সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আ.) ও কারবালা
শিরোনাম : সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আ.) ও কারবালা
সংকলনে : মুহাম্মাদ ইরফানুল হক
এ.কে.এম. রাশিদুজ্জামান
প্রকাশক : ওয়াইজম্যান পাবলিকেশনস
279/5 , মাসকান্দা , ময়মনসিংহ
গ্রন্থস্বত্ব : প্রকাশক কর্তৃক সংরক্ষিত।
প্রকাশকাল : 1লা মর্হরম , 1434 হি. ,
2রা অগ্রহায়ণ , 1419 বাং. ,
16ই নভেম্বর , 2012 খ্রি.।
মূদ্রণ :
কম্পোজ ও প্রচ্ছদ : আলতাফ হোসাইন
قال رسول الله (ص) إنّ الحسین مصباح الهدی و سفینة النچاة
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“ নিশ্চয়ই হোসেইন হেদায়াতের বাতি ও নাজাতের নৌকা।”
[মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-433 , সাফিনাতুল বিহার , খণ্ড-1 , মদিনাতুল মায়াজিয , খণ্ড-4 , পৃষ্ঠা-52 , খাসায়িসুল হোসেইনিয়া , পৃষ্ঠা-45 , নাসিখুত্ তাওয়ারিখ , পৃষ্ঠা-57]
সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন ( আ .) ও কারবালা
মহান আল্লাহর সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন ইসলামের পুনর্জাগরণের জন্য শাহাদাত বরণকারী এক মহান ব্যক্তি। তার পিতা হলেন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (আ.) এবং মা হলেন জান্নাতে নারীদের প্রধান ফাতিমা যাহরা (সা. আ.)। ইমাম হোসেইন (আ.) সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন ,“ নিশ্চয়ই হাসান ও হোসেইন জান্নাতে যুবকদের সর্দার।” [ জামে আত তিরমিযী , হাদীস - 3720 ]
জন্ম
হিজরী চতুর্থ সনের শা’ বান মাসের তৃতীয় দিনে ইমাম হোসেইন (আ.) জন্মগ্রহণ করেন। শেইখ সাদুক্ব তার বর্ণনাকারীদের ক্রমধারা উল্লেখ করে সাফিয়াহ বিনতে আব্দুল মুত্তালিব থেকে বর্ণনা করেন যে , তিনি বলেছেন: যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্ম হলো আমি তখন তার মায়ের সেবা করছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এলেন এবং বললেন ,“ হে ফুপু , আমার ছেলেকে আমার কাছে আনো।” আমি বললাম আমি তাকে এখনো পবিত্র করিনি। তিনি বললেন ,“ তাকে তুমি পবিত্র করবে ? বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে পরিষ্কার ও পবিত্র করেছেন।”
ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন ,‘ যখন হোসেইন (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন মহান আল্লাহ জিবরাঈল (আ.)-কে ওহী করলেন যে মুহাম্মাদের একটি ছেলে জন্মগ্রহণ করেছে এবং তাকে তার কাছে অবতরণ করতে বললেন , অভিনন্দন জানাতে বললেন এবং তাকে বলতে বললেন যে ,‘ নিশ্চয়ই আলীর অবস্থান তোমার কাছে ঠিক তেমনই যেমন মূসার কাছে হারুনের। তাই তার নাম রাখো হারুনের সন্তানের নামে।’ অতএব জিবরাঈল (আ.) অবতরণ করলেন , আল্লাহর পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানালেন এবং এরপর বললেন ,‘ নিশ্চয়ই আল্লাহ আপনাকে আদেশ করেছেন তাকে হারুনের সন্তানের নামে নাম রাখতে।’ তিনি (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন ,‘ তার নাম কি ছিল ?’ তিনি জবাব দিলেন ,‘ শুবাইর’ । তিনি (সা.) বললেন ,‘ কিন্তু আমার ভাষাতো আরবী!’ তিনি বললেন ,‘ তাই তার নাম রাখুন হোসেইন [যা হলো এর আরবী অর্থ] ।’ [ মীযান আল - হিকমাহ , হাদীস - 425 ]
অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে , তখন তিনি শিশু হোসেইনকে রাসূল (সা.)-এর কাছে দিলেন যিনি তার জিভকে তার মুখের ভিতর দিলেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তা চাটতে লাগলেন। সাফিয়াহ বলেন যে , আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে দুধ ও মধু ছাড়া অন্য কিছু দেন নি। তিনি বলেন যে , এরপর শিশু পেশাব করলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তার দুচোখের মাঝখানে একটি চুমু দিলেন এবং কাঁদলেন , এরপর আমার কাছে তাকে তুলে দিয়ে বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , আল্লাহ যেন তাকে অভিশাপ দেন যে তোমাকে হত্যা করবে।” তিনি তা তিন বার বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ আমার মা-বাবা আপনার জন্য কোরবান হোক , কে তাকে হত্যা করবে ?” তিনি বললেন ,“ বনি উমাইয়ার মধ্য থেকে যে অত্যাচারী দলটি আবির্ভূত হবে।”
বর্ণিত আছে , রাসূলুল্লাহ (সা.) তার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইক্বামাহ দিলেন। ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) বর্ণনা করেছেন যে , রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কানে আযান দিয়েছিলেন যেদিন তার জন্ম হয়েছিল। এছাড়া বর্ণিত আছে যে , সপ্তম দিনে তার আকিকা দেওয়া হয়েছিল এবং সাদা রঙের মন কাড়া দুটো ভেড়া কোরবানী করা হয়েছিল , এর একটি উরুসহ পা এবং সাথে একটি স্বর্ণমুদ্রা ধাত্রীকে দেওয়া হয়েছিল। বাচ্চার চুল চেঁছে ফেলা হয়েছিল এবং এর সমান ওজনের রুপা দান করা হয়েছিল। এরপর বাচ্চার মাথায় সুগন্ধি মেখে দেওয়া হয়েছিল।
ইসলামের বিশ্বস্ত কর্তৃপক্ষ শেইখ কুলাইনি বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার মা হযরত ফাতিমা (আ.) অথবা অন্য কোন মহিলা থেকে দুধ পান করেন নি। তাকে সবসময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আনা হতো এবং তিনি তাকে তার হাতের বুড়ো আঙ্গুলটি চুষতে দিতেন। ইমাম হোসেইন (আ.) তার বুড়ো আঙ্গুল চুষতেন এবং এরপর দুই অথবা তিন দিন তৃপ্ত থাকতেন। এভাবেই ইমাম হোসেইন (আ.)-এর রক্ত ও মাংস তৈরী হয়েছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রক্ত ও মাংস থেকে।
‘ মালহুফ’ -এ সাইয়েদ ইবনে তাউস বলেন যে , আকাশগুলোতে কোন ফেরেশতা বাকী ছিলো না যে রাসূলুল্লাহ (সা.) -কে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্মদিনে অভিনন্দন জানাতে ও তার শাহাদাত সম্পর্কে শোক-বার্তা জানাতে আসে নি এবং তারা জানিয়েছিলো ইমামের জন্য কী পুরস্কার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তারা তাকে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কবর দেখালেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) দোআ করলেন ,“ হে আল্লাহ , তাকে পরিত্যাগ করো যে হোসেইনকে পরিত্যাগ করে এবং তাকে হত্যা করো যে হোসেইনকে হত্যা করে এবং তাকে কোন প্রাচুর্য দান করো না যে তার মৃত্যু থেকে সুবিধা নেওয়ার ইচ্ছা করে। (ইবনে শাহর আশোব‘ মানাক্বিব’ -এ লিখেছেন যে , একদিন জিবরাঈল অবতরণ করলেন এবং দেখলেন যে , হযরত ফাতিমা (আ.) ঘুমাচ্ছেন এবং ইমাম হোসেইন (আ.) অস্থিরতা অনুভব করছেন এবং কাঁদছেন। জিবরাঈল বসে পড়লেন এবং সান্ত্বনা দিলেন এবং শিশুর সাথে খেলা করলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না হযরত ফাতিমা (আ.) জেগে উঠলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে এ কথা জানালেন।” )
সাইয়্যেদ হাশিম হোসেইন বাহরানি তার‘ মাদিনাতুল মা’ আজিয’ -এ শারহাবীল বিন আবি আউফ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) জন্ম নিয়েছিলেন উচ্চতম বেহেশতের ফেরেশতাদের একজন অবতরণ করলেন এবং বড় সমুদ্রে গেলেন এবং আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে আল্লাহর বান্দাহ , শোক ও দুঃখের পোষাক পরো এবং শোক পালন করো , কারণ মুহাম্মাদ (সা.)-এর সন্তান পড়ে আছে মাথাবিহীন , নির্যাতিত এবং পরাভূত অবস্থায়।”
তার ইমামতের প্রমাণ
হযরত ফাতিমা (আ.) বলেছেন ,‘ আমি হোসেইনকে জন্ম দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এসেছিলেন। তাই আমি তাকে [হোসেইনকে] তাঁর (সা.) কাছে দিলাম একটি হলদে কাপড়ে জড়িয়ে যা তিনি সরিয়ে দেখলেন এবং তাকে একটি সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দিলেন। এরপর বললেন ,‘ ফাতিমা , তাকে নাও , নিশ্চয়ই সে একজন ইমাম এবং ইমামের সন্তান। সে নয় জন ইমামের পিতা ; তার পিঠের নিম্নাংশ থেকে আসবে নৈতিক গুণসম্পন্ন ইমামবৃন্দ , যাদের নবম জন হবে আল-ক্বায়েম [যিনি প্রতীক্ষিত আল-মাহদী-আ.]।’ [মীযান আল- হিকমাহ , হাদীস-426]
হযরত ফাতিমা (আ.) বলেছেন ,‘ আমি হোসেইনকে জন্ম দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এসেছিলেন। তাই আমি তাকে [হোসেইনকে] তাঁর (সা.) কাছে দিলাম একটি হলদে কাপড়ে জড়িয়ে যা তিনি সরিয়ে দেখলেন এবং তাকে একটি সাদা কাপড়ে জড়িয়ে দিলেন। এরপর বললেন ,‘ ফাতিমা , তাকে নাও , নিশ্চয়ই সে একজন ইমাম এবং ইমামের সন্তান। সে নয় জন ইমামের পিতা ; তার পিঠের নিম্নাংশ থেকে আসবে নৈতিক গুণসম্পন্ন ইমামবৃন্দ , যাদের নবম জন হবে আল-ক্বায়েম [যিনি প্রতীক্ষিত আল-মাহদী-আ.]।’ [মীযান আল- হিকমাহ , হাদীস-426]
