষা করত তেমনিভাবে মিথ্যা হাদীছগুলিও মুখস্থ করত । অতপরঃ পুরুষদের সভা সমিতি অতিক্রম করে মহিলাদের শিক্ষাঙ্গন ও বৈঠক সমূহে পৌঁছে এবং শিক্ষকবৃন্দ সেইগুলিকে মুসলমান নারী ও বালিকাদের শিক্ষা দেন। অনুরূপভাবে ক্রীতদাস ও অধীনস্থদের মধ্যেও তা বিস্তৃতি লাভ করে।
ইসলামী সমাজ এইভাবে তার জীবনের সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। আর এই কারণে অজস্র মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীছ , পরবর্তী বংশধরদের মানসপটে স্থান লাভ করে। ফলে ফিকাহবিদ ,আলেম , বিচারক ও প্রশাসকগণ সকলেই সেগুলিকে সত্য মনে করে আত্মস্থ করেন ,বিশ্বাস করে প্রচারে রত হন ।
ইবনে আরাফাহ্ , যিনি‘ নাফ্তাওইয়াহ্ ’ নামে সমধিক খ্যাত এবং ইলমে হাদীছের মহান ও প্রখ্যাত ব্যক্তিগণের একজন , তিনি তার ইতিহাস গ্রন্থে কতকগুলি বিষয় লিখেছেন যেগুলি মাদায়েনীর বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তিনি লিখেন :“ সাহাবীগণের মর্যাদা সম্বলিত মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীছগুলির অধিকাংশই বনী উমাইয়্যাদের যুগে রচিত ও সংযোজিত হয়েছে । সেই হাদীছগুলির বক্তা ও রচয়িতারা উমাইয়্যা খলিফাদের নৈকট্য অর্জন , তাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্রে পরিণত হওয়ার উদ্দেশে তা রচনা করে। উমাইয়্যারা এর মাধ্যমে বনী হাশিম বংশের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করতে চেয়েছিলেন ।” ৪৫
মুয়াবিয়ার হাদীছ রচনার রাজনীতির ক্ষেত্রে যা কিছু বর্ণনা করা হল তার থেকেও তার বিষাক্ত উদ্দেশ্য ছিল । যেমন যুবাইর ইবনে বাক্কার তার‘ আল্ মুওয়াফফাকিয়্যাত ’ গ্রন্থে মুগাইরা ইবনে শু ’ বার পুত্র মুর্তারাফ হতে বর্ণনা করেন , তিনি বলেন“ আমি আমার পিতা মুগাইরার সাথে সিরিয়ায় যাই এবং মুয়াবিয়ার নিকট উপস্থিত হই । আমার পিতা প্রত্যহ মুয়াবিয়ার নিকট যেতেন এবং কিছু সময় তার সাথে কাটাতেন ,আর যখন তিনি বাড়ীতে ফিরে আসতেন তখন অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে মুয়াবিয়ার বিচক্ষণতা ও দক্ষতার ব্যাপারে কথা বলতেন এবং তার যা কিছু দেখেছেন তা আশ্চর্যের সাথে স্মরণ করতেন। কিন্তু একরাত্রে , মুয়াবিয়ার নিকট হতে বাড়ীতে ফিরে এসে খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত থাকেন এবং আমি তাকে কঠিন রাগান্বিত ও উদ্বিগ্ন দেখি। আমি ঘণ্টা খানেক বিলম্ব করি। কারণ আমি ভাবছিলাম যে ,আমাদের কোন আচরণে হয়তো আমার পিতা অসন্তুষ্ট হয়েছেন কিংবা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : আজ রাতে আপনার মন কেন এতটা খারাপ হয়ে আছে ? তিনি বললেন : হে পুত্র ! আমি সর্বাধিক নিকৃষ্ট ও সবচেয়ে বড় কাফিরের নিকট হতে ফিরে এসেছি ! আমি বললাম : হায় ! কি কারণে ?
তিনি বললেন : মুয়াবিয়ার বৈঠক জনশুন্য ছিল ,আমি তার নিকট এই প্রস্তাবটি পেশ করে বললাম : হে আমীরুল মু’ মিনীন ! আপনি আপনার উদ্দেশ্য ও কামনা বাসনায় পৌঁছে গিয়েছেন , এখন এই বৃদ্ধবয়সে যদি আপনি ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অপরের সাথে সদয় আচরণ করেন তবে কতইনা ভাল হয় ! আপনার আত্মীয় স্বজনদের (বনি হাশিম) প্রতি যদি সুদৃষ্টি দেন এবং তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখেন তবে জনগণের নিকট আপনার সুনাম বাড়বে । আল্লাহর কসম ! তাদের বিষয়ে আপনি যে ভয় ও আশঙ্কা করতেন সে অবস্থা আজ আর তাদের নেই (অর্থাৎ বনি হাশিম খিলাফতের বাসনা ত্যাগ করেছে) । মুয়াবিয়া উত্তর দিলেন : তুমি যা বলছ তা অসম্ভব অসম্ভব ! আবু বকর ক্ষমতা পেয়ে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এতসব কষ্ট সহ্য করেন ; আল্লাহর কসম ! তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার নামও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় , তবে হঠাৎ কেউ যদি কোনো দিন বলে‘ আবু বকর ’ ! যখন উমর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পান তখন সুদীর্ঘ দশ বছর ধরে অনেক পরিশ্রম করেন ও দুঃখ কষ্ট ভোগ করেন। তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার নামেরও সমাধি ঘটল , যদি না কেউ হঠাৎ তার নাম স্মরণ করে বলে‘ উমর ’ !
অতঃপর আমাদের জ্ঞাতি ভাই উছমান ক্ষমতায় আসেন। বংশ কৌলিন্যের দিক হতে তার মত আর কোনো পুরুষ ছিল না ! তিনি যা কিছু করার তাই করেছিলেন এবং লোকেরাও তার সাথে যা কিছু করার তাই করেছিল। তবে যখন তিনি নিহত হলেন , আল্লাহর কসম ! তার নামও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এবং তার কর্ম ও আচরণও বিস্মৃত হল। পক্ষান্তরে হাশিমী এই পুরুষের (রাসূল) নাম প্রত্যহ পাঁচবার ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় এবং বলা হয় :“ আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ ” । তোমার মতে এই অবস্থাকে কি অব্যাহত থাকতে দেয়া যায় ? কিভাবে তা সহ্য করা যায় ? হে মাতৃহীন ?! না , আল্লাহর কসম ! ক্ষান্ত হব না , যতক্ষণ না এই নামটিকে দাফন করব এবং সেইটিকে নিশ্চিহ্ন করব !!৪৬
হ্যাঁ , রাসূলের (সা.) নামের ব্যাপক প্রসিদ্ধি মুয়াবিয়ার অন্তরকে অগ্নি অপেক্ষা বেশী দগ্ধ করত ! কারণ রাসুলের কারণেই বদর যুদ্ধে তার ভাই , মামা , দাদা এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছিল। তিনি নিজের খেয়াল খুশি মত এই নামটিকে দাফন করতে.চেয়েছিলেন এবং এই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্যে দু’ টি পরিকল্পনা করেছিলেন ! মুয়াবিয়ার প্রথম পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল“ বনি হাশিম বংশের একজন লোকও যেন জীবিত না থাকেন !” এটি শুধু আমাদের কথা নয় বরং এই ব্যাপারে আমীরুল মু’ মিনীন ইমাম আলী (আ.) স্বয়ং এইরূপ বলেছেন :“ আল্লাহর কসম ! মুয়াবিয়ার কামনা বাসনা হচ্ছে এই যে , বনি হাশিম বংশের একজন লোকও যেন জীবিত না থাকেন ! সে এর মাধ্যমে আল্লাহর নূরকে নিভাতে চায় ! কিন্তু মহান আল্লাহ্ নিজ নূরের পরিপূর্ণতা দান ব্যতীত কখনই সন্তুষ্ট হবেন না , যদিও কাফিররা তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়নে সন্তুষ্ট হবে না ।” ৪৭
রাসূলের (সা.) নামকে দাফন করার জন্যে মুয়াবিয়া কসম খেয়েছিলেন ! তার বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীছ রচনার সহযোগী ও অনুচররা রাসূলের (সা.) ব্যক্তিত্বকে খলিফা ত্রয়ের মর্যাদা হতে নীচে নামিয়ে আনে ! যেমন বর্ণনা করা হয়েছে :“ রাসূল (সা.) গান বাজনা শুনতেন , ছোট ছোট মেয়েরা তাঁর নিকটে নাচত এবং বাদ্য বাজাত , কিন্তু আবু বকর ও উমর সেই কাজগুলি হতে বিরত থাকতেন , নিষেধ করতেন এবং নর্তকী ও বাদিকারা তাঁদের নিকট হতে পলায়ন করত !” আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে , রাসূল (সা.) এই ব্যাপারে বলেছেন :“ উমরের নিকট হতে শয়তান পলায়ন করে !” আরও বর্ণনা করা হয়েছে :“ বেগানা নারীদের বিবাহের অনুষ্ঠানে রাসূল (সা.) উপস্থিত হতেন !” আরও বর্ণনা করা হয়েছে :“ রাগান্বিত অবস্থায় রাসূল (সা.) মু’ মিনগণকে অভিসম্পাত করতেন এবং বলতেন ,“ আমি আল্লাহর নিকট কামনা করেছি যে , মু’ মিনদের প্রতি আমার অহেতুক অভিসম্পাতগুলি যেন তাদের পবিত্রতার উপকরণ হয়ে যায় !” মদীনার অধিবাসী , খেজুরগাছ পরিচর্যা কারী কৃষকদেরকে বলেন :“ খেজুরগাছগুলিকে পরাগায়ন করো না ! এতে তোমাদের খেজুর অধিকতর ভাল হবে ।” সেই বছর তারা পরাগায়ন করল না , ফলে সেই বছর তাদের খেজুরগুলি নষ্ট হয়ে গেল। লোকেরা রাসূলকে (সা.) সংবাদ দিল , তিনি বললেন :“ আনতুম আ’ লামু বি উমূরি দুনিয়াকুম মিন্নী !” অর্থাৎ তোমরা তোমাদের দুনিয়াবী কাজ কর্মের ক্ষেত্রে আমার চেয়ে বেশী জান !” আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে , রাসূল (সা.) একবার পবিত্র কাবা ঘরের নিকট সূরা নাজম তিলাওয়াত করতে গিয়ে যখন“ আফারাআইতুমুল্লাতা ওয়াল্ ’ উয্যা ওয়া মানাতাছ্ ছালিছাতাল্ উখরা ” এই আয়াতে পৌঁছেন , তখন শয়তান রাসূলের মুখ দিয়ে নিম্নোক্ত বাক্যটি বলিয়ে নেয় :“ তিলকাল্ গারানীকুল্ ’ উলা মিনহাশ্ শাফা’ আতুরতাজা ।” অর্থাৎ সেই সুশ্রী মূর্তিগুলি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ফলে তাদের প্রতি শাফাআতের আশা আছে ।” ৪৮ মুয়াবিয়া ও তার অনুচররা হযরত আলীর (আ.) নিন্দার ক্ষেত্রে , যতটা সম্ভব হয়েছে ততটা মিথ্যা হাদীছ রচনা করেছেন এবং রাসূলের (সা.) নাম দিয়ে মিথ্যা হাদীছসমূহকে মুসলমানদের মাঝে প্রচার করেছেন। কারণ তিনি হযরত আলীর উপর অভিসম্পাত করাকে জুমু’ আর নামাযের খুৎবার আবশ্যিক অংশ হিসেবে মুসলমানদের মাঝে প্রচলন করতে চেয়েছিলেন !
অপরদিকে , মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিলেন যে , ধার্মিকতা হচ্ছে খলীফাদের আনুগত্য করা , বাস ! আর এই কারণেই মুয়াবিয়া ও পরবর্তী খলীফারা যা কিছু আদেশ দিতেন , মুসলমানরা তারই আনুগত্য করত। শুধু এই কারণেই , প্রকাশ্য পাপী ও মদ্যপায়ী ইয়াযীদের হাতে মুসলমানদের নিকট হতে বাইআত ও তার খেলাফতের পক্ষে স্বীকারোক্তি নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সারকথা , ইসলামী সমাজ সেই সময়ে এইরূপ হয়েছিল যে , রাসূল (সা.) সেই বিষয়ে পূর্বেই সংবাদ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন :“ সা ইয়া’ তী ’ আলা উম্মাতী যামানুন্ লা ইয়াব্ক্বা মিনাল্ কুরআনি ইল্লা রাসমুহু ওয়ালা মিনাল্ ইসলামি ইল্লা ইসমুহু ।” অর্থাৎ আমার উম্মতের উপর এমন একটি সময় আসবে যে , তখন নাম ব্যতীত ইসলামের এবং কাগজের পৃষ্ঠায় লিখিত রূপ ব্যতীত কুরআনের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না ।” হ্যাঁ , ইসলামী সমাজ ও মুসলিম জনগণ এমন অবস্থার মধ্যেই জীবনযাপন করছিল , ফলে ষাট হিজরীতে মুয়াবিয়া মারা গেলে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযীদ তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সুযোগ পায় ।” ৪৯
খলীফার আনুগত্যের বিষয়
পূর্বোল্লেখিত বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে বলা যায় , মুয়াবিয়া মুসলমানদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন যে , সমসাময়িক খলীফার আনুগত্যের মাঝেই ইসলামের সবকিছু নিহিত বলে তারা জানত। প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে এখানেই ! দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে , মুয়াবিয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু (রাজধানি) ছিল মদীনা এবং ইসলামী ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী মুসলমানরা সেইখানে কতিপয় সাহাবী ও তাবেঈনের সাক্ষাৎ পেত আর তাঁদের নিকট হতে ইসলামী আক্বীদা বিশ্বাস ও হুকুম আহ্কাম সম্পর্কে জেনে নিত। মুয়াবিয়া সিরিয়াকে রাজধানি হিসেবে নির্ধারণ করেন এবং সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে , নামায পড়া ও রোযা রাখা ব্যতীত , তার ও তার পূর্ববর্তী রোম সমরাটের সরকারের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।
“ খলীফা যা কিছু বলেন তাই ধর্ম এবং ধর্ম বলতে সেটিই বুঝায় যেটি খলীফা বলেন ” তাদের এই বিশ্বাসের অন্যতম পরিণতি ইয়াযীদের যুগে স্পষ্ট হয়ে উঠে , যখন সে তার সৈন্যবাহিনীকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে মক্কায় প্রেরণ করে তখন তার সৈন্যবাহিনী কিবলাহ্ অর্থাৎ“ কা’ বার ” দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে এবং তারপরই আবার সেই কিবলাতে কামানের গোলা নিক্ষেপ করে !
অনুরূপভাবে যখন আব্দুল মালিক হাজ্জাজের নেতৃত্বে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে সৈন্যদল প্রেরণ করে , তখন কখনও কখনও সেনারা অলসতা করলে , হাজ্জাজ চিৎকার দিয়ে বলত :“ আত্তাআতু ! আত্তাআতু !” অর্থাৎ খলীফার আনুগত্য কর! খলীফার আনুগত্য কর! আর তারা বলত: ” ইজতামা’ আতিত্তাআতু ওয়াল্ হুরমাতু ফাগালাবাতিত্তাআতুল্ হুরমাতা !” অর্থাৎ খলীফার আনুগত্য আল্লাহর গৃহের মর্যাদার সাথে একত্রিত হয়েছে , কিন্তু খলীফার আনুগত্য আল্লাহ গৃহের মর্যাদার উপর প্রাধান্য পেল !” খলীফা আদেশ দিয়েছে যে , যেন আল্লাহর ঘরকে কামানের গোলায় উড়িয়ে দেই , আর আমরাও কামানের গোলায় তা উড়িয়ে দিচ্ছি !৫০ অনুরূপভাবে , মদীনার লোকেরা ইয়াজিদের খিলাফতের দ্বিতীয় বর্ষে যখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ্ করে , তখন ইয়াজিদ মদীনায় সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে এবং সে তিন দিনের জন্যে মদীনার অধিবাসীদের জান , মাল ও স্ত্রী কন্যাদেরকে তাদের জন্য হালাল করে দেয়।৫১ এভাবেই তার সেনাদল খলিফার আনুগত্যের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সেখানে সকল প্রকার অন্যায় আচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ চালায় । ফলে রাসূলের (সা.) মসজিদে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হয় এবং সেই ঘটনার পর সহস্র মহিলা এমন শিশুদের জন্ম দিয়েছিলেন যাদের পিতৃ পরিচয় ছিল না !৫২ সেনাপতি মুসলিম ইবনে উকবা ইতিহাসে যে‘ মুসরিফ ’ বলে প্রসিদ্ধ সে ঐ ভয়ঙ্কর অপরাধ যজ্ঞ সম্পন্ন করার পর যখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদীনা হতে মক্কার অভিমুখে যাত্রা করে এবং পথিমধ্যে মারা যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় বলে :“ হে আল্লাহ্ ! খলীফার আনুগত্যের লক্ষ্যে মদীনার অধিবাসীদেরকে হত্যার পর যদি তুমি আমাকে জাহান্নামে পাঠাও তবে প্রমাণিত হবে যে , আমি অতি হতভাগ্য !” ৫৩
অর্থাৎ খলীফার আনুগত্যের পথে আমি মদীনার অধিবাসীদেরকে হত্যা করেছি এবং এর মাধ্যমে আমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চেয়েছি।
শিমার ইবনে যিল জাওশান নিজেও যখন হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (ইমাম হুসাইন) শাহাদতের পর তিরস্কারের পাত্র হিসেবে চিহ্নিত হয় , তখন প্রতি উত্তরে বলে :“ ধিক তোমাদের প্রতি ! আমাদের কাজ ছিল খলীফার আনুগত্য করা। যদি আমরা খলীফার আনুগত্য না করতাম তবে এই চতুষ্পদ জন্তুগুলির মত হতাম !” ৫৪
অতএব , একদিকে খলীফার জন্যে মুসলমানদের আনুগত্য এই সীমায় পৌঁছেছিল এবং অপরদিকে খলীফা ইয়াযীদ এমন কেউ ছিল যে , ধারণা করত , সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর ইসলামের সমস্ত জিনিস শেষ হয়ে গেছে এবং তার বিপরীতে রুখে দাঁড়ানোর মত আর কেউ নেই। যে অনুষ্ঠানে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) মাথা আনা হয়েছিল সেইখানে এই কবিতাগুলি পাঠের দ্বারা সে স্বীয় বিশ্বাসকে প্রকাশ করে :
লা’ য়িবাত্ হাশিমু বিল্ মুলকি ফালা , খাবারুন্ জাআ ওয়া লা ওয়াহ্য়ুন্ নাযালা।
লাস্তু মিন্ খিন্দিফা ইনলাম্ আন্তাক্বিম্ , মিন্ বানী আহমাদা মা কানা ফা’ আলা।
ক্বাদ ক্বাতালনাল্ ক্বারমা মিন্ সাদাতিহিম্ , ওয়া’ আদালনা মাইলা বাদরিন ফা’ তাদালা।৫৫
“ সেই হাশিমী পুরুষটি ক্ষমতার সাথে খেলা করেছেন , তা ছাড়া , না কোনো ঐশী প্রত্যাদেশ এসেছে আর না কোনো সংবাদ !
বনী আহমাদ (রাসূলের বংশধর) বদরের দিন যেইরূপ কাজ করেছেন , আমি (ইয়াযীদ) যদি সেইরূপে প্রতিশোধ গ্রহণ না করি তবে আমি আমার দাদা বাবার সন্তান নই !
আমরা তাদের মহান ও নেতা ব্যক্তিদেরকে হত্যা করেছি এবং বদর দিনের প্রতিশোধ নিয়েছি , বদর প্রান্তরে সেদিন উৎবা , শাইবা ও হানযালা নিহত হয়েছিলেন ; আজ আমি পাল্লাকে সমান করেছি এবং শিরের বদলে শির নিয়েছি !”
হযরত আবা আব্দিল্লাহর (আ.) বিদ্রোহের কারণ
মোট কথা , মুসলমানদের আক্বীদা বিশ্বাস এইরূপ হয়েছিল যে , ধর্ম তাই যা খলীফা বলে। তাহলে এই অবস্থায় ইসলামের কী কিছু অবশিষ্ট থাকবে ?! এই অবস্থার বর্ণনা , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) বক্তব্যে কতকটা ফুটে উঠেছেঃ
১। মদীনায় তিনি তাঁর ভাই মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাকে তাঁর স্বহস্তে লিখিত যে অসিয়ত নামাটি দিয়েছিলেন , তার প্রারম্ভে বলেন :” ইন্নাল্ হুসাইনা ইয়াশহাদু আন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান্ আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু ।” তাঁর অসিয়তনামার শুরুতে তিনি এইটি বলেন যাতে তাঁর মৃত্যুর পর লোকেরা না বলে যে , আলীর পুত্র হুসাইন একজন বিদ্রোহী ছিলেন। যিনি মুসলমানদের খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দ্বীন হতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি লিখেনঃ“ ওয়া ইন্নী লাম্ আখরুজ আশারান্ ওয়া লা বাত্বারান্ ওয়া লা মুফসিদান্ ওয়া লা যালিমান্ ওয়া আন্নামা খারাজতু লিত্বালাবিল্ ইসলাহি ফী উম্মাতি জাদ্দী ।” অর্থাৎ আমি নিছক বিদ্রোহের উদ্দেশ্যে , শখের বশে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে বের হই নি। বরং আমি আমার নানাজানের উম্মতকে সংশোধন করার জন্যে বের হয়েছি।“ উরীদু আন্ আসীরা বিসীরাতি জাদ্দী ওয়া আবী’ আলী ইব্নি আবী ত্বালিব ।” “ আমি আমার নানাজান (সা.) এবং আমার পিতা আলীর (আ.) পথের অনুসরণ করতে চাই ।” কিন্তু অন্যান্য খলীফাদের নাম উচ্চারণ করলেন না।“ উরীদু আন্ আ’ মুরা বিল্ মা’ রুফি ওয়া আনহা ’ আনিল্ মুনকারি ফামান ক্বাবিলানী বিক্বাবূলিল্ হাক্কি ফাল্লাহু আউলা বিল্ হাক্কি ওয়া মান্ রাদ্দা ’ আলায়্যা হাযা আস্বিরু হাত্তা ইয়াক্বযীয়াল্লাহু বাইনী ওয়া বাইনাল্ ক্বাউমি ওয়া হুআ খাইরুল্ হাকিমীন ।” আমি সৎ কাজের প্রতি আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে চাই। অতএব , লোকেরা যদি আমাকে গ্রহণ করে তো করুক , আর গ্রহণ না করলে তাদেরকে আল্লাহর উপর অর্পণ করব , আর তিনি হচ্ছেন উত্তম বিচারক।৫৬
সুতরাং হযরত সাইয়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) এর আন্দোলনের কারণ ও হেতু এই“ অন্তিম বাণীতে ” বর্ণিত হয়েছে।
২। যে রাত্রে তাঁর থেকে বাইআত গ্রহণ করতে চাচ্ছিল এবং তিনি বাইআত করেন নি , তার পরের দিন মারওয়ান তাঁর সাথে দেখা করে এবং তাঁর নিকট আবেদন করে :
“ আমার একটি উপদেশ শুনুন!” তিনি বললেন:” বল!” সে বলল:” আসুন! ইয়াযীদের নিকট বাইআত করুন ; এটি আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্যে কল্যাণকর হবে!” তিনি বললেনঃ“ ওয়া’ আলাল্ ইসলামি আসসালামু ইযা বুলিয়াতিল্ উম্মাতু বিরায়িন্ মিছলি ইয়াযীদা!” অর্থাৎ যদি মুসলিম জাতি , ইয়াযীদের মত একজন প্রতিনিধি ও আমীরের আনুগত্য করে তাহলে ইসলামের সাথে খোদা হাফেযী করতে হবে এবং তাকে বিদায় জানাতে হবে!” ৫৭
৩। অন্য এক স্থানে তিনি বলেন :“ ইন্না ইয়াযীদা রাজুলুন্ শারিবুল্ খামরি ক্বাতিলুন্ নাফসিল্ মুহতারামাতি ওয়া মিছ্লী লা ইউবায়ি ’ য়ু মিছ্লাহু!” অর্থাৎ ইয়াযীদ একজন মদ্যপায়ী লোক। যাদেরকে হত্যা করা নিষেধ তাদেরকে সেই হত্যা করে। আমার মত লোক কখনই তার মত লোকের আনুগত্য করতে পারে না !৫৮
ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণী
হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের উপর ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত যে সব হাদীছ রাসূল (সা.)৫৯ এবং হযরত আলী (আ.)৬০ হতে বর্ণিত হয়েছে , সেগুলির প্রেক্ষিতে , সমস্ত মুসলমানই সেই বিদ্রোহের জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন ; আর যেহেতু তারা জানতেন এবং রাসূলের (সা.) নিকট হতে শুনেছিলেম যে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) ইরাকের ভূমিতে শহীদ হবেন , তার জন্যে ইবনে আব্বাস ও অন্যান্যরা তাঁকে ইরাকে যেতে নিষেধ করছিলেন।৬১
রাসূল (সা.) কারবালার অল্প পরিমাণ মাটি , উম্মে সালমাকে দিয়েছিলেন , এই উদ্দেশ্যে যে , তিনি যেন তা একটি বোতলে সংরক্ষণ করেন এবং তিনি তাকে বলেছিলেন :৬২ “ যখন এই মাটি রক্তে পরিবর্তিত হবে তখন বুঝবে যে , আমার সন্তান ইমাম হুসাইন (আ.) শহীদ হয়েছে !”
অতএব , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের খবরটি এমন এক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যা রাসূল (সা.) কয়েকবার তাঁর সাহাবীদেরকে বলেন। প্রথমবার , হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্মের দিন জিবরাঈল (আ.) আগমন করেন এবং রাসূলকে (সা.) হুসাইনের (আ.) শাহাদতের খবর দেন। রাসূল (সা.) ক্রন্দন করেন এবং সংবাদটি অন্যদের দেন । তাঁর জন্মের দু’ বছর পর অপর একজন ফেরেশ্তা আগমন করেন এবং রাসূলকে (সা.) সংবাদ দেন। রাসূল (সা.) পুনরায় ক্রন্দন করেন এবং উপস্থিত জনতাকে সংবাদটি সম্পর্কে অবগত করেন। এই সংবাদটি অধিকাংশ সাহাবীই শুনেন।৬৩
মক্কা হতে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) যখন যাত্রা করেন তখন“ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর ” তাঁর সমীপে আসেন এবং বিনীতভাবে তাঁকে ইরাকে যেতে বারণ করেন। কারণ এই পথে তিনি নিহত হবেন। তিনি তাকে এমনটি বলেন নি যে , তিনি নিহত হবেন না। বরং তিনি বলেন :“ মিন্ হাওয়ানিদ্ দুনিয়া আন্ য়ুহালা রা ’ সু ইয়াহ্ইয়া ইবনি যাকারিয়্যা ইলা বাগিয়্যিন মিন্ বাগায়া বানী ইসরাঈলা ।” অর্থাৎ পৃথিবীর হীন অবস্থার (বোঝার) জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে , ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়ার মাথাকে বনী ইসরাঈলের নিকৃষ্টলোকদের অন্তর্ভূক্ত একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে উপহার দেয়া হয় ।” তিনি প্রার্থনা করলেন :“ এখন যদি যান , তবে আপনার শরীরের যে অংশটিতে রাসূল (সা.) চুমু খেতেন সে অংশটুকু বের করেন , আমি চুমু খাব ।” তিনি নিজ জামাটি উঁচু করলেন এবং ইবনে উমর তাঁর ক্বলবের উপর (তিরের স্থানটি , যেখানে রাসূলকে তিনি চুমু দিতে দেখেছিলেন সেখানে) চুমু দেন।৬৪
এই বিষয়ে অপর যে বর্ণনাগুলি এসেছে তার অন্যতম হচ্ছে যে , হযরত দাউদের সন্তানদের অবশিষ্ট এক ব্যক্তি যিনি ইহুদী আলেম ছিলেন যখন কারবালায় পৌঁছতেন তখন তিনি সেখান দিয়ে দ্রুত অতিক্রম করতেন এবং বলতেন :“ আমি পড়েছি ,এই ভূমিতে রাসূলের একজন সন্তান নিহত হবেন ।” তিনি ভয় করতেন যে , হয়তো রাসূলের সেই সন্তান তিনিই হবেন। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর তিনি বুঝলেন যে , তিনি সেই পুরুষ ছিলেন না এবং সেখান দিয়ে আর দ্রুত অতিক্রম করতেন না।৬৫
দ্বিতীয় এই যে , রাসূলের একজন সাহাবা তাঁর নিকট হতে শুনেছিলেন যে , কারবালাতে তাঁর সন্তান সন্ততিদের কেউ একজন নিহত হবেন। তিনি রাসূলের (সা.) সন্তান সন্ততিদের সাথে শহীদ হওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় ধরে কারবালাতে অবস্থান করেন। বনী আসাদ গোত্রের লোকেরা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কারবালা প্রান্তরে আসেন এবং সেখানে সেই সাহাবীকে বাস করতে দেখেন। তারা তাঁর নিকট এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন :“ আমি রাসূলের (সা.) নিকট হতে শুনেছি যে , এইখানে তাঁর একজন সন্তান শহীদ হবেন। আমি তাঁর সঙ্গী হতে চাই ।” হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর বনী আসাদ গোত্রের লোকেরা পরস্পর বলাবলি করেন :‘ চল আমরা দেখি যে , সেই লোকটি শহীদগণের মধ্যে আছেন কি না ?’ তারা এসে দেখেন , সে মরুভূমিতে সমস্ত শহীদের সাথে তাঁরও লাশ রয়েছে।৬৬
মদীনা হতে ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রস্থান
তিনি এমন এক সময় মদীনা হতে বের হয়ে মক্কায় পৌঁছেন যে , সেই সময় আরব দ্বীপের লোকেরা মুফরাদা উমরা পালনের জন্যে মক্কায় এসেছিলেন। এই কারণে তাঁর বাইআত না করার সংবাদটি হেজায হতে ইরাক , সিরিয়া ও ইয়েমেন তথা সমগ্র আরব দ্বীপে প্রচারিত হয়েছিল এবং উমরার উদ্দেশ্যে আসা লোকেরা ফিরে গিয়ে অপর লোকদেরকে সংবাদটি পরিবেশন করেছিলেন যে , রাসূলের (সা.) দৌহিত্র , ইয়াযীদের নিকট বাইআত না করে মক্কায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং তিনি বলছেন ;“ ইয়াযীদু রাজুলুন্ শারিবুল্ খামরি ওয়া ক্বাতিলুন্ নাফ্সিল্ মুহতারামাতি ওয়া মিছ্লী লা ইউবায়ি ’ য়ু মিছ্লাহ্ ।” এই সংবাদটি সেখানকার সমস্ত অঞ্চলে প্রচারিত হয়। অতঃপর হজ্জ মৌসুমেও যেই সমস্ত লোক হজ্জ পালনে এসেছিলেন তারা পুনরায় তাঁর নিকট হতে কথাগুলি শুনেছিলেন। এর পূর্বেও কুফার লোকেরা , ইমাম হাসানের (আ.) শাহাদত বরণের পর হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) নিকট এই মর্মে পত্র লিখেছিল যে , আমরা আপনার নিকট বাইআত করার জন্যে প্রস্তুত এবং মুয়াবিয়ার বিপক্ষে বিদ্রোহ করতে চাই। তিনি প্রতি উত্তরে লিখেন যে , যতদিন পর্যন্ত মুয়াবিয়া জীবিত আছেন“ কূনূ হিলসান মিন্ আহলাসি বুয়ূতিকুম ।” অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত মুয়াবিয়া জীবিত আছেন ততদিন পর্যন্ত তোমরা তোমাদের গৃহের ব্যবহৃত চটের মত গৃহের কোণে বসে থাক।৬৭
মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পরও তারা পুনরায় তাঁর নিকট পত্র লিখে। তাঁর নিকট এত বেশী পত্র আসে যে , তা (বড় আকারের) দুইব্যাগ পরিমাণ হয়েছিল ।৬৮ পত্রগুলির বিষয়বস্তু ছিল এইরূপঃ“ আক্বদিম্ ’ আলা জুন্দিন্ লাকা মুজান্নাদুন্ ।” অর্থাৎ আপনি কুফাতে আসেন , আপনার জন্যে সৈন্য প্রস্তুত আছে।৬৯
তিনি তখন বাইআত গ্রহণ করার জন্যে মুসলিম ইবনে আক্বীলকে কুফায় প্রেরণ করেন। মুসলিম ইবনে আক্বীল সহস্র যোদ্ধা পুরুষের নিকট হতে বাইআত গ্রহণ করেন , সেইখানে বিশ হাজারেরও বেশী লোক তার নিকট বাইআত করেন।৭০
অতঃপর তিনি একখানা পত্রের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) জানান।৭১
অপরদিকে , মক্কায় হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) হত্যা করার জন্যে ইয়াযীদ বনী উমাইয়্যা গোত্রের একদল লোককে প্রেরণ করে এবং এই সংবাদটি তাঁর নিকট পৌঁছে যায়।৭২
যারা হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) ইরাকে যেতে বারণ করছিলেন , তাদের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাও (আ.) প্রত্যেককেই যথোপযুক্ত জবাব দিচ্ছিলেন। যখন ইবনে যুবাইর তাঁর নিকট এই আবেদন করেছিলেন যে ,“ এইখানে অবস্থান করেন , আমরাও আপনার সান্নিধ্যে থাকতে পারব ।” তিনি বললেনঃ“ রাসূলকে (সা.) বলতে শুনেছি : ইউক্বতালু ফিল্ বাইতি কাব্শুন্ মিন্ কুরাইশিন্ তুহ্তাকু বিহি হুরমাতুহু ফামা উহিব্বু আন্ আকূনা যা লিকাল্ কাবশ্ ।” অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে কুরাইশগণের একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি নিহত হবে এবং তাঁর হত্যার মাধ্যমে আল্লাহর ঘরের সম্মান বিনষ্ট হবে। আমি সেই ব্যক্তি হতে চাই না ।” ৭৩ । সে ব্যক্তিটি স্বয়ং‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর ’ ছিলেন , যিনি ইয়াযীদ ও বনী উমাইয়্যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং এই কারণে তারা আল্লাহর ঘরে কামানের গোলা বর্ষণ করে ঐ গৃহের সম্মান নষ্ট করে।
দ্বিতীয় জন ছিলেন ইবনে আব্বাস , তিনি বিনীতভাবে প্রার্থনা করলেন :“ ইয়াবনা রাসূলিল্লাহ্ ! (হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান) আপনি মক্কায় থাকেন কিংবা ইয়েমেনে যান , সেখানে আপনার অনুসারীগণ আছেন ।” তিনি বললেন : বনী উমাইয়্যারা আমার উপর থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত হাত গুটাবে না যতক্ষণ না আমি বাইআত করব , না হয় নিহত হব ।” ৭৪ কারণ যতদিন পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন এবং ইয়াযীদের নিকট বাইআত করছিলেন না ততদিন পর্যন্ত ইয়াযীদের খিলাফত দৃঢ় হয় নি। অতএব , হয় হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) ইয়াযীদের নিকট বাইআত করতে হত নতুবা যে অবস্থায় কল্যাণকর মনে করতেন সে অবস্থায় নিহত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হত। এ ছাড়া আর বিকল্প কোনো পথ ছিল না !
