আধ্যাত্মিক বিস্ময় :
শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত
মুহাম্মাদ রেইশাহরি
অনুবাদ :
মুহাম্মাদ ইরফানুল হক
সম্পাদনা :
এ. কে. এম. রাশিদুজ্জামান
ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস , ঢাকা
শিরোনাম : আধ্যাত্মিক বিস্ময়ঃ শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত
লেখক : মুহাম্মাদ রেইশাহরি
অনুবাদ : মুহাম্মাদ ইরফানুল হক
সম্পাদনা : এ.কে.এম. রাশিদুজ্জামান
সহযোগিতায় : কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর , ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ,ঢাকা , বাংলাদেশ।
প্রকাশক : ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস বাড়ী # 280 , রোড # 02 , আদাবর , ঢাকা-1207।
গ্রন্থস্বত্ব : প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত।
প্রকাশকাল : 3রা মহররম ,1430 হি. ,18ই পৌষ ,1415 বাং. , 1লা জানুয়ারি , 2009 খ্রী.।
মূদ্রণ : মাল্টি লিংক 145/সি , হাজী খালেক মার্কেট , ফকিরাপুল ঢাকা - 1000 , ফোন : 9348047
প্রচ্ছদ ও কম্পোজ : আলতাফ হোসাইন
উৎসর্গ
পৃথিবীর ত্রাণকর্তা পবিত্র ইমাম আল মাহদী (আঃ) এর দ্রুত আবির্ভাব কামনায়
লেখকের ভূমিকা
আমার যুবক বয়সের প্রথম দিকে একদিন ক্বোম শহরের (ইরানে) মসজিদ-ই-জামকারান-এ শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতের এক শিষ্যের সাথে ঘটনাচ ক্রে পরিচিত হই। আমি তার সাথে এর আগে পরিচিত না থাকা সত্ত্বেও তার বিশেষ ভক্ত হয়ে পড়ি। আমি তার কথায় এমন সত্যতা , ঔজ্জ্বল্য এবং আকর্ষণ খুজেঁ পেয়েছিলাম যা থেকে আল্লাহর বন্ধুদের সৌরভ পাওয়া যাচ্ছিলো।
বেশ অনেক বছর আমি সেই“ আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন মাশুক” - এর জীবন কাহিনী ও তার কথা জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি যিনি ছিলেন নৈতিকতার শিক্ষক ; যার পায়ের সামনে হাঁটু গেড়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রফেসররা এবং মাদ্রাসার আলেমগণ এবং ইচ্ছে করেছিলাম যে , তা বই আকারে তুলে ধরবো জনগণের কাছে। বিশেষ করে যুবকদের কাছে যারা তাদের জীবনের শুরুতেই এর বিশেষ প্রয়োজনে রয়েছে।
শেইখের কোন শিষ্য , যিনি লিখতে পারেন , যদি এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি তুলে নিতেন তাহলে এ সংকলনটি আরো বিশদ হতো। কিন্তু কিছু কারণে তা ঘটে নি। বিশেষ করে হযরত শেইখের বেশীর ভাগ শিষ্যই ইতোমধ্যেই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন যারা এ সংকলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারতেন।
বেশ কয়েক বছর আগে আমি এ বিষয়টি এক ঈমানি ভাইয়ের কাছে তুলে ধরলাম এবং তাকে হযরত শেইখের শিষ্যদের সাথে সাক্ষাৎকার-এর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করলাম। তা করা হলো এবং তাদের স্মৃতিসমূহ লিখে ফেলা হলো। এরপর ইসলামী গবেষণা ফাউণ্ডেশন 1997-এর জুন মাসে তা সম্পাদনা করে এবং‘ তানদিস-ই ইখলাস’ (মুখলেস ব্যক্তিত্ব) নামে তা প্রকাশ করে‘ দার-আল হাদীস’ নামে প্রকাশনী সংস্থা।
বইটিতে কিছু দূর্বলতা থাকা সত্ত্বেও পাঠকদের কাছে তা বিপুলভাবে সমাদৃত হয় , বিশেষ করে যুবকদের কাছে। এমন হয় যে এগারোটি পূনর্মূদ্রণের এক লক্ষ কপি বি ক্রি হয়ে যায়।
হযরত শেইখের আধ্যাত্মিক গুণাবলী এবং পূর্ণতার (কামালিয়াতের) সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া এক বিরাট কাজ যা বর্তমান বইটির মাধ্যমে পুরোপুরি সম্ভব নয়। আমরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ এ কাজটির সফলতার জন্য। সম্ভবত এ বইটি হবে হযরত শেইখের ভবিষ্যতবাণী বাস্তবে পরিণত হওয়ার প্রথম ধাপ , যিনি বলেছিলেন-“ কেউ আমাকে জানে না। আমার মৃত্যুর পর আমাকে জানা হবে।”
মুহাম্মাদ রেইশাহরি
এপ্রিল 01 , 1999
প্রথম ভাগঃ
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
প্রথম অধ্যায়
জীবন
ধার্মিক ও আল্লাহর ওয়ালী মরহুম রজব আলী নিকুগুইয়ান , যিনি হযরত শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত (দর্জি) হিসেবে পরিচিত , জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তেহরানে 1883 খৃষ্টাব্দে। তার পিতা মরহুম মাশহাদি বাক্বির ছিলেন একজন সাধারণ কর্মচারী। যখন শেইখ রজব আলীর বয়স ছিলো 12 বছর তখন তার পিতা ইন্তেকাল করেন এবং শেইখকে কোন রক্তসর্ম্পকীয় ভাইবোন ছাড়াই একা রেখে যান। এ মুহূর্তে এতটুকু ছাড়া তার শৈশব সম্পর্কে বেশী কিছু জানা যায় না। যা হোক , তিনি তার মা এর উদ্বৃতি দিয়েছেন যে তার মা তাকে বলেছিলেনঃ
“ যখন তুমি আমার পেটে ছিলে , এক রাতে তোমার বাবা যিনি তখন এক রেস্টুরেন্টে চাকুরী করতেন , ঘরে কিছু সুস্বাদু খাবার নিয়ে এলেন। আমি যখন তা খেতে উদ্যত হলাম তখন খেয়াল করলাম তুমি নড়াচড়া শুরু করেছো ও পেটে লাথি মারছো। আমি অনুভব করলাম যে এ খাবার আমার খাওয়া উচিত নয়। আমি খেলাম না এবং তোমার বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন তিনি আজ সুস্বাদু খাবার আনলেন অথচ অন্যদিন ক্রে তাদের উচ্ছিষ্টগুলো আনতেন। তিনি বললেন যে তিনি কাবাবগুলো আজ অনুমতি ছাড়াই নিয়ে এসেছেন। তাই আমি আর তা খেলাম না।”
এ ঘটনাটি ইঙ্গিত করে যে শেইখ এর পিতা উল্লেখ করার মত কোন ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। শেইখ নিজেই বলেছেন :
“ আমার বাবা আল্লাহর এক প্রেমিকের প্রতি কল্যাণ করেছিলেন ও তাকে খাইয়েছিলেন , সে জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তার ঔরসে।”
হযরত শেইখ এর ছিলো পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। তার একটি মেয়ে মারা যায় শৈশব কালেই।
হজরত শেইখ এর বাড়ি
তার সাধারণ ইটের বাড়িটি তার পিতা থেকে তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন যা ছিলো মওলভী এভিনিউতে 38নং (বর্তমানে শহীদ মুনতাযারী ) গলিতে। তিনি এ ছোট্ট বাড়িটিতেই তার বাকী জীবন কাটিয়েছিলেন। তার ছেলে বলেন :
‘ যখন বৃষ্টি হতো ছাদ চুইয়ে পানি পড়তো। একদিন এক আর্মি জেনারেল আরো কিছু সরকারী কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে আমাদের বাসায় এলেন। আমরা কিছু , বোল ও বাটি রেখেছিলাম যেখানে ছাদ চুইয়ে পানির ফোটা পড়ছিলো। আমাদের এ অবস্থা দেখার পর তিনি দু’ খন্ড জমি কিনলেন এবং আমার বাবাকে দেখালেন এবং বললেন তিনি একটি কিনেছেন নিজের জন্য অপরটি তার জন্য। আমার বাবা উত্তর দিলেন: আমাদের যা আছে তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট’ ।
তার আরেক ছেলে বলেন :‘ আমার অবস্থা যখন ভাল হলো আমি আমার বাবাকে বললাম:‘ আব্বাজান আমার কাছে চার তোমান আছে এবং বাড়িটি ষোল তোমানে বি ক্রি করা যাবে। তাই শাহবায এভিনিউতে আমাকে একটি নতুন বাড়ি কিনতে দিন’ ।
হযরত শেইখ বললেন :
“ যখনই তুমি চাও নিজের জন্য একটি কিনে নাও কিন্তু আমার জন্য এটিই যথেষ্ট” ।
তিনি আরো বলেন :‘ আমার বিয়ের পর আমরা উপরের তলায় দু’ টো কক্ষ প্রস্তুত করলাম এবং আমাদের বাবাকে বললাম : উচ্চ পদস্থ লোকেরা আপনার সাক্ষাতে আসে। তাই , দয়া করে এ দু’ কক্ষে আপনার সাক্ষাতগুলোর ব্যবস্থা করুন।’ তিনি উত্তর দিলেন :
“ কখনই না ! যে আমার সাক্ষাত চায় তাকে এ জীর্ণ ঘরেই আসতে দাও” ।
যে ঘরটির কথা তিনি বলছিলেন তা ছিলো একটি ছোট ঘর। যেখানে ছিল মোটা সূতীর ম্যাট এবং দর্জিকাজে ব্যবহার করা হয় এমন একটি টেবিল।
বেশ কয়েক বছর পর হযরত শেইখ তার একটি ঘর মাশহাদী ইয়াদুল্লাহ নামের একজন ট্যাক্সী ড্রাইভারের কাছে ভাড়া দিলেন মাসে 20 তোমানের বিনিময়ে। পরে যখন ট্যাক্সী ড্রাইভারের স্ত্রী এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিলো হযরত শেইখ তার নাম দিলেন“ মাসুমা” । তিনি বাচ্চার দুই কানে আজান ও ইক্বামাত দিলেন এবং দুই তোমানের একটি নোট কাপড়ে জড়ানো বাচ্চার পাশে রেখে বললেন :
“ আগা ইয়াদুল্লাহ! এখন আপনার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে , এ মাস থেকে আপনি 20 তোমানের পরিবর্তে 18 তোমান দিবেন (ভাড়া হিসেবে)।”
হযরত শেইখের জামা কাপড়
হযরত শেইখের জামা কাপড় ছিলো সাধারণ ও পরিচ্ছন্ন । তিনি যে পোশাক পরতেন তা ছিলো আলেমদের মত , একটি জোব্বা , একটি টুপি ও একটি আবা (চাদর)।
পোশাক পরিধানেও আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন ছিলো তার উদ্দেশ্য। একবার তিনি অন্যকে খুশী করার জন্য আবা পড়েছিলেন সেজন্য তাকে তার আধ্যাত্মিক অবস্থায় তিরস্কার করা হয়েছিলো।
এ ঘটনা সম্পর্কে তার বর্ণনা হলো :
নফস এক আশ্চর্য জিনিস ; এক রাতে দেখলাম আমি পর্দায় (অন্ধকারে) ঢাকা পড়েছি এবং আমি খোদার অনুগ্রহ লাভে ব্যর্থ হচ্ছি অথচ আমি অন্য সময় তা পেয়ে থাকি। আমি বিষয়টি নিয়ে আনুসন্ধান করলাম এবং বিনয়ের সাথে অনুরোধ করার পর জানতে পারলাম যে , এর আগের দিন বিকেলে যখন তেহরানে এক মর্যাদাবান ব্যক্তি আমার সাক্ষাতে এসেছিলেন তিনি বলেছিলেন যে মাগরিব ও ইশার নামাজ আমার পেছনে পড়তে চান। তাই তাকে খুশি করার জন্য আমি আবাটি পরেছিলাম নামাজের সময়......।
হযরত শেইখ এর খাবার
হযরত শেইখ কখনো মুখরোচক খাবারের চিন্তা করতেন না। তিনি বেশীরভাগ সময় আলু ও পনির খেতেন। দস্তরখানে তিনি কেবলামুখি হয়ে বসতেন এবং খাবারের উপর ঝুঁকে থাকতেন। কিছু কিছু সময় তিনি তার প্লেট খাওয়ার সময় হাতে তুলে নিতেন। তিনি সব সময় ক্ষুধা পূর্ণ নিবৃত্ত করে খেতেন। কোন কোন সময় তিনি তার খাবার থেকে বন্ধুদের প্লেটে খাবার তুলে দিতেন (সম্মান দেখিয়ে)। খাওয়ার সময় তিনি কথা বলতেন না এবং অন্যরাও তাকে সম্মান দেখিয়ে চুপ থাকতেন। তাকে কেউ খেতে দাওয়াত দিলে তিনি কিছু সময় ভেবে হয় তা গ্রহণ করতেন অথবা প্রত্যাখ্যান করতেন। তবে বেশীরভাগ সময় তিনি তার বন্ধুদের কাছ থেকে দাওয়াত গ্রহণ করতেন। তিনি বাইরে খাওয়া অপছন্দ করতেন না ; তবে তিনি ব্যক্তি সত্তার উপরে নির্দিষ্ট খাবারের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং মনে করতেন কিছু খাবার খাওয়ার পরিণতিতে আধ্যাত্মিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।
একবার তিনি ট্রেনে করে মাশহাদে যাচ্ছিলেন এবং সে সময় তিনি আত্মিক সংকোচন অনুভব করলেন। তিনি (আহলে বায়েত-আঃ এর কাছে) আবেদন করলেন এবং কিছু সময় পর তাকে অনুভুতির মাধ্যমে জানানো হলো যে তার আত্মিক সংকোচন ছিল ট্রেনের রেস্টুরেন্ট1 থেকে যে চা সরবরাহ করা হয়েছিলো তা পান করার ফল।
দ্বিতীয় অধ্যায়
পেশা
দর্জির পেশা ইসলামে একটি সম্মানিত পেশা , জ্ঞানী লুকমান (আঃ) এ পেশা নিজের জন্য পছন্দ করেছিলেন2 । পবিত্র নবী (সঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে , তিনি বলেছেন :
عمل الأبرار من الرجال من أمتي الخياطة ، و عمل الأبرار من أمتي من النساء المغزل
“ সৎকর্মশীল লোকের কাজ হচ্ছে দর্জির কাজ এবং সৎকর্মশীল নারীর কাজ হচ্ছে (চরকায়) সূতাকাটা।” 3
হযরত শেইখ এ কাজ পছন্দ করেছিলেন জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে। তখন থেকেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত (দর্জি) হিসেবে। মজার বিষয় হলো তার সেই সাধারণ ছোট্ট বাড়িটি , যা আমরা আগে বর্ণনা করেছি , তার কর্মশালা হিসাবেও ব্যবহৃত হতো।
এ বিষয়ে তার সন্তানদের একজন বলেন : প্রথমে আমার বাবার একটি কক্ষ ছিল কারাভানসেরিতে যেখানে তিনি তার দর্জির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একদিন বাড়ির মালিক এসে তাকে জায়গাটি ছেড়ে দিতে বললেন। পরদিন কোন তর্ক ছাড়াই এবং কোন অধিকার দাবী করা ছাড়াই আমার বাবা তার সেলাই মেশিন ও সেলাই টেবিল বেধেঁ নিলেন এবং আমাদের বাসায় নিয়ে এলেন ; আর কক্ষটি বাড়ি ওয়ালাকে ফেরত দিয়ে দিলেন। তখন থেকে তিনি তার বাড়ির প্রবেশদ্বারের পাশেই একটি কক্ষকে তার কর্মশালা করে নেন।
তার কাজে অধ্যাবসায়
হযরত শেইখ তার কাজে ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী ও অধ্যাবসায়ী। তিনি তার জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন তার জীবিকা অর্জনের জন্য। যদিও তার শিষ্যরা আন্তরিক ভাবে প্রস্তুত ছিলো তার সাধারণ জীবনপোকরণগুলো সরবরাহ করার জন্য , কিন্তু তিনি তা কখনোই গ্রহণ করেন নি।
পবিত্র নবী (সঃ) বলেছেন :
مَنْ أَكَلَ مِنْ كَدِّيَدِهِ كانَ يَوْمُ الْقِيامَةِ فِي أَعْدادِ الْأَنْبِياءِ وَ يَأْخُذُ ثَوابَ الْأَنْبِياءِ
“ যারা তাদের জীবিকা নিজে উপার্জন করে ক্বিয়ামাতের দিন তাদেরকে নবীদের মর্যাদা দেয়া হবে এবং তাদেরকে নবীদের পুরস্কার দেয়া হবে।” 4
অন্য এক হাদীসে তিনি বলেছেন :
“ ইবাদতের দশটি অংশ আছে। নয়টি অংশই হালাল উপার্জনের মাঝে” ।5
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন :
“ আমি ঐ দিনটি কখনো ভুলবো না যেদিন আমি হযরত শেইখকে পরিশ্রমে চেহারা ফ্যাকাসে অবস্থায় বাজারে দেখেছিলাম। তিনি সেলাইয়ের যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী কিনে বাড়িতে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি তাকে বললাম :‘ জনাব একটুখানি বিশ্রাম নিন , আপনি ভাল বোধ করছেন না।” তিনি বললেন ,
“ তাহলে আমি কি করবো আমার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ?!”
নবী (সঃ) বলেছেন :
“ আল্লাহ তাঁর দাসকে হালাল উপার্জনের পথে পরিশ্রান্ত দেখতে ভালবাসেন।” 6
“ অভিশপ্ত সে যে তার পরিবারের ভরণপোষণ দেয় না।” 7
মজুরী গ্রহণের সাম্যতা
হযরত শেইখ কাপড় সেলাইয়ের বিনিময়ে সঠিক মজুরী গ্রহণ করতেন। তিনি যে পরিমাণ সেলাই করতেন এবং যে পরিমাণ কাপড়ের কাজ করতেন ঠিক সে পরিমাণ মজুরী গ্রহণ করতেন। কোনভাবেই তিনি তার কাজের চেয়ে বেশী মজুরী গ্রহণ করতেন না। এ জন্য কেউ যদি বলতো :‘ হযরত শেইখ আমাকে একটু বেশী মজুরী দিতে দিন ,’ তিনি তা গ্রহণ করতেন না।
হযরত শেইখ তার ক্রে তাদের কাছে মজুরী দাবী করতেন ইসলামী চুক্তি (ভাড়ার) আইন অনুযায়ী।8 কিন্তু যেহেতু তিনি কখনই তার কাজের চেয়ে বেশী মজুরী নিতে চাইতেন না এবং কোন কারণে যদি কাজ শেষে দেখতে পেতেন যে তিনি যা ভেবেছিলেন তার চেয়ে কম কাজ করতে হয়েছে তাহলে তিনি সেই অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিতেন যা তার প্রকৃত মজুরীর চেয়ে বেশী বলে মনে হতো।
একজন আলেম বলেনঃ আমি কিছু কাপড় নিয়ে গেলাম হযরত শেইখ এর কাছে (একটি আবা , একটি জোব্বা ও একটি মোটা জোব্বা) বানানোর জন্য। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম , কত দিব ?
তিনি বললেন ,
“ এটি দু’ দিনের কাজ , তাই মজুরী হবে চল্লিশ তোমান।”
দুদিন পর আমি পোশাকগুলোর জন্য গেলাম , তিনি বললেনঃ মজুরী শুধু বিশ তোমান।
আমি জিজ্ঞাস করলামঃ‘ আপনিতো বলেছিলেন চল্লিশ তোমান ?’
তিনি বললেনঃ“ প্রথমে আমি ভেবেছিলাম তা দু’ দিনের কাজ , কিন্তু তা শেষ করতে শুধু এক দিন লাগলো!”
অন্য একজন বলেনঃ আমি তার কাছে কিছু কাপড় নিয়ে গেলাম দু’ টো প্যান্ট বানানোর জন্য। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তার মজুরী কত আসবে। তিনি বললেনঃ‘ দশ তোমান।’ আমি তাকে তখনই মজুরী দিয়ে দিলাম। যখন কিছু সময় পরে আমি প্যান্টগুলো আনতে গেলাম তিনি একটি দুই তোমানের নোট সেগুলোর উপরে রাখলেন এবং বললেন“ মজুরী হয়েছে আট তোমান।”
হযরত শেইখ এর সন্তান বলেন : একবার তিনি এক ক্রে তার সাথে একটি আবা বানানোর মজুরী পঁয়ত্রিশ তোমান সাব্যস্ত করলেন। কিছুদিন পর ঐ ক্রে তা আবার জন্য এলেন। যখনই ক্রে তা আবাটি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন আমার বাবা তার পিছনে পিছনে ছুটলেন ও তাকে পাঁচ তোমান ফেরত দিয়ে বললেন :“ আমি ভেবেছিলাম এ আবাটি বানাতে আমার আরো বেশী সময় লাগবে , কিন্তু তা লাগেনি।”
ইনসাফের (সাম্যতা) জন্য পুরস্কার
সব কাজে ইনসাফ করাকে একটি জরুরী বিষয় হিসেবে ইসলামে জোর দেয়া হয়েছে , বিশেষতঃ লেনদেনের ক্ষেত্রে। ইমাম আলী (আঃ) বলেছেনঃ
“ ইনসাফ নৈতিক গুণগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ।” 9
এবং তিনি আরো বলেছেনঃ
“ সবচেয়ে বড় পুরস্কার দেয়া হয় ইনসাফ (সাম্য) এর জন্য।” 10
শুধু জানার জন্য যে কীভাবে লেনদেনে ইনসাফ আত্মগঠনে কাজে লাগে এবং হযরত শেইখ এর উপর আল্লাহর নেয়ামত যে অতিরঞ্জিত কথা নয় তা বোঝার জন্য নিচের ঘটনাটি নিয়ে চিন্তা করা যথাযথ হবেঃ
লোকজনের প্রতি ইনসাফ এবং হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ ফাঃ) সাথে সাক্ষাত :
একজন জ্ঞানী ব্যক্তি চাইছিলেন হযরত বাকিয়াতুল্লাহ ইমাম মাহদী (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করবেন এবং অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন যে এরকম সুযোগ তাকে দেয়া হয় নি। দীর্ঘ সময়ের জন্য তিনি কঠোর আত্ম -নিয়ন্ত্রণ অনুশীলন করেছিলেন এবং আধ্যাত্মিক সাহায্য চেয়েছিলেন।
নাজাফে আশরাফের হাওযার ছাত্র ও ইমাম আলী (আঃ) এর মাযারের আলেমগণের কাছে এটি সুপরিচিত যে , কেউ যদি মসজিদে সাহলাতে মাগরীব ও ইশার নামায পর পর চল্লিশ মঙ্গলবার পড়ার সম্মান লাভ করে তবে সে ইমাম আল মাহদী (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত পাবে। কিছু সময়ের জন্য তিনি এভাবে সংগ্রাম করলেন কিন্তু কোন লাভ হলো না। তখন তিনি গ্রহ নক্ষত্র বিদ্যা এবং সংখ্যা তত্ত্বের স্মরণাপন্ন হলেন এবং নির্জনে আত্ম -সংযম ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক সাধনা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে লাগলেন। তিনি ব্যাকুল ভাবে অদৃশ্য ইমামের (আঃ) সাক্ষাত চাইছিলেন। কিন্তু সবই ব্যর্থ হলো। যা হোক , তার রাতের নামায , কান্না ও সকালের বিলাপের কারণে তার কিছুটা অন্তর্দৃষ্টি ও অতিন্দ্রীয় অনুভুতির সৃষ্টি হলো এবং মাঝে মাঝেই আলোর ঝলক তাকে দান করা হলো। তিনি ভাবাবেশ ও পরম আত্মিক আনন্দে পড়তে শুরু করলেন এবং মাঝে মাঝেই কিছু দৃশ্য দেখতে ও কিছু সূক্ষ্ণ বিষয় শুনতে লাগলেন।
এরকম এক আধ্যাত্মিক অবস্থায় তাকে বলা হলোঃ“ হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) এর সাক্ষাত তুমি লাভ করতে পারবে না যদি না তুমি অমুক শহরে যাও।” প্রথমে তা কঠিন মনে হলেও পবিত্র উদ্দেশ্যের কারণে তা অনেক সহজ হয়ে গেলো।
ইমাম আল আসর (আঃ ফাঃ) কামারের বাজারে
বেশ কয়েকদিন পর উপরোল্লেখিত ব্যক্তি সে শহরে এলেন এবং সেখানেও তিনি আত্ম -সংযম এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলন নির্জনে চালিয়ে যেতে লাগলেন যা চল্লিশ দিন পর্যন্ত করার নিয়ত ছিলো তার। সাঁইত্রিশতম দিনে তাকে বলা হলো : ঠিক এখনই হযরত বাকিয়াতুল্লাহ ইমাম আল আসর (আঃ ফাঃ) কামারদের বাজারে আছেন এক বৃদ্ধ কামারের দোকানে , তাই তাড়াতাড়ি যাও এবং তার সাক্ষাত লাভের চেষ্টা করো।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং তিনি ভাবাবেশের মাঝে যে দৃশ্য দেখেছিলেন সে অনুযায়ী বৃদ্ধ লোকটির দোকানে দ্রুত চলে গেলেন। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন পবিত্র ইমাম (আঃ) বসে রয়েছেন এবং সেই বৃদ্ধ তালাওয়ালার সাথে কথা বলছেন। তিনি সালাম দিলে পবিত্র ইমাম জবাব দিলেন এবং ইশারা করলেন চুপ থেকে [আভাস দিয়ে] বিস্ময়কর ঘটনা দেখার জন্য।
বৃদ্ধ তালা ওয়ালার ইনসাফ
এ সময় আমি দেখলাম একজন কুজোঁ হয়ে যাওয়া , ভেঙ্গে পড়া বৃদ্ধা তার হাতের লাঠি নিয়ে এলেন এবং কম্পিত হাতে একটি তালা দেখালেন এবং বললেন :“ তোমরা কি আল্লাহর ওয়াস্তে আমার কাছ থেকে তিন শাহীর11 বিনিময়ে এই তালাটি কিনবে ? আমার তিন শাহীর প্রয়োজন।”
বৃদ্ধ তালাওয়ালা তালাটি নিয়ে দেখলেন এবং এটিকে ব্যবহারযোগ্য দেখতে পেলেন এবং বললেন :
“ বোন আমার! এটির দাম দুই আব্বাসী।12 কারণ , এর চাবি দশ দীনারের13 বেশী হবে না। তাই আমাকে দশ দীনার দিন আমি এর একটি চাবি বানালে তালাটির দাম হয়ে যাবে দশ শাহী” ।
বৃদ্ধা এবার বললেন :
“ না , আমার তা প্রয়োজন নেই , শুধু তিন শাহী দরকার ; তুমি যদি তা তিন শাহীতে কিনে নাও , আমি তোমার জন্য দোয়া করবো।”
বৃদ্ধ খুব সরলভাবে বললেন , বোন আমার ! আপনি একজন মুসলমান এবং আমিও নিজেকে মুসলমান দাবী করি। তাই কেন আমি এক মুসলমানের সম্পদ এত কম দামে কিনবো এবং একজনকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করবো ? এ তালাটির বর্তমান দাম হচ্ছে আট শাহী , আমি যদি তা থেকে লাভ করতে চাই তাহলে আমি তা সাত শাহীতে কিনবো। কারণ দুই আব্বাসি পরিমাণ ব্যাবসাতে এক শাহীর চাইতে বেশী লাভ করা ন্যায় বিচার নয়। আপনি যদি নিশ্চিত থাকেন যে তা আপনি বি ক্রি করবেন তাহলে তা সাত শাহীতে কিনবো এবং আমি আবার বলছি আসল দাম হচ্ছে দুই আব্বাসি , যেহেতু আমি একজন ব্যাবসায়ী আমি তা কিনবো এক শাহী কমে।
বৃদ্ধা সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারছিল না বৃদ্ধ তালাওয়ালা কি বলছে। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন এবং অভিযোগ করলেন যে কেউ তার কাছ থেকে তা কিনতে চায় নি। তিনি বললেন , তিনি তাদের কাছে অনুনয় করেছিলেন তিন শাহীতে তা কেনার জন্য। কারণ দশ দীনার তার জন্য যথেষ্ঠ ছিলো না। বৃদ্ধ তালাওয়ালা তাকে সাত শাহী দিলেন এবং তার কাছ থেকে তালাটি কিনে নিলেন।
আমি তাকে সাক্ষাত দিবো
যখন বৃদ্ধা পিছনে ফিরলেন চলে যাবার জন্য , ইমাম (আঃ) আমাকে বললেন : প্রিয় আমার ! এই বিস্ময়কর দৃশ্যটি দেখলেতো! তুমিও এরকম করো এবং এরকম হয়ে যাও , তখন আমি তোমাকে দেখতে আসবো। কোন প্রয়োজন নেই আধ্যাত্মিক নির্জনতার এবং ইলমে জাফর-এর (সংখ্যাতত্তের)। আত্মসংযম ও বিভিন্ন ধরণের ভ্রমণ প্রয়োজন হবে না ; বরং ভাল কাজ কর ও মুসলিম হও যেন আমি তোমার সাথে মেলামেশা করতে পারি। এ শহরের লোকের মাঝে আমি এই বৃদ্ধকে বাছাই করেছি। কারণ এ ব্যক্তি ধার্মিক ও আল্লাহকে জানে। আর তুমি দেখছো সে কী পরীক্ষার ভেতর দিয়ে গেলো। এ বৃদ্ধা মহিলা বাজারের সবাইকে অনুরোধ করেছিলো তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য , যেহেতু তারা তাকে মহিলা ও অভাবী দেখেছে তাই তারা সবাই তার তালাটি সস্তায় কিনতে চেয়েছিল ; আর তিন শাহীর বিনিময়েও কেউ তা কিনে নি। এ বৃদ্ধ ব্যক্তি এটিকে প্রকৃত দামে কিনলো , সাত শাহীতে। এভাবে আমি প্রত্যেক সপ্তাহে তাকে সাক্ষাত দেই এবং তাকে দয়া ও সৌহার্দ দেখাই।14
তৃতীয় অধ্যায়
আত্মত্যাগ
হযরত শেইখ এর জীবনের বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে অন্যতম ছিলো অভাবী লোকদের সেবা করা এবং নিজের অভাবের দিনগুলোতেও আত্মত্যাগ করা। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী আত্মত্যাগ ও পরার্থবাদ হলো সবচেয়ে সুন্দর কল্যাণ ভাবনা , বিশ্বাসের সর্বোচ্চ স্তর এবং সর্বোৎকৃষ্ট নৈতিক নেয়ামত।15
হযরত শেইখ তার দর্জি পেশা থেকে সামান্য মজুরী সত্ত্বেও ছিলেন খুবই দয়ালু , উদার ও পরার্থবাদী। এ লোকটির আত্মত্যাগ সত্যিই বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয়।
অন্যদের সন্তানদের প্রতি আত্মত্যাগ
হযরত শেইখ এর এক সন্তান তার মা এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন যে তার মা বলেছেন : তখন ছিলো দুর্ভিক্ষের সময়। হাসান ও আলী16 বাড়ির ছাদে একটি আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত ছিলো। আমি ওপরে গিয়েছিলাম তারা কি করছে তা দেখতে। আমি দেখলাম তারা একটি চামড়ার ব্যাগ নিয়েছে তা পুড়িয়ে খাওয়ার জন্য। আমি এরকম দৃশ্য দেখে কেঁদে ফেললাম। আমি ছাদ থেকে নেমে কিছু তামা এবং ব্রোন্জ (এর পাত্র) নিয়ে গেলাম কাছের বাজারে। তা বি ক্রি করলাম এবং কিছু রান্না করা ভাত কিনলাম। ফেরার পথে আমি আমার ভাই কাসিম খানের দেখা পেলাম যে ছিল একজন ধনী ব্যক্তি। সে দেখলো আমি খুব অশান্তির মধ্যে আছি। সে আমার অশান্তির কারণ জিজ্ঞাসা করলো। যখন সে ঘটনাটি জানতে পারলো সে বললো :‘ তুমি কি বলছো’ ? আমি দেখলাম শেইখ রজব আলী লোকেদের মাঝে একশটি চেলো কাবাবের টোকেন বিলি করছে। দান খয়রাত ঘরে শুরু হওয়া উচিত! এ লোক... ? এটা সত্য যে তিনি একজন আত্ম -উৎসর্গকৃত ও সাধক ব্যক্তি , কিন্তু তার এ ধরনের আচরণ (নিজের পরিবারকে অবহেলা করা ) সঠিক নয়।”
“ এ কথা শুনে আমি আরো হতাশ হয়ে গেলাম। যখন রাতে হযরত শেইখ ঘরে এলেন তার সাথে আমার তর্ক হলো... এবং ঘুমাতে গেলাম উত্তেজিত হয়ে এবং ক্ষুব্ধ হয়ে। মধ্য রাতে আমাকে ডাকা হলো উঠার জন্য। আমি দেখলাম (স্বপ্নে) আমিরুল মুমিনীন মাওলা আলী (আঃ) , যিনি নিজের পরিচয় দিলেন এবং বললেন : সে অন্যদের সন্তানদের দেখাশোনা করছিলো এবং আমরা তোমার সন্তানদের দেখাশোনা করছিলাম। যখন তোমার সন্তান না খেয়ে মারা যাবে তখন অভিযোগ করো।”
দেউলিয়া হয়ে যাওয়া প্রতিবেশীর জন্য আত্মত্যাগ
হযরত শেইখের এক সন্তান বলেন :“ এক রাতে আমার পিতা আমাকে ডেকে তুললেন এবং একত্রে আমরা দু’ ব্যাগ চাল তুলে নিলাম , তিনি একটি এবং আমি একটি। আমরা ব্যাগ দু’ টো বহন করে নিলাম আমাদের এলাকার সবচেয়ে ধনী লোকের বাড়িতে। ব্যাগ দু’ টো বাড়ির মালিকের কাছে তুলে দিয়ে বললেন :
“ প্রিয় ভাই! তোমার কি মনে আছে বৃটিশরা লোকদেরকে তাদের দূতাবাসের দরজায় নিয়ে গিয়েছিলো ও তাদের চাল দিয়েছিল এবং ফেরত নিয়েছিলো প্রত্যেক দানার বিপরীতে একগাধা বোঝাই (চাল)17 এবং এরপরেও তারা তাদের ছাড়ে নি ?”
এই কৌতুকের পর আমরা চাল হস্তান্তর করে বাড়ি ফেরত এলাম। পর দিন সকালে তিনি আমাকে ডাক দিলেন :“ মাহমুদ! তোমার মাকে অর্ধেক ভাঙা দু’ শ পঞ্চাশ গ্রাম চাল এবং দুই রিয়াল পরিমান চর্বি তেল কিনে দাও রান্না করার জন্য।”
ঐ সময়গুলোতে আমার বাবার এ ধরণের আচরণ ছিলো খুবই কষ্টের ও এর অর্থ বোঝা কঠিন , কেন আমরা আমাদের বাসায় থাকা চাল দিয়ে দিবো অথচ দুপুরের খাবারের জন্য অর্ধেক ভাঙা চাল কিনবো ?!
পরে আমি জানতে পারলাম যে ঐ লোক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলো এবং একই সাথে তার এক বড় ভোজ দেয়ার কথা ছিলো।
বৎসরের প্রথম সন্ধ্যায় আত্মত্যাগঃ
মরহুম শেইখ আব্দুল করিম হামিদ বর্ণনা করেন :‘ আমি হযরত শেইখের দোকানে দিনে এক তোমানের বিনিময়ে কাজের ছেলে হিসেবে কাজ করতাম। নববর্ষের সন্ধ্যায় হযরত শেইখের কাছে ছিল পনেরো তোমান , তিনি আমাকে কিছু তোমান দিয়ে কিছু ঠিকানায় চাল দেয়ার জন্য বললেন এবং শেষে পাঁচ তোমান ছিল যা তিনি আমাকে দিলেন।’
আমি ভাবছিলাম : তিনি কি খালি হাতে নববর্ষের সন্ধ্যায় বাড়িতে যাবেন ? এবং একই সময় তার ছেলের প্যান্টের পা ছেঁড়া ছিলো। তাই আমি তোমানগুলো তার ড্রয়ারে রেখে দৌড়ে পালালাম। শেইখ চিৎকার করে কি বললেন আমি শুনলাম না। যখন আমি বাসায় ফিরলাম দেখলাম তিনি আমার পিছু নিয়েছিলেন। তিনি বললেন : কেন তুমি তোমানগুলো নিলে না ?” এরপর তিনি জোর করে আমাকে তোমানগুলো দিলেন।
চতুর্থ অধ্যায়
নিস্বার্থ উৎসর্জন
হযরত শেইখের আধ্যাত্মিক সাধনা ও উৎসর্জন ছিলো নীতিগতভাবে লোক দেখানো সুফিদের থেকে আলাদা। তিনি কখনোই সুফিদের তরিকত সমর্থন করেন নি। তার আধ্যাত্মিক পদ্ধতি ছিলো আহলে বায়েত (আঃ) এর নীতিমালার প্রতি উৎসর্গ হওয়া , তাই তিনি শুধু ওয়াজিব কাজগুলো করতেন না বরং মুস্তাহাব কাজগুলোও করতেন।
সকাল বেলায় তিনি জেগে থাকতেন এবং সূর্য ওঠার পর আধা ঘন্টা বা পুরো এক ঘন্টার জন্য ঘুমাতেন। কোন কোন সময় তিনি মধ্যাহ্নের পর অল্প বিশ্রাম নিতেন।
যদিও নিজেই ছিলেন আধ্যাত্মিক বিষয় সন্ধানকারী তবু তিনি বলতেনঃ‘‘ অনুভূতিলব্ধ জ্ঞান বিশ্বাস করো না এবং নির্ভর করো না। আমাদের উচিত সব সময় আমাদের ইমামদের অনুসরণ করা , কথায় ও কাজে দৃষ্টান্ত হিসাবে গ্রহণ করা।”
প্রকাশ্য সমাবেশগুলোতে হযরত শেইখ সবসময় কোরআনের এ আয়াতটি বলতেন :
) إِن تَنصُرُوا اللَّـهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ(
“ যদি তোমরা আল্লাহর পথে চেষ্টা করো তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন ও তোমাদের পা-কে দৃঢ় করবেন (তাঁর পথে কম্পমান অবস্থা থেকে” । (সুরা মুহাম্মাদঃ 7)18
এবং তিনি বলতেন :
“ আল্লাহর নিজের কোন প্রয়োজন নেই। আল্লাহর রাস্তায় চেষ্টা কর তার আদেশ অনুযায়ী এবং তার রাসুলের (সাঃ) হাদিস অনুযায়ী।”
এবং তিনি বলতেন :“ (আল্লাহর) আদেশের মত আর কোন কিছু মানুষের সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন ঘটায় না।”
হযরত শেইখ সব সময় বলতেন :
“ মিম্বারে যা প্রচার করা হয় তা হচ্ছে সত্যের ধর্ম। কিন্তু তাতে দু’ টো বিষয়ের অভাব থাকে : আন্তরিকতা ও খোদা প্রেম , এ দু’ টো অবশ্যই প্রচারের সময় যুক্ত করতে হবে।”
তিনি বলেছেন :
“ সৎকর্মশীল লোকেরা সবাই ভালো (কাজ) করছে কিন্তু তাদের উচিত অহংকারকে‘ আল্লাহ’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা।”
এবং তিনি বলেছেনঃ
“ যদি বিশ্বাসীরা অহংবোধ ছেড়ে দেয় তারা কিছু অর্জন করবে (উচ্চতর মাক্বাম)।”
তিনি আরো বলতেনঃ
“ যদি মানুষ আল্লাহর কাছে আত্মসর্মপণ করে , নিজের মতামত ও গোঁড়ামী পরিত্যাগ করে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহতে বিশ্বাস রাখে , তবে আল্লাহ তাকে শিখাবেন এবং তাকে তাঁর পথে পরিচালিত করবেন।”
তাক্বলীদ (বিশিষ্ট মুজতাহিদদের অনুসরণ)
বাস্তব ইবাদাতের নীতিমালা অনুযায়ী হযরত শেইখ ছিলেন তার সময়কার বিশিষ্ট মারজা , আয়াতুল্লাহ হুজ্জাতের মুকাল্লিদ বা অনুসারী। তিনি তার মারজা খুঁজে নেয়ার ঘটনাটি এভাবে বলেনঃ
“ আমি ক্বোমে গেলাম এবং সব মারজার সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমি কাউকে আগা হুজ্জাতের মত এত আত্ম -উৎসর্গিত পাই নি।”
তিনি অন্য কোন এক জায়গায় বলেছেনঃ“ আমি তার হৃদয়কে পেয়েছিলাম উচ্চাশা ও পদের লোভ বিবর্জিত।”
হযরত শেইখ তার বন্ধুদের সতর্ক করেছিলেন তরীকতগুলো সম্পর্কে যা উপরোল্লিখিত পথ থেকে সরে গিয়েছে। শেইখ এর একজন বন্ধু বলেন : আমি তাকে তরীকতগুলো19 সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম এবং তাতে তিনি উত্তর দিয়েছিলেনঃ
“ আমি কারবালাতে ছিলাম , আমি দেখলাম একটি দল পাশ দিয়ে যাচ্ছে , শয়তান তার লাগাম ধরে আছে যে বাকীদের পথ দেখাচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারা কারা। তারা বললো...।”
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যারা আহলুল বায়েত (আঃ) এর কাছ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখে তাদের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে তাদের কাছে প্রকৃত আসমানী জ্ঞানের দরজা বন্ধ থাকবে।
হযরত শেইখের এক ছেলে বলেনঃ
“ আমার বাবা ও আমি‘ বিবি শাহরবানু’ 20 পাহাড়ে গিয়েছিলাম। পথে আমরা দেখা পেলাম একজন তথাকথিত সাধকের যার ছিলো কিছু উচ্চ দাবী। আমার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার সাধনার পর এ পর্যন্ত কী বেরিয়ে এসেছে ? তখন ঐ ব্যক্তি নিচু হয়ে মাটি থেকে এক টুকরো পাথর তুলে নিলো এবং একে একটি নাসপাতিতে পরিণত করলো। এরপর আমার বাবাকে বললোঃ নিন খান!
আমার বাবা বললেনঃ“ ভালো , এটি তুমি আমার জন্য করেছো , এখন বলো তুমি আল্লাহর জন্য কি করেছো ? তাঁর জন্য কী করেছো ?!” তা শুনে সাধক কেঁদে ফেললো।
আল্লাহর জন্য কাজকে উৎসর্গ করা
হযরত শেইখ এর এক বন্ধু তার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে তিনি বলেছেন :“ সন্ধ্যা রাতগুলোতে আমি তেহরানে মসজিদে জুমাতে বসতাম লোকজনের সুরা হামদ ও সুরা তাওহীদ শুদ্ধ করতে। একদিন দুটো বাচ্চা ঝগড়া করছিলো এবং একটি অপরটিকে মারছিলো। বাচ্চাটি মার খাওয়া এড়াতে আমার পাশে এসে বসলো। আমি সুযোগটি নিলাম এবং তাকে সুরা হামদ ও সুরা তাওহীদ তেলাওয়াত করতে বললাম এবং সেগুলো শুদ্ধ করতে তাকে সাহায্য করলাম । এটি সে রাতে আমার সমস্ত সময় নিয়ে নিলো। পরের রাতে এক দরবেশ আমার কাছে এলো এবং বললোঃ আমি জ্ঞান রাখি কিমিয়ার (রসায়ন শাস্ত্রের) , সিমিয়ার (দৃশ্য দেখাবার শক্তি) , হিমিয়ার (আত্মার নিয়ন্ত্রণের) , এবং লিমিয়ার (যাদুর) , এবং এসেছি সেগুলো তোমার কাছে অর্পণ করতে ঐ পুরস্কারের বদলে যা তুমি গত রাতে অর্জন করেছো।” আমি তাকে উত্তর করলাম : না ! এগুলোর যদি কোন প্রয়োজন থাকতো তুমি নিজেই তা নিজের জন্য রাখতে!”
ইসলাম বহির্ভূত আত্মশুদ্ধিকে খণ্ডন করা
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যে , কেউ যদি সত্যিকারভাবে ইসলামের আইনকানুন অনুযায়ী কাজ করে তাহলে তারা অবশ্যই সার্বিক সম্পুর্ণতা ও আধ্যাত্মিক মাক্বাম অর্জন করবে। তিনি শক্ত বিরোধী ছিলেন সব ধরনের চরমপন্থী সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পথের যা হাদিস ও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী। তার শিষ্যদের একজন বলেছেনঃ
কিছু সময়ের জন্য আমি আত্মশুদ্ধিতে নিয়োজিত ছিলাম ; নির্জনে থাকতাম আমার আলাভী (ইমাম আলী আঃ এর বংশ) স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে একটি আলাদা কক্ষে। সেখানে আমি আমার নামাজ ও জিকির করতাম এবং ঘুমাতামও। চার পাঁচ মাস পর আমার এক বন্ধু আমাকে হযরত শেইখ এর কাছে নিয়ে গেলেন। তার দরজায় চৌকাঠে যখনই তিনি আমাকে দেখলেন তিনি সাথে সাথেই বললেনঃ
“ তুমি কি চাও আমি বলি. . ?”
আমি আমার মাথা লজ্জায় নিচু করলাম। তখন তিনি বলতে লাগলেনঃ
“ কেন তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে এমন আচরণ করেছো যেন তাকে তুমি পরিত্যাগ করেছো ?...এ ধরনের আত্মশুদ্ধি ও জিকির এবং তেলাওয়াত বিদায় করে দাও। যাও , এক বাক্স মিষ্টি নিয়ে তোমার স্ত্রীর কাছে ফেরত যাও। সাধারণ তা’ কীবাত সহ যথা সময়ে তোমার নামাজ পড়।”
এর পর হযরত শেইখ জোর দিলেন আহলুল বাইত (আঃ) এর হাদীসসমূহের উপর এই বলে যে যদি কোন ব্যক্তি আন্তরিকভাবে ও নিষ্ঠার সাথে চল্লিশ দিন কাজ করে তাহলে প্রজ্ঞার ঝর্ণাধারা তার অন্তর থেকে বইবে21 এবং উল্লেখ করলেনঃ
“ এ হাদীসগুলো অনুসরণ করে যদি কেউ তার ধর্মীয় দায়িত্বগুলো পালন করে তারা অবশ্যই কিছু আলো লাভ করবে।”
হযরত শেইখের পরার্মশ অনুযায়ী সে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি ছেড়ে দিলো এবং সাধারণ জীবনে ফিরে গেলো।
প্রথমে তোমার খুমস দিয়ে দাও
হযরত শেইখ এর এক শিষ্য ডাঃ হামিদ ফারযাম22 হযরত শেইখ এর ধর্মীয় বিষয়ে আন্তরিকতা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন : হযরত শেইখ সমানভাবে উৎসর্গিত ছিলেন শরিয়ত , ত্বরীকত ও হাকিকত এর জন্য। সেসব সূফিদের মত নয় যারা শরীয়তকে অস্বীকার করে। প্রথম যে জিনিস তিনি আমাকে বলেছিলেন তা হলো :
“ যাও তোমার খুমস দিয়ে আসো!” এর পর তিনি আমাকে মরহুম আয়াতুল্লাহ শেইখ আহমাদ আশতিয়ানী (রঃ) এর কাছে পাঠালেন এ উদ্দেশ্যে। এবং কী আশ্চর্য লোকই না ছিলেন তিনি! এক সত্যিকার আল্লাহ ওয়ালা লোক যার কাছ থেকে আমি কত নেয়ামতই না লাভ করেছি এবং কত বিস্ময়কর জিনিস তার ভিতরে লক্ষ্য করেছি! যা হোক , আমি তার কাছে গেলাম যেভাবে হযরত শেইখ আমাকে আদেশ দিয়েছিলেন এবং আমার যে সাধারণ বাড়িটি ছিলো তার খুমস দিয়ে আসলাম।”
পঞ্চম অধ্যায়
নৈতিকতা
হযরত শেইখ ছিলেন খুবই দয়ালু , মনোরম চেহারার , ভালো মেজাজের , মার্জিত আচরণের ও বিনয়ী। তিনি সব সময় নামাযের ভঙিতে বসতেন এবং কখনই কোন গদীতে হেলান দিতেন না। তা থেকে সামান্য দূরে বসতেন। যখনই তিনি হাত মেলাতেন তিনি কখনই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন না হাত ফিরিয়ে আনার ব্যপারে। তিনি ছিলেন স্থির ও শান্ত। যখন কথা বলতেন তিনি থাকতেন সব সময় হাসি-খুশি। তিনি খুব কমই রাগাম্বিত হতেন এবং যখন তিনি রাগ করতেন তখন শয়তান ও নফস তার দিকে আসতো। এরকম সময় , খুব বেশী রাগাম্বিত হলে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন এবং যতক্ষন পর্যন্ত না নফসের উপর বিজয়ী হতেন এবং শান্ত হতেন ততক্ষন পর্যন্ত বাড়িতে আসতেন না। যে বিষয়ে তিনি সব সময় জোর দিতেন এবং অন্যদের পরামর্শ দিতেন তা ছিলো :‘ ভাল স্বভাব’ । প্রত্যেকেরই উচিৎ আল্লাহর জন্য ভাল মেজাজ সম্পন্ন হওয়া ও মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করা।
এ বিষয়ে তিনি বলতেনঃ
“ বিনয়ী হও এবং ভালো মেজাজের হও আল্লাহর জন্যে , লোকজনকে খুশী করার মোনাফেকীর পরিবর্তে।”
হযরত শেইখ ছিলেন কথা বলতে অনিচ্ছুক ; তার মৌন দৃষ্টিপাত পরিষ্কার ইঙ্গিত করতো যে তিনি আল্লাহর দিকে চিন্তা ও জিকিরে আছেন। তার কথার শুরুতে এবং শেষে থাকতেন আল্লাহ। তার দিকে তাকালে আল্লাহর কথা স্মরণ হতো। কোন কোন সময় তাকে জিজ্ঞেস করা হতো তিনি কোথায় ছিলেন বলতেনঃ
“ ইনদা মালিকিল মুকতাদির --“ সার্বভৌর্ম সর্বসক্ষম প্রভুর কাছে।”
দোয়ার সময় (যেমন দোয়া নুদবাহ ও দোয়া কুমাইল) তিনি অনেক কাঁদতেন ; যখনই হাফিজ ও তাক্বদীসের কবিতা আবৃত্তি করা হতো তার চোখ অশ্রুপূর্ণ হয়ে যেতো। কান্নার মাঝেও তিনি সক্ষম ছিলেন হাসতে অথবা এমন কিছু বলতেন যা বিরক্তির পরিস্থিতিকে নরম করে হাসিখুশিতে পরিণত করতো।
তিনি আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আঃ) এর জন্য গভীর প্রেম অনুভব করতেন এবং ছিলেন তার এক দৃঢ় সমর্থক ও প্রেমিক। যখনই বসতেন অথবা উঠে দাঁড়াতেন তিনি নরম করে বলতেন‘ ইয়া আলী আদরিকনী (হে আলী! আমার দিকে দেখেন)।
বিনয়
তার এ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ড: ফারযাম বলেন : অন্যদের প্রতি তার আচরণ ছিলো বিনয় ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। তিনি সবসময়ই আমাদের স্বাগতম জানাতে নিজে দরজা খুলে দিতেন এবং সমাবেশগুলোর জন্য প্রবেশ করতে দিতেন। এসব আমরা তার বাড়িতে করতাম। কোন কোন সময় তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে আমাদেরকে নিয়ে যেতেন তার কর্মশালায় যেখানে তিনি সেলাইয়ের কাজ করতেন। এক শীতে , তিনি দু’ টো ডালিম কিনে আমাকে একটি দিলেন এবং খুব আন্তরিক ও দ্বিধাহীনচিত্তে বললেন : খাও , প্রিয় হামিদ!
তিনি কখনই নাক উঁচু ছিলেন না এবং কখনই নিজেকে অন্যের চাইতে বড় ভাবতেন না। যদি কখনো তিনি উপদেশ দিতেন তা ছিলো শুধুমাত্র অন্যকে পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব পালন করা।
তিনি সবসময় প্রবেশদ্বারের পাশেই বসতেন এবং যে ব্যক্তিই কক্ষে প্রবেশ করতো তিনি তাকে উষ্ণ অর্ভ্যথনা জানাতেন এবং সম্মানের সাথে তাদেরকে বসতে বলতেন।
হযরত শেইখের আরেক শিষ্য বলেন :‘ যখন তিনি তার সাথীদের সাথে কোথাও যেতেন তিনি অন্যদের আগে প্রবেশ করতেন না।’
অন্য একজন বলেন :“ আমরা হযরত শেইখের সাথে মাশহাদ গেলাম। আমরা যখন পবিত্র মাযারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম মরহুম আহমেদ মুরশিদ চিলুই-র23 ছেলে হায়দার আলী মির্যা হঠাৎ করে শেইখ এর পা-এ পড়ে গেলেন তার পায়ে চুমু দেয়ার জন্য। শেইখ বললেন : এই নীচু আত্মার লোক! আল্লাহর অবাধ্যতার বিষয়ে সতর্ক হও ! নিজের বিষয়ে লজ্জিত হও! আমাকে তুমি কী মনে করো ?!”
পুনরায় বন্ধুত্ব স্থাপন
গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিলো যে হযরত শেইখ লোকদের মধ্যে পূনরায় বন্ধুত্ব করে দিতেন। যারা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছে তিনি তাদেরকে নিজের বাসায় দাওয়াত দিতেন এবং পূনরায় তাদেরকে মিলিয়ে দিতেন এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস উল্লেখ করে।
সাইয়্যেদদের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা
ইমাম আলী (আঃ) ও মা ফাতিমা (আঃ)-দের বংশ ও সাইয়্যেদদের প্রতি ছিলেন খুবই শ্রদ্ধাশীল। তাকে সবসময় দেখা যেতো তাদের (সাইয়্যেদদের) হাতে চুমু দিতে এবং অন্যদের আদেশ দিতেন তাদের হাতে চুমু দিতে।
এক মর্যাদাবান সাইয়্যেদ প্রায়ই হযরত শেইখের সাথে দেখা করতে যেতেন। তার হুক্কা পানের স্বভাব ছিলো। যখনই তা তার জন্য তৈরী করা হতো শেইখ নিজে তাতে দু একটা টান দিতেন যদিও আসলে হুক্কা পানের অভ্যাস তার নেই , তিনি ভান করতেন পান করছেন যেন সাইয়্যেদ তা পানে লজ্জিত না হন। এরপর শেইখ তা তাকে পান করতে দিতেন।
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেছেনঃ‘ একবার শীতের এক দিনে আমি হযরত শেইখ এর সাথে দেখা করলাম , তিনি বললেনঃ
“ চলো তেহরানের এক পুরানো এলাকায় যাই।”
আমরা গেলাম এক পুরানো গলিতে। সেখানে আমরা দেখলাম এক আগোছালো দোকান যেখানে এক বৃদ্ধ সাইয়্যেদ বসে আছেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। একজন কয়লা বি ক্রে তা হিসাবে কাজ করতেন এবং সেখানেই ঘুমাতেন তার বাড়ি হিসাবে। জানা গেলো গত রাতে তার কুরসীটি24 এবং তার কাপড় এবং কিছু জিনিসপত্র পুড়ে গেছে।
তার থাকার অবস্থা ছিলো এতই খারাপ যে অনেক মানুষই সেখানে প্রবেশ করতে ইচ্ছা করবে না। খুব বিনয়ের সাথে শেইখ তার কাছে গেলেন এবং উষ্ণ শুভেচ্ছার পর তিনি তার আধোয়া অর্ধেক পোড়া কাপড় চোপড়গুলো নিলেন ধোয়ার জন্য ও তালি দেয়ার জন্য। তখন ঐ বৃদ্ধ লোক বললো যে তার সহায় সম্বল হারিয়ে গেছে এবং তিনি কাজ চালাতে পারছেন না। শুনে শেইখ আমার দিকে ফিরলেন এবং বললেনঃ
“ তাকে কিছু দাও ব্যবসা নুতন করে শুরু করার জন্য!”
সকলের জন্য শ্রদ্ধা
হযরত শেইখ শুধু সাইয়্যেদদের প্রতিই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তা নয় , বরং তিনি ছিলেন সব মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কেউ যদি ভুল করতো তাকে অন্যদের সামনে তিনি অপমান করতেন না। তিনি কাউকে কখনই তিরস্কার করেন নি তাদের ভুলের জন্য , বরং তাদের সাথে উষ্ণ ও সৌহাদ্যপূর্ণ আচরণ করতেন।
পৃথিবীর পদের বিষয়ে উদাসীনতা
হযরত শেইখের শেষ জীবনের দিকে , বেশ কয়েকজন উচ্চ পদস্থ লোক তার সাথে পরিচিত হন। তাতে শুধু হাওযা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত ব্যক্তিত্বরাই ছিলেন না , তাতে আরো ছিলেন কিছু রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্বও যারা বিভিন্ন কারণে তার সাথে দেখা করতে আসতেন।
দরিদ্র , নির্যাতিত ও বিশেষ করে সাইয়্যেদের প্রতি তার বিনয় ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের প্রতি উদাসীন।
যখন তারা তার বাড়িতে আসতেন তিনি বলতেনঃ
“ তারা আসে আমার কাছে পৃথিবীর25 জন্য ; তারা দুর্দশাগ্রস্ত , ক্লান্ত এবং তাদের কেউ আছে অসুস্থ (আত্মিয়দের মাঝে) , তারা আমার কাছে আসে দোয়ার জন্য।”
শেইখ এর এক ছেলে বলেনঃ আমার বাবার ভক্ত একজন জেনারেল আমাকে বললেন : জানো কেন আমি তোমার বাবাকে ভালবাসি ? কারণ আমি যখন প্রথমবার তার সাথে সাক্ষাত করতে আসি তিনি তার কক্ষে দরজার পাশেই বসে ছিলেন। আমি তাকে শুভেচ্ছা জানালাম ; এরপর তিনি আমাকে বললেনঃ যান বসুন! আমি তাই করলাম , একটু পরেই এক অন্ধ লোক এলো এবং আমি দেখলাম হযরত শেইখ উঠে দাঁড়ালেন। তাকে শ্রদ্ধার সাথে জড়িয়ে ধরলেন এবং তাকে নিজের কাছে বসালেন।
“ আমি যখন ঘরের চারদিকে দেখছিলাম কী হচ্ছে ; আমি দেখলাম ঐ অন্ধ লোকটি উঠে দাঁড়ালেন চলে যাওয়ার জন্য। একই সময় হযরত শেইখ তার সামনে এগিয়ে গেলেন এবং তাকে জুতা পড়তে সাহায্য করলেন। এরপর দশ তোমান তার হাতে দিলেন এবং অন্ধ লোকটি চলে গেলো। অথচ আমার বিদায় নেয়ার সময় হলে তিনি তার জায়গা থেকে নড়লেন না , শুধু বললেন :“ খোদা হাফেজ।”
ভ্রমণে নৈতিকতা
তার নেয়ামতপূর্ণ ও অন্যদের চেয়ে উত্তম জীবনে হযরত শেইখ ভ্রমণ করেছিলেন মাশহাদ , কাশান , ইসফাহান , মাযানদারান এবং কেরমানশাহতে। ইরানের বাইরে তার একমাত্র ভ্রমণ ছিলো ইরাকে , সেখানে তিনি পবিত্র মাজারগুলোতে যিয়ারতে যান। এ ভ্রমণগুলো ছিল সাথীদের সাথে যার স্মৃতি ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো ভ্রমণে নৈতিকতার সাথে জড়িত হওয়ায় তা এখানে উল্লেখ করা হলো।
তার ভ্রমণের সাথীরা বলেনঃ হযরত শেইখ ছিলেন ভালো মেজাজের , আন্তরিকতায় কপটতাহীন এবং একসাথে ভ্রমণে সুখকর। তিনি কখনও নিজেকে তার শিষ্যদের ও ভক্তদের থেকে আলাদা করে দেখতেন না । কোন মালপত্র ও রসদ বহন করতে তিনি নিজেরটা নিজেই বহন করতেন এবং খরচের নিজের অংশটি নিজেই দিতেন।
ষষ্ঠ অধ্যায়
ইমাম আল আসর এর (আঃ) দ্বিতীয় আগমনের প্রতীক্ষা
হযরত শেইখের অসাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ছিলো হযরত ওয়ালী আল আসর (আমাদের সত্তা তার জন্য কোরবানী হোক) প্রতি তার গভীর ভালবাসা ও তার পুনরাগমনের জন্য অপেক্ষা করা। তিনি বলেনঃ
“ অনেকে বলে তারা ইমাম আল আসর (আঃ)-কে তাদের নিজেদের চাইতে বেশী ভালোবাসে , অথচ তা সত্য নয়। কারণ আমরা যদি সত্যিই তাকে আমাদের চাইতে বেশী ভালোবাসি তাহলে আমাদের উচিত নিজেদের জন্য কাজ না করে তার জন্য কাজ করা। আল্লাহর কাছে তোমরা সবাই দোয়া করো যেন তিনি তার পুনরাগমনের পথে যত বাধা বিপত্তি আছে তা দূর করে দেন এবং আমাদের হৃদয়কে তাঁর হৃদয়ের অনুগামী রাখেন।”
হযরত শেইখের সবচেয়ে বড় দাবী
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেনঃ যত বছর আমি হযরত শেইখের সেবায় ছিলাম আমি কখনো এটি অনুভব করি নি যে শুধু হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) এর পুনরাগমন ছাড়া তার আর কোন দাবী ছিলো , তিনি বন্ধুদের মনে করিয়ে দিতেন যেন ইমামের (আঃ) পুনরাগমণ ছাড়া অন্য কিছু যতটা সম্ভব কম চাওয়া হয়। তার অপেক্ষারত অবস্থা এতই শক্তিশালী ছিলো যে , কেউ যদি হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) এর ফারাজ বা পুনরাগমনের কথা তুলতো তিনি খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন এবং কাঁদতেন।
কীভাবে পিঁপড়া তার প্রিয়তমার কাছে পৌঁছেছিলো
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হযরত শেইখ জোর দিতেন যে যারা হযরত ওয়ালী আল আসরের (আঃ) অপেক্ষায় আছে তারা যেন সব সময় প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে প্রস্তুত থাকে যদিও এমন হয় যে তারা ইমাম (আঃ) এর পুনরাগমন পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন না। তিনি হযরত দাউদ (আঃ) এর একটি ঘটনা বর্ণনা করতেনঃ
“ মরুভূমির মাঝ দিয়ে অতিক্রম করার সময় হযরত দাউদ (আঃ) একটি পিঁপড়াকে একটি ছোট ঢিবি থেকে কিছু ধূলা তুলে নিতে দেখলেন। সে তা বহন করে অন্য আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিলো। তিনি মহান আল্লাহর কাছে পিঁপড়াটির রহস্য জানতে চাইলেন......। পিপড়াটি কথা বলা শুরু করলোঃ আমার এক প্রিয়তমা আছে যে তার সাথে বিয়ের শর্ত দিয়েছে এ ঢিবি থেকে সব ধূলো যেন ঐ জায়গায় নিয়ে যাই!”
“ তুমি কত সময়ে এ বড় ঢিবিটির ধূলো প্রয়োজনীয় জায়গায় স্থানান্তরিত করতে পারবে ? কারণ তোমার জীবন কি এ জন্য যথেষ্ট ?” দাউদ (আঃ) পিঁপড়াকে জিজ্ঞেস করলেন। যার উত্তরে সে বললোঃ‘ আমি এতটুকুই জানি! কিন্তু আমার আনন্দ হচ্ছে যে আমি যদি এভাবে মারা যাই তাহলে আমি আমার প্রিয়তমার পথেই মারা যাবো!’