ইমাম হাসান (আ.) বলেছেন ,‘ নিঃসন্দেহে হোসেইন বিন আলী (আ.) আমার্য রতমপর এবং আমার দেহ থে কে আমার আত্মা চলে যাওয়ার পর ইমাম হবে এবং আল্লাহ— যার নাম প্রশংসিত— তাঁর কিতাবে নবীর উত্তারাধিকার আছে যা আল্লাহ তার পিতা ও মাতার উত্তারাধিকারের সাথে যুক্ত করেছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ জানতেন যে তোমরা তাঁর সৃষ্টিকূলের ভেতর শ্রেষ্ঠ , তাই তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই মুহাম্মাদ (সা.)-কে বেছে নিয়েছেন এবং মুহাম্মাদ (সা.) তোমাদের মধ্য থেকে বেছে নিয়েছেন আলীকে (আ.) এবং আলী (আ.) আমাকে বেছে নিয়েছেন ইমামতের জন্য , আর আমি বেছে নিয়েছি হোসেইনকে (আ.)।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-427]
হোসেইন (আ.) আমার থেকে
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ আর হোসেইনের (আ.) বিষয়ে— সে আমার থেকে , সে আমার সন্তান , আমার বংশ , মানবজাতির মধ্যে তার ভাইয়ের পরে শ্রেষ্ঠ। সে মুসলমানদের ইমাম , মুমিনদের অভিভাবক , জগতসমূহের রবের প্রতিনিধি , তাদের সাহায্যকারী যারা সাহায্য চায় , তাদের আশ্রয় যারা আশ্রয় খোঁজে , [সে] আল্লাহর প্রমাণ তাঁর পুরো সৃষ্টির ওপরে , সে বেহেশতের যুবকদের সর্দার , উম্মতের নাজাতের দরজা। তার আদেশই হলো আমার আদেশ। তার আনুগত্য করা হলো আমারই আনুগত্য করা। যে-ই তাকে অনুসরণ করে সে আমার সাথে যুক্ত হয় এবং যে তার অবাধ্য হয় সে আমার সাথে যুক্ত হতে পারে না।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-428]
বারাআ ইবনে আযিব বর্ণনা করেছেন ,‘ আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি ইমাম হোসেইন (আ.)-কে বহন করছেন এবং বলছেন ,“ হে আল্লাহ , নিশ্চয়ই আমি তাকে ভালোবাসি , তাই আপনিও তাকে ভালোবাসুন।” ’ [মীযান আল- হিকমাহ , হাদীস-429 ; বুখারী , হাদীস-2150 ; মুসলিম , হাদীস-6077]
হাকিমের‘ আমালি’ -এর সূত্রে নাক্কাশের তাফসীর থেকে ইবনে আব্বাসের বর্ণনা এসেছে যে , তিনি বলেছেন , একদিন আমি রাসূল (সা.)-এর সামনে বসা ছিলাম। এ সময় তার ছেলে ইবরাহীম তার বাম উরুর ওপরে এবং ইমাম হোসেইন (আ.) তার ডান উরুর ওপরে বসা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের একজনের পর আরেকজনকে চুমু দিলেন। হঠাৎ জিবরাঈল অবতরণ করলেন ওহী নিয়ে। যখন ওহী প্রকাশ শেষ হলো রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন ,“ আমার রবের কাছ থেকে জিবরাঈল এসেছিল এবং আমাকে জানালো যে সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং বলেছেন যে তিনি এ দুই শিশুকে একত্রে থাকতে দিবেন না এবং একজনকে অপরজনের মুক্তিপণ (বিনিময়) করবেন।”
রাসূল (সা.) ইবরাহীমের দিকে তাকালেন এবং কাঁদতে শুরুকরলেন এবং বললেন ,“ তার মা একজন দাসী [ মারইয়াম মিশরীয় কিবতি ] , যদি সে মারা যায় আমি ছাড়া কেউ বেদনা অনুভব করবে না , কিন্তু হোসেইন হলো ফাতিমা এবং আমার চাচাতো ভাই আলীর সন্তান এবং আমার রক্ত-মাংস , যদি সে মারা যায় শুধু আলী এবং ফাতিমা নয় আমিও ভীষণ ব্যথা অনুভব করবো। তাই আলী ও ফাতিমার শোকের চাইতে আমি আমার শোককে বেছে নিচ্ছি। তাই হে জিবরাঈল , ইবরাহীমকে মৃত্যুবরণ করতে দাও , কারণ আমি হোসেইনের জন্য তাকে মুক্তিপণ করছি।”
ইবনে আব্বাস বলেছেন যে , তিন দিন পর ইবরাহীম মৃত্যুবরণ করলেন। এরপর থেকে যখনই রাসূল (সা.) হোসেইনকে দেখতেন , তিনি তাকে চুমু দিতেন এবং তাকে নিজের দিকে টেনে নিতেন এবং তার ঠোঁটগুলোতে নিজের জিভ বুলাতেন। এরপর তিনি বলতেন ,“ আমার জীবন তার জন্য কোরবান হোক যার মুক্তিপণ হিসাবে আমার ছেলে ইবরাহীমকে দিয়েছি। আমার পিতা-মাতা তোমার জন্য কোরবান হোক , হে আবা আবদিল্লাহ ।”
তাঁর নৈতিক গুণাবলী
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ যে-ই চায় আকাশগুলোর বাসিন্দা ও পৃথিবীর বাসিন্দাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিকে দেখতে , তাহলে তার উচিৎ হোসেইনের দিকে তাকানো।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-432]
ইমাম হোসেইন (আ.) বলেছেনে , আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাক্ষাতে গিয়েছিলাম যেখানে উবাই বিন কা’ ব তার সাথে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে বললেন ,‘ স্বাগতম! হে আবা আবদিল্লাহ , হে আকাশগুলো ও পৃথিবীগুলোর সৌন্দর্য।’ এতে উবাই বললো ,‘ হে রাসূলুল্লাহ (সা.) , আপনি ছাড়া অন্য কারো জন্য এটি কি করে সম্ভব যে সে আকাশগুলো ও পৃথিবীগুলোর সৌন্দর্য হবে ?’ তিনি বললেন ,‘ হে উবাই , আমি তার শপথ করে বলছি যিনি আমাকে তাঁর অধিকার বলে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন , নিশ্চিতভাবেই হোসেইন বিন আলী[-র মূল্য] আকাশগুলো ও পৃথিবীগুলোর চেয়ে বেশী এবং নিশ্চয়ই [তার বিষয়ে] আল্লাহর আরশের ডান দিকে লেখা আছে: হেদায়েতের আলো , নাজাতের নৌকা , একজন ইমাম , দুর্বল না , মর্যাদা ও গৌরবের [উৎস] , এক সুউচ্চ বাতিঘর এবং মহামূল্যবান সম্পদ।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-433]
ইমাম হোসেইন (আ.) আশুরার দিন [কারবালাতে] তার বক্তৃতায় বলেছিলেন ,‘ সাবধান! ভণ্ডের সন্তান ভণ্ড[উবাইদুল্লাহ ইবনে যিয়াদ এবং যিয়াদ ইবনে আবিহ] আমাকে কোনঠাসা করেছে দুটো জিনিসের মাঝখানে— খাপ থেকে তরবারি খোলা অথবা অপমান সহ্য করা। আর তা বহু দূরে যে আমরা অপমান বেছে নেবো। নিশ্চয়ই আল্লাহ , তাঁর রাসূল , বিশ্বাসীরা এবং যে ঐশী ও পবিত্র কোল আমাদের সেবা করেছে এবং যা অপমানকে ঘৃণা করে , তারা সবাই এটি প্রত্যাখ্যান করেছেন যে , সম্মানের মৃত্যুর ওপরে জঘন্য ব্যক্তিদের আনুগত্যকে বেছে নেওয়া হবে।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-434]
ইমাম হোসেইন (আ.) আশুরার দিন [কারবালাতে] তার বক্তৃতায় বলেছিলেন ,‘ আল্লাহর শপথ , আমি তোমাদের হাতে আমার হাত দিবো না কোন অপমানিত ব্যক্তির মতো , আর না আমি পালিয়ে যাবো একজন ক্রীতদাসের মতো।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-435]
ইমাম যায়নুল আবেদীন (আ.) বলেছেন ,‘ আমি হোসেইন (আ.)-কে বলতে শুনেছি ,‘ যদি কোন ব্যক্তি আমাকে এই কানে অপমান করে— ডান কানের দিকে ইঙ্গিত করে— এবং ক্ষমা চায় অন্যটিতে , আমি তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করবো ; আর তা এ কারণে যে , আমিরুল মু’ মিনিন আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে তিনি আমার নানা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন ,“ যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থনা শুনতে চায় না— হোক সে সঠিক অবস্থানে অথবা ভুল অবস্থানে , সে হাউজে কাউসারে উপস্থিত হবে না।” ’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-436]
হুযাইফা বিন আল-ইয়ামান বর্ণনা করেছেন ,‘ আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি হোসেইন (আ.)-এর হাত ধরে থাকা অবস্থায় বলতে ,“ হে জনগণ , এ হলো হোসেইন ইবনে আলী , অতএব তাকে স্বীকার করে নাও। তাঁর শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন , নিশ্চয়ই সে জান্নাতে থাকবে , যারা তাকে ভালোবাসে তারা জান্নাতে থাকবে এবং যারা তার প্রেমিকদের ভালোবাসে তারাও জান্নাতে থাকবে।” ’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-437]
শুয়াইব বিন আব্দুর রহমান আল-খযাঈ বলেছেন ,‘ তাফ’ [আশুরা]-এর দিনে হোসেইন (আ.)-এর পিঠে একটি দাগ দেখা গিয়েছিল , তাই তারা যায়নুল আবেদীন (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করলো [এ বিষয়ে] এবং তিনি উত্তর দিলেন ,‘ এগুলো [খাদ্যের] বস্তাগুলোর দাগ যা তিনি পিঠে বহন করে বিধবাদের , ইয়াতিমদের ও সহায় সম্বলহীন ব্যক্তিদের বাড়ীগুলোতে নিতেন।’ [মীযান আল- হিকমাহ , হাদীস-438]
বর্ণিত হয়েছে যে , একদিন ফাতিমা যাহরা (আ.) তার দুই ছেলে ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হোসেইন (আ.)-কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে গেলেন যিনি খুব অসুস্থ ছিলেন (এবং পরে তিনি এ কারণেই ইন্তেকাল করেন)। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুরোধ করলেন তার দুই ছেলেকে [তার গুণাবলী থেকে] কিছু উত্তরাধিকার হিসেবে দিতে। এতে রাসূল (সা.) বললেন ,“ হাসানের জন্য সে আমার খোদাভীতি ও শ্রেষ্ঠত্ব উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করবে এবং হোসেইন সে আমার উদারতা ও বীরত্ব উত্তরাধিকার হিসাবে লাভ করবে।”
এটি সুপরিচিত যে , ইমাম হোসেইন (আ.) অতিথিদের আপ্যায়ন ও সেবা করতে ভালোবাসতেন এবং অন্যের আশা পূরণ করতেন এবং আত্মীয়দের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের ও দরিদ্রদের উপহার দিতেন , অভাবীদের দান করতেন , বস্ত্রহীনকে পোষাক দিতেন , ক্ষুধার্তকে খাওয়াতেন , ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করতেন , ইয়াতিমদের স্নেহের সাথে হাত বুলিয়ে দিতেন এবং সাহায্যপ্রার্থীদের সাহায্য করতেন , যখনই তিনি কোন সম্পদ লাভ করতেন তিনি তা অন্যদের মাঝে বণ্টন করে দিতেন।
হত্যা করা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত ও হাদীস