পক্ষান্তরে , কুফার অধিবাসীরা সহস্র পত্র লিখেছিল এবং সহস্র যোদ্ধা পুরুষ তাঁর নিকট বাইআত করেছিল। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) যদি কুফায় না যেতেন , তবে কী ইতিহাসে লিখা হত না যে , কুফাবাসীরা বাইআত করা সত্ত্বেও তিনি কুফায় যান নি ? কিয়ামত দিবসে কুফাবাসীরা কী আল্লাহর নিকট এই কথা বলার অধিকার রাখত না ? :“ হে আল্লাহ্ ! আমরা বাইআত করেছি , পত্র লিখেছি ; কিন্তু তোমার রাসূলের সন্তান আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেন নি ।”
খলীফাদের যুগে‘ জিহাদের’ অর্থের পরিবর্তন
রাসূলের (সা.) যুগের‘ যুদ্ধ ’ ও‘ জিহাদ ’ , ধর্মের পথে যুদ্ধ ও জিহাদ ছিল। কিন্তু খলীফাদের যুগের যুদ্ধ ও জিহাদ ছিল রোম ও পারস্য সম্রাটদের ধনভাণ্ডারকে হস্তগত করার জন্যে। ফলে দ্বীন ও দুনিয়া তাদের জন্যে একত্রিত হয়ে ছিল। আর এই কারণে , হযরত আমীরুল মু’ মিনীন (আ.) যখনই সৈন্য সমাবেশ করতে চাইতেন তখন যেহেতু তিনি প্রতিপক্ষ মুসলমানদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন ও আত্মসাত করার অনুমতি দিতেন না , তাই তাঁর খিলাফতের শেষদিকে লোকেরা তাঁকে গ্রাহ্য করছিল না। হযরত আমিরুল মু’ মিনীনের (আ.) যুগে জিহাদ , রাসূলের (সা.) যুগের জিহাদের মত , দ্বীনের পথে জিহাদ ছিল এবং দুনিয়া তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু খলীফাদের যুগের লোকেরা , দ্বীনের পথে জিহাদ করাকে ভুলে গিয়েছিল এবং দুনিয়া ব্যতীত দ্বীনের পুনর্জাগরণের জন্যে জিহাদ করা , তাদের নিকট কোনো অর্থ ছিল না।
জিহাদ , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) যুগেও এই অর্থে রূপান্তরিত হয়েছিল। অর্থাৎ দুনিয়ার জন্যে এবং দুনিয়াকে হস্তগত করার জন্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ! আর এই কারণেই তাঁকে সবাই বলত :“ আপনি কুফায় যাবেন না !” ইবনে আব্বাস , আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর , অন্যান্য সাহাবীরা এমনকি তাঁর ভাই উমর ইবনে আলী , তিনি মদীনাতে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) সমীপে উপস্থিত হয়ে বিনীতভাবে প্রার্থনা করেন :“ ইয়া আখী ! সামি ’ তু আখিল হাসান এবং তাঁর শুনা কথাগুলি পুনর্ব্যক্ত করতে পারছিলেন না , তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) তাঁর ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন :“ ভাই ! তুমি ধারণা করছ আমার ভাই‘ হাসান (আ.)’ তাঁর পিতার নিকট হতে কিছু শুনেছেন এবং তোমাকে বলেছেন আর আমাকে বলেন নি ?” ৭৫ উমর ইবনে আলী উত্তরে বলেন :“ ভাই ! আসুন , (সে কথাগুলির) ভিন্নরূপ ব্যাখ্যা করেন এবং আপনি যাবেন না। তাহলে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হবে না ।” তিনি তাকে বুঝাতে পারছিলেন না যে , বিদ্রোহ করা উচিত এবং নিহত হওয়া দরকার। আর তাঁর বিদ্রোহের মাঝে পার্থিব কোন উপকার নেই। তিনি তাকে বলতে পারছিলেন না :“ আমরা অবশ্যই বিদ্রোহ করব এবং রাসূলের (সা.) যুগের ন্যায় নিহত হব , তাহলে আল্লাহর দ্বীন পুর্নজীবিত হবে ।”
রাসূলের (সা.) যুগে , বদরযুদ্ধে , আনসারগণের মধ্য হতে রাসূলের(সা.) একজন সাহাবী (উমাইর ইবনে হুমাম) খোরমা খেতে খেতে রাসূলের (সা.) সমীপে আসেন এবং বিনীতভাবে বলেনঃ“ ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! মা লিমান্ গামাসা ইয়াদাহু ফীহিম ওয়া ক্বাতালা হাত্তা কুতিলা ?” “ হে আল্লাহর রাসূল ! যে ব্যক্তি তরবারিসহ তার হাতকে এদের দিকে বাড়াবে , যুদ্ধ করবে এবং শেষ পর্যন্ত নিহত হবে , তার বিনিময় কি ?” তিনি উত্তর দিলেন :“ আল্ জান্নাহ্ ।” সেই সাহাবী বললেন :“ বাখ্যিন বাখ্যিন মা বাইনী ওয়া বাইনাল্ জান্নাতি ইল্লা হাযিহিত্তামারাতু আ’ কুলুহা ।” অর্থাৎ বাহ্ বাহ্ ! আমার এবং বেহেশ্তের মাঝে শুধুমাত্র এই খোরমাগুলির ব্যবধান রয়েছে যা আমি খাচ্ছি !” অতঃপর তিনি খোরমাগুলি হাত হতে ফেলে দেন এবং যুদ্ধ করে শহীদ হন।৭৬
রাসূলের যুগে‘ জিহাদ ’ ছিল এরূপ। কিন্তু তাঁর পরে অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল ; পুরো ইসলামই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) মুখ নিস্মৃত কবিতার এই পংক্তিটি তার প্রকৃতি তুলে ধরেছে :
ইন্ কানা দ্বীনু মুহাম্মাদিন্ লাম্ ইয়াস্তাক্বিম্ ইল্লা বিক্বাত্লী ইয়া সুয়ূফু খুযীনী।“ যদি মুহাম্মদের (সা.) দ্বীন আমার নিহত হওয়া ব্যতীত সুদৃঢ় না হয় তবে সাবধান , হে তরবারিসমূহ ! আমাকে গ্রহণ কর !” ৭৭
যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে , যখন তিনি মক্কা হতে ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছিলেন তখন তিনি হাজীগণের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন এবং এইরূপ বলেন :“ খুত্তাল্ মাউতু ’ আলা উলদি আদামা মাখাত্তাল্ ক্বিলাদাতি ’ আলা জীদিল্ ফাতাতি ।” অর্থাৎ বনী আদমের জন্যে মৃত্যু , ঠিক যুবতী মেয়েদের গলে গলাবন্ধনির মত মানানসই। তিনি আরও বলেন :“ কাআন্নী বিআউসালী তাতাক্বাত্তা ’ উহা ’ আস্লানুল্ ফালাওয়াতি বাইনান্নাওয়াবীসি ওয়া কারবালা !” “ আমি যেন দেখতে পাচ্ছি আমার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলিকে কারবালা এবং নাওয়াবিস ভূমির মাঝে মরুভূমির নেকড়েরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে !” “ লান্ তাশুয্যা ’ আন্ রাসূলিল্লাহি লুহমাতুহু বাল্ হিয়া মাজমু’ আতুন্ লাহু ফী হাযীরাতিল কুদ্সি ।” “ আল্লাহর রাসূলের (সা.) রক্ত মাংস , যা আবা আব্দিল্লাহর শরীরে আছে , তা রাসূল (সা.) হতে পৃথক হবে না এবং বেহেশ্তে তাঁর সাথে সম্মিলিত হবে ।” ৭৮
অনুরূপভাবে ,যখন তিনি মক্কা হতে বের হতে চাচ্ছিলেন তখন তিনি এক লাইনের এক খানা পত্রে বনী হাশিমদেরকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন :“ ইলাল্ মালাআ মিন্ বানী হাশিমিন্ আম্মা বা ’ দু মান্ লাহিক্বা বী মিনকুম ইস্তাশহাদা ওয়া মান্ তাখাল্লাফা’ আন্নী লাম্ ইয়াবলুগিল্ ফাত্হা ।” “ তোমাদের মধ্য হতে যে আমার সাথে মিলিত হবে সেই শহীদ হবে , আর যে আমাকে সহযোগিতা করা হতে বিরত থাকবে সে কৃতকার্য হবে না ।” ৭৯ অতএব , তিনি শাহাদতের মাঝেই কৃতকার্যতাকে দেখেছেন।
ইরাকের পথে ইমাম (আ.) যে স্থানেই যাত্রাবিরতি করতেন বলতেন :“ মিন্ হাওয়ানিদ্ দুনিয়া আন্ য়ুহমালা রা ’ সু ইয়াহ্ইয়া ইবনি যাকারিয়্যা ইলা বাগয়িন্ মিন্ বাগায়া বানী ইস্রাঈল ।” ৮০
দুনিয়ার অন্যতম অধমতা এই যে , ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়ার মাথাকে বনী ইস্রাঈলের নিকৃষ্টলোকদের মধ্য হতে একজন নিকৃষ্টলোকের জন্য বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ।”
অতএব , প্রতীয়মান হয় যে , তিনি জানতেন যে , হয় তাঁকে নিহত হতে হবে , নতুবা বাইআত করতে হবে ; এই দু’ টি ভিন্ন অন্য কোন পথ তার ছিল না। যদি তিনি বাইআত না করতেন তবে ইয়াযীদের খিলাফত অনিশ্চিত হয়ে যেত এবং তাঁকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হত না। সুতরাং বাইআত না করলে তাঁর নিহত হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল , এমনকি যদি তিনি পবিত্র কা’ বার গেলাফের নিচেও আত্মগোপন করতেন এবং বাইআত না করতেন। আর তিনি বাইআত করলে , মুসলমানদের মধ্যে এই আক্বীদা বিশ্বাস জন্মাত যে , খলীফা ইয়াযীদ যা বলবে তাই ধর্ম । তাহলে আর ইসলামের কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। সুতরাং তাঁর বাইআত করাও উচিত নয়। তিনি বাইআত করলে , মুসলমানদের বলার অধিকার ছিল যে , রাসূলের (সা.) নাতি ইয়াযীদের নিকট বাইআত করেছেন। সমস্ত পাপ তাঁর কাঁধের উপর বর্তাত। আর এইটি , রাসূলের (সা.) ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ যা , মুসলমানদেরকে এই বিদ্রোহের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছিল , তার সাথে বিরোধ দেখা দিত।
লোকেরা এভাবেই হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের অপেক্ষায় ছিল। তিনি জানতেন যে , তাঁকে কারবালায় যেতে হবে , তাই তিনি লোকজনকে সেই বিদ্রোহের কারণ উপলব্ধি করানোর জন্যে , প্রস্তুত করছিলেন। অনরূপভাবে যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ , যখন হাজীগণ আরাফা ময়দানে যাচ্ছেন , হাজীগণের অনেকেই আফ্রিকা হতে ইরান পর্যন্ত দূরবর্তী স্থানসমূহ থেকে প্রায় এক বছরের রাস্তা অতিক্রম করে মক্কায় পৌঁছেছিলেন , তারা আল্লাহর রাসূলের (সা.) দৌহিত্রের সাথে সাক্ষাত করেন , দেখেন এবং শুনেন যে , তিনি যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে আরাফার ময়দানে যান নি এবং স্বীয় হজ্জকে‘ মুস্তাহাব হজ্জ ’ হতে‘ মুস্তাহাব উমরায় ’ পরিবর্তন করেছেন৮১ ও বলেছেন :“ তারা আমাকে এইখানে মেরে ফেলতে চায় , আমি বাইআত করব না !” এর মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের নিকট চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করেন।
কারবালায় ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রবেশ
তৎকালে রেডিও এবং টিভির মত কোনো মাধ্যম না থাকা সত্ত্বেও হযরত সায়্যিদুশ শুহাদা (আ.) গৃহিত পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে তাঁর বিদ্রোহ ও ইরাকের দিকে রওয়ানা হবার সংবাদটি , সে যুগে বিশ্বের সমস্ত মুসলমানের নিকট পৌঁছে গিয়েছিল।
তিনি তখনও কারবালায় পৌঁছেন নি এবং হুর ইবনে ইয়াযীদ রিয়াহী ’ র সৈন্যবাহিনী তাঁর মুখোমুখি হয় নি ; ইতোমধ্যে কুফা অঞ্চলের দু’ জন লোক তাঁর নিকট আসেন এবং তাঁকে মুসলিম ইবনে আক্বীল এর নিহত হওয়া ও কুফার লোকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাপারে সংবাদ দেন।৮২ তিনিও তাঁর সঙ্গী সাথিদেরকে উক্ত সংবাদটি জানিয়ে দেন এবং বলেন :“ এরা কুফার অধিবাসীরা আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে এবং আমাদেরকে সাহায্য করবে না। তোমাদের কেউ যেতে চাইলে চলে যাও ।” সেইখানে লোকেরা তাঁর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।৮৩ ইবনে যিয়াদ হুর ইবনে রিয়াহীকে একহাজার অশ্বারোহীর এক সুসজ্জিত বাহিনী সহ প্রেরণ করে এবং আদেশ দেয় যে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) যেখানেই দেখবে সেখানেই আটকে রাখবে এবং তাঁকে কুফায় আসার সুযোগ দিবে না। অতি প্রত্যূষে , হুরের সৈন্যবাহিনী পৌঁছার পূর্বেই তিনি (ইমাম হোসেন) পানির সমস্ত পাত্র পূর্ণ করার আদেশ দেন। উক্ত দিনেই , হুরের সৈন্যবাহিনী পৌঁছলে , তিনি তাদেরকে এবং তাদের ঘোড়াগুলিকে পিপাসায় অতিষ্ঠ অবস্থায় দেখেন , তখন তিনি তাদেরকে পানি পান করানোর জন্য সাথিদেরকে আদেশ দেন। অতঃপর তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং আল্লাহর স্তুতি ও গুণ গান এবং রাসূল (সা.) ও তাঁর বংশধরের প্রতি দুরূদ কামনার পর তিনি বলেন :“ আয়্যুহান্নাসু ইন্না রাসূলাল্লাহি (সা.) ক্বালা : মান্ রাআ সুলত্বানান্ জায়িরান্ মুস্তাহিলান্ লিহুরুমিল্লাহি নাকিছান্ লি ’ আহ্দিল্লাহি মুখালিফান্ লিসুন্নাতি রাসূলিল্লাহি ইয়া’ মালু ফী ’ ইবাদিল্লাহি বিল্ ইছ্মি ওয়াল্ ’ উদ্ওয়ানি ফালাম্ ইউগায়্যির ’ আলাইহি বিফি ’ লিন্ ওয়া লা ক্বাউলিন্ কানা হাক্কান’ আলাল্লাহি আন্ ইউদ্খিলাহু মুদ্খালাহ্” “ হে লোকসকল ! আল্লাহর রাসূল (সা). বলেন : কোনো ব্যক্তি যদি উদ্ধত কোনো শাসককে এই অবস্থায় দেখে যে , আল্লাহর কৃত হারামকে হালাল করে , আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করে , আল্লাহর রাসূলের সুন্নতের সাথে বিরোধিতা করে এবং আল্লাহর বান্দাগণের মাঝে পাপ ও অন্যায়ের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করে ; আর তার সাথে কথা ও আচরণ কোনো কিছুর দ্বারাই কোনরূপ বিরোধিতা না করে , আল্লাহর অধিকার হল ,তাকে (কিয়ামতের দিন) সেই অত্যাচারী শাসকের সাথে তার প্রবেশের স্থানে প্রবেশ করাবেন ।”
জেনে রেখ যে , এই অত্যাচারীরা শয়তানের আনুগত্য করেছে এবং রহমানের (আল্লাহর) আনুগত্যকে পরিত্যাগ করেছে। ফাসাদের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং শরয়ী বিধানের প্রয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে (চোর ও মদ্যপায়ীদের উপর আল্লাহর বিধান কার্যকর করে না) । মুসলমানদের প্রাপ্য সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ,যেগুলি মুসলমানদের প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল , সেগুলিকে নিজেদের করে নিয়েছে। আল্লাহর কৃত হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করেছে। এই অবস্থায় , আমি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি যার রুখে দাঁড়ানো উচিত এমন কেউ যে , অবশ্যই আমি রুখে দাঁড়াব ।”
অর্থাৎ দ্বিতীয় আর কেউ নেই , না হযরত আমীরুল মু’ মিনীন (আ.) , না ফাতিমা যাহরা (আ.) আর না ইমাম হাসান (আ.) । আহলে বাইতের (আ.) বিদ্যমান একক ব্যক্তিত্ব তিনি হুসাইন ইবনে আলী (আ.) । যদি তিনি রুখে না দাঁড়ান তবে তৎকালীন প্রশাসনের সমস্ত কাজকে তিনি অনুমোদন করলেন। এই দৃষ্টিকোণ হতে তিনি বলেন :“ আমি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি যার রুখে দাঁড়ানো উচিত ।” অতঃপর তিনি বলেন :“ তোমাদের পত্রগুলি আমার নিকট পৌঁছেছে। তোমরা আমার নিকট এমন লোকদেরকে পাঠিয়েছিলে যারা বলেছে :“ আমাদের নিকট আসুন ! তোমাদের বাইআত করার সংবাদ দিয়েছে। তোমরা লিখেছো যে , আমাকে তোমরা সাহায্য করবে ।” এখন যদি তোমরা তোমাদের বাইআতকে পরিপূর্ণ কর তবে তোমরা সুপথ পেয়েছো । আমি হুসাইন , আলী ও আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার সন্তান ।”
সুতরাং তিনি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্যে আহ্বান জানান এবং যেই ব্যক্তি এরূপ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না ও নীরব থাকবে , মহান আল্লাহ্ তাকে সেই অত্যাচারী শাসকের সাথে কিয়ামত দিবসে কবর হতে উঠাবেন। আর যেমন আমরা দেখছি , এই বক্তব্য এবং তার পূর্ব ও পরের বক্তব্যগুলির মাঝে , কখনই বিজয় সম্পর্কে কোনো কথা আসে নি।
বক্তব্যের শেষেও তিনি হুর ও তার সৈন্যবাহিনীকে বলেন :“ তোমরা যদি আমাকে সাহায্য করতে না চাও তবে আমাকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দাও !” হুর তা গ্রহণ করল না , তবে এই মর্মে সিদ্ধান্ত হল যে , এমন এক দিক দিয়ে যাবেন যে , কুফাতেও পৌঁছবেন না এবং মদীনাতেও যাবেন না। এইভাবে পথ পাড়ি দিয়ে তিনি কারবালা ভূমিতে উপস্থিত হন। সেখানেই ইবনে যিয়াদের পক্ষ হতে একখানা পত্র হুরের নিকট পৌঁছে । তাতে এই নির্দেশ ছিল যে ,“ যেখানে আছ হুসাইনকে সেখানেই আটকে রাখ !” আর এই রূপই করা হয়।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন :“ এই ভূমির নাম কি ?” লোকেরা উত্তর দিল :“ কারবালা ।” তিনি বললেন :“ আমাদের বোঝাগুলি নামাও , এইটি সেই স্থান , যার সম্পর্কে আমার নানাজান আমাকে সংবাদ দিয়েছেন !”
উমর ইবনে সা’ দ সৈন্যবাহিনীসহ সেখানে আসার পর , পুনরায় হযরত হুসাইন (আ.) তার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং বলেন :“ তোমরা আমার নিকট পত্র লিখেছো এবং তোমাদের নিকট আসার জন্যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছো। যদি এখন আমাকে না চাও তবে আমাকে ছেড়ে দাও , আমি যেইখান থেকে এসেছি সেইখানে ফিরে যাব অথবা ইসলামী ভূখণ্ডের কোন এক সীমান্তে গিয়ে কাফিরদের সাথে লড়াই করব ।” তারা বলে :“ আপনাকে অবশ্যই আমীরুল মু’ মিনীন ইয়াযীদের নিকট বাইআত করতে হবে এবং ইবনে যিয়াদের আদেশের আনুগত্য করতে হবে !” তিনি তাদের প্রতি উত্তরে বলেন :“ লা ওয়াল্লাহি ! লা উ ’ ত্বীহিম্ বিইয়াদী ই ’ ত্বাআয্ যালীলি ওয়া লা আফিররু মিনহুম ফিরারাল ’ আবীদি ।” “ না , আল্লাহর কসম ! হীন লোকদের হস্ত অর্পণ করার মত আমি তাদের হাতে আমার হাত অর্পণ করব না এবং বলদর্পীদের বিরুদ্ধে (যুদ্ধ করতে গিয়ে) যুদ্ধক্ষেত্র হতে ক্রীতদাসদের মত আমি পলায়ন করব না ।”
আশুরার রাতেও , তিনি তাঁর সঙ্গী সাথিদেরকে বলেন :“ তোমাদের মাঝ হতে যারা যেতে চাও , চলে যাও !” যাতে এমনটি না হয় যে , তাদের মাঝে কেউ লজ্জার কারণে অথবা অজ্ঞাত অবস্থায় থাকে। আশুরার রাতেও তিনি তাঁর তাঁবুর চারপাশে পরিখা খনন করেন এবং তার মাঝে আগুন জ্বালান , যাতে শত্রুবাহিনী হঠাৎ করে তাঁদের উপর হামলা করতে না পারে এবং ইমাম (আ.) কে কথা বলা ও তাদের অজুহাত পেশের সকল পথ বন্ধ করা থেকে বিরত রাখতে না পারে ।
সেই আশুরার রাতে , উমর ইবনে সা’ দের কয়েকজন সৈন্য তাদের দল থেকে পৃথক হয়ে যান এবং হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শিবিরে যোগ দেন।৮৪
আশুরা দিবস
বর্ণনাকারী বলেন :“ উমর ইবনে সা’ দ মুহাররমের দশ তারিখ , জুমু’ আর দিনের ফজরের নামায আদায় করে ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে তার সৈন্যদেরকে প্রস্তুত করে। ইমামও বত্রিশজন অশ্বারোহী এবং চল্লিশজন পদাতিক সৈন্যের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করেন , তাঁদের স্থান নির্ধারণ করেন এবং তাঁদের সাথে ফজরের নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি যুহাইর ইবনে কাইনকে ডান পার্শ্বের সেনাদলের সেনাপতির দায়িত্ব দেন এবং হাবীব ইবনে মাযাহিরকে বাম পার্শ্বের সৈন্যদলের পরিচালনার দায়িত্ব দেন আর পতাকাটি দেন তাঁর ভাই আব্বাসের হাতে। ইমামের পরিবারের তাঁবুগুলিকে সিপাহীদের পিছনে রাখেন এবং সেই রাত্রে খনন করা পরিখায় যুদ্ধের সময় আগুন জ্বালানোর জন্যে সৈন্য মোতায়েন করেন যাতে তাঁবুগুলি পিছন হতে শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকে।
উমর ইবনে সা’ দ তার ডান পার্শ্বের সৈন্যদলের সেনাপতির দায়িত্ব তার সিপাহী আমর ইবনে হাজ্জাজ যুবাইদীকে , বাম পার্শ্বের সেনাপতির দায়িত্ব‘ শিমর ইবনে যিল জাওশানকে , অশ্বারোহী সৈন্যের সেনাপতির দায়িত্ব উযরা (আযরা) ইবনে ক্বায়েস আহমাসীকে এবং পদাতিক সৈন্যের সেনাপতির দায়িত্ব শাবাছ ইবনে রাবয়ী ইয়ারবুয়ীকে অর্পণ করে এবং পতাকাটিও তার দাস‘ যূ ইয়াদ ’ এর হাতে দেয় ।”
শাহাদতের সৌভাগ্য অর্জনে ইমাম হুসাইনের (আ.) সহযোগিদের আনন্দ
আব্দুর রহমান ইবনে আব্দে রাব্বাহ্ আনসারী ’ র একজন গোলামের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেন :
“ আমি আমার মালিক আব্দুর রহমান এর সঙ্গে ছিলাম। যখন ইবনে যিয়াদের সৈন্যবাহিনী ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হল , তখন তিনি (ইমাম)পৃথক একটি তাঁবু খাটানোর আদেশ দিলেন। অতঃপর তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্যে একটি লগন বা বড় আকারের পানি ভর্তি পাত্র তাঁবুর মাঝে রাখতে বললেন এবং তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সুগন্ধি মিশ্রিত করা হল। প্রথম তিনি নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্যে তাঁবুর মাঝে গমন করেন। আমার মালিক এবং বুরাইর একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন এজন্য যে , কখন ইমাম বেরিয়ে আসবেন আর তাঁরা তাঁবুতে প্রবেশ করবেন।
এই ফাঁকে বুরাইর , আব্দুর রাহমানের সাথে হাসি ঠাট্টা ও রসিকতা শুরু করেন। আব্দুর রহমান সম্ভবতঃ বুরাইরের হাসি ঠাট্টায় ধৈর্যচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন , তাই তিনি তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন :‘ বিরত হও ! এখন কি হাসি ঠাট্টার সময় ! বুরাইর উত্তর দিলেন :‘ আল্লাহ্ জানেন এবং আমার সমস্ত আত্মীয় স্বজনও সাক্ষী যে , আমি আমার যৌবন কালে এবং বৃদ্ধ বয়সেও হাসি ঠাট্টা ও রসিকতা করতাম না। কিন্তু আল্লাহর কসম আমরা এখন যে অবস্থায় আছি এবং ভবিষ্যতের যে সুসংবাদ পেয়েছি তাই আমাকে এরূপ করেছে। কারণ এখন আমাদের এবং আমাদের জন্যে অপেক্ষমান বেহেশ্তি হুরদের মাঝে শুধু এতটুকুই দূরত্ব যে , এই সব লোক ধারাল তরবারি দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করবে ; আর এটিই আমার আনন্দের কারণ। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান যেন তারা তাদের এই কাজটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়িত করে। ’
অতঃপর আব্দুর রাহমানের গোলাম বলেন : ইমাম যখন তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন তখন আমরা ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করি ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হই। কালবিলম্ব না করেই ইমাম ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন এবং একখানা কুরআন সম্মুখে রাখেন। তাঁর বন্ধুগণ , তাঁর পাশে পাশে তাঁর জন্যে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন , আর সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। আমি যখন দেখলাম যে , সেই সব যোদ্ধা ও সাহসী পুরুষরা শহীদ হয়ে স্বীয় রক্তে গড়াগড়ি খাচ্ছেন তখন আমি ভয়ে পলায়ন করি !”
রাসূলের (সা.) পরিবারের সর্বপ্রথম শহীদ
খাওয়ারেযমী তার মাকতাল গ্রন্থে লিখেছেন :“ যখন হুসাইনের (আ.) জন্যে তাঁর পরিবার ব্যতীত কোনো সঙ্গী সাথি এবং কোনো সাহায্যকারী অবশিষ্ট ছিলেন না , তখন তাঁরা সবাই একত্রিত হলেন এবং পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে রওনা হলেন ।” ৮৫
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন :“ সেই মর্মান্তিক ঘটনায় আবু তালিবের বংশধরের মধ্যে সর্ব প্রথম শহীদ হয়েছিলেন ইমাম হুসাইনের (আ.) পুত্র আলী আকবর। তাঁর মাতার নাম লাইলা (আবু মুররা ইবনে উরওয়া ইবনে মাসঊদ ছাক্বাফীর কন্যা)৮৬ এবং তাঁর নানীর নাম ছিল মাইমূনা (আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কন্যা) ।৮৭ বনী উমাইয়্যা বংশের সাথে এই আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে তারা আলী আকবরের উদ্দেশ্যে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই মর্মে পত্র লিখে প্রেরণ করে যে , তিনি যেন তাঁর পিতাকে সাহায্য করা হতে বিরত থেকে শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয় নেন এবং নিহত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করেন !”
হুসাইনের (আ.) পুত্রের উদ্দেশ্যে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের প্রেরিত নিরাপত্তামূলক পত্রের বিষয়ে মুস্আব যুবাইরী ’ লিখেন যে , তারা আলী আকবরকে বলেছিল:
‘ আমীরুল মু’ মিনীন ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তোমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা রয়েছে এবং আমরা এই সম্পর্ককে রক্ষা করতে চাই। সুতরাং তুমি যদি আগ্রহী হও তবে আমাদের নিরাপত্তায় থাকবে ।”
আলী তাদের উত্তরে বলেন :“ আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখাই অধিকতর ভাল ।” ৮৮
খাওয়ারেযমী তার মাকতালে বলেন : হুসাইন (আ.) স্বীয় পুত্র আলীকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রেরণকালে নিজের দাড়ি মোবারককে হাত দ্বারা ধরেন এবং আকাশের দিকে মুখ করে বলেন :
“ হে আল্লাহ! তুমি এই লোকদের প্রতি সাক্ষী থাক ! চেহারা , আচার ব্যবহার ও কথা বার্তার দিক থেকে তোমার রাসূল মুহাম্মদের (সা.) সবচেয়ে সদৃশ এক যুবককে এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করছি। এ সেই যুবক যার বৈশিষ্ট্য হল , যখনই আমাদের কারো তোমার রাসূলকে দেখার আকাঙ্খা জাগত তখনই তাঁর চেহারার দিকে তাকাতাম !
হে আল্লাহ ! জমিনের বরকতকে তুমি তাদের উপর থেকে তুলে নাও ! তাদের সমাজকে ছত্রভঙ্গ করে দাও এবং তাদেরকে কঠিন দুরাবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ কর ! তাদের চিন্তা ভাবনার মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে দাও এবং তাদেরকে তাদের শাসকদের নিকট রাগ ও ঘৃণার পাত্র বানাও যাতে তারা কখনই তাদের প্রতি সন্তুষ্ট না হয় ! আফসোস ! তারা আমাদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসবে বলে আমাদেরকে তাদের নিকট আহ্বান করেছে কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আমাদের জীবনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং আমাদেরকে হত্যা করতে প্রস্তুত হয়েছে !”
অতঃপর ইমাম হুসাইন (আ.) উমর ইবনে সা’ দকে সম্বোধন করে চিৎকার দিয়ে বলেন :
“ আমাদের জীবন নিয়ে কি করতে চাও ? মহান আল্লাহ্ তোমার বংশকে যেন সমূলে উৎপাটন করেন ! তোমার আশা আকঙ্খাকে যেন পূর্ণ না করেন ! তিনি তাঁর বরকতকে যেন তোমার উপর হতে ছিনিয়ে নেন ! তিনি এমন কাউকে তোমার উপর বিজয়ী করেন যে , সেই ব্যক্তি তোমার বিছানায় তোমার দেহ হতে মাথাকে বিচ্ছিন্ন করে ! কারণ তুমি আমার বন্ধনকে ছিন্ন করেছো এবং আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে আমার নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ককে ভ্রুক্ষেপ কর নি ।”
অতঃপর তিনি উচ্চৈঃস্বরে সূরা আল ইমরানের এই আয়াতটি পাঠ করেন :“ ইন্নাল্লাহাস্তাফা আদামা ওয়া নূহাও ওয়া আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা ইমরানা ’ আলাল্ ’ আলামীন। যুররিয়্যাতান বা ’ যুহা মিন্ বা ’ য , ওয়াল্লাহু সামী ’ উন্ ’ আলীম ।” ৮৯ অপরদিক থেকে উমর ইবনে সা’ দের সৈন্যবাহিনীর উপর আলী আকবর আক্রমণ করেন এবং তিনি বলছিলেন :
“ আনা আলিয়্যুব্নুল হুসাইনুবনু আলী নাহনু ওয়া বাইতুল্লাহি আউলা বিন্নাবী
ওয়াল্লাহি লা ইয়াহ্কুমু ফীনা ইবনুদ্দায়ী আত্ব ’ আনুকুম বিররাহমি হাত্তা ইউনছানী
আযরিবুকুম বিসসাইফি হাত্তা ইয়াল্তাবী যারবু গুলামি হাশিমিয়্যি ’ আলাবী ।”
অর্থাৎ আমি , আলীর পুত্র হুসাইনের সন্তান। কা’ বার খোদার শপথ , আমরা রাসূল (সা.) এর নিকটতম আত্মীয়। আল্লাহর শপথ , আমাদের উপর ব্যভিচারীর সন্তানের শাসন করার কোনই অধিকার নেই। আর এই কারণেই নিজেদের বর্শা দ্বারা তোমাদের উপর এমন আঘাত হানব যে , সেইগুলি বাঁকা হয়ে যাবে। এমনভাবে তরবারি দ্বারা তোমাদেরকে আঘাত করব যাতে তোমরা আলাভী (আলী বংশীয়) হাশিমী ষাটজন যুবকের আঘাতের সমান আঘাত উপলব্ধি কর ।”
তিনি বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ করতে করতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কুফাবাসীদের ফরিয়াদ ও চরম অসহায়ত্বের আর্তনাদ বাতাসে ভেসে উঠল এবং তারা কোনো আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছিল না।
অবশেষে হুসাইনের (আ.) এই নির্ভীক ও সাহসী যুবক , যিনি যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বিপক্ষে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন ও নিজের জীবন প্রদীপকে নিভে যেতে দেখ ছিলেন শত্রুর তীর ও তরবারির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত শরীরে এবং পিপাসায় ক্লান্ত ও অসহায় অবস্থায় তাঁবুতে পিতার নিকট ফিরে আসলেন। তারপর বললেন :“ হে পিতা ! পিপাসা আমাকে কাবু করে ফেলেছে এবং এই সমস্ত রণসম্ভারের ভার আমার শক্তি সামর্থ্যকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এ অবস্থায় , পানি কি পাওয়া যাবে যার মাধ্যমে পিপাসার জ্বালা নিবারণ করব এবং শত্রুদের বিপক্ষে লড়াই করার জন্যে নতুন শক্তি ফিরে পাব ?”
ইমাম হুসাইন (আ.) সন্তানের এই কথায় কেঁদে বললেন : হে বৎস ! তুমি যা চাচ্ছ তা মুহাম্মদ (সা.) , আলী (আ.) ও তোমার পিতার জন্য অনেক কঠিন এবং অপ্রীতিকর কিন্তু তারপরও তোমার চাওয়া পূরণ করতে আমরা অপারগ ; তুমি তোমার বিপদে সাহায্য করার জন্যে আমাদেরকে আহ্বান করছ কিন্তু আমরা যে , তোমার আহ্বানে সাড়া দিতে পারছি না !” অতঃপর তিনি নিজের একটি আংটি তাঁর (আলী আকবর) হাতে দিয়ে বললেন :
“ এই আংটিটি নিয়ে মুখে রাখ এবং শত্রুদের বিপক্ষে লড়াই করতে যুদ্ধের ময়দানে ফিরে যাও। আশা করি অনতিবিলম্বে তোমার নানার হাতের শরবত পান করে পরিতৃপ্তি লাভ করবে এবং এর পর থেকে আর পিপাসা অনুভব করবে না ।”
আলী আকবর পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করলেন এবং বলছিলেন :
আল্ হারবু ক্বাদ বানাত্ লাহা হাক্বাইক্ব ওয়া যাহারাত মিম্ বা ’ দিহা মাসাদিক্ব
ওয়াল্লাহি রাব্বিল ’ আরশি লা নুফারিক্ব জুমূউকুম আও তাগমিদুল বাওয়ারিক্ব।
“ যুদ্ধ সত্যকে পরিষ্কার করে দিয়েছে এবং তারপর থেকে সত্যবাদিতা প্রকাশ পেয়েছে। আরশের অধিপতি আল্লাহর শপথ ! তরবারিগুলি খাপে প্রবেশ না করা পর্যন্ত তোমাদের উপর থেকে হাত গুটিয়ে নিব না এবং তোমাদের থেকে পৃথক হব না ।” ৯০
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন :“ অতঃপর তিনি শত্রুসৈন্যের উপর আক্রমণ করলেন এবং তাদের রক্ষণব্যুহকে দ্বিধা বিভক্ত করে দিলেন। প্রথম আক্রমণেই তিনি কুফাবাসীদের সারিগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেন এবং তাদের প্রতিরক্ষা শক্তিতে ফাটল সৃষ্টি করে তাদের উপর মৃত্যুধূলা ছিটাচ্ছিলেন তখন নু ’ মান আব্দী লাইছীর পৌত্র মুররা ইবনে মুনকিয তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল :“ সমস্ত আরবের পাপগুলি আমার কাঁধে বর্তাক। যদি সে আমার সামনে পড়ে তবে সে যেমনভাবে অন্যদেরকে রক্তাক্ত করে ধুলায় লুটাচ্ছে তেমনভাবে আমিও তাঁর পিতাকে তাঁর শোকগাঁথা গাইতে বসাব ।” আলী পূর্বানুরূপ কুফার সৈন্যদের ছিন্নভিন্ন করে , সামনে অগ্রসর হয়ে মুররাকে অতিক্রম করলেন। সেও এটাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে তাঁর উপর হামলা করল এবং বর্শার ফলক দ্বারা তাঁকে আঘাত হানল। এর ফলে আলী নিস্তেজ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর মোকাবেলা করার ক্ষমতা তাঁর হারিয়ে গেল। কুফাবাসীরা তাঁর চারিদিকে ঘিরে ধরল এবং তাদের তরবারি দ্বারা তাঁর ক্ষতবিক্ষত শরীরে পুনঃ পুনঃ আঘাত করতে লাগল ।”
খাওয়ারেযমী তার মাকতাল গ্রন্থে লিখেছেন :“ যখন আলী আকবর যুদ্ধ করতে করতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন মুররা ইবনে মুনক্বিয আব্দী তাঁর উপর হামলা করে এবং তরবারি দ্বারা এমনভাবে তাঁর ললাটের উপরিভাগে আঘাত করে যে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন এবং তাঁর যুদ্ধ করার শক্তি হারিয়ে যায়। কুফাবাসীরাও তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে এবং চারপাশ থেকে তাঁর নিথর শরীরে তরবারির আঘাত করতে থাকে । শেষ পর্যন্ত তাঁর আর কোনো উপায় রইল না। ফলে তিনি তাঁর ঘোড়ার ঘাড়ের উপর তাঁর হাত দু’ খানিকে ঝুলিয়ে দিলেন। কিন্তু ঘোড়াটি তাঁকে শত্রুদের মধ্যে নিয়ে চলে গেলে আলীর শরীর তীক্ষ্ণ তরবারিগুলির আঘাতের ফলে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অতঃপর তাঁর প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত অবস্থা তখন তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি দ্বারা চিৎকার দিয়ে বললেন :
“ হে পিতা! আমার নানা আল্লাহর রাসূল আমাকে একটি পরিপূর্ণ পিয়ালাতে করে সুপেয় শরবত পান করালেন , আমি আর কখনও পিপাসার্ত হব না। তিনি আপনাকে বলছেন ,‘ তাড়াতাড়ি তুমি এস , তোমার জন্যেও একটি পেয়ালা পূর্ণ করে রাখা আছে ।” ৯১
হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন :“ আমি নিজ কানে শুনেছি , সেইদিন হুসাইন (আ.) বলছিলেন ,‘ হে বৎস ! তোমাকে যারা হত্যা করল আল্লাহ্ তাদের হত্যা করুন ! বিষ্ময়কর এই যে , এই লোকেরা মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করতে এতদূর পর্যন্ত দুঃসাহস করেছে ! ? হে বৎস ! তোমার মৃত্যুর পর পৃথিবী ও পৃথিবীর জীবন অর্থহীন ।”
হামিদ বলেন :“ মনে হচ্ছে এখনও দেখছি যে ,উজ্জ্বল সূর্যের ন্যায় এক সম্ভ্রান্ত নারী অতি দ্রুত গতিতে তাঁবু থেকে বাইরে দৌড়ে আসলেন এবং আলীর শোকে তিনি ফরিয়াদ করছিলেন ! জিজ্ঞাসা করলাম : এই নারী কে ? তারা বলল : যয়নব , আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার কন্যা !”
যয়নব পূর্বানুরূপ অন্যান্য নারী ও বিলাপকারীদের সম্মুখে আসলেন এবং নিহত আলীর উপর লুটিয়ে পড়লেন। ইমাম হুসাইন এগিয়ে এলেন এবং যয়নবের নিকটে পৌঁছিলেন। তিনি তাঁর হাত ধরে তাঁকে নিহত আলীর উপর থেকে তুলে দাঁড় করালেন এবং তাঁবুতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। পুনরায় তিনি আলীর মৃতদেহের নিকট ফিরে এলেন। যুবকেরা তাঁর চারিদিকে ঘিরে ছিলেন। ইমাম তাদেরকে বললেন :“ তোমাদের নিহত ভাইকে তুলে নিয়ে যাও !” যুবকেরা এগিয়ে এসে আলীর মৃতদেহটিকে হাতে তুলে নিলেন। তিনি যে তাঁবুর সম্মুখে শত্রুদের বিপক্ষে লড়ছিলেন , সেই তাঁবুর নিকট মাটিতে তাঁকে রাখলেন ।”
আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিম ইবনে আকীলের শাহাদত
যখন আলী আকবর শাহাদত বরণ করলেন তখন মুসলিমের পুত্র এবং আকীল ইবনে আবী তালিবের পৌত্র আব্দুল্লাহ্৯২ যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করলেন। আমীরুল মু’ মিনীন আলী (আ.) এর কন্যা হযরত রুকাইয়া কোবরা তাঁর মাতা ছিলেন।৯৩ তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সময় নিুোক্ত পংক্তি দু’ টি আবৃত্তি করছিলেন :
আল্ ইয়াউমা উলাক্বী মুসলিমান্ ওয়া হুয়া আবী ওয়া ফিৎইয়াতান্ বাদূ ’ আলা দ্বীনিন্নাবী’ ।
অর্থাৎ আজ আমার পিতা মুসলিম এবং যেসব যুবক রাসূলের দ্বীনের উপর নিহত হয়েছেন তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করব।৯৪
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :“ আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে আমর ইবনে সাবীহ একটি তীর নিক্ষেপ করল। আব্দুল্লাহ্ নিজের মাথাকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্যে নিজের হাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন। ফলে আমরের তীরটি তাঁর হাত ও মাথাকে একইসাথে বিদ্ধ করল। এইরূপে যে , তীরটি তাঁর হাতের তালু অতিত্রুম করে গিয়ে তাঁর মাথায় বিদ্ধ হল। আব্দুল্লাহ্ বহু চেষ্টা করেও তাঁর হাতকে মুক্ত করতে পারলেন না এবং এই অবস্থায় আকষ্মিকভাবে অপর একটি তীর এসে তাঁর যকৃত ভেদ করল এবং তিনি শাহাদত বরণ করলেন ।”
যখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিম শাহাদত বরণ করলেন তখন ইয়াযীদের সৈন্যরা ইমামের সঙ্গীদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরল এবং তাঁদের উপর আত্রুমণ করল।
জা’ ফর ইবনে আকীলের শাহাদত
খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব লিখেছেন :“ অতঃপর জা’ ফর ইবনে আকীল আক্রমণের জন্যে সামনে অগ্রসর হলেন এবং এই অবস্থায় তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন :
আনাল্ গুলামুল্ আব্তাহিউত্তালিবী’ মিন্ মা’ শারিন্ ফী হাশিমিন্ মিন্ গালিবি
ওয়া নাহনু হাক্কান সাদাতুয্ যাওয়ায়িবি হাযা হুসাইনুন্ আত্বইয়াবুল্ আত্বায়িবি।৯৫
অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।
খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব , জা’ ফরের হত্যাকারীকে‘ বিশর ইবনে সাউত আল্ হামাদানী ’ বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যে , তাবারী লিখেছেন :‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উযরা খাছ্আমী যে তীরটি জা’ ফর ইবনে আকীলের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করেছিল সেই তীরের আঘাতে তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। ’
আব্দুর রাহমান ইবনে আকীলের শাহাদত
জা’ ফর ইবনে আকীল নিহত হওয়ার পর , তাঁর ভাই আব্দুর রাহমান ইবনে আকীল এই বীরত্বগাঁথাগুলো আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে অগ্রসর হলেনঃ
আবী আক্বীলুন ফা’ রিফূ মাকানী মিন্ হাশিমিন্ ওয়া হাশিমুন্ ইখ্ওয়ানী
কাহূলু সিদ্ক্বিন সাদাতুল্ আক্বরানি হাযা হুসাইনুন্ শামিখুল্ বুনয়ানি
ওয়া সায়্যিদুশ্ শাবাবি ফিল্ জানানি ।”
অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে উছমান ইবনে খালিদ জাহানীর হাতে শাহাদত বরণ করেন।
তাবারী লিখেছেন: উছমান ইবনে খালিদ জাহানী ও বিশর ইবনে সাউত হামাদানী একই সাথে আব্দুর রাহমান ইবনে আকীলের উপর আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করে।
মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা’ ফরের শাহাদত
খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব লিখছেন : আব্দুর রাহমান ইবনে আকীল নিহত হওয়ার পর আবু তালিবের নাতি‘ মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা’ ফর ’ নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেনঃ
আশকূ ইলাল্লাহি মিনাল’ উদ্ওয়ানি ফা’ অ্যালু ক্বাউমিন্ ফিররাদিয়্যি’ আময়ানি
ক্বাদ বাদ্দালূ মা’ আলিমাল কুরআনি ওয়া মাহ্কামাত্ তান্যিলি ওয়াত্তিব্য়ানি
ওয়া আয্হারুল্ কুফরা মা’ আত্ তুগইয়ানি।
অতঃপর তিনি কুফার অধিবাসীদের বিপক্ষে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে করতে‘ আমিল ইবনে নাহ্হাশ তামীমীর ’ হাতে শাহাদত বরণ করেন।
আওন ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা’ ফরের শাহাদত
যখন মুহাম্মদ শাহাদত বরণ করলেন তখন তাঁর ভাই আওন ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা’ ফর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ইবনে যিয়াদের সৈন্যদের উপর আক্রমণ করেন :
ইন্ তানকিরূনী ফা আনা ইবনু জা’ ফার শাহীদু সিদ্ক্বিন ফিল্ জিনানি আয্হার
ইয়াত্বীরু ফীহা বিজানাহিন্ আখ্যার কাফা বিহাযা শারাফান্ ফী মাহ্শার।
অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে আব্দুল্লাহ্ ইবনে কুতাইবা তায়ী ’ র হাতে শাহাদত বরণ করেন।৯৬
আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসানের শাহাদত
অতঃপর‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান’ নিম্নোক্ত বীরত্বগাঁথাটি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে পদার্পণ করেন :
ইন্ তানকিরূনী ফা আনা ফার’ উল্ হাসান সিবতুন্নাবিয়্যিল মুস্তাফাল্ মু’ তামিন
হাযা হুসাইনুন্ কাল্আসীরিল্ মুরতাহান বাইনা উনাসিন্ লা সাকূ সাওবাল্ মুয্ন।
অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে হানী ইবনে শাবীব খাযরামী ’ র হাতে আঘাত প্রাপ্ত হন এবং শাহাদত বরণ করেন।৯৭
কাসিম ইবনে হাসানের শাহাদত
তাঁর মৃত্যুর পর , তাঁর নাবালক ভাই‘ কাসিম ’ ময়দানে যাবার জন্যে প্রস্তুত হলেন।
যখন তাঁর উপর ইমামের দৃষ্টি পড়ল তখন তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চাচা ও ভাতিজা উভয়েই প্রচণ্ড কান্নাকাটি করলেন। কাসিম যখন যুদ্ধে যাবার জন্যে আবেদন করলেন তখন ইমাম তাঁকে অনুমতি দিলেন না। কিন্তু কাসিমও নাছোড় বান্দা হয়ে তাঁর চাচা হুসাইনের (আ.) হাত পা ধরে অনুনয় বিনয় করে যুদ্ধে যাবার জন্যে অনুমতি কামনা করতে থাকলে , ইমাম নিরুপায় হয়েই তাঁকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিলেন।
কাসিমের গণ্ডদেশ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকা অবস্থায় তিনি যুদ্ধের ময়দানের দিকে রওনা হল ।৯৮ কুফার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধের সময় তাঁর শরীরে কেবলমাত্র এক জোড়া জামা পায়জামা ও পায়ে এক জোড়া চটি জুতা ছিল। তাঁর মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য যেন পূর্ণিমার চাঁদের অংশ বিশেষ ছিল। তিনি সামনে অগ্রসর হতে হতে বলছিলেন :
ইন্নী আনাল্ ক্বাসিমু মিন্ নাসলি’ আলী’ নাহলু ওয়া বাইতুল্লাহি আউলা বিন্নাবী’
মিন্ শিমরা যিল্ জাওশান্ আউ ইবনিদ্দা’ য়ী’ ।৯৯
হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন :“ ইমামের সৈন্যদল থেকে পূর্ণিমার চাঁদরূপ এক যুবক আমাদের বিপক্ষে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলেন , তখন তাঁর শরীরে শুধুমাত্র এক জোড়া জামা পায়জামা , পায়ে এক জোড়া চটি জুতা এবং হাতে একখানা তরবারি ছিল। আমি কখনও ভুলব না যে , তাঁর বাম পায়ের জুতার ফিতা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তিনি উদ্দীপনার সাথে যুদ্ধের ময়দানে পদার্পণ করে সামনে এগিয়ে আসছিলেন , আর আমর ইবনে সা’ দ নুফাইল আযদী আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল , বলল :
“ আল্লাহর শপথ ! আমি তাঁর উপর আক্রমণ করব এবং তাঁর মৃত্যুঘন্টা বাজাব !” আমি তাকে বললাম :“ সুবহানাল্লাহ্ ! তুমি তাঁর প্রাণ থেকে কি চাও ? যে সব লোকজন তাঁর চারিদিকে রয়েছে তারাই তাঁকে হত্যার জন্যে যথেষ্ট হবে !” আমর বলল :“ আল্লাহর শপথ ! আমি নিজেই তাঁর মৃত্যু ঘন্টা বাজাব !” এই কথা বলে সে , তাঁর দিকে ধাবিত হল এবং সে নিজ তরবারির আঘাতে সেই যুবকের মাথাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল এবং তিনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন ।
আমরের আঘাতে সেই যুবকটি মুষড়ে পড়লেন এবং উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে সাহায্যের জন্যে তাঁর চাচাকে আহ্বান করলেন। আমি নিজে দেখলাম যে , হুসাইন (আ.) দক্ষ শিকারী বাজ পাখির মত ছুটে আসলেন এবং রাগান্বিত সিংহের মত আমরের উপর আক্রমণ করলেন ও তার উপর তরবারির আঘাত হানলেন। ইমামের তরবারিখানা আমরের ঢালস্বরূপ ব্যবহারকৃত হাতের কব্জি পর্যন্ত নামিয়ে দিল। আমর এই আঘাতের ফলে এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠল যে , উমর ইবনে সা’ দের সমস্ত সৈন্যবাহিনী তা শুনতে পেল।১০০
কুফার সৈন্যবাহিনী আমরের সাহায্যের জন্যে ইমামের অভিমুখে অগ্রসর হল এবং ইমামও নিরুপায় হয়ে তার থেকে সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু আমর তার সহযোদ্ধা সৈন্যদের অশ্বসমূহের পায়ের নিচে পতিত হল ,যদিও তারা তার সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এসেছিল কিন্তু অতিদ্রুত ও তীব্রগতিতে সামনে অগ্রসর হওয়ার কারণে তাদের ঘোড়াগুলো আমরকে পায়ের নিচে দলিত মথিত করে এবং তার বুকের ও মাথার হাড়গুলোকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলে ও তার প্রাণহীন দেহ মাটিতে পড়ে থাকে ।
কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ময়দানের ধুম্রতা কেটে গেলে আমি হুসাইনকে (আ.) দেখলাম : তিনি , প্রাণ ওষ্ঠাগত ও মাটির সাথে পিষ্ট তরুণটির মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বলছেন :“ তোমাকে যারা হত্যা করেছে এবং কিয়ামত দিবসে নিজেদেরকে তোমার নানার কৈফিয়ত তলবের পাত্রে পরিণত করেছে , তারা সব ধ্বংস হোক !” অতঃপর তিনি বললেন :“ আল্লাহর শপথ ! তোমার চাচার জন্যে অত্যন্ত কঠিন ও দুঃখজনক বিষয় যে , তুমি তাঁকে সাহায্যের জন্যে আহ্বান করেছিলে আর তিনি তোমাকে সাহায্য করতে পরেননি , অথবা তিনি তোমার সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এসেছেন কিন্তু তা তোমার কোনো উপকারে আসে নি !” অতঃপর তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের মৃতদেহটি উঠালেন। মনে হচ্ছে এখনও আমি দেখতে পাচ্ছি যে , সেই প্রাণহীন তরুণটির পা দু’ টি মাটির উপর ছেঁচড়ে যাচ্ছে আর ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। আমি নিজে নিজেই বললাম , দেখি হুসাইন (আ.) সেই যুবকের মৃতদেহটি কি করেন ? দেখলাম যে , হুসাইন (আ.) সেই তরুণের মৃতদেহটিকে এনে তাঁর পরিবারের অন্যান্য শহীদগণের মাঝে এবং তাঁর সন্তান আলী আকবরের পাশে শুইয়ে দিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম , এই তরুণটির নাম কি ? লোকেরা বলল : তাঁর নাম কাসিম , তিনি হাসান ইবনে আলী ইবনে আবী তালিবের সন্তান ।”
আবু বকর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত
অতঃপর ভাইয়ের জন্যে নিজেদেরকে উৎসর্গ করার অভিপ্রায় নিয়ে ইমামের (আ.) ভাইগণ যুদ্ধের ময়দানে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। তাঁদের প্রথমজন ছিলেন আবু বকর ইবনে আলী (আব্দুল্লাহ্) । তাঁর মাতা ছিলেন মাসউদ ইবনে খালিদের কন্যা লাইলা। আবু বকর ময়দানে যাবার সময় নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করছিলেনঃ
শাইখী আলীয়্যুন্ যুলফিখারিল্ আত্বওয়াল মিন্ হাশিমিস্ সিদ্ক্বিল্ কারীমিল্ মুফায্যাল
হাযাল্ হুসাইনু ইবনুন্নাবিয়্যিল্ মুরসাল নাযূদু’ আনহু বিল্ হুসামিল্ ফাইসাল
তাফ্দীহি নাফ্সী মিন্ আখিন্ মুবাজ্জাল ইয়া রাব্বি ফামানহী আছ্ছাউবাল্ মুজায্যাল।১০১
অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত যাহার ইবনে ক্বায়িস নাখয়ী ’ র হাতে আঘাত প্রাপ্ত হন এবং শাহাদত বরণ করেন।
উমর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত
আবু বকর ইবনে আলীর শাহাদতের পরে তাঁর ভাই উমর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ময়দান অভিমুখে রওনা করলেনঃ
আযরিবুকুম্ ওয়া লা আরা’ ফীকুম যুহুর যাকা আশ্বাক্কিয়ু বিন্নাবিয়্যী ক্বাদ্ কাফার
ইয়া যুহর ! ইয়া যুহর ! তাদানু মিন্ উমার লা’ আল্লাকা আল্ ইয়াউমা তাবুউ বিসাক্বার
শাররু মাকানিন্ ফী হারীক্বিন্ ওয়া সার্’ ফাইন্নাকা আল্ জাহিদু ইয়া শাররাল্ বাশার।
অতঃপর তিনি তাঁর ভাইয়ের হত্যাকারীকে আক্রমণ করলেন এবং তরবারি দ্বারা তার উপর এমন আঘাত হানলেন যে , সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তিনি তাঁর আক্রমণের সময় আবৃত্তি করছিলেনঃ
খাল্লু’ আদাতাল্লাহি খাল্লু’ আন্ উমর খাল্লু’ আনিল্লাইছিল্’ আবূসিল্ মুকফাহার ;
ইয়াযরিবুকুম্ বিসাইফীহি ওয়ালা ইয়াফির ওয়া লাইসা ইয়াগদু কালজাবানিল্ মুনজাহার।
আর এইভাবে তিনি গর্জন ও যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।
উছমান ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত
উমর ইবনে আলী নিহত হবার পর উছমান ইবনে আলী (হিযাম ইবনে খালিদের কন্যা উম্মুল বানীন ছিলেন তাঁর মাতা।) নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেনঃ
ইন্নী আনা’ উছমানু যুল্ মাফাখির শাইখী’ আলীয়্যুন্ যুল্ ফা’ আলিত্তাহির
সেনভুন্নাবিয়্যী যুর রাশাদিস্ সাঈর মা বাইনা কুল্লি গায়িবিন্ ওয়া হাযির।
অতঃপর তিনি আক্রমণ করেন এবং লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করেন।
জা’ ফর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত
অতঃপর তাঁর ভাই জা’ ফর ইবনে আলী (তিনিও উম্মুল বানীনের সন্তান) নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতে করতে শত্রুদের উপর আক্রমণ করেনঃ
ইন্নী আনা জা’ ফারুন্ যুল্ মা’ আলী নাজলু’ আলিয়্যিন্ আলখাইরু যুন্নাওয়ালি ;
আহমী হুসাইনান্ বিল্ ক্বানাল্’ আসসালি ওয়া বিল্ হুসামিল্ ওয়াযিহিস্ সিক্বালি।
তিনিও যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করেন।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত
জা’ ফরের শাহাদতের পরে , তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ্ (উম্মুল বানীনের অপর এক সন্তান) যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেন এবং তিনি শত্রু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করেন। হামলাকালে তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ
আনা ইবনু যিন্নজদাতি ওয়াল্ আফ্যালি যাকা’ আলিয়্যুন আল্ খাইরু ফিল্ ফাঅ্যালি
সাইফু রাসূলিল্লাহি যুন্নিকালি ওয়া কাশিফুল্ খুতূবি ওয়াল্ আহ্ওয়ালি।
অতঃপর তিনি কুফার অধিবাসীদের উপর আক্রমণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করে শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেন।১০২
হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন : সেইদিন ইমাম হুসাইন (আ.) বলতে শুনেছিলাম :
“ আল্লাহুম্মা আমসিক ’ আনহুম ক্বাত্বরাস্ সামায়ি ওয়ামনা ’ হুম্ বারাকাতিল্ আরযি , আল্লাহুম্মা ফাইন্ মাত্তা ’ তাহুম্ ইলা হীনা , ফাফাররিক্বহুম্ ফারক্বান্ ওয়াজ্‘ আলহুম্ ত্বারাইক্বা ক্বিদাদান্ ওয়া লা তারযা ’ আনহুমুল্ উলাতু আবাদান্ ফাইন্নাহুম্ দা ’ আওনা লিইয়ানসুরূনা ফা’ আদাও ’ আলাইনা ফাক্বাতালূনা !”