এটি শুনে হযরত দাউদ (আঃ) আবেগাল্পুত হয়ে পড়লেন এবং এ ঘটনাটিকে নিজের জন্য একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করলেন।”
হযরত শেইখ সব সময় বলতেন যেঃ
“ তোমার সমস্ত সত্তা দিয়ে (আন্তরিকভাবে) হযরত ওয়ালী আল আসরের (আঃ) অপেক্ষা কর এবং এ অপেক্ষার অবস্থা বজায় রাখো আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।”
“ আমার সালাম পৌছে দাও হযরত ইমাম (আঃ) কে”
তার এক শিষ্য বলেছেনঃ
তিনি সব সময় আল মাহদী (আঃ) এর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। কখনো দরুদ শেষ করতেন না“ আজ্জিল ফারাজাহুম (পূনরায় আগমন ত্বরান্নিত হোক) না যুক্ত করে।”
তার বৈঠকগুলো কখনো অনুষ্ঠিত হতো না ইমাম আল-আসর (আঃ) এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও তার পুনরাগমনের দোয়া না করে। জীবনের শেষ দিকে এসে যখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ফারাজের আগেই তার মৃত্যু হবে তখন তিনি তার বন্ধুদের বলতেনঃ
“ যদি তোমাদের সেই সম্মান হয় যে তোমরা তাঁর (ইমাম আঃ) পুনরাগমন প্রত্যক্ষ করো তাহলে তাঁকে আমার ভালবাসা জানাবে।”
ইমাম মাহদী (আঃ) এর জন্য অপেক্ষারত এক যুবকের বারযাখ (কবরের জীবন)
এক যুবকের দাফনের সময় হযরত শেইখ বললেনঃ
“ আমি দেখলাম হযরত ইমাম মুসা বিন জাফর (আঃ) তাঁর বাহু এগিয়ে দিয়েছেন এই ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরার জন্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম (আশপাশের লোকদের) মৃত্যুর আগে তার শেষ কথা কি ছিল ? তারা বলল এই কবিতাঃ
“ অপেক্ষারতরা তাদের আত্মা নিয়ে চলে যাচ্ছে তাদের শেষ নিঃশ্বাসে , হে মর্যাদাবানদের বাদশা , আপনার আশ্রয় দিন!”
ইমাম মাহদী (আঃ) এর জন্য অপেক্ষারতরা আবার আসবে
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যারা সত্যিই ইমাম আল- আসর (আঃ) এর অপেক্ষায় আছে তারা তাদের মৃত্যুর পর ইমাম মাহদী (আঃ) এর সাথে তাঁর পুনরাগমনে26 আবার আসবে। ইমাম মাহদী (আঃ) এর সাথে যারা পৃথিবীতে আবার ফিরে আসবে তাদের মধ্যে তিনি যাদের নাম বলেছেন তারা হলোঃ
আলী বিন জাফর , যার কবর ক্বোমের দার-ই-বিহিশতে এবং মির্যা কুমী যার কবর ক্বোম শহরে শাইখান কবরস্থানে।
রেই শহর-এর মুচি
হযরত শেইখের একজন শিষ্য বলেনঃ‘ একবার আমি তার কাছে উপস্থিত ছিলাম এবং আমরা মাওলা ইমাম আল-আসর (আঃ) এর জন্য অপেক্ষার শর্তাবলী নিয়ে কথা বলছিলাম। তিনি বললেন :
“ রেই শহরে এক মূচি বাস করতো যার নাম ছিলো ইমাম আলী। আযেরী ভাষাভাষি এ লোকটির কোন স্ত্রী ও সন্তান ছিলো না। সে তার কর্মশালাতেই ঘুমাতো। তার বর্ণনা এসেছে যে সে ছিলো খুবই অসাধারণ আধ্যাত্মিক অবস্থার অধিকারী। সে শুধু ইমাম আল-আসর (আঃ) এর ফারাজ ছাড়া আর কিছু চিনতো না। সে তার অসিয়তনামায় লিখে যায় যে , যখন সে মারা যাবে যেন শহরবানু পর্বতের গোড়ায় তাকে কবর দেয়া হয় যা ছিলো রেই শহরের উপকন্ঠে। যখনই আমি আমার মনোযোগ তার কবরের দিকে দিতাম আমি ইমাম আল-আসর (আঃ) কে সেখানে দেখতে পেতাম।27
সপ্তম অধ্যায়
কবিতা
হযরত শেইখ আধ্যাত্মিক ও নৈতিক কবিতাসমূহে খুবই আগ্রহী ছিলেন। তার বক্তব্যে বেশীর ভাগ সময়ে শিক্ষণীয় কবিতা থাকতো। তিনি বিশেষভাবে মূল্য দিতেন কবি হাফিজের গজল ও তাক্বদীসের মাসনভীকে। তিনি তাদের কবিতা শুনে কাঁদতেন।
তিনি তাক্বদীসের মসনভীর খুব ভক্ত ছিলেন এবং বলতেন :
“ যদি তাক্বদীসের একটি বই এ বাজারে থাকতো তাহলে আমি সব দিয়ে দিতাম ঐ একটি কিতাব কেনার জন্য।” 28
হযরত শেইখের বহু দিনের ঘনিষ্ট ড: আব্দুল হাসান শেইখ বলেন :‘ হযরত শেইখ ছিলেন হাফিজের কবিতার এক দক্ষ বোদ্ধা এবং তার কবিতাকে তিনি সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতেন।’
হযরত শেইখের কবিতা ও কবিতা সম্বন্ধে তার অভিমত , বিশেষ করে কবি হাফিজ সম্বন্ধে তার মনোভাব সর্ম্পকে ড: হামিদ ফারযাম বলেনঃ ড: গুইয়ার মাধ্যমে 1954 সন থেকে হযরত শেইখের বন্ধুত্ব লাভের পর থেকে এমন কোন বৈঠক ছিলো না যেখানে আমি তার মুখ থেকে সঠিক সময়ে সে সম্পর্কে সুন্দর কবিতা শুনি নি। তিনি হাফিজের কবিতায় মুগ্ধ ছিলেন। আমি তাকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম কেন তিনি এত হাফিজের কবিতায় মুগ্ধ। তিনি বললেন :
“ আধ্যাত্মিকতা ও রহস্যময়তাকে হাফিজ সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করেছেন এবং তার কবিতায় প্রতিভাত হয়েছে সব আত্মিক সত্য এবং রহস্যময় অনুভব।”
হযরত শেইখ ছিলেন অন্য কবিদের চেয়ে বেশী হাফিজ অনুরক্ত এবং সবসময় তার কবিতা আবৃত্তি করতেন ; এমনকি যদি তিনি কাউকে সর্তক করতে বা তিরস্কার করতেও চাইতেন29 তাহলে তিনি তার কবিতা আবৃত্তি করতেন।
তিনি সবসময় এ পৃথিবীকে‘ ডাইনী বুড়ি’ বলতেন। কোন কোন সময় তিনি কোন শিষ্যকে লক্ষ্য করে বলতেন :
“ আমি দেখছি তুমি আবার এ ডাইনী বুড়ির ফাঁদে পড়েছো !”
এবং তখন তিনি হাফিজের কবিতা আবৃত্তি করতেনঃ
“ এমন কেউ নেই যে তার এই জালে পেঁচিয়ে যায়নি , কে আছে যার পথে এরকম পরীক্ষার ফাঁদ বিছানো নেই ?”
তিনি উপহাস করে বলতেন :
“ বেশীর ভাগ লোকই এতে পেঁচিয়ে যায় এবং খুব কম লোকই আছে যারা এ থেকে মুক্ত।”
তিনি আত্ম -অহংকারকে তিরষ্কার করে নিচের এ লাইন দু’ টো আবৃত্তি করতেনঃ
“ দরবেশ হওয়ার পথে কুফুরী হলো আত্ম -অহংকার ও নিজ সম্পর্কে ভালো ধারনা ;
আদেশ হলো যা তুমি (আল্লাহ) নির্ধারণ করো
অভিমত হলো যা তুমি (আল্লাহ) ভাবো”
সুন্দর কন্ঠে কবিতা আবৃত্তি
ডঃ ফারযাম এ সম্পর্কে বলেনঃ
‘ মরহুম শেইখ খুব মনোরম সুরে কবিতা আবৃত্তি করতেন। ফায়েদ-ই কাশানীর বিশেষ কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতেন। যেমন , নিচের লাইন দুটোঃ
“ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই যা (আমি করেছি) মাশুক ছাড়া অন্যের জন্য , আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই আমার এ কাল্পনিক অস্তিত্বের জন্য , যদি কোন মুহূর্ত চলে যায় তার (সুন্দর) চেহারা স্মরণ না করে , আমি অসংখ্যবার ক্ষমা চাই সে মুহূর্তটির জন্য।”
আমরা এক অপরাহ্নে হযরত শেইখের সাথে তার এক শিষ্যের বাড়িতে ছিলাম। তার ছিলো বিরাট এক মেহমান কক্ষ যার দরজার কাছে হযরত শেইখ বসে হাফিজের এই কবিতাটি পড়ছিলেন :
“ কে আছে যে প্রেম ও দয়ায় আমার প্রতি আন্তরিক হবে ? (এবং) কল্যাণ করবে অন্যায়ের বদলে , আমার মত অন্যায়কারীর প্রতি ?”
তিনি কয়েকটি লাইন কাঁদতে কাঁদতে গাইলেন খুব সুন্দর ও মনোরম সুর দিয়ে এবং অন্যদেরও আবেগাপ্লুত করে ফেললেন। তা এত অসাধারণ ছিলো যে আমি ডাঃ গুইয়াকে বললামঃ
“ হযরত শেইখ- এর এত সুন্দর কন্ঠ ও মিষ্টি সূর আছে!”
তিনি বললেন :
“ এটি একটি দুঃখ যে তুমি এত দেরীতে তার সাথে পরিচিত হয়েছো। তিনি আধ্যাত্মিক অবস্থায় এত সুন্দর গাইতেন যে দরজা ও দেয়ালগুলো সত্যিকারভাবেই কাঁপতো।”
হযরত শেইখের একটি কবিতা ও একটি স্মৃতি
হযরত শেইখ নিজেও মাঝে মাঝে কবিতা লিখতেন। সমসাময়িক মারজা বিখ্যাত ফকীহ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মরহুম আয়াতুল্লাহ কাযীর (আল্লামা তাবাতাবাইর শিক্ষক) ছাত্র আমার অনুসন্ধানের উত্তরে হযরত শেইখ রজব আলী সম্পর্কে বললেনঃ
“ আমি তার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম নাজাফে হযরত আয়াতুল্লাহ কাযীর এক বৈঠকে। সে বৈঠকে তিনি আমির আল মুমিনীন (আঃ) সম্পর্কে প্রশংসাসূচক কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন যার প্রতিটি পংক্তি আবজাদ30 এর অক্ষর দিয়ে শুরু। এরপর তিনি তার একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন যা এরকমঃ
“ আপনি যে নেয়ামত দান করেছেন মহাজগতকে , তার সব দিয়েছেন আমাকে , প্রচুর ও বিভিন্ন ;
আমি ভাবছিলাম যে এটি হবে সবচেয়ে উঁচু ব্যাখ্যা খোদায়ী নেয়ামত ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতার , যতক্ষণ না আমি সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ার এই বাক্যটির সাক্ষাত পেলাম”
“ আমি আপনার সব নেয়ামতের জন্য শোকর জ্ঞাপন করছি।” 31
এক আশ্চর্য ও শিক্ষণীয় কারামাহ
সাপ্তাহিক বৈঠকের‘ নৈতিকতা’ সম্পর্কিত আলোচনার শেষে একজন যুবক এগিয়ে আসলো সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ার 35 নং দোয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতে : আমি ইয়াযদ থেকে এসেছি। এ বিষয়টি একটি বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়েছিলো এবং উপস্থিত কেউ কেউ হাসাহাসি করেছিলো। বলা হয়েছিলো এর কারণ হলো শেইখের মূর্খতা। কারণ তিনি জানতেন না সাহিফায়ে সাজ্জাদিয়াতে এটি আছে কিনা। সে রাতেই আমি দেখলাম তিনি বলছেনঃ
“ আমার উদ্ধৃতি দিয়ে যা বলা হয়েছে তা সত্য নয়। আমি যা বলেছি তা এরকমঃ‘ আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা , আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তার চেয়ে বরং সেসবের জন্য বেশী যা আমাকে দেন নি।’
এ কথাটি সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় 35 নং দোয়াতে আছে।”
কোন সন্দেহ নেই যে এটি একটি সত্য স্বপ্ন ছিলো। সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া থেকে কোন কিছু স্বপ্নে পাওয়া গায়েবের সাথে সম্পর্কহীন অবস্থায় একেবারেই অসম্ভব।32
অষ্টম অধ্যায়
রাজনীতি
হযরত শেইখ রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না কিন্তু তিনি ঘৃনিত পাহলভী সরকার ও শাসকগোষ্টির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি শুধু শাহের বিরোধিতাই করতেন না , মুসাদ্দেককেও সমর্থন করেন নি। তিনি আয়াতুল্লাহ ক্বাশানীর প্রশংসা করতেন এবং বলতেন :
“ তার ভেতরটি একটি ঝর্ণার উৎসমুখের মত” ।
দু’ টি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎবাণী
হযরত শেইখের সন্তান বলেনঃ 30 তীর 1130 ফার্সী বছর (21 জুলাই 1951) যখন শেইখ বাড়িতে আসলেন , তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেনঃ
“ হযরত সাইয়্যেদ আল-শুহাদা এ আগুন নিভিয়ে দিয়েছেন এবং দূর্যোগকে বাধা দিয়েছেন ; অনেক লোককে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো আজ। আয়াতুল্লাহ ক্বাশানী সফল (বিজয়ী) হবেন না। এক সাইয়্যেদ আসবেন তিনি বিজয়ী হবেন।”
পরে তার ভবিষ্যৎবাণী প্রমাণিত হয় যে তিনি হলেন ইমাম খোমেইনী (রহঃ)।
ইসলামী বিপ্লবের ভবিষ্যৎ
ইমাম খোমেইনী সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে আনন্দ হয় যখন ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে তার ভবিষ্যৎবাণী জানা যায়।
প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব আলী মুহাম্মাদ বিশারাতি বর্ণনা করেন যে 1979র গ্রীষ্মে যখন তিনি সিপাই-ই-পাসদারানের (ইসলামী বিপ্লবী গার্ডবাহিনী) গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান ছিলেন তিনি একটি রিপোর্ট পান যে জনাব শরিয়ত মাদারী (তৎকালীন বিদ্রোহী আলেম) মাশহাদে বলেছেন :“ আমি শেষ পর্যন্ত ইমাম খোমেনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো।” জনাব বিশারাতি বলেন : আমি ইমাম খোমেনীর (রাঃ) সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম এবং অন্যান্য রিপোর্টের সাথে তাকে জানালাম যে তাঁর সম্পর্কে জনাব শরিয়ত মাদারী কী বলেছেন। ইমাম (রঃ) মাথা নিচু করে শুনলেন এবং যখন আমি কথা শেষ করলাম তিনি তার মাথা তুলে বললেনঃ
“ তারা কী বলছে ? আমাদের বিজয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছেন আল্লাহ। আমরা সফল হবো এবং একটি ইসলামী সরকার গঠন করবো এবং পতাকা হস্তান্তর করবো এর প্রকৃত বহনকারী (ইমাম মাহদী -আঃ) -এর নিকট।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম : আপনি নিজে [হস্তান্তর করবেন] ?
ইমাম (রঃ) নীরব রইলেন এবং উত্তর দিলেন না ।
বারযাখে নাসির আল-দ্বীন ক্বাজার
হযরত শেইখের একজন শিষ্য নাসির আল দ্বীন শাহ কাজার-এর বারযাখের অবস্থা সম্পর্কে তার কাছ থেকে জেনে বলেনঃ
“ তার আত্মাকে মুক্ত করা হয় শুক্রবারে । ঐ সন্ধ্যাতে তাকে আবার জোর করে তার পূর্বস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সে কাঁদছিলো এবং প্রহরীদের কাছে ভিক্ষা চাইছিলো তাকে ফেরত না নেয়ার জন্য। যখন সে আমাকে দেখলো সে বললো : আমি যদি জানতাম আমার স্থান হবে এরকম আমি কোন দিন চিন্তাও করতাম না পৃথিবীতে আমোদ ফূর্তি করার।”
অত্যাচারী রাজাদের প্রশংসা করা
হযরত শেইখ তার বন্ধু ও শিষ্যদের পাহলভী সরকারের সাথে সহযোগিতাতে বাধা দিতেন , বিশেষ করে তাদের প্রশংসা ও (কর্মকর্তাদের) শ্রদ্ধা করার বিষয়ে।
হযরত শেইখের এক শিষ্য তার উদ্বৃতি দেন যে তিনি বলেছেনঃ
“ আমি দেখলাম বারযাখে এক ধার্মিক ব্যক্তির বিচার হচ্ছে এবং যত খারাপ কাজ তার সময়কার স্বেচ্ছাচারী শাসক করেছে তা তার ওপর আরোপ করা হচ্ছে। যার বিচার হচ্ছিল সে প্রতিবাদ করলোঃ
‘ আমি এ অপরাধগুলোর কোনটিই করি নি , তাকে বলা হলো :‘ তুমি কি তার প্রশংসায় বলো নি যে দেশকে কী সুন্দর নিরাপত্তা দিয়েছে ?’
সে উত্তর দিলো :‘ হ্যা’ ।
তখন তাকে বলা হলো : তুমি তার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট ছিলে ; সে এসব অপরাধগুলো করেছে তার রাজ্য লাভের উদ্দেশ্যে।”
নাহজুল বালাগাতে ইমাম আলী (আঃ) বলেছেনঃ
“ যে-ই অন্য লোকের আচরণে সন্তুষ্ট সে এমন যে ঐ কাজে তাদের সাথে সহযোগিতা করেছে এবং যে-ই অন্যায় কাজ করলো দু’ টো গুনাহ তার জন্য লিপিবদ্ধ হয়ঃ একটি তা করার জন্য এবং অপরটি তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার জন্য।” 33
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দূতের সাথে সহযোগিতা :
হযরত শেইখের এক বন্ধু , যার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দূতের সাথে কাজ করতো , বললোঃ মাশহাদে যাওয়ার পথে আমি হযরত শেইখের সাথে ছিলাম। তার সাথে একত্রে আমরা পবিত্র মাজার যিয়ারতে গেলাম । তিনি এক কোনায় যিয়ারত পড়তে দাঁড়ালেন ও ইমাম রেযা (আঃ) সাথে কথা বললেন ঠিক সেভাবে যেভাবে আমি আপনার সাথে কথা বলছি। যিয়ারত শেষ হওয়ার পর তিনি একটি সেজদা করলেন (কাবার দিকে ফিরে)। যখন তিনি তার মাথা সিজদা থেকে ওঠালেন তিনি আমাকে ডাকলেন (কাছে) এবং বললেনঃ
“ পবিত্র ইমাম (আঃ) বলেছেনঃ তোমার ছেলেকে একাজ করতে বাধা দিতে। নয়তো সে তোমার পিঠে এক ভারী বোঝা চাপিয়ে দেবে!”
আমরা জানতাম না যে সে আমেরিকানদের সাথে আমেরিকা যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করেছে । প্রায় পঁচিশ বছর আগে , একদিন আমার ছেলে আমার কাছে এলো এবং বললোঃ‘ আমি বিদেশ যাচ্ছি , আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি এবং এমনকি ভিসাও নিয়ে নিয়েছি।’ আমরা যা করলাম তাতে তার সিদ্ধান্তে কোন পরিবর্তন এলো না , শেষ পর্যন্ত আমেরিকা চলে যাবার কিছুদিন পর সে আমাদের চিঠি লিখলো যে , তার স্ত্রী বন্ধ্যা এবং সে তাকে তালাক দিচ্ছে। তখন থেকে তার কারণে আমরা অনেক সমস্যার মাঝ দিয়ে গিয়েছি ।
দ্বিতীয় ভাগ
এক লাফে দীর্ঘ পথ অতিক্রম
প্রথম অধ্যায়
আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ
হযরত শেইখের আধ্যাত্মিক মাক্বাম ও নৈতিক গুণাবলী তাদের সবার কাছেই সুস্পষ্ট ছিলো যারা তার বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থেকে তার কথা শুনতেন ও তাকে ঘনিষ্ঠভাবে জানতেন।
প্রশ্ন হলো এ বিশাল আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব কী করে এত উঁচু মর্যাদা পেলেন। কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ যিনি আনুষ্ঠানিক বিদ্যাবহির্ভূত ছিলেন এবং হাওযার (ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র) কোন অভিজ্ঞতা তার ছিলো না , অথচ তিনি এত উঁচু মাক্বাম অর্জন করলেন যে শুধু সাধারণ জনগণই নয় এমনকি হাওযা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ ব্যক্তিরাও তার পথ প্রদর্শন উপভোগ করেছে ? কী সেই গোপন রহস্য যা হযরত শেইখকে এক লাফে দীর্ঘপথ এগিয়ে দিয়েছিলো ? এবং সবশেষে : কে তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং কে ছিলো তার আধ্যাত্মিক শিক্ষক ?
শেইখের উস্তাদগণ
যদিও হযরত শেইখের আনুষ্ঠানিক কোন জ্ঞান ছিলো না যা বিশ্ববিদ্যালয় ও হাওযাগুলোতে অর্জন করা যায় , তবুও তিনি কিছু বিশিষ্টজনের সাহচর্য পেয়েছেন , যারা জ্ঞানে ও আধ্যাত্মিকতায় ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি , যেমন , আয়াতুল্লাহ মুহাম্মদ আলী শাহ আবাদী। যিনি ইমাম খোমেনী (রঃ) এর শিক্ষক ছিলেন34 , এবং মরহুম আয়াতুল্লাহ মির্যা মুহাম্মদ তাক্বী বাফক্বী এবং মরহুম আয়াতুল্লাহ মির্যা জামাল ইসফাহানী।
তিনি আরো দু’ জন বিজ্ঞ লোকের কাছে শিক্ষা লাভ করেন। তারা হলেন আগা সাইয়্যেদ আলী মুফাস্সির এবং সাইয়্যেদ আলী গারাভী যিনি ছিলেন কোরআন ব্যাখ্যাকারী এবং তেহরানের উপকন্ঠে মসজিদে সাল সাবিলের ইমাম।
এ অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার ফলে তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদীসের সাথে ভালোভাবেই পরিচিত হন এবং পবিত্র কোরআন হাদীস এবং দোয়াসমূহ অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতেন। অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তা উপস্থাপন করতেন ও যথাযথ মন্তব্য করতেন যে বিষয়ে অন্যরা ছিলেন কম সচেতন। এভাবে হযরত শেইখের ইসলামী জ্ঞান লাভ ছিলো বিশিষ্ঠ ব্যক্তিদের সান্নিধ্য লাভের ফলাফল। কিন্তু তার এক লাফে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যাওয়া ও আধ্যাত্মিক উন্নতির কারণ অন্য জায়গায়। তার জীবনের মোড় যেখানে ঘুরে যায় তা হলো যখন হযরত শেইখ বলেছেন :“ আমার কোন শিক্ষক ছিলেন না ,” তখন তিনি এ কথাটিই ইঙ্গিত করেছেন।
তার ভক্তদের একজন বলেছেন যে হযরত শেইখ বলেছেনঃ
“ আমার কোন শিক্ষক ছিলো না। আমি শেইখ মোহাম্মদ তাক্বী বাফক্বীর35 আলোচনায় উপস্থিত থাকতাম যা হযরত আব্দুল আযীম (আঃ) এর পবিত্র মাজারের উঠানে সন্ধ্যা রাতে অনুষ্ঠিত হতো। তিনি ছিলেন এক আধ্যাত্মিক লোক। একদিন তিনি শ্রোতাদের মধ্যে আমাকে সম্বোধন করে বললেন :“ আপনি একটি (উচ্চ) মাক্বাম অর্জন করবেন।”
জীবন সন্ধিক্ষণ
আমাদের মতে হযরত শেইখের একবারে দীর্ঘপথ অতিক্রম করা , উন্নতির শুরু এবং জীবনের বাঁক একটি ঘটনার মাঝে নিহিত যা খুবই প্রভাব বিস্তারকারী ও শিক্ষণীয়।
যুবক বয়সের প্রথম দিকে হযরত শেইখের জীবনে কিছু ঘটেছিলো যা অনেকটা ইউসূফ (আঃ) এর ঘটনার মত। এ ঘটনা এবং যা পরবর্তীতে ঘটেছিলো তা হলো হযরত শেইখের বাস্তব তাওহীদের পথ অনুশীলন। কোরআনে হযরত ইউসূফের (আঃ) ঘটনার শেষ দিকে এসে এই আয়াতে বলা হয়েছে :
) إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّـهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ(
“ নিশ্চয় যে সৎকর্মশীল ও ধৈর্যশীল , আল্লাহ তার সৎকর্মের পুরস্কারকে কখনোই হারিয়ে যেতে দেবেন না।” (সূরাইউসূফঃ90)
এটি একটি সাধারণ নিয়ম যা শুধু নবী ইউসূফ (আঃ) এর জন্যই নয়।
নবী মূসা (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কোরআন বলছেঃ
) وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَىٰ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ(
“ যখন সে পূর্ণ বয়স্ক হলো এবং দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো , (জীবনে) আমরা তাকে দিলাম ক্ষমতা ও জ্ঞান ; এভাবে আমরা তাদের পুরস্কার দেই যারা সৎকাজ করে।” 36 (আল কাসাসঃ14)
এটিও এক সাধারণ নিয়ম। কোরআন অনুযায়ী সব সৎকর্মশীল ও পরোপকারী ব্যক্তিগণ প্রজ্ঞার আলো ও সুনির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধি লাভ করে থাকেন।
নবী ইউসুফ (আঃ) এর মত একটি ঘটনা
হযরত শেইখ কদাচিৎ এ ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ দিতেন। যাহোক কিছু কিছু সময় তিনি সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দিয়েছেনঃ
“ আমার কোন উস্তাদ ছিলো না , কিন্তু আমি বলেছিলামঃ
হে আল্লাহ! আমি এ থেকে নিবৃত্ত রইলাম আপনাকে সন্তুষ্ট করার জন্য এবং আমি নিজেকে নিবৃত্ত করলাম এ আশায় যে আপনি আমাকে প্রশিক্ষণ দেবেন শুধু আপনার জন্য।”
এ ঘটনাটির উল্লেখ করে সুবিখ্যাত ফক্বিহ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ হাদি মিলানী (রঃ) বলেছেন : শেইখকে নেয়ামত দেয়া হয়েছে আর তা হচ্ছে এ কারণে যে তিনি যুবক বয়সে আত্মনিয়ন্ত্রণ করেছেন।
হযরত শেইখ নিজেই এ ঘটনাটি বলেছেন মর্যাদাবান ফক্বিহ আয়াতুল্লাহ মিলানীর কাছে। সেই বৈঠকে আয়াতুল্লাহ মিলানী (রঃ) ছেলে হাজ্ব , সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ আলী মিলানীও উপস্থিত ছিলেন , যিনি বলেছেন যে হযরত শেইখ এ ঘটনাটি এ ভাবে বলেছেন :37
‘ আমার যুবক বয়সে আমার এক আত্মীয়ের এক সুন্দরী কন্যা আমার প্রেমে পড়েছিলো এবং আমাকে এক নির্জন জায়গায় একা পেয়েছিলো। আমি নিজেকে বললামঃ‘ রজব আলী! আল্লাহ তোমাকে অনেকবার পরীক্ষা করতে পারেন ; কেন তুমি একবার আল্লাহকে পরীক্ষা করো না। ? নিবৃত্ত থাকো এক অবৈধ আনন্দের কাজ থেকে আল্লাহরই জন্য!’
এরপর আমি আল্লাহকে বললাম :
“ হে খোদা! আমি এ গুনাহ থেকে নিবৃত্ত রইলাম এবং এর বদলে তুমি আমাকে তোমার জন্য প্রশিক্ষণ দাও!”
এরপর , নবী ইউসূফ (আঃ) এর মত তিনি সাহসিকতার সাথে গুনাহপূর্ণ এ লোভ থেকে নিজেকে বিরত রাখলেন , আহবানকে এড়িয়ে গেলেন এবং দ্রুত সরে গেলেন সেই বিপজ্জনক ফাঁদ থেকে।
এ আত্ম -নিয়ন্ত্রণ ও গুনাহ এড়িয়ে যাওয়া তাকে দিয়েছিলো অন্তর্দৃষ্টি ও অতিন্দ্রীয় অনুভূতি। তার অন্য জগতের দৃষ্টি খুলে গেল। তিনি এমন কিছু দেখতেন ও শুনতেন যা অন্যরা দেখতে পেতো না বা শুনতেও পেতো না। তিনি এমন পরিষ্কার অর্ন্তদৃষ্টি পেলেন যে যখনই তিনি তার বাড়ি থেকে বেরোতেন তিনি কিছু লোককে তাদের প্রকৃত চেহারায় দেখতেন এবং কিছু রহস্যকে তার কাছে খুলে ধরা হয়েছিলো38 । হযরত শেইখ বলেছেনঃ
“ একদিন আমি‘ মৌলভী’ চৌরাস্তা থেকে‘ সিরাস’ এভিনিউর ভেতর দিয়ে‘ গালুবান্দাক’ (তেহরানের এক অঞ্চল) পর্যন্ত গেলাম এবং (একই পথ দিয়ে) ফিরলাম এবং দেখলাম শুধু একটি মাত্র মানুষের মুখ!”
কীভাবে তিনি আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন
ফাঁদে পড়া এক নব্য যুবকের দোয়াঃ“ হে আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য প্রশিক্ষণ দিন!” কবুল হয়েছিলো সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে এবং আধ্যাত্মিক জীবনে এক লাফে এত সামনে এগিয়ে গেলেন যে অগভীর লোকেরা তা ধারণাই করতে পারে না। এই এক লাফে শেইখ রজব আলী এক রাতে একশত বছর দূরত্ব অতিক্রম করলেন এবং পরিচিত হয়ে গেলেন শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত হিসেবে।
তার আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের প্রথম ধাপে তার চোখ , কান ও অন্তর খুলে গেলো। এতে তিনি বস্তু জগতের বাইরের এবং উচুঁ আকাশগুলো ভেদ করে দেখতে পেতেন , যা অন্যরা দেখতে পেত না ও শুনতে পেত না। এ রহস্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা শেইখের কাছে বিশ্বাসের জন্ম দেয় যে ইখলাস (আন্তরিকতা) অন্তরের চোখ ও কানকে খুলে দেয়। তিনি দৃঢ়ভাবে তার শিষ্যদের বলতেনঃ
“ যদি কেউ আল্লাহর জন্য কাজ করে তাদের অন্তরের চোখ ও কান খুলে যাবে।”
অন্তরের চোখ ও কান
কেউ হয়তো অবাক হতে পারেন অন্তরের আবার চোখ ও কান থাকতে পারে কিনা। কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে : মানুষ কি শারীরিক কান ও চোখ ছাড়া দেখতে ও শুনতে সক্ষম ?
উত্তর হচ্ছে , হ্যাঁ , এটি সত্য। শিয়া ও সুন্নী উভয়ের হাদীসের মাধ্যমে বর্ণীত হয়েছে যে এর উত্তর ইতিবাচক। এখানে কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো।39
নবী (সাঃ) বলেছেন :
“ কোন দাস নেই যে তার চেহারায় দু’ টো চোখ নেই যা দিয়ে সে পৃথিবীর জিনিস দেখে এবং আরও দু’ টো চোখ তাদের অন্তরে রয়েছে পরকালের বিষয়গুলো দেখার জন্য। যখন আল্লাহ তাঁর কোন দাসের কল্যাণ চান তিনি তাদের অন্তরের দু’ টো চোখ খুলে দেন যা দিয়ে তারা তার প্রতিশ্রুত নেয়ামতগুলো দেখতে পায় এবং তারা অদৃশ্যকে বিশ্বাস করে তাদের অদৃশ্য চোখ দিয়ে।” 40
অন্য এক হাদীসে নবী (সাঃ) বলেছেনঃ
“ যদি তোমাদের অন্তর বিভক্ত না হতো এবং তোমরা এতো বাচাল না হতে তাহলে তোমরা সন্দেহাতীতভাবে তাই শুনতে যা আমি শুনি।” 41
ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেনঃ
“ নিশ্চয়ই অন্তরের আছে দুটো কান : ঈমানের রুহ এর একটিতে কল্যাণের কথা বলে এবং অন্যটায় শয়তান অনিষ্টের কথা ফিসফিস করে। এভাবে যেটি অন্যটির উপর বিজয়ী হবে তার উপর অধিপত্য করবে।” 42
দ্বিতীয় অধ্যায়
অদৃশ্য জগত থেকে সাহায্য
আমরা নাহজুল বালাগাতে পড়ি ইমাম আলী (আঃ) জোর দিয়ে বলেন যে , সর্বশক্তিমান আল্লাহর কিছু মেধাবী দাস আছেন যাদের সাথে তিনি কথা বলেন তাদের মন ও বুদ্ধির মাধ্যমে। ইমাম আলী (আঃ) এর কথাগুলো এরকমঃ
“ সব যুগে ও সব কালেই বিশেষ করে (দুই নবীর আগমনের মধ্যবর্তী সময়ে) এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন যাদের সাথে নেয়ামত দানকারী মহান আল্লাহ একান্তে (উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে) কথা বলেন তাদের মন ও বুদ্ধির সাথে এবং আলোকিত করেন তাদের অন্তরের চোখ ও কানকে চেতনার আলো দিয়ে।” 43
আল্লাহর এ যোগ্য দাসেরা হলো তারা যাদের এভাবে বর্ণনা এসেছে মুনাজাতে শাবানিয়ায়ঃ
“ হে আল্লাহ ! আমাকে শামিল করুন তাদের সাথে যারা আপনার ডাকে সাড়া দেবে , আপনার নূর দেখে চেতনা হারাবে যখন আপনি তাদের দিকে তাকাবেন , আপনি তাদের সাথে নীচু স্বরে কথা বলেন , এবং তারা আপনার জন্যে প্রকাশ্যে কাজ করে।”
নফসে আম্মারার (অন্যায়ের দিকে উদ্বুদ্ধকারী) ফাঁদ থেকে ও শয়তানের উস্কানী থেকে মুক্ত হবার পর এবং অন্তরের চোখ ও কান খুলে যাবার পর এ ধরণের যোগ্য দাসদের মাঝে যুবক দর্জিকে মর্যাদা দেওয়া হলো। তখন থেকে তিনি মাঝে মাঝেই ঐশী অদৃশ্য জগত থেকে উৎসাহ লাভ করতেন যার কিছু ছিল স্বপ্নে এবং কিছু জাগ্রত অবস্থায়। এভাবে বিশেষভাবে পথ প্রদর্শিত হচ্ছিলেন যা নিবেদিত এবং মুখলেস মুজাহিদদের জন্যে দেয়া হয়।44
এ ধরনের হেদায়াত সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
“ যখন আল্লাহ কোন ব্যক্তির জন্য ভালো চান তিনি তাদের দ্বীনি আইন সম্পর্কে দক্ষ বানান এবং সঠিক পথে ঐশী উৎসাহ (এলহাম) দেন।” 45
অনুচিত চিন্তার শাস্তি
আল্লাহর প্রশিক্ষণের অধীনে ঐশী পথ প্রদর্শনের একটি নেয়ামত হচ্ছে নিজের ত্রুটি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। পবিত্র নবী (সঃ) বলেনঃ
“ যখনই আল্লাহ কোন ব্যক্তির কল্যাণ চান তিনি তাদেরকে করেন ধর্মীয় আইনে বিশেষজ্ঞ , পৃথিবীর প্রতি উদাসীন এবং তার নিজের দোষত্রুটি সম্পর্কে সচেতন।” 46
ঐশী হেদায়েতের পথে যুবক রজব আলী অনেক ঐশী উৎসাহ লাভ করেন।
আয়াতুল্লাহ ফাহরি47 বলেন হযরত শেইখ তাকে বলেছেন :
“ একদিন আমি বাজারে গেলাম কিছু কাজে , একটি অনুচিত চিন্তায় আমার মন ঘুরে গেলো। কিন্তু আমি সাথে সাথেই তওবা করলাম। পথে আমি দেখলাম এক সারি উট শহরের বাইরে থেকে লাকড়ী বহন করে আনছে। হঠাৎ করে একটি উট আমাকে লাথি দিলো। আমি যদি সঠিক সময়ে নিজেকে সরিয়ে না নিতাম তাহলে তা আমাকে মারাত্মক ব্যাথা দিতো। আমি এ প্রশ্ন মনে নিয়ে মসজিদে গেলাম যাতে জানতে পারি ঘটনাটি কোথা থেকে শুরু হলো । আমি দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হয়ে জিজ্ঞাসা করলামঃ হে আল্লাহ এটি কি ছিলো ?!
আমাকে অতিন্দ্রীয়ভাবে বলা হলোঃ
“ সেটি ছিলো তোমার চিন্তার ফল। আমি বললাম , আমিতো কোন গুনাহ করি নি। আমাকে উত্তর দেয়া হলোঃ উটের লাথিওতো আসলে তোমাকে আঘাত করে নি।” 48
বালাম-ই-বাউরের পরিণতি হবার হুমকি
হযরত শেইখের বিশ্বস্ত শিষ্যদের মধ্যে আয়াতুল্লাহ আগা মির্যা মাহমুদও অন্তর্ভূক্ত ছিলেন যিনি যানজান-এর জুময়ার ইমাম ও মির্যা নাঈনির একজন বিজ্ঞ ছাত্র। এ ধরনের জ্ঞানী ব্যক্তিও মুগ্ধ হয়েছিলেন আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিহীন দুনিয়া বিমূখ হযরত শেইখের আন্তরিকতা ও মেধা দেখে।
হযরত শেইখ একবার বলেনঃ
“ যানজান এর জুময়ার ইমাম তেহরানের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে এলেন। তিনি তাদেরকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এ সাক্ষাতের কারণে (আত্মগর্বের ফলে) আমি ভাবলাম আমি একটা উঁচু মর্যাদা লাভ করেছি যে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আমার সাথে সাক্ষাত করতে আসে...
ঐ (দিন) রাতে আমার মনে এক অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হলো। খুব হতাশ অনুভব করছিলাম। আল্লাহর কাছে দোয়া ও অনুনয়ের পর আমার পবিত্রতা পূনরায় ফেরত দেয়া হলো। আমি সতর্ক হলাম যে যদি এ ধরনের মনোভাব দীর্ঘস্থায়ী হতো তাহলে আমি কি করতাম।
এরকম অবস্থা কীভাবে হলো। আমি এরকম চিন্তায় নিমজ্জিত অবস্থায় আমাকে বালাম-ই-বাউর49 -কে দেখানো হলো এবং বলা হলো।:
যদি এ ধরনের মনোভাব চলতে থাকে তাহলে তুমি তার পরিণতি ভোগ করবে। তোমার সমস্ত সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার পরিণতি হবে যে তুমি বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সাথে মেলামেশা করবে , এ পৃথিবীকে উপভোগ করবে এবং পরকাল থেকে বঞ্চিত হবে। এ ঘটনা শেষ হয়ে গেলো। আমরা শুক্রবারগুলোতে নিয়মিতভাবে বসতে লাগলাম। একবার এ বৈঠক সাধারণের চাইতে দীর্ঘ হলো এবং তা দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হলো। বাড়ির মালিক ও অন্যান্য বন্ধুরা সেখানেই দুপুরের খাবারের জন্য প্রস্তাব করলো এবং আমি একমত হলাম। পরবর্তী সপ্তাহে বৈঠক দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হলো এবং আবারো দস্তরখানা বিছানো হলো। স্বাভাবিক ভাবেই এবার আরো বেশী প্রকারের খাবারসহ। তা বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে চললো। এক ভোজে বিভিন্ন খাবারের সাথে ছিলো সবচেয়ে ভালো মানের মাখন যা দস্তরখানার মাঝখানে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমার মনের ভেতর দিয়ে ঘুরে গেলো যে , এ ভোজ আমার জন্য হচ্ছে , এ বৈঠক আমার জন্য হচ্ছে এবং অন্যান্য বন্ধুদের দাওয়াত দেয়া হয়েছিলো আমার কারণেই। তাই মাখন নেয়ার অগ্রাধিকার আমারই।
এ ধারণা নিয়ে আমি সামান্য রুটির টুকরা নিলাম এবং যখনই আমি মাখন নিতে গেলাম আমি দেখলাম বালাম-ই-বাউর ঘরের এক কোণে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে! তখন আমি আমার হাত ফিরিয়ে নিলাম।”
তুমি পরিতৃপ্ত অথচ তোমার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত ?!
হযরত শেইখ এর এক শিষ্য বলেন যে হযরত শেইখকে তিনি বলতে শুনেছেনঃ
“ এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে আমি দোষী সাব্যস্ত হয়েছি এবং কিছু প্রহরী এসেছে আমাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পর দিন সকালে আমি মানসিকভাবে খুব বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম এই ভেবে এ স্বপ্নের কী কারণ ছিলো ? আল্লাহর অনুগ্রহের ফলে আমি জানতে পারলাম যে তা কোনভাবে আমার প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্কিত। আমি আমার পরিবারকে বললাম বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নিতে এবং আমাকে জানাতে। আমার প্রতিবেশী ছিলো একজন রাজমিস্ত্রী। জানা গেলো যে সে বেশ কয়েক দিন ধরে বেকার এবং এর আগের রাতে তার এবং তার স্ত্রীর জন্য কোন খাবার ছিলো না এবং ঐ রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছে। আমাকে (অতিন্দ্রীয়ভাবে) জানানো হলোঃ‘ দূর্ভোগ তোমার প্রতি! তুমি পেটভরা অবস্থায় ঘুমাও অথচ তোমার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত ?’ সে সময় আমার কাছে জমা ছিলো তিন আব্বাসী! কোন দেরি না করে আরেকটি আব্বাসী প্রতিবেশী এক মুদির দোকান থেকে ধার করলাম এবং আমার জমানো অর্থের সাথে একত্র করে প্রতিবেশীকে দিলাম আর অনুরোধ করলাম যে যখনই সে বেকার ও কপর্দকহীন হয়ে পড়ে তখনই যেন সে আমাকে জানায়।”
“ আল্লাহর জন্য সন্তানদের ভালোবাসো!”
একবার হযরত শেইখ বললেনঃ
“ একরাতে আমি নিজেকে (অন্তরকে) পর্দায়50 ঢাকা দেখলাম এবং কোন ভাবে মাশুকের দিকে পথ পাচ্ছিলাম না। আমি খুঁজে বের করতে চেষ্টা করলাম এ পর্দার উৎস কোথায়। দীর্ঘ সময় অনুনয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আমি বুঝতে পারলাম যে তা ছিলো আগের সন্ধ্যায় আমার এক সন্তানের চেহারার দিকে তাকিয়ে তার প্রতি স্নেহ অনুভব করার ফল। আমাকে (অতিন্দ্রীয় ভাবে) বলা হলো যে , আমি যেন আল্লাহর কারণে আমার সন্তানকে ভালোবাসি! (তাই) আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম ব্যক্তিগত কারণে স্নেহ করার কারণে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য।”
প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে পর্দা
হযরত শেইখের এক ভক্ত তার সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে একবার হযরত শেইখ তার এক বন্ধুর বাড়িতে এক বৈঠকে ছিলেন। কথা শুরু করার আগে তিনি ক্ষুধার কারণে কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করলেন এবং সামান্য রুটি চাইলেন। বাড়ির মালিক তাকে একটি বড় রুটির অর্ধেকটা এনে দিলেন খাওয়ার জন্য। এর পর তিনি আবার অধিবেশন শুরু করলেন। পরের দিন রাতে তিনি বললেন :
“ গত রাতে আমি ইমামদের (আঃ) সালাম পেশ করলাম কিন্তু তাদের দেখলাম না। এর কারণ খুঁজতে আমি অনুনয় করলাম । আমাকে অতিন্দ্রীয়ভাবে বলা হলো : তুমি অর্ধেক খাবার খেয়েছিলে এবং ক্ষুধা মিটে গিয়েছিলো। তাহলে কেন তুমি বাকী অর্ধেকও খেলে ?! শরীরের প্রয়োজনে কিছু খাবার খাওয়া যথেষ্ট কিন্তু তার চেয়ে বেশী পর্দা ও অন্ধকার সৃষ্টি করবে।”
তৃতীয় অধ্যায়
আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা
নফলে নৈকট্যের হাদীস নামে (হাদীস-ই-ক্বুরবী নাওয়াফিল) একটি হাদীস রয়েছে। শিয়া ও সুন্নী উভয়ের বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ এই হাদীসটি সামান্য পার্থক্যসহ বর্ণনা করেছেন যে নবী (সঃ) বলেছেন:51
“ কোন দাস আমার নিকটবর্তী হতে পারে না। আমার পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক কাজগুলোর চেয়েও অধিক পছন্দনীয় কাজগুলো ব্যতীত। নিশ্চয়ই সে নফলের মাধ্যমে এতটা নিকটবর্তী হয় যে , আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি। তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে। তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে। তার জিহবা হয়ে যাই যা দিয়ে সে কথা বলে এবং তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে আঘাত করে। সে যদি আমাকে ডাকে আমি তার ডাকে সাড়া দেই এবং যদি সে আমার কাছে চায় আমি তাকে তা দান করি।” 52
হাদীস-ই-ক্বুরবী নাওয়াফিলে যে নফলের কথা বলা হয়েছে তা বাধ্যতামূলক নামাযের পরে আসে যা ভালো ও সৎকাজকেও অন্তর্ভূক্ত করে। এটি মানুষের পরম পূর্ণতা এবং মানবতার ঐশী গন্তব্যের দিকে মানুষের ভ্রমণকে ত্বরান্নিত করে।
এভাবে , ব্যক্তি আল্লাহর জন্য সৎকাজের মাধ্যমে পরম পূর্ণতা ও দাসত্বের উচ্চতম স্থানের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন। তার চোখ আল্লাহর জন্য ছাড়া দেখবে না , তার কান শুনবে না একমাত্র আল্লাহর জন্য ছাড়া , তার জিহবা কথা বলবে না একমাত্র আল্লাহর জন্য ছাড়া এবং তার অন্তর চাইবে না শুধু আল্লাহর জন্য ছাড়া।
অন্যভাবে বলা যায় , এ হচ্ছে আপনার ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছায় ডুবিয়ে দেয়া। যেভাবে হাদীস-ই-ক্বুরবী নাওয়াফিলে বর্ণিত হয়েছে - আল্লাহ হয়ে যাবেন আপনার চোখ , কান , জিহবা ও অন্তর ; এবং আপনি শেষ পর্যন্ত অর্জন করবেন দাসত্বের ঐশী সত্তা।
হযরত শেইখ এর কথা অনুযায়ী :
“ যদি চোখ আল্লাহর জন্য কাজ করে তা আল্লাহর চোখ হয়ে যায়। যদি কান আল্লাহর জন্য কাজ করে তা হয়ে যায় আল্লাহর কান। যদি হাত আল্লাহর জন্য কাজ করে তা হয়ে যায় আল্লাহর হাত এবং তা মানুষের অন্তর পর্যন্ত যা আল্লাহর স্থান: যেমন বর্ণিত :
“ বিশ্বাসীর অন্তর সর্বদয়ালু আল্লাহর আরশ।” 53
আর ইমাম হোসাইন (আঃ) বলেনঃ
“ ইয়া রব! আপনি আপনার প্রেমিকের অন্তরকে বানিয়েছেন আপনার ইচ্ছা ও দূরদর্শিতার অবস্থান কেন্দ্র।” 54
নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে বোঝা যায় যে হযরত শেইখ শরীরী কামনার আহবানকে প্রত্যাখ্যান করায় তিনি যে দীর্ঘ দূরত্ব একবারে অতিক্রম করেছিলেন এবং যে ঐশী প্রশিক্ষণ তিনি অদৃশ্য জগত থেকে পেয়েছিলেন তা তাকে অনেক উঁচু আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত করেছিলো ।
হয়তোবা এটিই ছিলো সে রহস্য তার এ কবিতায় যা তিনি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন :
“ অমরত্বের বিদ্যালয়ে তোমার সৌন্দর্য আমাকে পথ দেখিয়েছে , তোমার অনুগ্রহ আমাকে তোমার (ঐশী) ফাঁদে আটকে যেতে সাহায্য করেছে।”
“ আমার নোংরা সত্তা যে মিথ্যাকেই চাইতো , তোমার অনুগ্রহের প্রবাহ আমাকে তা থেকে মুক্ত করেছে।”
তাওহীদের ভেতর নিমজ্জিত
হযরত শেইখের ঘনিষ্ট শিষ্যদের একজন55 যিনি তার সাথে ত্রিশ বছর ছিলেন তিনি বলেন :
হযরত শেইখের পরামর্শে আমি আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাথে দেখা করতে গেলাম। মরহুম কুহিস্তানি একবার হযরত শেইখ সম্পর্কে বলেন :‘ মরহুম শেইখ রজব আলীকে যা দেয়া হয়েছিলো তা ছিলো তার দৃঢ় তাওহীদের জন্য ; তিনি তাওহীদে ডুবে ছিলেন।’
ফানাহর (বিলীন হয়ে যাওয়ার) মাক্বাম
ডঃ হামিদ ফারযাম যিনি হযরত শেইখের বৈঠকগুলোতে উপস্থিত থাকতেন তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন :‘ হযরত শেইখ রজব আলী নিকুগুইয়ান (রঃ) ছিলেন একজন দুনিয়া বিমূখ সাধক যিনি আল্লাহর সাথে মিশে যাওয়া অর্জন করেছিলেন। নফসের পবিত্রতা ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতার কারণে যিনি ফানাফিল্লাহ (আল্লাহর মাঝে বিলীন হয়ে যাওয়া) এবং বাক্বাবিল্লাহ (আল্লাহর মাঝে চিরস্থায়ী বসবাস) অর্জন করেছিলেন শরীয়ত অনুযায়ী আমল করে এবং আধ্যাত্মিক মাক্বাম ও অবস্থার হাল শৃংখলা মেনে চলে। তিনি প্রকৃত সত্যের সাথে মিলিত হয়েছিলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিশেষ অনুগ্রহে।
আল্লাহ প্রেমিক
হযরত শেইখ সম্পর্কে আরেকজন বর্ণনা করেন :‘ হযরত শেইখ তাদের একজন যাদের সত্তা আল্লাহর প্রেমে বিমোহিত ছিলো। তিনি বাস্তবেই আল্লাহ ছাড়া কিছু দেখতে সক্ষম ছিলেন না। যা তিনি দেখতেন তা হলো আল্লাহ। তিনি যা বলতেন তা ছিলো আল্লাহ সম্পর্কে। তার প্রথম এবং শেষ কথা ছিলো আল্লাহ , কারণ তিনি আল্লাহর প্রেমে পড়েছিলেন। তিনি প্রেমে পড়েছিলেন আল্লাহর ও আহলে বায়েতের (আঃ)। তিনি যা বলতেন তা ছিলো তাদের সম্পর্কে। পবিত্র হওয়া আর প্রেমিক হওয়া আলাদা কথা। শেইখ রজব আলী ছিলেন এক প্রেমিক। তার শিক্ষাশৈলী ছিলো আল্লাহর প্রেম ও আল্লাহর জন্য কাজ। যারা ঐশী প্রেমে নিমজ্জিত তাদের চোখ তা প্রদর্শন করে। তার চোখ সাধারণ ছিলো না। মনে হতো তিনি আল্লাহ ছাড়া কিছুই দেখতেন না।’
হযরত শেইখ মনে করতেন আল্লাহ ছাড়া কোন কিছুতে আনন্দিত হওয়া ছিলো গুনাহের কাজ। একবার হযরত শেইখ খুব গরম গ্রীষ্মের দিনে হাত পাখা ব্যবহার করলেন (তার চেহারায় বাতাস দিলেন)। যখনই তিনি একটু ঠান্ডা অনুভব করলেন তিনি একবার বললেন :
“ (হে আল্লাহ) , ক্ষমা চাই তোমার কাছে তোমার স্মরণবিহীন প্রত্যেক আনন্দের জন্য। প্রত্যেক আরামের জন্য যা তোমার নৈকট্যবিহীন। প্রত্যেক সুখের জন্য যা তোমার নৈকট্যবিহীন এবং প্রত্যেক পেশার জন্য যা তোমার অনুগত্যবিহীন।” 56
তার আরেকজন শিষ্য হযরত শেইখের আল্লাহ প্রেম সম্পর্কে বলেন :
‘ হযরত শেইখ এতই আল্লাহর প্রেমমুগ্ধ ছিলেন যে তার উপস্থিতিতে মাশুকের কথা ছাড়া কোন কথা উঠার অনুমতি দিতেন না কেবল অতিজরুরী কিছু দৈনিক বিষয়ে ছাড়া। কোন কোন সময় তিনি লাইলী মজনুর কথা বলতেন যেখানে মজনু লাইলীর কথা ছাড়া আর কিছু শুনতে চাইতো না। বলা হয় যে কেউ জিজ্ঞেস করেছিলো , আলী সঠিক না উমর ?’
যার উত্তরে সে বলেছিলো : লাইলী সঠিক!
হযরত শেইখ বলতেনঃ
“ যদি ঘটনাটি সত্য নাও হয় তবুও এর ভিতরে (সুপ্ত) বাস্তবতাকে অন্তরে পৌঁছে দেয়ার জন্য তা উপযুক্ত।”
সর্বোচ্চ মাক্বাম
যুবক দর্জি তার তীব্র খোদা প্রেম ও নিখুঁত আন্তরিকতার জন্য সর্বোচ্চ মাক্বাম ও ঐশী গন্তব্য লাভ করেছিলেন।
আহলুল বায়েত (আঃ) যেভাবে বলেছেন তিনি সেভাবে অর্জন করেছিলেন নৈতিকতা এবং মারেফাতের মাক্বাম , এমন এক পথে যা সাধারণ নয়। ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন :
“ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিরা তারা যারা তাদের চিন্তাকে কাজে লাগায় , যার মাধ্যমে তারা আল্লাহ প্রেম লাভ করে। যখন তারা এ স্থানে পৌঁছায় পবিত্র ইমাম (আঃ) বলেন - তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রেমকে আল্লাহর দিকে স্থাপন করে এবং এর মাধ্যমে তারা তাদের রবকে অন্তরে খুঁজে পায় কিন্তু প্রজ্ঞা অর্জন করে সাধকরা যে রাস্তা পেয়েছে সে রাস্তায় নয় , কিংবা বিজ্ঞ গবেষকরা যে রাস্তা পেয়েছে সে রাস্তায় নয় , এবং সিদ্ক্ব (আন্তরিকতা) অর্জন করে ধার্মিকরা যে রাস্তা পেয়েছে সে রাস্তায়ও নয়। সাধকরা প্রজ্ঞা লাভ করেছে নিরবতার মাধ্যমে। বিজ্ঞ গবেষকরা জ্ঞান লাভ করেছে সন্ধানের মাধ্যমে এবং ধার্মিকরা ধার্মিকতা ও আন্তরিকতা পেয়েছে বিনয় ও দীর্ঘদিন ইবাদতের মাধ্যমে।” 57
সবগুলো জগতে প্রবেশের অনুমতি
হযরত শেইখের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ট এক ভক্ত হযরত শেইখের আধ্যাত্মিক অর্জন সম্পর্কে লিখেছেন :‘ সর্বশক্তিমান আল্লাহ ও আহলুল বায়েত (আঃ) এর জন্য তার গভীর ভালোবাসার কারণে তার ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা ছিলো না। সবগুলো জগতে তার প্রবেশাধিকার ছিলো। তিনি শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত বারযাখে সকল সত্তার সাথে কথা বলতে পারতেন। তিনি নিজ ইচ্ছায় দেখতে পারতেন যে কোন মানুষ তার জীবনে কী করেছে এবং তিনি নিদর্শনগুলো58 বলতেন এবং সেসব প্রকাশ করতেন যা তার ইচ্ছা হতো এবং যার অনুমতি তাকে দেয়া হতো।’
আলামে মালাকুত বা ফেরেশতাদের জগতে যাওয়া
নিশ্চিত জ্ঞানের অতিন্দ্রীয় মাক্বাম-এর পূর্ব শর্ত হলো আকাশ ও পৃথিবীর মালাকুতি জগতে অন্তরের চোখ দিয়ে প্রবেশ করা ।
) وَكَذَٰلِكَ نُرِي إِبْرَاهِيمَ مَلَكُوتَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلِيَكُونَ مِنَ الْمُوقِنِينَ(
“ এভাবে আমরা ইবরাহিমকে দেখালাম আকাশগুলো ও পৃথিবীর মালাকূত যেন সে নিশ্চিতদের অন্তর্ভূক্ত হয়।” (সূরা আল আনয়াম : 75)
নবী (সঃ) বলেছেনঃ
“ যদি শয়তানরা মানুষের অন্তরের উপর আধিপত্য না রাখতো , তবে তারা মালাকূত দেখতে পেতো।” 59
যারাই নফস ও শয়তানের ফাঁদ থেকে নাজাত পেয়েছে তাদের অন্তরের পর্দা ছিঁড়ে তারা আকাশগুলো ও পৃথিবীর মালাকূত দেখতে সক্ষম এবং আল্লাহর সত্তার একত্বের সাক্ষী দিতে সক্ষম :
) شَهِدَ اللَّـهُ أَنَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ(
“ কোন ইলাহ নেই তিনি ছাড়া : এটি সাক্ষ্য আল্লাহর , তার ফেরেশতাদের এবং তাদের যারা জ্ঞান প্রাপ্ত...)” (সূরা আল ইমরানঃ 18)
হযরত শেইখের এক শিষ্য বর্ণনা করেছেনঃ
‘ আমি মরহুম হাজ্ব মুক্বাদ্দাসকে60 জিজ্ঞেস করেছিলাম যে নবী (সঃ) এর নামে এ হাদীসটি সত্য কিনা :
“ যদি শয়তানরা মানুষের অন্তরের উপর আধিপত্য না রাখতো , তবে তারা মালাকূত দেখতে পেতো।”
তিনি বললেন :‘ হ্যা’ , (সঠিক)।
আমি জিজ্ঞেস করলামঃ‘ আপনি কী আকাশগুলো ও পৃথিবীর মালাকূত দেখতে পান ?
তিনি উত্তর দিলেনঃ“ না , কিন্তু শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত দেখতে পান।”
হযরত শেইখ ষাট বছরে
মরহুম শেইখ আব্দুল কারীম হামিদ বলেছেন যে শেইখ রজব আলী ষাট বছর বয়সে এমন মনের অধিকারী হন যে তিনি যখনই কোন জিনিস বুঝতে চাইতেন তিনি বুঝতে পারতেন তার ইচ্ছা অনুযায়ী।61
যে বিরাট পার্থক্য আমাদের জ্ঞান এবং তার জ্ঞানের মাঝে
ডঃ হামিদ ফারযাম বলেছেনঃ‘ আমি হযরত শেইখের সাথে দেখা করতাম সাধারণত: বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার জনসাধারণের জন্য নামায ও দোয়ার বৈঠকগুলোতে । একবার যখন আমি অনুভব করলাম যে আমার কিছু প্রশ্ন আছে যা তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন , তখন মনে হলো আমি তার সাথে সপ্তাহের মাঝখানে সাক্ষাত করবো।
এক সোমবার দুপুরের পর আমি তাকে কিছু প্রশ্ন করতে গেলাম। তা ছিলো একটি সুন্দর দিন। যেহেতু হাজ্ব ডঃ মুহাম্মাদ মুহাক্কিকি , যিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং আয়াতুল্লাহ বুরুজারদির একজন প্রতিনিধিও , এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন এক মেধাবী ব্যক্তিত্ব যার সাথে তখন পর্যন্ত আমার সাক্ষাত হয় নি। যাহোক , আমি অনুমতি চাইলাম , বললাম এবং বেশ উপভোগ করলাম ঐ দুই মর্যাদাবান ব্যক্তির বিজ্ঞ আলোচনা।
সন্ধ্যার প্রথম লগেড়বই বৈঠকের শেষে ডঃ মুহাক্কিকি খোদা হাফেজ বললেন এবং চলে গেলেন এবং আমিও বিদায় জানাতে বাড়ির বাইরে গেলাম। গলির ভেতরে আমি তাকে বললাম যে আমি তার সাথে আরো পরিচিত হতে চাই। তিনি বললেন :‘ আমি মুহাক্কিকি এবং আমি একজন শিক্ষক।’ আমি বললাম , আমি হযরত শেইখের সাক্ষাতে এসেছিলাম তার উপস্থিতি থেকে লাভবান হওয়ার জন্য এবং আমি দেখলাম আপনি অত্যন্ত জ্ঞানী , আলহামদুলিল্লাহ্.....। দেখতে চাইলাম তিনি কি বলেন। তিনি বললেনঃ
“ না জনাব , আমার জ্ঞান হচ্ছে কিতাবী জ্ঞান এবং সব মূখস্থ। আপনার নিজে দেখা উচিত কী উচ্চ মাক্বামইনা শেইখ অর্জন করেছেন। তিনি এমন অনেক জিনিস দেখেন ও জানেন যা আমার জ্ঞানের সাথে তুলনাহীন।”
আমি বললাম :‘ কী ভাবে ?’ তিনি বললেন :“ আমি প্রথম যখন তার সাথে সাক্ষাত করি , শুভেচ্ছার পর তিনি প্রথম যে জিনিস জিজ্ঞেস করলেন তা হলো আমার পেশা সম্পর্কে । আমি বললাম : আমি একজন শিক্ষক। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : শিক্ষকতা ছাড়া ? আমি বললাম : আমি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং শিক্ষা দেই।” তিনি বললেন : না , আমি দেখছি আপনি একটি গোলাকার জিনিসের ব্যাবসা করেন। আমি তা শুনে থ হয়ে গেলাম ও উত্তরে বললাম : জ্বী , আমি ভৌগোলিক গ্লোব বানাই জীবিকার জন্য এবং সে বিষয়ে কেউ জানে না।”
ডঃ মোহাক্কিকির অভিমত সমর্থন করে ডঃ ফারযাম হযরত শেইখ সম্বন্ধে তার স্মৃতিচারণ করে বলেন : অনেক জিনিস বলার আছে , যদি তা গুণি তা হবে অনেকগুলো খণ্ড। হযরত শেইখ তার পবিত্র সত্তা ও অভ্যন্তরীণ আন্তরিকতার কারণে তিনি বিভিন্ন জিনিস দেখতেন এবং সরলভাবে তা উল্লেখ করতেন কোন কিছুর প্রয়োজন অনুভব না করেই। যেভাবে সূফীরা বলে ---“ প্রকাশের সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া।” এভাবে তিনি তার শিষ্যদের উপস্থিতিতে প্রায়ই পরিস্কার ভাবে বলতেন :“ বন্ধুরা! আল্লাহ আমাকে নেয়ামত দিয়েছেন লোকজনের বারযাখীয় দেহ প্রত্যক্ষ করার।” এ ধরনের আরো কিছু স্মৃতি আমার আছে যা বলার মতো :
(ক) কঠোর পরিশ্রমী মজুরকে সাহায্য করা
আযারবাইযান থেকে আগত এক পরিশ্রমী এবং সৎ কর্মজীবী যার নাম ছিলো আলী ক্বুদাতী। সে প্রতিবেশীদের জন্য কাজ করতো এবং কোন কোন সময় আমাদের বাড়িতেও কাজ করতো এবং এর জন্য মজুরী পেতো। গ্রীষ্মে ও শীতে উভয় সময়ই সে একটি লম্বা মিলিটারী কোট পড়তো , তাকে কখনো না দেখেই শেইখ আমাকে হঠাৎ করে বললেন :
“ ঐ লম্বা লোকটি যে মিলিটারী কোট পড়ে এবং সাহায্য করার জন্য তোমার বাড়িতে মাঝে মাঝে আসে সে দরিদ্র ও তার পরিবার বড় ; তাকে তোমার আরো সাহায্য করা উচিত।”
(খ)“ তুমি মেজাজ হারাও খুব দ্রুত!”