মহান আল্লাহ বলেন :
) م ِنْ أَجْلِ ذَٰلِكَ كَتَبْنَا عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا(
“এ জন্যই আমরা ইসরাইলের সন্তানদের জন্য সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম যে ,যে কেউ কোন সত্তাকে হত্যা করবে ,মানুষ হত্যা [র অপরাধে অপরাধীকে ]ছাড়া ,অথবা পৃথিবীতে দুষ্কর্মকারী [ছাড়া ] ,তা হলো এমন যেন সে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করলো। আর যে -ই একটি জীবন বাঁচায় তা হলো এমন যেন সে পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করলো। ” [সূরা মায়েদা :32 ]
মানুষ হত্যা করা সম্পর্কে সুবিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ‘ মিজান আল-হিকমাহ’ থেকে কিছু হাদীস নিচে উল্লেখ করা হলো:-
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আগ্রাসী হলো সে যে নিজের হত্যাকারীকে ছাড়া কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে অথবা নিজের আঘাতকারীকে ছাড়া কোন ব্যক্তিকে আঘাত করে।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস- 5140]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ কিয়ামতের দিন [সমবেত] জনতার মাঝে প্রথম যে বিষয়ে বিচার করা হবে তা হলো [তাদের মধ্যে] রক্তপাত।’ [মীযান আল- হিকমাহ , হাদীস-5141]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ আল্লাহর কাছে পুরো পৃথিবীকে উপড়ে ফেলা খুবই গুরুত্বহীন ঐ রক্তপাতের চেয়ে যা অন্যায়ভাবে ঘটানো হয়েছে।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-5142]
বিশ্বাসীকে হত্যা করা
মহান আল্লাহ বলেন :
) و َمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّـهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا(
“ যদি কেউ ইচ্ছে করে কোন বিশ্বাসীকে হত্যা করে , তার প্রতিফল হলো জাহান্নাম , সেখানেই থাকার জন্য চিরকাল ; আল্লাহ তার প্রতি ক্রোধান্বিত হবেন ও তাকে অভিশাপ দিবেন এবং তিনি তার জন্য এক বিরাট শাস্তিপ্রস্তুত করবেন।” [সূরা নিসা: 93]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ হে জনগণ , কোন মানুষকে কি হত্যা করা হবে যখন আমি তোমাদের মাঝে আছি এবং হত্যাকারী কে তা অজ্ঞাত ? যদি আকাশগুলোর ও পৃথিবীর পুরো জনগণ একত্র হতো একজন মুসলমানকে হত্যা করার জন্য , তাহলে আল্লাহ তাদের সবাইকে শাস্তি দিবেন কোন সংখ্যা ও হিসাব ছাড়া।’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-5144]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ,‘ যে একজন বিশ্বাসীকে হত্যা করতে সাহায্য করে , এমনকি একটি কথার একটি অংশ দিয়েও , সে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে কপালে এ কথাটি লেখা অবস্থায়-“ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত।” ’ [মীযান আল-হিকমাহ , হাদীস-5145]
কারবালার ঘটনার প্রেক্ষাপট
ইমাম হোসেইন (আ.) ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার , বিনয়ী , জ্ঞানী , সাহসী এবং স্বাধীনতাকামী একজন নেতা। তিনি তার নানা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর উম্মতের সংশোধনের জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে উদ্দ্যোগ নেন। কিন্তু সে সময়ের খলিফা (শাসক) ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া তা অপছন্দ করে এবং তার সব ধরনের অন্যায় ও অপকর্মকে সম্মতি দিয়ে তার প্রতি আনুগত্য করার জন্য ইমাম হোসেইন (আ.)-কে আদেশ দেয়। আর তা করা না হলে তাকে হত্যা করা হবে বলে জানিয়ে দেয়। ইমাম হোসেইন (আ.) তার সব অপকর্মের প্রতিবাদ করেন এবং আনুগত্য করতে অস্বীকার করেন।
কিন্তু তিনি জানতে পারেন ইয়াযীদ হজ্বের সময় তাকে হত্যার জন্য মক্কায় তার দূত পাঠিয়েছে। পবিত্র কাবা ঘরের কোন স্থানে তার রক্ত ঝরুক এটি তিনি পছন্দ করেন নি। তাই হজ্ব না করেই 8ই জিলহজ্ব ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা থেকে মরুভূমির দিকে বেরিয়ে পড়েন। [বর্তমান ইরাকের] কুফা এলাকা থেকে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি ইমাম হোসেইন (আ.)-কে চিঠি পাঠিয়েছিলেন যেন তিনি কায়ফযান এবং সেখানে গিয়ে তাদের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেন। এতে ইসলাম ধ্বংস ও বিকৃতি থেকে রক্ষা পাবে। এসব চিঠির কারণে ইমাম হোসেইন (আ.) মক্কা ত্যাগ করে কুফার দিকে যাত্রা শুরুকরেন। কিন্তু পথে ইয়াযীদের নিয়োগ করা গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের আদেশে হুর বিন ইয়াযীদ ইমামকে বাধা প্রদান করে এবং কারবালা প্রান্তরে নিয়ে যায়। এখানে শত্রুরা প্রায় ত্রিশ হাজার সসস্ত্র সৈন্য মোতায়েন করে এবং ইমাম হোসেইন (আ.)-কে জোরপূর্বক বাইয়াত (আনুগত্য) করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। তারা জানায় যে , যদি তা না করা হয় তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে।
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথে ছিলো কেবল অল্প ক’ জন [প্রায় 100 জন] বন্ধু ও সাহায্যকারী এবং তার পরিবারের নারী ও শিশুরা।দ্ধযকরতে পারেন এমন পুরুষের সংখ্যা ছিলো 70 জনেরও কম। তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে সত্য ইসলামকে রক্ষার জন্য [আত্মরক্ষার] যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর প্রবেশ
হুর বিন ইয়াযীদ ইমাম হোসেইন (আ.)-কে কুফায় যাওয়ার পথে বাধা দিলে তিনি থেমে যান। এরপর তার সন্তানদের , ভাইদের ও আত্মীয়দেরকে নিজের চারদিকে জড়ো করলেন এবং কিছু সময়ের জন্য কাঁদলেন ও বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমরা আপনার রাসূলের বংশধর। লোকজন আমাদেরকে আমাদের বাড়িঘর থেকে টেনে বের করেছে এবং আমাদেরকে তাড়া করেছে এবং আমাদেরকে আমাদের নানার জায়গা [মদীনা] থেকে চাপ প্রয়োগ করে বের করে দিয়েছে। বনি উমাইয়া আমাদের উপর অত্যাচার করেছে। হে আল্লাহ , আমাদের অধিকারকে তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিন এবং এ অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন।”
এরপর তিনি সেখান থেকে অগ্রসর হলেন এবং 61 হিজরির 2রা মহররমের দিন বুধবার অথবা মঙ্গলবার কারবালায় প্রবেশ করলেন। এরপর তিনি তার সাথীদের দিকে ফিরে বললেন ,
“ লোকজন পৃথিবীর দাস এবং ধর্ম শুধু তাদের মুখের কথা এবং তারা এর যত্ন নিবে যতক্ষণ পর্যন্ততা তাদের জন্য আনন্দদায়ক এবং যখন পরীক্ষার উত্তপ্ত পাত্র এসে যায় তখন থাকে শুধু গুটি-কয়েক ধার্মিক ব্যক্তি।”
এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ এটি কি কারবালা ?”
লোকজন উত্তর দিলো , হ্যাঁ। তিনি বললেন ,“ এ জায়গা হলো দুঃখ ও মুসিবতের জায়গা এবং এ জায়গা আমাদের উটগুলোর বিশ্রামের স্থান , আমাদের থামার জায়গা , আমাদের শাহাদাতের জায়গা যেখানে আমাদের রক্ত ঝরানো হবে।”
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কাছে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের চিঠি
ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া কর্তৃক নিয়োজিত কুফার গভর্নর ইমাম হোসেইন (আ.)-কে একটি চিঠি প্রদান করে যা নিম্নরূপ:“ আম্মা বা’ আদ , হে হোসেইন , আমাকে জানানো হয়েছে যে , তুমি কারবালায় থেমেছো। ইয়াযীদ আমাকে লিখেছে , আমি যেন বিছানায় মাথা না রাখি এবং সন্তুষ্ট না হই যতক্ষণ পর্যন্তনা আমি তোমাকে আল্লাহর কাছে পাঠাচ্ছি , অথবা তুমি আমার কাছে এবং ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়ার কাছে আত্মসমর্পণ কর। সালাম।”
যখন এ চিঠি ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কাছে পৌঁছলো , তিনি তা পড়লেন এবং তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন ,“ যে আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে মানুষের সন্তুষ্টি খোঁজে সে কখনোই সফলতা লাভ করে না।” দূত তাকে চিঠির উত্তর দিতে বললে ইমাম বললেন ,“ তার জন্য কোন উত্তর নেই , আছে গযব [আল্লাহর]।”
আশুরার (দশ মহররম) রাতের ঘটনাবলী
[‘ ইরশাদ’ গ্রন্থে আছে ] ইমাম হোসেইন ( আ .) তার সাথীদের রাতের বেলা জড়ো করলেন , ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন ( আ .) বলেন যে , আমি তাদের কছে গেলাম শোনার জন্য তারা কী বলেন এবং সে সময় আমি অসুস্থ ছিলাম। আমি শুনলাম ইমাম তার সাথীদের বলছেন ,
“ আমি আল্লাহর প্রশংসা করি সর্বোত্তম প্রশংসার মাধ্যমে এবং তাঁর প্রশংসা করি সমৃদ্ধির সময়ে এবং দুঃখ দুর্দশার মাঝেও। হে আল্লাহ , আমি আপনার প্রশংসা করি এ জন্য যে , আপনি আমাদের পরিবারে নবুয়াত দান করতে পছন্দ করেছেন। আপনি আমাদের কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং ধর্মে আমাদেরকে বিজ্ঞজন করেছেন এবং আমাদেরকে দান করেছেন শ্রবণ শক্তি ও দূরদৃষ্টি এবং আলোকিত অন্তর। তাই আমাদেরকে আপনার কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