হামিদ বলেছেন: ইতোমধ্যে পদাতিক বাহিনী তাঁদের উপর আক্রমণ করে ও তরবারির আঘাত হানে অথচ তখন ইমামের মাত্র তিন চার জনের বেশী সাথি অবশিষ্ট ছিলেন না। এই অবস্থায় ইমাম (আ.) তাঁর ইয়েমেনের মজবুত ও সূক্ষ্মভাবে বুননকৃত গেঞ্জিটি আনতে আদেশ দেন। অতঃপর তিনি নিজ হাতে সেইটির কয়েকটি স্থানে ছিদ্র করেন যাতে তাঁর নিহত হওয়ার পর শত্রুরা ছিঁড়া হওয়ার কারণে তাঁর শরীর হতে সেইটি খুলে না নেয়।
তাঁর একজন সাথি তাঁকে পরামর্শ দিলেন :“ তার ভিতরে একটি খাটো পায়জামা পরা শ্রেয় হবে ।” ইমাম উত্তর দিলেন :“ এই ধরনের কোনো পায়জামা পরা আমার ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে শোভা পায় না। ঐরূপ পোশাক হচ্ছে লাঞ্ছনা ও অবমাননার নিদর্শন !”
কিন্তু ইমাম যখন শাহাদত বরণ করেন তখন‘ বাহার ইবনে কা’ ব ’ তাঁর শরীর থেকে সেই জামাটিও খুলে ফেলে তাঁকে বিবস্ত্র করে দেয় !
মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর রাহমানের থেকে বর্ণিত‘ আমর ইবনে শাবীবের ’ বরাত দিয়ে আবু মুখনিফ লিখেছেন যে , শীতকালে‘ বাহার ইবনে কা’ বের ’ হাতগুলি থেকে পানি ঝরত আর গ্রীষ্মকালে , দু’ টি শুষ্ক কাঠের মত হয়ে যেত।১০৩
আবুল ফযলের (আ.) শাহাদত
মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন গ্রন্থে এসেছে : হযরত আবুল ফযল আল আব্বাস একজন দীর্ঘ অবয়ব ও সুন্দর চেহারার অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যখন কোনো মোটা তাজা ও শক্তিশালী ঘোড়ার উপর বসতেন এবং রেকাব (পাদানী) থেকে পা বের করতেন তখন তাঁর পা দু’ খানি মাটির উপর ঘর্ষিত হত। এই উজ্জ্বল চেহারার কারণে তাঁকে‘ ক্বামারে বানী হাশিম (বনী হাশিমের পূর্ণিমার চাঁদ)’ বলা হত। আশুরার দিনে ইমাম হুসাইনের সেনাবাহিনীর পতাকা তাঁর হাতে ছিল। তিনি হযরত আলীর স্ত্রী‘ উম্মুল বানীনের ’ প্রথম সন্তান ছিলেন যিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর পথে এবং ইমামের প্রতিরক্ষায় শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। খাওয়ারিযিমীর মাকতালে এসেছে : হুসাইন (আ.) এর পরিবারবর্গের জন্য পানি আনার দায়িত্ব ছিল হযরত আব্বাসের কাঁধে। তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে কুফার সৈন্যদের উপর আক্রমণ করেন :
আক্বসাম্তু বিল্লাহিল্ আ’ আযযিল্ আ’ যাম ওয়া বিল্ হুজুনি সাদিক্বান্ ওয়া যামযামি
ওয়া বিল্ হাত্বীমি ওয়াল্ ফিনাল্ মুহাররাম লিইয়াখযিবান্নাল্ ইয়াউমা জিসমী বিদামী
দূনাল্ হুসাইনি যিল্ ফাখ্খারিল্ আক্বদাম ইমামু আহলিল ফায্লি ওয়াত্তাকাররুম।১০৪
কিতাবুল ইরশাদ , মাছীরুল আহযান এবং লুহুফ গ্রন্থে এসেছে :“ হুসাইন (আ.) পিপাসায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে , ঘোড়ায় আরোহণ পূর্বক ফোরাত অভিমুখে রওনা হলেন। এমতাবস্থায় তাঁর ভাই আব্বাস তাঁর সম্মুখপথে তরবারি চালাচ্ছিলেন এবং ইবনে সা’ দের সেনাবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা সার্বিক শক্তি দিয়ে তাঁদের সম্মুখপথ রোধ করে রেখেছিল এবং তাঁদেরকে পানির নিকটে যেতে দিচ্ছিল না।১০৫
ইবনে শাহরে আশুবের‘ মানাকিব ’ গ্রন্থে এসেছে : আবুল ফযল (আ.) পানি আনার সংকল্প নিয়ে ফোরাতকূল অভিমুখে অগ্রসর হলেন। ইবনে সা’ দের বাহিনী তাঁকে বাধা দেয়ার জন্যে তাঁর প্রতি আক্রমণ করল। আব্বাস (আ.)ও তাদের উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেন এবং এই অবস্থায় তিনি নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করছিলেন :
লা আরহাবুল্ মাউতা ইযাল্ মাউতু রুক্বা হাত্তা উওয়ারিয়া ফিল্ মাসালীতি লাক্বা
নাফ্সী লিনাফসিল্ মুস্তাফা আত্তুহুরু ওয়াক্বা ইন্নী আনাল্’ আব্বাসু আগদু বিসসাক্বা
ওয়া লা আখাফু আশ্ শাররা ইয়াউমাল মুলতাক্বা।
“ আক্রমণকারীদের মাঝে নিজেকে না হারানো পর্যন্ত আগত মৃত্যুকে আমি ভয় করব না ! নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েও পূত পবিত্র রাসূলের সন্তানকে আমি রক্ষা করব ! আমি পানি সংগ্রহকারী আব্বাস , যুদ্ধের দুঃখজনক দুর্ঘটনাকে ভয় পাই না !”
তিনি পরস্পর সংঘবদ্ধ সৈন্যদের বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং আক্রমণকারীদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। এভাবে ফোরাতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় যায়িদ ইবনে ওয়ারাকা যে একটি খেজুর গাছের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে ছিল , সহসা বেরিয়ে এসে হাকীম ইবনে তুফাইলের সহযোগিতায় আবুল ফযল আল্ আব্বাসের উপর আক্রমণ করে এবং তাঁর ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আবুল ফযল আল্ আব্বাস তড়িৎ বেগে তরবারিখানা বাম হাতে নেন এবং নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে অশ্বারোহী শত্রুদের উপর হামলা চালান :
ওয়াল্লাহি ইন্ ক্বাত্তা’ তুম্ ইয়ামীনী ইন্নী উহামী আবাদান্’ আন্ দ্বীনী
ওয়া’ আন্ ইমামি সাদিক্বিল্ ইয়াক্বীনি নাজলু আন্নাবিয়্যি আত্তাহিরিল্ আমীনি।
“ আল্লাহর শপথ ! তোমরা যদিও আমার ডান হাতখানা কেটে ফেলেছ তবুও সর্বদা আমি আমার ধর্ম ও বিশ্বস্ত নবীর পবিত্র সন্তান আমার সত্য ইমামের পৃষ্ঠপোষকতা করেই যাব ।”
তিনি লড়াই করতে করতে (হাত থেকে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ ও কঠিন পিপাসার কারণে) চরম দুর্বল হয়ে পড়েন। এই অবস্থায়‘ হাকীম ইবনে তুফাইল ’ একটি খেজুর গাছের আড়াল থেকে পুনরায় তাঁকে আক্রমণ করে এবং তাঁর বাম হাতটিকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই অবস্থায়ও‘ হযরত আবুল ফযল আল্ আব্বাস (আ.)’ নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করছিলেনঃ
ইয়া নাফ্সু লা তাখ্শী মিনাল্ কুফ্ফারি ওয়াব্শিরী বিরাহমাতিল্ জাব্বারি ;
মাআন্নাবিয়্যিস্ সায়্যিদিল্ মুখ্তারি ক্বাদ্ ক্বাত্ত্বা’ ঊ বিবাগয়িহিম্ ইয়াসারী ;
ফাআসিলহুম্ ইয়া রাব্বি হাররান্নারি !
“ হে আমার আত্মা ! কাফিরদেরকে ভয় করো না এবং তোমার প্রতি সুসংবাদ হচ্ছে এই যে , তুমি মহান আল্লাহর করুণা লাভ করবে এবং তোমার স্থান হবে আল্লাহর রাসূলের পাশে। এই অন্ধ হৃদয়েরা অবিবেচকের ন্যায় আমার বাম হাতখানি কেটে ফেলেছে । সুতরাং হে আল্লাহ্ ! তাদেরকে তুমি নরকের আগুনে নিক্ষেপ কর !”
কাল বিলম্ব না করে , অপর এক অভিশপ্ত ব্যক্তি তার লোহার মুগুর দ্বারা কঠিনভাবে তাঁর (আ) মাথায় আঘাত করে এবং তাঁকে শহীদ করে।১০৬
খাওয়ারেযমীর মাকতাল গ্রন্থে এসেছে :“ আবুল ফযল আল্ আব্বাস শহীদ হওয়াতে ইমাম হুসাইন (আ.) বললেন : এই মুহূর্তে আমার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল এবং আমার পরিকল্পনা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল !” ১০৭
ইমাম হুসাইনের (আ.) দুগ্ধপোষ্য শিশুর শাহাদত
খাওয়ারেযমীর মাকতাল গ্রন্থে এবং অন্যান্য সূত্রসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের তাঁবুগুলির সামনে আসেন এবং বলেন :“ আমার দুগ্ধপোষ্য সেই শিশু‘ আলীকে ’ নিয়ে এসো , তাঁর সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করি ।”
তাঁরা শিশুটিকে তাঁর কোলে দেন ! ইমাম তাঁকে চুমু দেন এবং বলেন :“ এই জাতির উপর লানত হোক যাদের শত্রু হচ্ছেন তোমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) !” তিনি আলীকে কোলে ধরে ছিলেন , এই অবস্থায় হারমালাহ্ ইবনে কাহিল আসাদী সেই শিশুটির গলাকে লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করে এবং সেই তীরটি তাঁর কণ্ঠ ভেদ করে। ইমাম (আ.) শিশুটির গলার নিচে হাত দিয়ে ধরলে তা রক্তে পূর্ণ হয়ে যায় এবং তিনি সেই রক্ত আকাশের দিকে ছুঁড়ে বলেন : হে আল্লাহ তোমার সাহায্যের মাধ্যমে ইয়াযিদের উপর বিজয়ী হওয়া হতে যদি আমাদের বঞ্চিত রাখো তাহলে তা আমাদের কল্যাণের উপকরণ হিসাবে নির্ধারণ করো এবং দ্রুত এই অত্যাচারীদের নিকট হতে আমাদের প্রতিশোধ গ্রহণ করো ।
তিনি তাঁর ঘোড়া থেকে নিচে নামলেন এবং তরবারির কোষ দ্বারা সেই শিশুটির জন্যে একটি ছোট গর্ত খুঁড়লেন । অতঃপর তাঁর জানাজার নামায আদায় করে তাঁর রক্তাক্ত দেহটিকে দাফন করলেন ।১০৮
ইমামের অপর একটি শিশুর শাহাদত
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উকবাহ্ গানাবী আবু বকর নামক ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর অপর একটি শিশুকে লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করে এবং তাঁকে শহীদ করে !
ফোরাতের পথে ইমামের যুদ্ধ
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে , যুদ্ধাঙ্গনের প্রত্যক্ষদর্শীদের একজনের বরাত দিয়ে লিখেছেন : যখন ইমাম হুসাইনের (আ.) সেনাবাহিনীতে পরাজয়ের নিদর্শন সুস্পষ্ট হল , তখন ইমাম ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং ফোরাতের দিকে যাবার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। সেই সময় বনী আবান ইবনে দারিম গোত্রের এক লোক চিৎকার দিয়ে বলল :‘ তোমাদের সর্বনাশ হোক ! তাঁর পথ রোধ কর ! তাঁর সঙ্গী সাথি ও অনুসারীগণ তাঁকে অনুসরণ করে ফোরাত অভিমুখে আসার ও পানিতে পৌঁছার পূর্বেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কর !’
এই বলে তার ঘোড়াকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে করতে দ্রুত সামনে অগ্রসর হল ! সৈন্যরাও তাকে অনুসরণ করল এবং ইমাম ও ফোরাতের (নদী) মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল ! ইমাম এরূপ অবস্থা দেখে লোকটিকে অভিশাপ দিয়ে বললেন :“ হে আল্লাহ্ ! তাকে পিপাসার্ত রাখ !” আবান গোত্রের লোকটিও এই কথা শুনে ধনুকে একটি তীর সংযোগ করে ইমামকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ল এবং তা তাঁর চোয়ালে আঘাত করল !
অপর একটি বর্ণনা অনুসারে :‘ হুসাইন ইবনে তামীম ’ একটি তীর ছুঁড়ে এবং সেই তীরটি ইমামের মুখের ভেতর (অপর একটি বর্ণনা অনুসারে তাঁর চোয়ালের ভেতর) প্রবেশ করে !
বর্ণনাকারী বলেছেন : সেই তীরটিকে ইমাম টেনে বের করলেন (সেই স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল) এবং তিনি সেই ছিদ্রের নিচে অঞ্জলী পেতে রক্তে পূর্ণ করলেন। অতঃপর সেই রক্তকে তিনি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন ! তারপর তিনি আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে বললেন :
“ হে আল্লাহ্ ! এরা তোমার রাসূলের নাতির সাথে যে আচরণ করেছে সেই অভিযোগ তোমার নিকট পেশ করছি। হে আল্লাহ্ ! তাদেরকে তুমি সমূলে উৎপাটন কর এবং এক এক করে তাদেরকে ধ্বংস কর ! তাদের কাউকেই তুমি পৃথিবীর বুকে অবশিষ্ট রেখ না !”
তাবারী বর্ণনা করেছেন : হুসাইন (আ.) তীরটিকে টেনে বের করলেন এবং তার নিচে (সেই স্থান থেকে যেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছিল) অঞ্জলী পাতলেন এবং তা রক্তে ভরে গেল। তখন তিনি অভিশাপ দিয়ে বললেন :“ হে আল্লাহ্ ! তোমার রাসূলের নাতির সাথে তারা যে আচরণ করেছে সেই অভিযোগ আমি তোমার নিকট পেশ করছি !”
বর্ণনাকারী বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! কিছু দিনের মধ্যেই সেই লোকটিকে মহান আল্লাহ্ পিপাসা জনিত একটি অসুখে ফেললেন। এমন অসুখ যে ,কোনো ক্রমেই তার পিপাসা মিটছিল না !”
কাসিম ইবনে আসবাগ এই বিষয়ে বলছেন : যারা তার শুশ্রূষার জন্যে তার নিকট যেত আমিও তাদের সাথে তার শিয়রে উপস্থিত হলাম এবং দেখলাম যে , মিছরির ঠাণ্ডা শরবত , ঘোলের মশক এবং পানির একাধিক কলস তার চারপাশে রাখা হয়েছে ! সে সেগুলো থেকে অনবরত পান করছে এবং চিৎকার দিয়ে বলছে :“ আমাকে বাচাঁও , আমি পিপাসায় মরে গেলাম !” অথচ সে সব পাত্র , মশক ও কলসের একটিই , কোনো একটি পরিবারের পিপাসা মিটানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল ! কিন্তু সে , সব কিছুর শেষ ফোটা পর্যন্ত পান করেও মাত্র সামান্য কিছু সময় বিশ্রাম নিচ্ছে , অতঃপর উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলছে যে , আমাকে বাচাঁও , আমি পিপাসায় মরে গেলাম ! আর এইভাবে শেষ পর্যন্ত , সেই সব তরল পদার্থের চাপে তার পেটটি ফেটে যায় !”
ভীতবিহ্বল একটি শিশুর শাহাদত
হানী ইবনে ছুবাইত হাযরামী ’ র উদ্ধৃতি দিয়ে তবারী বর্ণনা করেছেন সে বলেছে : হুসাইনের (আ.) হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে আমিও ছিলাম ! সেই সময় আমি অপর নয় জনের সাথে ছিলাম , আমরা প্রত্যেকেই এক একটি ঘোড়ায় আরোহী ছিলাম ; হৈ হুল্লোড় ও চিৎকার করে যখন ফিরে এলাম এবং একটি স্থানে স্থির হলাম , তখন হুসাইনের (আ.) পরিবারের একটি শিশুকে দেখলাম যে , হাতে একখানা লাঠি নিয়ে এবং কেবলমাত্র একজোড়া জামা পায়জামা পরিধান করে ভীত সন্ত্রস্ত হুসাইনের পরিবারের তাঁবু থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসল এবং ভীতি ও অস্থিরতার সাথে নিজের ডানে ও বামে ফিরে তাকাল !
মনে হয় এখনও দেখছি তার মাথা ঘুরানোর কারণে তার কানের দু’ টি মুক্তার দুল বাতাসে দোল খাচ্ছে !
ভীত সন্ত্রস্ত শিশুটি একইভাবে সম্মুখে এগিয়ে আসছিল। আমাদের মধ্যে থেকে একটি লোক তার ঘোড়া ছুটাল এবং শিশুটির নিকট পৌঁছল। অতঃপর তার ঘোড়া থেকে নিচে লাফ দিয়ে সেই শিশুটিকে আক্রমণ করল আর তরবারির একটি আঘাতে তাকে শহীদ করল !
অপর বর্ণনাকারী বলেন :“ সেই শিশুটির হত্যাকারী স্বয়ং হানী ইবনে ছুবাইত ছিল ! যখন সে এইরূপ একটি অপরাধের কারণে সমালোচনা ও অভিশাপের পাত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে তখন সেইটিকে অপর একজনের প্রতি আরোপ করেছে !”
ইমাম হুসাইনের (আ.) অন্য একটি শিশুর শাহাদত
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন :“ সেই সময় শিমর ইবনে যিলজাওশান তার পদাতিক বাহিনীর সাথে , একত্রে ইমামকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে আসল ! ইমাম তাদের উপর হামলা করলেন এবং তাদের সারিগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন আর তাদেরকে পেছনে সরে যেতে বাধ্য করলেন ! কিন্তু কাল বিলম্ব না করে পুনরায় তারা চারিদিক থেকে সম্পূর্ণরূপে তাঁকে ঘিরে ফেলল ! তখন ইমাম হাসানের (আ.) সন্তানদের মধ্যে থেকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান১০৯ নামের এক বালক নবীর আহলে বাইতের নারীদের তাঁবু থেকে দ্রুত দৌড়ে বাইরে এলো এবং তার চাচা হুসাইনের (আ.) উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো । তাকে ধরার জন্যে আলীর (আ.) কন্যা যয়নবও দৌড়ে বেরিয়ে এলেন , ইমামও তাঁর বোনকে ডাক দিয়ে তাকে ধরতে বললেন! কিন্তু বালকটি নিজেকে তার ফুফুর হাত থেকে ছাড়িয়ে দ্রুত যুদ্ধের ময়দানের দিকে দৌড় দিল এবং হুসাইনের (আ.) নিকট পৌঁছে তাঁর পাশে স্থির হয়ে দাঁড়াল ।
এই সময় বনী তাইমুল্লাহ্ ইবনে ছা ’ লাবা গোত্রের বাহার ইবনে কা’ ব কোষমুক্ত তরবারি দ্বারা ইমামের উপর হামলা করল। বালকটি এইরূপ অবস্থা দেখে , তাঁর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল :“ হে অপবিত্র সন্তান ! আমার চাচাকে তুই হত্যা করছিস ! ?”
বাহার ইবনে কা’ ব‘ আব্দুল্লাহর ’ কথাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে বরং সে তার তরবারিখানা দিয়ে ইমামের উপর আঘাত হানল। আব্দুল্লাহ্ও তার হাতকে ইমামের ঢাল হিসেবে স্থাপন করল। সমস্ত শক্তি দিয়ে বাহারের তরবারিখানা নিচে নেমে আসল এবং আব্দুল্লাহর হাত কেটে নিচের চামড়ার সাথে ঝুলে গেল। আব্দুল্লাহ্ শিশুদের ভঙ্গিতে মায়ের সাহায্য চাইল। ইমাম তাকে তুলে নিলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন :
“ হে আমার প্রিয় ভাতিজা ! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরো এবং সেটিকে আল্লাহর কল্যাণ ও নেকীর হিসাবের উপর ছেড়ে দাও। কারণ , মহান আল্লাহ্ এখন তোমাকে তোমার উত্তম পিতাদের আল্লাহর রাসূল (সা.) , আলী ইবনে আবি তালিব , হামযা , জা’ ফর ও হাসান ইবনে আলী (আ.) সাথে মিলিত করবেন।
শাহাদতের পথে ইমাম
তাবারী লিখেছেন যে , হুসাইন (আ.) বেশ পূর্বেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু যখনই কোনো ব্যক্তি তাঁর নিকট যাবার ইচ্ছে করছিল তখনই তাঁর হত্যার মহাপাপের চিন্তায় ফিরে আসছিল এবং তাঁকে হত্যা করতে সাহস করছিল না।
এরই মাঝে বনী বাদা ’ গোত্রের‘ মালিক ইবনে নুসাইর ’ নামের এক লোক ইমামের নিকট পৌঁছে এবং তরবারি দ্বারা তাঁর মাথাতে আঘাত করে। মালিকের আঘাত ইমামের পরিধেয় বিশেষ টুপিটি ভেদ করে তরবারির প্রান্তভাগ তাঁর মাথার খুলিতে প্রবেশ করল। রক্তে টুপিটি পরিপূর্ণ হলে ইমাম তাকে সম্বোধন করে বললেন :“ এই হাত দিয়ে পানাহার করে যেন কোনদিন পরিতৃপ্ত না হও ! কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ্ তোমাকে যেন অত্যাচারীদের কাতারে শামিল করেন !”
অতঃপর তিনি সেই টুপিটি মাথা থেকে উঠিয়ে ফেলে দিলেন এবং একটি লম্বা টুপি চেয়ে সেইটি মাথার উপর রেখে তার চারিদিকে পাগড়ী বাঁধলেন কিন্তু তখন তাঁর আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট ছিল না !
কিন্দী বংশীয় লোকটি উপুড় হয়ে ইমামের ফেলে দেয়া পশমের তৈরীকৃত সেই টুপিটি উঠিয়ে নিল। কারবালার সেই হৃদয় বিদারক ঘটনার পর যখন সে টুপিটিকে নিয়ে বাড়ীতে তার স্ত্রীর (হুরের কন্যা এবং হুসাইন ইবনে হুরের ভগ্নী) নিকট গেল এবং সেই টুপিটি থেকে রক্ত ধুতে শুরু করল , তখন তার স্ত্রী তাকে চিৎকার করে বলল :‘ তুমি , আল্লাহর রাসূলের নাতির টুপিটি ছিনতাই করে আমার বাড়ীতে নিয়ে এসেছ ?! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেইটিকে আমার বাড়ী থেকে বাইরে নিয়ে যাও !’
মালিকের বন্ধুরা বর্ণনা করেছে যে , সেই ঘটনার পর থেকে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত মালিক সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও নিদারুণ যন্ত্রণাময় জীবন ভোগ করেছে।১১০
হুসাইন পরিবারের তাঁবুগুলিতে পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ
আবু মাখনাফ তার বর্ণনায় এই বিষয়ে বলেন : শিমর ইবনে যিল জাওশান কুফার দশজন পদাতিক সৈন্যসহ হুসাইনী তাঁবুগুলোর উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সেই তাঁবুগুলোতে ইমামের পর্দানশীন নারিগণ , আত্মীয় স্বজন ও সঙ্গী সাথি অবস্থান করছিলেন। ইমাম এই বিষয়টি বুঝতে পেরে চিৎকার করে বললেন :
“ ওয়াইলাকুম ! ইন্ লাম্ ইয়াকুন্ লাকুম্ দ্বীনুন ওয়া লা তাখাফাউনা ইয়াউমাল মা’ আদ , ফাকূনূ ফী আমরি দুনইয়াকুম্ আহরারান্ যাবী আহ্সাবিন্ ইমনাঊ রাহলী ওয়া আহলী মিন তুগামিকুম ওয়া জুহ্হালিকুম ।”
অর্থাৎ তোমাদের সর্বনাশ হোক ! যদি তোমাদের দ্বীন ধর্ম না থাকে এবং কিয়ামত দিবসের ভয় না কর তবে তোমাদের পার্থিব বিষয়ে স্বাধীন ও উদার চিন্তার অধিকারী হও ! আমার তাঁবুগুলো ও পর্দানশীন নারিদেরকে ভণ্ড ও মূর্খদের হাত হতে নিরাপদ রাখ !
ইমামের বক্তব্য শুনার সাথে সাথে শিমার তাঁকে সম্বোধন করে বলল :“ তুমি সঠিক বলেছো হে ফাতিমার সন্তান !” সেই পদাতিক সৈন্যদের মাঝে আবুল জুনূব (আব্দুর রাহমান জু ’ ফী) , ক্বাশ্আম ইবনে আমর ইবনে ইয়াযীদ জু ’ ফী , সালিহ্ ইবনে ওয়াহাব ইয়ায্নী , সিনান ইবনে আনাস নাখ্য়ী ও খাওলা ইবনে ইয়াযীদ আসবাহীর মত ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছিল। শিমার তাদের সাথে নিয়ে হুসাইনের দিকে অগ্রসর হল এবং তঁকে ঘিরে ধরল । আর তাড়াহুড়া করে ইমামকে হত্যার কাজ সম্পন্ন করার জন্যে , শিমার তাদেরকে বার বার উৎসাহিত করছিল। তাদের মাঝে লোহা ইস্পাত ও বিভিন্ন সমর অস্ত্রে সুসজ্জিত‘ আবুল জুনূবের ’ প্রতি দৃষ্টি পড়লে সে তাকে বলল :“ সামনে অগ্রসর হও ও তাঁর কাজ শেষ কর !” আবুল জুনূব উত্তর দিল :“ তুমি নিজে কেন যাচ্ছ না ?” শিমার বলল :“ তুমি আমাকে ধৃষ্টতা দেখাচ্ছ ?!” আবুল জুনূবও তার প্রতি উত্তরে বলল :“ তুমি আমাকে আদেশ করছো ?!”
তারা পরস্পরকে গালিগালাজ ও অশ্লীল কথাবার্তা বলতে লাগল। আবুল জুনূব একজন সাহসী পুরুষ ও সৈনিক ছিল , অবশেষে সে শিমারের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল:“ বর্শার শীর্ষ দিয়ে তোমার চোখ উপড়িয়ে ফেলতে তুমি কি আমাকে বাধ্য করবে ?!” শিমার এই হুমকি শুনার সাথে সাথে আবুল জুনূবের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল :“ আল্লাহর শপথ , যদি পারতাম তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দিতাম !” ১১১
ইমামের (আ.) সর্বশেষ যুদ্ধ
তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে আবু মাখনাফের উদ্ধৃতি দিয়ে আম্মার ইবনে ইয়াগুছ বারেক্বীর নাতি হাজ্জাজ ইবনে আব্দিল্লাহ্ হতে বর্ণনা করেছেন যে , তার পিতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে আম্মারকে , হুসাইনের (আ.) নিহত হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমর ইবনে সা’ দের সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকার কারণে অন্যরা তিরস্কারের পাত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আম্মার বলে :“ বনী হাশিমের উপর আমার অধিকার রয়েছে ।” আমরা জিজ্ঞাসা করলাম :“ কি অধিকার ?” সে বলল :“ আমি বর্শা দ্বারা ইমাম হুসাইনের উপর হামলা করলাম , আল্লাহর শপথ ! যদি চাইতাম তাহলে তাঁকে একটি আঘাতে শেষ করতে পারতাম ; কিন্তু আমি এই কাজটি করি নি , তাঁর থেকে সামান্য দূরে সরে গেলাম এবং নিজে নিজেই বললাম , আমি তাঁকে হত্যা করব না , অন্য কেউ তাঁকে হত্যা করুক !!”
এমতাবস্থায় পদাতিক বাহিনীরা ডান ও বাম দিক থেকে তাঁর উপর আক্রমণ করল। ইমাম , পশমের তৈরী একটি জামা শরীরে এবং একটি পাগড়ী মাথায় পরে ছিলেন। তাঁর ডান পার্শ্বের আক্রমণকারীদের প্রতি আক্রমণ করলেন এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। অতঃপর বাম পার্শ্বের বিদ্রোহীদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন। তাদের উপর তরবারি দিয়ে আঘাত হানলেন এবং তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দিলেন।
আল্লাহর শপথ ! কখনও আমি তাঁর মত একক ও অদ্বিতীয় কোনো পুরুষ দেখি নি। যখন চতুর্দিক থেকে শত্রুরা তাঁকে পরিবেষ্টন করেছে এবং তাঁর সমস্ত সন্তান সন্ততি , আত্মীয় স্বজন ও সঙ্গী সাথিকে হত্যা করেছে তখনও তিনি নির্ভীক , সাহসী , শক্তিশালী , ধৈর্যশীল ও দৃঢ় সংকল্পী হিংস্র সিংহের ন্যায় প্রতিরোধ চালিয়ে গিয়েছেন ও যোদ্ধা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন !
সত্যিই , আল্লাহর কসম ! হুসাইনের আগে এবং তাঁর পরে আর এমন কোনো রণকুশলী ব্যক্তিকে আমি দেখি নি! পদাতিক সৈন্যরা তাঁর তরবারির সামনে থেকে এবং তাঁর বীর পুরুষোচিত আক্রমণ থেকে এমনভাবে ডান ও বাম দিকে ছুটে পালাচ্ছিল যে , মনে হচ্ছিল , নেকড়ের আক্রমণ থেকে ছাগলছানার পাল ছুটে পালাচ্ছে !
আল্লাহর শপথ ! যুদ্ধ ও পলায়ন অনুরূপভাবে অব্যাহত ছিল। হঠাৎ করে হুসাইনের ভগ্নী ও ফাতিমার কন্যা যয়নব , হেরেমের তাঁবু হতে বেরিয়ে আসলেন। তিনি বলছিলেন :“ হায় ! আসমান যদি পৃথিবীর উপর নেমে আসত !” তারপর তিনি স্বয়ং উমর ইবনে সা’ দের নিকট গমন করলেন। হুসাইনের (আ.) প্রতি আক্রমণকারী সেনাদের সে তদারকি করছিল। যয়নব তাকে বললেন :“ হে উমর ! হুসাইনকে হত্যা করছে আর তুমি তাকিয়ে দেখছো ?!”
বর্ণনাকারী বলেন :“ আমি নিজে দেখলাম যে , উমর ইবনে সা’ দের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গড়িয়ে তার গণ্ডদেশে ও দাড়িতে নেমে আসছিল আর এই অবস্থায় সে যয়নবের (আ.) দিক হতে মুখ ঘুরিয়ে নিল !”
আল্লাহর রাসূলের (সা.) নাতির শাহাদত
আবু মাখনাফ , সাকআব ইবনে যুবাইরের সূত্রে হামিদ ইবনে মুসলিম হতে বর্ণনা করেছেন :“ ইমাম হুসাইনের (আ.) শরীরে পশমের একটি জুব্বা ছিল এবং মাথার উপর ছিল একটি পাগড়ি। তিনি নিজের দাড়িসমূহকে রাঙিয়ে ছিলেন। শাহাদতের পূর্বে তিনি পদব্রজে ছিলেন কিন্তু সাহসী বীরের ন্যায় এবং পূর্ণ দক্ষতার সাথে লড়ছিলেন। তিনি অশ্বারোহী শত্রুদের প্রতি হামলা করছিলেন ।” আমি নিজে শুনেছি , তিনি তাদের সম্বোধন করে বলছিলেন:“ আমাকে হত্যা করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়েছো এবং জনগণকে সেই কাজের প্রতি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করছো ?! আল্লাহর শপথ ! অন্যান্য যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা অপেক্ষা , আমাকে হত্যা করার জন্যে মহান আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অধিক রাগান্বিত হবেন। আমি আশা রাখি যে , মহান আল্লাহ্ আমাকে তোমাদের লাঞ্ছনা ও অপমানের বিপরীতে সম্মানিত করবেন। যতখানি তোমরা চিন্তাও করতে পার না ততখানি মহান আল্লাহ্ তোমাদের নিকট থেকে আমার প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।
আল্লাহর শপথ ! জেনে রাখ যে , আমাকে হত্যা করলে মহান আল্লাহ্ তোমাদের উপর অত্যন্ত কঠোর হবেন , তোমাদের রক্ত ঝরবে , এতেও যথেষ্ট নয় বরং তোমাদের প্রতি তিনি কয়েকগুণ বেশি পীড়াদায়ক শাস্তি ধার্য করবেন ।”
হামিদ ইবনে মুসলিম বলেন : ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত হচ্ছিল , এই সময়ে কেউ তাঁকে হত্যা করতে চাইলে , হত্যা করতে পারত। কিন্তু তারা অপেক্ষা করছিল যে , অপর কেউ এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির পদক্ষেপ গ্রহণ করুক যাতে করে তারা নিজেদেরকে এই গুরুতর অপরাধ থেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়। ঠিক এই অবস্থায় শিমর (শিমার) চিৎকার দিয়ে উঠে :“ তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত ! কিসের অপেক্ষায় রয়েছো , তোমাদের মায়েরা তোমাদের জন্য বিলাপ করুক ?!! এই লোকটির কাজ সমাপ্ত কর এবং তাঁকে হত্যা কর !”
শিমারের ফরিয়াদের কারণে কুফার লোকেরা চারদিক হতে তাঁর উপর আক্রমণ করে। শুরাইক তামীমী তার তরবারি দ্বারা ইমামের বাম হাতের উপর একটি আঘাত করে। অপর একজন তাঁর কাঁধের উপর একটি আঘাত করে , যার ফলে ইমাম (আ.) কয়েকবার দাঁড়ান এবং মুখ থুবড়ে পড়ে যান। আক্রমণকারীরা এই অবস্থায় তাঁর নিকট হতে দূরে সরে যায়।
যখন ইমাম একবার দাঁড়াচ্ছিলেন আবার মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন ঠিক তখন আমর নাখ্য়ীর নাতি সিনান ইবনে আনাস তার বর্শা দ্বারা তাঁর উপর মারাত্মক একটি আঘাত হানে। ইমাম সেই আঘাতের ফলে লুটিয়ে পড়েন।‘ খাওলা ইবনে ইয়াযীদ আসবাহীর ’ দিকে মুখ ফিরিয়ে সিনান বলে“ তাঁর দেহ হতে মাথাটি বিচ্ছিন্ন কর !” খাওলা , ইমামের দেহ হতে মাথাটি বিচ্ছিন্ন করার জন্যে সামনে অগ্রসর হলো কিন্তু দুর্বলতা ও আড়ষ্টতা যেন তার সমগ্র অস্তিত্বকে আচ্ছন্ন করলো এবং সে কাঁপতে শুরু করল। সিনান ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে খাওলাকে উদ্দেশ্য করে বলল :“ আল্লাহ্ তোমার বাহু দু’ টিকে ভেঙ্গে ফেলুক এবং তোমার হাত দু’ খানিকে অকেজো করে দিক !” অতঃপর সে নিজেই সামনে অগ্রসর হয়ে নিষ্পাপ সেই ইমামের মাথাটিকে তাঁর পবিত্র শরীর হতে বিচ্ছিন্ন করে। তারপর সেই পবিত্র মাথাটিকে খাওলার নিকট অর্পণ করে ।”
ইমাম সাদীকের (আ.) উদ্ধৃতি দিয়ে আবু মাখনাফ বলেনঃ“ শাহাদতকালে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শরীরে ৩৩টি বর্শার আঘাত এবং ৩৪টি তরবারির আঘাত ছিল !”