একদিন আমি মুখ ভার করে বাসা থেকে বের হলাম। সন্ধ্যায় আমি হযরত শেইখের বাড়ি গেলাম রাতের নামাজের জন্য। সব বন্ধুরা একত্র হয়ে আজানের অপেক্ষা করছে এবং হযরত শেইখ এক কোণে বসে আছেন। যখনই তিনি আমাকে দেখলেন , আমার দিকে মুখ করে বললেন :“ তুমি খুব দ্রুত মেজাজ হারাও!” এরপর অসন্তুষ্টি ও বিস্ময়ে তিনি মাথা দোলালেন এবং হাফিজের এ কবিতা আবৃত্তি করলেনঃ
“ তাঁর দুঃখের তরবারীর নীচে তোমার উচিত নাচতে নাচতে যাওয়া (হাসি মুখে) ! কারণ যে তাঁর দ্বারা নিহত হবে তাকে দেয়া হবে সুন্দর শেষ”
আর আমি সাথে সাথেই নিজের ত্রুটি ধরতে পারলাম।
(গ)“ আমি দেখছি তার মাথার ও চেহারার চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে!”
প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমার হৃদপিন্ডে কিছু সমস্যা হলো এবং আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। আমি ডঃ গুইয়াকে বললাম যে আমার হৃদপিন্ড খুব ভালো অবস্থায় নেই হয়তো ----।
মনে হয় তিনি হযরত শেইখকে আমার হৃদপিন্ডের অবস্থা সম্পর্কে বলেছিলেন এবং তিনি মন্তব্য করেছিলেন :
“ তার দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই , আমি দেখছি তার মাথার ও চেহারার চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে।”
এবং তিনি আরো বলেছেনঃ
“ সে সত্তর বছরের বেশী বাঁচবে।”
এখন শোকর আল্লাহর আমার বয়স সত্তরের উপরে। এ ধরণের ঘটনা অনেক রয়েছে যা এখানে বলা সম্ভব নয়। আমি আরো কিছু ঘটনা এখানে বর্ণনা করবো যা অতিন্দ্রীয় দৃষ্টির চাইতেও বেশী কিছু।
ঘ) ডঃ ফারযাম এর মরহুম পিতামাতার সাথে যোগাযোগ
1958 সনের দিকে হযরত শেইখের শেষ বয়সের দিকের ঘটনা। আমাকে পাকিস্তানের লাহোরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়তে ফারসী ভাষা ও সাহিত্য শেখাবার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো । এক অপরাহেৃ আমি তার সাথে পরামর্শের জন্য গেলাম। আমি বললাম :‘ হযরত , আপনার সাথে পরামর্শের জন্য এসেছি পাকিস্তানে যাবো কিনা সেই অনুরোধ করতে , যদি সম্ভব হয় এ বিষয়ে আমার মা-বাবার সাথে পরামর্শের জন্যেও।’
হযরত শেইখ বললেনঃ
“ তিনটি সালাওয়াত পাঠাও”
এর পর তিনি তাদের সাথে কথা বলা শুরু করলেন এবং শেষে কেঁদে ফেললেন। আমি দুঃখিত হয়ে বললাম : আমি যদি জানতাম আপনি বিপর্যস্ত হবেন ও কাঁদবেন তাহলে আমার মা-বাবার সাথে যোগাযোগ করতে আমি আপনাকে বলতাম না ।
তিনি বললেন :
“ না জনাব! আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম ইমাম মাহদী (আঃ) এর পূনরাগমন সম্পর্কে এবং আমার কান্না ছিলো সে সম্পর্কিত।”
তখন তিনি আমাকে আমার বাবার চেহারার কিছু প্রমাণ দিয়ে বললেনঃ
“ তোমার মা একটি চাদর পড়েছিলেন এবং কথা বলছিলেন কেরমানের উচ্চারণে যার কিছু অংশ আমি বুঝি নি।”
আমি নিশ্চিত করলাম : তা সঠিক হযরত! তারা যদি কেরমানি উচ্চারণে বলে তাদের কিছু শব্দ আপনি বুঝতে পারবেন না।”
হযরত শেইখ বললেনঃ
“ তারা যা বললেন , তাদের শেষ কথা হলো - তোমার পাকিস্তান যাওয়া ঠিক হবে না এবং কেনইবা তুমি যাবে ?!”
অবশ্য শেষ পর্যন্ত আমি যাই নি ; তাদের কথা ও হযরত শেইখের কথা শেষ পর্যন্ত সত্য হলো।
কীভাবে ডঃ শেইখ ও হযরত শেইখ রজব আলীর মধ্যে সম্পর্ক হলো
হযরত শেইখের সন্তান , ডঃ আবুল হাসান শেইখ62 ও হযরত শেইখ রজব আলীর সাথে প্রথম সাক্ষাত সম্পর্কে বলেনঃ
“ হযরত শেইখ রজব আলীর সাথে আমার পরিচিত হওয়ার ঘটনাটি ঘটেছিলো আমার স্ত্রী দু’ মাসের জন্য হারিয়ে যাবার কারণে। আমরা যতই তাকে খুঁজছিলাম ততই তার চিহ্ন হারিয়ে যাচ্ছিলো। আমরা কিছু আধ্যাত্মিক ব্যক্তির সাথেও সাক্ষাত করলাম। কিন্তু কোন লাভ হলো না। আমাদের চরম হতাশার মধ্যে কেউ একজন হযরত শেইখের বাড়ির ঠিকানা দিলো এবং সেটিই তার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাত। তিনি যখন আমাকে দেখলেন তিনি কয়েক মুহূর্ত গভীর ভাবে ভাবলেন এবং এরপর বললেনঃ
“ আপনার স্ত্রী আমেরিকায় আছে এবং তিনি দু’ সপ্তাহের মধ্যে ফিরবেন। কোন দুশ্চিন্তা করবেন না।”
তিনি সঠিক বলেছিলেন। আমার স্ত্রী ছিলো আমেরিকাতে এবং ফিরলেন সঠিক সময়ে ।
এই ঘটনার পর ইউনিভার্সিটির কাজের পর আমি হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করতাম এবং এরপর বাড়ি যেতাম।
ডঃ শেইখ এ বইটির সংকলনের কাজ চলাকালীন 1996 সনের 2রা আগষ্ট এক সাক্ষাতকারে বলেছেনঃ
“ একবার আমরা তার সাথে‘ পাস ক্বালাতে’ গেলাম। আমরা তার জন্য একটা গাধা ভাড়া করেছিলাম চড়ে যাবার জন্য এবং আমি সামনে গাধার দড়ি নিয়ে এগোচ্ছিলাম। আমি ভাবছিলাম কেন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরিত্ব চাই ? আমি যদি পুরো প্রফেসর হতেই চাই তাহলে যা প্রয়োজন তা হলো তার ছায়ায় হাঁটা এবং তার মতো হয়ে যাওয়া। আমরা যখন তার সাথে কারবালায় গেলাম আমরা তার সাথে এক হামামখানায় গেলাম এবং তার পিঠ ডলে দিলাম একটি তুর্কী দস্তানা দিয়ে। কত সুখকরই না ছিলো তার সাথে থাকা!”
‘ গাড়ি ঠিকই আছে , চালাও’
ডঃ সুবাতি বলেনঃ“ একদিন হযরত শেইখ , মির্জা সাইয়্যেদ আলী ও আগা আকরামি একত্রে এক বাস ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন বিবি শহরবানু পাহাড়ে63 যাওয়ার জন্য। সেখানে অনেক যাত্রী অপেক্ষা করছিলো। প্রথম বাসটি এলো এবং হযরত শেইখ বললেনঃ
“ এতে চড়া আমাদের ভাগ্যে নেই”
বাস ভরে গেলো এবং চলে গেলো। দ্বিতীয় বাসটি এলো এবং হযরত শেইখ আবার একই কথা বললেন। যাত্রীরা দ্রুত এগোলো বাসের দিকে এবং চড়লো কিন্তু হযরত শেইখ এবং তার বন্ধুরা পেছনে পড়ে রইলেন। তৃতীয় বাসটি এলো কিন্তু এবারও যাত্রীরা ভীড়ে হুড়োহুড়ি করলো এবং হযরত শেইখ ও তার সাথীরা উঠতে পারলো না। বাস ড্রাইভার চাইলো বাস চালু করতে , কিন্তু তার কোন চেষ্টাতেই বাস চালু হলো না। শেষে ড্রাইভার যাত্রীদের বললো নেমে যেতে যেহেতু বাস নষ্ট হয়ে গেছে এবং তারা তাই করলো।
হযরত শেইখ তার সাথীদের বললেনঃ
“ এখন বাসে উঠো।” তারা বাসে উঠে পড়লো। ড্রাইভার বললোঃ বাস বন্ধ হয়ে গেছে আর তা চালু হচ্ছে না জনাব!’
হযরত শেইখ বললেনঃ
“ আর কোন সমস্যা নেই , যাত্রা করো!”
ড্রাইভার চালকের আসনে বসলো , অন্য যাত্রীরা উঠে বসলো এবং আমরা যাত্রা করলাম। পথে বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া সংগ্রহ করতে লাগলো এবং আমাদের কাছে পৌঁছলো। কিন্তু সে আমাদের তিন জনের ভাড়া নিতে অস্বীকার করলো , কিন্তু আমরা একমত হলাম না। শেষ পর্যন্ত কন্ডাক্টর হযরত শেইখকে দেখিয়ে বললো :‘ আমি উনার কাছ থেকে কোন ভাড়া নিবো না।’
আপনার অনুরোধ রক্ষা করা হয়েছে
আগা হাজ্ব সাইয়্যেদ ইবরাহিম মূসাভী যানজানি64 বলেছেনঃ“ 1956 সনের ফেব্রুয়ারীতে আমি বাগদাদে গেলাম আমার পরিবার নিয়ে ইরানী পাসপোর্ট অফিসের ডেপুটি হিসাবে। ইরাকে অভ্যুথানের ঠিক দু’ দিন আগে আমার পরিবার ও আমি ইরানে ফিরে আসলাম , কিন্তু আমার মা এবং ছেলে কাযেমাইনে রয়ে গেলেন। দু’ দিন পর চারদিকে ইরাকে অভ্যুথানের সংবাদ ছড়িয়ে গেলো এবং সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হলো। আমি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়লাম , কারণ আমার মা এবং ছেলে ইরাকে রয়ে গিয়েছিলো। আমি সর্বশেষ সংবাদ নিতে বার বার ইরাকি দূতাবাসে গেলাম এবং ইরাকে পূনরায় যাওয়ার জন্য ভিসা চাইলাম। আমার মতো অনেকেই এরকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলো এবং তারা দূতাবাসে আসছিলো কিন্তু কোন লাভ হচ্ছিল না।
(ইরাকের ভিতরের) সংবাদ শুনে আমি আরো দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়লাম। ঐ দিনগুলো ছিলো মুহাররম মাসে। তাই আমি হযরত মাসুমা (আঃ) এর মাযারে যিয়ারাত করতে গেলাম। আমি যখন পৌঁছলাম তখন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলাম। আমি সরাসরি জারিহ্-র মাথার দিকে গিয়ে গভীরভাবে কান্নাকাটি করতে লাগলাম ও ইমাম মুসা বিন জাফর (আঃ)-এর বিশেষ সালাওয়াত পড়তে পড়তে কাকুতি মিনতি করতে লাগলাম। ইমাম (আঃ)-এর নিকট ভিসা পাইয়ে দেয়ার অনুরোধ জানালাম।
আমি দু’ দিন পর তেহরানে ফিরে এলাম। আমার এক সহকর্মী মরহুম আহমদ ফায়েদ মাহদাভী তার এক চাচাতো ভাই মরহুম হাজ্ব আগা জিয়াউদ্দিন ফায়েদ মাহদাভীকে হযরত শেইখ এর সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তার সাথে (আগা জিয়াউদ্দিন) আমরা হযরত শেইখের বাড়ি গেলাম। যখন আমরা গেলাম আমাদের পথ দেখিয়ে নেয়া হলো এমন একটি কক্ষে যার অর্ধেকে কার্পেট ছিলো এবং সাধারণ আসবাবে সজ্জিত ছিলো। হযরত শেইখ আমাদের সূরা তাওহীদ সাতবার পড়তে বললেন। তিনি সাত সংখ্যাটিতে খুব বিশ্বাস রাখতেন। এর পর তিনি কথা বলতে শুরু করলেন ; এবং দিক নির্দেশনা ও উপদেশ দেয়ার ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ করে তিনি আমার দিকে ফিরলেন এবং বললেন :
“ আপনার খুব ভালো একটি যিয়ারত ছিলো এবং আপনার অনুরোধ রক্ষা করা হয়েছে ; এর প্রতি ক্রি য়া সুস্পষ্ট। আমার জন্যও দোয়া করুন!”
আমি হযরত শেইখকে জিজ্ঞাস করলাম কোন যিয়ারতের কথা তিনি বলছেন। তিনি বললেনঃ‘ ক্বোমে যিয়ারত’ এবং এরপর তিনি তার উপদেশ দেয়ায় ফিরে গেলেন।
অভিশাপ দেয়া (অন্তরে) অন্ধকার সৃষ্টি করে
এরই মধ্যে তিনি মরহুম আগা জিয়াউদ্দিন মাহদাভীকে বললেন :
‘ এত অভিশাপ দিও না ! অভিশাপ অনেক অন্ধকার সৃষ্টি করে ; এর বদলে দোয়া করো!!’
আগা জিয়াউদ্দিন বললেনঃ‘ মেনে নিলাম!’
এ সতর্কবাণী চলমান আলোচনার সাথে সম্পর্কহীন হওয়ায় আমার কাছে অস্পষ্ট থাকলো। পরদিন আমি আমার সহকর্মী আগা আহমেদ ফায়েদ মাহদাভীর কাছে বিষয়টি তুললাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ‘ আগা জিয়াউদ্দিনের অভিশাপ দেয়ার ঘটনাটি কী ?’
তিনি ব্যাখ্যা করলেনঃ আমার চাচাত ভাই , হাজ্ব আগা জিয়াউদ্দিন এর একটি ছেলে আছে যে ধর্মীয় ব্যাপারে খারাপ চিন্তাভাবনা করে , এবং তিনি প্রত্যেক নামাযের পর তাকে (তার ছেলেকে) অভিশাপ দেন!’
এদিকে আমার অনুরোধ রক্ষা করা হয়েছে এরকমটি হযরত শেইখ উল্লেখ করায় দু’ দিন পর আমি ইরাকী দূতাবাসে গেলাম। এ সম্পর্কিত কর্মকর্তা আমাকে দেখেই বললেনঃ আপনার পাসর্পোটটি আমাকে দিন ভিসার মোহর মারার জন্য। এরপর তিনি আমার পাসপোর্টটিতে পুরাতন রাজকীয় লোগো লাগানো সীল দিয়ে সীল মারলেন। এরপর‘ মালিক’ (রাজকীয়) কথাটি কেটে দিয়ে জমহুরি (প্রজাতন্ত্র) লিখে দিলেন। যারা ভিসার জন্য দরখাস্ত করেছিলো তাদের কাছে এটি খুবই বিস্ময়কর মনে হলো ।
ভিসা পেয়ে আমি বাগদাদে চলে গেলাম। পরে জানা গেলো আমার আগে শুধু একজন আমেরিকান সাংবাদিককে বাগদাদে যাবার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো।
আল্লাহর জন্য লোকের প্রতি বিনয়ের ফলাফল
হযরত শেইখের এক শিষ্য [তার এক বন্ধু থেকে] বর্ণনা করেছেনঃ মরহুম আগা মুরতাদা জাহিদকে কবরের মাঝে শোয়ানো হচ্ছিলো , হযরত শেইখ বললেনঃ
“ নাকিরাইনকে (মুনকার ও নাকির) সর্বশক্তিমান আল্লাহ সাথে সাথে বলেছেনঃ আমার দাসকে আমার কাছে ছেড়ে দাও ; তাকে বিরক্ত করো না---- সে তার সারা জীবন মানুষের সাথে আমার কারণে বিনয়ী ছিলো। সে কোন অহংকার বোধ করে নি।”
গাছের সাথে কথা বলা
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন যে হযরত শেইখ বলেছেনঃ
“ গাছেরাও জীবিত এবং তারা কথা বলে। আমি তাদের সাথে কথা বলি এবং তারা আমাকে তাদের গুণাগুণ সম্পর্কে বলে।”
ইলেকট্রিক ফ্যানের আবিষ্কারকের পুরস্কার
হযরত শেইখের এক শিষ্য বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেনঃ
“ একবার একটি ছোট্ট ইলেকট্রিক ফ্যান উপহার হিসাবে আমার কাছে আনা হলো ; আমি (অতিন্দ্রীয়ভাবে) দেখলাম এর আবিষ্কারকের সামনে একটি ফ্যান রাখা হয়েছে দোযখে (তিনি বুঝিয়েছেন) কবরে।”
এটি নিশ্চিত করা যায় একটি হাদিস দিয়ে যাতে বলা হয়েছে যদিও অবিশ্বাসীরা বেহেস্তে যাবে না , কিন্তু যদি তারা কোন ভালো কাজ করে থাকে তাহলে তার পুরস্কার পাবে। নবী (সঃ) বলেছেনঃ
“ যে ভালো কাজ করে , হোক সে মুসলমান অথবা অবিশ্বাসী , আল্লাহ তাকে পুরস্কার দেবেন। তাকে (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ‘ অবিশ্বাসীকে দেয়ার অর্থ কি ?’ নবী (সাঃ) উত্তর দিলেন :“ যদি তারা আত্মীয়তার সম্পর্ককে শ্রদ্ধা করে অথবা দান করে থাকে অথবা কোন ভালো কাজ করে থাকে আল্লাহ তাদেরকে তাদের ভালো কাজের পুরস্কার হিসাবে দেবেন সম্পদ , সন্তান এবং স্বাস্থ্য।65 তাকে আরো জিজ্ঞেস করা হলো ,“ কীভাবে তাদের পরকালে পুরস্কার দেয়া হবে ?” নবী (সঃ) বললেনঃ“ তারা কম শাস্তি পাবে ।” এর পর তিনি কোরআনের এ আয়াত তেলাওয়াত করলেনঃ
“ ফেরাউনের লোকদের কঠিনতম আগুনে নিক্ষেপ করো!” (সূরা নূর : 46)
দোয়া শর্তযুক্তভাবে কবুল হওয়া
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেছেন : হযরত শেইখের এক শিষ্যের সন্তান হচ্ছিলো না। তার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো। শেষ পর্যন্ত একদিন সে হযরত শেইখকে এর সমাধান জিজ্ঞেস করলো যেখানে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তিনি প্রশ্ন রাখলেনঃ‘ আমি একটি সন্তান চাই যে আমার মৃত্যুর পর আমার উত্তরাধিকারী হবে।’
হযরত শেইখ বললেন :
“ আমি তোমাকে পরে উত্তর দেবো।”
কিছু সময় পার হয়ে গেলো এবং আমাকে জানানো হয় নি কী উত্তর হযরত শেইখ তাকে দিয়েছিলেন। একদিন সে আমাকে এক ভোজের নিমন্ত্রণ জানায়। আমি তাকে ভোজের কারণ জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো তাকে একটি কন্যা সন্তান দেয়া হয়েছে। আমি হযরত শেইখের সাথে সেই বৈঠকের কথা স্মরণ করে তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ“ হযরত শেইখের দোয়া কি কবুল হয়েছিলো ?’ সে বললো : কিছু শর্তে অবশ্যই , আমি জিজ্ঞেস করলাম : সেটি কি রকম ? সে বললো :‘ (হযরত শেইখ) তিনি আমাকে অঙ্গীকার করতে বলেছেন যে আমি একটি বাছুর‘ ইমাম যাদেহ হাসান’ এর গ্রামে যা রেই শহরের কাছে ছিলো- নিয়ে যেতে এবং আমার কন্যার জন্ম দিনে তা (কোরবানী হিসাবে) জবাই করে সেখানকার লোকদের মাঝে বন্টন করে দিতে। আর এখন হচ্ছে সেই মানতের প্রথম বর্ষ।
এটি সাত বছর পর্যন্ত চললো। অষ্টম বছরে পিতা বিদেশে থাকায় তার অঙ্গীকার পূরণ করতে পারেন নি। সে বছরই শিশুটি মারা গেলো।
এ ঘটনার পর সে খুব হতাশ হয়ে গেলো। আমি হযরত শেইখের বাসায় যেতে চাইলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম সেও সেখানে যেতে চায় কিনা। সে একমত হলো এবং আমি একটু আগে চলে গেলাম এবং হযরত শেইখকে বললাম যে অমুক ব্যক্তি তার কন্যা ইন্তেকাল করায় খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হযরত শেইখ বললেন :
“ আমি কী করবো ? অঙ্গীকার রক্ষা করা কি মুসলমান হওয়ার প্রথম শর্ত নয়। সে তার অঙ্গীকার রক্ষা করে নি।”
এরপর আমাদের বন্ধু এলেন এবং হযরত শেইখ একটু কৌতুক করে বললেন :
“ দুঃখ করোনা! আল্লাহ তোমাকে এর পরিবর্তে বেহেশতে বেশ কয়েকটি প্রাসাদ দিয়েছেন ; সাবধান হও যেন সেগুলো ধ্বংস করে না ফেলো।”
যে সম্পদ হারিয়েছে তাকে সাহায্য করা
হযরত শেইখের মৃত্যুর পর এক ব্যক্তি তার ছেলেদের কাছে বলেছেন :“ আমি আমার বাড়িটি বি ক্রি করেছিলাম এবং ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করলাম কিন্তু তা বন্ধ ছিলো। তাই আমি বাসায় নিয়ে গেলাম এবং রাতে তা চুরি হয়ে গেলো। আমি গোয়েন্দা বিভাগের কাছে গেলাম কিন্তু তারা আমাকে সেখানে সাহায্য করতে পারলো না। ইমাম আল আসর (আঃ) এর কাছে অনুরোধ করলাম। আমার অনুরোধের চল্লিশতম রাতে আমাকে হযরত শেইখের বাড়ির ঠিকানা দেয়া হলো। আমি খুব সকালে হযরত শেইখের বাড়ি গেলাম এবং তাকে আমার সমস্যার কথা বললাম। তিনি বললেনঃ
“ আমি কোন ভবিষ্যত বক্তা নই ; তোমাকে ভুল জানানো হয়েছে!”
আমি বললাম : আমি আমার পূর্ব পুরুষ (কোন একজন ইমাম) এর কসম দিচ্ছি যে আমি আপনাকে ছাড়ছি না। হযরত শেইখ কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করলেন এবং আমাকে তার বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন। এরপর বললেনঃ
“ ভারামিন শহরে (তেহরানের কাছে) যাও। অমুক গ্রামে অমুক বাড়িতে-যার দুটো কক্ষ আছে । তোমার টাকা একটি লাল সিল্কের রুমালে বাধা অবস্থায় চুলার পাশেই আছে। অর্থগুলো নেবে এবং বাড়ি ছেড়ে চলে আসবে। তারা তোমাকে চা সাধবে কিন্তু তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসবে।”
আমি সে ঠিকানায় গেলাম- যা আমার বাড়ির চাকরের বাড়ি ছিলো। বাড়ির মালিক ভাবলো আমার সাথে গোয়েন্দা বিভাগের কোন লোক গিয়েছে। আমি কক্ষে ঢুকে পড়লাম এবং টাকা নিলাম সেখান থেকে যার কথা হযরত শেইখ হুবুহু বর্ণনা করেছিলেন। আমি যখন চলে আসছিলাম বাড়ির মালিক আমাকে চা সাধলেন কিন্তু আমি তার ওপর চিৎকার করে বাড়ি ত্যাগ করলাম।
টাকার পরিমান ছিলো মোট একশ তোমান। আমি অর্ধেক টাকা হযরত শেইখের কাছে নিলাম এবং কৃতজ্ঞতার সাথে তার সামনে উপস্থিত করলাম অনেক অনুনয় করলাম তা উপহার হিসেবে গ্রহণ করার জন্য , কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করলেন না। আমার বারংবার অনুরোধে আমাকে অনেক আনন্দ দিয়ে তিনি একমত হলেন বিশ তোমান নিতে , কিন্তু নিজের জন্য নয় , বরং তা আমাকেই ফেরত দিয়ে বললেন :
“ আমি তোমাকে দরিদ্র একটি পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি যার কন্যাদের বিয়ের যৌতুক দরকার। তুমি কারো ওপরে তা ছেড়ে দেবে না , নিজেই করবে। যাও যা তাদের দরকার তা কেনো এবং তাদের বাড়িতে পৌঁছে দাও।”
তিনি নিজের জন্য কিছুই নিলেন না!
লাল আপেলের সুবাস
হযরত শেইখের এক বন্ধু নীচের ঘটনাটি বর্ণনা করেছেনঃ
আমরা হযরত শেইখের সাথে কাশান গেলাম। হযরত শেইখের অভ্যাস ছিলো যেখানেই তিনি ভ্রমণে যাবেন সেখানকার কবরস্থানে তিনি যিয়ারতে যাবেন। আমরা যখন কাশানের কবরস্থানে প্রবেশ করলাম , তিনি বললেনঃ
“ আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ” (সালাম আপনার উপর হে ইমাম হোসাইন)
আমরা কয়েক পা আরো এগিয়ে গেলাম এরপর তিনি বললেনঃ“ তোমরা কি কোন কিছুর গন্ধ পাচ্ছো না ?”
“ না , কিসের গন্ধ ?” আমরা জিজ্ঞেস করলাম।
এরপর তিনি বললেন :
“ লাল আপেলের সুগন্ধ ?”
আমাদের উত্তর ছিলো আবারো‘ না’ । আমরা আবার এগিয়ে গেলাম এবং কবরস্থানের খাদেমের সাক্ষাত পেলাম। হযরত শেইখ তাকে জিজ্ঞেস করলেন :“ কাউকে কি আজ এখানে কবর দেয়া হয়েছে ?”
লোকটি উত্তরে বললো :‘ আপনাদের আসার আগেই একজনকে দাফন করা হয়েছে। এরপর তিনি আমাদের নতুন করে ঢাকা এক কবরের কাছে নিয়ে গেলেন। সেখানেই আমরা সকলে লাল আপেলের সুবাস পেলাম। আমরা হযরত শেইখকে সুবাসের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন:
“ যখন এ লোককে এখানে কবর দেয়া হয়েছিলো , হযরত সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আঃ) এখানে এসেছিলেন এবং এ লোকের উসিলায় এ কবরস্থানে যাদের দাফন করা হয়েছে তাদের সবার শাস্তি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।”
হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার পুরস্কার
আরেকজন শিষ্য বলেছেন :“ আমি সীপাহ স্কয়ার (নতুন নাম) ধরে ট্যাক্সি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এসময় দেখলাম চাদরে ঢাকা লম্বা সুন্দর একজন মহিলা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছে। আমি গাড়ি থামালাম এবং তাকে উঠতে দিলাম। আমার চোখ তার দিক থেকে সরিয়ে রেখে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিলাম।
পরদিন যখন আমি হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করলাম তিনি এমনভাবে বললেন- যেন তিনি দৃশ্যটি দেখেছেন :
“ কে ছিলো সেই লম্বা মহিলা যার দিকে তুমি তাকিয়েছিলে এবং দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিলে ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলে ? সর্বশক্তিমান ও মহিমান্নিত আল্লাহ তোমার জন্য বেহেশতে একটি প্রাসাদ প্রস্তুত রেখেছেন এবং একজন হুরী যে দেখতে ঐ-----”
হারাম সম্পদের ভিতরে আগুন
এ বৈঠকে এক লোক ডাইনী বিদ্যা অনুশীলন করছিলো এবং হযরত শেইখের এক ছেলেও সেখানে উপস্থিত ছিলো। তিনি বলেন :
“ আমি তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলাম। তাই সে যা-ই চেষ্টা করলো তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। শেষে সে বুঝতে পারলো আমি তার ব্যবসাতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিলাম এবং আমাকে অনুরোধ করলো যাতে আমি তার জীবিকার পথ বন্ধ না করে দেই। এরপর সে আমাকে একটি দামী কার্পেট উপহার দিলো। আমি কার্পেটটি বাসায় নিয়ে গেলাম। আমার বাবা তা দেখেই বললেন :
“ কে তোমাকে এই কার্পেটটি দিয়েছে ? [আমি দেখতে পাচ্ছি] আগুন ও ধোঁয়া এ থেকে উঠে আসছে! এখনই এটি এর মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে এসো।”
কীভাবে গ্রামোফোন অকেজো হয়ে গেলো
হযরত শেইখের এক সন্তান বলেন : আমার বাবা ও আমি আমাদের এক আত্মিয়ের বিয়েতে গেলাম। যখন মেযবান হযরত শেইখকে আসতে দেখলো তিনি আশেপাশের যুবকদের বললেন গ্রামোফোন বন্ধ করে দিতে। আমরা যখন প্রবেশ করলাম যুবকরা দেখতে এলো কে আসছে যার জন্য তারা গান শুনতে পারবে না। যখন হযরত শেইখকে দেখানো হলো তারা বললো : আরে! এর জন্য আমরা গ্রামোফোন বন্ধ করে দেবো ?! তারা ফিরে এসে তা আবার চালু করে দিলো।
আমি অর্ধেক মাত্র আইস ক্রী ম খেয়েছি এমন সময় আমার বাবা আমার বাহুতে হাত দিয়ে হালকা আঘাত করলেন বিদায় নেয়ার জন্য। কি ঘটেছে তা না জেনে আমি বললাম :‘ আমি আমার আইস ক্রী ম এখনও শেষ করিনি’ । তিনি বললেন :“ তা হোক , চলো যাই!”
আমি (পরে) জেনেছিলাম আমরা বিদায় নেয়ার সাথে সাথেই গ্রামোফোন অকেজো হয়ে গিয়েছিলো। তাদের আরো একটি আনতে হলো এবং সেটিও পুড়ে গেলো। এ ঘটনা ঐ অনুষ্ঠানের মেযবানকে আমার বাবার ভক্ত বানিয়ে ফেলে।
প্রেমে পড়া যুবকের অনুরোধ
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন : আমি হযরত শেইখের সাথে মাশহাদে গেলাম। ইমাম রেযা (আঃ)-এর পবিত্র মাযারে গিয়ে আমরা দেখলাম এক যুবক সাহন-ই-ইনক্বিলাব এর ইস্পাতের জানালা ধরে খুব কান্নাকাটি করছে এবং ইমাম (আঃ) এর কসম দিচ্ছে তার মায়ের কাছে। হযরত শেইখ আমাকে বললেনঃ
“ তার কাছে গিয়ে বলো তার কথা তারা শুনেছে এবং তাকে যেতে বলো।”
আমি এগিয়ে গেলাম এবং যুবকটিকে তা বললাম। সে ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো। আমি বিষয়টি জানতে চাইলে হযরত শেইখ বলেনঃ
‘ এ যুবকটি এক মেয়ের প্রেমে পড়েছে এবং তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু (মেয়ের মা-বাবা) একমত হচ্ছে না। সে এখানে এসেছে ইমাম রেযা (আঃ) এর কাছে অনুরোধ করতে তাকে সাহায্য করার জন্য। ইমাম (আঃ) বলেছেন :“ তা গৃহীত হয়েছে। সে যেতে পারে।”
“ ক্রো ধান্বিত হয়ো না!”
হযরত শেইখের এক ছাত্র বলেছেন : একদিন আমি বাজারে এক ব্যক্তির সাথে ধর্মীয় আলোচনা করছিলাম । সে আমার উপস্থিতিতে কোন প্রমাণই গ্রহণ করবে না। আমি একটু রাগ হয়ে গেলাম। এক ঘন্টা পর , আমি হযরত শেইখের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি আমাকে দেখার সাথে সাথেই বলে উঠলেন :
“ তুমি কি কারো সাথে ঝগড়া করেছো ?”
আমি যা ঘটেছে তা তাকে বললাম। তিনি বললেন :
“ এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাগ করবে না , পবিত্র আহলুল বায়েত (আঃ) দের পথ অনুসরণ করো। যদি দেখো তারা গ্রহণ করছে না , তাহলে তর্ক বন্ধ করে দাও।”
“ তার দাড়ি তোমার চিন্তার বিষয় নয়”
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেছেন যে : এক সন্ধ্যা রাতে আমি দেরীতে বৈঠকে এলাম যখন হযরত শেইখ ইতোমধ্যেই মোনাজাত করছিলেন।
আমি যখন শ্রোতাদের দিকে তাকালাম আমি একজনকে দাড়ি মুণ্ডনকৃত অবস্থায় দেখলাম। আমি হৃদয়ে খুব দুঃখ পেলাম এবং ঐ লোকটির জন্যও দুঃখ হলো। হযরত শেইখ তখন আমার পিছনে কেবলা মুখি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার দোয়া হঠাৎ করে বন্ধ করে দিয়ে বললেন :
“ তার দাড়ি তোমার কোন চিন্তার বিষয় নয়। দেখো তার কাজ কি রকম ; তার ভেতরে কিছু ভালো থাকতে পারে যা তোমার মাঝে নেই।”
শয়তানের উস্কানীতে সাড়া দেয়া
হযরত শেইখের সন্তান বলেছেন :“ একবার আমি আমার বাবার সাথে কোথাও যাচ্ছিলাম , আমি দেখলাম দুই মহিলা সেজে গুজে পর্দা ছাড়া আমার বাবার দু’ দিকে হাঁটছে। তাদের প্রত্যেকেই একটি লাটিম ঘোরাচ্ছিলো। তারা আমার বাবাকে বললো : এই যে দেখোতো! আমাদের কোনটি বেশী সুন্দর করে ঘুরছে ?”
আমি খুব ছোট ছিলাম। দেখলাম আমার বাবা তাদের উপেক্ষা করছেন এবং মাথা নিচু করে মুচ্কি হাসছেন। তারা আমাদের সাথে কয়েক পা এলো এরপর উধাও হয়ে গেলো! আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম তারা কারা ? তিনি বললেন :
“ তারা দু’ টোই ছিলো শয়তান।”
তৃতীয় ভাগ
আত্ম গঠন
প্রথম অধ্যায়
আত্মগঠনের পথ
হযরত শেইখ তার আকর্ষণীয় ক্ষমতা দিয়ে মেধাবী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দিতে ও আত্মগঠনে প্রভাবিত করতে খুব ভালোভাবেই সক্ষম ছিলেন। হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :
“ একবার আমি হযরত শেইখ ও মরহুম আয়াতুল্লাহ শাহ আবাদির66 সাথে তাজরীশ স্কোয়ারে ছিলাম। হযরত শেইখ আয়াতুল্লাহ শাহ আবাদীকে খুবই পছন্দ করতেন , কেউ একজন এসে আয়াতুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো :“ আপনি সত্য বলেন না এই লোক (হযরত শেইখকে দেখিয়ে) ?
মরহুম শাহ আবাদী বললেন :“ কোন সত্যের বিষয়ে আপনি কথা বলছেন ? আপনি কী বুঝাতে চাইছেন ?”
লোকটি আবার বললো :“ আপনাদের মধ্যে কে সঠিকটি বলে ?”
আয়াতুল্লাহ শাহ আবাদী বললেন : আমি শেখাই এবং তারা (ছাত্ররা ) শেখে ; তিনি (হযরত শেইখ) তৈরী করেন এবং মানুষ গড়েন।”
এটি ইঙ্গিত করে এ ঐশী ব্যক্তিত্ব ও সাধক কত বেশী বিনয়ী ও আত্ম -প্রত্যাখ্যানকারী ছিলেন এবং হযরত শেইখের বক্তব্য ও প্রশিক্ষণ দানের ক্ষমতা কত ফলপ্রসূ ছিলো।
ষাট বছর আমি ভুল পথে হাঁটছিলাম
ডঃ হামিদ ফারযাম হযরত শেইখের আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও কথার প্রভাব এভাবে বর্ণনা করেন :
“ প্রফেসর জালালুদ্দীন হুমাই তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নেতৃস্থানীয় সাহিত্যের প্রফেসর ছিলেন । তিনি মা’ আরিফ (আধ্যাত্বিক জ্ঞানে) , ফার্সী সাহিত্য এবং ইসলামী সূফীতত্ত্বের একজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং আমার নিজেরও প্রফেসর ছিলেন। তিনি ষাট বছর বয়সে হযরত শেইখের সাক্ষাত লাভ করেন। আমি সতেরো বছর বয়সে প্রফেসর হুমাইর অধীনে পড়েছি। তিনি ইতোমধ্যেই আবু রিহান বিরুনীর‘ আল-তাফহীমু লি আওয়াইল সানাআত আল-তানজীম এবং ইযযুদীন মাহমুদ কাশানীর মিসবাহ আল হিদায়া ওয়া মিফতাহুল কিফায়া’ সম্পাদনা করেছিলেন। তিনি খুবই বিজ্ঞতার সাথে‘ গাযালী নামাহ’ লিখেছেন , যা হলো ইমাম গাযালীর জীবন ও কর্মের সংগ্রহ। তার‘ মিসবাহ আল হিদায়া’ র ব্যাপক ভূমিকাটি নিজেই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক সূফীতত্ত্বের একটি নিঁখুত কোর্স।
যাহোক এই সূফীসাধক আমার শিক্ষক ছিলেন ষাটোর্ধ বয়সে। প্রতিদিনকার মত একদিন আমি হযরত শেইখের সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন :
“ তোমার প্রফেসর জালালুদ্দীন হুমাই আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাকে কিছু বাক্য বললাম , তা এত গভীরভাবে তাকে স্পর্শ করলো যে সে নিজের কপালে আঘাত করলো এবং বললো : অদ্ভুত!! আমি ষাট বছর ধরে ভুল পথ ধরে হাঁটছিলাম”
আসলে তা ছিলো হযরত শেইখের কথা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব যা প্রফেসর হুমাইর মত বিজ্ঞ ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোককে এত গভীর ভাবে স্পর্শ করেছিলো। আল্লাহ তাদের রুহের ওপর রহমত করুন। দোয়া ও নামাযের কিছু কিছু বৈঠকে যখন হযরত শেইখ নিবিষ্ট হতেন তখন বলতেন :
“ বন্ধুরা! যেসব কথা আমি আপনাদেরকে বলছি তা হচ্ছে আধ্যাত্মিকতার সর্বশেষ ক্লাসের কথা।”
এবং সত্যিই তাই ছিলো।
হযরত শেইখের আরেক শিষ্য বলেন :‘ হযরত শেইখের শিক্ষা তামাকে সোনায় পরিণত করে।’
হযরত শেইখের মানুষ তৈরীর ক্ষমতার গোপন রহস্য হচ্ছে শ্রোতাদের ওপর তার প্রভাব এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ধরন ও পদ্ধতি যা তিনি তার শিষ্যদের ওপর প্রয়োগ করতেন।
নিজের আচরণ দিয়ে নিজেকে তৈরী করা
ইসলামী ঐতিহ্যের দৃষ্টিতে নৈতিকতার শিক্ষকদের জন্য প্রধান শর্ত হচ্ছে তারা নিজেরা ঐভাবে চলতে বাধ্য যা তারা শেখান। এ বিষয়ে আমিরুল মুমিনীন ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন :
“ যে জনগণকে পথ দেখাবার উদ্যোগ নেবে , অন্যকে শেখাবার আগে তার উচিৎ নিজেকে শেখানো (যথেষ্টভাবে) এবং অন্যকে ভালো আচরণ শেখানোর জন্য কথা বলার আগে তার নিজের চরিত্র দিয়ে তা শেখাবে।” 67
সবচেয়ে অসাধারণ যে বৈশিষ্ট্য হযরত শেইখের আলোচনায় ছিলো তা হলো হযরত আমিরুল মুমিনীন (আঃ) এর উপরোল্লেখিত শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করা এবং অন্যকে তার ভালো আচরণ দিয়ে আল্লাহর দিকে ডাকা।
যদি হযরত শেইখ মানুষকে তাওহীদের দিকে ডাকতেন , তাহলে তিনি ইতোমধ্যেই (أرباب متفرّقون )‘ বহু ইলাহ যারা নিজেদের মধ্যে
বিভেদ করে’ (ইউসুফঃ 39) এবং তারও ওপরে তার নফসের মূর্তিকে ধ্বংস করেছেন। তিনি যদি মানুষকে সব কাজে আন্তরিকতার দিকে ডাকতেন , তাহলে তার নিজের কাজ ও ভঙ্গি ছিলো সবটুকুই আল্লাহর প্রতি আন্তরিকতাপূর্ণ। যদি তিনি কখনো উদাসীনতা অনুভব করতেন , তাহলে আল্লাহর অনুগ্রহ তার সাহায্যে এগিয়ে আসতো এমনভাবে যে তিনি একবার বলেছেন :
“ যতবার আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য আমি সূইকে কাপড়ের ভেতর প্রবেশ করাতাম ততবারই তা আমার আঙ্গুলে ঢুকে যেতো।”
আর তিনি যদি অন্যকে আল্লাহর প্রেমের দিকে ডাকতেন তাহলে তিনি নিজেই আল্লাহ প্রেমের আগুনে পুড়ছিলেন। যদি তিনি অন্যকে ডাকতেন জ্ঞান ও আত্মত্যাগের প্রতি এবং তাদের সেবার প্রতি , তাহলে তিনি নিজেই ছিলেন এ পথের অগ্রপথিক। যখন তিনি‘ পৃথিবীকে’ বলতেন‘ ডাইনী বুড়ি’ এবং অন্যদেরকে একে পছন্দ করার বিরুদ্ধে সতর্ক করতেন , তখন তার নিজের সাধক জীবন ছিলো এক পরিষ্কার প্রমাণ যে এ‘ ডাইনী বুড়ি-র প্রতি তিনি ছিলেন পুরোপুরি অনাগ্রহী। আর সবশেষে তিনি যদি অন্যদেরকে বলতেন নফসের খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে আল্লাহর জন্য সংগ্রাম করতে , তাহলে তিনি নিজে ছিলেন এর অগ্রভাগে এবং ইউসুফ (আঃ) এর মতো কঠিন পরীক্ষায় বিজয়ী।
শিক্ষা পদ্ধতি
যে পদ্ধতিতে হযরত শেইখ তার শিষ্যদের আত্ম -গঠনের শিক্ষা দিতেন তা দু’ ভাগে ভাগ করা যায়:
1. উম্মুক্ত বৈঠক
2. ব্যক্তিগত সাক্ষাত
1. উম্মুক্ত বৈঠক
হযরত শেইখের উম্মুক্ত বৈঠকগুলো সপ্তাহে একদিন তার বাড়িতেই অনুষ্ঠিত হতো। একইভাবে বেশীরভাগ ইসলামী উৎসবের দিন , নিষ্পাপ ইমাম (আঃ)-র জন্ম দিন ও শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে তার বাড়িতেই বৈঠক করতেন। মুহাররম , সফর68 ও পবিত্র রমযানের সময় তিনি ওয়াজ নসীহতের অধিবেশনও রাখতেন। এগুলো মাঝে মাঝে তার বন্ধুদের বাড়িতে প্রায় দু’ বছরের মত চলেছে।
সাপ্তাহিক অধিবেশন বা বৈঠকগুলো হতো বৃহস্পতিবার মাগরিব ও ইশার নামাযের পর। নামাযের ইমামতি করতেন হযরত শেইখ। নামাযের পর তিনি মরহুম ফায়েদের69 কিছু ছোট কবিতা আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর কন্ঠে আবৃত্তি করতেন যাতে ছিলো ইস্তেগফার (আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া) :
“ আমি ক্ষমা চাই আল্লাহর কাছে যা (আমি করেছি) মাশুক (আল্লাহ) ছাড়া অন্যের জন্য ,
আমি ক্ষমা চাই আমার কাল্পনিক অস্তিত্বের জন্য ,
যেদিন কোন মুহূর্ত পার হয়ে যায় তার সুন্দর চেহারা স্মরণ না করে ,
আমি ক্ষমা চাই আল্লাহর কাছে অসংখ্যবার সে মুহূর্তটির জন্য।
যে জিহ্বা বন্ধুকে স্মরণ করায় নিয়োজিত নয় ,
তার খারাপ থেকে সতর্ক হও এবং চাও আল্লাহর কাছে ক্ষমা ,
এর অবহেলার কারণে জীবন এসেছে তার শেষ প্রান্তে ,
আমি একটি ঘন্টার জন্যেও সচেতন ছিলাম না ,
আমি ক্ষমা চাই আল্লাহর কাছে (সে অবহেলার জন্য)।”
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন : তিনি এমনভাবে এ কবিতাগুলো গাইতেন যে আমরা না কেঁদে পারতাম না। অবশেষে অসাধারণ আকর্ষণীয় আধ্যাত্মিক অবস্থায় তিনি ইমাম যায়নুল আবেদীন (আঃ) এর পনেরোটি মোনাজাতের কোন একটি পড়তেন।
অন্য এক শিষ্য বলেন :‘ তার দোয়ার অনুষ্ঠানে আমি কাউকে তার চেয়ে বেশী কাঁদতে দেখি নি ; তার কান্না ছিলো সত্যিই হৃদয় বিদারক।’
দোয়ার শেষে , চা পরিবেশনের পর হযরত শেইখ কথা বলতে ও নসিহত করা শুরু করতেন। তিনি ছিলেন খুবই ভালো বক্তা ; তিনি তার বক্তব্যে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতেন যা তিনি কোরআন ও হাদীস থেকে পেয়েছেন এবং তাও যা তিনি তার নিশ্চিত জ্ঞানের মাধ্যমে জেনেছেন।
বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের সম্বোধন করার জন্য যে শব্দটি তিনি বেশীরভাগ সময়ই ব্যাবহার করতেন তা হলো‘ রুফাক্বা’ (বন্ধুরা) ; এবং তার বক্তব্যের প্রধান বিষয়গুলো ছিলো : তাওহীদ , আন্তরিকতা , অন্তরে আল্লাহ প্রেমের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি , আল্লাহর নৈকট্য , মানুষের সেবা , আহলুল বায়েত (আঃ) এর কাছে অনুরোধ (তাওয়াসসূল) , ফারাজের অপেক্ষা ; আর সতর্ক করতেন দুনিয়া প্রেম থেকে , আত্ম -প্রাধান্য ও নফসের খেয়াল খুশী থেকে। পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে উপরোক্ত বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ড: সুুবাতি হযরত শেইখের সাথে তার পরিচয়ের শুরু সম্পর্কে এবং তার বৈঠকগুলো কেমন ছিলো সে সম্পর্কে বলেন :‘ হাই স্কুলের শেষ দিকে আমাকে হযরত শেইখের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন ড: আব্দুল আলী গুইয়া , যিনি - নিউক্লিয়ার ফিজিক্স -এ ফ্র্যান্স থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন এবং হযরত শেইখের বৈঠকে দশ বছর যোগদান করেছিলেন। তার বৈঠক ছিলো সংক্ষিপ্ত , ব্যক্তিগত এবং খুব কম লোকই উপস্থিত থাকতেন। যখনই বৈঠকে খুব বেশী লোক হয়ে যেত এবং অচেনা লোকেরাও উপস্থিত হয়ে যেত তিনি অস্থায়ী ভাবে বৈঠক স্থগিত ঘোষণা করতেন। এর অর্থ তিনি অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে উৎসাহী ছিলেন না।
শুধু কিছু কথা , কিছু উপদেশ এবং প্রচার যা দোয়াতে গিয়ে শেষ হতো এছাড়া বৈঠকে আর কিছু উপস্থাপন করা হতো না। যদিও কথাগুলো ছিলো পুনরাবৃত্তিমূলক কিন্তু বৈঠক ছিলো আধ্যাত্মিকভাবে এতই আকর্ষণীয় যে যা কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কথা আমরা শুনতাম তা আমাদের মোটেও ক্লান্ত ও বিরক্ত করতো না।70 যেমন কোরআনের আয়াত আপনি যতই তেলাওয়াত করেন তা সবসময় সতেজ ও সুখকর। তার কথাও ছিলো সবসময় সতেজ ও সুখকর।
বৈঠকগুলো ছিলো এতই আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ যে , কেউই ব্যক্তিগত ও দুনিয়াবি বিষয় তুলতো না এবং কেউ যদি হঠাৎ বস্তুগত বিষয়ে কথা বলেই ফেলতো তার আশে পাশের লোকেরা তাকে উপেক্ষা করতো অবজ্ঞা অথবা এমনকি ঘৃণাভরে। হযরত শেইখের কথা প্রধানত ছিলো :‘ আল্লাহর নৈকট্য’ ‘ আল্লাহর প্রেম’ ও এবং‘ আল্লাহর দিকে সফর।’ তিনি‘ আল্লাহর নৈকট্য’ এভাবে সংক্ষেপে বর্ণনা করতেন :
“ তোমার উচিত তোমার উসসা (উস্তাদ) পরিবর্তন করা , অর্থাৎ তুমি এ পর্যন্ত যা করেছো তা কেবল তোমার নিজের জন্য। এখন থেকে , যাই তুমি করো , আল্লাহর জন্য করো এবং (জেনে রেখো) এটি হচ্ছে আল্লাহর দিকে সবচেয়ে কাছের রাস্তা। নিজের সত্তাকে পায়ের নিচে ফেলো , মাশুককে জড়িয়ে ধরো।” 71
সব মানবিক স্বার্থপরতা আত্ম -প্রেমের কারণে ঘটে , তুমি কিছুই হতে পারবে না যতক্ষণ না তুমি আল্লাহ প্রেমিকে পরিণত হবেঃ
‘ যদি তুমি নিজেকে পরিত্যাগ করো , তুমি মাশুকের সাথে মিলিত হবে ; না হয় চিরদিনের জন্য জ্বলতে থাকো , কেননা তোমার অবস্থা অপরিপক্ক।’
“ তোমার উচিত তাঁর প্রেমে কাজ করা । তা হলো , তাকে ভালোবাসো এবং কাজ করো তাঁর ভালোবাসার কারণে। তাকে ভালোবাসা ও তার জন্যে কাজ করা হলো আধ্যাত্মিক অগ্রগতির রহস্য যা মানবজাতি করতে পারে এবং তা সম্ভব। তাই , সব মানবিক অগ্রগতি অর্জন সম্ভব প্রবৃত্তির ইচ্ছার বিরোধিতা করে ; তুমি তা অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না তুমি তোমার নফসের (প্রবৃত্তির লালসা) সাথে কুস্তি লড়ো এবং কুপোকাত না করো।”
তিনি আমিত্বের বিষয়ে বলেনঃ
“ এখানে ক্লান্ত শরীর ও ভগ্ন হৃদয় কেনাও উত্তম , আমিত্ব বি ক্রি র বাজার এ বাজার থেকে অনেক দূরে।”
এবং তিনি আরও বলেন :
“ তোমার মূল্য তত বেশী যতটা তুমি দাবী করবে ; তুমি যদি আল্লাহকে দাবী করো তাহলে তোমার মূল্য অসীম। আর যদি তুমি পৃথিবী (পৃথিবীর সম্পদ) দাবী করো তোমার মূল্য তত নিচু যা তুমি আশা করেছো। কখনো বলো না আমি এটি চাই , ওটি চাই (বরং) দেখো আল্লাহ কী চান। যদি তুমি কোন ভোজ দাও , দেখো তুমি কাকে দাওয়াত করছো যাকে তোমার ইচ্ছা নাকি আল্লাহ যাকে চান তুমি দাওয়াত করো তাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার প্রবৃত্তির ইচ্ছার পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তুমি কোথাও পৌঁছাতে পারবে না। অন্তর হচ্ছে আল্লাহর বাসস্থান। এখানে কাওকে প্রবেশ করতে দিও না। শুধু আল্লাহ বাস করবেন এবং আল্লাহ কর্তৃত্ব করবেন তোমার অন্তরে। ইমাম আলী (আঃ)- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তিনি কীভাবে এতো উচ্চ মাক্বাম অর্জন করেছিলেন। তিনি উত্তরে বললেন :
‘ আমি অন্তরের প্রবেশ দ্বারে বসেছিলাম এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ঢুকতে দিই নি।’
তার সংক্ষিপ্ত কথার পর হালকা নাস্তা পরিবেশন করা হতো এবং এর পর মুনাজাত শুরু হতো। তার মুনাজাত ছিলো খুবই মনোজ্ঞ এবং আধ্যাত্মিক অবস্থা ছিলো মনমুগ্ধকর। তিনি দোয়া সাধারণভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে আবৃত্তি করতেন না , বরং তা ছিলো যেন নিচু স্বরে প্রিয়তমার কাছে প্রেমের গান । তিনি এমনভাবে ডুবে যেতেন মাশুকের ভেতর মুনাজাতের সময় যেন তা ছিলো কোন মা তার হারানো সন্তান খুঁজছে ; আন্তরিকভাবে কান্না- কাটি করতেন ও বিলাপ করতেন এবং কথা বলতেন বন্ধুর সাথে তাঁর পবিত্র উপস্থিতিতে।
কোন কোন সময় মনে হতো তিনি মুনাজাতের সময় ঐশী প্রেরণা লাভ করতেন যার চিহ্ন ও প্রভাব তার কথায় ও আচরণে প্রকাশ পেতো। তিনি অনেক দুঃখ করতেন যে তার বন্ধুরা ততটুকু অগ্রসর হতে পারে নি যতটুকু তিনি তাদের নিয়ে আশা করেছিলেন। তিনি চাইতেন যেন তার বন্ধুদের শীঘ্র চোখ খুলে যায় এবং ফেরেশতা ও পবিত্র ইমামদের (আঃ) দেখতে পায়।
যখন কেউ যিয়ারত থেকে [পবিত্র ইমামদের (আঃ) মাযার থেকে] ফিরে আসতেন তিনি তাদের জিজ্ঞেস করতেন :“ তুমি কি সেই বরকতময় সত্তাকে দেখেছো ?”
অবশ্যই কেউ কেউ এ বিষয়ে সফল হয়েছিলেন , ভালো আধ্যাত্মিক অবস্থান অর্জন করেছিলেন এবং এমনকি কিছু ঐশী প্রেরণাও লাভ করেছিলেন। অন্যরা অবশ্য পেছনে পড়েছিলেন।
যা হোক তার মুনাজাত ছিলো মনমুগ্ধকর ও উজ্জীবীতকারী। তিনি মুনাজাতের অর্থগুলো জানতেন এবং তার কিছু শব্দগুচ্ছের ওপর জোর দিতেন পুনরাবৃত্তি করে এবং কোন কোন সময় ব্যাখ্যা করে। তিনি‘ দোয়ায়ে ইয়াসতাশির’ ও‘ মুনাজাতে খামসা আশার’ প্রায়ই পড়তেন। তিনি বিশ্বাস করতেন দোয়ায়ে ইয়াসতাশির72 হলো আল্লাহর প্রতি প্রেমের প্রকাশ।
মোহাররম মাসে তিনি খুব কম কথা বলতেন ; তিনি এর পরিবর্তে আহলুল বায়েতের দুঃখ কষ্ট বর্ণনা সম্বলিত তাক্বদীসের কিছু কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং কাঁদতেন , তারপর মুনাজাত করতেন।
বিরত থাকার উপর গুরুত্ব দান
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন মানুষ সৃষ্টির পেছনে যে প্রজ্ঞা রয়েছে তা হলো তার আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করা (পৃথিবীতে)।73 যখন মানুষ এ মাক্বাম অর্জন করে তখন সে ঐশী কাজ সম্পাদন করে। যে পথে এ স্থানে পৌঁছানো যায় তা হলো আল্লাহর অনুগত্য ও প্রবৃত্তির বিরোধিতা করার মাধ্যমে। এ বিষয়ে তিনি বলেন : একটি হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে :
“ হে আদমের সন্তান! আমি সব কিছু তোমার জন্য সৃষ্টি করেছি এবং তোমাকে তৈরী করেছি আমার জন্য।” 74
“ আমার দাস! আমাকে মেনে চলো ঐ পর্যন্ত যখন আমি তোমাকে বানিয়ে ফেলবো আমার মত অথবা আমার উদাহরণ।” 75
“ প্রিয় বন্ধুরা! এসব হাদীস অনুযায়ী আপনারা আল্লাহর প্রতিনিধি ; আপনারা নাশপাতির মত , ফলের রাজা! নিজেদের মূল্য বুঝুন , শরীরী সত্তার খেয়াল খুশী অনুসরণ করবেন না , আল্লাহকে মেনে চলুন যেন আপনারা একটি উচ্চস্থান অর্জন করতে পারেন যা আপনাদেরকে ঐশী কাজ করতে সক্ষম করবে। আল্লাহ বিশ্ব জগতের পুরোটাকে সৃষ্টি করেছেন আপনাদের জন্য এবং আপনাদের সৃষ্টি করেছেন তার জন্য। দেখুন কী উচ্চ মাক্বামইনা তিনি আপনাদের দান করেছেন।”
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেয়া হবে যখন সে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মাক্বাম অর্জন করবে। তিনি বলতেন :“ যে ভাবে চামচ খাবার খাওয়ার জন্য , কাপ চা খাওয়ার জন্য , সে ভাবে ব্যক্তি মানুষ হওয়ার জন্য।
তিনি বারবার বলতেন :
“ আল্লাহ আমাকে কারামত দিয়েছেন ; তোমরাও আল্লাহর কাজ করো তিনি তোমাদেরকেও তা দিবেন। হে রাজমিস্ত্রী , হে দর্জি! যখন তুমি ইট বসাও অথবা সেলাই করো সূঁচ দিয়ে তা করো আল্লাহর প্রেম নিয়ে এবং আল্লাহ সম্পর্কে সচেতন থাকো , যখন তোমরা পোষাক পড়বে যার একগজ একশত তোমান , বলো না আমি এটি কিনেছি এক মিটার একশত তোমানে।76 এর পরিবর্তে বলো , আল্লাহ এটি আমাকে দান করেছেন। আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করো! নিজের প্রতিনিধিত্ব করো না!”
অভ্যন্তরীণ অবস্থা জানা
হযরত শেইখ শ্রোতাদের অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে জানতেন অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা দিয়ে। কিন্তু তিনি কখনই সবার সামনে কোন ব্যক্তির দুর্বল দিকটি প্রকাশ করতেন না। অবশ্য তিনি তা এমনভাবে করতেন যে ব্যক্তি নিজে সেই সতর্কবানী বুঝতে পারতো এবং চেষ্টা করতো নিজেকে শুদ্ধ করতে। এরকম দু’ টো ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেয়া হলোঃ
হযরত শেইখকে পরীক্ষায় ফেলা
একজন বিখ্যাত ধর্মপোদেষ্টা বলেন : এক অপরাহ্নে , 1956 সনে আমি তেহরানের বাজারে মসজিদে শেইখ আব্দুল্লাহ হোসেইনের পাশে মাদ্রাসা-ই-শেইখ আব্দুল্লাহ হোসেইনে ছিলাম। হযরত শেইখ রজব আলীর বিখ্যাত শিষ্য শেইখ আব্দুল করীম হামিদ আমার কাছে এসে তার উস্তাদ হযরত শেইখ রজব আলী সম্পর্কে কথা বললেন এবং বললেন তার ইখলাসের ও আধ্যাত্মিক মাক্বামের কথা। সবশেষে আমাকে হযরত শেইখের বৈঠকে বৃহস্পতিবার দিনে তার সাথে যেতে বললেন। আমি তার সাথে গেলাম। আমরা যখন এসে পৌঁছুলাম হযরত শেইখ তখন কিবলামূখী হয়ে বসে ছিলেন এবং আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) এর একটি মুনাজাতে নিমন্ন ছিলেনঃ
“ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে নিরাপত্তা চাই সেই দিনের যেদিন না সম্পদ , না সন্তান কোন উপকারে আসবে।”
একই সময় তার পিছনে বসে থাকা তার ভক্তরা মুনাজাতটি তার সাথে আবৃত্তি করছিলেন। আমিও লোকজনের পেছনে সর্বশেষ সারিতে বসে পড়লাম এবং মনে মনে বললাম : হে আল্লাহ! যদি তিনি আপনার অলীদের একজন হন তাহলে আমার বৈঠকগুলোর আকার বড় করে দিন যেন আমি তা থেকে ভালো বস্তুগত সুবিধা পেতে পারি! যখনই এ চিন্তা আমার মন ছুঁয়ে গেলো , হযরত শেইখ তার দোয়ার মাঝখানে বললেনঃ
“ আমি বলছি অর্থের কথা ভুলে যাও , কিন্তু সে এখানে এসেছে আমাকে অর্থ দিয়ে পরীক্ষা করতে।”
তিনি তা ফার্সীতে বললেন এবং তারপর মুনাজাত (আরবীতে) আবৃত্তি করে যেতে লাগলেনঃ
“ আমি আপনার নিরাপত্তা চাই সে দিন যে দিন না সম্পদ----”
একজন গুপ্তচরের উপস্থিতি
ক্রমা ন্নয়ে উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা এবং বিখ্যাত ব্যক্তিরাও হযরত শেইখের বৈঠকে যোগদান করতে লাগলো। হযরত শেইখের মতে তারা আসতো তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য এবং হযরত শেইখের বাড়িতে‘ ডাইনী বুড়ির’ (পৃথিবীর) খোঁজে। এর পরও কেউ কেউ হযরত শেইখের খোতবা থেকে উপকৃত হতেন তাদের ধারণ ক্ষমতা অনুযায়ী।
এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতির কারণে শাহের গোয়েন্দা বিভাগ বৈঠকগুলোর ব্যাপারে সন্দেহ করতে শুরু করে এবং হাসান-ইল-বেইগী নামে এক মেজরকে ভিন্ন পরিচয়ে , আরেকজন গুপ্তচরের সাথে নিযুক্ত করে বৈঠকে যোগদান করতে। রিপোর্ট করার জন্য সরকারী কর্মকর্তারা কেন বৈঠকে যোগদান করছে তা যেন তারা জানতে পারে।
যখন গোয়েন্দা বিভাগের এ চর বৈঠকে প্রবেশ করলো হযরত শেইখ তার খোতবার মাঝে বললেন , তার শ্রোতাদের উপদেশ দিয়েঃ
“ মনোযোগ দাও আল্লাহর দিকে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে তোমার অন্তরে ঢুকতে দিও না। কারণ অন্তর হচ্ছে আয়না’ র মত এবং যদি তাতে সামান্য দাগ পড়ে তা খুব দ্রুতই দেখবে। এখন , কেউ দেখতে মনে হয় গোয়েন্দা এবং আসে নাম বদলে ; উদাহরণ স্বরূপ তার নাম হাসান কিন্তু সে ভান করে অমুক।”
এ কথাগুলো গোয়েন্দা বিভাগের চরকে এতটা মুগ্ধ ও আশ্চর্যান্বিত কওে দেয় যে , মেজর হাসান ইল বেইগী , যার সত্যিকার নাম কারো জানা ছিলো না , সে সাভাক (গোয়েন্দা বিভাগের নাম) থেকে ইস্তফা দেয়।
“ প্রথমে তোমার বাবাকে সন্তুষ্ট করো!”