আম্মা বা’ আদ , আমি তোমাদের চেয়ে বিশস্ত এবং ধার্মিক কোন সাথীকে পাই নি , না আমি আমার পরিবারের চাইতে বেশী বিবেচক , স্নেহশীল , সহযোগিতাকারী ও সদয় কোন পরিবারকে দেখেছি। তাই আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে তোমাদেরকে উত্তমভাবে পুরস্কৃত করুন এবং আমি মনে করি শত্রুরা একদিনও অপেক্ষা করবে না এবং আমি তোমাদের সবাইকে অনুমতি দিচ্ছি স্বাধীনভাবে চলে যাওয়ার জন্য এবং আমি তা তোমাদের জন্য বৈধ করছি। আমি তোমাদের উপর থেকে আনুগত্য ও শপথের দায়ভার তুলে নিচ্ছি ( যা তোমরা আমার হাতে হাত দিয়ে শপথ করেছিলে ) । রাতের অন্ধকার তোমাদের ঢেকে দিয়েছে , তাই নিজেদের মুক্ত করো ঘূর্ণিপাক থেকে অন্ধকারের ঢেউয়ের ভেতরে। আর তোমাদের প্রত্যেকে আমার পরিবারের একজনের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ো গ্রাম ও শহরগুলোতে , যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের মুক্তি দান করেন। কারণ এ লোকগুলো শুধু আমাকে চায় এবং আমার গায়ে হাত দেয়ার পরে তারা আর কারো পেছনে ধাওয়া করবে না।”
এ কথা শুনে তার ভাইয়েরা , সন্তানরা , ও ভাতিজারা এবং আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানরা বললেন ,“ আামরা তা কখনোই করবো না আপনার পরে বেঁচে থাকার জন্য। আল্লাহ যেন কখনো তা না করেন।” হযরত আব্বাস বিন আলী ( আ .) সর্বপ্রথম এ ঘোষণা দিলেন এবং অন্যরা তাকে অনুসর ণ করলেন।
ইমাম তখন আক্বীল বিন আবি তালিবের সন্তানদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,“ মুসলিমের আত্মত্যাগ তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছে , তাই আমি তোমাদের অনমতি দিচ্ছি চলে যাওয়ার জন্য।” তারা বললেন ,“ সুবহানাল্লাহ , লোকেরা কী বলবে ? তারা বলবে আমরা আমাদের প্রধানকে , অভিভাবককে এবং চাচাতো ভাইকে , যে শ্রেষ্ঠ চাচাতো ভাই , পরিত্যাগ করেছি এবং আমরা তার সাথে থেকে তীর ছুড়িনি , বর্শা দিয়ে আঘাত করি নি এবং তার সাথে থেকে তরবারি চালাই নি এবং তখন আমরা ( এ অভিযোগের মুখে ) বুঝতে পারবো না কী করবো ; আল্লাহর শপথ , আমরা তা কখনোই করবো না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের জীবন , সম্পদ ও পরিবার আপনার জন্য কোরবানী করবো। আমরা আপনার পাশে থেকে যুদ্ধ করবো এবং আপনার পাশে থেকে পরিণতিতে পৌঁছে যাবো। আপনার পরে জীবন কুৎসিত হয়ে যাক ( যদি বেঁচে থাকি ) ।”
হোসেইন বিন হামদান হাযীনি তার বর্ণনা ধারা বজায় রেখে আবু হামযা সূমালি থেকে বর্ণনা করেন এবং সাইয়েদ বাহরানি বর্ণনার ক্রমধারা উল্লেখ না করেই তার কাছ থেকে নবণার্ করেছেন যে , তিনি বলেছেন: আমি ইমাম আলী আল-যায়নুল আবেদীনকে বলতে শুনেছি , শাহাদাতের আগের রাতে আমার বাবা তার পরিবার এবং সাথীদের জড়ো করলেন এবং বললেন ,“ হে আমার পরিবারের সদস্যরা এবং আমার শিয়ারা [অনুসারীরা] , এ রাতকে ভেবে দেখো যা তোমাদের কাছে বহনকারী উট হয়ে এসেছে এবং নিজেদেরকে রক্ষা করো , কারণ লোকেরা আমাকে ছাড়া কাউকে চায় না। আমাকে হত্যা করার পর তারা তোমাদেরকে তাড়া করবে না। আল্লাহ তোমাদের উপর রহমত করুন। নিজেদেরকে রক্ষা করো। নিশ্চয়ই আমি আনুগত্য ও শপথের দায়ভার তুলে নিলাম যা তোমরা আমার হাতে করেছো।” এ কথা শুনে তার ভাইয়েরা , আত্মীয়-স্বজন ও সাথীরা একত্রে বলে উঠলো ,“ আল্লাহর শপথ হে আমাদের অভিভাবক , হে আবা আবদিল্লাহ , আমরা আপনার সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করবো না , তাতে লোকেরা বলতে পারে যে আমরা আমাদের ইমামকে , প্রধানকে এবং অভিভাবককে পরিত্যাগ করেছি এবং তাকে শহীদ করা হয়েছে। তখন আমরা আমাদের ও আল্লাহর মাঝে ওজর খুঁজবো। আমরা আপনাকে কখনোই পরিত্যাগ করবো না যতক্ষণ পর্যন্তনা আমরা আপনার জন্য কোরবান হই।” ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই আগামীকাল আমাকে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের সবাইকে আমার সাথে হত্যা করা হবে এবং তোমাদের কাউকে রেহাই দেওয়া হবে না।” তারা বললেন ,“ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি আমাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন আপনাকে সাহায্য করার জন্য এবং আমাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন আপনার সাথে শহীদ হওয়ার জন্য। তাহলে কি আমরা পছন্দ করবো না যে আমরা আপনার সাথে উচ্চ মাক্বামে [বেহেশতে] থাকবো , হে রাসূলুল্লাহর সন্তান ?” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহ তোমাদের উদারভাবে পুরস্কৃত করুন।” এরপর তিনি তাদের জন্য দোআ করলেন।
তখন ক্বাসিম বিন হাসান (আ.) জিজ্ঞেস করলেন ,“ আমি কি শহীদদের তালিকায় আছি ?” তা শুনে ইমাম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন এবং বললেন ,“ হে আমার প্রিয় সন্তান , তুমি মৃত্যুকে কিভাবে দেখো ?”
ক্বাসিম বললেন ,“ মধুর চেয়ে মিষ্টি।”
ইমাম বললেন ,“ নিশ্চয়ই , আল্লাহর শপথ , তোমার চাচা তোমার জন্য কোরবান হোক , তুমি তাদের একজন যাদেরকে শহীদ করা হবে আমার সাথে কঠিন অবস্থার শিকার হওয়ার পর এবং আমার [শিশু] সন্তান আব্দুল্লাহকেও [আলী আসগার] শহীদ করা হবে।”
আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন ( আ .)- এর খোতবা
আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন (আ.) একটি খোতবায় বলেন:“ আম্মা বা’ আদ , বিবেচনা করো আমার পরিবার সম্পর্কে এবং গভীরভাবে ভাবো আমি কে , এরপর নিজেরদের তিরস্কার করো। তোমরা কি মনে করো যে আমাকে হত্যা করা এবং আমার পবিত্রতা ও সম্মান লুট করা তোমাদের জন্য বৈধ ? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি , তার ওয়াসী ও তার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান নই , যিনি ছিলেন বিশ্বাস গ্রহণে সবার আগে এবং সাক্ষী ছিলেন সে সবকিছুর ওপরে যা মহানবী আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন ? শহীদদের সর্দার হামযা কি আমার পিতার চাচা ছিলেন না ? জাফর , যিনি বেহেশতে দুপাখা নিয়ে উড়েন , তিনি কি আমার চাচা নন ? নবীর হাদীস কি তোমাদের কাছে পৌঁছে নি যেখানে তিনি আমার সম্পর্কে ও আমার ভাই সম্পর্কে বলেছেন : আমরা দুজন জান্নাতের যুবকদের সর্দার ? তাই যদি আমি যা বলছি তার সাথে একমত হও , এবং নিশ্চয়ই আমি যা বলেছি তা সত্য ছাড়া কিছু নয় , তাহলে তা উত্তম , কারণ আল্লাহর শপথ , যে সময় থেকে আমি বুঝেছি আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপছন্দ করেন তখন থেকে আমি কখনোই কোন মিথ্যা বলি নি। আর যদি তোমরা আমি যা বলছি তা বিশ্বাস না কর , তাহলে তোমাদের মাঝে নবীর জীবিত সাহাবীগণ আছে , তাদের কাছে যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস কর এবং তারা আমার বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষ্য দিবে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ আনসারি , আবু সাঈদ খুদরি , সাহল বিন সাদ সা’ য়েদি , যায়েদ বিন আরক্বাম এবং আনাস বিন মালিককে জিজ্ঞেস কর , তারা তোমাদের বলবে যে তারা আল্লাহর রাসূলের কাছ থেকে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এ হাদীসটি শুনেছে। এটি কি তোমাদের জন্য আমার রক্ত ঝরানোর চাইতে যথেষ্ট নয় ?”
তখন অভিশপ্ত শিমর বিন যিলজাওশান বললো ,“ আমি আল্লাহর ইবাদত করি ঠোঁট দিয়ে এবং তুমি যা বলছো তা আমি বুঝি না।” এ কথা শুনে হাবীব বিন মুযাহির [ইমামের সাথী] বললেন ,“ আমি দেখছি তুমি আল্লাহর ইবাদত করো সত্তুর ধরনের সন্দেহ নিয়ে এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে তুমি সত্য কথা বলেছো এবং তুমি বুঝতে পারো না ইমাম যা বলেন , কারণ আল্লাহ তোমার হৃদয়ের ওপরে একটি [মূর্খতার] মোহর মেরে দিয়েছেন।”
ইমাম বললেন ,“ যদি তোমরা এতে সন্দেহ পোষণ কর , তোমরা কি এতেও সন্দেহ কর যে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি ? আল্লাহর শপথ , পূর্বে ও পশ্চিমে , আমি ছাড়া নবীর কোন নাতি নেই তোমাদের মধ্যে অথবা অন্যদের মধ্যে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য , আমি কি তোমাদের মধ্য থেকে কাউকে হত্যা করেছি যে তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও ? অথবা আমি কি কারো সম্পদ বেদখল করেছি , অথবা কাউকে আহত করেছি যার প্রতিশোধ তোমরা আমার ওপর নিতে চাও ?”
যখন কেউ তাকে উত্তর দিলো না , তিনি উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ হে শাবাস বিন রাব’ ঈ , হে হাজ্জার বিন আবজার , হে ক্বায়েস বিন আল-আশআস , হে ইয়াযীদ বিন হুরেইস , তোমরা কি আমার কাছে চিঠি লিখোনি যে , ফল পেকেছে এবং আশপাশের ভূমিতে ফুল ফুটেছে এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে আসুন , যা আপনার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ?”