ইমামের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে সিনান ইবনে আনাস , ইবনে সা’ দের অপর সৈন্যদেরকে তাঁর (আ.) নিকটবর্তী হওয়া থেকে কঠিনভাবে বাধা দিচ্ছিল , এই আশঙ্কায় যে , হয়তো বা অপর কেউ তার আগেই ইমামের দেহ হতে মাথাটি বিচ্ছিন্ন করে দেয় ! স্বীয় বাসনা চরিতার্থ করা হলে সে , ইমামের পবিত্র মাথাটিকে খাওলার নিকট অর্পণ করে।
খলীফার সৈন্যরা রাসূলের সন্তানের শরীরের পোশাকগুলি লুণ্ঠন করছে
আবু মাখনাফ বলেন : ইমামের দেহকে তারা বিবস্ত্র করে এবং যা কিছু তাঁর শরীরে ছিল তা লুট করে। বাহর ইবনে কা’ ব তাঁর জামা এবং কায়েস ইবনে আশ্আছ তাঁর রেশমী আবাটি ছিনিয়ে নেয়। এইরূপ একটি ধৃষ্টতার জন্য সে‘ কাতীফা কায়েস ’ (লুটকারী কায়েস) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আসওয়াদ নামের বনী আওদ গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর জুতাগুলি ছিনিয়ে নেয় এবং বনী নাহ্শাল ইবনে দারিম গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তাঁর তরবারিখানা নেয়। পরবর্তীতে সেই তরবারিখানা হাবীব ইবনে বুদাইলের পরিবারের হাতে পড়ে।
অতঃপর সৈন্যরা পোশাক আষাক , অলঙ্কারাদি এবং উটগুলি লুট করা শুরু করে। পরিশেষে তারা ইমাম হুসাইনের (আ.) অন্দরমহল অর্থাৎ নারিগণ এবং তাদের আসবাবপত্র ও সাজ সরঞ্জামের দিকে ধাবিত হয়। এমনকি তারা নারিদের মস্তকাবরণ ও তাঁদের চাদরগুলি ছিনিয়ে নিয়েছিল !
সর্বশেষ শহীদ
যুহাইর ইবনে আব্দুর রাহমান খাছ্আমী হতে বর্ণিত হয়েছে : সুওয়াইদ ইবনে আমর ইবনে আবিল মাতা নামের ইমামের একজন সাথি মারাত্মতভাবে আহত হয়ে নিহতদের মাঝে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলেন। ইমামের শাহাদতের পর কিছুটা তাঁর চেতনা ফিরে আসে এবং তিনি লোকদের বলতে শুনেন:” হুসাইন নিহত হয়েছেন !” এই ধ্বনিটি তাঁকে জাগ্রত করে তোলে। তাঁর তরবারিখানা লুট করে নেয়ার কারণে , তিনি নিজের সঙ্গে রাখা চাকু দ্বারা কুফার লোকদের প্রতি আক্রমণ শুরু করেন এবং কিছু সময় ব্যাপী তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। পরিশেষে উরওয়াহ্ ইবনে বাত্বার তাগলিবী এবং যায়িদ ইবনে রিক্বাদ জাম্বী ’ র হাতে নিহত হন ও শহীদগণের কাতারে শামিল হন।
হামিদ ইবনে মুসলিম হতে বর্ণনা করা হয়েছে :“ আমি লুটকারী সৈন্যদের সঙ্গে ইমামের (আ.) তাঁবুগুলিতে প্রবেশ করলাম এবং আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী অর্থাৎ আলী আসগরের১১২ নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী ছিলেন। সেই অবস্থায় শিমার ইবনে যিল জাওশান তার পদাতিক লোকদের সাথে এই কথা বলাবলি করছিল :‘ এই রুগ্ন ব্যক্তিটিকে কি হত্যা করব , না করব না ?’ আমি উপস্থিত হয়ে তাদেরকে সম্বোধন করে বললাম : সুবহানাল্লাহ্ ! তাহলে কি তোমরা কিশোরকেও হত্যা করবে ? এই রুগীটি একজন কিশোর ছাড়া বেশী কিছু নয়। আমি এই কথার দ্বারা , যারাই তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হচ্ছিল তাদেরই পথ রোধ করছিলাম এবং সামনে অগ্রসর হতে দিচ্ছিলাম না। পরিশেষে উমর ইবনে সা’ দ সেখানে উপস্থিত হয় এবং চিৎকার করে বলে :‘ এই নারিদের তাঁবুতে প্রবেশ করার কারও অধিকার নেই এবং এই রুগ্ন যুবকটিকে কোনোরূপ কষ্ট দিতে পারবে না ; উপরন্তু যারা তাদের কোনো সামগ্রী লুণ্ঠন করেছে তারা যেন সেইগুলি তাঁদের নিকট ফিরিয়ে দেয় !’ কিন্তু আল্লাহর শপথ ! তার কথায় কেউ কান দিল না এবং লুণ্ঠনকৃত মাল পত্রের কোনো কিছুই ফিরিয়ে দিল না !”
ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন (আ.) ঘটনাটির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন :“ উত্তম কাজ করেছো। কসম খাচ্ছি যে , মহান আল্লাহ্ তোমার কথার দ্বারা তাদের কুকর্ম ও যাতনাকে আমা হতে দূরীভূত করেছেন ।”
হুসাইনের (আ.) হন্তা পুরস্কার চায় !
বর্ণনাকারী বলেন :“ ইমাম হুসাইনের নিহত হওয়ার পর , কুফার সৈন্যদের কয়েকজন লোক সিনান ইবনে আনাসকে বলে:‘ আলী ও আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার সন্তান হুসাইনকে তুমি হত্যা করেছো এবং আরবের সর্বাধিক অবাধ্য ব্যক্তি যিনি এই ক্ষমতাসীন সরকারের কব্জা থেকে ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্যে ওঁৎ পেতে বসে ছিলেন তাঁকে তুমি পরাজিত করেছো। এখনই সময় তুমি তোমার অধিনায়কদের নিকট যাও এবং তাদের নিকট হতে পুরস্কার চাও। তুমি তাদের জন্যে যে কাজ করেছো ও হুসাইনকে হত্যা করে তাদের যে উপকার করেছো , তার জন্যে তারা যদি তাদের যাবতীয় ধন সম্পদও তোমাকে দান করে তবুও তা তোমার কাজের প্রতিদান হবে না !
সিনান একদিকে যেমন একজন সাহসী পুরুষ অপরদিকে তেমনি বোকা ও বিকৃত মস্তিষ্ক ছিল , তাদের কথায় সে প্রভাবিত হল। তখন সে নিজ ঘোড়ায় আরোহণ করে সরাসরি উমর ইবনে সা’ দের তাঁবুর দিকে ছুটল এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে তার সমস্ত শক্তি দ্বারা চিৎকার দিয়ে বলল :
“ আউকির রিকাবিয়া ফিযযাতান্ ওয়া যাহাবা আনা ক্বাতালতুল মালেকাল্ মুহাজ্জাবা
ক্বাতালতু খাইরান্নাসি উম্মান্ ওয়া আবা ওয়া খাইরুহুম্ ইয্ ইয়ানসিবূনা নাসাবা ।”
অর্থাৎ আমি একজন মহৎপ্রাণ বাদশাহকে হত্যা করেছি , এই সুসংবাদের জন্য তোমরা আমার বাহনকে স্বর্ণ ও রৌপ্য দ্বারা ভরে দাও ! আমি পিতা মাতার দিক থেকে সর্বোত্তম মানুষকে হত্যা করেছি , তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বংশ কৌলীন্যের দিক হতে তাদের সর্বোত্তম !
সিনানের আওয়াজ , কবিতা ও বীরত্বগাঁথা শুনে উমর ইবনে সা’ দ তাকে সম্বোধন করে বলে :“ আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে , তুমি একজন পাগল!” তারপর সেই উপস্থিত জনতার দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল :“ ওকে ভিতরে আনো !” সিনান যখন উমর ইবনে সা’ দের তাঁবুতে পা রাখল তখন সে তার নিজের হাতের লাঠি দ্বারা তাকে আঘাত করে বলল : এই পাগল ! তুমি এই ধরনের কথাবার্তা বলছো ? আল্লাহর শপথ! তোমার এই কথাগুলো যদি ইবনে যিয়াদ শুনে তবে তোমার শিরোচ্ছেদ করবে !”
উকবাহ মুক্তি পেল এবং‘ মারকা’ বন্দী হলো
ইমরুল কায়িসের কন্যা ও সাকীনার মাতা রুবাবের মুক্ত দাস উকবাহ্ ইবনে সাম্আনকে লোকেরা বন্দী করে উমর ইবনে সা’ দের নিকট নিয়ে যায়। উমর তাকে জিজ্ঞাসা করল:‘ তুমি কি কর ?’ উকবাহ্ উত্তর দিলেন :‘ আমি একজন কৃতদাস !’ এই উত্তরের সাথে সাথে উমর তাঁর উপর হতে হাত গুটিয়ে নেয় এবং তাঁকে ছেড়ে দিল। বলল : সে যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারে। তিনি ও মারক্বা ইবনে ছামামা আসাদী ব্যতীত ইমামের অপর কোনো সাথিই জীবন রক্ষা করতে পারেননি ।
যুদ্ধ ক্ষেত্রে মারক্বা ’ তাঁর সমস্ত তীরকে শত্রুর বক্ষে বসিয়েছিলেন এবং তাঁর ধনুকে আর কোনো তীর অবশিষ্ট ছিল না। তিনি কুচক্রী শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়ে যাচ্ছিলেন , এমন সময়ে তাঁরই কয়েকজন নিকটাত্মীয় তাঁর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল যে , তুমি যুদ্ধ থেকে বিরত হও ; আমরা তোমাকে নিরাপত্তা দান করব। এই কথায় মারক্বা ’ তাদের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। পরিশেষে উমর ইবনে সা’ দ তাঁদেরকে ইবনে যিয়াদের নিকট নিয়ে যায় এবং তাদের ঘটনা ও মারক্বা ’ কে দেয়া তাদের নিরাপত্তা বিষয়ে ইবনে যিয়াদের নিকট তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। ইবনে যিয়াদও মারক্বা ’ কে হত্যা না করে , যুরারা অঞ্চলে নির্বাসিত করে।
ফাতিমা(আ.) এর নিহত সন্তানের উপর ঘোড়া ছুটানো হয়েছে
ইমাম নিহত হলে , উমর ইবনে সা’ দ তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল যে , নিহত ইমামের পবিত্র দেহের উপর ঘোড়া চালাতে আগ্রহীরা যেন এগিয়ে আসে !
সেই সৈন্যদের মাঝ হতে দশজন লোক সামনে এগিয়ে আসলো। তাদের মাঝে আলকামা ইবনে সালামা’ র বংশের‘ ইসহাক ইবনে হায়াত হাযরামী ও আহবাশ ইবনে মুরছেদকে ’ দেখা যাচ্ছিল। বর্ণনাকারী বলেন :“ প্রথমজন ইমামের শরীর হতে পরিধেয় বস্ত্র খুলে নেয়ার ফলে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়। আর ইবনে মুরছেদ সেই ঘটনার অব্যবহিত পরেই কোনো এক যুদ্ধে , অজানা একটি তীর এসে তার বক্ষ ভেদ করে এবং তাকে জাহান্নামে প্রেরণ করে ।”
যা হোক , এই দশজন নিকৃষ্ট ব্যক্তি (আল্লাহ্ ও রাসূলের সামনে লজ্জাবোধ করল না) তাদের নিজ নিজ ঘোড়াগুলিকে হুসাইনের (আ.) মৃতদেহের উপর দিয়ে ছুটালো এবং তাঁর পিঠ ও পাঁজরকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিল !
মদীনায় ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্যে শোক পালনকারীরা
১। উম্মে সালমা
সুনানে তিরমিযী , সিয়ারে আ’ লামিন্ নুবালা , রিয়াযুন্নাযরা , তারীখে ইবনে কাছীর , তারীখুল খামীছ এবং অন্যান্য সূত্রে সালমা’ র বরাত দিয়ে এসেছে :“ একদা আমি উম্মে সালমা’ র খিদমতে উপস্থিত হলাম এবং তাঁকে ক্রন্দনরত দেখলাম। জিজ্ঞেস করলাম , আপনি কেন ক্রন্দন করছেন ? তিনি উত্তর দিলেন , আল্লাহর রাসূলকে (সা.) আমি স্বপ্নে শোকার্ত দেখলাম , তাঁর মাথা ও মুখমণ্ডলে মাটি লেগে ছিল। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম , হে আল্লাহর রাসূল ! আপনার এ কি অবস্থা ? তিনি উত্তরে বললেন , এই কিছুক্ষণ পূর্বেই হুসাইনকে নিহত হতে দেখলাম !” ১১৩
ইয়াকুবী স্বীয় ইতিহাসে লিখেন : ইমাম হুসাইনের (আ.) শোকে মদীনায় সর্বপ্রথম যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তা ছিল রাসূলের স্ত্রী উম্মে সালমা’ র গৃহ হতে। তার কারণ ছিল এই যে , রাসুল‘ উম্মে সালমা’ কে একটি বোতলে কিছু মাটি প্রদান করে বলেন যে , জিব্রাঈল (আ.) আমাকে অবগত করলেন , হুসাইনকে আমার উম্মতের এক দল লোক হত্যা করবে। তারপর তিনি বলেন :“ তুমি যখনই দেখবে যে , এই মাটি টুকু টাট্কা রক্তে রূপান্তরিত হয়েছে তখনই জেনো যে , হুসাইন নিহত হয়েছেন ।”
সেই মাটি টুকু তখন থেকে উম্মে সালমা’ র নিকট ছিল , ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের সময় নিকটবর্তী হলে সেই মহিয়সী নারী সার্বক্ষণিক সেই মাটির দিকে চেয়ে থাকতেন এবং যখন তিনি দেখলেন যে , সেই মাটি টুকু টাট্কা রক্তে রূপান্তরিত হয়ে গেছে তখন তিনি“ ওয়া হুসাইনা ” ও“ ইয়াবনা রাসূলিল্লাহ্ ” বলে চিৎকার করে ক্রন্দন শুরু করলেন। মদীনার নারীরা উম্মে সালমা’ র আর্তনাদ শুনে মদীনার প্রতিটি কোণায় কোণায় শোকের রোল তুললেন এবং এক সময়ে হুসাইনের শোকে মদীনা শহরে এক বিরাট শোরগোল শুরু হল যা ইতিপূর্বে কোনো দিন শুনা যায় নি ।” ১১৪
২। ইবনে আব্বাস
আহমাদ ইবনে হাম্বালের মুসনাদ ও ফাযায়েল গ্রন্থে , ত্বাবরানী ’ র মো ’ জামে কাবীর গ্রন্থে , মুস্তাদরাকে হাকিমে , রিয়াযুন্নাযরা গ্রন্থে এবং অন্যান্য সূত্রে আম্মার ইবনে আবী আম্মারের ভাষ্যে ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত হয়েছে যে , তিনি বলেন“ দিনের মধ্যাহ্নভাগে ঘুমন্ত অবস্থায় আল্লাহর রাসূলকে (সা.) স্বপ্নে দেখলাম। তিনি ধুলা বালি মাখা এবং এলোমেলো চুলসহ খুবই বিমর্ষ অবস্থায় ছিলেন। তাঁর হাতে রক্তে পূর্ণ একটি বোতল ছিল ! তাঁকে সম্বোধন করে আমি বললাম :“ হে আল্লাহর রাসূল , আপনার জন্যে আমার পিতা মাতা উৎসর্গিত হোক ! আপনার হাতে এটি কি ? তিনি বললেন : এটি ইমাম হুসাইন ও তাঁর সঙ্গী সাথিদের রক্ত , এটি আমি আজই উঠিয়েছি ।”
আম্মার বলেন:“ আমি সেই দিবসটিকে (যে দিনটির প্রতি ইবনে আব্বাস ইশারা করেছিলেন) অনুসন্ধান করে দেখলাম , সেই দিবসেই হুসাইন শহীদ হয়েছেন ।” ১১৫
তারীখে ইবনে আসাকির ও ইবনে কাছীরে , জিদ্আনের পৌত্র‘ আলী ইবনে যাইদে ’ র ’ বরাত দিয়ে এসেছে :“ ইবনে আব্বাস ঘুম হতে জেগে উঠেন এবং পুনরায় শুতে গিয়ে বলেন , আল্লাহর শপথ ! হুসাইন নিহত হয়েছেন ! তাঁর একজন সাথি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন : কোথা থেকে তুমি এইরূপ কথা বার্তা বলছ ? তিনি বললেন : স্বপ্নে রাসূলকে রক্তে পূর্ণ একটি বোতলসহ দেখলাম। তিনি আমাকে বললেন : তুমি জান , আমার উম্মতরা আমার পরে কি করেছে ?! তারা হুসাইনকে হত্যা করেছে এবং এই হচ্ছে তাঁর ও তাঁর সঙ্গী সাথিদের রক্ত , আল্লাহর নিকট নিয়ে যাচ্ছি !”
তারা সেই দিন ও সেই সময়কে লিখে রাখেন। চব্বিশ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর মদীনায় সংবাদ আসে যে , সেই দিন ও সেই সময়ই হুসাইন (আ.) নিহত হয়েছেন।১১৬
৩। অপর অপরিচিত ব্যক্তি
তাবারী ও অন্যান্যরা আমর ইবনে ইকরামা’ র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন : যেই দিন হুসাইন নিহত হন সেই দিনই সকালে আমাদের জনৈক মাওয়ালী (দাস) মদীনায় সংবাদ দিলেন যে ,সে গতকাল কোনো এক ব্যক্তির চিৎকার শুনেছেন ; তিনি হুসাইনের শোকে এই কবিতা পাঠ করছিলেন :
“ আয়্যুহাল্ ক্বাতিলূনা জাহলান্ হুসাইনা উব্শিরূ বিল্’ আযাবি ওয়াত্তানকীলি ;
কুল্লু আহলিস্ সামায়ি ইয়াদ্’ ঊ’ আলাইকুম্ মিন্ নাবিয়্যিন্ ওয়া মালায়িকিন্ ওয়া ক্বাবীলি ;
ক্বাদ্ লু’ ইন্তুম্’ আলা লিসানি ইবনি দাঊদা ওয়া মূসা ওয়া হামিলিল্ ইঞ্জীলি ।”
অর্থাৎ হে সেই লোকেরা , যারা হুসাইনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করেছো , শাস্তি ও শিক্ষণীয় কানমলা খাওয়ার অপেক্ষা কর। নবী , ফেরেশ্তা ও অন্যান্যরা সহ আসমানের সমস্ত অধিবাসী তোমাদের উপর অভিসম্পাত বর্ষণ করছেন। তোমরা হযরত সুলায়মান , মূসা ও ঈসা কর্তৃক অভিশপ্ত।
এই পংক্তিগুলি , কিছুটা মতভেদ সহ উম্মে সালমা এবং অন্যান্যদের নিকট থেকেও বর্ণিত হয়েছে। তাঁরা একজন অদৃশ্য লোকের মুখ থেকে সেই পংক্তিগুলি শুনেছেন কিন্তু তাঁকে স্বয়ং দেখেন নি। তিনি হুসাইনের মৃত্যুতে এই কবিতাটি পাঠ করছিলেন ।” ১১৭
কুফায় মুহাম্মদের (সা.) বংশের বন্দিগণ
ইমাম হুসাইনের (আ.) বাহাত্তর জন সঙ্গী শহীদ হন এবং তাঁদের শাহাদতের একদিন পর , ইমাম ও তাঁর সাথিদের পবিত্র মৃতদেহগুলি , গাযেরিয়ার অধিবাসী বনী আসাদ গোত্রের লোকদের দ্বারা সমাহিত হয়।
যে দিন ইমাম (আ.) নিহত হন সেই দিনই তাঁর পবিত্র মাথাটিকে খাওলা ইবনে ইয়াযীদ এবং হামিদ ইবনে মুসলিম আযদীর সাথে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের জন্যে কুফাতে প্রেরণ করা হয়। খাওলা কুফাতে প্রবেশের পর‘ দারুল ইমারাত ’ প্রাসাদে (গভর্ণরের বাসভবন) রওনা করে কিন্তু দরজা বন্ধ দেখে সরাসরি তার নিজের বাড়ীতে যায় এবং পবিত্র মাথাটিকে তার বাড়ীতে একটি বড় পাত্রের মধ্যে লুকিয়ে রাখে।
অতি প্রত্যুষে খাওলা সেই মাথাটিকে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের নিকট নিয়ে যায়। উমর ইবনে সা’ দ সেই দিন এবং পরের দিন বিলম্ব করে। অতঃপর হামিদ ইবনে বুকাইর আহমারীকে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্যে ঘণ্টাধ্বনি বাজাতে আদেশ দেয়। কুফার সৈন্যরা কুফার উদ্দেশ্যে রওনা করে। এই যাত্রায় ইমাম হুসাইনের (আ.) কন্যাগণ , ভগ্নীগণ , তাঁর শিশুরা এবং অত্যন্ত অসুস্থ আলী ইবনিল হুসাইনকে (আ.) তাদের সাথে নিয়ে যায়।১১৮
ছৌল কুররাহ ইবনে কায়িস তামীমী ’ র উদ্ধৃতি দিয়ে তাবারী বলেন :“ যখন হুসাইন , তাঁর আত্মীয় স্বজন ও তাঁর সন্তান সন্ততির রক্তে ভেজা লাশগুলির পাশ দিয়ে হুসাইনের পরিবারের নারীদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন আমি স্বয়ং দেখেছি , তাঁরা বিলাপ ও আহাজারী করছিলেন এবং মাথা ও মুখমণ্ডলে চাপড়াচ্ছিলেন ।”
কায়িসের ছেলে বলেন :“ আমার স্মৃতি হতে যেসব বিষয় মুছে যাবে না , তার মধ্যে একটি হচ্ছে ফাতিমার কন্যা যয়নবের কথাগুলি ! তিনি তাঁর নিহত ভাই হুসাইনের পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে বলছিলেন :
“ ইয়া মুহাম্মাদাহ্ ! ইয়া মুহাম্মাদাহ্ ! সাল্লা ’ আলাইকা মালাইকাতুস্ সামায়ি , হাযা হুসাইনুন্ বিল্ আ’ রা য়ি !! মারমালুন্ বিদ্দিমা য়ি মাক্বত্বাউ ’ আল্ আ’ যা য়ি , ইয়া মুহাম্মাদাহ্ ! ওয়া বানাতুকা সাবায়া ওয়া যুররিয়্যাতুকা মুক্বাত্তালাতান্ তাসফী ’ আলাইহাস্ সাবা ।”
কুররাহ বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! যয়নব তাঁর এই বক্তব্যগুলি দ্বারা তাঁর সমস্ত বন্ধু ও শত্রুকে কাঁদিয়ে ছিলেন ।”
তাবারী বলেন :অপর বাহাত্তর জন শহীদের বিচ্ছিন্ন মাথাগুলিকে শিমার ইবনে যিল জাওশান , কায়িস ইবনে আশ্আছ , আমর ইবনে হাজ্জাজ এবং উযরাহ্ ইবনে কায়িসের মাধ্যমে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের নিকট প্রেরণ করা হয়।১১৯
ফুতূহে ইবনে আ’ ছিম , মাকতালে খাওয়ারেযমী এবং অন্যান্য গ্রন্থে এসেছে :“ উমর ইবনে সা’ দের সৈন্যরা রাসূলের পরিবারকে (তাঁর সন্তান সন্ততি) কারবালা হতে বন্দী হিসেবে বেঁধে কুফার অভিমুখে হাঁকিয়ে নিয়ে যায়। বন্দিদের কাফেলা যখন কুফায় উপস্থিত হয় তখন কুফার লোকেরা সে দৃশ্য দেখার জন্যে বেরিয়ে আসে এবং তাঁদের অবস্থা দেখে করুণাসিক্ত হয় ও প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তারা চিৎকার করে কান্না ও বিলাপ করে।
আলী ইবনিল হুসাইন কঠিন অসুস্থ ছিলেন এবং শক্ত জিঞ্জির ও শিকল দ্বারা বাঁধা ছিলেন আর অসুস্থতা তাঁকে এমন অবস্থায় উপনীত করেছিল যে , তাঁর জীবনের শেষ নিশ্বাস ব্যতীত অন্য কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তিনি কুফাবাসীদের এরূপ অস্থিরতা ও কান্না দেখে বলেন :“ এরা যে আমাদের বিপদে এরূপ ক্রন্দন ও আর্তনাদ করছে তাহলে আমাদের হত্যাকারী কারা ?!”
কুফার অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে হযরত যয়নবের (আ.) বক্তব্য
ইবনে আ’ ছাম তার ইতিহাস গ্রন্থে বশীর ইবনে হাযীম আসাদী ’ র উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন : যয়নবকে (আলীর কন্যা) সেইদিন প্রথম দেখেছিলাম , তাঁর পূর্বে তাঁর মত বাগ্মী অন্য কোনো পর্দানশীন নারীকে দেখিনি। মনে হচ্ছিল , তিনি যেন আমীরুল মু’ মিনীন আলী ইবনে আবী তালিবের ভাষায় কথা বলছিলেন এবং ইমামের বাণীগুলিই যেন তাঁর মুখ থেকে উৎসারিত হচ্ছিল।
সূচনায় তিনি স্বয়ং লোকজনকে চুপ করতে আদেশ দেন। তাঁর ইশারার সাথে সাথে লোকজন নীরব হয়ে যায় এবং চতুষ্পদ জন্তুগুলির ঘণ্টাধ্বনিও থেমে যায়। অতঃপর তিনি বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন :
“ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। অতঃপর আমার পিতা মুহাম্মদ , আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর পবিত্র ও মনোনীত বংশধরগণের উপর দরুদ প্রেরণ করছি। অতঃপর হে কুফার লোক সকল ! হে প্রতারক , ধোকাবাজ ও বিশ্বাসঘাতক জনতা ! তোমরা এখন ক্রন্দন করছ ?! তোমাদের চক্ষুগুলো কখনই যেন কান্না হতে বিরত না হয়! তোমাদের অশ্রুধারা যেন না শুকায় এবং তোমাদের বিলাপ ও আর্তনাদ যেন শান্ত না হয়! তোমরা ঠিক সেই নারীর ন্যায় , যে সুদৃঢ় করার পর নিজ হাতে তা বিচ্ছিন্ন করে! তোমরা ঠিক তাদের ন্যায় যারা নিজ শপথ ও প্রতিশ্রুতিগুলিকে প্রতারণা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উপাদানে পরিণত করেছে! লোকেরা তোমাদের নিকট হতে দম্ভোক্তি , আত্মপ্রশংসা , প্রতারণা ও শত্রুতা ব্যতীত আর কি আশা করতে পারে ? তোমরা ক্রীতদাসীদের ন্যায় তোষামোদ কর এবং শত্রুদের ন্যায় প্রতারণার দিকে ধাবিত হও। তোমরা কোনো নালার ধারে গজিয়ে উঠা আগাছা স্বরূপ , অথবা কোনো চুনামাটির অংশ যা দ্বারা কোনো কবরকে পূরণ করা হয়। তবে জেনে রেখ যে , স্বীয় ভবিষ্যতের জন্য কিরূপ মন্দ উপঢৌকন আল্লাহর সমীপে প্রেরণ করেছ আর তা হচ্ছে মহান আল্লাহর ক্রোধ ও চিরস্থায়ী পাকড়াও।
এখন ক্রন্দন ও শোক প্রকাশ করছো ?! হ্যাঁ ,আল্লাহর শপথ , বেশী কাঁদো ও অল্প হাঁসো ; কারণ নিজেদের জন্যে এমন লজ্জা ও অপমানকে প্রস্তুত করেছো যে , তা কোনো দিন মুছে যাবার নয়। আর কিভাবে নিজেদের সত্তাকে শেষ নবীর সন্তান হত্যার অপবিত্রতা হতে পবিত্র করবে ! কারণ তিনি ছিলেন বেহেশ্তি যুবকদের নেতা , পবিত্র লোকদের আশ্রয়দাতা ,তোমাদের বিপদের আশ্রয়স্থল , তোমাদের জন্য উজ্জ্বলতম দলীল ও সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং তোমাদের কণ্ঠের ভাষা ! মাথায় কি ধরনের অপরিপক্ক ধারণা লালন করছ ! তোমাদের উপর মৃত্যু ও ধ্বংস নেমে আসুক ! তোমাদের আকাঙ্খাগুলি নিরাশায় পরিণত হয়েছে এবং তোমাদের প্রচেষ্টাগুলি তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছেনি! তোমাদের হাতগুলি মুণ্ডিত হয়েছে এবং তোমাদের প্রতি শ্রুতিগুলি তোমাদের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তোমরা আল্লাহর ক্রোধ ও গজবের রোষানলে পতিত হয়েছো এবং তোমাদের উপর লজ্জা ও চরম দুরবস্থা ধার্য হয়েছে। হে কুফার জনতা ! তোমাদের ধ্বংস হোক !! তোমরা কি জান যে , আল্লাহর রাসূলের কোন কলিজাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করেছো , তাঁর কোন রক্ত ঝরিয়েছো , তাঁর কোন আবৃত সত্তার আবরণ অন্যায়ভাবে হরণ করেছো এবং কোন ধরনের মর্যাদার পর্দা উন্মোচন করেছো ?!
এমন এক আশ্চর্য ও বড় কর্মে (অপরাধে) লিপ্ত হয়েছো যে ,তার আতঙ্কে আসমানসমূহ ফেটে যাওয়ার উপক্রম , জমিন তার মুখ খুলে দেয়ার উপক্রম এবং পর্বতমালা বিধ্বস্ত হওয়ার উপক্রম ! এমন এক কাজ করেছো যে , তা এতটা কঠিন ও বড় , বন্ধুর , জটিল ও মন্দ যে জমিন ও সমস্ত আসমানের বিশালতার অনুরূপ ! তোমরা কি হতবাক হবে যদি এই বিপদের কারণে আসমানসমূহ রক্ত বর্ষণ করে ? নিশ্চিত যে , তোমাদের আজাবের অপর স্থানটি হবে যথেষ্ট লজ্জাকর এবং কঠিনতর , আর তোমাদের আর্তনাদে কেউ সাড়া দিবে না !
অতএব , যে সুযোগ পেয়েছো তাতে এত অধিক আনন্দিত ও অসচেতন হয়ো না ! কারণ , এই বিষয়ে মহান আল্লাহর কোনো তাড়া নেই এবং প্রতিশোধ গ্রহণের সময়কাল বিলম্বিত হওয়াতে তিনি ভয় পান না। হ্যাঁ , কখনও এইরূপ নয় এবং তোমাদের আল্লাহ্ তোমাদের (শাস্তি দানের) জন্য ওঁৎ পেতে আছেন ।”
বশীর বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! আমি সেইদিন লোকজনকে চরম দুর্দশাগ্রস্ত ও দিশাহারা এবং নেশাগ্রস্তদের ন্যায় উদ্দেশ্য ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় দেখেছি। তারা ক্রন্দন করছিল , গভীরভাবে চিন্তামগ্ন ছিল , অনিচ্ছায় চিৎকার করছিল , অতীত ক্রিয়াকলাপের জন্য আক্ষেপ ও অনুতাপ করছিল এবং অনুতাপে আঙ্গুল কামড়াচ্ছিল। কুফার একজন বৃদ্ধ লোককে আমার পাশে দাঁড়িয়ে এমন করুণভাবে কাঁদতে দেখলাম যে তার চোখের পানিতে তার দাড়িগুলি ভিজে গিয়েছিল এবং সে বলছিল :
“ আমার পিতা মাতা আপনার জন্যে উৎসর্গ হোক ! আপনি সত্য বলেছেন। আপনাদের বৃদ্ধ ব্যক্তিগণ সর্বোত্তম বৃদ্ধ , আপনাদের যুবকগণ সর্বোত্তম যুবক , আপনাদের নারিগণ সর্বোত্তম নারী এবং আপনাদের বংশ সর্বোত্তম বংশ ; অপমান ও পরাজয় আপনাদের কখনও স্পর্শ করতে পারে না ।”
ফাতিমা সুগরার বক্তব্য
মুছীরুল আহযান এবং লুহুফে এসেছে যে , ফাতিমা সুগরা (ইমাম হুসাইনের কন্যা)ও বক্তব্য রাখেন এবং বলেন : সমগ্র বালুকারাশি , কাঁকর এবং আসমান ও জমিনের ওজনের সমপরিমাণ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি , তাঁর প্রতি গভীর বিশ্বাস রাখি এবং তাঁর উপর পূর্ণ আস্থা নিয়ে ঘোষণা করছি যে , আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও প্রেরিত পুরুষ। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে , এই রাসূলেরই সন্তানকে ফোরাত নদীর ধারে , কোনো অন্যায় ও অপরাধ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে , অথচ তিনি কাউকে হত্যাও করেন নি কিংবা‘ কিসাস ’ হিসেবেও তাঁকে হত্যা করা হয় নি !
হে আল্লাহ্ ! তোমার প্রতি কোনরূপ মিথ্যা আরোপ করা হতে অথবা তোমার রাসূলকে যে আদেশ দিয়েছিলে তার বিপরীতে স্বরচিত কোনো কিছু বলা হতে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এই মর্মে আদেশ দিয়েছিলেন যে , তিনি যেন স্বীয় প্রতিনিধি ও স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি আলী ইবনে আবী তালিবের জন্যে জনগণের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন । তিনি সেই ওয়াসী যাঁকে আল্লাহর অন্যতম‘ মসজিদে ’ এবং মুসলমান নামধারীদের সামনে হত্যা করা হয়েছে । যেরূপভাবে গতকাল তাঁর সন্তানকে শহীদ করা হয়েছে। তাদের উপর ধ্বংস নেমে আসুক ! যারা তাঁর জীবিত থাকা অবধি তাঁর থেকে কোনো অন্যায়কে দূর করেনি এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর হতে কোনো অত্যাচারকে প্রতিরোধ করে নি। যদ্দপি না তুমি (আল্লাহ) সে সুখ্যাতি , প্রশংসিত অভ্যাস , পরিচ্ছন্ন মেজাজ এবং উত্তম নীতিমালা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে নিজের পানে আহ্বান করলে। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি তোমার পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দাবাদের ব্যাপারে ভীত ছিলেন না। পৃথিবী হতে বিমুখ ছিলেন এবং তোমার পথে প্রচেষ্টাকারী ও মুজাহিদ ছিলেন। এটিই হেতু ছিল ,যার জন্যে তুমি তাঁকে তোমার সরলপথের প্রতি পথ প্রদর্শন করেছো।
অতঃপর , হে কুফার লোকেরা ! হে ধোকাবাজ , প্রতারক ও স্বেচ্ছাচারী লোকেরা ! আমরা এমন এক পরিবার যে , মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে তোমাদের জন্যে এবং তোমাদেরকে আমাদের জন্যে পরীক্ষার উপকরণ বানালেন। আমরা এই পরীক্ষা হতে পবিত্র ও সম্মানের সাথে বেরিয়ে এসেছি , আমাদের পরীক্ষাকে তিনি উত্তমরূপে গ্রহণ করেছেন , তাঁর জ্ঞানকে আমাদের মাঝে তিনি আমানত হিসেবে দিয়েছেন এবং তিনি আমাদের তা বুঝার ক্ষমতা দান করেছেন। এই কারণেই আমরা তাঁর জ্ঞানের ধনাগার। তিনি নিজ মহানুভবতায় আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সা.) মাধ্যমে আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে সমস্ত সৃষ্টির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন।
কিন্তু তোমরা আমাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলে , আমাদেরকে হত্যা করা বৈধ মনে করলে এবং আমাদের ধন সম্পত্তিকে লুণ্ঠন করা বৈধ গণ্য করলে। ঠিক যেন আমরা বিধর্মী তুর্কীদের সন্তান এবং কাবুলের বন্দী। তোমরা আমাদের যে রক্ত ঝরিয়েছো এবং আমাদের ধন সম্পত্তি লুণ্ঠনে যে হাত প্রসারিত করেছো তার মাধ্যমে নিজেকে আনন্দ ও খুশির শুভ সংবাদ দিওনা । কারণ আল্লাহর আজাব তোমাদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে , তার ক্রোধ অবতীর্ণ হয়েছে এবং অত্যাচারীদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত ও লানত !
হে কুফার অধিবাসীরা , তোমাদের মৃত্যু হোক ! আল্লাহর রাসূলের (সা.) নিকট তোমাদের কি পাওনা ছিল অথবা তাঁর নিকট কোন রক্তপণ কামনা করছ যে , নিজেদের ঘৃণা ও ঈর্ষাকে তাঁর ভাই আলী ইবনে আবী তালিব , আমার দাদা এবং তাঁর পরিবারের মাথার উপর উজাড় করলে এবং তোমাদের কবিরা তাদের বীরত্বগাঁথা এইভাবে গেয়েছে :
“ আমরা আলী ও তাঁর সন্তান সন্ততিকে নিজ ধারাল তলোয়ার এবং বর্শার ফলক দ্বারা হত্যা করেছি !!
তাঁদের নারীদেরকে বিধর্মী তুর্কী নারীদের ন্যায় বন্দী করেছি এবং কত সুন্দরভাবে তাঁদের সাথে যুদ্ধ করেছি ও মুখোমুখি হয়েছি !!”
হে মিথ্যা রচয়িতা , তোমার মুখে ছাই পড়ুক ! তুমি এমন ধরনের লোককে হত্যা করা বৈধ জ্ঞান করেছো যে , মহান আল্লাহ্ নিজ কিতাবে তাঁদেরকে পাক ও পবিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং যে কোনো রকমের কলুষতা ও অপবিত্রতাকে তাঁদের থেকে দূর করেছেন ! অতএব , তোমার নিজের রাগে তুমি মর এবং তোমার পিতার ন্যায় তুমিও কুকুর সদৃশ মাটিতে তোমার ঠোঁট ঘর্ষণ কর ! কেননা , যেমন কর্ম তেমন ফল। যে সম্মান মহান আল্লাহ্ আমাদের জন্যে নির্ধারিত করেছেন , তার জন্যে তোমরা হিংসা করলে ! এইটি আল্লাহর করুণা যে , তিনি যাকে চাইবেন তাকে তা দান করবেন।“ ওয়া মান্ লাম্ ইয়াজ্ ’ আলিল্লাহু লাহু নূরান্ ফামা লাহু মিন্ নূর ”“ আর যাকে আল্লাহ্ নূর (জ্যোতি) দেন নি তার কোনো নূর রইবে না ।”
এই কথাগুলো শুনে লোকেরা তীব্রভাবে আর্তনাদ করে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে এবং বলে :“ যথেষ্ট হয়েছে হে পবিত্র ব্যক্তিগণের কন্যা , আপনি আমাদের অন্তরসমূহে আগুন জ্বালিয়েছেন এবং আপনার বক্তব্য মাধ্যমে আমাদের পা হতে মাথা পর্যন্ত পুড়িয়ে দিয়েছেন ।” তাদের এই কথাগুলি শুনে তিনিও নীরব হয়ে যান।
উম্মে কুলছুমের বক্তব্য
বর্ণনাকারী বলেন : আমীরুল মু’ মিনীন আলীর (আ.) কন্যা উম্মে কুলছুম , যখন বক্তব্য রাখতে উঠেন তখন তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল এবং তীব্রভাবে ক্রন্দন করছিলেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন :“ হে কুফার জনতা ! তোমাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত থেকো , তোমরা কি করেছো ?! হুসাইনের সাথে খিয়ানত করেছো , তাঁকে নিঃসঙ্গভাবে ত্যাগ করেছো , তাঁকে হত্যা করেছো , যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন করেছো এবং তাঁর পরিবারের নারীদেরকে বন্দিনী করেছো !! তোমাদের মুনাফার লয় হোক এবং তোমাদের মৃত্যু ঘটুক ! কিছু জান কি , নিজেদের মাথার উপর কি বিপদই না এনেছো এবং কত বড় অপরাধে জড়িয়েছো ? কি পরিমাণ রক্ত ঝরিয়েছো , কি মারাত্মক কাজে হাত দিয়েছো এবং কোন্ ধন সম্পত্তিকে লুণ্ঠন করেছো ? আল্লাহর রাসূলের (সা.) পর সর্বোত্তম ব্যক্তিকে হত্যা করেছো , এই অবস্থা সত্ত্বেও আল্লাহর দল বিজয়ী রয়েছে এবং শয়তানের দল পরাজিত ও ক্ষতিগ্রস্ত। তারপর এই কবিতাটি পাঠ করেন :
“ ক্বাতালতুম্ আখী সাবরান্ ফাওয়াইলুন্ লিউম্মিকুম , সাতুজযাওনা নারান্ হাররুহা ইয়াতাওয়াক্কাদু ।
সাফাকতুম্ দামান্ হাররামাল্লাহু সাফাকাহা , ওয়া হাররামাহা আল্ কুরআনু ছুম্মা মুহাম্মাদু ।
আলা ফাব্শিরূ বিন্নারি ইন্নাকুম্ গাদা , লাফী সাক্বারিন্ হাক্কান্ ইয়াক্বীনান্ তুখাল্লাদূ ।
ওয়া ইন্নী লাআব্কী ফী হায়াতী’ আলা আখী ,‘ আলা খাইরিম্ মাম্ বা’ দিন্নাবিয়্যী সাইউলাদু ।
বিদাম্’ য়িন্ গাযীরিন্ মুস্তাহাল্লিন্ মুকাফ্কাফি ,‘ আলাল্ খাদ্দি মিন্নী যায়িবান্ লাইসা ইয়াজমুদু ।”
অর্থাৎ আমার নির্যাতিত ভাইকে কঠিনতম দুরবস্থায় হত্যা করেছো। তোমাদের উপর ধ্বংস নেমে আসুক , শীঘ্রই তোমরা অগ্নিদগ্ধ হবে এবং তা কঠিন দগ্ধকারী। এমন এক রক্ত ঝরিয়েছো যা , আল্লাহ্ নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং কুরআন ও মুহাম্মদ (সা.) স্বয়ং তাকে সম্মানিত জ্ঞান করেছেন। অতএব , অবগত থেকো এবং তোমাদের প্রতি দোযখের আগুনের সুসংবাদ , সে আগুন নিঃসন্দেহে আগামী দিন এবং সদাসর্বদার জন্যে জাহান্নামে তোমাদেরকে পাকড়াও করবে। আমিও জীবনব্যাপী আমার ভ্রাতার জন্যে ক্রন্দন করব ; এমন সর্বোত্তম ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন করব যিনি আল্লাহর রাসূলের (সা.) পর পৃথিবীতে এসেছিলেন। বিরতিহীন অশ্রু যা প্লাবনের ন্যায় আমার চক্ষুদ্বয় হতে আমার গণ্ডদেশে প্রবাহিত , তা কোনো দিনই শেষ হবে না !” এ বক্তব্য শুনে লোকজন আর্তনাদ শুরু করে এবং শেকের বিলাপ ও কান্নার রোল ধ্বনিত হল ।” ১২০
ইবনে যিয়াদের সম্মুখে আল্লাহর মনোনীত বংশধর
তাবারী স্বীয় সূত্রে হামিদ ইবনে মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন :“ উমর ইবনে সা’ দ আমাকে কাছে ডাকে তার পরিবারের নিকট তার বিজয়ের সুসংবাদ ও সুস্থ থাকার খবর পৌঁছাতে আদেশ দেয়। আমি কুফায় প্রবেশ করি এবং নিজ দায়িত্ব পালন করি। অতঃপর অবস্থা দেখার জন্যে ইবনে যিয়াদের প্রাসাদে গমন করি। কারণ , বন্দীগণকে সেইখানে নিয়ে যাবার কথা ছিল এবং সমস্ত লোকজন সেইখানে সমবেত হয়েছিল।
গভর্ণরের প্রাসাদে প্রবেশের পর যিয়াদের পুত্র ইমাম হুসাইনের (আ.) মাথাটিকে তার সম্মুখে রেখে চিন্তায় নিমগ্ন এবং হাতের লাঠি দ্বারা তাঁর (আ.) ঠোঁট ও সম্মুখের দাঁতগুলিতে আঘাত করছে। কিছু সময় ধরে সে এই কাজটি অব্যাহত রাখল। যায়িদ ইবনে আরকাম সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন এবং ঘটনাটি দেখছিলেন। তিনি তার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন :
‘ তোমার হাতের লাঠিটি এই ঠোঁট ও দাঁতসমূহ থেকে সরিয়ে নাও , আল্লাহর কসম ! আমি একাধিকবার আল্লাহর রাসূলকে (সা.) এই ঠোঁট ও দাঁতগুলিতে চুম্বন করতে দেখেছি। ’
অতঃপর তাঁর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রুর বন্যা প্রবাহিত হয় এবং তীব্রভাবে ও উচ্চৈঃস্বরে ক্রন্দন করেন। ইবনে যিয়াদ তাঁকে বলে :‘ মহান আল্লাহ্ তোমার চক্ষুগুলিকে যেন সবসময় কান্নারত রাখেন। আল্লাহর কসম ! তুমি যদি অচল , নির্বোধ ও বুদ্ধিহীন বৃদ্ধ মানুষ না হতে তবে তোমার গর্দানকে উড়িয়ে দিতাম !’ ইবনে যিয়াদের এইরূপ বক্তব্য শুনে যায়িদ ইবনে আরকাম উঠে দাঁড়ান এবং সভা ত্যাগ করেন ।”
বর্ণনাকারী বলেন :“ যখন যায়িদ ইবনে আরকাম বের হলেন তখন লোকেরা বলল : আল্লাহর কসম ! যায়িদ বের হবার সময় এমন একটি কথা বলেছেন যে , যদি তা ইবনে যিয়াদের কানে পৌঁছত তবে নিঃসন্দেহে তাঁকে হত্যা করত ।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম:“ তাহলে যায়িদ এমন কি বলেছেন ?” তারা বলল :“ যায়িদ ইবনে আরকাম যখন আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন তখন বলছিলেন , এক দাস অপরের বান্দাকে দাসে পরিণত করেছে যেন মনে করেছে সমস্ত মানুষ তার দাস ! হে আরবের লোকেরা ! এরপর হতে তোমরা মূল্যহীন দাসের অধিক বিবেচিত হবে না! ফাতিমার সন্তানকে হত্যা করলে এবং মারজানার সন্তানকে নিজেদের উপর শাসক বানালে যেন সে তোমাদের নির্বাচিত ব্যক্তিগণকে হত্যা করে এবং তোমাদের বিনয়ী ব্যক্তিদেরকে নিজেদের দাসে পরিণত করে! তোমরা এইরূপ নীচতা ও লজ্জাকে মেনে নিয়েছো ; নীচ ও সম্মানের অযোগ্য ব্যক্তিদের উপর মৃত্যু নেমে আসুক !”