কোন কোন সময় হযরত শেইখ কিছু কিছু ব্যক্তিকে তার বৈঠকে ঢুকতে দিতেন না অথবা তাদের ওপর শর্ত আরোপ করতেন। হযরত শেইখের একজন শিষ্য যিনি তার সাথে 20 বছর ছিলেন তিনি বর্ণনা করেন কীভাবে তার হযরত শেইখের সাথে সম্পর্ক শুরু হয়ঃ প্রথম দিকে আমি যতভাবেই চেষ্টা করলাম তার বৈঠকে যোগদান করতে তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন না। একদিন আমি তাকে মসজিদ-ই জামাহতে দেখতে পেলাম এবং সালাম দেয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন তিনি আমাকে তার বৈঠকে প্রবেশ করতে দেন না। তিনি বললেন :
“ প্রথমে তুমি তোমার বাবাকে খুশী করো , তার পর আমি তোমার সাথে কথা বলবো।”
সে রাতে আমি বাড়ি চলে গেলাম এবং আমারে বাবার পায়ে পড়ে গেলাম। তাকে অনুরোধ করলাম আমাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য। আমার বাবা খুব অবাক হয়ে বললেন :‘ কী হয়েছে’ ?’
আমি বললাম :
“ আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না , শুধু ক্ষমা করে দিন।”
আমি জানতাম না যে আমি কী করছিলাম এবং সবশেষে আমার বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিলেন।
পরদিন সকালে আমি হযরত শেইখের বাড়ি চলে গেলাম। আমাকে দেখার সাথে সাথে তিনি বললেন :
“ ভালো করেছো ! এখন এসো এবং আমার পাশে বসো”
তখন থেকে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত আমি তার সাথে ছিলাম।”
2. বিশেষ দিক নির্দেশিকা
একজন নিখুঁত উস্তাদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আল্লাহর পথে তার দিক নির্দেশনা যা সন্ধানকারীকে সত্য সন্ধানের বিভিন্ন ধাপে তার অবস্থান অনুযায়ী পথ দেখাবে। অবশ্যই এ দায়িত্বটি প্রকাশ্যে অন্যদের সামনে করা সম্ভব নয়।
একজন ডাক্তার যতই বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ হোক সব রোগীকে একই পেস ক্রি পশনে একই ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করতে পারেন না। প্রত্যেক রোগীর ভিন্ন ও নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োজন। এটিও সম্ভব যে কোন কোন কারণে দু’ জন রোগীকে একই রোগের জন্য ভিন্ন ওষুধ দেয়া হয়। আত্মার রোগের জন্যও এটি সত্য।
নৈতিকতার একজন শিক্ষক প্রকৃতপক্ষে একজন মানুষের আত্মার শিক্ষক। তিনি নৈতিকতা সম্পর্কীত রোগগুলিকে আরোগ্য করতে পারেন যদি তিনি তা প্রথমেই চিহ্নিত করতে পারেন ঐ রোগের উৎসকে এবং তার কাছে যদি যথাযথ ওষুধও থাকে।
আল্লাহর রাসূলগণ (আঃ) ছিলেন আত্মার প্রধান শিক্ষক ও প্রশিক্ষক। তারা এ ধরণের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তারা শুধু মানব সমাজের সাধারণ প্রয়োজন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না বরং সাথে সাথে সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রয়োজন সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন।
ইমাম আলী (আঃ) হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর বৈশিষ্ট সম্পর্কে বলেনঃ
“ তিনি ছিলেন একজন চিকিৎসক , তার চিকিৎসা জ্ঞান নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন তার রোগীর খোঁজে। আর তার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি সব সময় প্রস্তুত থাকতো। সেগুলো ব্যবহার করা হতো প্রয়োজন অনুযায়ী এবং আরোগ্য করতেন আত্মাগুলোকে যেগুলো ভুগছিলো অন্ধত্বে , বধিরতায় ও বাকশক্তিহীনতায়। তার ওষুধ নিয়ে তিনি খুঁজে ফিরতেন অবহেলার বাড়িগুলো ও হতবিহবল অবস্থানগুলো।” 77
যারা আধ্যাত্মিক আলেম তারা নবীদের প্রকৃত উত্তরাধিকারী ও তাদের প্রতিনিধি। তাদেরও এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারাই যারা আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) এর মতে :
“ সত্য অর্ন্তদৃষ্টির উপর ভিত্তি করে জ্ঞান তাদের কাছে পৌঁছেছে এবং তারা নিশ্চিত হয়েছে এমন রুহ অর্জন করেছে।” 78
অবশ্যই যেভাবে আমিরুল মুমিনীন (আঃ) বলেছেন :
“ আধ্যাত্মিক আলেম যারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে সর্বোচ্চ মাক্বামের অধিকারী তারা সংখ্যায় খুব কম।” 79
একজন নিখুঁত শিক্ষকের কথা
মরহুম আয়াতুল্লাহ মির্যা আলী (রঃ) বলেছেন :‘ এই পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একজন জ্ঞানী ও নিস্বার্থ পূর্ণতাপ্রাপ্ত (কামিল) উস্তাদ পাওয়া। যখন কোন ব্যক্তি আল্লাহর পথে সন্ধানকারী হয় যদি সে তার জীবনের অর্ধেকও উস্তাদ খোঁজায় ব্যয় করে ফেলে তাও যথাযথ। যে তার উস্তাদ খুঁজে পেয়েছে সে তার অর্ধেক পথ অতিক্রম করেছে।’
হযরত শেইখের শিষ্যদের প্রতি তার পথ নির্দেশনার গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে আমিত্ব প্রত্যাখান , আন্তরিকতা এবং অদৃশ্য থেকে সাহায্যের মাধ্যমে তিনি আত্মিক পূর্ণতার এমন উঁচু স্থানে উঠেছিলেন যে তিনি সক্ষম ছিলেন অন্যদের জীবনের আত্মিক রোগ ও সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং তাদের আরোগ্য ও সমাধান করতে। এ বাস্তবতা সুস্পষ্ট তাদের কাছে যারা হযরত শেইখের জীবনের সাথে পরিচিত ছিলেন।
জীবনে গুনাহ ও দূর্যোগ
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের অনুচিত কাজগুলো তার সমস্যা ও দূর্যোগ হওয়ার মূল কারণ। পবিত্র কোরআন বলে :
) وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ(
“ যে দূর্যোগ তোমার আসে তা তোমার হাতের উপার্জনের কারণে।” (আল শুরা : 30)
উপরের আয়াতটি ব্যাখ্যা করে আলী (আঃ) বলেনঃ
“ গুনাহ সম্পর্কে সতর্ক হও , যেহেতু সব দূর্যোগ ও রিয্ক্বে দোষত্রুটি এমনকি গায়ে আঁচড় লাগা অথবা মাটিতে পড়ে যাওয়া গুনাহ করার কারণে ঘটে। কারণ , সর্বশক্তিমান আল্লাহ বলেনঃ“ যে কোন দূর্যোগ তোমার ঘটে তা তোমার হাত যা উপার্জন করেছে তার জন্য।” 80
যদি কোন ব্যক্তি সত্যিই বিশ্বাস করে যে অনুচিত কাজগুলো মৃত্যুর পরের জীবনেই শুধু দুঃখ কষ্ট আনবেনা এ পৃথিবীতেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত করবে তখন সে অন্যায় কাজ করা এড়িয়ে চলবে। সে সম্পর্কে ভাববেও না। এ বিশ্বাস যতই দৃঢ় হবে ততই ধার্মিক ব্যক্তি তৈরীর ভিত্তি প্রস্তুত হবে।
হযরত শেইখ তার অতিন্দ্রীয় বোধশক্তি ও আত্মার দৃষ্টি দিয়ে বাস্তবেই দেখতে পেতেন কষ্ট ও সমস্যার সাথে সম্পর্কিত খারাপ কাজগুলোকে এবং সেগুলো উল্লেখ করে তিনি মানুষের সমস্যার ও কষ্টের সমাধান করতেন। আত্ম -গঠনের এ পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি তাদের কামালিয়াতে বা পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করতেন।
“ আমরা আপনার কাছেও বাকিতে বিক্রী করি!”
হযরত শেইখের এক সন্তান বলেন :
“ একদিন বিখ্যাত মরহুম মুরশিদ চিলোই81 হযরত শেইখের কাছে গেলেন এবং তার ব্যাবসায় মন্দা চলবার অভিযোগ করে বললেন : দাদাশ (বন্ধু)! আমরা কী এক অবস্থার ভিতর পড়েছি ?! দীর্ঘদিন আমাদের সমৃদ্ধশালী অবস্থা হয়েছিলো। আমরা 3-4 টি বড় পাতিল ভরতি চেলো (রান্না চাল) বি ক্রী করতাম অনেক ক্রে তার কাছে। কিন্তু হঠাৎ করে সব বদলে গেছে এবং ক্রে তারা একের পর এক আমাদের পরিত্যাগ করেছে। বি ক্রী খুব ধীর এবং আমরা সারা দিনে এক পাতিলও বি ক্রী করি না ।
হযরত শেইখ একটু ভাবলেন এবং বললেন :‘ এটি তোমার ত্রুটি ; তোমরা ক্রে তাদের প্রত্যাখ্যান কর।’
মুরশিদ বললেন :‘ আমি কাউকে প্রত্যাখ্যান করিনি ; এমনকি আমি বাচ্চাদের পরিবেশন করি এবং তাদেরকে অর্ধেকটা কাবাব দেই।’
হযরত শেইখ বললেন :
“ কে ছিলো সেই সাইয়্যেদ যে তিন দিন (তোমার ওখানে) বাকীতে খেয়েছিলো এবং শেষবার তোমরা তাকে দোকান থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলে।”
খুব লজ্জিত হয়ে মুরশিদ হযরত শেইখের ওখান থেকে চলে গেলেন এবং দ্রুত ঐ সাইয়্যেদ এর খোঁজ করলেন। যখন তিনি তাকে পেলেন তিনি তার কাছে ক্ষমা চাইলেন এবং রেষ্টুরেন্টের জানালায় একটি নোটিশ টাঙ্গিয়ে দিলেন :
“ আমরা বাকীতে বি ক্রী করি , এমন কি আপনার কাছেও , নগদ অর্থ ও ঋণ দিবো যতটুকু আমাদের সম্ভব!”
বাচ্চাকে কষ্ট দেয়া
হযরত শেইখের একজন মর্যাদাবান শিষ্য বলেছেন :
আমার দু’ বছরের পুত্রটি , যে এখন চল্লিশ বছর বয়স্ক। তার বিছানা ভিজিয়ে ফেললো এবং তার মা তাকে এমন মার দিলো যে তার প্রায় মারা যাবার মত অবস্থা হলো। এক ঘন্টা পর আমার স্ত্রীর এত জ্বর এলো যে আমরা তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিলাম ডাক্তারদের কাছে। ওষুধের জন্য ষাট তোমান খরচ করলাম কিন্তু জ্বর কমলো না বরং আরো খারাপ হলো। আমরা ডাক্তারের সাথে আবার দেখা করলাম আরো চল্লিশ তোমান খরচ করে যা আমাদের জন্য সে দিনগুলোতে খুব বেশী ছিলো।
যাহোক , সে সন্ধ্যায় আমি হযরত শেইখেকে তুলে আনলাম তার সাথে তার বৈঠকে যাওয়ার জন্য। আমার স্ত্রীও গাড়িতে ছিলো। যখন হযরত শেইখ গাড়িতে উঠলেন আমি আমার স্ত্রীকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম ; বললাম :‘ এ হলো আমার সন্তানের মা। তার জ্বর এসেছে। আমি তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু জ্বর কমে নি।’
হযরত শেইখ আমার দিকে তাকালেন এবং আমার স্ত্রীকে বললেনঃ“ একটি বাচ্চাকে এভাবে মারা উচিত নয় ; তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও , যাও তাকে খুশী করো এবং তার জন্য কিছু কিনো , সে অসুখ থেকে সেরে উঠবে।”
আমরা তাই করলাম এবং তার জ্বর নেমে গেলো!
স্ত্রীকে কষ্ট দেয়া
ঐ একই ব্যক্তি বর্ণনা করেন :“ একদিন হযরত শেইখ ও আমি আগা রাদমানিশের বাড়িতে গেলাম। আমি তাকে (হযরত শেইখকে) বললাম :“ আমার বাবা82 1352হিঃ/1933 সনে ইন্তেকাল করেছেন। আমি দেখতে চাই তিনি কেমন আছেন (বারযাখে)।”
হযরত শেইখ বললেন :“ সূরা ফাতেহা পড়ো!”
এরপর তিনি ভাবলেন এবং কিছুক্ষণের জন্য চুপ রইলেন এবং বললেনঃ“ তারা তাকে আসতে দিচ্ছে না , সে অসুবিধায় আছে তার স্ত্রীর কারণে!” “ তোমার সৎ মা আসছেন।”
আমি বললাম :
“ তিনি ছিলেন একজন গ্রামের মহিলা এবং আমার বাবার স্ত্রী এবং যেহেতু আমার পিতা আরো কয়েক জন মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন তাই তিনি আমার বাবার সাথে কথা বলেন নি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। যখনই আমার বাবা দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেন তিনি অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতেন।”
আমি হযরত শেইখকে বললামঃ
‘ তাকে জিজ্ঞেস করুন আমি তার জন্য কী করতে পারি আমার বাবার সাথে উনি সন্তষ্ট হওয়ার জন্য।’
হযরত শেইখ বললেন :
“ সে [আমি] যেন ক্ষুধার্তকে খাওয়ায়।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম কত জনকে ? বললেন একশত জনকে। আমি বললাম : আমার এত লোককে খাওয়ানোর ক্ষমতা নেই , এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সংখ্যা নামিয়ে চল্লিশ জনে আনলেন। এর পর হযরত শেইখ বললেনঃ তোমার বাবার কন্ঠ এখন শোনা যাচ্ছে। সে মহিলা সন্তুষ্ট হওয়াতে তোমার বাবাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তিনি বলছেন আমার ছেলেকে বলুন কেন সে দুই বিয়ে করেছে । দেখুক আমি কী কষ্টের ভিতর পড়েছি! এখন সতর্ক হও সমান আচরণের জন্য (স্ত্রীদের মাঝে)।”
হযরত শেইখের আরেক বন্ধু বলেন :‘ আমি তাকে বারযাখে আমার বাবার অবস্থা জিজ্ঞেস করলাম।
হযরত শেইখ বললেন :“ তিনি ঝামেলার ভিতর পড়েছেন তোমার মায়ের দ্বারা!”
আমি দেখলাম তিনি সঠিক বলেছিলেন ; আমার বাবা আরেক জন মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন এবং আমার মা এ বিষয়ে রাগান্বিত ছিলেন। তাই আমি আমার মায়ের কাছে গেলাম এবং তাকে খুশী করলাম। পরের বার যখন আমি হযরত শেইখের সাক্ষাতে গেলাম তিনি আমাকে দেখার সাথে সাথে বললেন :
“ কী ভালোইনা দু’ জন লোকের মাঝে পুনরায় বন্ধুত্ব করে দেয়া ; তোমার বাবা এখন আরামে আছেন!”
স্বামীকে কষ্ট দেয়া
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :‘ এক মহিলা ছিলেন যার স্বামী ছিলো একজন সাইয়্যেদ এবং সে ছিলো হযরত শেইখের বন্ধু। সে তার স্বামীকে অনেক বিরক্ত করতো। কিছু সময় পর সে ইন্তেকাল করে। তার জানাযায় হযরত শেইখ উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি বললেন :
“ এই মহিলার রুহ তর্ক করছিলো যখন তাকে কবর দেয়া হচ্ছিলো , এই বলে যে‘ কোথায়! এখন আমি মৃত , তো কী হয়েছে ?! যখন তাকে কবরে শোয়ানো হচ্ছিলো তার আমল এক ভয়াল কালো কুকুরে পরিণত হলো। যখন মহিলা দেখলো যে কুকুরটিকে তার সাথে কবর দেয়া হচ্ছে (তাকে কবরে শাস্তি দেয়ার জন্য) সে বুঝতে পারলো কী রহস্য স্থুপীকৃত করেছে নিজের জন্য জীবনব্যাপী। সে বিলাপ করতে লাগলো। অনুনয় করতে লাগলো এবং চিৎকার করতে লাগলো। আমি দেখলাম সে খুবই বিপর্যস্ত অবস্থায় আছে। তাই আমি এই সাইয়্যেদকে বললাম তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আমার কারণে। কুকুরটি চলে গেলো এবং তাকে কবর দেয়া হলো।”
অসন্তুষ্ট বোন
হযরত শেইখের এক সন্তান বর্ণনা করেন :
‘ একজন আর্কিটেক্ট ছিলেন যার কাজ ছিলো বাড়ি তৈরী করা ও বি ক্রী করা। তিনি প্রায় একশত ফ্ল্যাট তৈরী করলেন কিন্তু খুব বেশী ঋণের কারণে তিনি মারাত্মক আর্থিক সমস্যায় পড়ে গেলেন এবং গ্রেফতার হয়ে জেলে যাবার অবস্থা হলো। তিনি আমার বাবার কাছে এলেন এবং বললেন তিনি বাড়িতে যেতে অক্ষম এবং লোকদের কাছ থেকে লুকাতে হবে।
সংক্ষিপ্ত চিন্তার পর হযরত শেইখ বললেন :
“ যাও বোনকে সন্তুষ্ট করো!” আর্কিটেক্ট বললেন : আমার বোন সন্তুষ্ট আছে ; হযরত শেইখ বললেন সে সন্তুষ্ট নয় , আর্কিটেক্ট কিছুক্ষণ ভেবে বললেন :“ হ্যা , যখন আমার বাবা ইন্তেকাল করেন তিনি কিছু অর্থ আমাদের লিখে দিয়ে যান। আমার বোনের অংশ ছিলো পনেরো শত তোমান যা আমি মনে করতে পারি তাকে আমি দেই নি।”
তার পর তিনি চলে গেলেন এবং কিছু সময় পর ফিরে এলেন এবং বললেন :‘ আমি আমার বোনকে পাঁচ হাজার তোমান দিয়েছি এবং তার অনুমতি নিয়েছি।”
আমার বাবা কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাবলেন এবং বললেন :
“ সে বলছে সে সন্তুষ্ট নয় , তার কি কোন বাসা আছে ?”
আর্কিটেক্ট বললেনঃ‘ না , সে একজন ভাড়াটে’ । হযরত শেইখ বললেন :‘ যাও তোমার সবচেয়ে ভালো বাড়িগুলোর একটির মালিকানা তার নামে করে দাও এবং এর পর আমার কাছে আসো দেখি কী করতে পারি।”
আর্কিটেক্ট বললেন : হযরত শেইখ! আমরা দু’ জন আছি বাড়িগুলোর অংশীদার হিসেবে। কীভাবে আমি তা করতে পারি ? হযরত শেইখ বললেন :
“ আমি আমার বুদ্ধির শেষ মাথায় চলে এসেছি ; কিন্তু আল্লাহর এই দাস এখনও সন্তুষ্ট নয়।”
সবশেষে তিনি চলে গেলেন , আনুষ্ঠানিকভাবে তার এক বাড়ি তার বোনের কাছে হস্তান্তর করলেন এবং তাকে সাহায্য করলেন তার ঘরের আসবাবপত্র স্থানান্তর করতে। যখন তিনি ফেরত আসলেন হযরত শেইখ তাকে বললেনঃ“ এখন এটির সমাধান হয়ে গেলো!”
পরদিন তিনি তার তিনটি বাড়ি বি ক্রী করতে সমর্থ হলেন এবং সমস্যা থেকে মুক্তি পেলেন।
বোনের প্রতি দয়া না করা
তেহরানের বাজারের এক ব্যাবসায়ী দেউলিয়া হয়ে গেলো। যখন সে তার বন্ধুর কাছে তার দুঃখের কথা বলছিলো হযরত শেইখ তার দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে দেখে তার বন্ধু তাকে উপদেশ দিলেন হযরত শেইখের কাছে সমস্যার কথা বলতে। শেইখ বললেন :“ তুমি একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি ; তোমার বোন জামাই মরে গেছে চার মাস হলো এবং তুমি তোমার বোনের সাথে ও তার (ইয়াতিম) সন্তানদের সাথে দেখা করো নি। এটি তোমার সমস্যার উৎস।”
ব্যাবসায়ী বললো :‘ আমাদের মাঝে গণ্ডগোল আছে।’
হযরত শেইখ বললেন :“ তোমার সমস্যার মূল সেখানে কিন্তু তুমি নিজে তা জানো না।”
ব্যাবসায়ী তার বন্ধুর কাছে ফেরত গেলো এবং তাকে বললো হযরত শেইখ যা বলেছেন তাকে। তারপর সে কিছু গৃহসামগ্রী কিনলো। সেগুলো তার বোনের কাছে নিয়ে গেলো এবং তার সাথে মিটমাট করে নিলো এতে তার সমস্যাও দূর হয়ে গেলো।
অসন্তুষ্ট মা
একজন যুবকসহ বেশ কিছু লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো। তার আত্মীয়রা হযরত শেইখের কাছে গেলো এবং তাকে অনুনয় করে এর সমাধান চাইলো। হযরত শেইখ তাদের বললেন যে সে তার মা-এর কারণে ঝামেলায় পড়েছে। তারা তার মায়ের কাছে গেলো এবং তিনি বললেন তিনি যে দোয়াই করেন কোন কাজ হচ্ছে না। তারা তাকে বললোঃ“ হযরত শেইখ বলেছেন আপনি তার প্রতি অসন্তুষ্ট।”
তিনি বললেন : তা সত্য ; আমার ছেলে যখন নতুন বিয়ে করেছে তখন একদিন আমি দুপুরের খাবারের পর দস্তরখান পরিস্কার করলাম। বাসন কোসন একটি ট্রেতে রাখলাম , এবং আমার ছেলের বউয়ের দিকে এগিয়ে দিলাম রান্না ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার ছেলে আমার কাছ থেকে ট্রে-টি নিয়ে আমাকে বললো :‘ আমি তোমাকে কোন কাজের লোক এনে দিই নি!’
শেষ পর্যন্ত তার মা তার প্রতি সন্তুষ্ট হলেন এবং তার ছেলের জন্য দোয়া করলেন। পরদিন ঘোষণা করা হলো যে একটি ভুল হয়েছে এবং যুবকটিকে মুক্তি দেয়া হলো।
ভগ্ন হৃদয় চাচী
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেছেন :
“ আমার বাবা এত বেশী অসুস্থ ছিলেন যে , কোন কিছুই তাকে সুস্থ করছিলো না। আমি হযরত শেইখকে বললাম যে আমার বাবা অসুস্থ এবং এক বছর ধরে বিছানায়। হযরত শেইখ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমার কোন চাচী আছে কিনা। আমি বললাম আছে। হযরত শেইখ বললেন :“ তোমার বাবা তোমার চাচীর কারণে জটিলতায় পড়েছেন এবং যদি তিনি দোয়া করেন তাহলে তিনি সুস্থ হবেন।”
আমি আমার চাচীকে অনুরোধ করলাম আমার বাবার জন্য দোয়া করতে কিন্তু আমার বাবা সুস্থ হলেন না। আমি হযরত শেইখের কাছে আবার গেলাম এবং বললাম আমার বাবা সুস্থ হন নি আমার চাচী সন্তুষ্ট হওয়া সত্বেও। হযরত শেইখ আমাকে কিছু নির্দেশনা দিলেন আমার চাচীর চারটি ইয়াতিম সন্তানের জন্য কিছু উপকার করতে এবং আমাকে বললেন তাদেরকে দোয়া করতে বলতে। হযরত শেইখ যেভাবে বলেছিলেন আমি তাই করলাম এবং আমার চাচীকে জিজ্ঞেস করলাম আমার বাবার সাথে তার অসন্তুষ্টির কারণ কি ?
তিনি বললেন :‘ আমার স্বামী মারা যাবার পর তোমার বাবা আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে তার নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন থাকার জন্য। একদিন আমি তোমার মায়ের সাথে ঝগড়া করছিলাম যখন তোমার বাবা এলেন এবং আমার সন্তানদেরসহ আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। আমার হৃদয় তখন ভেঙ্গে গিয়েছিলো।’
শেষ পর্যন্ত আমার চাচী সন্তুষ্ট হওয়ার পর আমার বাবা সুস্থ্য হয়ে উঠলেন কিন্তু পুরোপুরি স্বাস্থ্য ফিরে পেলেন না। আবার আমি হযরত শেইখের কাছে ঘটনাটি বললাম। এবার তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন সাইয়্যেদের উপকার করতে যাকে তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং আমি তা করার পর আমার বাবা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলেন।
মালিকের সন্তানকে কষ্ট দেয়া
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন যে তিনি বলেছেনঃ“ তোমরা কখনই অযথা দুর্যোগগ্রস্ত হও না।”
একবার আমার মাথা কেটে গিয়েছিলো এক দূর্ঘটনায়। আমি কিছু বন্ধুদের সাথে হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। হযরত শেইখকে আমার বন্ধু বললো :‘ দেখুনতো সে কি করেছে যার জন্য তার মাথা কেটেছে! , হযরত শেইখ কিছুক্ষণ ভাবলেন এরপর বললেন :“ সে একটি বাচ্চাকে কষ্ট দিয়েছে কারখানাতে।”
আমি দেখলাম তিনি ঠিক বলেছেন। আমি একটি বাঁকা করার যন্ত্রের অপারেটর ছিলাম যা সে দিনগুলোতে একটি বিরল পেশা ছিলো। এ ধরনের পেশার লোকেরা তাদের মালিকের কাছে সাধারণত প্রিয় ছিলো। একবার আমার মালিকের ছেলে আমার একটি ভুল ধরলো যা তার সাথে সম্পর্কিত ছিল না। তাই তার সাথে আমার ঝগড়া হলো এমন ভাবে যে সে কেঁদে ফেললো।
হযরত শেইখ বললেন :“ তুমি যদি তাকে সন্তুষ্ট না করো তাহলে তোমার সমস্যা চলতেই থাকবে।”
আমি গেলাম (সেই বাচ্চাটির কাছে) এবং ক্ষমা চাইলাম।
কর্মচারীকে কষ্ট দেয়া
বেশ কিছু কর্মকর্তা ফাইনান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে এলেন হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করতে তার এক শিষ্যের বাড়িতে। তাদের একজন বললেন :‘ আমার শরীর চুলকায় এবং তা সারে না। হযরত শেইখ সামান্য ভেবে বললেন :“ আপনি একজন সাইয়্যেদ মহিলাকে অসন্তুষ্ট করেছেন।”
ঐ ব্যক্তি বললো :
‘ এরা তাদের ডেস্কে বসতে আসে কিন্তু তাদের দায়িত্ব পালন করে না এবং যদি আপনি তাদের কিছু বলেন তারা কেঁদে ফেলে!’
দেখা গেলো ঐ সাইয়্যেদ মহিলা তাদের অফিসে নিয়োগ প্রাপ্ত ছিলেন এবং তিনি তাকে কষ্ট দিয়েছেন তার মন্তব্য দিয়ে।
হযরত শেইখ বলেন :“ আপনি এই চুলকানী থেকে সুস্থ হবেন না যতক্ষণ না আপনি তার কাছে ক্ষমা চান।”
হযরত শেইখের আরেক শিষ্য বলেন :
“ আমরা বসে ছিলাম হযরত শেইখের উপস্থিতিতে তারই এক বন্ধুর উঠানে। সেখানে একজন উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তাও ছিলেন যিনি নিয়মিত হযরত শেইখের বৈঠকে যোগ দিতেন। কোন অসুস্থতার কারণে তিনি পা লম্বা করে দিয়ে বলেন :‘ হযরত! আমি আমার পায়ের ব্যাথায় গত তিন বছর ধরে ভুগছি। যা-ই করি না কেন কোন ফল পাই না কোন ওষুধ কাজে লাগে না।’
নিয়ম অনুযায়ী হযরত শেইখ উপস্থিত সাথীকে বললেন সূরা ফাতিহা পড়তে , এরপর কিছুক্ষণ ভাবলেন এবং বললেন :“ আপনার পায়ে ব্যাথা শুরু হয়েছে সেদিন থেকে যেদিন আপনি টাইপিষ্ট মহিলাকে তার ভুলের জন্য বকা দিয়েছিলেন এবং চিৎকার করেছিলেন। যিনি ছিলেন এক সাইয়্যেদ মহিলা যার হৃদয় ভেঙ্গে যায় এবং সে কেঁদেছিলো। এখন আপনার উচিত তাকে খুঁজে বের করা এবং তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করা যেন ব্যাথা চলে যায়।”
ভদ্রলোক বললেন :‘ আপনি সঠিক বলেছেন , সে একজন টাইপিষ্ট ছিলো আমাদের অফিসে এবং আমি তার প্রতি চিৎকার করেছিলাম তাতে সে কেঁদেছিলো।’
বৃদ্ধার অধিকার হরণ করা
হযরত শেইখের শিষ্যদের একজন কিছু খাবার খাওয়ার পর তার আধ্যাত্মিক অবস্থা হারিয়ে ফেলে। তিনি এর জন্য হযরত শেইখের সাহায্য চাইলেন। হযরত শেইখ বললেন :
“ যে কাবাব তুমি খেয়েছো তার মূল্য পরিশোধ করেছিলো অমুক ব্যবসায়ী যে এক বৃদ্ধা মহিলার অধিকার হরণ করেছে।”
অন্যকে অপমান করা (খারাপ ভাষায়)
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেছেন :
“ একদিন হযরত শেইখ ও আমি আরো কয়েকজনের সাথে ইমাম-যাদেহ ইয়াহইয়া সড়ক ধরে যাচ্ছিলাম। তখন একজন বাইসাইকেল চালক এক পথচারীকে ধাক্কা দিলো। পথচারী সাইকেল চালককে‘ গাধা’ বলে অপমান করলো।
তা শুনে হযরত শেইখ বললেন :
“ তার ভিতরটি সাথে সাথে গাধায় পরিণত হয়ে গেলো।”
অন্য আরেক শিষ্য বলেন :
“ একবার আমি বাজারের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম একটি ঘোড়ার গাড়ি যাচ্ছে এবং লোক ঘোড়ার লাগাম ধরে আছে। হঠাৎ করে একজন মানুষ ঘোড়ার সামনে লাফ দিয়ে এগিয়ে গেলো রাস্তা পার হওয়ার জন্য। গাড়ির চালক তার প্রতি চিৎকার করে বললো :‘ ঐ ব্যাটা ঘোড়া!’ আমি দেখলাম ঐ গাড়ির চালকও ঘোড়ায় পরিণত হয়েছে এবং লাগাম দু টুকরো হয়ে গেছে।”
পশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ
ইসলামে পশুদের প্রতি অমানবিক আচরণ এক ঘৃণ্য কাজ।83 একজন মুসলমানের অনুমতি নেই যে সে কোন পশুকে কষ্ট দেয় অথবা এমনকি অভিশাপ দেয়। মুহাম্মাদ (সঃ) বলেন :
“ তোমরা পশুদের প্রতি যে অমানবিক আচরণ করো তা যদি ক্ষমা করা হয় তবে তোমাদের অনেক গুনাই ক্ষমা করা হয়।” 84
যদিও হালাল গোশতের পশুকে জবাই করা ইসলামে অনুমোদিত তারপরও জবাইয়ের জন্য রয়েছে নিয়মকানুন যা পশুকে যতটুকু সম্ভব কম ব্যাথা দেয়। একটি নিয়ম হচ্ছে পশুদেরকে অবশ্যই জবাই করা যাবে না একই প্রজাতির অন্য পশুর সামনে।85
ইমাম আলী (আঃ) বলেন :
“ কোন ভেড়াকে অন্য আরেক ভেড়ার সামনে জবাই করো না এবং কোন উটকে অন্য কোন উটের সামনে , যখন তারা দেখছে পশুদের জবাই করা হচ্ছে।” 86
তাই , কোন পশুর মাথা কেটে নেয়া তার মায়ের সামনে এক চরম তিরস্কারযোগ্য কাজ , কারণ তা অমানবিকতা ও হিংস্রতা প্রকাশ করে , যা এ কাজের অপরাধীর উপর বিরাট ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :
“ একজন কসাই এলো হযরত শেইখের কাছে এবং বললো :‘ আমার সন্তান মারা যাচ্ছে , আমি কী করবো ?’
হযরত শেইখ বললেন :“ তুমি এক বাছুরকে জবাই করেছো তার মায়ের চোখের সামনে।”
কসাই হযরত শেইখকে অনুরোধ করলো তার জন্য কিছু একটা করতে , হযরত শেইখ বললেন :
“ এটি (পশুটি) বলছে : কখনই না , সে আমার বাচ্চাকে জবাই করেছে তাই তার বাচ্চা অবশ্যই মরবে!” 87
দ্বিতীয় অধ্যায়
আত্মগঠনের ভিত্তি
‘ নাজাত’ হলো প্রকৃতপক্ষে মানবিক গুণাবলী ও পূর্ণতার সার সংক্ষেপ এবং তা অর্জনের পথ হলো , কোরআনের দৃষ্টিতে আত্মগঠন ও আত্মা পবিত্রকরণের মাধ্যমে। বেশ কয়েকটি শপথের পর আল্লাহ বলছেন :
) قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا(
“ প্রকৃত পক্ষে সে সফলতা লাভ করে (নাজাত পায়) যে তা পবিত্র করে।” (সূরাশামসঃ09)
যা কিছু ঐশী দূতগণ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন তা হলো নাজাত ও মানুষের‘ সম্ভাব্যতার’ বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ। মানব জাতির জন্য আত্মাপরিশুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কীভাবে আত্মগঠন শুরু করা যায় এবং এর ভিত্তির শুরু কোথায় ঐশী দূতদের মত অনুযায়ী। আত্মগঠনের ভিত্তি ও আত্মাপরিশুদ্ধকরণের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে‘ একত্ববাদ’ । তাই প্রত্যেক ঐশী দূতের প্রথম সংবাদ ছিলো -‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ - কোন ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া।”
) مَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ(
“ কোন রাসূলকে পাঠাই নি তোমার আগে এ অহী তার কাছে পাঠানো ছাড়া যেঃ কোন ইলাহ নেই আমি ছাড়া , অতএব আমারই ইবাদাত করো।” (সূরা আম্বিয়া : 25)
“ হে জনতা! বলো‘ কোন ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া’ যেন তোমরা নাজাত পাও।” 88
শুধু মুখে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা যথেষ্ট নয়। আত্মগঠনের ভিত্তি যা নাজাত ও মানবিক পূর্ণতা লাভের দিকে নিয়ে যায় তা হলো একত্ববাদের সত্যতা এবং প্রকৃত একত্ববাদের অনুসারী হওয়া।
মানুষ যদি প্রকৃত একত্ববাদে পৌঁছে যায় তার ইঙ্গিত হবে এ যে সে ফেরেশতাদের মত ঐশী সত্তার মাধ্যমে সর্বশক্তিমান আল্লাহর একত্বকে প্রত্যক্ষ করতে পারেঃ
) شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ(
“ কোন ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া : সেটি আল্লাহর , তাঁর ফেরেশতাদের এবং যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের সাক্ষ্য ---।” (আল ইমরান : 18)
তার আরেক শিষ্য বলেনঃ
“ হযরত শেইখ এ বিষয়ে ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন তা অন্যকে পৌঁছে দেয়ার জন্য যা তিনি নিজে অর্জন করেছিলেন এবং তার শিষ্যদের অতিন্দ্রীয় একত্ববাদে উন্নীত করার জন্য।”
হযরত শেইখ বলেছেন :
“ একত্ববাদ হচ্ছে আত্মগঠনের ভিত্তি। যদি কেউ চায় একটি বিল্ডিং তৈরী করতে তাকে অবশ্যই একটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় বিল্ডিংটির গোড়া মজবুত হবে না। আধ্যাত্মিক পথচারীকে অবশ্যই শুরু করতে হবে একত্ববাদ দিয়ে। যে রকম ছিলো প্রত্যেক নবীর (আঃ) প্রথম কথা‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ । মানুষ মানবিক পূর্ণতা লাভে ব্যর্থ হবে যদি সে একত্ববাদের সত্যকে বুঝতে অক্ষম হয়। এবং বিশ্বাস না করে যে অস্তিত্বে কিছুই নেই একমাত্র আল্লাহর পবিত্র সত্তা ছাড়া। একত্ববাদের মর্মার্থ বুঝতে পারার পর মানুষ পুরোপুরি সৃষ্টিকর্তার দিকে মনোযোগ দিতে পারে।”
তিনি আরো বলেন :
“ যদি চাও যে আল্লাহ তোমাকে ডাক89 দিক , (চেষ্টা করো) একটু ঐশী জ্ঞান লাভ করতে এবং তাঁর সাথে চুক্তি করো।”
“ যখন আমরা বলি‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আমাদের সত্য কথা বলা উচিত। যতক্ষণ না মানুষ মিথ্যা ইলাহদের পরিত্যাগ করে ততক্ষণ সে পারে না একত্ববাদী হতে এবং সত্যবাদী‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করতে। যা মানুষের অন্তরকে মোহিত করে রাখে তাই তার ইলাহ।90 আমরা যখন বলি (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তার প্রতি আমাদের বিমোহিত থাকা উচিত।”
সমস্ত কোরআন এ কথা বলে-‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ । মানুষের এমন অবস্থায় পৌঁছানো উচিত যে অন্তরে আর কিছু খোদাই করা থাকে না এ কথাটি ছাড়া এবং তিনি (আল্লাহ) ছাড়া সব কিছু তার অন্তর ত্যাগ করে।
) قُلِ اللَّهُ شَهِيدٌ بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ(
“ বলো :“ আল্লাহ তা নাযিল করেছেনঃ (এর পর তাদের ত্যাগ করো।” ) (সূরা আনয়ামঃ19)
“ মানুষ একত্ববাদের গাছ। যার ফল হচ্ছে তার মাঝে ঐশী গুণাবলীর আত্মপ্রকাশ ; এ গাছটি পূর্ণতা লাভ করবে না যতক্ষণ না সে এ ধরনের ফল দেয়। মানুষের পূর্ণতার সর্বোচ্চ শিখর হচ্ছে আল্লাহতে (কাছে) পৌঁছা , আর তা হলো আল্লাহর গুণাবলীর প্রকাশ (মাধ্যম) হওয়া। চেষ্টা করো ঐশী গুণাবলী নিজের ভিতর আনতে। তিনি অনুগ্রহশীল। তুমিও অনুগ্রহশীল হও। তিনি ক্ষমাশীল তুমিও ক্ষমাশীল হও। তিনি (দোষ ত্রু টি) গোপনকারী , তুমিও গোপনকারী হও।”
“ মানুষের জন্য যা উপকারী তা হলো ঐশী গুণাবলী। আর কিছু এত প্রভাবশালী নয় মানুষের উপর। এমন কি আল্লাহর ইসমে আযমও নয়!”
“ যদি তুমি একত্ববাদে নিমজ্জিত হও , তুমি উপভোগ করবে মহিমান্বিত আল্লাহর নিয়ামতগুলো সবসময় যা এর আগে কখনো কর নি। আল্লাহর নিয়ামতগুলো ও রহমতসমূহ যে কোন সময়ই অভিনব।”
শিরক মুছে দেয়া
সত্তা ও অন্তর থেকে শিরক মুছে ফেলা হলো একত্ববাদের সত্যে পৌঁছা। তাই‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে এক ও প্রকৃত ইলাহ প্রমাণের আগে মিথ্যা ইলাহদের অস্বীকার করা।
এখন জানা দরকার শিরক কী ? কে মুশরিক ? শিরক কী শুধু বিভিন্ন জিনিসের খোদায়ীত্বে বিশ্বাস করা ? একমাত্র মূর্তিপূজকরাই কি নিস্প্রাণ মূর্তিতে বিশ্বাসী ? নাকি বিষয়টি আরো কিছু ?
শিরক বা বহুত্ববাদ এর বিপরীতে একত্ববাদ হচ্ছে অলীক শক্তিসমূহ এবং জীব জগতের উপর তাদের প্রভাব এবং তাদের ইবাদাত-এর বিপরীতে প্রকৃত সর্বসক্ষম একমাত্র প্রতিপালনকারী।
একত্ববাদীরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কাউকে পৃথিবীতে ক্রি য়াশীল দেখে না এবং কারো ইবাদতও করে না । না নিস্প্রাণ মূর্তির , না জীবিত মূর্তির , আল্লাহ ছাড়া।
মুশরিক তারা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে প্রভাব সৃষ্টিকারী মনে করে এবং তাঁকে ছাড়া অন্যকে মানে ; কোন কোন সময় তারা ইবাদত করে জিনিসের , কোন কোন সময় শক্তিশালীকে মেনে চলে , কোন কোন সময় তারা তাদের নিজের শরীরী আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার দাস হয় এবং কোন কোন সময় তিনটিরই দাসত্ব করে।91
ইসলামের দৃষ্টিতে এ তিন ধরণের শিরকের সবক’ টিই অপরাধমূলক এবং একত্ববাদের বাস্তবতা অর্জনে এ শিরকসমূহকে অবশ্যই মুছে ফেলতে হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো , সবচেয়ে বিপজ্জনক শিরক হচ্ছে শেষেরটি , যা হলো শরীরী আকাঙ্ক্ষার অনুসরণ। এ ধরণের শিরক বুদ্ধিবৃত্তিক ও অনুভূতিমূলক বোধ এর পথে বাধা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় ধরণের শিরকের ভিত্তি।
) أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ(
“ তুমি কি তাহলে তাকে দেখেছো যে নিজের ইচ্ছাকে ইলাহ হিসেবে নিয়েছে। আল্লাহ (তাকে এমন) জেনেই তাকে পথভ্রষ্টতায় ফেলে রেখেছেন এবং মোহর মেরে দিয়েছেন তার শ্রবন শক্তিতে এবং তার অন্তরে এবং তার দৃষ্টি শক্তির উপর পর্দা দিয়ে দিয়েছেন। কে তাহলে তাকে পথ দেখাবে আল্লাহর পর ? তোমরা কি তাহলে সতর্কবাণী গ্রহণ করবে না।” (সূরা জাসিয়াঃ 23)
এ কারণে হযরত শেইখ নফসের মূর্তিকে একত্ববাদের জন্য সবচাইতে ক্ষতিকর হিসেবে দেখতেন এবং বলতেন :“ সমস্ত সমস্যা ঐ বড় মূর্তির কারণে যা তোমার ভিতরেই আছে।” 92
বড় সাধক ও অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ ইমাম খোমেইনীও (রহঃ) বলেছেন :“ সকল মূর্তির মা হচ্ছে তোমার নিজের নফসের মূর্তি ; যতক্ষণ না এই বড় মূর্তি ও শক্তিশালী শয়তান চূর্ণ বিচূর্ণ হয় তাঁর দিকে কোন পথ পাওয়া যাবে না। মনে রেখো এ মূর্তিকে চূর্ণ বিচূর্ণ করা ও এ শয়তানকে বশে আনা কঠিন কাজ!!” 93
যদি মানুষ এ বড় মূর্তির উপর বিজয়ী হয় সে সর্বোচ্চ বিজয় লাভ করেছে।
তোমার নফসের সাথে কুস্তি করো
হযরত শেইখের সময়ের এক বিখ্যাত কুস্তিগীর‘ আসগার আগা পাহলোয়ান’ বর্ণনা করেছেন :“ একবার আমাকে হযরত শেইখের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। তিনি আমার বাহুতে হালকা থাপ্পর দিয়ে বললেন :“ যদি তুমি সত্যিই চ্যম্পিয়ন হয়ে থাকো নিজের নফসের সাথে কুস্তি লড়ো!”
প্রকৃতপক্ষে নফসের মূর্তি ধ্বংসই শিরক মোছার এবং একত্ববাদের বাস্ত-বতা লাভ করার জন্যপ্রথম ও শেষ পদক্ষেপ ।
‘ নিজের নফসকে পায়ের তলে ফেলো এবং মাশুককে জড়িয়ে ধরো’
‘ তাঁর সাথে মিলনের কাবা পর্যন্ত , যা থেকে তুমি এক পা দূরে। যদি তুমি নিজের নফস থেকে মুক্ত হতে পারো তবে তুমি মাশুকের সাথে মিলিত হবে ; নয়তো চির জীবন জ্বলবে , কেননা তোমার অবস্থা অপরিপক্ক।’
আর হয়তো আল্লাহকে পাওয়ার এ পথকে নিকটতম বলা হয়েছে এ জন্য যা আবু হামযা সুমালী বলেন ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) বলেছেন :
“ যে তোমার (আল্লাহর) পথে এগোচ্ছে ,সে দূরত্ব অল্প” 94
এবং হাফেয শিরাযী বলেছেন :‘ যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি দেখো পান্ডিত্য ও জ্ঞান , তুমি ঐশী জ্ঞান থেকে বঞ্চিত। আমি তোমাকে একটি কথা বলছি , নিজেকে খেয়াল করো এবং তুমি মুক্ত হয়ে যাবে।’
একটি কথা বলার জন্য ভ্রমণ
মনে হয় হযরত শেইখকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো কেরমানশাহতে যাওয়ার জন্য এবং এক বিরাট ব্যক্তিত্ব সরদার কাবুলীকে উপরের কথাটি বলার জন্য।
আয়াতুল্লাহ ফাহরী মরহুম কুদসীর উদ্ধিৃতি দেন যে তিনি বলেছেনঃ‘ এক বছর হযরত শেইখ কেরমানশাহ এলেন। তিনি একদিন আমাকে বললেন তার সাথে সরদার কাবুলীর বাড়িতে যেতে। আমরা গেলাম। আমি হযরত শেইখকে মরহুম সরদার কাবুলীর সাথে পরিচয় করে দিলাম। কিছু সময় নিঃশব্দে পার হয়ে গেলো এর পর সরদার কাবুলী বললেনঃ“ হযরত শেইখ! কিছু বলেন যেন আমরা উপকৃত হই। হযরত শেইখ বললেনঃ‘ আমি তাকে কী বলবো যে তার নিজের শিক্ষা ও অর্জিত জ্ঞানের উপর বেশী ভরসা করে আল্লাহর অনুগ্রহের চাইতে।’
মরহুম কাবুলী চুপচপ বসে ছিলেন , কয়েক মুহূর্ত পর তিনি তার পাগড়ী খুলে নিলেন এবং তা মাটিতে রেখে দিলেন এবং তার মাথা দেয়ালে ঠুকতে লাগলেন এত জোরে যে আমি তার জন্য করুণা বোধ করলাম এবং এগিয়েছিলাম তাকে থামানোর জন্য , কিন্তু হযরত শেইখ আমাকে তা করতে দিলেন না।’
তিনি বলেনঃ“ আমি তার কাছে এসেছিলাম শুধু এ কথাটি তাকে বলে ফিরে যাওয়ার জন্য”
আল্লাহর কাছে হাজার বার ক্ষমা চাও
হযরত শেইখের এক সন্তান বলেছেন :
“ এক ভারতীয় ব্যক্তি যার নাম ছিলো হাজ্ব মোহাম্মদ। তিনি ইরানে আসতেন প্রতি বছর এক মাস থাকার জন্য। একবার তিনি মাশহাদে যেতে ট্রেন থেকে নামলেন নামায পড়ার জন্য। যখন ট্রেন প্রায় ছেড়ে দেয়ার সময় হলো তার বন্ধুরা তাকে ডাকলো উঠবার জন্য নয়তো তাকে পিছনে ফেলে ট্রেন চলে যাবে। হাজ্ব মোহাম্মাদ তার বন্ধুদের ডাকে কোন সাড়া দিলেন না এবং তার মানসিক শক্তি দ্বারা ট্রেন আধা ঘন্টা আটকে রাখলেন। যখন তিনি মাশহাদে ফিরলেন হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করলেন এবং শেইখ বললেন :
“ আল্লাহর কাছে এক হাজার বার ক্ষমা চাও!”
“ কেন ? -হাজ্ব মোহাম্মদ বললেন।
শেইখ উত্তর দিলেন :
“ তুমি একটি অন্যায় কাজ করেছো”
হাজ্ব আবার জিজ্ঞেস করলেন :
“ কী অন্যায় ? আমি ইমাম রেজা (আঃ) এর মাযার যিয়ারত করেছি এবং আপনার জন্যও দোয়া করেছি।”
হযরত শেইখ বললেন :“ তুমি সেখানে ট্রেনকে আটকে রেখেছিলে , এ ইচ্ছা দেখাবার জন্য যে তুমি এমন ব্যক্তি যার জন্য ---- । দেখ শয়তান তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে , তোমার এ কাজের কোন অধিকার ছিলো না।”
ব্যক্তিত্ব ভক্তি ও শিরক
একত্ববাদ ও বহুত্ববাদ (শিরক) এর মাঝে সীমারেখাটি খুব চিকন ও সুক্ষ্ম এবং প্রায় দেখাই যায় না। নবী (সঃ) বলেছেন :“ নিশ্চয়ই , শিরক অন্ধকার রাতে কালো পাথরের উপরে একটি পিপড়ার চলার চাইতে বেশী অ-অনুভবযোগ্য।” 95
একমাত্র সমূন্নত এবং অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা লুকোনো শিরকের সীমারেখা দেখতে সক্ষম ও সে বিষয়ে সতর্ক করতে সক্ষম।
ব্যক্তিত্ব ভক্তি এক ধরণের লুকোনো ও সুক্ষ্ম শিরক যাতে অনেক লোকই জড়িয়ে পরে। যদি ব্যক্তিত্বের প্রতি মনোযোগ ও আনুগত্য আল্লাহর জন্য না হয় তাহলে ব্যক্তিত্ব যত বড়ই হোক তা শিরক হিসাবে বিবেচিত হবে। এ কারণে হযরত শেইখ বলতেনঃ
“ যদি তোমরা আমার কারণে আমার কাছে এসে থাকো তা হলে তোমাদের অনেক ক্ষতি হবে।”
“ তোমার বাবা যেন কোন মূর্তিতে পরিণত না হয়”
বিখ্যাত ফকিহ ও মারজা মরহুম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ হাদী মিলানী (রঃ) এর ছেলে হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ আলী মিলানী তার বাবার সাথে হযরত শেইখের সাক্ষাতের ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেন :
“ মরহুম রজব আলী খাইয়্যাত , যাকে আল্লাহ অন্তর্দৃষ্টি দান করেছিলেন তার আত্মসংযম ও গুনাহ পরিত্যাগ করার কারণে , কিছু কিছু লোককে আন্তরিকতা ও খোদা প্রেম প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তিনি আমার বাবার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। আমি তার সাথে সাক্ষাত করতাম প্রায়ই আমাদের পুরোনো বন্ধুত্বের জন্য এবং কিছু কিছু সময় তার বৈঠক খুব উপভোগও করতাম , যেখানে তিনি সত্য সন্ধানকারীদের ধর্মপোদেশ দিতেন কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে এবং পবিত্র আহলুল বায়েত (আঃ) দের হাদীস থেকে।
এক বছর তিনি মাশহাদে এলেন ইমাম রেজা (আঃ) এর মাযার যিয়ারতে এবং মাযারের কাছেই এক হোটেলে উঠলেন। আমার মরহুম বাবা তাকে দাওয়াত করলেন দুপুরের খাবারের জন্য । হযরত শেইখ আমাদের বাসায় এলেন এবং আমার বাবা তার সাথে সাক্ষাত পেয়ে খুবই খুশী হলেন এবং তারা পরস্পরের সাথে কথা বললেন সন্ধ্যা পর্যন্ত। সেই সাক্ষাতেই হযরত শেইখ আমার দিকে ফিরে বললেনঃ“ সতর্ক হও যেন তোমার বাবা মূর্তি না হয়ে দাঁড়ায়।”
এবং আমার বাবাকে বললেন :
“ আপনার সন্তানের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন যেন সে আপনাকে সমস্যায় ফেলে না দেয়।”
আমার মনের মধ্যে উঁকি দিলো যে কোন ব্যক্তি পৃথিবী ও আখেরাত দু’ টোই পেতে পারে কি না। হযরত শেইখ হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বললেন : এ দোয়াটি বেশী বেশী পাঠ করো-
) رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ(
“ হে আমাদের রব! আমাদের লাভ দিন এ দুনিয়াতে ও লাভ দিন আখেরাতে।”
আমি তার সাথে হোটেল পর্যন্ত গেলাম , সেখানে হায়দার আগা মুজিযা (কবি) হযরত শেইখের কাছে এলেন এবং তাকে পরদিন দুপুরে খাবারের জন্য দাওয়াত দিলেন। হযরত শেইখ তার দাওয়াত প্রথমে গ্রহণ করলেন না কিন্তু সে বারংবার বলতে থাকায় শেষ পর্যন্ত রাজী হলেন। এরপর হায়দার আগা আমার বাবার কাছে গেলেন এবং তাকেও দাওয়াত দিলেন। শেষে আমার বাবার সাথে আমি সে বাড়িতে গেলাম এবং দেখলাম হযরত শেইখ এবং তার সাথের আরো দু’ ইজন ভ্রমণকারী সেখানে ইতোমধ্যেই উপস্থিত হয়েছেন। সেদিন আমাদের বৈঠক চললো সন্ধ্যা পর্যন্ত।
কীভাবে একত্ববাদের বাস্তবতায় পৌঁছানো যায়
এখন প্রাথমিক প্রশ্ন হচ্ছে :
“ কীভাবে একজন নিজেকে শিরক থেকে মুক্ত করবে এবং নফসের মূর্তিকে ধ্বংস করবে , লুকানো ও প্রকাশ্য শিরককে উপড়ে ফেলে একত্ববাদের ভিত্তি অর্জন করবে ?
হযরত শেইখ উত্তর দিয়েছেন এইভাবে :
“ আমার মতে যদি কেউ মুক্তির রাস্তা খোঁজে এবং চায় প্রকৃত পূর্ণতা এবং উপভোগ করতে চায় একত্ববাদের অর্থ তাদের চারটি জিনিস করা উচিতঃ
প্রথমত , নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি , (যিকর)
দ্বিতীয়ত , আহলুল বায়েত (আঃ) এর উপর নির্ভরতা ,
তৃতীয়ত , রাত্রে অনুনয় করা (দোয়া ও নামায) এবং
চতুর্থত , অন্যের উপকার করা।
হযরত শেইখের ওপরের মতামতের ব্যাখ্যা পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আসছে।
তৃতীয় অধ্যায়
আত্মগঠনের অমোঘ ওষুধ
আত্মগঠন ও সমৃদ্ধির অমোঘ ওষুধ হচ্ছে প্রেম। সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রেম সব নৈতিক কদর্যতা থেকে পুরোপুরি আরোগ্য করে এবং সব ভালো গুণ প্রেমিককে দান করে। প্রেমের অমোঘ ওষুধ আশেককে মাশুকের প্রতি এতই বিমোহিত করে ফেলে যে আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুর সাথে এর সর্ম্পক ছিন্ন হয়ে যায়।
আশেকদের মোনাজাতে ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) বলেন :
‘ হে আমার ইলাহ , কে আছে যে আপনার প্রেমের মিষ্টতা লাভ করেছে এরপর অন্যকে চেয়েছে আপনার জায়গায় ? কে আপনার সাথে ঘনিষ্ট হয়েছে এরপর আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চেয়েছে ?96 প্রেম মোহিতকারী এবং যখন তা সত্তায় প্রবেশ করে , তা মাশুক ছাড়া সবকিছুর প্রতি দরজা বন্ধ করে দেয়।’
ইমাম সাদিক (আঃ) থেকে একটি হাদীসে বলা হয়েছে :
“ যখন আল্লাহর প্রতি প্রেমের জ্যোতি কোন নিবেদিত ব্যক্তির অন্তরে জ্বলজ্বল করে , তা তাকে তার সব চিন্তা থেকে মুক্ত করে ; আল্লাহকে স্মরণ ছাড়া সবকিছুই অন্ধকার। আল্লাহ প্রেমিক আল্লাহর দাসদের মধ্যে সবচেয়ে আন্তরিক , কথায় সবচেয়ে সত্যবাদী এবং শপথ ও অঙ্গীকারে সবচেয়ে বিশ্বস্ত।”
বিচ্ছিন্নতার প্রথম ধারায় শরীরী আকাঙ্ক্ষার নফস মারা যায় এবং যুক্তি নির্ভর জীবন শুরু হয় এবং এর উচ্চতম ধাপে অন্তরের চোখ আলোকিত হয় আল্লাহর সাথে মিলনের আলোতে এবং মানুষ অর্জন করে একত্ববাদের সর্বোচ্চ স্থান যা‘ উলুল ইলম’ এর মাক্বাম। আমরা মোনাজাতে শাবানিয়াতে পড়ি :
“ হে আমার ইলাহ! আপনার দিকে ছাড়া আমাকে বিচ্ছিন্ন করুন সব দিক থেকে এবং আমাদের অন্তরের চোখকে আলোকিত করুন আপনার দিকে তাকিয়ে থাকার আলো দিয়ে।” 97
প্রকৃত উজ্জীবিতকারী ওষুধ
আল্লাহ প্রেম যে প্রকৃত উজ্জীবীতকারী ওষুধ তা উল্লেখ করে হযরত শেইখ একটি আনন্দদায়ক ঘটনা বর্ণনা করেন :“ একবার আমি রসায়নের বিশেষ জ্ঞান খোঁজ করছিলাম ; আমি আত্ম -সংযম অনুশীলন করলাম একটি সময় পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি পথের শেষে উপস্থিত হলাম কোন লাভ ছাড়াই। তখন একটি আধ্যাত্মিক অবস্থায় আমাকে এই আয়াতটি জানানো হলো :
) مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْعِزَّةَ فَلِلَّهِ الْعِزَّةُ جَمِيعًا(
“ যদি কেউ সম্মান ও ক্ষমতা চায় তাহলে সমস্ত সম্মান ও শক্তি আল্লাহর।” (সূরা ফাতির-10)
আমি বললাম আমি রসায়নের বিশেষ জ্ঞান খোঁজ করছি। আমাকে এলহামের মাধ্যমে বলা হলো :
“ তারা রসায়ন চায় সম্মান ও ক্ষমতার জন্য ; সম্মান ও ক্ষমতার বাস্তবতা হচ্ছে এ আয়াতে।” এতে আমার মন শান্ত হয়ে গেলো।
বেশ কিছুদিন পর দু’ ব্যক্তি (আত্ম সংযম পালনের পর) আমার বাসায় এলো এবং আমার সাক্ষাত চাইলো। যখন দেখা করলাম তারা বললোঃ
‘ দু’ বছর ধরে আমরা চেষ্টা করছি রসায়নের বিশেষ জ্ঞান লাভের জন্যে কিন্তু ফল পাই নি। আমরা হযরত ইমাম রেজা (আঃ) এর কাছে আবেদন করলাম তিনি আমাদেরকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন।’
হযরত শেইখ তাদের উপরোক্ত ঘটনাটি উল্লেখ করে বললেনঃ
“ আমি স্থায়ী ভাবে (এ উচ্চাশা থেকে) তা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম। রসায়নের বাস্তবতা হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন।”
কোন কোন সময় হযরত শেইখ উপরোক্ত রায়ের (সিদ্ধান্তের) পক্ষে দোয়ায়ে আরাফাহ থেকে নীচের অংশ আবৃত্তি করে শোনাতেনঃ
“ যে আপনাকে পায়নি (জানেনি) সে কী পেয়েছে ? এবং যে আপনাকে পেয়েছে সে কী পায় নি ?”
ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) আল্লাহ প্রেমের উজ্জীবনী ওষুধের কথা দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাকের শেষ দিকে এসে উল্লেখ করেছেনঃ
“ আমার জন্য আপনার প্রেমের দিকে একটি মসৃণ পথ খুলে দিন এবং আমার জন্য আপনার এ পৃথিবী ও পরকালের কল্যাণ সম্পূর্ণ করুন।” 98
হাফিয খুব সুন্দরভাবে তার গযলে এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেনঃ
“ হে নির্বোধ! চেষ্টা করো অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন হতে।
তুমি নেতা হতে পারবেনা , যদি না তুমি [নিজেই প্রথমে] পথে সন্ধানকারী হও।
সত্যের বিদ্যালয়ে এবং প্রেমের শিক্ষকের সাহায্যে চেষ্টা করো
হে বৎস , একদিন বাবা হওয়ার জন্য।
তোমার অস্তিত্বের জামা পরিত্যাগ করো ঐ লোকদের মত যারা পথের উপরে আছে।
যেন তুমি প্রেমের ওষুধ আবিষ্কার করো এবং তাকে সোনায় পরিণত করো যদি তোমার অন্তরে ও সত্তায় প্রেমের আলো জ্বলে উঠে আল্লাহর ক্বসম তুমি আকাশের সূর্যের চাইতে বেশী উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।”
হযরত শেইখের শ্রেষ্ঠ শিল্প
হযরত শেইখের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ও কৌশল ছিলো তার“ প্রেমের ওষুধ।” এর অনুশীলনে তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ এবং নিঃসন্দেহে এর সুস্পষ্ট প্রকাশ এই কথায় :
) يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ(
“ যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালোবাসবে।” (সূরা মায়েদাহঃ 54)
এবং
) وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ(
“ কিন্তু যারা বিশ্বাসী তারা আল্লাহর ভালোবাসায় উপচে পড়ে।” (সূরা বাকারাঃ 165)
যেই তার কাছে আসতো সেই কোন না কোনভাবে প্রেম সূধা উপভোগ করতেন। হযরত শেইখ বলেছেনঃ
“ আল্লাহর প্রেম হচ্ছে দাসত্বের শেষ ধাপ। প্রেমে মোহাচ্ছন্ন হওয়ার চাইতে বেশী। মোহাচ্ছন্ন হওয়া আকস্মিক বিষয়। কিন্তু প্রেম হচ্ছে অপরিহার্য ; মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তি মাশুক থেকে সরে যেতে পারে কিন্তু প্রকৃত প্রেমিক এরকম নয়। যদি মোহাচ্ছন্ন ব্যক্তির মাশুক প্রতিবন্ধী হয় অথবা তাদের গুণ হারায় তাদের মোহাচ্ছন্নতা হারাতে পারে কিন্তু একজন মা তার প্রতিবন্ধী ছেলেকেও ভালোবাসে।”
তিনি বলতেনঃ
তিনি তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ
“ কাজের মূল্যায়নের মানদণ্ড হচ্ছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি প্রেমের পরিমাণ।”
“ যে প্রেমের বীজ বপন করে নি সে পূর্ণতার একটি শস্য দানাও লাভ করবে না।”
শিরিন ও ফরহাদ
কোন কোন সময় হযরত শেইখ শিরিন ও ফরহাদের কাহিনী তার শিষ্যদের কাছে উল্লেখ করতেন রুপক হিসেবে বোঝানোর জন্যঃ
‘ গাইতির প্রত্যেক আঘাতের সাথে ফরহাদ শিরিনকে স্মরণ করতো।’
“ তোমরা যাই করো তোমাদের এ অবস্থা থাকা উচিত কাজটি শেষ হওয়া পর্যন্ত ; তোমাদের সব চিন্তা ও স্মরণ হবে আল্লাহর জন্য , নিজের জন্য নয়।”
‘ মাশুকের জন্য লিখো’
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেনঃ
“ আমি এক ট্রেডিং কোম্পানীতে সে ক্রে টারী ছিলাম। একদিন হযরত শেইখ আমার কাছে এলেন এবং বললেনঃ
“ কার জন্য তুমি এ সব নোটবুকে লিখছো ?”
আমি বললাম ,‘ আমার মনিবের জন্য’ । তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ
‘ তুমি যদি তোমার নাম লিখো এ বইগুলোতে , তোমার মনিব কি কোন আপত্তি করবে
আমি উত্তর দিলামঃ অবশ্যই তিনি (আপত্তি) করবেন।
এর পর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ
‘ যে কাপড় তুমি মাপজোক করছো , কার জন্য মাপছো ? তোমার জন্য নাকি তোমার মনিবের জন্য।’
আমি বললামঃ‘ তার (আমার মনিবের) জন্য’ ।
তিনি তখন জিজ্ঞেস করলেনঃ
“ তুমি কি বুঝেছো ?”