তারা উত্তর দিলো যে তারা এ ধরনের কোন চিঠি লিখেনি। ইমাম বললেন ,“ সুবহানাল্লাহ , আল্লাহর শপথ অবশ্যই তোমরা তা লিখেছিলে।”
এরপর তিনি বললেন ,“ হে জনতা , এখন যদি তোমরা আমার আগমনকে পছন্দ না কর , তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও যেন আমি কোন আশ্রয়ের জায়গায় চলে যেতে পারি।”
ক্বায়েস বিন আল-আশআস বললো ,“ তুমি যা বলছো তা আমরা জানি না , আমার চাচাতো ভাইদের [বনি উমাইয়ার] কাছে আত্মসমর্পণ কর , তারা তোমার সাথে সেভাবে আচরণ করবে যেভাবে তুমি চাও।” ইমাম বললেন ,“ আল্লাহর শপথ , নিকৃষ্ট মানুষের মতো আমি তোমাদের হাতে হাত দিবোনা , না আমি পালিয়ে যাবো কোন দাসের মতো।”
এরপর তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন , হে আল্লাহর দাসেরা ,
) و َإِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُمْ أَن تَرْجُمُونِ(
“ নিশ্চয়ই আমি আমার ও তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি ,পাছে তোমরা আমাকে পাথর মারো [হত্যা করো]। ” [সূরা দুখান: 20]
) إ ِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ(
“ আমি আশ্রয় নিই আমার ও তোমাদের রবের কাছে , প্রত্যেক দাম্ভিক থেকে , যে হিসাব দিনে বিশ্বাস করে না।” [সূরা মু’ মিন: 27]
ইমাম আরো অগ্রসর হলেন এবং তাদের সামনে দাঁড়ালেন এবং তাদের সারিগুলোর দিকে তাকালেন শান্তবৃষ্টির মতো। তিনি উমর বিন সা’ আদকে কুফার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন এবং বললেন ,“ ধন্যবাদ আল্লাহর প্রাপ্য , যিনি এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং একে মৃত্যু ও ক্ষয়ের বাড়ি বানিয়েছেন এবং যিনি এর মানুষদেরকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন করেন। সে ব্যক্তি ধোঁকা খেয়েছে যে এ পৃথিবীর প্রতারণার শিকার হয়েছে , কারণ যে এর ওপর নির্ভর করে সে তাকে হতাশ করে। যে এখানে আকাঙ্ক্ষা করে সে তাকে রিক্তহস্ত করে। আমি দেখতে পাচ্ছি তোমরা জড়ো হয়েছো এমন একটি কাজের জন্য যা তোমাদের ওপর আল্লাহর ক্রোধ আনবে। তিনি তোমাদের দিক থেকে তার চেহারা ঘুরিয়ে নিয়েছেন এবং তোমাদেরকে তার ক্রোধে ঢেকে দিয়েছেন এবং তোমাদের কাছ থেকে তার রহমত সরিয়ে নিয়েছেন। তাই আমাদের রব হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ , আর তোমরা হচ্ছো নিকৃষ্টতম দাস। তোমরা আল্লাহকে মেনে চলার অঙ্গীকার করেছো এবং তার রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)-কে বিশ্বাস করেছো। এরপরও তোমরা তার পরিবারকে এবং বংশধরকে আক্রমণ করেছো এবং তাদেরকে হত্যা করতে চাও। [ইরশাদ] শয়তান তোমাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং তোমাদেরকে সর্বশক্তিমান আল্লাহকে ভুলিয়ে দিয়েছে। দুর্ভোগ তোমাদের জন্য তোমাদের পথ ও লক্ষ্যের ওপর। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তার কাছে ফেরত যাবো। এ এক জাতি যারা বিশ্বাস গ্রহণের পর কুফুরী গ্রহণ করেছে , তাই বিদায় হে অত্যাচারী জাতি।”
তখন উমর বিন সা’ আদ বললো ,“ তোমাদের জন্য আক্ষেপ , তাকে উত্তর দাও , কারণ সে আলীর সন্তান। সে যদি সারা দিন তোমাদের দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে তার বক্তব্য শেষ হবে না , না সে ক্লান্তহবে।” তখন শিমর এগিয়ে এলো এবং বললো ,“ হে হোসেইন , তুমি কী বলছো ব্যাখ্যা কর যেন আমরা বুঝতে পারি।” ইমাম বললেন ,“ আমার বক্তব্যের মূল কথা হলো যে আমি তোমাদের বলছি আল্লাহকে ভয় করার জন্য এবং আমাকে হত্যা করো না। কারণ আমাকে হত্যা ও আমার পবিত্রতা ধ্বংস করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। কারণ আমি তোমাদের নবী (সা.)-এর কন্যার সন্তান এবং আমার নানী খাদিজা ( আ .) তোমাদের নবীর স্ত্রী। তোমরা হয়তো আমার নানাকে বলতে শুনে থাকবে যে , হাসান এবং হোসেইন বেহেশতের যুবকদের সর্দার।”
এরপর তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-কে সবদিক থেকে ঘেরাও করে ফেললো। তিনি তাদের কাছে এগিয়ে গেলেন এবং তাদেরকে চুপ থাকার ইঙ্গিত করলেন , কিন্তু তারা তা শুনতে অস্বীকার করলো। তখন ইমাম বললেন ,“ তোমাদের জন্য দুর্ভোগ , তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা চুপ করছো না এবং আমি যা বলছি তা শুনছো না ? আমি তোমাদেরকে ধার্মিকতার পথে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। যে আমাকে মান্য করবে সে প্রজ্ঞাবান হবে। আর যে আমাকে মান্য করবে না সে ধ্বংস হবে। তোমরা সবাই আমার অবাধ্য হচ্ছো এবং আমার কথায় কান দিচ্ছো না। এর কারণ হলো তোমরা তোমাদের পেট হারামে পূর্ণ করেছো এবং তোমাদের হৃদয়গুলোতে মোহর মারা হয়েছে। আক্ষেপ তোমাদের জন্য। তোমরা কি ন্যায়পরায়ণ নও এবং শুনতে অক্ষম ?”
কুফাবাসীদের লক্ষ্য করে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বক্তব্য
সাইয়্যেদ ইবনে তাউস বর্ণনা করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তার উটে চড়লেন [অন্যরা বলেন তার ঘোড়ায়] এবং তাদের ইশারা করলেন চুপ করার জন্য। এরপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাসবীহ ও মর্যাদা বর্ণনা করলেন যা তার প্রাপ্য। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় সালাম পাঠালেন ফেরেশতা , নবী ও রাসূলদের ওপর। তারপর বললেন ,“ হে জনতা , তোমরা যেন ধ্বংস হও , দুর্দশাগ্রস্ত হও। তোমরা উৎসাহের সাথে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে তোমাদের সাহায্য করার জন্য এবং আমরা তা করার জন্য দ্রুত অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু তোমরা এখন সে তরবারিগুলো কোষমুক্ত করেছো যা আমরা তোমাদের দিয়েছি এবং তোমরা আমাদের জন্য আগুন জ্বালিয়েছো যা আমরা তোমাদের ও আমাদের শত্রুদের জন্য জ্বালিয়েছিলাম। তোমরা তোমাদের শত্রুদের পক্ষ নিয়েছো এবং তাদের সাথে থেকে তোমাদের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অগ্রসর হয়েছো , যদিও তারা তোমাদের সাথে ন্যায়পরায়ণ আচরণ করে নি , না তোমরা তাদের কাছ থেকে কোন দয়া ও সদয় আচরণ আশা কর। তোমাদের ওপর শত দুর্ভোগ আসুক। তোমরা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো যখন তরবারিগুলো এখনও তাদের খাপে রয়েছে , হৃদয়গুলো শান্তিতে আছে , মতামতগুলো যথাযথভাবে স্পষ্ট এবং ভুল থেকে মুক্ত। কিন্তু তোমরা পঙ্গপালের মতো , যারা যুদ্ধের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং মথের [প্রজাপতি] মতো , একজনের ওপর আরেকজন যেমন পড়ে। তোমরা ধ্বংস হও , হে যারা দাসীদের প্রেমিক , যারা দলত্যাগ করেছো , যারা কোরআন পরিত্যাগ করেছো , যারা সঠিক বক্তব্যকে বদলে নিয়েছো , যারা খারাপের স্তম্ভ , হে যারা শয়তানদের দ্বারা উস্কানি পাচ্ছো এবং যারা আসমানী আদেশ ছিন্নকারী , তোমরা তাদের পক্ষ নিচ্ছো এবং আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছো ? হ্যাঁ , নিশ্চয়ই প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গ করা তোমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য , যা তোমাদের পিতৃপুরুষেরা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা থেকে শাখা বেরিয়েছে। তোমরা নোংরা এবং এর বিস্বাদ ফল যা এর বপনকারীর গলায় আটকে যায় এবং তা অত্যাচারীদের কাছে আনন্দের। সাবধান , এখন অবৈধ পিতার অবৈধ সন্তান [উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদ] আমাকে তরবারি কোষমুক্ত করা ও অপমান সহ্য করার মাঝে স্থাপন করেছে এবং আমরা অপমান গ্রহণ করবো তা কখনোই হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার রাসূল এবং পবিত্র কোলগুলো যা আমাদের দুধ খাইয়েছে , যারা ভদ্র ও যারা অপমান ঘৃণা করে তারা এর সাথে দ্বিমত পোষণ করে যে , আমরা ঘৃণ্য মানুষদের কাছে মাথা নোয়াবো এবং তারা আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন এ বিষয়ে যুদ্ধের ময়দানে পৌরুষের সাথে নিহত হতে। জেনে রাখো , আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো যদিও আমার সাথে রয়েছে অল্প কয়েকজন মানুষ এবং যদিও কিছু ব্যক্তি আমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে।”
“ নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর ওপর নির্ভর করি , আমার রব এবং তোমাদের রব , কোন জীবিত প্রাণী নেই , যার কপালের চুল তার হাতে নেই। নিশ্চয়ই আমার রব সঠিক পথের ওপরে আছেন।” [সূরা হুদ: 56]
হে আল্লাহ , তাদের কাছ থেকে আকাশের বৃষ্টি তুলে নিন এবং তাদেরকে অনাবৃষ্টিতে জড়িয়ে যেতে দিন ইউসুফ (আ.)-এর সময়ের মতো এবং বনি সাকীহর এক ব্যক্তিকে [মুখতার বিন আবু উবায়দা সাক্বাফীকে] তাদের ওপর নিয়োগ দিন , যে তাদের গলায় তিক্ত পেয়ালা ঢেলে দিবে। কারণ তারা মিথ্যা বলেছে এবং আমাদের পরিত্যাগ করেছে। আপনি আমাদের রব , আপনার ওপরে আমরা নির্ভর করি এবং আপনার দিকেই আমরা ফিরি এবং আপনার সামনেই (সবকিছুর) শেষ।