বর্ণনাকারী বলেন :“ যখন ইমাম হুসাইনের (আ.) মাথাটিকে তাঁর সন্তান , ভগ্নী ও অন্যান্য নারিগণের সাথে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের নিকট নিয়ে যাওয়া হল তখন ফাতিমার (আ.) কন্যা যয়নব তাঁর সর্বাধিক মূল্যহীন জামাটি পরিধান করলেন যাতে তাঁকে চিনা না যায় , আর তাঁর দাসীগণ তাঁকে বেষ্টন করল। তিনি রাজ প্রাসাদে প্রবেশের পর একটি কোণায় বসলেন। উবাইদুল্লাহ্ তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করল:‘ তুমি এমন কে যে , আমার আদেশ ছাড়াই বসে গেলে ?’ যয়নব কোনোরূপ উত্তর দিলেন না। উবাইদুল্লাহ্ তিনবার তার প্রশ্নটি পুনরাবৃত্তি করলে তাঁর জনৈকা দাসী বললেন :“ ইনি ফাতিমার কন্যা যয়নব !” উবাইদুল্লাহ্ এই উত্তর শুনে তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল :‘ সেই আল্লাহর প্রশংসা , যিনি তোমাদেরকে অপমানিত করেছেন , তোমাদেরকে ধ্বংস করেছেন এবং তোমাদের দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছেন ।”
যয়নব (আ.) বললেন :“ কৃতজ্ঞতা সেই আল্লাহর , যিনি আমাদেরকে তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মদের (সা.) মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন। যে কোনো প্রকারের অপবিত্রতা হতে সর্বোত্তম অবয়বে পাক ও পবিত্র করেছেন এবং তুমি যা বললে সেই রূপ নয়। বরং পাপাচারীরাই অপমানিত হবে এবং চরিত্রহীন ও অন্যায়কারীরাই মিথ্যা বলে ।” উবাইদুল্লাহ্ বলল:‘ তোমার পরিবারের সাথে আল্লাহর ক্রিয়াকলাপকে কিরূপ দেখলে ?’ তিনি বললেন:“ মহান আল্লাহ্ শাহাদতকে তাঁদের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন এবং তাঁরাও গর্বিতভাবে নিজ আত্মোৎসর্গের ভূমিতে পা রেখেছেন। খুব শীঘ্রই মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে একে অপরের সামনে দণ্ডায়মান করবেন , যেন তাঁর নিকটে ন্যায়বিচার প্রার্থনা এবং দলীল প্রমাণ উপস্থাপন কর ।”
বর্ণনাকারী বলেন : এতে উবাইদুল্লাহ্ চরমভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে অশ্লীল অশ্রাব্য ভাষা প্রয়োগ করতে শুরু করলে আমর ইবনে হারিছ তাকে বলল :‘ মহান আল্লাহ্ আমীরকে দীর্ঘজীবি করুন ! তিনি হলেন নারী , নারিদের কথার প্রতি পুরুষদের কোনোরূপ গুরুত্ব দেয়া উচিত নয়। তাঁদেরকে বক্তব্যের মাঝে নিন্দা ও তিরস্কার করাও ঠিক নয়। ’ ইবনে যিয়াদ যয়নবের প্রতি দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল‘ মহান আল্লাহ্ , আমার ভিতরের অস্বস্তি ও অন্তরদাহকে তোমার পরিবারের একগুঁয়ে মহান ব্যক্তিগণের হত্যার দ্বারা শান্তি ও পরিত্রাণ দিয়েছেন !”
যয়নব তার কথায় প্রচণ্ড ক্রন্দন করতে করতে বললেন :“ হ্যাঁ , আমার প্রাণের কসম , আমার নেতাকে হত্যা করেছো , আমার পরিবারের মূলোৎপাটন করেছ , আমার জীবনের ডালপালাগুলিকে কেটে দিয়েছো এবং আমার শিকড়কে উপড়িয়ে ফেলেছো। যা করেছো , তা যদি তোমার প্রশান্তির কারণ হয় তবে নিঃসন্দেহে সেই প্রশান্তিকে স্মৃতিতে ধরে রেখ !”
ইবনে যিয়াদ যয়নবকে ইশারা করে বলল‘ ছন্দ ও ঝঙ্কারপূর্ণ কথা বলছ ।” অতঃপর , তাঁকে সম্বোধন করে , এরূপ বলে :“ আমার নিজ জীবনের শপথ ! তোমার পিতাও কবি ছিলেন এবং ছান্দিকরূপে কথাবার্তা বলতেন ।”
যয়নব উত্তর দিলেন :“ ছন্দ ও ঝঙ্কারের সাথে নারিদের কি সম্পর্ক ? আমি এইরূপ অবস্থায় ঝঙ্কার ও অন্তঃমিল দিয়ে কথা বলছি না বরং যা কিছু বললাম তা আমার বুকের ভিতরের জ্বালা ছিল ।”
হামিদ ইবনে মুসলিমের উদ্ধৃতি দিয়ে তাবারী বলেন :“ আমি ইবনে যিয়াদের নিকট দাঁড়িয়ে ছিলাম , এমন সময়ে আলী ইবনে হুসাইনকে (আ.) তার সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। যিয়াদ তাঁকে জিজ্ঞাসা করল :‘ তোমার নাম কি ?’ ইমাম সাজ্জাদ বললেন :‘ আমি হুসাইনের পুত্র আলী। ’ ইবনে যিয়াদ বলল :‘ তাহলে কি হুসাইনের পুত্র আলীকে মহান আল্লাহ্ হত্যা করেন নি ?!’ ইমাম নীরব থাকলেন। ইবনে যিয়াদ পুনরায় বলল :‘ কেন কথা বলছ না ?’ ইমাম বললেন :‘ আমার একজন ভাই ছিলেন , তাঁরও নাম ছিল আলী এবং লোকেরা তাঁকে হত্যা করেছে ।”
ইবনে যিয়াদ বলল :‘ মহান আল্লাহ্ তাকে হত্যা করেছেন !’ ইমাম নীরব রইলেন। ইবনে যিয়াদ পুনরায় জিজ্ঞাসা করল :‘ কেন কথা বলছ না ?’ তিনি উত্তর দিলেন :‘ মহান আল্লাহ্ , মৃত্যুর সময় আত্মাগুলিকে গ্রহণ করেন এবং মহান আল্লাহর আদেশ ব্যতীত কেউই মারা যান না। ’ ইবনে যিয়াদ এই উত্তর শুনে রেগে চিৎকার করে বলে :‘ মহান আল্লাহর শপথ ! তুমিও তাদের অন্তর্ভুক্ত। ’ অতঃপর চিৎকার করে বলে : তাকে নিয়ে গিয়ে গর্দান উড়িয়ে দাও !’ ইমাম জিজ্ঞেস করলেন :‘ তখন এই নারিগণের দেখাশুনা কে করবে ?’
ইবনে যিয়াদের এই কথা শুনে যয়নব (আ) তাঁর ভ্রাতুস্পুত্র আলী ইবনে হুসাইনের সম্মুখে দাঁড়ান এবং বলেন :“ হে যিয়াদের পুত্র ! আমাদের জীবনের উপর হতে হাত উঠিয়ে নাও , আমাদের যতটা রক্ত ঝরিয়েছো তাই যথেষ্ট ; তুমি কি আমাদের কাউকে অবশিষ্ট রেখেছো ?” তারপর তিনি তাঁর ভ্রাতুস্পুত্রের কাঁধে হাত রাখেন এবং বলেন :“ যদি তোমার ঈমান থাকে তাহলে তোমাকে আল্লাহর কসম দিচ্ছি যে , তুমি যদি তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হও তবে তাঁর সাথে আমাকেও হত্যা কর !” হুসাইনের (আ.) পুত্র আলীও চিৎকার করে বলেন :“ হে যিয়াদের পুত্র ! এদের সাথে যদি তোমার আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে তবে একজন চরিত্রবান পুরুষকে এদের সাথি কর , যিনি ইসলামের আইন অনুসারে এদের সঙ্গী হবেন ।”
বর্ণনাকারী বলেন :“ যিয়াদের পুত্র কিছু সময় ধরে হযরত যয়নবকে কথার মাধ্যমে ক্ষত বিক্ষত করে , অতঃপর জনগণের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে বলে :‘ রক্তের টান দেখে আমি আশ্চর্য বোধ করছি ! আল্লাহর কসম ! আমার ধারণা হচ্ছে যে , যদি তাঁকে হত্যার পদক্ষেপ নেই তবে তিনি কামনা করবেন যে , তাঁকেও যেন তাঁর সাথে হত্যা করি। ’ অতঃপর , সে বলল :‘ এই যুবকের উপর হতে হাত গুটিয়ে নাও !’ তারপর আলী ইবনে হুসাইনকে সম্বোধন করে সে বলে :‘ তুমি এই নারিদের সাথে থাকো !”
হামিদ ইবনে মুসলিম বলেন : উবাইদুল্লাহ্ যখন প্রাসাদে প্রবেশ করে এবং লোকজনও সেইখানে সমবেত হয় তখন জামাআতের সাথে নামায আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে হাজির হতে আদেশ দেয়। লোকেরা কুফার বড় মসজিদে সমবেত হয় এবং সেই নিজে মিম্বরের উপর দণ্ডায়মান হয়ে বলে :
‘ সেই আল্লাহর প্রশংসা , যিনি সত্য ও সত্যপন্থীদেরকে জয়ী করেছেন ; আমীরুল মু’ মিনীন ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়াকে এবং তার দলকে বিজয়ী করেছেন আর মিথ্যুক হুসাইন ইবনে আলী ও তাঁর দলকে হত্যা করেছেন। ’
ইবনে যিয়াদ তখনও তার বক্তব্য শেষ করে নি ,‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে আফীফ আযদী গামেদী ’ নামক বনী ওয়ালীবা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি এবং হযরত আলীর (কাররামুল্লাহ্ ওয়াজহাহু) জনৈক অনুসারী ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ান। তিনি জঙ্গে জামালে তাঁর একটি চক্ষু হারিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় চক্ষুটি জঙ্গে সিফ্ফীনে হারিয়েছিলেন। তাঁর মাথায় একটি আঘাত এবং তাঁর ভ্রুর উপর অপর একটি আঘাত লাগার কারণেই তিনি তাঁর চক্ষুদ্বয় হারিয়েছিলেন । আব্দুল্লাহ্ সর্বদা কুফার বড় মসজিদটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং রাত্রিতে সেই স্থান ত্যাগ করতেন। ইবনে যিয়াদের বক্তব্য শুনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আফীফ হুঙ্কার ছেড়ে বলেন : হে মারজানার পুত্র ! তুমি মিথ্যুক , তোমার বাবা মিথ্যুক আর যে তোমাকে জনগণের উপর শাসক বানিয়েছে সেও মিথ্যুক এবং তার বাবাও !
হে মারজানার পুত্র ! রাসূলের সন্তানকে হত্যা করেছো আর পবিত্র ব্যক্তিগণের অনুসরণের কথা বলছো ?! ইবনে যিয়াদ তাঁর এইরূপ বক্তব্য শুনা মাত্রই হুঙ্কার দিয়ে উঠে :
‘ তাকে ধরো !’ তার দরবারের প্রহরারত সৈন্য এবং জল্লাদরা তাঁকে আটক করে। আব্দুল্লাহ্ আযদী গোত্রের লোকদের সম্বোধন করে চিৎকার করে বলেন :“ হে সৎকর্মশীল !” ‘ আব্দুর রাহমান ইবনে মাখনাফ আযদী ’ সেইখানে বসে ছিল ; সে তড়িৎ আব্দুল্লাহ্ ইবনে আফীফকে সম্বোধন করে বলল :“ তোমার আত্মীয় স্বজনদের জন্য দুর্ভাগ্য! অন্যদের নিকট সাহায্য কামনা করছো ?! তুমি তোমার এই বক্তব্য দ্বারা নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছো এবং তোমার সমস্ত পরিবারকেও মৃত্যুর মুখে ফেলেছো !”
বর্ণনাকারী বলেন :“ সেই সময়ে আযদ গোত্রের সাতশত জন যোদ্ধা কুফায় উপস্থিত ছিলেন।‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে আফীফের সাহায্যের আহ্বান শুনে সেই গোত্রের একদল যুবক উঠে দাঁড়ায় এবং আব্দুল্লাহকে ইবনে যিয়াদের জল্লাদদের থাবা হতে ছিনিয়ে আনে এবং তাঁকে কড়া পাহারা দিয়ে তাঁর বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দেয় এবং তাঁর আত্মীয় স্বজনদের হাতে অর্পণ করে। কিন্তু রাত্রিতে সুযোগ বুঝে ইবনে যিয়াদ কতিপয় লোককে প্রেরণ করে ও তাঁকে আটক করে হত্যার আদেশ দেয়। অতঃপর তাঁর মৃতদেহটিকে কুফার‘ সাবখা ’ এলাকায় ঝুলিয়ে রাখতে আদেশ প্রদান করে ।”
সিরিয়ায় আলে মুহাম্মদের (সা.) বন্দিগণ
আল্লাহর রাসূলের (সা.) বংশধরগণকে দামেশক শহরে নিয়ে যাওয়া হল এবং তাঁদেরকে অমুসলিম বন্দিদের রাখার স্থানে , মসজিদের প্রবেশ দ্বারের সম্মুখে রাখা হল। এই অবস্থায় একজন বৃদ্ধলোক সামনে আসে এবং তাঁদের সন্নিকটে এসে বলে:‘ সেই সত্য আল্লাহর প্রশংসা যিনি তোমাদেরকে হত্যা করেছেন , তোমাদেরকে নিশ্চিহ্ন করেছেন এবং জনগণকে তোমাদের কর্তৃত্ব ও যন্ত্রণা হতে নিরাপত্তা দান করেছেন আর আমীরুল মু’ মিনীনকে তোমাদের উপর আধিপত্য দান করেছেন !’
ইমাম আলী ইবনিল হুসাইন (আ.) তাকে বলেন :“ হে বৃদ্ধ ! আপনি কি কুরআন পড়েছেন ?” ॥ সে বলে :“ হ্যাঁ , পড়েছি ।” তিনি বলেন :“ এই আয়াতটি নিশ্চয় জানেন যে , মহান আল্লাহ্ বলেছেন : বল , আমি এই রিসালতের জন্যে , আমার অতি নিকট আত্মীয়দের প্রতি ভালবাসা ও বন্ধুত্ব ব্যতীত তোমাদের নিকট অন্য কোনো বিনিময় কামনা করি না ।” ১২১
বৃদ্ধ লোকটি বলে :‘ হ্যাঁ , এই আয়াতটি তো পড়েছি। ’ ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন :“ এই আয়াতে নিকট আত্মীয়ের অর্থ আমরাই !” অতঃপর তিনি বলেন :“ সূরা বনী ইস্রাঈলের এই আয়াতটি কি পড়েছেন যেখানে আল্লাহ্ বলছেন : নিকট আত্মীয়দের হক প্রদান কর ।” ১২২
বৃদ্ধলোকটি বলে :“ হ্যাঁ , এই আয়াতটি তো পড়েছি ।”
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন :“ আমরাই হচ্ছি নিকট আত্মীয় , হে বৃদ্ধ ! এই আয়াতটিও কি পড়েছেন যেখানে আল্লাহ্ বলছেন : সাবধান থেক এবং জেনে রেখ , যা কিছু তোমাদের হস্তগত হয় তার এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ , আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর নিকট আত্মীয়দের জন্যে ।” ১২৩ )
বৃদ্ধলোকটি বলে :“ হ্যাঁ , এই আয়াতটি তো পড়েছি ।”
ইমাম সাজ্জাদ বলেন :“ হে বৃদ্ধ , নিকট আত্মীয় হচ্ছি আমরাই। এই আয়াতটিও নিশ্চয় পড়েছেন যেখানে আল্লাহ্ বলছেন : হে আহলে বাইত! নিশ্চয় মহান আল্লাহ্ তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে চান ।” ১২৪ বৃদ্ধলোকটি বলে :‘ হ্যাঁ , এটিও তো পড়েছি। ’ ইমাম (আ.) বলেন :‘ আমরাই সেই আহলে বাইত। পবিত্র আল্লাহ আমাদেরকে আয়াতে তাত্বহীরের মাধ্যমে বিশেষত্ব দান করেছেন। ’
বর্ণনাকারী বলেন :“ বৃদ্ধলোকটি কিছু সময় নীরব , বিস্মিত ও অনুতপ্ত হয়ে নিজ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন। অতঃপর , আসমানের দিকে মাথা উঁচু করে বলেন : হে আল্লাহ্ ! আমি যে কথাগুলি বলেছি এবং এই ব্যক্তিবর্গের সাথে শত্রুতামূলক যে আচরণ করেছি তার জন্যে তওবা করছি ও তোমার নিকট প্রত্যাবর্তন করছি। হে আল্লাহ! মুহাম্মদ ও আলে মুহাম্মদের (সা.) প্রতি শত্রুতা পোষণকারীরা , জ্বিন ইনসান যে কেউই হোক , আমি তাদের থেকে বিমুখতা প্রকাশ করছি এবং তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি ।” ১২৫
ইয়াযীদের দরবারে আহলে বাইতের (আ.) প্রবেশ
ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া খিলাফত মসনদে বসার পর সিরিয়ার সম্মানিত লোকদেরকে ডাকে এবং তাদেরকে তার পাশে স্থান দেয়। অতঃপর , আলী ইবনে হুসাইন (আ.) , ইমাম হুসাইনের (আ.) বংশের নারীগণ ও শিশুদেরকে তার নিকটে আনতে আদেশ দেয় , এই অবস্থায় আল্লাহর রাসূলের (সা.) কচি শিশুদেরকে রশি দিয়ে একে অপরের সাথে বেঁধে রেখেছিল এবং লোকেরা সে দৃশ্য দেখছিল ।” ১২৬
ইমাম হুসাইনের পবিত্র মস্তকটি যখন আহলে বাইতের (আ.) সদস্যগণ এবং তাঁর অন্যান্য সহযোগীদের মাথার সাথে ইয়াযীদের সামনে রাখা হয় তখন ইমাম আলী ইবনে হুসাইন (আ.) ইয়াযীদকে বলেন:“ তুমি কি আমাকে কথা বলার অনুমতি দিবে ?” ইয়াযীদ বলে:“ বল , তবে বাজে কথা বলবে না !” ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন :“ আমি এমন এক স্থানে দণ্ডায়মান হয়েছি যে , প্রলাপ বকা এবং অর্থহীন কথাবার্তা বলা আমার মত লোকের জন্যে শোভা পায় না। হে ইয়াযীদ ! আল্লাহর রাসূলের (সা.) সম্পর্কে কি উপলব্ধি করছ , যদি তিনি আমাদেরকে জিঞ্জির ও শিকলে বাঁধা এ অবস্থায় দেখেন ?” ইয়াযীদ তার চতুষ্পার্শ্বস্থ লোকদেরকে বলে :“ তার হতে শিকলগুলি খুলে নাও !” ১২৭
ইয়াযীদের প্রতি ইহুদী এক পণ্ডিতের অভিযোগ
উক্ত সভায় একজন ইহুদী পণ্ডিত উপস্থিত ছিলেন , তিনি জিজ্ঞেস করেন :‘ হে আমীরুল মু’ মিনীন! এই যুবকটি কে ?’ ইয়াযীদ বলে :‘ এই মাথার অধিকারী ব্যক্তিটি হল তার পিতা !’ ইহুদী বলেন :‘ হে আমীরুল মু’ মিনীন ! এটি কার মাথা ?’ ইয়াযীদ বলে :‘ আবু তালিবের পুত্র আলী , তার পুত্র হুসাইন , এটি তারই মাথা। ’ ইহুদী বলেন :‘ তাঁর মাতা কে ?’ ইয়াযীদ বলে :‘ রাসূলের কন্যা ফাতিমা। ’ ইহুদী পণ্ডিত বিস্ময়ের সাথে বলেন:‘ সুবহানাল্লাহ! ইনি তোমাদের রাসূলের কন্যার সন্তান ! তাঁর ইন্তেকালের পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই (এত দ্রুত) তোমরা তাঁকে হত্যা করলে ?! তাঁর সন্তানদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে স্বীয় রাসূলের জন্যে তোমরা কত মন্দ স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি! আল্লাহর কসম ! মূসা ইবনে ইমরান যদি তাঁর বংশের কোনো ব্যক্তিকে আমাদের মাঝে রেখে যেতেন তবে আমরা আল্লাহ্ ব্যতীত তাঁরই উপাসনা করতাম ! তোমরা এমন লোক যে , এই গতকাল তোমাদের রাসূল তোমাদের মাঝ হতে বিদায় নিয়েছেন , আর তোমরা তাঁর সন্তানের উপর চেপে বসলে এবং তাঁকে হত্যা করলে ! ধিক তোমাদের উপর ! তোমরা কতই না নিকৃষ্ট!” ১২৮
ইয়াযীদ আদেশ দিল:‘ তার কণ্ঠ রুদ্ধ কর !’ ইহুদী পণ্ডিত বললেন :‘ আমার ব্যাপারে যা মনে কর তাই কর ; আমাকে মার কিংবা হত্যা কর অথবা জীবিত রাখ। আমি তওরাতে এইরূপ দেখেছি যে , যদি কোনো ব্যক্তি কোনো রাসূলের সন্তানকে হত্যা করে তবে সে যতদিন জীবিত থাকবে ততদিন পরাজিত হবে এবং তার মৃত্যুর পর মহান আল্লাহ্ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন !’
সিরিয়ার জনৈক পুরুষ এবং রাসূলুল্লাহর (সা.) বংশের এক নারীকে দাসী হিসেবে পাওয়ার আকাঙ্খা প্রকাশ
সে সভায় সিরিয়ার অধিবাসীদের মাঝ হতে জনৈক পুরুষ উঠে দাঁড়ায় এবং বলে :‘ হে আমীরুল মু’ মিনীন ! এই মেয়েটিকে (হুসাইনের (আ.) কন্যা ফাতিমাকে উদ্দেশ্য করে) আমাকে প্রদান করুন , তাকে আমার দাসী হিসেবে গ্রহণ করব। ’ ফাতিমা বলেন :“ আমি কেঁপে উঠি , কাঁদতে শুরু করি এবং ধারণা করি যে , এই কাজটি তাদের জন্যে আইনসিদ্ধ। আমার ফুফু যয়নবের বুকে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করি , তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড় এবং বুদ্ধিমতী ছিলেন , আর তিনি জানতেন যে , এই কাজটি হওয়ার যোগ্য নয় ।” যয়নব (আ.) সেই পুরুষটির উত্তরে বলেন :“ আল্লাহর কসম ! তুমি মিথ্যা বলেছো এবং নীচুতার পরিচয় দিয়েছো , এইরূপ বিষয় না তোমার জন্যে ন্যায়সঙ্গত হবে , আর না তার জন্যে ।”
ইয়াযীদ ক্রোধান্বিত হয়ে বলে:‘ আল্লাহর কসম! তুমি মিথ্যা বলছ , এই কাজটি আমার জন্যে আইনসিদ্ধ , আমি যদি সেটি বাস্তবায়ন করতে চাই তবে বাস্তবায়ন করব !’ যয়নব (আ.) বলেন :“ আল্লাহর কসম ! এইরূপ নয় ! মহান আল্লাহ্ এইটিকে তোমার জন্যে আইনসিদ্ধ করেন নি , তবে যদি আমাদের ধর্ম হতে বেরিয়ে যেতে চাও এবং নিজের জন্যে অন্য ধর্মকে বেছে নাও !” ইয়াযীদের ক্রোধ বৃদ্ধি পেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ছাড়িয়ে গিয়েছিল , সে বলল:‘ আমার মত লোকের সাথে এইরূপ বিতর্ক করছ ?’ যারা ধর্ম হতে বেরিয়ে গেছে তারা হল তোমার বাবা ও ভাই !’ যয়নব (আ.) বলেন :“ তুমি , তোমার পিতা এবং তোমার দাদা আল্লাহর দিকে আমার পিতা , ভ্রাতা ও নানার দ্বীনের মাধ্যমে সুপথ প্রাপ্ত হয়েছো ।” ইয়াযীদ বলে:‘ হে আল্লাহর শত্রু! তুমি মিথ্যা বলছ !’ যয়নব(আ.) বলেন:“ তুমি এখন অধিনায়ক , আধিপত্যশীল এবং পরাভূতকারী তাই অন্যায়ভাবে গালি দিচ্ছ এবং নিজ কর্তৃত্বের শক্তি দেখাচ্ছ ।”
ইমাম হুসাইনের (আ.) কন্যা ফাতিমা বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! মনে হল ইয়াযীদ লজ্জিত হল এবং নীরব হয়ে গেল ।” সিরিয়ার লোকটি পুনরায় নিজ প্রার্থনা পুনরাবৃত্তি করে বলে :‘ হে আমীরুল মু’ মিনীন ! এই মেয়েটিকে আমাকে প্রদান করুন ! ইয়াযীদ যেহেতু সুদৃঢ় ও দাঁতভাঙ্গা প্রতি উত্তর পেয়েছিল তাই সে ক্রোধান্বিত হয়ে অতি কর্কশভাবে তাকে বলল :‘ ধ্বংস হও ! আল্লাহ্ তোমাকে অকস্মাৎ এবং দ্রুত মৃত্যু দান করুন !’ ১২৯
মুসলমানদের খলীফার সামনে রাসূল(সা.) এর সন্তানের মাথা
ইমাম হুসাইনের (আ.) মাথাটি স্বর্ণের একটি বড় পাত্রে করে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযীদের সামনে রাখা হল। সে একখানা বেতের লাঠি চাইল এবং সেটি দ্বারা সে ইমাম হুসাইনের (আ.) দাঁতগুলির উপর আঘাত করতে লাগল এবং বলল :‘ আবু আব্দিল্লাহর কি চমৎকার দাঁত ছিল !’
এই সময়ে আবু বারযা আসলামী১৩০ নামক রাসূলের জনৈক সাহাবী ইয়াযীদকে বলেন :“ তোমার লাঠি দ্বারা কি ইমাম হুসাইনের (আ.) ঠোঁট ও দাঁতে মারছো ?! সাবধান থেক ! তোমার লাঠি দ্বারা হুসাইনের ঠোঁট দু’ টির যে স্থানে আঘাত করছ , আল্লাহর রাসূলকে (সা.) আমি অসংখ্যবার সে স্থানে চুমু দিতে এবং চোষণ করতে দেখেছি। ইয়াযীদ ! তুমি কিয়ামত দিবসে এমন অবস্থায় উত্থিত হবে যে , তোমার শাফাআতকারী হবে ইবনে যিয়াদ ! আর এই হুসাইন (আ.) কিয়ামত দিবসে আসবেন এবং তাঁর শাফাআতকারী হবেন মুহাম্মদ (সা.) !” অতঃপর তিনি তাঁর স্থান হতে উঠে দাঁড়ান এবং বেরিয়ে যান।১৩১
ইয়াযীদ নিজ কুফরীকে প্রকাশ করছে
ইয়াযীদ , বিজয় ও অহংকারের নেশায় অন্ধ হয়ে ইবনে যেবা ’ রীর কবিতার পংক্তিগুলির মাধ্যমে উদাহরণ দেয় এবং এইরূপ আবৃত্তি করে :
১। হায় ! বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আমার বংশের মহান ব্যক্তিরা যদি উপস্থিত থাকত এবং দেখত যে , আমি কি করেছি ,
২। তাহলে মারহাবা বলত , উৎফুল্ল হত এবং বলত :‘ ইয়াযীদ তোমাকে ধন্যবাদ। ’
৩। আমরা এই কওমের মহান ও সর্দার ব্যক্তিগণকে হত্যা করেছি , বদরের দিনের উচিৎ জবাব দিয়েছি (প্রতিশোধ নিয়েছি) এবং সমান সমান হয়েছি। ’
অতঃপর সে এই পংক্তিটি নিজ থেকে যুক্ত করে এবং আবৃত্তি করে :‘ যদি আমি মুহাম্মদের সন্তান সন্ততি এবং তাদের কৃত কাজের প্রতিশোধ গ্রহণ না করি তবে আমি উৎবা ’ র বংশ নই !’
‘ তাযকিরায়ে খাওয়াসসিল উম্মা ’ গ্রন্থে এসেছে : সকল বর্ণনাতেই এ বিষয়টি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে যে , ইয়াযীদ যখন হুসাইনের (আ.) মাথাটিকে তার সম্মুখে দেখে তখন সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে একত্রিত করে এবং তাদের উপস্থিতিতে তার হাতের লাঠি দ্বারা মাথাটিকে আঘাত করে ও ইবনে যেবা ’ রীর কবিতার পংক্তিগুলি আবৃত্তি করে , আর নিম্নোক্ত পংক্তি দু’ টি সেইগুলির সাথে যোগ করে :
‘ বনী হাশিম গোত্র রাজত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে খেলা করেছে , না আসমান হতে কোনো সংবাদ এসেছে আর না কোনো ওহী অবতীর্ণ হয়েছে !
যদি আহমদের সন্তান সন্ততি এবং তাদের যাবতীয় কৃতকর্মের প্রতিশোধ গ্রহণ না করি তবে আমি খিন্দিফ গোত্রের লোক নই !’ ১৩২
ইয়াযীদের দরবারে হযরত যয়নবের (আ.) বক্তব্য
ইমাম আলী ইবনে আবী তালিবের (আ.) কন্যা যয়নব , ইয়াযীদের সভায় দণ্ডায়মান হয়ে বলেন :
“ বিশ্বের প্রতিপালকের জন্যে সমস্ত প্রশংসা ও স্তুতি এবং রাসূল ও তাঁর বংশধরের উপর আল্লাহর করুণা অবতীর্ণ হোক ! পরম পবিত্র আল্লাহ্ তায়ালা কতটা সত্য কথা বলেছেন ! তিনি বলেন :‘ গোনাহ্গার ও মন্দ লোকদের পরিণতি এই হবে যে ,আমাদের নিদর্শনগুলিকে মিথ্যা মনে করবে এবং সেইগুলিকে উপহাসের বস্তু হিসেবে গ্রহণ করবে। ’ ইয়াযীদ ! তুমি কি ধারণা করেছো ? তুমি কি ধারণা করছ যে , তুমি এখন আমাদের জন্য পৃথিবী ও আকাশকে সংকীর্ণ করে দিয়েছো এবং আমাদেরকে এই অবস্থায় উপনীত করেছো যে , বন্দিদের মত আমাদেরকে এদিক সেদিক নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । ভেবেছো এই কাজটি আমাদেরকে আল্লাহর নিকট হীন ও অযোগ্য করে দিবে এবং তোমাকে সম্মানিত ও মহত্বে পৌঁছাবে ; আর আল্লাহর নিকট তোমার উচ্চমর্যাদার কারণে এই বাহ্যিক বিজয় ঘটেছে ? এই কারণে তুমি চরম আনন্দিত এবং নিজের অতীতে ফিরে গেছ , পৃথিবীকে নিজের জন্যে প্রস্তুত , সুসজ্জিত ও সুস্বাদু দেখে তুমি খুশী ও আনন্দে বাগ বাগ হয়েছো ? আমাদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা যখন তোমার করতলগত হয়েছে এইরূপ করছ ? শান্ত হও , শান্ত হও ! মহান আল্লাহর বাণী কি ভুলে গেছ ( ?) তিনি বলেছেন :‘ যারা কুফরী করে তারা যেন এইরূপ ধারণা না করে যে , পৃথিবীর যে সব সুযোগ সুবিধা আমরা তাদেরকে দান করি সেগুলি তাদের জন্যে কল্যাণকর। আমরা এই সুযোগ সুবিধাগুলি তাদেরকে এই উদ্দেশ্যে দান করি যে , সেইগুলি যেন তাদের পাপসমূহকে বৃদ্ধি করে এবং আগামীতে তাদের জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি ।”
হে আমাদের নানার মুক্তকৃত লোকদের সন্তান ! এইটি কি ন্যায়বিচার যে , তুমি নিজ নারী ও দাসীদেরকে পর্দায় রাখছ আর রাসূলুল্লাহর কন্যাগণকে বন্দী হিসেবে ইসলামী দেশের চতুর্দিকে ঘোরাচ্ছ ? তাঁদের পর্দা কেড়ে মুখমণ্ডলসমূহকে প্রকাশ করছ ? শত্রুদের দ্বারা তাঁদেরকে শহর হতে শহরে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াতে বাধ্য করছ ? তাঁদেরকে শহরের লোকজনদের নিকট বিনোদনের উপাদান বানাচ্ছ , যাতে পরিচিত অপরিচিত এবং উত্তম অধম সবাই তাঁদের মুখমণ্ডলগুলিকে লক্ষ্য করে। আর এই অবস্থায় তাঁদের সাথে তাঁদের কোনো অভিভাবক নেই এবং তাঁদের পুরুষগণের পক্ষ হতে তত্ত্বাবধায়ন হচ্ছে না ?!
না , হে আল্লাহ্ , কি বলব ! নিরাপত্তার ব্যাপারে কি করে তাদের প্রতি আশা করা যায় ( ?) যারা সায়্যিদুশ্ শুহাদা হযরত হামযা ’ র মত পবিত্রতম ব্যক্তিত্বের কলিজা চিবিয়েছে এবং ওহুদের শহীদগণের রক্তের দ্বারা যাদের রক্ত মাংসের বৃদ্ধি ঘটেছে ? আমাদের আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্রে নরম আচরণ করবে বলে তাদের উপর কি করে আশা করা যায় যারা আমাদেরকে অস্বীকার করে , শত্রুতা , ঈর্ষা ও বিদ্বেষের দৃষ্টিতে আমাদেরকে দেখে এবং তাদের মধ্যে গুনাহর কোন অনুভূতিই নেই , এই কাজটিকে বড় কোন অন্যায় বলে মনে করে না ? বরং বলছে :‘ লোকেরা যেন আনন্দ করে , খুশীতে থাকে , উল্লাস করে ! আর বলে , এ কর্মের জন্যে হে ইয়াযীদ! তোমাকে ধন্যবাদ। ’ এই অবস্থায় , বেহেশ্তের যুবকদের সর্দার হযরত আবু আব্দিল্লাহর দাঁতগুলিকে তুমি তোমার লাঠি দ্বারা আঘাত করছ ! কেনই বা তুমি এইরূপ কাজ করবে না ?! মুহাম্মদের (সা.) নাতি ও আলে আব্দিল মুত্তালিবের আকাশের তারকাগণের রক্তপাতের মাধ্যমে তুমি যে , তোমার হিংসা বিদ্বেষপূর্ণ নোংরা বস্তুগত চেহারার পর্দা উন্মুক্ত করেছো এবং তোমার মূলে ফিরে গেছ , তোমার পিতৃপুরুষদের স্মরণ করছ ও তাদেরকে আহ্বান করাকে কল্যাণকর ধারণা করছ , অথচ খুব শীঘ্রই তুমি তাদের প্রবেশের স্থানে প্রবেশ করবে ! সেইখানে তুমি চাইবে যে , যদি তুমি খোঁড়া , অক্ষম ও বোবা হতে এবং এই সব না বলতে ও এইরূপ কর্ম না করতে !
হে আল্লাহ্ ! আমাদের প্রতিশোধ গ্রহণ কর ! যে ব্যক্তি আমাদের প্রতি অত্যাচার করেছে তার নিকট হতে প্রতিশোধ নাও ! যে ব্যক্তি আমাদের রক্তপাত করেছে ও আমাদের অভিভাবকগণকে হত্যা করেছে তুমি তাদের উপর তোমার ক্রোধ ও অভিসম্পাত প্রেরণ কর !
ইয়াযীদ ! আল্লাহর শপথ ! তুমি তোমার নিজের চামড়া ব্যতীত অন্য কিছু চিরনি এবং তোমার নিজেরই মাংস ব্যতিত অন্য কিছুই কাটনি ! আল্লাহর রাসূলের সন্তান সন্ততির রক্তপাত ,তাঁর ইতরাত (বংশধর) ও তাঁর শরীরের অংশসমূহের সম্মান বিনষ্ট করার ফলে যেসব অপরাধ তোমার কাঁধে চেপেছে সেসব সহকারে তুমি নিঃসন্দেহে তাঁর (রাসূল) নিকট প্রবেশ করবে ! আল্লাহ্ তাঁদের বিক্ষিপ্ত অংশসমূহকে সংযোজন করবেন , তাঁদের বিচ্ছিন্ন অংশগুলিকে সংযুক্ত করবেন এবং তাঁদের প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন ! আর তোমরা এইরূপ ধারণা করো না যে , যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়েছেন তাঁরা মারা গেছেন , বরং তাঁরা জীবিত আছেন এবং তাঁদের প্রতিপালকের নিকট হতে রিয্ক গ্রহণ করেন।
তোমার জন্যে এই যথেষ্ট যে , মহান আল্লাহ্ তোমার নিকট হিসাব গ্রহণ করবেন , মুহাম্মদ (সা.) তোমার সাথে দুশমনি করবেন এবং জিব্রাঈল (আ.) আমাদের পৃষ্ঠপোষক হবেন। যে ব্যক্তি তোমার জন্যে এইরূপ অপরাধকে সুসজ্জিত করেছে এবং মুসলমানদের উপর তোমাকে কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের অধিকারী করেছে সে অচিরেই বুঝবে যে , অত্যাচারীর জন্যে জাহান্নামের মন্দ স্থান নির্ধারিত রয়েছে এবং তুমিও বুঝবে যে , তোমাদের ও আমাদের মাঝে কারা মন্দ স্থানে রয়েছে এবং কারা দুর্বলতর শক্তির অধিকারী।
ইয়াযীদ ! বর্তমান কঠিন অবস্থা ও সমস্যাদি আমাকে এমন স্থানে উপনীত করেছে , যার ফলে তোমার সাথে কথা বলছি ! তবে তুমি জেনে রেখ ! আমি তোমাকে এতটা নগণ্য ও ক্ষুদ্র জ্ঞান করি যে , তোমাকে ভর্ৎসনা করাটাও তোমার সত্তার চেয়ে বড় মনে করি এবং তোমার জন্যে তিরস্কার করাটাও বেশী মনে করি (অর্থাৎ তুমি ভর্ৎসনা ও তিরস্কারের অযোগ্য) ! কিন্তু কি করি ! ? চক্ষুগুলি অশ্রুতে পূর্ণ এবং অন্তরসমূহ অগ্নিদগ্ধ ! জেনে রেখ ! বিস্ময়কর ! সবই বিস্ময়কর !! শয়তানের দলের মুক্তিপ্রাপ্ত লোকদের হাতে হিযবুল্লাহর মহানুভব ব্যক্তিগণ নিহত হচ্ছেন ! এই হাতগুলি হতে আমাদের রক্ত ঝরছে , এই মুখগুলি আমাদের মাংসকে চোষণ করছে এবং আমাদের পবিত্র ব্যক্তিগণের দেহসমূহকে নেকড়েরা ছিন্নভিন্ন করছে , হায়েনারা মাটির উপর টানাটানি করছে !
ইয়াযীদ ! তুমি যদি আমাদেরকে তোমার জন্য গনিমত মনে করে থাক তবে এইটি জেনে রেখ যে , খুব শীঘ্রই আমাদেরকে তোমার ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখবে ! পূর্বে প্রেরিত আমলগুলি ছাড়া সেইখানে আর অন্য কিছু পাবে না ! তোমার প্রতিপালক অত্যাচারী লোকদের সাথে কোনো সম্পর্ক রাখেন না ! আমি আল্লাহর নিকট অভিযোগ করছি এবং তাঁর উপর আমার ভরসা আছে।
ইয়াযীদ ! তুমি তোমার প্রতারণাকে কাজে লাগাও , তোমার চেষ্টাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাও এবং তোমার প্রচেষ্টাকে বিস্তৃত কর ! আল্লাহর শপথ ! তুমি আমাদের স্মরণকে বিলুপ্ত করতে পারবে না এবং আমাদের ঐশী প্রেরণাকে নস্যাৎ করতে পারবে না। এই অপরাধের লজ্জা ও অপমান তোমার থেকে কখনই মুছে যাবে না। দুর্বল (যুক্তি)ও মিথ্যা(ভাষ্য) ব্যতীত তোমার কি মত আছে ? মুষ্টিমেয় কয়েকটি দিন এবং বিক্ষিপ্ত জনতা ছাড়া তোমার আর কি আছে ? যে দিন আহ্বানকারী আহ্বান করবেন :‘ জেনে রাখ ! জালিমের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক !’ বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে সমস্ত প্রশংসা , যিনি আমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৌভাগ্য ও মাগফিরাতসহ গন্তব্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছিয়েছেন এবং আমাদের উত্তরসুরিগণকে শাহাদত ও রহমত দ্বারা নৈকট্য দান করেছেন। মহান আল্লাহর নিকট কামনা করব , তিনি যেন তাঁদেরকে অফুরন্ত নিয়ামত দান করেন এবং তাঁদের শাহাদতকে তাঁর নিয়ামত বৃদ্ধির উপকরণ বানিয়ে দেন ! আমাদেরকে তাঁদের উত্তম প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করেন ! তিনি হচ্ছেন করুণাময় ও দয়ালু। তিনিই আমাদের জন্যে যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম ভরসাস্থল ।” ১৩৩
দামেশকের জামে মসজিদে হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এর ভাষণ
ইয়াযীদ দামেশকের জামে মসজিদে স্বীয় খতীবকে আদেশ প্রদান করে যে , সে যেন মিম্বরে আরোহণ করে মুয়াবিযা ও ইয়াযীদের প্রশংসা করে এবং ইমাম আলী ও ইমাম হুসাইনের (আ.) সমালোচনা করে। খতীব মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতির পর যথাসাধ্য আলী ও হুসাইনের (আ.) নিন্দা এবং মুয়াবিয়া ও ইয়াযীদের প্রশংসা করে।
এ অবস্থায় হুসাইনের পুত্র আলী (আ.) তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলেন :“ হে বক্তা , তোমার অকল্যাণ হোক ! সৃষ্টির সন্তুষ্টিকে স্রষ্টার ক্রোধের সাথে বিনিময় করলে এবং জাহান্নামে তোমার জায়গা বেছে নিলে ?!”