আমি বললাম ,‘ না’ ।
এরপর তিনি বললেনঃ
“ গাইতির প্রত্যেক আঘাতের সাথে সাথে ফরহাদ বলতোঃ‘ আমার প্রিয়তম শিরিন!’ এবং সে শিরিনের নাম ছাড়া কোন কিছু বলতো না। তাই তুমিও লেখো এ বইগুলোতে মাশুকের ভালোবাসায়! কাপড় মাপো তাকে স্মরণ করে! ফলে এ সব কিছু মিলনের দিকে প্রথম পদক্ষেপ। এমনকি তোমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসকে অবশ্যই হতে হবে তার স্মরণে।”
‘ আল্লাহর কোন ক্রেতা নেই!’
আল্লাহর জন্য ক্রে তা খুঁজতে হযরত শেইখ বলতেন :
“ ইমাম হুসাইন (আঃ) এর যত ক্রে তা আছে ; হয়তোবা এরকমই অন্যান্য ইমাম (আঃ) দের বেলায়ও আছে ; কিন্তু আল্লাহর জন্য আছে খুব অল্প সংখ্যক ক্রে তা! আমি আল্লাহর জন্য করুণা বোধ করি এত অল্প ক্রে তা থাকায়। খুব কমই আসে বলতেঃ আমি আল্লাহকে চাই ; আমি আল্লাহর সাথে পরিচিত হতে চাই।”
কোন কোন সময় তিনি বলতেন :“ যখন তোমরা আল্লাহর প্রয়োজন অনুভব করো , তিনি তোমাদের প্রেমে পড়ে আছেন!”
হাদীসে ক্বুদসীতে আছে :
“ হে আদমের সন্তান! আমি তোমাকে ভালোবাসি তাই তুমি আমাকে ভালোবাসো।” 99
আরো একটি হাদীসঃ
“ আমার দাস! আমি আমার অধিকারের কসম দেই যে আমি তোমাকে ভালোবাসি , তাই , ভালোবাসো আমাকে তোমার উপরে আমার অধিকারের মাধ্যমে।” 100
মাঝে মধ্যে তিনি বলতেনঃ
“ ইউসুফ দেখতে সুন্দর কিন্তু তার কথা চিন্তা করো যে ইউসুফকে সৃষ্টি করেছে , সমস্ত সৌন্দর্য তাঁর।”
“ এই পৃথিবীতে কেউ ইউসুফের চেয়ে সুন্দর কিছু দেখে নি
(পরম) সৌন্দর্য তাঁর যিনি ইউসুফকে সৃষ্টি করেছেন।” 101
‘ প্রেমের শিক্ষা দাও’
হযরত শেইখের এক শিষ্য বর্ণনা করেনঃ
মরহুম শেইখ আহমদ সাইদী যিনি একজন প্রখ্যাত মুজতাহিদ এবং মরহুম আগা বোরহানের102 ‘ খারিজ’ (পি , এইচ ,ডি) শিক্ষার শিক্ষক ছিলেন , তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ
‘ তুমি কি তেহরানের কোন দর্জিকে চেনো যে আমার জোব্বা বানিয়ে দিতে পারে ?’
আমি হযরত শেইখকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম।
কিছু দিন পর তিনি আমাকে দেখার সাথে সাথে বললেনঃ
‘ তুমি আমাকে কী করেছো ? কোথায় পাঠিয়েছিলে আমাকে ?’
আমি বললামঃ‘ কেন ? কী হয়েছে ?’
তিনি বললেনঃ‘ আমি যেই ভদ্রলোকের কাছে গেলাম যাকে তুমি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলে আমার একটি জোব্বা বানিয়ে দেয়ার জন্য , তিনি আমার মাপ নেয়ার সময় আমাকে আমার কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম আমি একজন তালাবা (মাদ্রাসার ছাত্র)। তিনি বললেনঃ
“ আপনি কি পড়েন না কি শিক্ষা দেন ?”
আমি উত্তর দিলাম , আমি শিক্ষা দেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন , আমি কী শিক্ষা দেই। আমি বললাম আমি‘ খারিজ’ (পি , এইচ ,ডি) স্তরে শিক্ষা দেই। তিনি একমত হয়ে মাথা দোলালেন এবং বললেনঃ“ তা ভালো , কিন্তু শিক্ষা দিন প্রেমের শিক্ষা!”
তার এ কথা আমাকে একেবারে একজন নুতন মানুষে পরিবর্তন করে ফেললো ; এটি আমার জীবনকে পরিবর্তন করে ফেললো।’
এ ঘটনার পর মরহুম সাইদী হযরত শেইখের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং তার বৈঠকে উপস্থিত হতেন। আমার জন্য দোয়া করতেন কারণ তাকে আমি হযরত শেইখের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম।
“ মথ103 (এক ধরনের প্রজাপতি) থেকে প্রেম শেখো!”
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন যে তিনি বলেছেন :
“ এক রাতে আমি ব্যস্ত ছিলাম মোনাজাতে এবং মাশুকের কাছে দোয়া ও অনুনয় করাতে। আমি খেয়াল করলাম এর মধ্যে এক মথ হারিকেনটির দিকে এগিয়ে এলো এবং একে বার বার ঘিরে উড়তে থাকলো এবং এক সময় এর দেহের একপাশ হারিকেনে আঘাত করলো এবং পড়ে গেলো। কিন্তু ,সেটি মরে গেলো না। অনেক কষ্টে তা নড়া চড়া করলো এবং আবার হারিকেনের দিকে উড়ে এলো এবং আঘাত করলো হারিকেনকে তার দেহের অন্য পাশটি দিয়ে। এবার সে তার জীবন দিয়ে দিলো। এ ঘটনা আমার ভিতরে ঐশী প্রেরণার সৃষ্টি করলোঃ‘ হে অমুক! প্রেম শেখো এ পোকাটির কাছ থেকে ; কোন কপটতা অথবা কোন দাবী করা যেন তোমার ভেতরে না থাকে। প্রেম ও ভালোবাসার সত্য এ পোকাটি পূর্ণ করেছে।’ আমি এ অদ্ভূত দৃশ্য থেকে অনেক কিছু শিখলাম এবং আমার (আধ্যাত্মিক) জীবন সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেলো।”
আল্লাহ প্রেমের মৌলিক শত
সর্বশক্তিমান আল্লাহকে জানার মৌলিক শর্ত হলো‘ তাঁকে জানা’ 104 । এটি প্রায় অসম্ভব যে , কেউ আল্লাহকে জানবে অথচ তার প্রেমে পড়বে নাঃ
‘ যদি তুমি তাকে (ইউসূফকে) দেখো এবং বলতে পারো কমলা ও (এর খোসা খুলতে ব্যস্ত) তোমার হাতের পার্থক্য তাহলে জুলাইখাকে তিরষ্কার করা হবে অনুমোদনযোগ্য।’
ইমাম হাসান আল মুজতাবা (আঃ) বলেন :
‘ যে আল্লাহকে জানে সে তাঁকে ভালোবাসে।’ 105
হযরত শেইখ বলেনঃ
“ প্রধান বিষয় হলো যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর বিষয়ে অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জন না করে সে (তাঁর) প্রেমে পড়বে না। যদি সে জ্ঞান অর্জন করে সে দেখতে পায় সব ভালো আল্লাহর মাঝে জমা আছে।
) آللَّهُ خَيْرٌ أَمَّا يُشْرِكُونَ(
“ কে ভালো ? আল্লাহ না কি মিথ্যা ইলাহরা যা তারা শরীক করে (তাঁর সাথে)।” (সূরা নামল-59)
এরকম হলে এটি সম্ভব নয় যে সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দিকে মনোযোগ দিবে।”
পবিত্র কোরআনে দুটি দলের উল্লেখ রয়েছে যাদের মহিমান্বিত সর্বশক্তিমান আল্লাহ সম্পর্কে অতিন্দ্রীয় জ্ঞান আছে- একটি ফেরেশতাদের দল ও অপরটি যারা‘ জ্ঞানপ্রাপ্ত’ ।
) شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ(
“ কোন ইলাহ নাই আল্লাহ ছাড়া। এটি আল্লাহর , তাঁর ফেরেশতাদের এবং জ্ঞানপ্রাপ্তদের সাক্ষ্য।” (সূরা আলে ইমরান-18)
প্রথম দলটি তার জ্ঞানের মিষ্টতা ও তাঁর প্রেমের তৃষ্ণা নিবারণকারী পেয়ালার স্বাদ পেয়েছে বলে ইমাম (আঃ) উল্লেখ করেছেনঃ
“ এরপর মহিমান্বিত আল্লাহ তার আকাশগুলোতে থাকার জন্য এবং তার রাজ্যের উচ্চতর স্তরগুলোতে বসবাস করার জন্য নুতন ধরণের প্রাণী সৃষ্টি করলেন , যেমন ফেরেশতা- তাঁর ইবাদাতে নিয়োজিত থাকার কারণে তারা অন্যান্য দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে এবং বিশ্বাসের বাস্তবতা তাদের সাথে ও তাঁর জ্ঞানের সাথে সংযোগ তৈরী করেছে। তাঁর প্রতি তাদের বিশ্বাস তাদেরকে তাঁর প্রতি মনোযোগী করেছে। তারা কোন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করে না , তাঁর কাছে যা আছে তা ছাড়া। তারা তাঁর জ্ঞানের মিষ্টতার স্বাদ পেয়েছে এবং তাঁর প্রেমের তৃষ্ণা নিবারণকারী পেয়ালা থেকে পান করেছে” ।106
অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জন
অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জনের কোন পথ নেই অন্তরের আয়না থেকে অনুচিত কাজগুলোর দাগ মুছে ফেলা ছাড়া। আবু হামযা সুমালী বর্ণিত এক দোয়ায় ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) বলেছেন :
“ আপনার সন্ধানকারী আপনার নিকটেই আছে। আপনি আপনার সৃষ্ট প্রাণী থেকে দূরে নন , যদি না (তাদের অনুচিত) কাজগুলো আপনাকে আড়াল করে রাখে তাদের কাছ থেকে।” 107
আল্লাহ পর্দায় ঢাকা নন। আমাদের নিজেদের কাজ তাঁকে আমাদের কাছ থেকে আড়াল করে রাখে , যদি অপ্রীতিকর কাজগুলোর পর্দা অন্তর থেকে সরিয়ে ফেলা যায় তা মহিমান্নিত আল্লাহর রাজকীয় সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করবে এবং তার প্রেমে পড়বে।
‘ মাশুকের সৌন্দর্য পর্দামুক্ত ও উম্মুক্ত হয়েছে , তোমার পথের উপর ধূলাকে নেমে যেতে দাও যেন তাঁর সৌন্দর্য দেখতে পাও।’
পথের উপরে ধূলোকে নেমে যেতে দিতে ও অন্তরকে অশোভন কাজ থেকে পরিস্কার করতে অন্তরকে অবশ্যই দুনিয়ার ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে , কারণ দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসাই সব অহংবোধ ও খারাপের উৎস।
আল্লাহর প্রেমের পথে চোরাই গর্ত
আল্লাহর প্রেমের পথে প্রকৃত চোরাই গর্ত হচ্ছে দুনিয়ার প্রেম। হযরত শেইখের শিক্ষা অনুযায়ী যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহর জন্য পৃথিবী চায় এটি হবে প্রাথমিক পদক্ষেপ তাঁর সাথে মিলনের। আর যদি তা হয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্যে তাহলে তা হবে তাঁর ভালোবাসার পথে চোরাই গর্ত । সেক্ষেত্রে পৃথিবীতে হালাল ও হারাম এর কোন পার্থক্য থাকবে না। অবশ্য পৃথিবীর হারাম উপার্জন ও আনন্দ মানুষকে আল্লাহর কাছ থেকে আরো বেশী দূরে নিয়ে যায়।
মুহাম্মাদ (সাঃ) বলেছে :
‘ পৃথিবীর ভালোবাসা ও আল্লাহর ভালোবাসা একটি ক্বলবে কখনো জমা হয় না।’ 108
ইমাম আলী (আঃ) এ বিষয়ে বলেছেন :
‘ যেভাবে সূর্য ও রাত মিলিত হয় না সেভাবে আল্লাহর ভালোবাসা ও পৃথিবীর ভালোবাসা মিলিত হয় না।’ 109
অন্য একটি হাদীসে তিনি বলেন :
“ কীভাবে একজন ব্যক্তি আল্লাহ প্রেমের দাবী করে অথচ পৃথিবীর প্রেম তার অন্তরে বাসা বেঁধেছে।” 110
হযরত শেইখ তার উদাহরণগুলোতে সব সময় পৃথিবীকে ডাইনী বুড়ির সাথে তুলনা করতেন এবং মাঝে মাঝে তার কোন শিষ্যের দিকে ফিরে বলতেনঃ“ আমি দেখছি তুমি ডাইনী বুড়ির কারণে জটিলতায় পড়েছো!”
তারপর তিনি হাফিযের এ কবিতাটি বর্ণনা করতেন :
‘ কেউ নেই ঐ বৃত্তাকার জালে জড়িয়ে পড়ে নি।
কে আছে যার পথে এরকম পরীক্ষার ফাঁদ বিছানো নেই ?
প্রকৃতপক্ষে হযরত শেইখ তুলনাটি এ হাদীস থেকে দিয়েছেন :
“ এ পৃথিবীর বাস্তবতাকে দেখানো হয়েছিলো ঈসা (আঃ) কে। তিনি এটিকে দেখলেন এক বৃদ্ধা হিসাবে যে তার সব দাঁত হারিয়েছে এবং তার গায়ে ছিলো সব ধরনের অলংকার। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
‘ তোমার কতজন স্বামী আছে ? সে বললো :‘ আমি গুনি নি !’ তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন :‘ তোমার সব স্বামী কি মারা গেছে না তারা তোমাকে তালাক দিয়েছে ?’ সে উত্তর দিলো :‘ না , বরং আমি তাদের সকলকে হত্যা করেছি!’ ঈসা (আঃ) বললেন :‘ দূর্ভোগ তোমার ভবিষ্যত স্বামীদের প্রতি যারা তোমার অতীত স্বামীদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নি ; কীভাবে তুমি তাদের প্রত্যেককে হত্যা করেছো এবং তারা তোমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়নি।” 111
হযরত শেইখ বার বার বলতেন :
‘ যারা আমার কাছে আসে তারা ঐ ডাইনী বুড়ির112 খোঁজে আসে। কেউ এখানে এটি বলার জন্য আসে না যে , আমার আল্লাহর সাথে ভালো সম্পর্ক নেই , আমাকে তাঁর সাথে মিলিয়ে দিন।’
দুনিয়া লোভী মানুষের অভ্যন্তরীণ চেহারা
হযরত শেইখ যিনি মানুষের গভীরতম চেহারা দেখতে পেতেন। তিনি তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বলতেন :
“ যারা পৃথিবীকে অবৈধ পন্থায় চায় তাদের ভিতরের চেহারা কুকুরের মত। যারা আখেরাত চায় তাদের চেহারা নিরপেক্ষ এবং যারা আল্লাহকে চায় তারা পৌরুষদীপ্ত।”
আল্লাহ প্রকাশকারী অন্তর
হযরত শেইখ বলেছেন :
“ অন্তর ইঙ্গিত দেয় সে কী চায়। চেষ্টা করো যেন তোমার অন্তর আল্লাহকে ইঙ্গিত করে! মানুষ যা চায় তার ছবি তার অন্তরে প্রতিফলিত হবে , যেন যারা ঐশী জ্ঞানে জ্ঞানী তারা তার অন্তর দেখে বুঝতে পারে বারযাখে সে কোন অবস্থায় থাকবে। যদি তারা কারোর বাইরের সৌন্দর্য দেখে মোহাচ্ছন্ন হয় অথবা অর্থ ও সম্পদে খুব আগ্রহী থাকে তাহলে তারা বারযাখে সেই আকার লাভ করবে যে জিনিস তারা পৃথিবীতে ভালোবাসতো।”
“ তুমি কী করেছো ?”
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :
এক রাতে আমি নারীঘটিত আনন্দদায়ক স্বপ্ন দেখলাম। যা আমার মনে সারা দিন ঘুরতে লাগলো। পর দিন সকালে আমি হযরত শেইখের সাক্ষাতে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি আবৃত্তি করলেন :
“ যদি মনে করো তোমার বন্ধুর সাথে মেলা মেশা বন্ধ করবে না তাহলে (প্রেমের) সূতোতে ধরে থাকো যেন তিনিও তা ধরে রাখেন। হে অন্তর এমনভাবে জীবিকা অর্জন করো , যেন যদি তোমার পা পিছলে যায় ফেরেশতারা তোমাকে রক্ষা করবে দোয়ার দু’ হাত দিয়ে।’
আমি বুঝলাম যে তিনি কিছু অনুভব করেছেন। তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করবেন না উদ্দেশ্য ছাড়া। আমি কিছুক্ষণ বসে রইলাম। হযরত শেইখ সেলাইতে ব্যস্ত ছিলেন। আমি বললাম :“ এতে কোন কিছু আছে (আপনি যা বলতে চান) ?” তিনি বললেন :“ তুমি কী করেছো যে তোমার চেহারা মেয়েদের মত হয়ে গেছে ?”
আমি বললাম আমি স্বপ্নে এক সুন্দর মহিলা দেখেছি এবং এর স্মৃতি আমার ভিতর রয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন :“ হ্যা সেটাই! আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও!”
“ আমি তোমার মাঝে কী দেখছি ?!”
হযরত শেইখের এক ভক্ত বলেন :
আমি একবার হযরত শেইখের সাথে দেখা করতে বাড়ি থেকে বের হলাম। পথে আমি একজন বোরখাবিহীন মহিলাকে দেখলাম যে আমার মনোযোগ কাড়লো। আমি হযরত শেইখের বাড়িতে গেলাম এবং তার পাশে বসলাম। তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন :
“ হে অমুক! আমি তোমার মাঝে কী দেখছি ?!”
আমি মনে মনে বললাম :‘ ইয়া সাত্তারাল উয়ুব (হে ত্রুটি গোপনকারী)!’
হযরত শেইখ মুচকি হাসলেন এবং বললেন :
“ তুমি কী করেছো যে আমি যা দেখছিলাম তা চলে গেলো ?!”
পুরুষ যারা মহিলায় পরিণত হলো!
ডঃ হাজ্ব হাসান তাওয়াক্কুলি বর্ণনা করলেন : একদিন আমি ক্লিনিক (ডেন্টিষ্ট এর) থেকে বের হলাম কোথাও যাওয়ার জন্য , আমি একটি বাসে উঠলাম এবং যখন তা ফেরদৌসী স্কোয়ারে এসে থামলো , কিছু লোক বাসে উঠলো এবং তখন আমি দেখলাম ড্রাইভার একজন মহিলা এবং আমি আরো দেখলাম সবাই মহিলা। তাদের সবার চেহারা এক ও একই পোষাক! আমি দেখলাম আমার পাশেও এক মহিলা বসে আছে। আমি নিজেকে সরিয়ে নিলাম এবং ভাবলাম আমি ভুল বাসে উঠে পড়েছি। এটি হয়তো মহিলা কর্মচারীদের বাস সার্ভিস। বাসটি থামলো এবং একজন মহিলা নেমে গেলো। মহিলা যখন নেমে গেলো (বাসের) সবাই পুরুষে পরিণত হয়ে গেলো।
যদিও আমি প্রথমে হযরত শেইখের কাছে যাওয়ার ইচ্ছা করি নি কিন্তু বাস থেকে নেমে আমি হযরত শেইখের কাছে গেলাম। আমি কিছু বলার আগেই হযরত শেইখ বললেন :
“ তুমি সব পুরুষকে মহিলা হয়ে যেতে দেখেছো! যেহেতু সবার মনোযোগ কেড়েছিলো ঐ মহিলা তাই সবাই মহিলাতে পরিণত হয়েছিলো!”
তখন তিনি আরো বললেন :
“ মৃত্যুর সময় ব্যক্তি যে দিকে মনোযোগ রাখবে তাই তার চোখের সামনে বাস্তবে পরিণত হবে। আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) সম্পর্কে ভালোবাসা নাজাতের দিকে নিয়ে যাবে।”
“ কতই না সুন্দর আল্লাহর সৌন্দর্যে নিমজ্জিত হওয়া-
যাতে তুমি এমন কিছু দেখো যা অন্যরা দেখে না ও এমন কিছু শোন যা অন্যরা শোনে না।”
“ টেবিলটি কী ?”
ডঃ সুবাতি বললেন : সাইয়্যেদ জাফর নামে একজন মূচি ছিলেন । যিনি এখন মৃত। তিনি বলেছেন :
‘ একবার আমার বাসায় একটি বড় টেবিল ছিলো যা রাখার মত ভালো কোন জায়গা আমি পাই নি এবং ভাবছিলাম তা নিয়ে কী করি। সন্ধ্যা রাতে আমি বৈঠকে গেলাম এবং আমাকে দেখার সাথে সাথেই হযরত শেইখ নীচু স্বরে বললেন অন্তরের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে :
“ এটা কিসের টেবিল যা তুমি ওখানে রেখেছো”
মূচি সাইয়্যেদ জাফর হঠাৎ বুঝতে পারলেন হযরত শেইখ কী বোঝাচ্ছেন ; তিনি হাসলেন এবং বললেন :
“ হযরত শেইখ! ওটা রাখার মত কোন জায়গা আমি পাইনি তাই তা এখানে রেখেছি!!”
ঐশী রহস্য অর্জন করা
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যে প্রাথমিকভাবে , ঐশী রহস্য অর্জন করার জন্য যে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন তা হলো আল্লাহ সম্পর্কে জানা।
তিনি বলতেন :
“ যতক্ষণ আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছুর প্রেম অন্তরে তিল পরিমাণ থাকবে ঐশী রহস্যের কোন কিছু অর্জন অসম্ভব!”
“ আল্লাহ ছাড়া আর কিছু চেওনা!”
হযরত শেইখ দু’ জন ফেরেশতা থেকে শিখেছেন যে‘ তিনি যেন আল্লাহ ছাড়া আর কিছু না চান।’ তার এক শিষ্য বলেন যে হযরত শেইখ বলেছেন :
এক রাতে দু’ জন ফেরেশতা দু’ টি কথার মাধ্যমে আমাকে (আল্লাহর একত্বে) ফানাহ হওয়া সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। আর কথা দু’ টি হলো :
“ নিজের সম্পর্কে কিছু বলবেন না এবং আল্লাহ ছাড়া কিছু চাইবেন না!” 113
একইভাবে তিনি বলেছেন :
“ সচেতন হও , গোটা সৃষ্টি তোমাদের জন্যই। আল্লাহ ছাড়া আর যা কিছু চাও তা তোমার ব্যর্থতার (নিদর্শন) ।”
বুদ্ধি ও নফসের মাক্বাম
হযরত শেইখ বলেছেন : যদি মানুষ বুদ্ধির মাক্বামে থাকে সে কখনো ইবাদাত বন্দেগী পরিত্যাগ করবে না , আল্লাহর অবাধ্যতায় গুনাহ করবে না এবং হাদীস অনুযায়ী :
(বুদ্ধি হলো তা যা দিয়ে দয়ালু খোদার ইবাদাত করা হয় এবং যার মাধ্যমে বেহেশত অর্জন করা যায়)114 এ ধাপে সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু খোঁজে , যেমন- বেহেশত। কিন্তু যখন সে রুহের ধাপে পৌঁছে , এ আয়াত অনুযায়ী-
) وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي(
“ এবং তার ভিতরে আমি রুহ ফুঁকে দিয়েছি” (সূরা আল হিজর-29)
সে শুধু সত্যের দিকে তাকাবে এবং দ্বিতীয় কবিতাটির প্রমাণ হয়ে যায়ঃ
‘ জনগনের রোজা হচ্ছে পান ও আহার থেকে বিরত থাকা নির্বাচিতদের রোজা হচ্ছে সব ধরণের গোনাহ থেকে বিরত থাকা তার রোজা হচ্ছে বন্ধু (আল্লাহ) ছাড়া সব কিছু থেকে বিরত থাকা যা সে চায় সব তাঁরই জন্য।’
এবং কবি হাফিয বলেছেন :
“ যদি বেহেশত আমাকে দেয়া হয় কীভাবে আমি তা গ্রহণ করবো যেহেতু আমার দৃষ্টিতে‘ বন্ধু’ (আল্লাহ) বেহেশত থেকে উত্তম।”
ভালোবাসার উপর ভিত্তি করে ইবাদাত
আল্লাহকে সন্ধান করার চরম পর্যায়ে মানুষ আল্লাহর ইবাদাত করে ভালোবাসার কারণে , জান্নাত লাভ বা জাহান্নামের ভয়ে নয়। ইমাম সাদিক (আঃ) তার নিজের ইবাদাত সম্পর্কে বলেন :
“ সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহর ইবাদাত করে মানুষ তিন দলে : একদল তার ইবাদাত করে পুরস্কারের জন্য যা লোভীদের ইবাদাত এবং তা সম্পদের লোভ ; অন্য দলটি তাঁর ইবাদাত করে জাহান্নামের ভয়ে যা দাসদের ইবাদাত এবং তা ভীতি ; কিন্তু আমি সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহর ইবাদাত করি প্রেমে ও ভালোবাসায় যা মর্যাদাবানদের ইবাদাত এবং তা নিরাপত্তার উৎস। কারণ সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ বলেন :
“ এবং তারা সেদিনের ভয় থেকে মুক্ত।” (সূরা নামল-89)
এবং সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহ আরও বলেন :
‘ বলো , যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সূরা ইমরান- 31)
“ এভাবে যে সর্বশক্তিমান ও মহিমান্বিত আল্লাহকে ভালোবাসে , তিনিও তাকে ভালোবাসবেন এবং যাকে সর্বশক্তিমান ও মহিমান্নিত আল্লাহ ভালোবাসেন সে নিরাপদ থাকবে (বিচার দিনের আতংক থেকে)।” 115
হযরত শেইখ বার বার তার বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ করতেন সংগ্রাম করার জন্য যেন তারা আল্লাহর জ্ঞান লাভে এ অবস্থা অর্জন করে যেখানে আল্লাহর প্রেম ছাড়া আর কোন কিছু তাদের ইবাদাতে উদ্বুদ্ধ না করে।
সবকিছু নিজের জন্য , এমনকি আল্লাহও
হযরত শেইখ বলতেন :
‘ হে মানুষ! কেন তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু দাবী করো ? তিনি ছাড়া অন্যের কাছ থেকে কী দেখেছো (পেয়েছো) ?116 তিনি যদি ইচ্ছা না করেন কোন কিছুই ঘটবে না ; এবং তোমাদের প্রত্যাবর্তন হচ্ছে তাঁর দিকে।’
‘ শহরে চিনি [লাভজনক লক্ষ্য] আছে।
কিছু পথ পরিক্রমণকারী বাজপাখীরা মাছি শিকার করে সন্তষ্ট!’ 117
তোমরা আল্লাহকে ছেড়ে দিয়েছো অন্যের কারণে! কেন তোমরা নিজের চারিদিকে ঘুরছো ?! আল্লাহকে খোঁজ এবং প্রত্যেক দাবীকে একটি প্রস্তুতি বানাও তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। সমস্যা হলো আমরা সব চাই এমনকি আল্লাহকেও নিজের জন্য!”
ধার্মিকতার সর্বোচ্চ স্তর
হযরত শেইখ ধার্মিকতার স্তর সম্পর্কে বলতেন :
“ ধার্মিকতার বিভিন্ন স্তর রয়েছে ; একদম নীচের স্তর হলো ওয়াজিব পালন করা এবং হারাম এড়িয়ে চলা , যা ঠিক আছে , এবং তা কিছূ লোকের জন্য যথপোযুক্ত ; কিন্তু সর্বোচ্চ ধার্মিকতা দাবী করে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুকে এড়িয়ে চলা , আর তাহলো অন্তরে কোন কিছুকে মূল্য না দেয়া একমাত্র আল্লাহর প্রেম ছাড়া।”
প্রেমের বিদ্যালয়
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন মানুষ মনুষত্বের চরম শিখরে পৌঁছতে পারবে না , যদি না সে অন্তরকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দিক থেকে ফিরিয়ে না নেয়। যদি সে সংগ্রামও করে তার আত্মপূর্ণতা অর্জনের জন্য , তাহলে সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। এভাবে , যদি কেউ হযরত শেইখের কাছে পথ পাওয়ার জন্য আসতো তার আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলতেন :
‘ তুমি কাজ করেছো ফলাফল লাভের আশায়। অথচ এটি ফলাফলের বিদ্যালয় নয় , এটি আল্লাহমুখী হওয়ার বিদ্যালয়।”
অন্তরের চোখ খোলা
মরহুম হযরত শেইখ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখেছিলেন যে অন্তরের চোখ ও কান খুলে যাওয়া এবং অদৃশ্যের রহস্য সম্মন্ধে জানা সম্ভব হবে পূর্ণ আন্তরিকতা ও আল্লাহমূখী হওয়ার মাধ্যমে। তিনি বলতেন :
“ যদি তোমরা তোমাদের অন্তর সম্পর্কে সতর্ক থাকো এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে এতে প্রবেশ করতে না দাও তাহলে তোমরা দেখতে সক্ষম হবে যা অন্যরা দেখতে সক্ষম নয় এবং শুনবে যা অন্যরা শুনতে অক্ষম।”
যদি মানুষ তার অন্তরের চোখকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের কাছ থেকে সরিয়ে রাখে তিনি তাকে জ্যোতি দান করবেন এবং তাকে ঐশী সত্তার মৌলিক বিষয়গুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিবেন।
যদি কেউ আল্লাহর জন্য কাজ করে তার অন্তরের চোখ খুলে যাবে।
“ বন্ধুরা! আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো তোমাদেরকে বধিরতা ও অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করার জন্য , যতক্ষণ মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু খোঁজ করবে সে বধির ও অন্ধ থাকবে!!”
ভিন্নভাবে বলা যায় হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয় সুস্থ একটি অন্তর ছাড়া। একটি পূর্ণ সুস্থ অন্তর হলো যেখানে সামান্যতম দুনিয়া প্রেম নেই এবং আল্লাহ ছাড়া কিছুই চায় না। ইমাম সাদিক (আঃ) সুস্থ অন্তর সম্পর্কে যা বলেন তার সাথে একথা সঙ্গতিপূর্ণ।
) مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ(
“ শুধু সে (সমৃদ্ধি লাভ করবে) যে আল্লাহর কাছে আনবে একটি সুস্থ অন্তর।” (সূরা শুআরা-89)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় পবিত্র ইমাম (আঃ) বলেন :
“ তা একটি হৃদয় যা নোংরা আকাঙ্ক্ষার ভালোবাসা থেকে পবিত্র।” 118
অন্য একটি হাদীসে ইমাম (আঃ) বলেন :
“ আত্ম -সমর্পিত এবং পবিত্র অন্তর হলো সেটি যা রবের সাথে মিলিত হয় , যখন এতে তিনি ছাড়া কেউ থাকে না এবং শিরক ও সন্দেহ আছে এমন প্রত্যেক অন্তর ত্রুটিযুক্ত [এবং অসুস্থ]।” 119
অন্তরের অভ্যন্তরীণ চেহারা
হযরত শেইখ বলেছেন : যখন কোন ব্যক্তিকে ভেতরের চোখ (অন্তরের চোখ) দেয়া হয় , যখনই সে তার অন্তরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেয় তার ভেতরের (বারযাখীর) অন্তর সেটারই রূপ ধারণ করে। যদি তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু দাবী কর , তোমার মূল্য হলো ততটুকু যা তুমি দাবী করেছো ; এবং যদি তুমি আল্লাহমূখী হও তোমার মূল্য অপরিসীম। যে আল্লাহর সাথে থাকবে আল্লাহ তার সাথে থাকবেন। যদি তুমি সব সময় আল্লাহতে নিমজ্জিত থাকো ঐশী জ্যোতি তোমার উপর জ্বলবে এবং যা তুমি ইচ্ছা কর তা তুমি দেখবে ঐশী আলোতে ।
যে অন্তরে সব কিছু উপস্থিত
হযরত শেইখ বলেছেন :
“ চেষ্টা করো তোমার অন্তরকে আল্লাহর জন্য স্থাপন করতে ; যখন তোমার অন্তর আল্লাহর জন্য হবে তখন তিনি সেখানে থাকবেন ; যখন তিনি সেখানে থাকবেন তখন যা কিছু তাঁর সাথে সম্পর্কীত তা সেখানে উপস্থিত থাকবে ; যখন তুমি ইচ্ছা করবে সব ইচ্ছা তোমার সাথে থাকবে কারণ আল্লাহ সেখানে আছেন , নবী ও আওলিয়াদের রুহও সেখানে থাকবে ; তুমি যদি চাও এমনকি মক্কা ও মদিনাও তোমার সাথে থাকবে। তাই চেষ্টা করো যেন অন্তর শুধু আল্লাহর জন্য হয় যেন যা কিছু আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তা তোমার কাছে উপস্থিত থাকে!”
যে মানুষ কারামত সংঘটিত করে
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যদি আল্লাহ প্রেম অন্তরে আধিপত্য করে এবং তা সত্য সত্যই আল্লাহ ছাড়া আর কিছু চায় না তাহলে মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধিতে পরিণত হবে এবং তার দ্বারা কারামত সংঘটিত হবে। এ সম্পর্কে তিনি বলেন :
“ যদি কোন কিছু অন্য কিছুর উপর আধিপত্য করে তাহলে প্রথমটি তার বৈশিষ্টগুলো দ্বিতীয়টির উপর দান করবে। যেমন , যখন আগুনে লোহাকে রাখা হয় কিছু সময় পরে আগুন লোহার ভিতরে প্রবেশ করবে এবং লোহাকে আগুনের মত জ্বলতে সক্ষম করে। বিষয়টি মানুষ ও তার সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই রকম।”
তিনি আরো বলেছেন :
“ আমরা অসাধারণ কিছু করি না , বরং আমরা খুঁজে নেই (তৈরী করি) সেই প্রকৃতি যা আল্লাহওয়ালা লোকদের থাকে। সব জিনিস মানুষকে দেয়া হয় রুহের মাধ্যমে। গরুর রুহ গরুর কাজ করে , মোরগের রুহ মোরগের কাজ করে। এখন আমাকে বলো , মানুষের খোদায়ি রুহ কি করবে ? ঐশী কাজইতো তাকে করতে হবে।”
) وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي(
“ তার ভিতরে আমার রুহ ফুঁকে দিলাম।” (সূরা হিজর-29)
এ আয়াতটি এ কথাটিই বলে।
অন্তর পরিষ্কার করা
আর এভাবে অতিন্দীয় জ্ঞান অর্জন করা যাবে না যদি অন্তরকে আল্লাহ প্রেম ছাড়া অন্য কিছু থেকে পবিত্র করা না হয় এবং মানুষ চরম পূর্ণতার অধিকারীর প্রেমে পড়বে না ঐশী জ্ঞান লাভের মাধ্যম ছাড়া। প্রধান সমস্যা হলো অন্তরকে দুনিয়াবী আকাঙ্ক্ষা থেকে পবিত্র করা সহজ কাজ নয়। কীভাবে অন্তরকে চেহারা মেক আপ করা‘ বুড়ির’ প্রেম থেকে মুক্ত করা যাবে ?
হযরত শেইখের মতে অন্তরকে পবিত্র করতে পারে ঐ একই জিনিস যা মানুষকে একত্ববাদের বাস্তবতা অর্জনে সাহায্য করে। যেমন আগের অধ্যায়ে উল্লেখিত বিষয় হলো :
1। নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি (যিকর )
2। আহলে বাইত (আঃ) এর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা
3। রাত্রে অনুনয় করা (দোয়া ও নামাযের মাধ্যমে)
4। অন্যের উপকার করা
আল্লাহকে ভালোবাসার পথ
হযরত শেইখ আল্লাহর কাছে যাওয়া120 ও তাঁকে ভালোবাসার জন্য‘ অন্যের উপকার করাকে’ বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহ প্রেমের মাধ্যম হচ্ছে তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা ও অন্য লোকের সেবা , বিশেষ করে নির্যাতিত ও যারা কষ্টের মধ্যে আছে।
নবী (সাঃ) বলেছেন :
“ জনগণ হচ্ছে আল্লাহর পরিবার ; আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হচ্ছে সে যে আল্লাহর পরিবারের কল্যাণকারী এবং যে তাদেরকে খুশী করে।” 121
অন্য একটি হাদীসে বলা হয় যে , নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলো :‘ কে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় ?’
নবী (সাঃ) উত্তর দিলেন :‘ যে জনগণের সবচেয়ে বেশি কল্যাণকারী।’ 122
আরেকটি হাদীসে বলা হয় যে নবী (সাঃ) কে মেরাজের পূর্ব মুহূর্তে বলা হয়েছিলো :
“ হে আহমদ (মুহাম্মাদ)! আমাকে ভালোবাসা হচ্ছে দরিদ্রদের ভালোবাসা , তাই দরিদ্রদের তোমার কাছে টানো এবং তাদের জমায়েতে যাও কারণ দরিদ্ররা আমার বন্ধু।” 123
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :
‘ হযরত শেইখের পরামর্শে আমি বেশ কয়েক বার নেকা শহরে (উত্তর ইরানে) গেলাম আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাক্ষাতে। আমি একবার বাস ষ্টেশনে যাচ্ছিলাম নাসির খসরু এভিনিউতে নেকার টিকেট কিনতে যখন হযরত শেইখের সাথে দেখা হলো , তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমি কোথায় যাচ্ছি , আমি বললাম :‘ নেকাতে’ আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাথে দেখা করতে। তিনি বললেন :
“ তার পদ্ধতি হলো আত্মসংযম ; আমার সাথে আসো আমি তোমাকে আল্লাহ প্রেমের পথ দেখাচ্ছি।”
এর পর তিনি আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন (বর্তমান) ইমাম খোমেনী (রঃ) এভিনিউতে যা তখন সূর্কিতে ঢাকা ছিলো এবং কিছু দূরে এক গলিতে গিয়ে এক দরজায় টোকা দিলেন। জরাজীর্ণ বাড়িটি ছিলো কয়েকজন দরিদ্র ও হতভাগ্য শিশু ও বয়স্ক লোকের আশ্রয়। তাদেরকে দেখিয়ে হযরত শেইখ বললেন :
‘ এদের মত দারুণ অভাবী লোকদের প্রয়োজন মিটানো একজনকে আল্লাহ প্রেমিক বানায়! এটিই তোমার শিক্ষা। আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির কাছে তুমি আত্মসংযমের শিক্ষা পেয়েছো কিন্তু এটি হলো প্রেমের শিক্ষা।’
‘ তখন থেকে দশ বছর পর্যন্ত হযরত শেইখ ও আমি শহরের ঐ জরাজীর্ণ বস্তিতে যেতাম অভাবীদের সাহায্য করতে ; হযরত শেইখ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাদেরকে আমার কাছে , আমি তাদের রসদ সরবরাহ করতাম।’
চতুর্থ অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের আন্তরিকতা
হযরত শেইখের শিষ্যদের প্রশিক্ষণে তার একটি প্রধান চিন্তা ছিলো এতে জোর দেয়া যে , শুধু বিশ্বাসে ও ইবাদাতেই আন্তরিকতা নয় , বরং সব কাজেই আন্তরিকতা রাখতে হবে। সব সময় তিনি জোর দিয়ে বলতেন :
“ সত্যিকার ধর্ম প্রচার হয় মিম্বার থেকে কিন্তু তবুও তাতে দু’ টো জিনিস কম থাকে : আন্তরিকতা ও আল্লাহ প্রেম। এ দু’ টোকে অবশ্যই প্রচারের বিষয়ে যুক্ত করতে হবে।”
সব কাজ আল্লাহর জন্য
হযরত শেইখের সবচেয়ে মূল্যবান ও শিক্ষণীয় বক্তব্য ছিলো :
“ সব কিছুই ভালো , কিন্তু (যদি তা হয়) আল্লাহর জন্য।”
কোন কোন সময় তিনি তার সেলাই মেশিনের দিকে ইশারা করে বলতেন :
“ এই সেলাই মেশিনের দিকে তাকাও! এর সব বড় ছোট যন্ত্রাংশগুলোতে প্রস্তুতকারীর মার্কা আছে----এটিই বোঝাচ্ছে এর সবচেয়ে ছোট নাটের মধ্যেও এর প্রস্তুতকারকের নাম রয়েছে। একজন বিশ্বাসীর সমস্ত কাজেও আল্লাহর নাম অবশ্যই থাকা উচিত।”
হযরত শেইখের বিদ্যালয়ে আধ্যাত্মিকতা সন্ধানকারী অবশ্যই কোন কিছু করার আগে ভাববে এটি অবৈধ কিনা , হলে আল্লাহর জন্য এড়িয়ে যাবে এবং যদি তা বৈধ হয় তা আল্লাহর জন্য করবে। তাকে এটিও দেখতে হবে যে তা তার শরীরী আকাঙ্ক্ষার জন্য আনান্দদায়ক কিনা। তাকে অবশ্যই শারীরী আকাঙ্ক্ষার জন্য প্রথমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং এরপর আল্লাহর জন্য কাজটি করতে অগ্রসর হবে।
আল্লাহর জন্য খাওয়া ও বিশ্রাম নেয়া
হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) হযরত আবু জার (রাঃ) কে যে উপদেশ দেনঃ“ হে আবু জার! তোমার উচিত সব কাজে পরিষ্কার নিয়ত রাখা , এমনকি (বৈধ) ঘুমে ও খাদ্য গ্রহণে।” 124
হযরত শেইখ সবসময় তার শিষ্যদের বলতেন :
“ তোমাদের সব কাজ যেন হয় আল্লাহর জন্য , এমনকি তোমাদের খাওয়া ও ঘুমানোও। যখন এক কাপ চা আল্লাহকে স্মরণ করে পান করবে তোমাদের অন্তরের ঐশী আলোতে উজ্জল হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি তা পান কর নিজেদের আকাঙ্ক্ষা তৃপ্ত করার জন্য এটি তাতে পরিণত হবে যা তোমরা চেয়েছিলে (আল্লাহ ছাড়া অন্যকিছু)।” 125
আয়াতুল্লাহ মাহদাভী কানী বলেছেন :
“ আমার তালাবা (মাদ্রাসার ছাত্র) হিসেবে পড়াশোনায় শুরুর দিকে , যখন আমি চোদ্দ বছর বয়সী ছিলাম , আমি একদিন চাইলাম নিজের জন্য একটি জামা বানাতে। মরহুম বোরহানের কাছ থেকে ধার করা কাপড়-চোপড় ফেরত দেয়ার পর।
আমি গেলাম এক ব্যক্তির কাছে যার নাম ছিলো শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত , সাথে কাপড় নিয়ে গেলাম বানানোর জন্য। তার কর্মশালা ছিলো তার বাড়িতেই প্রবেশদ্বারের পাশেই একটি কক্ষে। আমি একটু সময়ের জন্য বসলাম , তারপর হযরত শেইখ এলেন এবং বললেনঃ
‘ তুমি কী হতে চাও ?’
আমি উত্তর দিলাম :‘ একজন তালাবা।’ তিনি বললেন :“ তুমি কি তালাবা হতে চাও নাকি একজন মানুষ ?’
আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম যে একজন সাধারণ মানুষ একজন ধর্মীয় ছাত্রের সাথে এভাবে কথা বলছে। তিনি বলতে লাগলেন :‘ রাগ করো না! তালাবা হওয়া ভালো কিন্তু এর উদ্দেশ্য হলো (সত্যিকার) মানুষ হওয়া। আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি মনে রাখার জন্য ; তোমার ঐশী লক্ষ্যকে ভুলে যেও না। তুমি এখনো অল্প বয়সী আছো এবং এখনও (গুনাহর) দূষিত হয়ে যাও নি। যা কিছু তুমি কর চেষ্টা করো তা আল্লাহর জন্য করতে। এমনকি যখন তুমি সুস্বাদু খাবার খাও , তা খাও এ নিয়তে যে এর মাধ্যমে তুমি শক্তি অর্জন করবে ইবাদাতের জন্য এবং আল্লাহর পথে কাজ করবে। কখনোই এ উপদেশ তোমার জীবনে ভুলো না।”
আল্লাহর জন্য সেলাই করো
তিনি মূচীকে বলতেন :“ যখন তুমি একটি জুতা বানাও , প্রথমেই তা আল্লাহর কারণে বানাও এবং তা সুন্দর ও মজবুত করে সেলাই করো যেন তা দ্রুত ছিড়েঁ না যায় এবং দীর্ঘদিন টেকে।”
তিনি কোন দর্জিকে বলতেন :
“ যখন কোন কাপড় তুমি সেলাই কর , চেষ্টা করো তা আল্লাহর কারণে সেলাই করতে এবং মজবুত ভাবে।”
আল্লাহর জন্য আসো!
হযরত শেইখের এক শিষ্য আন্তরিকতার বিষয়ে তার পরামর্শ সম্পর্কে বলেন যে হযরত শেইখ বলেছেন :
“ যখন তোমরা আসো (শেইখের বাসায়) , আল্লাহর জন্য আসো ; যদি আমার জন্য আসো , তবে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে!”
তার মনের অবস্থা ছিলো বিস্ময়কর। তিনি লোকদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন নিজের দিকে নয়।
আগুনে ফুঁ দাও আল্লাহর জন্যে!
হযরত শেইখের এক সন্তান বলেন :
‘ শেইখ আব্দুল কারীম হামিদ আমার বাবার কারখানায় কাজের ছেলে ছিলেন। একদিন তিনি লোহার পাইপ দিয়ে আগুনে ফুঁ দিচ্ছিলেন পুরানো দিনের ইরানী লোহার পাইপ এর মাধ্যমে যা দিয়ে আগুন উস্কে দেয়া হতো , তখন আমার বাবা তাকে বললেন :
“ আব্দুল কারীম! তুমি কি জানো কিভাবে আগুনে ফুঁ দিতে হয় ?”
তিনি বললেন :
‘ না , জনাব , কীভাবে ফুঁ দিবো ? আমার বাবা বললেন :
‘ দু’ ঠোঁট পরস্পর চেপে ধরো এবং আল্লাহর জন্য ফুঁ দাও!’
তাদেরকে ভালোবাসো আল্লাহর জন্যে
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেছেন হযরত শেইখ তাকে ব্যক্তিগত বৈঠকে বলেছেন :“ তোমার মন ঘুরে বেড়াচ্ছে অমুক অমুক জায়গায় ; তা ঠিক আছে , কিন্তু তা যেন হয় আল্লাহর জন্য।”
একদিন আমি আমার এক বন্ধুকে নিয়ে হযরত শেইখের বাড়িতে গেলাম। হযরত শেইখ আমার বন্ধুর অন্তরের দিকে ইশারা করে বললেন :“ আমি সেখানে দু’ টো শিশু দেখছি ; তা ভালো , কিন্তু অন্তর হচ্ছে আল্লাহর ঘর। সন্তানের জন্য আগ্রহ অবশ্যই হতে হবে আল্লাহর জন্য।”
তিনি বললেন :
“ ধর্মীয় লোকদের কাজ সবই ভালো , কিন্তু তাদের‘ আমিত্ব’ কে‘ আল্লাহ’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে।”
আল্লাহর কারণে চুমু দাও
আয়াতুল্লাহ ফাহরী হযরত শেইখের আন্তরিকতা সম্পর্কে পরামর্শ এভাবে বর্ণনা করেন :
“ তিনি সব সময় যে কথাটি ব্যবহার করতেন তা হচ্ছে আল্লাহর জন্য কাজ করো।” তিনি এ কথাটি এতো বেশী উচ্চারণ করতেন যে‘ আল্লাহর জন্য কাজ করো’ কথাটি তাদের নীতি বাক্য হয়ে দাঁড়ালো। একজন মাহুত যেমন হাতীর মাথায় বার বার আঘাত করে হাতুড়ি দিয়ে তেমনি হযরত শেইখ তার শিষ্যদের মনকে আঘাত করতেন‘ আল্লাহর জন্য কাজ করো’ কথাটি দিয়ে!”
তিনি নিজের ও অপরের উদাহরণ দিতেন এ বিষয়ে এ শিক্ষা রপ্ত করার জন্য। সব অবস্থায় তিনি সবাইকে জোর দিতেন আল্লাহর জন্য কাজ করতে। তিনি বলতেন :
“ আল্লাহ তোমাদের জীবনের সমস্ত কাজে যেন উপস্থিত থাকেন। এমনকি যখন তুমি রাতে ঘরে ফেরো ও স্ত্রীকে চুমু দাও , তাকে চুমু দাও আল্লাহর কারণে!”
যারা হযরত শেইখের বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছে তারা তার এ উপদেশ পালনের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মাক্বাম ও অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জন করেছে ।
তুমি আল্লাহর জন্য কী করেছো ?
হযরত শেইখের এক সন্তান নীচের ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন :
একদিন আমার বাবা ও আমি বিবি শাহারবানু পাহাড়ে গেলাম। পথে আমরা এক সাধকের সাক্ষাত পেলাম এবং আমার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
“ আপনার আত্ম -সংযমের ফল কী পেয়েছেন ?”
সাধক নীচু হয়ে মাটি থেকে একটি পাথর তুললেন । পাথরটি একটি নাশপাতিতে পরিণত হলো এবং তিনি আমার বাবাকে তা খেতে দিলেন এই বলে :
‘ নিন খান!’
আমার বাবা একবার তার দিকে তাকালেন এবং বললেন :
“ এটি আপনি আমার জন্য করেছেন , আমাকে বলুন আপনি আল্লাহর জন্য কী করেছেন ?!”
একথা শুনে সাধক কেঁদে ফেললো!
দূর্ভোগ আমার প্রতি , দূর্ভোগ আমার প্রতি
হযরত শেইখের এক শিষ্য যিনি তার সাথে ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন বলেন যে হযরত শেইখ তাকে বলেছেন :
‘ আমি এক আধ্যাত্মিক লোকের রুহকে দেখলাম বারযাখে যে ইরানের বড় একটি শহরে বাস করতো , সে নিজেকে নিয়ে আফসোস করছিলো তার উরুতে থাপ্পর দিয়ে এবং এই বলে :‘ দূর্ভোগ আমার প্রতি! আমি (পৃথিবী থেকে) বের হয়ে এসেছি পরিশুদ্ধ ও আন্তরিক কোন আমল হাতে না নিয়ে!’
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে কেন এমন করছে। সে বললো :“ আমি আমার জীবনে এক ব্যবসায়ীর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম যে আমাকে তার কিছু আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। আমি তার কাছ থেকে যখন বিদায় নিলাম আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি সাধনা করবো যেন আমিও অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করতে পারি , অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং‘ বারযাখ’ ও অদৃশ্য জগত দেখার জন্য। আমি ত্রিশ বছর আত্ম -সংযম অনুশীলন করলাম সফল হওয়ার আগে। তখন মৃত্যু আমার দরজায় টোকা দিলো। এখন (বারযাখে) তারা আমাকে বলছে :‘ তুমি ঐ আধ্যাত্মিক লোকের সাথে সাক্ষাত করার আগ পর্যন্ত শরীরী আকাঙ্ক্ষায় গা ভাসিয়েছিলে এবং এর পর তোমার জীবনের ত্রিশ বছর কাটিয়েছো অতিন্দ্রীয় জ্ঞান অর্জন এবং বারযাখের দৃশ্য দেখার জন্য। এখন বলো শুধুমাত্র আমাদের জন্য তুমি কী করেছো ?!”
আল্লাহর জন্য ভালো হওয়া
সমকালের একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি যিনি নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার উপর একজন প্রফেসর বলেন :
“ আমি হযরত শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম দেখতে তিনি আমার সম্পর্কে কী ভাবেন। তিনি উত্তর দিলেন :‘ আগা হাজ্ব শেইখ! তুমি ভালো হতে চাও নিজের জন্য কিন্তু আল্লাহর জন্য ভালো হও!”
যিয়ারতে যাও আল্লাহর জন্য!
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :‘ একবার আমি হযরত শেইখকে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি ইমাম রেজা (আঃ) এর মাযারে , মাশহাদে একত্রে যেতে রাজী আছেন কি না।’
তিনি বললেন :‘ আমার নিজে থেকে কোন অনুমতি নেই (কিছু করার)!’ প্রথমে তার উত্তর আমার কাছে অদ্ভূত লাগলো যে কিভাবে আবার তার যিয়ারতে অনুমতি নেই। কিছু সময় পরে আমি জানতে পারলাম যে একজন সাধকের কোন ব্যক্তিগত মতামত নেই , আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া এবং তার কাজ আল্লাহর অনুমতি ও সম্মতি সাপেক্ষে হয়।
পরে ইমাম রেজা (আঃ) এর প্রতি আন্তরিকতা সম্পর্কে কথা উঠলো। হযরত শেইখ এ সম্বন্ধে বললেন :
“ যদি আমরা যাই আল্লাহর জন্য এবং অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া আর কোন কিছু না থাকে হযরত ইমাম (আঃ) এ যিয়ারতকে গ্রহণ করেন বিশেষ আনুকূল্যে। ইমাম রেজা (আঃ) এর মাযার যিয়ারতে একবার আমার আর কোন ইচ্ছা ছিলো না একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া। পবিত্র ইমাম (আঃ) আমার প্রতি এমন অনুগ্রহ করেছিলেন যে চরম বিস্ময় বিমুগ্ধ হয়ে গেলাম। যদি এ অনুগ্রহ ভাষায় প্রকাশ করা যেতো তাহলে আমি বলতাম তা কেমন অনুভূত হয়েছিলো। যা হোক , যদি তোমরা চাও এ দয়া ও অনুগ্রহ অনুভব করতে তাহলে তোমাদের পবিত্র করতে হবে , তখন দেখতে সক্ষম হবে আমি যা দেখেছি!”
আন্তরিকতার পুরস্কার
হযরত শেইখ এই শব্দগুচ্ছ বার বার ব্যবহার করতেন তার কথায় :
“ যে আল্লাহর সাথে থাকবে , আল্লাহ তার সাথে থাকবেন।” 126
যে পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর জন্য কাজ করে , আল্লাহ তার জন্য থাকবেন। এছাড়া বলতেন :
“ তোমরা আল্লাহর জন্য হয়ে যাও , তিনি এবং তাঁর ফেরেশতারা তোমাদের জন্য হয়ে যাবেন।”
কোন কোন সময় বলতেন :
“ যদি কোন মানুষ সেভাবে কাজ না করে , এমনকি এ সম্পর্কে কথা বলাও ব্যক্তির আধ্যাত্মিকতার উপরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
ঐশী পথ নির্দেশনা
হযরত শেইখ মনে করতেন বিশেষ ঐশী পথ নির্দেশনা আন্তরিকতার বিশেষ পুরস্কার। নিচের আয়াতকে তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করতেন :
) وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا(
“ এবং যারা আমাদের পথে সংগ্রাম করে আমরা অবশ্যই তাদের পথ দেখাবো।” (সূরা আনকাবুত-69)
“ যদি তোমরা আল্লাহর জন্য দাঁড়িয়ে যাও , সমস্ত বিশ্ব জগতের সম্পদ তোমাদের পথ দেখাবে এবং সমর্থন করবে। যেহেতু তাদের পরিপূর্ণতা তোমাদের সাথে মিশে যাবার মধ্যে নিহিত তাই তারা পূর্ণতা লাভের জন্য প্রকৃতিগতভাবে যে সব জিনিসের তারা অধিকারী তা দিয়ে দিতে চায় । যদি মানুষ আল্লাহর জন্য দাঁড়িয়ে যায় অস্তিত্ববান সমস্ত প্রাণী তার জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে তাদের কাছে যা আছে তাকে উপহার দেয়ার জন্য এবং তার পথপ্রদর্শক হওয়ার জন্য।”
হযরত শেইখ মনে করতেন আন্তরিকতার সর্বোচ্চ স্তর বিশেষ ঐশী পথনির্দেশনা লাভের জন্য খুবই জরুরী যা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বিশেষ প্রশিক্ষণ। তা হলো এই যে , মানুষের আর কোন লক্ষ্য থাকবে না , তার সব প্রচেষ্টা হবে একমাত্র সর্বশক্তিমানের সন্তুষ্টি ছাড়া ; এমনকি সে নিজের সম্পূর্ণতা লাভও উপেক্ষা করবে।127 তিনি এ সম্পর্কে বলেন :
“ যতক্ষণ মানুষ তার নিজের সম্পূর্ণতায় (কামালিয়াত) খেয়াল রাখবে সে‘ সত্য’ লাভ করবে না। মানুষের অধীনে যত উপায় ও উপকরণ রয়েছে তার সবগুলো আল্লাহকে পাওয়ার পথে ব্যয় করবে। সে ক্ষেত্রে সর্বশক্তিমান আল্লাহ মানুষকে তাঁর নিজের জন্য প্রশিক্ষণ দিবেন।”
কাজে আল্লাহর সুবাস
হযরত শেইখ বলেন :
যখন তুমি আল্লাহকে জানবে , যা-ই তুমি করবে তা হওয়া উচিত একমাত্র প্রেম ও আন্তরিকতা থেকে। এমনকি নিজের সম্পূর্ণতার দিকেও খেয়াল করবে না কারণ শরীরী নফস খুবই চালাক ও সুক্ষ্ণ এবং নিজেকে (মানুষের পবিত্র চিন্তার উপর) চড়াও করাতে নাছোড়বান্দা।
যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ নিজেকে চাইবে এবং নিজের দিকে মনোযোগ দিবে তার কাজ হবে রসকষহীন এবং ঐশী লক্ষ্যে নয়। যা হোক , যখন সে আত্ম -কেন্দ্রিকতা পরিত্যাগ করে এবং আল্লাহমূখী হয়ে যায় তখন তার কাজগুলো ঐশী রং ধারণ করে এবং তার কাজে ঐশী সুবাস পাওয়া যায় ; এবং সেটির একটি ইঙ্গিতও আছে ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর কথায় :
“ আপনার প্রেমের সুবাস কতইনা সুন্দর।” 128
শয়তানকে পরাজিত করা
আল্লাহর জন্য কাজ করার রহমত হলো শয়তানকে পরাজিত করতে পারা। হযরত শেইখ বলেন :
যে আল্লাহর জন্য উঠে দাঁড়ায় সে মুখোমুখি হবে শরীরী নফসের ও তার সাথের পচাত্তরটি সৈন্যদলের বিরুদ্ধে এবং শয়তানও তার সৈন্যসহ উঠে দাঁড়ায় তাকে ধ্বংস করার জন্য , কিন্তু“ আল্লাহর সৈন্য বাহিনীই বিজয়ী।”
বুদ্ধি পচাত্তরটি সৈন্যবাহিনী দিয়ে তৈরী। সেও আত্ম -নিবেদিত ইবাদাতকারীকে পরাজিত হতে দেবে না :
) إِنَّ عِبَادِي لَيْسَ لَكَ عَلَيْهِمْ سُلْطَانٌ(
“ অবশ্যই , তোমার কোন ক্ষমতা থাকবে না আমার আন্তরিক ইবাদাতকারীদের উপর।” (সূরা হিজর-42)
“ যদি তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুতে আগ্রহী না হও , শরীরী নফস ও শয়তান তোমার উপর কোন ক্ষমতা রাখবে না ; বরং তারা তোমার কাছে পরাভূত হবে।”
তিনি আরও বলেন :
“ পরীক্ষা রয়েছে প্রত্যেক নিঃশ্বাসে। তোমার দেখা উচিত তা ঐশী উদ্দেশ্যে নেয়া , নাকি তা শয়তানি ইচ্ছার সাথে মিশ্রিত।”
অন্তরের চোখ খোলা
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যতক্ষণ মানুষ আল্লাহ ছাড়া অন্যদিকে মনোযোগী এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কিছু চাইছে সে প্রকৃতপক্ষে একজন মুশরিক এবং তার অন্তর শিরকে দূষিত। তিনি উল্লেখ করতেন কোরআনের এ আয়াত :
) إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ(
‘ অবশ্যই মুশরিকরা অপবিত্র ও নোংরা।’ (সূরা তাওবাহ-28)
যতক্ষণ পর্যন্ত অন্তর শিরকের ধূলামাখা থাকবে , মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত অস্তিত্বের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে জানবে না।
এরপর শেইখ বলেছেন :“ যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মনোযোগ আল্লাহ ছাড়া অন্য দিকে থাকবে সে অস্তিত্বের বহির্ভাগে পর্দাবরণে থাকবে এবং সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ চেহারা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে।”
‘ হে হাফিয , তুমিই পথের পর্দা , সরে যাও!