এরপর তিনি তার উট থেকে নামলেন এবং রাসূল (সা.)-এর ঘোড়ায় চড়লেন , যার নাম ছিলো মুরতাজায এবং তার সাথীদেরকে সাজাতে শুরু করলেন।
[‘ মালহুফ’ গ্রন্থে আছে] উমর বিন সা’ আদ সামনে এগিয়ে এলো এবং ইমামের সেনাদলের দিকে একটি তীর ছুঁড়লো এবং বললো ,“ সেনাপতির সামনে সাক্ষী থেকো যে আমিই ছিলাম যে প্রথম তীর ছুঁড়েছিল।’’ তখন তার অধীনে যারা ছিলো তারা বিরাট সংখ্যায় তীর ছুঁড়তে লাগলো যা পাখির মত দেখাতে লাগলো। ইমাম তার সাথীদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন ,
“ আল্লাহ তাঁর রহমত তোমাদের ওপর বর্ষণ করুন , জাগো অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর মুখোমুখি হতে এবং এ তীরগুলো সেনাবাহিনীর দূত যা আমাদের দিকে আসছে।’’
এরপর তারা আক্রমণ করে এবং ইমামের একদল বিশ্বস্তও পরহেজগার সাথী নিহত হন।
বর্ণনাকারী বলেন যে ইমাম হোসেইন (আ.) নিজের দাড়ি ধরে বললেন ,
“ আল্লাহর ক্রোধ চরম হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইহুদীদের ওপর যখন তারা বলেছিল তাঁর একটি ছেলে আছে এবং তাঁর রাগ খ্রিষ্টানদের ওপর পড়ে যখন তারা তাঁকে তিন জনের একজন বানিয়েছিল এবং তাঁর ক্রোধ গিয়ে অগ্নি উপাসকদের [মাজুসদের] ওপর পড়েছিল যখন তারা তাঁর পরিবর্তে সূর্য ও চাঁদের ইবাদত করতে শুরু করেছিল এবং এখন আল্লাহর ক্রোধ পড়বে এ সম্প্রদায়ের ওপর যারা একত্রিত হয়েছে নবীর নাতিকে হত্যার জন্য। সাবধান , আল্লাহর শপথ , আমি তাদের আশার সাথে একমত হবো না , যতক্ষণ পর্যন্তনা আমি আমার রবের সাথে মিলিত হই আমার রক্তে ভিজে।’’
বর্ণিত আছে আমর বিন হাজ্জাজ ইমাম হোসেইন (আ.)-এর সাথীদের দিকে অগ্রসর হলো এবং বললো ,‘‘ হে কুফাবাসী , তাদেরকে দৃঢ়ভাবে ধরে থাকো যারা তোমাদের এবং তোমাদের সম্প্রদায়ের কথা শোনে এবং তাকে হত্যা করতে দ্বিধা করো না যে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে এবং ইমামকে অমান্য করেছে।’’ ইমাম হোসেইন (আ.) বললেন ,‘‘ হে আমর বিন হাজ্জাজ , তুমি কি লোকজনকে আমার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করছো ? আমরা কি ধর্ম থেকে বেরিয়ে গেছি , আর তোমরা তার ওপর দৃঢ় আছো ? আল্লাহর শপথ , যখন তুমি তোমার এ খারাপ কাজগুলো নিয়ে মরবে তখন তুমি জানতে পারবে যে , কে ধর্ম থেকে বেরিয়ে গেছে এবং কে জাহান্নামের [আগুনের] জন্য যোগ্য।’’
হযরত আব্বাস ইবনে আলী (আ.)-এর শাহাদাত
ইবনে শাহর আশোব তার‘ মানাক্বিব’ -এ বলেছেন যে , সাক্কা [পানি বহনকারী] , হাশেমীদের চাঁদ , হোসেইনের পতাকাবাহক এবং তার ভাইদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আব্বাস পানির খোঁজে গেলেন। তারা তাকে আক্রমণ করলো এবং তিনিও জবাব দিলেন এবং বললেন ,“ আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না যখন সে আমাকে উচ্চকণ্ঠে ডাকে , অথবা যতক্ষণ না আমি পরীক্ষিত যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করি এবং মাটিতে পড়ে যাই , আমার জীবন কোরবান হোক তার ওপর যিনি হলেন মুস্তাফার জীবন , নিশ্চয়ই আমি আব্বাস , যে পানি আনে , আর আমি যুদ্ধের দিনে ভয় পাই না।”
তিনি শত্রুসৈন্যদের ছত্রভঙ্গ করে দিলেন , কিন্তু যায়েদ বিন ওয়ারক্বা’ জাহনি যে একটি গাছের পিছনে ওঁৎ পেতে ছিলো , সে তার ডান হাতকে বিচ্ছিন্ন করে ফেললো হাকীম বিন তুফাইল সুমবোসির সহযোগিতায়। এরপর তিনি তরবারি বাম হাতে নিলেন এবং যুদ্ধের কবিতা আবৃত্তি করছিলেন ,“ আল্লাহর শপথ , তোমরা আমার ডান হাত কেটে ফেলেছো , আমি আমার ধর্মের প্রতিরক্ষা করতেই থাকবো যেমন করবে আমার সত্যবাদী ইমাম পবিত্র ও বিশ্বনবীর সন্তান।”
তিনি যুদ্ধ করতে লাগলেন এবং ক্লান্তহয়ে পড়লেন এবং হাকীম বিন তুফাইল তাঈ একটি গাছের পিছনে লুকিয়ে ছিলো , সে তার বাম হাতে আঘাত করলো ও তা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। আব্বাস বললেন ,“ হে আমার সত্তা , কাফেরদের ভয় পেয়ো না , সর্বক্ষমতাবান আল্লাহর রহমতের ও ক্ষমতাপ্রাপ্তদের অভিভাবক রাসূলের সুসংবাদ তোমার কাছে আসুক , তারা আমার বাম হাত বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে অন্যায়ভাবে , হে আল্লাহ তাদেরকে [জাহান্নামের] আগুনে পোড়ান।”
অভিশপ্ত ব্যক্তি তাকে হত্যা করলো লোহার বর্শা দিয়ে। যখন ইমাম হোসেইন (আ.) তাকে ফোরাত নদীর তীরের কাছে দেখতে পেলেন , তিনি কাঁদলেন এবং বললেন ,“ তোমরা তোমাদের কাজের মাধ্যমে অবিচার করেছো হে অভিশপ্ত জাতি , এবং রাসূল (সা.)-এর কথার বিরোধিতা করেছো , শ্রেষ্ঠ নবী কি আমাদেরকে তোমাদের কাছে আমানত রেখে যান নি , আমরা কি সৎকর্মশীল নবীর বংশধর নই , তোমাদের মধ্য থেকে যাহরা (আ.) কি আমার মা নন , আহমাদ (সা.) সৃষ্টির মধ্যে কি শ্রেষ্ঠ নন , অভিশাপ তোমাদের ওপর পড়েছে এবং তোমরা যা করেছো তার জন্য অপমানিত হবে এবং খুব শীঘ্রই তোমরা চরম আগুনের মুখোমুখি হবে [জাহান্নামে]” ।
ইমাম হোসেইন ( আ .)- এর শাহাদাত
কুতুবুদ্দীন রাওয়ানদি তার‘ দাওয়াত’ -এ বর্ণনা করেছেন ইমাম আলী যায়নুল আবেদীন (আ.) থেকে যে ,“ দশই মহররম আমার বাবা আমাকে তার বুকের সাথে চেপে ধরেন তখন তার শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিলো এবং তিনি বললেন ,“ হে প্রিয় সন্তান , এ দোআ মনে রাখো যা সাইয়্যেদা ফাতিমা (আ.) রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে এবং তিনি জিবরাঈল থেকে পেয়েছেন এবং যা আমার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কারণ এটি সব আশা পূর্ণ হওয়ার জন্য , গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে , দুশ্চিন্তায় , কঠিন পরিস্থিতিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে উপকারী। দোআটি এমন:
بِحَقِّ يس وَالْقُرْآنِ الْحَكيمِ وَ بِحَقِّ طه وَ الْقُرْآنِ الْعَظيمِ يا مَنْ يَقْدِرُ عَلى حَوآئِجِ السّآئِلينَ يا مَنْ يَعْلَمُ ما فِى الضَّميرِ يا مُنَفِّساً عَنِ الْمَكْرُوبينَ يا مُفَرِّجاً عَنِ الْمَغْمُومينَ يا راحِمَ الشَّيْخِ الْكَبيرِ يا رازِقَ الطِّفْلِ الصَّغيرِ يا مَنْ لايَحْتاجُ اِلَى التَّفْسيرِ صَلِّ عَلى مُحَمَّدٍ وَ آلِ مُحَمَّدٍ وَافْعَلْ بى...
অর্থ:“ ইয়াসিন এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ কোরআনের উসিলায় , এবং ত্বোহা ও উচ্চতর মর্যাদাপূর্ণ কোরআনের উসিলায় হে যিনি প্রার্থনাকারীদের প্রয়োজন পূরণ করেন , হে যিনি জানেন হৃদয়ের ভিতরে কি আছে , হে যিনি দুঃখ - কষ্ট দূরকারী , হে শোকার্তদের স্বস্তিদানকারী , হে অতি বৃদ্ধদের ওপর দয়ালু , হে ছোট্ট শিশুদের রিয্ক্ব দানকারী , হে যার কাছে কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই , কল্যাণ বর্ষণ করুন মুহাম্মাদ ও তাঁর পরিবারের ওপর এবং আমার বিষয়ে ।” [তারপর প্রয়োজনগুলো বলতে হবে ]
সাইয়্যেদ ইবনে তাউস বলেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) তার যুবকদের ও বন্ধুদের লাশ দেখতে পেলেন তিনি শহীদ হওয়ার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ কেউ কি আছে আল্লাহর রাসূলের পরিবারকে রক্ষা করবে ? তাওহীদবাদী কেউ কি আছে যে আল্লাহকে ভয় করবে আমাদের বিষয়ে ? কোন সাহায্যকারী কি আছে যে আল্লাহর জন্য আমাদেরকে সাহায্য করতে আসবে ? কেউ কি আছে যে আমাদের সাহায্যে দ্রুত আসবে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারের বিনিময়ে ?”
নারীদের কান্নার আওয়াজ উঁচু হলো এবং ইমাম তাঁবুর দরজায় এলেন এবং যায়নাব (আ.)-কে ডাকলেন ,“ আমাকে আমার দুধের শিশুটিকে দাও যেন বিদায় নিতে পারি।” এরপর তিনি তাকে দুহাতে নিলেন এবং উপুড় হলেন তার ঠোঁটে চুমু দেয়ার জন্য। হুরমালা বিন কাহিল আসাদি শিশুটির দিকে একটি তীর ছুঁড়লো , যা তার গলা ভেদ করে তার মাথা আলাদা করে ফেললো (আল্লাহর রহমত ও রবকত শিশুর উপর বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর অভিশাপ পড়ুক তার হত্যাকারীর উপর)।
সিবতে ইবনে জওযি তার‘ তাযকিরাহ’ -তে বর্ণনা করেছেন হিশাম বিন মুহাম্মাদ ক্বালবি থেকে যে , যখন ইমাম হোসেইন (আ.) দেখলেন তারা তাকে হত্যা করবেই , তিনি কোরআন আনলেন এবং তা খুলে মাথার ওপর রাখলেন এবং উচ্চ কণ্ঠে বললেন ,“ আল-কোরআন এবং আমার নানা , আল্লাহর রাসূল (সা.) হলেন আমার ও তোমাদের মধ্যে বিচারক। হে জনতা , কিভাবে তোমরা আমার রক্ত ঝরানোকে বৈধ মনে করছো ? আমি কি তোমাদের নবীর নাতি নই ? আমার নানা থেকে কি হাদীস পৌঁছায় নি তোমাদের কাছে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে যে , আমরা জান্নাতের যুবকদের সদারর্ ? তাহলে জিজ্ঞেস করো জাবির (বিন আব্দুল্লাহ আনসারি)-কে , যায়েদ বিন আরক্বামকে এবং আবু সাঈদ খুদরীকে , জাফর তাইয়ার কি আমার চাচা নন ?”