অতঃপর তিনি বলেন :“ ইয়াযীদ ! তুমি আমাকে অনুমতি দাও , আমি এই কাঠের (মিম্বারের দিকে নির্দেশ করে) উপর আরোহণ করে এমন কিছু কথা বলব যে , তা আল্লাহর সন্তুষ্টিরও কারণ হবে এবং উপস্থিত জনগণও ছাওয়াব ও কল্যাণ লাভ করবে ।” ইয়াযীদ গ্রহণ করল না। উপস্থিত জনতা বলল :“ হে আমীরুল মু’ মিনীন ! তাঁকে আরোহণ করার অনুমতি দিন , আমরা তাঁর নিকট হতে সম্ভবতঃ কিছু শুনতে পাব ।” ইয়াযীদ তাদেরকে বলল :“ যদি এই ব্যক্তিটি মিম্বরে আরোহণ করেন তবে আমার এবং আবু সুফিয়ানের বংশের মান সম্মান ধুলিস্যাত না করে নামবেন না !” লোকেরা বলল :“ কোন্ লোক তাঁর ও তাঁর বক্তব্যের পক্ষ নেবে ?” ইয়াযীদ বলল :“ সে এমন এক পরিবারের সদস্য যারা জ্ঞানকে সর্বোত্তমরূপে আস্বাদন করেছে !” কিন্তু উপস্থিত লোকেরা এতবেশী পীড়াপীড়ি করতে লাগল যে , শেষে ইয়াযীদ অনুমতি দিতে বাধ্য হল। ইমাম (আ.) মিম্বরে আরোহণ করে আল্লাহর প্রশংসা , স্তুতি ও গুণগান করে বললেন :
“ হে উপস্থিত জনতা ! রাসূলের বংশধর হিসেবে আমাদেরকে ছয়টি বিশেষত্ব দান করা হয়েছে এবং অন্যদের উপর আমাদের সাতটি বিষয়ে প্রাধান্য রয়েছে। আমাদের প্রতি দানকৃত জিনিসগুলি হচ্ছে : জ্ঞান প্রজ্ঞা , ধৈর্য , মহানুভবতা , বাকপটুতা , সাহসিকতা ও মু’ মিনদের অন্তরসমূহে আমাদের প্রতি ভালবাসা। আর অন্যদের চেয়ে আমাদের প্রাধান্যের বিষয়গুলো হচ্ছে :আমরা হচ্ছি আল্লাহর নির্বাচিত নবী মুহাম্মদ মোস্তফার (সা.) বংশভুক্ত , আর সিদ্দীক , আসাদুল্লাহ্ ,ও আসাদুর রাসূল আলী , বিশ্বের নারীদের নেত্রী ফাতিমা বাতুল ,এই বংশের দুই সন্তান জান্নাতের যুবকদের দুই সর্দার , জাফর তাইয়ার সকলেই আমাদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর বলেন: যারা আমাকে চিনেন তারা তো চিনেনই ; আর যারা আমাকে চিনেন না তাদেরকে এখন আমার বংশকৌলীন্য সম্পর্কে অবহিত করব ।
আমি মক্কা ও মিনার সন্তান। আমি জমজম ও সাফার সন্তান। আমি সেই ব্যক্তির সন্তান যিনি চাদরের আঁচলে করে যাকাত নিয়ে চারদিকে ছুটে যেতেন। সর্বোত্তম লুঙ্গি ও চাদর পরিধানকারী লোকের আমি সন্তান। আমি সর্বোত্তম খড়ম পরিধানকারীর সন্তান। আমি সেই সর্বোত্তম ব্যক্তিত্বের সন্তান যিনি তাওয়াফ ও সাঈ ’ করেছেন। আমি তাঁর সন্তান যিনি হজ্জ করেছেন ও লাব্বাইক বলেছেন। আমি তাঁর সন্তান যিনি বোরাকে আরোহণ করে আসমানে ভ্রমণ করেছেন। আমি তাঁর সন্তান যাঁকে নৈশকালে মসজিদুল হারাম হতে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তিনি কত পবিত্র সত্ত্বা যিনি তাঁকে নৈশকালে ভ্রমণ করিয়েছেন।)১৩৪ আমি তাঁর সন্তান যাঁকে জিব্রাঈল (আ.)‘ সিদ্রাতুল মুন্তাহায় ’ পৌঁছিয়েছেন। আমি তাঁর সন্তান যিনি নিকটবর্তী হয়েছেন এবং দুই বিঘত পরিমাণ অথবা তদোপেক্ষা নিকটবর্তী হয়েছেন। আমি তাঁর সন্তান যিনি আসমানসমূহের ফেরেশ্তাদের সাথে নামায আদায় করেছেন। আমি তাঁর সন্তান যাঁর নিকটে মহান আল্লাহর যা কিছু ওহী করার ছিল তা ওহী করেছেন। আমি মুহাম্মদ মোস্তফার (সা.) সন্তান , তাঁর সন্তান যিনি মানুষের নাসিকা ধুলায় ধুসরিত করেছেন ফলে তারা‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ’ বলতে বাধ্য হয়েছেন। আমি তাঁর সন্তান যিনি দুইবার বাইআত করেছেন। দুই কিবলার দিকে নামায আদায় করেছেন। বদর ও হুনাইনে যুদ্ধ করেছেন। চোখের পলক পড়ার সমান পরিমাণ সময়ও আল্লাহকে অস্বীকার করেন নি। মুসলমানদের অগ্রপথিক। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী , অত্যাচারী ও খারিজীদেরকে হত্যাকারী। মহানুভব ও দাতা , পবিত্রদের নেতা , হেজাজের সিংহ , ইরাকের ব্যাঘ্র , মক্কী , মাদানী , আবতাহী , তাহামী , খাইফী , আকাবী , বদরী , ওহুদী , শাজারী , মুহাজেরী , সিবতাইনের (হাসান ও হুসাইন) পিতা আলী ইবনে আবী তালিবের সন্তান। আমি ফাতিমা যাহরার সন্তান। আমি নারীদের নেত্রীর সন্তান। আমি রাসূলের দেহের অংশের সন্তান ।”
বর্ণনাকারী বলেন :‘ মানুষের কান্না ও চিৎকার ধ্বনি উত্থিত হওয়া পর্যন্ত ইমাম অব্যাহতভাবে আমি , আমি , বলে যাচ্ছিলেন। হট্টগোল সৃষ্টি হওয়ার ভয়ে ইয়াযীদ মুয়াজ্জিনকে আযান দিতে আদেশ দেয় এবং ইমামের বক্তব্যের ছেদ ঘটায়। ইমামও নীরব হয়ে যান। মুয়াজ্জিন‘ আল্লাহু আকবার ’ বলল , ইমাম (আ.) বলেন :“ তিনি মহান , এমন মহান সত্তা যে , কোনো কিছুর সাথে তুলনা করা যাবে না। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ে ধারণযোগ্য নন। কোনো বস্তুই তাঁর চেয়ে মহান নয় ।” মুয়াজ্জিন‘ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ ’ বলল ইমাম (আ.) বললেন :“ এই বাণীর প্রতি আমার সমস্ত অস্তিত্ব সাক্ষ্য দিচ্ছে ; আমার লোম , চামড়া , মাংস , রক্ত , মেধা , অস্থি সবই তার প্রতি সাক্ষ্য দিচ্ছে ।” মুয়াজ্জিন‘ আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ (সা.)’ বলল , ইমাম আলী ইবনিল হুসাইন (আ.) মিম্বরের উপর হতে ইয়াযীদের দিকে মুখ করে বলেন :“ ইয়াযীদ ! এই মুহাম্মদ (সা.) আমার নানা , না তোমার নানা ? যদি তোমার নানা বলে দাবি কর তবে নিশ্চয় তুমি মিথ্যা বলছ , আর যদি আমার নানা বলে স্বীকার কর তবে তাঁর ইতরাতকে (বংশধর) কেন হত্যা করলে ?”
বর্ণনাকারী বলেন :‘ মুয়াজ্জিন আযান সমাপ্ত করলে , ইয়াযীদ সামনে যায় এবং যোহরের নামায আদায় করে। ’১৩৫
খিলাফতের রাজধানীতে শোকানুষ্ঠান পালন
দামেশকের মসজিদে ইমামের (আ.) বক্তব্যের পর , ইয়াযীদ নামায সম্পন্ন করে আদেশ দেয় যে , প্রস্তুতকৃত ঘরটিতে যেন ইমাম আলী ইবনিল হুসাইন (আ.) এবং তাঁর ভগ্নীগণ ও ফুফুদেরকে স্থান দেয়া হয়। তাঁরাও সেইখানে কয়েকদিন যাবৎ শোকানুষ্ঠান পালন করেন এবং হুসাইনের (আ.) জন্যে ক্রন্দন করেন ও শোকগাথাঁ পাঠ করেন।
এই অনুষ্ঠানের পরে , ইয়াযীদ রাসূলের (সা.) সন্তান সন্ততির সাথে আচরণ পরিবর্তন করতে এবং কতকগুলি সীমাবদ্ধতাকে উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয় ও তাঁদের শহীদগণের জন্যে শোকানুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে ।
অতঃপর ইয়াযীদ দামেশক শহরের অবস্থা শোচনীয় দেখে বন্দী কাফেলাকে সম্মানের সাথে মদীনায় পাঠায়।
ইমাম হুসাইনের শাহাদতের পর সাহাবা ও তাবেঈনের বিদ্রোহ
মদীনার লোকদের বিদ্রোহ ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে হানযালার হাতে শপথ
ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের পর , মদীনার লোকেরা‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে হানযালার ’ পাশে জমা হন এবং তাঁর হাতে শপথ করেন । এমনই শপথ যাতে তারা মৃত্যু বরণ করতে ও নিহত হতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হন ! আব্দুল্লাহ্ তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন এবং বলেন :‘ হে লোক সকল ! আল্লাহকে ভয় কর ! খোদার কসম ! আমরা ইয়াযীদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র এই আশঙ্কায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছি যে , হয়ত বিদ্রোহ না করলে আসমান হতে আমাদের উপর পাথর বর্ষণ করা হবে ! ইয়াযীদ এমনই এক ব্যক্তি , যে তার পিতার শয্যা সঙ্গিনী , তার কন্যা ও বোনদের সাথে বিবাহ করছে , মদ পান করছে এবং নামায পরিহার করছে। ’১৩৬
ইবনে যুবাইরও মক্কায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন , ইয়াযীদকে খিলাফতচ্যুত করেন এবং মদীনার বেশীর ভাগ লোকই তাঁর অনুসরণ করেন।‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুতী ’ ও আব্দুল্লাহ্ ইবনে হানযালা’ এবং মদীনার লোকেরা মসজিদে তাঁর নিকট একত্রিত হন।
সাহাবী আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর বলেন :‘ আমি আমার পাগড়িটিকে যেইভাবে মাথা হতে সরিয়ে নিচ্ছি ঠিক সেইভাবে খিলাফত হতে ইয়াযীদকে অপসারণ করছি। ’ অতঃপর তিনি তাঁর পাগড়িটিকে মাথা হতে তুলে বলেন :‘ আমি এমন এক সময় এই কথাগুলি বলছি যখন ইয়াযীদ আমাকে মূল্যবান কিছু উপহার দিয়েছে , তবে সে আল্লাহর শত্রুএবং সদা সর্বদা মদ পান করে নেশাগ্রস্ত থাকে। ’
অপর একজন বলেন :‘ আমি আমার পা হতে জুতা খোলার মত করে ইয়াযীদকে খিলাফতচ্যুত করছি। ’ অন্য আরেকজন বলেন :‘ শরীর হতে শার্ট খোলার ন্যায় আমি তাকে খিলাফতচ্যুত করছি। ’ অন্য একজন বলেন :‘ আমি আমার পা হতে জুতা জোড়া খোলার ন্যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। ’ বিভিন্ন লোকজনের পাগড়ি , জুতা এবং নাগরায় স্তুপ আকার ধারণ করে ! সকলে তার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং তাকে পদচ্যুত করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন।
বনী উমাইয়্যাদেরকে বিতাড়িত করার জন্যে মদীনার লোকেরা সমাবেশ করেন এবং তাদের নিকট এই মর্মে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যে , তারা মদীনার অধিবাসীদের বিপক্ষে খলীফার সৈন্যদেরকে সহযোগিতা করবেন না এবং ইয়াযীদের সৈন্যদেরকে মদীনায় প্রবেশ করতে বাধা প্রদান করবেন। আর যদি সৈন্যদেরকে প্রতিহত করতে না পারেন তবে তারা নিজেরা সৈন্যদের সাথে মদীনায় ফিরে যাওয়া হতে বিরত থাকবেন।
বনী উমাইয়্যাদের নারী ও শিশুদেরকে ইমাম সাজ্জাদ আশ্রয় দিলেন
এই সময়ে , উমাইয়্যা বংশের মারওয়ান‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমরের ’ নিকট গমন পূর্বক বলে :‘ হে আবু আব্দির রাহমান ! তুমি তো দেখতে পাচ্ছ যে , এই লোকেরা আমাদের কর্তৃত্ব গুটিয়ে নিতে বাধ্য করেছে এবং আমাদেরকে বিতাড়িত করেছে। তুমি আমাদের নারী ও শিশুদেরকে আশ্রয় দাও। ’
আব্দুল্লাহ্ বলেন :“ তোমাদের ও তাদের কোন পক্ষের সাথেই আমাদের কোনোরূপ সম্পর্ক নেই ।” মারওয়ান উঠে দাঁড়ায় এবং বলে :‘ এই চরিত্র ও আচরণকে আল্লাহ্ অপছন্দ করুন !’ অতঃপর সে , হুসাইনের পুত্র আলীর (আ.) নিকট আসে এবং তার পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার জন্যে ইমামের (আ.) নিকট আবেদন করে। ইমাম (আ.) তাই করেন এবং উম্মে আবান নামে উছমানের কন্যা ও মারওয়ানের স্ত্রী , আব্দুল্লাহ্ ও মুহাম্মদ নামক তার দুই পুত্রসহ তাদেরকে আশ্রয় প্রদান করেন।১৩৭
তাবারী ও ইবনে আছীর লিখেছেন :“ মদীনার লোকেরা যখন ইয়াযীদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও বনী উমাইয়্যাদেরকে বিতাড়িত করেন তখন মারওয়ান ইবনে হাকাম‘ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমরের ’ সঙ্গে এই মর্মে আবেদন করে যে , তিনি যেন তার পরিবারকে তাঁর নিজের নিকট আশ্রয় দেন ; কিন্তু তিনি তার আবেদনটি মঞ্জুর করলেন না। মারওয়ান‘ হুসাইনের পুত্র আলীর ’ সঙ্গে আলাপ করে এবং বলে :‘ হে আবুল হাসান ! আমি আপনার আত্মীয় এবং আত্মীয়তার অধিকার রাখি , আমার পরিবারটি আপনার পরিবারের পাশে থাকুক ?’ ইমাম (আ.) বলেন :‘ ঠিক আছে , এতে কোনো বাধা নেই। ’ মারওয়ান নিজ পরিবারকে ইমামের (আ.) সমীপে প্রেরণ করে। ইমাম (আ.) নিজ পরিবার ও মারওয়ানের পরিবারকে মদীনার বাইরে‘ ইয়াম্বু ’ নামক স্থানে নিয়ে যান এবং সেইখানে তাঁরা বসবাস শুরু করেন ।” ১৩৮
ইয়াযীদের নিকট বনী উমাইয়্যাদের সাহায্য প্রার্থনা ও মদীনায় সৈন্য সমাবেশ
বনী উমাইয়্যারা এইরূপ অবস্থা দেখে ইয়াযীদের নিকট পত্র লিখে এবং তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। ইয়াযীদ‘ মুসলিম ইবনে উক্ববার ’ নেতৃত্বে একদল সৈন্যকে মক্কা ও মদীনায় প্রেরণ করে এবং‘ ইবনে যুবাইরের ’ উদ্দেশ্যে লিখে :
“ আসমানে তোমার খোদাকে আহ্বান কর। কারণ তোমার বিরুদ্ধে আমি‘ আক্ক ও আশ্আর ’ গোত্রের যোদ্ধা ব্যক্তিদেরকে প্রেরণ করলাম। সৈন্য পৌঁছার পূর্বেই নিজ জীবনের নিরাপত্তার জন্যে কোনো উপায় অন্বেষণ কর !” ১৩৯
মদীনায় ইয়াযীদের সৈন্যের প্রবেশ
ইয়াযীদের সৈন্য মদীনায় উপস্থিত হলে এক কঠিন যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মদীনাবাসীগণ পরাজিত হন। খলীফার সেনাবাহিনী প্রধান‘ মুসলিম ইবনে উকবাহ্ ’ তিনদিন যাবৎ মদীনা নগরকে তার সৈন্যদের জন্য বৈধ ঘোষণা করে যাতে তারা লোকজনকে হত্যা করে এবং তাদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন করে !১৪০
বৈধ করে দেয়া দিনগুলিতে আল্লাহর রাসূলের (সা.) তিনজন সাহাবী সহ মদীনার সাতশ ’ জন কুরআনের হাফেয নিহত হন !১৪১
সেই দিনগুলির হত্যাযজ্ঞতা এমন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল যে , ধারণা হচ্ছিল , মদীনাবাসীদের কেউই অবশিষ্ট থাকবে না ! বর্ণিত হয়েছে যে , উক্ত দিনগুলিতে সহস্র নারী , গর্ভ ধারণ করেন ! অপর একটি বর্ণনায় এসেছে যে ,নিহত ব্যক্তিগণের মাঝে সাতশ ’ জন শুধু শীর্ষস্থানীয় মুহাজির , আনসার ও তাঁদের মুক্তিদানকারী ব্যক্তিগণ ছিলেন ; আর তাঁদের ছাড়াও সহস্র পুরুষ নিহত হন।১৪২
ইয়াযীদের জন্যে মদীনার লোকদের নিকট হতে বাইআত গ্রহণ
ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে : মুসলিম ইবনে উক্ববাহ বাইআত করার জন্যে লোক জনকে আহ্বান করে। সে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করে যে , তারা মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযীদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য স্বীকার করছে এবং সে তার ইচ্ছামত তাদের জান , মাল ও পরিবারকে ব্যবহার করতে পারবে। ’১৪৩
মদীনার অধিবাসীদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল তারা এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করল যে , তারা ইয়াযীদের দাস ও গোলাম ! শুধুমাত্র হুসাইনের পুত্র আলী (আ.) বাইয়াত করলেন না। তিনি মদীনাবাসীদের সাথে যোগ দেন নি। আর আলী ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাসের মামারা খলীফার সেনাবাহিনীতে ছিল এবং মদীনাবাসীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা হতে তাঁকে বিরত রেখেছিল। এ ছাড়া যারাই তার বাইআতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল তাদের সকলকেই হত্যা করেছিল।১৪৪
মক্কাভিমুখে ইয়াযীদের সৈন্যের যাত্রা ও তার সেনা প্রধানের মুনাজাত
‘ মুসলিম ইবনে উকবাহ্ ’ মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ , তাদেরকে হত্যা এবং তাদের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করার পর সৈন্যদের সাথে মক্কাভিমুখে যাত্রা করে এবং পথিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে যখন তার নিজের মাধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পেল তখন সে তার পরবর্তী সেনাপতির হাতে সৈন্যদের দায়িত্বভার অর্পণ করে আল্লাহর নিকট মুনাজাত করে বলে :“ হে আল্লাহ্ ! আমি‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ ’ র ’ সাক্ষ্য দেয়ার পর হতে আমার নিজের আখিরাতের জন্যে এমন কোনো কাজই করি নি যা মদীনাবাসীদের হত্যার চেয়ে আমার নিকট প্রিয় ! আর এই কাজ করার পর যদি আমি জাহান্নামে গমন করি তবে প্রতীয়মান হয় যে , আমি হতভাগ্য !’ অতঃপর সে মারা যায়।১৪৫
খলীফার সৈন্যরা কাবায় আগুন জ্বালায়
মুসলিম ইবনে উকবার মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত‘ হুসাইন ইবনে নুমাইর ’ মক্কায় এসে মক্কা অবরোধ করে এবং অগ্নি ও পাথর নিক্ষেপকারী যন্ত্র দ্বারা কাবাগৃহের উপর পাথর বর্ষণ করে এবং কাপড় , কেরোসিন ও আগুন জ্বালানোর বিভিন্ন জিনিস দ্বারা কা’ বা ঘরে আগুন জ্বালায় ও ধ্বংস করে।১৪৬
তার এ ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে বলা হয়েছে :‘ ইবনে নুমাইর এমন এক অন্যায় কাজের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল যার মাধ্যমে মাকাম ও মুসাল্লা দু’ টিই ভষ্মীভূত হয় ।’ ১৪৭
যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে কখনও কখনও উভয় দলই যুদ্ধে বিরতি দিলে আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমাইর এবং খতীব ইবনে যুবাইর কা’ বা ঘরের ছাদের উপর গিয়ে সর্ব শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলছিল :“ হে সিরিয়াবাসী ! এটি আল্লাহর হারাম শরীফ। এমন এক হারাম যেটি জাহিলিয়্যাতের যুগেও মানুষের জন্যে আশ্রয়স্থল ছিল এবং পশুপাখিও এইখানে নিরাপদ ছিল। হে সিরিয়াবাসী ! আল্লাহকে ভয় কর ।”
অপরদিকে সিরিয়াবাসীরা চিৎকার বলছিল :‘ আনুগত্য কর ! খলীফার আনুগত্য কর !! আক্রমণ কর ! আক্রমণ কর !! রাত না আসতেই কাজ সম্পন্ন কর !’ কা’ বা ঘরে আগুন লাগা পর্যন্ত তারা এই আক্রমণ অব্যাহত রাখল। সিরিয়ার লোকেরা এইরূপ অবস্থা দেখে বলছিল :“ কা’ বা ঘরের মর্য়দা ও খলীফার আনুগত্য একত্রিত হয়েছে ও পরস্পরে বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। অতঃপর খলীফার আনুগত্য , কা’ বা ঘরের মর্যাদার উপর বিজয় লাভ করল !” ১৪৮
কা’ বার অগ্নিকাণ্ডে , আগুনের প্রচণ্ড শিখায় কা’ বা ঘরের পর্দা , ছাদ এবং হযরত ইসমাঈলের (আ.) জীবনের বিনিময় স্বরূপ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত দুম্বার দু’ টি শিং যা কা’ বা ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ছিল , সব কিছু পুড়ে যায়।১৪৯
ইয়াযীদের মৃত্যু সংবাদ তার সৈন্যদের নিকট পৌঁছা পর্যন্ত কা’ বা ঘরের অবরোধ অব্যাহত থাকে।
দুই পবিত্র হারামে বিদ্রোহের অবসান এবং অন্যান্য স্থানে বিদ্রোহ শুরু
মক্কা ও মদীনার উত্তেজনার অবসানের পর , অন্যান্য শহরে বিভিন্ন আন্দোলন ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। যেমন‘ ইয়া লা ছারাতিল হুসাইন’ এর শ্লোগান সহ কুফা নগরীতে ৬৫ হিজরীতে‘ তাওয়্যাবীনের ’ আন্দোলন। তাঁরা‘ আইনুল ওয়ারদা ’ নামক স্থানে খলীফার সৈন্যদের বিপক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদত বরণ করেন। তারপর , ৬৬ হিজরীতে কুফা নগরীতে‘ মুখ্তারের ’ আন্দোলন। তিনি‘ ইমাম হুসাইনের (আ.)’ হন্তাদেরকে হত্যা করার জন্যে আন্দোলনের ডাক দেন এবং তিনি সেই অত্যাচারীদেরকে নিশ্চিহ্ন করেন। তাঁদের পরে আলাভীদের আন্দোলন। যেমন শহীদ যায়িদ ও তাঁর পুত্র ইয়াহ্ইয়ার আন্দোলন।১৫০ আর সর্বশেষে আব্বাসীয়দের আন্দোলন। তারা আলে মুহাম্মাদের (সা.) দিকে আহ্বানের শ্লোগান দিয়ে আন্দোলন শুরু করে এবং উমাইয়্যাদের র্খিলাফতকে উৎখাত করে আব্বাসীয় খিলাফতকে এই শ্লোগানের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠা করে।১৫১
বিপ্লবীরা খিলাফতকে দুর্বল করে দেয় এবং ইমামগণ (আ.) ইসলামের বিধানসমূহকে পুনর্বহাল করেন
একদিকে ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ফলে বিপ্লবীদের দ্বারা সৃষ্ট এই সব উত্তেজনা , আন্দোলন ও বিপ্লবসমূহ এবং অপরদিকে আহলে বাইতের ইমামগণের (আ.) গৃহীত পদক্ষেপের কারণে ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের সুবাদে ইমামগণ (আ.) , আল্লাহর রাসূলগণের নেতা এবং তাঁদের নানা রাসূল (স.) এর ধ্বংস ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া শরীয়তকে পুনরায় বহাল করার সুযোগ পান এবং ইসলামী বিধানসমূহকে প্রচার ও প্রসার করার জন্যে তাঁদের শিক্ষালয়কে প্রতিষ্ঠা করেন (এই সম্পর্কে পরে বর্ণিত হবে) ।
হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) অভ্যুত্থানের ফলাফল ও অবদানসমূহ
মুয়াবিয়া , সিরিয়ার উপর চল্লিশ বছর যাবৎ শাসনক্ষমতা পরিচালনাকালে , সিরিয়াবাসীকে ইচ্ছামত ইসলাম হতে বিচ্ছিন্ন করে প্রশিক্ষিত করতে সমর্থ হয়। রাসূলের (সা.) সাহাবীগণও এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন নি। মুয়াবিয়া এমন ধরনের কাজ করতে সমর্থ হয় যে , তার ফলে আমীরুল মু’ মিনীন আলী (আ.) নব্বই হাজার যোদ্ধা সহও সিরিয়ায় পৌঁছিতে পারেন নি এবং সিরিয়া জয় করতে পারেন নি। কিন্তু হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা নিজের ও তাঁর সহযোগিদের বিচ্ছিন্ন শির দ্বারা সিরিয়া জয় করেন এবং সিরিয়া আন্দোলিত হয় ! রাসূলের (সা.) সন্তান সন্ততিকে বন্দী করার পরও অতিব সম্মানের সাথে মদীনায় ফেরত পাঠাতে ইয়াযীদ বাধ্য হয়।
ইসলামী দেশের প্রত্যেক প্রান্তে লোকেরা জেগে উঠে। মদীনায় সর্বপ্রথম বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ শুরু হয় যেটিকে‘ হাররার ঘটনা ’ বলা হয়। দ্বিতীয় বিদ্রোহটি মক্কায় হয়। তৃতীয় বিদ্রোহ , তাওয়াবীনের বিদ্রোহ ও সংগ্রাম এবং এতে চার হাজার লোক অংশ নিয়েছিল। এর পরে মুখ্তারের বিদ্রোহ্। সারকথা , একের পর এক আন্দোলনের সংঘটিত হয় এবং এর ফলে বনি উমাইয়্যাদের খিলাফতের পতন ঘটে।
হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এই যে , খিলাফতের তথাকথিত পবিত্রতার ধারণা ক্ষুন্ন হয়। মুসলমানরা ধারণা করত যে , খলীফার আনুগত্য করাটাই হচ্ছে ধর্ম । তারা রাসূলের (সা.) চেয়ে খলীফাদের অধিক সম্মানের অধিকারী জ্ঞান করত , তাদের এই ধারণাকে বাতিল ও ভ্রান্ত প্রমাণ করে। এই পবিত্রতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে , আব্দুল মালিকের যুগে হাজ্জাজ তার একটি বক্তব্যে বলে:“ আ খালীফাতু আহাদিকুম আক্বরাবু ’ ইনদাহু আম্ রাসূলুহু ?” অর্থাৎ তোমাদের খলীফা ও প্রতিনিধি তোমাদের নিকট অধিক প্রিয়ভাজন , না তোমাদের রাসূল ?১৫২ এই বক্তব্য দ্বারা তার উদ্দেশ্য ছিল এই যে , রাসূল (সা.) আল্লাহর পক্ষ হতে ওহীর একজন বাহক ছিলেন মাত্র। পক্ষান্তরে আব্দুল মালিক হচ্ছে পৃথিবীর বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি।
পুনরায় বলে :‘ কতদিন যাবৎ একটি কবর ও পচে যাওয়া অস্থিগুলির চারপাশে ঘুরবে ?’ ১৫৩ এ কথার দ্বারা রাসূলের (সা.) মর্যাদাকে অস্বীকার করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। অতঃপর সে তার অবাধ্যতাকে এই পর্যায়ে উন্নীত করে যে , মক্কার হজ্জ ও আল্লাহর ঘরের চারপাশে তাওয়াফ করার পরিবর্তে আদেশ দেয় যে , সিরিয়াবাসীরা বাইতুল মুক্বাদ্দাসে যাবে , ইহরাম বাঁধবে এবং বাইতুল মুক্বাদ্দাসের ভিতরে , শিলাখণ্ডের চারদিকে তাওয়াফ করবে। অতঃপর ইহরাম হতে মুক্ত হবে।১৫৪
খলীফা মতাদর্শের অনুসারী মুসলমানদের এই দলের বিপরীতে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের কারণে অপর একদল মুসলমান জেগে উঠেন এবং আহলে বাইতের ইমামগণের (আ.) নিকট হতে প্রকৃত ইসলামকে ধারণ করেন। যেমন খুলাফা মতাদর্শের অনুসারীরা বিশ্বাস করত যে ,“ ওয়াসিয়া কুরসিয়্যুহুস্ সামাওয়াতি ওয়াল আরয্ ।” ১৫৫ এই আয়াতাংশের অর্থ এই যে ,‘ আল্লাহর দেহ রয়েছে এবং তিনি কুরসীর (চেয়ার) উপর বসে রয়েছেন। ’ উক্ত কুরসীটি বস্তু সত্তার অধিকারী এবং আল্লাহর দেহ , কুরসীর চারদিকে চারহাত করে অতিরিক্ত প্রসারিত রয়েছে।১৫৬ এই অর্থের স্থলে আহলে বাইতের ইমামগণ (আ) আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে , কুরসীর অর্থ আল্লাহর জ্ঞান। আল্লাহর জ্ঞান আসমান ও জমিনকে বেষ্টন করে রেখেছে।১৫৭ সুতরাং হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের ফলে এবং আহলে বাইতের ইমামগণের চেষ্টা সাধনার বিনিময়ে ইসলামের আক্বীদা বিশ্বাস ও বিধি বিধান সমাজে পুনরায় ফিরে আসে।
হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের অপর অবদান এই যে , সেই সময় পর্যন্ত খুলাফা মতাদর্শে ইসলামের বিধান ছিল খিলাফতের অধীন। ইয়াযীদের খিলাফতের সময় থেকে ধর্ম হতে খিলাফত পৃথক হয়ে যায়।
ইয়াযীদের পূর্ব পর্যন্ত খলীফা যা কিছু বলত তাই ইসলামের বিধান হিসেবে গণ্য হত। কিন্তু হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর , খলীফা মতাদর্শের আলিমরা যেমন মালিক ইবনে আনাস ও আবু হানীফা প্রমুখ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হন। অর্থাৎ খলীফা মতাদর্শে ইসলামের আলিমরা খিলাফত হতে পৃথক হয়ে যায় এবং সেইদিন থেকে ধর্ম হতে রাজনীতি পৃথক হয়। অবশ্য , সেইরূপ খিলাফত ও শাসন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব হতে ধর্মের পৃথক হওয়া আবশ্যক ছিল। তবে আহলে বাইতের ইমামগণ (আ.) খলীফা হলে তাঁরা নিষ্পাপ বিধায় যা কিছু বলবেন ও আমল করবেন তাই ধর্মীয় বিধান বলে গণ্য হবে। আর আহলে বাইতের ইমামগণের পর , নীতিবান ফকীহর (ফকীহে আদেল) দায়িত্ব হল ইসলামী সরকার গঠন করা। এমনটি নয় যে , মুসলমানরা যে কোনো জালিম ও অত্যাচারী ব্যক্তির হাতে বাইআত করলেই সে মুসলমানদের অভিভাবক হবে ও তার আনুগত্য করা ওয়াজিব হয়ে যাবে এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ হবে না।
পৃথিবী ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের নিকট হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) আন্দোলনের আহ্বান হচ্ছে এই যে , যখনই কোনো শাসক অত্যাচারী হবে এবং রাসূলের (সা.) সুন্নতের বিপরীত আমল করবে তখনই তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) পর হতে আজ পর্যন্ত যে কোনো আন্দোলনই হয়েছে , তার পিছনে তাঁর শাহাদতের অবদান রয়েছে।
ইমাম খোমেনী (রহ.) যে আন্দোলন করেছিলেন এবং শিয়ারা তাঁর পতাকা তলে তাগুতের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন , সেইটিও ছিল হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) আন্দোলনের ফল। ইরানে‘ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ’ প্রতিষ্ঠিত হত না , যদি অত্যাচারী ও খোদাদ্রোহিতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মত শিয়া জনগণের হুসাইনী প্রশিক্ষণের অবদান না থাকত।
ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিস্থাপক ও রাহবার স্বয়ং‘ হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) আন্দোলনকে ব্যবহার করেছেন। এই মূলধন শিয়াদের সমাজে বিদ্যমান ছিল। কোনো ব্যক্তির অধীনে মূল্যবান কোনো মূলধন থাকলে যেমনটি হয় , ইমাম খোমেনী (রহঃ) তেমনভাবে সেই মূলধনকে কাজে লাগিয়েছেন । চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে , রণাঙ্গনে গমন করাটাও ছিল এই আদর্শের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিয়াদের শাহাদত কামনার ফল স্বরূপ। ইরানী জনগণের আন্দোলন ও ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা , অন্যান্য ইসলামী দেশে অপর মুসলমানদের জেগে উঠার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশ্ন ও উত্তর
১। প্রশ্ন : বাহ্যতঃ আপনার আলোচনাকে কয়েকটি মূল বিষয়ে বিন্যস্ত করা যায় :
প্রথমত : মুয়াবিয়ার পর ইসলামী সমাজের অবস্থা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) সেই অবস্থাকে মানতে পারছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে সে অবস্থাকে মেনে নেয়ার অর্থই ছিল ইসলামকে ধ্বংস করে দেয়া।
দ্বিতীয়ত , ইমাম হতে বাইআত গ্রহণের জন্যে ইয়াযীদের চাপ প্রয়োগ প্রকৃতপক্ষে আন্দোলনের সূচনা বিন্দু আর ইমামের (আ.) বিদ্রোহ হচ্ছে এই পদক্ষেপের বিপক্ষে এক প্রকার প্রতিরোধ স্বরূপ।
তৃতীয়ত : সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ এমন এক আকার ধারণ করেছিল যে , খলীফার আনুগত্যকে ধর্ম হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল। এই জন্যে হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ এই বিষয়টিকে পরিষ্কার করার চেষ্টায় ছিলেন যে , খলীফার বিপক্ষে বিদ্রোহ করা সম্ভব এবং খলীফার আনুগত্য করা আবশ্যক নয়।
চতুর্থত : ইমাম (আ.) মক্কায় থাকা কালে , তাঁর নিকট কুফাবাসীদের আহ্বান সম্বলিত বিপুল পরিমাণ পত্র পৌঁছেছিল। এর দ্বারা তারা ইমামের (আ.) নিকট এক প্রকার চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করেছিল। আর এই কারণে তাঁর নীরব থাকা অসম্ভব। তাদের দাওয়াত গ্রহণ ও আহ্বানে সাড়া দেয়া , আইনতঃ (শরীয়তগতভাবে) তাঁর উপর ওয়াজিব হয়ে গিয়েছিল।
পঞ্চমত : এই যে , ইমাম হুসাইন(আ.) শাহাদতকে ইসলামের পুনর্জাগরণের নিয়ামক হিসেবে লক্ষ্য করেছিলেন এবং প্রকৃতপক্ষে শাহাদতের মাঝে চূড়ান্ত বিজয়কে সন্ধান করছিলেন।
এখন আমরা যদি বিদ্রোহের কারণ , উদ্দেশ্য ও দর্শন সম্পর্কে আপনার আলোচনাকে তাত্ত্বিক রূপ দিতে চাই তাহলে কি আমরা সমগ্র আন্দোলনকে মাত্র একটি বাক্যে প্রকাশ করতে পারব ? না , আপনার মতে বিষয়টির বিভিন্ন দিক ও উদ্দেশ্য রয়েছে ? আপনি অবহিত আছেন যে , শহীদ মোতাহ্হারীর মত কতিপয় গবেষক এই বিষয়টিকে এই ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন‘ সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধই ’ ছিল এই আন্দোলনের মূল নিয়ামক। অবশ্য , তারা অন্যান্য দিক ও বিভাগের কথাও বলেছেন। কেউ কেউ কুফায় শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকে মূল ও কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য হিসেবে স্বীকার করেছেন। অপর এক দল পণ্ডিত , বিশেষ করে সায়্যিদ ইবনে তাউসের যুগের পণ্ডিতগণ শাহাদতকে আন্দোলনের মূল প্রেরণা বলে বিশ্লেষণ করেছেন। শহীদ মোতাহ্হারীও নিজ মতামতের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করেছেন।
আপনি বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন ? আর চূড়ান্ত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে , আন্দোলনের সামগ্রিকতাকে কি প্রতিরোধমূলক একটি কাজ হিসেবে গণ্য করছেন ? না , সেইটিকে আক্রমণাত্মক একটি কাজ বলে বিশ্লেষণ করছেন ?
উত্তর :
প্রথমতঃ হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) যেহেতু ইসলামের নবীর (সা.) স্থলাভিষিক্তগণের অন্তর্গত১৫৮ এবং তাঁর মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামের ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধি বিধানকে সংরক্ষণ করা। সেহেতু এই দায়িত্বকে পালন করা তাঁর কর্তব্য , যদিও তিনি এই পথে নিহত হন। আর এই বর্ণনার দ্বারা অনেকগুলি প্রশ্নের উত্তর চলে আসে।
দ্বিতীয়তঃ ইমাম খোমেনী (রহঃ) ও শহীদ মোতাহ্হারীর লিখাগুলি যতদূর দেখেছি তাতে কেউই এই কথা বলেন নি যে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) উদ্দেশ্য ছিল শাসন ক্ষমতা দখল করা। এইরূপ দৃষ্টিগোচর হয় যে , জনগণের নিকট হতে তিনি বাইআত গ্রহণ করার কারণে অনেকে ধারণা করেছেন যে , তিনি খলীফা হওয়ার জন্যে বাইআত গ্রহণ করেছেন , যদিও আজকাল আমরা বাইআত গ্রহণের অর্থ জানি না। রাসূল (সা.) তাঁর সাহাবীগণের নিকট হতে তিনবার বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম আক্বাবার বাইআতটি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছিল।১৫৯ দ্বিতীয় আক্বাবার বাইআতটি ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।১৬০ সোলহে হোদায়বিয়ার ঘটনায় বাইআতুর রিদওয়ানটি ছিল মক্কার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে।১৬১ ইমাম জা’ ফর সাদিকের (আ.) যুগেও , মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে হাসান ইবনে হাসানের (আ.) নিকট বাইআত গ্রহণের কারণ ছিল এই যে , বনী হাশিম বংশের লোকেরা ধারণা করছিল , তিনি স্বয়ং হযরত মাহ্দী (আ.) এবং তাঁর নিকট তারা বাইআত করেছিল। বনী উমাইয়্যা বংশের যুগ তখন শেষ হতে যাচ্ছে , ফলে বনী হাশিম বংশের লোকেরা তাঁর নিকট বাইআতের জন্যে সমবেত হয়। কাহিনীর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ :
বনী হাশিম বংশের কিছু সংখ্যক লোক মদীনার বাইরে‘ আব্ওয়া’ নামক এলাকায় সমবেত হয়। তাদের মাঝে মনসুর দাওয়ানিকী , মনসুরের চাচা সালিহ্ ইবনে আলী ইবনে আব্বাস , আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান (হাসানে মুছান্নার ছেলে) এবং তার দুই ছেলে মুহাম্মদ ও জা’ ফর উপস্থিত ছিল।
সালিহ্ ইবনে আলী বক্তব্য প্রদান করে বলে :‘ তোমরা সেই সব লোককে চিন অন্যান্য লোকেরা যাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং তাদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এখন যেহেতু মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে এখানে সমবেত করেছেন সেহেতু তোমাদের নিজেদের মাঝে কোনো এক ব্যক্তির নিকট তোমরা বাইআত কর। তাহলে মহান আল্লাহ্ বিজয় ও প্রশস্ততা দান করবেন। আর তিনি হচ্ছেন সর্বোত্তম প্রশস্ততা দানকারী। ’
অতঃপর আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা জ্ঞাপন করে বলে :“ তোমরা জেনে রেখ যে , আমার এই সন্তান মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ই হচ্ছে সেই ইমাম মাহ্দী ! সুতরাং এসো , তার নিকট বাইআত গ্রহণ করি !”
আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসানের সত্যায়নে আবু জা’ ফর মনসুর দাওয়ানিকী বলে :“ আপনি কেন নিজেকে ধোকা দিচ্ছেন ? আল্লাহর শপথ ! আপনি জানেন যে , লোকেরা সবচেয়ে বেশি এই যুবকের (মুহাম্মদের) প্রতি আকৃষ্ট এবং তাকে ছাড়া অন্য কাউকেই এত সাদরে গ্রহণ করবে না ।” (মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ই ছিল তার লক্ষ্য।)
সকলে বলল :“ হ্যাঁ , আল্লাহর শপথ ! তুমি সত্য বলেছ। ইনিই সেই ব্যক্তি যাকে আমরা চিনি ।” তারপর তারা সকলেই মুহাম্মদের প্রতি হাত বাড়িয়ে তার নিকট বাইআত করে। অতঃপর ইমাম সাদিকের (আ.) সন্ধানে যায়।
ইমাম (আ.) আসেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান তাঁকে নিজের পাশে স্থান দেয় সেই কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করে। ইমাম (আ.) তাদেরকে বলেন :“ এই কাজ করো না ! কেননা , এখনও সেই যুগ (প্রতিশ্রুত মাহ্দীর আবির্ভাবের যুগ) আসে নি। হে আব্দুল্লাহ্ ! যদি এইরূপ ধারণা কর যে , প্রতিশ্রুত মাহ্দী হচ্ছেন তোমার এই সন্তান তবে জেনে রেখ যে , এই ব্যক্তি সেই ব্যক্তি নয় ! এই যুগটি ইমাম মাহদী(আ.) এর যুগ নয় ! কিন্তু তোমার লক্ষ্য যদি এই হয় যে , তুমি নিছক আল্লাহর জন্যেই ক্রোধান্বিত হবে (আন্দোলন করবে) এবং সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে , তাহলে আল্লাহর শপথ ! আমরা তোমাকে পরিত্যাগ করব না এবং তোমার সন্তানের নিকট বাইআত করব। কারণ তুমি আমাদের বনী হাশিম বংশের সম্মানিত ব্যক্তি ।”
আব্দুল্লাহ্ রাগান্বিত হয়ে বলে :“ আপনি স্বয়ং জানেন যে , আপনি আপনার জ্ঞানের বিপরীত কথাবার্তা বলছেন ! আল্লাহর শপথ ! আল্লাহ্ আপনাকে তাঁর ইলমে গায়িব সম্পর্কে প্রতি অবগত করান নি ! বরং আপনার হিংসা আপনাকে , আমার ছেলের ব্যাপারে এইরূপ কথাবার্তা বলতে বাধ্য করেছে !”
ইমাম (আ.) বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! এইরূপ নয় ! তোমার প্রতি হিংসা আমাকে এইরূপ কথাবার্তা বলতে বাধ্য করে নি। তবে এই ব্যক্তি (আবুল আব্বাস আস্ সাফ্ফা) , তার ভাই ও ছেলেরা তোমার অগ্রবর্তী হচ্ছে ।” অতঃপর তিনি আব্দুল্লাহর কাঁধে হাত রেখে বলেন :“ আল্লাহর শপথ ! না তুমি ক্ষমতা পাবে আর না তোমার দুই পুত্র। বরং ক্ষমতা তাদেরই হস্তগত হবে এবং তোমার দুই পুত্র নিহত হবে !” ১৬২
অতএব , যা কিছু বর্ণিত হল এবং যা কিছু ইমাম সাদিক (আ.) হতে আমরা দেখলাম (ক্ষমতার জন্যে বাইআত প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও , সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায়ের প্রতিবাদের জন্যে বাইআতকে বৈধ মনে করেছেন) তার উপর ভিত্তি করে বোঝা যায় যে , ইসলামে যে কোনো বাইআতই শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্যে নয়। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতি নিষেধের জন্যে এবং ইয়াযীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। আর এইটি স্পষ্ট ছিল যে , তিনি যদি বাস্তবেও বিজয়ী হতেন তবে শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করতেন ।
হুরের সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রদত্ত একটি ভাষণে ইমাম (আ:) এই কাজেরই দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন।১৬৩
মদীনায় অবস্থানরত বনী হাশিম বংশের লোকদের উদ্দেশ্যে , মক্কা হতে লিখা তাঁর একটি পত্রে তিনি লিখেন :“ আপনাদের মধ্যে থেকে যে ব্যক্তিই আমার সাথে সংযুক্ত হবেন , তিনিই শহীদ হবেন ! আর যে ব্যক্তিই এর বিরোধিতা করবেন , তিনি সফলতা লাভ করতে পারবেন না ।” ১৬৪
আর এইরূপ বাইআত গ্রহণ , তাঁর‘ নিহত হওয়ার ’ জ্ঞানের সাথে সাজুয্য রাখে। তিনি জানতেন যে , নিহত হবেন তবুও তাঁর বিদ্রোহ করা উচিত। বিদ্রোহের জন্যেও বাইআত গ্রহণ আবশ্যক ছিল। বর্তমান সময়ে অনেকের ধারণা যে ,‘ যুগের ইমাম(আ.) আবির্ভূত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। ’ এই মতটি পূর্বোক্ত বর্ণনার পুরোপুরি বিপরীত। কিছু সংখ্যক অজ্ঞ লোকেরা ধারণা করে যে , শুধু যুগের ইমাম (আ.) প্রকাশ লাভ করলে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা যাবে! আমি এই শ্রদ্ধেয়জনদের নিকট প্রশ্ন করতে চাই :
মানুষের জন্যে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গরূপে এসেছে কি না ?
যদি ইসলাম পরিপূর্ণ হয় এবং মানুষ ও তার জীবন যাপনের জন্যে তার পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচী থাকে তাহলে এই কর্মসূচীসমূহ কিভাবে বাস্তবায়িত হবে ? যুগের ইমামের দীর্ঘকালীন অন্তর্ধানের (পূর্ণ গাইবাতের) সময়ে মুসলমানরা কি ইসলামী সরকার গঠন করতে ও ইসলামী বিধি বিধানকে কার্যকর করতে পারবে না ? চোরের হাত কাটতে ও ইসলামী অন্যান্য শাস্তির বিধানকে বাস্তবায়ন করতে পারবে না ?
প্রকৃতপক্ষেই কি ইসলামী সরকার গঠন করা সম্ভব হবে না এবং ইসলামী দেশগুলোতে কি ইসলাম বিরোধী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে ? অথবা না , সম্ভব হবে ? আমরা বিশ্বাস করি যে , যুগের ইমাম (আ.) প্রকাশ লাভ করে ইসলামী সরকার গঠন করবেন এর অর্থ এই যে , তিনি সার্বিক অর্থে ইসলামী ন্যায় বিচারের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি এমন এক সরকার গঠন করবেন যা ইতিহাসের পরিক্রমায় এমনকি পূর্ববর্তী কোনো নবীর (সা.) যুগেও ছিল না এবং তাঁর যুগে কোনো প্রকার জুলুম অত্যাচার থাকবে না । এ সম্ভাবনাও আছে যে , সম্ভবতঃ তিনি অত্যাচারিতের ডাকে সাড়া দেয়া এবং শাস্তি ও বিধি বিধানের বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর নিজ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করেই কাজ করবেন। বাহ্যিক কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ ও দলীলের প্রয়োজন বোধ করবেন না। যেমন মতবিরোধপূর্ণ কোনো বিষয়ে দুইজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যের মুখাপেক্ষী হবেন না ইত্যাদি।
অতএব ,তাঁর সরকার হবে বিশেষ একটি সরকার। এমন একটি সরকার যে , মানবতার ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই। এমন নয় যে ,তাঁর আন্দোলনের পূর্বে মুসলমানরা সরকার গঠন করতে পারবেন না। যদি এরূপই হয় যে , মুসলমানরা শরীয়ত সম্মত সরকার গঠন করতে পারবেন না। তাহলে কিভাবে ইসলামকে মানবতার সৌভাগ্যের নিশ্চয়তা দানকারী বলে স্বীকার করা যায় ? যদি এই ধরনের ধারণা থেকে থাকে তবে এইটি কত বড় ভুল ধারণা !
সুতরাং এইরূপ নয়। আমরাও ইসলামী সরকার গঠন করতে পারব। সেক্ষেত্রে ন্যায়পরায়ণ ফকীহ্ , ইসলামী সরকার গঠন করবেন। অবশ্য , আমরা বলছি না যে , ন্যায়পরায়ণ ফকীহর সরকার ঠিক হযরত মাহ্দীর (আ.) সরকারের মত হবে , তাতে কোনো ত্রুটি থাকবে না এবং ফকীহর গঠিত ইসলামী সরকারের উচ্চপদস্থ সকল ব্যক্তিই ত্রুটিহীন হবেন। না , হতে পারে ইসলামী বিন্যাস কাঠামোতে বিভিন্ন ত্রুটি এবং সমস্যা থাকতে পারে। তবে এইরূপ সমস্যা ও ত্রুটিসমূহ , সরকার গঠনের আবশ্যকতাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করবে না।
আসল আলোচনায় আমরা ফিরে যাই
হ্যাঁ , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) জানতেন যে , তিনি ক্ষমতা লাভ করতে পারবেন না , এই অবস্থা সত্ত্বেও তিনি লোকজনের নিকট হতে বাইআত গ্রহণ করেছেন। কি উদ্দেশ্যে ? খোদা দ্রোহীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যেই শুধু বাইআত গ্রহণ করেছেন , ক্ষমতা লাভের জন্যে নয় ! উদাহরণ স্বরূপ , বর্তমানে ইরাকে স্বৈরাচারী‘ সাদ্দাম ’ ক্ষমতায় রয়েছে এবং মুসলমানদেরকে হত্যা করছে ; ইরাকের লোকদের কি করা উচিত ? তার যে কোনো ইচ্ছা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দেয়া উচিত কি ? অথবা না , লোকেরা তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করবেন ? এতে যদি তারা ক্ষমতা লাভ করে তো করবে আর যদি ক্ষমতা লাভ না করে তবুও তার বিরুদ্ধে আন্দোলন পরিত্যাগ করা উচিত হবে না। আমি তো বিষয়টিকে এই ভাবেই বুঝেছি। ইমাম খোমেনীর (রহ.) লেখা আমি যতটুকু দেখেছি এবং মরহুম জনাব মোতাহ্হারীর বক্তব্যগুলি যতটুকু শুনেছি তা এমনই ছিল। এর বিপরীত কিছু দেখিনি।
ইমাম হুসাইন (আ.) বিদ্রোহ করেছেন , বাইআত গ্রহণ করেছেন , ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্যে বাইআত এবং এই বিদ্রোহকে শরীয়ত সম্মত ও ওয়াজিব হিসেবে জেনেছেন। এই বিদ্রোহ ও বাইআতের অপরিহার্য শর্ত এটি ছিল না যে , তিনি তাঁর নিহত হওয়াকে অবিশ্বাস করেছেন। বরং তিনি তাঁর নিহত হওয়াকে প্রাণপণে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও ইয়াযীদের বিপক্ষে বিদ্রোহ ঘোষণা করাকে ওয়াজিব গণ্য করেছেন।
২। প্রশ্ন :
আন্দোলন প্রকৃতিগত ও মানবিক হওয়া এবং শাহাদত সম্পর্কে ইমামের পূর্ব জ্ঞান এই দুয়ের মাঝে কি বিরোধ দেখা দেয় না ?‘ আন্দোলন ঐশী ও আধ্যাত্মিক হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ’ এবং‘ জাগতিক ও সামাজিক হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ’ এই দুয়ের মাঝে ও কি কোনরূপ দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নেই ? উদাহরণ স্বরূপ , ইমাম (আ.) যখন হুরের মুখোমুখি হয়েছেন তখন বলেছেন“ আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও , আমি ফিরে যাব ।” এই কথাটি কিভাবে ,‘ শাহাদত কামিতা ও স্বীয় শাহাদত সম্পর্কে পূর্বজ্ঞান’ এর সাথে সমন্বিত হতে পারে ?
উত্তর :
যেমন আলোচনার মধ্যে বলা হয়েছে সার্বিকভাবে ইমাম হুসাইনের শাহাদতের পটভূমি , বিরাজমান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় তাঁর শাহাদত ব্যতীত ধর্মের পুনর্জাগরণ সম্ভব হত না। এমনকি , আলী আসগরকে যেভাবে শহীদ করা হয়েছে , তিনি যদি সেভাবে শহীদ না হতেন তবে খিলাফত ব্যবস্থার পবিত্রতা ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হত না এবং লোকেরা মর্মান্তিক ঘটনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারত না। জনগণকে সুপথ দেখানোর জন্যে এবং জাগ্রত করার জন্যে এই সব ক্ষুদ্রক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম বিষয় সমুহের সমন্বয়ের প্রয়োজন ছিল।
ইমাম (আ.) আশুরার রাতে তাঁর সকল সাথি ও পরিবার পরিজনকে এ বিষয়ে অবগত করেন যে , পরের দিন তারা সকলে শহীদ হবে , কেউ চলে যেতে চাইলে যেতে পারে।১৬৫ ঘটনার এটি একটি দিক। অপরদিকে পরিখা খনন করার জন্যেও আদেশ দিয়েছেন ! কেন ? সকলেই যখন শহীদই হবেন তখন যত দ্রুত হয় ততই ভাল ! কিন্তু না ! পরিখা খনন করেছেন এবং তার মাঝে আগুন জ্বালিয়েছেন যাতে যুদ্ধে পরাভূত না হন আর চূড়ান্ত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ হাত ছাড়া না হয়। আশুরা দিবসে ইমাম (আ.) অবশ্যই সকলের প্রতি তাঁর চূড়ান্ত যুক্তি প্রমাণকে পূর্ণ করবেন। কারণ তিনি হচ্ছেন সুপথ প্রদর্শনকারী। তাঁর যাবতীয় পদক্ষেপ হচ্ছে জনগণের হেদায়াতের জন্যে যদিও তিনি একাই হন। আপনারা জানেন যে , যুহাইর ইবনে কাইন‘ উছমানী মাযহাবের ’১৬৬ লোক ছিলেন। পূর্বে তিনি আহলে বাইতের (আ.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন অর্থাৎ আলীর (আ.) শত্রুছিলেন। ইমাম (আ.) তাঁকে হুসাইনী (হুসাইনের অনুসারী) করেছিলেন। তিনি মক্কা হতে ফিরে আসার পথে , ইমামের সাথে এক স্থানে একত্রিত না হওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। যখন নিরুপায় হয়ে তিনি একই স্থানে ইমামের সাথে অবতরণ করলেন তখন ইমাম তাঁর নিকট লোক পাঠালেন এবং তাঁকে আহ্বান জানালেন। ইমামের প্রেরিত লোকটি যখন তাঁর নিকট গেলেন তখন তিনি আহার করছিলেন। তিনি তাঁকে আহ্বান করাতে তাঁর সাথিরা চমকে উঠল। তবে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ডেকে বললেন :‘ যুহাইর ! রাসূলের (সা.) নাতি তোমাকে আহ্বান করছেন আর তুমি গড়িমসি করছ ?!’ যুহাইর দেখা করে ফিরে এলেন। তাঁর চেহারার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল ! তিনি তাঁর সাথিদেরকে বললেন :“ তোমাদের সাথে এটিই আমার শেষ সাক্ষাৎ !” তাঁর স্ত্রীকে বললেন :“ তুমি তোমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে মিলিত হও ।” অতঃপর তিনি তাঁর সাথিদেরকে কোনো একটি যুদ্ধের ঘটনা এবং আশুরার দিবস সম্পর্কে রাসূলের (সা) জনৈক সাহাবী প্রদত্ত সংবাদটি শুনালেন। কারণ তারা সকলেই রাসূলের (সা.) নিকট হতে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) আন্দোলনের সংবাদটি শুনেছিলেন এবং জানতেন যে , তাঁর আন্দোলনে শাহাদত বিদ্যমান।১৬৭
অতএব ,সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কর্মে বাধা দানের জন্যে ইমামের আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল। উপরন্তু এই কাজের মাধ্যমে ইসলাম অবশিষ্ট থাকবে। তিনি আন্দোলন না করলে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। তিনি তাঁর আন্দোলন দ্বারা তৎকালীন মুসলমান ও আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন :
১। অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কর্তব্য।
২। শুধুমাত্র বিজয় অর্জন ও সামরাজ্যের বিস্তৃতির জন্যেই জিহাদ নয়।
তবে“ আমাকে ছেড়ে দাও , আমি ফিরে যাব ”১৬৮ এই কথার সাথে“ শাহাদত সম্পর্কে তাঁর পূর্ব জ্ঞান ” কিভাবে খাপ খায় ? এর উত্তর এই যে , বনী উমাইয়্যা বংশের প্রতি চূড়ান্ত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করা ইমামের (আ.) কর্তব্য ছিল। কারবালা পর্যন্ত তাঁর আসার মাধ্যমে কতকগুলি কাজ সম্পাদিত হয়েছিল অর্থাৎ তৎকালীন দুনিয়া উপলব্ধি করেছিল যে , ইয়াযীদের নিকট আলীর পুত্র হুসাইন (আ.) বাইআত করেন নি। আর এখন যে , তিনি ফিরে যেতে চাচ্ছেন তবুও ইয়াযীদের হাতে বাইআত করেন নি। শুরু হতে শেষ পর্যন্ত এই ছিল ইমামের বক্তব্য। কারবালা প্রান্তরেও তিনি বলেন :
“ তোমরা যখন গ্রহণ করছ না এবং নিজ প্রতিশ্রুতির উপরও অটল নও তখন দু’ টির যে কোনো একটিকে গ্রহণ কর , হয় মদীনায় ফিরে যেতে দাও নতুবা ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে দাও ।” ১৬৯ এর মাধ্যমেও তিনি চূড়ান্ত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন যাতে তারা না বলে যে , আমরা নিরুপায় হয়েই তাঁকে হত্যা করেছি ! এই কাজটি অতীতের চেয়ে অধিক মাত্রায় তাদের অত্যাচারের মুখোশকে খুলে দিয়েছে। ইমাম (আ.) জানতেন যে , এরা বিরত হবে না। আর সেই জন্যেই তিনি এই কাজের মাধ্যমে চূড়ান্ত যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। তিনি রাজক্ষমতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ইরাক হতে ফিরে আসতে চাওয়ার বিষয়টিও প্রমাণ করে না যে , তিনি পুনরায় আন্দোলন করবেন না। যেহেতু তিনি বাইআত করেন নি এবং করতেনও না সেহেতু তিনি স্বাধীন ছিলেন। ফিরে যাওয়ার পর পুনরায় প্রচেষ্টা করতেন এবং অপর একটি আন্দোলনের পটভূমি রচনা করতেন। সুতরাং যে কোন অবস্থায়ই তাঁকে আন্দোলন করতে হত ।
হ্যাঁ , যদি তিনি বাইআত করতেন তবে আর কোন পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ থাকত না এবং আত্মসমর্পণ করা তাঁর আবশ্যক হয়ে যেত। কিন্তু ইমাম (আ.) পূর্ণ স্পষ্টতার সাথে বলেন :“ আমি বাইআত করব না!” যাতে করে খিলাফত কর্তৃপক্ষের সমস্যা বলবৎ থাকে। এমনকি যদি আমরা ধরেও নেই যে , তারা ইমামকে (আ.) ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিত তবুও সেইখানেই তাঁর আন্দোলন তাঁর কিছু উদ্দেশ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। কেননা তিনি তাদেরকে বলেন :“ আমি ইয়াযীদের নিকট বাইআত করব না। তোমরা বলেছিলে এবং লিখেছিলে :‘ আমাদের নিকট আসুন , আমরা আপনার সহযোগী হব !’ আমি এসেছি। এখন তোমরা যদি আমাকে ফিরে যেতে না দাও তবুও আমি বাইআত করব না !”
৩। প্রশ্ন :
আপনার বক্তব্যের আলোকে , আমরা কি মুসলমানদের শিক্ষাপ্রক্ষণকেও ইমাম হুসাইনের (আ.) বিপ্লবের ফল হিসেবে গণ্য করব ?
উত্তর :
হ্যাঁ , এটি ইমামের (আ.) বিপ্লবের অন্যতম ফল ছিল অর্থাৎ নির্ভেজাল ও খাঁটি ইসলাম , মুহাম্মদের (সা.) খাঁটি ইসলামকে পরিচয় করানো। যেমন বসরার যুদ্ধে যখন হযরত আয়িশার সৈন্যবাহিনীর উপর হযরত আলীর (আ.) সৈন্যবাহিনী বিজয় লাভ করল তখন পূর্ববর্তী খলীফাদের অনুসৃত নীতির উপর ভিত্তি করে তাদের ধারণা ছিল এই যে , বসরা তাদের অধিকারভুক্ত হওয়ার পর বিরোধীদের সমস্ত অর্থ সম্পদ ও যথাসর্বস্ব তাদের জন্যে বৈধ গণ্য হবে। এমনকি তাদের নারী ও শিশুদেরকেও বন্দী এবং তাদের মাঝে ভাগ বণ্টন করা হবে। ঠিক আবু বকরের যুগে সংঘটিত যুদ্ধগুলির ন্যায় হবে যেগুলিতে বিরোধী দলের অর্থ সম্পদগুলি তারা গ্রহণ করে এবং তাদের নারীদেরকে বন্দী করে। কিন্তু ইমাম (আ.) এই কাজে বাধা দান করেন এবং বলেন :“ এরা মুসলমান এবং ইসলামের ভিত্তির উপর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সৈন্যদের নিকট হতে যেই সব গনিমত তোমরা পেয়েছ সেইগুলিই তোমাদের সম্পদ। আর তাদের অর্থ সম্পদ , নারী ও শিশুদের উপর তোমাদের কোনরূপ অধিকার নেই ।” কিন্তু ইমামের (আ.) এই পদক্ষেপ ও বক্তব্য সৈন্যদের মাঝে সাদরে গৃহীত হল না। অনেকেই গোলযোগ করা আরম্ভ করল এবং বলল :“ আপনি ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করলেন না ! এইটি কিরূপ সিদ্ধান্ত যে , তাদের রক্তপাত করা আমাদের জন্যে বৈধ অথচ তাদের অর্থ সম্পদ ও নারীরা আমাদের জন্যে নিষিদ্ধ ?!”
তিনি বললেন :“ এরা ইসলামের আইন অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করেছেন ইত্যাদি ।” এতে যখন তারা সন্তুষ্ট হল না তখন ইমাম (আ.) অন্য পন্থা অবলম্বন করলেন এবং বললেন :“ খুব ভাল কথা , যখন তোমরা গ্রহণ করছ না এবং নিজেদের অংশ চাচ্ছ , তাহলে তোমাদের মাঝে কোন্ ব্যক্তি‘ উম্মুল মু’ মিনীন হযরত আয়িশাকে ’ নিজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে ? যদি নারীদেরকে তোমরা বন্দিনী করতে চাও তবে তিনি তাদের নেত্রী , তাঁকে প্রথম বন্দী কর !” এর মাধ্যমে গোলযোগ সৃষ্টিকারীরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে ও ইমামের (আ.) আদেশের নিকট মাথা নত করে এবং এর মাধ্যমে ধর্মীয় বিধানাবলির কিয়দংশ শিক্ষা গ্রহণ করে।
অন্যান্য যুদ্ধেও পূর্ববর্তী খলিফাদের অনুসৃত নীতির প্রতিফলন দেখা যায় যেমন মুয়াবিয়া বলতেন :‘ যেখানেই তোমরা প্রবেশ করবে সেখানেই হত্যা করবে এবং তাদের অর্থ সম্পদগুলি লুটতরাজ করবে ইত্যাদি। ’ কিন্তু ইমাম (আ.) তাঁর সৈন্যবাহিনীকে বলতেন :“ যেখানেই তোমরা প্রবেশ কর , শুধুমাত্র তখনই সেখানকার পানপাত্র হতে তোমাদের জীব জন্তুগুলিকে পানি পান করাও যখন তারা তাদের পশুদের পানি পান করানো সম্পন্ন করেছে , কারও অর্থ সম্পদ নিবে না এবং কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নিজের সাথে নিয়ে যাবে না। যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হয় তবে তা ভাড়া নিবে এবং তার ভাড়ার অর্থ প্রদান করবে ।” এই সব কারণেও ইমামের (আ.) সৈন্যরা অনেক ক্ষেত্রে ইমামের আহ্বানে সাড়া দিতনা। কারণ তার মাঝে দুনিয়া ছিল না। তারা এমন ধরনের জিহাদ কামনা করত যার সাথে দুনিয়া থাকবে। তারা পথ হারিয়ে ফেলেছিল। ইমাম হুসাইনের(আ.) আন্দোলনের অন্যতম ফলাফল এই ছিল যে , তা মুসলমানদেরকে সঠিক জিহাদের পথ দেখিয়েছিল।
৪। প্রশ্ন :
আপনার আলোচনা থেকে বোঝা যায় ইমাম হুসাইনের শাহাদত ও আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটানো এবং এটি একটি পর্যায়ক্রমিক এবং দীর্ঘ মেয়াদী কাজ , স্বল্প মেয়াদী ও তড়িৎ অনুভব যোগ্য কোন কাজ নয়। আমরা কি ঠিক বুঝেছি ?
উত্তর :
হ্যাঁ , তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল ইসলামের পুনর্জাগরণ। যদি ইমাম (আ.) বাহ্যিক ভাবে বিজয়ীও হতেন এবং তার নিকট বাইআত করতেন তবে ইসলাম পুনর্জীবিত হত না ! কেন ? এই জন্যে যে , ইমাম হুসাইন (আ.) যে শাসন প্রতিষ্ঠা করতেন , তা অবশ্যই তাঁর পিতা হযরত আলীর (আ.) প্রতিষ্ঠিত শাসনের চেয়ে সুদৃঢ় হত না।
ইমাম আলী (আ.) যা চেয়েছেন তাই কি তিনি বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন ? তিনি স্বয়ং বলেন :“ যে বিধানগুলিকে তারা (পূর্ববর্তী খলিফারা) পরিবর্তন করে দিয়েছে আমি সেগুলিকে ইসলামী সমাজে ফিরিয়ে আনতে চাই ।” তিনি আরও বলেন :“ আমি বলেছিলাম যে , জামাআতবদ্ধ হয়ে নফল নামায আদায় করো না , এইরূপ করা ঠিক নয় ! আমার সৈন্যদের মাঝ হতে‘ ওয়া সুন্নাতা , ওয়া সুন্নাতা উমার ’ এর ধ্বনি উচ্চারিত হল !” (চিন্তা করে দেখুন ! ইমামের সৈন্যরা ইমামের সাথে কিরূপ আচরণ করছে ?) তারা বলল :‘ আলী আমাদেরকে জামাআতবদ্ধ হয়ে মুস্তাহাব নামায আদায় করতে বারণ করছেন। ’ আলী (আ.) বলেন :“ সৈন্যদের মাঝে গোলযোগ সৃষ্টি হওয়ার ভয়ে আমি তাদেরকে তাদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেই ।” ১৭০
অতএব , যদি ইমাম হুসাইন (আ.) খলীফাও হতেন তবুও নিশ্চিত যে , তিনি মুয়াবিয়ার ক্ষমতাকে পরিবর্তন করতে পারতেন না। কারণ খিলাফতের প্রচলিত শিক্ষায় প্রশিক্ষিত জনগণ এই বিষয়গুলিকে বুঝতে পারত না এবং খলীফাদের নিয়মের যে কোনো পরিবর্তনকে তারা ইসলামের পরিবর্তন বলে গণ্য করত।
অন্যতম ভুল এই যে , লোকেরা বলে :‘ ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রতি পত্র লেখকরা শিয়া ছিল এবং পরবর্তীতে সেই পত্র প্রেরকরাই অর্থাৎ শিয়ারাই তাঁর সাথে বিরোধিতা করে। ’ না , তারা শিয়া ছিল না বরং খুলাফা মতাদর্শের অনুসারী ছিল। যেমন হযরত আমীরুল মু’ মিনীন (আ.) স্বয়ং , তাঁর নিকট বাইআত কারীদের সম্পর্কে খুৎবায় বলেন :“ যদি ইসলামের বিধানগুলিকে পূর্বের মত করে সমাজে ফিরিয়ে আনতে চাই তবে যারা আমার ইমামতকে কুরআন ও রাসূলের সুন্নাত থেকে গ্রহণ করেছে তাদের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যতীত , আমার অন্য কোনো সাহায্যকারী অবশিষ্ট থাকবে না ।” ১৭১
অর্থাৎ যারা ইমামের ইমামতকে কুরআন ও সুন্নাহ্ হতে গ্রহণ করেছিলেন তারা সংখ্যায় অল্প ছিলেন। আর পূর্ববর্তী খলীফারা যে সব বিধানকে পরিবর্তন করেছিলেন , ইমাম সেগুলিকে ইসলামী সমাজে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না। কারণ ইসলামের মূল কাঠামো হচ্ছে বিধি বিধান ও আকীদাসমূহ , শুধুমাত্র নাম নয়। যারা ইমাম আলী(আ.) এর নিকট বাইআত করেছিলেন তাদের অধিকাংশের মস্তিষ্কে এইরূপ চিন্তা ভাবনা ছিল যে , অন্যান্য খলীফাদের ন্যায় আলীও (আ.) একজন খলীফা। আর এই কারণে ইমাম (আ.) বলছেন :“ আমার সাথে কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। তবে তারা ব্যতীত , যারা আমার ইমামতকে কুরআন ও সুন্নাহ্ হতে গ্রহণ করেছেন ।” তারা সংখ্যায় স্বল্প ছিলেন। অন্যরা নিজ খেয়াল খুশিমত এইরূপ ধারণা করছিল যে , ইমাম (আ.) তাদের বাইআতের মাধ্যমে আমীর ও শাসক নির্বাচিত হয়েছেন।
সুতরাং ইমাম হুসাইনকে (আ.) পত্র প্রেরণকারী ও আহ্বানকারীদের অধিকাংশই খুলাফা মতাদর্শের অনুসারী ছিল এবং তাদের মাঝে খুব কম সংখ্যকই শিয়া ছিলেন। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) সম্পর্কেও তাদের হুবহু এই ধারণা ও চিন্তা ভাবনাই ছিল। তাদের মস্তিষ্কে এটা ছিল না যে , ইমাম (আ.) হচ্ছেন নিষ্পাপ , আল্লাহর পক্ষ হতে তিনি মনোনীত ইমাম এবং তিনি যা কিছু বলেন তার আনুগত্য করা আবশ্যক ! মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তারা ইমামকে (আ.) খিলাফতের জন্যে শ্রেয় ও অধিক উপযুক্ত জ্ঞান করছিল অর্থাৎ ইমামকে ইয়াযীদের চেয়ে ভাল মনে করছিল ! আর যখন ইমামের (আ.) বাইআত প্রতিষ্ঠিত হল না এবং তাদের ধারণা মত ইমাম (আ.) তাদের বাইআতের দ্বারা খলীফা হলেন না বরং তার পরিবর্তে ইবনে যিয়াদ ও ইয়াযীদের বাইআত প্রতিষ্ঠিত হল এবং ইয়াযীদ খলীফা হল। সুতরাং তাদের ধারণা অনুযায়ী ইমাম হুসাইনের(আ.)ও উচিত ইয়াযীদের হাতে বাইআত করা ও তার আনুগত্য করা। এক্ষেত্রে তারা এদু’ য়ের মাঝে পারস্পরিক বৈপরীত্যও দেখে নি ! বাইআত , খলীফা হওয়া এবং খলীফার আনুগত্য করা ; শাইখাইনের (প্রথম দু’ খলীফার) প্রবর্তিত একটি আদর্শ যা অনেক ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা.) সুন্নতের উপরও প্রাধান্য পেয়েছে !১৭২
হ্যাঁ , ইসলামী বিশ্বে এই বক্রতাসমূহ ও বক্র চিন্তা ভাবনাসমূহই ইমামকে (আ.) বিদ্রোহ করতে বাধ্য করেছে , যার ফলে তিনি ইয়াযীদের হাতে বাইআত না করে প্রাণ বিসর্জন দেন ! তা ছিল বিশেষ ও ব্যতিক্রমধর্মী এক প্রাণ বিসর্জন ! যাতে করে জনগণ জেগে উঠে এবং তথাকথিত খিলাফতের পবিত্রতার অলীক ধারণা ভঙ্গ হয় এবং এর মর্যাদার অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণিত হয়। আহলে বাইতের (আ.) অন্য ইমামগণ ইসলাম এবং তার বিধি বিধান ও আকীদাসমূহকে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ পান। মুহাম্মদী (সা.) খাঁটি ও নির্ভেজাল ইসলামকে ইসলামী সমাজে ফিরিয়ে আনার অনুকূল পরিবেশ পান।১৭৩
ওয়াস্ সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্।
তথ্যসূত্র :
১। সূরা নূর , আয়াত-১১।
২।‘ ইসলামের হাদীছের ক্ষেত্রে আয়িশার ভূমিকা ’ নামক পুস্তকে এই সম্পর্কে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে।
৩। সূরা জুমু ’ আহ্ , আয়াত-১১।
৪। দালায়িলুন্ নবুওয়াত , আবু বকর আহমাদ বাইহাক্বী।
৫। সহীহ্ বোখারী , ১ম খণ্ড , পৃ. ৩২-৩৩ , বাবু কিতাবাতিল ইলম এবং ২য় খণ্ড , পৃ. ১২০ , বাবু জাওয়ায়িযিল্ ওয়াফ্দ ইত্যাদি।
৬। তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃঃ ৬১৯ ; মুরূজুয্ যাহাব , ১ম খণ্ড , পৃ. ৪১৪ ; আলইস্তিআব , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৬৯ ; কানযুল উম্মাল , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৩৫ ; আল ইমামাহ্ ওয়াস্ সিয়াসাহ্ , ১ম খণ্ড , পৃ. ১৮ ইত্যাদি।
৭। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ১১৫।
৮। তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৪৪৩ , ৪৪৪ ; শরহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ১ম খণ্ড , পৃ. ১৩০-১৩৪ , আবূ বকর জওহারী বর্ণিত।
৯। তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৪৪৩ , ৪৪৪ , ৪৪৬ ইত্যাদি।
১০। শারহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ১ম খণ্ড , পৃ. ১৩৪ , আবু বকর জওহারীর সকীফা গ্রন্থ হতে বর্ণিত।
১১। রাসূল আকরাম (সা.) এবং আহলে বাইতের (আ.) জন্যে সাদকা ও যাকাতের সম্পদ গ্রহণ অবৈধ । এই জন্যে মহান আল্লাহ্ ফাই ও খুমসকে তাঁদের জন্যে নির্ধারণ করেছেন।
১২। সূরা বনী ইসরাঈল , আয়াত-২৬।
১৩। মাজমা ’ উয্ যাওয়ায়িদ , ৯ম খণ্ড , পৃ. ৩৯ , তাবরানী হতে বর্ণিত।
১৪। সূরা তওবাহ্ , আয়াত- ১২৮।
১৫। সূরা মায়েদা: ৫০
১৬। (সূরা আলে ইমরান :১৪৪)
১৭। সূরা তওবাহ্ , আয়াত-১২।
১৮। শারহে নাহ্জুল বালাগা ,ইবনে আবিল হাদীদ , ৪র্থ খণ্ড , পৃ.৭৮ ,৭৯ ও ৯৩ এবং বালাগাতুন্নিসা , পৃ. ১২-১৫ ; সূরা শু ’ আরা , আয়াত-২২৭।
১৯। (সুরা নামল-১৬)
২০। সূরা মারইয়াম , আয়াত ৫-৬।
২১। সূরা নিসা ’ , আয়াত-১১।
২২। সূরা বাক্বারা , আয়াত-১৮০।
২৩। বালাগাতুন্নিসা , পৃ. ১৬-১৭ এবং সূরা মায়িদা , আয়াত-৫০।
২৪। ওয়াসায়িলুশ্ শী ’ য়াহ্ , ১৮তম খণ্ড , পৃ. ৭৯ মাহাসিন হতে বর্ণিত।
২৫। সাফীনাতুল বিহার , মাদ্দে মুল্ক , ২য় খণ্ড , পৃ. ৫৫১।
২৬। সূরা আনফাল , আয়াত-৭৫।
২৭। শরহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ১ম খণ্ড , পৃ. ৫৫।
২৮। নাহ্জুল বালাগাহ্ , ৩য় খুতবা (খুতবায়ে শাকশাকীয়্যাহ বলে খ্যাত) ।
২৯। রওযায়ে কাফী , পৃ. ৫৮-৬৩।
৩০। সাইয়্যেদ হাশিম রাসূলীর অনুবাদকৃত ইরশাদে শেখ মুফীদ , পৃ. ২৭৬ এবং ২৭৮।
৩১।“ ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা ” নামক পুস্তকের ৯ম খণ্ডের ৭৮-৮৬ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য ((ঘটনাটির বিশদ বিবরণ সেখানে এসেছে) ।
৩২। শারহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ১ম খণ্ড , পৃ. ৬৬-৬৭।
৩৩।‘ ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা’ নামক পুস্তকের ২য় খণ্ডে বিশদ ব্যাখ্যা দেখুন।
৩৪। দেখুন : শারহে নাহ্জুল বালাগাহ , ২য় খণ্ড ,পৃ. ১০২) , তাযকিরায়ে খাওয়াসসিল উম্মাহ্ , পৃ. ১১৫ এবং জামহারাতুল খুতাব (২য় খণ্ড , পৃ. ১১২) । মুয়াবিয়ার মূল কবিতাটি আরবী ভাষায় এরূপঃ
ইয়া সাখরু লাতুসলিমান্ ইয়াওমান্ ফাতাফযাহানা বা ’ দাল্লাযীনা বিবাদরি আসবাহ ফিরাক্বা ,
খালী ওয়া আম্মী ওয়া আম্মুল উম্মি ছালিছুহুম ওয়া হানযালুল্ খাইরি ক্বাদ আহ্দা লানাল্ আরাক্বা।
লা তারকানান্না ইলা আমরিন তুকাল্লিফুনা ওয়ার রাক্বিসাতি বিহি ফী মাক্কাতাল্ খুরুক্বা ,
ফালমাওতু আহ্ওয়ানু মিন্ ক্বাওলিল্ উদাতি লাক্বাদ আদা ইবনু হারবিন আনিল্ উয্যা ইযা ফারিক্বা।
৩৫। ইসলাম“ মুওয়াল্লাফাতি কুলূবিহিম ” এর অংশকে বাহ্যদর্শীদের জন্যে নির্ধারণ করেছে , যারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন কিন্তু দ্বীনের যথার্থতা পরিপূর্ণভাবে তাদের অন্তরদেশকে বশীভূত করে নি। এর দ্বারা আল্লাহর বিধান সম্পর্কে তাদের অন্তরসমূহকে নরম ও আকর্ষণ করতে চেয়েছে।
৩৬। আত্তাম্বীহ্ ওয়াল্ আশরাফ , পৃ. ২৮২-২৮৩ , মাক্তাবাতু খাইয়াত প্রকাশনী , বৈরূত , ১৯৬৫।
৩৭। আল ইস্তি ’ আব , ১ম খণ্ড , পৃ. ৪১২ ; উসদুল গাবাহ্ , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১০৬ ; তাহযীবু ইবনি’ আসাকির , ৭ম খণ্ড ,পৃ. ২০৬ ও ২১৪ ; আল্ ইসাবাহ্ , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৬০ ; সিয়ারু আ ’ লামিন্ নুবালা , ২য় খণ্ড , পৃ. ১-৫ ; সহীহ্ মুসলিম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৬।
৩৮। সহীহ্ মুসলিম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৬ ; তাহযিবু ইবনি’ আসাকির , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২১২।
৩৯। তাহযিব , ৭ম খণ্ড , পৃ. ২১১-২১২ ; আন্ নুবালা , ২য় খণ্ড ,পৃ. ৩-৪ ; মুসনাদে আহমাদ , ৫ম খণ্ড ,পৃ. ৩২৫।
৪০। আনসাবুল আশরাফ , বালাযুরী , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৫৩।
৪১। আনসাবুল আশরাফ , বালাযুরী , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৩।
৪২। মুয়াবিয়ার উদ্দেশ্য ছিল এই যে , তার দরবারের মত সাধারণ সভাগুলিতে , মিম্বরের উপর , জুমুআর নামাযের খুৎবাসমূহে উছমানের নামে যেন প্রশংসা করা হয় ; পক্ষান্তরে আলীর (আ.) নামে যেন নিন্দা করা হয় !
৪৩। তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ১৪১ , ৫১ সালের ঘটনাদি ; ইবনু আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৭৮।
৪৪। আন্ বারেআতিয্ যিম্মাতু মিম্মান রাওয়া শাইআন্ মিন্ ফাযলি আবী তুরাবিন্ ওয়া আহলি বাইতিহী।
৪৫। শারহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৫-১৬।
৪৬।“ ফা আয়্যু’ আমালিন্ ইয়াব্ক্বা মা ’ আ হাযা ? লা উম্মা লাকা ! লা ওয়াল্লাহি ইল্লা দাফনান্ দাফনান। ” একটি বর্ণনায় এসেছে যে , মুয়াবিয়া এই বাক্যটি উচ্চারণ করেন“ ওয়া ইন্না ইবনা আবী কাবশাতা লাইউসাহু বিহি ইয়াওমিয়ান খামসা মাররাতিন লা ওয়াল্লাহি ইল্লা দাফনান্ দাফনান। ” মুরূজুয্ যাহাব , ইবনে আছীর , ৭ম খণ্ড ,পৃ. ৪৯ ; শারহে নাহ্জুল বালাগাহ্ , ইবনে আবিল হাদীদ , ১ম খণ্ড ,পৃ. ৪৬৩ ; আল্ মুওয়াফাকিয়্যাত , যুবাইর ইবনে বাক্কার , পৃ. ৫৭৬-৫৭৭ , ইরাক হতে প্রকাশিত।
৪৭। মুরূজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড ,পৃ. ২৮ ; মুয়াবিয়ার দিনগুলির স্মরণে , মুহাম্মদ মুহিবিদ্দীনের গবেষণাকৃত।
৪৮। দেখুন : ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ৩৭৬।
৪৯। ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা , ১ম খণ্ড , পৃ. ৬০ , শেখ সাদুকের ছাওয়াবুল আ ’ মাল হতে বর্ণিত , পৃ. ৩০৯ , হাদীছ নম্বর-৪ এবং বিহারুল আনওয়ার , ৫২তম খণ্ড , পৃ.১৯০।
৫০। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৫১-২৫২।
৫১। তারীখে ত্বাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ১১ ; ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৪৭ ; ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ২২০ ; ইয়াকূবী , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২৫১।
৫২। তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ২২।
৫৩। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৫১ , তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড ,পৃ. ২২৫।
৫৪। তারীখুল ইসলাম , যাহাবী , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৮-১৯।
৫৫। ইবনে আছাম , খাওয়ারিযিমী ও ইবনে কাছীর বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেন (আ.) এর বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে ইয়াযীদ নিম্নোক্ত পংক্তিগুলির (এইগুলি মূলতঃ ইবনে যেবা ’ রার রচিত) মাধ্যমে উদাহরণ প্রদান করে :
১) লাইতা আশ্ইয়াখী বিবাদরিন শাহিদূ জায্ ’ আল্ খাযরাজি মিন্ ওয়াক্ব ’ য়িল্ আসালি ,
২) লা আহাললু ওয়াস্তাহাললু ফারাহা ছুম্মা ক্বালু ইয়া ইয়াযীদু লা তাশাল্লি ;
৩) ক্বাদ ক্বাতালনাল্ ক্বারমা মিন্ সাদাতিহিম্ ওয়া’ আদলনা মাইলা বাদরিন ফা ’ তাদালা।
ইবনে আছাম বলেন : উপরোক্ত তিনটি পংক্তির পর ইয়াযীদ নিম্নোক্ত পংক্তি নিজে থেকে রচনা করে :
৪) লাস্তু মিন্’ উক্ববাতিন্ ইনলাম্ আন্তাক্বিম্ মিন্ বানী আহমাদা মা কানা ফা ’ আলা।
“ তাযকিরাতু খাওয়াসসিল উম্মাহ্ ” এর প্রণেতা বলেন : ঐতিহাসিক সমস্ত বর্ণনায় এই বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে যে , যখন হযরত আবা আব্দিল্লাহ্ আল হুসাইনের বিচ্ছিন্ন মাথাটিকে ইয়াযিদের সম্মুখে রাখা হয় তখন সে সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে সমবেত করে এবং তার হস্তস্থিত লাঠি দ্বারা ইমাম হুসাইনের মাথাটিতে আঘাত করছিল ও ইবনু যেবা ’ রার এই পংক্তিগুলি আবৃত্তি করছিল :
লাইতা আশ্ইয়াখী বিবাদরিন শাহিদূ ওয়াক্ব ’ আতাল্ খাযরাজি মিন ওয়াক্ব ’ য়িল্ আসালি ,
ক্বাদ ক্বাতালনাল্ ক্বিরনা মিন্ সাদাতিহিম্ ওয়া’ আদালনা মাইলা বাদরিন ফা ’ তাদালা।
তাযকিরার প্রণেতা“ শু ’ বার ” উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে , উল্লিখিত পংক্তিগুলির পর ইয়াযীদ তার নিম্নোক্ত পংক্তিগুলিকে সংযোজন করে :
লায়িবাত্ হাশিমু বিল্ মুলকি ফালা খাবারুন্ জাআ ওয়া লা ওয়াহ্য়ুন্ নাযালা।
লাস্তু মিন্ খিন্দিফা ইনলাম্ আন্তাক্বিম্ মিন্ বানী আহমাদা মা কানা ফা ’ আলা।
এইখানে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা আবশ্যক :
(ক) ইবনে যেবা ’ রার কবিতাটি অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল। ইয়াযীদ সেইগুলির মাধ্যমে উদাহরণ দেয়ার পূর্বেই অনেক বর্ণনাকারী সেইগুলিকে তাদের লেখায় উল্লেখ করেছিল। ইয়াযীদ নিজে থেকে শুধু দ্বিতীয় , চতুর্থ ও পঞ্চম পংক্তি তিনটি সেই পংক্তিগুলির সাথে যোগ করে। অবশ্য পরবর্তী বর্ণনাকারীরা তার নিকট হতে এই পংক্তিগুলি গ্রহণ করেছে এবং প্রকৃতপক্ষে যা কিছু ইবনে যেবা ’ রীর ছিল তার সঙ্গে যুক্ত করেছে , আর এর ফলে বর্ণনাগুলির শব্দের মাঝে পার্থক্য ঘটেছে।
(খ.) সীরাতে ইবনে হিশামে (৩য় খণ্ড ,পৃ. ৯৭) এবং ইবনে আবিল হাদীদের শারহে নাহ্জুল বালাগা ’ য় (২য় খণ্ড ,পৃ. ৩৮২) ইবনে যেবা ’ রীর কবিতার পংক্তিগুলি বর্ণিত হয়েছে। (বিঃ দ্রঃ পরবর্তী পৃ.)