আনন্দিত সে যে এ পথে পর্দাবরণ মুক্ত।’
যাহোক , যদি মানুষ তার অন্তরকে শিরকের ধূলা থেকে পবিত্র করে সৃষ্টি জগতের রহস্য তার কাছে আমানত রাখা হবে। হযরত শেইখ বলেন :
“ যদি কেউ আল্লাহর জন্য কাজ করে তবে তার অন্তরের চোখ খুলে যায়। যদি তুমি তোমার অন্তরের বিষয়ে সতর্ক থাকো এবং এতে আল্লাহ ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে না দাও তুমি দেখতে সক্ষম হবে যা অন্যরা দেখতে অক্ষম এবং তা শুনবে যা অন্যরা শুনতে অক্ষম।” 129
বস্তুগত ও আত্মিক নেয়ামত
পবিত্র কোরআন বলে , যদি কেউ এ পৃথিবীর জীবনের প্রতি লালায়িত থাকে তাহলে আল্লাহর কাছে রয়েছে এ পৃথিবীর পুরস্কার ও আখেরাতের চির পবিত্র জীবন :
) مَنْ كَانَ يُرِيدُ ثَوَابَ الدُّنْيَا فَعِنْدَ اللَّهِ ثَوَابُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ(
“ যে এই পৃথিবীর জীবনে পুরস্কার চায় তাহলেতো (তার জানা উচিত) আল্লাহর কাছে রয়েছে এই পৃথিবীর জীবনের পুরস্কার ও আখেরাতের পুরস্কার।” (সূরা নিসা-134)
অন্য কথায় সর্বশক্তিমান আল্লাহই সব ; যে আল্লাহকে পেয়েছে তার সবই আছে।130 হযরত শেইখের এক ভক্ত বলেন : হযরত শেইখ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমার পেশা কী। আমি বললাম আমি একজন কাঠমিস্ত্রী। তিনি বললেন :“ তুমি কি তারকাটায় হাতুড়ি ঠোক আল্লাহর স্মরণ রেখে , না কি টাকার কথা স্মরণ রেখে ?! যদি তুমি টাকার স্মরণে আঘাত করো তাহলে তুমি শুধু টাকাই পাবে , কিন্তু যদি তুমি আল্লাহর স্মরণে আঘাত করো তাহলে টাকা ও আল্লাহর সাথে মিলন দু’ টোই পাবে।” 131
আমি তাদের শিক্ষা দিয়েছি আল্লাহর জন্য
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন যে তিনি বলেছেন :
“ এক বিরাট জনতা আয়াতুল্লাহ বরুজারদীর (রঃ) জানাযায় অংশ নিলো এবং তা এক বিশাল অনুষ্ঠানে পরিণত হলো। আমি আধ্যাত্মিক অবস্থায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম তাকে কীভাবে এত বড় সম্মান দেয়া হচ্ছে। তিনি উত্তরে বললেন : আমি সব তালাবাকে আল্লাহর জন্য শিক্ষা দিতাম।”
আল্লাহ আমাদের সমস্যা দেখলেন
হযরত শেইখের এক ভক্ত বলেন হযরত শেইখ বলেছেন :“ আমার ছেলেকে ডাকা হলো বাধ্যতামূলক মিলিটারী সার্ভিসে। আমি তার সাথে যেতে চাইলাম এ সমস্যার সমাধান করতে যখন এক দম্পতি এলো আমার কাছে তাদের বিরোধ মিটাতে সাহায্য করতে। তাই আমি রয়ে গেলাম তাদের সমস্যা সমাধান করতে। দুপুরের পর আমার ছেলে বাসায় ফিরলো এবং বললো :
“ মিলিটারী গ্যারিসনের কাছে যাওয়ার পর আমার এমন মাথা ব্যাথা শুরু হলো যে আমার মাথা ফুলে গেলো। (গ্যারিসনের) ডাক্তার আমাকে পরীক্ষা করলেন এবং আমাকে পরীক্ষা করে মিলিটারী সার্ভিস থেকে বাতিল বলে ঘোষণা দিলেন। গ্যারিসন ছেড়ে আসার সাথে সাথে আমি সামান্য ব্যাথা ও ফোলার চিহ্নও পেলাম না।”
হযরত শেইখ আরো বললেন :
“ আমরা (আমি) অন্য লোকের সমস্যা সমাধান করতে অগ্রসর হলাম এবং আল্লাহ আমাদের সমস্যার সমাধান করলেন।”
পঞ্চম অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের যিকর
হযরত শেইখের কিছু মূলনীতি ছিলো , তিনি বিভিন্ন সময় তার উপর জোর দিতেন। যদিও সেসব নীতিমালা হাদীস থেকে নেয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হযরত শেইখের সে বিষয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
এ ঐশী ব্যক্তিত্ব ও সৎকর্মশীল লোকের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে যে তার কথাগুলো ছিলো নিজস্ব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি
হযরত শেইখ তার শিষ্যদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতেন যেন তারা নিজেদেরকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সামনে সর্বাবস্থায় উপস্থিত আছে বলে মনে করে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সাঃ) বলেছেন :
“ আল্লাহকে স্মরণ করো খামিল যিকর-এর মাধ্যমে। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো :‘ খামিল যিকর কী ?’ তিনি বললেন :‘ নিঃশব্দে ও গোপনে যিকর ।” 132
অন্য এক হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেছেন :
“ গোপন যিকর যা ফেরেশতারা শুনতে পায় না , তা তারা যে যিকর শোনে তার চেয়ে সত্তরগুণ উত্তম।”
গোপন যিকর এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ্য যিকর এর উপরে এ জন্য যে তা মানুষের আত্মিক উন্নতিতে বিশেষ প্রভাব ফেলে। জিহবায় স্মরণ করা সহজ , কিন্তু অন্তরের মাধ্যমে স্মরণ বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্নভাবে তা করা বেশ কঠিন। ইমাম বাক্বির (আঃ) একে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি বলে মনে করেন :
“ তিনটি কাজ মানুষের জন্য কঠিন :‘ বিশ্বাসীদের ইনসাফ , কোন ব্যক্তির আর্থিক সাহায্য তার ভাইয়ের জন্য এবং আল্লাহকে সর্বাবস্থায় স্মরণ করা। যেমনঃ মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করবে গুনাহর (উস্কানী) সম্মুখীন হলে এবং তা করার সিদ্ধান্ত নিলে। তখন এ স্মরণ তাকে গুনাহতে বাধা দেয়। তা আল্লাহর কথা অনুযায়ী :
) إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ(
“ নিশ্চয় যারা ধার্মিক যখন শয়তানের কাছ থেকে কোন খারাপ চিন্তা তাদেরকে স্পর্শ করে তারা আল্লাহর স্মরণ করে এবং (এরপর) পরিস্কার দেখতে পায়।” 133 (সূরা আল আরাফ-201)
অন্য এক হাদীসে ইনসাফ , দান-খয়রাত এবং নিরবচ্ছিন্ন যিকরকে ঐশী বাধ্যবাধকতার মধ্যে সবচে’ কঠিন বলে পাওয়া যায়। ইমাম সাদিক (আঃ) ব্যাখ্যা করেছেন‘ সর্বাবস্থায় স্মরণ বলতে তিনি যা বুঝিয়েছেন তা শুধু জিহবার মাধ্যমে স্মরণ নয় , যদিও তা যিকর এর অন্তর্ভুক্ত।
“ আল্লাহর স্মরণ বলতে আমি বুঝাইনা যে ,“ সুবহানাল্লাহ , ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার” বলা। যদিও এগুলোকেও যিকর বিবেচনা করা হয় , কিন্তু যা বোঝানো হয়েছে তা হলো আনুগত্য ও অবাধ্যতার সম্মুখীন হলে আল্লাহকে স্মরণ করা।” 134
এটি মানুষের জন্য খুবই কঠিন যে সে নিজেকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত দেখবে। যদি মানুষ এ চেতনা লাভ করে তাহলে তাকে শরীরী আকাঙ্ক্ষা ও শয়তানের পরাজিত করা ও তার রবের অবাধ্য হতে বাধ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কীভাবে শরীরী নফস ও শয়তান থেকে মুক্ত হওয়া যায়
হযরত শেইখ বলেন :
“ শরীরী নফসের খারাপ থেকে মুক্ত হওয়ার কোন পথ নেই একমাত্র আল্লাহর দিকে মনোযোগ দেয়া ছাড়া এবং তাঁর কাছে নিজেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে উপস্থিত রাখা ছাড়া। যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি তাঁর উপস্থিতিতে আছো এবং আল্লাহর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নও , শরীরী নফস তোমাকে ধোঁকা দিতে পারবে না।”
নীচের আয়াতটি উল্লেখ করে :
) وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ(
“ যদি কেউ দয়ালু আল্লাহর স্মরণ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় , আমরা তার জন্য একটি শয়তান নিয়োগ দেই তার ঘনিষ্ট সাথী হওয়ার জন্য।” (সূরা যুখরুফ-36)
হযরত শেইখ অনেক সময় বলতেন :
“ যখনই মানুষের মনোযোগ আল্লাহর কাছ থেকে সরে যায় , শরীরী নফস এবং শয়তান যারা ওঁত পেতে থাকে তারা তার অন্তরকে দখল করবে এবং তারা সেখান থেকে তাদের কাজ শুরু করে।”
আমার উপর থেকে হাত সরিয়ে নাও
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন যে তিনি বলেছেন :
“ আমি আমার শরীরী নফসকে দেখলাম আমার আধ্যাত্মিক অবস্থায় ; আমি একে বললাম আমার উপর থেকে তার হাত সরিয়ে নিতে! তা উত্তর দিলো : তুমি কি জানো না যে আমি তোমার উপর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিবো না যতক্ষণ না আমি তোমাকে ধ্বংস করি!”
সম্ভবত : এ অতিন্দ্রীয় জ্ঞানের কারণে হযরত শেইখ এ কবিতায় উৎসাহী ছিলেন :“ চিরজীবনের বিদ্যালয়ে তোমার সৌন্দর্য আমাকে পথ দেখিয়েছে , তোমার উদার অনুগ্রহ আমাকে সাহায্য করেছে তোমার দাসত্বে বন্দী হতে , আমার ইতর শরীরী নফস সব অহংকারকে প্রশ্রয় দিয়েছে , তোমার রহমতের প্রবাহ আমাকে এর থাবা থেকে মুক্ত করেছে।”
ঐশী অনুগ্রহ মানুষের অন্তরে অবতীর্ণ হয় তাঁর নিরবচ্ছিন্ন স্মরণের মাধ্যমে। যখন আল্লাহর স্মরণ অন্তরে প্রবেশ করে তখন প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে তা অন্তরকে পবিত্র করবে শয়তানী উস্কানী ও শরীরী অহংকার থেকে এবং একে প্রস্তুত করবে পরম দানশীলের কাছ থেকে ঐশী অনুগ্রহ লাভের জন্য ।
এ বিষয়ে আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ) বলেন :
‘ অন্তরের সুস্থতার মূল নির্ভর করে এর আল্লাহর স্মরণে নিমজ্জিত থাকায়।’ 135
নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর সামনে উপস্থিত থাকার অনুভূতি মানুষকে শরীরী নফস ও শয়তানের হাতে বন্দীত্ব থেকে মুক্ত করে এবং পরিণতিতে অন্তরের বিভিন্ন রোগ দূর করে। ইমাম আলী (আঃ) বলেন :
“ আল্লাহর স্মরণ শয়তানকে বিতাড়িত করে।” 136
“ আল্লাহর স্মরণ নফসের রোগের ওষুধ।” 137
“ হে যাঁর নাম হচ্ছে ওষুধ ,যাঁর স্মরণ হচ্ছে আরোগ্য।” 138
আল্লাহকে নিরবচ্ছিন্নভাবে স্মরণের মাধ্যমে ঐশী অনুগ্রহ অন্তরকে মানব জীবন দেয় এবং একে জ্যোতির্ময় করে , নফসকে শক্তিশালী করে , মানুষের অন্তরকে আল্লাহর ঘনিষ্ট করে , ধীরে ধীরে মানুষকে দেয় প্রেমের উজ্জীবনী শরবত ও ভালোবাসা।
ইমাম আলী (আঃ) যিনি আল্লাহকে খুব ভালো জানতেন এবং যিনি মানুষের নফসের রোগ সম্পর্কে পরিচিত ছিলেন তিনি বলেন :
“ যে আল্লাহকে স্মরণ করে , আল্লাহ তার অন্তরকে জীবিত করবেন এবং তার মন ও বুদ্ধিকে আলোকিত করবেন।” 139
“ আল্লাহর নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ নফসকে রসদ জোগায়।” 140
“ আল্লাহর নিরবচ্ছিন্ন স্মরণ তাঁর নৈকট্য লাভের চাবি।” 141
“ যে আল্লাহকে প্রচুর স্মরণ করে , আল্লাহ তাকে ভালোবাসবেন।” 142
এখানে সংক্ষেপে যা তুলে আনা হলো তা হলো আল্লাহকে স্মরণ রাখা নেয়ামতের এক ক্ষুদ্র অংশ এবং এর মাঝেই রয়েছে মানব সত্ত্বাটির উন্নতি ও সমৃদ্ধি।143 উপরের কথাগুলো সামান্য ভাবলেই পরিস্কার হয়ে যাবে যে কত মূল্যবান সে মুহূর্তগুলো যখন আমরা আল্লাহকে স্মরণ করি এবং কত ক্ষতিকর সে নিশ্বাসগুলো যা আমরা গ্রহণ করি আল্লাহকে স্মরণ না করে।
ঘুমের মধ্যে আল্লাহকে স্মরণ করা
ডঃ সুবাতি বলেন :
‘ একবার আমরা নিমন্ত্রিত হলাম দুপুরের খাবারের জন্য বৈঠকের এক সদস্যের বাসায়। দুপুরের খাবারের পর সবাই বিশ্রাম নিতে অগ্রসর হলো। আমি শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করছিলাম এবং এ সম্পর্কে ভাবছিলাম চোখ বন্ধ করে। এ সময় হযরত শেইখ যিনি আমার সামনে বসে ছিলেন এবং আমাকে খেয়াল করছিলেন , বন্ধুদের পরামর্শ দিলেন :
“ তোমাদের উচিত আল্লাহকে স্মরণ করা যখন তোমরা ঘুমাচ্ছো।”
ঐ একবারই আমি তাকে ঘুমের মধ্যে আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য বলতে শুনেছি আর কোন সময় উল্লেখ করেছেন কিনা মনে করতে পারি না।”
বারযাখ থেকে এক সংবাদ
হযরত শেইখের এক বন্ধু বর্ণনা করেন : আমি হযরত শেইখের কাছে গেলাম , তিনি বললেন :
“ আমি এক কম বয়সী ছেলেকে বারযাখে দেখলাম যে বলছে :‘ তুমি জানো না এখানে কী ঘটছে! যখন তুমি এখানে আসবে তুমি জানতে পারবে ; একটি নিশ্বাসও যা তুমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারণে নিয়েছো তা তোমার ক্ষতিতে পরিণত হয়েছে।”
যিকর এর গুণাবলী
আমরা যখন যিকর এর গুণাবলী (উপকার) সম্পর্কে কথা বলি আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে হযরত শেইখের বিদ্যালয় প্রেমের বিদ্যালয় , ফলাফলের নয়। তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কিছু চান না। যে নিজের সম্পূর্ণতাও চায় না সেই ফল লাভ করবে। একইভাবে আল্লাহকে স্মরণ রাখার ফলাফল যা-ই হোক , লক্ষ্য যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু না হয়।
দু’ টি যিকরকে গুরুত্ব দেয়া
হযরত শেইখের এক ভক্ত বলেন :
‘ হযরত শেইখ‘ ইসতিগফার’ (ক্ষমা চাওয়া) ও‘ সালাওয়াতকে’ (দরুদ) খুব বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন , এবং জানতে পেরেছেন যে এ দুটি যিকর আল্লাহর দিকে সফরকারীর দু’ টো পাখার মত।
হযরত শেইখ বলতেন :‘ যদি তোমরা জীবনে প্রচুর দরুদ পাঠাও , আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তোমার মৃত্যুর সময় তোমার ঠোঁটে চুমু দিবেন।’
শরীরী আকাঙ্ক্ষার উপর বিজয় লাভ করা
1. অধ্যাবসায়ের সাথে এ যিকর-“ লা হাওলা ওয়ালা ক্বুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম”
-‘ কোন নিরাপত্তা নেই ও কোন শক্তি নেই শুধু মাত্র আল্লাহর মাধ্যম ছাড়া’
2‘ ইয়া দায়েমু ইয়া ক্বায়েমু’ -‘ হে চিরস্থায়ী! হে চির উপস্থিত’
3. শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার জন্য , নিচের যিকরটি পড়ুন তের বার অথবা একশত বার করে সকালে ও সন্ধ্যায় :
‘ আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু ওয়া ইলাইকাল মুশতাকা ওয়া আনতাল মুসতায়ান।’ ‘ হে আল্লাহ , আপনারই সব প্রশংসা , আপনার কাছেই সব অভিযোগ করা হয় এবং আপনারই সাহায্য চাওয়া হয়।’
4. নীচের যিকরটি প্রতি রাতে একশত বার যিকর করুন :“ ইয়া যাকিয়্যু ত্বহিরু মিন কুল্লি আফাতিন বিক্বুদসিহী।”
হে পবিত্র ও পরিস্কার সমস্ত অপবিত্র তা থেকে , আপনার পরম পবিত্রতার মাধ্যমে।144
হযরত শেইখ উপরোক্ত যিকরটি শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে দমন করার জন্য বলেছেন :“ আমি নিজে তা ব্যবহার করেছি এবং তা আবৃত্তি করার মাধ্যমে শুরু করেছি আধ্যাত্মিকতার সন্ধান। একদিন আমি যিকরটি এতবার করলাম যে আমার শরীরী নফসের মৃত্যু ঘটলো। তাই আমি নিজেকে বললাম : আমি তা চালিয়ে যাবো যতক্ষণ না আমার (দুনিয়াবী) অস্তিত্ব অনস্তিত্বে পরিণত হয়। কিন্তু যখন কিছু সময়ের জন্য পড়তে অবহেলা করলাম যা মানুষের প্রকৃতির জন্য স্বাভাবিক , আমি দেখলাম আমার শরীরী নফস জীবিত হয়ে উঠেছে। কোন মানুষ যদি তার মনোযোগকে পৃথিবীর দিকে পরিচালিত করে তার শরীরী নফস শক্তিশালী হয়ে উঠবে ; এ যিকরটি শরীরী নফসকে পরাজিত করায় খুবই কার্যকর।”
রক্তের সম্পর্কের ছাড়া অন্য নারীর সাক্ষাতে আকর্ষণ দমন করা
ডঃ ফারযাম বলেন :
“ হযরত শেইখ রজব আলী এই যিকিরটি করতেন :‘ ইয়া খাইরা হাবিবীন ওয়া মাহবুবিন সাল্লে আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলীহি।’
‘ হে শ্রেষ্ঠ প্রেমিক ও প্রিয়তম , শান্তি বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের উপর।’
রক্তের সম্পর্কের বাইরে অন্য নারীর দিকে প্রথম দৃষ্টিপাতের পরেই এটি খুবই কার্যকর বলে বলেছেন । তিনি আমাকে বেশী বেশী তা আবৃত্তি করতে বলেছেন শয়তানের উস্কানী থেকে বাঁচার জন্য!
“ যখন তুমি তোমার রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্য নারীর দিকে তাকাও যদি তুমি উপভোগ না করো তাহলে তুমি অসুস্থ। কিন্তু যদি তুমি উপভোগ করো তাহলে অবশ্যই তোমাকে তার থেকে চোখ সরিয়ে নিতে হবে এবং বলবে :
‘ ইয়া খাইরা হাবিবীন------।
যার অর্থ :
‘ হে আমার রব! আমি তোমাকে ভালোবাসি। এরা পছন্দনীয় না ; যা কিছু মরণশীল তা পছন্দনীয় নয়----- ।’
আল্লাহর ভালোবাসায়
এক হাজার বার সালাওয়াত (দরুদ প্রতি রাত্রে) চল্লিশ রাতের জন্য।
বাতেন (অভ্যন্তর) কে পবিত্র করা
হযরত শেইখ মনে করতেন সূরা সাফ্ফাত প্রত্যক সকালে এবং সূরা হাশর প্রতি রাত্রে তেলাওয়াত করা বাতেনকে পবিত্র করার জন্য কার্যকারী।
হযরত শেইখের এক ভক্ত বলেন তিনি তাকে প্রতি রাত্রে সূরা হাশর পড়তে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন এ সূরার শেষ দিকে আল্লাহর ইসমে আযম রয়েছে।
ইমাম মাহদী (আঃ) এর সাথে সাক্ষাতের জন্য
সূরা বনী ইসরাইলের 80 নং আয়াতের এ অংশ একশত বার করে চল্লিশ রাত পড়লে ইমাম মাহদী (আঃ)- এর সাক্ষাত পাওয়া যাবে।
) رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِنْ لَدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا(
“ হে আমার রব! আমার প্রবেশ হোক সত্য ও সম্মানের দরজা দিয়ে এবং একইভাবে আমার প্রস্থান হোক সত্য ও সম্মানের দরজা দিয়ে এবং আমাকে দান করুন আপনার কাছ থেকে অনুমোদন (আমাকে) সাহায্য করার জন্য।” (সূরা বাণী ইসরাইলঃ 80)
বর্ণনায় এসেছে হযরত শেইখের অনেক ছাত্র ইমাম মাহদী (আঃ)-এর সাক্ষাত পেয়েছে এ যিক্রের মাধ্যমে ; যদিও সাক্ষাতের সময় তারা ইমাম (আঃ) কে চিনতে পারে নি।
দুটি ঘটনা নীচে দেয়া হলো :
1। কিভাবে আয়াতুল্লাহ যিয়ারাতি এ সম্মান লাভ করেন
হযরত শেইখ আয়াতুল্লাহ যিয়ারাতিকে মাহদী শাহরে এ যিকরের মাধ্যমে ইমামের সাক্ষাত লাভের জন্য বলেছিলেন। তার আদেশ পালনের পর তিনি হযরত শেইখের কাছে গেলেন এবং বললেন যে এতে কোন ফল পান নি।
হযরত শেইখ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন :
“ আপনি যখন মসজিদে নামায পড়ছিলেন একজন সাইয়্যেদ আপনাকে বলেছিলেন :
‘ বাম হাতে আংটি পড়া মাকরুহ (অপছন্দের)। আর আপনি বলেছিলেন :
‘ সব মাকরুহ অনুমোদিত।’ সেই পবিত্র মানুষটি ছিলেন ইমাম মাহদী (আঃ)।”
2। এক দোকানদার এ সম্মান পেয়েছিলো
দুই দোকানদার দায়িত্ব নিয়েছিলো এক সাইয়্যেদ পরিবারের দেখাশোনা করবে। তাদের একজন হযরত শেইখের এ যিকর শুরু করে ইমাম (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য। চল্লিশতম রাতের আগে সাইয়্যেদ পরিবারের একটি শিশু তার দোকানে গেল এবং তার কাছে একটি সাবান চাইলো। দোকানদার একটু অভিযোগ করলো কেন তার মা তাকে আরেক জনের কাছে পাঠায় নি- অন্য দোকানদারের কথা বুঝিয়ে -তারা যা চায় তার জন্য।
এ লোকটি বললো :
“ সেই রাতে আমি যখন ঘুমাতে গেলাম , আমি শুনলাম কেউ আমাকে ডাকছে। আমি বাইরে দেখতে গেলাম এবং কাউকে দেখতে পেলাম না। আমি আবার বিছানায় গেলাম। আমি শুনলাম আমার নাম ধরে কন্ঠস্বরটি ডাকছে----। তৃতীয় বার আমি আবার বাইরে গেলাম দেখতে। যখন আমি ঘরের দরজা খুললাম , আমি দেখলাম একজন সাইয়্যেদ তার চেহারা ঢেকে আছেন , বললেন :
“ আমরা আমাদের সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে পারি কিন্তু আমরা চাই তুমি উঁচু মাক্বাম (স্থান) অর্জন করো।”
সমস্যা সমাধান ও অসুস্থতা দূর করার জন্য
ডঃ ফারযাম বলেছেন : হযরত শেইখ কোরআনের আয়াত , দোয়া ও সাথে সালাওয়াত পড়তে বলতেন যিকর হিসেবে সমস্যা সমাধান ও অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভের জন্য।
‘ হে আমার রব! আমি পরাজিত , আমাকে সাহায্য করুন আপনি শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।’
একবার আমার একটি সমস্যা হলো , হযরত শেইখ বললেন এ আয়াত যিকির করতে :
‘ হে আমার রব , আমি দুর্দশাগ্রস্ত এবং আপনি সবচে করুণাময়’
তিনি বলতেন :
“ এগুলো হলো যিকর , এগুলো দরুদের সাথে বলো।”
অথবা যখন আমাদের বাচ্চারা অসুস্থ হতো তিনি আমাদের বলতে বলতেনঃ
‘ হে তিনি যার নাম হলো ওষুধ , যার স্মরণ হচ্ছে আরোগ্য ; মুহাম্মাদ ও তার পরিবারের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।’
গরম ও ঠান্ডা এড়িয়ে যাবার জন্য
হযরত শেইখের একজন শিষ্য বলেন : হজ্বে আমার প্রথম যাত্রায় আমি হযরত শেইখকে জিজ্ঞেস করলাম আমি কী করতে পারি চরম তাপ এড়াবার জন্য। তিনি বললেন এ আয়াতগুলো যিকর করতে ঠান্ডা ও গরম থেকে বাঁচার জন্য :
) سَلَامٌ عَلَى إِبْرَاهِيمَ (109) كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ(
“ শান্তি ইবরাহিমের উপর , এভাবে আমরা পুরস্কার দেই যারা সৎকর্মশীল।” (সূরা সাফফাত-109-110)
) يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ(
‘ হে আগুন! তুমি ঠান্ডা হও এবং হও নিরাপত্তা ইবরাহিমের জন্য’ (সূরা আম্বিয়া- 69)
ষষ্ঠ অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের দোয়া
হযরত শেইখের অন্যতম নির্দেশনা ছিলো যে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহর কাছে নির্জনে মোনাজাত ও দোয়ার জন্য নির্ধারিত করা , যাকে তিনি অভিহিত করতেন“ আল্লাহর দরজার চৌকাঠে ভিক্ষা চাওয়া” এবং বলতেন :
“ দোয়া আবৃত্তি করো প্রতি রাতে এক ঘন্টার জন্য , এমনও যদি হয় যে তোমার মন এর জন্য প্রস্তুত নয় , আল্লাহর সাথে নির্জনে সময় কাটানো পরিত্যাগ করো না।”
তিনি আরো বলেছেন :
“ বিস্ময়কর নেয়ামত রয়েছে সকালে ঘুম থেকে উঠেই এবং রাতের শেষ এক তৃতীয়াংশে। তুমি যা কিছু চাও তা পেতে পারো আল্লাহর কাছ থেকে সকালে ভিক্ষা চাওয়ার মাধ্যমে। সকালে ভিক্ষা চাওয়ায় অবহেলা করো না। যা কিছু নেয়ামত তোমরা অর্জন করতে চাও তা তার মাধ্যমে সম্ভব। একজন খুব কমই ঘুমায় এবং মাশুকের সাথে মিলন ছাড়া আর কিছু চায় না। সকাল হচ্ছে তাঁর সাথে সাক্ষাত ও মিলনের সময়।”
“ যা কিছু সুখের ভান্ডার হাফিযকে খোদা দিয়েছেন তা হচ্ছে রাতের দোয়া ও সকালের বিলাপ।”
হযরত শেইখের দোয়া
হযরত শেইখ নীচের দোয়াগুলো সব সময় পড়তেন এবং তার শিষ্যদের সেগুলো পড়ার জন্য উপদেশ দিতেন :
দোয়ায়ে ইয়াসতাশির , আদিলা , তাওয়াসসূল এবং আমিরুল মুমিনিন (আঃ)-এর মসজিদে কুফার মোনাজাত যার শুরু হচ্ছে এমন :
“ ও আল্লাহ , আমি আপনাকে অনুরোধ করি আমাকে নিরাপত্তা দিতে যেদিন না সম্পদ না সন্তান কোন উপকারে আসবে।”
এ ছাড়া ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ) এর পনেরোটি মোনাজাত। এ পনেরোটি দোয়ার মধ্যে বিশেষ করে‘ মোনাজাত-আল-মুফ-তাক্বিরীন’ (চরম দরিদ্রের দোয়া) এবং‘ মোনাজাতে আল মুরিদীন’ (নিবেদিত প্রাণদের দোয়া)।
তিনি বলতেন :
“ পনেরোটি মোনাজাতের প্রত্যেকটিরই বিশেষ বৈশিষ্ট্য (নেয়ামত) আছে।”
তার প্রতিদিনের দোয়া
ডঃ ফারযাম বলেছেন যে হযরত শেইখের প্রতিদিনের দোয়ার একটি ছিলো :
“ হে আল্লাহ! শিক্ষা দিন , পূর্ণতা দিন এবং আপনার জন্য প্রশিক্ষণ দিন! হে রব! হে রিয্ক দাতা! আমাদেরকে আপনার সাথে মোলাকাতের জন্য প্রস্তুত করুন।”
বৃহস্পতিবার রাতগুলোতে নামাযের পর হযরত শেইখ দোয়ায়ে কুমাইল অথবা পনেরোটি মোনাজাতের একটি পড়তেন এবং এর উপর বক্তব্য রাখতেন।
‘ দোয়ায়ে ইয়াসতাশির পড়ো’
আয়াতুল্লাহ ফাহরী হযরত শেইখ সম্পর্কে বলেন যে তিনি বলেছেন :
“ আমি আল্লাহকে বললাম : হে আল্লাহ! প্রত্যেকেই তার মাশুকের সাথে নীচু স্বরে প্রেমপূর্ণ কথা বলে ; আমি নিজে এ নেয়ামত চাই। আমি কি দোয়া পড়বো ? আমাকে আধ্যাত্মিক অবস্থায় বলা হলো ,‘ দোয়ায়ে ইয়াসতাশির পড়ো।”
তাই তিনি দোয়ায়ে ইয়াসতাশির উদ্বীপ্ত হয়ে পড়তেন।
তাঁকে খোঁজার বাহানা বের করো
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যদি কারো আল্লাহর জন্য সত্যিকার আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুতে সন্তুষ্ট না থাকে তাহলে সর্বশক্তিমান আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তার বিষয়গুলোর দায়িত্ব নিবেন এবং তাকে পথ দেখাবেন (ঐশী) গন্তব্যের। এ বিষয়ে তিনি নীচের এ আনন্দদায়ক উদাহরণটি দিতেন :
“ কোন বাচ্চার কান্নাকাটি এবং তার প্রত্যেক খেলনা ও চকলেট ছুঁড়ে ফেলা এবং কান্না ও অভিযোগ না থামার পর যখন তার বাবা তাকে কোলে নেয় এবং আদর করে তখন সে থামে ও শান্ত হয়। এভাবে তুমি যদি এ পৃথিবীর বিলাসকে গ্রাহ্য না করো , অভিযোগ করো এবং (এভাবে) তাঁকে পাওয়ার জন্য বাহানা ধরো সর্বশক্তিমান আল্লাহ শেষ পর্যন্ত তোমার বিষয়গুলোর দায়িত্ব নিবেন এবং তোমাকে উঁচুতে উঠিয়ে দিবেন। তখনই তুমি সত্যিকার আনন্দে পৌঁছুবে।”
কান্না ও নীচুস্বরে মোনাজাতের মূল্য
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যে একজন মানুষ নীচুস্বরে মোনাজাত ও আল্লাহর সাথে কথা থেকে তখনই লাভবান হবে যখন সে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর ভালোবাসা অন্তর থেকে দূর করে দিবে। যদি ব্যক্তির শরীরী আকাঙ্ক্ষা তার ইলাহ হয়ে থাকে সে সত্যবাদীতার সাথে বলতে পারবে না যে‘ হে আল্লাহ!’ তিনি এ সম্পর্কে বলেন :
“ কান্না ও নীচুস্বরে দোয়া তখনই লাভবান হবে যখন মানুষের
অন্তরে আল্লাহ প্রেম ছাড়া আর কোন কিছুর প্রেম থাকবে না ।”
হযরত শেইখের একটি শিক্ষামূলক অতিন্দ্রীয় জ্ঞান উপরোক্ত কথাকে সমর্থন করে।
‘ ইয়া আল্লাহ’ কথার জবাবে একটি পয়সা’
আয়াতুল্লাহ ফাহরী বলেন যে হযরত শেইখ বলেছেন :
“ আমি বাজারের মাঝ দিয়ে হাঁটার সময় এক ভিক্ষুক আমাকে বললো তাকে কিছু পয়সা দেয়ার জন্য। আমি পকেটে হাত দিলাম তাকে কিছু পয়সা দেয়ার জন্য। আমার হাতে দুই রিয়ালের একটি কয়েন অনুভূত হলো। আমি তা সরিয়ে দিলাম এবং এর পরিবর্তে একটি দশ শাহীর145 কয়েন নিলাম তাকে দেয়ার জন্য। দুপুরে আমি মসজিদে গেলাম নামায পড়তে। নামায পড়ার পর আমি হাত তুললাম আল্লাহর কাছে এ বলে‘ ও আল্লাহ!’ আমি একথা বলার পর আমাকে অতিন্দ্রীয়ভাবে ঐ দুই রিয়ালের কয়েনটি দেখানো হলো যা আমি আমার পকেটে রেখে দিয়েছিলাম (ভিক্ষুককে দেই নি)।”
এ অতিন্দ্রীয় দৃশ্যে ভাবনার কিছু বিষয় আছে :
1। শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে ইলাহ হিসেবে নেয়ার উপমা। কোরআনের আয়াত :
) أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ(
“ তুমি কি তাকে দেখেছো যে তার শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে ?” (সূরা জাসিয়া-23)
2। মানুষ যতটুকু তার শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে মেনে চলবে আল্লাহ থেকে সে ততটুকু দূরে থাকবে। বরং সে যা চায় তার দাস হয়ে যায়। যেভাবে‘ দুই রিয়াল কয়েন’ অতিন্দ্রীয় জগতে‘ ইলাহ’ হয়ে দাঁড়ালো।
3। আপনি যা সবচে’ ভালোবাসেন তা দান করা উত্তম। একজন বিশ্বাসী তার মাশুকের পথে দান করে দিবে যা সে পছন্দ করে , তা দান করবে না যে বিষয়ে তার আগ্রহ নেইঃ
) لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ(
“ কোন ভাবেই তোমরা সৎকর্মশীল হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা দান করবে (উম্মুক্তভাবে) তা থেকে যা তোমরা ভালোবাসো।” (সূরা আলে ইমরান-92)
আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর পথ হচ্ছে অন্য লোকের কল্যাণ করা। যদি কোন মানুষ নামাযের জন্য যথাযথ মানসিক অবস্থা চায় ও যিকর ও আল্লাহর কাছে মোনাজাত উপভোগ করতে চায় তাকে অবশ্যই আল্লাহর জন্য আল্লাহর সৃষ্টির সেবায় থাকতে হবে। তিনি বলেছেন :
যদি তুমি পেতে চাও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অনুগ্রহ এবং তার কাছে নীচুস্বরে মোনাজাতের আনন্দ , তাহলে আল্লাহর সৃষ্টির সেবা অনুশীলন করো আহলুল বায়েত (আঃ)-এর কাছ থেকে শিখে।
) وَيُطْعِمُونَ الطَّعَامَ عَلَى حُبِّهِ مِسْكِينًا وَيَتِيمًا وَأَسِيرًا إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ لَا نُرِيدُ مِنْكُمْ جَزَاءً وَلَا شُكُورًا(
“ এবং তারা খাওয়ায় আল্লাহর জন্য দরিদ্র , ইয়াতিম এবং বন্দীদের , (এই বলে) আমরা তোমাদের খাওয়াই শুধু আল্লাহর জন্য! তোমাদের কাছ থেকে আমরা চাই না কোন পুরস্কার , আর না কোন ধন্যবাদ।” (সূরা আল-ইনসান-89)
তিনি আরো বলেছেন :
“ যা মানুষের মাঝে আল্লাহর দাসত্বের আধ্যাত্মিক অবস্থা সৃষ্টি করে তা হলো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের পর অন্য লোকের কল্যাণ করা।”
আমরা আল্লাহর কাছ থেকে কী চাইবো ?
দোয়াতে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো দোয়াকারীর এটি জানা উচিত আল্লাহর কাছে মোনাজাতে সে কী বলবে এবং তাঁর কাছ থেকে কী চাইবে। দোয়ার উপরে তার ব্যাখ্যায় হযরত শেইখ জোর দেন কিছু শব্দগুচ্ছের উপর। যেমন :
“ হে আরেফদের আশার লক্ষ্য , হে আশাকারীর আশার পরম লক্ষ্য , হে আমার প্রশান্তি , হে আমার জান্নাত , হে আমার দুনিয়া , হে আমার আখেরাত।”
এরপর তিনি বলতেন :
“ বন্ধুরা! প্রজ্ঞা শিক্ষা নাও তোমাদের ইমাম (আঃ) থেকে। দেখো ইমাম কীভাবে আল্লাহকে নীচুস্বরে বলেন : আমি আশ্রয় খুঁজছি আপনার মাঝে , আমি এসেছি আপনাকে জড়িয়ে ধরতে। আমি আপনাকে চাই [আমি আপনার মাঝে আনন্দ করি]।”
হযরত শেইখ তার দোয়া ও মোনাজাতে নিজে বলতেন :
“ হে আল্লাহ , গ্রহণ করুন এগুলো (দোয়াগুলো) প্রাথমিক (উপায়) হিসেবে আপনার সাথে মিলনের জন্য!”
একজন আশেক (প্রেমিক) তার মাশুকের কাছ থেকে কী চায়
হযরত শেইখের উপরোক্ত শিক্ষাগুলো উল্লেখ করে ডঃ হামিদ ফারযাম বলেন :“ কোন কোন সময় হযরত শেইখ খুব সহজ সরল উপমা দিতেন চরম আধ্যাত্মিক কোন বিষয় বোঝাতে , যেমন :
‘ একজন প্রেমিক তার মাশুকের বাড়ির দরজায় টোকা দিলো। মাশুক জিজ্ঞেস করলো :‘ আপনি কি রুটি চান ?’
প্রেমিক বললো -‘ না’
‘ আপনি কি পানি চান ?’
‘ না’
‘ তাহলে আপনি কী চান ?’
‘ আমি আপনাকে চাই!’ উত্তর দিলো মাশুক।
বন্ধুরা! বাড়ির মালিককে ভালোবাসতে হবে। তার ভোজ ও খাবারকে নয়। যেভাবে সাদী বলেছেন:
‘ যদি বন্ধুর কাছ থেকে উপকার আশা করো
তাহলে তুমি নিজের ভিতর বন্দী আছো , বন্ধুর প্রেমে নয়।’
তিনি এ কবিতা আবৃত্তি করতেন :
‘ তোমাকে অবশ্যই শুধু আল্লাহর প্রেমে থাকতে হবে এবং যা-ই তুমি কর তা শুধু তাঁর জন্য করবে। তাঁর প্রেমে থাকো , এমনকি কোন ইবাদাত করো না কোন পুরস্কারের জন্য।’
তিনি কোন কোন সময় সুন্দর কন্ঠে আমাকে বলতেন :
‘ কিছু করো যেন তোমার ফাঁদের জালে কিছু জড়িয়ে যায় [অর্থাৎ চিরস্থায়ী মাশুকের প্রেমে পড়]!’
তিনি যথোপযুক্ত কবিতা যুক্ত করতেন , বিশেষ করে হাফিযের কবিতা। এতে তার নির্দেশনা হতো খুবই কার্যকরী। যেমন :
‘ যদি তুমি চাও মাশুক মিলন ভঙ্গ না করে
ধরে থাকো সংযোগকে (প্রেম) যেন তিনিও তা ধরে রাখেন।’
“ পরিত্যাক্ত হয়ে থাকার অভিযোগ”
হযরত শেইখ বলতেন :
“ যখনই তোমরা রাতে ভিক্ষা চাওয়াতে (আল্লাহর কাছে) নিয়োজিত হও অভিযোগ কর পরিত্যাক্ত হয়ে থাকার এবং অনুরোধ করো :‘ হে আল্লাহ! আমার কোন শক্তি নেই শরীরী আকাঙ্ক্ষাকে মোকাবেলা করি ; তা আমাকে পঙ্গু করে ফেলেছে , আমার সাহায্যে আসুন এবং এর থাবা থেকে আমাকে মুক্ত করুন!’ এবং আহলুল বায়েতের (আঃ) কাছে আবেদন জানাও সুপারিশ করার জন্য।” এরপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করতেন :
) إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي(
‘ (মানুষের) নফস খারাপমুখী , যদি না আমার রব রহমত করেন।’ (সূরা ইউসূফ-53)
আহলুল বায়েত (আঃ)-এর কাছে আবেদনের প্রকৃত কারণ
হযরত শেইখ বলতেন :
“ বেশীর ভাগ লোক জানে না আহলুল বায়েত (আঃ)-এর কাছে আবেদন কিসের জন্য। তারা আহলুল বায়েত (আঃ) এর কাছে আবেদন করে সমস্যা ও জীবনের কঠিন বিষয়গুলো সমাধান করার জন্য।146 অথচ আমাদের উচিত তাদের দোরগোড়ায় যাওয়া একত্ববাদ ও আল্লাহর মারেফাত অর্জনের পথে চলার জন্য। এ রাস্তা খুব কঠিন এবং অসম্ভব , একজন মানুষের জন্য একটি আলো ও একজন পথ প্রদর্শক ছাড়া।”
যিয়ারাতে আশুরা
হযরত শেইখ আহলুল বায়েত (আঃ) কাছে আবেদনে জোর দিয়েছিলেন। আর তা যিয়ারাতে আশুরা পড়ার জন্যে। তিনি বলেছেন :‘ এক আধ্যাত্মিক মুহূর্তে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিলো যিয়ারাতে আশুরা পড়ার জন্য।’
তিনি আরো বলেছেন :“ যত দিন বেঁচে থাকো যিয়ারাতে আশুরা পড়তে ভুলো না।”
দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত
দোয়া কবুল হওয়ার একটি প্রধান শর্ত হচ্ছে ব্যক্তির খাবার হালাল হওয়া। একজন লোক নবী (সঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন :
‘ আমি চাই আমার দোয়া কবুল হোক।’ তিনি বললেন :
“ তোমার খাবারকে পবিত্র করো এবং হারামকে তোমার পেটে প্রবেশ করতে দিও না।” 147
“ প্রথমে লবণের দাম পরিশোধ করো”
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেছেন : হযরত শেইখের সাথে আমাদের একদল একত্রে বিবি শাহারবানু (পর্বতে) দোয়া ও মোনাজাতের জন্য রওনা দিলাম। আমরা কিছু রুটি ও শশা কিনলাম। এর মধ্যে আমরা কিছু লবণ তুলে নিলাম শশা বি ক্রে তার ঠেলা গাড়ি থেকে এবং এরপর আমরা পর্বতের দিকে রওনা দিলাম। আমরা যখন সেখানে পৌঁছালাম হযরত শেইখ বললেন :
“ চলো নিচে চলে যাই , আমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তারা বলছে : প্রথমে লবণের মূল্য পরিশোধ কর এরপর আসো নামায ও দোয়ার জন্য।”
ইবাদাতকারীর ক্ষমতা
একটি সুক্ষ্ণ বিষয় ইবাদাতকারীকে বিবেচনায় রাখতে হবে যে , যা সে আল্লাহর কাছে দাবী করছে তা তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা অনুযায়ী হতে হবে , যদি সে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা না রাখে তাহলে সে নিজেকে সমস্যায় ফেলবে দোয়া করে।
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন : একবার ব্যবসা খুব ধীরগতি হয়ে গেলো এবং আমি অস্থির হয়ে পড়লাম। একদিন হযরত শেইখ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি কেন বিপর্যস্ত আছি। আমি তাকে ঘটনা বললাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমি নামাযের পর তাক্বীবাত (নফল দোয়া) পড়ছি কিনা , আমি ওনাকে বললাম আমি আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ)- এর দোয়া আস সাবাহ পড়ছি। তিনি বললেন :
“ দোয়া সাবাহর বদলে সূরা হাশর পড়ো এবং দোয়ায়ে আদিলা পড়ো তোমার তা’ ক্বীবাতে যেন তোমার সমস্যা দূর হয়ে যায়।”
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কেন আমি দোয়ায়ে সাবাহ পড়বো না। তিনি বললেন :
‘ এ দোয়াতে এমন সব (ভারী) কথা ও শব্দগুচ্ছ আছে যে একজন মানুষের সেই ক্ষমতা থাকতে হবে তা বহন করার। ইমাম আলী (আঃ) আল্লাহকে এ দোয়ায় অনুরোধ করছেন :
‘ হে আল্লাহ আমাকে একটি ব্যাথা দিন যে মুহূর্তগুলোতে আমি আপনাকে ভুলবো না। তাই এ দোয়া দাবী করে প্রয়োজনীয় ক্ষমতার। এবং তুমি তা পড়েছো প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ছাড়াই যা তোমার সমস্যার সৃষ্টি করেছে। তাই সাবাহর বদলে সূরা হাশর ও দোয়ায়ে আদিলা পড়ো। আল্লাহর ইচ্ছায় তা তোমার সমস্যা দূর করে দিবে।
সূরা হাশর ও দোয়ায়ে আদিলা পড়া শুরু করার পর আমার এক বন্ধু দশ হাজার তোমান ধার দিলো ; আমি সে টাকা দিয়ে কাজ করলাম। একটি বাড়ি কিনলাম এবং ধীরে ধীরে আমার ব্যাবসা উন্নতি লাভ করলো।
ইবাদাতকারীর সৌজন্য
ডঃ ফারযাম আরো বলেন : হযরত শেইখ একটি বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন , তাহলো ইবাদাতকারীর সৌজন্য। এ বিষয়ে হযরত শেইখ বলেছেনঃ
“ দোয়া করার সময় ব্যক্তি থাকবে বিনয়ী ও ভীত এবং হাঁটু ভাজ করে বসবে কিবলামুখী হয়ে।”
একবার আমার পায়ে অসুবিধা হতে লাগলো আমি মনে করলাম আমার পা দু’ টো একটু লম্বা করি। হযরত শেইখ যিনি আমার পিছনে ছিলেন কক্ষের পিছন দিকে বলে উঠলেন :
“ দোয়ার সময় সোজা হয়ে বসে থাকো হাঁটু ভাজ করে , এবং সৌজন্য বজায় রাখো।”
সপ্তম অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের পরোপকার
অন্যদের সেবা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় যা হাদীসগুলোতে খুব জোর দেয়া হয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেন :
“ মানুষের মধ্যে তারাই শ্রেষ্ঠ যারা অন্যের জন্য উপকারী।” 148
সৃষ্টির রহস্য
হযরত শেইখ এ বিষয়টিকে খুব জোর দিয়েছেন। তার এক শিষ্য বলেছেন যে তিনি বলেন :
“ আমার একবার আল্লাহর নৈকট্য এলো ; আমি তাঁকে অনুনয় করলাম সৃষ্টির রহস্য কী বলার জন্য। আমাকে বলা হলো (ঐশী প্রেরণার মাধ্যমে) যে সৃষ্টির রহস্য হচ্ছে জনগণের প্রতি কল্যাণ।”
ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন :
“ তোমাদের আদেশ করা হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করার জন্যে এবং তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে অন্যের কল্যাণ করা ও (আল্লাহকে) মান্য করার জন্য।” 149
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন : একবার আমি তাকে বললাম ,“ হে শেইখ! আমাকে কিছু বলুন যা আমার উপকার করবে! তিনি আমার কান মলে দিলেন এবং বললেন :
“ মানুষের সেবা , মানুষের সেবা!”
হযরত শেইখ বলতেন :“ যদি তোমরা চাও একত্ববাদের সত্যপথ পেতে তাহলে মানুষের কল্যাণ করো। একত্ববাদের বোঝা খুব ভারী এবং সমস্যাসংকুল , এবং সবাই এর বোঝা সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। যা হোক অন্যের কল্যাণ এ ভার বহনকে সহজ করে দেয়।” এবং তিনি মাঝে মাঝে হাস্যরসের সাথে বলতেন :
“ দিনের বেলা আল্লাহর বান্দাদের সাহায্য করো এবং রাতের বেলা ভিক্ষা চাও তাঁর দরজার গোড়ায়।”
মরহুম ফায়েদ কাশানী (রঃ) তার একটি কবিতায় তুলে এনেছেন :
‘ সারা রাত বিলাপ করো বিনয়ের সাথে রিয্ক দাতার দোর গোড়ায় , যখন সকাল হয়ে যায় , সাহায্য করো যারা অন্তরে আঘাত প্রাপ্ত ও ভগ্ন হৃদয়ের।’
দারিদ্র্যের মধ্যেও দান করা
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা হাদীসে জোর দেয়া হয়েছে তা হলো অন্যের কল্যাণ করা ও দারিদ্র্যের মধ্যেও সাহায্য দেয়া। নবী (সাঃ) বলেছেন :
“ বিশ্বাসের তিনটি নিদর্শন রয়েছে : দারিদ্র্যের মাঝে থেকে দান করা , অন্যের প্রতি ইনসাফ , এবং জ্ঞান সন্ধানকারীকে জ্ঞান দান করা।” 150
দারিদ্র্যের ভেতর থেকেও দান করা আত্মগঠনের উপর কী প্রভাব ফেলে তা বর্ণনা করে হাফিয বলেন :‘ দারিদ্র্যের ভিতর থেকে সংগ্রাম করো হাসি খুশী ও পূর্ণ সত্তার মাতাল হতে , এ সঞ্জীবনী সুরা একজন দরিদ্রকে ক্বারুনে (মূসা (আঃ)-এর সময়কার বিরাট ধনী ব্যক্তি) পরিণত করে।’
রোযা রাখো ও ভিক্ষা দাও
ইমাম কাযেম (আঃ) এর এর এক সাথী বলেছেন :
আমি হযরতের কাছে আমার দারিদ্র্য নিয়ে অভিযোগ করলাম এবং বললাম যে আমি এত দরিদ্রতায় ভুগছি যে অমুক তার নিজের জামা খুলে আমাকে পড়তে দিয়েছে। হযরত ইমাম (আঃ) বললেন :“ রোযা রাখো ও ভিক্ষা দাও!”
আমি বললাম :“ আমি কি ভিক্ষা দিতে পারি যা আমি ভিক্ষা হিসেবে পেয়েছি , তা যত অল্পই হোক ?”
ইমাম (আঃ) বললেন :“ দান করো যা তোমাকে আল্লাহর রিয্ক হিসেবে দান করেন , এমনকি যদি তা তোমার নিজের জন্য খরচ করা উচিত।” 151
বড় পরিবারের কারণে বেকার ব্যক্তির জটিলতায় থাকা অবস্থায় তাকে সাহায্য করা
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন : আমি বেকার ছিলাম এবং খুব হতাশ ছিলাম কিছু সময়ের জন্য। তাই আমি তার বাসায় গেলাম এ অবস্থা থেকে মুক্তির পথ পেতে। আমি হযরত শেইখের ঘরে ঢোকার সাথে সাথে তিনি বললেন :
“ তুমি এমন আবরণের নীচে পড়েছো যে আমি এরকম আর দেখি নি! কেন তুমি আল্লাহতে নির্ভর করা ছেড়ে দিয়েছো ? শয়তান তোমাকে এক আবরণে ঢেকে দিয়েছে যে তুমি অনুভব করতে অক্ষম।”
তার কথা আমাকে প্রবলভাবে আন্দোলিত করলো এবং আমার অন্তরে চাপ সৃষ্টি করলো। তিনি বললেন :‘ তোমার আবরণ দূর হয়েছে , কিন্তু সতর্ক থাকো যেন তা ফেরত না আসে।’ এরপর তিনি বললেন :“ কেউ একজন বেকার এবং অসুস্থ এবং তাকে দুটো পরিবার চালাতে হয়। যদি পার , যাও তার সন্তানদের জন্য কিছু কাপড় কিনে আনো এখানে।”
যদিও আমি বেকার ও কপদর্কহীন ছিলাম আমি এক পুরনো বন্ধুর কাপড়ের দোকানে গেলাম এবং বাকীতে কিছু কাপড় কিনলাম এবং শেইখের কাছে নিয়ে গেলাম। যখন আমি কাপড়ের প্যাকেটটি তার সামনে রাখলাম , হযরত শেইখ আমার দিকে তাকালেন এবং আমার প্রচেষ্টাকে খুব প্রশংসা করলেন।
ডঃ সুবাতি বলেন :
‘ তিনি যে জিনিসটিতে খুব বেশী জোর দিতেন তা হলো অন্যের কল্যাণ করা। তিনি একে খুব বেশী মূল্যবান ভাবতেন এবং আল্লাহর দিকে পথ চলতে তা খুব কার্যকরী বলে মনে করতেন। যখন কেউ আধ্যাত্মিক পথে ব্যর্থ হতো তিনি পরামর্শ দিতেন :
“ অন্যের কল্যাণে অবহেলা করো না এবং অন্যের ভালো করো যতটুকু তোমার পক্ষে সম্ভব।”
‘ অভাবীদের সেবা করো জীবনে যতদিন পারো।
হয় তোমার কথা দিয়ে , পয়সা , কালাম অথবা উদ্যোগ দিয়ে।’
তিনি নিজে ছিলেন অন্যের কল্যাণে অগ্রপথিক। কেউ একজন সমস্যায় পড়লো , সে হযরত শেইখের সাক্ষাতে গেলো। তিনি বললেন :
“ এ লোক তার আত্মীয়দের সাহায্য করে শুধু খুমস দিয়ে এবং তাদের জন্য আর কোন উপকার করে না।”
এর অর্থ হলো শুধু খুমস দেয়াই যথেষ্ট নয়।
বোনের প্রতি কল্যাণ
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন :
‘ একদিন আমি হযরত শেইখকে অনুরোধ করলাম আমার মৃত বাবার রুহের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এবং তাকে জিজ্ঞেস করতে যদি আমি তার জন্য কিছু করতে পারি। হযরত শেইখ বললেন :‘ সূরা হামদ পড়ো।
আমি যখন সূরা হামদ পড়লাম তিনি সাথে সাথেই আমার বাবার চেহারা ও আকার আকৃতি বর্ণনা করলেন যিনি চল্লিশ বছর আগে ইন্তেকাল করেছিলেন। এরপর তিনি আমার বাবার কথা বললেন :
“ আমার কোন কিছুর প্রয়োজন নেই , আমার ছেলেকে বলুন তার ছোট বোনকে ঘরের প্রয়োজনে সাহায্য করতে।”
হযরত শেইখ ও অন্যের সেবা
হযরত শেইখের জীবনের বিভিন্ন দিক গবেষণা করে দেখা যায় যে এ ঐশী ব্যক্তিত্ব ছিলেন দুর্দশাগ্রস্ত লোকদের সেবায় ও তাদের সমস্যা সমাধানের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তার পরোপকারের উপর এ বইয়ের বিভিন্ন অংশে বিশেষ করে প্রথম অংশে তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরো কিছু ঘটনা উল্লেখ করা হলো :
হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ)- এর নির্দেশে ইমামে জুমাকে প্রতিদান
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন : মরহুম সুহাইল152 (রঃ) বলতেন :
আমার দোকান ছিলো তেহরানে আব্বাসী চৌরাস্তায়। একবার গ্রীষ্মের এক গরম দিনে হযরত শেইখ আমার দোকানে এলেন তাড়াহুড়া করে এবং আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন :
‘ কোন সময় নষ্ট করো না , এখনই এ টাকা সাইয়্যেদ বেহেশতীর কাছে নিয়ে যাও।’
তিনি ছিলেন আরিয়ানা এভিনিউর মসজিদে হাজ্ব আমজাদের ইমাম। আমি ততক্ষণাৎ তার বাসায় গেলাম ও তাকে টাকাটি দিলাম। পরে আমি সাইয়্যেদকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনাটি কী। তিনি বললেন :
‘ সেদিন আমার ঘরে একজন মেহমান ছিলো এবং আমার ঘরে কোন খাবার ছিলো না। আমি অন্য ঘরে গেলাম এবং হযরত মাহদী (আঃ)-এর (ওয়ালী আল আসর) কাছে আবেদন করলাম এবং তখন এ টাকা আমার কাছে পাঠানো হলো।
হযরত শেইখ নিজে বলেছেন :“ হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) আমাকে আদেশ করেছিলেন এ টাকাটা সাইয়্যেদ বেহেশতির কাছে তৎক্ষণাৎ দিয়ে আসতে।”
খাবার পরিবেশনের জন্য উপদেশ
বিভিন্নভাবে মানুষের সমস্যা সমাধানের চেষ্টার সাথে সাথে তিনি তার ছোট্ট বাড়িতে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে মেহমান গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে এবং বিশ্বাসীদের জন্য বাড়িতে খাবার পরিবেশন করার উপরে বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।
তিনি তার (শিষ্যদের) পরামর্শ দিতেন তাদের বাড়িতে খাবার পরিবেশন করতে। তিনি বলতেন দরিদ্রকে টাকা দেয়া তাদের বাড়ীতে রান্না করা খাবার পরিবেশনের মতো মূল্যবান নয়।
ডঃ ফারযাম বলেন :
‘ দরিদ্র ও অভাবী মানুষের জন্য খাবার পরিবেশন করা ছিলো প্রায়ই তার পরামর্শ। একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম যদি এর পরিবর্তে টাকা দেই।
তিনি বললেন :
‘ না খাবার দেয়া একটি ভিন্ন জিনিস এবং আরো কার্যকরী।’
সবাই জানতেন পনেরই শাবান হযরত শেইখ ভোজের আয়োজন করতেন রাতের বেলা। মুরগী ও ভাত দিতেন সব শ্রেণীর মেহমানদের যারা তার (অপরের কল্যাণে) ভোজে বসতেন। হযরত শেইখ তার মেহমানদেরকে খুব সম্মান করতেন এবং তাদেরকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়ার চেষ্টা করতেন।
হযরত শেইখ জোর দিতেন বিশ্বাসীদের খাবার পরিবেশনে এবং তার নিজের বাড়িতে খাবার পরিবেশনে এবং অতিথেয়তার ভদ্রতা ও সৌজন্য বজায় রাখাতে যখন তিনি নিজেই ছিলেন অর্থ কষ্টে।
“ আল্লাহ চাইলে তা যথেষ্ট হবে।”
এক ভোজে হযরত শেইখের বাড়িতে এক ভীড় তৈরী হলো দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। এতে দু’ টো তলাই মেহমানে ভর্তি হয়ে গেলো। যদিও প্রায় ত্রিশ কিলোগ্রামের মত চাল রাঁধা হলো তার পরিবার দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো যে হয়তো খাবার সবার জন্য যথেষ্ট হবে না। যখন হযরত শেইখ তাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখলেন তিনি বাবুর্চির দিকে ফিরলেন -যিনি ছিলেন ক্বোমের একজন ধর্ম বিশেষজ্ঞ এবং বললেন :
‘ সাইয়্যেদ আবুল হোসেইন! তারা কী বলছে ? পাতিলের ঢাকনা সরিয়ে একবার দেখো!’
তিনি পাতিল থেকে কিছু চাল হাতে নিয়ে বললেন :
“ আল্লাহ চাইলে তা যথেষ্ট হবে!”
আশ্চর্যজনক যে খাবারে কোন কমতো পড়েই নি বরং দরজায় অনেক লোক যারা তাদের পাত্র নিয়ে হাজির হয়েছিলো তারাও খালি হাতে ফেরে নি।
অন্যের কল্যাণ করা নেয়ামত
অন্য লোকের ভালো করা একজন মানুষের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত জীবনে অনেক নেয়ামত আনে। হযরত শেইখের মতে অন্যের কল্যাণে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত হলো অন্তরের উজ্জ্ব ¡লতা , দোয়া ও মোনাজাতের জন্য যথাযোগ্য মনের অবস্থা এবং আল্লাহর নৈকট্য।153
নীচে আনন্দদায়ক ও শিক্ষামূলক স্মৃতিচারণ উল্লেখ করা হলো যা অন্যের কল্যাণ করার নেয়ামত সম্পর্কিত :
হযরত আব্দুল আযীম হাসানীর মর্যাদা
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেনঃ
‘ হযরত শেইখ ও আমি সাইয়্যেদ আল কারীম (আঃ)- এর যিয়ারতে গেলাম। হযরত শেইখ হযরত আব্দুল আযীম (আঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন :
“ আপনি কীভাবে এ মাক্বাম (মর্যাদা) অর্জন করলেন ?”
হযরত আব্দুল আযীম হাসানী উত্তর দিলেন :‘ অন্য লোকের কল্যাণ করার মাধ্যমে ; আমি কোরআনের কপি হাতে লিখতাম , খুব কষ্টে তা বি ক্রি করতাম এবং যা পেতাম তা দরিদ্রদের দিয়ে দিতাম।’
ট্যাক্সী ড্রাইভারের সেবার ফলে নেয়ামত
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন : 1958 অথবা 1959 সনে আমি ট্যাক্সী ড্রাইভার হিসাবে কাজ করতাম। একবার আমি‘ বুযার জুমিহরি ঘারবি’ এভেনিউতে ছিলাম। সেদিন কোন বাস চলছিলো না। অনেক মানুষ ট্যাক্সীর জন্য লাইন ধরে ছিলো। আমি দেখলাম দুজন মহিলা , একজন লম্বা ও একজন খাটো , আমাকে থামার জন্য ইশারা করলো। তারা বললো তাদের একজন যাবে লশকর স্কোয়ারে এবং অন্যজন আরিয়ানা এভিনিউতে। প্রত্যেকেই পাঁচ রিয়াল করে দেবে। আমি তাদেরকে তাদের গন্তব্যে নিতে রাজী হলাম।
লম্বা মহিলা নেমে গেলেন এবং তার ভাড়া দিয়ে দিলেন। এরপর আমি আরিয়ানা এভিনিউর দিকে গেলাম খাটো মহিলার গন্তব্যের দিকে। সে ছিলো একজন তুর্কী এবং ফারসী বলতে পারতো না। আমি দেখলাম সে বিড় বিড় করছে :‘ হে আল্লাহ! আমি একজন তুর্কী এবং ফারসী জানি না এবং আমি জানি না কীভাবে আমার বাসায় যেতে হয়। প্রত্যেক দিন আমি বাসে উঠি এবং আমার বাসার কাছে দুই কিরানে (রিয়াল) দিয়ে নেমে যাই। আমি সকাল থেকে এতগুলো কাপড় ধুয়েছি শুধু দুই তোমানের জন্য। এখন আমাকে পাঁচ রিয়াল দিতে হবে ট্যাক্সী ভাড়ার জন্য।’
আমি তাকে বললাম :‘ চিন্তা করবেন না , আমিও একজন তুর্কী , আমি আরিয়ানা এভিনিউতে যাচ্ছি এবং আপনাকে আপনার বাড়িতে নামিয়ে দিবো।’ এতে তিনি খুব খুশী হলেন।
আমি শেষ পর্যন্ত ঠিকানা বের করলাম এবং থামলাম তার নামার জন্য। তিনি একটি দুই তোমানের নোট বের করে আমাকে সাধলেন।
আমি বললাম তার পয়সা দেয়ার দরকার নেই। খোদা হাফেজ বলে গাড়ী চালিয়ে চলে আসলাম।
দু’ দিন পর আমি হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করলাম আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে। তিনি তার সাধারণ কক্ষটিতে বসেছিলেন অন্য কিছু লোকের সাথে। সালামের পর শেইখ আমার দিকে তাকালেন ও আমার মন পড়ে বললেন :
“ তুমি বৃহস্পতিবার রাতগুলোতে অপেক্ষা করছো ; তুমি উপস্থিত থাকবে।”
আমি প্রতিদিন (ধর্মীয়) কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করছিলাম হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) এর সাথে সম্পর্কিত এবং যা তিনি বুঝিয়েছিলেন‘ তুমি উপস্থিত থাকবে’ বলে সেটা হলো আমি উপস্থিত থাকবো ইমাম মাহদী (আঃ)-এর পুনরাগমনের সময়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের করা পূর্ণ রহমতের কারণে হযরত শেইখের কথা আমাকে বিশেষ ভাবে স্পর্শ করলো এবং আমরা সকলে একত্রে অনেক কাঁদলাম , হযরত শেইখ তখন বললেনঃ
“ তুমি জানো কী ঘটেছে যে তুমি আমার কাছে এসেছো ? সেই খাটো মহিলাটি যে তোমার গাড়িতে উঠছিলো এবং তুমি তার কাছ থেকে কোন টাকা নাও নি , সে তোমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করায় সর্বশক্তিমান আল্লাহ তার দোয়ায় সাড়া দিয়েছেন এবং তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।”
অন্ধ লোকের সাহায্য করাও অন্তরের জ্যোতি
সেই একই লোক বর্ণনা করেছেন :
‘ একদিন আমি ঐ একই ট্যক্সী চালাচ্ছিলাম সালসাবিল এভিনিউতে যখন আমি দেখলাম একজন অন্ধ মানুষ অপেক্ষা করছে রাস্তার পাশে কেউ তাকে সাহায্য করবে এ আশায়। আমি সাথে সাথে থামলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় তিনি যেতে চান।
‘ আমি রাস্তা পার হতে চাই’ -অন্ধ লোকটি বললো।
‘ সেখান থেকে কোথায় যেতে চান ?-আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘ না আমি আপনাকে আর বিরক্ত করবো না’ , বললেন মানুষটি।
আমি নাছোড়বান্দা হওয়ায় তিনি বললেন তিনি হাশেমী এভিনিউতে যাবেন আমি তাকে তার গন্তব্যে নিয়ে গেলাম।
পর দিন আমি যখন হযরত শেইখের সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন:
‘ কী সেই অন্ধ লোকটির ঘটনা যাকে তুমি গতকাল গাড়ীতে পৌঁছে দিলে ?”
আমি তাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি বললেন :
‘ গত কাল থেকে যখন তুমি তা করেছো সর্বশক্তিমান আল্লাহ একটি আলো সৃষ্টি করেছেন যা বারযাখকে এখনও আলোকিত করে রেখেছে।’
চল্লিশজনকে খাওয়ানো ও রোগীর আরোগ্য লাভ
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন :
“ আমার ছেলে একটি দুর্ঘটনার কারণে হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। আমি হযরত শেইখের কাছে গেলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম কী করবো। তিনি বললেন :
“ দুশ্চিন্তা করো না। একটি ভেড়া কেনো। প্রতিবেশী চল্লিশ জন শ্রমিক জড়ো করো এবং‘ আবগুশত’ (গোস্তের তরকারী) তৈরী করে তাদেরকে পরিবেশন করো এবং একজন ধর্মপ্রচারককে ভোজের শেষে দোয়া করতে বলো। যখন ঐ চল্লিশজন লোক বলবে‘ আমিন’ তোমার ছেলে সুস্থ হয়ে যাবে ও বাসায় ফেরত আসবে।”
খরাতে বৃষ্টি
হযরত শেইখের ছেলে বলেন : বেশ কয়েকজন চাষী সারি (ইরানের মাযান্দারান প্রদেশের রাজধানী) থেকে আমার বাবার কাছে এলো এবং বললো‘ সারি’ -তে চরম খরা চলছে এবং সব গাছ শুকিয়ে গেছে এবং লোকেরা চাপের মধ্যে আছে । আমার বাবা বললেন :“ যাও একটি গরু জবাই করো ও লোকেদের খাওয়াও!”