শিমর উত্তর দিলো ,“ খুব শীঘ্রই তুমি জ্বলন্ত আগুনের [জাহান্নামের] দিকে দ্রুত যাবে।” (আউযুবিল্লাহ)। ইমাম বললেন ,“ আল্লাহু আকবার , আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাকে জানিয়েছেন যে , তিনি দেখেছেন একটি কুকুর তার গলা পূর্ণ করছে তার আহলুল বাইত (আ.)-এর রক্ত দিয়ে এবং আমি বুঝতে পারছি সেটি তুমি ছাড়া কেউ নয়।”
শিমর বললো ,“ আমি শুধু জিহ্বা দিয়ে আল্লাহর ইবাদত করবো , যদি আমি বুঝি তুমি কী বলছো।” ইমাম হোসেইন (আ.) ফিরে দেখলেন তার শিশুপুত্র পিপাসায় কাঁদছে। তিনি তাকে কোলে নিলেন এবং বললেন ,“ হে জনতা , যদি তোমরা আমার প্রতি দয়া না দেখাও , কমপক্ষে এ বাচ্চার ওপর দয়া করো।” এক ব্যক্তি একটি তীর ছুঁড়লো যা তার গলা বিচ্ছিন্ন করে ফেললো। ইমাম কেঁদে বললেন ,“ হে আল্লাহ , আপনি বিচারক হোন আমাদের মাঝে ও তাদের মাঝে , যারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং এর বদলে আমাদের হত্যা করেছে।” একটি কণ্ঠ আকাশ থেকে ভেসে এলো ,“ তাকে ছেড়ে দাও হে হোসেইন , কারণ এক সেবিকা তাকে শুশ্রুষা করার জন্য বেহেশতে অপেক্ষা করছে।” এরপর হাসীন বিন তামীম একটি তীর ছোঁড়ে তার ঠোঁটের দিকে এবং তা থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে।
ইমাম কাঁদলেন এবং বললেন ,“ হে আল্লাহ , আমি তোমার কাছে অভিযোগ করি , তারা যেভাবে আমার সাথে , আমার ভাই , আমার সন্তানদের এবং আমার পরিবারের সাথে আচরণ করেছে।”
‘ আল-ইহতিজায’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে , এরপর ইমাম (আ.) তার তরবারির খাপ দিয়ে একটি কবর খুঁড়লেন এবং রক্তে ভেজা বাচ্চাকে বালির নিচে দাফন করলেন। তিনি তার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং শোকগাঁথা আবৃত্তি করলেন। শাহাদাতের লেখকরা এবং ইহতিজাজের লেখকও বলেন যে , ইমাম এরপর তার ঘোড়ায় চড়লেন এবং যুদ্ধের জন্য এগিয়ে গেলেন এই বলে ,“ এ জাতি অবিশ্বাস করেছে এবং তারা রাব্বুল আলামীনের পুরস্কার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে , এ জাতি হত্যা করেছে আলীকে এবং তার সন্তান হাসানকে যিনি ছিলেন উত্তম এবং সম্মানিত পিতা-মাতার সন্তান। তারা ঘৃণা ও বিদ্বেষে পূর্ণ ছিলো এবং তারা জনতাকে ডাক দিয়েছে এবং জমা হয়েছে হোসেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। অভিশাপ এ নীচ জাতির ওপর যারা বিভিন্ন দলকে একত্র করেছে‘ দুই পবিত্র আশ্রয়স্থলের’ লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য। এভাবে মুশরিকদের বংশধর উবায়দুল্লাহর জন্য তারা যাত্রা করেছে এবং মুরতাদদের আনুগত্য করার জন্য অন্যদেরকে আহ্বান করেছে আল্লাহর বিরোধিতা করে আমার রক্ত ঝরানোর জন্য , এবং সা’ আদের সন্তান আমাকে হত্যা করেছে আক্রমণাত্মকভাবে এক সেনাবাহিনীর সাহায্যে যা প্রবল বন্যার মতো এবং এসব আমার কোন অপরাধের প্রতিশোধের জন্য নয় , শুধু এ কারণে যে , আমার গর্ব হচ্ছে দুই নক্ষত্র , আলী যিনি ছিলেন নবীর পরে শ্রেষ্ঠ এবং নবী ছিলেন কুরাইশ পিতা-মাতার সন্তান , আমার বাবা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং আমরা দুজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির সন্তান , রূপার মতো যা বেরিয়ে এসেছে স্বর্ণ থেকে। আমি হচ্ছি রূপা , দুই স্বর্ণালীর সন্তান। আর কারো নানা কি আমার নানার মতো , অথবা তাদের পিতা আমার পিতার মতো , এরপর আমি দুজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির পুত্র-সন্তান , আমার মা ফাতিমাতুয্ যাহরা এবং বাবা যিনি মুশরিকদের পিঠ ভেঙ্গে দিয়েছিলেন বদর ও হুনাইনের যুদ্ধে এবং যিনি শৈশবকাল থেকেই রবের ইবাদত করেছেন যখন কুরাইশরা ইবাদত করতো একসাথে দুই মূর্তির লাত ও উযযার , তখন আমার বাবা নামায পড়েছেন দুই ক্বিবলার দিকে ফিরে। আর আমার বাবা হলেন সূর্য এবং আমার মা চাঁদ , আর আমি এক নক্ষত্র , দুই চাঁদের সন্তান এবং তিনি [আলী (আ.)] উহুদের দিনে এমন মোজেযা দেখিয়েছেন সেনাবাহিনীকে দুভাগ করে দেওয়ার মাধ্যমে , যা হিংসা দূর করেছিলো এবং আহযাবে [এর যুদ্ধে] ও মক্কা বিজয়ে। যেদিন দুই সেনাবাহিনীতে একটি কথাই ছিলো মৃত্যু এবং এ সবই আল্লাহর রাস্তায় করা হয়েছিল , কিন্তু কিভাবে এ নীচ জাতি এ দুই সন্তানের সাথে আচরণ করেছে যারা সৎকর্মশীল নবী ও আলীর সন্তান , দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধের দিনে যারা লাল গোলাপের মতো।”
এরপর তিনি সেনাবাহিনীর দিকে ফিরে দাঁড়ালেন তার তরবারিকে খাপমুক্ত করে , জীবনকে পরিত্যাগ করে এবং হৃদয়ে মৃত্যুর দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে। তিনি বলছিলেন ,“ আমি আলীর সন্তান , যিনি ছিলেন পবিত্র ও হাশিমের বংশধর এবং এ মর্যাদা আমার জন্য যথেষ্ট যখন আমি গর্ব করি , আমার নানা আল্লাহর রাসূল সবার চেয়ে সম্মানিত। আমরা সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর বাতি এবং আমার মা ফাতিমা যাহরা (আ.) , যিনি আহমাদ (সা.)-এর কন্যা এবং আমার চাচা যিনি দুপাখার অধিকারী বলে পরিচিত এবং আমাদের মাঝে আছে আল্লাহর কিতাব এবং তা সত্যসহ নাযিল হয়েছে এবং আমাদের মধ্যেই আছে বৈধতা এবং কল্যাণপূর্ণ ওহী এবং আমরা হলাম সব মানুষের মধ্যে আল্লাহর আমানত এবং আমরা গোপনে ও প্রকাশ্যে ঘোষণা করি যে , কাউসারের ওপর আমরা কর্তৃত্ব রাখি এবং আমরা আমাদের অনুসারীদের পান করাবো নবীর পেয়ালা দিয়ে , যা অস্বীকার করা যায় না এবং আমাদের অনুসারীরা হলো অনুসারীদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এবং যারা আমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে , কিয়ামতের দিন তারা ধ্বংস হয়ে যাবে।”
তিনি বলেন:“ মৃত্যু অপমানিত হওয়ার চেয়ে উত্তম এবং অপমান জাহান্নামের আগুনে প্রবেশের চাইতে উত্তম।” “ আমি হোসেইন , আলীর সন্তান , আমি শপথ করেছি যে শত্রুদের কাছ থেকে পালিয়ে যাবো না এবং আমার বাবার পরিবারকে রক্ষা করবো , যতক্ষণ না আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ধর্মের উপর নিহত হই।”
মুহাম্মাদ বিন আবি তালিব , ইবনে শাহর আশোব এবং সাইয়্যেদ ইবনে তাউস বলেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.) তখন বললেন ,“ দুর্ভোগ তোমাদের ওপর হে আবু সুফিয়ানের পরিবারের অনুসারীরা , যদি তোমরা অধার্মিক লোক হও এবং কিয়ামতের দিনটিকে ভয় না পাও , তাহলে কমপক্ষে স্বাধীন চিন্তার লোক হও এবং বুঝতে চেষ্টা করো যদি তোমরা আরবদের বংশধর হও।”
শিমর বললো ,“ হে ফাতিমার সন্তান , তুমি কী বুঝাতে চাও ?”
ইমাম বললেন ,“ আমি বলছি যে আমরা পরস্পর যুদ্ধ করবো , কিন্তু নারীরা তো কোন দোষ করে নি । আমার পরিবারের তাঁবু লুট করা থেকে বিরত থাকো যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি।”
ইমাম (আ.) বলেন:“ তোমরা একত্রে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছো ? আল্লাহর শপথ , আমার পরে তোমরা আর কাউকে হত্যা করবে না যার হত্যাতে আল্লাহ তোমাদের ওপর এর চাইতে বেশী ক্রোধান্বিত হবেন। আল্লাহর শপথ , আমি চাই যে আল্লাহ আমাকে ভালোবাসুন তোমাদের ঘৃণার পরিবর্তে এবং তিনি আমার প্রতিশোধ নিন তোমাদের ওপর এমন এক মাধ্যমে যে সম্পর্কে তোমরা সচেতন নও। সাবধান , যদি তোমরা আমাকে হত্যা করো , আল্লাহও তোমাদেরকে হত্যা করবেন এবং তোমাদের রক্ত ঝরাবেন। এরপর তিনি তোমাদের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিবেন না , যতক্ষণ না তিনি ভয়ানক শাস্তি কে দ্বিগুণ করবেন।”
আবুল আব্বাস আহমেদ বিন ইউসুফ দামিশকি ক্বিরমানি , যিনি 1019 হিজরিতে মারা যান , তার‘ আখবারুল দাওল’ গ্রন্থে বলেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর পিপাসা তীব্র হয়ে উঠলো , কিন্তু তারা তাকে পানি পান করার জন্য পানি দেয় নি। এক পেয়ালা পানি তার হাতে এলো এবং তিনি উপুড় হলেন তা পান করার জন্য। হাসীন বিন নামীর তার দিকে একটি তীর ছুঁড়লো , যা তার থুতনি ভেদ করলো এবং পেয়ালাটি রক্তে ভরে গেলো। তখন তিনি তার দুহাত আকাশের দিকে তুলে বললেন ,“ হে আল্লাহ , তাদের সংখ্যা কমিয়ে দাও , তাদের প্রত্যেককে হত্যা করো এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকেও পৃথিবীর ওপর ছেড়ে দিও না।” তখন তারা তাকে সব দিক থেকে আক্রমণ করলো এবং তিনি তাদেরকে বাম ও ডান দিকে তাড়িয়ে দিলেন , যতক্ষণ পর্যন্তনা যারাহ বিন শারীক তার বাম কাঁধে আঘাত করে এবং আরেকটি আঘাত কাঁধে ঢুকিয়ে দেয় এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেয়। শিমর তখন তার ঘোড়া থেকে নেমে এসে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তা খাওলি আসবাহির হাতে হস্তান্তর করে। এরপর তারা তার জামা-কাপড় লুট করে।
মুহাদ্দিস শেইখ আব্বাস কুম্মি বলেন যে , সাইয়্যেদ ইবনে তাউস , ইবনে নিমা , শেইখ সাদুক্ব , তাবারি , ইবনে আসীর জাযারি , ইবনে আব্দুল বির বির , মাসউদী এবং আবুল ফারাজ বলেছেন যে , শিমারের নির্দেশে অভিশপ্ত সিনান [বিন আনাস] তার মাথা বিচ্ছিন্ন করেছিল।
সাইয়্যেদ ইবনে তাউস বলেন যে , সিনান এগিয়ে এলো এবং বললো ,“ যদিও আমি জানি যে সে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নাতি এবং তার মা-বাবা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , তবুও আমি তার মাথা কাটবো।” এরপর সে তার পবিত্র ঘাড়ে আঘাত করে তার তরবারি দিয়ে এবং তার পবিত্র ও সম্মানিত মাথা আলাদা করে ফেলে।
আবু তাহির মুহাম্মাদ বিন হাসান [অথবা হোসেইন] বারাসি [অথবা নারাসি]‘ মা’ আলিমুদ দ্বীন’ গ্রন্থে বলেন যে , ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বিষয়টি এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় , তখন ফেরেশতারা আল্লাহর সামনে কাঁদতে থাকে এবং বলে ,“ হে আল্লাহ এ হোসেইন আপনার মেহমান , সে আপনার রাসূলের নাতি” , তখন আল্লাহ ইমাম আল- ক্বায়েম [আল-মাহদী]-এর একটি ছবি দেখালেন এবং বললেন ,“ আমি তাদের ওপর প্রতিশোধ নিবো এর মাধ্যমে।”