ফুতুহে ইবনে আছাম (৫ম খণ্ড , পৃ. ২৪১) এবং তারীখে ইবনে কাছীরে (৮ম খণ্ড , পৃ. ১৯২) এইভাবে এসেছে যে , ইয়াযীদ দ্বিতীয় পংক্তির পর পুনরায় ইবনে যেবা ’ রার নিম্নোক্ত পংক্তিগুলির মাধ্যমে উদাহরণ দিয়েছে :
হীনা আলকাত্ বিকুবাআ বারাকুহা ওয়াস্তাহারাল্ ক্বাত্লু ফী’ আব্দিল আশাল্লি।
খাওয়ারিযিমীর মাক্তালে (২য় খণ্ড ,পৃ. ৪৮) প্রথম পংক্তিটির পূর্বে , নিম্নোক্ত দু ’ টি পংক্তি এসেছে:
ইয়া গুরাবাল্ বায়নি মা শিয় ’ তা ফাকুল্ ইন্নামা তান্দুবু আমরান্ ক্বাদ্ ফু ’ য়িল্ ,
কুল্লু মুলুকিন্ ওয়া না ’ য়ীমিন্ যা-য়িল্ ওয়া বানাতুদ্দাহির ইয়াল্ ’ আব্না বিকুল্ল।
আর উপরোক্ত কিতাবে এবং কিতাবুল্ লুহুফেও (পৃ. ৬৯) চতুর্থ পংক্তির পর নিম্নোক্ত পংক্তিটি এসেছে :
লা ’ য়িবাত্ হাশিমু বিল্ মুলকি ফালা খাবারুন্ জাআ ওয়া লা ওয়াহ্য়ুন্ নাযালা।
তারীখে ইবনে কাছীরে (৮ম খণ্ড ,পৃ. ২০৪) চতুর্থ পংক্তিটি বাদ পড়ে গেছে এবং তিনি সেইগুলিকে , ইয়াযীদের শৈশবের পরিচর্যার দায়িত্বে নিয়োজিতা নারী“ রিয়ার ” উদ্ধৃতি দিয়ে তারীখে ইবনে আসাকির হতে বর্ণনা করেছেন এবং শুধু প্রথম পংক্তিটির উল্লেখ করেই শেষ করেছেন। অনুরূপভাবে আবুল ফারাজ ইসফাহানী“ মাক্বাতিলুত তলিবিয়ীনে ” (পৃ. ১২০) প্রথম ও তৃতীয় পংক্তি দু ’ টি উল্লেখ করেছেন।
আরও দেখতে পারেনঃ তাবাকাতে ফুহুলুশ্ শু ’ আরা ’ , পৃ. ২০০ ; সামাতুন্ নুজূমিল্’ আওয়ালী , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৯৯ এবং আবু’ আলী ক্বালী ’ র আমালী , ১ম খণ্ড , পৃ. ১৪২।
৫৬। বিহারুল আনওয়ার , ৪৪তম খণ্ড ,পৃ. ৩২৯।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক , সেটি হল এই যে , ফুতুহে ইবনে আ ’ ছাম(৫ম খণ্ড ,পৃ.৩৪) এবং খাওয়ারিযিমীর মাকতালে (১ম খণ্ড , পৃ. ১৮৮) ,“ আসীরু বিসীরাতি জাদ্দী ওয়া আবী ” এই বাক্যটির পর , বিকৃতকারীরা নিম্নের বাক্যটিকে সংযোজন করেছে :“ ওয়া সীরাতিল্ খুলাফায়ির রাশিদীনাল্ মাহ্দিয়্যীনা রাযিয়াল্লাহু’ আনহুম্ ” অর্থাৎ এবং খুলাফায়ে রাশিদীনের পথকে পুনরজ্জীবিত করতে। এই বাক্যটি যে , ঠিক নয় তা স্পষ্ট। কারণ ,“ খুলাফায়ে রাশিদীন ” পরিভাষাটি উমাইয়্যাদের খিলাফতের পর আবিষ্কৃত এবং তার পূর্বে কোনো টেক্সটই ব্যবহৃত হয় নি। অপরদিকে“ খুলাফায়ে রাশিদীন” এর অর্থ , যারা রাসূলের (সা.) পর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে একের পর এক প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং তাদের অন্যতম হলেন ইমাম আলী ইবনে আবী তালিব (আ.) । ফলে , ইমাম আলী (আ.) এর কথা স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখের পর‘ এবং ’ অব্যয়টি ব্যবহার করে‘ রাশিদীন ’ শব্দটি তার সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয় এবং এটি তারই নিদর্শন বহন করে যে , এই বাক্যটি , বিকৃতকারীদের মাধ্যমে হযরত আবা আব্দিল্লাহর বাণীর সাথে সংযোজিত হয়েছে।
৫৭। মুছীরুল আহযান , পৃ. ১৪-১৫ ; আল্ লুহুফ ,পৃ. ৯-১০ ; ফুতুহে ইবনে আ ’ ছাম ; মাকতালে খাওয়ারেযমী।
৫৮। মুছীরুল আহযান ,নাজমুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে জা ’ ফর ইবনে আবিল বাকা ’ , পৃ.১৪-১৫ ; হাইদারিয়া ছাপা খানা , নাজাফ , ১৩৬৯ হিঃ ; আল্ লুহুফ ফী কাত্লা আত্তুফুফ , পৃ.৯-১০ , মাকতাবাতুল্ আন্দালুস , বৈরূত ; ফুতূহে ইবনে আ ’ ছিম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ১০ ; মাকতালে খাওয়ারিযমী , ১ম খণ্ড ,পৃ. ১৮০-১৮৫।
৫৯। মুসতাদরাক আস্ সাহীহাঈন , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৭৬ ; তারীখে ইবনে’ আসাকির , হাদীস ৬১৩ ; মাজমা ’ উয্ যাওয়ায়িদ ; মাকতালে খাওয়ারিযিমী , ১ম খণ্ড , পৃ. ১৫৯ ; তারীখে ইবনে কাছীর , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ.২৩০ ; ফুসূলুল্ মুহিম্মা , ইবনে সাব্বাগ মালিকী , পৃ. ১৪৫ বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন: মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , সায়্যিদ মুরতাযা আসকারী , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২৭-২৮ , ২য় সংস্করণ।
৬০। মো ’ জামুত তাবরানী , হাদীস ৫৭ , পৃ. ১২৮ ; মাজমাউয্ যাওয়ায়িদ , ৯ম খণ্ড ,পৃ. ১৯১ ; আনসাবুল্ আশরাফ , বালাযুরী , পৃ. ৩৮ ; তারীখুল ইসলাম , যাহাবী , ৩য় খণ্ড , পৃ.১১ ; সিয়ারুন্ নুবালা , যাহাবী , ৩য় খণ্ড ,পৃ. ১৯৫ ; কানযুল উম্মাল , ১৬ তম খণ্ড , পৃ.২৭৯ ; কামিলুয্ যিয়ারাহ্ ,ইবনে কুলাভেই , পৃ.৭২। আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্যে দেখুন: মা ’ আালিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , ৩য় খণ্ড ,পৃ. ৩৭-৪৩ , ২য় সংস্করণ।
৬১। ইবনে আব্বাসের বক্তব্যটি নিম্নরূপ:
সাদাক্বতা আবা’ আব্দিল্লাহি ! ক্বালান্নাবিয়্যু (সাঃ) ফী হায়াতিহি :“ মা লী ওয়া লিইয়িযদা লা বারাকাল্লাহু ফী ইয়াযীদা ওয়া ইন্নাহু ইয়াক্বতুলু ওয়ালাদী ওয়া ওয়ালাদা ইব্নাতী-আল হুসাইনা ওয়াল্লাযী নাফ্সী বিইয়াদিহি লা ইউক্বতালু ওয়ালাদী বাইনা যাহারানী ক্বাওমুন্ ফালা ইয়াম্না ’ ঊনাহু ইল্লা খা-লাফাল্লাহু বাইনা কুলূবিহিম্ ওয়া আলসুনিহিম্ !” ছুম্মা বাকা ’ ইবনু‘ আব্বাসিন ওয়া বাকা ’ মা ‘ আহুল্ হুসাইনু- ফুতুহু ইবনে আ ’ ছাম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২৬ , ১ম সংস্করণ , দারুল কুতুবিল্ ইলমিয়্যাহ্ , বৈরূত।
৬২। মোজামুত তাবরানী , হা.৫১ , পৃ. ১২৪ ; তারীখে ইবনে’ আসাকির ,হা.৬২২ এবং তাহযিব , ৪র্থ খণ্ড , পৃ.৩২৫(সংক্ষিপ্ত) ;যাখায়িরুল উক্ববা ,পৃ.১৪৭ ; মাজমা ’ উয্ যাওয়ায়িদ , ৯ম খণ্ড , পৃ.১৮৯ ; তারহুত্তাছরিব , হাফেয ইরাকী , ১ম খণ্ড ,পৃ.৪২ ; আল্ মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ , ২য় খণ্ড , পৃ. ১৯৫ ; খাসায়িসুল্ কুবরা , সুয়ূতী , ২য় খণ্ড , পৃ.১৫২ ; আস্ সীরাতুস্ সাবিয়্যু , শাইখানী মাদানী , পৃ.৯৩ ; জওহারাতুল্ কামাল ফিল্ আদ্ ’ ইয়্যাহ , পৃ.১২০ ; র্আ রিয়াযুন্নাযারাহ্ , ১ম খণ্ড , পৃ. ৯২-৯৩।
৬৩। বিশদ ব্যাখ্যার জন্য দেখুন : মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন : সায়্যিদ মুরতাযা’ আসকারী , ৩য় খণ্ড , বাবু আম্বায়ি বিস্তিশহাদিল্ হুসাইনি (আ.) ক্বালবা উকূয়িহি , পৃ. ১৬ ও তৎপরবর্তী অংশ , ২য় সংস্করণ।
৬৪। ফুতুহে ইবনে আ ’ ছাম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪২-৪৩ ; মুছীরুল আহযান , পৃ. ২৯ ; আল্ লুহুফ , পৃ. ১৩।
৬৫। তারীখে তাবারী ,৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২২৩ ; মো ’ জামু তাবরানীয়ে কাবীর , আবুল কাসিম সুলাইমান ইবনে আহমাদ(জন্ম ৩৬০ হি.) , পৃ.১২৮ , হা.৬১ ; তারীখে ইবনে’ আসাকির ,হা.৬৪১ ; সিয়ারুন্ নুবালা , ৩য় খণ্ড ,পৃ.১৯৫ ; আরও বিশদভাবে জানতে দেখুন : মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৬।
৬৬। তাবাকাতে ইবনে সা ’ দ , হা.২৮০ ; তারীখে ইবনে’ আসাকির , হা.৬৬৬।
৬৭। ইরশাদ , শেখ মুফীদ , রাসূলী মাহাল্লাতীর অনুবাদকৃত , ২য় খণ্ড ,পৃ. ৮১।
৬৮। ইরশাদ , শেখ মুফীদ , রাসূলী মাহাল্লাতীর অনুবাদকৃত , ২য় খণ্ড , পৃ. ৮১।
৬৯। তারীখে তাবারী , ৫ম খণ্ড , পৃ.৩৫৩ ; মুহাম্মদ আবুল ফযল ইব্রাহীমের গবেষণাকৃত , ২য় সংস্করণ।
৭০। তারীখে ইবনে’ আসাকির , হা. ৬৪৯।
৭১। তারীখে তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২১১।
৭২। আল্ লুহুফ ,পৃ.২৪-২৫ ;ইরশাদ ,মুফীদ ,২য় খণ্ড , পৃ. ৬৯ ; তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ.২১৭-২১৮ ; ইবনে আছীর , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১৭।
৭৩। তারীখে তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড পৃ. ৩১৭ ; আনসাবুল্ আশরাফ , পৃ. ১৬৪।
৭৪। আনসাবুল্ আশরাফ , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৬১ ; তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ২৭৫ ; কামিলে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২৭৬।
৭৫। আল্ লুহুফ , সায়্যিদ আহমাদ ফেহরী যানজানীর অনুবাদকৃত , পৃ. ২৭।
৭৬। সীরাতে ইবনে হিশাম , ৭ম খণ্ড , পৃ. ৬২৭ ; মোস্তফা আস্ সাক্কা , ইব্রাহীম আল্ আব্ইয়ারী এবং’ আব্দুল হাফীয আশ্ শালবী সংশোধিত , ২য় সংস্করণ , ১৩৭৫ হি. ।
৭৭। আহলুল বাইতের (আ.) সমীপে(ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন) , সায়্যিদ মুহ্সিন আমীন , হাসান তারিমীর অনুবাদকৃত , পৃ. ১৪৬।
৭৮। মুছীরুল আহযান , পৃ. ২৯ ; আল্ লুহুফ , সায়্যিদ আহমাদ ফেহরী যানজানী অনুবাদকৃত , পৃ.৬১।
৭৯। কামিলুয্ যিয়ারাহ্ , পৃ.৭৫ , অধ্যায়:৭৫ ; আল্ লুহুফ , সায়্যিদ আহমাদ ফেহরী অনুবাদকৃত , পৃ. ৬৫-৬৬ ; মুছীরুল আহযান , পৃ. ২৭।
৮০। ইরশাদ , শেখ মুফীদ , পৃ. ২৩৬ ; এলামুল্ ওয়ারা , পৃ. ২১৮।
৮১। তাহযিব(আলী আকবর গাফ্ফারীর সংশোধিত) , শেখ তূসী , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৮১ ; তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ১৬৬ ; ইরশাদ , শেখ মুফীদ , পৃ. ২০১।
৮২। তারীখে তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২২৫ ; তারীখে ইবনে আছীর , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১৭ ; আখবারুত্তুয়াল , দিন্ওয়ারী , পৃ. ২৪৭ ; তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ১৬৮।
৮৩। ইরশাদ , মুফীদ (রাসূলী মাহাল্লাতীর অনুবাদকৃত) ,২য় খণ্ড , পৃ.৭৭ ; মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , ৩য় খণ্ড , পৃ.৬৭।
৮৪। দেখুন : মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৯৪-১৫৭ , ২য় সংস্করণ।
৮৫। খাওয়ারেযমীর মাকতাল , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৬।
৮৬। মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন , পৃ. ৮০ ; তারীখে তাবারী , ইউরোপের ছাপা , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৫৬-৩৫৭।
৮৭। মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন , পৃ. ৮০ , মুস্ ’ আব যুবাইরী , নাসাবে কুরাইশ , পৃ. ৫৭ , ইসাবাহ্ , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১৭৮ , আবু মুররার জীবনী অংশ ।
৮৮। নাসাবে কুরাইশ , পৃ. ৫৭।
৮৯। সূরা আলে ইমরান- ৩৩ ,৩৪।
৯০। খাওয়ারেযমীর মাকতাল , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩০-৩১।
৯১। খাওয়ারেযমীর মাকতাল , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩১।
৯২। তাবারী আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিমের শাহাদত বরণকে আলী আকবরের পরে উল্লেখ করেছেন। (তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৫৭ , ইউরোপ হতে প্রকাশিত) ।
৯৩। নাসাবে কুরাইশ , মুস্ ’ আব যুবাইরী , পৃ. ৪৫ ; মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন , পৃ. ৯৪।
৯৪। মানাকিব , ইবনে শাহরে আশুব , ২য় খণ্ড , পৃ. ২২০ ; মাকতালে খাওয়ারিযিমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৬।
৯৫। আকীলের সন্তানদের ও জা ’ ফরের শাহাদত বরণ এবং তাঁদের বীরত্বগাঁথাগুলোকে খাওয়ারেযমীর মাকতাল এবং ইবনে শাহরে আশুবের মানাকিব হতে আমরা এনেছি। তাবারী তার অভ্যাস অনুযায়ী সেই বীরত্বগাঁথাগুলোকে যুদ্ধের বর্ণনায় আনেন নি।
৯৬। মানাকিব , ইবনু শাহরে আশুব , ২য় খণ্ড , পৃ. ২২০ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৭। শুধু বীরত্বগাঁথাগুলি ব্যতীত খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুবের বর্ণনাগুলির সাথে তাবারীর বর্ণনা সমূহের পুরোপুরি মিল রয়েছে। বীরত্বগাঁথাগুলিকে তাবারী বর্ণনা করেন নি।
৯৭। মানাকিব : ইবনে শাহরে আশুব , ২য় খণ্ড , পৃ. ২২০। কিন্তু খাওয়ারেযমীর মাকতালে (২য় খণ্ড , পৃ. ২৭) এই পংক্তি দু ’ টি কাসিম অথবা আব্দুল্লাহর প্রতি সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং এলামুল্ ওয়ারাতে (২১৩ পৃ.) এসেছে : ইমাম হুসাইন (আ.) নিজ কন্যা সাকীনাকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসানের সাথে বিবাহের আকদ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার পূর্বেই তিনি শাহাদত বরণ করেন।
৯৮। খাওয়ারেযমীর মাকতাল , ২য় খণ্ড , পৃ ২৭।
৯৯। মানাকিব , ইবনে শাহরে আশুব , ২য় খণ্ড , পৃ. ২২১।
১০০। তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৫৮-৩৫৯ ; ইরশাদ , শেখ মুফীদ , পৃ. ২২৩।
১০১। আমরা এই আলোচনার পুরোটিই মাকতালে খাওয়ারেযমী (২য় খণ্ড , পৃ. ২৮-২৯) হতে এনেছি।
১০২। তাবারী ও তার অনুসারীরা , হযরত ইমাম হুসাইনের ভাইদের শাহাদতের সংবাদটি সংক্ষিপ্তভাবে এনেছেন। ইবনে শাহরে আশুবও হযরত আব্বাসের সহোদর ভাইদের বীরত্বগাঁথাগুলিকে বর্ণনা করেছেন। তবে আমরা এইখানে যা বর্ণনা করেছি তা খাওয়ারেযমীর মাকতাল গ্রন্থ হতে নিয়েছি (২য় খণ্ড , পৃ. ২৮-২৯) ।
১০৩। মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন , পৃ. ৮৪ ।
১০৪। মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৯-৩০।
১০৫। ইরশাদ , শেখ মুফীদ , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৪ ; এলামুল ওয়ারা , পৃ. ২৪৪ ; মুছীরুল আহযান , পৃ. ৫৩ ; আল্ লুহুফ , পৃ. ৪৫।
১০৬। মানাকিব , ইবনে শাহরে আশুব , ২য় খণ্ড , পৃ. ২২১-২২২।
১০৭। মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩০।
১০৮। মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ .৩২ , তারীখে ত্বাবারী , তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ .১৮৮ ।
১০৯। তারীখে তাবারীতে“ হুসাইনের পরিবারের একজন শিশু ” বলা হয়েছে , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৬৩ ; সংশোধিত বর্ণনাটি শেখ মুফীদের ইরশাদ গ্রন্থ হতে নেয়া হয়েছে , পৃ. ২২৫।
১১০। তারীখে তাবারী , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৪৮ , দারুল মা ’ আরিফ প্রকাশনী , মিশর ; মুহাম্মদ আবুল ফযল ইব্রাহীমের গবেষণা , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৫৯- ৩৬০ , ইউরোপ হতে প্রকাশিত।
১১১। তারীখে তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৬২-৩৬২ , ইউরোপ হতে ছাপা।
১১২। আলী ইবনিল হুসাইন দ্বারা বর্ণনাকারীর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইমাম যয়নুল আবেদীনকে (আঃ) বুঝানো। আর তিনি , আলী আসগর ও শিশু ছিলেন না বরং তাঁকে‘ আলী আওসাত ’ বলা হত এবং সেইদিন কারবালায় তাঁর সন্তান ৫ম ইমাম হযরত ইমাম মুহাম্মদ বাক্বির (আ.)ও উপস্থিত ছিলেন।
১১৩। সুনানে তিরমিযী , ১৩তম খণ্ড , পৃ. ১৯৩-১৯৪ ; মুস্তাদরাকে হাকিম , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১৯ ; সিয়ারু আ ’ লামিন্ নুবালা ’ , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২১৩ ; রিয়াযুন্নাদ্বরা , পৃ. ১৪৮ ; তারীখে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৩৮ ; তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ২০১ ; তারীখে সুয়ূতী , পৃ. ২০৮ ; তারীখে ইবনে আসাকির , পৃ. ৭২৬ ; তাহযীবে তারীখে ইবনে’ আসাকির , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ২০৪।
১১৪। তারীখে ইয়াকূবী , ১ম খণ্ড , পৃ. ২৪৭-২৪৮।
১১৫। মুসনাদে আহমাদ , ১ম খণ্ড , পৃ.৪২ ও ২৮২ ; ফাযায়িল , আহমাদ ইবনে হাম্বাল , পৃ.২০ , ২২ ও ২৬ ; মো ’ জামে তাবরানী , ৫৬তম খণ্ড , মুস্তাদরাকে হাকিম , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ৩৯৮ ; তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন যে , এই হাদীছটি ইমাম মুসলিমের মানদণ্ড অনুযায়ী সহীহ্। সিয়ারে আ ’ লামীন্ নুবালা ’ , ৩য় খণ্ড , পৃ.৩২৩ ; রিয়াযুন্নাদ্বরা ,পৃ. ১৪৮ ; মাজমা ’ উয্ যাওয়ায়িদ , ৯ম খণ্ড , পৃ. ১৯৩-১৯৪ ; তায্কিরায়ে সিব্তে ইবনে জওযী , পৃ. ১৫২ ; তারীখে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৩৮ ; তারীখে ইবনে কাছীর , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২৩১ ও ৮ম খণ্ড , পৃ. ২০০ ; তিনি লিখেন : তার সনদ সুদৃঢ়। তারীখুল খামীস , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩০০ ; আল্ ইসাবাহ্ , ১ম খণ্ড , পৃ ৩৩৪ ; তারীখে সুয়ূতী , পৃ. ২০৮ ; আমালিয়ে শাজারী , পৃ. ১৬০।
১১৬। তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ২০০ ; তারীখে ইবনে আসাকির , হাদীস নং ৭৩৩-৭৩৯ ।
১১৭। তারীখে ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ.২০১ ; সিয়ারু আ ’ লামিন্ নুবালা ’ , ৩য় খণ্ড , পৃ ২১৪ ; তারীখে সুয়ূতী , পৃ. ২৮০ ; তারীখে ইবনে’ আসাকির , হাদীস নং ৭৩৩-৭৩৯।
১১৮। তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৬৮-৩৬৯ ; ইউরোপ হতে প্রকাশিত।
১১৯। তাবারী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৭০ ; ইউরোপ হতে প্রকাশিত।
১২০। মুছীরুল আহযান , পৃ. ৬৬-৬৯ ; আল্ লুহুফ ; মানাকিব , ইবনে শাহরে আশুব।
১২১।“ কুল্ লা আস্আলুকুম্’ আলাইহি আজরান্ ইল্লাল্ মাওয়াদ্দাতা ফিল্ কুরবা। ” সূরা শুরা:২৩।
১২২।“ ওয়া আতি যাল্ কুরবা হাক্কাহু। ” সূরা বনী ইসরাঈল:২৬।
১২৩।“ ওয়া ’ লামূ আন্নামা গানিমতুম্ মিন্ শাইয়িন্ ফাইন্না লিল্লাহি খুমুসাহু ওয়া লিররাসূলি ওয়ালি যিল্ কুরবা। ” সূরা আনফাল:৪১।
১২৪।“ ইন্নামা ইউরীদুল্লাহু লিইউয্হিবা’ আনকুমুর রিজসা আহলাল বাইতি ওয়া ইউত্বাহহিরাকুম তাত্বহীরা। ” সূরা আহযাব:৩৩।
১২৫। তারীখে ইবনে আ ’ ছাম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২৪২-২৪৩ ; তাফসীরে তাবারী , সংশ্লিষ্ট আয়াতের ব্যাখ্যা ; তাফসীরে ইবনে কাছীর , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১১২ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৬১ ; আল্ লুহুফ , সায়্যিদ আহমাদ ফেহরী ’ র অনুবাদকৃত , পৃ. ১৭৬-১৭৮ ; আমালী , শাইখ সাদূক , পৃ. ১৬৬ , ৩য় সংস্করণ।
১২৬। তাযকিরাতু খাওয়াসসিল্ উম্মাহ্ , পৃ. ১৪৯ ; মুছীরুল আহযান , পৃ. ৭৯ ; আল্ লুহুফের অনুবাদ , পৃ. ১৭৮।
১২৭। মুছীরুল আহযান , পৃ. ৭৮ ; আল্ লুহুফের অনুবাদ , পৃ. ১৭৮।
১২৮। ফুতূহে ইবনে আ ’ ছাম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২৪৬।
১২৯।.শেখ মুফীদের ইরশাদের অনুবাদ , ২য় খণ্ড , পৃ. ১২৫-১২৬ ; তারীখে তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড ,পৃ. ২৬৫।
১৩০। আবু বারযা আল আসলামী , তাঁর নাম উবাইদ , তাঁর পিতার নাম হারিছ এবং ৬৪ হিজরী সালে তিনি মারা যান। উসদুল গাবাহ্ , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ৩১ , দারুশ শে ’ ব প্রকাশনী।
১৩১। তারীখে তাবারী , মুহাম্মদ আবুল ফযল ইব্রাহীমের গবেষণালব্ধ , মিসর থেকে প্রকাশিত , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৪৬৫ ; ৬১ হিজরীর ঘটনাসমূহের অন্তর্গত।
১৩২। এই পংক্তিগুলির আরবি মূল অংশটি ও প্রমাণপঞ্জি পূর্বে উল্লেখ হয়েছে।
১৩৩। মুছীরুল আহযান , পৃ. ৮০ ; আল্ লুহুফের অনুবাদ , পৃ. ১৮১-১৮৬।
১৩৪। সূরা ইসরা:১।
১৩৫। ফুতূহে ইবনে আ ’ ছাম , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২৪৭-২৪৯ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৬৯-৭১।
১৩৬। তারীখুল ইসলাম , আয্ যাহাবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩৫৬।
১৩৭। আগানী , আবুল ফারাজ ইস্ফাহানী , ১ম খণ্ড , পৃ. ৩৪-৩৫।
১৩৮। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ.৭ ; ইবনু আছীর , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ৪৫।
১৩৯। আত্তাম্বীহ্ ওয়াল্ আশ্রাফ , পৃ. ২৬৩ ; মুরূজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৬৮- ৬৯ ; আখবারুত্তোয়াল , পৃ. ২৬৫। ইবনে যুবাইরের প্রতি ইয়াযীদের মূল বক্তব্য নিম্নরূপ ছিল :
উদ্ ’ ঊ ইলাহাকা ফিস্ সামায়ি ফাইন্নানী আদ্ ’ ঊ’ আলাইকা রিজালা আক্কি ওয়া আশ্ ’ আরি
কাইফা আন্নাজাতু আবা হাবীবিন্ মিনহুম্ ফাহ্তাল্ লিনাফসিকা ক্বালবা আতাল্’ আস্কারি।
১৪০। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ.১১ , ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৪৭ ; ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ.২২০।
১৪১। তারীখে ইবনে কাছীর , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২৩৪।
১৪২। ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ. ২২।
১৪৩। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ১৩।
১৪৪। আত্তাম্বীহ্ ওয়াল্ আশ্রাফ , পৃ. ২৬৪ ; মুরূজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড , পৃ.৭১।
১৪৫। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ১৪ ; ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৪৯ ; ইবনে কাছীর , ৮ম খণ্ড , পৃ.২২৫।
১৪৬। মুরূজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৭২-৭৩।
১৪৭। মুরূজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৭২-৭৩।
ইবনু নুমাইরিন্ বিশামা তাওয়াল্লা ক্বাদ আহরাক্বাল্ মাক্বামা ওয়াল্ মুসাল্লা।
১৪৮। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৫১-২৫২।
১৪৯। তারীখুল খামীস , ২য় খণ্ড , পৃ. ৩০৩ ; তারীখুল খুলাফা , সুয়ূতী , পৃ. ৯।
১৫০। বিস্তারিত দেখুন : তারীখে ত্বাবারী ; ইবনে আছীর ও ইবনে কাছীরের ৬৫-৬৭ হিজরীর ঘটনাবলীর বর্ণনায়।
১৫১। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ.৩৪৫ এবং ৩৫২-৩৫৩ ; ইবনে আছীর , ৫ম খণ্ড , পৃ. ১৪৪ ও ১৪৮ , ১৩০ হিজরীর ঘটনাবলীর বর্ণনার মাঝে ; মুরুজুয্ যাহাব , ৩য় খণ্ড , পৃ.২৮৬।
১৫২।’ আক্বদুল ফারীদ , মুহাম্মদ সা ’ য়ীদুল আরবান , ৫ম খণ্ড , পৃ. ২৮৫-২৮৬ ; মিসর হতে প্রকাশিত , ১৩৭২।
১৫৩। আনসাবুল আশরাফ , ৫ম খণ্ড , পৃ. ৩৭৪ , বাগদাদ হতে প্রকাশিত।
১৫৪। তারীখে ইয়াকূবী , ২য় খণ্ড , পৃ. ২৬১ , দারে সাদেও প্রকাশনী , বৈরূত।
১৫৫। সূরা বাক্বারাহ্ : ২৫৫।
১৫৬। তাফসীরে তাবারী , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৮ ; তাফসীরে ইবনে কাছীর , ১ম খণ্ড , পৃ. ৩১০ ; তাফসীরে সুয়ূতী , ১ম খণ্ড , পৃ. ৩২৮-৩২৯ ; তাওহীদে ইবনে খুযাইমা , ১০১।
১৫৭। তাওহীদে সাদুক , বাবু মা ’ না ক্বাওলিল্লাহি’ আয্যা ওয়া জাল্লা“ ওয়াসিয়া কুরসিয়্যুহুস্ সামাওয়াতি ওয়াল্ আরয ” , পৃ. ৩২৭-৩২৮।
১৫৮। আমালী , শেখ তূসী , ২য় খণ্ড , পৃ. ৫৬ , নাজাফ হতে ছাপা , আন্ নোমান ছাপাখানা ; বাসায়িরুদ্দারাজাত , পৃ ১৬৭ ; ইয়ানাবী ’ উল মাওয়াদ্দাহ্ , পৃ ২০।
১৫৯। সীরাতে ইবনে হিশাম , ২য় খণ্ড , পৃ. ৪০-৪২।
১৬০। সীরাতে ইবনে হিশাম , ২য় খণ্ড , পৃ. ৪৭-৫৬।
১৬১। ইম্তা ’ উল্ আসমা , মুক্বরীযী , পৃঃ ২৭৪-২৯১।
১৬২। মাক্বাতিলুত্তালিবিয়্যীনের অনুবাদ , আলী আকবার গাফ্ফারী কর্তৃক সংশোধিত , পৃ. ১৯৭-১৯৯ ; শেখ মুফীদের ইরশাদের অনুবাদ , ২য় খণ্ড , পৃ. ১৮৪-১৮৭।
১৬৩। তারীখে ত্বাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ৩০০ ; কামিলে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২৮০ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী , ১ম খণ্ড , পৃ. ২৩৪ ; আনসাবুল আশরাফ , ৩য় খণ্ড , পৃ. ১৭১।
১৬৪। আল্ লুহুফের অনুবাদ , পৃ. ৬৫। অবশ্য কামিলুয্ যিয়ারা ’ য় এসেছে যে , পত্রখানার শিরোনাম ছিল : হুসাইন ইবনে আলী তরফ হতে হাশিম গোত্রের মুহাম্মদ ইবনে আলী এবং তাঁর সমর্থকদের প্রতি ।
১৬৫। তারীখে ত্বাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ৩২১-৩৩২।
১৬৬। আনসাবুল আশরাফ , পৃঃ ১৬৭ ও ১৬৮ ; তারীখে ইবনে আছীর , ৪র্থ খণ্ড , পৃ. ১৭।
১৬৭। তারীখে তাবারী , ৬ষ্ঠ খণ্ড , পৃ. ২২৪-২২৫ ; শাইখ মুফীদের ইরশাদের অনুবাদ , ২য় খণ্ড , পৃ. ৭৩-৭৫ ; তাবারীর বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
১৬৮। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ২৯৭-২৯৮ ; কামিলে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২৮০ ; ইরশাদ , শেখ মুফীদ , পৃ. ২২৪-২২৫ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী ,পৃ. ২৩১-২৩২।
১৬৯। তারীখে তাবারী , ৭ম খণ্ড , পৃ. ২৯৭-২৯৮ ; কামিলে ইবনে আছীর , ৩য় খণ্ড , পৃ. ২৮০ ; ইরশাদ , শেখ মুফীদ , পৃ. ২২৪ ও ২২৫ ; মাকতালে খাওয়ারেযমী , পৃ. ২৩১-২৩২।
১৭০। রওযায়ে কাফী , আলী আকবর গাফ্ফারী সংশোধিত , পৃ. ৫৮-৬৩।
১৭১। রওযায়ে কাফী , আলী আকবর গাফ্ফারীর সংশোধিত , পৃ. ৫৮-৬৩।
১৭২। এই ইজতিহাদগুলির দলীল এবং তার নমুনাগুলির সাথে পরিচিতির জন্যে , দেখুন : মা ’ আলিমুল্ মাদ্রাসাতাঈন , ২য় খণ্ড , পৃ. ৭২-২৯৯ , চতুর্থ সংস্করণ ; ইজতিহাদ দার মুকাবিলে নাস , আব্দুল হুসাইন শারাফুদ্দীন ।
১৭৩।দ্রষ্টব্য:মা ’ আলিমুল মাদরাসাতাইন , ৩য় খণ্ড , পৃ. ৩০১ এর পর হতে এবং ২য় খণ্ড।
সূচীপত্র :
আমাদের কথা ৩
ভূমিকা ৪
১ ইসলাম পূর্ব আরবের সামাজিক অবস্থা ৫
যাইদ ইবনে হারিছার ঘটনা ৫
২. ইমাম হুসাইনের (আ.) বিপ্লবের পূর্বে মুসলমানদের সামাজিক অবস্থা ৬
পবিত্র কুরআনে কতিপয় সাহাবীর চিত্র ৬
ক .অপবাদ ও কুৎসা রটনা ৭
খ .ব্যবসা বাণিজ্য ও খেলাধুলা ৭
গ .মুনাফিকী ও কপটতা ৮
ঘ. রাসূল আকরাম(সা.) কে হত্যার ষড়যন্ত্র ৯
ঙ. রাসূলের মুমূর্ষু অবস্থা ও উসামার সৈন্য ১০
চ. ইন্তেকালের সময় এবং “ হাসবুনা কিতাবুল্লাহ্ ” ১১
৩ আবু বকরের কঠোর হস্তের শাসন ও রূঢ় রাজনীতি ১৪
ক) ফাতিমার (আ.) গৃহে অবস্থানগ্রহণকারী বিরোধীদের সাথে আচরণ ১৪
ফাতিমার (আ.) বাড়ীতে কিভাবে প্রবেশ করে ১৬
খ. আহলে বাইতের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ ও ফাদাক বাজেয়াপ্তকরণ ১৮
গ. রাসূলুল্লাহর উত্তরাধিকারী সম্পদ , ফাতিমার অভিযোগ ও আবু বকরের উত্তর ২০
আবু বকরের হাদীছটির মূল্যায়ন ২৭
আনসারগণ কেন নীরব ছিলেন ?২৯
ঘ. মালিক ইবনে নুয়াইরাকে হত্যা ৩০
আহলে বাইত (আ.) মতাদর্শের অনুসারীদের কিতাব সমূহে মালিকের ঘটনা ৩৩
ঙ. কান্দা অঞ্চলের লোকজনকে হত্যা ও বন্দী ৩৪
আবু বকরের ওসিয়ত ৩৬
৪ । উমরের খিলাফত ও ইসলামে বিকৃতির প্রসার ৩৮
ইসলামে শ্রেণী বৈষম্যের শুরু ৪০
১ বিশেষ আর্থিক সুবিধাদান ৪০
২। বিশেষ বংশকে প্রাধান্য ও সুবিধাদান ৪০
উছমানের খিলাফত ও বনী উমাইয়্যাদের আধিপত্য ৪২
মুয়াবিয়ার খিলাফত ও ইসলামের বিরুদ্ধে নব্য পরিকল্পনা ৪৪
হাদীস রচনার মাধ্যমে মুয়াবিয়ার উদ্দেশ্য ৪৬
খলীফার আনুগত্যের বিষয় ৫৩
হযরত আবা আব্দিল্লাহর (আ.) বিদ্রোহের কারণ ৫৫
ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণী ৫৭
মদীনা হতে ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রস্থান ৫৮
খলীফাদের যুগে ‘ জিহাদের ’ অর্থের পরিবর্তন ৬১
কারবালায় ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রবেশ ৬৪
আশুরা দিবস ৬৮
শাহাদতের সৌভাগ্য অর্জনে ইমাম হুসাইনের (আ.) সহযোগিদের আনন্দ ৬৮
রাসূলের (সা.) পরিবারের সর্বপ্রথম শহীদ ৬৯
আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিম ইবনে আকীলের শাহাদত ৭৪
জা ’ ফর ইবনে আকীলের শাহাদত ৭৫
আব্দুর রাহমান ইবনে আকীলের শাহাদত ৭৬
মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ’ ফরের শাহাদত ৭৬
আওন ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ’ ফরের শাহাদত ৭৭
আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসানের শাহাদত ৭৭
কাসিম ইবনে হাসানের শাহাদত ৭৭
আবু বকর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত ৭৯
উমর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত ৮০
উছমান ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত ৮০
জা ’ ফর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত ৮১
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত ৮১
আবুল ফযলের (আ.) শাহাদত ৮২
ইমাম হুসাইনের (আ.) দুগ্ধপোষ্য শিশুর শাহাদত ৮৫
ইমামের অপর একটি শিশুর শাহাদত ৮৫
ফোরাতের পথে ইমামের যুদ্ধ ৮৬
ভীতবিহ্বল একটি শিশুর শাহাদত ৮৭
ইমাম হুসাইনের (আ.) অন্য একটি শিশুর শাহাদত ৮৮
শাহাদতের পথে ইমাম ৮৯
হুসাইন পরিবারের তাঁবুগুলিতে পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ ৯০
ইমামের (আ.) সর্বশেষ যুদ্ধ ৯১
আল্লাহর রাসূলের (সা.) নাতির শাহাদত ৯৩
খলীফার সৈন্যরা রাসূলের সন্তানের শরীরের পোশাকগুলি লুণ্ঠন করছে ৯৪
সর্বশেষ শহীদ ৯৫
হুসাইনের (আ.) হন্তা পুরস্কার চায় ! ৯৬
উকবাহ মুক্তি পেল এবং ‘ মারকা ’ বন্দী হলো ৯৭
ফাতিমা(আ.) এর নিহত সন্তানের উপর ঘোড়া ছুটানো হয়েছে ৯৮
মদীনায় ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্যে শোক পালনকারীরা ৯৮
১। উম্মে সালমা ৯৮
২। ইবনে আব্বাস ৯৯
৩। অপর অপরিচিত ব্যক্তি ১০০
কুফায় মুহাম্মদের (সা.) বংশের বন্দিগণ ১০১
কুফার অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে হযরত যয়নবের (আ.) বক্তব্য ১০২
ফাতিমা সুগরার বক্তব্য ১০৫
উম্মে কুলছুমের বক্তব্য ১০৭
ইবনে যিয়াদের সম্মুখে আল্লাহর মনোনীত বংশধর ১০৮
সিরিয়ায় আলে মুহাম্মদের (সা.) বন্দিগণ ১১৪
ইয়াযীদের দরবারে আহলে বাইতের (আ.) প্রবেশ ১১৫
ইয়াযীদের প্রতি ইহুদী এক পণ্ডিতের অভিযোগ ১১৬
মুসলমানদের খলীফার সামনে রাসূল(সা.) এর সন্তানের মাথা ১১৭
ইয়াযীদ নিজ কুফরীকে প্রকাশ করছে ১১৮
ইয়াযীদের দরবারে হযরত যয়নবের (আ.) বক্তব্য ১২০
দামেশকের জামে মসজিদে হযরত ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এর ভাষণ ১২৩
খিলাফতের রাজধানীতে শোকানুষ্ঠান পালন ১২৬
ইমাম হুসাইনের শাহাদতের পর সাহাবা ও তাবেঈনের বিদ্রোহ ১২৭
ইয়াযীদের নিকট বনী উমাইয়্যাদের সাহায্য প্রার্থনা ও মদীনায় সৈন্য সমাবেশ ১২৯
মদীনায় ইয়াযীদের সৈন্যের প্রবেশ ১২৯
ইয়াযীদের জন্যে মদীনার লোকদের নিকট হতে বাইআত গ্রহণ ১৩০
মক্কাভিমুখে ইয়াযীদের সৈন্যের যাত্রা ও তার সেনা প্রধানের মুনাজাত ১৩০
খলীফার সৈন্যরা কাবায় আগুন জ্বালায় ১৩১
দুই পবিত্র হারামে বিদ্রোহের অবসান এবং অন্যান্য স্থানে বিদ্রোহ শুরু ১৩২
হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) অভ্যুত্থানের ফলাফল ও অবদানসমূহ ১৩৩
প্রশ্ন ও উত্তর ১৩৭
তথ্যসূত্র : ১৫১