চাষীরা‘ সারি’ তে একটি টেলিগ্রাম পাঠালো একটি গরু জবাই দেয়ার জন্য এবং এক হাজার লোককে খাওয়ানোর জন্য।
বলা হয়েছে সেই ভোজের সময় এত বেশী বৃষ্টি হয়েছিলো যে অতিথিদের জায়গামত পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছিলো। এ ঘটনা হযরত শেইখের সাথে ঐ এলাকার লোকদের একটি সুসম্পর্ক সৃষ্টি করলো। তাকে বেশ কয়েকবার‘ সারি’ তে বৈঠকের জন্য দাওয়াত করা হয়েছিলো।
সন্তান লাভের জন্য লোক খাওয়ানো
সেই একই ব্যক্তি বর্ণনা করেন : কেউ একজন সন্তান লাভে ব্যর্থ হলো দেশের ভিতরে ও বিদেশে চিকিৎসার পরও। হযরত শেইখের এক বন্ধু তাকে হযরত শেইখের কাছে নিয়ে এলো এবং তাকে সমস্যার কথা বললো। তিনি বললেন :
“ আল্লাহ তাদেরকে দু’ টো সন্তান দিবেন এবং প্রত্যেকের জন্য একটি গরু তারা অবশ্যই জবাই করবে এবং লোকদের মাঝে বিলি করবে।”
সে জিজ্ঞেস করলো কীসের জন্য। হযরত শেইখ বললেন :
“ আমি ইমাম রেজা (আঃ) কে অনুরোধ করলাম এবং তিনি রাজী হলেন।”
যখন প্রথম সন্তানটি জন্ম গ্রহণ করলো তার বাবা একটি গরু জবাই করে হযরত শেইখের আদেশে তা লোকদের দিলেন। দ্বিতীয় সন্তানটি জন্ম নেয়ার পর তার কিছু আত্মীয় তাকে গরু জবাই করা থেকে এবং লোকদের খাওয়ানো থেকে বিরত রাখলো। এই প্রতিবাদ করে যে শেইখ রজব আলী কি কোন ইমামের সন্তান অথবা সে মোযেযা দেখাচ্ছে! সে কে এ ধরণের আদেশ দেয়ার ? এভাবে তারা তাকে বিরত রাখলো ওয়াদা রক্ষায়। হযরত শেইখের সাথে যে তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো সে যখন তাকে বললো ওয়াদা রক্ষা করতে সে তাকে বললো তা সম্পূর্ণ কুসংস্কার। কিছুদিন পর দ্বিতীয় সন্তানটি মারা গেলো।
ক্ষুধার্ত পশুকে খাওয়ানোর নেয়ামত
হযরত শেইখের এক বন্ধু বলেন যে হযরত শেইখ তাকে বলেছেন :“ কেউ একজন তেহরানের পুরোন গলিগুলো পার হচ্ছিলো যখন হঠাৎ সে দেখলো একটি কুকুরকে একটি ড্রেনের ভিতরে যার বাচ্চাগুলো তার বুকে ধাক্কা দিচ্ছিলো দুধের জন্য , কিন্তু কুকুরটি ছিলো খুব ক্ষুধার্ত তাই তার দুধ ছিলো না বাচ্চাদের দেয়ার জন্য এবং খুব কষ্টে ছিলো এ কারণে। এ দৃশ্য দেখে ঐ লোকটি তখনই চলে গেলো কাছের এক কাবাবের দোকানে এবং বেশ কয়েকটি কাবাব এনে কুকুরটিকে দিলো----। সে রাতেই সকালের দিকে তাকে আল্লাহ বর্ণনাতীত এক রহমত করলেন।”
বর্ণনাকারী বলেন : যদিও হযরত শেইখ কখনো বলেন নি কে সেই ব্যক্তি ছিলো। প্রমাণ ইঙ্গিত করে যে তিনি নিজেই ছিলেন সেই ব্যক্তি।
ডঃ ফারযাম বলেন : যখনই আমি হযরত শেইখকে বিদায়ের সময় জিজ্ঞাসা করতাম তিনি আমাকে কোন উপদেশ দিবেন কিনা। তিনি বলতেন :“ মানুষের কল্যাণ করতে ভুলো না , এমনকি পশুপাখিরও।” 154
আল্লাহর ভালোবাসায় অন্যের কল্যাণ
অন্য লোকের কল্যাণের পিছনে কী নিয়ত ছিলো এবং কীভাবে তা সম্পাদন করা হলো তা হযরত শেইখের দৃষ্টিতে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ। হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন ইমামরা (আঃ) ও আল্লাহর বন্ধুরা যেভাবে অন্যের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন ঠিক আমাদেরও সেভাবে অন্যের সেবায় থাকতে হবে। তাদের সেবায় তাদের কোন লক্ষ্য ছিলো না একমাত্র আল্লাহর কারণে এবং তাঁর ভালোবাসা ছাড়া। এ বিষয়ে তিনি বলতেন :
“ অন্যের প্রতি কল্যাণকে অবশ্য হতে হবে আল্লাহমুখী হওয়ার কারণে ;
) إِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللَّهِ(
“ আমরা তোমাদের খাওয়াই শুধু আল্লাহর কারণে।” (সূরা ইনসান- 09)
কত ভালোবাসায়না তোমরা পয়সা ব্যয় কর তোমাদের সন্তানদের জন্য এবং তাদের ভালোবাসো! শিশু সন্তানরা কি কিছু করতে পারে তাদের পিতা-মাতার জন্য ? পিতা-মাতারা তাদের বাচ্চাদের প্রেমে থাকে এবং তাদের জন্য পয়সা খরচ করে ভালোবাসায়। কেন তোমরা তাহলে আল্লাহর সাথে একই আচরণ করো না ? কেন তোমরা তাকে ততটুকু ভালোবাসো না যতটুকু ভালোবাসো তোমাদের সন্তানদের ?! এবং যদি হঠাৎ করে তোমরা কারো উপকার করে ফেলো তোমরা তার জন্য পুরস্কার চাও!”
অন্যের সেবার বিষয়ে ইমাম খোমেইনী (রঃ)- এর উপদেশ
এ অধ্যায়ের শেষে অন্যের সেবার বিষয়ে ইমাম খোমেইনী (রঃ)- এর দিক নির্দেশনা যথোপযুক্ত হবে। ইমাম খোমেইনী তার ছেলে আহমদ (রঃ)-কে অসিয়ত করেছেন :
“ হে আমার সন্তান! মানবিক দায়িত্ব এড়িয়ে যেও না , তা হলো আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালন , জনগণের কল্যাণের আকারে। কর্মকর্তা ও জনগণের দায়িত্বে যারা রয়েছে শয়তান তাদের মাঝে এ মাঠে কম ঘোড়া চালায় না এবং পদের জন্য সংগ্রাম করো না , না আধ্যাত্মিক না পৃথিবীর পদ ঐশী জ্ঞান লাভ ও আল্লাহর বান্দাদের সেবা করার বাহানায়। এ ধরণের পদ মর্যাদার প্রতি মনোযোগই হচ্ছে শয়তানী। তার জন্য সংগ্রাম করা থেকে দূরে থাকো। আল্লাহর সতর্কবাণীতে কান দাও আন্তরিকভাবে এবং ঐ দিকেই পথ পরিক্রম করো :
) قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُمْ بِوَاحِدَةٍ أَنْ تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَى وَفُرَادَى(
“ বলো , আমি তোমাদের একটি বিষয়ে সতর্ক করি যে , তোমরা দাঁড়িয়ে যাও আল্লাহর সামনে (হতে পারে) জোড়ায় অথবা (হতে পারে) একাই ।” (সূরা সাবা-46)
পথ পরিক্রমের শুরুতেই যে ব্যবস্থা নাও সেটিই আল্লাহর জন্য উত্থান। ব্যক্তিগত কাজে ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও ; চেষ্টা করো সফল হতে প্রথম পদক্ষেপে যা যুবক বয়সে অর্জন করা সহজ। নিজেকে তোমার বাবার মত বৃদ্ধ হতে দিও না। তাতে তুমি হয় একই জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকবে অথবা পিছনের দিকে যাবে। এতে দরকার সতর্ক পাহারা ও আত্ম -পর্যালোচনা। যদি কোন মানুষ জীন ও মানবজাতির সার্বভৌমত্ব অর্জন করে এক ঐশী উদ্দেশ্যে সে হলো ঐশী জ্ঞানের অধিকারী এবং এ পৃথিবীতে একজন আত্ম -সংযমী সাধক ; কিন্তু যদি সে শরীরীভাবে ও শয়তানীর কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকে , সে যাই অর্জন করে , এমনকি তা যদি একটি তাসবীহও হয় তাহলে সে আল্লাহর কাছ থেকে সেই অনুপাতে দূরে সরে যাবে।”
অষ্টম অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের দোয়া
হযরত শেইখের বিদ্যালয়ে যারা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তাদের একটি সুপরিচিত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের নামাযের মাঝে মনোযোগ। আর তা সম্ভব হয়েছে শুধু এজন্য যে হযরত শেইখ আত্মা-বিহীন লোক দেখানো নামাযের কোন মূল্য দেন নি এবং চেষ্টা করেছেন তার শিষ্যরা যেন সত্যিকারভাবে নিবেদিত হয়ে নামায পড়ে।
নামাযের বিষয়ে হযরত শেইখের দিক নির্দেশনায় আছে চারটি নীতি যা পবিত্র কোরআন ও হাদীস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে :
1. প্রেম
হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন একজন প্রেমিক তার মাশুকের সাথে কথা বলা উপভোগ করে। একজন নামাযীরও উচিত রবের সাথে নীচু কন্ঠে প্রেমপূর্ণ কথা বলায় আনন্দ লাভ করা। ব্যক্তিগতভাবে তিনি এরকমই ছিলেন যেমন আল্লাহর বন্ধুরা হন। নবী (সাঃ) বলেছেন :
“ আল্লাহ , যিনি মহান , তাঁর প্রশংসাকে আমার চোখের আনন্দ করেছেন নামাযে , নামাযকে করেছেন আমার কাছে প্রিয় যেভাবে তিনি খাবারকে করেছেন ক্ষুধার্তের কাছে প্রিয় এবং পানিকে তৃষ্ণার্তের কাছে প্রিয় ; (পার্থক্য এই) যখন ক্ষুধার্ত খাবে সে তৃপ্ত হবে এবং তৃষ্ণার্ত পান করবে তার তৃষ্ণা মিটে যাবে , কিন্তু আমি কখনও তৃপ্ত হই না (অথবা তৃষ্ণা মেটেনা) নামায পড়া থেকে।” 155
হযরত শেইখের এক শিষ্য যে তার জীবনের ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন তার সাথে , তিনি বলেন :
‘ আল্লাহ জানেন যে আমি তাকে দেখেছি এমনভাবে নামাযে দাঁড়াতে যেমন প্রেমিক তার মাশুকের সামনে দাঁড়ায়। তার সৌন্দর্যে নিমন্ন হয়ে। আমি আমার সারা জীবনে তিনটি লোককে দেখেছি নামাযে অসাধারণ : মরহুম শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত , আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানি এবং মাশহাদে শেইখ হাবিবুল্লাহ গুলপায়গানী ।
তারা নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন বিস্ময়কর । আমি অতিন্দ্রীয়ভাবে দেখলাম যে তাদের চারদিকে পরিবেশ ছিলো ভিন্ন পৃথিবীর ; তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন দিকে মনোযোগ দিতেন না।
2. সৌজন্য
আল্লাহর উপস্থিতিতে নামাযীর সৌজন্য বজায় রাখার উপরে ইসলামে বিরাট জোর দিয়েছে। ইমাম সাদিক (আঃ) এ প্রসঙ্গে বলেছেন :
“ নামাযের অধিকার হলো এটি জানা যে নামায হলো সর্বোচ্চ আল্লাহর উপস্থিতিতে প্রবেশ করা এবং যখন দাঁড়াও তখন তুমি মহিমান্বিত আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছো। তাই এটি জেনে , তোমার নামাযে দাঁড়ানো উচিত মর্যাদাহীন এবং বিনয়ী দাস হিসেবে। আন্তরিকভাবে নিবেদিত হয়ে , আশার সাথে ভীত হয়ে , অসহায়ভাবে কান্না কাটি করে ; এবং নামাযে এগিয়ে যাও শান্ত ভাবে এবং সৌন্দর্যের সাথে , যাঁর সামনে দাঁড়াচ্ছো তাকে বিরাট সম্মান দেখিয়ে এবং তা আন্তরিকভাবে সম্পাদন করো , এর সব নিয়ম কানুন পুরোপুরি মেনে।” 156
হযরত শেইখ উপস্থিত থাকার সৌজন্য সম্পর্কে বলেন :
“ শয়তান সব সময় মানুষকে অমনোযোগী করে দেয়। মনে রাখবে আল্লাহর প্রতি মনোযোগ না ভাঙ্গতে , নামাযে সৌজন্য বজায় রাখো ঠিক যে ভাবে দাঁড়াও কোন সম্মানিত ব্যক্তির সামনে ; যদি তোমার শরীরকে সুঁই দিয়ে খোঁচা দেয়া হয় তোমার শরীর নড়বে না।”
উপরের কথাগুলো হযরত শেইখ তার ছেলেকে বলেছিলেন যে তাকে বলেছিলো‘ আপনি নামাযে মাঝে মাঝে মুচকি হাসেন।’
তার ছেলে বলেন :
‘ আমার মনে হয় শয়তানের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন যে তাকে কিছু করতে পারে না।’
যা হোক হযরত শেইখ বিশ্বাস করতেন যে আল্লাহর সামনে শরীর নাড়ানো অভদ্রতা যা শয়তানের উস্কানিতে হয়। তিনি বলেছেন :
“ আমি দেখেছি শয়তান শরীরের সে অংশে চুমু দিচ্ছে যে অংশটি এক ব্যক্তি চুলকালো নামাযের ভিতরে।”
3. অন্তরের উপস্থিতি
নামাযের মর্যাদা হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং মহিমান্বিত আল্লাহর সান্নিধ্যে নামাযীর অন্তরের উপস্থিতি ।
“ আল্লাহ কোন ব্যক্তির নামায কবুল করবেন না যার অন্তর তার দেহের সাথে উপস্থিত নয়।” 157
জামায়াতে নামায পড়ার আগে হযরত শেইখ চেষ্টা করতেন যারা নামাযের জন্য উপস্থিত আছে তারা অন্তরের উপস্থিতি লাভ করুক। তার নামায ছিলো অন্তর উপস্থিত থাকার আদর্শ নমুনা।
ডঃ ফারযাম বলেন : তার নামায ছিলো খুবই গম্ভীর ও সুন্দর আচরণের।158 মাঝে মাঝে আমি জামায়াতে নামাযে দেরীতে আসতাম এবং (পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়) নামাযে তার দেহ সৌন্দর্য দেখতাম। দেখলে মনে হতো তার সারা শরীর কাঁপছে ; উজ্জ্বল চেহারায় তিনি যা পড়তেন তাতে নিমজ্জিত থাকতেন। তার মনোযোগ পুরোপুরি নামাযের দিকে থাকতো এবং মাথা সব সময় নীচু থাকতো। আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো হযরত শেইখ কখনোই তার অন্তরে সামান্য সন্দেহ পোষণ করতেন না ।’
হযরত শেইখের আরেকজন শিষ্য বলেন : তিনি আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন :
“ হে অমুক! তুমি কি জানো তুমি রুকুতে ও সিজদাতে কী বলো ? যখন তুমি তাশাহুদ বলো : আমি সাক্ষ্য দেই যে কোন ইলাহ নেই আল্লাহ ছাড়া , যিনি অদ্বিতীয় ও কোন অংশীদারবিহীন ; তুমি কি সত্য বলছো ? তুমি কি তোমার শরীরী আকাঙ্ক্ষার ভেতর জড়িয়ে নেই ? তুমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্যের দিকে মনোযোগী নও ? তুমি কি অনেক ইলাহ নিয়ে কারবার করছো না যারা নিজেদের মধ্যে বিভেদ করছে।”
4. নামায যথাসময়ে পড়াতে অধ্যাবসায়
ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন :
“ ওয়াক্তের শুরুতে নামাযের মর্যাদা ওয়াক্তের শেষে পড়ার চাইতে ততটুকু মর্যাদাবান যেমন আখেরাতের মর্যাদা দুনিয়ার উপরে।” 159
হযরত শেইখ যথাসময়ে পাঁচবার নামায পড়াতে খুবই তৎপর ছিলেন এবং অন্যদেরও তা করতে বলতেন।
“ ইমাম হোসেইন (আঃ) এর একজন দাস তার নামায এত দেরীতে পড়ার জন্য রেখে দেবে না”
যোগ্য ধর্মপ্রচারক , হজ্ব আগা সাইয়্যেদ কাসিম শোজাই হযরত শেইখ সম্পর্কে এক আনন্দদায়ক স্মৃতি বর্ণনা করেন :
‘ আমি খুতবা দিতাম আমার স্কুল জীবন থেকে এবং আমি ছিলাম সুন্দর বক্তব্যের ধর্মপ্রচারক। আমাকে অনেক বৈঠকে দাওয়াত দেয়া হতো‘ মাসায়েব’ (কারবালার মুসিবত) বলার জন্য , এমনকি হযরত শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতের বাড়িতে পর্যন্ত প্রত্যেক চাঁদের মাসের সাত তারিখে। উপরের তলায় ডান দিকে একটি কক্ষ ছিলো এবং মহিলারা সেখানে জড়ো হতো এবং‘ মাসায়েব’ বলতাম প্রতি মাসে একবার। হযরত শেইখের কক্ষ ছিলো নীচের তলায়। আমার বয়স তখন তের বছর এবং তখনও বালেগ হই নি।
একদিন খোতবা শেষ হওয়ার পর আমি নীচের তলায় আসলাম এবং হযরত শেইখের মুখোমুখি হলাম প্রথম বারের মত। তিনি তার হাতে একটি টুপি ধরে ছিলেন , মনে হলো বাইরে যাচ্ছেন। আমি বললাম‘ সালাম’ । তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন এবং বললেন :
“ নবী (সাঃ)-এর সন্তান এবং ইমাম হোসেইন (আঃ)-এর দাস তার নামাযকে এখন পর্যন্ত দেরী করবে না!!”
আমি (মনে মনে) বললাম :‘ আমার চোখের কসম! সূর্য ডোবার তখনও দু’ ঘন্টা বাকী এবং আমি সেদিন এক জায়গায় মেহমান ছিলাম এবং নামায পড়ি নি ;’ হযরত শেইখ আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে সাথে সাথেই তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং তা আমার কাছে উল্লেখ করলেন। আমার বালেগ হওয়া থেকে এবং তারপর থেকে যখনই আমি তার বৈঠকে যোগদান করেছি , যেগুলো আগা হাকিমি আহনান ফুরুশের বাড়িতে হতো ,
আমি অনুভব করতাম এ লোকের কথা ছিলো ঐশী প্রেরণার মাধ্যমে। তার কোন আনুষ্ঠানিক জ্ঞান ছিলো না কিন্তু তিনি যখন কথা বলতেন শ্রোতারা তাতে আন্তরিকভাবে নিমন্ন হতো। আমি এখনও মনে করতে পারি তার কিছু কথা :
“‘ আমরা’ শব্দটি পেছনে ফেলে আসো ; যেখানেই‘ আমরা’ ও‘ আমি’ শব্দ রাজত্ব করে সেখানে বাস করে শিরক। শুধু একটি সর্বনামই রাজত্ব করছে তা হলো‘ তিনি’ । এবং যদি তুমি এ সর্বনামকে পাশে সরিয়ে রাখো অন্য সর্বনামগুলো শেরেকী।”
এ ধরণের কথা তিনি যখনই বলতেন সেগুলো মানুষের অন্তর ও মনে জ্বল জ্বল করতো।
রাগ নামাযের জন্য ধ্বংস
হযরত শেইখ বলেন :
“ এক সন্ধ্যায় আমি তেহরানে সিরুস এভিনিউর মসজিদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মসজিদে প্রবেশ করলাম নামায যথাসময়ে পড়ার ইচ্ছায় এবং‘ শাবিস্তানের’ ভেতরে প্রবেশ করলাম। সেখানে আমি দেখলাম কেউ একজন নামায পড়ছে এবং তার মাথার চারদিকে নূরের একটি বৃত্ত। আমি মনে মনে ভাবলাম আমি তার সাথে পরিচিত হবো দেখার জন্য কী গুণাবলী তার আছে যা তাকে নামাযে এমন আধ্যাত্মিক অবস্থা দিয়েছে। জামায়াতের নামাযের শেষে আমি তার সাথে মসজিদ থেকে বেরিয়ে এলাম। গেটে এসে মসজিদের খাদেমের সাথে তার তর্ক হয়ে গেলো। এমনকি লোকটি তার প্রতি রাগ হয়ে চীৎকার করলো এবং তার রাস্তায় চলে গেলো। রাগের পর , আমি দেখলাম তার মাথার চারদিকে যে নূরের বৃত্ত ছিলো তা হারিয়ে গেলো!”
নবম অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের হজ্ব
হযরত শেইখ অর্থনৈতিক কারণে কখনো বাধ্যতামূলক হজ্বে যেতে পারেন নি। তারপরও কিছু হজ্ব যাত্রীর প্রতি তার দিক নির্দেশনা ইঙ্গিত দেয় যে তিনি আল্লাহর বন্ধুদের হজ্বের রহস্য সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন তখনই প্রকৃতপক্ষে হজ্ব সংগঠিত হবে যখন হাজ্বী কাবার প্রভুর সাথে প্রেমে থাকবে যেন সে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতাগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কেও বুঝতে পারে। তাই একজন তার সাথে একত্রে হজ্বে যেতে চায় শুনে তিনি বলেন :
“ প্রথমে জানো কীভাবে একজন প্রেমিক হতে হয়। এরপর মক্কায় একত্রে যাওয়ার জন্য আসো ।”
হজ্ব যাত্রীদের প্রতি হযরত শেইখের উপদেশ
1. হযরত ওয়ালী আল আসর (আঃ) সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা
হযরত শেইখের এক পুরানো শিষ্য বলেন : প্রথম বার যখন আমি হজ্বের জন্য মক্কা যাচ্ছিলাম আমি তার কাছে গেলাম দিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য :
“ তোমার রওয়ানা দেয়ার সময় থেকে চল্লিশ দিন এ আয়াতে কারিমা পড়ো :
) رَبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَلْ لِي مِنْ لَدُنْكَ سُلْطَانًا نَصِيرًا(
‘ হে আমার রব আমাকে প্রবেশ করান সত্য ও সম্মানের দরজা দিয়ে এবং একইভাবে বের করে আনুন সত্য ও সম্মানের দরজা দিয়ে এবং আমাকে দান করুন আপনার কাছ থেকে অনুমোদন ও সাহায্য।’ (সূরা বনি ইসরাইল : 80)
হয়তোবা তুমি হযরত মাহদী (আঃ) এর সাক্ষাত পাবে। তিনি আরো বলেন :“ এটি কীভাবে সম্ভব যে একজনকে কারো বাসায় দাওয়াত করা হবে আর সে বাড়ির মালিককে দেখবে না! ? পূর্ণ সতর্ক হও যেন সেই মহিমান্নিত ইমাম (আঃ)-কে দেখতে পাও হজ্বের কোন একটি আনুষ্ঠানিকতার সময় , ইনশাআল্লাহ।”
2. ইহরাম অবস্থায় আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছুর ভালোবাসা হারাম করে নাও
“ যে ব্যক্তি মিক্বাতে ইহরাম পড়বে তার জানা উচিত যে , সে এখানে এসেছে নিজেকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু থেকে বিরত রাখতে এবং যে মুহূর্ত থেকে সে বলে‘ লাব্বায়েক’ সে আল্লাহর দাওয়াত গ্রহণ করেছে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুকে নিজের জন্য হারাম করেছে। আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোন বিষয়ে আগ্রহ হারাম এবং তার জীবনের শেষ পর্যন্ত তার উচিত নয় আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুতে মনোযোগ দেয়া।”
3. আল্লাহকে প্রাথমিকভাবে জানা সম্পূর্ণ করে নেয়া কাবা প্রদক্ষিণ করার সময়
“ কাবাকে প্রদক্ষিণ করা মানে বাইরের দিক থেকে ঘরের চারদিকে ঘোরা , কিন্তু তোমাদের জানা উচিত যে এই প্রদক্ষিণের অর্থ হচ্ছে আল্লাহকে একজন মানুষের জীবনের অক্ষরেখা বানিয়ে নেয়া এবং তাঁর মাঝে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়া। চেষ্টা করো একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা পেতে যেন তোমরা তাঁকে প্রদক্ষিণ করো এবং তাঁর জন্য উৎসর্গ হয়ে যাও।” 160
4. কাবার ছাদের পানি পড়ার নলের নীচে দোয়া
“ হিজরে ইসমাইল এবং কাবার ছাদের পানি পড়ার সোনালী রঙের নলের নীচে যেখানে হাজীরা আল্লাহর কাছে অনুনয় করে তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য তুমি সেখানে বলো :‘ হে আল্লাহ , আমাকে প্রশিক্ষণ দিন আপনার দাসত্ব করার জন্য এবং আপনার ওয়ালী হুজ্জাত ইবনুল হাসান (আঃ) কে সাহায্য করার জন্য।’
5. মিনাতে শরীরী নফসকে হত্যা করা
“ তোমরা যখন মিনাতে যাও , কোরবানীর জায়গায় তোমরা কী কর ? তোমরা কী জানো কোরবানীর দর্শন কী ? তোমাদের উদ্বুদ্ধকারী শরীরী নফসকে উৎসর্গ করো!
) فَتُوبُوا إِلَى بَارِئِكُمْ فَاقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ(
‘ তাই ফেরো (অনুতপ্ত হয়ে) তোমার সৃষ্টিকর্তার দিকে এবং নিজেদের হত্যা করো (জালেমদের)।’
(সূরা আল বাকারা -54)
তোমার শরীরী নফসের মাথা আলাদা করে দাও এবং ফিরে আসো। তোমার শরীরী নফসকে বিদায় করে দাও , বরং তা না হলে ফিরে আসার পর তা আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।”
একমাত্র জায়গা যেখানে তারা ভালোবাসা প্রদর্শন করলো
(হজ্ব থেকে) ফিরে এসে আমি হযরত শেইখের সাক্ষাতে গেলাম এবং বললাম :
‘ আমি জানতে চাই এর ফলাফল কী’ ।
তিনি বললেন :
“ তোমার মাথা নীচু করো ও আল-হামদ তেলাওয়াত করো!”
তখন তিনি এক মুহূর্ত ভাবলেন এবং বললেন , আমি মসজিদুল হারামের কোন জায়গা দিয়ে অতিক্রম করেছি এবং আমার অবস্থান সম্পর্কেও এমনভাবে যে তিনি বললেন :
“ একমাত্র জায়গা যেখানে তারা তোমার প্রতি ভালোবাসা দেখিয়েছে তা হচ্ছে বাক্বী কবরস্থানে যেখানে তুমি এমন অবস্থায় ছিলে এবং এগুলো দাবী করেছিলে।”
আমি সেখানে আল্লাহকে যা অনুরোধ করেছি তা তার কাছে প্রকাশ করা হয়েছে।
‘ হজ্ব থেকে ফেরার পর ভোজ’
হজ্ব থেকে ফেরার পর আমি হযরত শেইখকে ও অন্যান্য কয়েকজনকে আমার বাড়িতে‘ হজ্ব ফেরত ভোজে’ দাওয়াত করলাম। আমরা ভোজের জন্য‘ চেলো কাবাব’ তৈরী করেছিলাম। আমরা বারান্দায় একটি আলাদা দস্তরখান দিলাম হযরত শেইখের জন্য ও কিছু ব্যক্তিগত মেহমানের জন্য। তা লক্ষ্য করে শেইখ আমাকে ডাকলেন এবং বললেন :
“ কেন তুমি লোক দেখাও ? নিজের বিষয়ে বেশী গর্ব করো না। লোকদের মাঝে পার্থক্য করো না ; তাদের সাথে সমানভাবে আচরণ করো। কেন তুমি কিছু লোককে বেশী মূল্য দিবে ? না , আমি অন্যদের সাথে মিশে যাবো। আলাদা করা যাবে না।”
হজ্বের রহস্যাবলী ইমাম খোমেইনী (রঃ)-এর বক্তব্যে
এটি জানা যথাপোযুক্ত হবে যে হযরত শেইখ হজ্বের যে দর্শন উল্লেখ করেছেন নিজের অতিন্দ্রীয় জ্ঞানের মাধ্যমে তা ইমাম খোমেইনী (রঃ) হজ্বের রহস্য উল্লেখ করে যা বলেছেন তার খুবই কাছাকাছি। এখানে তা উল্লেখ করা হলো :
বার বার‘ লাব্বায়েক’ বলার রহস্য
বার বার লাব্বায়েক বলা তাদের জন্য সত্য যারা আল্লাহর ডাক শুনেছে তাদের কান দিয়ে ও তাদের সত্তা দিয়ে এবং তারা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিচ্ছে তার সব নামের সার সংক্ষেপ নাম নিয়ে। বিষয়টি হচ্ছে‘ পরম উপস্থিতির’ সামনে উপস্থিত হওয়া এবং মাশুকের সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করা। যদিও যিকরকারী এ মুহূর্তে নিজের ভেতর হারিয়ে গেছে এবং বার বার ডাকে সাড়া দিচ্ছে এবং এর পর পরই অস্বীকার করছে সম্পর্ক (আল্লাহ ছাড়া অন্যের সাথে) এর পরম অর্থে (এবং) শুধু খোদার সাথে সম্পর্ক স্বীকার করা নয় যা আল্লাহর জন্য উৎসর্গিতরা জানে। সম্পর্ক ছেদ করা সব ধাপকে অন্তর্ভুক্ত করে এ পৃথিবী বিলীন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তিদের দৃষ্টিতে এবং অন্তর্ভুক্ত করে সব সতর্কতামূলক ও পছন্দনীয় বিষয়সমূহ। উদাহরণ স্বরূপ : আল হামদ লাকা ওয়াল নি’ মাতা লাকা----- উৎসর্গ করে প্রশংসাকে ও নেয়ামতকে পরম সত্তাকে এবং শিরক অস্বীকার করে। এটি জ্ঞানী ব্যক্তিদের কাছে পরম একত্ববাদ , অর্থাৎ কোন প্রশংসা ও নেয়ামত যা ঘটে (আল্লাহ ছাড়া অন্যের)। এ উচ্চ উদ্দেশ্য বিজয়ী থাকে প্রত্যেক মওক্বীফ (অবস্থায়) এবং মাশআর (ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের স্থান) , প্রত্যেক থামা ও প্রত্যেক চলায় এবং প্রত্যেক বিশ্রাম এ প্রত্যেক কাজে। এর বিরোধিতা করা মানে সাধারণভাবে শরীক করা। যা হোক আমরা অন্ধ হৃদয়ের যারা , তারা সবাই ভুগছি।161
তওয়াফের রহস্য
‘ আল্লাহর ঘরের চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করার অর্থ হচ্ছে তুমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে প্রদক্ষিণ করবে না।162
আল্লাহর পবিত্র ঘরকে প্রদক্ষিণ করার সময়- যা আল্লাহকে ভালোবাসার নিদর্শন , অন্যদেরকে তোমার হৃদয় থেকে বের করে দাও এবং সমস্ত ভয়কে বিতাড়িত করো তোমার সত্তা থেকে আল্লাহর ভয় ছাড়া এবং আল্লাহর প্রেমের সাথে সংগতি রেখে অস্বীকার করো বড় ও ছোট মূর্তিদের , তাগুত ও তার সাথীদের , যেগুলি অস্বীকার করেছে আল্লাহ ও তার বন্ধুরা এবং পৃথিবীর সকল মুক্তিপ্রাপ্তরা এ থেকে মুক্ত।’ 163
আল্লাহর কাছে বায়াত (অনুগত্যের শপথ)
“ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময় আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শপথ করো যে তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলদের এবং ধার্মিক ও মুক্তিপ্রাপ্তদের শত্রুদের শত্রু হবে এবং তাদের মানবে না ও তাদের দাসত্ব করবে না , তারা যে-ই হোক এবং যেখানেই হোক ; এবং অন্তর থেকে আল্লাহর শত্রুদের ভয় দূর করো , যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে বড় শয়তান (যুক্তরাষ্ট্র) এমনও যদি হয় তারা খুন খারাবী , অত্যাচার ও অপরাধী কাজে অধিকতর শক্তিশালী।” 164
সা-ই (প্রচেষ্টা) মাশুককে পাওয়ার জন্য
“ সাফা ও মারওয়ার মাঝে‘ সা-ই’ করার সময় চেষ্টা করো আন্তরিকভাবে ও সত্যবাদীদের সাথে মাশুককে খুঁজে পেতে ; যখন তুমি তাঁকে পাবে তখন সব দুনিয়াবী গিঁট খুলে যাবে , সব সন্দেহ দূরীভূত হবে , সব পাশবিক ভয় ও আশা মুছে যাবে এবং শয়তান ও মূর্তির বাঁধন যা আল্লাহর দাসদের বন্দি করে রাখে এবং মানতে বাধ্য করে , তা ছিঁড়ে যাবে।” 165
মনোযোগ ও ইরফান (আধ্যাত্মিকতা) মাশ’ আরে ও আরাফাতে
“ মাশ’ আর আল-হারাম ও আরাফাতে যাও মনোযোগ ও আধ্যাত্মিক অবস্থাসহ এবং যে কোন অবস্থানেই (মওক্বীফ) নিজেকে আরো নিশ্চিত করো আল্লাহর অঙ্গীকার সম্মন্ধে এবং’ নির্যাতিতদের রাজত্বে। নিরবতা ও গাম্ভীর্যের সাথে সত্যের নিদর্শনগুলোর উপর ভাবো এবং চিন্তা করো পৃথিবীর দাম্ভিক শক্তির হাত থেকে দরিদ্র ও নির্যাতিতদের মুক্ত করার জন্য এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে অনুরোধ করো ঐ পবিত্র স্থান গুলোতে তোমার মুক্তির পথ দেখাতে।” 166
মীনাতে কোরবানী করার রহস্য
“ এর পর মীনাতে যাও এবং সত্যিকার আকাঙ্ক্ষা খুঁজে নাও। যা হচ্ছে তোমার সবচে’ ভালোবাসার জিনিসকে পরম মাশুকের পথে কোরবানী করার স্থান। আর জেনে রাখো তুমি পরম মাশুকের কাছে পৌঁছুবে না যতক্ষণ না তুমি ভালোবাসায় এসব জিনিসকে পরিত্যাগ করতে না পারো। যার উপরে রয়েছে আত্মপ্রেম ও এ পৃথিবীর (বস্তুর) প্রতি ভালোবাসা।” 167
রজম-ই-আক্বাবাত (শয়তানের প্রতি পাথর ছোঁড়া)
“ তোমরা যাও ঐশী ভ্রমণে শয়তানকে পাথর ছুঁড়তে। যদি তুমি , খোদা না করুক , শয়তানদের বাহিনীর একজন হও তুমি পাথর নিজের দিকেই ছুঁড়বে। তোমার ঐশী ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া উচিত যেন তোমার পাথর মারা , দয়ালু খোদার বাহিনীর কর্তৃক শয়তানকে পাথর ছোঁড়ার মত হয়।” 168
দশম অধ্যায়
আল্লাহর বন্ধুদের ভয়
আল্লাহর প্রেম আলোচনা করার পর প্রথম যে বিষয়টি আসে তা হলো যদি আল্লাহ দয়ালু ও স্নেহশীল হন এবং তার প্রেম যদি বিবর্তনের জন্য সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয় তাহলে কেন ইসলামী কিতাবগুলোতে আল্লাহভীতিকে এত জোর দেওয়া হয়েছে। কেন পবিত্র কোরআনে আল্লাহভীতিকে আলেমদের সবচে’ সম্মানীয় গুণ বলা হয়েছে ? সবশেষে ভালোবাসা ও ভয় কি সাযুজ্যপূর্ণ ?
উত্তর হচ্ছে‘ হ্যাঁ’ ; হযরত শেইখ একটি আনন্দদায়ক উদাহরণ দিয়েছেন ভয় ও প্রেমের সাযুজ্যের উপর যা এ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। তার আগে ভয় ও আল্লাহ প্রেমের অর্থ আরেকবার দেখে নেই।
আল্লাহর ভয়-এর অর্থ
ঐশী ভয় ও প্রেম ব্যাখ্যার প্রথম বিষয়টি হচ্ছে আল্লাহর ভয় গুনাহ ও খারাপ কাজ করার ভয়। ইমাম আলী (আঃ) বলেছেন :
‘ ভয় পেয়ো না নিজের গুনাহ ছাড়া এবং আশা করো না তোমার রবকে ছাড়া।’ 169
আল্লাহকে ভয় করো না
একদিন আলী (আঃ) কারো মুখোমুখি হলেন যার চেহারা ভয়ে পরিবর্তন হয়ে গেছে , তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন :
“ তোমার কী হয়েছে ?”
লোকটি বললো :
‘ আমি আল্লাহর ভয়ে ভীত।’
ইমাম আলী (আঃ) বললেন :
“ আল্লাহর বান্দাহ! তোমার গুনাহকে ভয় করো এবং ভয় করো ঐশী ন্যায়বিচারের। তাঁর দাসদের বিরুদ্ধে তোমার অন্যায়ের বিচারে! আল্লাহকে মানো যা তিনি তোমার জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন এবং অবাধ্য হয়ো না যা তোমার জন্য ভালো সে বিষয়ে। তাই , আল্লাহকে ভয় করো না কারণ তিনি কখনও কারো প্রতি অবিচার করেন না এবং কাউকে শাস্তি দেন না তার প্রাপ্য পরিমাণ ছাড়া।” 170
বিচ্ছেদের ভয়
তাই কারো উচিত না আল্লাহকে ভয় করা এবং আমাদের উচিত ভয় করা আমাদেরকেই যেন আমরা জটিলতায় জড়িয়ে না যাই আমাদেরই অনুচিত কাজের কারণে। আল্লাহর বন্ধুদের অনুচিত কাজের শাস্তির ভয় সাধারণ মানুষের ভয়ের চাইতে ভিন্ন । যারা তাদের অন্তর থেকে আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছুর ভালোবাসা বিতাড়িত করেছে তাদের আল্লাহর প্রতি আনুগত্য না জাহান্নামের ভয়ে , না জান্নাতের আশায় ; তাদের একমাত্র ভয় বিচ্ছেদ। তাদের জন্য আল্লাহর সাথে বিচ্ছেদের কষ্ট জাহান্নামের কষ্টের চেয়ে কষ্টদায়ক। তাই আল্লাহর ওয়ালীদের নেতা আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ) বিলাপ করেন তার দোয়াতে আল্লাহর কাছে এভাবে-
“ তাই যদি আপনি আমাকে শাস্তি দেন আপনার শত্রুদের সাথে , জড়ো করেন আপনার শাস্তিপ্রাপ্ত লোকদের সাথে এবং আমাকে বিচ্ছিন্ন করেন আপনার বন্ধু ও পছন্দনীয়দের কাছ থেকে , তাহলে মনে করুন , হে আল্লাহ , আমার প্রভু , আমার নিরাপত্তারক্ষক এবং আমার রব যে আমি হয়তো আপনার শাস্তি সহ্য করতে পারলাম কিন্তু কীভাবে আমি আপনার বিচ্ছেদ সহ্য করবো (দোয়ায়ে কুমাইল)
হযরত শেইখ তাফসীর করেছেন এ আয়াতেরঃ
) يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا(
“ তারা ডাকে তাদের রবকে ভয়ে ও আশায়” (সূরা সাজদাহ-16)
এভাবে :
“ ভয় ও আশা কী ? বিচ্ছেদের ভয় ও তাঁর সাথে মিলনের আশা। এরকমই কথা আমিরুল মুমিনিন হযরত আলীর (আঃ) দোয়ায়ে কুমাইলে :
“ তাই মনে করুন , আমার আল্লাহ----কীভাবে আমি সহ্য করবো আপনার কাছ থেকে বিচ্ছেদ ?” এবং ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) এর দোয়ায় :
“ আপনার সাথে মিলন হচ্ছে আমার সত্তার ইচ্ছা এবং আপনার দিকেই আমার আকাঙ্ক্ষা ।” 171
বিখ্যাত সাধক এবং ফক্বীহ মরহুম মুল্লা আহমদ নারাক্বী এ বিষয়ে বলেন :“ ওয়ালীদের সম্রাট দোয়াতে বলেছেন , আমার সত্তা তার জন্য কোরবানী হোক হে আমার রব , হে আল্লাহ , হয়তো আমি আপনার শাস্তি সহ্য করলাম কিন্তু কীভাবে আমি সহ্য করবো আপনার সাথে বিচ্ছেদ , হে বন্ধু ?”
ধাত্রী বাচ্চাদেরকে আগুনের ভয় দেখায় (এ বলে) খেলা করো না হে অমুক , না হয় , আমি তোমার হাতে ও পায়ে আগুন রাখবো ; ছেঁকার দাগ দিবো তোমার চেহারায় ও পিঠে। কিন্তু বিচ্ছেদের শাস্তি ভয় পাইয়ে দেয় সিংহ (হৃদয়) মানুষকে (আলী (আঃ)) , হাজারগুণ বেশী ও আতংক দিয়ে।172
মাশুকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হওয়ার ভয়
আল্লাহর বন্ধুরা ভয় করে যদিও তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে। তারা ভয় পায় হয়তো মাশুক সেগুলো পছন্দ করবে না এবং গ্রহণ করবে না :
) وَالَّذِينَ يُؤْتُونَ مَا آتَوْا وَقُلُوبُهُمْ وَجِلَةٌ أَنَّهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ رَاجِعُونَ(
“ এবং যারা দান করে এবং তাদের অন্তর থাকে ভয়ে পরিপূর্ণ , কারণ তারা তাদের রবের কাছে ফিরবে।” (সূরা মুমিনিন-60)
মাশুক , যিনি পরম ও নিখুঁত , তার কাছে গৃহীত হওয়া আল্লাহর ওয়ালীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ , একইভাবে তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছেদ হৃদয়বিদারক ও তাদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে। এটি এমন জরুরী যে তেহরানের জুময়ার ইমাম বলেছেন যে ইমাম খোমেইনী (রঃ) তার জীবনের শেষ মুহূর্তে জনগণকে বলেছেন আল্লাহর কাছে দোয়া করতে যেন তিনি তাকে গ্রহণ করেন।
এখন দেখুন হযরত শেইখ কীভাবে একটি সুক্ষ্ণ আধ্যাত্মিক বিষয় একটি সাধারণ উদাহরণ দিয়ে বোঝান।
হযরত শেইখের এক শিষ্য বলেন : একবার তিনি (হযরত শেইখ) আমাকে বললেন :
“ হে অমুক! কার জন্য নববধূ নিজেকে সাজায় ?”
আমি বললামঃ‘ স্বামীর জন্য।’
তিনি বললেন :‘ তুমি বুঝেছো ?’
আমি চুপ করে রইলাম। তখন তিনি বললেন :
“ বাসর রাতে নববধূর আত্মীয়-স্বজনরা তাকে যতটুকু সম্ভব সুন্দর করে সাজায় যেন বর তাকে পছন্দ করে। কিন্তু বধূর একটি গোপন অংশ থাকে যা অন্যরা খেয়াল করে না ; সে শংকায় থাকে সে কী করবে যদি বরের আগ্রহ সৃষ্টি করতে না পারে অথবা যদি সে (বর) তার প্রতি ঘৃণা বোধ করে।
কীভাবে একজন দাস , যে জানে না তার কাজ আল্লাহ গ্রহণ করছেন কিনা , ভয় পাবে না ও দুশ্চিন্তা করবে না ?! তুমি কি নিজেকে সাজাও তাঁর অথবা নিজের জন্য এবং লোকদের মাঝে সুনাম অর্জনের জন্য ?!
যখন মানুষ মারা যায় তারা আবেদন করে :
) رَبِّ ارْجِعُونِ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا(
“ হে আমার রব! আমাকে ফেরত পাঠান (পৃথিবীর জীবনে) যেন আমি সৎকাজ করি যা আমি অবহেলা করেছি।” (সূরা মুমিনিন- 99-100)
তাই হযরত শেইখ সব সময় আল্লাহর সাথে মিলনের ভয়ে থাকতেন এবং বলতেন :
তোমরা বলো আল্লাহর ভয় নেই ,
) وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ(
“ তার জন্য যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় পায়।” (সূরা নাযিয়াত-40)
কিন্তু আমরা কী করবো যদি তিনি আমাদেরকে পছন্দ না করেন এবং আমাদের কাজ গ্রহণ না করেন ?
এর উত্তরে হযরত শেইখের ছেলে বলেন যে তিনি বলেছেনঃ“ হে রব! কিনে নিন এবং গ্রহণ করুন আমাদেরকে পুরাতন ফালতু জিনিসের মত , যেমন ফেরীওয়ালা ডাক দেয় :‘ আমি ভাঙ্গা ও ফালতু জিনিস কিনি : -হে রব গ্রহণ করুন এবং আমাদেরকে কিনে নিন।”
চতুর্থ ভাগ
ইন্তেকাল
প্রথম অধ্যায়
শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতের ইন্তেকাল
শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর 13 , 1961 সনে হযরত শেইখের বরকতময় জীবন শেষ হয়ে আসে এবং সত্তার পাখিটি এ জীবন থেকে বিদায় নেয় জীবনভর আত্ম -উন্নয়ন ও অন্যকে সমৃদ্ধ করার পর। তার আলোকিত সত্তার এ পৃথিবী থেকে উচ্চতর জগতে চলে যাওয়ার ঘটনাটি খুবই আগ্রহ সৃষ্টিকারী ও শিক্ষামূলক।
তার ইন্তেকালের আগের দিন
হযরত শেইখের ছেলে তার ইন্তেকালের আগের দিনটি বর্ণনা করেন এভাবে :
ইন্তেকালের আগের দিন , আমার বাবা ভালো ও সুস্থ ছিলেন। আমার মা বাইরে ছিলেন এবং আমি একা ছিলাম। দুপুরের পরে আমার বাবা বাসায় ফিরে আসলেন , ওযু করলেন এবং আমাকে ডেকে বললেনঃ
“ আমি একটু অসুস্থবোধ করছি , যদি আল্লাহর বান্দাহ (একজন খদ্দের) আসে তার পোষাক নিয়ে যেতে , অতিরিক্ত কাটা কাপড় গুলো এর পকেটেই আছে এবং তাকে ত্রিশ তোমান মজুরী দিতে হবে।”
আমার বাবা কখনোই এর আগে আমাকে বলেন নি যে , কেউ তার পোষাক নিতে এলে কত মজুরী হবে। কিন্তু ঐ দিন আমি বুঝতে পারি নি কী ঘটতে যাচ্ছে।
তার এক শিষ্যের স্বপ্ন
হযরত শেইখের একজন ভক্ত তার বিদায়ের আগেই দেখেছে এক সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে। সে ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছে :
‘ শেইখ এ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগের রাতে স্বপ্নে দেখলাম মসজিদে ক্বাযভীনের পশ্চিম দিকের দোকানগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : কী হয়েছে ? তারা বললো আগা শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত ইন্তেকাল করেছেন। আমি জেগে উঠলাম হতবিহবল ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে। তখন রাত বাজে তিনটা , আমি মনে করলাম আমার স্বপ্ন সত্য। আমি সকালের আজানের পর নামায পড়েই সাথে সাথে রওয়ানা দিলাম আগা রাদমানিশের বাড়িতে। তিনি আশ্চর্য হয়ে আমার অসময়ে আগমনের কারণ জানতে চাইলেন এবং আমি তাকে বললাম স্বপ্নের কথা।
তখন ছিলো সকাল 5টা। সূর্য উঠার সময় আমরা হযরত শেইখের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। হযরত শেইখ দরজা খুললেন। আমরা ভিতরে গেলাম এবং বসলাম। হযরত শেইখও বসলেন এবং বললেন :
“ এত সকালে তোমরা কী উদ্দেশ্যে বেরিয়েছো ?”
আমি আমার স্বপ্নটি তার কাছে বললাম না। আমরা কিছু সময় ধরে কথা বললাম এরপর হযরত শেইখ কাত হয়ে শুলেন এবং তার হাত মাথার নীচে রাখলেন :
‘ কিছু বলো , একটি কবিতা আবৃত্তি করো!”
কেউ একজন গাইলেন :
‘ প্রেমের দিনগুলোর চাইতে বেশী আনন্দের কোন সময় ছিলো না
প্রেমিকদের দিনগুলোর জন্য কোন রাত নেই
আনন্দের ঘন্টাগুলো কেটেছে বন্ধুর সাথে
বাকী সব ছিলো অযথা ও মূর্খতা।’
হযরত শেইখের অন্তিমকালে
এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে হযরত শেইখের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যেতে দেখলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম তার জন্য কোন ডাক্তার ডাকবো কি না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তিনি সেদিন ইন্তেকাল করবেন। হযরত শেইখ বললেন :
“ এটি তোমার বিষয়।”
ডাক্তার একটি প্রেস ক্রি পশন দিলেন এবং আমি ওষুধ আনতে গেলাম। আমি ফিরে এসে দেখলাম হযরত শেইখকে আরেকটি কক্ষে নেয়া হয়েছে। তিনি ক্বিবলামুখী হয়ে বসেছিলেন এবং তার পা একটি সাদা চাদরে ঢাকা ছিলো ; তিনি সাদা চাদরটিকে তার বুড়ো আঙ্গুল ও শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করছিলেন।
আমি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম কীভাবে একজন আল্লাহর লোক এ পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। হঠাৎ তার ভিতরের অবস্থার এক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম যেন কেউ তার কানে কানে কিছু বলছে। তিনি বললেন :‘ ইনশাআল্লাহ’
তারপর বললেন :
“ আজকে কী বার ? আজকের দোয়া আনো!”
আমি সেদিনের দোয়া পড়লাম।
তারপর বললাম :
‘ আগা সাইয়্যেদ আহমদও তা পড়ুক।’
তিনিও তা পড়লেন। এরপর হযরত শেইখ বললেন : তোমাদের হাত আকাশের দিকে তোল এবং বলো :
‘ ইয়া কারীম আল-আফ , ইয়া আযীম আল আফ।
(হে মর্যাদাবান ক্ষমা করো , হে বিরাট ক্ষমা করো)
আমি আমার বন্ধুর দিকে তাকালাম এবং বললাম :
‘ আমি যাই আগা সুহাইলকে নিয়ে আসি মনে হচ্ছে আমার দেখা স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। তিনি তার শেষ সময়ে এসে গেছেন , এবং আমি চলে গেলাম।
স্বাগতম আমার মাওলা (অভিভাবক)
হযরত শেইখের ছেলে বাকি ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেন :
‘ আমি দেখলাম আমার বাবার কক্ষ ভর্তি লোক। তারা বলছিলো হযরত শেইখের অবস্থা খুবই খারাপ। আমি সাথে সাথে কক্ষে প্রবেশ করলাম এবং দেখলাম আমার বাবা যিনি কয়েক মুহূর্ত আগে ওযু করে এসেছেন হেলান দিয়ে কেবলামুখী হয়ে বসে আছেন । হঠাৎ করে তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং মুচকি হেসে বললেন :
“ স্বাগতম আমার প্রিয় মাওলা!” 173
মনে হলো তিনি কারো সাথে হাত মেলালেন , শুয়ে গেলেন এবং চলে গেলেন মুখে মুচকী হাসি নিয়ে!
দাফনের পর প্রথম রাতে
তার আরেক বন্ধু বলেন :
‘ আমি স্বপ্নে হযরত শেইখকে দাফনের পর প্রথম রাত্রে দেখলাম । আমি দেখলাম মাওলা আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ) তাকে এক বিরাট মাক্বাম দান করেছেন। আমি সেই মাক্বামের দিকে অগ্রসর হলাম , আমাকে দেখার সাথে সাথে তিনি খুব একটি নরম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন যেমন একজন বাবা তার সন্তানকে সতর্ক করেন যখন সে কোন বিষয়ে মনোযোগ দিচ্ছে না। তার চাউনি আমাকে মনে করিয়ে দিলো যা তিনি সব সময় বলতেন :
“ আল্লাহ ছাড়া আর কিছু চেয়ো না।”
(কিন্তু আমরা তখনও শরীরী আকাঙ্ক্ষায় বন্দী ছিলাম)। আমি আরো কাছে গেলাম। তিনি দু’ টো বাক্য বললেন :
প্রথম বাক্য :“ জীবনের আনন্দ হচ্ছে আল্লাহর ও তাঁর বন্ধুদের সান্নিধ্য।” 174
এবং দ্বিতীয় বাক্য :“ তিনি [ইমাম আলী (আঃ)] জীবন যাপন করেছিলেন [এমন এক সত্য জীবন] যে তার স্ত্রী (হযরত ফাতেমা (আঃ) তার শার্টটি আল্লাহর পথে দান করে দিয়েছিলেন বাসর রাতে।”
তাই তার উপর সালাম যেদিন তিনি জন্ম নিয়েছিলেন , যে দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং যেদিন তাঁকে জীবিত উত্থিত করা হবে , (আবার)।
দ্বিতীয় অধ্যায়
আয়াতুল্লাহ হুজ্জাতের ইন্তেকাল
চতুর্থ ভাগের শুরুতেই যেমন বলা হয়েছে , আমি যথোপযুক্ত মনে করছি যে আল্লাহর আরো দু’ জন বন্ধুর ইন্তেকালের বর্ণনা দিতে যাদের মিল রয়েছে হযরত শেইখ রজব আলীর সাথে। এ দু’ জনের একজন হচ্ছেন আয়াতুল্লাহ হুজ্জাত (রঃ) যিনি ছিলেন হযরত শেইখ রজব আলীর মারজা ; এবং হযরত শেইখ তার আন্তরিকতার জন্য তাকে সম্মান করতেন এবং তাকে দেখেছিলেন দুনিয়াবি আকাঙ্ক্ষা বর্জিত।175 এখন আমরা এ সম্মানিত ব্যক্তির ইন্তেকালের ঘটনাটি শুনবো তারই মেয়ের জামাই সম্মানিত আয়াতুল্লাহ হাজ্ব শেইখ মোরতাযা হায়েরীর (রঃ) কাছ থেকে যা আমি একজন সামান্য ছাত্র হিসেবে জেনেছি :
বাড়ি মেরামত
সর্বপ্রথম আমার বলা উচিত যদিও মরহুম আয়াতুল্লাহ হুজ্জাত ছিলেন আমার শিক্ষক ও আমার শশুর। আমি তার বাড়িতে খুব বেশী যেতাম না এবং তার সভাপতি হওয়ার বিষয়ে (প্রতিষ্ঠানের) কোন তৎপরতায় নিজেকে জড়াইনি । তিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ বুরুজারদী (রঃ) এর সময়ে একজন মারজা অথবা আযারবাইযান এলাকার বেশীর ভাগ লোকের মারজা। তেহরান ও আযারবাইযানে এবং অ-আযারবাইযানীরাও তার কাছে যেতেন [তাদের ধর্মীয় সমস্যার সমাধান করার জন্য)। তিনি মাসিক বেতনও দিতেন [তালাবা বা ধর্মীয় ছাত্রদের] এবং একটা পর্যায় পর্যন্ত [ব্যক্তিগত] খরচের অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। কোন এক বছরে শীতের শুরুতে তখনও বেশী ঠান্ডা পড়ে নি , তিনি তার বাড়িটি মেরামত করছিলেন। উঠানের এক কোণায় গর্ত খোঁড়া হচ্ছিলো নুতন একটি বিল্ডিং উঠানোর জন্য এবং কিছু শ্রমিক বাড়ির ভিতরে মেরামতের কাজ করছিলো। একটি কূপও খোঁড়া হচ্ছিলো বিল্ডিং সম্প্রসারণের প্রয়োজনে।
নির্মাণ কাজ তার টাকায় হচ্ছিলো না। হচ্ছিলো তারই এক শিষ্যের টাকায় যিনি তেহরানে বাস করতেন। যদি আমার ভুল না হয় তার নাম ছিলো চাইচি।
আমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে
একদিন সকালে176 আমি তাকে দেখতে গেলাম তার বাড়ির ভিতরে। তিনি বিছানায় বসে ছিলেন কিছুটা সুস্থতা বোধ করে। ক্র নিক ব্রংকাইটিস এর কারণে , তিনি হাপাঁনীতে ভুগতেন যখন ঠান্ডা পড়তো। তখন শীত শুরু হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি হাপাঁনীতে কষ্ট পাচ্ছিলেন না বলে মনে হলো। আমাকে বলা হলো তিনি নির্মাণ শ্রমিকদের বিদায় করে দিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি কেন তাদের বিদায় করে দিয়েছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে ও পরিষ্কারভাবে বললেন :
“ আমি মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছি তাই এ নির্মাণ কিসের জন্য ?”
আমি কিছু বললাম না এবং মনে হয় না আমি খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম তার এ উত্তরে। তখন তিনি আমাকে বললেন :
“ আমার প্রিয়! আগামী কয়েকদিন তুমি এসো।”
তিনি বোঝালেন আগের মত আর দূরত্ব বজায় রাখবেন না।
‘ হে আল্লাহ! আমি যা করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম তা করেছি’
আমার মনে আছে আমি প্রতি সকালে (তার কাছে) যেতাম‘ মাকাসিব’ শিক্ষা দেয়ার পর। যা আমি শিখাতাম তার বাড়ির বাইরের দিকের ঘরে এবং কোন কোন সময় সন্ধ্যায়। একদিন সম্ভবত বুধবার , তিনি আমাকে বিশেষভাবে খবর দিলেন তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য কিছু কাজে। আমি তাকে সেদিন দেখতে গেলাম। তার সামনে ছিলো এক বিরাট লোহার সিন্দুক এবং আগা হাজ্ব সাইয়্যেদ আহমদ যানজানি177 তার সামনে বসেছিলেন। তিনি কাগজপত্র ও চুক্তিপত্র গুলো আগা যানজানিকে দিলেন এবং সিন্দুকের সমস্ত টাকা আমাকে দিলেন ভিন্ন কাজে খরচ করার জন্য এবং এর কিছু আমার অংশ হিসেবে আমাকে দিলেন। তিনি ইতোমধ্যেই তার অসিয়ত (উইল) কয়েক কপি করে লিখেছেন এবং আমাকে এক কপি পাঠিয়েছিলেন যা এখনও আমার কাছে আছে। তার কিছু টাকা ছিলো নাজাফে , তাবরিযে এবং ক্বোমে মরহুম মুহাম্মদ হোসেইন ইয়াযদির কাছে যিনি ছিলেন আমার মরহুম পিতার (রঃ) একজন অসীয়ত সম্পাদনকারী। আয়াতুল্লাহ হুজ্জাত তার অসীয়ত নামায় উল্লেখ করেছিলেন যে , সমস্ত টাকা পয়সা যা তিনি তার প্রতিনিধিদের কাছে আমানত রেখেছিলেন তা ছিলো‘ সাহম-ই ইমাম’ (অংশ যা গুপ্ত ইমাম আঃ-এর) এবং জমির একটি খন্ড-যা পরে মসজিদ-ই-আগা বরুজারদীর একটি বিশাল অংশ হয়েছিলো যা তার নিজের পয়সায় কিনেছিলেন মাদ্রাসার জন্য।
তিনি তার অসীয়তনামায় উল্লেখ করেছিলেন যে , জমিটি হযরত ইমাম মাহদী (আঃ)-এর মালিকানায় আছে এবং তা উত্তরাধিকার সূত্রে কেউ পাবে না কিন্তু যদি আগা বুরুযারদী তা মসজিদের জন্য চান তাহলে তা তাকে দেয়া যাবে।
তার নগদ অর্থ যা ছিলো তা তার লোহার সিন্দুকেই ছিলো এবং গত কয়েকদিন যাবৎ তিনি ধর্মীয় কর ও সাদক্বাসমূহ জমা নিচ্ছিলেন না। যা হোক , আগা যানজানী মনে হয় সেগুলো জমা নিচ্ছিলেন যিনি মাসিক বেতন দেয়া শুরু করেছিলেন (তালাবাদের জন্য) আয়াতুল্লাহ হুজ্জাতের ইন্তেকালেন পর প্রথম মাস থেকেই। কয়েকটি মুদ্রা তার বালিশের নীচে ছিলো। যা তিনি অসুস্থ হওয়ার পর তার মেয়ে অর্থাৎ আমার স্ত্রী তার পকেট থেকে নিয়ে তার বালিশের নীচে রেখেছিলো তার সুস্থ হয়ে উঠার দিন পর্যন্ত রাখার জন্য এবং তা পরে সাদকা হিসেবে দেয়ার জন্য যা ছিলো অতীতের মহিলাদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি কাজ যে সম্পর্কে আমিও ওয়াকিবহাল ছিলাম। মনে হয় তা অনেকটা মানত , যদি রোগী সুস্থ হয় তবে তা দান করে দেয়া হবে। তা ছিলো একমাত্র পয়সা যা সম্পর্কে আগা (হুজ্জাত) জানতেন না। তিনি যখন তার সিন্দুক থেকে সব টাকা আমাকে দিলেন যথাযথভাবে খরচ করার জন্য তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে বললেন :
“ হে আল্লাহ! আমি করেছি যা আমি করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম। এখন তুমি আমার জীবন নাও!” 178
“ আমার মৃত্যু হবে দুপুর বেলা”
আমি তার সাথে আরো ঘনিষ্ট হওয়ার কারণে তাকে বললাম : জনাব , আপনি কোন কারণ ছাড়া ভয় পাচ্ছেন! প্রতিবারই আপনি এ সমস্যায় ভোগেন কিন্তু পরে ভালো হয়ে যান। তিনি বললেন :
“ না , আমার বিষয়টি অথবা আমার মৃত্যু দুপুর বেলা হবে।”
আমি আর কিছু বললাম না এবং তার কিছু কাজে বাইরে গেলাম। আমি একটি‘ ডরশকী’ (ঠেলা গাড়ি) নিলাম তার কাজগুলো দ্রুত করার জন্য পাছে তার মৃত্যু হয়ে যায় দুপুর বেলাতেই এবং তার কথামত টাকা পয়সাগুলো যথাযথভাবে খরচ ও এদের উত্তরাধিকারীদের কাছে পৌছানোর আগেই। আমি কাজ সেরে ফেললাম দুপুরের মধ্যেই এবং তিনি সেদিন মারা গেলেন না।
কোরআন খুললেন
একদিন রাতে তিনি আমাকে পবিত্র কোরআন দিতে বললেন। কিছুক্ষন ভেবে এবং যিকর এর পর তিনি কোরআন খুললেন যে কোন এক জায়গায়। যে পাতা খুললো তার প্রথম আয়াত ছিলো :
‘ শুধু তারই জন্য প্রার্থনা , পরম সত্য।’ (সূরা রাদ-14)
মনে হলো তিনি কাঁদলেন এবং আল্লাহর সাথে ফিসফিস করে কথা বললেন যা আমি এখন মনে করতে পারছি না। তিনি তার সিল মোহরটি ভেঙ্গে ফেললেন। আমি এটি মনে করতে পারছিনা তা কি সে রাতেই না অন্য কোন রাতে।
“ আগা আলী , দয়া করে ভেতরে আসুন!”