বর্ণনাকারী বলেন , যে মুহূর্তে তারা ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মাথা কেটে ফেললো তখন এক প্রচণ্ডঘুর্ণিঝড় আবির্ভূত হলো এবং পুরো দিগন্তকে অন্ধকারে ছেয়ে ফেললো। এরপর এক লাল ঝড় বইলো যার কারণে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না এবং সেনাবাহিনী ভাবলো আল্লাহর অভিশাপ বোধ হয় নামলো। এরকম অবস্থা এক ঘণ্টা চললো এবং তারপর থামলো।
হিলাল বিন নাফে’ বলেন যে , আমি উমর বিন সা’ আদের সাথীদের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং কেউ একজন চিৎকার করে বললো ,“ অধিনায়ক , সুসংবাদ নিন , শিমর হোসেইনকে হত্যা করেছে।” তখন আমি তার শাহাদাতের স্থানে গেলাম এবং তার পাশে দাঁড়ালাম এবং তিনি মারা যাচ্ছিলেন। আল্লাহর শপথ , আমি এর চেয়ে ভালো কোন লাশ দেখি নি যা রক্তে ভেজা ছিলো এবং তার চেহারার চাইতে আলোকিত কোন চেহারা দেখি নি। তার চেহারার আলো এবং অসাধারণ সৌন্দর্য আমাকে তার মৃত্যু ভুলিয়ে দিলো।
এ অবস্থায় তিনি পানি চাইলেন এবং এক ব্যক্তি তাকে বললো ,“ আল্লাহর শপথ , তুমি তা পাবে না যতক্ষণ না জ্বলন্ত আগুনে [জাহান্নামে] প্রবেশ কর।’’ (আউযুবিল্লাহ)। আমি ইমামকে বলতে শুনলাম ,“ দুর্ভোগ হোক তোমার , আমি জ্বলন্তআগুনের দিকে যাচ্ছি না , না আমি সেখানে ফুটন্ত পানির স্বাদ নিবো , বরং আমি যাচ্ছি আমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর কাছে এবং আমি বাস করবো তার সত্যপূর্ণ বাসস্থানে আল্লাহর আশ্রয়ে , যিনি সর্বশক্তিমান এবং আমি পবিত্র পানি পান করবো এবং এরপর আমি তার কাছে অভিযোগ করবো তোমরা আমার সাথে কী করেছো” । তা শুনে তাদের সবাই ক্রুদ্ধ হলো। যেন তাদের বুকের ভেতর কোন দয়া-মায়া ছিলো না এবং এ পরিস্থিতিতে যখন তিনি তাদের সাথে কথা বলছিলেন তারা তার মাথা কেটে নিলো। আমি তাদের নৃশংসতায় আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম এবং বললাম ,“ আমি আর কোন দিন কোন কাজে এখন থেকে তোমাদের সাথে থাকবো না।”
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেছেন , যখন ইমাম হোসেইন (আ.)- এর ওপর একটি আঘাত করা হলো , তিনি তার ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন এবং তারা দৌড়ে আসলো তার মাথা কেটে ফেলতে। একটি কণ্ঠ আকাশ থেকে শোনা গেলো ,“ হে , যে জাতি তাদের নবীর ইন্তেকালের পর উদ্ধত হয়ে গেছে এবং পথভ্রষ্ট হয়েছে , আল্লাহ যেন তাদের রোযা ও ঈদুল ফিতরের অনুগ্রহ দান না করেন।” তখন তিনি (ইমাম-আ.) বললেন , অতএব আল্লাহর শপথ , তারা সমৃদ্ধি লাভ করে নি এবং তারা বৃদ্ধি পেতে থাকবে যতক্ষণ না প্রতিশোধ গ্রহণকারী [ইমাম মাহদী] উঠে দাঁড়াবেন ইমাম হোসেইনের (আ.) জন্য।
মাশহাদির বর্ণনায় আছে যে , উম্মে সালামা (আ.)-এর কাছে সালামা গেলেন , তখন তিনি কাঁদছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ,“ আপনি কাঁদছেন কেন ?” তিনি বললেন , আমি আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখলাম তার মাথা ও দাড়ি ধুলায় মাখা। আমি জিজ্ঞেস করলাম ,“ হে রাসলূ ুলাহ (সা.) , আপনার কী হয়েছে যে আপনি ধুলায় মাখা ? তিনি বললেন ,“ এইমাত্র আমি আমার হোসেইনের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি।”
ইবনে হাজারের‘ সাওয়ায়েক্বে মুহরিক্বা’ -এ বর্ণিত আছে যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাতের দিন যে চিহ্নগুলি দেখা গিয়েছিল তার মধ্যে একটি ছিলো আকাশ এতো কালো হয়ে গিয়েছিল যে , দিনের বেলা‘ তারা’ দেখা গিয়েছিলো। যে কোন পাথর তুললে তার নিচে তাজা রক্ত দেখা গিয়েছিলো এবং আরো বলা হয় যে , আকাশ লাল হয়ে গিয়েছিলো তার শাহাদাতে এবং সূর্য পীচের মতো কালো। তারাগুলো দিনের বেলা দেখা যাচ্ছিলো এবং মানুষ মনে করেছিলো কিয়ামতের দিন [পুনরুত্থানের দিন] চলে এসেছে। সেদিন সিরিয়াতে যে কোন পাথর উঠানো হয়েছিলো তার নিচে তাজা রক্ত দেখা গিয়েছিলো।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে , ইমাম হোসেইন (আ.)-কে হত্যার পর তারা শহীদদের লাশের মাথাগুলো কেটে বর্শার মাথায় বিদ্ধ করে এবং দেহগুলোকে শত শত ঘোড়ার পায়ের আঘাতে পিষ্ট করে। তারা তাবুগুলো লুট করে ও তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। লুট করার সময় পরিবারের সদস্যদের চাবুক মারে। ইমাম হোসেইন (আ.)-এর মেয়ে পাঁচ বছরের শিশু সাকিনার কানের দুল কান থেকে ছিঁড়ে নেয় এবং তা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। শিশুরা ভয়ে ও ব্যাথায় কাঁদতে থাকলে তাদের গালে চড় মারে। নারীদের মাথার চাদরও [বোরখা] কেড়ে নেয়। নবী পরিবারের নির্যাতিত অসহায় এসব সম্মানিত ব্যক্তিরা মরুভূমিতে আশ্রয়হীনভাবে খোলা আকাশের নীচে চলে আসেন।
শাহাদাতের সময় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বয়স হয়েছিলো 57 বছর। নির্মম , নির্বিচার ও জঘন্যতম এসব অন্যায় অত্যাচার ও হত্যার এ দিনটিই ছিলো 10ই মহররম যা আশুরা দিন হিসেবে সুপরিচিত। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের এ দিনে ইমাম হোসেইন (আ.)-সহ মোট 72 জন শহীদ হন। মহান আল্লাহ ইমাম হোসেইন (আ.) , তার সন্তানদের , শহীদ সাথীদের ও নির্যাতন সহ্যকারী পরিবারের সদস্যদের সবার ওপর তার শান্তিও সম্মান আরো বাড়িয়ে দিন।
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য শোক প্রকাশ
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:“ নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু’ মিনের হৃদয়ে হোসেইনের শাহাদাতের ব্যাপারে এমন ভালোবাসা আছে যে , তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হয় না।” [মুস্তাদরাক আল-ওয়াসাইল , খণ্ড-10 , পৃষ্ঠা-318]
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন:“ সমস্তচোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে , নিশ্চয়ই কেবল সেই চোখ ছাড়া যা হোসেইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে ; ঐ চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত প্রদান করা হবে।” [বিহারুল আনওয়ার , খণ্ড-44 , পৃষ্ঠা-193]
ইমাম আলী ইবনে হোসেইন (আ.) প্রায়ই বলতেন:“ প্রত্যেক মু’ মিন যার চোখ হোসেইন ইবনে আলী (আ.) ও তাঁর সহযোগীদের হত্যার কারণে অশ্রুপাত করে এবং সেই চোখের পানি তার গাল গড়িয়ে পড়ে , আল্লাহ অবশ্যই তাকে জান্নাতে একটি সম্মানিত গৃহ দান করবেন।” [ইনাবিউল মাওয়াদ্দাহ , পৃষ্ঠা- 419]
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:“ যে ব্যক্তি আমাদের স্মরণ করে অথবা যার সামনে আমাদের স্মরণ করা হয় এবং [এর ফলে] তার চোখ দিয়ে অশ্রুপ্রবাহিত হয় , যদিও তা মশার একটি ডানার পরিমাণ হয় , আল্লাহ জান্নাতে তার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করবেন এবং অশ্রুকে তার ও [জাহান্নামের ] আগুনের মাঝে প্রতিবন্ধক করে দেবেন।” [আল-গাদীর , খণ্ড-2 , পৃষ্ঠা-202]
ইমাম আলী (আ.) বলেন:“ নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের জন্য অনুসারী নির্বাচন করেছেন যারা আমাদের সাহায্য করে , আমাদের আনন্দে আনন্দিত হয় ও আমাদের দুঃখে দুঃখিত হয়।” [গুরারুল হিকাম , খণ্ড-1 , পৃষ্ঠা-135]
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন:“ এমন কোন ব্যক্তি নেই , যে হোসেইন (আ.)-কে নিয়ে কবিতা পাঠ করে , নিজে কাঁদে ও এর মাধ্যমে অন্যদের কাঁদায় , অথচ আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে অপরিহার্য এবং তার পাপসমূহকে ক্ষমা করে দেন না।” [রিজাল , আল-শেখ আল-তুসী , পৃষ্ঠা-189]
ইমাম জাফর আস-সাদিক্ব (আ.) বলেন:“ আমাদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে তার কারণে যে শোকার্ত , তার দীর্ঘশ্বাস হলো তাসবীহ এবং আমাদের বিষয়ে তার দুশ্চিন্তা হলো ইবাদত এবং আমাদের রহস্যগুলো গোপন রাখা আল্লাহর পথে জিহাদের পুরস্কার বহন করে।” এরপর তিনি বললেন ,“ নিশ্চয়ই এ হাদীসটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখা উচিত।” [শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস , খণ্ড-1 , পৃষ্ঠা-22]
1 শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস [নাফাসুল মাহমুম] , মুহাদ্দিস শেইখ আব্বাস কুম্মী , ঢাকা , 2010।
2. মীযান আল-হিকমাহ , আল্লামা মুহাম্মদ মুহাম্মাদি রেইশাহরি , দার আল-হাদীস ইনস্টিটিউট , কোম , ইরান , 2009।
3. সহীহ বুখারী , মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী , ঢাকা-2005।
4. সহীহ মুসলিম , আবুল হুসাইন মুসলিম , ঢাকা-2003।
5. জামে আত-তিরমিযী , আবু ঈসা আত-তিরমিযী , ঢাকা-1998।
সাইয়্যেদুশ্ শুহাদা ইমাম হোসেইন (আ.) ও কারবালা 4
তার ইমামতের প্রমাণ 7
হোসেইন (আ.) আমার থেকে 9
তাঁর নৈতিক গুণাবলী 11
হত্যা করা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত ও হাদীস 14
কারবালার ঘটনার প্রেক্ষাপট 16
কারবালায় ইমাম হোসেইন (আ.)-এর প্রবেশ 18
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর কাছে উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের চিঠি 19
আশুরার (দশ মহররম) রাতের ঘটনাবলী 20
আশুরার দিনে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর খোতবা 23
কুফাবাসীদের লক্ষ্য করে ইমাম হোসেইন (আ.)-এর বক্তব্য 27
হযরত আব্বাস ইবনে আলী (আ.)-এর শাহাদাত 30
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর শাহাদাত 32
ইমাম হোসেইন (আ.)-এর জন্য শোক প্রকাশ 41
তথ্যসূত্র: 44
সূচীপত্র : 45