একদিন তার মৃত্যুর নিকটবর্তী সময় তিনি দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন , স্পষ্ট ছিলো যে তিনি কিছু দেখছেন যখন তিনি বললেন :
‘ আগা আলী , দয়া করে ভেতরে আসুন!’
অল্প সময় পরেই তিনি নিজের মধ্যে ফেরত এলেন। শেষ কয়েক দিন তিনি যিকর ও মোনাজাতে ছিলেন। একবার দোয়ায়ে আদিলাহ পড়া হলো। মনে নেই আমি পড়েছি নাকি অন্য কেউ। তার মৃত্যুর দিন আমি আমার বাসাতে‘ আল মাকাসিব’ এর ক্লাস নিলাম। একটু নিশ্চিন্ত হয়েই যে তার অবস্থা তত খারাপ নয়। এর পর আমি তার ঘরে গেলাম যেখানে তিনি বিছানায় ছিলেন। সে সময় তার কন্যা অর্থৎ আমার স্ত্রী তার সাথে ছিলো। তিনি বিছানায় শুয়ে মাটির দিকে চেয়ে যিকর করছিলেন ও দোয়া পড়ছিলেন। সে (আমার স্ত্রী) বললো তিনি আজকে যেন একটু মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। মনে হয় তা অতিরিক্ত যিকর ও দোয়ার কারণে। আমি যখন সালাম দিলাম তিনি বললেন :
‘ আজকে কি বার ?’
আমি বললাম শনিবার। এরপর তিনি বললেন :
‘ আগা বুরুজারদী কি ক্লাস নিতে গেছেন ?’
আমি বললাম ,‘ জী’ । এবং তিনি খুব আন্তরিকতা সহ উত্তর দিয়ে বললেন বেশ কয়েকবার :
‘ আল হামদুলিল্লাহ’ - সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।’
তিনি আরো কিছু বললেন আমি এখানে তা আর বললাম না সংক্ষিপ্ত করার ইচ্ছায়।
তুরবা (কারবালার মাটি) পানির সাথে মিশিয়ে
তার কন্যা বললেন : আগা আজ কিছুটা বিপর্যস্ত , চলুন তাকে কিছু তুরবা দেই। আমি বললাম ঠিক আছে। সে পানির সাথে তুরবা মিশ্রিত করলো এবং আমি তাকে তা পান করার জন্য সাধলাম। তিনি উঠে বসলেন এবং আমি তার জন্য গ্লাস ধরে রইলাম। খাবার অথবা ওষুধ মনে করে তিনি ভ্রু কুচঁকে বললেন ;‘ এটা কী ?’
আমি বললাম এটি তুরবা। তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো এবং সাথে সাথে গ্লাসটা নিয়ে পুরো পানিটা পান করে নিলেন। এরপর আমি তাকে একথা বলতে শুনলাম :
“ আমার শেষ খাওয়া হচ্ছে এ পৃথিবী থেকে (ইমাম) হুসেইনের (আঃ) তুরবা।”
তিনি তুরবা কথাটি খুব স্পষ্ট করে বললেন। তিনি দু’ বার শুয়ে পড়লেন ও আবার উঠে বসলেন এবং দোয়া পড়তে ও যিকর করতে লাগলেন। আমি ঘরের বাইরে ও ভিতরে অবস্থান করতে থাকলাম। দোয়ায়ে আদিলা তার জন্য দ্বিতীয়বার পড়া হলো তারই অনুরোধে। আগা সাইয়্যেদ হাসান তারই ছেলে একটি বালিশে ভর দিয়ে পা ভাঁজ করে বসেছিলেন। তার বিশ্বাস ফার্সী ও আযেরী ভাষায় আল্লাহর কাছে তার বিশ্বাসকে খুব আন্তরিকতার সাথে তুলে ধরছিলেন।
“ কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়া ?!”
আমার মনে আছে তিনি বলেছিলেন আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ) সম্পর্কে তার খেলাফত স্বীকার করে আযেরী ভাষায় :
“ বিলা ফাসলী হীচ ফাসলী ইউখদি , লাপ বিলা ফাসলী , বিলা ফাসলী , কিজিম ফাসলী ওয়ার (কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়া , কোন মধ্যস্থতাকারী ছিলো না , কোন মধ্যস্থতাকারী ছিলো না , অবশ্যই কোন মধ্যস্থতাকারী ছিলো না! কার মধ্যস্থতাকারী আছে) ?!”
এরপর তিনি পবিত্র কোরআন থেকে নবী (সাঃ)- এর আহলুল বায়েত এবং ইমাম আলী (আঃ) সম্পর্কে আয়াত তেলাওয়াত করলেন :
) مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ(
‘ ---- একটি রুপক ভালো কথা ভালো গাছের মত , যার মূল দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং এর শাখাগুলো আকাশের দিকে উঠে গেছে।’ (সূরা ইবরাহীম-24)
আমি নিজে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং এ বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করছিলাম পুরোপুরি আশ্চর্য হয়ে। আমার মনে হলো তাকে বলি :‘ আগা! আমার জন্য দোয়া করুন!’ কিন্তু আমি লজ্জিত হলাম , কারণ প্রথমত তিনি নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং পারিপাশিরক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। শুধু নিজেকে দেখছিলেন আল্লাহর উপস্থিতিতে এবং তার আধ্যাত্মিক দায়িত্বসমূহকে তার মৃত্যুর আগে । এবং দ্বিতীয়ত এরকম অনুরোধের অর্থ হবে আমরা তার মৃত্যুর দৃশ্য দেখছি এবং মৃত্যুর কাছে তাকে আত্মসমর্পন করতে দেখছি।
আমি নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলাম এ দৃশ্যের পিছনে এবং ভেতরে ছিলেন আগা সাইয়্যেদ হাসান এবং অন্যজন তার কন্যা এবং তার পরিবারের সদস্যরা। আমি তাকে আরো বলতে শুনেছি :
‘ হে আল্লাহ! আমার সমস্ত বিশ্বাস উপস্থিত আছে , আমি সেগুলোকে আপনার কাছে আমানত রাখলাম (এখন) , আমাকে তা ফেরত দেবেন (পরকালে)।’
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং মোনাজাতে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করে বালিশে হেলান দিয়ে কিবলামুখী অবস্থায় তার নিঃশ্বাস শেষ হয়ে গেলো। যারা উপস্থিত ছিলো তারা মনে করলো তার হার্ট এটাক হয়েছে তাই তারা কিছু কেরোসিনের ফোটা তার মুখে ঢেলে দিলো। কিন্তু আমি দেখলাম তরল পদার্থটি তার ঠোটের কোণে ফেরত এসে গেলো। তিনি ইন্তেকাল করেছেন তার নিঃশ্বাস শেষ হওয়ার সাথে সাথে এবং তুরবার শরবত পান করার পর কোন কেরোসিন তার ভিতর প্রবেশ করেনি। আমি স্পষ্ট সচেতন ছিলাম যে তিনি চলে গেছেন। আমি কক্ষ ত্যাগ করলাম এবং আযান শুনতে পেলাম মাদ্রাসায় হুজ্জাতিয়ায়। তার মৃত্যু সংঘটিত হলো দুপুরে যেমন তিনি বুধবার দিন বলেছিলেনঃ
“ আমার মৃত্যু (অথবা আমার বিষয়টি) হবে দুপুরে ।”
শেষে আয়াতুল্লাহ হায়েরী যোগ করেনঃ
‘ এ বর্ণনা এক দৃঢ় বিশ্বাসকে তুলে ধরে এবং অদৃশ্য জগতের কিছু নিদর্শনও তুলে ধরে :
1. তিনি আগেই বলেছিলেন যে তার মৃত্যু হবে দুপুরে এবং তাই ঘটেছিলো।
2. তিনি আলী (আঃ)-কে অতীন্দ্রীয়ভাবে দেখেছিলেন।
3. তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে এ পৃথিবীতে তার শেষ খাবার হবে তুরবা এবং তাই ঘটেছে , তিনি তুরবা না চেয়েই , অথবা গ্লাসে কী আছে তা না জেনেই (যে তাতে পানি ও তুরবা মিশ্রিত)। যেহেতু গ্লাসে কী আছে না জেনে তিনি প্রথমে তা পান করতে অনিচ্ছুক ছিলেন ।179
তৃতীয় অধ্যায়
আয়াতুল্লাহ হাজ্ব আখুন্দ তুরবাতির ইন্তেকাল
আরেকজন আল্লাহর বন্ধুর মৃত্যুর ঘটনাটি আগ্রহের সৃষ্টি করে এবং তা শিক্ষণীয় , তিনি হচ্ছেন মরহুম হাজ্ব আখুন্দ তুরবাতি। তিনি বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক মরহুম হুসেইন আলী রাশেদ (রঃ)-এর পিতা। মরহুম হুসেইন আলী রাশেদ (রঃ) তার বাবার মৃত্যুর ঘটনাটি তার লেখা বই‘ বিস্মৃত নৈতিক গুণাবলী’ যা তার বাবার জীবনী , তাতে এভাবে লিখেছেন :
ইন্তেকালের এক সপ্তাহ আগে
যেসব জিনিস আমরা (তার পরিবারের সদস্যরা) তার সম্পর্কে মনে করতে পারি এবং যা এখনও আমাদের কাছে আশ্চর্যজনক তা হলো আমার বাবা ইন্তেকাল করেন 16ই অক্টোবর 1943 সনে (17 শাওয়াল 1362 হি.) সূর্যোদয়ের দু’ ঘন্টা পরে , সকালের নামায শেষে তার বিছানায়। তার পা কিবলার দিকে লম্বা করা। তিনি তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং ফিসফিস করে কিছু কথা বলছিলেন যেন তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তিনি মারা যাচ্ছেন। শেষ যে কথা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তার রুহ চলে যাবার আগে তা হলো‘ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’
‘ রাসূলের (সাঃ) প্রতি সালাম’
তার ইন্তেকালের ঠিক এক সপ্তাহ আগে রোববার তার সকালের নামাযের পরে তিনি কিবলার দিকে ফিরে শুয়েছিলেন তার চাদর দিয়ে তার চেহারা ঢেকে। হঠাৎ তার পুরো শরীর আলোকিত হয়ে উঠলো সূর্যের রশ্মির মত। তার চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো যা এর আগে অসুস্থতার কারণে ছিলো হলদে ফ্যাকাশে ; তা এমন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো যে তা চাদরের উপর দিয়েই বোঝা যাচ্ছিলো যা তার শরীর ঢেকেছিলো। তিনি একটু নড়াচড়া করলেন এবং বললেন :
“ সালামুন আলাইকুম ইয়া রাসূলাল্লাহ , আপনি এসেছেন আপনার অযোগ্য এক দাসকে দেখতে ?!”
তারপর , যেন সত্যিই কিছু লোক তাকে দেখতে এসেছে এমন ভাবে তিনি সালাম দিলেন ,‘ আমিরুল মুমিনিন আলী (আঃ)-কে , এবং সব ইমাম (আঃ)-কে বারোজন ইমাম (আঃ) পর্যন্ত। একের পর এক এবং তাদেরকে ধন্যবাদ দেন তাকে দেখতে আসার জন্য। এরপর তিনি হযরত ফাতেমা (আঃ)-কে সালাম ও সম্মান জানালেন। অবশেষে তিনি হযরত যয়নাব (আঃ)-কে সালাম দিলেন এবং এ সময় অনেক কাঁদলেন , এই বলে :
“ বিবি! আমি আপনার জন্য অনেক কেঁদেছি।”
“ শান্তিতে থাকেন , হে মা!”
এরপর তিনি নিজের মাকে সালাম দিলেন এই বলে :
‘ আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ মা , আপনি আমাকে পবিত্র দুধ দিয়েছেন।’
এ অবস্থা চললো সূর্যোদয়ের দু’ ঘন্টা পর পর্যন্ত। এরপর যে আলো তার শরীরকে আলোকিত করে রেখেছিলো তা চলে গেলো এবং তার চেহারা আগের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ঠিক এক সপ্তাহ পর আরেক রোববার সেই দু’ ঘন্টা সময় তিনি মৃত্যুর কষ্ট অনুভব করলেন এবং হালকাভাবে তার দেহ ছেড়ে চলে গেলেন।
‘ আমাকে বিরক্ত করো না’
এই দুই রোববারের মাঝামাঝি আমি তাকে বললাম :
“ আমরা কিছু শুনি আমাদের নবীদের কাছ থেকে ও মর্যাদাপূর্ণ লোকদের কাছ থেকে এবং আমরা আফসোস করি যদি আমরা তাদের সময় থাকতাম এবং তাদের কাছ থেকে সরাসরি শুনতাম ; এখন আপনি হচ্ছেন আমার সবচাইতে নিকটাত্মীয় যার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে। হায় আমি যদি জানতাম কী ঘটেছিলো। তিনি চুপ থাকলেন এবং কিছুই বললেন না। আমি আমার অনুরোধে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে দু’ তিন বার বললাম কিন্তু তিনি চুপ রইলেন। আমি চতুর্থ অথবা পঞ্চম বার অনুরোধ করতে তিনি উত্তর দিলেন :
‘ আমাকে বিরক্ত করো না হোসেইন আলী!’
আমি বললাম :‘ আমি কিছু বুঝতে চেয়েছি।’
তিনি বললেন :
‘ আমি তোমাকে বোঝাতে পারবো না ; তুমি যাও এবং নিজে তা বোঝ।’
এ অবস্থা একটা ধাঁধাঁ হয়ে রইলো আমার জন্য এবং আমার মা , ভাই , বোন এবং ফুপুর জন্য এখন পর্যন্ত , যখন আমি এ ঘটনাটি লিখছি সকাল 9:30 , মঙ্গলবার , 15 জুলাই , 1975 (পাঁচ রজব 1395 হিঃ)। আমি এর বিস্তারিত কিছুই জানিনা শুধু এতটুকু বলতে পারি তা সত্যিই ঘটেছে ।180
1.“ বালামের পরিণতি হওয়ার হুমকি” 2য় অধ্যায় , 2য় অংশ।
2. রাবি’ আল আবরার 2 : 535।
3. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড -4 , 1628 : 5478।
4. প্রাগুক্ত , খণ্ড-5 , 2058 : 7209।
5. প্রাগুক্ত , খণ্ড-5 , 2060 : 7223।
6. মীযান আল- হিকমাহ , খণ্ড-5 , 2060 : 7218।
7. প্রাগুক্ত , খণ্ড-5 , 2058 : 7202।
8. দেখুন মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-1 , 40 : 16।
9. প্রাগুক্ত , খণ্ড-13 , 6306 : 20191।
10. প্রাগুক্ত , খণ্ড-13 , 6306 : 20194।
11. এক শাহী সমান 5 দিনার।
12. এক আব্বাসী সমান 4 শাহী।
13. এক দিনার সমান 1 পয়সা।
14. সারমা-এ-সোখান , খণ্ড-1 , 611-613 (সংক্ষিপ্ত)।
15. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-1 , 22 : 1।
16. শেইখের দুই সন্তান যারা ইন্তেকাল করেছে।
17. এক গাধা বোঝাই সমান 300 কিলোগ্রাম।
18. কোরআনের অনুবাদ , আব্দুল্লাহ ইউসূফ আলী , নুতন সংস্করণ , 1989।
19. বর্ণনাকারী তরীকতের নাম উল্লেখ করতে বারণ করেছেন।
20. রেই শহরের কাছে একটি পাহাড় , যেখানে বিবি শাহরবানুর (ইমাম হুসাইন আঃ-এর স্ত্রী) কবর রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
21. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-3 , 1436 : 1040 , এবং“ আল ইলম ওয়াল হিকমাহ ফীল কিতাব” অধ্যায়-4 , অংশ-3 : 4 ,2 ,“ আল ইখলাস।”
22. তিনি বর্তমানে ফারসী ভাষা ও সাহিত্য একাডেমীর একজন সদস্য এবং 1954 সনের মাঝামাঝি তাকে হযরত শেইখের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তারই বন্ধু ডঃ আব্দুল আলী গুইয়া। তিনি শেইখের কথায় গভীরভাবে মুগ্ধ হন এবং একই দিনে তাকে তার শিষ্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং তাকে একটি বিশেষ যিকর শিক্ষা দেয়া হয়। ডঃ গুইয়া বিশ্বাস করতেন যে শেইখ ডঃ ফারযামকে বিশেষ অনুকুল্য দান করেছিলেন এবং তাকে যোগ্য ও প্রতিভাবান পেয়েছিলেন।
23.“ আমরা বাকিতে বিক্রয় করি , এমনকি আপনার কাছেও ,” তৃতীয় অধ্যায় , প্রথম ভাগ দেখুন।
24. লেপ ও কম্বলে মোড়া একটি বর্গাকার টেবিল যার নীচে জ্বলন্ত কয়লার পাত্র রাখা হয় পা ও শরীর গরম রাখার জন্য।
25. তিনি পৃথিবীকে আজুস বা ডাইনী বুড়ি বলে সম্বোধন করতেন। দেখুন তৃতীয় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ ,“ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার পথে চোরা গর্ত” ।
26. লেখককে তা ইমাম খোমেইনি (রঃ)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যার বরকতময় জীবন শেষ হয় প্রতিদিন দোয়া-ই- আহাদ (বায়াতের দোয়া) তেলাওয়াত করার মাধ্যমে , যে দোয়া সম্পর্কে ইমাম সাদিক (আঃ) বলেছেন :“ যে ব্যক্তি এ বায়াত চল্লিশ সকাল পড়বে সে আমাদের‘ ক্বায়েম’ -এর সাহায্যকারীদের মর্যাদাভুক্ত হবে এবং যদি সে হযরতের পুনরাগমনের পূর্বেই ইন্তেকাল করে তাহলে আল্লাহ তাকে কবর থেকে উঠাবেন হযরতের খেদমত করার জন্য।” এছাড়া মাফাতিহুল জিনান দেখুন।
27. দেখুন“ যে অন্তরে সবকিছু উপস্থিত ,” 3য় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
28. শেইখের একজন ভক্ত বলেন :“ তিনি মোল্লা আহমাদ নারাক্বীর‘ তাক্বদীস’ এবং গাযালীর‘ কিমিয়ায়ে সা’ আদাত’ পড়তে বলতেন।”
29. দেখুন“ তুমি মেজাজ হারাও খুব দ্রুত ,” 3য় অধ্যায় , দ্বিতীয় ভাগ।
30. আরবী হরফের গাণিতিক সারণি।
31.“ সাহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ)-এর 37নং দোয়া এবং কৃতজ্ঞদের মোনাজাত” -এ কথার সমর্থন করে।
32. এমনকি এ কথাও বলা যায় যে সত্য স্বপড়ব সম্মানিত শেইখ থেকে এ বইতে উল্লেখিত বিভিনড়ব বিষয়কে সমর্থন করে।
33. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-8 , 3714 : 12748।
34. বর্ণিত আছে যে তিনি হাজ্ব আগা নুরুল্লাহ ইসফাহানির ভাই ছিলেন যিনি আগা নাজাফি ইসফাহানি হিসাবে পরিচিত। তিনি রেযা শাহর শাসনামলে তেহরানের বাজারে‘ সাইয়্যেদ আযিযুল্লাহ মসজিদ’ -এর ইমাম ছিলেন। তার খোতবা সম্পর্কে শেইখ রজব আলী খাইয়্যাত বলেছেনঃ“ তার মিম্বার (খোতবা) আল্লাহ প্রেমিক তৈরী করে।” রেযা খানের বিরোধিতার কারণে তাকে ইসফাহানে নির্বাসন দেয়া হয় এবং সেখানে তাকে শহীদ করা হয় এবং তাকে দাফন করা হয়েছিলো“ তাখত-ই-ফুলাদ” কবরস্থানে। ডঃ আবুল হাসান শেইখ বলেনঃ“ একবার হযরত শেইখ এবং আমি‘ তাখত-ই-ফুলাদ’ কবরস্থানে গেলাম। আমরা একটি কবরের পাশে বসে পড়লাম। হযরত শেইখ বললেনঃ“ এখানে যাকে দাফন করা হয়েছে তিনি ছিলেন আমার উস্তাদ।”
হুজ্জাতুল ইসলাম কারিমি উদ্ধৃতি দিয়েছেন আয়াতুল্লাহ কাযিম আস্সার-এর। যিনি আয়াতুল্লাহ মির্যা জামাল ইসফাহানির একটি আশ্চর্য কারামাহ বর্ণনা করেছেন যা তিনি পেয়েছিলেন আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) থেকে।
হযরত আয়াতুল্লাহ আস্সার ছিলেন শহীদ মোতাহহারি ইসলামি মাদ্রাসার (আগে নাম ছিলো সিপাহসালার) এক মহান শিক্ষক এবং আমি এবং শেইখ কারাম আলী কারিমি মাদ্রাসায় ছয় বছরের কোর্স তার সাথে এবং আরো কিছু শিক্ষকের সাথে শেষ করি। মির্যা জামাল ইসফাহানির প্রথম কারামা (অলৌকিক ক্ষমতা) সম্পর্কে আমাদেরকে বলেছিলেন আমাদের আসফার (দর্শন)-এর শিক্ষক আয়াতুল্লাহ আস্সার। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেনঃ“ হযরত আয়াতুল্লাহ হাজ্ব আগা জামাল ইসফাহানি (রঃ)-কে রেযা খান পাহলভি তেহরানে নির্বাসন দিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন বাজারে হাজ্ব সাইয়্যেদ আযীযুল্লাহ মসজিদের ইমাম , তিনি মারভি মাদ্রাসার শিক্ষকতা করতেন। মাদ্রাসায় তার শিক্ষা এত আকর্ষণীয় ও এত মূল্যবান বিষয়পূর্ণ ছিলো যে তার ক্লাসে সবসময় পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ ও জ্ঞানী ছাত্রদের উপচে পড়া ভিড় লেগে থাকতো। এতে এমন হলো যে কিছু মসজিদের ইমাম তার প্রতি ঈর্ষাপরায়ন হয়ে পড়লো।
অতএব তারা (মসজিদের ইমামরা) একটি সভা করল এবং সেখানে ঘোষণা দিলো যে তিনি (আয়াতুল্লাহ ইসফাহানি) একজন অজ্ঞ ব্যক্তি এবং তিনি তার পাশে জড়ো হওয়া আলেমদের ধোঁকা দিয়েছেন। তারা একদিন তাকে তিনটি বিষয়ে পরীক্ষা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করলোঃ দর্শন , ফিক্বহ এবং উসূল। আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো তাকে দর্শন শাস্ত্রে (আসফার) পরীক্ষা করবার জন্য এবং অন্য দুইজন যাদের নাম আমি মনে করতে পারছি না তাদের দায়িত্ব ছিলো তাকে ফিক্বহ ও উসূল শাস্ত্র বিষয়ে পরীক্ষা করার। আমরা তিনজন তার ক্লাসে যোগ দেয়ার জন্য , ভিনড়ব ভিনড়ব জায়গায় বসার জন্য এবং আমাদের প্রত্যেকে পাঠদানের সময় তাকে প্রশড়ব করার প্রস্তুতি নিলাম।
আমি (আসসার)‘ আসফার-এর একটি কপি আমার সাথে নিলাম। যখন হাজ্ব আগা জামাল ইসফাহানি দর্শনের একটি দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করছিলেন আমি আসফার থেকে একটি প্রশড়ব তুলে ধরলাম তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল ধরে। তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং বললেন“ আমি তোমার প্রশেড়বর উত্তর এভাবে দিবো না। তুমি‘ আসফার’ -এর যে কোন জায়গা খুলো (ইস্তেখারার মত) এবং পৃষ্ঠার প্রথম লাইনটি পড়।”
আমি তাই করলাম এবং পৃষ্ঠার প্রথম বাক্যটি পড়লাম। তিনি বললেনঃ‘ যথেষ্ট হয়েছে’ এরপর তিনি পুরো পৃষ্ঠাটি লাইনের পর লাইন স্মৃতিশক্তি থেকে বলে গেলেন এবং তা অনুবাদ করলেন। এরপর তিনি বললেনঃ তুমি এখানে এসেছো আমাকে পরীক্ষা করতে ? আমার নিজের কিছুই নেই ; আমার যা আছে (তা আমাকে দিয়েছেন) মুত্তাকীদের মাওলা , আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) ।”
এরপর হাজ্ব আগা জামাল আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ)-এর মোজেযার একটি বর্ণনা করেন-“ আমি নাজাফে চল্লিশ বছর ধরে পড়াশোনা করলাম এবং ইজতিহাদের যোগ্যতা এবং উচ্চমানের বৃত্তি লাভ করলাম। আমার বাবা কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি ও ব্যাবসায়ীকে ইসফাহান থেকে নাজাফে পাঠালেন আমাকে ইসফাহানে ফেরত নিয়ে আসতে এবং চেয়ারম্যান ও প্রধান শিক্ষক হিসাবে মাদ্রাসা পরিচালনা করার জন্য। যে রাতের পর আমাদের নাজাফ ছেড়ে ইরান যাওয়ার কথা সে রাতে আমার হঠাৎ করে টাইফয়েড জ্বর শুরু হলো এবং আমি চল্লিশ দিনের জন্য অজ্ঞান পড়ে রইলাম। যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো , আমি দেখলাম যে ছোট কাল থেকে আমি তখন পর্যন্ত যা শিখেছি সব ভুলে গেছি ; আমার সমস্ত অর্জিত জ্ঞান স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। আমি মানসিক ভাবে খুবই ভেঙ্গে পড়লাম এবং আমির আল মুমিনীন আলী (আঃ) এর (মাযারে) কাছে গেলাম এবং কানড়বাকাটি শুরু করলাম। আমার মাওলাকে বললামঃ“ হে আমার মনিব , চল্লিশ বছর ধরে আমি আপনার বিশাল জ্ঞান (ঐশী জ্ঞান) থেকে মূল্যবান খোরাক অর্জন করেছিলাম। কিন্তু এখন আমি বাড়িতে ফেরত যেতে চাই আমার এখন শূন্য হাত । আপনিতো দয়ার সাগর।” (মরহুম আস্সার বর্ণনা করার সময় কাঁদছিলেন) এরপর মরহুম আয়াতুল্লাহ হাজ্ব আগা জামাল বললেনঃ“ আমি এত কানড়বাকাটি ও বিলাপ করলাম যে আমি তন্দ্রা অনুভব করলাম ও ঘুমিয়ে পড়লাম। [আমার ঘুমের ভিতরে] আমি মাওলা আলী (আঃ) কে দেখলাম যিনি তাঁর আঙ্গুলের মাথায় মধু নিয়ে আমার মুখের ভিতর দিলেন এবং আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলেন। এরপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। যখন আমি বাসায় ফেরত এলাম আমি দেখলাম আমি ছোট কাল থেকে এখন পর্যন্ত যা শিখেছি সব মনে করতে পারছি।”
এরপর হাজ্ব আগা জামাল কাঁদলেন এবং বললেনঃ“ জনাব , আমার নিজের কিছুই নেই। আমি যা জানি তার মালিক হলেন আমার মাওলা এবং ইমাম আমির আল মুমিনীন আলী (আঃ)। আপনারা আসুন এবং আমাকে পরীক্ষা করুন ; আমি সবগুলো পাঠ্য বই অন্তর দিয়ে জানি আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) অনুগ্রহে এবং আমির আল মুমিনীন আলী (আঃ)- এর দানে। জনাব আস্সার কাঁদছিলেন এবং বললেনঃ যখন হাজ্ব আগা জামাল এই ঘটনা বললেন , সমাবেশ থেকে একটি শোরগোল শোনা গেলো , এবং আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তার কাছে গেলাম তার স্যান্ডেল দু’ টো বরকত হিসেবে আমার চোখে স্পর্শ করার জন্য।”
35.কামেল সাধক ও সংগ্রামী আলেম শেইখ মোহাম্মাদ তাক্বী বাফক্বি ইয়াযদি রেযা খানের সাথে কাশফ-ই-হিজাব (ইরানী মুসলিম মহিলাদের বোরখা পড়া নিষিদ্ধ করে রেযা খানের আদেশ) বিষয়ে বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়ার কারণে হযরত মাসুমাহ (আঃ)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গনে স্বেচ্ছাচারি রাজা তাকে মারধর করে এবং তাকে রেই শহরে নির্বাসন দেয়া হয়। তিনি সেখানে তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকেন। যারা এ আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পনড়ব আলেমের ঘনিষ্ট সাথী ছিলেন তারা তার অনেক কারামাহর কথা বর্ণনা করেছেন। তার চাকর মরহুম শেইখ ইসমাইল আমাকে (লেখককে) বলেছেনঃ“ তার জীবনের শেষ বছরগুলোতে শেইখ (বাক্বফি) তার বাড়ী থেকে বাইরে বেরোতে পারতেন না অসুস্থতার কারণে। একবার তিনি আমাকে বললেনঃ যখন তুমি হযরত শাহ আব্দুল আযীম-এর (মাযারে) কাছে যিয়ারাতে যাও তুমি কি তিনজন ইমাম যাদেহ’ র (ইমাম (আঃ)- এর নাতি) যিয়ারাত কর অথবা ইমামযাদেহ তাহিরকে সালাম দাও তার কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ? সে যুগে পবিত্র মাযারের উনড়বয়ন করা হয় নি তখনও এবং ইমামযাদেহ তাহির-এর মাযার মূল জায়গা থেকে একটু দূরে ছিলো। আমি বললাম ,‘ আমি ইমামযাদেহ তাহির-এর কাছে যিয়ারাতের জন্য যাই না , বরং শুধু তার মাযারের বাইরে দাঁড়িয়ে যিয়ারাত করি। শেইখ বললেনঃ‘ এটি সৌজন্য নয়। তুমি তিনজন সম্মানিত ব্যক্তির দর্শনে গেছো অথচ দু’ জনের সাক্ষাত করেছো কাছ থেকে এবং একজনকে দূরে থেকে ? এটি অসম্মান হিসেবে বিবেচিত। এরপর যখন যিয়ারাতের জন্য যাবে হযরত তাহির (আঃ)-এর মাযারের ভিতরে প্রবেশ করবে এবং তোমার যিয়ারাত পড়বে তখন তাকে আমার শ্রদ্ধাও পৌঁছে দিবে।” শেইখ ইসমাইল বললেনঃ‘ যেভাবে শেইখ বলেছিলেন , আমি হযরত তাহির (আঃ)-এর মাযারে প্রবেশ করলাম। মাযারের ভিতর কেউ ছিলো না ; আমি শেইখের আদেশ স্মরণ করলাম ; আমি যখন বলতে যাবো যে তিনি তার শ্রদ্ধা পাঠিয়েছেন হঠাৎ কবর থেকে এ কথাটি আমি শুনতে পেলাম“ লাব্বায়েক , লাব্বায়েক , লাব্বায়েক’ (আমি এখানে)।”
ইমাম খোমেইনি (রঃ) তার ব্যক্তিগত পাঠ দানের বৈঠকগুলোতে প্রায়ই তার ছাত্রদেরকে উৎসাহিত করতেন মরহুম বাফক্বির সাথে সাক্ষাত করতে যিনি নির্বাসনে ছিলেন , বলতেনঃ কত আনন্দের এক কাজে দ্বিগুণ প্রশান্তি লাভ , যিয়ারাতে শাহ আব্দুল আযীম এবং প্রিয় শেইখ বাফক্বির সাক্ষাত লাভ।
36. উল্লেখ্য যে একই আয়াত সূরা ইউসূফে উল্লেখ করা হয়েছে , 22নং আয়াতে ,‘ ইসতাওয়া’ শব্দটি ছাড়া।
37. শেইখ এ বিষয়ে আরো কিছু দিক উল্লেখ করেছেন যা উল্লেখ করা হয়েছে তৃতীয় ভাগের প্রথম অধ্যায়ঃ“ বিশেষ দিক নির্দেশনা।”
38. এ ঘটনাটি ঘটে যখন শেইখের বয়স 23।
39. এ হাদীসগুলো সম্পর্কে আরো জানতে হলে দেখুন : মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4988 : 3390-1।
40. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4988 : 16942।
41. প্রাগুক্ত , খণ্ড-10 , 4990 : 16956।
42. প্রাগুক্ত , খণ্ড-10 , 4988 : 16950।
43. নাহজুল বালাগা , খোতবা নং-222।
44.“ যারা আমাদের পথে সংগ্রাম করে - নিশ্চয়ই আমরা তাদেরকে আমাদের পথে পরিচালিত করবো।” - সূরা আল মূলকঃ 69।
45. মীযান আল হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1602 : 5359।
46. প্রাগুক্তঃ খণ্ড-4 , 1602 : 5360।
47. তিনি ওলিয়ে ফক্বীহর প্রতিনিধি এবং দামেস্কে মসজিদে যায়নাবিয়্যাহর জুম’ আর ইমাম ছিলেন। তিনি শেইখ সম্পর্কে পরবর্তী ঘটনাটিও বর্ণনা করেছিলেন।
48. এ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন আয়াতুল্লাহ ফাহরি। এ ঘটনাটি তার অন্য দুই ভক্ত সামান্য পার্থক্যসহ বর্ণনা করেছেন।
49. তাফসীরগুলোতে আছে বালাম-ই-বাউর একজন পণ্ডিত ছিলো যার দোয়াগুলো কবুল হতো। তার ছিলো বারো হাজার শিষ্য , কিন্তু তার নফসের কামনা বাসনার কারণে সে তখনকার স্বেচ্ছাচারী শাসককে সাহায্য করতে এগিয়ে যায় , তা ঐ পর্যন্ত যে সে প্রস্তুত হয়ে যায় মূসা (আঃ)-এর সেনাবাহিনীকে অভিশাপ দেয়ার জন্য। তাকে কুকুর-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে কোরআনে-“ তার উদাহরণ হলো একটি কুকুর-এর মত , যদি তুমি তাকে আক্রমণ কর সে তার জিহবা বের করে রাখে অথবা তাকে যদি কিছু না কর , (তখনও) সে জিহবা বের করে রাখে।” (সূরা আল আরাফঃ 176)। এছাড়া দেখুন- তাফসীর আল-মীযান , খণ্ড-8 , 339 ; তাফসীর-ই-কুম্মী , খণ্ড-1 , পৃষ্ঠা 248 ; মুনিয়াত আল মুরিদ-151 পৃষ্ঠা।
50. বাতেনী পর্দায় ঢাকা এবং আত্মার অন্ধকার।
51. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4856 : 3330।
52. আল কাফী , খণ্ড-2 , 352 : 7 ; মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4858 : 16627।
53. বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড-58 , 39।
54. মুহাজ আল-দাওয়াত , 68 ; বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড-85 , 214।
55. বিখ্যাত আলেমদের একজন আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাথে সাক্ষাত করতে হযরত শেইখ প্রায়ই যেতেন। যার সম্পর্কে শেইখ বলেছিলেন :“ জনাব কুহিস্তানি থেকে একটি নূর বেরিয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে।” একদিন এক সাক্ষাতে মরহুম আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানি হযরত শেইখকে রাস্তার পাশে এগিয়ে দিতে এলেন - তার বাড়ী থেকে প্রায় 1 কিলোমিটার দূরে তাকে বিদায় জানাবার জন্য। কয়েক বছর পর যখন আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানি সম্পর্কে শেইখের কথা তাকে জানানো হলো তিনি বিনয়ের সাথে বললেন : সেই দিনগুলোতে আমরা বিভিনড়ব যিক্র করতাম।
এখানে আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানি সম্পর্কে একটি অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করা যথাযথ হবে। হাজ্ব সাইয়্যেদ কাসিম সুজাই নামে একজন সুবক্তা ও ধর্ম প্রচারক আমাকে (লেখককে) বলেছেনঃ“ রাশতের একজন ধর্মপ্রচারক আগা সাদরাই ইশকিওয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হলেন। তাকে রাশত থেকে তেহরানে স্থানান্তর করা হয় এবং আবান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একদিন মরহুম ফালসাফি আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে বললেন তার সাথে হাসপাতালে একসাথে তাকে দেখতে যেতে। যখন আমরা সেখানে গেলাম , সালাম বিনিময়ের পর আগা ফালসাফি তাকে জিজ্ঞেস করলেন-“ আপনার আর্থিক অবস্থা কেমন ?
তিনি উত্তর দিলেন-“ সাইয়্যেদ আল শুহাদা ইমাম হোসেইন (আঃ)-এর পক্ষ থেকে দান আমাদেরকে চালিয়ে নিচ্ছে।”
“ তিনি বললেন আমরা সবাই সাইয়্যেদ আল শুহাদা’ র দান উপভোগ করছি। এতে আগা সাদরাই বললেনঃ“ আমাদের ঘটনা একটু ভিনড়ব।” আগা সাদরাই ব্যাখ্যা করলেনঃ‘ আমার একটি চা বাগান রয়েছে যা সাইয়্যেদ আল শুহাদা আমাকে দিয়েছেন এবং এর ফসল আমার বৃদ্ধ বয়সে ও অবসর জীবনে ভরণপোষণ জোগায়।’ আগা ফালসাফি জিজ্ঞেস করলেনঃ‘ আপনি কীভাবে জানেন যে তা সাইয়্যেদ আল শুহাদা দান করেছেন ? তিনি বললেনঃ আমি এ বাগানটি বিক্রি করার জন্য প্রাথমিক একটি চুক্তি করেছিলাম। দু’ দিন পর যখন সেখানে আমি আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাথে সাক্ষাত করতে গেলাম। যখন আমি প্রবেশ করলাম তিনি বললেনঃ“ সাদরাই , কেন তুমি‘ আতিয়্যেহ মুলুকানেহ’ (বাদশাহী দান) বিক্রি করে দিচ্ছো ?” আমি তাকে বললামঃ আগা , শাহের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ; তিনি বললেনঃ“ আমি তা বুঝাচ্ছি না , আমি বলছি ইমাম সাইয়্যেদ আল শুহাদার (ইমাম হোসেইন (আঃ)-এর কথা। তোমার কি মনে আছে যখন তুমি একজন যুবক ছিলে এবং তুমি সাইয়্যেদ আল শুহাদার মাযার যিয়ারাতে গিয়েছিলে এবং তাঁর যারিহর ফোকর দিয়ে ফিসফিস করে বলেছিলে“ হে ইমাম সাইয়্যেদ আল শুহাদা , আমাকে একটি উপকার করুন যেন আমি অবসর গ্রহণের পর আপনার দানের উপর বেঁচে থাকতে পারি ? এ বাগানটি তোমার সেই অনুরোধের উত্তর , কেন তুমি এটি বিক্রি করছো ?”
আমি তার (আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির) হাতে চুমু দিলাম। তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম , একটি গাড়ি করে রাশতে ফেরত এলাম এবং প্রাথমিক চুক্তিটি ছিড়েঁ ফেললাম। তখন থেকে আমার ভরণপোষণ এ পর্যন্ত চলে আসছে এ বাগানের মাধ্যমেই।’
আমি (সুজাই) এতে খুবই মুগ্ধ হলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তার সাথে সাক্ষাত করবো (কিন্তু পারি নি)। তখন ছিলো হজ্বের সময় এবং আমাকে হজ্ব কাফেলার আলেম হিসাবে নিয়োগ দেয়া হলো। আমাদের কাফেলায় ডঃ তাহমাসবি নামে একজন ডাক্তার ছিলেন। আমি তাকে বললাম আমি আগা কুহিস্তানির সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছি কিন্তু তখনও পর্যন্ত পারি নি। তিনি বললেন তিনি তার চিকিৎসক। আমি খুব খুশী হলাম এবং তাকে বললাম ওয়াদা করতে যেন ইরান ফেরত এসে তিনি আমাকে তার কাছে নিয়ে যান। তিনি বললেন যখন তিনি ইরান ছেড়ে এসেছেন তিনি (আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানি) খুবই অসুস্থ ছিলেন।
আমি খুবই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম যতক্ষণ পর্যন্ত না মক্কা থেকে আরাফাতে পৌঁছালাম । সেখানে আমি নিঃশব্দে দোয়ায়ে আরাফা পড়তে শুরু করলাম , এর বিষয়বস্তু ও অর্থের উপর গভীরভাবে ভাবছিলাম। যখন আমি এ কথাটিতে পৌঁছালাম“ আমিয়াত আইনুন লা তারাক (সে চোখ অন্ধ হয়ে যাক যে আপনাকে দেখে না) আমার হৃদয় ভেঙ্গে গেলো , আমার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আমি বললাম ,“ হে আল্লাহ , আমার কাছে মূল্যবান কিছু নেই যা আমি তোমাকে দিতে পারি। কিন্তু একটি জিনিস আমার অবশ্যই আছে এবং তাহলো আমার‘ সিয়াদাত’ (সৈয়দ বংশ-নবী বংশ) আমি তা শপথের মাধ্যমে আপনার জন্য উৎসর্গ করছি ; আমি আমার পূর্বপুরুষদের অধিকার ও মর্যাদার উসিলা দিচ্ছি আপনার এ দাস আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানিকে আরোগ্য দান করুন।”
আমরা যখন ইরান ফেরত এলাম , আমি আয়াতুল্লাহ কুহিস্তানির সাক্ষাতে যেতে পারি নি। আমি মাশহাদে গেলাম। তখন রাত 11:30 বাজে। তখন দার আল সিয়াদাতে (ইমাম রেযা (আঃ)-এর পবিত্র মাযারের সামনের ছাউনি) আমি একজন বৃদ্ধ লোককে আসতে দেখলাম আরো দুই ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে যারা তার বাহু ধরেছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি কে , তারা উত্তর দিলো“ আগা কুহিস্তানি।” আমি উনাকে আগে দেখি নি। তার হাতে চুমু দেয়ার জন্য নীচু হলাম। আমি যখন নীচু হলাম তিনি তার হাত আমার ডান কাঁধের উপর রাখলেন এবং বললেনঃ“ সুজাই , আল্লাহ যেন তোমাকে দীর্ঘ বরকতময় জীবন দান করেন। আরাফাতে তোমার দোয়া আমার কাছে পৌঁছেছে (আমাকে রক্ষা করেছে)।” আমার শরীর ঘেমে গেলো তা শুনে। আমি সেখানেই বসে পড়লাম। আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করলো-‘ কী হয়েছে’ ? আমি বললাম-‘ কিছু না’ কিছুক্ষণ আমাকে বসে থাকতে দাও ।’ আমি সেখানে প্রায় আধা ঘন্টা বসে রইলাম।
আগা রাই শাহরি , একমাত্র আল্লাহ দেখছিলেন আরাফাতে এবং কেউ সেখানে ছিলো না যখন আমি আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করছিলাম। তার কাছ থেকে এটি ছিলো অলৌকিক ঘটনা। আমি তার জন্য সম্পূর্ণ নির্জন জায়গায় দোয়া করেছি , আর আমার চোখ থেকে এক ফোটা পানি আমার হাতে ধরা দোয়ার বইতে পড়েছিলো। তিনি ইমাম রেযা (আঃ)-এর পবিত্র মাযারে দাঁড়িয়ে বললেন তিনি আমার দোয়া পেয়েছেন (যা তার জন্য ছিলো) যা আরাফাতে করেছি। এটি ছিলো আমার জীবনে একটি আশ্চর্য ঘটনা।
56. মাফাতিহুল জিনান , মুনাজাত আল-যাকিরীন , মুনাজাত নং-15।
57. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-2 , 960 : 3159।
58. এ ধরনের ঘটনার একটি উদাহরণ আমার (বর্ণনাকারীর) কাছে বর্ণনা করা হয়েছে পবিত্র মক্কায় আমার প্রথম গমনে। দেখুন“ একমাত্র জায়গা যেখানে তারা ভালোবাসা প্রদর্শন করলো।” নবম অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
59. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4988 : 16945।
60. তেহরানের একজন বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক যিনি ছিলেন পরহেযগার ও পবিত্র।
61.“ ইরানে আধ্যাত্মবাদ- এর সর্বশেষ ইতিহাসের উপর দু’ টি গবেষণা কর্ম” -এর লেখক মানুচেহর সাদুকি 103 পৃষ্ঠায়‘ একটি নোট’ শিরোনামে লিখেছেন :“ আমি জনাব মুদাররেসিকে বলতে শুনেছি , তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে পড়াশোনার সময় তিনি এবং বেশ কয়েকজন প্রফেসর হযরত শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতের সাপ্তাহিক বৈঠকে যোগ দিতেন। তিনি মাঝে মাঝে হযরত শেইখকে পদার্থ বিজ্ঞানের কিছু কঠিন প্রশড়ব করতেন , যেমন ম্যাগনেটিক ফিল্ড , ইত্যাদি। শেইখ বলতেন :“ আমি জিজ্ঞাসা করবো এবং (আপনাকে) উত্তর দিবো ,” এরপর তিনি তার মাথা নীচু করে চুপ করে থাকতেন এবং পরে মাথা তুলে সঠিক উত্তরটি দিতেন।
62. তিনি ইরানে‘ রসায়ন শাস্ত্রের পিতা’ বলে পরিচিত।
63. রেই শহরের কাছে একটি পাহাড়ের নাম।
64. যানজান-এর জুমার ইমাম মরহুম আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মাহমুদ- এর জামাতা।
65. মীযান আল হিকমাহ , খণ্ড-2 , 662 : 2213।
66. ইমাম খোমেইনী (রঃ)- এর শিক্ষক।
67. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-1 , 222 : 850।
68. তিনি তার পুত্রকে উপদেশ দিয়েছিলেন :“ তুমি অবশ্যই শোকানুষ্ঠানগুলোর শেষ দিনটিতে যোগ দিতে ভুলবে না , যেহেতু হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ) সেখানে উপস্থিত থাকেন।”
69. মরহুম মুহসিন ফায়েদ সুপরিচিত মোল্লা মুহসিন ফায়েদ কাশানি নামে (1006-1091 হি) এবং তিনি তার সময়ে ছিলেন নেতৃস্থানীয় পণ্ডিত , দার্শনিক , সূফী , তাফসীরকারক এবং 11শ হিজরী শতকের কবিদের একজন।
70. প্রেমে কষ্ট পাওয়া একটিমাত্র ঘটনার বেশী নয় এবং তা এত আশ্চর্য যে তুমি যার কাছ থেকেই তা শুনবে , মনে হবে তা বলা হয়নি (কবি হাফিয)।
71. তোমার সত্তাকে পায়ের নীচে ফেলো , (এর বদলে) মাশুককে জড়িয়ে ধরো , তাঁর সাথে মিলিত হওয়ার কাবা পর্যন্ত , তুমি মাত্র এক পা দূরে আছো।
72. দেখুন“ দোয়ায়ে ইয়াসতাশির পড়ো ,” 6ষ্ঠ অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ ।
73. বলা হয় যে শেইখ বলেছেন ,“ আমি বেশ ক’ জন পণ্ডিত ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেছি কেন আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন , আমি সন্তোষজনক উত্তর পাই নি। যতক্ষণ না আমি আয়াতুল্লাহ মোহাম্মাদ শাহ অবাদিকে এ প্রশড়ব করলাম। তিনি বললেন :“ আল্লাহ মানুষকে বানিয়েছিলেন তাঁর প্রতিনিধি।” (সূরা বাকারাহঃ 30)
74. শারহ-ই- আসমা-ই-হুসনা , খণ্ড-1 , 139: 202 ; রাসায়েল-ই-কারাকি , খণ্ড-3 , 962।
75. বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড-105 , মাক্বাম-ই-ইমাম আলী (আঃ) , খণ্ড-3 , 185 , সামান্য পার্থক্য সহকারে।
76. এক মিটার একশত তোমান হিসাবে কাপড়ের দাম শেইখের আমলে ছিলো অত্যন্ত চড়া।
77. নাহজুল বালাগা , খোতবাঃ 108।
78. নাহজুল বালাগা , উপদেশ : 147।
79. প্রাগুক্ত।
80. খিসাল , 616 : 10 , বিহার আল-আনওয়ার , 70 ,350 : 47।
81. হায়দার আলী তেহরানির পিতা , একজন কবি যার উপাধি ছিলো‘ মুজিযা’ । (শেইখের সাথে তার ঘটনার বর্ণনা দেয়া হয়েছে। দেখুন“ বিনয়” 5ম অধ্যায় ,প্রথম ভাগ , ও“ বাবা যেন কোন মূর্তিতে পরিণত না হয়” 2য় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।)
82. আখুন্দ মোল্লা মোহাম্মাদ বাক্বির ছিলেন আখুন্দ মির্যা জানি ক্বাযভিনির পুত্র। তিনি ছিলেন ক্বাযভিনের মোত্তাকি ও মুজাহিদ পণ্ডিত। তিনি 1290হি। 1873 সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি ছিলেন আয়াতুল্লাহ উযমা আখুন্দ খুরাসানি (আল কিফায়ার লেখক) , হাজ্ব শেইখ মোল্লা ফাতহুল্লাহ খুরাসানি এবং হাজ্ব মোহাম্মাদ হাদি তেহরানির (নাজাফে আশরাফে) ছাত্র। এছাড়া দেখুন গানজিনে-ই-দানিশমানদান , খণ্ড-9 , 219।
83. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-3 , 1343।
84. প্রাগুক্ত , খণ্ড-3 , 1344 : 4520।
85. ওয়াসাইল আল-শিয়া , খণ্ড-24 ,পৃষ্ঠা-16 তাহরির আল ওয়াসিলা , পৃষ্ঠা-151 ;সংখ্যা-20।
86. আল-কাফি , খণ্ড-6 , 229 : 7 ; তাহযীব আল আহকাম , খণ্ড- 9 , 80 : 341।
87. আয়াতুল্লাহ ফাহরী উদ্ধৃতি দিয়েছেন সাইয়্যেদ মোহাম্মাদ রিফা কাশাফির , তিনি
বলেছেন-“ আমাদের পাড়ায় এক কসাই বাস করতো যার পুত্রের ভীষণ পেট ব্যাথা হলো। সে আগা কাশফির কাছে সাহায্য চাইলে তিনি তাকে হযরত শেইখের কাছে পাঠালেন। তিনি তাকে বললেন-“ তুমি এক বাছুরকে জবাই করেছো তার মায়ের সামনে। তাই তোমার এ সন্তান সুস্থ হবে না।
88. বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড-80 , 202।
89. আমরা মোনাজাত-ই-শাবানিয়াতে পড়ি-
“ হে আল্লাহ , আমাকে তাদের একজন করুন যাদের আপনি ডাক দেন এবং তারা আপনাকে সাড়া দেয় , আপনি তাদের দিকে তাকান এবং তারা আপনার মর্যাদা দেখে অজ্ঞান হয়ে যায় , এবং আপনি তাদের সাথে গোপনে কথা বলেন এবং তারা প্রকাশ্যে আপনার জন্য কাজ করে।”
90. সূরা আল-জাসিয়াতে বলা হয়েছে :
) أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ(
“ তুমি কি তাকে দেখেছো যে তার নিজের কামনা বাসনাকে ইলাহ
বানিয়েছে , (তাকে এমন) জেনে আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্টতায় ফেলে রেখেছেন।” (সূরা আল- জাসিয়াঃ 23)।
91. প্রথম দলটি সম্পর্কে এ আয়াতে বলা হয়েছে-
) وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا(
“ তারা (পরস্পরকে) বলেছে তোমাদের ইলাহদের পরিত্যাগ করো না , পরিত্যাগ করো না ওয়াদকে , না সুয়াকে , না ইয়াগুত বা ইয়াউক্ব বা নসরকে” । (সূরা নূহঃ 23)।
দ্বিতীয় দলটি সম্পর্কে বলা হয়েছে-
) أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ(
“ আল্লাহর দাসত্ব কর এবং তাগুতকে (বিদ্রোহী , খারাপ) বর্জন করো।” (সূরা আল নাহল : 36)।
তৃতীয় দলটি সম্পর্কে বলা হয়েছে-
) أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ(
“ তুমি কি তাদের দেখেছো যে তার নিজের কামনা বাসনাকে (অথবা ঝোঁক) ইলাহ হিসেবে নিয়েছে” ? (সূরা আল ফোরক্বান : 43)।
92. দেখুন‘ ইয়া আল্লাহ’ কথার জবাবে একটি পয়সা ,” 6ষ্ঠ অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
93. সাহিফা-ই-নূর , অধ্যায়-22 , 348।
94. মাফাতিহুল জিনান , দোয়া-ই-আবু হামযা সুমালি।
95. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-6 , 2724 : 9316।
96. বিহার আল-আনওয়ার খণ্ড- 90 , 160 ; মাফাতিহুল জিনান ; সাহিফা-ই-সাজ্জাদিয়া , 9ম অধ্যায় , 77 : 248।
97. বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড- 95 , 99।
98. সাহিফা-ই-সাজ্জাদিয়া , পৃষ্ঠা- 75।
99. মাওয়াইয আল-আদাদিয়্যাহ , 419।
100 ইরশাদ আল - ক্বুলুব , 171 ।
101. ডঃ ফারযামের কথা অনুযায়ী এ কবিতাটি কাযার আমলের বিখ্যাত কবি মোল্লা বিমান আলী রাজি কেরমানির লেখা। বলা হয় প্রথম লাইনটি ফাতহ আলী শাহ কাযার বলেছিলেন এবং তাকে দ্বিতীয় লাইনটি বলতে বলেন , তখন তিনি তৎক্ষণাৎ দ্বিতীয় লাইনটি রচনা করেন।
102. তেহরানের বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তিত্ব এবং বোরহান মাদরাসা ইলমিয়ার প্রতিষ্ঠাতা , রেই শহরে অবস্থিত হযরত আব্দুল আযীম আল হাসানির পবিত্র মাযারের পাশেই অবস্থিত।
103. ফার্সী সাহিত্যে মথ হলো প্রেমের প্রতীক , যা তার জীবন বিসর্জন দেয় মাশুকের পথে।
104. আল্লাহ প্রেমের মৌলিক শর্ত সম্পর্কে আরো জানতে হলে পড়ুন মোহাম্মাদ রেই শাহরির লেখা“ আল মাহাব্বাবা ফী আল কিতাব ওয়া আল সুনড়বাহ ,” সম্পাদনা ও প্রকাশনা‘ দারুল হাদীস ক্বোম , ইরান।
105. তানবিহ আল- খাওয়াতির ,খণ্ড-1 , পৃষ্ঠা 52।
106. নাহজুল বালাগা , খোতবা নং 91।
107. মাফাতিহ আল-জিনান , দুয়া-ই আবু হামযা সুমালি।
108. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-2 , 960 : 3162।
109. প্রাগুক্ত , খণ্ড-2 , 960 : 3164।
110. প্রাগুক্ত , 960 : 3163।
111. তানবিহ আল-খাওয়াতির , খণ্ড-1 , পৃষ্ঠা-146 , মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1744 : 6010।
112. এর অর্থ তারা তাদের প্রতিদিনের সমস্যার সমাধানে আসে।
113. খাজা নাসির আল-দ্বীন তুসী এ বিষয়ে বলেন যে , একজন ব্যক্তি তাওহীদে তখনই পৌঁছাবে যখন সে তার অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্ব দু’ টোই হারাবে এবং এ দুই অবস্থাকে অতিক্রম করবে। যতক্ষণ সে অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মাঝে দুলবে , হয় সে এ পৃথিবীর লোক অথবা সে আখেরাতের। তিনি বলেন ,“ আল্লাহ ছাড়া যা দেখ সবই মূর্তি। সেগুলোকে চূর্ণ বিচূর্ণ কর।” তাই আল্লাহ ছাড়া কিছু চাওয়া হচ্ছে মূর্তিপূজা। যেমন , আখিরাত , বেহেশত , আল্লাহর সন্তষ্টি এবং আল্লাহর নৈকট্য। কারণ , তৌহিদের সন্ধানকারীর জন্য এগুলো শোভা পায় না। যে বাস্তবে আল্লাহকে জানে সে আল্লাহ ছাড়া আর কিছু চায় না। দেখুন‘ তাওয়াল্লাহ ওয়া তার্বারা’ এর রিসালা , পরিশিষ্ট‘ আখলাক্ব-ই-মুহ্তাশামি’ , পৃষ্ঠা-569।
114. আল-কাফী , খণ্ড-1 , 11 : 3।
115. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-7 , 3418 : 11647।
116. একটি হাসীসে কুদসীতে আছে :“ হে মানুষ , প্রত্যেকে তোমাকে চায় তার জন্য এবং আমি তোমাকে চাই তোমার জন্য। তাই আমার কাছ থেকে পালিও না।” আল মাওয়াইয আল-আদাদিয়্যাহ , 420।
117. হাফিয।
118. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-10 , 4984 : 16931।
119. প্রাগুক্ত , খণ্ড-10 , 4684 : 16930।
120. দেখুন“ আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথ।” ষষ্ঠ অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
121. আল-কাফী , খণ্ড-2 , 164 : 6
122. প্রাগুক্ত , 164 : 7
123. ইরশাদ আল-ক্বুলুব , 199।
124. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড- 13 , 6578 : 20999।
125. দেখুন“ বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক নেয়ামত।”
126. বিহার আল-আনওয়ার , খণ্ড- 82 , 197 ; আল ওয়াফি , 5 : 784 , রওদাতুল মুত্তাকিন , 3 : 195। খাজা নাসির আল-দ্বীন তুসী-র আলখাক্ব মুহতাশামি , 12 : 122।
127. দেখুন“ ইমাম খোমেইনীর (রঃ) পথ নির্দেশনা তার সন্তান হাজ্ব আহমাদ আগার (রঃ) প্রতি , 7ম অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
128. ইমাম আল সাজ্জাদ (আঃ) , সাহিফা-ই-সাজ্জাদিয়া , 15।
129. দেখুন“ অন্তরের চোখ খোলা” , 3য় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
130. যেমনটি উল্লে্যখ আছে দোয়া-ই-আরাফাতে-“ যে আপনাকে পেয়েছে তার কিসের অভাব ?”
131. দেখুন“ আল্লাহর জন্য খাওয়া এবং বিশ্রাম নেয়া ,” 4র্থ অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
132. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড- 4 , 1866 : 6491 এবং 6493।
133. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1856 : 6454।
134. প্রাগুক্ত।
135. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1846 : 6394।
136. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1850 : 6427।
137. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1850 : 6418।
138. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1850 : 6419।
139. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1848 : 6399।
140. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1848 : 6403।
141. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1850 : 6422।
142. প্রাগুক্ত , খণ্ড-4 , 1842 : 6435।
143. মীযান আল হিকমাহ ,“ আল যিকর ,” সামারাত আল যিকর।
144. দোয়া-ই হযরত ইদরিস (আঃ) -এ এটি পাওয়া যায়। দেখুন মিসবাহ আল মুতাহাজ্জিদ , পৃষ্ঠা- 601।
145. দশ শাহির একটি কয়েন সমান দুই রিয়ালের এক চতুর্থাংশ।
146. দেখুন“ কীভাবে একত্ববাদের বাস্তবতায় পৌঁছানো যায় ,” 2য় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
147. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1658 : 5599 ।
148. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-8 , 3688 : 12635।
149. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-1 , 428 : 1555।
150. প্রাগুক্ত , খণ্ড-8 , 6452 : 20664।
151. আল-কাফী , খণ্ড-4 , 18 : 2।
152. তিনি ছিলেন শেইখের ঘনিষ্ট শিষ্যদের একজন। শেইখ ইন্তেকাল করার সময় তাকে মরহুম সুহাইলি (রঃ) বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
153. দেখুন“ আল্লাহকে ভালোবাসার পথ” তৃতীয় ভাগ , তৃতীয় অধ্যায় , ।
154. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-8 , 3686 : 2674।
155. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-7 , 3092 : 10535।
156. প্রাগুক্ত , খণ্ড-7 , 3124 : 10669।
157. প্রাগুক্ত , খণ্ড-7 , 3116 : 10635।
158. শেইখের একজন শিষ্য বলেন যেঃ“ আয়াতুল্লাহ শাহ আবাদির মতই শেইখ রুকু ও সিজদার যিকর তিনবার বলতেন।
159. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-7 , 3130:10685।
160. দেখুন“ বড় পরিবারের কারণে বেকার ব্যক্তির জটিলতায় থাকা” - 7ম অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ।
161. হজ্জ যাত্রীদের জন্য ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষ্যে ইমাম খোমেইনী (রঃ)-এর বাণী , 29 আগষ্ট 1984।
162. প্রাগুক্ত , 03 অক্টোবর , 1979।
163. প্রাগুক্ত , 7 আগষ্ট 1986 ।
164. প্রাগুক্ত।
165. প্রাগুক্ত।
166. প্রাগুক্ত।
167. প্রাগুক্ত।
168. হাজ্বীদের ও আলেমদের উদ্দেশ্যে ইমাম খোমেইনী (রঃ)- এর কথা , 30 সেপ্টেম্বর 1979।
169. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1572 : 5225 , গুরার আল হিকাম , 10162 , নাহজুল বালাগাতে অনুরূপ , উপদেশ নং 82।
170. মীযান আল-হিকমাহ , খণ্ড-4 , 1672 : 5223 , বিহার আল আনওয়ার , খণ্ড-90 , 392 : 60।
171. সাহিফা-ই-সাজ্জাদিয়া : 247।
172. তাক্বদীস-এর মসনাভী : 215।
173. মরহুম সুহাইলি বলেছেন :“ আমার প্রিয় মাওলা” বলে তিনি ইমাম আল আসর , আল মাহদী (আঃ) কে বুঝিয়েছেন যিনি তাকে সে মুহূর্তে দেখতে এসেছিলেন।
174. সাহিফা-ই-সাজ্জাদিয়ার 21নং দোয়াতে আছে-“ এবং আমাকে নৈকট্য দিন আপনার সাথে। আপনার বন্ধুদের সাথে এবং আপনাকে যারা মানে তাদের সাথে।”
175. দেখুন 4র্থ অধ্যায় , প্রথম ভাগ।
176. বর্ণনাকারী হলেন আয়াতুল্লাহ হায়েরি।
177. আয়াতুল্লাহ হাজ্ব আগা মূসা যানজানির (সমকালের একজন মারজা’ র) পিতা।
178. অথবা এরকম কথা।
179. সির-ই- দিলবারান , 206-214।
180.‘ ভুলে যাওয়া নৈতিক গুণাবলী’ , 2য় অধ্যায় , তৃতীয় ভাগ , পৃষ্ঠা-149।
সূচিপত্র :
প্রথম ভাগঃ 6
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য 6
জীবন 7
পেশা 11
আত্মত্যাগ 18
নিস্বার্থ উৎসর্জন 21
নৈতিকতা 26
ইমাম আল আসর এর (আঃ) দ্বিতীয় আগমনের প্রতীক্ষা 32
কবিতা 36
রাজনীতি 40
এক লাফে দীর্ঘ পথ অতিক্রম 44
আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ 45
অদৃশ্য জগত থেকে সাহায্য 51
আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা 56
আত্ম গঠন 78
আত্মগঠনের পথ 79
আত্মগঠনের ভিত্তি 104
আত্মগঠনের অমোঘ ওষুধ 113
আল্লাহর বন্ধুদের আন্তরিকতা 135
আল্লাহর বন্ধুদের যিকর 147
আল্লাহর বন্ধুদের দোয়া 157
আল্লাহর বন্ধুদের পরোপকার 167
আল্লাহর বন্ধুদের দোয়া 180
আল্লাহর বন্ধুদের হজ্ব 186
আল্লাহর বন্ধুদের ভয় 192
ইন্তেকাল 197
শেইখ রজব আলী খাইয়্যাতের ইন্তেকাল 198
আয়াতুল্লাহ হুজ্জাতের ইন্তেকাল 203
আয়াতুল্লাহ হাজ্ব আখুন্দ তুরবাতির ইন্তেকাল 210
তথ্যসূত্র : 213